সোমবার, ১০ নভেম্বর, ২০১৪

দীপংকর গৌতমের গল্প : একলব্যের পুনরুত্থান

দ্রোণাচার্য ভীষণ উদ্বিগ্ন। একদিন দ্রোণাচার্য তার শ্রেষ্ঠ ছাত্র অর্জুনসহ বাকিদের নিয়ে একলব্যের জঙ্গলে হরিণ শিকার করতে গেল। তার পোশা কুকুরটি হরিণের পিছু পিছু ছুটে যেতে যেতে একসময় হারিয়ে যায়। কুকুরের কান্নার শব্দ শুনে দ্রোণাচার্য তার শিষ্যরা একটি কুটিরের নিকট উপস্থিত হয়ে দেখেন, সাতটি তীরের মাধ্যমে কুকুরটিকে পাশের অশ্বত্থ গাছের সাথে এমনভাবে গেঁথে ফেলা হয়েছে যে, তার গায়ে বিন্দুমাত্র আঁচড় লাগেনি। কিন্তু সেটি কোনো ভাবেই নড়াচড়া করতে পারছে না। নিজের অজান্তেই উচ্ছ্বসিত হয়ে যান দ্রোণাচার্য। তিনি জিজ্ঞেস করেন--কে এই তীরন্দাজ? কোথায় সে? একথা বলে তিনি যখন এদিক-ওদিক তাকাচ্ছেন, তখন এক কৃষ্ণবর্ণ তরুণ কুটির থেকে বেরিয়ে এসে তার পায়ের কাছে বসে পড়লো।


কিশোরের নাম--একলব্য। মগধের অধিবাসী নিষাদরাজ হিরণ্যধনুর পুত্র। এই নিষাদরা অনার্য জাতি। সবকিছু বুঝেও নিজেকে স্থির করতে পারছিলেন না দ্রোণাচার্য। কারণ তিনি ক্ষত্রিয়দের ছাড়া কাউকে যুদ্ধবিদ্যা দেন না। তাহলে এই কিশোর কীভাবে এতো বড় যোদ্ধায় পরিণত হলো। এতো তার জন্য অশনি সংকেত। শংকিত দ্রোণাচার্য অপ্রতিরোধ্য একলব্যকে জিজ্ঞেস করলো--হে বৎস, তুমি এই ধনুর্বিদ্যা শিখেছো কোত্থেকে? একলব্য উত্তর দিল--প্রভু আপনার কাছ থেকেই। দ্রোণাচার্য সন্তস্ত্র হলো। তিনি উত্তর দিলেন--না। আমি কোনো ছোটজাতকে অস্ত্র শিক্ষা দেই না। বল তুমি, কে তোমার গুরু? একলব্য উত্তর দিল--প্রভু আপনি অস্ত্র বিদ্যা দিতে অস্বীকার করলে আমি আপনার মূর্তি বানিয়ে তাতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করে এই জঙ্গলেই ধনুর্বিদ্যা শিখেছি। আপনি আমার গুরু। এসময় অর্জুন দ্রোণাচার্যকে মনে করিয়ে দিল গুরুর প্রতিজ্ঞার কথা।--গুরুদেব আপনি বলেছিলেন আমিই হবো আপনার সেরা ছাত্র। তাহলে এই শূদ্রের পুত্র কীভাবে আপনাকে এতো মুগ্ধ করে। একলব্য তখনও বলছে--গুরুদেব, আমি আপনার কাছেই ধনুর্বিদ্যা শিখেছি। অর্জুনের বুদ্ধিতে দ্রোণাচার্য তখন কপট হয়ে ওঠেন এবং বলেন--যদি সত্যি আমি তোমার গুরু হয়ে থাকি, তাহলে আমার গুরু-দক্ষিণা দাও। বীর একলব্য উত্তর দিলো--বলুন কী গুরু-দক্ষিণা চান? যুদ্ধাবাজ সেনাপতি দ্রোণাচার্যের মাথায় কপট বুদ্ধি ভর করলো। তিনি ভাবলেন, একলব্যকে অচল করে দিতে পারলে অনেক আয়েস করে যুদ্ধ করা যাবে। তাই তিনি একলব্যের দিকে তাকিয়ে বললেন--সত্যি যদি আমি তোমার গুরু হই, আর এই গুরুবিদ্যাকে যদি তুমি স্বীকার করে থাকো, তাহলে আমি তোমার বৃদ্ধাঙ্গুল চাই। বীর একলব্য তার বৃদ্ধাঙ্গুল কেটে দিল। একলব্যের এই আঙ্গুল কাটার মধ্যদিয়ে দ্রোণাচার্য অর্জুনের কথায় একজন বীরকে হত্যা করলেন।

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে একে একে নিহত হন ভীষ্ম, দ্রোণাচার্য, কর্ণ, অভিমন্যু, ঘটোৎকচ, একলব্য। তাতেও শান্তি আসলো না। গান্ধারী যখন কুরুক্ষেত্রের ময়দানে গেলেন তখন দেখলেন, সম্পূর্ণ ময়দান অন্ধকার। দেখলেন অজস্র মানুষের মু- পড়ে আছে আর সাদা শাড়ী পড়া বিধবাদের দীর্ঘ লাইন। তিনি কাঁদতে কাঁদতে বললেন--হা, ধর্মযুদ্ধ এই তোমার রূপ!


(২)

আমাদের গ্রামের ফকির চাঁদ লোকজন পেলেই গল্প বলে। এই সময় ইতিহাসের ছাত্র ছিলেন। তারপরে পড়েছেন দর্শন। অজস্র বিষয়ে তার অগাধ পাণ্ডিত্ব। তিনি বলেন--এই মাটিতে সাঁওতাল বিদ্রোহ দিয়ে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হয়। তারপর একে একে আসে ফকির সন্যাসী বিদ্রোহ, টংক বিদ্রোহ, নানকার বিদ্রোহ, ভাওয়াল বিদ্রোহ, তে-ভাগার সংগ্রাম। মানুষ আসলে চাইছিল স্বাধীন একটা দেশ। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬২’র শিক্ষা আন্দোলন, ৬৯’র গণ অভ্যুত্থান; সব শেষে ‘৭১-র মুক্তিযুদ্ধ। সেকি যুদ্ধ! তয় একটা কথা মুক্তিযুদ্ধ কারো একক দান না। যারা ৭ই মার্চের বক্তৃতা শুনেন নাই, তারাও মুক্তিযুদ্ধে গেছে। সে সময় কয়জনের ঘরে রেডিও ছিল যে, বক্তৃতা শুইনা যুদ্ধে যাবে? আসল যুদ্ধ শুরু হয় ২৫ শে মার্চের পরে। কৃষক-মজদুর, ভুখা-নাঙ্গা মানুষ তারা বাজারে যাইতে পারতে ছিল না রাজাকারদের অত্যাচারে। রাজাকাররা মাইয়া চায়, খাশি-মোড়ক চায়। কে দেবে এই সব? পরে দেয়ালে পিঠ ঠেইকা যাওয়ার জন্যে সবাই মুক্তিযুদ্ধে গেছিল। কিন্তু এতবড় একটা গণবিপ্লব এইডা শেষ হইয়া গেল একটা প্রতিবিপ্লবের ফলে। ‘৭৫-র ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধু পরিবার-পরিজন আত্মীয়-স্বজনসহ হত্যা হইলো সে আরেক কুরুক্ষেত্রে। সবাই সবাইরে মারে। সব শেষে দেখা গেল, কুরুক্ষেত্রের মতো এখানেও সব অন্ধকার। অজস্র বিধবাদের মিছিল। স্বপ্ন পুরন হলো না। একের পর এক প্রতিবিপ্লব আর হত্যা। ক্যান্টনমেন্টগুলোতে বারবার মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের হত্যা করা হয়েছে। তারপরও শান্তি আসেনি। একজনে আরেক জনকে হত্যা করে নেতা হওয়ার জন্য মুক্তিযুদ্ধের সব অর্জনকে ধ্বংস করে দিয়েছে। সেদিন কর্ণেল তাহের, খালেদ মোশাররফ, সাফায়াত জামিল, জিয়াউর রহমান--এছাড়াও কত একলব্যরা প্রাণ হারাইছে আইজ আর তার নাম খুঁজে বের করা যাবে না। এরমধ্যে আরেক সেনাপতি পতিত স্বৈরাচার। শুনেছি সব খুনের সঙ্গেই তার যোগসূত্র ছিল। কিন্ত থাকলেন ধরা ছোঁয়ার বাইরে।

একদিন হঠাৎ করে টেলিভিশন খুলে দেখি হাত উঁচিয়ে সেই সেনাপতি হাজির। এসেই বললেন--প্রিয় দেশবাসী ভাই, দেশের অবস্থা খারাপ। দেশের মানুষ অপকর্মে লিপ্ত হচ্ছে। এইটা ঠিক হলেই আমি আবার চলে যাব। তয় আপনারা নিরাপদে থাকার জন্য বুড়া আঙ্গুলগুলো কাইট্যা ফ্যালান। তাইলে অপরাধ করার ক্ষমতা থাকবে না।

চারদিকে বাহিনী ছড়াই পড়লো। মানুষদের ডাইকা ডাইকা কইলো, বুড়া আঙ্গুল কাইট্টা ফ্যালান। কেউ কাটলো, কেউ হতবাক হয়ে থাকলো। কিন্তু ছাত্ররা এসব মানলো না। তারা সবাই গ্রামে-গঞ্জে, সবখানে ছড়াইয়া পড়লো। আর বললো--এই সামরিক শাসন মানি না। আপনারা আর বৃদ্ধাঙ্গুল কাটবেন না। সবাই রাস্তায় নাইমা আসেন। হাতগুলো মুষ্টি করে মেঘের দিকে তাক করেন।

এই ডাক শুনে কারখানা থেকে ছুটে এলো লোহার শ্রমিক, মাঠ থেকে ক্ষেতের মজুর। সব শ্রেণী-পেশার মানুষ ছুটে এলো একখানে। তারপর সেই একলব্যদের ডাকে দূর হলো মানুষে মানুষে ভেদাভেদ। আর সামরিক বাহিনীর উর্দি খসে পড়লো।



লেখক পরিচিতি
দীপংকর গৌতম

কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক। জন্ম: কোটালীপাড়া, গোপালগঞ্জ। ঢাকা থেকে প্রকাশিত একটি দৈনিকে কর্মরত। বাংলাদেশের বামপন্থী রাজনীতির সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের সঙ্গে ঘনিষ্টভাবে যুক্ত। লিখেন দেশ-বিদেশের কাগজে। কবিতা, প্রবন্ধ, অনুবাদ, গবেষণাসহ প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ১২টি। তার মধ্যে কাব্যগ্রন্থ মেঘ-বিচ্ছেদ(২০০৩) এবং মেঘ বলি কাকে (২০০৪) নব্বইয়ের কবিতায় বিশেষ নিরীক্ষার দাবি রাখে। সাংবাদিকতা ও সাহিত্যের জন্য পেয়েছেন একাধিক পুরস্কার। ই-মেইল : dipongker@yahoo.com

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন