সোমবার, ১২ মে, ২০১৪

বোধিসত্ব ভট্টাচার্যের গল্প : জানলা

আমি যে ঘরটায় থাকি, তার জানলাগুলো পুরনো আমলের। জানলার সামনে একটু শূন্যতা, সেখানে একটা প্লাস্টিক বল টকটক করে আওয়াজ করে। সেই শূন্যতার ভেতরেই একটা পাঁচিল, তার ওপারে অনেকটা জমি, আগে ফাঁকা ছিল, পিওর ধুধু, এখন জংলা হয়ে গেছে পুরোপুরি। ওই জংলার গাছগাছালির ছাঁকনিতে আটকে পড়া সূর্যের আলো থেকে নাদটুকু চলে যায়। তারপর যে টুকু নিকোনো আলো পড়ে থাকে, তাই আসে আমার ঘরে। আমি মুড়ি খেলে বাটিতে সেই আলো আটকে থাকে। জংলা জায়গাটা পেরোলে একটা মাঝারি মাপের রাস্তা। ওখান দিয়ে মানুষ যায়, সাইকেল যায়, বাইক যায়, ‘আসকিম-আসকিম’ যায়। বড় গাড়ি ঢুকতে পারে না রাস্তাটায়। একবার একটা লরি ঢুকে পড়েছিল বলে কি ঝামেলা! 

ওই রাস্তায় একটা ছোট দোকান রয়েছে। দোকানটা আমার জানলা থেকে দেখা যায়। দোকানের মালিক মন্টু দাস চিটফান্ড এজেন্ট ছিলেন। গ্রাহকের টাকা ফেরত দিতে না পেরে গত বছর এরকমই এক সময়ে সিলিং থেকে ঝুলে যান। ছোট দোকানঘরের সামনে বড় চাতাল। মাথায় টিনের ছাউনি। বৃষ্টি হলে ওখানে তখন অনেক মানুষ। গরমের দুপুরে ওই চাতাল তেতে যায়। কেউ আসে না। এক পাগল শুতে আসে খালি। সঙ্গে শতরঞ্চি। চাতালের ওপর পেতে নিয়ে শোয়। রোজ যে আসে তা-ও নয়। মাঝেমাঝে। ইদানীং বেশি আসছে। অন্তত আমি যে ক’টা দুপুর বাড়িতে কাটাই, ওকে দেখি। মানুষটা আমার পরিচিত। ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি। পাড়ার এক মুদীর দোকানি ছিল, নোদে মন্ডল। এখন আর নেই। ওখানে এখন মাল্টিস্টোরিড। তার কোনো এক সম্পর্কের মামা হল এই মানুষটি। আমরা ছড়া বেঁধেছিলাম তাকে নিয়ে—নোদের গরব, নোদের মামা। 

আজ দুপুরে শোয়ার আগে ও শতরঞ্চিটা পাশের টিউবওয়েল থেকে অনেকক্ষণ ধরে ধুয়ে নিয়ে এল। তারপর চাতালে পাটপাট করে পেতে নিল বেমালুম। আমি জল খেতে খেতে দেখছিলাম, কি এক কারণে যেন ও ইতস্তত করছে। শুতে পারছে না। হঠাৎ ভেজা শতরঞ্চির ওপর উঠে দাঁড়িয়ে আমাকে হাতছানি দিতে লাগলো। ও কিছু বলছে কি না বুঝতে পারছি না, তবু গন্ধ পাচ্ছি—আয় রে, আয় রে, আয় রে। এসব গন্ধ পুকুরের জলে অল্প একটু ভিজিয়ে নেওয়া কলাপাতায় মোড়া ভালবাসার মত। কিন্তু ঘটনা হল, যে চাতালটায় ও শোয় সেটার থেকে আমার জানলার দূরত্ব বেশ খানিকটা। আমার পক্ষে ওকে দেখাটা ততটা অসুবিধাজনক না হলেও ওর পক্ষে আমাকে দেখতে পাওয়াটা প্রায় অসম্ভব। ব্যাপারটা ঠিক কি হচ্ছে বুঝতে না পেরে বসে রইলাম আমি জানলার সামনে, যেমন ছিলাম। সে ও হাতছানি দিতে লাগল, যেমন দিচ্ছিল। তিরিশ-চল্লিশ সেকেন্ড মত এইভাবে চলার পর ও চাতাল থেকে নেমে মাঝারি রাস্তাটার উল্টোদিকে এসে উবু হয়ে একটা সবুজ রঙ (রঙ আমি ভাল চিনি না। তবে, আমার ‘সবুজ’-ই মনে হল)-এর কুকুরের বাচ্চাকে তুলে নিয়ে ফিরে গেল ভেজা শতরঞ্চিতে।

আবহাওয়া দপ্তর বলছে, এরকম গরম বহুদিন পড়েনি। ব্রেকিং নিউজ বলছে, চুপ! তাপপ্রবাহ চলছে। তার মাঝেই এক কুকুর বাচ্চাকে পরম যত্নে ভেজা শতরঞ্চিতে শুইয়ে দিচ্ছে একইরকমভাবে তেতে যাওয়া আরেক মানুষ। ঘুমই পাড়িয়ে দিচ্ছে হয়তো বা। খোকা ঘুমোলো, পাড়া জুড়োলো। পাশ দিয়ে মানুষ চলে যাচ্ছে, মাথার ওপর দিয়ে প্লেন চলে যাচ্ছে, ভাল করে খেয়াল করলে হয়তো বর্গীদের ঘোড়ার খুরের শব্দ কিংবা কালিকট বন্দরে নোংর করার সময় ভাস্কো-ডা গামা’র জাহাজের বিধিসম্মত ছলাত ছলাতও টের পাওয়া যাবে, তবু ওর কোনও ভ্রুক্ষেপ নেই। এইভাবেই, দিন এবং রাতের চেনা সমীকরণের মাঝে চিলতে কাদামাটির ভেতর ধীরে ধীরে গিঁথে যাচ্ছে একটা কুকুর আর একটা মানুষ। এইভাবেই, অদ্ভুতুড়ে এপ্রিলের নাড়ির মধ্যে লুকিয়ে থাকা সিমেন্টের চাতালে নি:শব্দে গান গেয়ে চলেছে কোনও এক হরিদাস পাল।
আমার ঘরের জানলা। জানলার বাইরে শূন্যতা। তার ভেতর প্লাস্টিক বল পাঁচিল ফুরফুরে নিদ্রালু সময়। আয় রে, আয় রে, আয় রে।

ঘুম পেয়ে যাচ্ছিল খুব। শোওয়ার আগে বিছানাটায় একটু জল ঢেলে দিলাম।




লেখক পরিচিতি
বোধিসত্ত্ব ভট্টাচার্য

হ্যাঁচ্চো, মিনিবাস, মোমবাতি, মাঝরাস্তা, লেড়ো-খাস্তা... অল্প অল্প করে রয়েছেন সবেতেই। পাশ ফিরে ঘুম আর বিফ কাবাবে প্রচুর সময় দেওয়ার জন্য মাঝমাঝেই ডেডলাইন মিস করেন। প্রিয় বাক্য-- " ঠিয়াছে... কোনও অ্যাপার না...!"

গল্পকার। প্রবন্ধকার।

২টি মন্তব্য: