শনিবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৭

বোধিসত্ত্ব ভট্টাচার্যের গল্প : পাঠক

-আর একটু ডাল দিয়ে যাও তো, তিতলি। এটা শেষ হয়ে গিয়েছে। এবার অল্প করে একটু আলু চটকে ডালের ভিতর ফেলে দিয়ো তো। খেতে ভালোলাগবে। বলতে বলতে ডালের বাটিটা একপাশে সরিয়ে রাখল অভিরূপ। ষাটের উপর বয়স। ফর্সা চেহারা। চুল তেমন পাকেনি। দেখলে বিয়াল্লিশের বেশি মনে হয় না। যদিও, ইদানীং, পেচ্ছাপ এবং ‘তুই’ বলে ডাকার লোক- দুটোই কমে যাচ্ছে। টেবিলের তলায় দুটো আরশোলা ঘুরে বেড়াচ্ছিল। ওগুলোকে ‘হুশ, হুশ’ করে তাড়িয়ে চেয়ারে পাজামা পরা পা দুটোকে গুটিয়ে তুলে নিয়ে বাবু হয়ে গুছিয়ে বসলেন তিনি। আরশোলা দুটো উড়ে গিয়ে বসল দেওয়াল ঘড়ির মাথায়। ঘড়িতে সাতটা পনেরো। ওর বাবার বিয়ের ঘড়ি। ‘জনগণমন অধিনায়ক’-কে ‘জাতীয়সঙ্গীত’ হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়ার ঠিক দু’মাস পরে বিয়েটি হয়। ওটি বাবার প্রথমপক্ষ। বেশিদিন টেকেনি। অভিরূপ দ্বিতীয় পক্ষের ছেলে। ওর বাবা প্রথম জীবনে স্বদেশী করতেন। তারপর ইস্কুল মাস্টার হন। শেষের দিকে, ডিম্পল কাপাডিয়ার সিনেমা দেখতে পছন্দ করতেন খুব। 

-কী গো, কই গেলে! দাও! মাঝামাঝি আটকে রয়েছি লেখাটার! আজকে সন্ধের মধ্যেই পাঠাতে হবে এই কিস্তির লেখা! এমনিতেই দু’দিন দেরি হয়ে গিয়েছে! গৌতমবাবু এবার রাগারাগি করবেন!

-আরে দিচ্ছি! দিচ্ছি! পাঁচটা মিনিট তর সইছে না তোমার! রান্নাঘর থেকে বউ গজগজ করে উঠল।

-রাগারাগি করে কী হবে! শান্ত হও। দাও। আমি ততক্ষণ হাতের কাজটা এগিয়ে রাখি। আজ কখন বেরোনো তোমার?

-একদম ন’টায় বেরোতে হবে। দশটা পনেরো থেকে মিটিং। ঘি কতটা দেব? আলুসেদ্ধ একটু চটকে ডালে দিয়ে দিলাম।

-দু চামচ মতো দাও।

লিখতে বসে মাঝারি সাইজের স্টিলের বাটিতে ডাল খাওয়া অভিরূপের দীর্ঘদিনের অভ্যাস। লেখার সময়টুকু ওর বন্ধুরা কেউই তেমন কিছু খায় না। ওই চা আর সিগারেট। তার বেশি কিছু নয়। অভিরূপও খায় সবই। হুইস্কিটা শোওয়ার আগে চার পেগ করে খাওয়াটা দীর্ঘদিন দখলে ছিল। এখন বন্ধু-ডাক্তারের পরামর্শে ওটা আড়াই পেগ করতে হয়েছে। সিগারেট আর চা তো চলতেই থাকে। লেখক হতে গেলে একটা ভাল মানের লিভার থাকা চাই। যা সব কিছুকেই হজম করে নিতে পারবে। তা ওর আছে। কিডনিটাও যথেষ্ট শক্তিশালী। খোলা জায়গায় বা মাঝেমাঝে রাত্রিবেলা ঘরের জানলা দিয়ে পেচ্ছাপ করার সময় একটু জোরে চাপ দিলে, তা তিন হাত দূরের জমিতে গিয়ে পড়ে। কিন্তু এত কিছুর পরেও লেখার সময় ও তথাকথিত নেশার জিনিসগুলো স্পর্শ করে না। তার বদলে খায় বাটির পর বাটি ধোঁয়া ওড়ানো ডাল। সঙ্গে কিছুটা ঘি। ডাল ঠাণ্ডা হয়ে গেলে অভিরূপ ছুঁয়ে দেখবে না। কেউ কেউ বলেন, এটা তার একটা বিচ্ছিরি সংস্কার। আর ও নিজে এই খাওয়ার ব্যাপারটি নিয়ে বলে, লেখক-জীবনের হিস্টোরিক্যাল ফ্যাক্ট। জিনিসটা খেতে খেতে বেঁচে থাকার একটা ঠিকঠাক মানে খুঁজে পাওয়া যায়। কতগুলো অবশ মাংস পাশাপাশি বসিয়ে তৈরি হওয়া ওর সাদা রঙের থকথকে মুখটা তখন শূন্য অন্ধকার থেকে অনেকগুলো সদ্যমৃত অথচ এখনও জ্বলজ্বল করা তারা একটি অলীক আঁকশি দিয়ে পরপর পেড়ে ফেলার আনন্দে ফকফক করতে থাকে। লেখা এগোতে থাকে তরতর করে।

অভিরূপ গত বাইশ বছর ধরেই পূর্ণসময়ের লেখক। তার আগে পশ্চিম মেদিনীপুরের বেলদার একটি ইস্কুলে পড়াত। তারও আগে ছিল একটি জীবন-বিমা কম্পানির এজেন্ট। একদম শুরুতে থাকত জলপাইগুড়ি জেলায়। ওখানেই জন্ম। চালশা থেকে চব্বিশ কিলোমিটার দূরের একটি জায়গায়। জায়গাটির নাম- ক্রান্তি মোড়। একটি বিস্তীর্ণ এলাকা। সেখান থেকে ইস্কুল, থানা, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, হাসপাতাল, রেললাইন- সবই বেশ দূরে দূরে। কাছের জিনিস বলতে- যখন তখন সাদা বা লালচে রঙের মেঘ গলে পড়া একটি আকাশ আর নেওড়া নদী। এছাড়া আছে, ক্রান্তি বাজারের বৃহস্পতিবারের হাট। যেখানে অনেক সস্তায় দেশি মুরগি, কচ্ছপ, পায়রা, টেরিকটের জামাকাপড়, কাচের বোতলে ইংলিশ মদ, বড়ো জ্যারিকেন; এইসব পাওয়া যায়। হাটের একটু ভিতরে ঢুকলে মুখে প্রচুর পাউডার আর মাথায় কাপড় কাচার সাবান মেখে চুলটা ফুলিয়ে বিভিন্ন মহিলা দাঁড়িয়ে থাকে। একটি মাঝারি সাইজের কচ্ছপের থেকে বেশি দাম নয় তাদের।

নেওড়া একটি শান্ত দেখতে নদী। শান্ত নদীটি, পটে আঁকা ছবিটি। সারাবছরই কোমর পর্যন্ত জল থাকে তাতে। রাতের জোয়ারে যেটুকু জল ভরে দেয়, ভোরের ভাঁটার টানে তা থেকে খসে যায় অনেকটাই। কখনও কখনও নদীর বেশ অনেকটা অংশ বুকে চরা ফেলে শুকিয়ে ঠনঠন হয়ে পড়ে থাকে। বর্ষায় এই নদীর রূপটিই আবার হয়ে ওঠে মনোহর। আকাশবোঝাই করে বৃষ্টি নেমে এলে তা অতিমাত্রায় নাটকীয় হয়ে ওঠে। বলা যায়, এই নদীর জল ভরা আর জল খসানোকে সামনে রেখেই একরকম বেড়ে উঠেছিল ওরা তিন বন্ধু। পলাশ, আফতাবুল, অভিরূপ। নদীর পাশের জমি খুব উর্বর। তাতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ধানের চাষ হয়। ধানের খেত শেষ হলে পর জঙ্গল। সেখান থেকে মাঝেমাঝে হাতি বেরোয়। বর্ষায় আঁধার খুব তাড়াতাড়ি নেমে আসে ওই অঞ্চলে। আঁধারের রং প্রথমে শ্যাওলা শ্যাওলা। তারপর হয়ে যায় যুবতীর তেল মাখা লম্বা চুল। নদীর জল কালো হয়ে যায় ধীরে। সেই কালো একটি বিস্তৃত ভয়াবহ ফণা হয়ে বিছিয়ে থাকে জঙ্গলের গাছপালা, মাটি, ঘাসের মাথায়। এরকম এক অন্ধকারের ভিতর বসেই প্রথমবার বিড়ি খেতে শিখেছিল অভিরূপ। পলাশ আর আফতাবুল তার আগেই ধরে নিয়েছে। ওরা তিনজনে একই ইস্কুলে পড়ত। অভিরূপ বাকি দুজনের থেকে বয়েসে খানিকটা ছোটো। দু’বার ফেল করে অন্য ইস্কুল থেকে এসে পলাশ আর আফতাবুল অভিরূপদের ক্লাস সেভেনে ভর্তি হয়। এক সপ্তাহের মধ্যেই একটি ঘন বন্ধুত্ব তৈরি হয়ে যায় তিনজনের মধ্যে। পরের বছর ফাইনাল পরীক্ষায় ওরা তিনজনেই একসঙ্গে ফেল করে। অভিরূপের বাবা ছিলেন ওই ইস্কুলেরই ইতিহাসের শিক্ষক। গান্ধীজীর সহযোগী ছিলেন ‘ভারত ছাড়ো আন্দোলন’-এ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কিছু পরে জন্ম তাঁর। রোজ সকালে উঠে এক টুকরো কাঁচা হলুদ আর এক গ্লাস চিরতার জলের সাহায্যে লিভারের দোষগুলো মুছে পরিষ্কার করতেন। ছেলের এই অধঃপতন তিনি ভালো চোখে দেখলেন না। একটা চিঠি লিখে তাকে পাঠিয়ে দিলেন কোচবিহারের মাথাভাঙায়। তাঁর দিদির বাড়ি। তিনি বুঝতে পারেননি, ততদিনে বন্ধুত্ব নামের একটি চিরকালীন আঠায় বিচ্ছিরিভাবে আটকে গিয়েছে চোদ্দ-পনেরো বছরের তিনটে ছেলে। যারা তখনও পর্যন্ত একবারও গোঁফটি চেঁচে ফেলে আয়নার সামনে নিজেদের দাঁড় করায়নি। পিসির বাড়ি যাওয়ার পথে চেন টেনে ট্রেন থামিয়ে মাঝপথে নেমে গেল অভিরূপ। তারপর টানা বারোদিন ছিল আফতাবুলের বাড়ি। পরে, জানাজানি হতে আবার ফিরে আসে ‘স্বদেশী ভবন’-এ। ওদের বাড়ির নাম।

অভিরূপের একটি মধ্যবয়স্ক বাবা ছিল। আফতাবুলের বাবা ছিল আদতে এক আনকোরা যুবক। ইট-বালি-সুড়কি সাপ্লাইয়ের ব্যবসা করত। পরম আনন্দের সিচুয়েশনে অন্যমনস্ক গলায় আব্বাউদ্দিনের গান গাইতে গাইতে একেবারে হঠাৎ চুপটি হয়ে যেত। গুনগুন করে বলত, বালি কই! এই অঞ্চলে বালি কই!তার আসল নাম কী ছিল, অনেকেই আর মনে করতে পারত না ওই সময়। তখন পরীক্ষার খাতায় নিজের বাবার নাম লিখতে হতো। আফতাবুল নিজেই একবার ভুল করে লিখে এসেছিল- বালি কই আহমেদ। কলকাতার জল-হাওয়ায় বড়ো হয়ে ওঠা কালিপদ স্যার তাই দেখে ওকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন- তোমাদের এদিকে কি বালির ভিতরেও কইমাছ পাওয়া যায়? আশ্চর্য! একবার এনো তো! পলাশের কোনও বাবা ছিল না। কোনও কোনও সন্ধ্যায় বিধান রায়, লালবাহাদুর শাস্ত্রী, বৈজয়ন্তীমালা, দেব আনন্দ নিয়ে কথা বলতে বলতে ও ছিটকে বেরিয়ে যেত। সময় থেকে ফটফট করে খসে পড়ত পলেস্তরার মতো। প্রশ্ন করত। বেপরোয়া প্রশ্ন। বাবা জিনিসটা ঠিক কেমন? সাবান মাখার সময় গান গায় কি? কত সাইজের বেল্ট পরে? কোন আইটেমটা পছন্দ করে ইলিশের-ভাপা না পাতুড়ি?...এই সকল অনুসন্ধিৎসার পাশে বসে থাকত ওর ঘরপোড়া দুই বন্ধু। তাদেরও পাশ দিয়ে বয়ে যেত নেওড়া নদী। সেখানে অন্ধকার আসে। অন্ধকার যায়। জঙ্গলের নিভৃত ডালপালাগুলোতে কত জন্তুর কামড়াকামড়ির দাগ নির্দোষ আকাশটির নিচে ঘুম হয়ে পড়ে থাকে।

একটি দানবীয় হৃদয়ভার প্রত্যেকেই প্রত্যেকের জন্য অনুভব করত তখন। একে অপরের সঙ্গে ভাগ করে নিত দিন আর রাতের বিস্ময়কর ভান্ডারগুলো। ওরা অন্ধকারের দিকে চেয়ে থাকত। সবাই মিলে জোনাকি আর বৃষ্টির ভিতর চেয়ে থাকত। হাওয়ায় গাছের পাতা দুলতে থাকে। অন্ধকার, আকাশ, মানুষ, ধানখেত ইত্যাদি পেরিয়ে একটি বিশাল দুর্জ্ঞেয় জলীয় ব্যাপার পড়ে থাকে নিস্পৃহ ও নিস্পন্দ হয়ে। তার মধ্যে থপ করে একটি ব্যাং লাফিয়ে পড়ার শব্দ শুনলেই মনে হয়- ইহার নামই সভ্যতা। ইহার নামই নদী।

বিড়ি খেতে খেতে মাঝেমাঝে ওটা দু’তিন টান দিয়েই আকাশের দিকে ছুঁড়ে দিত আফতাবুল। বলত, এই ছুঁড়ে দিলাম জীবনকে! ক্যাচ নিলাম। আবার এই ছুঁড়ে দিলাম কোমা’কে। তার মানে, ততক্ষণে বিড়িটা প্রায় নিভে এসেছে। ‘এই ছুঁড়ে দিলাম মৃত্যুকে’- বলার আগেই পলাশ আর অভিরূপ চেপে ধরত ওর হাত। ‘বরং আমাদের দে’- এমনটাই বলে বসত ওরা। 

এসব ছিল ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ের কথা। অথচ এখনও তা ঘুমের সময় লতার মতো জড়িয়ে থাকে ওকে। মাঝেমাঝেই স্বপ্নে এসে যায় ওরা। পলাশ আর আফতাবুল যোগ দিয়েছিল নকশালবাড়ি আন্দোলনে। অভিরূপকেও বারবার বলত ওরা। বোঝাত। চল আমাদের সঙ্গে। ভীমরুলের চাকের ভিতর বসবাস করছি আমরা। জিনিসটা ভাঙতেই হবে। এটা থেকে বেরোতেই হবে। তবেই মুক্তি। কথাগুলো বলতে বলতে আফতাবুল চোখ বন্ধ করে ফেলত। ওর কথার ভিতর নেওড়ার বাতাস এসে লাফিয়ে পড়ত। গলাটা তাতে আরও বেশি গম্ভীর শোনাত। অভিরূপ বুঝতে পারত, কথাগুলো শেখানো। নইলে আফতাবুল ‘বসবাস করছি’ বলবে কেন! ‘থাকছি’ বলবে!ক্রান্তি ছেড়ে চলে আসার সময় অভিরূপের বয়স পনেরো। ওদের দুজনের আরও একটু বেশি। ও মনে মনে বলত- আমার তোদের মতো সাহস নেই একদম। আমি তো ভিতু। এত সাহস জোগাড় করব কোথা থেকে? কথাটা কখনও বলা হয়নি। চালসা থেকে ট্রেনে উঠে বাবা মা দুই দিদির সঙ্গে কলকাতা ফিরে এলো অভিরূপ। ওর দুই বন্ধু ওর জন্য অপেক্ষা করছিল ওদলাবাড়ি স্টেশনে। চালসা, মাল, ডামডিম, ওদলাবাড়ি। কথা ছিল, বছরখানেক আগে যেভাবে পিসির বাড়ি যাওয়ার পথে চেন টেনে ট্রেন থেকে নেমে গিয়েছিল, সেভাবে নেমে আসবে এবারও। ও পারেনি। ট্রেনটা ওদলাবাড়ি পেরোনোর সময় নিজেকে লুচি-আলুরদম দিয়ে ভুলিয়ে রেখেছিল। পরে শুনেছিল, পলাশ গিয়েছে পুলিশের গুলিতে আর আফতাবুল, চিতাবাঘের কামড়ে। পলাশের চোখটা খুবলে নিয়ে তার ভিতরে মহানন্দার মাটি ঠুসে দেওয়া হয়েছিল।

ডালের বাটি চলে এসেছে। অভিরূপ তা থেকে একটু একটু করে চুমুক দেয় আর লেখে। ‘বাংলার স্টেশন’ বিষয়ক একটি ধারাবাহিক রচনা লিখছে ও এখন এক বিখ্যাত পাক্ষিকে। বিয়াল্লিশশো থেকে ছেচল্লিশশো শব্দের এক- একটা লেখায় নতুন নতুন স্টেশনের কথা উঠে আসে। রচনাটি পাঠকমহলে দারুণ পিঠ-চাপড়ানি পেয়েছে। খবরের কাগজে ওঁর রচনার সমালোচনা লিখতে গিয়ে কয়েকদিন আগেই নামকরা প্রাবন্ধিক তাঁর লেখার শেষ বাক্যটা লিখলেন এভাবে- ‘...কত বার তো গিয়েছি ওই স্টেশন দিয়ে। কত কী চোখে পড়েছে! কত কী-ই না ভেবেছি! কিন্তু কই, এভাবে ভাবিনি তো!’ কথাটা পড়ে অভিরূপের হাসি পেয়েছিল। এমনভাবে লেখে সমালোচকরা! সে নিজেও তো কতকিছুই ভাবেনি। ভাবতে পারেইনি। ঘটে গিয়েছে। সরকারের বিরুদ্ধে লিখতে গিয়েছে, বারবার সংসার চলে এসেছে। হাওয়ার ভিতর, বাতাসের ভিতর কী নিশ্চিন্তে মাঠ, পুকুর, গাছ, নদী এসব পড়ে থাকে। কতদিন ধরে রয়ে গিয়েছে ওরা এখানে। হেলায়ফেলায় বড়ো হয়। পাতা-ঘাস-জলের মতো সামান্য অথচ ঐতিহাসিক ঘটনাগুলোকে আন্দোলিত হতে দেখলে ওর মনে হয় ওদের শরীরে এখনও একটি বড়ো হাঁড়িওয়ালা সংসারের নেশা ভালমতো লেগে আছে। সেই হাঁড়িতে বসেই ক্রমাগত গরম ভাত হয়ে ফুটছে অভিরূপ ও তার সাহিত্য। বিপ্লব নিয়ে লিখতে গিয়ে তাই খুব সহজেই ওর কলমে চলে আসে ধানের ভারে নুইয়ে আসা একটি তল্লাটের এক পুকুর থেকে দুটো সুন্দর দেখতে লেগহর্নের গা-ঝাড়া দিয়ে উঠে এসে ঘাস পেরিয়ে মাঠ পেরিয়ে দিগন্তের আউটলাইনে মুছে যাওয়ার দৃশ্যটি। অথচ, ওর তো বিপ্লবী হওয়ারই কথা ছিল। দেওয়ালে দেওয়ালে লেখার কথা ছিল- সাম্রাজ্যবাদ নিপাত যাক। হাওয়ায় হাওয়ায় ঢলে পড়া আহ্লাদী গাছগুলো তা আর হতে দিল না।

অভিরূপ আজ লিখছে পশ্চিম মেদিনীপুরের একটি হল্ট স্টেশন নিয়ে। স্টেশনটি খড়গপুরের কিছু আগে। নাম- ক্ষীরাই। ভালো সিঙাড়া ওঠে ওখান থেকে। গরম। দশ টাকায় চারটে। আহ! সাউথ-ইস্টার্ন রেল! আধঘন্টা বাদেই রূপনারায়ণ... “বর্ষাকাল। মেঘের পটি দিয়ে সুন্দর করে সাজানো আকাশ আলপনা দেওয়া একটি নরম মাটির উঠোনের কথা মনে পড়ায়। একটু ভালো করে খুঁজলেই সম্ভবত একটা তুলসী গাছও পাওয়া যাবে কাছেপিঠে। তার মধ্যে দিয়ে উড়ে উড়ে যাচ্ছে নাম-না-জানা কয়েকটি সাদা পাখি। এই সব ঘটনাকে একটুও পাত্তা না দিয়ে বড়ো নিশ্চিন্তমনে সাইকেল চালিয়ে কাজে চলেছেন খাটো ধুতি পরা বুড়ো মানুষটি। কালো গালে বেশ কয়েকটা গর্ত। সকালের আলোয় মুখটা তেলেভাজার মতো লাগছে। স্বাস্থ্যটি দেখলে বোঝা যায়, বহুদিন তিনি কোনও অসুখ-বিসুখের মুখোমুখি হননি। এক-একটা ট্রেন চলে যাওয়ার পর মৃত্যু-পরবর্তী চিতা হয়ে লাইনগুলো এই সময় শুয়ে থাকে পৃথিবীর ওপর। শান্ত। নিস্পন্দ। জলে ভেজা। একটু বাদেই লাইনের ধারের পাথরগুলো কাঁপিয়ে দিয়ে এখান থেকে পাস করবে হাওড়াগামী সুপারফাস্টটি...”। এই জায়গায় পড়েই আচমকা থেমে গেল লেখা। ওহো! দেখেছ কান্ড! একদম ভুলে মেরেছি! পাঁচফোড়ন দিয়ে রুই মাছের বড়ো পেটি কড়াইতে সাঁতলাতে সাঁতলাতে কথা বলল তিতলি- কী হল আবার! কী ভুললে!

-আরে!উত্তেজিত হয়ে গেলে মাথা দোলাতে দোলাতে তুড়ি মারা স্বভাব অভিরূপের। সে এখন তাই করছে।

-কী হল বলবে তো রে বাবাহ! নাটক না করে! চেক জমা দিতে ভুলে গেছ, নাকি?

-না না! 

-তাহলে? কারও কাছ থেকে বই আনার কথা ছিল?

-না না। ওসব নয়। আজ একটি ছেলে আসবে। আমার পাঠক। দুপুরে খাবে। বলল, কইমাছের রগরগে ঝোল পছন্দ করে ফুলকপি দিয়ে। আমার একদম খেয়াল নেই। আসলে কেউ আসে না তো! বলছিল বর্ধমান থেকে আসবে সকালের সুপারফাস্ট ট্রেন ধরে।

-তুমি বাড়িতে আসতে বলেছ? তুমি! অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে তিতলি। বিয়াল্লিশ বছর বয়স। সন্তান হয়নি। ছ্যাক ছ্যাক শব্দ করে রুই মাছের পেটিটা পুরে যাচ্ছে। গত রাতে কেনা।

-হ্যাঁ। আমার লেখার একজন গুণমুগ্ধ পাঠক। দু’দিন আগে ফোন করেছিল। মুখস্থর মতো করে বিভিন্ন গল্পের বিভিন্ন জায়গার কথা বলে যাচ্ছে। বর্ধমান ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। এম.এ। ফার্স্ট ইয়ার। পাঠকের এইসব মুগ্ধতার ব্যাপার তো আমার কাছে নতুন কিছু নয়। কিন্তু, ওর ক্ষেত্রে কী যে মনে হল আমার! 

-ও কী বলল? 

-প্রথমে খুব অবাকই হল। আমার বাইরের লোককে বাড়িতে না ঢুকতে দেওয়ার কথাটা বোধহয় জানে।

-সে তো জানবেই। এত মনোযোগী পাঠক। আর এটুকু জানবে না! তোমার এই বাতিকের কথা কি আর কারও জানতে বাকি আছে!

- বাতিক কেন হবে, তিতলি? এটা তো সতর্কতা। সবই তো জানো তুমি। সবই তো বোঝো। তবুও এভাবে বলো কেন?

- এটাকে সতর্কতা বলে না, অভিরূপ। এটা পরিষ্কার পাগলামো। আমার বাড়ির লোক নিশ্চয়ই তোমার লাইব্রেরি থেকে বই চুরি করার জন্য এখানে আসবে না? কয়েকটা বইয়ের জন্য তুমি যে কী পৈশাচিকভাবে অসামাজিক হয়ে উঠেছ, তা বুঝতে পারো না!

- কয়েকটা বই না তিতলি ওগুলো। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সব বই। অন্তত আমার কাছে। ইতিহাস, সাহিত্য, দর্শন, সমাজবিদ্যা...এক একটা বইয়ের গুরুত্ব লেখার কাজে অপরিসীম। কত লোক এক সময় এসেছে। বিশ্বাস করে, ভালোবেসে তাদের সবাইকেই তো ঘুরিয়েছি লাইব্রেরিতে। তার প্রতিদানে কী পেয়েছি? তিলে তিলে জমানো বইগুলো একটু একটু করে কমে এসেছে। যে যার মতো করে চুরি করে নিয়ে কেটে পড়েছে। তোমার বা আমার বাড়ির লোকরাও তাদের মধ্যে নেই, সেটাই না আমি বুঝব কী করে!

- ঠিক আছে ছাড়ো। এই নিয়ে আর কথা বলতে ভালোলাগে না এখন। সেই এক কথা। এক গোঁ। রুইমাছ করে ফেলেছি। কই নেই আজ। আগে বললে করে রাখতাম। এখন আর হবে না। অফিস।

- আচ্ছা। ঠিক আছে। যা আছে। তাই খাবে।

- ও যে আসবে, যদি লাইব্রেরিতে যেতে চায়, কী করবে?

- তালা দিয়ে রাখব।




ছেলেটিকে দেখে বেশ অবাক হল অভিরূপ। চমৎকার ঝকঝকে চেহারা। পাঁজরের গায়ে যত্ন করে লেগে থাকা সলিড মাংসের আভাস নীল পাঞ্জাবির বাইরে থেকেও পাওয়া যাচ্ছে। তবে অবাক হওয়ার কারণটি অন্য। ছেলেটির দুটো কান চোখের সঙ্গে সমান্তরালে নয়। তার থেকে একটু নিচে। অভিরূপের মা রূপকথার গল্প পড়ে শোনানোর সময় এই ব্যাপারটা নিয়ে একটা ছড়া কাটত। চোখের নিচে যার কান / তারই নাম ভগবান। পৃথিবীর সব মানুষের কানই চোখের সঙ্গে সমান্তরালে থাকে। যাদের তা নয়, তাদের ঠিক সাধারণ মানুষ বলা যায় না। তবে তারা অবশ্যই মানুষের মতো। তিতলি অফিসে চলে গিয়েছে ঘন্টা দুয়েক আগে। অভিরূপের রচনার খাটো ধুতি পরা মানুষটি তখন পাঁচ কিলোমিটার রাস্তা এবং দুটো ছোটো নদী পেরিয়ে রাধামোহনপুর বাজারে দাঁড়িয়ে বড়ো দেখে একটা ডাবের জল শেষ করে তার শাঁসটা তুলে তুলে মন দিয়ে খাচ্ছিল। আরও কিছু পথ সাইকেলে যেতে হবে তাকে। ওই সময়ই কলিংবেলটা বাজল। দরজা খুলেই অভিরূপ দেখতে পেল তাকে। জিজ্ঞাসা করল সঙ্গে সঙ্গে- তুমিই? উত্তর এলো সটান- হ্যাঁ। আমিই! একটু অবাক হল অভিরূপ। ছেলেটি তার বাড়িটা চিনল কী করে! এর আগে তো কখনও আসেনি। তবে কি কেউ দেখিয়ে দিল? কিন্তু কে? অনেক প্রশ্ন করতে চাইলেও করা হয়ে ওঠে না। এটাও হল না। জিভের ডগায় ঝুলে রইল বাদুড় হয়ে। সেই বাদুড়কে পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে এলো অন্য একটি কথা- কী নাম তোমার? ভিতরে এসো। 

আমার, ছেলেটি বেল্ট দেওয়া চামড়ার জুতো খুলতে খুলতে বলল, তেমন কোনও নাম নেই স্যার।

- স্যার বোলো না। শুনতে বাজে লাগে। নাম নেই মানে? এ আবার হয় নাকি!বর্ধমান ইউনিভার্সিটিতে পড়ছ কী করে তাহলে? 

- আমি বর্ধমান ইউনিভার্সিটিতে পড়ি না তো! 

আবার মেঘ করে এসেছে। ফ্যাকাশে ঠাণ্ডা একটা হাওয়া দিচ্ছে। ম্যাটম্যাটে রঙের আকাশ। একদম ভালোলাগে না। এই ভরদুপুরে প্রকৃতির এ কী উৎপাত! ভালোলাগে না একদম। তার বাড়ির সামনেই একটি বড়ো মাঠ। তারপর গোয়াল ঘর। ওখান থেকে সাদা, কালো এবং আরও অনেক বর্ণের গরু ঘাস খাবে বলে মাঠে এসেছে। তাদের বড়ো বড়ো কান খাড়া হয়ে উঠছে কখনও। বাতাসে তাদের লেজ নাড়ার সপাসপ শব্দ। সেদিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে অভিরূপ বলল, তাহলে ফোনে মিথ্যে কথা বললে কেন? চা খাবে? আমি কিন্তু করতে পারি না। খেতে হলে তোমাকে নিজে করে নিতে হবে।

- তখন তো জানি না যে, আপনি একেবারে ঘরে নেমন্তন্ন করে বসবেন। তাহলে হয়তো অন্য কথা বলতাম। আমি চা করতে পারি না। ওটা থাকুক বরং। ছোটো ড্রয়িংরুমে বসে কথা হচ্ছিল। এই ঘরে একটি শাটার লাগানো পুরনো ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট টিভি আছে। খারাপ।

- কিন্তু এভাবে কী করে কথাবার্তা হবে! আশ্চর্য! আমি তো তোমাকে চিনি না। তুমি নিজের পরিচয়টাও দিচ্ছ না! মহা মুশকিল!

- আমি একজন পাঠক। ফ্রম টো টু হেড। এটাই আমার পরিচয়।

- এটা একদম ন্যাকামি। কিছু মনে কোরো না ভাই! অনেকে ঠিক এই ভঙ্গীতেই বলে, আমি একজন মানুষ। এটাই আমার আসল পরিচয়। অদ্ভুত! তাহলে আধার কার্ড, ভোটার কার্ড এগুলো আছে কী করতে! প্রতিটা মানুষের রেটিনার গড়ন আলাদা। হাতের ছাপ আলাদা। একটু খুঁজলে হয়তো দেখা যাবে, কোষের গঠনেও বহু তারতম্য আছে। কিন্তু এসব তো সাধারণ চোখে ধরা পড়ে না। যা পড়ে, তা হল ওই নাম। ওটিই হল, একের সঙ্গে অপরের পৃথকত্ব প্রমাণের ধারণার ওপরে পড়া সবথেকে বলিষ্ঠ রবার স্ট্যাম্প। তুমি সেটাকে মুছে দিতে চাইলে হবে নাকি!

- আচ্ছা। আপনার যে নামটি ভালো মনে হয়, তাতেই আমাকে ডাকুন। অসুবিধা নেই।

- তোমার বয়স কত?

- ছাব্বিশ।

অভিরূপের মনে হল, কথাটা মিথ্যে নয় বোধহয়। দেখে তো ওরকমই লাগছে। সে আবার জিজ্ঞাসা করে- চা তো হল না! বিস্কুট খাবে? সন্দেশ খাবে? দুপুরের খাওয়া তো আরও পরে। এখন একটু কিছু খাও। এতক্ষণ শুধু মুখে বসে থাকবে? অত দূর থেকে এসেছ!

- আপনি চিন্তা করবেন না। আমি কিছু খেয়েই এসেছি। আচ্ছা, কোথায় থেকে এসেছি আমি, আপনি জানেন?

- বর্ধমান বললে তো! সেটাও মিথ্যে?!

- দেখুন, মিথ্যে কথা নয়। তবে, এখানে একটা ব্যাপার আছে!

- কী ব্যাপার?

- নাম জিনিসটার প্রতি, প্রপার নাউন জিনিসটার প্রতিই আমার ভয়াবহ বিবমিষা আছে। আমি এক-একটা জায়গার নাম নিজের ইচ্ছেমতো দিই। বলা ভালো, বাকিরা যে নামে ডাকে, আমি সেই নামে ডাকি না। পাল্টে দিই।

- মানে? ঠিক পরিষ্কার হল না।

- আমি আপনাকে বলেছি যে, আমি বর্ধমান থেকে আসছি, তাই তো?

- হ্যাঁ।

- তেমন জটিল কিছু না। আপনি যে জায়গাটাকে ‘বর্ধমান’ বলে চেনেন, আমি হয়তো সেটাকে ডাকি ‘মালদা’ বলে। আবার আপনার বা আপনাদের ‘মালদা’ হয়তো আমার কাছে ‘পুরুলিয়া’।

- এরকমভাবে ভাবলে তুমি ট্রেনের টিকিট কাটো কী করে? হাওড়া বা শিয়ালদহ-কে তো তখন ‘হাওড়া’ বা ‘শিয়ালদহ’ বলছ না নিশ্চয়ই!

- তখন বলি লাস্ট স্টেশন। ওটা তো আর প্রপার নাউন নয়। বদলাতে হল না। যেমন, সুপারফাস্ট ট্রেনটাও প্রপার নাউন নয়। তাই, ওতে করেই যে আমি এসেছি, তা সত্যি।

অভিরূপ মনে মনে বলল- সত্যি না ছাই! তুমি আসলে একটা স্কাউন্ড্রেল। একটা হ্যাবিচুয়াল লায়ার। কিন্তু ছেলেটি পরের কথাটি বলেই ওকে চমকে দিল।

- এ জিনিস তো আপনারা লেখকরা হামেশাই করে থাকেন! ধর্মতলায় দেখা কোনও ঘটনাকে সময় বদলে স্থান বদলে কাশিপুরে নিয়ে গিয়ে ফেলেন না? এটাও তো ঠিক তেমনই। মিথ্যে আর কল্পনা- এ দুটো ব্যাপার তো তেমন আলাদা কিছু নয়। একে অপরের আপৎকালীন বন্ধু। অথচ, প্রথমটা শুনলে, আমরা ভাবি- নরক। দ্বিতীয়টার ক্ষেত্রে- ঠাকুমার ঝুলি। 


ছেলেটির গালে অল্প দাড়ি। ফরসা মুখ। একটা রিমলেস চশমা পরে আছে। একদম তোড়ে কথা বলে যাচ্ছে। কথার ভিতর অ্যামেচারিশ ছাপ। সম্ভবত এর আগে কখনও এত নামকরা লেখককে সামনাসামনি দেখেনি। কথাটা ভাবতে ভাবতেই ছেলেটির ভাবনাটা মনে মনে একবার চট করে অ্যাপ্লাই করে ফেলল অভিরূপ। অবাক হয়ে দেখল, পঞ্চাশ বছর আগে ওর দুই বন্ধু ওর জন্য ওদলাবাড়ি স্টেশনে ওর জন্য অপেক্ষা করে বসেছিল- এই বাক্যে ‘ওদলাবাড়ি’র জায়গায় ‘লিলুয়া’ লিখলে ব্যথাটা আশ্চর্যভাবে খানিকটা কমে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, এই তো মোটে পাঁচ কিলোমিটার… নাহ! ছেলেটিকে থামানো দরকার! 

ও বলল, চলো। একটা জায়গায় নিয়ে যাই তোমায়। ওখানে ঘন্টাখানেক থাকো। তারপর দুজনে মিলে ভাত খাব। কই নেই কিন্তু। রুই আছে। বড়ো পেটি।

- তাতেও দারুণ চলবে! আমি মাছ খেতে খুব ভালোবাসি!

- ফ্যানাভাত খাও? পছন্দ করো?

- ততটা নয়। তবে, খাই।

- কী দিয়ে খাও?

- মাখন, আলুসেদ্ধ আর ডিম দিয়ে মেখে।

- ঘি দিয়ে খাবে। ওতে স্বাদ আরও খুলে যায়। 

অভিরূপ ছেলেটিকে নিয়ে তালা খুলে লাইব্রেরিতে ঢোকে। অন্তত দু’বছর বাদে এই ঘরটিতে আবার একটি ক্ল্যাসিক মুহূর্ত তৈরি হল। লেখক এবং তার পাঠক। আগেও এমনটা হত বটে। অভিরূপের বইয়ের সংগ্রহ দেখার মতো। অন্তত হাজার বিশেক বই আছে তার। ও নিজে অত্যন্ত ভালো পাঠক। মগ্ন পাঠক। পড়ার সময় নাকে টিকটিকি বসলেও খেয়াল করবে না। প্রত্যেকদিন অন্তত ঘন্টা তিনেক পড়াশোনা করা অভ্যাস। পাঠক ওর লেখার ভিতর থেকে খুঁজে পায় মনীষা। আগে বাইরে থেকে কেউ এলে এই ঘরটিতে বসেই চা বা হুইস্কি খেতে খেতে আড্ডা হত। সেই আড্ডার সুযোগেই বহু লোক ওর অনেক বই না বলে নিয়ে চলে গিয়েছে। আর ফেরত দেয়নি। প্রায় হাজারখানেক বই চলে যাওয়ার পর ও প্রথমে লাইব্রেরিতে, তারপর বাড়িতে ঢোকাই বন্ধ করে দেয় বাইরের লোকের। আত্মীয়-বন্ধু নির্বিশেষে। এতে ওর বুকে উদ্ধত, অহঙ্কারী, অসামাজিক, মোগ্যাম্বো ইত্যাদি নামের ব্যাজ এঁটে বসে যায় শক্ত করে। অথচ, এসব কিছুই না। ও জানে, ওর একটাই পরিচয়- ভিতু। ও ভয় পায়। কোথা থেকে সাহস বলে জিনিসটা জোগাড় করা যায়, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও পায়নি।

পতঙ্গ যেভাবে এক ফুল থেকে অপর ফুলের দিকে লাফিয়ে লাফিয়ে চলে, ঠিক সেভাবেই লাইব্রেরির এক র্যাক থেকে আরেক র্যাকের দিকে পৌঁছে যাচ্ছিল ছেলেটি। তার পাতলা শরীরটি তখন রাজকীয় হয়ে গিয়েছে। পা দুটোকে মনে হচ্ছে অনেক বেশি সুঠাম। সুবিন্যস্তভাবে পেশিগুলো সাজানো তাতে। তার কোনও হাঁফ নেই। তবু দুর্বোধ্য কারণে কোনও কোনও বই খুলে উল্টেপাল্টে দেখতে দেখতে মাঝেমাঝেই গর্জে উঠছিল সে। একটু যেন লম্বাটেও দেখাচ্ছে তাকে। আরও বেশি উজ্জ্বল। অভিরূপ বসেছিল লাইব্রেরির একটি কোণের চেয়ারে। ওর নজর তখন শুধু ছেলেটির কানের দিকে। ও কি ওই বিশেষ ছড়াটি আদৌ জানে? পামুক থেকে কুন্দেরা হয়ে মানিককে ছুঁয়ে দিয়ে ছেলেটি এগোচ্ছিল কালিদাসের দিকে। মেঘ কেটে গিয়ে একটি ছোকরা আলো আকাশ থেকে চ্যাটাং চ্যাটাং করে এসে জানলা দিয়ে ঢুকে গেল লাইব্রেরির মধ্যে। 

বহুক্ষণ লাইব্রেরিতে কাটানোর পর রুই মাছের রগরগে ঝোল দিয়ে অনেকটা করে ভাত খেল ওরা দুজন। দশ মিনিট বিশ্রাম নেওয়ার পর ছেলেটি বলল, এবার যাব। অভিরূপও তাই চাইছিল। কিস্তির লেখাটা এখনও অনেকটা বাকি। আজকেই জমা দিতে হবে। 

ছেলেটিকে বলল- আবার এসো।

জুতোর বেল্ট বাঁধতে বাঁধতে সে জবাব দিল- আমি আসলে আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাইনি।

-কেন? আমিই তো তোমাকে ডেকেছিলাম। দেখা করতে চেয়েছিলাম।

-তা জানি। তবু...আপনার লেখা আগ্রহ নিয়ে পড়ি মানেই আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাইব, তার তো কোনও মানে নেই। দেখা করতে এলেই বা কী বিষয়ে কথা বলতাম? আপনি অমুক উপন্যাসটা কেন ওভাবে লিখলেন বা অমুক চরিত্রটাকে কেন আর একটু বেশি হাঁটালেন না- এইসব নিয়ে? রিডিকিউলাস! এগুলো তো আমি আপনাকে বলতেই পারব না। অথচ, বাইরের লোকের সঙ্গে তা নিয়ে গলার শির ফুলিয়ে তর্ক করতে পারব। এগ্যলো কিছুই যখন বলতে পারব না, তাহলে আপনার সঙ্গে আমার আলোচনার কমন গ্রাউন্ডটা কোথায়?

-এখানে এসে তবে কী পেলে?

-কিছুই পেলাম না। তবে আপনার লাইব্রেরি আর রুইমাছের ঝোলটা বড়ো পাওনা।

-তোমার নামটা জানতে পারলে খুব ভালোলাগত।

ছেলেটির মুখের প্রজ্বলিত অগ্নি মুহূর্তে নিভে যায় দপ করে। সে শুধু হাসল। অভিরুপ আর কোনও কথা বলল না। এই বয়সে এসে সে বুঝতে পারে, শব্দহীনতাই আমাদের বিনীত করে সবথেকে বেশি। 

ছেলেটি চলে গেল তারপর। 

দশ মিনিট পরে অভিরূপ আবার গেল লাইব্রেরিতে। সাড়ে তিনটে বেজে গিয়েছে তখন। প্রথম ট্রেন আর তার টিকিট-ব্যবস্থা নিয়ে অক্ষয় কুমার দত্তের একটি বিখ্যাত প্রবন্ধ রয়েছে ওঁর রচনাবলীতে। প্রবন্ধটি ওর মনে আছে। তবু, আরেকবার ঝালিয়ে নেওয়া। এখন যেটা লিখছে, তার জন্য লাগবে। 

বইটি নির্দিষ্ট তাক থেকে নামিয়ে পড়তে গিয়েই একটা অদ্ভুত ব্যাপার টের পেল অভিরূপ। রচনাবলীটি ওর বহুবার পড়া। প্রায় মুখস্থই বলা যায়। কিন্তু, এখন পড়তে গিয়ে মনে হল, এ জিনিস এর আগে পড়েনি। এটিই প্রথমবার। ট্রেন-সংক্রান্ত রচনাটি পড়তে গিয়েও সেই একই ব্যাপার টের পেল ও। সবই কেমন নতুন। এই বইয়ের কিছুই যেন কখনও পড়েনি ও। কী মনে হওয়ায়, আগে ভালো করে পড়া আছে এমন কয়েকটা বই তাক থেকে নামাল ও। সেই এক ব্যাপার। অদ্ভুত কান্ড! প্রত্যেকটা বইই পড়তে গিয়ে মনে হচ্ছে, এর আগে কখনও পড়েনি। নিজের দুটো রচনাসমগ্র নামাল। সেখানেও সেই ব্যাপার। নিজের লেখা বলে চেনাই যাচ্ছে না।

হতভম্ব, বিমূঢ়, ক্রমশ রক্তশূন্য অভিরূপ সিলিং ফ্যানটা চালিয়ে দাঁড়িয়ে রইল লাইব্রেরির একদম মাঝখানটায়।


তিতলির বাড়ি ফিরতে রাত হল। বারান্দায় বসে আছে অভিরূপ। এসেছিল তোমার সেই ভক্ত? প্রশ্নটা নিয়ে বারান্দায় উঠে পড়ল তিতলি। 

-ভক্ত নয়।

-তবে কী?

-রহস্য... 

-মানে?

-আবার লাইব্রেরি থেকে চুরি হয়ে গেছে, তিতলি...

-সে কী! তুমি ওকে ঢুকতে দিলে! আশ্চর্য! কোন বই নিয়ে গেছে? বুঝতে পেরেছ?

-বই নয়।

-তবে কী? লাইব্রেরিতে তো বই ছাড়া আর কিছুই নেই!

এর উত্তরে পঁয়ষট্টি বছরের অভিরূপের ভিতর থেকে ফট করে বেরিয়ে এলো প্রায় বাহান্ন বছর আগের জলপাইগুড়ি জেলার হাইস্কুলের ইতিহাস শিক্ষকের ক্লাস সেভেনে ফেল করা ছেলেটির অবিকল গলা- আজ এক পাঠক এয়েছিল। আমার পুরা পড়াশোনাটাই তুইলে নে চইলে গেল সে লাইবিরি থিক্যা...

কথাটা বলতে বলতে প্রখ্যাত লেখক টের পাচ্ছিলেন, তিনি ভিতর থেকে একদম চুপসে যাচ্ছেন।পাঁজরের ঠিক তলা থেকে হাড্ডি-চামড়াসহ ভেঙেচুরে দুমড়ে যাচ্ছেন একটু একটু করে...

২টি মন্তব্য:

  1. এই চিন্তাভাবনা নিয়ে গল্প খুব কমই লেখা হয়েছে।খুব ভাল লাগল পড়ে।

    উত্তরমুছুন
  2. অদ্ভুৎ ভাল লাগা গল্প। গল্প পড়তে পড়তে অনেক লেখকের দিকে জার্নি হলো আমার। পিটার বিকসেল, পামুক,কুন্ডেরা আর কবি কালিদাস। পাঠকের নাম বদলের কথোপকথনের সময় বিকসেলকে খুব মনে পড়ল। একটা ঘোরের মধ্যেই গল্পটা পড়া শেষ করি। কিন্তু আরো একবার পড়বার আকুতি থেকে গেছে মনের গভীরে….

    উত্তরমুছুন