রবিবার, ১১ মে, ২০১৪

সিফাত আহমেদের গল্প : অবলোকনসমূহ

ব্যক্তিগত নোটবইটার একটা রেখাটানা-তারিখলেখা পাতায় তুমি খুব সযত্নে, গোটা গোটা হরফে লিখলে, ‘মরে গেলাম। এমনিই।’ তার পরে তুমি উঠে দাঁড়িয়ে দরোজার দিকে হাঁটতে থাকলে। ওই দুয়ারটি ছাড়া কোন কিছুরই আর অস্তিত্ব নেই। দরজার হাতলে হাত রেখে তার কাঠের ডিটেইলসের দিকে চোখ যায়। কারুকার্যহীন সেই দরোজার কাঠের রেখাগুলিকে কমপ্যাক্ট ডিস্কের গ্রুভের মত সঙ্গীতবহ মনে হয় তোমার। ততক্ষণে তুমি দরজা খুলে ফেললে এবং সামনে ছাদের অস্তিত্ব টের পেলে। এবড়ো-থেবড়ো ছায়ামাখানো সেই ছাদের চাঁদের আলো যেন তোমাকে জাদুটোনা করে রাখে। ধীরে ধীরে হেঁটে তুমি রেলিঙের কাছে গেলে। সিমেন্টের চওড়া রেলিঙে চাইলেই দাঁড়ান যায়। আর তুমি যেহেতু দাঁড়াতে চাও, তাই তুমি দাঁড়াতে পারলে।


দাঁড়িয়ে তুমি দুরের পটভূমি দেখে নিলে। নতুন করে তোমার মুখে বাতাসের ঝাপটা লাগলো। শহরতলীর সতেজ বাতাস। তুমি নিচে তাকালে এবং আবার ওপরে। দুই হাত ডানার মত করে একটি পা তুমি শূন্যে বাড়িয়ে দিলে। শরীরটা যেন তারে শুকানো কাপড়ের মত হালকা দুলে উঠলো তোমার। তুমি নিজেকে কোন কিছু থেকে দমন করতে চাইলে। কিন্তু পারলে না। ফলস্বরূপ আচমকা তুমি ঝাঁপিয়ে পড়লে। যখন তুমি পড়ছ, তখন তোমার সামনে এক অদ্ভুত দৃশ্য ভেসে উঠলো। তোমার শৈশবের সাথে সম্পর্কযুক্ত সেই দৃশ্যে তুমি দেখতে পেলে তোমার মাকে। তোমার দিকে তাকিয়ে হাসছে। মাটিতে আছড়ে পড়ার মুহূর্তে সেই হাসি তোমাকে অনুপ্রেরনা জোগাল বেঁচে থাকার। তোমাকে টেনে নিয়ে গেল অন্য কোথাও। আর তোমার ঘুম ভেঙ্গে গেল।

তুমি বিস্ফারিত চোখে অন্ধকার ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকলে কিছুক্ষণ। যেন বিশ্বাস করতে পারছ না তখনও যে তুমি বেঁচে আছো। শ্বাস-প্রশ্বাস তখনও দ্রুত এবং গভীর। অবশেষে তুমি উঠে বসলে খাটের ওপর। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে। আকাশে ক্ষীণ আলোর রেখা দেখা যাচ্ছে। এমন করে তুমি সেই আলোর দিকে তাকিয়ে থাকলে যেন গভীর জঙ্গলে হারিয়ে যাওয়া কুকুরটি তার সন্ধানরত মনিবের টর্চের আলো দেখতে পেল। সকাল তোমার কাছে এক দারুণ উদ্দীপনা হয়ে এলো।

যদিও তুমি এই সকালে কখনই ঘুম থেকে ওঠ না, আজকে তুমি তড়িঘড়ি করে বিছানা ছাড়লে। রুমের মধ্যেই তুমি কিছুক্ষণ পায়চারি করলে। তারপর বেসিন কেবিনেটের সামনে গিয়ে টুথপেস্টের টিউব হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে। আয়নায় নিজেকে দেখলে, আরেকটু খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। যেন পুরনো কাঠামোর মধ্যেই নতুন কিছু খুঁজছ। তুমি ভুলে গেলে দাঁত ব্রাশ করার কথা। টুথপেস্টের টিউব কেবিনেটের ওপর রেখে তুমি দরজা খুলে বাইরে বের হয়ে এলে। সিঁড়ি ভেঙ্গে যখন নিচে নামতে উদ্যত হলে, কি মনে করে আবার তুমি ঘরে ফিরে এলে। এমন আলুথালু হয়ে কি কোথাও বেরুনো যায়? হয়ত তাই ভাবলে তুমি।

আবার ঘরে ঢুকে তুমি ভালো করে মুখ ধুলে, দু গ্লাস পানি খেলে এবং পরিষ্কার একটা শার্ট ও প্যান্ট পড়ে নিলে। তুমি বোধ হয় দাঁত ব্রাশ করার কথা একেবারেই ভুলে গেলে। তোমার চোখে ভাসছে তুমি কেবিনেট থেকে টুথপেস্টের টিউব বের করেছ এবং তা আবার যথাস্থানে রেখে দিয়েছ। বাকি শূন্যস্থানটুকু মস্তিষ্ক পূরণ করে নিয়েছে। সুতরাং তুমি সেই অমার্জিত মুখেই ঘর থেকে বের হয়ে গেলে। রাস্তায় নেমে তুমি দেখলে ইতোমধ্যেই চারিদিক বেশ আলোকিত হয়ে এসেছে। তুমি ফাঁকা রাস্তা ধরে হাঁটতে থাকলে।

একটা খালি রিকশা তুমি দেখতে পেলে। এমন স্নিগ্ধ সকালে রিকশায় করে ঘুরতে মন্দ লাগবে না ভেবে তুমি রিকশাওয়ালাকে ডাকলে। রিকশাওয়ালা কাছে এলে তুমি রিকশাওয়ালার দিকে তাকিয়ে থাকলে। কারণ তুমি তখনও গন্তব্য ঠিক করনি। রিকশাওয়ালা তাগাদা দিলে যা হোক তুমি কোন এক ঠিকানার নাম বললে। রিকশাওয়ালা যেতে রাজি হল না এবং তোমাকে দ্বিতীয়বার ভাবনার সুযোগ না দিয়েই চলে গেল। তুমি রিকশার দিকে প্রত্যাখ্যাত প্রেমিকের দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলে। তোমাকে দেখে মনে হল এক্ষুনি তুমি কেঁদে ফেলবে।

তুমি রাস্তার পাশের ফুটপাতে বসে পড়লে। মনটাকে ঠিক করার চেষ্টা করলে। তারপর আবার উঠে দাঁড়িয়ে হাঁটতে থাকলে। তোমাকে বেশ বিব্রত দেখাল। যেন কোন এক গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে পাঠকের এক্সপেক্টেশান মেটাতে না পারার ব্যর্থতা তোমার ওপর চেপে বসেছে। কিন্তু তোমার এখনও বেঁচে থাকাটাই কি নায়কোচিত নয়! তাই হয়ত ভাবলে তুমি। আর হাঁটার গতি তুমি বাড়িয়ে দিলে। তোমার শরীর ঘেমে উঠতে লাগলো কিন্তু তবু তুমি হাঁটতে থাকলে। হাঁটতে হাঁটতে অবশেষে এক পার্কের সামনে এসে দাঁড়ালে। তারপর তুমি ঘুরে দাঁড়িয়ে পার্কে বিশ্রামের হাতছানি উপেক্ষা করে অন্য পথে হাঁটতে থাকলে। তোমার এই ঘুরে দাঁড়ানোটাই কি বীরোচিত নয়!

সেটা প্রশ্নসাপেক্ষ। কারণ তুমি আবার দাঁড়িয়ে গেলে। ফের কতকটা পথ হেঁটে তুমি পার্কে ঢুকে পড়লে। পার্কের বৃক্ষসমাগম যে ছায়ার সরবরাহ ঘটিয়েছে তা তোমার ক্লান্তি প্রশমনে যথেষ্ট ছিল। তাই পার্কের এক নির্জন বেঞ্চিতে বসার কিছুক্ষণ বাদেই তোমার ঘুম পেয়ে গেল। কিন্তু কোন এক অজানা শঙ্কায় তুমি ঘুমুতে পারলে না। যেন খুব দামি কিছু তোমার কাছে গচ্ছিত আছে। তাই বেঞ্চে বসে তুমি শুধু ঢুলতে লাগলে। সামনে-পেছনে। কোন এক দিকে একটু বেশি হেলে পড়লেই ঘুম তোমার ছ্যাঁত করে ছুটে যাচ্ছিল। তারপর কিছুক্ষণ বাদে আবার তুমি ঢুলতে থাকলে। তোমার দোষ কি! এত সকালে তো তুমি কখনই ঘুম থেকে ওঠনি।

একটা নির্জন বেঞ্চিতে তুমি বসেছিলে। তোমার কাছে বেঞ্চটা কেন নির্জন মনে হল? নির্জন হতে পারে যে পার্কটিতে বেঞ্চটি রাখা, সেই পার্কটি। কিংবা তোমার চোখের সামনে পেতে রাখা কৃত্রিম হ্রদটি; যে হ্রদের পানিতে তুমি তাকিয়ে থাক; তোমার অবয়বের দিকে। কিন্তু, বেঞ্চটা কেন নির্জন হবে! তবু তোমার কাছে বেঞ্চটাকেই নির্জন মনে হল। পুরো পার্কের নির্জনতা যেন ওই বেঞ্চে এসে জমেছিল। আর যেহেতু খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে পড়েছ তুমি, সেহেতু বেঞ্চের সেই নির্জনতা তোমাকে তন্দ্রালু করার জন্য পর্যাপ্ত ছিল। এর মধ্যে একটি কুকুর তোমার পেছনে এসে দাঁড়াল। তুমি ওটার শ্বাস-প্রশ্বাসের ওঠানামা টের পাচ্ছ। কুকুরটি তোমার পেছন থেকে হেঁটে এসে হ্রদের পাড়ে দাঁড়াল। তারপর মাথা নুইয়ে পানি পান করতে উদ্যত হয়। তুমি হ্রদের পানিতে কুকুরটির অবয়ব দেখতে পেলে। সেটি যেন কোন কুকুরের মুখ ছিলনা। যেন কোন মানুষের মুখ। কিন্তু তোমার কাছে তা স্পষ্ট হল না। কারণ তোমার চোখে তখন ঘুম। তোমার এমন তন্দ্রালু অবস্থায় আমি এসে তোমার পাশে বসলাম।

- কেমন আছো?
- এইতো। ভালোই আছি। তুমি?
- আমি? উম… ভালোই… বোধ হয়।
- বোধ হয়? বোধ হয় কেন?
- উম… আমার মনে হয় না, কোন মানুষের পক্ষে সে কেমন আছে তা নিশ্চিত হয়ে বলা সম্ভব।
- কেন?
- কারণ আসলে সে জানেই না, ভালো থাকা বা খারাপ থাকা আসলে কি। মানুষের আশেপাশের বস্তুগুলো দিয়ে যদি পরিমাপ করা যায়, তাহলে হয়ত বলা সম্ভব। কিন্তু এটা তো বোধের ব্যাপার। আর এছাড়াও মানুষ ভাবতে পছন্দ করে যে সে ভালো নেই। এবং যতক্ষণ সে মনে করছে সে ভালো নেই, সে আসলেই ভালো নেই। কারণ এটা বোধের ব্যাপার।
- তাহলে সে ভালো নেই, এটা তো বলতে পারে। তোমার কথামতে তারা তো আসলে ভালো নেই। তাই না?
- না। অনেক মানুষই ভালো থাকে। আর সেই ভালো থাকার বোধ থেকে অনেকেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে উত্তর দিয়ে ফেলে যে সে ভালো আছে। কিন্তু তাকে যখন জিজ্ঞেস করা হয় যে সে কেমন আছে এবং সে উত্তর দেয় যে ভালো আছে, তখনই তার কাছে মনে হয়, আসলে কি সে ভালো আছে। আর সে তার দুঃখ-দৈন্য নিয়ে ভাবতে থাকে। এক পর্যায় তার আফসোস হয় কেন সে বলল যে সে ভালো আছে। এবং পরমুহূর্তে সে নিজেকে মহান এবং সংহত ভাবতে শুরু করে। কারণ, কজন পারে অমন কষ্টের মধ্যে এমন মানসিক শক্তি প্রদর্শন করতে!
- তুমি কি মনে কর না কিছু মানুষ আছে যারা এতকিছু ভাবতেই চায় না।

- মানুষ না ভেবে পারে কীভাবে! মানুষকে তো ভাবতেই হয়। ভাবনা মানুষের নিয়তি। আর তুচ্ছ চিন্তায় ব্যাপৃত থাকতে মানুষ ভালবাসে।

- আমার মনে হয়, এটা তোমার একান্তই নিজস্ব সিদ্ধান্ত।

- নিশ্চয়ই। তোমার জন্য যদি এটা সত্য না হয়, তাহলে ধরে নেয়া যায় তুমি আসলেই ভালো আছো।

- হুম… তারপর… তোমার স্বপ্নের কথা বল।

- হ্যাঁ… তুমিও নিশ্চয়ই স্বপ্ন দেখ।

- আজই তো দেখলাম। কিন্তু আমি তোমার স্বপ্নের কথা শুনতে চাই।

- আমি দেখলাম তোমাকে…আমি স্বপ্নে তোমাকে দেখলাম, তুমি ঘুমিয়ে আছ। ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখছ। দুঃস্বপ্ন। আমি দেখলাম তুমি স্বপ্নে দেখছ, তুমি আত্মহত্যা করছ। ছাদ থেকে লাফ দিয়ে। ছাদ থেকে লাফ দিয়ে মাটিতে পড়ার ঠিক আগ মুহূর্তে তোমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। তুমি বিছানা ছেড়ে বেসিনের সামনে গিয়ে দাঁড়ালে এবং… আরও কি কি যেন করলে। তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে এলে। তারপর তুমি হাঁটলে। প্রচুর হাঁটলে। এবং বেশ দ্বিধান্বিত অবস্থায় একটা পার্কে গিয়ে ঢুকলে। একটা … নির্জন বেঞ্চিতে বসলে। তোমার প্রচুর ঘুম পাচ্ছে। এমন অবস্থায় আমি আসলাম তোমার সাথে দেখা করতে। এবং … তোমাকে… বলতে থাকলাম আমি কি স্বপ্নে দেখেছি। পুরোটা বলা শেষে, আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কি স্বপ্নে দেখলে। তুমি তোমার স্বপ্নের কথা বললে। তারপর উঠে দাঁড়ালে।

প্রথমে ধীর পায়ে তারপর আত্মবিশ্বাসী পদে হেঁটে পার্ক থেকে বেরিয়ে গেলে। পার্ক থেকে বেরিয়ে কিছুটা পথ হাঁটলে। তারপর সিগনালে দাঁড়িয়ে থাকা একটি বাস দেখতে পেলে। বাসটাকে ধরার জন্য তুমি দৌড়ানো শুরু করলে। ইতিমধ্যে বাসটিও ছেড়ে দিয়েছে। তুমি দৌড়ে গিয়ে কোনমতে বাসটা ধরতে পারলে এবং চলন্ত বাসে লাফ দিয়ে উঠে গেলে। বাসে উঠে তুমি খালি দেখে একটা সিটে বসে পড়লে। বাসে তোমার তিন সিট সামনেই একটা মেয়ে বসা। তুমি পুরোটা পথ ওই মেয়েটার দিকে তাকিয়ে থাকলে। তারপর বাস যখন এসে তোমার গন্তব্যস্থলে থামল তখন তুমি বাস থেকে নেমে যেতে যেতে মেয়েটিকে ভালমতো দেখে নিলে। সুন্দর, সুশ্রী, সেক্সি। তুমি নিজের অজান্তেই বাসের ইঞ্জিন বক্সে বসে পড়লে। মেয়েটা তোমার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি একটা হাসি দিল। তারপর বুকের ওপর থেকে ওড়নাটা ঝট করে সরিয়ে ফেলল। সাথে সাথে ড্রাইভার তোমাকে বাস থেকে নেমে যেতে তাগাদা দিল। তুমি বাস থেকে নেমে পড়লে। তারপর হেঁটে হেঁটে বাসায় ফিরে এলে।

সিঁড়ি ভেঙ্গে বাসায় ঢুকবার সাথে সাথে তোমার বাবা তোমাকে জিজ্ঞেস করল তুমি ব্রাশ করেছ কিনা। তুমি অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে বললে যে হ্যাঁ তুমি দাঁত ব্রাশ করেছ। কিন্তু তোমার বাবার কাছে মনে হচ্ছিল তুমি তা করনি। কারণ টুথব্রাশটি ছিল শুকনো খটখটে। সুতরাং তিনি তোমাকে আবার ব্রাশ করতে বললেন। কিন্তু তুমি তা করতে অস্বীকৃতি জানালে। কারণ তুমি জান, তুমি ইতিমধ্যেই দাঁত ব্রাশ করেছ।

তারপর তুমি তোমার রুমে ফিরে গেলে। বিছানায় শুয়ে পড়লে। আর শোয়ামাত্রই ঘুমিয়ে পড়লে। কারণ তুমি সেদিন খুব সকালে ঘুম থেকে উঠেছিলে। তাই তোমার চোখে ছিল প্রচুর ঘুম। একটানা লম্বা একটা ঘুম শেষে তুমি যখন চোখ মেলে তাকালে, তখন তোমার দেহে দীর্ঘ ঘুমজনিত অবসন্নতা।

ঘুম থেকে উঠে তোমার খুব গান শুনতে ইচ্ছে হল। তুমি তোমার ল্যাপটপটা অন করলে আর গানের সিডিটা হাতে নিলে। তুমি সিডিটার প্রায়শ-রুপালি দিকটায় তাকিয়ে থাকলে। যেন ডিস্কটার মধ্যকার গানগুলো তুমি দেখার চেষ্টা করছ। অতঃপর ডিস্কটা তুমি সিডি রমে ঢুকিয়ে দিলে। সঙ্গীতের মূর্ছনায় পুরো রুম যেন বিষাক্ত হয়ে উঠলো। তুমি গান শুনছো কিংবা শুনছো না। তুমি জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে। সবটাই ঘোলাটে মনে হয় তোমার কাছে।

তুমি বিছানা থেকে উঠে তোমার ব্যাক্তিগত নোটবইটা বের করলে। ব্যক্তিগত নোটবইটার একটা রেখাটানা-তারিখলেখা পাতায় তুমি খুব সযত্নে, গোটা গোটা হরফে লিখলে, ‘মরে গেলাম। এমনিই।’ তারপর তুমি উঠে দাঁড়ালে। হেঁটে হেঁটে দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালে। ঠিক যেমনটা তুমি ডিস্কের দিকে তাকিয়েছিলে ওইভাবে দরজাটার দিকে তাকিয়ে থাকলে। তোমার কাছে মনে হচ্ছিল ওই দরজাটি থেকে গানের সুর ঠিকরে বের হচ্ছে। যেমনটা বের হচ্ছিলো দেয়াল থেকে… টেবিল থেকে… দেয়ালে টাঙানো পোর্ট্রেট থেকে। তারপর তুমি দরজাটি খুলে সরাসরি ছাদে চলে এলে। দ্বিধাহীন পায়ে রেলিঙের উপর গিয়ে দাঁড়ালে এবং লাফ দিলে। মাটিতে পড়ার ঠিক আগ মুহূর্তে তুমি তোমার মাকে দেখলে এবং আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল।

- কিন্তু… আমি তো আসলেই দাঁত ব্রাশ করেছি। তাই নয় কি?

- তাই কি? আমি কীভাবে নিশ্চিত হতে পারি?

- তুমিই তো নিশ্চিত হতে পার। এছাড়া আর কে!

হ্রদের পানির দিকে তাকাও। কি দেখতে পাচ্ছ?

- আমার মুখ। মুখের প্রতিচ্ছবি।

- আর আমি দেখতে পাচ্ছি আমার মুখ, আমার মুখের ছায়া। কোথাও তোমার মুখ দেখি না।

আমি এখন উঠি।

- দাঁড়াও! তুমি স্বপ্নে কি দেখলে?

- হ্যাঁ… আমি কি দেখলাম… আমি একটা বিরাট ঘনজঙ্গলের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। একটি কুকুর হয়ে। আমি দেখলাম সবকিছু অনেক বড় হয়ে গেছে। আর কি গন্ধবহুল সবকিছু! তার মাঝে একটা তীব্র গন্ধ আমার নাকে এসে ধাক্কা দিচ্ছে। এবং আমাকে টানছে ওই ভরাট জঙ্গলের দিকে। আমি একটা বোকা কুকুর, যার ওপর গন্ধের আছর পড়েছে। আমি সেই জঙ্গলে ঢুকে পড়লাম। কি তীব্র অন্ধকার চারিদিক আর ঘোলাটে! আমি সেই গন্ধ অনুসরণ করছি। আমি ছুটছি, একটি কুকুর যেমন করে ছোটে- অপ্রয়োজনীয় গতিশীলতায়। যত এগুচ্ছি গন্ধের তীব্রতা তত বাড়ছে। গন্ধটা যেন আর একটু হলে আমাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেবে। তারপর অবশেষে আমি কোথাও এসে থামি। বুঝতে পারি আমার খুব কাছেই গন্ধের উৎস। আমার মধ্যে এক তীব্র হাহাকার কাজ করে। পথ হারিয়ে ফেলা, দিকশুন্যের হাহাকার। আমি খুব করুণ এবং জোরালো স্বরে একটানা ডাকতে থাকি।

তারপর… মনে হল এক মহাকাল পরে, আমি ক্ষীণ এক আলোর রেখা দেখতে পাই। আমি ডাক আরও তীব্র করে দিই। আলোর উৎস কিছুক্ষণ বাদেই আমার কাছে চলে আসে। ভীষণ এক আনন্দে আমার মন ভরে ওঠে। দেখ! কি ইন্টরেস্টিং! একটা আগাগোড়া দুঃস্বপ্নের মধ্যেও সুন্দর কিছু অভিজ্ঞতা লুকিয়ে থাকতে পারে।

- হুম! কিন্তু গন্ধের উৎসটা কি ছিল?
- একটা মানুষ। উপুড় হয়ে পড়ে আছে। আর চারপাশে রক্ত। এই রক্তের গন্ধই হয়ত আমাকে টানছিল। যা হোক, চলি।

এই বলে তুমি হাঁটতে শুরু করলে। প্রথমে ধীর পায়ে তারপর… আমি হ্রদের দিকে তাকাই। কি সুন্দর টলটলে পানি! ইচ্ছে করে শরীরের… মনের সমস্ত ক্লান্তি সেই পানিতে ধুয়ে ফেলি।

আমার মনে পড়ে শৈশবের কথা। হ্রদের পানিতেই যেন সেই স্মৃতি ভেসে ওঠে। সেই কুকুরটার মত, আমিও… খুব ছোটবেলায় একবার হারিয়ে যাই। সেই কুকুরটার মত, ঘন-গভীর জঙ্গলে। এক দৈত্যাকার গাছের শেকড়ের ওপর বসে আমি কাঁদতে থাকি। সেই কুকুরটার মত চিৎকার করার শক্তি কিংবা মনোবল আমি তখন হারিয়ে ফেলেছি। শুধু কাঁদছি। তখন কেউ যদি আমাকে জিজ্ঞেস করত, “তুমি কেমন আছো?” আমি নিশ্চিতভাবেই বলতে পারতাম, ভালো নেই। কিন্তু এমন বিপদে কেউ কাউকে কারও কুশলাদি জিজ্ঞেস করতে পারে না। এমন বিপদে শুধু কাঁদতে হয়। তাই আমি কাঁদছিলাম।

জানিনা কতক্ষণ কাঁদছিলাম। হয়ত সেই কুকুরটার মত, এক মহাকাল। তারপর আমি দেখতে পাই আমার মাকে একটা আলোকিত টর্চ হাতে সে এগিয়ে আসছে। কি তীব্র সেই মুক্তির আনন্দ! আমার মা আমাকে জড়িয়ে ধরে। আনন্দ আর ক্লান্তিতে আমার চোখ বুজে আসে। ঠিক ওই সময়ের মত এখনও আমার চোখ বুজে আসে। ক্লান্তিতে। আহ! চারদিক কি মোলায়েম আঁধারে ডুবে আসছে। কি অমোঘ টান সেই আঁধারের! আমি ডুবছি সেই আঁধারে।



ভোঁতা এবং তীব্র একটা আওয়াজে শহরতলির নিরবতা ক্ষণিকের জন্য ক্ষুণ্ণ হল। তারপর আবার সব ঠিকঠাক। এই সমস্ত হতাশা এই শহরতলীর নিত্যদিনের দৃশ্য।



লেখক পরিচিতি
সিফাত আহমেদ
জন্ম : ১৯৯২
বরিশাল।
বর্তমানে থাকেন ঢাকায়।
ছাত্র।

কবি ও গল্পকার।
Email Address: rebelinmood@gmail.com



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন