শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০১৫

এমদাদ রহমানের গল্প : আমাদের ভাঙাকাচের জানালায় মায়াপাখি উড়ে যায়

তুমি তাই সীমারেখা? কী হয় তোমাকে দিয়ে?
বাঃ সীমারেখা!
কীভাবে আমাদের বেঁধে দিয়েছ আর দেখো, আমরাও করতালি দিচ্ছি!
তাই তুমি, হে সীমান্ত, হে সীমারেখা, তুমিও কেমন ঢুকে পড়েছ আমাদের স্বপ্নে। কিন্তু, দেখো তুমি, ঘুমের ঘোরে টেবিলের ওপর রাখা এক গ্লাস জল ধরতে গিয়ে আমাদের স্বপ্নের মৃত্যু হচ্ছে। এক গ্লাস জল... জল গড়িয়ে যাচ্ছে... ধারাস্রোত... বর্ষণ... এক গ্লাস জলের স্বপ্ন থেকে আমরা ঘুমের ঘোরে কোথায় যেন যাচ্ছি!
হ্যাঁ, এই তো, এই তো আমাদের বালকবেলা। এই বালকবেলার কৌশল! কচ্ছপের বাচ্চাকে হাতের তালুতে নিয়ে বৃষ্টিতে ভিজছে একটি ছয়-সাত বছরের বালক... একদিন যে ঘটনাটি ঘটেছিল সেই ঘটনার কাছে স্বপ্ন আমাদের যখন ফিরিয়ে নিতে চায়, তখনই সেই দৃশ্যের মৃত্যু হচ্ছে! গড়িয়ে পড়েছে জলের গ্লাস... জল ছিটকে গেছে! আয়নায় মৃত্যু হচ্ছে মুখের! আয়নায় মরে যাচ্ছে দৃশ্য দেখার চোখ।
রেখায় রেখায় তুমি এক ভাঙন ছাড়া আর কি তোমাকে বলা যায় সময়?
বাহ, আমাদের সীমান্তঘেরা জীবন! কত সীমানা এই জীবনের? জল, ভাষা, দেশ, আকাশ-- সব, সবাইকে তুমি বেঁধে দিয়েছ!
যেখানে বাঁধা পড়েছ তুমি জীবন!
ও জীবন তুমি কেমন?
লাল কি তোমার রঙ? রক্তের মতই কি দেখতে তুমি? নাকি জীবন তুমি বিষাদ, নীল? কোথায় তোমার সেই আশ্চর্য ফুল। জীবনফুলের পাপড়িগুচ্ছ আমাদের দরকার। কোথায় আছে, কোথায়?
ও জীবন, হে জীবন, আহা জীবন।
দেখো, দেশ কীভাবে ভেঙে যায়, ভেঙে ভাগ হয়ে যায়। সীমারেখা টানা হয়ে যায় মানুষে মানুষে। মানুষও ভাগ হয়ে যায়। মানুষকে ভেঙে ফেলবার কুশলতা কি তুমিই শিখিয়ে দিয়েছ? তবু হে জীবন, মানুষ বিস্ময়ে তাকিয়ে থেকেছ তোমার বৃষ্টির দিকে। তাকিয়ে দেখেছে তার সন্তানের মুখ। তাকিয়ে দেখে অন্ধ হয়ে গেছে, তুমি বলেছ মেগাডেথ।
পাহাড়? পৃথিবীর স্তম্ভ। তবু, আমরা শুনতে পেয়েছি কান্না তার, পাহাড়ের।
উঁচুতে, আরও উঁচুতে পৌঁছে গিয়েও কেবল পৌঁছতে পারিনি তোমার আত্মার কাছে, হে পাহাড়। জানি, তোমার গোপন তলদেশে আদিম মানুষের জন্য জমিয়ে রেখেছিলে পবিত্র জল, আমাদের সন্তানরা মায়ের বুক থেকে যেমন চুষে নেয় বিন্দু বিন্দু জীবনফোঁটা, ঠিক তেমনি, পাহাড়ের বুকের ভিতর তুমিই কি ঈশ্বর এখনও গোপন করে রেখেছ ফসলের বিপুল দানা! আন্দালুসিয়ার কবি গারসিয়া লোরকা বহু বছর আগে, গ্রানাদার সবচেয়ে ধূসর দিনটিতে, স্পেনের ভিয়েন্তা থেকে পাহাড়ের প্যানারমা দেখছিলেন। হাওয়ায় উল্লসিত ডুমুর আর ঝাঁকড়া ওকগাছের বিপুল আন্দোলনের ভিতর দাঁড়িয়ে থেকে, দেখছিলেন পর্বতমালার বিস্তৃত দৃশ্যপট। দেখছিলেন, ইউরোপের সৌন্দর্য। এশিয়ার সৌন্দর্যকে আপনি দেখেছিলেন, রবীন্দ্রনাথ?
না কি, সভ্যতার সংকট আপনাকে ভাবিত করেছিল? মানুষকে বড় বিশ্বাস করতে চেয়েছিলেন! আমরা বড় আদিম এখনও, ভুলতে পারিনি সেই বিষবৃক্ষকে। তবু, কবি হে, দেখুন, একঝাঁক পাখি, চক্রাকারে ঘুরতে ঘুরতে আমাদের কত সংলাপ শুনিয়ে গেল। ঘুম ভেঙে গেল পাথর-পাহাড়ের।
ওলমৌস্ট হ্যাভেন... লাইফ ইজ ওল্ড দেয়ার... কান্ট্রি রোড টেইক মি হোম টু দ্য প্লেইস আই বিলঙ... ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া, ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া, ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া...
বুকটা হু হু করে উঠে। ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া!
ওঃ ডেনভার, এ কোন গান শুনিয়ে দিলে! ওলমৌস্ট হ্যাভেন... লাইফ ইজ ওল্ড দেয়ার... কোথায়, কোথায় সেই পুরনো দিন, পুরনো জীবনধারা!
স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে, ব্রিজের গোঁড়ায়, ফুটপাতে-- মরতে মরতে, ভাঙতে ভাঙতে দেখো কীভাবে আমাদের অন্তর্গত মুখ চিৎকার করছে -- ভাত। ভাত।
সবকিছু দেখেও তুমি নিরাসক্ত। হে ফিডলার। ছাদে বসে ভায়োলিন বাজাচ্ছ তুমি নাকি তোমার নীরব বিদ্রুপ! দেখো, দেখে নাও, পৃথিবীর মানুষের বাগান কেমন করে বিশাল এক সার্কাসের ময়দান হয়ে গেছে...
একদল লোক দৌড়চ্ছে, মখমলবাফ! আবার এদিকে দেখো, দেখতে পাচ্ছ, যুদ্ধাহত এক সৈনিক আটকা পড়ে আছে ভয়ানক এক বাউন্সিং মাইনের ওপর। তাকে উদ্ধার করা যাচ্ছে না। জাতিসংঘ ব্যর্থ। জাতিসংঘ ফিরে যাচ্ছে। ক্যামেরা আটকে পড়া সৈনিকটির ওপর ঘুরছে। নো ম্যান্স ল্যান্ড। নো ম্যান্স ল্যান্ড। কাবুল। কান্দাহার... অন্ধকারের স্তনের ভিতর, যোনির ভিতর অনন্ত মৃত্যুর মত...
তখন আমাদের খবরের কাগজগুলি রক্তমাখা। কারণ তার ঠিক আগের দিন আমরা ফটো সাংবাদিকের ক্যামেরার সামনে খুন করে ফেলেছি বিশ্বজিৎকে।
দৃশ্যের পরের দৃশ্যে আমরা খালি পালিয়ে বেড়াই। কান্দাহারের লোকেরা দৌড়চ্ছে। আকাশ থেকে মার্কিন বিমান নকল পা ফেলছে। পা যেন পাখি। পা যেন গ্যাসবেলুন। উড়ছে। ডানা মেলে দিয়েছে। অন্ধকারের স্তনের ভিতর যোনির ভিতর অনন্ত মৃত্যুর মত...
তখন আমরা নিজের ভিতর, সিনেমার পর্দা ছাপিয়ে জীবনের চলন দেখি। কীভাবে একটি ছোট্ট নুড়ি দিনে দিনে আল্পস... ব্লু রিজ মাউন্টেইন, শানানদো রিভার... লাইফ ইজ ওল্ড দেয়ার... ওলডার দেন দ্য ট্রিজ, ইয়ঙ্গার দেন দ্য মাউন্টেইনস...
দেখি আমাদের বালকবেলা। দেখি আমরা হাতের তালুতে কচ্ছপের বাচ্চা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। হাতের ধাক্কায় গ্লাস পড়ে গেছে মেঝেতে। গড়ান জল। স্বপ্নে আমাদের বড় তৃষ্ণা।
দেখি আমাদের বালকবেলা। দেখি, বহুকালের পুরনো কাঠের ব্রিজের নিচে, কচুরিপানার আশ্চর্য ফুলের সঙ্গে জলের ওপর দুলছে এক মানব ভ্রূণ!
আমাদের মনে হতে থাকে, বহু বছর পর মনে হতে থাকে স্বপ্নে আমরা হাত বাড়িয়ে জলের গ্লাসটি ধরতে গেলেই মেঝেয় ঝনঝন শব্দ হয়। বহু বছর পর আমাদের এমনও মনে হয় যে, আমাদের বালকবেলার সেই জলের ওপরের মানব ভ্রূণটি আসলে বীজ ছিল।
সেই বীজ সম্ভব করেছিল পৃথিবীতে জীবনের আশ্চর্য বিকাশ।
কেউ কথা বলি না। সবাই দেখি। সবাই দেখি কীভাবে ক্যামেরার সামনে কুপিয়ে কুপিয়ে মেরে ফেলা হল বিশ্বজিৎকে। বিশ্বজিৎ! এই শব্দের অর্থ আমরা কেউ জানি না কেন?
মায়ের গর্ভফুল ছিঁড়ে কোথায় জন্ম সম্ভব হয়েছিল এই মানবভ্রূণের? কোন সে জরায়ু?
আমরা তখন মানুষের ঘরবাড়ির দিকে তাকিয়ে থাকি। ডান দিকে বাড়ি, তারপর আরও বাড়ি,
তারপর, মেঘের বাড়ি।
খবরের কাগজে বিশ্বজিতের লাশের ছবি।
পরের দিন খবরের কাগজে আমরা বিশ্বজিতের মায়ের ছবি দেখি। মাকে কাঁদতে দেখি। আর তখন মার্কিন বিমান থেকে কান্দাহারের যুদ্ধে পা হারানো মানুষের জন্য নকল পা নীল আকাশের ব্যকগ্রাউনড ভরে দেয়। আমরা মায়ের ভিতরে জন্ম নিতে থাকি।
খবরের কাগজে ছাপা বিশ্বজিতের মায়ের ছবি দেখে আমরা দুপুরের খাবার খাই। তারপর ঘুমিয়ে পড়ি। জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা একজন মাকে বাড়ির উঠোন থেকে ছাপ্পান্নহাজার বর্গমাইলজুড়ে বিস্তৃত করে দেয় আর আমাদের ছেলেবেলার আশ্চর্য আশ্চর্য সব দিন ফিরে আসছে। আমরা দেখছি, আমাদের ভাঙাচোরা জীবনের আকাশে অনেক পাখি। কে জানি বলে দেয়, এরা সব মায়াপাখি। আমরা চিৎকার করে বলি-- জীবন আমার বোন। জীবন আমার বোন। বোনের সঙ্গে জীবন এক আশ্চর্য যোগসূত্র তৈরি করলে আমরা দেখতে থাকি কচুরিপানার সঙ্গে একটি মানবভ্রূণ জলের ঢেউয়ে ঢেউয়ে দুলছে।
খবরের কাগজে বিশ্বজিতের মা।
তখন, মুখে মুখে রুপকথা। কিম্ভূতকিমাকার রূপকথা।
আমাদের রাজার আদেশ। তাই আমরা বন্দুকধারীদের রাঙা চোখের সামনে কুচকাওয়াজ করতে থাকি। আমরা সমস্বরে চিৎকার করে বলতে থাকি, মহারাজার জয় হোক। জয় হোক। জয় হোক। চিৎকারের কোরাসে এই বাংলাভূমি আড়মোড়া ভেঙে জাগতে থাকে। আমরা বন্দুকের নলের দিকে তাকিয়ে থেকে চিৎকার করতে থাকি--
ম হা রা জা ম হা রা জা ম হা রা জা ...
তখন, আশ্বিনের দিনগুলিতে জল শুকিয়ে যেতে থাকে। কিন্তু কোথায় সেই ভ্রূণ? কচুরিপানার দল তখন জল হারিয়ে কাদার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। মানবভ্রুন কি মাটিতে বীজের মত গেঁথে যায়? বহু বছর পর, খবরের কাগজে বিশ্বজিতের ছবিতে রক্ত।
কী আমাদের চিল চিৎকারে? শধুমাত্র একটি প্রতিধ্বনি? হ্যাঁ আমি সেই প্রতিধ্বনিটাই তৈরি করতে চাই। আর কিছুই না। আমরা মানুষরা খুব তুচ্ছ রে। খুব সামান্য। মহাকালের হিসেবে আমরা আসলে কিছুই না।
সেই সামান্য মানুষ একটু প্রতিধ্বনি তৈরি করতে চায়।
পাহাড়ের কানে সেই চিৎকার পৌঁছবে কোনোদিন?
বহু বছর পর স্বপ্নে আমরা জলের গ্লাস ধরতে হাত বাড়াই... স্বপ্নের ভেতর কেউ ফিসফিস করে
-ওলমৌস্ট হ্যাভেন... লাইফ ইজ ওল্ড দেয়ার... কান্ট্রি রোড টেইক মি হোম টু দ্য প্লেইস আই বিলঙ... ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া, ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া, ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া... মেঝেয় ঝনঝন শব্দে গ্লাস গড়িয়ে পড়ে। বহু বছর পর ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে দাঁড়িয়ে কর্নেল অরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার মনে পড়ে যায় জীবনের প্রথম বরফ দেখার কথা। বহু বছর পর আমাদের দেশ একটা কিম্ভূতকিমাকার রূপকথার রাজ্যে পরিণত হয়। আসলে বহু বছর পর... আসলে, আমরা স্বপ্ন দেখতে ভুলে যাই। জীবনের ভাঙাকাচের আয়নায় তখন মায়াপাখি। বরফ যেন প্রাগৈতিহাসিক ডিম...ব্লু রিজ মাউন্টেইন, শানানদো রিভার... লাইফ ইজ ওল্ড দেয়ার... ওলডার দেন দ্য ট্রিজ, ইয়ঙ্গার দেন দ্য মাউন্টেইনস...বহু বছর পর আমরা গোঙাতে থাকি--
ম হা রা জা... ম হা রা জা বলে।
আমাদের শিশ্নে, আমাদের যোনিতে ক্ষত দেখা দেয়। হাঁ ঈশ্বর, আমরা গোঙাতে থাকি। স্বপ্নে শুধু হাত বাড়িয়ে জলের গ্লাসটি ধরতে পারি না আর আমাদের ভাঙাকাচের জানালায় মায়াপাখি উড়ে যায়!

২টি মন্তব্য:

  1. ও জীবন, হে জীবন, আহা জীবন.......

    উত্তরমুছুন
  2. আইভি চট্টোপাধ্যায়২৫ জুলাই, ২০১৫ ১২:৪২ PM

    বাঃ খুব সুন্দর ।

    উত্তরমুছুন