বৃহস্পতিবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৬

সাদিয়া মাহজাবীন ইমাম'এর গল্প : জলের দাগ

একদিন মাঝরাতে আজইগাঁতি গ্রামের মানুষ দেখলো, ভৈরবের দিকে পাগলের মতো অন্ধকারে কেউ একজন দৌড়ে যাচ্ছে। খালি পায়ের ধূলো উড়িয়ে দিচ্ছে বাতাসে। হালকা কুয়াশা শুরু হয়েছে, এখানকার মানুষ বলে হিম। হিমের ভেতর মিশে মিশে যাচ্ছে ধূলো। মানুষটার হাতে বাদামী রঙের কাপড়ের মতো কিছু একটা। সেটাও তার সাথে সাথে দৌড়াচ্ছে যেন নৌকার পালের পেটে ভাটির বাতাস লেগেছে। সেদিন আশ্বিনের রাতে আজইগাঁতির অনেকেই জেগে।
ভোর হলেই একদল ঢোল-ডাগর নিয়ে মাঠে বেড়িয়ে যাবে। কাঁচা হলুদের সাথে শুন্ধি বেঁটে মাখবে আফলা ধান গাছের গায়ে। অনুর্বর জমির জরায়ু থেকে শষ্য প্রাপ্তির আকাংখা। সন্ধ্যা থেকে গাস্বীর গান বাঁধছে কৃষকরা। নারীরা আমগুরুজের পাতার সাথে হলুদ আর পান বেটে শরীরে মেখে নদীতে গোসল সেরেছে। ওরই রেশ আজইগাঁতির আশ্বিনের রাত জমিয়ে তুলেছে। দশ-বারো বছরের ছেলেরা লম্বা পাটকাঠির মুখে আগুন দিয়ে বিড়ি খাওয়ার মহড়া চালাচ্ছে। কাঠির মাথার এক পাশ দিয়ে লম্বা দমে আগুনটা টান দিলে পক পক করে সাদা ধোঁয়া বের হয়। গ্রামের এক কোনায় বুড়ির ঘরের সামনে মাটি আলু পুড়িয়ে খেয়েছে এই দল। শীত শুরু হলে তখন আবার ছোলার ক্ষেতে শুরু হবে আনাগোনা। সবে দানার দেখা দিয়েছে কি দেয়নি ওই শেকড়সহ মুঠি মুঠি তুলে তাতে আগুন দিবে। খানিকটা পুড়ে এলে মাটিতে বাড়ি দিয়ে দিয়ে আগুন নেভানো হবে। এই দল সবকিছুতে আছে, তারা আজ রাত জাগবে। সেই ছেলেদের কয়েকজন পাখি মারার গুলাইল বানাবে বলে নদীর পাশের পেয়ারা বাগানে ঢুকেছিলো চুরি করে। পেয়ারার ডালে গুলাইল ভালো হয়। ওটা মহাজনের ক্ষেত। নদীর কাছাকাছি ছিল বলে ছেলের দলই শুধু চিনলো মানুষটাকে দৌড়ে যাওয়ার সময়। তাদের পাশ দিয়ে ভো কাট্টা ঘুড়ির মতো চলে যেতেই দুএকজন চিৎকার করে উঠলো, ও কাওছার ভাই শুনো শুনো, কনে যাতিছো এত রাত্তিরে? কী হইয়েছে? মানুষটার কোনদিকে খেয়াল নেই সে দৌড়ে যাচ্ছে বড় গাঙের ঘাটের দিকে। যেখানে প্রতিদিন তার নৌকা বাঁধা থাকতো।

কাওছার বাড়ি ফিরেছিলো সন্ধ্যায়। মাঝরাতে আকস্মিক শুরু হয়েছিল ঘটনা। প্রথমে চৌকিতেই শুয়ে ছিল শিউলি তারপর তাকে মেঝের পাটিতে শুইয়ে দিলো। পেটিকোটের ফিতের গিটটা ঢিলে করে খানিকটা নামিয়ে দিলো। তলপেটে হাত রেখে কানের কাছে মুখ নামিয়ে আনলো কাওছার... কিছু টের পাতিছো বউ? শিউলি হাত খামচে ধরেছে, কাওছারের দুই বাহুর চামড়া নখের ধারে এখানে সেখানে চিড়ে গেছে। কোনমতে শিউলি উচ্চারণ করলো, মইরে যাতিছি। আমার শইল্লের ভিতর মনি হতিছে গাঙ মুচরোচ্ছে। গত প্রায় ঘণ্টাখানেক ধরে থেকে থেকে এমন চলছে। মাঝে মাঝে শান্ত হয়ে এলে শিউলির মুখের দিকে আশা নিয়ে তাকায় কাওছার। পর মুহূর্তেই দ্বিগুণ বেগে কাতরে উঠে, পাটিতে শুয়ে থাকা নারী। এখন কিছুটা শান্ত হয়ে আসছে শিউলি। আস্তে আস্তে ছটফটানি কমে আসছে, ভরসা বাড়ছে কাওছারের। তবে রাগও হচ্ছে খুব। সে বাড়ি ফিরে আসার সময় দেখেছে ছেলেপেলেরা দল বেঁধে হালট ধরে যাচ্ছে। তাকে দেখেই একদল গাস্বীর ছড়া কাটলো। ‘নাউ কুচ কুচ কদুর বিচি/ রানচে কিডা, বড়দি/ খাবে কিডা, বড় দা।’ এসব মুখের বুলি। এমন ছড় কাটলে তাকে আবার ছড়া দিয়েই জবাব দিতে হয়। কাওছারের ভারি আমোদ লাগলো। সে শিউলিকে ডেকে বাইরে এনে এই উৎসব দেখাবে ভাবতে ভাবতে ওদের উত্তর দিলো ‘তোর বড়দা কনে গেছে, চরণে/ ফুল তুলতি, বরণে/ ধামাও নেই, কুলোও নেই/ ফুল তুলতি মনেও নেই।’ মানে হলো এখন আর লাউ কেনার বাহানা করে যে টাকা চাওয়া হয়েছে সেটা দেওয়া হবেনা। তবুও ছেলের দল হেসে কুটিকুটি জবাব পেয়ে। কিছু পেলে হয়তো তারা দোকানে যেয়ে দুই পাঁচ টাকার মিশ্রির দানা কিনতো। কাওছার বললো, নে তোগের জবাব দিইয়েছি এইবার এট্টু দাঁড়া দেইন তোগের ভাবিরে ডাইকে আনতিছি। শিউলি ঘর থেকে খুব একটা বের হয়না ইদানিং। উৎসব দেখলে আমোদ পাবে ভেবে দ্রুত বাড়ির ভেতর এলো। অথচ দরজায় খিল তোলা। সন্ধ্যা হয়ে এসেছে এমন সময় একা কোথায় যাবে! আবার উঠোনে এসে দাঁড়িয়েছে কাওছার। ছেলের দল টাকা না পেয়ে চলে গেছে। ঠিক তখনই ভিজে কাপড়ে ফিরলো শিউলি। ততক্ষণে মাথায় রাগ উঠছে চিড়বিড়িয়ে। রাগ সামলাতে সামলাতে জিজ্ঞেস করলো এই ভর সন্ধ্যায় তুই কনে গেছিলি?

- ঘাটে নাইতি। সবাই সাথে ছিল অত ভয় পাতিছো কেন?

- তুই ভর সন্ধ্যায় গাঙে ডুব দিলি!

- ওমা আইজকের দিনে বউ ঝি’রা সন্ধ্যায়ইতো যায়, নাকি? গাঙে এট্টা নতুন ছড়া শুনিছি, কব?

- কী শুনিছিস?

- এটটা তারা, দুডো তারা/ ঐ তারাডার বউ মরা/ তারারা সাতে ভাই/ তারা গুইনে বাড়ি যাই। বলেই খিলখিল করে হেসে উঠলো নারী।

- কাওছারের রাগ হচ্ছে। পাঁচবছরের সংসারে ছেলেপুলে আসেনি বলে দু’একজন তাকে নতুন বউ ঘরে আনার কথা বলেছে বটে কিন্তু সেতো সেসব কানে তুলেনি। তাই বলে এমন অলক্ষুণে ছড়া কে শিখালো? সে মেজাজ দেখিয়ে বললো ওসব আজেবাজে ছড়া ঘাটের মাগিরাই কয়। তুই মরতে গেছিলি ঘাটে। আরেকবার শুনলি তোর ঠ্যাঙ বাইরে ভাঙবো কতিছি।

শিউলি হেসে কুটি কুটি স্বামীর অকারণ মেজাজে। সে গামছা দিয়ে ভেজা চুলের পানি সামলাতে সামলাতে কাছে এসে বলে,

- কী চাইয়েছি জানো গাঙের কাছে? কইয়েছি গোলা না ভরুক তুমি অন্তত কিছু ধান এবার ঘরে তুলতি দিও আমাগের। গত বছর পুরো কিনা চাউল রান্ধিছি। এইবার ধান না হলি আমাগের খোকার ওই চাউলের ভাতই মুখে দিতি হবি। কাওছারের অহংকারটা যেন এবার একটু শানিয়ে উঠলো।

- কেন কিনা চাল তোর খারাপ লাগিছে খাতি? খেতেরতে ওডা চিকনই ছেলো। ভাততো খাইয়েছিস আগের চে বেশি।

- তা হলিও আমার পরান জুরোয়নি। আগে তুমি অল্প হলিও খেতের চাইল ঘরে তুলিছো কিন্তু গতবার কী যে অলো।

গতবার প্রথম কাওছার খেতি করেনি। নতুন কাজে সময়ই পায়নি। শ্রাবণ শেষ হওয়ার প্রায় শেষ দিকে যেয়ে কয়েক বিঘেতে চারা বসিয়েছিল কিন্তু তা আর অকালের ঢলে ঘরে উঠানো যায়নি। তবে তাতে যে খুব না খুশ তা নয়। কেনা চাল এই গ্রামের সবাই খায় নাকি! আর খেতির কাজ তাঁর শখেরই ছিলো। নতুন কাজটা ধরেছে বলেই না কেনার ক্ষমতা হয়েছে। নতুন কাজে তার আয় রোজগার বেড়েছে, খাটুনিও কম। আগে সে নৌকা নিয়ে ভৈরবে যেতো। মন মতো আরো দুএক জেলের নৌকা পেলে তাদের সাথে পশুর পর্যন্ত। সেই বাপ দাদা তারও আগের বংশের মানুষ সবাই মাছ ধরেই খেয়েছে। কত দূর দূর চলে গেছে মাছের খোঁজে। চাষের বাগদার চেয়ে বেশি দাম উঠেছে তার নদীর ছোট চিংড়ির। নদীর ঢেউ আর বাতাসের বেগ বুঝে জাল ফেলে টেনেছে। সেই ঝাঁকিজাল নৌকায় তুলে হাত দিয়ে নাইলনের সুতোর ভেতর থেকে টেনে টেনে বের করেছে রয়না, মৃগেল। একটা মাইয়াজালের শখ ছিলো তার কিন্তু দশ বছর ধরে মাছ মেরেও সে জাল কেনার পয়সা গোছাতে পারেনি। উপরন্তু ঘাটের ডাক আসার পর থেকে মাছও চলে গেলো মহাজনের জিম্মায়। এখন আর তারা মাছের নৌকা নিয়ে সরাসরি গঞ্জের বরফ কলটার সামনে বসতে পারেনা। ঘাট থেকে মহাজনের লোক এসে দর করে নিয়ে যায়। সারাদিনমান কষ্ট করে মাছ নৌকায় তুললেও দামের সময় পানির দর। না নিলে মাছ পঁচে খালুইয়ের ভেতর। বছর দুই আগে নৌকার পাটা, খোল একেবারে ভেঙ্গে গেলো ঝরে। সারাইয়ের চেয়ে নতুন কেনাই ভালো। কিন্তু সে পুঁজি কোথায়? খাল থেকে আর কতটুকুই এখন পাওয়া যায় ওই ছোটো নৌকা আর একটা ঝাঁকিজাল দিয়ে। ওইতে নিজের খাওয়ার মাছ জোটে কিন্তু বেচা-বিক্রি করে চাল-নুন জোটানো মুশকিল। এবার নদী ছেড়ে বারোমাস ফসলের খেতে মন দিবে ভাবছে কাওছার। কিন্তু জমি আর কতটুকু! এর কয়েক মাস পরই হটাত ঘাটের ডাক দিলো নতুন করে। কাওছারেরও কপাল খুললো। সে জেলে থেকে হয়ে গেলো ইজারাদারের সহযোগী। এখন টোল ঠিকমতো পড়ছে কিনা সারাক্ষণ নজর রাখতে হয়। বছরে তিন কোটি টাকার ডাক আসে ভৈরব ঘাটের। সে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘন্টায় ঘন্টায় যেয়ে টাকা নিয়ে আসে টোল আদায়কারিদের কাছ থেকে। ময়লা টাকা, পকেটে রাখা, লুঙ্গির গাটে গুজে রাখা, মহিলার পার্সে ভাজ করা নোট, চকচকে কাগজে চামড়া আর কালির গন্ধ। অথচ তাদের ছোটবেলাতেও দেখেছে ঘাটের দুইপাশে শুধু বড় বড় পাকুড় গাছ। সেই গাছে পাখি এসে বসে। গাছের তলায় নারীরা গোবর পুড়িয়ে জ্বালানী করবে তাই রোদে দিয়ে গেছে। কেউ পাটি পেতে বড়ই শুকোতে দিয়েছে আচার করবে বলে। নারীর লাল রঙা ভেজা শাড়ি ঘাসের ভেতর মুখ গুজে আছে। এখন ঘাটের দুই পাশে বড় বাজার হয়েছে। সেই বাজারে হলুদ লাল বাতি, কাচের বাক্সর ভেতর সাদা চিনি দিয়ে বানানো মিষ্টি। ঠান্ডা কোলা, গানের সিডি আর ছিট কাপড়ের দোকানে মৌমাছির মতো মানুষ গিজ গিজ করে সবসময়। এখন নৌকার ভাড়া আলাদা আবার ঘাটে প্রবেশের সময় দুই টাকা করে। কাওছারের মালিকের খেলাটা এইখানেই। কেউ বাক্স-পেটরা নিয়ে উঠলে তাকে ২০ থেকে পঞ্চাশ টাকা পর্যন্ত বখশিশ দিতে হয়। ন্যূনতম তা ৫ টাকায় এসে ঠেকে। তাও কেউ দিতে না চাইলে দুএকজনের বাক্স বা বাজারের থলে রেখে দেওয়ার কাজটা তাকে যেয়ে করতে হয়। এতে পরেরজন সাবধান হয়। এই বাড়তি আয়টা ভাগ-বাটোয়ারা হয় নিজেদের মধ্যে। তবুও মাঝরাতে ঘুমের ভেতর সে মাঝে মাঝে নদীর শোঁ শোঁ শব্দ শোনে। নৌকার বাদামের পতপত আওয়াজ হয় মাথার ভেতর। বৈঠার শব্দ শুনে বলতে পারে ঠিক কতটা পানি নদীর ওইখানে। তবে এই আবেগ পাত্তা দেওয়ার সময় নেই কাওছারের। ঘরে নতুন মুখ আসবে। সে বড় হবে, স্কুলে যাবে ঘাট পার হয়ে। তার জন্য কিছু জমানো চাই। সে নিজে বেশ খুশি আয় রোজগারে শুধু বউ নিয়ে মুশকিল। মহিলা মানুষ বাস্তব বুঝতে চায়না। স্বামীর আয়ে কোথায় খুশি হবে তা না প্রতিদিন কানের কাছে যা তা বলেই যাচ্ছে আর ভয় দেখাচ্ছে।

-এতদিন ধইরে যে গাঙ আপনেরে ভাত জুটোইছে তারে হটাত কইরে ছাইরে দিতিছেন? কী এমন অভাব পড়িছে আমাগের!

- অভাবে পড়িনি কতিছিস? ওই মাছ ধইরে দিন আর চলে না বউ।

- তয় খেতি করেন কিডা নিষেধ করতিছে তাই বইলে নদী পার হতি আলাদা কইরে টাকা দিতি হতিছে এ নিয়ম আমরা কোনকালে শুনিনি।

- ঘাটের ডাক পইরেছে, তুই খালি মাঝিরে দুই টাকা দিইয়ে পার হবি অতো সুজা? তোর স্বামীর ক্ষমতা বাইরেছে দেহিসনি?

- আমার ওসব ভালো লাগতিছেনা। ওমন টাউট-বাটপার লোকের সাতি কাজ করতি গেলি আপনি না বদলায় যান।

এসব আদিকালের কথা শুনে কাওছার হাসে। সে বউকে বাগে আনতে গা ঘেঁষে বসে, নতুন সিনেমা উঠিছে হলে। তোরে নিয়ে যাবানে। তবুও বউর মন উঠেনা। তবে বাচ্চাটা পেটে আসার পর থেকে বউর অভিযোগ কমেছে। সে সারাদিনরাত ওই এক ধ্যানেই থাকে। স্বামী বাড়ি ফিরলে জিজ্ঞেস করে কনতো কার মতো হবি দেখতি?

- আমি চাই মেয়ে হলি তোর মতো হোক।

- উহু না বাপের মতো হইলে সে মাইয়ে কপাল নে আসে কিন্তু আপনের হবি ছেলে।

- তোরে কিডা কইয়েছে ছেলে?

- মন কতিছে আর দ্যাহেন না সবসোময় পেটের ভিতর কেমুন করতিছে। মনে হতিছে এহুনি সে বাড়ায় আসতি চায়।

কাওছার সোহাগ নিয়ে বউর তলপেটে ফুলে উঠা জায়গায় হাত রাখতে রাখতে বলে, বউ মাইয়ে হলি নাম রাখপো আয়েশা। তোর নামডার ভিতর কেমুন এট্টা হিন্দুয়ানি ভাব। ওমুন নাম আমার পছন্দ হয়না।

বিয়ের প্রায় পাঁচ বছর পর তাদের আঁটকুড়া নাম ঘুচেছে সেই আনন্দে শিউলি আর কোন প্রতিবাদ করে না সন্তানের নামকরণ নিয়ে। সে খাবারের আয়োজন করে ঘরের ভেতর। রাত হলে এই শরীরে সে এখন বারান্দায় বসে না। কোথা থেকে কোন বাতাস লাগে বলা যায়না। ঘরের ভেতর পাটি পেতে কেনা চালের চিকন সরু ভাত তুলে দেয় স্বামীর পাতে। হারিকেনের বদলে চার্জার বাতি এসেছে ঘরে। খাওয়া শেষ করে পাটির ওপর পান নিয়ে বসে। এই অভ্যাস নতুন। একটু ভাত পেটে পরলেই কেমন গা গুলিয়ে উঠে। দুই টুকরা কাটা সুপুরি দিয়ে পান মুখে দিলে বমি বমি ভাবটা চলে যায়। তবে এই কষ্টের সাথে কী যেন এক আনন্দ আছে বুকের ভেতর। পৃথিবীটা খুব রঙিন রঙিন লাগে শিউলির কাছে। আশ্বিনের শেষ রাতে হালকা হিমের ভেতর তার গায়ে একটা চাদর টেনে দেয় স্বামী। কপট রাগ দেখাতে দেখাতে বলে, আমার মাইয়ের যদি ঠান্ডা লাগে তুই বুঝবি। এই ভরা সন্ধ্যায় তোর গাঙে নাওয়া আমি ছুটোয় দেবো।

-ইশ খুব মাইয়ের বাপ হইয়েছে। এহনো তারে দ্যাহে নাই দরদ কতো।

- বউ কাল সকালের ভাত থুইয়েছিস?

- ওসব আমারে শেখান লাগবিনা। তুলে রাখিছি পানি দিয়ে। আপনের ওসবি ইবার মনে হতিছে খুব বিশ্বাস আসিছে?

আজইগাঁতির মানুষ আশ্বিনের শেষ দিন যে ভাত রান্না করে তা কার্তিকের প্রথমদিন সকালে খাওয়ার জন্য তুলে রাখে। এই নিয়ম বহুকাল ধরে চলে আসছে। এতে ঘরের পয়মন্ত হয়। সকালে উঠে গা গোসল দিয়ে সেই ভাত খেতে খেতে বলে আশ্বিনে রান্ধে, কার্তিকে খায়/ যে বর মাগে সে বর পায়।

- কাওছার হাসে, কুটুম আসতিছে এহন সব বিশ্বাস হয় বউ। ছাওয়াল পুলাপান হলি মনডা কেমুন নরম কইরে তুলে বাপ-মায়ের।

সারাদিন ঘাটে টাকা তোলা মানুষটার মুখের দিকে তাকিয়ে মায়া হয় শিউলির। আহারে তারও নিশ্চই কষ্ট হয়। গাঙ যে স্বামীরে এখনো টানে শিউলি টের পায়। মুখে বড় বড় কথা বললে কি হবে স্বামীর রক্তের ভেতর নদীর ঢেউ, বৈঠার শব্দ, জাল থেকে মাছ তোলার স্মৃতি দাপিয়ে বেড়ায় বুঝতে পারে। দু’একদিন ঘুমের ভেতর কথা বলে উঠে কাওছার। বেঘোরের সেইসব শব্দে থাকে গাঙের কথা। হটাত হটাত বলে বউ দ্যাখ দ্যাখ কতো বড় নাও, কত বড় ছই। ইডা হলো গয়না নৌকার। শিউলি আরো ঘনিষ্ট হয়ে মিশে শোয় স্বামীর গায়ে। এখন পেটটা বড় হয়ে উঠেছে সে কাত হয়ে শুতে পারেনা। পেটের চামড়ায় দাগ পড়েছে বউর। ওই দাগগুলোর দিকে তাকালে হটাত হটাত শীতকালে নদীর পাড়ে বালির পরতের কথা মনে হয় কাওছারের। জোয়ারের সময় পানি এসে ফিরে যাওয়ার পর রোদে বালিয়াড়িতে দাগ ধরে। অনেকটা সে রকম দাগ এখন অতটুকু পেটের জমিনে। কাওছার রাতে বউকে ধরে ঘুমায়। আশ্বিনের মাঝ রাতে সেদিনও ওভাবেই শুয়েছিল। মাত্র ঘুমটা আসবে আসবে ঠিক তখনই শিউলি বলে উঠলো। আমার যেন কিরম লাগতিছে। কোমড়ের নীচে এমন ভিজা ভিজা ঠেকতিছে কেন। কাওছার লাফিয়ে উঠে বাতিটা সামনে নিয়ে আসে। ঠিকই তাই, শিউলির কোমড়ের নীচ থেকে কাপড় খানিকটা ভিজে উঠেছে। ভয়ে তার আত্মা শুকিয়ে আসে। তাড়াতাড়ি শুকনো গামছা খুঁজে আনে। ততক্ষণে শিউলির ব্যথা তীব্র হয়েছে। সে মুখ দিয়ে গোঙানির মতো করছে। কাউকে যে ডাকবে সেই অবস্থাও নেই, একা ফেলে যেতে হবে। কাওছার আরো কাছে এসে বউএর চুলে হাত দিয়ে নিজেই ভরসা পেতে চায়।

- কেমন লাগতিছে বউ খুব কষ্ট হতিছে? ডাকপো কাউরে?

- শিউলি তার বাহু আকড়ে ধরে। আমার ভয় করতিছে। প্রচন্ড ব্যথা করতিছে। আমি মইরে যাতিছি মনে হতিছে কেন।

কাওছার এবার খানিকটা জড়িয়ে ধরলো আর ঠিক তখনই একটা দমকা হাওয়ার মতো বেগ উঠে এলো শিউলির সারা শরীরে। শিউলির কোমড়ের নীচ থেকে খুব তরল কিছু বেরিয়ে মাখামাখি হয়ে যাচ্ছে খেজুর পাতার পাটিতে। সে কোনমতে আবারো উচ্চারণ করলো। আমার কেমন ঘোরের মতো লাগতিছে, সবকিছু অন্ধকার দেহা যাতিছে। এট্টু তুইলে ধরবেন শুকনো জায়গায়? এটুকু বলতে বলতেই তার কণ্ঠ দুর্বল হয়ে এলো। কাওছার একঝটকায় তুলে চৌকিতে শুইয়ে দিলো। মেঝেতে পড়ে থাকা পাটিটায় ছোপ ছোপ দাগ। চার্জারের আলোতে তার চোখ ভুল দেখছে। সে পাটিটা হাতে নিয়ে দৌড়ে এসেছে উঠোনে। সামনে টানা দড়িতে মেলে দিলো পাটিটা। পূর্ণিমা গেছে কাল তবুও আলো একইরকম উজ্জ্বল সে রাতে।

জোছনার আলো বিভ্রান্তি তৈরি করে। কাওছারের চোখের সামনে মেলে রাখা পাটিটা বাতাসে একটু একটু দুলছে। হালকা বাদামী পাটির দিকে তাকিয়ে হটাত মনে হলো চোখের সামনে ভৈরব। আজইগাঁতির জমি কেটে বেরিয়ে যাওয়া ভৈরবের জল এখন ঘোলা। আবার ফিরতি বর্ষায় টলটলা হবে। জোয়ারের শুরুতে যেমন ভৈরব দুলতে দুলতে আগায় সেভাবে বাতাসে দুলছে একটা অর্ধেক ভেজা পাটি । কাওছার অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে সেদিকে। এই আলোতে অস্পষ্ট সেই রঙ। উঠোনের একপাশের নারকেল গাছটার সাথে ঘরের খুটির দড়ি টাঙানো। কয়েকটা শুকনো কাপড় রাখা আর খুটির কাছে স্তুপ করে গুটিয়ে রাখা সেই পুরনো ঝাঁকিজালটা। ব্যবহার অযোগ্য হাতে ধরা ওই জিনিস বছর খানেক আগে রাখা হয়েছিলো। বাতাসে দুললে জালের নিচে লোহার চাকতির ভারগুলো থেকে টরটর শব্দ উঠছে। ঘরের ভেতর থেকে এখন আর কোন কাতর স্বর আসছেনা। কাওছার এবার পাটি টেনে মাটিতে ফেলে উপুড় হয়ে বসলো। এরই মধ্যে সরসর করে আসছে স্রোতের শব্দ। আজইগাঁতির মাটির ভেতর দিয়ে ভৈরবের খালে পানি যাওয়ার জানান দেওয়ার শব্দ এটা। কাওছার জানে খালের পাড়ে এখন দক্ষিণ দিকে নুয়ে যাওয়া হিজল গাছের গোড়ায় যে কচুরি পানা জমেছে ওইখান দিয়েই ঢুকে বেরিয়ে যাচ্ছে পানি। দিনের বেলাতেও জায়গাটা কেমন ছায়া ছায়া থাকে। মাঝে মাঝে গাছের ফুল পানিতে পরে বাতাসে দূর দিয়ে ভেসে ভেসে যায়। ভাটার সময় সে নবগঙ্গা খাল আর বাসুখালীতেও কম যায়নি। সেখানে তখন ভাটার টানে পানি সরে আর জোয়ারে খলখল শব্দ হয় নৌকার পাটাতনের পাশে। মাঝরাতে উঠোনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে যে শব্দ শুনছে তা শুধু ভৈরবের খালে ঢুকে যাওয়ার সময়ই হয়। আবার ঝুঁকল সে। এই পাটিতে তাঁর অনাগত সন্তান নিয়ে শুয়েছিলো শিউলি। নাহ রক্তের দাগ নেই অথচ পাটি পুরো ভেজা। অনেক অনেক পানি। এক নৌকা সমান পানি মানুষ কেমন করে ধরে অতটুকু একটা পেটে! তার মাথার ভেতর কী যেন কেমন করছে। জোছনার আলো আর পাটির ওই দাগ মিলে মনে হচ্ছে মাথার ভেতরই এক আস্ত ভৈরব বয়ে চলেছে। পাটি হাতে করে ভৈরবের দিকে দৌড়াচ্ছে একটা মানুষ। আকাশে তখন সন্ধ্যায় উঠা তারাটা একপাশে মিশে যেতে চাইছে। আজইগাঁতি গ্রাম থেকে ভৈরবের দিকে দৌড়াতে দৌড়াতে লোকটা বলে যাচ্ছে এটটা তারা, দুডো তারা. . . ঐ তারাডার বউ মরা... ভোরে ফসলের মাঠে গাস্বী করতে যারা রাত জাগছিলো কেউ উঠোনে বসে দেখলো, কেউ ঘর থেকে বেরিয়ে এলো ঘুম চোখ নিয়ে। একটা মানুষ যাচ্ছে নদীর দিকে।

মহাজনের বাগান থেকে গুলাইল চুরি করে আসা ছেলেরা বাড়ি ফিরে বলার সাহস পায়নি। কার্তিকের প্রথম সকালে আজইগাঁতির মানুষ গাস্বী করে এসে উঠোনে বসেছে। কথাটা তখন কেউ একজন তুললে তারা ছুটে এলো কাওছারের বাড়িতে। শিউলির শরীরের নীচে তখন রক্ত জমাট বেঁধেছে। দু একটা মাছি উড়ছে। ভিড়ের ভেতর কে যেন আফশোস করে বললো, ছ্যাড়াডারে আগেই কইয়েছি, গাঙ থুইয়ে হাটের ডাকে যাতিছো, ভালো হতিছেনা। যে গাঙ বাঁচায় সে অতো সহজে ছাড়েনা মানুষ।



লেখক পরিচিতি
সাদিয়া মাহজাবীন ইমাম
গল্পকার। সাংবাদিক। গবেষক।
বাংলাদেশ।

২টি মন্তব্য: