সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০১৫

হামীম কামরুল হকের গল্প : অপদেবতার হাসি

ছেলেগুলি গাড়িটাকে ঘিরে ফেলে। সবার হাতেই লাঠি। একজনের হাতে একটা ক্যান। ঘিরে দাঁড়াতে না দাঁড়াতেই দুজন গাড়ির দুপাশে গিয়ে গাড়ির কাঁচ ভাঙে। তারা সরে যেতেই দলের আরও দুইজন এগিয়ে যায়। গুলি করে। পর পর, ধামাধাম। একই সময়ে যার হাতে ক্যান ছিল সে গাড়ির গায়ে পেট্রোল ঢালতে থাকে। গাড়ির সামনের সিটেই বসা ছিল দুজনে। তারপর গাড়িটায় আগুন দেয়। -- এই পুরো দৃশ্যটি ডিজিটাল ভিডিও ক্যামেরায় ওঠে। সদর রাস্তার পাশে থাকা দোতলার একটা জানালায় পর্দাটা সামান্য ওঠানো ছিল, সেটা নেমে যায়।


সে আসলে ক্যামেরায় ছবি তুলছিল রোদের তাপ বাড়লে সূর্যের আলো মানুষ ও তার আশপাশের কী অবস্থা হয়। বৃষ্টির দিনের ছবি, সকাল বেলার ছবি, ভোরের ছবি আর মানুষ-- ক্যামেরাটা কেনার পর থেকে এমন ছবি তোলা একরকম নেশাই হয়ে গেছে। যেখানে যায় কেবল রাস্তাঘাট, পথ, মানুষের ছবি তোলে। ভিডিও করে। সেদিন ভিডিও করছিল মফস্বল শহরে দুপুরের রাস্তা। তখনই একটা মোটর গাড়ির ঠিক সামানে আরেকটা গাড়ি থামে। পরের গাড়িটা মাইক্রোবাস। দুপাশের দুটো দরজা ধাঁ ধাঁ করে খুলে যায়। সাত আটটা ছেলে নেমে আসে। সঙ্গে সঙ্গে জানালার পর্দার আড়ালে চলে যায় সে। ক্যামেরাটাকে আড়াল করে ভিডিও করতে থাকে দৃশ্য। কাজটা করার সময় তার ভেতরে কী হয়েছিল সে নিজেও জানে না। মিনিট কয়েকের ঘটনা। ওই এলাকার চেয়ারম্যানর (পরের দিন খবরের কাগজ থেকে নামগুলি জানে) আরবাজ মোসাদ্দেক হিটু আর তার ড্রাইভার আবুল বাসার কিছলু খুন। খুনের পর গাড়িশুদ্ধা পুড়িয়ে কয়লা করে দেওয়াটা দেখার জন্য তারা তো থাকেনি। যেভাবে এসেছিল, সেভাবেই গাড়িটা পেছনে নিয়ে তারপর সাঁই করে চলে যায়। দোতলায় দাঁড়ানো ক্যামেরা তখন গাড়ির নম্বরটাও তুলে নিয়েছে। নিয়েছে জুম করে ক্লোজআপে কয়েকটা ছেলের মুখও।

বুকের ভেতর কী হচ্ছিল, ক্যামেরায় তোলার সময় টের যে পায়নি। সে তো এখানকার কেউ নয়। এলাকার কাউকে সে চেনে না। ব্যবসার কাজে ওই হোটেলে থাকা। এর আগেও দুবার এসেছে। এখানে দেখবার মতো কিছু থাকলে লবঙ্গকে, মানে বউকে, সঙ্গে আনতো। যেমন বগুড়ায় যাওয়ার সময়ও নিয়ে গিয়েছিল। সিলেট যাওয়ার সময় নিয়ে গিয়েছিল। বউ এখানেও আসার সময় বায়না ধরে। বউকে লবঙ্গ বলে ডাকে না, বউ-ই বলে।

সে বলে, দুরো, ওখানে কিছু নাই।

বউ বলে, আমাকে ব্লাফ দিও না।

ব্লাফ দিলাম কোথায়? তুমিই বলো তাহলে ওখানে কী কী আছে।

আমি কীভাবে বলব, আমি কী ওখানে কোনোদিন গেছি নাকি। গেছ তো তুমি।

আমি যখন গেছি, তো আমিই বলতেছি, ওখানে দেখার মতো কিছু নাই, সোনাবউ।

কথাটা বলার সময় বউয়ের দুই গাল দু হাতে টিপে ধরে নাড়া দেয়।

দৃশ্যটা তোলার পর ভাবছিল ভাগ্যিস বউ সঙ্গে ছিল না। কিন্তু এই দৃশ্য নিয়ে সে কী করবে? এই তো গত বছর না তার আগের বছর বিশ্বজিৎকে সবার সামনে কোপানের খবর পত্রপত্রিকায়, টিভিতে দেখানো হয়েছিল দিনের পর দিন। ছবি তোলার জন্যই আর কোনো কিছু লুকাতে পারা যায়নি। কিন্তু তারপরও কি সবাইকে কব্জা করা গেছে? তারা কি ওই সাংবাদিকদের কোনোদিন দেখে নিতে চাইবে না? কে জানে বাবা।

তার বুক তখনও ধুক ধুক করছে। এটা কী দেখল! আর কেনই সে এভাবে ঘটনাটা ক্যামেরায় নিল? কী করবে এই নিয়ে? পুলিশের কাছে যাবে, না সাংবাদিকদের কাছে? তারপর বলবে, এই হল ঘটনা, যারা খুন করেছে, আগুন লাগিয়েছি, দেখেন ছেলেগুলি কারা, চিহ্নিত করেন, ধরেন, তারপর বিচার করে উপযুক্ত শাস্তি হোক এদের।-- এমন কিছু কি সে বলতে পারবে? তাহলে কী করবে এই ক্যামেরায় ভিডিওটা রেখে?

বছরখানিক আগে বউয়ের আবদারে ক্যামরাটা কেন।

‘এত্তগুলি টাকা খরচ কইরা কোনো লাভ হইল।’

‘ঘরে এমন একটা সুন্দর বউ আছে। তার ছবি তুলবা লোকজনরে দেখাবা-- সেটা বুঝ তোমার মনে চায় না, না?’

‘তার জন্য ক্যামেরা লাগব ক্যান, মোবইলেও তো কত ছবি তোলা যায়। আমার মোবাইলের ক্যামেরার রেজুলেশন যথেষ্ট ভালো।’

‘কী যে কও না। ছাগল দিয়ে ধান মাড়ানি হয়! এখন তো গাইগুই করতেছো, কেনার পর তুমি যদি আমার চেয়ে বেশি পাগল না হও, তো কইয়া রাখলাম।’

ঢাকার সবচেয়ে বড় শপিং সেন্টার থেকে ক্যামেরাটা কেনার দিন বউ আর সে গিয়েছিল। ক্যামেরা কেনার পর থেকে বউয়ের কলকলানি আর থামেই না। বউ বলে, ‘আজকাল কারো ক্যামেরা না থাকলে চলে?’ যদিও চলে, কিন্তু ক্যামেরা হইল স্ট্যাটাস! যার হাতে ক্যামেরা থাকে তার দামই আলাদা। বউ বলে,‘আচ্ছা, লোকজন নাকি ক্যামেরায় ফটো তুইলাই লাখ লাখ টাকা কামায়?’ বউয়ের সব কথায় এই টাকা। আরো টাকা কী করে করা যায়।

বউয়ের কথাই সত্যি হয়। তাকেই পেয়ে বসে ক্যামেরাটা। প্রথম দিকে বউ কিছুদিন মেতে ছিল। কত যে ছবি তুলেছে, তার কোনো ইয়ত্তা নেই। তারপর আশেপাশে বাসার ভাইভাবি বাচ্চাদের ছবি। আর তারপর থেকে আরেক কলকলানি, ‘আমাদের যদি একটা বাচ্চা থাকতো। কত্ত ফটো তুলতে পারতাম।’ এরপর থেকে গত কয়েক মাসের চেষ্টায় লবঙ্গ এখন তিন মাসের পেয়াতি।

ক্যামেরা কেনার পর শুরু হয় কম্পিউটার কেনার বায়না। ‘আজকাল কম্পিউটার না হইলে চলে।’ পাশের বাসায় কলেজে পড়া মেয়েটার কাছে শুনেছে ফেসবুক খোলার কথা। ফেসবুকে অনেক মজা। আর সেখানে ছবির পর ছবি আপলোড করা যায়।-- এইসব কত্ত কী।

কিনে আনতে হয় সেকেন্ডহ্যান্ড একটা কম্পিউটার। বউ ব্যস্ত হয় ফেসবুক নিয়ে আর তারপর অদ্ভুতভাবে তার একদিন ক্যামেরাটকে ভালো লেগে যায়। সে নিজেই দুনিয়ার ছবি তুলতে থাকে। আর বউ ফেসবুকে আপলোড করতে থাকে। এসবই পাশের বাড়িরও কলেজে পড়া মেয়েটা দেখিয়ে দিয়ে গেছে।

গ্রামের বাড়িতে গিয়েও সে দেখেছে। আজকাল কেবল দুবেলা খেতে পারলেই হল না। টিভি দরকার, মোবাইল দরকার। ছেলেমেয়েরে ভালো স্কুলে ভর্তি করা দরকার, লেখাপড়া শেখানো দরকার। এমন কত দরকার যে তৈরি হইছে!

সেদিন অফিসে পাশের টেবিলে রহমত ভাইয়ের কাছে একজন এসে এই গল্পই করছিল, এক গ্রামে নাকি সবাই কিডনি বেঁচে। বিয়েও করে বউয়ের কিডনি বেচানোর জন্য। ছেলেরও বিয়ে দেয়, ছেলের বউয়ের কিডনি বেচার জন্য। কেবল খাওয়া দিয়েই এখন জীবন চলছে না কোথায়, থাকা দিয়েও না।

রহমত ভাই বলছিলেন, ‘তাহলে ঢাকার ফুটপাতে বস্তিতে যারা থাকে তাদের অবস্থা চিন্তা করে দেখেন।’

‘আর অবস্থা, বড় বড় নেতাদের, আমলাদের, দেশের তথাকথিত মান্যগণ্যজঘন্য লোকজনের চুরিদারি যদিন বন্ধ না হইবো, ততদিন কিছুই বদলাইবো না।’

‘তবে চুরি কিন্তু কেবল বড় বড় লোকেই করে না। এদেশের রিক্সাওয়ালা সবজিওয়ালা থেকে শুরু করে কমবেশি সবাই অসৎ।’

তখন পাশের একজন বলে, ‘ভাইরে দুনিয়ার লোকের সৎ-অসৎ বিচার করইরা কী হইব। আমি-আপনি সৎ কিনা সেটাই দেখেন।’

‘তা ঠিকই কইছেন। আমরা তো ‘পান না তাই খান না’-র দলের লোক।’

‘হ্যাঁ, সেদিন আমার এক মামা, কলেজে পড়ান। খুবই অনেস্ট লোক। তাও কী বললেন জানেন?’

‘কী?’

‘বললেন, আমি নিজেকে কী করে সৎ বলি, কেউ তো আমার সামানে কোটি টাকা রেখে দেখেনি।’

শুনে সবাই হো হো করে হেসে ওঠে।

সে সবার কথা শুনছিল। কথাগুলি যে তার উদ্দেশ্যে বলা হচ্ছে কিনা কে জানে। বিভিন্ন পার্টির কাছ থেকে পারসেন্টেজ খাওয়ার বেলায় ওস্তাদ হিসেবে তার নাম আছে। একজন বলে বলে, ‘বিদেশে টাকা মারে কেমনে জানেন? ধরেন একটা ব্রিজ করতে খরচ হবে একশো কোটি টাকা। তারা করে কি একশো ত্রিশ কোটি টাকার বাজেট করে। কাজটা ওই একশো কোটি টাকা দিয়ে ঠিকমতোই হয়, তখন ওই ত্রিশ কোটি তারা ভাগেযোগে খায়।’

‘বুঝলেন, সবখানে মারামারি যা হয় সবই এ-ই’, বলে, বাম হাতের বুড়ো আঙুল আর তর্জনী ঘষে ঘষে বলে, ‘মানির জন্য। এছাড়া এখন আর কোনো সমস্যা নেই। মানি দেন তো সব পানি। সবাই আপনাকে মেনে নিবে। মানি দেন তো সবাই আপনার সঙ্গে ইচ্ছা না চাইলেও মানিয়ে নেবে। আর আপনি তো মানি দিয়েই মানী লোক হয়ে উঠবেন। পানির মতো মানি কামান তো...’

তারপর কথাগুলোর দৃশ্যগুলির তাল কেটে ঢুকে পাড়ে ভর দুপুরের রাস্তা। লোকজনের আসা যাওয়া। তার ভেতরে একটা গাড়ির সামনে আরেকটা গাড়ি। মাইক্রোবাস। দুপাশ থেকে নামে মৃত্যুদূতেরা। সামনে আটকে পড়া মোটরগাড়ির কাছে গিয়েই জানালার কাঁচ ভাঙে, গাড়িতে পেট্রোল ঢালা, তারপর গুলি, আগুন...

এরপর আবার দৃশ্যগুলি কেটে যায়। তার হাতে থাকা ক্যামেরাটা নড়ে ওঠে। আরেকটু হরে হাত থেকে পড়ে যেত। বুকের ভেতর শব্দ হতে থাকে। নানান রকমের শব্দ, ঘ্যাস করে গাড়ির থামার, গাড়ির দরজা খেলার, এলোমেলো পায়ের শব্দ, কাঁচ ভাঙার, তারপর গুলি। নাকে আশে গাড়ি পোড়ার গন্ধ সঙ্গে আরেকটা কেমন গন্ধ, সেটা কি মানুষ পোড়ার? সে বুঝতে পারে না কেন আচ্ছন্নের মতো সে দৃশ্যগুলি তুলেছিল।

মাথা ঠাণ্ডা করো মিয়া, যাও বাথরুমে গিয়ে হাতমুখে পানি দেও। পারলে গোসল করে একটা ঘুম দেও। তারপর যত তাড়াতাড়ি পারো ভাগো। যে পলাইছে, হেই বাঁচছে।

এই কথার পর আরো কথা তৈরি হতে থাকে। কী করবা এই ভিডিও নিয়া? ধান্দাবাজি। যারা মারছে তাদের পার্টির কাছে নিয়ে কবা, কিছু ছাড়েন, নইলে...? ব্ল্যাকমেইলিং করবা? নাকি যারা মরছে তাদের পার্টির হাতে তুইলা দিবা অপনয়েন্টকে ঘায়েল করার এই মোক্ষম অস্ত্রটা? নাকি পুলিশের কাছে নিয়ে দিয়ে দিবা? নাকি সাংবাদিকদের কাছে? টাকা কামানোর একটা রাস্তা বানাতে পারো মিয়া। তবে রিক্স আছে। জান পর্যন্ত খতরা হইতে পারে। আর... কিছুই যদি না করতে পারো তো ভাগো হিয়াসে। আজকাল তো রক্তের ভেতরে, আগুনের ভেতরেই সব মজা। জ্বালো জ্বালে আগুন জ্বালো। আর চাইলে নিজে নিজে বসে এই দৃশ্য বারবার দেখে নিজের মতো করে মজা পাও, যেমন করে তার এক বন্ধু আর বন্ধু বউ নিজেদের বিছানার দৃশ্য নিজেরাই ভিডিও করে বার বার দেখে। এটা বলে পরের বারের টনিক হয়ে কাজ করে। কিন্তু তার তো কোনো টনিকের দরকার নেই। প্যানিকেই সে পাগল হয়ে যাবে কিনা। প্যানিক শব্দটা ইংরেজি শিখতে গিয়ে জেনেছিল। এখন আতঙ্কের বদলে প্যানিক শব্দটাই বলে সে। তারপর তো কত কিছু দেখলো এলাকাজুড়ে প্যানিক আতঙ্ক। পুলিশের দৌড়াদৌড়ি, লোকজনের দৌড়াদৌড়ি। মিছিল। পরের দিনই হরতালে ঘোষাণ দেওয়া হল। তখনও ঠিক করে আজকের রাতেই পালাতে হবে। সে রাতের লঞ্চ ধরে। লঞ্চটা ছাড়ার পর হাঁপ ছেড়ে বাঁচে। এর আগ পর্যন্ত কেবলই মনে হচ্ছিল-- তাকে যেন কেউ ধাওয়া করছে।

.....................



কেবিন পাওয়া গিয়েছিল। সেদিন যাত্রী কম। লঞ্চ ফাঁকা ফাঁকা। সে কিছুক্ষণ কেবিনে থাকে আর কিছুক্ষণ পরে বার হয়ে আসে। অনেকক্ষণ ধরে এই-ই করছিল সে। ব্যাগের ভেতরে রাখা ক্যামেরাটাকে বোমার মতো মনে হয়। মনে হয় একটা অবৈধ অস্ত্র নিয়ে ঘুরে বেড়চ্ছে। কেবিনে ব্যাগটার কাছে এলে বুকের ভেতরে শব্দ বাড়তে থাকে।

রাতের লঞ্চ। কেমন একটা রহস্য রহস্য ভাব চারপাশে ছড়ানো। রাত বাড়ে যত, ততই রহস্য বাড়ে। সে দাঁড়িয়ে থাকে নিজের কেবিনের বাইরে। রাত তখন কত হবে? পাশের রুম থেকে অনেকক্ষণ ধরেই হাসাহাসির শব্দ পাচ্ছিল। একবার তাকিয়ে দেখে দরজার পাশে ছোট্টা জানালাটা খোলা। একটাই তো দরজা। সিঙ্গেল কেবিন। একটু জোরেই শব্দ হয়, ‘আহা ঘোরো তো দেখি। হ্যাঁ, এই বার ঠিক আছে। দ্যাটস গুড!’ বেশ জোরে কথাটা আসে। রাত কত বাজে মোবাইলটা বের করে দেখে নেয়। লঞ্চে চলার শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। কেমন একটা ঝিম মারা লাগছে। এর ভেতরে পাশের কেবিনের হাসাহাসি শুধু।

তারপরও এতক্ষণ ধরে একটা জিনিস নিয়ে থাকতে থাকতে এবার মনটা আপনাআপনি অন্যদিকে ঘুরে যেতে চাইছে। মজার জিনিস না হলে মন একই জিনিস বেশিক্ষণ ধরে বইতে পারে না। মজার জিনিসও তো বেশিক্ষণ বইতে পারে না। ওই যে হাসির অনুষ্ঠানটা হয়। একটা খুব বেশি হলে দুটোতিনটা জোকই মনে থাকা।-- ‘এক মামা; বুক ভরা লোম। দেখে তার সুন্দরী গালফ্রেন্ড একদিন বলে, বুক তো নয়, যেন গহীন অরণ্য। মামা বলে, এই অরণ্যে বেড়াতে এসো, একটা গণ্ডার তোমার জন্য অপেক্ষা করে থাকবে।’ বোম ফাটানোর মতো হেসে উঠেছিল লবঙ্গ। সে প্রথমে কিছু বুঝতে পারেনি। এত জোরে হাসির কী হল?

রাতে ফিরে টিভির সামনে খবরের কাগজ নিয়ে বসা তার অভ্যাস। জোকটা বলার সময় সে কাগজটা নামিয়েছিল। লবঙ্গ এত জোরে তো হাসে তারপর টেনে টেনে অনেকক্ষণ চলে হাসির দমক। এত হাসির কী হলো?

বিজ্ঞাপন বিরতির সময় লবঙ্গ তাকে ঘটনাটা বলে। এবার সেও হা হা হা করে হেসে ওঠে। আর গালে ঠোনা মেরে বলে, ‘এইবার বোকারাম তিন বার হাসো।’

......................

পাশের কেবিন থেকে এবার একসঙ্গে হাসির শব্দ শোনা যায়। মাঝখানে অনেকক্ষণ কোনো হাসির শব্দ ছিল না। কোনো শব্দই ছিল না। প্রথমে ‘হাঃ’ করে একটা শব্দ হয় তারপর টেনে টেনে একটা হাসি, সেটা পুরুষের, এর সঙ্গে একটু পর নারীর হাসিটা যোগ হয়। ভেঙে ভেঙে হাসি। তারপর আবার সব চুপ।

সে নদীর দিকে তাকায়। ভিডিওটা মন থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা করে আসছে সেই তোলার পর থেকে। একবার তার মনে হল, সে তো নিজের চোখে কিছুই দেখেনি, যা দেখেছে, সব ওই ক্যামেরাটাই দেখেছে। সে যে ক্যামেরাটা তাক করে এক বার চোখ তুলে দেখবে ঘটনাটা, সেটা একটুখানিকের জন্যও পারেনি। সে ক্যামেরা দিয়েই দেখেছিল যা দেখার। যদি সে এটা থানায় গিয়ে দেখাতে পারে, তারপর আদালতে উকিল যদি তার কাছে জানতে চায়, ‘যখন গুলিটা হয়, মানে ওই খুন দুটা হয়, গাড়ি পোড়ানো হয়, এ সময় আপনার চোখ কোথায় ছিল?’

‘ক্যামেরায়।’

‘ঠিক বলছেন তো।... তাহলে আপনি নিজের চোখে ঘটনাটা দেখেনি। ক্যামেরায় দেখেছেন। কী করে প্রমাণ হয় যে আপনিই সত্যটা দেখেছেন...’ তারপর প্রচ- জোরে একটা শব্দ। আদালতে বোমা ফাটে। একদল লোক হুড়মুড় করে কাঠগড়ার সামনে চলে আসে। গুটি কয়েক পুলিশ তাদের প্রথমে থামানোর চেষ্টা করে, না পেরে পরে শুরু হয় লাঠিচার্য। এসব হট্টগোলের ভেতরে তার পেছনে একটা লোক চলে এসেছিল, সে কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার মাথার পেছনে ধাঁ করে একটা বাড়ি পড়ে। সে কাঠগড়ায় স্তূপের মতো পড়ে যায়।

সারারাত এমন সব দৃশ্য আধোঘুমে আধোজাগা অবস্থায় সে দেখে গেছে। বার কয়েক মনে হয়েছে-- ডেকে গিয়ে দাঁড়াবে। পাশের কেবিনে কি এখন ফুর্তি চলছে কিনা কে জানে? তবে সারারাতই মনে হয় ফুর্তি চলেছে। এরা কি নতুন বিয়ে করেছে, নাকি প্রেমিক-প্রেমিকা নাকি... এসব কথা আসে আবার হারিয়ে গিয়ে আবার মগজ ফেটে রক্ত এসে ভাঙা জানাল কাচে লাগে, আগুন জ্বলে ওঠে।

সে কি লবঙ্গকে গিয়ে বলবে ঘটনাটা? কাউকেই তো বলতে পারেনি। কেবল ভেতরে ভেতরে অস্থির হয়ে আছে। ছটফট করেছে খাঁচায় রাখা পাখির মতো। আস্তে আস্তে ছটফটানিও কমে গেছে। তারপর দৃশ্যগুলি গেঁড়ে বসেছে মাথায়।

নিজে কলেজে থাকার সময় একটা সংগঠনের পাল্লায় পড়েছিল। মাঝে মাঝে বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছে মারামারির জন্য-- টেন্ডারের ভাগ নিয়ে মারামারি, কর্তৃপক্ষ লিডারের গার্লফ্রেন্ডকে ভর্তি হতে দিবে না, কারণ ওয়েটিং লিস্টেও নাম নেই, কিন্তু একটা ঝামেলা পাকিয়ে কাজটা করতে হবে তো লাগাও গ্যাঞ্জাম, ভার্সিটির সামনের মেইনরোড আটকে দাও।

‘‘পলেটিক্স বিহাইন্ড দ্য পলেটিক্স ইজ মোর ক্রিটিক্যাল।’’ গ-গোল থামাতে তাদের সঙ্গে সমঝোতার কথাবার্তা বলার সময় ভিসি স্যার দীর্ঘশ্বাস ফেলে এই কথাটা বলেছিলেন। খুব দাগা দিয়েছিল কথাটা। অন্য কেউ হয়তো শুনেই নাই। বলতে কি-- এই কথাটাই পলিটিক্স থেকে তাকে এক রকম সরিয়ে এনেছে। কারণ ওত গভীরে সে যেতে পারবে না। পেছনের কলকাঠি নাড়ানো হোমরাচোমরা সে কোনো কালেই হতে চায় না, চাইলেও হতে পারবে না। অনেক কষ্ট করে গা থেকে সেই সংগঠনের গন্ধ দূর হয়েছে। সেসময় মারামারির দৃশ্যও তার কম দেখা হয়নি। লাঠিশোটা, কিরিচ, রামদা, চাপাতি। তবে তার হাতে কোনোদিন এসব ওঠেনি। হলে সিট পাওয়ার জন্য ওই দলে যোগ দিতে হয়েছিল। মিছিলটিছিলে যেতে হয়েছিল। নইলে থাকতে পারতো না।

একেবারে গ্রামের ছেলে সে। বিভাগীয় শহরে এসে তাল পাচ্ছিল না। তারপর কোনো মতে বি.এ পাশ করে বেঁচেছে। এম.এটা আর দেওয়া হয়নি। আসমত চাচা বলেছিল, ‘মানুষের এত লেখপড়ার, জ্ঞানবিদ্যার দরকার নাই, যা দরকার তা হইল কা-জ্ঞান-- কখন কোন পরিস্থিতিতে কী করতে হবে, কার সঙ্গে কীরকম করতে হবে-- এসব বোঝাই হল আসল লেখাপড়া। ইন্টার পর্যন্তই লেখাপড়া যথেষ্ট। তারপর লেখাপড়া করবে যারা কোনো কিছুতে এক্সপার্ট হতে চায়। লেম্যানদের জন্য ইন্টার কেন ম্যাট্রিক পাস করারই যথেষ্ট। ওইটুকু বিদ্যার পর যার সত্যিই বোধ-বুদ্ধি আছে সে বিরাট ব্যবসায়ী কি শিল্পপতি সবই হতে পারে।’

বিদ্যাটিদ্যা কোনোটাই তার মাথায় বেশি ঢুকতো না। তারপর ইংরেজি শিখতে হবে। ঢাকা এসে নানান মেথডে সে ভর্তি হয়ে দেখেছে। ইংরেজি পত্রপত্রিকা পড়তে চেষ্টা করেছে। পল্টনের ফুটপাত থেকে কার যেন একটা ইংরেজি গল্পের বই কিনেছিল, তেমন করে পড়া হয়নি। এদিকে বাবা মারা যাওয়ায় সংসারের ভার ওঠে তার ঘাড়ে। বড় ভাইয়েরা ছিল, কিন্তু তারা গ্রামে চাষবাস নিয়ে আছে। সাদাসিধা মানুষ। তারওপর এত্ত বোকা। সে আর কী বোকা! অল্প কিছু জমিজমা আছে-- তা দিয়ে কোনো মতে চলে। বর্গা দেওয়া থেকে আর কতটুকু আসে। বাবা এমন ছিল না। মামাদের বোকামির ধাঁত পেয়েছে ভাগ্নেগুলি। বাবা একসময় পাটের ব্যবসা করতো। লাভ-লগ্নি ভালোই ছিল-- তা দিয়ে হাটে কয়েকটা দোকান করেছিল। পরে সেগুলি নানান কারণে একটা একটা করে বিক্রি হয়ে গেছে।

নিজে ঢাকায় এক মামাতো ভাইয়ের তদবিরে একটা কোম্পানির সেলসে ঢুকেছে। নানান সময় এ-জেলা ও-জেলা যেতে হয়। লোকজন বলছে বিবিএটা পড়তে পারে। পারলে এমবিএ-- নইলে এ লাইনে উন্নতি নাই।

উন্নতি তার একটু একটু করে হচ্ছে। লবঙ্গ একটা স্কুলে পড়ায়। অঙ্কে মাথা খুব ভালো। বাসায় কয়েকটা ছেলেমেয়ে পড়তে আসে। সবমিলিয়ে দুজনের ভালোই চলে। চলে যাচ্ছে বলেই দুজনে মিলে এই সব দুমদাম কেনা হল-- ক্যামেরা, কম্পিউটার। ফ্রিজ টিভি তো ছিল। লবঙ্গ কয়েক ভরি সোনার গয়নাও করেছে। লবঙ্গের ইচ্ছা ঢাকা শহরে নিজের ফ্ল্যাটে থাকবে। সে যদি নিজের একটা ব্যবসা দাঁড় করতে পারে তো সেসব করা এমন আর কঠিন কী। কদিন আগে তার জন্য ‘দ্য সেভেন হ্যাবিটস অব হাইলি ইফেক্টিভ পিপল’-এর বাংলা অনুবাদ কিনে এনেছে লবঙ্গ। স্বামীকে সে চাকরি থেকে ছাড়িয়ে ব্যবসায় আসমানে তুলে ছাড়বে।

এখন লবঙ্গকে গিয়ে যদি ভিডিওটা দেখায়, যদি বলে, এই ভিডিও দিয়ে তারা বড় একটা দান মারতে পারে, তাহলে? কিন্তু উল্টোটাও তো হতে পারে, সর্ব দিকে সর্বনাশ হতে পারে, এর জন্য তারা দুজনেই খুন হয়ে যেতে পারে। রক্ত ডেকে আনবে আরো রক্ত। তাদের মতো দুটো মানুষ, একটু একটু করে সামনের দিনগুলিকে যারা গড়তে চায়, এই গড়ার সময় কিছু কি ভাঙাতে হয়? লোকে তো বলেই-- গড়তে হলে ভাঙতে হবে, তাই বলে নিজের শান্তি-স্বস্তি তো আর ভাঙা যায় না। জীবিকায় গতি চাইলে ব্যক্তিগত জীবনে স্থিতি চাই-ই চাই।-- অন্তত এবয়সে এটুকুই সে বুঝেছে।

তাহলে সে এই কী করবে সে ভিডিওটা নিয়ে? মুছে দেবে? অনেক কিছু দেখার পরও তো মুছে দিতে হয়, ভুলে যেতে হয়। সেও তো তার জানা।

........................

ভোর হতে একটু বাকি। ঢাকায় পৌঁছানোর সময় হয়ে গেছে প্রায়। সে বিছানায় আর শুয়ে থাকতে পারে না। আবার ডেকে আসে। বেরিয়েই দেখে একটি লোক, তাকে পেছন থেকে দেখা যাচ্ছে। ফৌজি ছাঁটের চুল। পরনে কোয়াটার প্যান্ট। টি শার্ট। পেশালো, পেটানো শরীর। কী বাইসেপ, পায়ের গুল্লি-- বাব্বা! দুহাতের কব্জিতেই কালো কালো রবারের চুড়ি। হেলান দিয়ে দাঁড়ানো। আর পাশে যে মেয়েটা, দেখে রীতিমতো চমকে ওঠে। তিসি না?

তিসি লবঙ্গের কেমন যেন খালাতো বোন। খুব কাছের কেউ না। উত্তরায় থাকে। কীসব মডেলিংটডেলিং করে। চোখাচোখি হলেও তিসির মধ্যে তেমন কোনো ভাব জেগে ওঠে না। চুল খোলা। তিসির চুল এত কোঁকড়ানো ছিল নাতো। পার্লারে গিয়ে করে এসেছে হয়তো। নাকি সে ভুল করছে? আর গায়ের রঙ আগের চেয়ে অনেক ঝলমলে দেখাচ্ছে। লোকটার একটা হাত রেলিংয়ে রাখা। তিসির হাত তার হাতের ওপরে হাত বুলাচ্ছে, চোখে মুখে কথা বলছে মেয়েটা, আনন্দ সুখের অগুণতি ঢেউ পা থেকে মাথা পর্যন্ত খেলে যাচ্ছে বার বার। তাকে চিনতে পারেনি মনে হয়, নাকি ভান করছে। ভান করাটাই তো কাজের কাজ এখন।

সে অন্য দিকে তাকিয়ে নদী দেখতে থাকে। তিসি লোকটাকে কী যেন বলে। লোকটা বলে, ‘আবারও!’ তার সঙ্গে কেবিনে ঢুকতে ঢুকতে মনে হয় ইচ্ছা করেই বলে, ‘সারারাত তো ঘুমাতেই পারলাম না তোমার জ্বালায়।’ তিসি গা দুলিয়ে হেস ওঠে। লোকটাকে টেনে ভিতরে নিয়ে যায়। দরজা বন্ধ করার আগে তার দিকে তীব্র কটাক্ষ হানে। শুরু হয় হাসাহাসি। এবার অনেকটা চাপা।

সে কি ঢাকায় ফিরে লবঙ্গকে তিসির কথা বলতে পারবে? বললে এক কান থেকে দশ কান হয়ে তারপর...। তিসি যদি ক্ষেপে ওঠে, যে মেয়ে বাবা! তাকে কি এই দৃশ্যটাও হজম করতে হবে? তুমি পুরুষ মানুষ। হজম করাই হল পুরুষ মানুষের আসল শক্তি। হজম করো, হজম করো, হজম করো আর চুপ থাকো। নিজের ধান্দা করো, কাজ করো, জান দিয়ে খাটো, এগিয়ে যাও। জগতের কে কী করল তা দিয়ে তোমার কী? কোথায় কী হচ্ছে না হচ্ছে-- তা দিয়ে তোমার কী যায় আসে? এতক্ষণে তার ঠোঁটের কোনে একটা হাসি দেখা দেয়। কে তাকে হাসাল? তার কি এখন হাসি আসা সম্ভব? তাহলে কে? অনড় বিধির বিধাতা? সে কি বিধাতা, নাকি অপদেবতা?

সে কেবিনে ঢোকে। কিছুক্ষণ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর বিছানায় বসে। ব্যাগ থেকে ক্যামরাটা বের করে। পাশের বাড়ির কলেজে পড়া মেয়েটা তাকে ক্যামরাটা আনার দিনই শিখিয়ে দিয়েছিল কী করে সব ছবি মুছে দিতে হয়। একবার দেখেই শিখে নিয়েছিল সে। এটা করতে কখনোই ভুল হয়নি।


সে মুছে ফোলার বাটনে টিপ দিতে যাবে, ঠিক তখনি পাশের কেবিনে, প্রচণ্ড শব্দ করে দুজন হেসে ওঠে। তার হাতটা থমকে যায়।

২টি মন্তব্য:

  1. গল্পটির বর্ণনা চমৎকার। কিন্তু সমাপ্তিটা আর একটু চমৎকার হতে পারতো যদি এখানে নায়ক লবঙ্গকে দেখতে পেতো।

    উত্তরমুছুন
  2. গল্পটির বর্ণনা চমৎকার। কিন্তু সমাপ্তিটা আর একটু চমৎকার হতে পারতো যদি এখানে নায়ক লবঙ্গকে দেখতে পেতো।

    উত্তরমুছুন