সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০১৫

গল্পকার রেজা ঘটক : জীবনের স্পন্দন না থাকলে সেসব গল্পকে আমার মৃত মাছের মত লাগে

সাক্ষাৎকার গ্রহণ: অলাত এহ্সান

অলাত এহ্সান : গল্পকার হিসেবে আপনার প্রস্তুতি ও চর্চা অনেকদিনের, ইতোমধ্যে প্রকাশ হয়েছে পাঁচটি গল্পগ্রন্থ। তা, গল্পলেখা শুরু করলেন কবে?


রেজা ঘটক : স্কুল জীবনে ২১ ফেব্রুয়ারি, ২৬ মার্চ ও ১৬ ডিসেম্বর আমাদের এলাকা থেকে কিছু সংস্কৃতিমনা বড় ভাইয়েরা মিলে ছোট ছোট পত্রিকা বের করতেন। মাঝে মাঝে সেসব পত্রিকায় আমার লেখা ছাপা হতো। কিন্তু সেসব লেখা ততোটা সিরিয়াস ছিল না। কলেজ জীবনে কলেজের বার্ষিক স্মরণিকায়ও আমার লেখা ছাপা হতো। তখনো জানতাম না আমি একদিন গল্প লিখব। অনার্সে পড়ার সময় একবার ডাকযোগে সাপ্তাহিক বিচিত্রায় একটা গল্প পাঠালাম। সম্ভবত ১৯৯৩ সালের ঘটনা। আমার সেই গল্পটি বিচিত্রায় ছাপা হল। আমার খুব ইচ্ছে হল বিচিত্রা অফিসে গিয়ে সম্পাদক শাহাদাৎ চৌধুরী'র সঙ্গে দেখা করি। কিন্তু দেখা করে কী বলব, তা গুছিয়ে উঠতে পারছিলাম না। তো একদিন মনে সাহস যুগিয়ে বিচিত্রার সেই কপিটি হাতে নিয়ে সোজা হাজির হলাম সম্পাদকের টেবিলে। শাহাদাৎ ভাই আমাকে দশ-বারো মিনিট সময় দিলেন। আর বললেন, তোমার হাতে তো গল্প আছে। তুমি নিয়মিত গল্প লেখো না কেন? সেদিন বিচিত্রা অফিস থেকে বের হবার পর দারুণভাবে আমার মনের শক্তি বহুগুণ বেড়ে গেল। তখন থেকেই সিদ্ধান্ত নিলাম গল্প লিখব।



অলাত এহ্সান : লেখক প্রস্তুতি হিসেবে দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি, ধর্ম, দর্শন, রাজনীতি, দেশিয় সাহিত্যপাঠ ইত্যাদি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আজকের দিনে অনেকে অবশ্য এতো গভীরে যেতে চান না। আপনি দীর্ঘদিন প্রস্তুতি নিয়েছেন, লিখেছেন অনেক পরে। আপনার কাছে লেখক প্রস্তুতি কেমন?

রেজা ঘটক : লেখার আগে প্রস্তুতি নেবার জন্য একজন লেখককে অবশ্যই প্রচুর পড়াশুনা করতে হয়। পড়ার কাজটি যে যতটা গুছিয়ে করেন, আমার ধারণা তার লেখা ততটা ভালো হবার সম্ভাবনা থাকে। আমিও এর ব্যতিক্রম নই। আগে হাতের কাছে যা পেতাম, তাই পড়তাম। মুড়ির ঠোঙ্গা থেকে শুরু করে আর্নেস্ট হেমিংওয়ে পর্যন্ত। লুকিয়ে লুকিয়ে একটা বয়সে প্রচুর রসময় গুপ্তও পড়তাম। মাস্টার্সের পর থেকে পড়ার ক্ষেত্রে বাছাই পদ্ধতি বেছে নিলাম। আমার কবি-সাহিত্যিক বন্ধুরা এ ব্যাপারে অনেক সহায়তা করল। এখন আর দায়ে না পড়লে নিজের সিলেকশনের বাইরে পড়ি না। যত বেশি ভ্যারিয়েশন নিয়ে পড়া যায়, ততই মানসচক্ষু খুলে যায়। একজন লেখকের জীবনে দীর্ঘ পাঠ-অভ্যাসের কোনো বিকল্প নেই। এই দীর্ঘ পাঠই আমার প্রস্তুতির অন্যতম অংশ।

এছাড়া প্রচুর ভ্রমণ আর আড্ডা, নতুন নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচয়, নতুন নতুন বিচিত্রসব জিনিসের প্রতি খেয়াল আমার লেখার প্রস্তুতিতে অনেক কাজে লাগে। অনেকের কাছে এটি সময় নষ্টের কারণ হলেও আমার কাছে এটি লেখার জন্য নতুন রসদ যোগান দেয়।


অলাত এহ্সান : এ-বছর বই মেলায় আপনার কি কি বই প্রকাশ হয়েছে, কারা করেছে?

রেজা ঘটক : এ বছর আমার দুইটি বই প্রকাশ করার কথা ছিল। একটি গল্পের বই। 'গল্পেশ্বরী'। অন্যটি কিশোরদের জন্য 'বঙ্গবন্ধুর সংক্ষিপ্ত জীবনী: মুজিব দ্য গ্রেট'। 'গল্পেশ্বরী' আমার ষষ্ঠ গল্প সংকলন। কিন্তু দুইটি গল্প কিছুতেই আমার মনের মত না হওয়ায়, রিরাইট করার মত মুড না আসায়, শেষ পর্যন্ত বইটি আর প্রকাশ করিনি। মাঝপথে প্রকাশককে না করে দিয়েছি। তাই অমর একুশে বইমেলায় আমার কেবল 'মুজিব দ্য গ্রেট' বইটি প্রকাশ পেয়েছে। প্রকাশ করেছে ত্রয়ী প্রকাশন।


অলাত এহ্সান : আপনার সর্বশেষ গল্পগ্রন্থ ‘পঞ্চভূতেষু’ বেরিয়েছে ২০১৪ সালে। এটা আপনার পঞ্চম গল্পগ্রন্থ। কতদিন ধরে লেখা গল্পগুলো এই বইতে যুক্ত হয়েছে?

রেজা ঘটক : 'পঞ্চভূতেষু'-তে আমি পাঁচ নিয়ে একটা খেলা খেলেছি। তাই এখানে নতুন-পুরানো দুই ধরনের গল্পই ঠাই পেয়েছে। মূলত ২০০৩ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত এই দশ বছরের কিছু গল্প থেকে মাত্র সাতটি গল্প নিয়েই 'পঞ্চভূতেষু'। কোনো কোনো গল্পের ভেতরে আলাদা আলাদা পাঁচটি গল্পের একটা মিশেল আছে। এককথায় দশ বছরের গল্প নিয়ে 'পঞ্চভূতেষু'।



অলাত এহ্সান : এই সময় ধরে লেখা গল্পগুলোর মধ্যে আপনি পরিবর্তন লক্ষ্য করেছেন কি?

রেজা ঘটক : অবশ্যই। প্রতিটি মুহূর্ত যেমন বদলে যায়, প্রতিটি দিন যেমন এক-একটি নতুন দিন, প্রতিটি বর্ষাকাল যেমন নতুন, প্রতিটি ফাল্গুন যেমন নতুন, জীবন যেমন প্রতি লগ্নে বদলে যায়। সো, সেই বদলের হাওয়া তো নতুন গল্প লেখার সময় অবশ্যই নতুন কিছু বলার জন্য।



অলাত এহ্সান : এই বইতে সাতটি গল্প আছে। গল্পগুলো কি কি বিষয়বস্তু নিয়ে লেখা?

রেজা ঘটক : সাতটি গল্পে সাত ধরনের বিষয় বস্তু। 'গাং পারাতি কয় আনা' গল্পের বিষয় আমার শৈশবের বলেশ্বরের খেয়ানায়ের কাদের মাঝি। বলেশ্বর নদে ব্রিজ হয়ে যাবার পর সেই খেয়ানাও উঠে গেছে। বলেশ্বর জনপদে একটা পরিবর্তন ঘটেছে। বলেশ্বর নদও মরে গেছে। এর সঙ্গে রাইসমিলের খুদবুড়ি (যিনি রাইসমিলে চাল ঝাড়ু দেন)কে ঘিরে একটা প্রেমের গল্প। 'চন্দ্রমণি' গল্পটি সাগরে মাছ ধরা কৈবর্ত সমাজের গল্প। 'ডিটেকটিভ' গল্পটি তো নামেই এর বিষয়বস্তু ধরা যায়। 'তিলোত্তমা মহাসড়ক' গল্পটি ঢাকা টু মংলা হাইওয়ে নিয়ে। এই হাইওয়ের কাজ যখন চলে, তখন আমি এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) এই প্রজেক্টের একজন মাঠ গবেষক হিসেবে কাজ করেছিলাম। সেই সময়ের অভিজ্ঞতা নিয়ে এই গল্পটি। যেখানে একটি হিন্দু পরিবার অসহায়ভাবে ভারতে চলে যায়। 'পঞ্চায়েত সভা' গল্পের ভেতরে আসলে পাঁচটি আলাদা গল্প। যার মধ্যে 'ণ ও ন' একটি চুরির গল্প। 'দপ্তরবিহীন' গল্পটি বর্তমান সময়ের টেলিভিশন টকশো নিয়ে একটি ব্যাঙ্গাত্মক গল্প। 'জনৈক হেকিম ও তার আশ্চার্য নির্বাচনী মলম' এটি বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে একটি হাসির গল্প। 'পাগলা বাবা' একটি রহস্যময় গল্প। আর 'সদানন্দ আচার্য সমাচার' প্রথম যৌবনে পদার্পণের একটি শ্লট, যেখানে সদানন্দ কেবলই আকাশ মুখস্থ করে। এই পাঁচটি গল্প মিলে 'পঞ্চায়েত সভা'। 'শালবনে কুয়াশা পূর্ণিমা' একটি কাল্পনিক গল্প। যেখানে ৮৭ দিন বাংলাদেশ শাসন করা এক শাসক, শালবনের ভেতর এক বাংলোতে বসে পূর্ণিমা রাতে বাল্যবন্ধুর কাছে সেই সময়ের স্মৃতিচারণ করেন। 'ক্ষেত্রপাল বিগ্রহ' গল্পটি পাবর্ত্য চট্টগ্রামের বৈসাবি উৎসব ও একজন পূজারীর খুন হবার সত্য ঘটনার ছায়া অবলম্বনে লেখা।



অলাত এহ্সান : আগে প্রকাশিত গ্রন্থের সঙ্গে এই বইয়ের গল্পগুলোর বিশেষ কি পার্থক্য আছে?

রেজা ঘটক : আমার প্রতিটি গল্পই অন্য গল্প থেকে স্বতন্ত্র। তাই এককথায় পার্থক্য বুঝানো কঠিন। 'বুনো বলেশ্বরী'তে গ্রামীণ জনপদের আধিক্য ছিল। 'সোনার কংকাল'-এ আবার নাগরিক জীবনের আধিক্য। 'সাধুসংঘ' তো সাধু ভাষায় লেখা। 'ভূমিপুত্র' আবার অন্য ধরনের এক্সপারিমেন্ট। আর 'পঞ্চভূতেষু'র কথা তো অনেকটাই বললাম। তবে 'ভূমিপুত্র' বইয়ে কিন্তু 'ভূমিপুত্র' গল্পটি নেই। ওই গল্পটি যাবে 'গল্পেশ্বরী'-তে। আমার গল্পে মিথ থাকে। মহাকাল থাকে। জীবনাচারের একেবারে শেকড়ের ধুলোমাটির গন্ধ থাকে। মাটি ও মানুষের জীবন সংগ্রামের গল্প থাকে। জীবনের হাসি-ঠাট্টা, কৌতুক, সুখ-দুঃখের বয়ান থাকে। মানুষের মুখ ও মুখোশের আড়ালের গল্প থাকে। আসল পার্থক্য বলতে কি শুনতে চান, তা মনে হয় আমার চেয়ে পাঠকই ভালো বলতে পারবে।



অলাত এহ্সান : আপনি কি কোনো নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু—ফর্ম নিয়ে লিখতে পছন্দ করেন বা দূর্বলতা আছে কি? লেখার ক্ষেত্রে আপনি কোনটাকে বেশি গুরুত্ব দেন?

রেজা ঘটক : সত্যি কথা বলতে কি গল্পের বিষয়বস্তু কখন কী হবে, ফর্ম কী হবে, মোটিভ কী হবে, ভাষায় কোনটা প্রাধান্য পাবে, এসব আমি লেখার সময় একদম মাথায় রাখি না। গল্পের প্রয়োজনে এসব অটোমেটিক যা যা আসে, তাই আমার গল্পের আইডেনটিটি। এসব ফর্ম-টর্ম দুর্বলতা নিয়ে আমি একদম মাথা ঘামাই না। এসব সাহিত্যের গবেষক-পণ্ডিতদের খুটিয়ে খুটিয়ে বের করার কাজ। সেটি আমার করারও কথা না। আমার কাজ গল্প লেখা। আমি শুধু গল্প নিয়েই ভাবি। চরিত্র নিয়ে ভাবি। এতোকাল কথাসাহিত্যিকেরা যত গল্প লিখলেন, তা আবার নতুন করে আমি কেন লিখব? আমি সবসময় নতুন কোন গল্প লেখার কথা ভাবি। সেখানে সেই গল্পের ফর্ম কেমন হবে তা তো জানি না ভাই। ঢিল ছুড়লে সেটি কোথায় গিয়ে পড়বে, কোনদিকে যাবে, কেমন উচ্চতায় যাবে, তা আগে কিভাবে বল? হাতে রক্ষিত কোনো ঢিলের চরিত্র যেমন আগেভাগে ঠিক করে দেওয়া যায় না, তেমনি আমার নতুন কোনো গল্পের বিষয়বস্তু বা ফর্ম কেমন হবে, তা আমি কিছুই জানি না। যে কারণে গল্প লেখার আগে আমার কাছে কিছুই গুরুত্ব পায় না। তবে হ্যা, আমার গল্পটি যখন আমি এডিট করি বা রিরাইট করি, তখন একজন দক্ষ এডিটর যা যা করতে চান, আমিও তখন সেই ভূমিকা পালন করি। তখন হয়তো কোনো ফর্ম-টর্ম হয়। যা হয়তো আমি একদম বুঝি না। যা নিয়ে হয়তো আমার চেয়ে একজন ভালো এডিটরই ভালো বলতে পারবেন।



অলাত এহ্সান : গল্পগুলোতে আপনি কি বলতে চেয়েছেন, মানে কোনো বিশেষ বিষয়কে উপস্থাপন বা মেসেজ দিতে চেয়েছেন কি না?

রেজা ঘটক : আমার প্রতিটি গল্পেই বিশেষ কোনো মেসেজ থাকে। বিশেষ একটি উদ্দেশ্য নিয়েই গল্পটি বলি বা লিখি। অনেক সময় সেই মেসেজটি পাঠক চট করেই ধরতে পারেন না। এটা হয়তো আমার দুর্বলতা। কিন্তু যদি কোনো নিবিঢ় পাঠক খুব মনযোগ দিয়ে আমার গল্প পড়েন, তিনি হয়তো সেই বিষয়টি ধরতে পারেন। গল্পটি পড়ার পর যদি পাঠকের মনে প্রশ্নই না জাগে, তাহলে তো মনে হয় গল্পটি না বলাই ভালো। পাঠকের মনে এক রহস্য তৈরি হবে। সেই রহস্যের জাল ভেদ করাও পাঠকের দায়িত্ব বলে মনে করি।



অলাত এহ্সান : এই সময়ের প্রকাশিত অন্যদের গল্পের সঙ্গে আপনার গল্পের পার্থক্য কিভাবে করেন?

রেজা ঘটক : প্রত্যেকের গল্প বলার ঢঙ আলাদা। চরিত্র আলাদা। উপস্থাপন ভঙ্গি আলাদা। গল্পও আলাদা। আমার মনে হয়, এই পার্থক্যটা আসলে কোথায় কিভাবে, তা পাঠকই ভালো জানেন। আমি কখনো এই পার্থক্য নির্নয়ে যাই না।



অলাত এহ্সান : বইতে অনেকগুলো গল্প আছে। তার মাঝ থেকে কোন গল্পটি নাম গল্প হিসেবে নির্বাচন করেন? অথবা, (যদি নাম গল্প না থাকে) সাধারণত আমরা দেখি নামগল্প বা গল্পগুলোর অভ্যন্তরিণ মিল বা বিষয়বস্তু থেকে বইয়ের নাম নিয়ে থাকেন। আপনার বইতে কোনো নাম গল্প নেই, বইয়ের এই ‘পঞ্চভূতেষু’ নাম দ্বারা আপনি কি বোঝাতে চেয়েছেন?

রেজা ঘটক : আমার গল্পের বইয়ের নাম নির্বাচনের ক্ষেত্রে আমি শেষ সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করি। যেমন 'বুনো বলেশ্বরী', 'ভূমিপুত্র' এবং 'পঞ্চভূতেষু'র বেলায় কোনো নাম গল্প নেই। আবার 'সোনার কংকাল' ও 'সাধুসংঘ' বইতে নামগল্প আছে। 'সাধুসংঘ' বইয়ের ভেতরের গল্পটির নাম কিন্তু 'গাল-গপ্পো-গান-উদ্যান অথবা সাধুসংঘ'। এটি আসলে ঠিকঠাক ব্যাখ্যা করা খুব কঠিন। ওই সময়ে আমার যেটি মনে হয়েছে, যেটি সঠিক মনে করেছি, সেভাবেই নাম নির্বাচন করেছি। বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল রাখার চেষ্টা করেছি কিনা বলতে পারব না। 'পঞ্চভূতেষু'নামটি পঞ্চভূত থেকে নেওয়া। আমরা কোথাও আবেদন করলে যেমন শেষে লিখি সমীপেষু, বন্ধুকে চিঠি লেখার সময় যেমন লিখি বন্ধুবরেষু, এই যে শব্দের শেষে একটা 'ষু' দিয়ে আমরা বিশেষ কিছু বোঝাতে চাই, পঞ্চভূতের উদ্দেশ্যে আমার গল্পগুলো এক ধরনের নিবেদন। তাই পঞ্চভূত-এর সাথে আমি একটা 'ষু' যোগ করেছি। তা দিয়ে সত্যিই কিছু বোঝা যায় কিনা আমার আসলে জানা নেই।



অলাত এহ্সান : গল্প লেখার জন্য ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উৎস। একটি ঘটনা বা অভিজ্ঞতা কি করে আপনি গল্পে রূপান্তর করেন? গল্পগুলোতে আপনার ব্যক্তিগত ছাপ কিভাবে এসেছে?

রেজা ঘটক : একবার লোকাল বাসে ঢাকা থেকে সিরাজগঞ্জ গিয়েছিলাম। গাজীপুর চৌরাস্তা থেকে একদল মুরগিবিক্রেতা সেই বাসে উঠলেন। তাদের সঙ্গে মুরগি ছিল। কিছু মুরগির খাঁচা বাসের ছাদে তোলা হল। কিছু বাসের ভেতর ওঠানো হল। তাদের কয়েকজন ছাদে উঠলেন, কয়েকজন বাসের ভেতরে রড ধরে দাঁড়ালেন। মুহূর্তে গোটা বাস মুরগির গন্ধে ভরে গেল। এখন এই ঘটনার আমি প্রত্যক্ষ সাক্ষি না হলে চলন্ত বাসের ভেতরে মুরগির গন্ধ কেমন তা কিন্তু বুঝতাম না। এমনিতে আমি গ্রামের পোলা। নিজেও মুরগি পালতাম। কিন্তু দীর্ঘদিন শহরে থাকার কারণে মুরগির সেই গন্ধ কিন্তু হুট করেই আমার মনে পড়ার কথা না। অবশ্যই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা গল্প লেখার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ উৎস। সেই উৎস কে কতোটা দক্ষভাবে গল্পে প্রয়োগ করতে পারেন, সেটাই দেখার বিষয়। এখন সিরাজগঞ্জ যাবার সেই বাস নিয়ে যদি আমি কোনো গল্প লিখি, সেখানে ব্যক্তিগত ছাপ বোঝা গেলেও কোনো চরিত্রে আমি যদি তা আরোপ করি, তা কিন্তু পাঠকের পক্ষে বুঝে ওঠা মুশকিল। যেমন সেই লোকাল বাসের ভিড়ের ভেতর একজন লুঙ্গি পড়া লোক তার লেওড়া দিয়ে বারবার আমার ঘাড়ে ঘষা দিচ্ছিলেন। এখন সেই লেওড়ার ঘষার অনুভূতি যদি আমি অন্য কোনো চরিত্রের মধ্যে প্রয়োগ করি, তা কিন্তু পাঠকের পক্ষে চট করেই বুঝে ওঠা কঠিন। এখন যখনই আমি সেই লোকাল বাসটি কল্পনায় আনার চেষ্টা করি না কেন, আমার কিন্তু সারা পথের সব ঘটনা মুহূর্তে ফ্ল্যাশব্যাকের মত সাঁই সাঁই করে মনে পড়বে। গল্পের খাতিরে সেখান থেকে যা যা রসদ আমার দরকার হবে, তা গল্পে প্রয়োগ করার জন্য আমার তো কোনো কষ্টই হবে না। এখানে অভিজ্ঞতা অবশ্যই একটা বিশাল ফ্যাক্টর।



অলাত এহ্সান : গল্প উপস্থাপনের ক্ষেত্রে আপনি কি মেটাফোর, নিজস্ব শব্দ তৈরি করেন। তা কি রকম?

রেজা ঘটক : অবশ্যই। গল্পের দৃশ্যায়নের প্রশ্নে যদি কোনো শব্দ তৈরি করা প্রয়োজন হয়, আমি তা অনায়াসে বানাই। যেমন ধরুন, বর্ষাকাল। ছোট ছোট একদল বালক গ্রামের কোনো একটা রাস্তার পাশে ফাঁকা মাঠে ফুটবল খেলছে। তার সামনেই রাস্তার উল্টাপাশে একটা মুদি দোকান। দোকানের পেছনে গভীর নালা। দোকানের পঞ্চাশোর্ধ বয়স্ক মালিক যখন একজন ক্রেতার জন্য চিনি মাপছিলেন, ঠিক তখনই দূর থেকে কিক নেওয়া ফুটবলটি ঠিক গোল না হয়ে, দোকানের ভেতর গিয়ে দোকানির হাতের দাড়িপাল্লায় আঘাত করে গড়িয়ে গড়িয়ে দোকানের পেছনের দরজা দিয়ে সেই নালায় গিয়ে পড়ল! এখন এই দৃশ্যের পর বালকদের অনুভূতি কী হবে? আর ওই বয়স্ক দোকানি কি করতে পারে? প্রথমে দোকানি একটা খেস্তি তো মারতেই পারে। সেটি যদি এমন হয়- 'হাউগার পোরে ধরইগা আন ভইরগা দি...' এখন দোকানির এই খিস্তিখেউরটা প্রয়োগ করার সময় আমি হয়তো লোকাল অরজিনাল টিউনটা বোঝাতে মেটাফোরের প্রয়োগ করব। এটা যতটা কাছাকাছি প্রয়োগ করা যাবে, পাঠক ততটা মজা পাবেন বলেই আমার ধারণা। একটু খেয়াল করলে দেখবেন, এখানে বিশেষভাবে 'গা'যোগ করার উপর জোর দেওয়া হয়েছে। এখন কার সাধ্য ওই বুড়ো যতোক্ষণ দোকানে থাকে, তার উপস্থিতিতে সেই ফুটবল টোকাতে দোকানের নিচে ঢু মারবে? অতএব লিলিপুটদের খেলা কিন্তু তখন অটোমেটিক বন্ধ হয়ে যাবে।



অলাত এহ্সান : প্রায় সব গল্পেই তো কোনো না কোনো অনুসন্ধান থাকে। যেমন- আত্ম, নৃ-তাত্ত্বিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, মেট্রপলিটন, দার্শনিক ইত্যাদি। আপনি কোন ধরনের অনুসন্ধানে গল্প তৈরি করেন?

রেজা ঘটক : এটা ডিপেন্ড করে গল্পের চাহিদার উপর। যেমন ধরুন, উপরের বলা গল্পে আসলে কি কি বিষয় বোঝানো সম্ভব? আত্মজনিক। কিভাবে? আমি যদি সেই লিলিপুটদের কেউ হয়ে যাই, তাহলে সেটা আত্মজার মত ব্যাপার। পাশাপাশি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক চিত্র তো এখানে সুস্পষ্ট। এখন ওই দোকান ও দোকানির টোটাল চেহারা, তার জীবন, জীবনাচার, ইত্যাদিও এই গল্পে প্রয়োগ করা সম্ভব। যেমন ধরুন, ওই বুড়ো যখন হাটু ভেঙে বসেন, তখন লুঙ্গির ফাঁক দিয়ে তার টলটলে বিচি যদি লিলিপুটদের কেউ আচমকা দেখে ফেলে, তার মনের অবস্থা কি হবে, বলুন? নৃ-তাত্ত্বিক বা প্রত্নতাত্ত্বিক হওয়ার জন্য তো ওই লিলিপুটদের কারো একটা দুষ্টু চাহনিই যথেষ্ঠ, নাকি!!! তো এখানে গল্পটি কোন দিকে যাবে, গল্পটি কোথায় কিভাবে শেষ হবে, তার একটা আলটিমেট ম্যাটার থেকে এর দর্শন বোঝার জন্য কারো ফিলোসফার হবার দরকার আছে বলে মনে করি না। গল্পই পাঠককে এর সকল রসদ বুঝিয়ে দেবে। ঘটনা সামান্য। ফুটবলে একটা মাত্র কিক। কিকটা কিন্তু গোল হয়নি। বাট, বলটি গিয়ে বুড়োর পালা উল্টে দিল। এখন পালা উল্টে না দিয়ে বলটি যদি বুড়োর বিচিতে লাগতো? বুড়োর কাছে চিনি কিনতে যাওয়া মানুষটা যদি পঁচিশ-ত্রিশ বছর বয়সি কোনো গ্রামীণ মহিলা হয়? তখন? হঠাৎ বুড়োর বিচিতে এমন বল লাগার পর তার কি সত্যি সত্যি কোনো হুস থাকবে? তখন যদি বুড়ো বিচি সামলাতে গিয়ে ওই মহিলাকে লেওড়া দেখিয়ে ফেলে? আমরা কী বুড়োকে দোষ দিতে পারব? ঘটনার পরম্পরা এখানে কিভাবে ঘটল, সেটাই আসল ব্যাপার। গল্পের চাহিদার সঙ্গে তার প‌্যাটার্ন-ই সব বলে দেবে, কি হওয়া উচিত। আমি এখানে ঘটনার অনুসঙ্গ পরম্পরার দিকেই বেশি নজর দেব। ঘটনা যেভাবে ঘটবে, তার উপর আমি গল্পে মোচড় দেবার চেষ্টা করব।



অলাত এহ্সান : আপনার গল্পগুলোকে কি কোনো বিশেষ ধারা বা ঘরাণার-যেমন মার্কসবাদী, জীবনবাদী, নারীবাদী, ফ্রয়েডিয়, অস্তিত্ববাদী ইত্যাদি বলে মনে করেন?

রেজা ঘটক : আমি ধারাপাত শিখেছিলাম ছোটবেলায়। মার্ক্স, ফ্রয়েড, দর্শন এগুলো বড় হয়ে পড়েছি। গল্পের সঙ্গে আমি এসব বাদ-বিবাদে বিশ্বাস করি না। এগুলো ভাষা সাহিত্যের পণ্ডিতগণ ভালো বলতে পারবেন। আমার গল্প কোন ঘরাণার তা আমি জানি না। কারণ আমি কোনো ঘরাণার হয়ে গল্প লিখি না। গল্প যেভাবে আগায়, গল্পের প্রয়োজনে আমি শুধু তার পায়ে পায়ে যাই। তবে আমি জীবনমুখী গল্প লিখতেই পছন্দ করি। জীবনের স্পন্দন না থাকলে সেসব গল্পকে আমার মৃত মাছের মত লাগে। এখন যদি আমি জীবাশ্ব নিয়ে কোনো গল্প লিখি, তা ঠিক কোন ঘরাণায় যাবে তা এখন বলা কঠিন। আমি এসব ঘরাণার ধার ধারি না মোটেই।



অলাত এহ্সান : আমরা দেখি বাংলা সাহিত্যে উত্তারাধিকারের ধারা বহন করেছেন অনেক লেখক। আপনি নিজেকে কোনো সাহিত্যিক/সাহিত্যধারার উত্তরাধিকারী মনে করেন?

রেজা ঘটক : অবশ্যই আমি আমার পূর্ব-পুরুষদের বংশজাত। এখন যদি আপনি গোটা সাহিত্যিক সমাজকে একটা গোত্র মনে করেন, তাহলে আমি সেই গোত্রের একজন নবীন সদস্য। আমি হয়তো মালকোছা দিতে গেলে পাছার নলি বের হয়ে থাকবে। যতোই বয়স বাড়বে ততই আমি কাছা দেওয়ার ক্ষেত্রে দক্ষ হয়ে উঠব। একেতো আমি কৃষক পিতার সন্তান। ছোটবেলায় হুক্কা দিয়েই আমার ধূমপানে হাতেখড়ি। এখন আমি শহরে যতোই জুতা মারাই না কেন, দিন শেষে পা দিয়ে কিন্তু কাদার গন্ধ বের হবে। সেই হিসেবে আমি গোটা সাহিত্যিক গোত্রের উত্তরাধিকার। কিন্তু ঠিক কোন সাহিত্যিকের তা আমার পক্ষে বলা মুশকিল। তবে নাগরিক সাহিত্যিকের অবশ্যই নয়। ছোটবেলায় আমিও ছিলাম নাইয়ার খালের একজন সুদক্ষ কৈবর্ত। কৈশোরে বনেবাদারে ঘুরেছি অনেক। এখনো সময় পেলে ঘুরি। কোনো ধারা-টারার মধ্যে আমি পড়ি না আসলে। আমি আমার মত নতুন একটি ধারা। সেই ধারা হয়তো নাইয়ার খালের চেয়েও ক্ষুদ্র একটি আঁকাবাঁকা পথ। সেটি এখন কোন গঙ্গায় গিয়ে মিশবে, আমার জানা নেই।



অলাত এহ্সান : বাংলা সাহিত্যে এখন উত্তরাধুনিক সাহিত্যের নামে একধরনের সাহিত্য চর্চা হচ্ছে, এতে ব্যক্তি স্বাতন্ত্রকেই প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। তাই প্রত্যেক গল্পকার তার স্বাতন্ত্র নিয়ে ভাবেন, এটা অবাঞ্চিত কিছু নয়। এই ব্যক্তি স্বাতন্ত্র আমাদের সাহিত্যের কি রূপ দিচ্ছে?

রেজা ঘটক : সত্যি বলতে কি আমি আধুনিক আর উত্তরাধুনিক এই কুতর্কে যাই না কখনো। কাকে আপনি আধুনিক বলবেন? জুলেভার্ন সেই কোনকালে ৮০ দিনে চন্দ্র ঘুরে এসেছেন। হেমিংওয়ে সেই কতকাল আগে একটা ছোট্ট ডিঙ্গি নিয়ে বহির্সমুদ্রে মাছ ধরেছেন।বিভূতিভূষণ সেই কবে পাহাড়ের অলিগলি বন-জঙ্গল চষে বেড়িয়েছেন। আমরা কতোটা আর মারাতে পারছি? এসব ছাপিয়ে গেলে তারপরে না আসবে উত্তরাধুনিকতার প্রশ্ন!! প্রত্যেকটা মানুষ আলাদা স্বভাবজাত। যতই আমরা জিনের দোহাই টানি না কেন, পৃথিবীর সাড়ে সাতশো কোটি মানুষ সাড়ে সাতশো টাইপের। কারো হয়তো কারো সাথে কিছু কিছু মিল পাওয়া যাবে। কিন্তু প্রত্যেকই স্বাতন্ত্রসত্ত্বা। আপনার মত হুবহু কোনো দ্বিতীয় মানুষ পৃথিবীতে খুঁজে পাওয়া যাবে না। আমার মতও দ্বিতীয় কেউ পৃথিবীতে নেই, এটা আমি জানি। সে হিসেবে প্রত্যেকই স্বতন্ত্র। এই স্বতন্ত্রসত্ত্বা সাহিত্যের জন্য বরং উপকারী বলেই আমি মনে করি। এতে বহুমাত্রিক একটা যোগসূত্র তৈরি হবার সুযোগ থাকে।





অলাত এহ্সান : সাহিত্যের দশক বিচার প্রচলিত আছে। আপনি আপনার দশককে কি ভাবে উপস্থাপন বা চিহ্নিত করছেন?

রেজা ঘটক : আমার অত্যন্ত প্রিয় কবি, কিউবার জাতীয় কবি জোসে জুলিয়ান মার্তি একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। পৃথিবীতে অর্জিত সকল সাফল্যকে একটি ক্ষুদ্র শস্যদানার মধ্যে পুতে ফেলা সম্ভব। সেখানে এই মহাকাল, যার আমরা আগামাথা কিছুই জানি না। শুরু কোথায়, শেষ কোথায় কিছুই জানি না। সেখানে দশকের নিক্তি নিয়ে যারা হাগামোতা করেন, আমি তাদের সঙ্গে নেই। আমার জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত গোটা সময়কে আপনি মহাকালের বিচারে কিভাবে হিসাব করবেন? সেখানে আমি তুচ্ছাতি তুচ্ছ এক অতীব গাড়ল মাত্র। এসব দশক টশোক মারানোর সময় নাই আমার। আমি আমার জীবনকাল পাড়ি দিচ্ছি। যার সমাপ্তি ঘটবে আমার দম যখন বন্ধ হবে, তখন, ব্যাস।



অলাত এহ্সান : একটা বই প্রকাশ করা আর একটা ভাল গল্প লেখা, কোনটা আপনাকে বেশি তৃপ্তি দিবে?

রেজা ঘটক : অবশ্যই একটা ভালো গল্প লেখা আমাকে বেশি স্বস্থি দেবে। বই প্রকাশ এখন এক ধরনের টর্চার। আমাদের প্রকাশকরা এখনো তেমন প্রফেশনাল হয়ে ওঠেনি। প্রকাশনার যে কোনো পর্যায়ে লেখক একটু অনুপস্থিত থাকলে বা বেখেয়াল হলেই মারাত্মক সব ভুলভাল থেকে যায় বইয়ে। যা আমাকে খুব পিড়া দেয়। গুয়ানতানামো বে থেকে ভাগ্যগুণে ফিরে আসা কোনো কয়েদির মনের অবস্থা যা হয়, আমাদের প্রকাশকদের কাছ থেকে একটি বই প্রকাশের পর তেমন অনুভূতি হয় আমার। মনে হয় এ বছরের মত অন্তত প্রাণটুকু নিয়ে ফিরে আসা গেল। একেবারে টাটকা ঘটনা বলি একটা। এবার ফেব্রুয়ারির ২ তারিখে আমি আমার 'মুজিব দ্য গ্রেট' বইটি যে প্রকাশকের করার কথা, তার কাছ থেকে উড্র করতে বাধ্য হয়েছি। তিনি দেশের একজন নামকরা নেতাগোছের প্রকাশক। লেখকের লেখা বিক্রি করেই কিন্তু এরা সবাই লাটগিরি মারায়। এখনো সঠিক বাক্য লিখতে জানে না এমন সব লেখকদের নিয়ে মিডিয়াকে সাথে করে এরা বকোয়াজ করে বেড়ায়। আর এরাই যখন একজন প্রকৃত লেখকের হাজার রাতের অজস্র স্বপ্নকে একফুঁতে না বলে উড়িয়ে দিতে চায়, তখন এদের থেকে ভারী কষ্ট পেয়ে চলে আসতে হয়। দেশের বিখ্যাত সেই প্রকাশককে আমি মুখের উপর না বলতে পারিনি বটে। কিন্তু মাত্র ত্রিশ গজ হেঁটে পাঁচ মিনিটের মধ্যেই আমার বইয়ের জন্য প্রকাশক রেডি করতে পেরেছিলাম। এই অনাকাঙ্খিত ঘটনায় আমার ভেতরে যে পিড়ন হয়েছে,তার জন্য বাকি জীবনে আমি আর ওই প্রকাশকের ছায়াও মারাতে চাই না। যে কারণে আমার গল্পের বইটি বের করার মত মানসিক প্রস্তুতি আমার ভেঙ্গে যায়। কারণ গল্পের বইটির প্রকাশক রেডি ছিল। কিন্তু আমার দুইটি গল্পের এডিটিং তখনো শেষ হয়নি। তাই বই প্রকাশে আমার সত্যিকার অর্থেই কোনো তৃপ্তি আসে না। বরং মনের ভেতর নানান প‌্যাচাল শুরু হয়। কোথায় কি ভুলটুল রয়ে গেছে কে জানে? এই উৎকণ্ঠায় আমাকে পেয়ে বসে। কারণ, প্রকাশনা শিল্পে আমাদের প্রফেশনাজিম নেই। ভালো সম্পাদক নেই। এখানে লেখককেই সম্পাদনার যা করার করতে হয়। এটা আমাদের সাহিত্যের জন্য খুব বাজে একটা দিক। সরকারিভাবেও এদিকটায় কোনো আগ্রহ নেই। আমাদের বড় বড় লেখকদেরও এটা নিয়ে কথা বলতে দেখা যায় না। যে কারণে আমাদের অনেক ভালো ভালো নতুন প্রজন্মের কবি-লেখকরা প্রকাশনা শিল্পের এই প্রফেশনাজিমের চণ্ডালি দশার কারণে এক সময় হারিয়ে যায়। আর আমাদের মিডিয়ার মুর্খরা সবসময় ভুল লেখককে নিয়ে মাতামাতি করে। এটা আমাদের সাহিত্যের জন্য একটা বড় দুঃসময়। আমাদের দৈনিকগুলোর যারা সাহিত্য সম্পাদক, তারা নিজেরা কতোটা সাহিত্য বোঝে? তাদের পছন্দ-রুচিবোধই তো মান উত্তীর্ণ হয়নি। এরা নিজেদের মনে করে এক একজন বাংলা সাহিত্যের তুঘলক। এদের দিয়ে বাংলা সাহিত্য আতুরঘরেই মার খাচ্ছে। যারা কেবল এদের তেল মারতে পারেন, তাদের অখাদ্য অসাহিত্যই শুক্রবারের সাহিত্যপাতায় বিকোয়। শুধু বাংলা সাহিত্যে পড়াশুনা করলেই যেমন ভালো সাহিত্যিক হওয়া যায় না। তেমনি সাহিত্যপাতার সম্পাদক হলেই যে তিনি সাহিত্যের তুঘলক বনে যাবেন, এটা মানা যায় না। তাই বাংলাদেশে প্রকৃত কবি-লেখকরা পদে পদে হুচোট খাচ্ছে। নতুন প্রজন্মতো প্রতি পদে পদে এই বাধার সামনে পড়ছে। ফলে বই প্রকাশে তৃপ্তি পাবার প্রশ্ন ওঠে কিভাবে?



অলাত এহ্সান : পরবর্তী বই নিয়ে আপনার কি চিন্তা?

রেজা ঘটক : পরবর্তী বই নিয়ে আমার চিন্তা এতো ছোট পরিসরে বলার সুযোগ নেই। সরি।



অলাত এহ্সান : আপনার না লেখা কোনো গল্প আছে, যা আপনি লিখতে চান?

রেজা ঘটক : না লেখা গল্পগুলো মৃত্যুর আগ পর্যন্ত যতটা পারি লিখতে চাই। আসলে গোটা জীবনভর আমি হয়তো একটা গল্পই লিখে চলেছি। যা দিয়ে আমাকে হয়তো বোঝা যাবে। আর না বলা সেই গল্পটি অবশ্যই লিখতে চাই। অবশ্যই।



অলাত এহ্সান : এক বসায় গল্প লেখেন না ধীরে ধীরে, কেঁটে-ছিড়ে লিখে থাকেন? আবার গল্পটা কি আগে ভেবে লিখতে বসেন, নাকি লিখতে লিখতে ভাবেন?

রেজা ঘটক : না, এক বসায় কখনো আমার গল্প লেখা হয় না। কখনো হয়তো থিমটা লিখে রাখি। কখনো হয়তো গল্পের শুরু লিখি। এক বসাতে অনেক আগে লিখতাম। কিন্তু সেসব গল্প যখন আমি এডিট করতে যাই, দেখি অনেক সময় তা বদলে যায়। বা পুরো গল্পটাই বাদ দেই। আমি খুব খুতখুতে স্বভাবের। নিজের গল্পের নিজেই সবচেয়ে কড়া সমালোচক। নিজের পছন্দ না হওয়া পর্যন্ত তা নিয়ে কাঁটা-ছেড়া চলতে থাকে। গল্পটি যখন আমার মাথায় আসে, তখন নিজের সঙ্গে একটা যুদ্ধ ঘোষণা করি। নিজেকে পক্ষে-বিপক্ষে দাঁড় করিয়ে ভাবি। একসময় গল্পটি যখন যুক্তিতর্ক উতড়ে একটা স্পষ্টভাব ফুটে ওঠে, তখনই লিখতে বসি। আমার লেখার মুড না আসা পর্যন্ত ওটা আমার মাথায়ই কেবল ঘুরপাক খায়। অনেক সময় ঘুরপাক খেতে খেতে গল্পটি হারিয়েও যায়। আমার অনেক গল্প মগজের এমন ঝড়-তুফানের ভেতর হারিয়ে গেছে। যেগুলো সেই ঝড়-তুফান কাটিয়ে কাগজে লিপিবদ্ধ হয়, সেগুলো নিয়েই পরে এডিট করার সুযোগ আসে। লিখতে লিখতে ভাবার ব্যাপারটা ঠিক আমাকে দিয়ে হয় না। যা ভাবার আগেই ভেবে নি।



অলাত এহ্সান : গল্প লেখার কোনো অতৃপ্ততা আছে কি?

রেজা ঘটক : বলতে পারেন পুরোটাই অতৃপ্তি। অতৃপ্তি আছে বলেই এখনো লেখার চেষ্টা করি। যেদিন আর অতৃপ্তি থাকবে না, সেদিন হয়তো আমার কলম থেমে যাবে। আমার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করবে। তখন আর আমি হয়তো লিখতে পারব না।



অলাত এহ্সান : আজকের দিনে সবাই যখন উপন্যাসের দিকে ঝুঁকছে, আপনি সেখানে ছোটগল্পকে কিভাবে দেখছেন?

রেজা ঘটক : ঝোঁকার চেয়ে আমার কাছে ব্যাপারটা অনেকটা প্রাকটিসের মত। আমি নিজেও উপন্যাস লেখার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করছি। যখন আর গল্প লেখায় মন থেকে সায় পাব না, তখন হয়ত শুধু উপন্যাস লিখব। আমার ধারণা, গল্প লেখার চেয়ে উপন্যাস লেখা অনেক সহজ। কিন্তু উপন্যাসে একটা বড় সময় ধরে নিজেকে বন্দি রাখার মত ব্যাপার আছে। অনেকগুলো চরিত্র। অনেক বড় ক্যানভাস। এটা থেকে অন্য কোথাও মন সরলেই একটা ছন্দপতন ঘটার কথা। ছোটগল্প হল কথাসাহিত্যের নিউক্লিয়াস। যতই গভীরে যাই মধু। যতই বাইরে আসি দহন। এককথায় ছোটগল্প কথাসাহিত্যের আত্মা।



এহ্সান : গল্পের আঙ্গিক-ভাষা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা সবসময়ই হয়েছে। নবীন-প্রবীন, সবার ভেতরই এখন অনেক বেশি দেখা যায়। এটা যেমন আন্তর্জাতিক প্রভাব, তেমনি স্বপ্রণোদনাও আছে। আমরা অনেক সময়, শুধুমাত্র শব্দের উচ্চারণগত পার্থক্য ছাড়া তেমন কিছুই পাই না। আবার গল্পের ভাষার সঙ্গে কাব্যভাষার তেমন তফাৎ থাকছে না। বলা হচ্ছে সময়ের প্রয়োজনে। কেউ কেউ আবার এটাকে পুরোপুরি রহিত করতে চান। বর্তমান সময়ে গল্পের এই ভাষাগত, আঙ্গিকের যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা তা কিভাবে দেখছেন? এর মধ্যে অগ্রসর রূপ কোনটি? আপনার কাছে গল্পের ভাষা কেমন?

রেজা ঘটক : যতদিন গল্প লেখা হবে, যতজন গল্প লিখবেন, ততদিন ততজন গল্পে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবেন। এটাই স্বাভাবিক। এখানে আন্তর্জাতিক বা আঞ্চলিক বলে কোনো ব্যাপার নেই। আমার একেবারে শিকড়ের গল্পটি যখন আমার মনের মত লিখতে পারব, সেটাই হবে প্রকৃত গল্প। নিজের ভাষায় নিজের আত্মজাকে প্রকাশ করতে পারলেই তা একসময় আন্তর্জাতিক হবার জন্য উন্মুক্ত হবে। গোর্কি কিন্তু আমার ভাষায় আমার আঞ্চলিক গল্পটি লেখেননি। নাগিব মাহফুজ কিন্তু ইজিপ্টের বাইরের কোনো ল্যাটিন গল্প শোনাননি। এমন কি চিনুয়া অ্যাচেবে কিন্তু আফ্রিকার বাইরের কোনো গল্প শোনান না। অথচ তারা সবাই কিন্তু আন্তর্জাতিক খ্যাতি পেয়েছেন। পরীক্ষা-নিরীক্ষা না হলে উন্নত স্তরে যাবার পথ তৈরি হবে কিভাবে। একজন লেখক নিজেই যখন তার নিজের সামর্থের সেই উচু স্তরটা বুঝতে পারেন, তখন তিনি হয়তো সেখানে থেকেই বাকি কাজগুলো করে যান। গল্পের ভাষা কেমন, ব্যাপারটা আমার কাছে ঠিক ক্লিয়ার না। আমি তো গল্পের দাবি মেটাতে যে ভাষা প্রয়োজন মনে করব, সেটাই হবে সেই গল্পের ভাষা। নতুবা তো ন'ঘা মাগালেও যা, ছ'ঘা মাগালেও তা।



অলাত এহ্সান : ভাল গল্প বলতে আপনি কোনগুলোকে বোঝেন, মানে আপনার চোখে কোন গল্পগুলো ভাল? আপনার সমসাময়িক সাহিত্যিকদের মধ্যে কার কার সাহিত্য আপনার ভাল লাগে, নতুন কারা ভাল করছেন?

রেজা ঘটক : যে গল্পটি একবার পাঠের পর হাজারো চেষ্টা করেও ভুলে থাকা সম্ভব না, সেটিই আমার কাছে একটি ভালো গল্প। একটি ভালো গল্প পাঠের পর আমার ভেতরে অসংখ্য প্রশ্ন তৈরি হয়। নিজেই সেসব প্রশ্নের জবাব দেই। আবার নিজেই সেসব তর্কের ভেতরে নতুন প্রশ্ন খুঁজে বের করি। এটা অনেকটা একাএকা বিড়বিড় করার মত ব্যাপার। কিন্তু একটা ভালো গল্প কিছুতেই পাঠক ভুলতে পারেন না বলেই আমার বিশ্বাস। অনেকের টা ভালো লাগে। আমার অগ্রজ-সমসাময়িক-অনুজ অনেকেই ভালো লেখেন। আমি নাম উল্লেখ করে কাউকে বিব্রত করতে চাই না। নতুন অনেকেই ভালো গল্প লিখছেন। তাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার দিকে আমার গোপনে গোপনে সুতীব্র নজরদারি আছে। সরি, আমি সবগুলো প্রশ্নের জবাব দেবার মত শারিরীক স্বস্থিতে নেই। অন্য সময় হয়তো বাকি প্রশ্ন নিয়ে কখনো আলাপ হবে। ধন্যবাদ আপনাকে।







লেখক পরিচিতি

রেজা ঘটক:

জন্ম: ২১ এপ্রিল ১৯৭০ (৮ বৈশাখ ১৩৭৭), উত্তর বানিয়ারি, নাজিরপুর, পিরোজপুর। পড়াশুনা অর্থনীতি শাস্ত্রে। নেশা ও পেশা লেখালেখি। শখ শিশুদের জন্য চলচ্চিত্র বানানো।

প্রকাশিত বই:

গল্প সংকলন: ১. বুনো বলেশ্বরী (২০০৮), ২. সোনার কংকাল (২০১০), ৩. সাধুসংঘ (২০১১), ৪. ভূমিপুত্র (২০১৩), ৫. পঞ্চভূতেষু (২০১৪), ৬. গল্পেশ্বরী (প্রকাশিতব্য)।

উপন্যাস: মা (২০১২)।

গদ্য/সমালোচনা: শূন্য দশমিক শূন্য (২০১১)।

জীবনীসাহিত্য: বঙ্গবন্ধুর সংক্ষিপ্ত জীবনী: মুজিব দ্য গ্রেট (২০১৫)।

কিশোর গল্প: বয়ঃসন্ধিকাল (২০০৫)।

শিশুতোষ গল্প: ১. ময়নার বয়স তেরো (২০০৩), ২. গপ্পো টপ্পো না সত্যি (২০১১)।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন