রবিবার, ২৭ মার্চ, ২০১৬

শামসুজ্জামান হীরা'র গল্প | পিছলা ঘাট

আমার সোয়ামি খুউব ভালোবাইসত আমারে; তারে জানি ছাইড়া না যাই তাই জন্যি কুনো কামে আমারে বাধা দেয় নাই। এক্সিডেনের পর পেরালিস ব্যাধি। ব্যাধি গো, ব্যাধি — মরণের ব্যাধি!

অথচ ওরকম একটা পরিণতির শিকার হবে মোফাকখার, কেউ কি স্বপ্নেও ভেবেছিল! এই বছর খানেক আগেও যে-রকম পরিশ্রম করত, সাত গেরামের লোকের সাধ্যি কী তার সাথে পাল্লা দেয়! কিন্তু অনেক অস্বাভাবিক ঘটনাই তো ঘটে! ফোক্কারের ক্ষেত্রেও ঘটল। এই যাহ্, মোফাকখার কীভাবে ফোক্কার হয়ে গিয়েছিল সে-কথাটা বলা হল না।


খুব আদরের প্রথম সন্তানের নাম রাখতে মসজিদের ইমাম সাহেবের পেছনে তিন শুক্কুরবার ঘুরঘুর আর তোয়াজ করে তাকে রাজি করাতে সক্ষম হয়েছিল কাজেম আলী। গলায় ঝোলানো চাঁদির তৈরি দাঁতখোঁচানি দিয়ে দাঁতের ফাঁক থেকে খয়েরি রঙের কী যেন বার করে দু-আঙ্গুলে কচলে তারপর নাকের কছে আঙ্গুল নিয়ে কীসের যেন বাসনা নিয়েছিল বিরক্ত ইমাম; দুই দিন আগে খোনকারবাড়িতে চল্লিশার যে খানা খেয়েছিল সেই বুড়া গরুর গোশতের কুঁচি এখনও বেরোচ্ছেই। ভুরুতে গিঁঠ ফেলে হাড়জিরজিরে কাজেমের দিকে তাকিয়েছিল ইমাম। পেটের ভাতের খবর নাই, পোলার নাম নিয়া মাতামাতি! তারপর কীভাবে যেন একসময় ইমামের মেন্দি-লাগানো চাপদাড়ি আর ছোট করে ছাঁটা গোঁফের ফাঁক দিয়ে ফস্ করে বেরিয়ে গিয়েছিল নামটা। মোহাম্মদ মোফাকখারুল ইসলাম। বেজায় ভারী নাম গো! মুখস্ত রাখা কী যে-সে কথা! চাইলশার মাপের সময় পাল্লায় ধান তুলে শব্দ করে যেমন বারবার গনা হয় — আরে নাব... নাবে নাব... নাবে এক, নাবে এক... নাবে দুই, — সেভাবে মসজিদ থেকে নামটা জপতে জপতে বাড়ি পর্যন্ত গিয়েছিল কাজেম। পরের তিন শুক্কুরবার পার করে চৌথা শুক্কুরবারের দিন মহাজনের কাছ থেকে টাকা হাওলাত করে আকিকা দিয়ে আল্লাহ্র আরশে নামটা পাকাপোক্ত করে নিয়েছিল। কিন্তু আদিতে মোফাকখার রাখা হলেও মুখে মুখে পরিবর্তিত, নাকি বিবর্তিত হতে হতে শেষপর্যন্ত নামটা দাঁড়িয়ে যায় ফোক্কারে। নামের এ বিবর্তনের পেছনে বেশ কিছু সামাজিক কারণ থাকে। মুরুখ্খু তার ওপর আবার পেটেভাতে চলা লোকেদের অমন কঠিন নাম কষ্ট করে মুখে আনার ঠেকাটা পড়েছে কার! সুতরাং ফোক্কার! লেখাপড়া শিখে ভালো কোনও চাকরি-বাকরি করলে, বা না শিখেও যদি যেকোনও উপায়ে মেলা মালপানি বানানো যায়, তাহলে নামের বিবর্তন ঘটে না। তবে খুব ভালো অবস্থায় থাকলে বা খুব ভালো কাজ করলে নামের আগেপিছে বিশেষণ যোগ হয়। কু-কাম করলেও বিশেষণ যে যোগ হয় না, তা নয়।

জিওল মাছের মত গায়ের রং, খালি গায়ে পেশিগুলোর ওপর নজর পড়লে একসময় চোখ ফেরানো কঠিন ছিল। ওর পেশাটাই এমন ধারা ছিল যে, পেশি তৈরি না হওয়ার জো ছিল না। থপথপ শব্দে হাঁটত দ্রুত পায়ে; আর পা দুটো? কতকটা যেন হাড়ি ধরার বাউলি। অনেকে এজন্য ওকে বাউলি-পায়া ফোক্কাইরা বলে ডাকে। তাতে কী! পরতের পর পরত মাংস দিয়ে শিলিয়ে বানানো পা-জোড়া তিন মণ ওজনের ভার সইতে পারত অনায়াসে! গড়নে তেমন একটা উঁচা-লম্বা নয়, খাটোও বলা যাবে না — মাঝারি। চওড়া বুক আর ঘাড় যেন গজারি গাছের গুঁড়ি।

অনেক বছর, তা এক-কুড়ি বচ্ছর তো হবেই, তেইশ বছরের মর্দ তখন ও। সেই জোয়ান বয়স থেকে এক বছর আগ পর্যন্ত কাজের অন্ত ছিল না ফোক্কারের। কী বল ছিল শরীরটায়! যখন ভরা গাঙ, সে কী সোঁত আর পানির পাক! মরার সোঁত ঠেইলে উজানে সাত মাইল যাতি লাগত তিন ঘণ্টা। উজান গাঙে রেলইস্টিশন। যাওয়ার সময় সেই রহম চোদন। রেলইস্টিশনে যাওয়ার প্যাসেন্দার রাইত-দুপুরে নৈকায় ওঠে, বিহানে পায় ইস্টিশন। হাল ধরে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকত নাওয়ের মালিক সেকেন্দার ওরফে সেকেন মাঝি, দাঁড় টানত ফোক্কারসহ আরও এক মাঝি। দাঁড়ের কাছির কাছে শব্দ উঠত ক্যাঁচর-ক্যাঁচর, পানিতে ছলাৎ-ছলাৎ। নাও কী এগোতে চায় সোঁত আর ঘূর্ণিজল ঠেলে! মাল্লাদের মুখে ছুটত সুর তুলে নানান উচ্চরব। শ্লীলতা-অশ্লীলতার বালাই নাই। বেশির-ভাগই অর্থহীন। বলারে বলা মার টান, কালা গাইয়ের ভরা বান...। তবে হাওয়া থাকলে বিভিন্ন রঙের কাপড়ের তালি-মারা পাল খাটাত মাস্তল তুলে দিয়ে। যখন হাওয়া থাকত না, দাঁড়েও কুলাত না — টানো গুণ। নদীর পাড়ের নোংরা খচে টেনে চলো গুণ। গুয়ে ফ্যাঁচ করে পা গেড়ে গেলে খিস্তি বেরোত মুখ গলে: বোদার বেটারা নদী বিলা বানায় মাচা-পায়খানা। গু আইসা পড়ে গাঙের কান্দায়, বানের সমায় বরাবর গাঙে। ঘাইরা আরও কত জাতের মাছ কিলবিল করে গু খাওয়ার লোভে!

ইস্টিশন থিকা ফিরতির সময় আরাম কারে কয়! বাওয়াও লাগে না নৈকা। হালডা কেবল ধইরা থাহ, তরতরাইয়া লাও চলে সোঁতের টানে! সকালের টেরেনে আসা বিনোদবাড়ির প্যাসেন্দারগরের কী সুখ! ভাটির টানে এক ঘণ্টার পথ। বাইত্ ফিরা বউয়ের হাতে তৈরি ভাঁপ-ওঠা খানা খাও।

অন্য পাইটরা যেখানে দিনে আয়-রোজগার করত পঞ্চাশ, ফোক্কার সেখানে ষাট। কাজের ধারাটাও ছিল ওর অন্যরকম। খেপ মারা শেষ হলে গলুই-ছই-চরাট ধুয়ে-মুছে বেবাক সাফ করে ঝকঝকা-ফকফকা। ওর কাজ দেখে মালিক চোখ পিটপিটিয়ে পিচ করে পানের পিক ফেলে বলত: আমার ফোক্কাইরা মাশাল্লা একডা মইষের শক্তি রাহে শইল্লে! কামের মইদ্যেও কত যত্ন। নৈকা জানি ওর নিকা করা বউ।


কত না শুনেছে ফোক্কারের জবানিতে তার নৌকা বাওয়ার কেচ্ছা-কাহিনি জোবেদা — নারী উন্নয়ন সমিতির খাতায় মোছাম্মৎ জোবায়েদা খাতুন। ইসকুলের রেজিস্ট্রি খাতায় যে নামটা ছিল, সেটাই সমিতির খাতায় লিখিয়েছিল জোবেদা।

জোবেদা নিজেই তো এক জলজ্যান্ত কেচ্ছা। মোফাকখারের পেরিয়ে-আসা জীবনের বড় অংশের কেচ্ছা।

আঠারো কী উনিশ বছর তো হলই। মনে হয় এই সেদিনকার কথা। নদীতে কোমর পানি। কোথাও গলা। কাতি আগন মাসে হরবছর এমনটাই থাকে বড়াল নদী। স্রোত তেমন না থাকাতে সাত মাইল যেতে যতখানি সময় লাগত, আসতেও প্রায় ততটুকুই। রেলইস্টিশন থেকে বিনোদবাড়ি ফেরার পথে আরাজিপাড়ার কাছে নৌকা ঠেকাতে হয়েছিল। বেলা দশটা, ঝলমলে রোদ্দুর। নদীর পাড়ে, উহুঁ পাড় নয়, পাড় থেকে বেশ খানিকটা নিচে নেমে পানির কাছাকাছি এসে নৌকা ধরার জন্য অপেক্ষা করছিল এক মেয়ে, সঙ্গে মাঝবয়সী এক নারী। মেয়েটা হাত নেড়ে নৌকা থামানোর ইশারা দিচ্ছিল। সামনে এক জেলে মাছ ধরবার জন্য খরা পেতে বসেছিল। খরা এড়িয়ে এমনিতেই পাড় ঘেঁষে ছিলছিলে জলে নৌকা ঠেলতে হত। থামাতে অসুবিধা হল না। তাছাড়া ওই সময়টাতে যাত্রীর চাপ থাকত না বললেই চলে। খুচরা যাত্রী তুলতেও তাই আগ্রহে খামতি থাকত না।

সাবধান, মাটি পিছলা কইলাম, আঠাইল্যা মাটি। ফোক্কার বলেছিল।

নৌকায় উঠতে গিয়ে সত্যি আর একটু হলে পা পিছলে পানিতে পড়ে যেত মেয়েটা। খপ্ করে হাতটা ধরে ফেলেছিল ফোক্কার। হ্যাচকা টানে নৌকায় তুলে নিয়েছিল। নৌকাটাও দুলে উঠেছিল জোরে। ভেতরের লোকদের মুখ ফুড়ে বিরক্তির ভাষা বেরিয়ে আসতে সময় লাগেনি: এ বালের কেবা ল্যাঠায় পড়লাম! ঘাটায় অঘাটায় লাও ঠেকাও মিয়া ফোক্কার! কী পাইলা, অ্যাঁ?

মেয়েটার মুখে অপ্রতিভ সলজ্জ হাসি।

কী তুলতুলা হাত গো! মেয়েটার হাত ছেড়ে মুঠোয় লগি তুলে নিতে গিয়ে মনে মনে ভেবেছিল ফোক্কার। দাঁড় টেনে আর লগি ঠেলে ওর হাতের তালু তো খরায় ফাটা মাঠের মত খরখরা।

লগি ঠেলতে ঠেলতে জিগাইছিল ফোক্কার: যাবানে কোনে?

নেছড়াপাড়া...। রিনরিনে গলায় মেয়েটার জবাব।

কোন বাড়ি?

বিল্লালের বাড়ি...।

কি গো নারাণদা, খরায় মাছ-টাছ ঠ্যাহে? পাইলা কিরম? মাথা ঘুরিয়ে খরার পাশে মাচানে বসে-থাকা হলদারকে জিজ্ঞেস করেছিল ফোক্কার।

পানি তো পরায় শুহায়া গেছে। মাছ পাই কনে! কামকাজ নাই, বাইত্ গিয়া কী লাভ! খরার থিকা দোয়াইরে মাছ ধরা লাভ।

আমাগেরও অবস্থা সেরম, দাদা। আর কয়দিন গেলি নৈকাও চলবি লয়...

কিছুক্ষণের মধ্যেই নেছড়াপাড়ার ভগ্নপ্রায় ঝুরঝুরে ইটের মঠ আর জটাধারী বটবৃক্ষ ও ঝাউগাছের দেখা মেলে। বাতাস উঠলে ঝাউগাছগুলো কী শিস দেয়! মনে হয় হাজার হাজার অতৃপ্ত আত্মা আহাজারি করছে! এখানে একসময় শ্মশানঘাট ছিল। প্রায় পাঁচ একর অর্পিত-সম্পত্তি দখলে নিয়ে এখন সেখানে আলহাজ মোহাম্মদ ফজলুর রহমানের দুই-চিমনি ইটের ভাটা। আগে ঈশ্বরের হাতে-গড়া মরামানুষ পোড়ানো হত, এখন মানুষের হাতে মাটি থেকে ছাঁচে গড়া ইট।

হাঁক ছেড়েছিল ফোক্কার: নেছড়াপাড়া আয়া পড়ছি...

পোটলাডা ধর জোবেদা। ছইয়ের নিচে কুঁজা হয়া বইসা থাইকা মাজা ব্যথা হয়া গেছেরে...।

নাম তা’হলি জোবেদা, সাকিন নেছড়াপাড়া। বাপ বিল্লাল, নাকি ওইডা ভাতারের নাম! বিয়াইত্তা না অবিয়াইত্তা — হেইডাও তো একটা ব্যাপার! ভেবেছিল ফোক্কার। মেয়ার বয়স দেইখা তো মনে হয় চোদ্দ কি পনেরো। এই বয়সে গাঁও-গেরামের মেয়াগের বিয়া তো অয়ই, এমনকি কোলেও ঝুলতে দেখা যায় নাকে পোঁটা-জমা গেদা না-অয় গেদি।

মেয়েটা সাবধানী পায়ে নেমেছিল নৌকা থেকে, সঙ্গে মাঝবয়সী মেয়েলোকটাও। পাড়ের ঢাল বেশ খাড়া — হাঁটা পথও আঁকাবাঁকা। ফোক্কার একদৃষ্টিতে চেয়ে থেকেছিল হেঁটে-চলা মেয়েটার পানে। গায়ের রং ফরসা না হলেও জালি লাউয়ের মত, স্বাস্থ্যবতী, নৌকায় ওঠার সময় একঝলক দেখে মনে হয়েছিল, সেজেগুজে থাকলে সিনেমার নায়িকা রোজিনার মত লাগত ওকে। নৌকা থেকে নেমে হেঁটে যাওয়ার সময় পাছায় যে ঢেউ উঠছিল তা যেকোনও মরদের চোখে নেশা ধরাতে যথেষ্ট! বিনোদবাড়ি থেকে তেমন দূরে নয় নেছড়াপাড়া, খুব একটা বেগ পেতে হবে না বাড়ি খুঁজে পেতে। কিন্তুক বিয়াইত্তা না অবিয়াইত্তা — হেইডাই অইল গিয়া চিন্তার বিষয়!

হ্যাঁ, দেখতে দেখতে নদী শুকিয়ে এসেছিল। শেষের কদিন তো কিছু কিছু জায়গায় কাদার ওপর দিয়ে নৌকা ঠেলে নিতে হয়েছিল; যদিও এতে নৌকার তলির ক্ষতি হয় বেশ।

নদীর অল্প পানিতে কিছুদূর পরপর দোয়াইর বসানো। ওগুলোতে গুঁড়ো চিংড়ি, আরও হরেক পদের কুঁচো মাছ ধরা পড়ে। যেখানে পাড় উঁচু, নরম মাটি, অগুনতি ছোট গোল গোল গর্ত — গাঙশালিক আর মাছরাঙার বাসা — পাখি ঢোকে আবার গর্ত থেকে বেরিয়ে ফুরুৎ করে উড়ে যায়।


২.

নৌকা বন্ধ। কমপক্ষে মাস দুয়েক এমনই থাকবে — যতদিন নদীতে আবার জোয়ার না লাগে। সে পর্যন্ত কী করা। অন্য কোনও কাজও জানা নাই ফোক্কারের। বাজারের বাধাইমালের মহাজন গোলজারের গদিঘরে যায় মাঝেমধ্যে। ফোক্কারকে খুব পছন্দ ওর। গোলজারের ভূষিমাল বস্তায় বস্তায় ফোক্কারদের নৌকাতে চালান হত বিনোদবাড়ি থেকে বাঘাবাড়ি ঘাটে। আবার বাইরে থেকে আসতও। সে তো যখন নদীতে পানি থাকে। এখন পাইকারি বিক্রি নাই বললেই চলে। মোষের গাড়িতে এ-হাটে ও-হাটে অল্পস্বল্প মাল পাঠায় গোলজার। তবে হাটে হাটে মাল কেনা চলে। বস্তায় বস্তায় মাল খামাল দেওয়া হয় গুদামঘরে।

অলস সময়ে গদিঘরের শান-বাধানো সিঁড়ির পৈঠার ওপর বসে লোকজনের চলাফেরা দেখে ফোক্কার। সরষের তেল আর কেরোসিনের গন্ধ নাকে এসে বেঁধে।

ফোক্কারকে উদাস উদাস দেখাচ্ছিল।

গোলজার বলেছিল: কীরে ফোক্কাইরা, মনডা উড়াউড়া মনে হতিছে; ব্যাপারডা কী?

না, এবাই। কামকাজ নাই। কাম না থাকলি মন ভালা থাকে ক্যাবা কইরে?

এই ফাঁকে বিয়াডা সাইরা ফ্যালা। রাইতে অহনও শীতশীত... খেতার মদ্যি...। কি কইস, মেয়া আছে নি কুনো পছন্দের?

ফোক্কার জবাব দেয়নি।

যা, আফাজের দোকান থিকা দুই কাপ লাল-চা লিয়ে আয়। গলাডা শুহায়া কাঠ!

যতদিন নৈকা না চলে আমার আড়তে কাম করলিও তো পারিস, নাকি? বস্তা উঠানি লামানির কাম। কি কস? চায়ের খুদে গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে বলেছিল গোলজার।

আচ্ছা চিন্তা করুমনে...।


প্রথম প্রথম একটু অসুবিধা হলেও কিছুদিনের মধ্যে পাকা মুটে বনে যায় ফোক্কার। মন্দ কী, বসে না থেকে দুটো পয়সা রোজগার করায়। তাছাড়া আলসেমিতে শরীরের কলকব্জাতেও জং ধরতে কতক্ষণ!

ওর নিকা-করা বৌ তো এখন নদীর চরে। মাঝে মাঝে যায়, চত্রিক মাসের রৈদে ওর কালা গতর তাওয়ার মত তাতানো। গতকালও গেছিল একবার। পক্ষীর লাদি চুনার মত লেগে আছে সারা গতরে। ওর এই অবস্থা দেখে মন কেঁদেছে ফোক্কারের। কাঁধের গামছা ভিজিয়ে যদ্দুর পেরেছে সাফসুফ করেছে। আরও আগেই পাশের ডোবায় ডুবিয়ে রাখা উচিত ছিল ওকে। ঝাঁঝাঁ রোদ্দুরে গতর ওর ফেটে যাবে তো! একবারও বিষয়টা মাথায় না আসায় নিজেকে গালমন্দ করে।

জোবেদার চিন্তাও মাথায় খেলা করে। সকাল থেকে রাত আটটা অব্দি কাজ। সপ্তাহে একদিন ছুটি। যাব যাব করে কেটে যায় বেশ কিছুদিন। মন স্থির করে ফেলে, আগামী শনিবার ছুটির দিন, নেছড়াপাড়া যাওয়া লাগবি-ই।

একটা আশঙ্কা থেকে মুক্ত হয়েছিল নেছড়াপাড়া গিয়ে, জোবেদা বিল্লাল সর্দারের সবথেকে ছোট মেয়ে; এখনও বিয়েথা’ হয়নি। পয়সার অভাবে কেলাস ফাইভের পর ইসকুলে যাওয়া বন্ধ। বিয়ে দেওয়ার জন্য বাপ অস্থির, কিন্তু যৌতুকের টাকা কই!

মেয়ে দেখা আর বিয়ের কলেমা পড়া একই আসরে। দেনমোহর তিরিশ হাজার; গয়না বাবদ নগদ উশুল দশ হাজার।


.

বৈশাখের মাঝামাঝি, নদীতে আবার পানি বাড়তে শুরু করে। মাসের শেষদিকে নৌকা ভাসায় ফোক্কার। এখন নৌকার মালিক সে। মাঘের শুরুতে নিউমোনিয়া হয়ে সেকেন মারা গেলে ওর সেই ‘নিকা-করা বৌকে’ কিনে নিয়েছিল সেকেনের আধ-পাগলা পোলার কাছ থেকে। জীবনের যাকিছু খায়েশ আছিল তা তো পরায় পুরাই হইল। ফোক্কার ভাবে। একটা নৈকা আর একটা পছন্দের বৌ — আল্লার মেহেরবানিতে দুইডাই হাসিল হয়া গেল। নিজেকে দুনিয়ার সৌভাগ্যবান ব্যক্তি ভাবতে ভালো লাগে ওর। হাতে পয়সা জমলে আরেকটা ইচ্ছা পূরণ করলেই, ব্যস্। মাথা গোঁজার একটা ঠাঁই। ওয়াপদার বাঁধের ঢালে আর কতদিন!


যেদিন প্রথম একটা লক্কড়ঝক্কড় বাস ভেতরে ও ছাদে যাত্রী বোঝাই করে রেলইস্টিশনের দিক থেকে টলতে টলতে বিনোদবাড়ি এসে থামল, ফোক্কারসহ নৌকার মাঝিদের চোখে-মুখে আতঙ্কের ছাপ! প্রায় চার নৌকার প্যাসেঞ্জার এক বাসে! নৌকা চালিয়ে পেট চালাবে কী করে ওরা! কিছু একটা করা দরকার। বাপ-দাদা চোদ্দগুষ্টির ব্যবসা তো নষ্ট হতে দেওয়া যায় না এভাবে। নৌকার সব মাঝি জোট বাঁধল। দাবি একটাই, বাস ঠেকাতে হবে। কিন্তু কে কান দেয় ওদের এই দাবিতে। দুঘণ্টার পথ আধঘণ্টায় যেতে পারলে কত সুবিধা; নৌকার মাঝিদেরকে কেউ কেউ পরামর্শ দেয়, একা না পারুক কজনে মিলে বাস কেনবার। তাছাড়া ভারী মালামাল টানার জন্য নৌকা ছাড়া তো গতি নাই। তাতেই বা ইনকাম কম কিসে! তার ওপর সব পথ তো বাস চলার যোগ্য এখনও হয়নি। সে কবে হবে তারও কোনও ঠিকঠিকানা নাই।

মানুষ টানা ছেড়ে মাল টানাতেই লেগে পড়ে ফোক্কার। গোলজারের আড়ত তো আছেই। ফোক্কার ছাড়া অন্য কাউকে দিয়ে ও মাল টানাবে না, এ বিশ্বাস ফোক্কারের আছে।

ভালোই রোজগার হতে থাকে ফোক্কারের। এমনকি আগে যখন যাত্রী বহন করত, তখনও এত আয় হত না। আল্লায় যা করে ভালোর জন্যই করে। বাস চালু নাহলে তো আগের রোজগারেই চলতে হত। বউ-কপাইল্যা বলেও একটা কথা আছে। জোবেদার সঙ্গে বিয়ে হওয়ার পর একটার পর একটা ভালো ঘটনা ঘটে চলেছে। জোবেদার পছন্দের জিনিস কিনতে কার্পণ্য নাই ওর। ওর পছন্দের মাছটা, দাম যা-ই পড়ুক, কেনা চাই-ই। শাড়ি, বেলাউজ, পেটিকোট, সোনো, পাউডার, লিপিস্টিক, নোখপালিশ। ভালো খাওয়াদাওয়া আর স্বামীর সোহাগে আরও যেন খোলতাই হয় জোবেদার রূপ। সেদিনের কথা মনে এলে ডিঙি নৌকায় বসে-থাকা ফোক্কারের ঠোঁটের কোনায় আজও হাসি খেলা করে।

ভরা ভাদ্দরমাস। পানিতে কানায় কানায় পূর্ণ নদী। আকাশে ছিটেফোঁটা মেঘের আনাগোনাও নাই। পূর্ণিমার চাঁদের আলো নদীর ওপর পড়ে ঝিকমিক করছিল। সাজগোজ করে নৌকায় উঠেছিল জোবেদা। ছৈয়ের ওপর ওর দিকে মুখ করে বসেছিল। গাঙের দু’কূলের গাছগাছালিতে আলো-আঁধারির খেলা। জোবেদা বলেছিল: কী সোন্দর চান্দ; নৈকার উপরে বইসা এই পরথম দ্যাখতিছি...!

ওই চান্দের থিকাও আমার চান্দ অনেক সোন্দর। ছই থিকা লাইমা আয়, ভিতরে গিয়া বসি...

এহানে কী সোন্দর বাতাস লাগতিছে; ভিতরে বইসা কী হবি?

আয় কইলাম। ভিতরে বাতাস লাগবিনি, আয়...

কী আর করা। মুখ বেঁকিয়ে ঠোঁটে কেমন এক হাসি টেনে ওপর থেকে নেমে এসে ছৈয়ের ভেতর নিঃশব্দে ঢুকে পড়েছিল জোবেদা।

মাঝনদীতে নোঙর করা নৌকা দুলছিল ভীষণ।

পাশ দিয়ে উজানে নাও বেয়ে যেতে যেতে জিজ্ঞেস করেছিল এক মাঝি: কিডারে, ফোক্কাইরা নাহি?

হাঁপাতে হাঁপাতে উত্তর করেছিল ফোক্কার: হ। মজনু নাহি...?

ফোক্কারের বন্ধু মজনু ঠাঠা হাসিতে ফেটে পড়েছিল। নৈকা অত লড়ে কেন রে? ডুইবা না যায় আবার, দেহিস...। তারপর গলাছেড়ে গান ধরেছিল: পিরিতি কাঁঠালের আঠা...


৪.

ওয়াপদার বাঁধের ওপর দিয়ে না কি সড়ক তৈরি হবে। চওড়া সড়ক। বাঁধের ঢালে বাসিন্দারা সরে যাওয়ার নোটিশ পেয়ে গেছে। সরকার তো নোটিশ দিয়েই খালাশ; খেটে-খাওয়া হতদরিদ্র এই লোকগুলো তা যেভাবেই হোক মাথা গুঁজে ছিল বাঁধে। এখন থাকবে কোথায়! তাছাড়া বাঁধের নিচেই অনেক লম্বা খাল। ওই খালের মাটিতেই তো এত উঁচু বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ বানানো হল। খালে হয় মাছের চাষ। আশপাশে বসতকারীদের গোসল, কাপড়কাচা, ধোয়ামোছার কাজ চলে খালের পানিতে। মাছের খাদ্য তৈরির জন্য ইউরিয়া সার দেওয়াতে পানির রং কখনও গাঢ় নীল কখনও বা হালকা নীল থাকে। তাতে তেমন কিছু যায় আসে না। ধোওয়ামোছার কাজে এমন সুবিধা কি জোটে সব জায়গায়? খাওয়ার পানির জন্য টিউকল বসিয়ে নিয়েছিল অনেকেই।

শেষপর্যন্ত ছাড়তে হল বাঁধের জায়গা। মাথা গুজবে কোথায়? ছিন্নমূল লোকগুলো জমানো টাকা আর সমিতির লোন নিয়ে কেনে বাঁধের নিচে যে খাল তার লাগোয়া সাত ডেসিমেল পতিত জমি। ওখানেই সস্তা টিন আর পাটশোলার বেড়া দিয়ে গায়ে গায়ে লাগিয়ে গড়ে তোলে নিজেদের ছাপরা। খুব তাড়াতাড়ি না তুলে তো উপায় ছিল না। হঠাৎই গড়ে-ওঠা, তাই নামটা হল হঠাৎগাঁও। ‘হঠাৎগাঁও’, নামটা এই মুরুখ্খু লোকগুলোরই দেওয়া।

অবসর সময়ে বাবলা গাছটার তলে বসে দোক্তা আর আলাপাতা দিয়ে পান খেতে খেতে কত কথা, কত সুখ-দুঃখের আলাপ হত হঠাৎগাঁওয়ের মেয়েলোকগুলোর মধ্যে। জোবেদা, ফোক্কারের বউও পান চিবাতে চিবাতে সখিদের সঙ্গে আলাপ জমাত। অনেক বিষয়ের মধ্যে স্বামীদের নিয়েও চলত আলাপ। পালক-ফোলানো কইতরির মত ওর দেমাগ কারও কারও আঁতে খোঁচা দিত বৈকি। একদিনের কথাই ধরা যাক না কেন। অলস বিকেলে লেপাপোঁছা ছোট্ট উঠানের এক কোনায় সপ বিছিয়ে আলাপের ঝাঁপি খুলে দিয়েছিল ওরা। মুখের পানে আরও এক চিমটি দোক্তা ঠেসে দিয়ে জোবেদা বলেছিল: মরদ একডা দিছে আল্লায় আমারে! যখন যা বায়না ধরি, দেয়; আবার শইল্লের সুখও মিডায় সেইরহম...উপরে উঠলি মাগো, জান কবজ করার মত অবস্থা!ওরে ঠাপ!শইল্লের তাগদ যেমন, ওইডাও দিছে আল্লায় — বজরা লাওয়ের লগি জানি!

তোর একখান কপাল রে জবু! আমার মরদ কামাই যা করে দুই ওক্ত ভালা খাওনও জোডে না। শইল্লের সুখের কতা না অয় বাদই দিলাম; অইডা যে কারে কয় ভুইল্যাই গেছি। ফোঁস করে শ্বাস ফেলে বলেছিল শুকজান। ছফুরা তো মুখের ওপরই বলেছিল : অত দেমাক দেহাইও না গো। বেশি দেমাক ভালা লয়।


৫.

বছর খানেক আগে আকস্মিকভাবে ঘটে গিয়েছিল ঘটনাটা। জীবনের মোড় ফেরানো ঘটনাগুলো তো আসলে আকস্মিকভাবেই ঘটে থাকে।

কয়েকদিন ধরে আকাশ গোমরামুখো। কখনও ঝমঝমিয়ে কখনও বা গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছিল গত তিন দিন ধরে। সেদিন সকাল থেকে দম ধরেছিল বাদলা। তাই কাজের চাপ বেশি। অনেক মাল পাঠাতে হবে বাঘাবাড়ি। গুদাম থেকে বস্তা আসছে, সঙ্গে হিসাব রাখার জন্য টালি, মানে বাঁশের সরু কাঠি। বস্তা নৌকায় তোলার আগে লেবার টালিটা ধরিয়ে দেয় ফোক্কারের হাতে। তবনে মালকোচা মেরে নদীর ঘাটের একপাশে দাঁড়িয়ে মাল তোলার তদারকি করছিল ফোক্কার। শান বাধানো হলেও বৃষ্টিতে ঘাটের ওপর কাদা জমে পিছল।

নৌকায় তুলতে গিয়ে দু’মণি এক বস্তাসমেত পা হড়কে পড়ে যায় মুটে। ফোক্কার কী যেন দেখতে ক্ষণিকের জন্য পেছন ফিরেছিল। মুটের মাথার বস্তা গিয়ে পড়ে ফোক্কারের পিঠের ওপর। মুহূর্তে বস্তাসহ ফোক্কার গড়িয়ে পড়ে নদীতে। চারদিকে হৈচৈ, হন্তদন্ত, ছোটাছুটি। নদীর জল থেকে অচেতন ফোক্কারকে টেনে তোলা হল। কিন্তু ওকে নিয়ে কী করবে ভেবে পাচ্ছিল না কেউ। খুব তাড়াতাড়ি কোনও হাসপাতালে নিতে না পারলে বাঁচানো কঠিন। আপাতত থানা হাসপাতাল। থানা হাসপাতালের ডাক্তারের জবাব: নাহ্, অবস্থা গুরুতর, জেলা হাসপাতালে নিয়া দেখানো যাইতে পারে। ওখানেও একই কথা, উহুঁ, অবস্থা খুবই গুরুতর; ঢাকা পঙ্গু-হাসপাতালে নেওয়া ছাড়া উপায় নাই।

ভাগ্যিস যোগাযোগ তখন আগের থেকে অনেক উন্নত। ঢাকা পৌঁছাতে তাও আট ঘণ্টা। পঙ্গুতে পৌঁছে চিকিৎসা তো দূরের কথা ভর্তি হওয়াও কী অত সহজ! বেশ্যার দালালের মত বিভিন্ন ক্লিনিকের দালাল কিলবিল করে। টানাটানি শুরু করে রোগীর সঙ্গে-আসা লোকদের তাদের নিজ নিজ ক্লিনিকে নিয়ে যেতে।

অনেক চেষ্টা তদবির মালপানি খরচ করে ভর্তি করা গেল হাসপাতালে।

মারাত্মক চোটে শিরদাঁড়া এবং কটিদেশে জখম হয়েছে খুব। রোগী প্রাণে বাঁচবে, কিন্তু পঙ্গু হয়ে যাবে জীবনের তরে।


৬.

ক্রাচের মত করে বানানো বাঁশের লাঠিতে ভর দিয়ে চলতে হয় ফোক্কারকে। সেই কবে থেকে কোনও আয়রোজগার নাই ওর। যা সামান্য টাকা জমানো ছিল, শেষ হতে চলল প্রায়। ফোক্কারের সন্তান বলতে দু’মেয়ে। কচি বয়সে বিয়ে দিলে যৌতুক কম লাগে। দিয়েও ছিল খুব কম বয়সেই মেয়ে দুটোর বিয়ে। তারপরও দুটো বিয়েতে খরচ তো একেবারে কম হয়নি। বড় মেয়ের স্বামী দশ-বারো মাইল দূরে আতাইকুলা বাজারের এক সেলুনে কাজ করে। ছোটটার বিয়ে দিয়েছে এক ক্ষেতমজুর-পরিবারে। একটু হাবাগোবামত হলেও জামাই বাবাজির স্বভাব-চরিত্তির ভালো; খাটতেও পারে খুব। এখন সংসারে থাকার মধ্যে জোবেদা আর সে। খরচ আগের চেয়ে অনেক কম, কিন্তু কোনও কাজ না করলে এ-খরচই বা জুটবে কোত্থেকে! পঙ্গু ফোক্কারের পক্ষে ভারি কাজ করার প্রশ্নই ওঠে না। সৌভাগ্যই বলতে হয়। ওর জন্য উপযুক্ত কাজ জুটে গেল অবশেষে। ওয়াপদা-খালের মাছ পাহারা দেওয়ার কাজ। দারুল উলুম এতিমখানা ও হাফিজিয়া মাদরাসার নামে ইজারা নেওয়া খাল। লোকে সংক্ষেপে বলে এতিমখানার খাল। এতিমখানার অধ্যক্ষ, যাকে আরবিতে বলা হয় মুহ্তামিম, নূরুল হুদা লোকটা ভালো। যদিও এ অঞ্চলের লোক নয়; আদি নিবাস কুষ্টিয়া; কিন্তু কী কারণে, কেউ জানে না, নিজ ভুঁই ছেড়ে এতদূরে এসে বসত গেড়েছে। দেখতে সুপুরুষ, মুখভর্তি ঘন কাঁচাপাকা দাড়ি; বয়স দেখে মনে হয় পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই। বিবি বাল-বাচ্চার কথা বললে, বলে: বিয়ে করেছিলাম। টিকল না। ব্যস্, এ-পর্যন্তই। অনাথ-এতিম পঙ্গুদের প্রতি অপার ভালোবাসা ছাড়া দুনিয়াতে আর কিছু করবার কথা ভাবতে পারে না সে। আল্লার ইবাদত মনে করে এ-কাজকে। তাই পঙ্গু ফোক্কারের প্রতি তাঁর এত দরদ।

তবে নূরুল হুদার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত এক ব্যক্তি একবার বিনোদবাড়ি এসেছিল ব্যবসায়িক কাজে। তার মুখ থেকে জানা যায় আরও অনেক কিছু। নূরুল হুদা ছিল কুষ্টিয়ায় তবলিগ জামাতের বড় নেতা। ইসলামের দাওয়াত পৌঁছাতে সে চিল্লায় বেরোত। বছরের মধ্যে একনাগাড়ে চল্লিশ দিনই কাটত তার দ্বিনের খেদমতে। আর নতুন বিয়ে-করা বউ তখন থাকত ননদের সঙ্গে। সময় কাটত ননদের সঙ্গে লুডু খেলে। কুষ্টিয়া শহরের এক এবতেদায়ি মাদরাসার শিক্ষক ছিল তখন নূরুল হুদা। শুধু যে তবলিগ তাই নয়। সবকিছুতেই ছিল তার অতি বাড়াবাড়ি। কেউ ছবি তুলবে ওর? কক্ষনই সম্ভব নয়। বৌ বলেছিল একদিন: আপনে তো ছবি তোলেন না। কিন্তু পিস টিভিতে জাকের নায়েক কী সুন্দর ভাষণ দেন...ওনারটা কি বেদাতি কাজ?

খুব টিভি দেখা হয়, না? তা কোন বাসায়, অ্যাঁ? টিভি দেখা হারাম। আর ওই জাকের না কি ফাকের, অনেকের কাছেই শুনেছি ওর কথা; একটা মোনাফেক! আল্লার লানত্ পড়ুক ওই এয়াহুদি-নাছারাদের দালালের উপর!

বাজার থেকে কৌটার বা বোতলের কোনও জিনিস কিনে তো দূরের কথা মাগনা পেলেও খেত না। দেশি আর আরব দেশ ছাড়া অন্য কোনও দেশের জিনিস স্পর্শ করাও হারাম। ওষুধ? একমাত্র হেকিমি। ইউনানিও চলে। একবার খুব ডায়রিয়া, ভালো কম্পানির ওরস্যালাইন দেওয়াতে সে কী তুলকালাম কাণ্ড! ঝ্যাংটা মেরে ছুঁড়ে ফেলে-দেওয়া স্যালাইনে বিছানা ভিজে একশা, মেঝেতে পড়ে গেলাস ভেঙে কয়েক টুকরা।


একদিন চিল্লা থেকে ফিরে এসে দেখে, বাসা ফাঁকা। পরে বোনের কাছ থেকে জানতে পারে, তার ভাবি চলে গেছে বাপের বাড়ি। বোন বারবার অনুরোধ করেছিল ভাবিকে ফিরিয়ে আনতে। কে শোনে কার কথা। যত খুবসুরতই হোক স্বামীর অবাধ্য আওরাতকে খোশামোদ করা বেদ্বিনি কাজ। মাসখানেক পড়ে জানা যায়, মালয়েশিয়া প্রবাসী এক যুবকের গলা ধরে মেয়েটি চলে গেছে সেই দেশে। আর সেইদিন থেকেই নাকি নূরুল হুদা ছেড়ে দেয় চিল্লায় যাওয়া। ঘনিষ্ঠজনদের সঙ্গে তবলিগ নিয়ে কথা উঠলে বলে: তাবলিগের নিকুচি করি! আরও কিছু কাহিনি বলা যেত তার সম্পর্কে, তবে তা বলা উচিত হবে না বলে মনে করেছিল কুষ্টিয়ার সেই ব্যবসায়ী। অত ভালো চাকরি ছেড়ে দূরদেশে এসে লিল্লার ওপর চলে এমন একটা প্রতিষ্ঠানে কাজ করে জেনে তাজ্জব বনেছিল সেই লোক!

এখন অবসর সময়ে বসে বসে নূরুল হুদা পিস টিভি দেখে, যখন একা থাকে, লুকিয়ে-চুরিয়ে অন্য চ্যানেল।


৭.

খটখট্...খটখট্...

সন্ধ্যা গড়িয়ে অন্ধকার নামলে ফোক্কারকে দেখা যায় খটখট্ শব্দ তুলে তার জন্য নির্ধারিত ডিঙি নৌকায় গিয়ে উঠতে। ডিঙির চরাটে বিছানো তেলচিটচিটে কাঁথার ওপর কাত হয়ে বসে দুর্বল হাতে সে ধীরে ধীরে নৌকা বায়। খালের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত পর্যন্ত। খালটা তো আর ছোট নয়। এ-পার থেকে ও-পারে যেতে আধঘণ্টার মত লেগে যায়। মাঝে মাঝে সাত ব্যাটারির টর্চ মারে খালের এদিক ওদিক। আজকাল আবার কারেন্টজাল চালু হয়েছে। কোনওমতে এক টান মারতে পারলে আধমণ মাছ গায়েব! থেকে থেকে ভাঙা গলায় আওয়াজ দেয় ফোক্কার: কিডারে? হেই-ই-ই..., হুঁশিয়ার! কোথাও ছপ করে আওয়াজ উঠলেই সার্চলাইটের মত টর্চের আলো ফেলে। কখনও চোখে পড়ে উদ, গুইসাপ, কখনও বা ঢোঁরা সাপ, মাছ মুখে নিয়ে পানি থেকে ডাঙামুখো উঠছে। এদের উপদ্রব থেকে বাঁচবার কোনও উপায় আজও খুঁজে পাওয়া যায়নি। দিনেরবেলা মাছরাঙার ছো! একেকটা ছো যেন বুকে খোঁচা মারে ফোক্কারের। সন্ধ্যাবেলা মাঝারি আকারের সিলভার আর কাতলা মাছগুলো যখন দল বেঁধে খালের কিনার ঘেঁষে পাক মারে, চোখ জুড়িয়ে যায়। নিকা-করা নৈকাটার শোক কিছুটা হলেও ভুলিয়ে দেয় পুকুরের মাছগুলোর খেলা। বেখেয়ালে বাইতে গিয়ে পাড়ের কাছের নলখাগড়ার ঝোপে সেধিঁয়ে যায় ডিঙির মাথা। আরে একি ঝোপের ওপারেই তো ওদের ঘর। যাবে না কি একটু জিরাতে? এক গেলাস পানি খেতে? জোবেদার জন্য মন কাঁদে। আহারে, সংসার কইরে কোনও সুখ পাইল না মেয়াডা। কয়েকদিনের সুখ যেন এক হাওয়াইমিঠাই, মুখে দিতেই শ্যাষ। গাঙে পইড়া যাওয়ার পর এই এক বচ্ছর দেহের সুখ দিতে পারে নাই। চেষ্টা কী কম করেছে! শুধু আদর করা, ডলাডলি, চুমাচুমি সার! এতে আরও কষ্ট বেড়েছে দুজনেরই। একসময়কার বজরা লৈকার লগি এখন মুখে নুন-দেওয়া জোঁক — কুঁচকে এতটুকুন! ফোক্কারের ভয় হয়, ওর মত ভরাযৌবনের মেয়েলোক কতদিন থাকতে পারবে উপোসী দেহ নিয়ে! ওর দুচোখ থেকে ঠিকরে বেরোতে দেখা যায় কামনার আগুন। মেজাজ মাঝে মাঝেই বিগড়ে যায়; অস্বাভাবিক আচরণ করে। ফোক্কারের বন্ধু কছের মোল্লা একদিন গম্ভীর গলায় বলেছিল: ভাবিরে কবিরাজ দ্যাহা। যা দ্যাখতিছি ভালা ঠেকতিছে না। জিনে ধরল না তো!

জিনে ধরার চেয়েও আরও বড় একটা আতঙ্ক ওকে তাড়া করে ফেরে। ওকে ফেলে যদি অন্য কারও সঙ্গে পালায় জোবেদা, তখন!

জোবেদাই বলে: দুব্বল শৈল্লে তোমার কত কষ্ট। আমি না-অয় কুনো কামে লাগি।

তুই আবার কী কাম করবি?

এতিমখানার হুজুর কইছিল তার পাকশাকের কাম কইরা দিতি; মাসে দুই হাজার টেহা দিবি। কী কও?

কপালের চামড়ার সমান্তরাল সোজা রেখাগুলো বাঁকা হয়েছিল ফোক্কারের। ফ্যাকাসে চোখ দুটো আরও যেন ফ্যাকাসে হয়ে উঠেছিল। ফ্যাসফেসে, কিছুটা বা জড়ানো গলায় জবাব দিয়েছিল: একটা কতা কব জবু...?

কী কতা?

আমারে ছাইড়া যাবি নাতো কুনোদিন?

আইশ্চয্য, এ আবার কেবা কতা! এইডা তুমার মাতায় আইসল ক্যান?

দেহি তো, তোর পিছনে কত ভোমর ভনভন করে। আমি আইজ মারা গেলি কাইলই তোরে বিয়া করতে কতজনে উইঠা পইড়া লাগবি...। কথা পাল্টায় ফোক্কার: গেদি দুইডার খবর কী? আসপি নাহি কেউ?

বড়টা খুব বেস্ত। গারমেন্টে কাম কইরে সমায় পায় না। ছোড্ডার শ্বশুরের অসুখ, কাইল অষ্টমিনশা থিকা জব্বর মিয়া আইছিল, বলল।

বড় মেয়ের খসম আরেকটা বিয়ে করায় স্থায়ীভাবে ছাড়াছাড়ি। ঢাকায় এখন গারমেন্টসে চাকরি করে।

তোর যা খুশি তাই কর; আমারে ছাইড়া যাইস না। তোরে ছাড়া আমি বাঁচপার পারব না...। কথাগুলো বলতে গিয়ে গলা ধরে এসেছিল ফোক্কারের। তুই বুজবার পারিস না, আমি তোরে কত ভালোবাসি — আমার জান!

কী যে খালি প্যাচাল পারে! ঘর ঝাঁট দিতে দিতে মুখে রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে বলেছিল জোবেদা।


৮.

হুজুরের বাসায় কাজে লেগে যায় জোবেদা। সকালে ফোক্কারের সেবা-যত্ন সেরে হাঁটা দেয় প্রায় আধা কিলোমিটার দূরের এতিমখানার দিকে। এতিমখানার এক প্রান্তের সীমানা ঘেঁষে হুজুরের ছোট বাসা।

ওকে দেখে খুশি হয় নূরুল হুদা। বলে: তুমি বাঁচালে আমাকে। কী যে ঝামেলায় পড়েছি। একটা বিটি ছিল, মেয়ের অসুখের খবর পেয়ে চলে গেল। গেল যে গেল, আর খবর নেই। এখন নিজেই দুমুঠো চাল ফুটিয়ে নিই, ওর মধ্যেই ছেড়ে দিই কখনও আলু, বেগুন, ঢেঁড়শ সঙ্গে কাঁচালঙ্কা। ভাত আর ভর্তা খেয়ে খেয়ে পেটে পলি জমে গেছে।

আমরা গরিব মানুষ চাচামিয়া, আমাগের পাক কেবা লাগবিনি কে জানে...। বলে জোবেদা।

বেশ শব্দ করেই হেসে ওঠে নূরুল হুদা, বলে: আগের বিটি কি বড়লোকের বউ ছিল?

হাসলে নূরুল হুদাকে আরও সুন্দর দেখায়। মানুষের সৌন্দর্যের একটা বড় দিক দখল করে থাকে তার হাসি। আর দাঁত যদি ঝকঝকে নিখুঁত পরিপাটি না হয় তাহলে হাসিতে সেই মধু ঝরে না। হুদার দাঁত যেন কোনও ঝানু সেকরা অতি যত্ন করে বানিয়ে বসিয়ে দিয়েছে তার গোলাপি মাড়িতে।

বেশ বড় এলাকা জুড়ে এতিমখানা আর হাফেজিয়া মাদরাসা। চারদিক কাঁটাতারে ঘেরা। মাদরাসার অন্য শিক্ষকরা বাইরে থেকে আসে, কর্মচারীরাও।

ক’দিন যেতে না-যেতে জড়তা যেটুকু ছিল কেটে যায়। নূরুল হুদার সঙ্গে ক্রমশ স্বাভবিক হয়ে ওঠে জোবেদার সম্পর্ক। একদিন বলেই ফেলে: আপনে আরেকডা বিয়া করলেই তো পারেন, চাচামিয়া। বিয়ার বয়স তো...

ওকে থামিয়ে দিয়ে নূরুল হুদা বলে: স্ত্রীজাতিতে বিশ্বাস পাই না। ও চিন্তা আর মাথায় আনি না...।


সপ্তাহ দুয়েকের মাথায় হুজুরের কিছু কিছু আচরণ একটু যেন কেমন লাগে।

তোমার হাতে কি জাদু আছে? যা রাঁধো তাই এত মজা হয়!

কী যে কন চাচামিয়া, আমাগের দ্যাশে সকলেই এরহমই রান্দে...

কথায় কথায় কেবল চাচামিয়া চাচামিয়া, একদম ভালো লাগে না। কানে জ্বালা ধরায়। ওটা বাদ দিলে হয় না?

কী বইলা ডাকপ তা অইলে?

না, মানে, তুমিই না আরেকটা বিয়ে করার কথা বললে। আমার বয়স কি তোমার চাচার সমান মনে হয়? মুরুব্বি মুরুব্বি মনে হয়?

সাহস বেড়ে চলে নূরুল হুদার। জোবেদা যে বোঝে না তা নয়। ওরও তো এক বছরের উপোসী শরীর। মজাও লাগে মরদের আগানোর ছলাকলা দেখে।

তোমার কপালটা খুব সুন্দর, খুব ইচ্ছা হয় ওখানে একটু আদর করতে...

জোবেদা মনে মনে হাসে, কপালে কেন, ঠোঁটে আদর করতি অসুবিধা কী, বুকে! যেরহম অবস্থা দেখতাছি, সারা শৈল্লে আদর করতি বললি জান দিয়া করবা। মুখে কিছু বলে না। শুধু উত্তেজনাকে উসকে দেওয়ার জন্য অদ্ভুত মিষ্টি হাসির ঝিলিক তোলে চিকন ঠোঁটে।

একদিন তো ঘরে ঢুকে থ’। এ কি! কী দ্যাখে হুজুরে!

ওকে দেখেই রিমোট টিপে বন্ধ করে দিয়েছিল টিভি।

অস্বাভাবিক কেমন এক কণ্ঠে বলেছিল: একটা কথা বলব তোমাকে, রাখবে?

কী কথা? পাল্টা প্রশ্ন জোবেদার।

আগে বল, রাখবে...

না শুইনে বলি কেবা কইরে! রাহার মত হলি রাখপ লয় ক্যান!

তুমি যা চাইবে তাই দেব।

যা চাব, তা দিবেন?

হুঁ, সাধ্যের মধ্যে হলে তা-ই দেব।

চিকিচ্ছা করায়ে সোয়ামির ব্যাধিটা ভালা কইরে দিতে পারবেন? আপনের তো অনেক টেকা।

ধ্যাৎ, কী যে বলে! আমার অনেক টাকা; হা-হা-হা। হাসালে তুমি। কিন্তু ওর যা অবস্থা, ভালো হওয়া সম্ভব বলে মনে হয় না। তারপরও চেষ্টা করে দেখব।

ঠিক আছে, আপনে যা বলবেন, রাখপোনি। মুচকি হেসে বলেছিল জোবেদা।

নূরুল হুদা তার মনের গোপন বাসনাটা জানিয়েছিল। এবং রিমোট টিপে চালু করেছিল টিভি। যে ফিল্মটি ভেসে উঠেছিল টিভির রঙিন পর্দায়, জোবেদার জীবনে ও-ধরনের সিনেমা এই প্রথম দেখা।

একবার মুখ থেকে শুধু বেরিয়েছিল: ও ছিক্কো...!


৯.

বিষয়টা ফোক্কারের নজর এড়ায় না। জোবেদা কেমন যেন আনমনা থাকে ইদানীং। কিছুটা বিমর্ষও। ওর পায়ের কাছেই হড়হড়িয়ে বমি করে দিল এই তো ক’দিন আগে।

আতঙ্কিত ফোক্কার অস্থির হয়ে ওঠে। নিজে পঙ্গু, বউটারও যদি কঠিন কোনও রোগ বাধে, অবস্থা কী দাঁড়াবে, ভাবতেও শিঁউরে ওঠে ও।

কী রে, কী অইল তোর?

কিচ্ছু না। তোমার অত চিন্তা করার দরকার নাই।

ফোক্কারকে চিন্তা না করতে বললেও জোবেদা নিজে চিন্তা করে পায় না, কী করে উদ্ধার পাওয়া যাবে এ বিপদ থেকে। ঘনিষ্ঠ অনেকজনকে ধরেছিল, একটা বিহিত-ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্য। ওদের উল্টো কথা: তোর তো মোডে দুইডা গেদি, কতজনের পাঁচডা ছয়ডা; আর এবারেরডা যদিল গেদা অয়।

অনন্যোপায় হয়ে বিষয়টা খোলাখুলি জানিয়েছিল ফোক্কারকে। ওর কপালের সরলরেখাগুলো আবার বেঁকে গিয়েছিল ক্ষণিকের জন্য। মুখ থেকে ঝরে পড়েছিল শুধু একটা শব্দ: অ!

জোবেদা বালিশে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেছিল। কাঁদতেই থেকেছিল ততক্ষণ, যতক্ষণ না একটা খরখরে হাত ওর উদলা পিঠে এসে নড়াচড়া করতে শুরু করেছিল।

কান্দিস না, জবু। কান্দনের কী অইল! আর কেউ জানে নি আসল ব্যাপারডা? জোবেদার উদাম পিঠে হাত বোলাতে বোলাতে বলে ফোক্কার।

মাথা নেড়ে নিঃশব্দে বোঝায় জোবেদা, না, কেউ জানে না।

তা অইলে কান্দনের কী অইল, অ্যাঁ? সক্কলে জানব আমার মর্দামি আগের লাহানই আছে...।

প্রতিদিনের মত খাল পাহারা দেয় ফোক্কার, জোবেদা পায়ে হেঁটে আধকিলোমিটার পথ মাড়িয়ে পৌঁছে যায় এতিমখানায়।

কী দেহা যায় অই দিকে খালের কান্দায়! দক্ষ সেনা যেমন শত্রুকে দেখামাত্র গুলি ছোড়ে, ফোক্কারও তেমনই চোখের নিমিষে টর্চের তীব্র আলো ছোড়ে আবছা একটা বস্তুকে লক্ষ করে। পরক্ষণেই ধাঁ করে টর্চের আলো অন্যদিকে সরিয়ে নেয়। পাশের গাঁয়ের মালতি খালের পাড়ে হাঁটু গেড়ে বসে হাগু করছে। পাগলি, বদ্ধ উন্মাদ! কী-ই বা বলা যায়! মায়া হয় ওর জন্য। অবস্থাপন্ন পরিবারের মেয়ে। অথচ খেয়াল রাখবার তেমন গরজ নেই কারও।

জোবেদার শারীরিক পরিবর্তন ভালোভাবে খেয়াল করলে ধরা যায়। উদর স্ফিত হতে শুরু করেছে। ডিঙির বৈঠায় পানি কাটে আর সুদূর অতীতের জমে-থাকা স্মৃতির গায়ে আঁচড় কেটে চলে ফোক্কার। ওর বাপজানের মুখ ভেসে ওঠে। সে তো আজ থেকে না-হলেও ছত্রিশ বছর আগেকার কথা। ওকে সাত বছরের রেখে মারা যায় কাজেম। বাপের সঙ্গে নাওয়ে করে মাঝেমধ্যেই রেলইস্টিশনে যেত। কদমা-কটকটি আর জিলাপি কিনে দিত বাপ। বারবার জিজ্ঞেস করত: আরও জাল্লা খাবি নাহি, গেদা? ওর বাপও ছিল নৌকার মাঝি। ওকে রেখে কোথাও বেরোতে পারত না কাজেম আলী। ফাঁকি দিয়ে বেরোলে, টের পাওয়ার পর সে কী কান্না, চিৎকার, — বাজান কনে, আমার বাজান কনে গেল...। একদিনের কথা খুব মনে পড়ে। পাড়ার বন্ধুদের সঙ্গে মার্বেল খেলছিল, এমন সময় নতব মাঝি ওর মাকে বলল: কাজেম আসতিছে...। দুদিন ধরে ওর বাপকে না দেখে মনটা খারাপ ছিল গেদার। চাঙাড়িতে বয়ে-আনা কাজেমের নিথর দেহটাকে ওদের ছাপরার সামনে রাখা হয়েছিল। সবাই মড়াকান্নায় ভেঙে পড়েছিল। গেদা বিষয়টা বুঝে উঠতে পারছিল না যেন। পরে জেনেছিল, নেছড়াপাড়া শ্মশানঘাটের কাছেই গুন টানার সময় জাত সাপের ছোবলে মারা যায় কাজেম। ওর মুখের কশে লালচে লালা শুকিয়ে লেপ্টে ছিল।

চোখজোড়া ভিজে আসে ফোক্কারের। এতদিন পর, কেন, বোঝে না, বুক চিরে বেরিয়ে আসে এক দীর্ঘশ্বাস — বাজান!


আশে পাশে কোথাও কয়েকটা শেয়াল ডেকে ওঠে তীক্ষ্ণ সুরে। সঙ্গে সঙ্গে কুকুরের হুঙ্কার। হঠাৎই তুমুল হট্টগোলের শব্দে সম্বিত ফিরে পায় সে। হ্যাঁ, ওদের বাড়ির দিক থেকেই তো আসছে আওয়াজটা। এত রাতে আবার কী ঝামেলা বাধল! ব্যাকুল ফোক্কার যত জোরে সম্ভব ডিঙি বেয়ে চলে ঘাটের দিকে। ডিঙি থেকে তাড়াহুড়ো করে নামতে গিয়ে অল্পের জন্য আছাড় খাওয়া থেকে রক্ষা পায়। বাঁশের ক্রাচের খটখট্ শব্দের দ্রুততা স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে কয়েকগুণ বেড়ে যায়।

ওর ঘরের সামনে অনেক লোকের জটলা। কারও গলার স্বরই স্বাভাবিক মাত্রায় নেই।

চোরের দশ দিন কী গেরস্থের এক! নূরুল হুজুর আর জোব্দা বিবিরে জুতমত ধরা গেছে আইজ; এহেবারে রাইত দুপুরে ঘরের মদ্যি...!

ভিড়ের মধ্য থেকে কে একজন ফোড়ন কাটে: রাইত দুপুরে হুজুর মনে অয় আমসিপারা পড়াতি আসছিল... হি হি হি...

অতি উঁচু মাত্রা থেকে ফোক্কারের কানে ক্রমান্বয়ে কমে আসে টুকরো টুকরো শব্দগুলোর জোর: আমাগের গাঁওরে লটিপাড়া বানাতি দেওয়া চলবি লয় , লটি মাগিরে হেটাতি হবি... লটি মাগি... লটি মাগি — !

বাঁশের লাঠিতে আর শরীরের ভর রাখা যাচ্ছে না। মাথাটা বোঁ বোঁ ঘুরছে। লক্ষ লক্ষ ঝিঁঝিঁ ডেকে চলেছে অনবরত। আচমকা হট্টগোল কান থেকে একেবারেই উবে যায় ফোক্কারের।

কে একজন বলে ওঠে: আরে, আরে, ফোক্কাইরা পইড়া গেল যে!

লোকের সামনে বুক টান করে দাঁড়িয়ে জোবেদা মুখ বেঁকিয়ে খনখনে গলায় হেঁকে চলে: বেশি হৈচৈ কইরো না কইলাম। নেছড়াপাড়ার মেয়া আমি, ডরাই না কাউরে। আমার সোয়ামির কথার বাইরে কুনো কাম করি না। হে খুব ভালোবাসে আমারে; আমিও তারে ভালোবাসি। আইজ হে নিজেই হুজুররে আসপার জন্যি বলছিল, আসছে — অন্যায়ডা কী অইছে তাতে, অ্যাঁ?

আমি আমার সোয়ামির ইচ্ছার বাইরে কুনো কাম করি না। বিশ্বাস না অইলে ডাহো তারে। চুপ কইরে আছ ক্যা? কই, ডাহো!


মাটিতে যে ফোক্কার বা মোহাম্মদ মোফাকখারুল ইসলাম পড়ে ছিল, তার ঠোঁটের কশ বেয়ে লালচে লালা গড়িয়ে পড়ে আলাপাতারঙ মাটিতে জমে ছিল। লাঠি দুটো পাশে পড়ে থাকলেও সাত-ব্যাটারির টর্চটা হাতের মুঠোতে শক্ত করে ধরা ছিল। তার শরীরের ওপর আলো ফেলে ভালোভাবে দেখে সবাই নিশ্চিত হল, হাজার ডাকলেও সে আর কখনও উঠে দাঁড়াতে পারবে না।


লেখক পরিচিতি
শামসুজ্জামান হীরা
মুক্তিযোদ্ধা। গল্পকার। অনুবাদক। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন