বুধবার, ২৯ জুন, ২০১৬

শামসুজ্জামান হীরা'র গল্প : ঘোর রাতে ঘরে ফেরা

রাত একেবারে মন্দ হয়নি। তবে অন্যান্য দিনের চেয়ে আজ বেশ তাড়াতাড়ি ভেঙেছে আসর — দশটা পনের, রঙচটা হাতঘড়িতে চোখ বোলায় মোরশেদ। কোনও কোনও দিন গভীর রাত, আবার কোনও কোনও দিন কীভাবে যে রাত পার হয়ে যায় টেরই পায় না। ফজরের আজান কানে বাজলে হুঁশ হয়; তখন নিজেকেই ঝাড়ি দেয়: ‘বড় বেশি বাড়াবাড়ি করছি, ছিঃ! বউটা নিশ্চয়ই টেনশনে সারা রাত জেগে কাটিয়েছে। যা দিনকাল পড়েছে! আর কক্ষণও এত বাড়াবাড়ি নয়; নেভার!’ ব্যস, ওই পর্যন্তই!

আসরটাও কম দিনের নয় — তেইশ-চব্বিশ বছর তো হবেই কম পক্ষে। প্রথম যখন এ-আসরে ভেড়ে, তখন বড় বন্যা হয়ে গেল দেশে । হেডক্লার্ক হবার দশ বছর আগেকার কথা। এর আগে খেলত মালিটোলা এক বন্ধুর বাসায়। ওখানে খেলা নিয়ে দারুণ গোল বাঁধল একদিন, হাতাহাতি মারামারির পর্যায়ে চলে গিয়েছিল ব্যাপারটা। যাবেই-বা না কেন; জলজ্যান্ত জুয়াচুরি! তিন তাসের খেলা — ফ্লাশ। কখনও পাঁচজন, কখনও এমনকি সাতজন। খেলা এবং সেই সঙ্গে কেউ টানত শক্তি ঔষধালয়ের মৃতসঞ্জীবনী সুরা, সংক্ষেপে বলত শক্তি; যারা একটু মালদার, কেরু কম্পানির ড্রাই জিন। তবে সবাই যে খেত তা নয়। আক্কাস তো খেলার ফাঁকে ফাঁকে সরাসরি বোতল থেকেই মেরে দিত দু’এক ঢোক শক্তি। রাত যত গড়াত মুখও চলত তত। হাত ফেভার না করলে কার্ডের কাল্পনিক মা-বাপ-চোদ্দগুষ্টি তুলে অকথ্য খিস্তিখেউর। যারা মাল খেত না, তাদের মধ্যে কেউ কেউ এদের মাতলামির সুযোগ নেওয়ার তালে থাকত। ঘটনাটা ঘটেছিল এভাবেই। পাঁচ হাতে খেলা হচ্ছিল; নিয়ম মাফিক বোর্ড-হিট-কাউন্টার দিয়ে অফ গিয়েছিল তিনজন। কিন্তু ব্লাইন্ড খেলে চলেছিল আক্কাস আর জাভেদ। সবাই কিছুটা আশ্চর্য — আক্কাস মাঝে মাঝে বেপরোয়া ব্লাইন্ড খেলে বটে, কিন্তু জাভেদ তো এত ব্লাইন্ড খেলে না কখনও! খেলতে খেলতে আক্কাসকে টাল ভেবে চট করে তাস পাল্টে নিতে যাচ্ছিল জাভেদ। চৌকো টেবিলের ওপর তখন টাকার স্তূপ। যত মালই টানুক, আক্কাস ঘাগু জুয়াড়ি — খপ করে চেপে ধরেছিল জাভেদের কব্জি, জড়ানো গলায় খেঁকিয়ে উঠেছিল: ‘ম্-মাদারচোৎ, ক্-কী করস? ভাবছস আমি দ্-দেহি নাইক্যা?’

জাভেদই-বা কম যায় কিসে, এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে নিয়ে ধমকে উঠেছিল: ‘খামুশ, মুখ সামলা, বাড়াবাড়ি করলে বিপদ আছে কইলাম! হালায় মদ খাইয়া টাল, হুদাহুদি গ্যাঞ্জাম করে। কী করছি আমি,অ্যাঁ?’

‘তুই আমার চ্-চোখরে ফাঁকি দিবার চ্-চাস্, ভাবছস্ দ্-দেহি ন্যাইক্যা, ব্-বোকাচোদা নাহি আমি? নিচের থন ব্-বানানি তাস ল্-লইছস্...।’

ব্যাপারটা পীযূষের চোখেও পড়েছিল। পকেট ফাঁকা হয়ে যাওয়ায় ও তখন বসে বসে খেলা দেখছিল। বাটার আগে তিনটে তাস পছন্দ মত বানিয়ে ঝটপট টেবিলের নিচে, কোলের ওপর রেখে দিয়েছিল জাভেদ। ভেবেছিল কেউ দেখেনি। খেলার এক পর্যায়ে সুযোগ বুঝে ওপরেরটা নিচে ফেলে নিচের তাস ওপরে তুলতে নিতেই বিপত্তি। 

পীযূষ আপস-রফার চেষ্টা চালায়। বলে: ‘কামডা ভালা কর নাই জাভেদ, জুয়া খেলার মদ্যে সততা না থাকলে চলে? অত কেউ দেহে নাকি কোন্ দিয়া কেডা কী করে?’ 

‘জব্বর কইছস হালায়, জুয়া খেলায় সততা! কী জানি কয়, অনেস্টি ইজ দি বেস্ট পলেসি, কেলাশ টেনে পড়ছিলাম!’ একগাল হেসে ফোড়ন কাটে তসলিম। 

অনেকক্ষণ ধরে চেঁচামেচি বাকবিতণ্ডার পর ফয়সালা হয়েছিল, বোর্ডের টাকা আক্কাসই পাবে। কিন্তু ওই ঘটনার পর পাশের ফ্লাটের বাসিন্দাদের শাসানিতে ওখানে খেলা গেল বন্ধ হয়ে। তারপর হেথা-হোথা আসর বসিয়ে শেষে এসে থিতু হয়েছে এ-আস্তানায়। 


মনটা ফুরফুরে মোরশেদের। পরপর দু’দিন — মাঝখানে অবশ্য চারদিন খেলেনি — হারবার পর ভালোই দান মেরেছে আজ। গোনেনি যদিও, তবু আন্দাজ, হাজার খানেক তো হবেই। মাসের শেষ, টাকার খুব দরকার ছিল; সময়মত জুটে গেল। কাল, হ্যাঁ কাল অবশ্যই ডাক্তারের কাছে যেতে হবে। আরও ক’দিন আগেই যাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু কী করবে, সব জায়গায় বাকি চললেও ডাক্তারের কাছে কি চলে?

ধুশ্ শালা, পথঘাটের কী ছিরি! বিরক্তিতে গজরায় মোরশেদ। আরেকটু হলেই পাঁকের মধ্যে পটকান খেত। স্ট্রিট-লাইটের নিষ্প্রভ আলোয় পথ দেখে চলা ভার, টর্চের ব্যাটারির আয়ু গেছে কমে — জোর নেই যথেষ্ট আলো ছড়াবার। ধারেকাছের কোনও এক হোটেল থেকে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গান ভেসে আসছে। ওর খুব প্রিয় গান। গানের সুর ওকে নিয়ে যায় সুদূর অতীতে। সিটি ক্যাফের রেকর্ড প্লেয়ারে বাজত এই গান। তখন কলেজে পড়ে। কলেজের দিনগুলোর স্মৃতি মনে এসে ভিড় করে ওর। ভাবতেও অবাক লাগে এখন। পড়াশোনা থোড়াই করেছে। বারবার পরীক্ষায় ডাব্বা! বেশির-ভাগ সময় তখন কাটত ওর লেখালেখি নিয়ে। কলেজ-বন্ধু, কেউ সহপাঠী, কেউ বয়সে বড়, কেউ-বা কিছু ছোট, সাহিত্যের সঙ্গে যাদের সম্পর্ক, তারাই ছিল ওর ঘনিষ্ঠজন। সিটি ক্যাফের আড্ডা, আহা! এক কোণ বেছে নিয়ে ওরা জমাতো সাহিত্যের আসর। নতুন-লেখা প্রবন্ধ, গল্প বা কবিতা পড়ে শোনাতো, যখন যে লিখত। ওর লেখা মানে গল্প। একেকটা গল্পের জন্ম দিতে কত রাত কেটে যেত নির্ঘুম, হিসাব নেই। প্রশংসা শুনে কেটে যেত রাত্রি জাগরণের ক্লেশ। গর্বের হাসি ফুটত মুখে, যেমন হাসি ফোটে সন্তান জন্ম দেওয়ার পর মায়ের মুখে! খুব রাগ হত যারা শুধু আড্ডা মেরে সময় নষ্ট করে তাদের ওপর। ভাবত, কী অপদার্থ, অবুঝ লোকগুলো, সময়কে কী করে নষ্ট করছে, দ্যাখ!

অমনোযোগী হওয়ায় হোঁচট খেল মোরশেদ, মাঝে মাঝেই খায়, এখন তো রাত, দিনের বেলাতেও খায়। চোখে ছানি পড়েছে সেই কবে; ডানচোখটা অপারেশন করা দরকার; চশমার পাওয়ার বদলানোর সময় ডাক্তার বলেছেন।
‘আরে আরে মুরুব্বি, সাবধানে চলাফেরা করবেন তো! বয়স তো কম হয় নাই।’ ক’জন যুবক এসে রাস্তা থেকে টেনে তুলেছিল ওকে। বক্সিবাজারের ফুটপাথ থেকে পথে নামতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে পড়ে গিয়েছিল, তাও আজ থেকে প্রায় বছর দুয়েক আগে এক সন্ধ্যায়; ছিটকে পড়েছিল চশমা, হাতে-ধরা কাগজপত্তর। যুবকদের সহানুভূতি ওর বুকে কাঁটার মত বিঁধেছিল, বয়স তো কম হয় নাই, মুরুব্বি —! মুরুব্বি... মুরুব্বি... মুরুব্বি...কানে জ্বালা ধরিয়েছিল এই একটি শব্দ! রাগে গা রি রি করছিল; হাত নিশপিশ; পারলে বসিয়ে দেয় দু’ঘা এগিয়ে-আসা যুবকদের যে-কারও মুখে! নিজেকে সংযত করেছে। হিসাব কষে দেখেছিল, বয়স সাতান্ন ছুঁই ছুঁই। সার্টিফিকেটে পঞ্চান্ন প্লাস; আর ক’বছর বাদেই রিটায়ারমেন্টে যেতে হবে। অথচ, মনে হয়, এই তো সেদিন, লুকোচুরি খেলতে গিয়ে হুট করে ঢুকে পড়েছিল এক প্রতিবেশীর ঘরে; ঝাঁজালো গলায় শাসনের সুরে বলে উঠেছিলেন বাড়ির কর্ত্রী — ও খালাম্মা বলে ডাকত, অনেক বয়স, তখন মনে হত, মায়ের চেয়ে তো বেশি বৈ কম নয়, ত্রিশ-বত্রিশ — ‘বান্দর কোথাকার, না বলে-কয়ে ঘরে ঢোকো, বয়স হয় নাই, হ্যাহ্...!’ তখনও হাফপ্যান্ট ছাড়েনি; ক্লাশ সেভেনে পড়ে। ঘরে ঢোকার সঙ্গে বয়সের কী সম্পর্ক সেদিন বোঝেনি। ভ্যাবাচেকা খেয়ে সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল মহিলাটির দিকে!

তাস খেলায় হাতেখড়ি ওর সেই যখন বয়স পঁচিশ কি ছাব্বিশ। সবে জেলা-শহরের কলেজ থেকে বেরিয়েছে, ঢাকা এসে চাকরির খোঁজে টো টো করে ঘুরে বেড়ায় এ-অফিস ও-অফিস। থাকে এক আত্মীয়র বাসায়। সন্ধ্যা পেরোলেই আত্মীয় ওকে নিয়ে বসত ফিস — ওরা বলত দুরি ফিস — খেলতে। ইচ্ছা না-থাকলেও আশ্রয়দাতার মন জোগাতে খেলতে হত। আট কার্ডের খেলা। দুই হল জোকার। খেলাটা আত্মীয়ই শিখিয়েছিল ওকে। প্রথমদিকে প্রায়ই হারত; পরে জিতত মাঝেমধ্যে। জিতলে দু’ বা আড়াই টাকা, হারলেও ওরকমই। টাকার দাম ছিল তখন, হুঁ! — চল্লিশ টাকা মণ চাল, গরুর মাংসের সের দু’টাকা আট আনা! দশমিক মুদ্রার প্রচলন হলেও লোকের মুখে তখনও পাঁচ আনা আট আনা চালু। অভ্যাস কী অত সহজে বদলায়? 

প্রথম প্রথম বেজায় খারাপ লাগত এভাবে সময় নষ্ট করতে; পুরনো সেই আড্ডার কথা মনে এলে কেমন এক দুর্বহ বিষণ্নতার বোঝা বুকে এসে চেপে বসত। তারপর ধীরে ধীরে সময়ের স্রোত ধুয়েমুছে সাফ করে দিয়েছে অতীতের অনেক কিছুই। লেখা তো দূরের কথা, বই ওল্টাতেও এখন আর আগ্রহ জাগে না। 

এখানকার আস্তানাটা অন্যরকম। খেলার শুরুতে প্রত্যেককে ঘরভাড়া জমা দিতে হয়। তেইশ বছর আগে যখন শুরু হয়েছিল তখন ছিল জনপ্রতি পাঁচ টাকা। সেই জমা বেড়ে এখন দাঁড়িয়েছে পঞ্চাশে। জুয়াড়িদের একজনের বাড়ির একরুমের ভাড়া বাবদ গুনতে হয় মাসে তিনহাজার টাকা। সে-হিসেবে দিনে মাথাপিছু পঁচিশ-ত্রিশ টাকা উঠলেই হয়; কিন্তু প্রতিদিনই যে খেলা হবে এমন তো কথা নেই। কোনওদিন দেখা গেল পার্টনারের অভাবে খেলা হল না। চারজন না-হলে গেম খেলা জমে না। নিদেনপক্ষে তিনজন। ঘরটা ছিমছাম, পরিপাটি — কোনও ঝুটঝামেলা নেই। বাড়ির মালিক শাকের, বংশালে স্পেয়ার পার্টসের ব্যবসা। যারা খেলতে আসে তাদের বেশির-ভাগই ব্যবসায়ী। 

কত ধরনের খেলা চলল দীর্ঘ এ-সময়টাতে; একেবারে প্রথমে ফ্লাশ, তারপর কাচ্চু, হাইড্রোজেন — সংক্ষেপে হাইড্রো, বছর দশেক হল চলছে গেম। তুমুল উত্তেজনাপূর্ণ খেলা। এ খেলার আরও একটা বড় সুবিধা হল পয়সাকড়ির লেনদেন অন্য খেলার মত অত ঘনঘন করতে হয় না। একটা গেম উঠতে বেশ সময় লাগে। গেম হতে পারে দুশ’ বা আড়াইশ’ পয়েন্টে — খেলোয়াড়দের ঐকমত্যের ভিত্তিতে পয়েন্টের এই বিষয়টি স্থির হয় — সেই সঙ্গে টাকার পরিমাণও; ওরা ইদানীং দুশ’ পয়েন্টে খেলে, গেমপ্রতি মাথাপিছু একশ’টাকা। গেম উঠলে সবচেয়ে কম পয়েন্ট যার সে পায় অন্য সবার টাকা। খেলার কত কিসিম, কত নিয়ম! কাচ্চু খেলবে, তোমার অন্তত একটা জোকার বিহীন চার কার্ডের রান লাগবে; হাইড্রোতে জোকার দিয়ে হলেও লাগবে অন্তত দুটো তিন কার্ডের রান। গেম-এ জোকার ছাড়া একটা তিন কার্ডের রান মাস্ট; জোকার তোমার যতই থাকুক, রান না থাকলে গুনে গুনে পয়েন্ট দাও! 

গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি, অন্ধকারে দেখা যায় না তবে আঁচ করা যায়। স্ট্রিট-লাইটের কাছটাতে কুয়াশার মত দেখায় বৃষ্টিকে। হোক বৃষ্টি, তাড়াতাড়ি ঘরে ফিরতে হবে। বউটার খুব জ্বর। সাতদিন হয়ে গেল; জ্বর নামে আবার ওঠে। ঘরে বারো বছরের ছেলে — লোকে ঠাট্টা করে বলে বুড়া কাইল্যা পোলা — আর বউ। একটা ঠিকা ঝি অবশ্য আছে, সকালে আসে, কাজটাজ সেরেসুরে দুপুরবেলা চলে যায়। দু'মেয়ের বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর এই হল বর্তমানে মোরশেদের পরিবারের হাল। বিকেলে বেরোবার সময় বউয়ের রোগক্লিষ্ট শুকনো মুখ দেখে বেরিয়েছে। বলেছে: ‘আসি, তাড়াতাড়ি ফিরবো, আজ আবার শালা শুক্কুরবার, ডাক্তার দেখানো সম্ভব না।’ ছেলে খোকনকে বলেছে: ‘তোমার আম্মুর জ্বর বাড়লে মাথায় পানি দিও, কেমন? ওষুধ খাওয়াইয়ো, বুঝলে?’ ছেলেটা মাথা নেড়েছে, ফ্যালফ্যাল করে বাপের দিকে চেয়ে থেকেছে। বুদ্ধি হবার পর থেকে বাপের এই একই রূপ দেখে আসছে ও। এটাই স্বাভাবিক ওর কাছে। বাবাকে খুব কম সময়ই ও কাছে পায়।

শামিমা, ওর স্ত্রী, খুব চিকন হাসি টেনেছে ফ্যাকাশে ঠোঁটে। ওর হাসিমুখ দেখে গেলে কার্ড নাকি ফেভার করে! স্বামী হাসিমুখে বাড়ি ফিরলে বোঝে কাজ হয়েছে হাসিতে; গোমড়ামুখে ফিরে অযথাই রাগারাগি করলে ধরে নেয়, হাসিটাতে কোথাও হয়তো গলদ ছিল! সেই যখন বিয়ে করে গ্রাম থেকে ঢাকা শহরে এনে তুলল, তখন থেকে চলছে এই একই নিয়ম। প্রথমদিকে বাইরে থেকে ফিরে কখনও আদরে আদরে পাগল করে তুলত, কখনও-বা ম্লানমুখে ঘরে ঢুকে গপাগপ খেয়ে বিছানায় পাশ ফিরে শুত। কিছু বলত না শামিমা, নিজেকেই দুষত; হাসিতে নিশ্চয়ই ভেজাল ছিল! 

বিয়ের পর দেখতে দেখতেই কেটে গেল তিরিশ বছর। হা কপাল! জীবনটা কত তাড়াতাড়িই না শেষ হয়ে যায়! কেমন এক ফাঁপা অনুভূতি ওর বুকের ভেতরটা বিষাদে ছেয়ে ফেলে। বিয়ের পর কতবার বলেছে বউকে:‘সামান্য কেরানি, দেশের বাইরে যাওয়ার মুরোদ কই, কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান — না গো সুন্দরবন না, বান্দরবান, খুব সুন্দর সব জায়গা, এই কিছুদিন পর ছুটি নিয়ে ঘুরে আসব।’ সেই কিছুদিন আর আসেনি — সাপ্তাহিক ছুটির দিনে সকাল থেকে মাঝরাত পর্যন্ত চলেছে জুয়া।

রাস্তার একধারে ডাস্টবিনের কাছটাতে দুটো কুকুর কামড়াকামড়ি করছে, ঝাঁপিয়ে পড়ছে একে অন্যের ওপর তীক্ষ্ণ রব তুলে, দাঁত খিঁচিয়ে। ওদের জাপ্টাজাপ্টিতে রাস্তার স্থানে স্থানে জমে-থাকা ছিলছিলে পানি ছিটকে পড়ছে আশপাশে। থমকে দাঁড়িয়ে খিস্তি করে ওঠে মোরশেদ: ‘এই শালা কুত্তার বাচ্চা...ভাগ!’ পরমুহূর্তেই হেসে ফেলে, গালিটা ভালোই দিয়েছে — কুত্তার বাচ্চা! কুকুরকে এ ছাড়া আর কী গালি দেয়া যায়? শুয়োরের বাচ্চা বললে কি ওদের ইজ্জতে লাগত? কী জানি। আরে দ্যাখ, কী আশ্চর্য! ধ্বস্তাধ্বস্তি ফেলে ওদের মধ্যে থেকে একজন দুপায়ে লাফাতে লাফাতে ওর কাছে এসে বিনম্র সুরে বলে উঠল: ‘কুঁইকুঁই, সরি আঙ্কেল, কামড়া-কামড়ি করে আপনাকে বিরক্ত করার জন্য খুবই দুঃখিত; কুঁইকুঁইকুঁই, তবে বাচ্চা বলাতে আমরা দারুণ খুশি!’ কুকুরের আঙ্কেল! বিকৃত মুখে বিড়বিড় করে মোরশেদ। বিশ্বায়নের কী সুনামি — চাচা-জ্যেঠা, মামা-ফুপা-খালু সব ভাসিয়ে নিয়ে এক শব্দে শেষ — উহুঁ, লিঙ্গভেদে দুটো শব্দ, আঙ্কেল আন্টি! মন্দ না! 

বউটাকে কাল ডাক্তার না দেখালেই নয়। টাইফয়েড হলে তো বড় ধাক্কা! ইদানীং আবার ডেঙ্গু নিয়ে বেশ উদ্বেগ-আতঙ্ক লক্ষ করা যাচ্ছে মানুষের মধ্যে। মাগির..., অ্যাই শালা বাঞ্চত মুখ সামলা, নিরীহ গোবেচারা মেয়েমানুষটারে গালি দিস কোন আক্কেলে, হেহ্! দাঁত কিড়মিড় করে নিজেকেই ধমকায় মোরশেদ। তবে হ্যাঁ, বৌটার কোনও বোধশোধ নেই, অসুখ হলে যে একটু কোঁকাবে, উহু-আহা করবে, আদর কাড়ার চেষ্টা চালাবে, সে ধান্দা ওর ধাতে থাকলে তো। অথচ ওর একটু মাথা ব্যথা হলে, সারা মুখে উদ্বেগ নিয়ে কত যে কী করবে তার ইয়ত্তা নেই। একবার, তা তো প্রায় বছর বিশেক হলই, বেকায়দায় পড়ে ডান পাটা মচকে গেল; হাঁটু ফুলে ঢোল; সে কী প্রচণ্ড ব্যথা! ঘণ্টার-পর-ঘণ্টা পায়ে তেল মালিশ করেছে বউ। ওই দিন সাতেক স্বামীকে একান্তভাবে কাছে পেয়েছিল শামিমা। আহা তেল মালিশ করার কী বাহার! পায়ের গোড়ালি থেকে হাঁটু হয়ে কোমর অব্দি। কোনও অর্থ আছে এর? হাঁটুর জ্বালা অন্য জায়গায় পৌঁছে দাও! মুচকি হেসে অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নিতে দেরি করেনি শামিমা। দরজার খিল আটকাতে যা সময়! বউটা দেখতে শুনতে একসময় তো চোখে লাগার মতই ছিল। গাঁও-গেরামের গেরস্থ ঘরের মেয়ে, তাতে কী, হাজারে একটা নজরে পড়ে ওর মত; লেখাপড়াও করেছে — ইশকুল পাশ। আরও পড়ার ইচ্ছা ছিল কিন্তু ভালো পাত্র পাওয়াতে বিয়ে দিয়ে দিয়েছে বাপ-মা। উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ হলে কী হবে, গায়ের ত্বক ছিলো ঠিক যেন কচি লাউপাতার মতো। কোমল ত্বকে হাত ছোঁয়ালে গা কাঁটা দিত — কাঁপত তিরতির; টের পেত মোরশেদ। হাসলে গালে টোল পড়ত — এখনও পড়ে। তবে টোলের চারপাশের চামড়ায় ভাঁজ এখন চোখ এড়ায় না। অবহেলা অযত্নে পেলবতা কোথায় উধাও!

‘বুঝলে, আমি শালা একটা জানোয়ার, তোমার কোনও সাধআহ্লাদ পূরণ করতে পারলাম না — জীবনটা শেষ হয়ে গেল হাফসার মা, শেষ...! তাসের নেশা বড় সব্বোনেশে গো!’ মাঝে মাঝে এখন আপসোস করে মোরশেদ।

শামিমার ভ্রূক্ষেপ নেই, বলে: ‘সাধআহ্লাদ আবার কী, আমার কোনও দুঃখ নাই। বেশ তো আছি...।’

জুয়া — জুয়া জীবনটারে খেয়ে ফোঁপড়া করে দিল। মুখে বলে, বোঝে যে না তাও নয়। মন শক্ত করে, নাহ্ আর নয়; তোর মুখে মুতিরে আমি খানকির পুত জুয়া! কিন্তু ক’দিন যেতে না-যেতেই সন্ধ্যা গড়ালে শরীর ম্যাজ ম্যাজ করতে থাকে — মন উদাস, কিছু ভালো লাগে না। শামিমাও অস্থির হয়ে ওঠে ওর অবস্থা দেখে, বলে: ‘যাও একটু ঘুরে আস। মন খারাপ থাকলে শরীর খারাপ হবে যে...।’শামিমার কথা কি ফেলা যায়? নাকি ফেলা উচিত? হাফ ছেড়ে বলে মোরশেদ: ‘তুমি যখন বলছ, যাই, ঘুরেই আসি। মুখে হাসি ফুটিয়েছে শামিমা। গাল জুড়ে ছোপ ছোপ মেছতা, চোখজোড়ার নিচে কালি। তারপরও হাসিতে কেমন এক মাধুর্য। 

আজ বেরোবার সময় ওর হাসিটা বুকের পাঁজরে গিয়ে খোঁচা দিয়েছে। এ অবস্থায় ওকে রেখে খেলতে আসাটা মোটেই উচিত হয়নি। জ্বরে মুখ বিস্বাদ; কিছুই খেতে পারছে না চার দিন হল। দুধ-স্যুপ যা-ই দেওয়া হচ্ছে, উগড়ে দিচ্ছে। বাসার কাছাকাছি যে ফার্মেসিটা, ওখান থেকে লোক এসে স্যালাইন লাগিয়ে দিয়ে গেছে। এই চার দিন স্যালাইনের ওপরই আছে । তবে গতকালের চেয়ে আজ মনে হল অবস্থা একটু ভালো। নাহ্, বউটাকে সময় দিতে হবে। দাম্পত্য জীবন থেকে খসে গেছে তিরিশটি বছর, তা ঠিক; কিন্তু সামনে যে সময়টুকু আছে ওটুকু ওকে সুখ দিতে খরচ করলেই বা মন্দ কী। আর তো ক’টা মাস, তারপর রিটায়ারমেন্ট; প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা পেলে একটা চমক দিতে হবে ওকে। কক্সবাজার নয়, কলকাতা, চাইকি দার্জিলিং ঘুরে আসা যাবে। পাসপোর্ট-ভিসার একটা ঝামেলা আছে বটে, সে দেখা যাবে। বুড়ো বয়সে হানিমুন! মুখে এক ঝলক অদ্ভুত হাসির রেখা দেখা দিয়েই মিলিয়ে যায় ওর।

আর সামান্য পথ — সামনের ইলেকট্রিক খুঁটিটা পেরিয়ে বামদিকের গলিতে ঢুকে পাঁচ মিনিট হাঁটলেই বাসা। ধুত্তোর, লোডশেডিঙের জ্বালায় আর বাঁচা গেল না! বাসার সম্মুখে পৌঁছোবামাত্র দপ করে নিভে গেল সবগুলো বাতি! 

দরজায় কড়া নাড়ে মোরশেদ — বারবার, বেশ কিছুক্ষণ পর দরজা খুলে দেয় খোকন। সদ্যভাঙা ঘুম থেকে উঠে আসায় চোখ কচলাতে থাকে। স্যাঁতসেঁতে ঘরের ভেতরটায় ঘুটঘুটে অন্ধকার। জিজ্ঞেস করে ছেলেকে: ‘আম্মুর জ্বর দেখেছিলে, আব্বু?’ ছেলে মাথা নেড়ে বোঝায়, দেখেছিল।

‘জ্বর কেমন?’

‘নাই।’ হাই তুলে বলে খোকন।

স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে মোরশেদ। আগেই অনুমান করেছিল, সাধারণ ভাইরাল ফিভার। কোনও চিকিৎসা নেই; ক’দিন কষ্ট দিয়ে এমনিতেই সেরে যাবে। টেবিলের ওপর রাখা মোমবাতিটি জ্বালে; বৃষ্টিতে ভেজা জবজবে কাপড়চোপড় ছাড়ে মোরশেদ। ম্লান আলোতে নজরে আসে মশারির স্ট্যান্ডে ঝোলানো স্যালাইনের ব্যাগটা। এগিয়ে যায় শুয়ে-থাকা শামিমার কাছে। আলতোভাবে হাত রাখে ওর কপালে, আর হাত রাখতেই চমকে ওঠে — একটা ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে যায় ওর শিরদাঁড়া বেয়ে। বরফের মতন হিমশীতল শামিমার কপাল। চিৎ হয়ে শুয়ে। মোমের আলো এতদূর পৌঁছে না। টর্চের আলো ফেলে হতবিহ্বল মোরশেদ দেখে, নিথর ফ্যাকাশে শামিমার মুখ। ঠোঁটে স্মিত হাসি। হঠাৎ ঝাঁকুনি দিয়ে কাঁপতে থাকে মোরশেদের সর্বাঙ্গ; পা দুটো অবশ হয়ে আসে। শামিমার পাশে থপ করে বসে পড়ে ও।




লেখক পরিচিতি
শামসুজ্জামান হীরা


মুক্তিযোদ্ধা।
গল্পকার। প্রবন্ধকার।
প্রকাশিত দুটি গল্পগ্রন্থ-- ‘দিঘির জলে পুরনো চাঁদের শব’ ও ‘কানাগলিতে কানামাছি’।
সম্পাদিত বই অরুণ সোম কর্তৃক অনূদিত নিকোলাই গোগলের ‘ওভারকোট’।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন