মঙ্গলবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী, ২০১৬

শামসুজ্জামান হীরা'র গল্প : নন্দিনী

ঢাকা থেকে সৈয়দপুর পৌঁছাতে পেটের নাড়িভূড়ি হজম হয়ে যাওয়ার যোগাড়।

উনিশশো বাহাত্তরের মাঝামাঝি — সারাদেশের সড়কপথ, রেলপথ বিধ্বস্ত — কী যে দুর্ভোগ!

ভোরে রওনা দিয়ে সৈয়দপুর পৌঁছাতে সন্ধ্যা পার হয়ে যায় মামুনের। সৈয়দপুরে রেলওয়ের বড়সড় ওয়ার্কশপ। মামুনের মামা রেল-ডিপার্টমেন্টের একজন মাঝারি গোছের কর্মকর্তা।


জনপদের একপ্রান্তে সুনসান পরিবেশে দক্ষিণমুখী বাংলো টাইপের বাসা; ইটের দেওয়াল, অ্যাসবেস্টসের ছাউনি। পুব-পশ্চিমে প্রলম্বিত বাসাটির মাঝবরাবর সুপরিসর বারান্দা। বারান্দার দুই ধারে সুগন্ধি ফুলের বাগান। ফুলের ঘ্রাণ চপল দখিনা বাতাসের গা জড়িয়ে থাকে —ম-ম করে চারপাশ।

মামুন আসাতে মামি খুশি হয়েছেন বলেই মনে হল। বাড়িতে থাকার লোক বলতে দু’জন — মামা আর মামি। মামিও চাকরি করেন এক হাইস্কুলে — হেডমিস্ট্রেস। এক ছেলে, এক মেয়ে। ছেলে চাকরি করে খুলনায়; মেয়ের বিয়ে হয়েছে এক ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে, থাকে ঢাকায়।

পড়ন্ত বিকেলে বেতের চেয়ার নিয়ে বারান্দায় গিয়ে বসে মামুন; হাতে মাঝারি আকারের একটি বই। ছয় ফুটেরও বেশি লম্বা, হাল্কা-পাতলা গড়ন, উজ্জ্বল শ্যাম, একমাথা ঝাঁকড়া চুলে কপালের অর্ধেকটাই ঢাকা, বাম গালে কাঁচপোকা আকারের মাশ — সবকিছু মিলিয়ে নির্দ্বিধায় মামুনকে সুদর্শন বলা চলে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে ফাইনাল পরীক্ষা দিয়ে বাড়ি ফেরার পথে ক’দিন অলস সময় কাটানোর জন্য বেছে নিয়েছে এ-বাড়িটাকে। নিজ-বাড়ি দিনাজপুরের শহরতলিতে।

বকবকম শব্দে চোখ তুলে সমুখে তাকায় মামুন। বাসার সামনে সবুজ ঘাসে মোড়া ছোট্ট একচিলতে মাঠ। মাঠ পেরিয়ে গজ পঞ্চাশেক দূরে চৌচালা টিনের ঘর। ঘরের চাল ঘেঁষে কবুতরের খোপ। খোপের পাটাতনে কবুতরগুলো জোড়ায়-জোড়ায় একে অন্যকে গলা ফুলিয়ে প্রেমনিবেদন করেই চলেছে। বাসা আর মাঠের পশ্চিম-বরাবর বড়সড় এক দিঘি। দিঘির কিনারে আকাশে শাখা মেলে দাঁড়ানো ঝাঁকড়া-মাথা প্রকাণ্ড পাকুড়গাছ — আর তার ঠিক নিচেই দাঁড়িয়ে ধবধবে ফরসা এক মেয়ে। পশ্চিমে হেলে-পড়া সূর্যের ঈষৎ রক্তিম রশ্মি মেয়েটির উন্মুক্ত মুখ ও গ্রীবায় পড়ে গলে গিয়ে অপরূপ আভার সৃষ্টি করেছে।

মেয়েটি কে? ছোট্ট এক শিশুকে কোলে নিয়ে গাছের নিচে দাঁড়িয়ে; মাঝে মাঝেই আড়চোখে তাকাচ্ছে মামুনের দিকে। পরনে সালোয়ার-কামিজ, গলায় প্যাঁচানো ওড়না — দিঘল শরীরের অনুপম ভাঁজ নজর এড়ায় না।

মেয়েটা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করব নাকি মামা বা মামিকে? রাতে খাবার টেবিলে বসে মামুন ভাবে; থাক্, আছি তো বেশ ক’দিন; দেখা হবে আরও কতবার — তাড়াহুড়ার দরকারটা কী? এখনই এতটা কৌতূহল দেখানো ঠিক হবে না।

–কেমন লাগছে তোর? ঘুরেফিরে দেখেছিস সৈয়দপুর? মামা জিজ্ঞেস করেন।

–এলাম তো মোটে; কী ধকলটাই-না গেল! একা নয়, দু’জন একসাথে বেরোবো। বলে মামুন।


পরদিন সকালে মামুন আবার গিয়ে বসে খোলা বারান্দায় — পাকুড়গাছটার দিকে চোখ ফেলে; না ওখানে কেউ নেই। গতকাল শুরু-করা বইটার পাতায় চোখ বোলাতে থাকে। মন বসাতে পারে না একদম। বারবার অবাধ্য দৃষ্টি ছুটে যায় সমুখের গাছটার দিকে। হ্যাঁ, মেয়েটি আজও এসে দাঁড়িয়েছে গাছতলায় এবং কী আশ্চর্য এগিয়ে আসছে এ-বাড়ির দিকেই! মামুন নড়েচড়ে বসে। মাথার এলোচুল আঙুল চালিয়ে যদ্দুর পারা যায় ঠিকঠাক করে নেয়। কিছুদূর এগিয়ে শরীর বাঁকিয়ে পেছন ফিরে তাকায় মেয়েটি। মসৃণ ঘন কেশদাম নদীর স্রোতের মত পিঠ-বেয়ে নেমে এসে আছড়ে পড়ছে ওর নিতম্বের নিচে। ঢাকায় কত মেয়ের সান্নিধ্যে এসেছে মামুন — এত নজরকাড়া কেশ কারও দেখেছে বলে মনে করতে পারে না। মেয়েটি ওর খুব কাছ দিয়ে হেঁটে গিয়ে গেট ঠেলে বাড়িতে ঢোকে। কিছুক্ষণ পর মামির ডাক আসে ভেতরবাড়ি থেকে।

– আমার ভাগ্নে, ননদের ছেলে — মামুন। ঢাকা মেডিকেলে পড়ে; বেড়াতে এসেছে। মেয়েটিকে লক্ষ করে মামি বলেন।

–পড়ি না, ফাইনাল পরীক্ষা দেওয়া হয়ে গেছে —। শুধরে দেয় মামুন।

–ওহ্, তাইতো। আর এ হল নন্দিনী। আমাদের পড়শি। খুব লক্ষ্মী মেয়ে। ও না-থাকলে তো একা-একা দম বন্ধ হয়ে মারা যেতাম!

–তাই বুঝি! স্মিত হেসে বলে মামুন। তা আপনার পড়াশোনা চলছে নিশ্চয়ই?

–আরে, তুমি ওকে আপনি আপনি করছ কেন? পুঁচকে মেয়ে; এই তো সেদিনও ইজের-ফ্রক পড়ে ছুটোছুটি করত —। একগাল হেসে বলেন মামি।

মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে নন্দিনী। দুই গালে ওর রক্ত ছলকে ওঠে।

–পড়াশোনা চলছে? আবারও প্রশ্ন মামুনের।

–ক্লাস টেনে পড়া অবস্থায় যুদ্ধ শুরু হল; ওই পর্যন্তই —। মামিই জবাব দেন। নন্দিনীর মুখে রা ফোটে না।

–কাজের বুয়াকে রান্না-বান্নার কাজটা বুঝিয়ে দিয়ে আসি — স্কুলে যাবার সময়ও হয়ে এল। ত্রস্ত পায়ে হেঁসেলের দিকে ছোটেন মামি। উঠান পেরিয়ে রান্নাঘর। রান্নাঘরের ফাঁক-ফোকর গলিয়ে রেল-ইঞ্জিনের আধপোড়া পাথর কয়লার গাঢ় সাদা ধোঁয়া বেরোচ্ছে গলগলিয়ে। ধোঁয়ার গন্ধে কেমন এক আমেজ!

অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে বসে আছে নন্দিনী। কচি লাউডগার মত মসৃণ গ্রীবা, বাহু; ঘাড়ের একপাশ ঘেঁষে বুকের ওপর দিয়ে গড়িয়ে কোলে এসে জড়ো হয়েছে একগুচ্ছ চুল। পরনে ফিরোজা রঙের সাদামাটা সাটিনের সালোয়ার-কামিজ।

–পড়াশোনা আবার শুরু করার কোনও ইচ্ছা কি আছে? জড়তা ভাঙবার জন্য কথা পাড়ে মামুন।

–নাহ্ —। ছোট্ট একটুকরো শব্দ খসে পড়ে নন্দিনীর ঠোঁট থেকে।

অদ্ভুত মেয়ে তো! এ-বয়সের মেয়েদের মধ্যে যে-রকম প্রাণচাঞ্চল্য, চপলতা থাকবার কথা, ছিটেফোঁটাও নেই ওর মধ্যে।

মামুন নিজেকে সামলে নেয় — অযথাই গায়ে পড়ে কথা বলছি। এতগুলো কথার জবাব মিলল শুধু একটি শব্দে — ‘নাহ্’; যদিও ছোট্ট ওই শব্দটিতে সংগীতের মূর্ছনা ছিল — বীণার তন্ত্রীতে যেন আঙুলের আলতো স্পর্শ! কথা বলুক আর না-বলুক তাতে এমন কী এসে যায়! আর কথা বললেই ওর সঙ্গে কী এমন আলাপ হতে পারে? স্কুলের গণ্ডি না-ডিঙানো এক মেয়ের সঙ্গে ওর আলাপ করবার কী-ই বা থাকতে পারে?


বেশ কদিন কেটে গেল, বাইরে বেরোনো হল না। মামা প্রতিদিন বলেন অফিস থেকে ফিরে এসে বেড়াতে বেরোবেন, কিন্তু ফেরেন বেশ রাত করে।

মামিকে জিজ্ঞেস করেছিল মামুন: এত রাত পর্যন্ত কী কাজ থাকে মামার, অ্যা?

–কী জানি বাপু, বন্ধুদের সাথে আড্ডা-টাড্ডা মারে বোধহয়। বাসায় ফিরে করবেটাই বা কী? ভুরু কুঁচকে বলেছিলেন মামি।


এই ক’দিনেই মেয়েটির সঙ্গে সম্পর্ক অনেকখানি স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। কিন্তু একটা ব্যাপার মাথায় ঢোকে না — না-বললেই-নয় এমন দুয়েকটা শব্দ ছাড়া কথা বেরোয় না ওর মুখ থেকে। মেয়েটা কি লাজুক, নাকি কথা বলায় কোনও সমস্যা? মানসিক সমস্যা নয় তো? হুট করেই একটা বুদ্ধি খেলে মাথায়, — আচ্ছা দু’কলম লিখলে কেমন হয় ওকে?

‘কথা বলো না কেন? তোমার কথা শুনতে খুব ইচ্ছা হয়।’ ব্যস, এটুকু লিখে একটুকরো কাগজ পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় টুপ করে নন্দিনীর দিকে ছুঁড়ে দেয় মামুন। কাগজটা কুড়িয়ে নেয় নন্দিনী। কিন্তু ওই পর্যন্তই — কাগজের গায়ে-আঁকা নিঃশব্দ আকুতির সাড়া মেলে না কোনও।

বিকেলবেলা বারান্দায় গিয়ে বসে মামুন। এ-যেন এক অভ্যাসে, নাকি বাতিকে পরিণত হয়েছে ওর।

হ্যাঁ, ওই তো বাচ্চা কোলে নিয়ে মেয়েটি এদিকেই আসছে। গেটের দিকে যেতে নিতেই মামুনের ডাকে থমকে দাঁড়ায়। তারপর শিথিল-মন্থর পায়ে উঠে আসে বারান্দায়। কোলের বাচ্চাটির দিকে তাকিয়ে মামুন বলে: বাহ্ খুব মিষ্টি তো, কী নাম?

–বাবু। মেয়েটির কণ্ঠনিসৃত রিনিঝিনি শব্দের তরঙ্গ মামুনের কানের অলিগলি পেরিয়ে মস্তিষ্কের অচেনা কন্দরে গিয়ে অনুরণিত হতে থাকে।

–দেখি, দাও তো; হাত বাড়ায় মামুন । খুব কাছে সরে এসে ওর হাতে বাচ্চাটা তুলে দেয় নন্দিনী। দখিনা বাতাসে-ওড়া ওর দীর্ঘ এলোকেশ মামুনের মুখে, শরীরে এসে লাগে। শরীরের গন্ধ ছোঁয় ওকে — নাম-না-জানা বুনো ফুলের গন্ধ! আবেগ-জড়ানো কণ্ঠে বলে মামুন: কিছুই কি বোঝো না তুমি?


শালিকের মত টানা চোখজোড়া কেঁপে ওঠে নন্দিনীর। ফরসা মুখে চকিতে গোলাপি আভা। ত্রস্তপদে সরে যায় মামুনের সমুখ থেকে। কিছুটা বিব্রত বোধ করে মামুন। মেয়েটার কাছে নিজেকে খুব হাল্কা করে দিল না তো! ক’দিনেরই বা পরিচয়, এ-ধরনের প্রশ্ন ওকে করাটা কি ঠিক হল? অস্বস্তি ঝেড়ে ফেলে — যা হয়ে গেছে তা নিয়ে ভেবে কী লাভ। ওর সম্পর্কে জানতে হবে। মামা বলেছেন আজ সন্ধ্যাবেলায় বেরোবেন — তখনই জিজ্ঞেস করা যাবে।


কিছুক্ষণ আগে একপশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে — এবড়োখেবড়ো পথঘাটে ছিলছিলে পানি। ছোট্ট শহর সৈয়দপুর। মুক্তিযুদ্ধের চিহ্ন সর্বত্র নজরে পড়ে। মূল রাস্তা ধরে মামার পাশাপাশি হাঁটতে থাকে মামুন। অনেক ঘরবাড়ি, দোকানপাট ভাঙাচোরা, অগ্নিদগ্ধ। কথায় কথায় নন্দিনী প্রসঙ্গে আলাপ তোলে মামুন। একটা সেমিপাকা ঘরের সামনে এসে দাঁড়ান মামা; বলেন: এই যে বাড়িটা দেখছিস, এটা ছিল নন্দিনীদের। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর অন্যেরা দখল করে নিয়েছে।

মামুনের সবিস্ময় জিজ্ঞাসা: নন্দিনীদের পরিবার কি তাহলে রাজাকার, মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী ছিল?

–না, ওরা বিহারি, রাজাকারের চেয়েও ভয়ঙ্কর! ভেজা মাটিতে পায়ের থপথপ্ শব্দ তুলে হাঁটতে-হাঁটতে বলেন মামা; তুইও তো যুদ্ধ করেছিস, কী বলিস?

নির্বাক মামুন। মাথার ভেতর ওর অসংখ্য ঝিঁঝিপোকা একনাগাড়ে ডেকেই চলেছে। কী বলবে ও!

–নন্দিনীর আব্বা আমার কলিগ ছিল। রেলওয়ে ওয়ার্কশপের ফোরম্যান। রেলশ্রমিকদের নেতা — কমিউনিস্ট পার্টি করত।

–কী বলছ তুমি? কমিউনিস্ট পার্টি, ন্যাপ, আমরা যারা ছাত্র ইউনিয়ন করতাম, একসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ করেছি।

–নন্দিনীর আব্বা আশরাফও করেছে। রংপুর সৈয়দপুর রোডে গেরিলারা যে অ্যামবুশে বারোজন পাকসেনা মেরেছিল, আশরাফও ছিল ওই অপারেশনে।

–তারপর? অস্থির শোনায় মামুনের কণ্ঠ।

–দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই কিছু লোকের হাবভাব দেখে ঘাবড়ে যায় আশরাফ। বিষয়টা নিয়ে আমার সাথেও আলাপ করে। যুদ্ধের সময় যারা খানসেনাদের সাথে গোপনে হাত মিলিয়ে বিভিন্ন ফায়দা লুটেছিল; দেশ স্বাধীন হতেই রাতারাতি ভোল পাল্টে বনে যায় মুক্তিযোদ্ধা! একদিন গভীর রাতে ওরাই দলবেঁধে নন্দিনীদের বাড়ি আক্রমণ করে। পরদিন ভোরে বাড়ির সামনে পড়ে থাকতে দেখা যায় নন্দিনীর আব্বা-আম্মা আর বড় ভাইটাকে, গলাকাটা লাশ; আহ্! শিউরে ওঠেন মামা।

–আর নন্দিনী?

–ও সেদিন ছিল অন্য এক কমরেডের বাড়িতে — বাড়িটা তুই তো চিনিসই; আমাদের বাসার সামনেই —।

–এখনও কেউ জানে না যে ও বিহারি?

–জানলেই বা কী; ওদের সহায়-সম্পত্তি দখল করার দরকার ছিল, করেছে। উদ্দেশ্য হাসিল হওয়ার পর নন্দিনীকে নিয়ে মাথা ঘামানোর দরকারটা কী? তাছাড়া কারও সাথে ওর মেলামেশা নেই; কথা তো বলেই না; যা শুধু আমাদের সাথে। নাম ছিল নাজনিন; পাল্টে এখন নন্দিনী।

মামা আরও অনেক কথা — মুক্তিযুদ্ধে সৈয়দপুরবাসীর অসাধারণ বীরত্ব, অবদান ইত্যাদি নিয়ে অনেক কথা অনর্গল বলে যান। সবকথা মামুনের কানে ঢোকে না। ওর ভেতর সমুদ্রের উত্তাল উচ্ছ্বাস জাগতিক সব বোধশক্তিকে যেন ভাসিয়ে নিয়ে যায়। নন্দিনী — নাজনিন; একই অস্তিত্বের দুটো পরিচয়। দু’ভাষার দুটো শব্দ, দুটো নাম। অথচ এই পরিচয়ই বিশেষ সময়ে বড় হয়ে দেখা দেয় অস্তিত্ব ছাপিয়ে!

বাইরে থেকে ফিরে এসে বিষণ্ন মামুন অবসন্ন দেহখানা বিছানায় এলিয়ে দেয়। কিছুই ভালো লাগে না। রাত কাটে আধো নিদ্রা আধো জাগরণে।

উজ্জ্বল দিবালোকে প্রশস্ত পথ ধরে হাঁটছে মামুন। পথের দুধারের লোক তাকিয়ে আছে ওর দিকে। কী ব্যাপার, লোকগুলো ওভাবে তাকিয়ে আছে কেন? কেনই বা হাসছে? ঠিক তখনই টের পায় — সম্পূণ উলঙ্গ ও। দুহাতের তালু দিয়ে আপ্রাণ চেষ্টা করে উরুসন্ধিসংলগ্ন অঙ্গটাকে আড়াল করতে। লজ্জায় মাটির সঙ্গে মিশে যেতে ইচ্ছা হয়। দৌড়াতে চেষ্টা করে। পারে না। পা জড়িয়ে আসে। এক টুকরো বস্ত্র, একটু আচ্ছাদন কি নেই কোথাও! ঘুম ভাঙবার পরও ধাতস্ত হতে সময় লাগে, আসলে স্বপ্ন দেখছিল নাকি তখনও সে নগ্ন!

মামি ডাকেন: অনেক বেলা হয়েছে বাবা; হাতমুখ ধুয়ে নাও। নাস্তা জুড়িয়ে যাচ্ছে যে...।

নাস্তা খেতে-খেতে মামুন বলে: কাল নন্দিনী, মানে নাজনিন সম্পর্কে অনেক কিছুই জানলাম। মামা বললেন। ওই বাড়িতে কী হিসাবে আছে ও?

স্বাভাবিক গলায় বলেন মামি: কেন, ওদের মেয়ের মতই। রহমান সাহেবের সন্তান বলতে একমাত্র ওই পিচ্চিটা । তাছাড়া নন্দিনীর আব্বা আর উনি একই পার্টি করতেন; উনি এখনও করেন...।

–পড়াশোনা ছেড়ে দিল; ওরও তো একটা ভবিষ্যৎ আছে, তাই না? বলে মামুন।

–ভবিষ্যৎ মানে বিয়েশাদির কথা বলছ তো ? সে-চিন্তা আমরা যে করি না তা নয়; কিন্তু ওর মধ্যে সবসময় কেমন এক ভীতি — আতঙ্ক কাজ করে। সম্ভবত অতীতের ভয়াবহ স্মৃতি এখনও মুছে ফেলতে পারেনি মন থেকে।

ছোট্ট একটা শব্দ বেরোয় মামুনের মুখ থেকে: হাহ্।

–তাছাড়া ওকে তো আর যার-তার হাতে তুলে দেওয়া যায় না। এমন পাত্র দরকার, যে ওর মনের ক্ষতগুলো সারিয়ে তুলতে পারবে। ব্যাপারটা কি সহজ?

–কেন নয়? কথাটা মুখ ফসকে বেরোতেই মামুনকে বেশ অপ্রস্তুত দেখায়। ওর দিকে অর্থপূর্ণ দৃষ্টি নিয়ে তাকান মামি। প্রসঙ্গ পাল্টে জিজ্ঞেস করেন: আরও ক’টা দিন থাকছ তো, বাবা?

মাথা নাড়ে মামুন।

মামি তাঁর কর্মস্থলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে ব্যস্ত হয়ে ওঠেন। আজ দেরিই হয়ে গেল স্কুলে রওনা দিতে, বিড়বিড় করে কথাগুলো আউড়ে কিছুটা এগিয়ে গিয়ে ফিরে এসে বলেন: তুমি কোথাও বেরোলে ঘরে তালা দিয়ে নন্দিনীর কাছে চাবির গোছা রেখে যেয়ো। বাসা খালি থাকলে ও নজর রাখে। হঠাৎ কোনও কাজে তোমার মামা এলে ওর কাছ থেকে চাবি নেয়।

মামি বেরিয়ে যেতেই নিত্যদিনের মত বারান্দায় গিয়ে বসে মামুন। কেমন নতুন, অপরিচিত মনে হয় সবকিছু; নন্দিনী নামের মেয়েটিকেও। এতদিন কাল্পনিক কী অর্থই না সে আরোপ করে আসছিল ওর আচরণগুলোর ওপর! প্রতিদিনকার মত আজও সম্মুখের বাড়িটি, পাকুড়গাছ, কবুতরের খোপ, সবই তেমনই চোখে পড়ে। কবুতরগুলো কি ডাকছে? গলা ফুলিয়ে ভালোবাসা জানাচ্ছে একে অপরকে? কী জানি! সম্মুখে দৃষ্টি প্রসারিত করে বহুক্ষণ চেয়ে থাকে মামুন। পাকুড়গাছের কাছ-ঘেঁষে দাঁড়ানো দীর্ঘাঙ্গিনীর দেখা নেই। একটা সাময়িকীর পাতা অযথাই ওল্টায় আর অস্থির চোখ মেলে রাখে, কখন গাছটির নিচে দেখা যাবে দিঘল তন্বীর মোহনীয় মূর্তি। হ্যাঁ, ওই তো নন্দিনী, ধীরপায়ে হেঁটে এসে একই ভঙ্গিতে দাঁড়িয়েছে একই জায়গায়। হাতের ইশারায় ওকে ডাকে মামুন। মন্থরগতিতে এগিয়ে এসে দাঁড়ায় ও সিঁড়ির গোড়ায়।

–তোমার সাথে কথা আছে, কাছে এসো —। মামুনের কণ্ঠ আবেগের প্রাবল্যে কিছুটা কম্পিত।

নন্দিনী সিঁড়ি ভেঙে বারান্দায় উঠে আসে। ভাষাহীন চোখ মেলে চেয়ে থাকে মামুনের দিকে।

–মামা তোমাদের পরিবার সম্পর্কে অনেক কিছুই বলেছেন; কী মর্মান্তিক!

নন্দিনীর মুখে কোনও কথা নেই। কথা বলুক আর না বলুক জেদ চেপে যায় মামুনের; আজ ওকে পরিষ্কার খুলে বলবে বুকের ভেতর চেপে-রাখা কথাগুলো — যা হয় হবে।

–কিছু বললে চুপ করে থাক কেন? আমার কথা বোঝো না? তোমার ভাষাতেই বলি তাহলে: ম্যায় তুমকো বহুত প্যায়ার...

কথা শেষে হতে পারে না; মামুনকে হকচকিয়ে দিয়ে গোলাপ-পাঁপড়ির মত পেলব তালুতে নন্দিনী ওর মুখ চেপে ধরে! ভয়ার্ত সুরে ফিসফিসিয়ে বলে: ও-ভাষায় কথা বলতে হয় না —! তারপর মামুনের দিকে শঙ্কিত হরিণীর মত চকিত চাউনি ছুঁড়ে প্রায় ছুটে পালিয়ে যায়। ক’মুহূর্তেই অদৃশ্য হয় নন্দিনী।

এ-ঘটনার পর আরও বেশ কিছুদিন ছিল মামাবাড়িতে। নির্দিষ্ট স্থানটির দিকে প্রত্যাশা-বিভোর মন নিয়ে বসে থেকেছে। নাহ্, নন্দিনীর দেখা আর মেলেনি।


বাড়ি চলে আসার কয়েক মাস পর মামাতো ভাইয়ের পাঠানো একখানা চিঠি পায়। চিঠিতে অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে নন্দিনী প্রসঙ্গেও লিখেছে। বিস্ময় প্রকাশ করেছে ওদের দু’জনের সম্পর্কের ব্যাপারটি নিয়ে। জানিয়েছে, নন্দিনীকে কিছুদিন আগে মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ওর বিছানার তলা থেকে একটা চিরকুট পাওয়া যায়, ওটাও চিঠির সঙ্গে পাঠিয়েছে সে।

বাড়ির দাওয়ায় বসে চিরকুটটার দিকে একদৃষ্টিতে চেয়ে থাকে মামুন। কাঁচা হাতের লেখা, ‘আপনে চলে যাওয়ার আগে কয়দিন অসুখ ছিলো আমার। তাই ঘরের বাহিরে আসিতে পারি নাই। সেদিন আমার দিকে ফিকে দেওয়া আপনার লেখাটার জবাব না দেওয়াতে গোসা করেছিলেন মনে হয়। আমি সবই বুঝি। আপনে বুঝেন না। সব কথা কি মুখে বলতে হয়?’ — নন্দিনী।

মামুন উদাস চোখে চেয়ে থাকে আকাশের দিকে, যেখানে আসন্নপ্রসবা ছাঁইরঙা গাইয়ের মত গাঢ় মেঘের ধীর আনাগোনা। দৃষ্টি ওর ঝাপসা হয়ে আসে। গলার কাছটায় কেমন এক টনটনে ব্যথা। ওই তো নন্দিনী — কেমন করুণ ভাসাভাসা ডাগর চোখে অপলক চেয়ে আছে ওরই দিকে।

হঠাৎ কোথা থেকে সাদা অ্যাপ্রন-পরা দু’জন নার্স এসে ওকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে চলে ইসিটি রুমের দিকে। সব প্রস্তুতি শেষ; এবার ইসিটি — ইলেকট্রো কলভালসিভ খেরাপি। ইলেকট্রিক শক্। আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে গোঙানির শব্দে। শক্ — গোঙানি।

তারপর একসময় নিস্তব্ধতা — নিঃসাড় নন্দিনী!

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন