শনিবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৭

হামীম কামরুল হক'এর গল্প : হয়, হচ্ছে, হবে

১.

--কী নাম?

--মেহদাদ ফেরদৌস।

--কদিন ধরে এমন বোধ করছেন?

--অনেকদিন।

--মানে কত মাস বা বছর?

--এই তো মাস ছয়েক।

--নিজে কোনো কারণ বের করতে পেরেছেন?

--হ্যাঁ। সেটা তো আমি জানি। দুম করে চাকরিটা চলে গেল। ঠিক তার আগে আগে নিরুপমার সঙ্গে সম্পর্কটা চলে গিয়েছিল প্রায়। আমার চাকরি গেছে শুনে সবার আগে যে পাশে দাঁড়িয়েছে, সে হলো নিরুপমা। কিন্তু আমি এটাকে, মানে নিরুপমার এই ফিরে আসাকে একদম পছন্দ করিনি। আবার সে চলে যাক তাও চাইছি না। কারণ নিরুপমার টাকায় বলতে গেলে আমি এখন চলছি। বাড়িতেও টাকা দেওয়া বন্ধ করিনি। জানাইওনি যে আমার চাকরি নেই। আসলে নিজেকে খুব ছোট লাগছে। বা লাগে। আমার অযোগ্যতার জন্য যদি চাকরিটা যেত, আমি মেনে নিতাম। কোনো অন্যায় কিছু করছি, তাও মেনে নিতাম। কিন্তু কোনো কারণ ছাড়া চলে গেল, এটা একদম মানতে পারিনি।

--তাহলে মামলা করলেন না যে?

--ও বলা হয়নি। ওটা আসলে চুক্তিভিত্তিক কাজ ছিল। ঠিক চাকরিও বলা যাবে না। বছর দুই হয়েছিল। এর ভেতরে আমার সরকারি চাকরির বয়সও শেষ হয়ে গেছে। এজন্য আফসোস হচ্ছে। আসলে ভেবেছিলাম এই তো মাত্র কটা দিন এরপর পারমানেন্ট হয়ে যাব। তারপর তো এই নিয়ে আর ভাবনা থাকবে না। যদিও জানি না তখন ইনক্রিমেন্ট প্রমোশনের ইঁদুর দৌড়ে আমিও দৌড়াতে শুরু করে দেব কিনা। জন্মগতভাবে তো কোনো প্রতিভা নিয়ে আসিনি যে নিজের এটা জগৎ থাকবে। তাতে জীবিকাটা ছোট থাকলেও জীবনটা ছোট হবে না। তবে জানি না, আমার এক বন্ধু, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স মাস্টার্স পাশ করে একটা পত্রিকায় কাজ নিয়েছে। এডিটিং অ্যাসিসটেন্ট। আসলে প্রুফ রিডার। তার ইচ্ছা জীবিকটাকে ছোট রাখলে জীবনটাকে সময় দেওয়া যাবে। অফিসের কাছেই বাসা। অফিসের কাজ বাদে গান নিয়ে পড়ে থাকে। গান লেখে, সুর দেয়। এ পর্যন্ত শ খানেক গানে সুর দিয়েছে, নিজের গান, কিন্তু কই তার তো কোনো ব্যবস্থা হলো না? রেডিও টিভিতে, সিনেমায় কোথাও তো কেউ ডাকল না?

মেহদাদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তারপর আর টেনে একট দম নেয়। চুপ করে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর আবার বলতে শুরু করে।

--তবে কী জানেন, আমার এই অবস্থার ভেতরে একটা দারুণ সুখের ব্যাপারও আছে। আর সেটা হলো নিরুপমা। আমি উপমা বলে ডাকি। ওর সত্যিই কোনো তুলনা নেই। কোনো সংস্কার নেই। কোনো পিছু টান নেই। একেবারে স্বনির্ভর মেয়ে। আমার দেহমন আত্মসত্তা সব সে সুখে সুখে ভরিয়ে দিয়েছে। মাঝে মাঝে মনে হয়, নিরুপমা যতদিন থাকবে, ততদিন আমার আর কিছু করাই হয়ে উঠবে না। বলে না, মানুষ একটা হারালে আরেকটা ফিরে পায়। প্রকৃতির অদ্ভুত একটা ব্যালেন্স তৈরি করে দেয় তার জন্য। নিরুপমা তেমন করেই ফিরে এসেছিল যেন। যেদিন হাতে চাকরিচুত্য হওয়ার চিঠি নিয়ে হাঁটছি, মনে হচ্ছিল পায়ের নিচে কেমন যেন পানি জমেছে, পায়ের তলা ফুলে গেছে, পা ফেলতে মনে হচ্ছিল ঠিক মাটির ওপর হাঁটছি না, পা ফেললেই ব্যালেন্স রাখতে পারব না, এদিকে চোখ ফেটে বুক ফেটে একটা কান্নার প্রচ- দমক সব কিছু ভেঙে ছুটে আসতে চাইছে কিন্তু পারছে না, ঠিক সেই সময় আমি নিরুপমার একেবারে মুখোমুখি পড়ে গেলাম। আমার ভেতরটা তখন এমন দুম করে ঠান্ডা মেরে গেল। হয়ত মুখ থেকে রক্তই সরে গিয়েছিল। 

--তুমি? হঠাৎ এখানে?

--আমার কথা বাদ দেও। তোমার কী শরীর খারাপ করছে? চেহারার এই দশা?

আমার তখন জানি কী হয়। নিরুপমার কথার ভেতরে এমন একটা মায়া ছিল। দুম করে আমার মনে হয়, না হারানোর কিছু নেই। হারালেও ফিরে পাওয়ার আছে। সব কিছু হারিয়ে যায় না। আসলে কোনো কিছুই হারিয়ে যায় না। সবই ফিরে ফিরে আসে। আচমকা এমন সুস্থবোধ করি যে একেবারে স্বাভাবিক কণ্ঠে বলি, চলো এক কাপ চা খাই। খেতে খেতে বলছি।

টিএসসির ওখানে আমরা আমাদের পরিচয়ের শুরু থেকেই আড্ডা মারি। আমি ও নিরুপমা। নিরুপমার গায়ের রঙটা একটু চাপা, সানবাথ নেওয়ার পর ফর্সা মানুষের যেমন রঙ হয়। সবচেয়ে বড় হলো নাকটা এমন চোখা, বড় বড় চোখ, কেবল হনুদুটোর কারণে ভালোমতো খেয়াল করলে তবে একটু ধরা যায় ও বাঙালি মেয়ে না। নাট্যকলা থেকে অনার্স-মাস্টার করে এনজিওতে কাজ করছে। ঢাকার বাইরেই বেশি থাকতে হয়। একটা জেলার প্রত্যন্ত এলাকায় কাজ করে। এখন আছে শেরপুরে। ঢাকার হেড অফিসে ফিরে আসার চেষ্টা করছে। তবে ওখানের ঘনিষ্ঠ একজন বলছে, ওখানে যেও না; গেলেই পলিটিক্সের ভেতরে পড়বে; যা যা দেখবে সহ্য করতে পারবে না। 

নিরুপমার মধ্যে কেবল একটা জিনিস আছে খারাপ, এছাড়া মানুষ হিসেবে ওর সত্যিই কোনো তুলনা নেই। খারাপ যেটা সেটাও আসলে ভালো। কোনো রকম উল্টাপাল্টা কিছু দেখলে সে মাথা ঠিক রাখতে পারে না। রেগেমেগে অস্থির হয়ে যায়। বিশেষকরে যেটা যার সঙ্গে যায় না, ওর পরিচিতদের ভেতরে তেমন কিছু কেউ করে বসলেই হলো, সে যেই হোক নিরুপমা তাকে দুতিন কথা শুনিয়ে ছাড়বে। কোনো মাফ নেই। আবার সরি বললেই সাত খুন মাফ, নিরুপমার কোমল মনেরও কোনো তুলনা নেই। ফেসবুকে উপমা অনিন্দিতা নামে ওর পেইজটা ও বন্ধ করেছে কয়েকজনের ওপর রাগের কারণে। বলে, সবার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দিতে ইচ্ছা করে, কেবল তুমি আছো বলে আমি মোবাইলটা রেখেছি, নইলে মোবাইলটাও ছেড়ে দিতাম।

আমি ঠিক জানতাম না নিরুপমার সঙ্গে আমি কতদূর কী করব, কত দূর যাব, আমাদের সম্পর্কটা ঠিক প্রেম না, আবার বন্ধুত্বও না। কারণ সম্পর্কটা বন্ধুত্বের চেয়ে একটু বেশি কিছু। নিরুপমা বলে, তার জীবনে একটা স্বপ্ন ছিল, সারা দেশ জুড়ে এমন একটা লাইব্রেরি করবে, যেখানে মাত্র একশ বই থাকবে। নিরুপমা বলে যাচ্ছিল, মাত্র একশোটা বই। তালিকাটা খুব সোজা জানো-- ৪টা ধর্মগ্রন্থ বা দার্শনিক গ্রন্থ --বেদ, ত্রিপিটক, বাইবেল, কোরআন বা রিপাবলিক, পলিটিক্স, দ্য ক্যাপিটাল, দ্য ইন্টারপ্রিটেশন অব ড্রিমস; ৪টা মহাকাব্য, ৪ জন প্রধান চিন্তকের প্রধান বই-- ডারউইন, মার্কস, ফ্রয়েড, আইনস্টাইন, ১০টি নাটকের বই, ২০টি কবিতার বই, ১০টি ক্ল্যাসিক বিশ্ব-উপন্যাস, ১০টি আধুনিক বিশ্ব-উপন্যাস, ২০টি বাংলা উপন্যাস-- ক্ল্যাসিক ও আধুনিক মিলিয়ে, ১০ লেখকের গল্পগ্রন্থ, ৪টি বিজ্ঞান নিয়ে আধুনিক চিন্তার বই, আর ৪টি নন্দনতাত্ত্বিক, সৌন্দর্য কী, শিল্প কী, আর্ট কী এজাতীয় বই। প্রত্যেকটা বইয়ের দশটা করে কপি থাকবে। তাহলে মাত্র একহাজার বই। কিন্তু এই এক হাজার বই দিয়ে মানুষ তার ভেতরে মানুষকে চিনতে পারবে, তার সমাজ ভাষা ও আশেপাশের মানুষদের চিনতে পারবে। এই একশো বই মানুষকে হাজার কি দশ হাজার বইয়ের দিকে নিয়ে যাবে। বিজ্ঞানের ভেতর দিয়ে মানুষ নিজেকে, বিশেষ করে তার যার যার শরীরটাকে চিনতে পারবে। আমাদের দেশে কেন, পৃথিবীর কোথাও কি বায়োলজিটা ঠিকমতো পড়ানো হয়, বলো? জীবের ইতিহাস, জীবনের, প্রাণের ইতিহাস সত্যিকারভাবে পড়নো হয় কোথাও? তুমি জানো, শরীরটা চিনতে পারলেই মানুষ সমস্ত রকমের সংস্কার ভেদাভেদ থেকে, এবং যা কিছু মানুষকে বিভক্ত করে, তার হাত থেকে মুক্তি পাবে। এরপর সে একটা অদ্ভুত কথাও বলেছিল, ‘শরীর নিজে একটা ধর্মহীন বিষয়, এটা আমি প্রথম কোথা থেকে টের পাই জানো?’ ‘কোথা থেকে?’ আমি ছোট্ট করে জানতে চাই। বলে, ‘পর্নো দেখে। সেখানে কোনো রেইসিজম নাই। সাদাকালো ভেদ নাই। এশীয়, আফ্রিকান, ইউরোশিয়ান, ইউরোয়ামেরিকান ভেদ নাই। এমন কি ইনসেস্টেও। আমি আমি বিষয়গুলিকে খুব খেয়াল করে দেখেছিলাম। শরীর ও জৈবিকতার কোনো বাধ্যগত কোনো স্বভাব নেই।-- এইটা বোঝার শুরুটা সেখান থেকে, পরে আমি নানা কিছু দেখে যতটুকু জানা যায় পড়ে, এই সিদ্ধান্তে আসতে পারেছি, যত তুমি তোমার শরীরকে জানবে, তত তুমি মুক্তির দিকে যাবে।’

নিরুপমা একসময় খুব জেন চর্চা শুরু করে। ওর কাছে শুনেছিলাম জেন চর্চার জন্যই সে নিজেকে বাঁচাতে পেরেছিল। বলে, ‘দুটো জিনিস আমার এত তীব্র, একটা হলো রাগ আরেকটা হলো শরীরীক্ষুধা। নইলে রাগের ঠেলায়, আর কামের জ্বালায় আমি মরেই যেতাম। মজার ব্যাপার হলো এই দুটোকে আমি কু থেকে সু-র দিকে ঘুরিয়ে দিতে পেরেছিলাম। তা-ই হয়ত নিজে বেঁচেছি, আমার খপ্পর থেকে অন্যরাও বেঁচে গেছে। হি হি হি হি!’

--অন্যরা মানে?

--আছে। বলা যাবে না।

--তার মানে তোমার সঙ্গে যাদের সঙ্গ-অনুষঙ্গ হয়েছিল? মেহদাদ চোখে মুখে একটা বিশেষ ভঙ্গি করে জানতে চায়। 

নিরুপমা মেহদাদের বাহুতে একটা ঘুসি দিয়ে বলে, সেটা হলো কিনা না-হলো তোমাকে বলব কেন?



২.

মাকে ফোন করতে ভয় করে। ফোন করলেই মা কথা বলতে বলতে কাঁদে। আর কেবলই বলে বাড়িতে চলে আসতে। ঢাকায় থেকে এসব চাকরিবাকরি করে কী হবে। ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে আয়। যতদিন বেঁচে আছি কাছে থাক। তারপর মরে গেলে যেখানে খুশি চলে যাবি, কেউ তোকে ধরে রাখবে না।--বলেই ডুকরে কেঁদে ওঠে। মায়ের এইসব একথা এখন আর ভালো লাগে না। দেশে যা জমিজায়গা আছে, তাতে আমাদের চিন্তা করার কিছু নেই। বড় ভাই একটা বেসরকারি কলেজের ইংরেজির শিক্ষক। আয়রোজগার ব্যাপক। কয়েক শিফটে ছাত্রছাত্রী পড়ায়। সব মিলিয়ে তো মনে হয় শখানেক হবে। নিজের আলাদা বাড়ি করেছে ঝিনাইদা শহরে। তাই বাড়ির জন্য আমি ভাবি না। যদিও বড় ভাইয়ের হাতটা তত খোলা না, খুব হিসেব করে চলেন।

আমি নিরুপমাকে এসব বলেছিলাম আমাদের প্রথমদিকে আলাপের সময়। নিরুপমা খুব সন্দীপনের কথা বলত। সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়। তাঁর লেখা তাকে প্রবলভাবে শরীর সচেতন করেছেন। এমন শরীরী লেখক কবি জীবনানন্দ দাশ ছাড়া বাংলায় আর নেই।

--এসব আমাকে বলে কীলাভ?

--আমি আমার মজায় বলি।

-- কিন্তু তুমিই তো বলো, বলনেওয়ালা ঝুটা, শুননেওয়ালা সাচ। 

--সেটা গল্প যে বলে লিখে বা পড়ে, তাদের বেলায়।

বলেছিলাম, আমার দিন যাচ্ছে দৌড়ের ওপর। দৌড়ের ওপর কোনো ভালো কিছু নেওয়া ও দেওয়া যায় না। নিলেও চট করে দিয়ে দিতে হয়। ভারী লাগে। ছোট জিনিসও তখন ভারী লাগে।

--এখন তো না হয় দৌড়ের ওপর, আগে কী করেছো? বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়? তোমরা মানুষ, না পাথর? পাথরের মতো জন্ম নিয়ে পৃথিবীতে গড়িয়ে পড়েছো, তারপর গড়াতে গড়াতে একদিন কবরে উঠবে।-- এই তো জীবন।

আমি নিরুপমার কথা শুনে হো হো করে হাসি। ‘ভালো বলেছ হে নিরুপমা, করিয়ো ক্ষমতা।’ কিশোর কুমারের সেই গানটা প্রায়ই গাইতাম নিরুপমার সঙ্গে দেখা ও আলাপ জমে ওঠোর পর থেকে-- ‘ওগো নিরুপমা, করিও ক্ষমা।’ কারণ নিরুপমার সত্যিই রাগটা বেশি। এমন রাগি মেয়ে আমি কম দেখেছি। অন্তত আমার চেনাপরিচয়ের ভেতরে।

নিরুপমা জানতে চায়, আর তোমার চেনাপরিচিত লোকজন তোমার জন্য কী বলে? ঢাকা এসে তাহলে কেমন যোগাযোগ তৈরি করতে পারলে বলোতো? হয় তুমি দশটা লোককে চিনবে, নয়তো তোমাকে দশাটা লোক চিনবে। আর দুটো দিকে যদি এক হয়, মানে-- তুমিও দশজনকে চেনো, তোমাকেও দশজন চেনে, তাহলে তো কেল্লাফতে। আসলে যতই যা বলো, মানুষ মানুষের কাছে ছাড়া আর কোথাও কী ঠিক আশ্রয় পায়? বইপত্র গান সিনেমা নাটকও আশ্রয় দেয়, কিন্তু সেটা হলো ধীরে। অনেকদিনের অভ্যাসের ফলে কেউ সেটা পায়। সাধারণ মানুষের জন্য মানুষ ছাড়া আর কোনো আশ্রয় নেই। তবে সবচেয়ে ভালো হয় নিজেকেই নিজের আশ্রয় হিসেবে তৈরি করতে পারলে।

--কিন্তু চাকরির জন্য আর কারো কাছে যেতে ইচ্ছা করে না। কোথায় যে এমন বাধে! ঠিক তাও বুঝতে পারি না। যদিও জানি মানুষের কাছেই যেতে হবে। আমার পরিচিতরা কী আর বলবে। তুমি জানো চাকরির বাজার এখন ভীষণ খারাপ।

নিরুপমা বলে, চাকরির বাজার চিরকালই খারাপ। এর ভেতরে মানুষ নিজের জন্য সুযোগ তৈরি করে নেয়। তোমার মতো সুযোগের অপেক্ষায় থাকে না। 

নিরুপমার কথা শুনে ওর সঙ্গে রাগের ঘটনাটা মনে পড়ে। সেটা আমার ওই সুযোগ তৈরির একটা ব্যাপার ছিল। আসলে আমি একটু মরিয়া ছিলাম। নিরুপমার জন্য প্রবল একটা আকর্ষণবোধ তো ছিল। মনের সঙ্গে সেটা শরীরেও ছড়ায়। তাই একদিন নিজের এই সব কথা বলছিলাম। নিরুপমা চুপ করে শুনছিল। ওর-যে শরীর নিয়ে কোনো সংস্কার নেই-- আমি জানি। সেই সাহসেই ভর দিয়ে বলি, আমার সঙ্গে শোবে, নিরুপমা? নিজের কণ্ঠটা এত করুণ আমার কাছে শোনায়নি কোনেদিনও। নিরুপমা শুনেই হি হি করে সে কী হাসি হাসে। আমার ইচ্ছা করে তক্ষুনি নিরুপমাকে জড়িয়ে ধরি। ধরে আচ্ছাসে চুমু খাই। তার বদলে নিরুপমার হাতটা শক্ত করে ধরি। বেশ কিছুক্ষণ হেসে নিয়ে বলে, তোমার কী শোয়াটা খুব দরকার? এবার নিরুপমার কণ্ঠে কী যেন ছিল, তীক্ষ্ণ একটা কিছু। মনে হচ্ছিল ওর এই অতি সাধারণ কথার ভেতরে এমন একটা ধার ছিল, আমাকে কেটে দুভাগ করে দিতে রামদার মতো উদ্যত হয়েছে। আমি একটু ভড়কে গিয়ে বলি, ‘ঠিক তা না!’ একটু ততলেও উঠি। আর তক্ষুনি নিরুপমা রেগে ওঠে। সে কী রাগ! ভদ্রভাষায় আমাকে এমন ধোয়া ধুয়েছিল সেদিন। আমি নিজেকে ধন্যবাদ দিই, নিজেকে সামাল দিতে পেরেছিলাম। নিরুপমা বলেছিল, এজন্য আমাকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না। ভেতরে ম্যান্দামারা এই আমতা আমতার জন্যই আসলে আমার চাকরিটা গেছে। প্রাণ খুলে বুক উজাড় করে জীবনে আমি কিছু করেছি? কোনো কিছু জোর গলায় বলবার চাওয়া মুরোদ নেই। পুরুষ নামের কলঙ্ক। ইত্যাদি ইত্যাদি। তারপর ধাঁ করে উঠে চলে যায়। ‘আমি আসছি!’ আমার তখন আবার খুব রাগ হয়। এমন রাগ হয় যে আমার কোনোদিন ওর সঙ্গে কথা বলব না। বলিওনি। প্রায় কুড়িদিন আমি ওকে কোনো ফোন করিনি। ও-ও আমাকে কোনো ফোন করিনি। আগে হলে হয়ত ফেসবুকে কিছু লিখতাম, বা সে লিখত। তখন তো নিরুপমা নিজের ফেসবুক ডিঅ্যাক্টিভেইট করে রেখেছে।



৩.

চাকরি হারানোর চিঠি হাতে নিয়ে বিধ্বস্ত অবস্থার ভেতরে নিরুপমার সঙ্গে দেখা। সেদিন প্রথমে টিএসটির বাইরে চা খাই। পরে টিএসসির ভেতরে গিয়ে বসি। সেই আগেরদিনের মতো দেওয়ালে হেলান দিয়ে, একটা কোনা বেছে নিয়ে। হঠাৎ ঝড়ের ভেতর সেদিন এমন শান্ত হয়ে উঠি। নিরুপমা তো অদ্ভুত রকমের শান্ত ছিল সেদিন। সেদিন শেষদিকে বলেছিল, ‘তারও আজকে একটা ভয়ংকর দিন। কারণ তার বহুদিন ধরে যে ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল সেটা সম্ভবত শেষ। সম্ভবত বলছি, কারণ, অ্যাবসুলিউট বলে কোনো কিছু আমি বিশ্বাস করি না। ভাঙা যেকোনো কিছুই আবার যেকোনো সময় যেকোনো মানুষের সঙ্গে নতুন করে শুরু হতে পারে। কারণ ওই যে তুমি জানো, মন তো মাটির হাঁড়ি বা কাঁচের পাত্র নয়। তারপরও আমি অনেক দিন ধরে আভাস পাচ্ছিলাম। আসলে আমাদের সম্পর্কটা মানসিকের চেয়ে শারীরিকই বেশি ছিল। দোষটা আমারই। আমিই শুরু থেকে এটা বলেছিলাম যে, আমি ওইসব রোমান্টিকতায় বিশ্বাসী মানুষ নই। আমি গ্রাফিক্যালি, ফিজিক্যালি সব কিছু দেখি। যা এখানে এখন নেই, তা দিয়ে আমার কোনো কাজ নেই। ভাবালুতায় ভোগা মানুষ নই। কিন্তু দেখো, আমি তো কষ্ট পাচ্ছি!’ কথাটা বলতেই নিরুপমার চোখ দিয়ে হঠাৎ এক্কেবারে টপ টপ করে পানি পড়তে থাকে। সে সঙ্গে সঙ্গে মুখ ঢেকে ফেলে। সত্যিই আমি এই নিরুপমাকে চিনতাম না। ওর ভেতরে দুর্বলতা বলে কিছু ছিল না। অসম্ভব একটা তীব্রতা আর প্রখরতার মেয়ে। নাকটাই কী তীক্ষè, চোখ, দৃষ্টিতে কী ধার। হাসিতে, কথায়! সেই মেয়ে সেদিন ওমন করল? আমি নিরুপমার হাতের ওপর হাত রাখতেও ভয় পাচ্ছিলাম। যদি রেগে যায়। কারণ কারো করুণা নিয়ে কোনো দিন বড় হয়নি সে। যা করেছে নিজের চেষ্টায় করেছে। নিজের জন্য সুযোগগুলি তৈরি করেছে। স্কুল জীবন থেকে কবিতা লিখত। গান গাইত। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার শুরুর দিনগুলিতে ছোটগল্প লিখতে শুরু করে। ওর ইচ্ছা আখতারুজ্জামান ইলিয়াস যেটা চেয়েছিলেন, চাকমা উপন্যাস, তেমন একটা উপন্যাস লিখবে। যদিও জানে না সেটা সম্ভব কিনা। 

একদিন বলেছিল, ‘আমি একটা জিনিস খেয়াল করেছি জানো। সেটা হলো প্রথম দিকে বিশ্বজুড়েই আধুনিক লেখার অন্যতম দিক ছিল পেটের খিদা। ন্যুট হামসুন যেমন। শরীরী খিদাও ছিল, কিন্তু অভাব দারিদ্রটাই বেশি। এখন যেটা হয়েছে, সেটা হলো শরীরী খিদাটাই বেশি, দারিদ্র্য অভাব যে নেই তা নয়। কিন্তু সেক্স ছাড়া তুমি আধুুনিক কোনো লেখাই পাবা না। তো এই পেটের খুদা, চ্যাটের ক্ষুধা উতরে গিয়ে আমাদের লেখা যখন মস্তিস্কের ক্ষুধা নিয়ে আলাপ করবে, সেটাই হলো আমাদের মানুষের উত্তরণের প্রধান লক্ষণ হয়ে দেখা দেবে। লেখাকে আলাপ ছাড়া আর কী বলা যায়? বাখতিন আসলে এক্কেবারে ঠিক জায়গাটা ধরিয়ে দিয়েছেন। ইলিয়াসের উপন্যাসের বাখতিনের তত্ত্বের কী সব লক্ষণ নিয়ে একটা গবেষণা প্রবন্ধ নিয়ে কথা বলে নিরুপমা। সেদিন দেখা হওয়ার সময় দেখি খুব মন দিয়ে টিএসসির বারান্দায় একটা থামের পাশে কী পড়ছে। আমি বসতে বসতে বলি, ‘কী পড়ো?’ বলে, ‘জটিল জিনিস।’ 

এই মেয়ে সেদিন যেমন দুম করে কান্না শুরু করেছিল, তেমন মিনিট খানেকের ভেতরে টিস্যু দিয়ে মুখটুক মুছে ঠিক হয়েছিল, যদিও মুখটা তখনও লালাভ দেখাচ্ছিল।

‘আমরা দুজনেই যথেষ্ট বড় হয়েছি। তাও আমরা কী বাচ্চা? তাই না! আসলে বিপদে পড়লে সবাই প্রায় বাচ্চা হয়ে যাই। এত দ্রুত একটা আশ্রয় পেতে চাই, কোথাও কারো কাছে, তাই না? চলো উঠি।’ সেদিন আর কোনো কথা হয়নি। নিরুপমা রিক্সায় ওঠার সময় বলে, আমি ফোন করব। ঠিক আছে। ভালো থেকো।’

নিরুপমা চলে যাওয়ার পর এমন নির্ভার মনে হয়। কেমন যেন একটা শান্ত লাগে। ঝড়ের পর সব যেমন ফের শান্ত হয়ে যায়, তেমন একটা শান্তি। মনে হলো সত্যি, সুখের ভেতরে দিয়ে নয়, বেদনার ভেতরে দিয়ে মানুষ অন্য মানুষের গভীর গহনের মানুষটিকে পায়, এমনকি নিজের ভেতরে থাকা গহীন মানুষটাকেও। নিরুপমা আমাকে অনেকবারই বলেছে, ‘তুমি যথেষ্ট সেন্সেটিভ মানুষ। কিন্তু শিল্পসাহিত্য নিয়ে তোমার কোনো আগ্রহ নেই। তোমার ওই সেন্সেটিভিটির জন্যই তোমাকে ভালো লাগে। আর রাগ লাগে তোমার কোনো আগ্রহ নেই আর্টের প্রতি। আর্টের প্রতিও নেই, ধর্মের প্রতিও নেই, বিজ্ঞানের প্রতিও নেই। তুমি কী নিয়ে বাঁচো বলতো?’

আমি হেসে বলেছিলাম, চাকরি নিয়ে। সাধারণ মানুষের এ ছাড়া আছে কী?

--কিন্তু সাধারণ মানুষের তো ধর্মটা থাকে। তোমার তো তাও নেই।

--তারমানে আমি তো ধর্মহীন মানুষ নই। ধর্ম নিয়ে গোঁড়ামি কি ধর্ম নিয়ে বিদ্বেষ-- দুটো একই মৌলবাদিতার দুটো পিঠ-- আর কিছু না হোক এইটুকু বুঝতে শিখেছি।

--বাব্বা, এইটুকুই কিন্তু অনেক। তুমি সেন্সেটিভই নও, সেন্সেবল মানুষও।

আমি বলি, এসব তো তোমার কাছেই শিখেছি। শুনেই নিরুপমা আমার বাহুতে ঘুসি মারে।



৪.

ঠিক তিন দিনের মাথায় ফোন করে নিরুপমা। ‘হ্যালো, কেমন আছো?’ কণ্ঠটায় এমন একটা খুশির আভাস ছিল। যেমন হাসতে হাসতে কথা বলছে।

‘এই তো আছি। ভালোই আছি। এখন পর্যন্ত ভালো আছি।’

‘তোমার মন ভালো?’

‘ছিল না। এই মাত্র হয়ে গেল।’

‘ঢং। যাই হোক, শোনো, তুমি কোথায় আছো?’

‘কেন?’

‘একটু আসতে পারবে?’

‘সদরঘাটে।’

1 টি মন্তব্য:

  1. নিরুপমার চরিত্রটা ভালো এঁকেছেন। চরিত্রটা তার দর্শন আর জীবনবোধ নিয়ে দারুণ এগোচ্ছিলো। কিন্তু দুম করে শেষ হয়ে গেলো যেন। শেষটা ভালো লাগেনি।

    উত্তরমুছুন