শনিবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৭

মাসুদা ভাট্টি'র গল্প : সুবল অথবা শফিকের নাম-পরিচয়

শফিক ওরফে সুবলের বড় ছেলের বয়স ত্রিশ পেরিয়েছে, মেয়েটির বিয়ে হয়েছিল কিন্তু টেকেনি। এখনও ওরা শফিক ওরফে সুবলকে ঠিক ওদের বাবা বলে মেনে নিতে পারে না। ওদের মা গত হয়েছে বেশ অনেক বছর হয়। সেও স্বর্গে গেছে কি বেহেশতে গেছে তা নিয়ে অনেক সময়ই শফিক ওরফে সুবলের মনে দ্বন্দ্বময় প্রশ্নের জন্ম হয়, সে অবশ্য এসব কথা প্রকাশ্যে আনে না।
তবে আনলেও এখন আর শোনার মতো কেউ নেই ওর। বয়স হয়েছে, মৃত্যু সন্নিকটে। নিজেও বেহেশতে যাবে নাকি স্বর্গে, নরক নাকি দোযখে, সে প্রশ্নও ভেতরে ভেতরে তৈরি হয় ওর, আবারও এসব কথা আলোচনার কেউ নেই ওর। একমাত্র বর্ষাকাল ছাড়া দিনভর মানুষের খেতে-খামারে কাজ করে, বিকেল বিকেল বাড়ি ফিরে চুলোয় চাল ধুয়ে চড়িয়ে দেয়, উঠোনের পাশেই সব্জির জন্য বানানো স্থায়ী মাচা, সেখানে যখন যা থাকে তাই কুটে, ধুয়ে ভাতের মধ্যে ছেড়ে দেয়। ভাতের সঙ্গে কি চমৎকার সেদ্ধ হয়ে মিশে থাকে। একটা কুপি ধরিয়ে সেটাই ওর সাবেকি পাথরের থালাটায় ঢেলে নিয়ে গরম গরম খেয়ে নেয়। এখনও বিলাসিতার মধ্যে যেটুকু অবশিষ্ট আছে ওর জীবনে তাহলো, এই ভাত আর সেদ্ধ সব্জির সঙ্গে একটু ঘি হলে শফিক ওরফে সুবল অমৃত মনে করে সেটা খেতে পারে কিন্তু সব সময় কি আর ঘি জোটানো যায়? তাছাড়া আজকাল ঘি-ই বা বানায় কে? এদিকে এক সময় ঘি বানাতো ঘোষ পাড়ায়, এখন সে পাড়াও নেই, ঘি’ও বানায় না কেউ। ওই আধা-শহরের দোকানে ঘি বিক্রি হয়, তা সে ঘি’র না আছে গন্ধবাস না আছে স্বোয়াদ। তাও সে কিনে আনে কখনও সখনও কালে ভদ্রে ওদের গ্রাম থেকে পাঁচ মাইল দূরের আধা শহরে গেলে। আজকাল সেও কমে এসেছে একেবারেই।

ঘি-এর কথা বলায় মনে পড়ে গেলো। ছোটোবেলায় ঠাকুমা নিজে হাতে ঘি বানাতেন। ওদের বাড়িতে তিন তিনটে গাই সব সময় দুধ দিতো। গরু ছিল মোট ছ’টা, তাই তিনটে গাই-ই বছরভর দুধ দিতো। বিরাট বাড়ি ছিল ওদের, বাবা-জ্যাঠা-কাকাদের নিয়ে একান্নবর্তী পরিবার। ছোটবড় মিলিয়ে প্রতি বেলায় ত্রিশ-পয়ত্রিশজন মানুষ খাওয়া-দাওয়া করে। বাড়ির বউ-ঝিরা কেবল রান্না করতে করতেই দিন পার করে দেয়, আর বছরের ফসলাদি তোলাতো আছেই। বিঘা ত্রিশেক জমির ফসল আসে। বছরের ধানটা, ডালটা, ধনেটা সবই হাতের। ঠাকুমা সব দেখাশোনা করেন, বয়স হয়ে গিয়েছিল, তাও সবদিক তার কড়া নজর। সুবলের সঙ্গে ওর ঠাকুমার আলাদা সম্পর্ক ছিল, শিশুকালেই সুবলের মা’টা মারা যায় কলেরা হয়ে। বাবা আবার বিয়ে করেন, তারপর থেকেই সুবল ঠাকুমার আঁচল ধরা হয়ে বড় হয়েছে। একেবারে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ঠাকুমা ওর হাতটা ছাড়েননি। ভাত মেখে খাওয়ানো থেকে শুরু করে স্নান করানো, পাশে শুয়ে ঘুম পড়ানো সবই করেছেন তিনি। এখনও চোখ বন্ধ করলে ঠাকুমার শরীরের গন্ধ টের পায় শফিক ওরফে সুবল। সাদা থানের ভেতর থেকে আজব এক ধরনের গন্ধ বেরুতো ঠাকুমার শরীর থেকে। তাতে মেশানো থাকতো ঘি, ধুপ, তুলসিসহ বছরের যে সময়ে যে ফসল উঠতো তার গন্ধ। রাতে গা ধুয়ে কাপড় বদলে ঘুমুতে এলেও সুবল বুঝতে পারতো ঠাকুমার শরীরের গন্ধ। ওর সবচে ভালো লাগতো যখন ঠাকুমা এক উঠোন কালোজিরে শুকিয়ে মাটির ভাসিতে তুলে রেখে ক্লান্ত হয়ে ঘুমুতে আসতেন, তখন তার শরীর থেকে কালোজিরের গন্ধ বেরুতো। এখনও শফিক কিংবা সুবল টের পায়, প্রায়ই সাদা থান পরা বৃদ্ধা ঠাকুমা এই বাড়ির উঠোন দিয়ে হাঁটাচলা করেন। বাড়ির তারে স্নান করে আসা থানটি মেলে দেন, রাতভর জ্যোৎস্নার আলোর সঙ্গে তারের ওপর মেলে দেওয়া থান ওড়াওড়ি করে, লুকোচুরি খেলে, আর তখন উঠোনময় ম ম করে ঠাকুমার গায়ের গন্ধ-- কখনও কালোজিরের, কখনও ধনে কিংবা অন্য কোনো ফসলের অথবা নলেন গুড়ের।

কিন্তু উঠোনটাতো ছোট হয়ে গেছে অনেক, সাবেকি সেই উঠোন এখন আর নেই। এখন সুবলেরই যেটুকু উঠোন, বাকিটাতো একেকজন ভাগ-যোগ করে নিয়ে গেছে। বাড়িটাই নাকি জ্যাঠামশাই বিক্রি করে দিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু সুবল এখনও বুঝতে পারে না, এতো বড় বাড়ি, জমিজমা সহ জ্যাঠামশাই বিক্রিটা করলেন কখন? যুদ্ধ লাগার মাস খানেকের মাথাতেইতো ওদের বাড়ির সবাই চলে গিয়েছিল ভারতে। এতো বড় পরিবার, সবাইকে একবারে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। একেক ভাই একেকবার এসে তাদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলেন ওপারে। কেবল সুবল আর ওর ঠাকুমা রয়ে গিয়েছিল। ওদেরকে কেউ নিয়ে যায়নি। ঠাকুমা যেতেই চাননি বাড়ি ছেড়ে, বলতেন, “কই যামু এই বাড়িঘর থুইয়া? মাইরা ফালাইলে এইহানেই মাইরা ফালাক। বিদ্যাশে গিয়া মইরা গেলি এই বাড়িঘর দেখফেনে কিডা? জন্মাইছি এই দ্যাশে মরণ কি আরেক দ্যাশে অবে? বাঁচলেও এহেনে বাঁচপো, মরলেও এহেনে মরবো”।

বাড়িঘরের প্রতি বড্ড মায়া ছিল বুড়ির। শফিক ওরফে সুবল হাসে মিটিমিটি। ওর মনে পড়ে যায় বুড়ি বললে ওর ঠাকুমা খুব চেতে যেতেন। পাড়ার পোলাপান তাকে খেপানোর জন্য “খটখইট্টা বুড়ি” বলে খেপাতো। বুড়ি সত্যি সত্যিই খট্ খট করে উঠতো, আর আরো একটা কারণে তাকে সকলে ও নামে ডাকতো। তাহলো সন্ধে হলেই বুড়ি হাত-পা ধুয়ে একটা খড়ম পায়ে দিতেন, আর তা পরে যখন হাঁটতেন তখন সত্যিই খট্্খট্্ শব্দ হতো। সেই খড়ম পায়েই তিনি পুকুর পাড় থেকে আসতেন, তুলসি মন্ডপে সন্ধ্যা দিতেন, তারপর জঁপের থলিটা বের করে উঠোনময় হাঁটতেন আর জঁপ করতেন। সে সময় সুবলও তার পেছন পেছন হাঁটতো। শোনার চেষ্টা করতো ওর ঠাকুমা কী বলেন। কিন্তু কোনোদিনই সুবল তার মুখ থেকে কিছু শুনতে পায়নি। এখনও সুবল কান পাতার চেষ্টা করে, যদি শোনা যায় ওর ঠাকুমার মুখের কথা? কিন্তু এখনতো সুবল আরো পারে না। কেবল ধবধবে পূর্ণিমার রাতে বিছানায় শুয়ে বাইরে তাকালে সুবল দেখতে পায় চওড়া উঠোন, ধপধপ করছে জ্যোছনায়, কাপড় শুকোনোর তার থেকে ঝুলছে একাধিক শাড়ি মা-কাকিমাদের, আর তার পাশেই সাদা থানটা ঝুলছে লম্বালম্বি। ওর মনে পড়ে যায়, সে সময় কাপড় নাড়া থেকেও বোঝা যেতো কোনটি  হিন্দু বাড়ি আর কোনটি মুসলমান বাড়ি। যে বাড়িতে কাপড় আড়াআড়ি ভাজ করে তার থেকে ঝুলিয়ে শুকোনো হতো সেটি হিন্দু বাড়ি আর মুসলমান বাড়িতে কাপড়টি চার ভাজ করে তারে মেলা হতো। সুবলের অবশ্য মুসলমান বাড়িতে শাড়ি মেলার ধরণটা বেশি ভালো লাগতো। তারপরও কাপড় মেলা দিয়ে হিন্দু আর মুসলমান বাড়ির এই ভাগটা ওকে ওই শিশু বয়সেও একটু ভাবাতো কিন্তু ওর জীবনে কোনো ভাবনাই বেশিক্ষণ স্থায়ী থাকেনি, ও ভাবতেই পারে না বেশিক্ষণ এক নাগাড়ে। মাথাটা ঝিমঝিম করে। এখনও রাতের খাওয়া শেষ করে ও ঘরের দাওয়ায় পিড়ি পেতে বসেছিল বাইরের দিকে তাকিয়ে। মাথার ভেতর অনেক কথা ভাসছে, কিন্তু তাহলে কী হবে, ও বেশিক্ষণ এই ভাবনাগুলোকে ঠিক মাথায় রাখতে পারবে না। ওকে এর মাঝে অন্য কিছু ভাবতে হবে নাহলে কিছু একটা করতে হবে যাতে একটু আগের ভাবনাগুলো মাথায় না থাকে। শফিক ওরফে সুবল ওর অজান্তেই দুই হাত দিয়ে মাথার চুল খামচে ধরে, তারপর উঠোনের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকে।

উঠোনে তখন ঝলমল করছে চাঁদ, ঠিক সেখানেই চাঁদের আলোটা গভীর হয়ে পড়ে আছে যেখানে এক সময় ওদের ধান মাড়াই করার জন্য একটা বিশাল খাম পোতা ছিল। সেই খামের সঙ্গে একের পর এক গরু জুড়ে দিয়ে তারপর ধান মাড়াই করা হতো। এখন সেখানে কিছুই নেই। একটু একটু বালি দেখা যাচ্ছে। নদীর কাছাকাছি বলে ওদের এলাকার মাটি একটু বালি বালি। চক্্চক্্ করছে বালি চাঁদের আলোয়। আর তখনই দেখতে পারে সুবল ওর ঠাকুমা ওখানে দাঁড়িয়ে আছেন। কোন্্ দিকে তাকিয়ে আছেন ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। ওকে হয়তো লক্ষ্যই করতে পারছেন না তিনি। তাই সুবল একবার গলা পরিষ্কার করে কেশে ওঠে। কিন্তু তাতেও ওর ঠাকুমা ওর দিকে তাকান না। চাঁদের আলোয় ঠাকুমাকে ওর ঠিক মানুষ বলে মনে হয় না। সাদা থান পরনে, খালি পা, এতো রাতেও কেন ঠাকুমা খালি পা, সুবলের ধন্দ্ব লাগে একটু। এমনিতেতো সন্ধে আগেই ঠাকুমা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে, কাপড় বদলে তারপর খমড় পরে উঠোনময় খট্্ খট্্ করে হাঁটতেন, কিন্তু এখন কেন খালি পায়ে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন ওভাবে? সুবল আর থাকতে না পেরে ঠাকুমা’কে জিজ্ঞেস করে, “ও ঠাহুমা ওইরম খাড়ায়া রইলি ক্যান? পাও ধুইসনাই আইজ? কুহানে গেছিলি তুই ঠাহুমা, কিরে কতা কস না ক্যা?”

বলতে বলতে সুবল ঘরের দাওয়া থেকে নেমে আসে উঠোনে, যেখানে ওর ঠাকুমা দাঁড়িয়েছিলেন ঠিক তার কাছাকাছি। ধক্ করে সুবলের নাকে ওর ঠাকুমার শরীরের সেই পরিচিত গন্ধটা এসে লাগে। সুবল এতোক্ষণে নিশ্চিত হয় যে, ওর ঠাকুমাই এসে দাঁড়িয়েছেন উঠোনে। ও আরো প্রগলভ হয়ে ওঠে, “ও ঠাহুমা কতা কবিন্যা? এতোদিন কুহানে আছিলি তুই? ঠাহুমারে? দ্যাখদিনি, এট্টু ঘিও নাই গরে, খাওয়া-দাওয়ায় যে কী কষ্ট তা আর কবার যো নাই। তুই এট্টু ঘি বানাদিনি। খাড়া আমি কাইলক্যা বাজারে গিয়া কয়েক আড়ি দুদ নিয়া আসফানে”।

ঠিক তখনই সুবলের ঠাকুমা মুখ ফেরান। কুঁচকানো চামড়ার ভেতর থেকে যেনো কথা বলছেন, “ক্যান গাইগুল্যান কুহানে গ্যালো? ছয় ছয়ডা গাই, পেত্যেকদিন দশ বারো আড়ি দুদ অয়। এ্যাতো দুদ কারা খায় যে দুদ কিনা লাগবি?”

ঃ আরে ভগবান তুই দেহি কিছুই জানিসনে, গাইতো আর নাই। কিডা কুহানে নিয়া বিককিরি কইর‌্যা দিছে তার খবর আছেনি। তার চিয়া আমি দুদ কিনে আনবানে, তাই দিয়া ঘি বানাইসক্যানে।

ঃ তোর গরের অবস্থাও দেখতিছি খুব খারাপ সুবল, গরটা এট্টু ঠিক করবারও পারিসন্যা?

ঃ পারবো না ক্যান, খুব পারি। কিন্তু ঘরে থাকপিনে কিডা? আমারতো যাবার সুমায় ওইয়া গ্যাছে। আমি মইর‌্যা গেলি পরে এই ঘরে থাকপিনে কিডা কদিনি ঠাহুমা?

ঃ ক্যান তোর ছাওয়াল-ম্যায়া কুহানে? ম্যায়াডারে নয় বিয়া দিছিলি, ছাওয়ালডা কুহানে গেছে? ছাওয়াল বিয়া হরাবিন্যা? ও সুবল, পুতির মুখ দেখফো না আমি?

ঃ নারে ঠাহুমা, তারা আর আমার সনে সুম্পক্ক রাহে না। তারা কয়, তুমার পরিচয় দিতি আমাগো লইজ্জা করে। ক্যান তুমি আমাগো দুনিয়ায় আনছো কও? ক্যান আনছো? আমরা আনবার কইছিলাম? পরিচয় দিবার পারো না ছাওয়াল-ম্যায়া পয়দা দিলা ক্যান?

ঃ ক্যান তোর পরিচয়ের কী ওইছেরে সুবল? তোর ঠাহুদ্দার পরিচয়? তোর বাবা-জ্যাঠার পরিচয় আছে না? তাগোর নাম কবার পারিসন্যা? নাকি তাগো নাম তুই ভুইল্যা গেছস?

ঃ কী কও তুমি ঠাহুমা, নাম ভুলি ক্যামনে? নাম কি ভুলন যায়? কিন্তু নাম মনে রাখলি কী হবিনে, আমি যে আর আমি নাই ঠাহুমা, আমি যে এ্যাহন শফিক ওইয়া গেছি।

ঃ ওয়া কী কস তুই? তোর মাথাডা এ্যাহেবারে গ্যাছেরে সুবইল্যা, এ্যাহেবারে গ্যাছে। তুই মোছলমান ওইছস? শ্যাষকালে আইস্যা তুই ধম্মডারেও খুয়াইছস? ও ঠাহুর আমার কী অবেরে, নরকেও যে ঠাঁই অবে নানে। তুইতো যাবি যাবিই, তোর চৌদ্দ পুরুষ নরকে যাবে। জাইন্যা শুইন্যা কেউ ধম্ম খোয়ায়?

সুবলের ঠাকুমা মাথা চাপড়ান আর ক্রমশঃ উঠোনের মাঝখান থেকে সরে যান কিনারের দিকে। তারপর এক সময় আর তাকে দেখা যায় না। সুবল আবারও ধন্দ্বে পড়ে যায়। চোখ কচলে উঠোনের দিকে তাকায়। এতোক্ষণ ও কি তবে এখানেই বসেছিল? নাকি নেমে উঠোন অবধি গিয়েছিল? যতোদূর মনে করতে পারে ও উঠোনে নেমেছিল, কিন্তু এখন শফিক ওরফে সুবল নিজেকে ওর ভাঙা ঘরটার দাওয়ায় আবিষ্কার করে। চমকে ওঠে নিজেকে দেখে। এতোক্ষণ তবে ও কার সঙ্গে কথা বলছিলো? ওর মন খারাপ হয় খুউব, ঠাকুমাকে ওর ভেতরের কথাগুলো আজই বলে ফেলা যেতো, কিন্তু সেটা হলো না। ঠাকুমা কোন্দিকে যেনো চলে গেলেন। শফিক ওরফে সুবল সেদিকেই তাকিয়ে থাকে, থাকতে থাকতে ভাবে ওর সুবল থেকে শফিক হওয়ার কথা।

যুদ্ধ চলছে চারদিকে, ঘোর যুদ্ধ। ঠাকুমা রাত হলেই বলেন, এই যুদ্ধ নাকি মহাভারদের কৌরব-পান্ডবের যুদ্ধের মতো, ন্যায়ের যুদ্ধ। এতে নাকি পান্ডবদেরই জয় হবে, কৌরবরা হারবে। সুবলের বয়স তখনও অতো হয়নি, মহাভারত সম্পর্কেও ওর জ্ঞান সামান্য। যেটুকু গল্প এই ঠাকুমার কাছেই শুনেছে, ব্যাস সেটুকুই। কিন্তু সত্যবতীর মতো ওর ঠাকুমাকে যে রাতে খুন করা হলো, ওদের বাড়িতে আগুন দেওয়া হলো সে রাতে ঠাকুমা ওকে রেখে এসেছিলেন পাশের কচুবনের ভেতর। কাঁদার মধ্যে নাক জাগিয়ে রেখে শুয়ে থাকতে বলেছিলেন সুবলকে। রাতভর সুবল সেভাবেই থাকতে থাকতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল সুবল। কিন্তু ভোরবেলা উঠে পোড়া বাড়িতে ওর ঠাকুমাকে পড়ে থাকতে দেখেছিল নিথর। আর তখন পুরো এলাকায় ছেয়ে গিয়েছিল পাকিস্তানী সেনা বাহিনী আর তাদের দোসররা। ওর ভেতর পাগলামি দ্যাখা দিয়েছিল তখন থেকেই। আর সে সুযোগেই একদিন ওকে ধরে এলাকার কয়েকজন মিলে খৎনা করে দিয়েছিল বলে শোনা যায়। সে সময়ই ওকে একটা নামও দিয়ে দেয় তারা, সেই নামটিই শফিক। কিন্তু এই যে এতো বয়স হলো, এখনও পর্যন্ত সুবল নিজেকে শফিক বলে ভাবতে পারেনি। এমনকি ওর বিয়েটাও ঠিক সেভাবে ঘটা করে হয়নি। মুক্তিযুদ্ধের পর দেশের রাস্তাঘাটে অনেক পাগল নারীকে দেখা যেতো। ওদের গ্রামেও একদিন এক পাগলি এসে জুটেছিল। সবাই তখন সুবল বা শফিক পাগলের কাছে সেই পাগলিকে পাঠিয়ে দিয়েছিল। দু’জনে ভাবও হয়ে গিয়েছিল দ্রুতই। কোনো ধর্মমতে ওদের বিয়ে হয়নি বটে কিন্তু দু’দু’টো সন্তান হওয়ার পর এবং তারা যখন একটু বড় হতে শুরু করে তখন তাদের ধর্ম কী হবে তা নিয়ে এলাকায় অনেক আলোচনা-বৈঠক হয়েছে। গ্রামের মুরুব্বিরা, যারা ওকে জোর করে খৎনা করিয়ে দিয়েছিল, যারা ওর নাম বদলে দিয়েছিল, যারা পাগলনিকে এনে জুটিয়ে দিয়েছিল সুবল বা শফিকের সঙ্গে তারাই ওদের ছেলেমেয়েদের ধর্ম ঠিক করে দিয়েছিল। ওরা ওদের মতো করে বড় হয়েছে। কী হয়েছে, কেমন হয়েছে তা নিয়ে সুবল বা শফিকের কোনো মাথাব্যাথা নেই, ওর পাগলি স্ত্রীরও ছিল বলে মনে হয় না। কিন্তু ছেলেমেয়েরা এখনও ওদের দোষারোপ করে। কারণ ধর্ম ঠিক করে দিলেই কি আর ধর্ম পাওয়া যায়, ধর্মে জন্মাতে হয়, সেটাতো ওরা পারেনি বা ওদের ভাগ্যে জোটেনি। ওরা জন্মেছে সুবল অথবা শফিকের ঔরশে জাতপাত অজ্ঞাত এক নারীর গর্ভে। চাইলেই কি আর তারা একটা পরিচিতি পেতে পারে? অতোই সহজ? তাই ছেলেটা যেমন-তেমন মেয়েটা কোথাও টিকতে না পেরে এখন ঢাকায় গিয়ে গার্মেন্টস-এ কাজ নিয়েছে, সেখানে নাকি কেউ জিজ্ঞেস করে না ওর জন্ম-পরিচয়। মাঝে মাঝে বাপটার খোঁজখবর নেয় এখন তবে গ্রামের পথে পা বাড়ায় না আর। বাড়াবে কি করে, এলেইতো তাকে মানুষের মুখের সামনে পড়তে হয় আর মানুষের মুখ সবার আগে ওর জন্ম-পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তোলে। কিন্তু সেসবে সুবল বা শফিকের কিছু যায়-আসে না। কারণ ওর জীবনে যা কিছুই হয়েছে বা ঘটেছে তাতে ওর কোনো দায় নেই, দায়িত্বও নেই। ওর যেটুকু দায় ও দায়িত্ব তা ওর ঠাকুমার কাছে। পাগল হলেও ওর এই বোধ আছে, পূর্বপুরুষের দায় নাকি মেটাতে হয় জীবন থাকতে থাকতেই। আর সে কারণেই পাগল সেজে হলেও এই বাড়িটি আঁকড়ে ও পড়ে আছে। বাড়িতে ওর অংশ একেবারেই ছোট হয়ে গেছে, ওকে কোন্্ঠাসা করতে করতে একেবারেই ক্ষুদ্রাংশে পরিণত করা হয়েছে কিন্তু ও দখল ছাড়েনি। পাগল সেজে, শফিক নাম নিয়ে হলেও ও টিকে আছে, কিন্তু মনে মনে ও ঠিক জানে যে, ও আসলে সুবল। যে ভিটেয় ওর ঠাকুমাকে মেরে ফেলে রাখা হয়েছিল সেই ভিটে যে ও মুসলমান নাম নিয়ে হলেও টিকিয়ে রাখতে পেরেছে সেটাই ওর বড় সাফল্য, পাগল হলেও সেই সাফল্য ওকে গর্বিত করে আর ও অপেক্ষা করে থাকে একদিন ঠিক ওর ঠাকুমাকে এ কথা ও বোঝাতে পারবে। কিন্তু ওর দুঃখ হলো মানুষের দেয়া নামটি শুনেই অভিমানে ঠাকুমা ওর সামনে থেকে সরে যায়, সুবল আর সুযোগ পায় না বলে ওঠার জন্য যে, ও আসলে মানুষের দেয়া নামটিই নিয়েছে, কিন্তু সে নামে কোনো মাহাত্ম নেই ওর কাছে। কোনো এক পূর্ণিমায় সুবল একথা ওর ঠাকুমাকে বলবে বলেই বেঁচে আছে, নাহলে এই জীবনে ওরই কি আর আগ্রহ আছে? সে আগ্রহতো সেদিনই গেছে যেদিন ওর নাম বদলে দিয়েছিল পাড়ার লোকেরা মিলে।

1 টি মন্তব্য:

  1. আপাতঃ সরল বুননের বেশ জটিল গল্প। সুবলের চরিত্রটা দারুণ লেগেছে। তবে তার ছেলে মেয়েদের মানসিক দ্বন্দ্ব নিয়ে আরেকটু কাজ করা যেতো বলে মনে হয়। শুভকামনা।

    উত্তরমুছুন