শনিবার, ১০ জানুয়ারী, ২০১৫

এমদাদ রহমান-এর গল্প : নিভৃতবাস

আগুনে ঘুমাই, আগুনে খাইরে
আমি এবং আমার আগুন
আমরা দু'জন যমজ বোন, যমজ ভাই
: কফিল আহমেদ



সন্ধিক্ষণের ঈগল


ফেরিওয়ালাটা ক্লান্ত। সারাদিন কমলালেবু ফেরি করে এখন বিড়ি টানছে। অবশিষ্ট কয়েক থোকা আঙুর নিয়ে এখনও বসে আছে আঙুরওলাটা। হয়তো এখনই কোন বাবা মেয়ের জন্য একশ' গ্রাম আঙুর কিনতে আসবে। দামদর করবে, দু'টো টাকা কম দিতে চাইবে। লোকটার গা থেকে আসবে ঘামের ভুসভুসে গন্ধ। আবহাওয়া বেশ গুমোট।
আকাশ অন্ধকার এবং বেশ ভারী ঠেকছে। সিগ্রেটের ধোঁয়া উড়িয়ে দুটি যুবক আসছে। তাদের মুখ এই রাতের বেলাতেও কেমন শুষ্ক আর করুণ দেখায়। হয়তো টাকাপয়সার টানাটানি যাচ্ছে। মোড়ের কোণে ইলেকট্রিকের থাম। থামের গোড়ায় আঙুরওলার পাশে পানবিড়ির টঙ। বিড়িসিগ্রেটের ব্যবসা বেশ জমজমাট আজকাল। রাজ্যের ঝুটঝামেলা মাথায় নিয়ে লোকজন আর যা-ই করুক না কেন, বিড়িসিগ্রেট টানবেই। যুবকদের একজন ম্যানিব্যাগ খুলে তিনটা পেতলের কয়েন বের কওে, একজন ফের সিগ্রেট ধরায়; হয়তো-বা একটু নস্টালজিয়ায় ভোগে। মা কিংবা বোন কিংবা মৃত বাবার কথা মনে পড়ে যায়।

একটা পাথরখেকো মেশিন ঠেলে তিনচারজন নির্মাণশ্রমিক এদিক দিয়েই আসছে। সারাদিন কতোকিছু যে খায় রাক্ষসটা! স্টার্ট নিয়েই হুড়মুড় করে ঘুরতে শুরু করে আর ঘেষঘেষ, ধিকধিক, ফেসফেস, হড়াম, কড়মড় করে চিবুতে থাকে ইট কিংবা পাথরের কনক্রিট এবং বালি, পানি ও সিমেন্টের সাখে ভজঘট পাকিয়ে উগড়ে দেয় কড়াইয়ের ওপর আর এখন-যে শ্রমিকরা যন্ত্রটাকে ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে আসছে, ঘড়ামঘড়াম শব্দ ওঠছেই। ইলেকট্রিক-থামের কাছে এসে তারা একটু দম নেয়। একজন গাল চুলকাতে চুলকাতে বললো : আর কত্‌খন লাগবিনিরে?

তিনটা রিকশা খ্যাপের আশায় ঝিমুচ্ছে। সারাদিন কী ধকলটাই না গেছে! রিকশাওলাদের কপালে করোগেটেড আয়রনের ঢেউ, কিন্তু কপালে থাকলে কী হবে, বর্ষাকালে ঘরের চাল ফুটো করে দিয়ে রাক্ষুসে বৃষ্টি ঝমাঝম ঝরতেই থাকে, যেন ঘর নয়- খাটাল...এভাবে, ধীরে ধীরে রাতের রাস্তা ফাঁকা হচ্ছে এখন। এরপর রাত যত এগোবে, রাস্তা চলে যাবে টহল পুলিশের দখলে- না, এই খণ্ড খণ্ড দৃশ্যগুলো আমি কখনোই দেখিনি। কোনদিন দেখিনি কীভাবে একটু একটু করে শহরের রাস্তার ওপর কালো রাতগুলো নেমে আসে, বাতিগুলো নিভে যায়। নেড়িকুকুরটা কুঁইকুঁই করে মরবার জন্য কাকুতি জানায় আর আবর্জনার ভেতর পরিত্যক্ত ডটেড কনডমে নাক ডুবিয়ে বেড়ালটা হঠাৎ অন্ধ হয়ে যায়! মাঝে মাঝে নস্টালজিয়ায় ভুগলে নাকি মনে এরকম খণ্ড খণ্ড নকশা তৈরি হয়। যদি কোনদিন শরীরটা প্যারালাইজ হয়ে যায়, তখনও কি এইসব খণ্ড খণ্ড দৃশ্য স্নায়ুর ভেতর ক্রিয়াশীল থাকবে? একেকটা জায়গায় আমরা তো এভাবেই বেঁচে থাকি, ভিড়ের ভেতর আবছা আবছা মানুষের মতোই-তো কারো না কারো জীবন!


আধঘন্টা ধরে জ্যামে আটকে আছি।

শহরে মহারানী এসেছেন। তিনি না-যাওয়া পর্যন্ত রোড ব্লক থাকবে। দীর্ঘদিন ধরে বিছানায় লেপ্টে থাকা প্যারালাইজড মায়ের মুখটা মনে পড়ছে। মনে পড়ছে বাবার কথাও। মানুষটা বেশ অদ্ভূত। ভাবতে অবাক লাগে-একটা মানুষ সারা জীবন ঘুমের ঘোরে শুধু একটা পাথরকে ঠেলছে। কিন্তু পাথরটাকে এতোটুকু নড়াতে পারছে না। বাবার স্বপ্নে শুধু পাথর আর কচ্ছপ। শতবর্ষী কচ্ছপগুলো রোদের ভেতর ঝিমুচ্ছে। বাবার স্বপ্নের বর্ণনায় তাই কচ্ছপের প্রসঙ্গ অমোঘ- কখনো কচ্ছপ দেখেছিস? জানিস কচ্ছপ আড়াই'শো বছর বাঁচে। আমি তাকে বলি যে, প্রায়ই স্বপ্নে দেখি একটা ক্লান্ত কচ্ছপ গড়িয়ে গড়িয়ে এগিয়ে আসছে, আমি তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছি!

কচ্ছপ দেখবি? আমি মাথা নেড়ে সায় দিই।

তখন একটা কচ্ছপ মাথা উঁচিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে আর মাথার ভেতর তৈরি হয় আড়াই'শো বছরের গোলকধাঁধা। বাবা বলেন-ছুঁয়ে দেখ। শতবর্ষের আয়ূ নিয়ে কীভাবে বেঁচে আছে প্রাণীটা!

আমার মুঠোয় কচ্ছপের মাথাটা বন্দি হয়ে যায়। তখন, পাশের রুমে গোঙানোর শব্দ। মা কথা বলতে পারেনা, কেবল গোঙায়। পাশের রুম থেকে মেয়ে ডাকে মা। মা শব্দটি ছাড়া মেয়েটা আর কোনো শব্দ উচ্চারণ করতে পারে না। বুকে তীব্র কষ্ট বলকে ওঠে। আসছি মা-বলে মুঠো আলগা করি। আড়াই'শো বছর আয়ূর জীবটা কী শান্ত! আমরা মানুষরা আর কতো বছরইবা বাঁচি!

মা-ও আর গোঙানোর সময় পায়না। সব সময় তো শান্ত হয়েই আছে। কিন্তু যখনই বাবার ঘরের আলোটা জ্বালি, চোখে কচ্ছপের স্বপ্ন নিয়ে তার খাটের পাশে নিঃশব্দে দাঁড়াই, কেবল তখনই তার ফোঁসফোঁস গোঙানো শুরু হয়।

মায়ের কাছে যাই। বাতি জ্বাললে দেখি, শরীরটা ঘাম জবজব, মুখ দিয়ে ফেনা বেরুচ্ছে। আমাকে দেখে তার মুখটায় কীসের ভাব ফুটে উঠে ধরতে পারি না। ফ্যানের স্পিড বাড়িয়ে তার পায়ের কাছটায় বসে পড়ি।

মানুষের হাসি এতো তিতকুটে হয়, তা এখন আমার মায়ের মুখ না দেখলে বোঝা যাবে না। অথচ একদিন কতো প্রশান্ত আর সরলই না ছিলো এই হাসি। এসব এখন রোমন্থনের মতো। হাতড়ে খুঁজে বের করতে হয়।

: তোমার খুব কষ্ট হচ্ছে মা?

মায়ের মুখটা তোবড়ানো, বাঁকা এবং বিকৃত। ঠিক মায়ের মুখ যেমন হওয়া উচিত, তেমনটি নয়। একটাও কথা বলতে পারে না। আমি প্রাণপণে কামনা করি-মা কথা বলুক। কিন্তু সে মুখর হতে পারেনা। তার বলার অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে। আমি গামছা দিয়ে মুখের ফেনা মুছে দিই।

: চলে যাব?

মা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। মুখ দিয়ে ফেনা বেরুচ্ছে। : তুই এখান থেকে যা কিরণ, চলে যা। নিজের প্রশ্নের উত্তর নিজেই দিই।

: কোথায়?

যেখানে, আড়াইশো বছর আয়ূর কচ্ছপটা...বুক কাঁপে। ধক্‌ ধক্‌ শব্দ হয়। গলা শুকিয়ে কাঠ। তার ডান হাত, ডান পা প্যারালিসিসে অচল। গলায় স্বরও নেই। কিম্ভূত কিছু শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা যায় না।

কিন্তু বাঁ হাতটা সচল, সে হাতে ইশারা-কাছে আয়।

বুকের ভেতর তখন দ্রিম দ্রিম শব্দ আর প্রবল কাঁপুনি জাগে। মা কী করতে পারে এখন? আমার শেকড়-বাঁকড় ধরে টান দেবে? সাপের গর্তে আঙুল ঢুকিয়ে দেবে? হু হু করে কেঁদে উঠবে?

না। মা এসব কিছুই করে না।

আমার হাত চেপে ধরে অসহায় দুটো চোখ দিয়ে তার মেয়েকে দেখতে চেষ্টা করে। হয়তো কিছু, হয়তো অনেক কিছু বলতে চায় কিংবা বলছে, কিন্তু এসব বোঝার ক্ষমতা যে আমার নেই! হয়তো বলতে চায়-যা, শুতে যা। এতো রাত জাগিস কেন? চোখের নিচে কালি পড়েছে টের পাস না?

নিজের রুমে গেলে দেখি মেয়েটা আকাশের তারার মতো শান্ত হয়ে আছে।

বাতি নিভিয়ে দিতেই আচ্ছন্ন নীরবতার ভেতর কারো চাপা কান্না শোনা যায়। আমার না মায়ের, বুঝতে পারিনা!





দেয়ালে দেয়ালে গাঁথা আমার পূর্বপুরুষের চোখ



বেঁচে থাকাটা কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে বাবা। ভীষণ কষ্ট হয়। রোজ স্বপ্নে আমাকে কচ্ছপ দেখতে হয়। ইচ্ছে হয় একটা আঙুল কেটে বালতিতে ডুবিয়ে রাখি। সব রক্ত বের হয়ে যাক। মরে পড়ে থাকি। কেন শুধু কচ্ছপ দেখবো? আমার শঙ্খচিল দেখার লোভ নেই? পৃথিবীর সব মানুষের শঙ্খচিল দেখার লোভ আছে। অথচ আমার স্বপ্নে শুধু কচ্ছপ। টের পাই পেটের ভেতর কিলবিল করছে...

বাবা বলে-তোকে কোনো একটা ক্লিনিকে নিয়ে যাবো? আমি মেঘহীন, রোদহীন, আশা ও কান্নাহীন চোখে তার দিকে তাকিয়ে থাকি। বাবা আমাকে কঠোর হাতে জড়িয়ে ধরে। কর্কষ চুমু খায় ঠোঁটে। তার ঠোঁট নুনতা। এতোক্ষণ কেঁদেছে নাকি?


আমার নিজস্ব ভুবন একটা গোপন দরোজায় তালাবদ্ধ।

দরোজাটা কখনোই খুলিনা। দরোজাটার ভেতর তাকে তাকে সাজিয়ে রেখেছি আমার শুকসারি, বেহুলা, মনসা, ঈগলের ডানা, খনন, গোরস্থান, প্লেগ, লখিন্দরের মূর্ত্লি-তাই ও দরোজা আমি খুলতে পারিনা। ভয় লাগে, যদি আমার এই জতুগৃহ, যদি এই অনাস্বাদিত নিঃসঙ্গতা, এই বিবর-হারিয়ে ফেলি! যদি সব কিছু ভেঙে যায়? না, এই দরোজা আমি খুলবো না। এটা খুলে দিলে আমি আমার পূর্বপুরুষের চোখগুলো, চোখের শাদাকালো আলোটুকু; যা এখনও খানিকটা ধরে রেখেছি, বাতাসের এক ঝাপটায় হারিয়ে ফেলবো। সব কিছু মুছে যাবে। আমি আর উড়াল দিতে পারবো না। আমার ডানাওলা ফুলগুলো ডানা ভেঙে পড়ে যাবে। তাদের সমস্ত সৌরভ, যে সৌরভে আমার পূর্বপুরুষরা আমার সাথে দুঃখসুখের কথা বলে, আমি আর সেইসব কথা শুনতে পাবো না।


দরোজার ভেতরে রাখা আছে মৃতমানুষের গান।

তারা মরতে চেয়েছিল কি? কে তাদের বেঁচে থাকার অধিকার কেড়ে নিলো? তারা তাই গান গায়। আমি হতবাক, এইসব মৃত মুখগুলোকে দেখে। মুখগুলো কী প্রশান্তভাবে প্রাণহীন। তাই ও দরোজা আমি আর খুলি না। এর ভেতরে আছে পৃথিবীর দুঃখভারাতুর গেইষাদের স্মৃতিকথা আর আছে তাকে তাকে সাজানো আমার মেমোরিগুলো, যেগুলো থেকে এখনও পৃথিবীর বিলুপ্ত ফুলের আশ্চর্য গন্ধ বেরোয়, ফিসফিসিয়ে কথা বলে

-হরিণীরা আসছে।


আমি আমার শরীরের ভাঙারী।

ভেঙে ভেঙে ডাঁই করে রেখেছি শরীরের যতোসব হাড়গোড়। সাজিয়ে রেখেছি থরে থরে। তীব্র ইচ্ছা এই হাড়গোড় থেকে একদিন, সুদূরের কোনো একদিন জন্ম নেবে আশ্চর্য এক মানুষ। তাই শরীরের ভাঙা টুকরোগুলো দিয়ে মানুষের মূর্তি গড়ার চেষ্টা করি। খুলির গর্ত দিয়ে নিংড়ে নেবার আপ্রাণ চেষ্টা করি অবশিষ্ট আলো। আর গড়ি পুতুল। তাই আমার গোপন দরোজা আমি খুলবোনা। ভয়, যদি আমার মেয়ে জেগে ওঠে, কথা বলা শিখে যায়? যদি মায়ের গলা ফের সুরেলা হয়ে ওঠে? যদি আমার পাথরগ্রস্থ বাবা তার স্বপ্ন হারিয়ে ফেলে? তারচে ওই উড়ন্ত ফুল, সবুজ প্রজাপতি, কচ্ছপ আর শঙ্খচিল-এসব থাকুক। থাকুক এই উপনিবেশ, আমার আদিবাসীতার ইন্টারপ্রিটেশন।


একদিন আমার ভাইটির ঘুম আর ভাঙে না।

কত কান্না, কতো দীর্ঘশ্বাস বাতাসকে ভারী করলো, তবু তার ঘুম আর ভাঙে না। তার চোখ দুটো দেয়ালের টিকটিকির দিকে তাকিয়েই রইলো। পরে ওই অবস্থাতেই, পরিজন এবং পাড়ার লোকেরা তার সৎকারে লেগে যায়। মা তখন বাড়িতে ছিলনা, তার এক বোনের অসুখের খবর পেয়ে তার বাড়িতে গিয়েছিল। তাকে আনতে বাবা লোক পাঠিয়েছিলেন। মুর্ছা গিয়েছিল বলে যাত্রাকালীন সময়ে মায়ের কান্না ভাইটার শোনা হয়নি। এ ঘটনার কিছুদিন পর মা অসাড় হয়ে গেল। শরীরের একদিক হিম হয়ে গেল, অন্য দিকের কলকব্জার সাথে আর যোগাযোগ রইলনা। তখন যারা যারা কাঁদছিল, চোখকে ওই অবস্থায় রেখে ভাইটি সে কান্না শুনছিল। লোকেরা তাকে গোসল করিয়ে খাটিয়ায় শোয়ানোর পর কাফনে মোড়ায়। আমরা বারান্দায় দাঁড়িয়ে থেকে দেখতে পেলাম, একটা মানুষের মুখ চিরকালের জন্য ঢাকা পড়ে গেলো।


এগুলো কি রক্তের ভেতর ওৎ পেতে থাকা কোনো প্রাচীনতা? বুঝতে পারিনা।

বাবা শুধু বলে-নে, একটু চেখে দেখ, বলেই বোতল থেকে তীব্র গন্ধওলা তরল গ্লাসে ঢেলে আমার দিকে বাড়িয়ে দেয়। আমি গলায় ঢালি। বলি-আরেকটু দাও। আমি পান করি। কী যে হয়। শরীরটা যেন প্যারালাইজড। তার পাঁজরে শরীর এলিয়ে দিই। তার পাঁজরের শব্দ কানে আসে। তার চোখের জল আমার ঠোঁটে নেমে আসে। কতো আশ্রয় যে দিতে পারে একটা মানুষ! কতো যে কাঁদে! একান্ত নিভৃতে না গেলে তার কিছুই টের পাওয়া যায় না।


যদি দেখতে পেতাম!

মাঝে মাঝে ভাবি, আমরা আমাদের মনগুলোকে দেখতে পাইনা কেন? বাবা বলে-সারা জীবন ধরে পাথরটাকে ঠেলছি, এতোটুকু নড়াতে পারিনি। জানিস, খুব কাঁদতে ইচ্ছা হয়, কিন্তু কাঁদার জন্য মনটা যত থকথকে হতে হয়, ঠিক ততটা হয়না। বাবা একদিন কোত্থেকে যেন একটা কান্নার রেকর্ড নিয়ে আসলো। কান্নার নাম: ফ্লাই মাই স্যাডনেস! বাতি নিভিয়ে আমি আর বাবা শুনতে থাকি সেই কান্না। এই কান্নায় যোগ দেয় মৃত শিশুদের আত্মা, সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত মা, আত্মহত্যা করা যুবক, অগ্নিদগ্ধ মেয়ে, কুষ্ঠরোগী, শ্বাসকষ্টে ভোগা বৃদ্ধবৃদ্ধার দল, বজ্রপাতে মৃত মানুষ, শ্মশানবন্ধু আর মৃত্যুসখিগণ। সকলের কান্নার কোরাসে পৃথিবী কানায় কানায় ভরে গিয়েছিলো, তারপর...

প্রচণ্ড নিঃসঙ্গতায় কিছুটা সময় পার হয়ে যায়। তারপর...

নীরব নৈঃসঙ্গের পটভূমিকায় নির্মিত হয় এক অভিগমন। আমরাই কুশিলব। লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ি মেঝেয় আর আমাদের চোখ-জলসিক্ত। বুনো হিংস্রতায় আমি ও আমার আঁঠালো ঠোঁট, স্তনবৃন্ত, আদিম ঊরু আর শিকড়-বাঁকড়ের মূল-হায়রে, কতো কাল ধরে তারা তৃষ্ণার্ত ছিলো! আমি যেন তার স্বপ্নে পাওয়া পাথর। স্বপ্নে সারা জীবন ধরে ধাক্কাচ্ছে, যেন পাথরে পাথর ঘষে আগুন জ্বালছে। জ্বালুক। দাবানলে পৃথিবী ভরে যাক। ফ্লাই মাই স্যাডনেস...ফ্লাই উইথ মাই স্যাডনেস! যৌনতার তীব্র আস্বাদ আমাদের ভেতর কান্নার কোরাসের মতোন প্রবহমান।

তাই গোপন দরোজা আমি আর খুলিনা। যদি ভেঙে পড়ে, যদি সব কিছু ভেঙে পড়ে?

কখনো স্বপ্নে কচ্ছপ দেখে ঘুম ভেঙে গেলে টের পাই, চোখ বেয়ে নামছে লবনাক্ত নদী। পৃথিবীর দীর্ঘতম সলটেড রিভার! মেয়েটা কীভাবে যেন বুঝে ফেলে। মায়া, আমার এই একরত্তি বোবা মেয়েটাও তখন কাঁদে। আমার চোখ থেকে কচ্ছপটা মুছে যায়। মা-ও কাঁদে। কাঁদলে তার একটা চোখ থেকে জল গড়ায়। এক চোখে কোন মানুষ কাঁদতে পারে, এ আমার ধারণাতেও ছিলনা।

আর যখন আমার হাড়গোড়ে সৃষ্টি হয় লেলিহান দাবানল, পুড়ে যেতে থাকে সব কিছু, তখন মায়া তার একমাত্র সম্বল 'মা' শব্দটি দিয়ে আমাকে ডাকে।

তখন মায়ের ঘরে গ্লাস ভাঙার শব্দ।

প্যারালাইজড মাকে তখন ডাইনী ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারি না। বাক্‌শক্তিহীন ডাইনীটা আমায় নিভিয়ে দেয়, যেভাবে ফায়ার সার্ভিসের লোকেরা আগুন নিভিয়ে ফেলে।

ওকে মেরে ফেল কিরণ-বাবার আচ্ছন্ন গলাটা যেন কাতরাচ্ছে-মুখে বালিশ চেপে ধরে থাকবি। কিছুক্ষণ দাপাদাপি করবে, তারপর...ডেথ ইজ আ সাইলেন্ট মেটাফোর!

জেদ চেপে যায়। ঠিক করে ফেলি, ডাইনীটাকে আজই হত্যা করবো। ওকে আর বাঁচিয়ে রাখা যায় না। ওর খাবারের সাথে মিশিয়ে দেবো বিষ। হ্যাঁ, ওকে আর বাঁচিয়ে রেখে লাভ নেই। একদিন তো মরবেই!

ডাইনীটা হাসছে। তার মুখে রক্তাক্ত হাসি। হাসছে দেয়ালে দেয়ালে গাঁথা আমার পূর্বপুরুষের চোখগুলোও। অন্তরাত্মা কেঁপে উঠে। না, না...না, ও'কে আমি হত্যা করতে পারবোনা, কোনাদিন পারবোনা।


বৃষ্টি থেমে গেলে আর ফিরতে ইচ্ছে করে না।

ফেরা মানে অতীত। অতীত মানে যার কাছে ফিরতে ইচ্ছে করে না। যখন পা বাড়াই, দেখি দুনিয়াটা বড়ো বেশি অচেনা। বাড়ির সামনের রাস্তাটা নেই। নেই পাঁচতলা বাড়িটা। সামনে ধু ধু তেপান্তর, সেখানে হ্রেষা ধ্বণি, খুরের আওয়াজ আর কিছু মানুষ, এমন কিছু মানুষ; যারা এ জীবনে কোথাও থিতু হতে পারেনি। অথচ শেকড় ছিল, গোড়ায় একটু জলকাদা পড়লেই শক্ত ভিত্তি পেতে পারত। কিন্তু তা না করে তারা এখন নাচছে। নাচছে নারী, শিশু, এমনকি পুরুষরাও। তাদের ঘিরে আছে মরচে ধরা ফিকে লাল আলো। তাদের মুখগুলো যেন পুরনো পৃথিবীর বাদ্যযন্ত্র। বাদ্যযন্ত্রগুলোয় মন্দ্রিত হচ্ছে সুর। এই সুর যেন বলছে : ফিরে আসছে-বিলুপ্ত জনপদ এবং মৃত মানুষেরা। জন্মে জন্মে এই ভূমিতে পুনরায় ফিরে আসবো সবাই।

ঘাতকেরাও পুনর্বার আসবে, কিন্তু তারা এ গান কি কখনোই শুনবে না!

দ্রুত পা চালাই। ঘরে যেতে হবে, যেখানে আমার সমস্ত অতীত! পৃথিবীটা বড়ো ক্রুর। পাশা খেলা চলছে। ধর্মপুত্র একে একে হারাচ্ছেন সবকিছু। এমনকি নিজেকেও খুইয়ে বসেছেন। শকুনিরই জয় হে। এবার? বাকী আছেন দ্রৌপদী! দ্রুত পা বাড়াই। একটু দাঁড়াও দুঃশাসন! মেয়েটা ঘরে একা। বুকটা কেঁপে ওঠে। কাকে দুঃশাসন বলছি? বাবাকে?!

হঠাৎ ভয়াবহ আতঙ্কে ডুবে যাই। কনভয় থেকে নেমে আসে শাদা পোশাকের মিলিটারী। এক যুবককে ধরে লাত্থি মারতে থাকে। ছেলেটা তোতলায়। কিছুই বলতে পারেনা। চোয়ালের আঘাতে তার বাঁধানো দাঁতগুলো ভেঙে যায় আর রক্তের সাথে তার ভাঙা দাঁতগুলো রাস্তায় পড়ে থাকে, যেন মানুষের দাঁত আর রক্ত আবর্জনা ছাড়া আর কিছুই নয়!

ঘরে ফিরে আসি। একটা তীব্র নেশা আমাকে টানছিল। মায়ের তোবড়ানো মুখটাও টানছিল প্রবলভাবে। ভাবা যায়, অর্ধেক দেহের একটা মানুষ আমার মা! আর মেয়েটা যে কেন এমন হলো! মা ছাড়া আর কোনো শব্দ সে বলতে পারে না। অথর্ব একটা মেয়ে। পোলিওমাইলাইটিস। বাতিগুলো নেভানো ছিল। বাতি জ্বেলে মায়ের ঘরে ঢুকি, মা টিকটিকিদের পোকা খাওয়া দেখছে, তার চোখ ছাতের কোণায় স্থির, যেন মৃতমানুষ!


বাবা এতো নীচু লয়ে ভায়োলিন বাজায়!

ভায়োলিনের সুর আমার শিকড়বাঁকড়ের দুঃখভরা অধ্যায়গুলোর ওপর পরশমণি বুলিয়ে দিতে থাকে। ভায়োলিনের সুর আর সেই উড়ন্ত ফুল রাতভর বৃষ্টি ঝরায়। এমন আচ্ছন্ন করে রাখে যেন তারা আমার পরনের শাড়ি। বাবা তার বোতল যখন খোলেন, তীব্র ফুলের গন্ধে সারা বাড়ি ছেয়ে যায়। একটা কালো সাপ জানলা গলে মেঝেয় লাফিয়ে পড়ে। ছাতে উল্টো হয়ে বসে থাকে ১৩টি টিকটিকি, আর জানলা দিয়ে উড়ে আসে একটা সবুজ প্রজাপতি।

তো বলছিলাম ফুলের গন্ধের কথা। ফুলটা খুবই অদ্ভূত। ভাইয়ের মৃত্যুর পরদিন রাতে মায়ের ঘরে কোত্থেকে যেন এই ফুলটা আসে। তারপরদিন রাতে আরো কয়েকটা। ফুলটায় এমনিতে গন্ধ নেই। যেই তুমি স্পর্শ করেছো, শরীরের ঘাম বেরুবার মতো একরাশ তীব্র, স্নায়ু অবশ করা গন্ধ তোমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলবে। বাবা তার বোতল খুলে গ্লাসে তরল ঢালবেন, ছিপি খোলার সাথে সাথে এই ফুলের গন্ধে পুরো বাড়ি ছেয়ে যাবে। এই ফুলের ডানা আছে, সে উড়তে পারে। এই ফুল কথা কেড়ে নিতে পারে। তার ক্ষুধা আছে।


বাবাকে একদিন শঙ্খচিলের কথা বলি।

বলি যে স্বপ্নে আমি শঙ্খচিল দেখতে চাই। কাজে একটুও মন বসাতে পারি না। ছেলেদের সিলেবাস এখনও শেষ করতে পারি নি। ডিপার্টমেন্টের চেয়ারম্যানের কাছে কমপ্লেন করা হয়েছে আমার বিরুদ্ধে। সারাদিন নিজের চেম্বারে বসে ফ্যানের তলায় ঝিম মেরে বসে থাকি। ভার্সিটির চাকরিটা আর করতে ইচ্ছে করছে না বাবা। মনে কচ্ছপের প্রচণ্ড ভয়।

তিনি আমাকে ছোট ছোট দুটি পাথর দিয়ে বলেন-ঘুমানোর সময় পাথর দুটো মুঠোয় নিয়ে ঘুমাবি। আমি তা-ই করি। এক রাত, দু'রাত, তিনরাত কেটে গেলেও কোনো পরিবর্তন আসে না। কিন্তু, চতুর্থ রাতে কানের কাছে স্তোত্র পাঠ শুনতে পাই। শব্দগুলো কুহরে মন্দ্রিত হয়, অন্তরের একেবারে গহীনে গেঁথে যায়-: ইসাবেলা দেখো, চোখ খুলে দেখো।

: কিছুই দেখছিনা।

: মুঠোর পাথর শক্ত করে ধরো, তারপর দেখো।

: না, কিছুই দেখছিনা। এতো অন্ধকার চারপাশ!

: শঙ্খচিল...

তখন কানে বাজে অজস্র শঙ্খচিলের ডাক। তখন তীব্র ব্যাথায়...কোনো তীরন্দাজ আমাকে যেন শরবিদ্ধ করলো! যন্ত্রণায় কাৎরাতে থাকি, কিন্তু শঙ্খচিলের ডাক! আমার জনমভর প্রতীক্ষা তো এই ডাক শোনার, আমি কান পেতে রই। হ্যাঁ, এই তো তাদের ডাক কানে আসছে। কিন্তু শঙ্খচিল কোথায়? একটা কচ্ছপ আমার উরুমূলে ঢুকে যেতে চাইছে। হ্যাঁ, এই তো...এই তো...এই তো যন্ত্রণার শেষ...এই তো এখন আনন্দ পাচ্ছি, আনন্দের তীব্রতায় থরথরিয়ে কাঁপছি। আনন্দের পর এখন অবসাদ। এই তো এখন অবসাদেরও শেষ, এখন বনবাস। এখন অবকাশ। এখন আকাশ। হ্যাঁ, ওই তো শঙ্খচিলের ঝাঁক। ওই তো তাদের কান্না। ওই তো আমিও কাঁদছি। ওই তো পাশেই আমার আত্মজা। সেও কি কাঁদছে? কেন, কেন কাঁদবে সে? অন্ধকার হাতড়িয়ে ওর চোখে হাত রাখি। না, মায়া কাঁদছেনা। ওর চোখ শুষ্ক। রুমের টিউবলাইট তীব্র আলোয় জ্বলজ্বল করছে। সে আলোয় দেখি-বাবা আর সেই পাষণ্ড শিল্পী পায়ের কাছে দাঁড়িয়ে আছে!

মা! মা! হঠাৎ মেয়েটা চিৎকার করে ওঠায় দ্রুত কাছে গিয়ে তাকে বুকের সাথে চেপে ধরি।-কি হয়েছে মা? মেয়েকে কী বলবো, কী বলবো...না মা, লক্ষিসোনা। আমার চাঁদ। তোমার কিচ্ছু হয়নি। মায়া ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। তার দু'মুঠোয় দুটি পাথর। আমি বিষ্ময়ে বিমূঢ় হয়ে যাই। মেয়েকে কী বলবো, বুকের ধক্‌ ধক্‌ শব্দের তালে মুখে কথা আসে না। ওকে কোনোমতে বলি-তুমি ঘুমাও মা। এখন ঘুমাও, এসো তোমার চুলে বিলি কেটেদি। ওর চোখ আতংকে নীল। তীব্রভাবে জড়িয়ে ধরে বলি : আমার সোনামণিকে ফেলে আর কোথাও যাবো না। এখন লক্ষিটির মতো শুয়ে পড়ো।

হঠাৎ ইচ্ছে হয় মেয়েকে তার বাবার কথা বলি। অনেকবার বলা গল্পগুলো সে কি আর শুনতে চাইবে? শুনতে শুনতে সঞ্চয়ের সব গল্প ওকে বলে ফেলেছি। জন্ম থেকে আজ এই রাত-অব্দি বাবা মানুষটাকে দেখেনি সে। তার জীবনে বাবা একটা শূন্যস্থান। গর্ভে থাকতেই লোকটা নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। একটা পাষণ্ড আর্টিস্ট। আঁকতে বসে শুধু নিজের পোট্র্‌্রটে আঁকতো। ক্যানভাস জুড়ে বুভূক্ষু একটা চোখ দানবের মতো তাকিয়ে থাকতো। কতোদিন এইসব চোখটোখ দেখে ভয় পেয়েছি!

নিজের বাবার গল্প করবো? মেয়েকে বলে দেবো সবকিছু? কীভাবে একরাতে বাবা কচ্ছপ হয়ে গিয়েছিলো? তারও আগে ছাদে বৃষ্টিতে একসঙ্গে ভিজতে ভিজতে আমার শাড়ি খসে পড়েছিলো? কীভাবে বোতলের তীব্র তরল আমাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে দিনের পর দিন? বুকের ভেতর মেয়েটা ভয়ে কাঁপছে আর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। নিজেকে সামলে রাখতে পারিনা। মেয়েকে বুকে নিয়ে নিঃশব্দে কাঁদতে থাকি। কিন্তু আমার মা?

তুমিও কি কাঁদছো? পৃথিবীর সব মুনিয়া পাখি কেন শুধু একা একা কাঁদে মা?


মানুষ কাঁদছি, আহা, প্যারাডাইজ লস্ট!

নাইজার, কঙ্গো, উগান্ডা, বুরুন্ডি, রুয়ান্ডা আর আমি, দুনিয়ার সমস্ত মুনিয়া পাখি, প্রজাপতি, আমার মৃত ভাই, আমার স্মৃতি, এই-সব, আটকে রেখেছি ওই দরোজার ভেতর। এই দরোজা কোনোদিন খুলে দিলে বের হবে উদভ্রান্ত, খ্যাপাটে সব নরকঙ্কাল।

কিন্তু, এমন কোনো গান কি নেই, কানের কাছে বর্ষিত হবে বৃষ্টিধারার মতো, একেবারে শেকড়সুদ্ধ নাড়িয়ে দেবে! উল্লাসে ধেই ধেই করে নেচে উঠবে রক্তের কণাগুলো। দাফনের আগে লাশকে যেমন গোসল দেয়া হয়, তেমনি পবিত্র করে দেবে!

বৃষ্টির কথা ভাবলেই নাকে ফুলের গন্ধ এসে ধাক্কা মারে। এই গন্ধ তোমার অস্তিত্বকে বিবশ করে দেবে। তাকে জিজ্ঞেস করি এই গন্ধের মানে কী বাবা?

তার মুখটা থমথম করে, কয়েকবার বিদ্যুৎ চমকায়, তারপর বৃষ্টিধারা নেমে আসে-মানে শুনতে চাস? এই গন্ধ হলো জীবনের প্রথম চুম্বন আর সর্বশেষ সঙ্গমের স্মৃতি, তোকে মনে করিয়ে দেবে এর ভেতরেই পার হয়ে গেছে বহু বহু যুগ। আসলে নিউরনে একটা ভার্চুয়াল মেমোরি বয়ে বেড়ানো। এই গন্ধের মানে হলো গত শতাব্দীর প্রথম দশকগুলোয় যারা বেঁচে ছিল, তুই আমি আমরাও ওই সময়ে, তাদের সাথে ছিলাম। এই গন্ধে আছে মুক্তি, শান্তি এবং অস্তিত্বের প্রসঙ্গ। দ্বন্দ্ব, উত্তেজনা, হত্যা এবং জীবনের প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণ কিংবা পলায়ন। হয়তো তুমি কখনোই সংসার ত্যাগের কথা ভাবতে পারবে না কিংবা সংসারেই লাগিয়ে দেবে আগুন। হয়তো এই গন্ধই তোমাকে ক্রমশ বন্দি করে ফেলবে একটা ঘেরাটোপে। এটা একাধারে মিউজিশিয়ান এবং হয়তো-বা মিউজিকও। আমরা প্রত্যেকে কেন এতো শৈশব দ্বারা আক্রান্ত জানিস? এই গন্ধের জন্যই। আসলে গন্ধটা আর কিছুই না, জীবন ও মৃত্যুর ভেতর একটা ভারসাম্য। একটা চক্র, শুরু এবং শেষহীন। একটা সমুদ্র-মন্থন। পৃথিবী ভরে যাবে গরলে। পুনর্বার লোহার বাসরঘরে ঢুকে পড়বে লখিন্দরের হন্তারক, কিন্তু এতো গরল কে পান করবে গো মা মনসা? তখন একটা তীব্র চুম্বনের নেশায় আমি থরথরিয়ে কাঁপতে থাকি। শরীরে জেগে উঠে প্রথম সঙ্গমের আনন্দ-যন্ত্রণাময় কোরাস।


দরোজায় তালা ঝুলছে।

ওই দরোজাটা বহুদিন খুলিনি। কী আর আছে-কুষ্ঠরোগী, পঁচাগলা শামুক, চিৎকার, কান্না, পাথর, দাবানল, হাইড্র্যান্ট; তবে আলমারির পেছনে বা হতে পারে এর ভেতরেই আছে একটা তক্ষকের বসতি। সন্ধ্যাবেলা কিংবা মাঝরাতে কী মনে করে যেন সে ডাকে, একবার ডাকার পর বিরতি দেয়, আমি অপেক্ষা করি পরবর্তী ডাকের, সে আরো একবার ডাকে। আবার অপেক্ষা করি, কিন্তু মরে গেলেও আর ডাকবে না তক্ষকটা!


আমার যে অনেকগুলো নাম!

প্রত্যেকেই, আমার নামগুলো, মৃত কিংবা জীবিত, কিংবা জীবন্মৃত।

আমার কতোগুলো নাম-মনসা, কিরণ, পারমিতা, ইসাবেলা, দুঃশলা, সাবিত্রি, কেয়া, ঋতু, গুহা, অদিতি, মেটাফোর, সখিনা। নামগুলো আমার পোষা সাপ। এগুলো খাটের তলায়, বারান্দায়, জানলার গ্রীলে দিনরাত বসে থাকে, গান গায়, কথা বলে। রাত জেগে পাহারা দেয়। প্যাঁচ মেরে ধরে। হাড়গোড় গুড়ো করে দেয়। কখনও চুম্বন, কখনও দংশন!

তারা বুঝিয়ে দেয়-এ জীবন বড় দুঃসহ, শুধু নাটকীয়তা, মারপ্যাঁচ, খুনোখুনি, সিংহ চিহ্নিত আসন আর মানুষের লোভাতুর রক্ত কেবল বলকাচ্ছে।

নামগুলো আমার শুকসারি। রাত্রির পর রাত্রি তারা কাহিনী বলে পার করে দেয়। চোখের জলে ভেসে ভেসে তারা জিঘাংসার কথা বলে, চক্রান্তের কথা বলে, হত্যার কথা বলে।

মাঝে মাঝে তাদের কী যে হয়, একসাথে ঝাঁপিয়ে পড়ে আমার ওপর এবং তখন পুঁতির দানার মতো তাদের চোখগুলো জ্বলতে থাকে। তখন আমিও চাই, আমার সখিগণ বিষাক্ত ছোবলে আমাকে অন্ধ করে দিক, যেন হাড়গুলো গলে জল হয়ে যায়। ওদের চোখ লোভে আর ক্রোধে আর জিঘাংসায় ফুঁসে ওঠে, ঠিক বাবার চোখের মতো।

তখন এই শরীরও আড়মোড়া ভাঙে। তখন শরীর মানে বেতার, শর্ট ওয়েভ থেকে লঙ ওয়েভে বার্তা পাঠায়। শরীর মানে ছাপাখানা, শরীর মানে বৈদ্যুতিন আলো, শরীর মানে হাইড্রোলিক হর্ণ। শরীরটা যেন ভাতের হাঁড়ি, তাপের চাপে টগবগিয়ে ফুটছে। শরীর এমন এক তীব্র নেশা, ভারী পাথরের নীচে চাপা পড়তে ইচ্ছা করে।


কী প্রখর দুটি চোখ!

গতকাল একটা কুরিয়ার এসেছে। একক প্রদর্শনীর কার্ড। কার্ডটায় আঁকা দুটো চোখ প্রখর দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে থাকলো কিছুক্ষণ,-এবং একটি চিরকুট : তুমি আসবে তো কিরণ?

কিরণ! চমকে উঠি। প্রতিরোধের বাঁধগুলো ভেঙে যায় আর আলমারির দরোজাটা অনেকদিন পর খুলে ফেলি। তাকে তাকে সাজিয়ে রাখা ভুবনটাকে বের করে আনতে চাই, কিন্তু হায়! নেই। আলমারিটা শূন্যগর্ভ। তাহলে কি এতোদিন কর্পুরের দানা দিয়ে ভর্তি করেছিলাম? কিছুই নেই, এমনকি আমার প্রথম চুম্বন আর প্রথম সঙ্গমের স্মৃতিটুকুও হারিয়ে গেছে!

আজ বুঝে গেলাম, জীবন, একটা দীর্ঘ; বেদনার্ত শব্দ।





উপনিবেশ


আমি অস্ফুট স্বরে বলি: না...

সেই গন্ধের মতো, বিগত কালের জেগে ওঠা নদীদের মতো, বিধ্বস্ত সব পর্বতের মতো, আমার শরীর-কাঠামোয় চিরফাটা দেখা দেয়। মাটির এক-একটা টুকরো গা থেকে খসে পড়ে। মাংসের শরীর এবং আত্মা তড়পাতে থাকে বুভূক্ষুর মতো। বাবার খসখসে আঙুলগুলো প্রলুব্ধ বুকের ওপর কম্পমান। শরীরের বাঁকগুলোয় নখের রক্তাক্ত দাগ। বক্ষবন্ধনী ঝুলে পড়ে। নাভির মোম গলে বের হয় ঘামের বুদ্বুদ। নিতর্ম্ববে তানপুরাটা সঙ্গীতে চূর। গুহাপথ আগুনমুখা। জল থৈ থৈ! আমার স্বর গলে শিৎকার: আহ্‌। তখন, ঠিক তখন, পৃথিবীর সমস্ত শঙ্খ বেজে ওঠে, ধুপের গন্ধ আর আভাসে আরতির লগ্নও এসে যায়। আমি তীব্র বিষে বেঁকেচুরে যাই। এ জীবন শুধুই, শুধুই বিসর্জনের!

তখন আমার পূর্বপুরুষের চোখগুলোর কথা মনে পড়ে। আহা! চোখগুলো দেয়ালে দেয়ালে গাঁথা আর কানে আসে ডাইনীটার ফোঁসফোঁসানী। কতোবার জ্বালিয়ে দেয়া আগুন এই ডাইনীটা ফুঁ দিয়ে নিভিয়ে দিয়েছে।

ডাইনী আমার আত্মাটাকে খামচে ধরে। ঠিকঠাক জ্বলতে পারি না, গলতে পারি না, ডুবতেও পারিনা। মেঝেয় কাচের গ্লাস ছিটকে পড়ে ভাঙে। ঘোর কেটে যায়। প্রচণ্ড জেদ চাপে। কিন্তু জানিনা, মনের কোথায় কোন ভূত বাস করে, ওকে হত্যা করার জেদ খানখান হয়ে ভেঙে পড়ে। মেয়েটাকে নিয়েও ভয়। ও বড় হচ্ছে। বুকে কুড়ি ফুটছে। ও এখন কতোরকম স্বপ্ন দেখবে, তার নাকে ফুলের তীব্র গন্ধ লাগবে।

আচ্ছা, মেয়েটা তার সারাজীবনে কী কী স্বপ্ন দেখবে?

কোনো বেহালাবাদক যুবক?

ম্যাজিশিয়ান?

বংশীবাদক? পাথরকুঁচি? বনতুলশি?

তক্ষক? কচ্ছপ? পাথর? অচিন কোনো বৃক্ষ? নদীতীর? শঙ্খচিল? মেয়েটা বড় হচ্ছে। যে-কোনদিন সে রজঃস্বলা হবে। ঋতুর গন্ধে ভরে উঠবে তার পৃথিবী। আমার মনটা থিক থিক করতে থাকে।


তুমি আসছো তো কিরণ?

কেউ ডাকছে। স্বরটা বড়ো করুণ!-এই তো মোড়ের কাছে চলে এসেছি। বড়োজোর ১০ মিনিট লাগবে। মহারানী যাবেন তো। নিরাপত্তারক্ষীরা রাস্তাঘাট সব বন্ধ করে রেখেছে। ঘন্টাখানেক আগে যদি বের হতে পারতাম! কিন্তু, থাক, আর তো কেবল ১০টি মিনিট।

: মা...

হাত থেকে স্টিলের বাটিটা মেঝেয় পড়ে গেলে যেমন ঝনঝন করে, মেয়ের গলাটা তেমন শোনায়। মহারানীর আর কতোক্ষণ লাগবে? ১১ না ১৭ না ২১ মিনিট? সন্ধ্যা নামছে!


দেয়ালে ঝুলে আছে আমারই খণ্ড খণ্ড অংশ!

চোখগুলো আর্তনাদ করে ওঠে এবং পর মুহূর্তে তারা কাঁদতে শুরু করে। গর্ভকালীন স্মৃতি, প্রথম ও শেষ সঙ্গম, উড়ন্ত ফুল, ফ্লাই উইথ মাই স্যাডনেস, পাথরের চাঙর, টারশিয়ারি যুগের পাহাড়ের তলায় আড়াইশো বছরের কচ্ছপ, ডানামেলা গাঙচিল, মুঠোবন্দি পাথর, কনডম হাতে শিশু, প্যারালাইজড মা, আমি ও মায়া, কনডমের ভেতর মানুষের মুখ আর ক্রোধ, হিংসা, কান্না, গন্ধ, সন্ধিক্ষণের ঈগল, আগ্নেয়গিরি, নাগিনী কন্যার কাহিনী, পাশা খেলছেন যুধিষ্ঠির, দ্রৌপদীর শাড়ি, রক্তাক্ত হাসি, দংশন, নস্টালজিয়া।

দেয়ালে ঝুলে আছি আমি আর আমার যোনিপথে ফণা তুলে দাঁড়িয়ে আছে কালো কুচকুচে সাপ। পায়ের কাছে পড়ে আছে একটা পুরুষাঙ্গ, যার মুখে ঘন হয়ে বসেছে কয়েকটি ডুমোমাছি। পাশে একটা পাথর। রক্তাক্ত!


কতোদিন পর আজ আমার হারিয়ে যাওয়া আলো খুঁজে পেলাম!


সেইসব দিনগুলোতে ভেন্টিলেটর দিয়ে ফটফটে আলো এসে আমাদের শরীরে কতোরকমের নকশা যে তৈরি করতো আর অদ্ভূত চোখের বাউণ্ডলে লোকটা, তার দু বাহুর প্রশস্ততা দিয়ে এমনভাবে ঢেকে রাখতো, দুঃখ আর বেদনার উপাখ্যানগুলোকে মনে হতো মিথ্যা, অলীক। তাহলে কি এতোদিন আমি মৃত, মিথ্যা এবং অলীক ছিলাম? আমি কি আমার প্যারালাইজড মা, কচ্ছপওলা বাবা, মৃত ভাইয়ের স্মৃতি, পাথর, শঙ্খচিলগুলোকে গত শতাব্দীর প্রথম দশকগুলোয় ফেলে এসেছি?

-মা...

মেয়েটা কেমন যেন করছে। এই তো আর খানিকটা সময় মা, তোমার কি খারাপ লাগছে?

মেয়েটা আবারো বলে : মা। মায়ার মুখটা কষ্টে, বেদনায়, বিবমিশায় একাকার। কী হলো মেয়েটার!


রিকশায় উঠে পড়েছি।

হঠাৎ দেখি গ্যালারির সিঁড়িতে বাউণ্ডুলে লোকটা ধাঁধার গোলকের মতো দাঁড়িয়ে আছে! ঠিক দেখছি? সেই লোকটা তো? আমাকে ফেলে রেখে ও কোথায় গিয়েছিল!

ওই দেখো, তোমার বাবা দাঁড়িয়ে আছে-মেয়েকে এমন এক স্বরে কথাটা বলি, মহামারীর সময় লোকে ঠিক এমন ভাঙা ও করুণ গলায় কথা বলে।

মায়া রোগাটে, ফ্যাকাশে, উদভ্রান্ত চেহারার লোকটির দিকে তাকিয়ে থাকে। আমাকে হঠাৎ আঙুলের ইশারায় তার গোড়ালির দিকে তাকাতে বলে। চোখে পড়ে মেয়ের গোড়ালিতে একটা দাগ। যেন একটা সূর্য। একটা রেড-ক্রস/লাইন/এ্যালার্ট কিংবা সিগন্যাল। মেয়েটার এখন অন্য একটা নাম দিতে হবে। আমার কতগুলো নাম্তকিরণ, পদ্মা, পারমিতা, সখিনা, দুঃশলা, রোকেয়া, সাবিত্রি, শিখণ্ডী, ঋতু, অদিতি, অহল্যা, নূরজাহান, ইসাবেলা। নিজের একটা নাম মেয়ের সাথে জুড়ে দেবো? কোন নামটায় তাকে মানাবে? তাকে বোঝা যাবে? তাকে যদি মেটাফোর নামে ডাকি? ওর পায়ে একটা চিহ্ন। একটা কলোনিয়াল মেটাফোর!

বুঝি না জীবন এরকম কেন? যে-মেয়েটা সারাজীবনে মা শব্দটি ছাড়া আর কিছুই বলতে পারবে না, তার চোখে কেন সেপিয়াময় বিষণ্নতা? গ্যালারীর বারান্দায় আমার শিল্পী দাঁড়িয়ে আছে। আমি কি তাকে ডাকবো? ডেকে চিৎকার করে বলবো : আমার আত্মজা আজ রজঃস্বলা হয়েছে!


খানিক পরেই রাত নামবে তার অন্ধকারের বিস্তার নিয়ে, অথচ আমি জানি- মেয়েটার মতোই আজ আমার চোখ ভরে থাকবে সেপিয়া- পৃথিবীর বিষণ্নতম রং। শহরের বুকে নেমে আসবে ঘুটঘুটে অন্ধকার রাত। শহরের রাস্তার ওপর কালো রাতগুলো আর কতোকাল ধরে এভাবে নেমে আসবে? ধীরে ধীরে রাতের রাস্তা ফাঁকা হবে, চলে যাবে টহল পুলিশের দখলে। বাতিগুলো নিভে যাবে। নেড়িকুকুরটা কুঁইকুঁই করে মরবার জন্য কাকুতি জানাবে আর আবর্জনার ভেতর পরিত্যক্ত ডটেড কনডমে নাক ডুবিয়ে বেড়ালটা হঠাৎ অন্ধ হয়ে যাবে!




অনুবাদক পরিচিতি 

এমদাদ রহমান


গল্পকার
অনুবাদক।
জন্ম সিলেট, বাংলাদেশ।
বর্তমানে ইংলন্ডে থাকেন।

প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ : পাতালভূমি ও অন্যান্য গল্প।

1 টি মন্তব্য:

  1. মাহমুদ হাসান পারভেজ১২ জানুয়ারী, ২০১৫ ৭:০০ AM

    অদ্ভুত আকর্ষণে পড়ে ফেলা গল্প। কত আগের বা পরের কাল অার মহাকাল ঢুকে আছে শরীরে। মগজে। গন্ধে। জীবনে।

    উত্তরমুছুন