সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০১৫

উইলিয়াম ফকনারের সাক্ষাৎকার : গল্পের শৈলী

ইন্টারভিউ নিয়েছেন জীন স্টীন

অনুবাদ : নৃপেন্দ্রনাথ সরকার

উইলিয়াম ফকনার ১৮৯৭ সালে জন্ম গ্রহন করেন মিসিসিপি অঙ্গরাজ্যের নিউ এলব্যানিতে। প্রপিতামহ “The White Rose of Memphis” এর গ্রন্থকার ছিলেন এবং তাঁরই প্রতিষ্ঠিত রেলপথে বাবা কন্ডাক্টর হিসেবে কাজ করতেন। সহসাই তাঁদের পরিবার পয়ত্রিশ মাইল দূরে অক্সফোর্ড নামক জায়গায় চলে যায়। যুবক ফকনারের বই পড়ার প্রতি এত ঝোঁক ছিল যে স্থানীয় উচ্চবিদ্যালয় থেকে তিনি পাশই করতে পারলেন না। ১৯১৮ সালে তিনি কানাডীয় রাজকীয় বিমান বাহিনীতে যুক্ত হন। বৎসরাধিক সময় তিনি ওলে মিস বিশ্ববিদ্যালয়ে্র বিশেষ ছাত্র ছিলেন। তারপর বিশ্ববিদ্যালয় স্টেশনে পোস্টমাস্টার হিসেবে কাজে যোগদান করেন। কিন্তু কাজে ফাঁকি দিয়ে পড়ার কারণে তিনি চাকুরীচ্যুত হন।


শেরওড এন্ডার্সনের উৎসাহে ১৯২৬ সালে তিনি “Solder’s Pay” লেখেন। তারপর তিনি লিখেন “Mosquitoes” (1927), “Sartoris” (1929),‌ “The Sound and the Fury”(1929), এবং “As I Lay Dying” (1930)। কিন্তু এই বইগুলো থেকে সংসার চালানোর মত তেমন অর্থ তিনি পাননি। তিনি স্বীকার করেন আর্থিক নিরাপত্তার জন্যই ১৯৩১ সালে “Sanctuary” লিখেন। এটি একটি হৃদয়গ্রাহী এবং অত্যন্ত জনপ্রিয় বই ছিল।

এর পর নিয়মিত উপন্যাস বেরোতে থাকে। সবগুলোকে “Yoknapatawpha saga” নামে পরিচিত যেমনঃ “Light in August ”(1932), “Pylon” (1935), “Absalom, Absalom!” (1936), “The Unvanquished” (1938), “The Wild Palms” (1939), “The Hamlet” (1940), এবং “Go Down, Moses, and Other Stories” (1941). দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নাগাদ তাঁর মূখ্য লেখাগুলো হল - “Intruder in the Dust” (1948), “A Fable” (1954), এবং “The Town” (1957)। “Collected Stories” এবং “A Fable ” উপন্যাসগুলো জাতীয় পুস্তক পুরস্কার পায় যথাক্রমে ১৯৫১ এবং ১৯৫৫ সালে। ফকনার সাহিত্যে নোবেল পুরষ্কার পান ১৯৪৯ সালে।

ফকনার অবসর নিচ্ছেন। ইদানীং কথা বলছেন বিনয়ের সঙ্গে। ভ্র্মণে যথেষ্ঠ সময় দিচ্ছেন। রাষ্ট্রসংঘের তথ্যসেবার পক্ষে ভাষণ দিচ্ছেন। নিউ ইয়র্কে তাঁর সঙ্গে এই কথোপকথনটি হয় ১৯৫৬ সালের গোড়ার দিকে।


সাক্ষাৎকারী
মিষ্টার ফকনার, একটু আগেই যেমনটা বললেন, আপনি সাক্ষাৎদান পছন্দ করেন না।

উইলিয়াম ফকনার
ব্যক্তিগত প্রশ্নে আমি অনেক সময় অসহিষ্ণু বোধ করি এবং ভায়োলেন্টও হয়ে যেতে পারি। তাই আমি সাক্ষাৎকার দেওয়া পছন্দ করি না। প্রশ্নটা আমার কাজ সম্পর্কিত হলে আমি উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করি। প্রশ্নটা আমাকে নিয়ে হলে আমি উত্তর দিতেও পারি আবার নাও দিতে পারি। যদি উত্তর দেই তো একই প্রশ্ন আগামী কাল করলে আমি হয়ত ভিন্ন উত্তর দেব।


সাক্ষাৎকারী
লেখক হিসেবে আপনি নিজেকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন?

উইলিয়াম ফকনার
আমি না থাকলেও আমি বা Hemingway, Dostoyevsky দের নিয়ে কেউ না কেউ লিখত। শেক্সপিয়ারের নাটকের গ্রন্থকার দাবীদার আছে জনা তিনেক। মূল কথা হল “Hamlet” এবং “A Midsummer Night’s Dream” লেখা হয়েছে। কে লিখেছে সেটা বড় কথা নয়। শিল্পীটি কে সেটা বড় কথা নয়। তিনি কী সৃষ্টি করলেন সেটাই বড় বিষয়। কারণ, বিষয়টি নিয়ে নতুন কিছু আর বলার নেই। Shakespeare, Balzac, Homer একই জিনিষ লিখেছেন। তাঁরা যদি আরও এক হাজার কি দু হাজার বছর বাঁচতেন, প্রকাশকদের নতুন কাউকে আর দরকার হত না।

সাক্ষাৎকারী
নতুন কিছু মনে না হলেও লেখকদের ব্যক্তিসত্বার কি কোন মূল্য নেই?

উইলিয়াম ফকনার
সেটা তার নিজের ব্যাপার। ব্যক্তিগত বিষয় বাদ দিয়ে নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকাই প্রত্যেকের উচিৎ।


সাক্ষাৎকারী
আপনার সমসাময়িকদের কী অবস্থা?

উইলিয়াম ফকনার
যথার্থ স্বপ্নকে আমরা কেউ বাস্তবায়িত করতে পারিনি। অসম্ভবকে সম্ভব করার বিরাট ব্যর্থতা দিয়েই আমি নিজেদের মূল্যায়ন করি। আমার মতে, আমি যদি আমার সব লেখাগুলো আবার লিখতে পারতাম, আমার বিশ্বাস, আমি ভাল করতে পারতাম; একজন শিল্পীর কাছে সেটাই সুস্থতা। একজন শিল্পীর নিরন্তর প্রচেষ্টা এভাবেই চলতে থাকে। তিনি প্রত্যেকবার ভাবেন এবারেরটাই সর্বোত্তম হবে। অবশ্য সেটা কখনওই হবার নয়। বরং এখন যা আছে সেটাই একটা সুস্থতা। একটা কাজ নিজের স্বপ্নের মত করে গড়ে তোলার শেষ নেই। কোথাও না কোথাও গলদ থেকেই যায়। আমি একজন ব্যর্থ কবি। হয়ত বা প্রত্যেক উপন্যাসিক প্রথমে কবিতা লিখতে চায়। যখন দেখে হচ্ছে না, তখন চেষ্টা করে ছোট গল্প লেখার। কবিতার পরে এটাই সব চাইতে প্রিয় বিষয়। এখানেও ব্যর্থ হলে তখনই একজন উপন্যাস লিখতে শুরু করে।


সাক্ষাৎকারী
উপন্যাসিক হওয়ার কি কোন বিশেষ ধারা আছে?

উইলিয়াম ফকনার
৯৯% হল মেধা...৯৯% হল নিয়মানুবর্তিতা...৯৯% হল কাজ করে যাওয়া। কোন কিছু করে সন্তোষ্ট হয়ে হাত-পা ঝেড়ে বসে থাকলে চলবে না। যা ভাবা যায় তার সবটা করা যায় না। আপনি যা করতে পারবেন তার চেয়ে বেশী ভাববেন, স্বপ্ন দেখবেন। আপনার সমসাময়িক বা পূর্বসূরীদের চেয়ে ভাল করেছেন ভেবে বসে থাকলে চলবে না। আপনার নিজের চেয়েও ভাল করার চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। একজন শিল্পী এমনই এক জাতীয় জীব যে কিনা দৈত্য দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। সে জানেনা কেন তারা তাকেই বেছে নিয়েছে। সে এটা ভাবতে ব্যস্ত। তার ন্যায়-নীতি বলে কিছু থাকতে নেই। লেখকরা যেন চোর-ছ্যাচ্চর, ভিক্ষা করাই এদের কাজ। সবাই তাকে দিয়ে কাজ করিয়ে নেবে।


সাক্ষাৎকারী
আপনি কি মনে করেন একজন লেখককে সম্পূর্ণভাবে নির্দয় হতে হবে?

উইলিয়াম ফকনার
তাঁর সৃষ্টির প্রতিই একজন লেখকের মূল দ্বায়িত্ব। ভাল শিল্পী্রা পুরোপুরি নির্দয় হতেই পারেন। স্বপ্ন নিয়েই তার কাজ। স্বপ্নটাই তাকে অশান্ত করে রাখে। শিল্প সৃষ্টি করেই তিনি শান্ত হোন। সৃষ্টি শেষ না হওয়া পর্যন্ত তার শান্তি নাই। সন্মান, গর্ব, সৌন্দর্য, নিরাপত্তা, আনন্দ, সব কিছুই দরকার একটা লেখা সম্পূর্ণ করতে। একজন লেখককে যদি তার মায়ের পকেটও মারতে হয় তো সেটা করতেও তিনি ইতস্ততঃ করবেন না। যেমন সব প্রৌঢ়াদের জন্যই “Ode on a Grecian Urn” কথাটা প্রযোজ্য।


সাক্ষাৎকারী
সন্মান, আনন্দ, এবং নিরাপত্তাহীনতাই কি একজন শিল্পীর সৃজনশীলতার জন্য প্রয়োজনীয় অনুসংগ?

উইলিয়াম ফকনার
না, তা নয়। এগুলো দরকার নিজস্ব শান্তি এবং স্বল্পে তুষ্ট থাকা নিয়ে। কিন্তু শিল্পসত্ত্বার সঙ্গে “শান্তি এবং স্বল্পে তুষ্ট”এর কোন যোগসূত্র নেই।



সাক্ষাৎকারী
তাহলে একজন লেখকের জন্য উৎকৃষ্ট পরিবেশটা কী?

উইলিয়াম ফকনার
পরিবেশ নিয়ে শিল্পেরও কিছু করার নেই; শিল্পের কাছে এর অবস্থানের কোন মূল্য নেই। আপনি যদি আমার কথাই বলতে চান তো আমি বলব আমি সব চাইতে লোভনীয় যে সুযোগটি পেয়েছিলাম তা হল একটি গনিকালয়ের মালিক বনে যাওয়া। আমার মনে হয় একজন শিল্পীর জন্য এটা একটা উৎকৃষ্ট পরিবেশ। এটা শিল্পীকে আর্থিক স্বাধীনতা দেয়; এখানে তার মাথার উপর ছাদ আছে; কিন্তু কোন ভয় নেই, খাবার অভাব নেই। তাকে শুধু হিসাবপত্র রাখতে হবে এবং মাসে একবার পুলিশের পাওনা মিটাতে হবে। সকাল বেলার নিঃশব্দ পরিবেশ সারাদিন কাজ করার জন্য খুবই উপযোগী। সন্ধ্যায় সামাজিকতার যথেষ্ট সুন্দর পরিবেশ। একাকীত্ব ভাল না লাগলে তিনি মিশে যেতে পারেন সান্ধ্য জীবনটা উপভোগ করতে। সমাজে তার একটা বিশেষ জায়গাও হয়ে যেতে পারে। তার কিছুই করার থাকে না কারণ ম্যানেজার মহিলাটিই তো সব ঠিক ঠাক রাখে। মালিক ছাড়া বাড়ীর সবাই মহিলা। সবাই “স্যার” হিসেবে ডাকবে। চোরাই মদ্যব্যবসায়ীরাও তাকে “স্যার” বলে ডাকবে। সে পুলিশদেরকেও প্রথম নাম ধরে ডাকতে পারবে।

একজন শিল্পীর নূনতম দরকার হল সস্তায় যতটুকু স্নিগ্ধ শান্তিপূর্ণ পরিবেশ পাওয়া যায়। সব রকম বেঠিক পরিবেশ তার রক্তচাপটাই বৃদ্ধি করবে, তার হতাশা এবং মেজাজ দুটোই বাড়বে। আমার নিজের অভিজ্ঞতা হল, আমার কাজের জন্য দরকা্রী জিনিষ হল কাগজ, তামাক, খাবার এবং খানিকটা হুস্কি।


সাক্ষাৎকারী
Bourbon এর কথা বলছেন?


উইলিয়াম ফকনার
না। এব্যাপারে আমার তেমন খুতখুতানি নেই। স্কচ্‌ হলে আর কিছু দরকার নেই।


সাক্ষাৎকারী
আপনি বলছিলেন, আর্থিক স্বাধীনতার কথা। একজন লেখকের কি তা দরকারী?

উইলিয়াম ফকনার
না। একজন লেখকের জন্য আর্থিক স্বাধীনতা দরকার নেই। যা দরকার তা হল একটি পেন্সিল এবং কিছু কাগজ। ফাও টাকা পাওয়া যাবে এই ভাবনা নিয়ে আমি লিখিনা। ভাল লেখকের জন্য কোন ফাউন্ডেশন লাগে না। শুধু লেখা নিয়েই তিনি ব্যস্ত থাকবনে। তিনি যদি প্রথম শ্রেণীর লেখক হন তবে তিনি নানান বাহানার কথা কথা বলবেন – তিনি সময় পাচ্ছেন না বা এতে আর্থিক স্বাধীনতা নেই, ইত্যাদি। ভাল লেখা একজন চোর, মদ্য সরবরাহকারী কিম্বা একজন ঘোড়া দেখাশুনাকারীর কাছ থেকেও আসতে পারে। লোকেরা দারিদ্য এবং কষ্টসাধ্য কাজকে ভয়ের চোখেই দেখে। ভাল লেখককে কিন্তু কোন কিছুই দমিয়ে রাখতে পারেনা। একমাত্র মৃত্যুই ভাল লেখককে হটিয়ে দিতে পারে। ভাল লেখকের সফল কিম্বা বিত্তশালী ভাবার সময় নাই, সময় থাকে না। সাফল্য হল মেয়েলী ব্যাপার - মেয়েদের মত। আপনি যদি নরম এবং ভীতু হোন, সে আপনার ঘাড়ে চাপবে। কাজেই তার জন্য সঠিক ব্যবহার হলে আপনার হাতের পেছন দিকটা। তাহলেই মনে হয় এরা আপনার পেছনে ঘুরঘুর করবে।


সাক্ষাৎকারী
ছায়াছবির জন্য কাজ কি আপনার লেখায় বিঘ্ন সৃষ্টি করে?

উইলিয়াম ফকনার
প্রথম সারির লেখককে কোন কিছুই ক্ষতিগ্রস্থ করতে পারে না। প্রথম শ্রেণীর লেখক না হলে ছবিটারও কোন লাভ হয় না। প্রথম শ্রেণীর লেখক না হলে তার জন্য কোন সমস্যাই নয়, কারণ সে তো নিজেকে সুইমিং পুলের কাছে বিকিয়ে দিয়ে বসে আছে।


সাক্ষাৎকারী
ছায়াছবির জন্য লিখতে গেলে কি স্বকীয়তা বিসর্জন দিতে হয়?

উইলিয়াম ফকনার
চলচ্চিত্র সব সময়ে একাধিক প্রয়াসে নির্মিত হয়। এরকম প্রয়াসে দেওয়া-নেওয়ার ব্যাপার আছে। কাজেই স্বকীয়তার ছাড় তো দিতেই হয়।


সাক্ষাৎকারী
কা্র সঙ্গে কাজ করতে আপনি সবচেয়ে বেশী ভাল বাসেন?

উইলিয়াম ফকনার
হামফ্রে বোগার্টের সঙ্গে আমি স্বচ্ছন্দে কাজ করেছি। তার সঙ্গে আমি “To Have and Have Not” এবং “ The Big Sleep” ছবিতে কাজ করেছি।


সাক্ষাৎকারী
আপনি কি আরও একটি ছবি বানাতে চান?

উইলিয়াম ফকনার
হ্যা। জর্জ অরওয়ের ১৯৮৪ এর উপর একটা কাজ করার ইচ্ছা আছে। কাজটা্র শেষের দিকটা নিয়ে আমার মাথায় একটা বুদ্ধি আছে। সব সময়েই এই ইচ্ছাটা আমি পোষন করছিঃ লোকটার মধ্যে স্বাধীনচেতা একটা সারল্য আছে; তাকে ধংস করা যায় না।

সাক্ষাৎকারী
উৎকৃষ্ট ছায়াছবি বানানোর জন্য কী কী করে থাকেন?

উইলিয়াম ফকনার
আমার কাছে উৎকৃষ্ট চলচ্চিত্রের জন্য কলাকশলী এবং স্ক্রিপ্ট গুরুত্বপূর্ণ এবং ছবি তোলার আগেই দৃশ্যগুলো নিয়ে ভাবতে হবে, পূর্নাঙ্গ মহড়া করতে হবে। চলচ্চিত্রটাকে সিরিয়াসলি ভাবতে না পারলে সেটা হাতে নেওয়াই ঠিক না। আমি তো নেবই না। এখন জানি আমি চলচ্চিত্রের একজন ভাল কাহিনী লিখিয়ে হব না। আমার নিজের কাজের জগত নিয়ে আমি যেমনটা মগ্ন থাকি, চলচ্চিত্রের গুরুত্বটা আমার কাছে কখনওই তেমনটা হবে না।

সাক্ষাৎকারী
হলিওডে আপনার লেজেন্ডারী অভিজ্ঞতার কথা কি বলবেন?

উইলিয়াম ফকনার
MGM এ চুক্তি শেষে বাড়ীর দিকে রওয়ানা হওয়ার সময় তখন। যে পরিচালকের সঙ্গে কাজ করছিলাম তিনি বললেন, “এখানে যদি আরও একটি কাজ করতে চান তো আমাকে জানাবেন। আমি স্টুডিওর সঙ্গে নতুন চুক্তি নিয়ে কথা বলব।” তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বাড়ী চলে এলাম। প্রায় ছয় মাস পড়ে আমি টেলিগ্রাম করে আমার বন্ধুটিকে জানালাম আমি আর একটা জব চাই। কিছুদিনের মধ্যেই হলিউডের এজেন্টের কাছ থেকে একটা চিঠি পেলাম; সঙ্গে প্রথম সপ্তাহের বেতনের চেক। আমি অবাকই হলাম। কারণ আমি আশা করেছিলাম স্টুডিও থেকে নতুন চুক্তিনামার একটা দাপ্তরিক চিঠি আসবে। আমি ভাবলাম চুক্তিটির দেরী আছে এবং পরের মেইলে সেটি আসবে। এক সপ্তাহ পরে এর পরিবর্তে আরও একটা চিঠি এল এবং সঙ্গে দ্বিতীয় সপ্তাহের বেতনের চেক। এটা শুরু হয়েছিল ১৯৩২ সালের নভেম্বরে এবং চলল ১৯৩৩ সালের মে পর্যন্ত। তারপর স্টুডিও থেকে একটি টেলিগ্রাম পেলাম, “William Faulkner, Oxford, Miss. Where are you? MGM Studio.”

আমি টেলিগ্রাম পাঠালামঃ “MGM Studio, Culver City, California. William Faulkner.”

কমবয়েসী এক মহিলা অপারেটর বললঃ “এখানে সংবাদটি কোথায়, ফকনার সাহেব?” আমি বললাম, “এটাই।” সে বলল, “আইন অনুযায়ী সংবাদ ছাড়া আমি কিছু পাঠাতে পারি না। আপনাকে কিছু একটা বলতে হবে।” তারপর তার কিছু স্যাম্পল নিয়ে বসলাম এবং একটা বেছে ঠিক করলাম, কোনটি ঠিক করলাম এখন তা আর মনে নেই – কোন একটা বার্ষিকীর শুভেচ্ছা বাণী হবে হয়তো। আমি তাই পাঠিয়ে দিলাম। তারপর স্টুডিও থেকে লং ডিস্ট্যান্স টেলিফোন কল। আমাকে প্রথম বিমানেই নিউ অর্লিন্স যেয়ে পরিচালক ব্রাউনিংকে রিপোর্ট করতে হবে। আমি ট্রেনে আট ঘন্টায় অক্সফোর্ড থেকে নিউ অর্লিন্স যেতে পারতাম। কিন্তু আমি স্টুডিওর নির্দেশ মতই মেমফিস গেলাম। প্লেন সাধারণত ওখান থেকেই নিউ অর্লিন্স যেত। তিন দিন পরে আমি তাই করলাম।

আমি সন্ধ্যা প্রায় ছয়টা নাগাদ ব্রাউনিং সাহেবের হোটেলে পৌছে তাঁকে রিপোর্ট করলাম। ওখানে একটা পার্টি চলছিল তখন। তিনি আমাকে রাতে আরামে ঘুমাতে বললেন। কারণ পরদিন সকাল সকাল কাজ শুরু করতে হবে। আমি তাঁকে গল্পটার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, “ ওহ্‌, হ্যা। তুমি অমুক কক্ষে চলে যাও। ওখানেই আছে ধারাবাহিক লেখক। তিনিই তোমাকে গল্পটা বলবেন।”

নির্দেশ মত আমি সেই কক্ষে চলে গেলাম। ধারাবাহিক লেখক একাই ছিলেন সেখানে। আমি তাকে আমার পরিচয় দিয়ে গল্পটি কী তা জানতে চাইলাম। তিনি বললেন, “সংলাপ লিখেছ তুমি, আর আমি তার গল্প বলব!” আমি ব্রাউনিংএর কক্ষে গিয়ে ঘটনাটি বললাম। তিনি বললেন, “আবার যাও, এবং এই-এই বলো গিয়ে। কিছু মনে করো না। এখন আরামসে ঘুমাও গিয়ে। কাল সকাল সকাল শুরু করতে হবে।”

পরদিন সকালে ধারাবাহিক লেখক ছাড়া আমরা সবাই ধুমধাম করে প্রায় একশত মাইল দূরে গ্র্যান্ড আইলের দিকে রওয়ানা হলাম। এখানেই শুটিং হবে। ঠিক সময়ে পৌছে আমরা দুপুরের খাবার খেলাম। তারপর অন্ধকার হওয়ার আগেই নিউ অর্লিন্স ফিরতে হবে। আবার একশত মাইল।

এভাবেই তিন সপ্তাহ কেটে গেল। গল্পটা নিয়ে আমার উদ্বিগ্ন চলতেই থাকল। কিন্তু ব্রাউনিং সব সময় বলত, “এত উদ্বিগ্ন হওয়ার কী আছে? রাতে আরামসে ঘুমাও। পরদিন সকাল সকাল বেরিয়ে পড়তে হবে।”

এক সন্ধ্যায় ফিরেছি। আমি আমার কক্ষে ঢুকতে যাচ্ছি তখন একটি টেলিফোন কল এলো। ব্রাউনিংএর কল। তিনি আমাকে তার কক্ষে যেতে বললেন। আমি গেলাম। তার হাতে একটা টেলিগ্রাম। লেখাঃ “ফকনার চাকুরীচ্যুত, MGM Studio.” ব্রাউনিং বললেন, “উদ্বিগ্ন হইও না। আমি এখনই একটা কিছু বলব। তিনি তোমাকে শুধু চাকুরীতে পূনর্বহালই করবেন না, বরং তাকে লিখিত ভাবে মাফ চাইতে হবে।” ঠিক তখনই দরজায় কেউ টোকা দিল। অন্য আর একটা টেলিগ্রামের পাতা এল। এটাতে লেখাঃ “ব্রাউনিং চাকুরী চ্যুত, MGM Studio.” এরপর আমি বাড়ীতে চলে এলাম। এবং ব্রাউনিংও অন্য কোথাও নিশ্চয়ই যেয়ে থাকবে। আমার বিশ্বাস, সেই ধারাবাহিক লেখকটি কোথাও বসে বসে সাপ্তাহিক বেতনের চেকটি পেয়ে যাচ্ছে। ওরা ছবিটি শেষ করতে পারেনি। কিন্তু পরে তারা একটি চিংড়ি-গ্রাম তৈরী করে। জলে খুটির উপর একটা প্ল্যাটফরম বানায়। একটা আচ্ছাদনও রাখে – দেখতে যেন একটি আড়ত ঘর। চাইলে স্টুডিও এর প্রতিটি চল্লিশ কি পঞ্চাশ ডলারে কিনতে পারত। তার বদলে তারা নিজেই এসব বানাল। এর কোন মানে হয় না। একটা প্ল্যাটফরম, সঙ্গে একটি মাত্র দেওয়াল। জিনিষটা এরকম যে, তুমি দরজা খুলে সামনে গেলেই সমুদ্রের জলে পড়ে যাবে। এসব বানানোর প্রথম দিনেই এক কেজুন জেলে তার ছোট্ট ডিংগি নৌকাটি কাঠের ফাঁক দিয়ে ঢুকিয়ে দিল। জেলেটি সারাদিন কাঠফাটা রোদে ওখানেই বসে দেখল সাদা লোকগুলো ফালতু সব প্ল্যাটফরম বানাচ্ছে। পরদিন জেলেটি ডিংগি নৌকা করে তার পুরো পরিবার নিয়ে এল। তার স্ত্রীর কোলে ছিল একটা ছোট্ট বাচ্চা, অন্যান্য আরও বড় বাচ্চা, এবং শ্বাশুড়ী। সবাই কাঠফাটা রোদে বসে দেখল লোকগুলোর প্ল্যাটফরম বানানোর মত বোকামো কাজ কারবার। দুই তিন বছর পরে আমি নিউ অর্লিন্সে আবার গিয়েছিলাম। শুনেছি কেজুন জেলেরা দুর-দুরান্ত থেকে এইসব ফালতু চিংড়ি প্ল্যাটফরম দেখতে আসত। অনেক সাদারা এসব চটপট বানাত। তারপর কোন একদিন এসব ছেড়ে তারা চলে যায়।


সাক্ষাৎকারী
আপনি বলেছেন চলচ্চিত্রের জন্য লেখককে অনেক ছাড় দিতে হয়। তার লেখাটি কেমন ছিল? পাঠকদের জন্য তার কি দ্বায়-বদ্ধতা ছিল?

ফকনার
নিজের কাজটি যত সম্ভব ভাল করে শেষ করাটাই ছিল তার দ্বায়-বদ্ধতা; দ্বায়-বদ্ধতাটুকু সেরে তিনি বাকীটা তার মত করে করতে পারেন। আমি এত ব্যস্ত যে পাঠকদের চাহিদার কথা ভাবার সময় থাকেনা। আমার সময় নাই কে আমার পাঠক। আমার বা অন্যের লেখা নিয়ে কোন যদু-মধু কী ভাবল তা ভাবার সময় নাই। আমার নিজের একটি স্বকীয়তা আছে। আমাকেই তা রক্ষা করতে হবে। আমি “La Tentation de Saint Antoine”, অথবা “the Old Testament” পড়ার সময় যা ভাবি আমি আমার লেখা নিয়ে তাইই ভাবি। এতে আমার খুব ভাল লাগে। একটা পাখী দেখলেও আমার এরকম ভাল অনুভূতি হয়। আমার যদি পূনর্জন্ম হত তাহলে আমি ঈগল পাখি হয়ে ফিরে আসতাম। কেউ এই পাখিকে ঘৃণা বা হিংসা করে না। কেউ একে চায় না বা এর দরকার মনে করে। কেউ একে বিরক্ত করেনা, এর কোন বিপদ নেই, এবং পাখিট যা ইচ্ছা তাই খেতে পারে।

সাক্ষাৎকারী
আপনার স্বকীয়তা বজায় রাখতে আপনি কী পদ্ধতি অনুসরণ করেন?

ফকনার
লেখক যদি কোন পদ্ধতিতে আগ্রহী থাকেন তাহলে তিনি সার্জারী বা ইট বিছানো পদ্ধতি গ্রহণ করতে পারেন। লেখালেখিতে কোন যান্ত্রিক পদ্ধতি নেই। কোন সংক্ষিপ্ত পথও নেই। নবীন লেখকেরা বোকার মত কোন তাত্ত্বিক পথ অবলম্বন করতে পারে। মানুষ শুধু ভুল থেকেই শিখে। একজন ভাল শিল্পী বিশ্বাস করে যে অন্য কেউ এত ভাল নয় যে তাকে পরামর্শ দিতে পারে। তার একটা চরম অহংকার বোধ থাকে। পুরানো লেখককে তিনি প্রশংসা করুন বা না করুন, তিনি তাকে পেছনে ফেলতেই চাইবেন।


সাক্ষাৎকারী
তাহলে কি আপনি পদ্ধতির উপযোগিতা প্রত্যাখ্যান করেন?

ফকনার
কোনভাবেই না। অনেক সময় পদ্ধতি শক্তি যোগায়; লেখায় হাত দেওয়ার আগেই লেখকের স্বপ্ন তাকে নিয়ন্ত্রিত করতে শুরু করে। ইট ঠিকমত বিছানোর মতই এটা একটা উৎকর্ষতা এবং এভাবেই লেখা পরিণত হতে পারে। কারণ এক্ষেত্রে লেখা শুরুর আগেই লেখক জানে পুরো লেখার কোথায় কোন শব্দটি বসবে। “As I Lay Dying” এর ক্ষেত্রে তাই হয়েছে। এটা সহজ ব্যাপার নয়। কোন সততাপুর্ণ লেখায় এমনটা হয়না। এটা সহজ হয় যখন সমস্ত উপকরণ আওতাধীন থাকে। দিনে বার ঘণ্টা কায়িক পরিশ্রমের একটা চাকুরী ছিল। এমতাবস্থায় সময় নিয়ে ছয় সপ্তাহে কাজটি করি। আমি একদল লোক নিয়ে ভাবলাম। চারিদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ চলছে। বন্যা, অগ্নোৎপাত। কিন্তু এর মধ্য থেকেই তাদেরকে উঠে আসতে হবে। কোন পদ্ধতি যখন প্রভাব না ফেলে লেখা তখন সহজই হয়। আমার সব সময়ই একটা পয়েন্ট থাকে। এই বইটাতেও তাই। চরিত্রগুলো নিজেরাই তৈরী হয়। তারা তাদের মত চলতে থাকে। ২৭৪ পাতা খুললেই এরকমটা পাওয়া যাবে। অবশ্য আমি জানি না বইটি ২৭৪ পাতায় শেষ করলে কী হতে পারত। একজন শিল্পীর মূল্যায়ন তার সততা, সাহস এবং তার লেখা দিয়েই পরিমাপ হওয়া উচিৎ, তিনি কী করলেন সেটা বড় কথা নয়। আমার কোন লেখাই আমার নিজস্ব মান-সম্পন্ন হয়নি বিধায় আমি নিজের ক্ষুব্ধতা এবং ক্রুদ্ধতা দিয়েই আমার নিজের লেখার মান বিবেচনা করি। একজন মা তার সন্তানদের কত ভালবাসেন, অথচ তারা চোরও হয়ে যেতে পারে। কেউ ধর্ম যাজক হতে গিয়ে খুনী হয়ে যেতে পারে।


সাক্ষাৎকারী
আপনি কোন লেখাটার কথা বলছেন?

ফকনার
“The Sound and the Fury.” পাঁচটি বিভিন্ন সময় নিয়ে লেখাটি লিখি কারণ লেখার সময় আমি আমার কল্পনা, আমার ক্রোধ থেকে বেরিয়ে আসতে চেয়েছিলাম। লেখাটি ক্যাডি এবং তার মেয়ে এই দুইজন দুর্দশাগ্রস্ত নারীকে নিয়ে। ডিলসে আমার খুবই পছন্দের চরিত্র। কারণ সে খুবই সাহসী, সৎ, ভদ্র এবং পরোপকারী। সে আমার চেয়েও সাহসী, সৎ এবং পরোপকারী।


সাক্ষাৎকারী
আপনি “The Sound and the Fury” কীভাবে শুরু করেন?

ফকনার
লেখাটি আমার মাথায় ছবির মত ভাসতে থাকে। এরকম হয়, তখনও আমি গুরত্ব দিয়ে ভাবিনি। একটা ছোট্ট কক্ষে নোংরা জায়গায় বসে আছে একটা বাচ্চা মেয়ে। জানালা দিয়ে তার দিদিমার অন্তেষ্টিক্রিয়া দেখছে, নীচে তার ভাইয়েরা কিছু একটা করছে। কারা এরা, কী সব করছে এবং কী ভাবে মেয়েটির প্যান্ট নোংরা হয়ে গেল এটুকু বর্ণনা করার সঙ্গে সঙ্গেই আমি বুঝতে পারলাম এটা নিয়ে কোন ছোট গল্প লেখা অসম্ভব; বরং একটা বই লিখতে হবে। এবং তখন আমি অনুভব করলাম নোংরা প্যান্টের ব্যাপারটি। মূল ছবিটা তখন বদলে গেল। আমার চোখে ভেসে এল মাতাপিতাহীন একটি মেয়ে। বাড়ীটা কখনও আদর বা ভালবাসা দেয়নি ওকে। এই বাড়ী থেকে তার পালানো দরকার। দেখলাম মেয়েটি পাইপ বেয়ে নিচে নেমে আসছে।

নির্বোধ মেয়েটির চোখ দিয়েই আমি গল্পটি শুরু করেছিলাম, কারণ আমি ভেবেছিলাম ঘটনাটা বর্ণনা করাই যথেষ্ট, কেন ঘটল এটা মূখ্য নয়। আমি দেখলাম ঐ সময় আমি গল্পটা বলিনি। একই গল্প অন্য এক ভাইয়ের চোখ দিয়ে আমি আবার বলার চেষ্টা করলাম। এর পরও গল্পটি পূর্নাঙ্গ হলনা। কথকের মত আমি সব উপাদানগুলো একত্র করার চেষ্টা করলাম। পনের বছর পরে বই হিসেবে প্রকাশ না করা পর্যন্ত কিন্তু সম্পূর্ণ হল না। এখানেই শেষ নয়। গল্পটির আরও একটি অংশ আমার মাথায় ঘুরাফেরা করছিল। আমার সর্বশেষ চেষ্টার অংশ হিসেবে তা অন্য একটা বইয়ের শেষে জুড়ে দিলাম। আমি কিছুটা মানসিক শান্তি অনুভব করলাম। আমার মনে হয় এই বইটাই সব চাইতে আবেদনমাখা হয়েছে। মনের ভিতর বইটা সার্বক্ষনিক থাকছে, সঠিক করে আমি বলতে পারছিনা। অনেক সময় দিয়েছি, শ্রম দিয়েছি, আমি আবারও চেষ্টা করতে চাই। তারপরও হয়ত আমি যা চেয়েছি তা সম্পন্ন করতে পারব না।


সাক্ষাৎকারী
বেঞ্জী আপনার হৃদয়ে কী ধরণের অনুভূতির উদ্রেক করে?

ফকনার
বেঞ্জীর জন্য আমার দুঃখ হয়। পৃথিবীর তাবৎ মানুষের দুঃখকষ্টেই আমি ব্যথিত। বেঞ্জীর কোন অনুভূতি নেই কাজেই ওর জন্য আপনারও কোন অনুভূতি হবে না। আমি তাকে যেভাবে সৃষ্টি করেছি সেটা বিশ্বাসযোগ্য কতটা হয়েছে সেটাই আমার ব্যক্তিগতভাবে ভাববার বিষয়। এলিজাভেথিয়ান ড্রামায় গ্রেভডিগারদের মতই সে আমার ভূমিকার কাজটি করেছে। তাকে নিয়ে আমার পটভূমির কাজটি শেষ। তাকে নিয়ে সব কিছুই শেষ। বেঞ্জির কাছে ভাল-মন্দ নামে কোন কিছু ছিলনা। ভাল-মন্দ কোন বোধই তার ছিলনা।


সাক্ষাৎকারী
বেঞ্জীর কি কোন ভালোবাসা বোধ ছিল?

ফকনার
বেঞ্জীর স্বার্থপর হওয়ার মত বোধও ছিল না। সে একটা পশু ছিল। ভালবাসা এবং কোমলতা সমন্ধে তার সম্যক ধারণা ছিল। কিন্তু এগুলোর কী নাম তা সে জানত না। ক্যাডির পরিবর্তন সে লক্ষ্য করে কিন্তু কোমলতা এবং ভালোবাসার প্রতি তার নির্মমতা্র জন্যই ক্যাডিকে সে বুঝতে পারেনি। তাই ক্যাডিকে সে পায়নি; হাবা ছেলেটি বুঝতেই পারেনি ক্যাডি তার জীবন থেকে চলে গেছে। সে শুধু বুঝতে পেরেছিল কিছু একটা ভুল হয়েছে। তার হৃদয়ে একটা শুন্যতা সৃষ্টি হয় এবং কষ্ট পায়। শুন্যতাটি সে পূরণ করতে চেষ্টা করে। ক্যাডির ফেলে দেওয়া চপ্পলটিই তার একমাত্র সম্বল ছিল। চপ্পলটিই ছিল তার একমাত্র প্রেম এবং অনুভূতি। এটারও যে একটা নাম আছে তা সে জানত না। কিন্তু অনুভব করত একটা কিছু সে হারিয়েছে। সে নোংরা থাকত। পরিচ্ছন্যতা এবং অপরিচ্ছন্যতার তফাৎ সে বুঝত না। ভালো এবং মন্দের তফাৎও সে বুঝত না। চপ্পলটা কার ছিল তা সে মনে করতে না পারলেও এটিই তাকে শান্তনা দিত। ক্যাডি কোন দিন ফিরে এলেও সে হয়তো বা তাকে চিনতে পারত না।


সাক্ষাৎকারী
বেঞ্জীকে নার্সিসাস ফুল দেওয়ার গুরুত্বটা কী?

ফকনার
ওর মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে দেওয়ার জন্যই নার্সিসাস দেওয়া হয়। এটা একটা সাধারণ ফুল। এপ্রিলের পাঁচ তারিখে এটা সহজলভ্য। এটা ইচ্ছাকৃত নয়।


সাক্ষাৎকারী
আপনি “A Fable”এ খ্রিশ্চিয়ানিটির অন্তর্নিহিত রহস্য ব্যবহার করেছেন। এরকম আচ্ছাদিত রহস্য ব্যবহারে শিল্পীদের কি সুবিধা আছে?

ফকনার
বর্গাকৃতি দালান বানানোর জন্য বর্গাকার কোণা সুতারদের জন্য একটা সুবিধাজনক ব্যাপার আছে। “A Fable”এ খ্রিশ্চিয়ানিটির অন্তর্নিহিত রহস্যটা ঐ বিশেষ গল্পটির জন্য খুবই উপযোগী ছিল, এই যেমন - যেখানে যে রকম দরকার।


সাক্ষাৎকারী
একজন সুতার কার্য সম্পাদনের জন্য একটা হাতুড়ী ধার করে, তেমনি কি একজন শিল্পী খ্রিস্টান ধর্ম ব্যবহার করতে পারে?

ফকনার
একটা হাতুড়ী ছাড়া সুতার হয় না। খ্রিস্টান শব্দটির সঙ্গে যদি আমরা একমত হই তো আমরা কেউই খ্রিস্টান ধর্ম ছাড়া নই। প্রতিটি মানুষের একটা নিজস্বতা থাকে। একজন মানুষ যদি তার স্বকীয়তা বজায় রাখে, সে তার নিজের চেয়েও ভাল মানুষ হতে পারে। ক্রস অথবা বাঁকা চাঁদ যে প্রতিকৃতিই হউক না কেন, এটা মানুষের কর্তব্যবোধকেই মনে করিয়ে দেয়। উপমা হল মাপকাঠিস্বরূপ। মানুষ এসব থেকেই নিজের মূল্যায়ন করে। অংক শেখার বইয়ের মত এগুলো ভালো মানুষ হতে শেখাতে পারে না। যন্ত্রনা, আত্নত্যাগ এবং প্রত্যাশাবোধের অপরিসীম উদাহরণ থেকে নিজস্ব অন্তর্নিহিত শক্তি আবিস্কারের মাধ্যমে স্বকীয়তা এবং নৈতিকতার আদর্শে উজ্জীবিত হতে এসব উপমাসমূহ অনেক অবদান রাখে। লেখকরা মানবিক সচেতনার উপমা নিয়ে আঁকেন এবং সব সময় আঁকবেন কারণ উপমার তুলনা নেই। “Moby Dick” এর তিনটি চরিত্র তিনটি সচেতনতার প্রতীক। এই চরিত্রগুলো যেন কিছু জানেনা; জানলেও কিন্তু কিছুই মূল্য দেয়না। অথচ এরা সবই বুঝে এবং মূল্য দেয়। একজন অল্প বয়েসী জুইশ পাইলট অফিসারের “A Fable ”এর ত্রিনীতি চরিত্র আছে। এরা বলে, “এটা ভয়ানক, আমি গ্রহন করতে নারাজ, জীবন দিতে হলেও অনাগ্রহী”; আবার ফরাসী প্রৌঢ় কোয়ার্টার মাস্টার জেনারেল বলেছেন, “এটা ভয়ানক, কিন্তু কাঁদতে হলেও গ্রহন করতে হবে”; এবং ইংরেজ ব্যাটেলিয়ান বলছেন, “এটা ভয়ানক, এটা নিয়ে আমি একটা কিছু করব।”


সাক্ষাৎকারী
“The Wild Palms ” এ দুটো বিচ্ছিন্ন অবতারণা আছে। এগুলো কি শুধুই উপমা হিসেবে আনা হয়েছে? এটা কি অলংকরণের জন্য নাকি এটা অনাবশ্যকভাবেই এসেছে?

ফকনার
আরে, না। ওটা একটা গল্প – শারলট রিটেনমায়ার এবং হ্যারি উইলবারের গল্প। এরা ভালবাসার জন্য জীবনের সব কিছু উৎসর্গ করেছে। তারপর ভালবাসাটাও গেছে। বইটা শুরু করার আগেও জানতাম না এখানে দুটো আলাদা গল্প আছে। যখন আমি “The Wild Palms” এর প্রথম অংশের শেষে পৌছে যাই, আমি সহসাই অনুভব করি যে একটা কিছু যেন নেই; সঙ্গীতের আরোহন–অবরোহনের মত এটাকে অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে। “The Wild Palms” এর গল্পটি উচ্চমাত্রা লাভ করা পর্যন্ত আমি “Old Man” গল্পটা লিখলাম। “Old Man” গল্পটাই এখন প্রথম অংশ। তারপর আমি “The Wild Palms” এর গল্পটার যতদুর সম্ভব উৎকর্ষতায় নিয়ে যাওয়ার জন্য আত্মনিয়োগ করলাম। আরও একটা অধ্যায় যোগ করে এই গল্পটার আরও উন্নয়ন করলাম। এটাই হল একটা মানুষের গল্প। কিন্তু বইটির বাকি অংশে দেখা যাবে - মানুষটির জীবনে প্রেম এল, কিন্তু সে এই প্রেম থেকেই পালিয়ে বেড়া্লো। এমনকি দেখা যাবে শেষে সে স্বেচ্ছায় জেলে ঢুকেই নিরাপদ হল। ঘটনাক্রমেই যেন দুটো গল্প। হয়তো বা সেটাই দরকার ছিল। এই হল শারলট এবং উইলবার্নের গল্প।


সাক্ষাৎকারী
আপনার লেখার কতটা আপনার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ফসল?

ফকনার
তা বলতে পারব না। আমি কখনও তা গুণে দেখিনি। কারণ, “কতটা গুরুত্বপূর্ণ’’ এটা কোন বিষয় নয়। একজন লেখকের তিনটি জিনিষ দরকার, যেমন, অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষন, এবং কল্পনা – এর যেকোন দুটো, এক সময় এর যেকোন একটি অন্যগুলোর অভাব মিটাতে পারত। আমার ক্ষেত্রে, একটা গল্প প্রথমে মাত্র একটি ধারণা বা মানসিক কল্পচিত্র দিয়েই শুরু হয়। আসলে লেখাটা ঐ মূহুর্তকে দিয়েই। একজন লেখক চেষ্টা করে বিশ্বাসযোগ্য মানুষদের নিয়ে স্বাভাবিক পরিবেশের মধ্যে থেকে এগিয়ে নিয়ে যেতে। অবশ্যই লেখক পরিবেশ অনুযায়ী তার নিজস্ব বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করেই তা করবে। আমি বলতে চাই সংগীতের মাধ্যমে নিজের ভাব প্রকাশ করা সব চেয়ে সহজ কারণ মনের ভাব প্রকাশের জন্য মানুষ ঐতিহাসিক ভাবে সংগীতকেই প্রথম ব্যবহার করতে শিখেছে। সংগীতের মাধ্যমে হয়তো বা আরও ভালভাবে প্রকাশ করা যেতে পারত, কিন্তু যেহেতু আমার মেধার মাধ্যমই হল লেখা, আমার চেষ্টা হবে বিদ্‌গুটে হলেও লিখেই তা করা। অর্থাৎ, সংগীত হয়তো বা সহজে ভালভাবে কাজটা করতে পারত, কিন্তু আমি পছন্দ করি লিখে প্রকাশ করা, কারণ আমি শোনার চেয়ে পড়তে বেশী পছন্দ করি। আমি শব্দের চেয়ে নিঃশব্দতা পছন্দ করি, এবং নিঃশব্দতার মধেই একটি চিত্র ফুটে উঠে। অর্থাৎ বজ্রধ্বনি এবং সংগীতের জায়গাটি নেয় নিঃশব্দতা।


সাক্ষাৎকারী
আপনার লেখা দুই বা তিন চার বার পড়েও অনেকেই আপনার লেখা বোঝেনা। তাদের জন্য আপনার কী উপদেশ?

ফকনার
চারবার পড়ুন।

সাক্ষাৎকারী
আপনি বলেছেন একজন লেখকের কাছে অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ এবং কল্পনা গুরুত্বপূর্ণ। আপনি এর সঙ্গে অনুপ্রেরণা যোগ করতে পারেন?

ফকনার
অনুপ্রেরণা সমন্ধে আমি কিছু জানিনা। কারণ আমি জানি না অনুপ্রেরণাটা কী জিনিষ। আমি এটা শুনেছি, কিন্তু কখনও দেখিনি।


সাক্ষাৎকারী
লেখক হিসেবে অত্যাচার বা নির্যাতনের প্রতি আপনার পক্ষপাতিত্ব আছে।

ফকনার
এটা এরকম বলা যেন হাতুড়ীর প্রতি একজন সুতারের পক্ষপাতিত্ব আছে। নির্যাতন একজন সুতারের কাজের মাধ্যম। সুতার হয়ত একটা যন্ত্র দিয়ে কাজ করতে পারে, কিন্তু একজন লেখক তা পারেনা।


সাক্ষাৎকারী
আপনি কি বলবেন আপনি কী ভাবে লেখক জীবন শুরু করলেন?

ফকনার
নিউ অর্লিন্সে একটা কিছু আয় করার জন্য আমি যে কোন কাজ করতে থাকি। সেখানে আমার শেরউড এন্ডারসনের সঙ্গে পরিচয় হয়। অপরাহ্নে আমরা শহরটাতে হাঁটতাম এবং ওখানকার লোকজনের সঙ্গে কথা বলতাম। সন্ধ্যায় আমরা আবার মিলতাম। এক-দুই বোতল খেতাম। তিনি কথা বলতেন আর আমি শুনতাম। দুপুরের আগে তাকে আমি দেখতাম না। তখন তিনি একাকী থাকতেন আর কাজ করতেন। পরের দিনও আমরা তাই করতাম। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, লেখকের যদি এটাই জীবন হয় তবে আমাকে লেখকই হতে হবে। তাই আমি আমার প্রথম বইটা লিখতে শুরু করি। তখনই আমি বুঝি লেখালেখির মধ্যে মজা আছে। আমি ভুলে গেলাম যে তিন সপ্তাহ আমার সঙ্গে এন্ডারসনের দেখাই হয়নি। শেষে এন্ডারসনই একদিন আমার বাড়ীতে এসে হাজির। আমার বাড়িতে এটা তার প্রথম পদার্পন। তিনি বললেন, “সমস্যাটা কী? তুমি কি আমার প্রতি বিরক্ত?” আমি তাকে বললাম আমি একটা বই লিখছি। “তাই বলো” বলেই তিনি বেরিয়ে গেলেন। “Soldier’s Pay” নামে বইটি যখন শেষ হল তখন রাস্তায় একদিন তার স্ত্রীর সঙ্গে দেখা। বইটা কেমন এগুচ্ছে জিজ্ঞেস করলেন। আমি বললাম, শেষ করে ফেলেছি। তিনি বললেন, “শেরউড বলছিল, সে তোমাকে একটা কাজ করে দেবে। তার যদি তোমার পান্ডুলিপিটি পড়ার দরকার না হয় তো সে তার প্রকাশককে বলবে বইটি প্রকাশ করতে।” আমি বললাম, “ঠিক আছে।” আমি এভাবেই লেখক হলাম।


সাক্ষাৎকারী
“মাঝ-সাঝে কিছু টাকা কামাই করা” বলতে আপনি কী ধরণের কাজ করতেন?

ফকনার
যখন যা জুটত। আমি প্রায় সব কিছুই করতে পারতাম – নৌকা চালানো, বাড়ী রং করা, উড়োজাহাজ চালানো। নিউ অর্লিন্স খুবই সস্তা জায়গা। তাই আমার তেমন টাকা পয়সা দরকার ছিলনা। দরকারের মধ্যে ছিল ঘুমানোর মত একটা জায়গা, কিছু খাবার, ধুমপান, আর হুইস্কি। দুই-তিন দিন নানারকম কাজ করে যা পেতাম তাতে মাসের বাকী দিনগুলো চলে যেত। আমার স্বভাব ছিল একজন বখাটে প্রকৃতির লোকের ন্যায় উদ্দেশ্যবিহীন ঘুরে বেড়ানো। কাজ করে প্রচুর টাকা কামাই করা আমার দরকার ছিল না। এটা লজ্জার ব্যাপার যে পৃথিবীতে কত কাজ আছে। অথচ একজন মানুষ দিনের পর দিন প্রতিদিন আট ঘণ্টা করে কাজ করবে এটাই সব চাইতে দুঃখজনক ব্যাপার। আপনি দিনে আট ঘণ্টা ধরে অনবরত খেতে থাকেন না বা মদ্য পান করেন না অথবা আট ঘণ্টা ধরে প্রেম করেন না – কিন্তু আট ঘণ্টা এক নাগাড়ে কাজ করেন। এভাবেই প্রতিটি মানুষ তার জীবনকে দুর্বিসহ এবং অসুখী করে তুলে।


সাক্ষাৎকারী
আপনি নিশ্চয়ই শেরউড এন্ডারসনের কাছে ঋণী। কিন্তু লেখক হিসেবে তাঁকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন?

ফকনার
আমার প্রজন্মের আমেরিক্যান লেখকদের তিনিই পিতৃস্থানীয় এবং আগামী দিনের লেখকরা আমেরিক্যান লেখার এই বিশেষ ধরনটাই সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবে। তিনি তাঁর যথার্থ মূল্যায়ন পাননি। ড্রেইসার তাঁর বড় ভাই। তাঁরা উভয়েই মার্ক টুইনের ছেলে।


সাক্ষাৎকারী
সেই সময়ে ইউরোপীয় লেখকদের সমন্ধে কিছু বলুন।

ফকনার
আমার সময়ে দুই দিকপাল হলেন ম্যান এবং জয়েস। বিশ্বাসী অশিক্ষিত ব্যাপ্টিস্টরা যেমন পুরাতন টেষ্টামেন্টের আশ্রয় গ্রহণ করে থাকে, তেমনি আপনার উচিত জয়েসের “Ulysses” পড়া দরকার।


সাক্ষাৎকারী
আপনার ব্যক্তি-জীবনে বাইবেলের অবদান কতটা?

ফকনার
আমার প্রপিতামহ মারী ছোটদের কাছে দয়ালু এবং ভদ্রলোক ছিলেন। তিনি আসলে একজন স্কটিশ হয়েও আমাদের কাছে তেমন অর্থে ধার্মিক বা কট্টর কোনটাই ছিলেন না। কিন্তু নীতির দিক থেকে তিনি অনমনীয় ছিলেন। সকালে নাস্তার টেবিলে ছোট-বড় সবাইকে বাইবেল থেকে শ্লোক পাঠ করার জন্য প্রস্তুত থাকার রেওয়াজ ছিল। নাস্তা খেতে হলে আগে শ্লোক মুখস্ত বলতে হত। অন্যথায় শ্লোক মুখস্ত করার জন্য অন্য ঘরে চলে যেতে হত। (এই কাজটি নিয়ন্ত্রন করার জন্য একজন কাজের মাসি ছিল)।

শ্লোক হতে হবে আদি এবং অকৃত্রিম। আমরা যখন ছোট ছিলাম, প্রতিদিন সকালে একই শ্লোক আওড়াতে হত। আমরা তখনও খুব বড় হইনি, হয়ত কোন এক সকালে (শ্লোকটি ভালোই আয়ত্বে এসেছে, তেমন মনোযোগ ছাড়াই শ্লোকটি তখন বলতে পারি, খাবার টেবিলে হ্যাম এবং স্টেক, ফ্রাইড চিকেন এবং মিস্টি আলু, দুই-তিন রকমের গরম রুটি উঠে গেছে, আপনি পাঁচ-দশ মিনিট আগে থেকেই প্রস্তত আছেন) আপনি সহসা লক্ষ্য করবেন তিনি আপনার দিকে স্নেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন – সমস্ত আদর ফুটে বেরিয়ে আসছে, তার কঠিন মেজাজ আর নেই। কিন্তু পরের দিন আপনাকে দেওয়া হবে নতুন একটি শ্লোক। এভাবেই এক সময় শৈশব কাটিয়ে বড় হয়েছি; শ্লোকের বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে এসেছি, নতুন পৃথিবীতে ঢুকেছি।


সাক্ষাৎকারী
আপনি কি আপনার সমসাময়িকদের লেখা পড়েন?

ফকনার
না, আমি যে সবের সঙ্গে পরিচিত সেগুলোই পড়ি। ছোট সময়ে এগুলো আমি খুবই উপভোগ করতাম। আপনাদের যেমন পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হলে ভালো লাগে, এগুলো পড়তে আমার তেমনই ভাল লাগেঃ ওল্ড টেস্টামেন্ট, ডিকেন্স, কনরাড, সারভেন্টিস, ডন কুইজট – বাইবেলের মত আমি এসব প্রতি বছর পড়ি। ফ্রবার্ট, ব্যালজ্যাক – নতুন জগত সৃষ্টি করেছেন, গোটা বিশেক বইয়ের মধ্যখান দিয়ে যেন রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে – ডসটোয়েভস্কি, টলস্টয়, শেক্সপিয়ার। মাঝে মধ্যে আমি মেলভিলের লেখা পড়ি, এবং কবিদের মধ্যে আছেন – মারলো, ক্যাম্পিওন, জনসন, হেরিক, ডন, কীটস এবং শেলী। আমি এখনও হাউসম্যান পড়ি। এগুলো আমি এত পড়েছি যে আমি এখন আর প্রথম পাতা থেকে শেষ পাতা পর্যন্ত পড়ি না। আমি মাত্র একটা দৃশ্য পড়ি অথবা একটা চরিত্র মাত্র। এটা অনেকটা কোন বন্ধুর সঙ্গে কয়েক মিনিটের আলাপের মত।


সাক্ষাৎকারী
ফ্রেডের লেখা পড়েছেন?

ফকনার
যখন নিউ অর্লিন্সে থাকতাম সবাই ফ্রেডের কথা বলত। না, তার লেখা পড়িনি। শেক্সপীয়ারের লেখাও পড়িনি। মনে হচ্ছে না আমি মেলভিলের কিছু পড়েছি। নিশ্চিত করে বলতে পারি মবি ডিকের লেখা পড়িনি।


সাক্ষাৎকারী
আপনি কি কখনও রহস্য গল্প পড়েন?

ফকনার
আমি সিমেননের লেখা পড়েছি। তার লেখা অনেকটা চেখভের লেখার কথা মনে করিয়ে দেয়।


সাক্ষাৎকারী
আপনার প্রিয়দের সমন্ধে যদি কিছু বলেন?

ফকনার
স্যারা গ্যাম্প আমার পছন্দ – একজন নিষ্ঠুর, দয়ামায়াহীন, মদ্যপ, সুবিধাবা্দী, এবং অবিশ্বস্ত মহিলা। তার সবকিছুই খারাপ, কিন্তু তার পরেও এটা একটা চরিত্র বটে; এছাড়া আছে মিসেস হ্যারিস, ফলস্টাপ, প্রিন্স হল, ডন কুইজট এবং স্যাঙ্কো। লেডী ম্যাকবেথ আমার ভারী পছন্দের। এবং বটম, অফেলিয়া ও মারকুটিও। এরা এবং মিসেস গ্যাম্পের জীবন ভিন্ন ধরণের। এরা কারো সাহায্য চাননি এবং কখনও আক্ষেপও করেন নি। অবশ্য হাক ফিন এবং জিমের কথা আলাদা। টম সয়েরকে আমি তেমন পছন্দ করতাম না – নিজেকে বড় পণ্ডিত ভাবত, অসহ্য। আমার সুট লাভিংগুডকে ভাল লেগেছে। ১৮৪০ অথবা ১৮৫০ সালে জর্জ হ্যারিস লিখেছিলেন তার ব্যাপারে টেনেসী মাউন্টেইন্স-এ। তার নিজের সমন্ধে কোন ভ্রান্ত ধারণা ছিল না, তিনি তার নিজের সাধ্যমত লিখতেন। একটা সময়ে তিনি ভীতু প্রকৃতির লোক ছিলেন, কিন্তু এজন্য তিনি লজ্জিত বোধ করতেন না। নিজের দুরাবস্থার জন্য তিনি কাউকেই দোষারোপ করতেন না। ঈশ্বরকেও তিনি অভিশাপ দিতেন না।


সাক্ষাৎকারী
উপন্যাসের ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছু মন্তব্য করবেন?

ফকনার
আমার ধারণা, মানুষ যতদিন উপন্যাস পড়বে, ততদিন পর্যন্ত মানুষ উপন্যাস লিখবে। সচিত্র মেগাজিন এবং কমিকের দাপট মানুষের পড়ার স্পৃহাকে ভোঁতা করে দিলে অন্য কথা। সাহিত্য আজ নিয়ান্ডার্থালদের যুগে পাহাড়ের গুহার লেখার দিকেই এগুচ্ছে।


সাক্ষাৎকারী
সমালোচকদের দায়িত্ব কতটুকু?

ফকনার
সমালোচকরা কী বলল একজন শিল্পীর তা শোনার সময় থাকেনা। লেখক হতে চাইলে মানুষের প্রতিক্রিয়া পড়তে হয়। কিন্তু যিনি লেখেন তার প্রতিক্রিয়া পড়ার সময় নাই। সমালোচকরা বলতে চায়, “Kilroy was here.” সমালোচক শিল্পীর কাজের প্রতি আপতিত হবে না। শিল্পীর অবস্থান সমালোচকের উপরে। শিল্পী যা লিখবে তার উপরেই সমালোচক আলোড়িত হবে। সমালোচকের লেখা শিল্পীর জন্য নয়; অন্যদের জন্য লেখা।


সাক্ষাৎকারী
এর অর্থ হচ্ছে অন্যের সঙ্গে আপনার কাজ নিয়ে আপনি কোন আলাপ করতে চান না?

ফকনার
না, আমি লেখা নিয়ে অত্যন্ত ব্যস্ত থাকি। লেখার মধ্য থেকে আমাকে আনন্দ পেতে হবে। তা না হলে অন্যের সঙ্গে কথা বলার আমার দরকার নেই। কোনো লেখা আমাকে আনন্দ না দিলে, তা নিয়ে অন্যের সঙ্গে কথা বললে তো আর লেখার মান উন্নত হবে না। লেখার মান উন্নত করতে হলে লেখার উপর আরও যত্নবান হতে হবে। আমি সাহিত্যিক নই, আমি একজন লেখক মাত্র। কথা বলার ব্যবসা থেকে আমি কোন আনন্দ পাই না।


সাক্ষাৎকারী
সমালোচকরা বলে আপনার উপন্যাস রক্তের সম্পর্ক কেন্দ্রিক।

ফকনার
এটা একটা অভিমত। আমি আগেই বলেছি, আমি সমালোচনা পড়িনা। একটা গল্প সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য অনেক কিছুই দরকার হতে পারে। অন্যথায় আমার সন্দেহ আছে, যিনি লিখতে চেষ্টা করবেন তিনি মানুষের নাকের আকৃতি বাদ দিয়ে রক্তের সম্পর্কের প্রতি সচেষ্ট থাকবেন। প্রাসঙ্গিক জিনিষ, যেমন সত্য এবং মানুষের অন্তরের প্রতি মনোনিবেশ করলে অন্য কিছু যেমন, নাকের আকৃতি অথবা রক্তের সম্পর্কের মত ঘটনা ও ধারণার প্রতি নজর দেওয়ার সময় একজন লেখকের থাকবে না। আমার মতে, সত্যের সঙ্গে ধারণা এবং ঘটনার খুবই সামান্য মিল আছে।


সাক্ষাৎকারী
সমালোচকরা আরও বলেন, আপনার চরিত্রগুলো সচেতনভাবে কখনোই ভালো বা মন্দ দিকটা বেছে নেয় না।

ফকনার
জীবন ভাল বা মন্দ দেখে না। ডন কুইজট সবসময়ই ভাল-মন্দের বাছ-বিচার করতেন, এটা তিনি কল্পনাতেই করতেন, তিনি একটা পাগলাটে ধরণের লোক ছিলেন। যখন তার চরিত্রগুলোর ভালো-মন্দ বিচার করার সময় থাকত না, তখনই তিনি বাস্তবতায় ফিরে আসতেন । জীবন যতদিন, মানুষ ততদিন। জীবন যতদিন আছে মানুষের তা কাজে লাগানো উচিৎ। জীবন গতিময়, মানুষই জীবনকে গতিময় করে। গতিময় জীবনে আছে উচ্চাকাঙ্খা, ক্ষমতা এবং আনন্দ। ন্যায়-নীতি প্রতিষ্ঠা মানুষের চিরায়ত আকাঙ্ক্ষা। এখান থেকে কিছুটা বেরিয়ে আসা দরকার। আগামী দিনে টিকে থাকার জন্য স্বকীয় নীতিবোধই ভাল মন্দের মাঝে সঠিক একটা অবস্থান বেছে নেবে। স্বপ্ন দেখার অধিকার ঈশ্বর প্রদত্ত হলে তা মানুষের নীতিবোধে একটা অভিশাপ।


সাক্ষাৎকারী
একজন শিল্পীর সঙ্গে গতিশীলতার সম্পর্কের ব্যাপারটি একটু পরিষ্কার করে বলবেন?

ফকনার
প্রত্যেক শিল্পীর লক্ষ্য হল গতিশীলতাকে করায়ত্ত্ব করা। এটাই জীবন। এটাকে শক্ত করে ধরে রাখুন যেন আজ থেকে একশত বছর পরে যদি কোন আগন্তুকের নজরে আসে, এটা আবার গতিশীল হবে। কারণ এটাই তো জীবন। যেহেতু মানুষ মরণশীল, তার অমরত্বের সম্ভাবনা তখনই হবে যদি তিনি তার কর্ম রেখে যেতে পারেন। কারণ তার কর্ম গতিশীল। শিল্পী একদিন পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিবেন। কিন্তু তার কর্মের ফসল হবে “Kilroy was here”। অবচেতন মনে এটাই সার্বক্ষণিক প্রচেষ্টা।


সাক্ষাৎকারী
শুনেছি, ম্যালকম কাউলি বলেন আপনার চরিত্রগুলো অনেকটাই ভাগ্যের হাতে সমর্পিত।

ফকনার
এটা তার অভিমত। আমি বলব, বাস্তবে যেমন সব মানুষ একই রকমের হয় না, আমার সব চরিত্রও তাই। আমি বলব “Light in August”এ লেনা গ্রোভ নিজের আয়ত্বাধীন ছিল। তার ভাগ্য তার প্রেমিক লুকাস বার্চের সঙ্গে নাকি অন্যের সঙ্গে, আমার তাতে কিছুই যায় আসেনি। এটা তার কপালের লিখন - তার একজন স্বামী থাকবে, বাচ্চা-কাচ্চা থাকবে সে তা জানত। সে তো কারও পরামর্শ নিতে যায়নি কে তার স্বামী হবে? সে নিজেই তার জীবনের নাবিক। বায়রন বাঞ্চ যখন তার সর্বশেষ শক্তি দিয়ে তাকে ধর্ষণ করতে উদ্যত হয়, সেই মূহুর্তে লেনা গ্রোভের দৃঢ়, শান্ত এবং জ্ঞানগর্ভ বক্তব্য তুলনাহীন। সে বলেছিল, “তোমার কি লজ্জা হয় না? তোমার আচরণে হয়তো বাচ্চাটা জেগে উঠেছে।” ঐ সময়টাতে এক মূহুর্তের জন্যও সে কিংকর্তব্যবিমূঢ় ছিল না, ভয় ছিল না, শংকিতও হয়নি। সে ভাবেওনি তার কোন দয়া-দাক্ষিণ্য দরকার আছে। সম্ভবত তার শেষ বক্তব্য ছিল: “Here I ain’t been traveling but a month, and I’m already in Tennessee. My, my, a body does get around.”

“As I Lay Dying” লেখাতে বান্ড্রেন পরিবার নিজেরাই তাদের জীবনকে সামলে নিয়েছিল। স্ত্রী বিয়োগের পরে, স্বাভাবিক ভাবেই বাবাটির একজন সঙ্গী দরকার ছিল। কাজেই তিনি একজনকে নিয়েও নিয়েছিলেন। তারপর, এক ধাক্কাতেই তিনি শুধু পারিবারিক পাচক পরিবর্তন করলেন না, বিশ্রামের সময় সবার জন্য একটা গ্রামোফোনের ব্যবস্থা করলেন। অন্তঃসত্ত্বা মেয়েটি এবারে তার অবস্থা পরিবর্তন করতে না পারলেও নিরুৎসাহিত হল না। সে আবার চেষ্টা করতে চাইল। আর তো কিছু নয়, শুধু আর একটা সন্তান।


সাক্ষাৎকারী
মিস্টার কাউলি আরও বলেন যে আপনি বিশ থেকে চল্লিশ বছরের মধ্যে সহানুভূতিশীল চরিত্র সৃষ্টি করতে আপনার অসুবিধা হয়।

ফকনার
বিশ থেকে চল্লিশ বছর বয়েসী লোকেরা সহানুভূতিশীল নয়। একটা শিশুর যে ক্ষমতা আছে, আমার তা নেই। আমি শুধু জানি চল্লিশের পরে এটা হবার নয়। বিশ থেকে চল্লিশের মধ্যে একটা শিশুর মত প্রবল ইচ্ছাশক্তি থাকে, এটা খুব বিপজ্জনকও বটে, কিন্তু শেখার সময় তখনও শুরু হয়নি। এই সময়টাতে বিনোদনমূলক পরিবেশের কারণে সে নষ্টের দিকেই পরিচালিত হয়। পৃথিবীর যত খারাপ কাজ তা বিশ থেকে চল্লিশ বছরের লোকের জন্যই হয়। আমার বাড়ীর চতুর্পাশের লোকজনের জন্যই যতসব বর্ণবৈষম্যমূলক ঝামেলা চলছে – মিলাম এবং রায়ান্ট (এমিট টিল খুন হল) এবং নিগ্রো গুন্ডারা এক শ্বেতাংগীনিকে ধর্ষণ করে প্রতিশোধ নিল। হিটলার, নেপোলিয়ন এবং লেনিনের কথাই ধরুণ। মানুষের দুর্দশার জন্য এরাই দায়ী। এদের সবার বয়সই বিশ থেকে চল্লিশের মধ্যে।

সাক্ষাৎকারী
এমিট টিলের খুনের সময় আপনি কাগজে একটা বক্তব্য দিয়েছিলেন। ওটাতে আপনি কি আর কিছু সংযোগ করতে চান?

ফকনার
“Soldier’s Pay” যখন লিখি, তখন মনে হত আনন্দ থেকেই লেখালেখি করি। শেষের দিকে আরো মনে হত, প্রতিটি লেখার জন্য একটি ছক থাকা উচিৎ। একজন লেখকের সমস্ত কাজই ছক অনুযায়ী হওয়া উচিৎ। “Soldier’s Pay” এবং “ Mosquitoes “ আমি শুধু লেখার জন্যই লিখেছিলাম কারণ লেখার মধ্যে আনন্দ আছে। “Sartoris” লেখার সময় থেকে আমি অনুভব করলাম, দেশের একটা ছোট্ট পোষ্টেস স্ট্যাম্প নিয়েও লেখা যায়। কিন্তু এটা নিয়ে লেখালেখি করলে আমার সুনাম দীর্ঘস্থায়ী হবে না। বরং রূপক বা উপমার মোড়কে আসল বিষয়কে প্রকাশ করার স্বাধীনতা আমার আছে। আর তাই দিয়েই আমার যা প্রতিভা আছে তার চুড়ান্ত প্রয়োগ করা উচিৎ। অন্য লোকদের মধ্যেই আমি স্বর্ণখনির সন্ধান পেলাম। এভাবেই আমি আপন বিশ্ব রচনা করলাম। আমি এই লোকগুলোকে ঈশ্বরের মত গতিময় করতে পারি, শুধু মহাশুণ্যেই নয়, সময়ের প্রেক্ষিতেও। এই যে অন্তত আমার বিবেচনায় আমি আমার চরিত্রগুলোকে সময়ের সঙ্গে গতিশীল করতে সফল হয়েছি, এটা দ্বারাই আমার তত্ত্ব প্রমাণিত যে, সময় হল একটি বায়বীয় ব্যাপার, যেন মানুষের তাৎক্ষণিক একটা ভিন্ন রূপ ছাড়া এর কোন বাস্তবতা নেই। কিছু “ছিল” বলে কিছু নেই – “আছে”টাই সত্য। কোন “ছিল” নিয়ে মনে কষ্ট পাওয়ার কোন অর্থ নেই। আমার ভাবতে ভাল লাগে, এই মহাবিশ্বে আমি যত ছোটই হই না কেন, আমি একটি বিশ্ব সৃষ্টি করেছি যে বিশ্বটাকে আলাদা করলে মহাবিশ্বটাই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। Yoknapatawpha County নিয়ে আমার শেষ বই হবে “Doomsday Book, the Golden Book”। এর পরেই আমার পেন্সিলটা ভেঙ্গে ফেলব। আমাকে থামতে হবে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন