বৃহস্পতিবার, ২৪ মে, ২০১৮

রঞ্জনা ব্যানার্জী'র গল্প : উদ্ভ্রান্ত মুখরতা

সাত মাস চলছিল আমার। হাঁপ ধরা সময় যাকে বলে। শরীরের ভারে আমি অস্থির। পা ঝুলিয়ে রাখলে জল জমে যায়। হাঁটতে গেলে প্রায়শ টান খাই। ঘুমাতে পারিনা। কী যে অশান্তি! যা খাই তাই উল্‌টে আসে।

বাবার বাড়ি এসেছি। এক্কেবারে বাচ্চাকে সড়গড় করে ফিরবো। আমাদের প্রথম বাচ্চা। 

ঘটনাটা যেদিন ঘটে সেদিন ছিল বৃহস্পতিবার। রাতের বাসে অদ্রীশ আসবে। ও দু’সপ্তাহ পরপর আসে নিয়ম করে। শণিবার সকালে ফিরে যায়। সেই দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পরে ব্যালকনিতে বসেছিলাম। অক্টোবরের শেষ। মিঠে রোদ পিঠে এসে পড়ছে; আরাম লাগছিল। বমিভাব তাড়াতে আমার হাতে বাটিভর্তি আমমাখা। মদিনা খালা রান্নাঘরের কাজ শেষে চুলে বিলি কেটে তেল দিয়ে দেবে বলেছে। রাতে আমার একফোঁটা ঘুম হয়নি। 

ব্যালকনির তারে মায়ের শাড়ি শুকোতে দেয়া হয়েছে। আগে ছাদেই কাপড় শুকোতে দেয়া হতো ইদানিং খুব চুরি যাচ্ছে। ছাদের দরজা বন্ধ থাকে তাও কীভাবে যে কাপড় হাপিস হয় তার থই পাচ্ছে না কেউ। পাশেই নতুন বিল্ডিং এর কাজ চলছে। রাজ্যের লোকের আনাগোনা। এই বিল্ডিঙেও সাত ঘর ভাড়াটে । তাদের সূত্রেও হরেকরকম লোকজনের নিত্য ওঠানামা। কাকে সন্দেহ করবে? অতএব এই এক চিলতে ব্যালকনিতেই এখন কাপড় শুকানোর ব্যবস্থা। 

ব্যালকনিতে কাপড়চোপড় দেখতে আমার অসহ্য লাগে! বাইরে সেদিন জোর হাওয়া। শাড়িটা মনে হচ্ছে ব্যালকনির ফোকড় গলে উড়ে যাবে অন্য কোথাও। চারপাশে কী শব্দ! ইট ভাঙার আওয়াজের সাথে ভিখিরি, ফেরিওয়ালা, গাড়ির আওয়াজ সব মিলেমিশে অদ্ভুত হল্লা। শাড়ির একটা কোনা মাঝে মাঝেই পতপত করে উড়ে লাগছে আমার গায়ে । মোড়াটা একটু সরিয়ে দরজার কাছে নিতেই চোখ চলে গেল পিলারে! 

পিলার ঘেঁষে লাল পিঁপড়েরা সার বেঁধে যাচ্ছে কোথাও। কোথায় যাচ্ছে ওরা?হঠাৎ মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠলো আর কথা নেই বার্তা নেই চোখের ওপর কালি ঢেলে দিল যেন কেউ! চোখ খুলতেই দেখি সবাই ঘিরে আছে আমাকে। হঠাৎ ঐ মুখগুলোর ওপর ভেসে ওঠে সেই পিঁপড়ের দল। মনে হয় যেন গেরুয়া বসনে সন্ন্যাসী! ওদের পায়ের সাথে পা মিলিয়ে হাঁটছে অক্ষরেরা। একবার সামনে, একবার পেছনে। আমি কি স্বপ্ন দেখছি? অবাক কান্ড ওরা এর ওর আগেপিছে বসে মসৃণ রেশমি ফিতের মত উড়তে উড়তে নিজেরাই আওড়ালো ‘মৌন সন্ন্যাসীর দল মগ্নতা ফেরি করে উদ্ভ্রান্ত মুখরতায়’। এরপরেই পুরো ব্যাপারটাই মিলিয়ে গেল! আমাকে কেউ ইলেক্ট্রিকের শক দিল যেন! চোখের সামনে আবার সব ‘নাই’ হয়ে গেল। 

পাড়ার ডাক্তারকে ডাকা হয়েছিল। প্রেসার লো। বাবা মা বেশ ভড়কে গিয়েছিলেন। দুই পক্ষেরই প্রথম নাতনি। (আলট্রাসোনোতে জেনেছি আমার শরীরে বাড়ছে আমার মেয়ে।) ডাক্তার আমার পেটের ওপরে স্ট্যাথো ঘুরিয়ে দেখলেন। নাহ্‌ বাচ্চা ঠিক আছে। মা অদ্রীশকে ফোনে সব হড়বড় করে বললো, ‘কতক্ষণ যে পড়ে ছিল কে জানে!’ মদীনা খালা সেই সময় মাথায় তেল লাগাতে না এলে কেউ জানতেই পারতো না। অদ্রীশ ফোনে আমার সাথে কথা বলে। কুমিল্লায় বাস স্ট্রাইক ও আসতে পারছে না। আমি হাঁপ ছাড়ি। ও এলে আরো ব্যস্ত হতো। 

সেদিন বিকেলে জোর করে আমার গাইনির ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়েছিল মা। ডাক্তার শাহানা ভীষণ ব্যস্ত ডাক্তার। সিরিয়ালই পাওয়া যায় না। এ্যাপয়েন্টমেন্ট ছাড়া দেখতে যাওয়ার মানে নেই কিন্তু মা বুঝলে তো! দুই ঘন্টা বসে ছিলাম ওয়েটিং রুমে। পা ফুলে ঢোল। ডাক্তার আপা অবশ্য আমাকে বেশ সময় নিয়েই দেখলেন। কিছু সমস্যা নেই। প্রেসারও পারফেক্ট। তাও আরেকটা ব্লাড টেস্ট দিলেন। বেশ খুঁটিয়ে জানতে চাইলেন আসলে কী ঘটেছিল। বললাম, ‘চোখের সামনে হঠাৎ অন্ধকার’।

আমি পিঁপড়ে আর সেই রেশমি লাইনটার কথা চেপে গেলাম। অবশ্য সেই রেশমি লাইনটা মনেও করতে পারলাম না। 

ডাক্তারের চেম্বার থেকে অদ্ভুত মন খারাপ নিয়ে বাড়ি ফিরেছিলাম। আমি স্পষ্ট দেখেছিলাম লাইনটা। শব্দগুলো নিজেই নিজেদের পড়েছিল! কেন মনে পড়ছে না? বাড়ি ফিরে আমি ব্যালকনিতে ঠিক একই জায়গায় দাঁড়াই। রাত গাঢ় হয়। দেখি সামনের ল্যাম্পপোস্টের লাইটটা নতমুখে আলো ঢালছে রাস্তায়। দুপুরের সেই হল্লা নেই কেবল গাড়ির আওয়াজ আর রিকশার টুংটাং। ছাতার মত ঠান্ডা ঝাঁপছে রাতের মাথায়। মদীনা খালা শাড়ি তুলে নিয়ে গেছে। ফাঁকা তারটার একধার রাস্তার লাইটের আলোয় অদ্ভুত চিকচিক করছে। পিলারটা তেরছা ছায়া ফেলেছে উলটো দেয়ালে। কিন্তু কোথাও কোন পিঁপড়ে নেই! অদ্ভুত একা লাগতে থাকে আমার। 

অদ্রীশ বিদেশে ছিল দীর্ঘদিন। আল্ট্রাসোনোর পরেই বাচ্চার নাম ঠিক করে ফেলেছিল ও। বিদেশে নাকি বাচ্চার জন্মের সাথে সাথেই নাম দিয়ে দিতে হয়। দুই বাড়ির গুরুজনেরা এই নাম দেয়া নিয়ে মহা অসন্তুষ্ট। বাচ্চা পৃথিবীতে আসার আগে তাকে নিয়ে যত কম কথা বলা যায় ততই ভালো। অদ্রীশ এসব পাত্তা দেয় না । আমাকে মা বাবার সামনেই ডাকে ‘মিঠুর মা’!। আমাদের দুই বোনেরই ডাক নাম ‘ম’ আদ্যক্ষরের। মিমি আর মলি। ‘মিঠু’ নামটা মলির দেয়া। ভালো নাম ‘অলকানন্দা’, অদ্রীশ দিয়েছে ;ওরই মত স্বরবর্ণের প্রথম অক্ষর। 

সেদিন রাতে আবার ফোন দিয়েছিল অদ্রীশ। ওর সাথে হুহা করে কথা সেরেছিলাম। কেন যেন অদ্রীশকে খুবই বিরক্ত লাগছিল। ওর কথা আধা শুনেছি আধা শুনিনি নি। আমার বুকের ভেতর সেই হারিয়ে যাওয়া শব্দগুলোর জন্যে হুমহুম হাহাকার পাক খাচ্ছিলো। 

সেই দিন থেকেই সবকিছু অন্যরকম হয়ে গেল । সেই শব্দের কাফেলা দেখার নেশায় আমার দিন রাত একাকার হয়ে গেল। মাঝে মাঝে মনে হতো রেশমি লাইনটা আসলে আমার জন্যে ছিল না। আমি ওদের ভুল করে দেখে ফেলেছি । জীবনে কেজো কিছুর বাইরে তো আমি কলম ধরিনি। থোড়বড়ির বাইরে চোখও মেলিনি। ওরা হয়তো বুঝে গিয়েছিল আমার এই নিরেট মনোভূমিতে ঠাঁই নিলে শুকিয়ে মরবে তাই চিহ্ন মুছে চলে গেছে। এই ভাবনা আমাকে ওদের আরেক ঝলক দেখার জন্যে আরো অস্থির করতো। 

ব্যালকনির কাছেই ঘুরঘুর করতাম। এইসব এলেবেলে ভাবনা কাউকে বলা যায়? মলি মেডিকেলে থার্ড ইয়ারে, ওকে তো নয়ই। কে কবে শব্দদের কথা বলতে শুনেছে? 

অবশেষে ওরা ফিরেছিল। তবে পুরো নয় । মিঠুর জন্মের পরদিনই আবার দেখেছিলাম ওদের। 

ডাক্তারের হিসেব মতে মিঠুর আসার তারিখ ছিল ত্রিশে ডিসেম্বর। ২৫ তারিখ রোববার সরকারী ছুটি। অদ্রীশ ২৬ তারিখ থেকে দশ দিনের টানা ছুটি নিয়ে চলে এসেছিল শুক্রবারে। আমার কোন ব্যথা ট্যথা নেই। মদীনা খালা পেটে তেল মালিশ দিচ্ছে। মা আর শাশুড়ি নিয়মিত উপোস দিচ্ছেন মিঠুর সুস্থ জন্মের আশায় অথচ আমি চোখ সরু করে লাগাতার পিঁপড়ের সারি খুঁজছি। সত্যি বলতে কি মিঠুর কথা খুব একটা ভাবছিলাম না। 

সাতাশ তারিখ শেষ চেক আপের দিন ছিল। ডাক্তার আমাকে দেখছেন পেশেন্ট বেডে শুইয়ে। বাচ্চার পজিশন মাপছিলেন উনি। সাদা পর্দা দিয়ে জায়গাটা ঘেরা। হঠাৎ কথা নেই বার্তা নেই পর্দার সাদাটার দিকে তাকাতেই সেই দুপুরটা দুলে উঠলো। সারবন্দি পিঁপড়েগুলি কোত্থেকে যেন জেগে উঠলো! শব্দগুলো ওদের ফাঁকে উঁকি দিচ্ছে। এত ছোট যে ওদের পড়া যাচ্ছে না। ডাক্তার আমার পা ফাঁক করে ডায়ালেশন চেক করার জন্যে হাত বাড়াতেই আমার জল ভাঙে। এতটাই হঠাৎ যে ডাক্তার নিজেই অবাক। তারপর সেকি হুড়োহুড়ি! এ্যাম্বুলেন্স ডেকে চেম্বার থেকেই ক্লিনিকে। রাস্তায় জ্যাম কেটে পৌঁছাতে পৌঁছাতে আমার আকাশপাতাল ব্যথা। শব্দ দেখার সেই দুপুরের পরে এই প্রথম আমার মিঠুর জন্যে দুশ্চিন্তা হতে থাকে। আমি অনবরত অদৃশ্য কারো কাছে আমার বাচ্চাটার প্রাণ ভিক্ষা চাই এমনকি আমার প্রাণের বিনিময়ে হলেও। ক্লিনিকে পৌঁছানোর আধাঘন্টার মধ্যেই পান পাতার মত ছোট্ট মুখের পুতুল পুতুল মেয়েটা রাত কাঁপিয়ে কেঁদে জানান দেয় ওর আগমন! ঐ কচি মুখটার দিকে তাকিয়ে আমি নিজেই অবাক! এতদিন একসাথে ছিলাম অথচ আজই আমাদের প্রথম দেখা! 

আমার শ্বশুর শাশুড়ি পরদিন ভোর না হতেই ক্লিনিকে এলেন সরাসরি। তাঁদের প্রথম বংশপ্রদীপ। বেলা হতেই আমার রুমে সবাই জড়ো হলো; আমার বন্ধুরা, দুদিকের অনেক আত্মীয়স্বজন। এর মধ্যেই ডাক্তার এসে দেখে গেছেন আমাদের মা মেয়েকে। এত ভিড় দেখে মৃদু অসন্তোষ দেখালেন। প্রথম রাত অদ্রীশ ছিল আমার সাথে। ওর অনেক ধকল গেছে। মদীনা খালা থাকবে রাতে। ডাক্তারের বকা খেয়ে সবাই বাড়ি ফেরার জন্যে তৈরি হচ্ছিলো। 

আমার শাল দুধ আসেনি বুকে। মিঠুকে খাওয়ানোর জন্যে যুত করে ধরাটাও আমার হাতে আসেনি। এত লোকজন আমারও অসহ্য লাগছিল। যাব,যাচ্ছি বলেও সবাই বাচ্চার কটের কাছেই জড়ো হয়ে আছে। জন্মের পর থেকে ক্যামেরায় হাজারের ওপর ছবি উঠেছে তাও আশ মেটেনি কারো; সেল ফোনে ছবি তুলছে অবিরাম। 

সেই ফটো সেশনের মধ্যেই আমার চোখ চলে যায় মিঠুর কটের কাছে দেয়ালে। পিঁপড়ে! মিঠুর কট ঘেঁষে অনুভূমিক চলছে সার বেঁধে। সেই অদ্ভুত শিহরণ ফিরে আসে যেন! আমি বিছানা থেকে ঝট করে নামি। একটানে কটটা আমার বিছানার কাছে নিয়ে আসি। হঠাৎ সব কিছু থেমে যায়। সবাই অবাক হয়ে দেখছিল আমাকে। কটটা যাওয়া আসার পথে রাখার মানে কি? মলি ঝাঁঝিয়ে ওঠে। আমি দেয়ালে পিঁপড়ের সার দেখাই। ও ছুটে যায় মারতে। আমি নিজেকে চমকে দিয়ে তীব্র চেঁচিয়ে উঠি! মলি অবাক। মা বাবা অন্যেরাও থমকে তাকায় আমার দিকে। আমি এমন চেঁচাতে পারি কারো জানা ছিলনা! আমি নিজেও অবাক। ‘কিরে তুই বুদ্ধদেবের সাগরেদ হলি কবে?’ মলি পরিস্থিতি সামাল দেবার চেষ্টা করে। অমনি রেশমি ফিতের মত সেই লাইনটা দুলে ওঠে। আমার হাতের কাছে কাগজ কলম নেই। আমার শ্বাস আঁটকে যায় যেন, ‘একটা কাগজ দে!’ কী আশ্চর্য এতোগুলো মানুষ কারো কাছে একটুকরো কাগজ নেই! টিস্যু বক্সের দিকে নজর যায়। অদ্রীশের পকেট থেকে কলম নিয়ে আমি তাতেই লাইনটা লিখি। শব্দগুলো হাই তোলে। তারপর অনিচ্ছায় দাঁড়ায় পাশাপাশি । 

‘মৌন সন্ন্যাসীর দল মগ্নতা ফেরি করে ’ আমি চোখ সরু করে দেয়ালে তাকাই। ‘মগ্নতা ফেরি করে’ কার কাছে? কোথায়? ওরা পেছাতে থাকে এবং দুম করে মিলিয়ে যায়! পাশ থেকে মলি,অদ্রীশ ঝুঁকে দেখতে থাকে আমার কান্ড। ‘কী?’ মলি জানতে চায়। টিস্যুটা আমার হাত থেকে টেনে নেয়। জোরে পড়ে ‘মৌন সন্ন্যাসীরদল মগ্নতা ফেরি করে’ । কী লজ্জা! অদ্রীশ অবাক চেয়ে থাকে। 

মলি ছাড়ে না ‘কী এটা?’ অদ্রীশ হাল্কা করার চেষ্টা করে, ‘কোনো গানের লাইন?’ ‘নাহ্‌ দাদাবাবু’, মলি বলে , ‘যেভাবে কাগজকলম নিয়ে খসখস লিখলো মনে হলো যেন আঙুলে সরস্বতী!’ আমার শাশুড়ি মুখ টিপে হাসেন। আমি ভেবে পাইনা কী বলা উচিত ‘হঠাৎ লাইনটা মনে হলো’। মলি চোখ নাচায়, ‘উহু এত সহজে পার পাচ্ছ না। স্বয়ং সরস্বতী দেবী তোমার জীভ খসে আমাকে এই ছেঁদো বার্তা আচমন করিবার নির্দেশ দিলেও আমি মানিবো না; কদ্যপি নহে।আমাদের সাথে কালিদাসী ঘুরিতেছেন, আমরা তাহার এই রূপান্তরের আঁচ পাইলাম না ইহা কীভাবে সম্ভব?’ আমি মলির দিকে মুগ্ধ তাকিয়ে থাকি কী দারুণ বলছে! পাশাপাশি বড় হলাম, একই বিছানা্‌য়, একই ঘরে, তবুও কত অচেনা আমরা! আমি বললাম, ‘নারে আসলেই লাইনটা হঠাৎই মনে হলো’। 

মদীনা খালা এলে সবাই বাড়ি ফিরে যায়। হঠাৎ সব কেমন সুনসান হয়ে যায়। ভীষণ অস্থির লাগতে থাকে। লেখার জন্যে হাত নিশপিশ করছে যেন। অবাক হয়ে দেখছি সলমা জরির মত শব্দেরা আমার চোখের সামনে চমকাচ্ছে - উন্মুল, থইথই, উর্বী। উর্বী শব্দটা কী সুন্দর! মানে কী? শব্দগুলো আলাদা আলাদা। কেউ ডানদিক থেকে ভাসছে কেউ ডিগবাজী খেয়ে উল্‌টো দিকে যাচ্ছে। এ এক খেলা যেন! আমিও অসম্পূর্ণ সেই লাইনটার পাশেই টিস্যু পেপারের গায়ে শব্দগুলো টুকতে থাকি। মদীনা খালা একবার জিজ্ঞেস করে, ‘মনা কিসু লাগবো?’ আমি বলি, ‘না খালা ঘুম আসলেই ঘুমাবো। জরুরী কিছু জিনিস লিখে রাখছি’। খালা আমার দিকে একবার, টিস্যু পেপারের দিকে আরেকবার তাকায়। কিছু বলে না; কেবল লাইট জ্বালাতে চাইলে আমি মানা করি। খালা আরো চোখ কুঁচকায়। আমি ব্যাখ্যা দি, দরজার তলা দিয়ে বাইরে আলো যাবে; ডিউটি নার্সের নজরে আসবে। আমি ডিমলাইটের নীলাভ আলোয় শব্দগুলো টুকতে থাকি। অনেক শব্দ। আমি ওদের সাথে পেরে উঠি না। ক্রমশ চোখ টানে আমার। ঘুমের গহীনে ঝাঁপাবার আগে দুটো শব্দ আবার ঝিকমিকিয়ে জাগেঃ সাগরকূলে শৈলমূলে। বাহ্‌ বেশ মিল তো! আমার হাত থেকে পেন্সিল খসে পড়ে আমি ঘুমের ভেতর তলাতে তলাতে ভাবি এমন শব্দ রবিকবির সিগ্ন্যাচার, আমার নয়! তখনই বুক ঠেলে কান্না আসে, রেশমি ফিতের সেই লাইনটা কেবল আমার জন্যেই এসেছিল! আমি এক বুক হতাশা নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। 

ঘুম ভাঙে কারো মৃদু ঠেলায়। অনেক দূর থেকে কান্নাটা ভেসে আসে কানে। ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসি। আমার বুক ভারভার লাগে। এ এক অন্য অনুভূতি! চোখে আবছা অন্ধকারটা সইলে দেখি মদীনা খালা মিঠুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পাশে। ‘খুধা লাগসে সোনার। এট্টু খাওয়াও। কুন সময় থেইকা কাঁনতাসে!’ কী মরণ ঘুম আমার! খুব মায়া হয় মিঠুর জন্যে। মদীনা খালা আমাকে শেখায় কীভাবে ওকে খাওয়াতে হবে। আশ্চর্য! মিঠু চুপ হয়ে যায়। আবছা আলোয় আমি টের পাই মিঠু খাচ্ছে। 

তিন দিন পরে আমি বাড়ি ফিরি। কদিন খুব টাইট যায়। শব্দেরা ঘুরছে, ফিরছে, গাল ফোলাচ্ছে তারপর আড়ি দিয়ে পালাচ্ছে। আমি কিছুতেই সবার চোখ এড়িয়ে ওদের খাতায় টুকতে পারছি না। কী কষ্ট! 

ক্লিনিক থেকে ফিরে বাবার কাছে উর্বী শব্দের অর্থটা জেনেছিলাম। উর্বী মানে পৃথিবী। আমি জানতামই না। আমার বিশ্বাস হয় এই শব্দ আমার কাছে বিশেষ কোন দাবী নিয়ে এসেছে। আমি নামকরণের দিনে মিঠুর ডাকনাম পাল্টে দি। মলি গাল ফোলায়, অদ্রীশও। 

নামকরণের পরেই আমার শ্বশুরশাশুড়ি কুমিল্লা ফিরে যান আর অদ্রীশ আগের মত দুই সপ্তাহ পরপর আসার রুটিনে ফের ফেরে। 

উর্বীকে ব্রেস্ট ফিড করাবার সময় যখনই দরজা বন্ধ করি, তখনই শব্দেরা আসে হুড়মুড়িয়ে। ওরা জেনে গেছে এই সময়ই আমার নিজের কাছে থাকার সময়। আমি সবাইকে ধরতে পারিনা। মাঝে মাঝে ফিসফিস কথাও বলি ওদের সাথে। ‘থাম্‌ লিখতে দে’, কেউ থামে, কেউ ভেঙচি কেটে পালায়। স্নান করার সময় সেদিন স্নানঘরে ‘গন্ধাধিবাস’ শব্দটা শাওয়ারের জলে পিছলে নামছিল। ওকে অনুরোধ করি আমার সেই রেশমি লাইনটা খুঁজে আনতে ও মুখ ব্যাজার করে জলে গলে যায়। 

সেদিন উর্বীকে নিয়ে সবে বসেছি মলি ফট করে ঘরে ঢুকে পড়ে নকফক ছাড়াই। ভাগ্যিস আমি তখন আসলেই উর্বীকে খাওয়াচ্ছিলাম! চেয়ারটা টেনে ও আমার মুখোমুখি বসে । ভণিতা ছাড়াই শুরু করে, ‘এইভাবে মুখ লম্বা করে কবিনি ভাব ধরে ঘুরে বেড়ালে বইমেলাতে বই বেরোবে না, তবে বাচ্চাটা একটা ঢেড়স হবে। আরে নতুন মায়েরা কত ছড়া বলে, গান করে, বাচ্চাদের সাথে খেলাধুলো করে আর তুই? একটু পরপর ফট করে ওড়না ঢেকে বাচ্চাকে খাওয়ানো! বাচ্চাটাও হয়েছে ঘুমঘুম আলস্যের বাচ্চা। ড্যাবড্যাব গরুর মত তাকায়! আরে এইটা আমার জান্টুস বোনঝি এমন ম্যান্দামারা লুতুপুতু হলে চলবে?’ ও উর্বীকে টিপেটুপে হাসিয়ে কাঁদিয়ে ছড়া শোনায়। হাত পা একসাথে করে খেলায়। অপরাধবোধ ছুঁয়ে থাকে আমাকে। সত্যি তো আমি কোন ছড়া বলি না, গান গাই না। মা আর মদীনা খালাই করে সেই কাজটা। ভীষণ ছোট লাগে নিজেকে। হঠাৎ মনে হয় মলি নিজে নয় অন্য কারো হয়ে বলছে এসব! হতে পারে অদ্রীশ অথবা মা। 

আচ্ছা আমি কেন এই শব্দ ধাঁধায় আঁটকালাম? আমার কি মানসিক কোন সমস্যা হলো? আমি ঝরঝর করে কেঁদে দি। মলি আমাকে জড়িয়ে ধরে। বলে, ‘তুই যদি কাউকে তোর সমস্যা না বলিস কীভাবে বুঝবো? তুই কি লিখতে চাস? বুঝতে পারছিস না কীভাবে শুরু করবি?’ আমি জবাব দি না। ও বলে যায় ‘তোকে আমরা বুঝতে পারছি না। বাচ্চা কাঁদছে তুই শব্দ টুকছিস। খেতে বসেছিস হঠাৎ উঠে গিয়ে লিখছিস। কেন? দাদাবাবু যেদিন থাকে সেদিন তুই মুখ আঁধার করে ঘুরিস। দুদিন পরে ও বাড়িতে কী অবস্থা হবে তোর? তুই কি ভাবছিস কেউ টের পাচ্ছে না ? মদীনা খালাও টের পাচ্ছে। সেদিন তুই উর্বীকে গামলার জলে বসিয়ে খাতা কলম নিয়ে লিখছিলি। যদি একটা অঘটন ঘটতো?’ আমি আঁতকে উঠি, ‘কখন?’ ‘গত মঙ্গলবার। মদীনা খালা না দেখলে কী যে হত! বাবামা তোর চিন্তায় অস্থির। ঠিক করে বল তো কী হয়েছে তোর?’ আমি ঘামতে থাকি; মঙ্গলবার সত্যি এমন হয়েছে? উর্বী সবে বসতে শিখেছে। আমার তো কিছু মনে পড়ছে না। আমি মলির দিকে তাকাই। আমার মনের আগল হাট করে খুলে যায়। শব্দগুলো দেখাই। বলি সেই পিঁপড়ে হাঁটার কাহিনী। ‘মলি আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি’। মলি আমাকে অনেক্ষণ জড়িয়ে রাখে। ফিসফিস করে বলে, ‘সব ঠিক হয়ে যাবে’। 

পরদিন দুপুরেই ও আমাকে ঘরের মাঝখানে এনে চড়কির মত ঘোরায়। ও ক্লাসে যায়নি। ‘তোকে একজায়গায় নিয়ে যাব। খাতাটা নিবি। লাইনটা অবশ্যই ফিরবে তোর কাছে। তোর এই সংকটের ব্যাখ্যা পেয়েছি’। মলি দু’হাত তুলে নাচের মুদ্রা ধরে , ‘হে ভগিনী, মাতা সরস্বতী তোমার মস্তিষ্কে চাষের ইজারা লইয়াছেন!’

অনেক দিন পর আমি প্রাণ খুলে হাসি। 

ক ত দিন পরে বেরোলাম বাড়ি থেকে! একটা সরু গলির ভেতরে রিক্সা ঢোকে। মলি রিক্সাওয়ালাকে মাঝপথে থামিয়ে ভাড়া মিটিয়ে দেয়। আমার দিকে তাকিয়ে বলে, ‘আর ভেতরে যাওয়া যাবে না’। 

এক মানুষ সাইজের একটা দরজা। সেই দরজা দিয়েই আমরা উলটো দিকে বেরোই। বিশাল এক উঠোন। মলি জানায়, ‘এটা শর্ট কাট’। ঠিক দরজা ঘেঁষে একজন বসা। মলিকে বলে, ‘শফিক ভাইয়ের কাছে আসছ’? মলি সাঁয় দেয়। ‘উপ্রেই আসেন’। 

আমি বললাম, ‘শফিক কে ?’ মলি বলে, ‘সাসপেন্স!’ আমি অবাক হই, ‘তুই এই ঘুপচিতে আসিস?’ মলি হাসে, ‘হ্যা এই ঘুপচিতেই আছে আলোর উৎস!’ উঠোনকে ঘিরে একটা এল প্যাটার্নের সাদা রঙচটা বিল্ডিং। অনেকটা স্কুল ঘরের মত। সার সার লোহার শিক দেয়া জানালা। কোনটাতে কাপড় ঝুলছে, কোনটাতে রশিতে বাঁধা ফুলের টব। এটা বাড়ির পেছন দিক। সামনের দিকটা বড় রাস্তার ওপরে। আমরা ঘুরে সিঁড়ি বেয়ে উঠি। তিন তলার দরজার ওপরে লেখা, ‘মোঃ শফিকুর রহমান, অধ্যাপক(অবসরপ্রাপ্ত) মনোবিজ্ঞান দেওয়ানহাট ডিগ্রি কলেজ’। আমি হতাশ হই। ইনি আমার কী করবেন? দরজায় টোকা দিতেই খুলে যায় ‘আরে মলি চলে এসেছ’! ভেতরে পা দিতেই আমার মন ভালো হয়ে যায়। কী সুন্দর ছিমছাম!দেয়াল জুড়ে এপার ওপার বইয়ের সারি। 

মলি পরিচয় করিয়ে দেয়, ‘শফিক চাচা। ফেলুদার যেমন সিধু জ্যাঠা। আমাদের তেমন শফিক চাচা। সব প্রশ্নের উত্তর আছে ওঁর কাছে’। উনি হাসেন, ‘এটা কি ঠিক মলি?’ উনি জানলা দিয়ে ডাকেন কাউকে, ‘মধু!’ মলি বলে, ‘আপনিই আমার কাছে সব ‘মুশকিল আসান’ চাচা’। আমার দিকে ফিরে বলে ‘সেই যে স্কুলটা আমরা চালাই পথশিশুদের নিয়ে, সেটা চাচার টাকায়। আমরা শুধু শ্রম দি’। এবার চাচার মুখ উজ্জ্বল হয়। ‘হ্যাঁ আমি এটা নিয়ে গর্ব করতে পারি। এইসব ঝলমলে ছেলেমেয়েরা নিঃস্বার্থ সময় দেয়। ওদের মেধার সলতে দিয়ে অধিকারবঞ্চিত শিশুদের মনে আলো ছড়ায়। ওদের এই অর্জনই আমাকে গর্বিত করে’। 

সেই লোকটা যাকে নিচে দেখেছিলাম তিনি আসেন ওপরে। চাচা টাকা বের করেন ড্রয়ার থেকে। মধু ‘মলির সেই পিঁয়াজু আর মুড়ি মাখা এনো আর মশলা চা’। আমি মানা করি, ‘কী দরকার চাচা!’ উনি হাসেন ‘কিছুই না। মলি আমার কন্যা তুমিতো ওর বোন। এবার বল তোমার কথা’। আমি চুপ করে থাকি। উনি জানতে চান, ‘খাতাটা এনেছ?’ 

আমি ব্যাগ থেকে খাতাটা এগিয়ে দি। উনি চোখে চশমা এঁটে পড়েন। পৃষ্ঠা উল্টে আমার রাশিরাশি শব্দের তালিকায় চোখ বোলান, ‘এই যে এতো এতো শব্দ লিখেছ এগুলো কখনো সাজাবার চেষ্টা করেছ?’ ‘নাহ্‌ যা ভেসেছে চোখের সামনে তা টুকে রেখেছি । ওরা এর আগে একবারই সবাই মিলে একটা ফিতের মত লাইন বলেছিল।’ আমি সেই ‘মৌন সন্ন্যাসী’র লাইনটা দেখাই। ‘এটার দুটো শব্দ আর পাইনি খুঁজে’। উনি দেখেন চুপচাপ। ওঁর ধবধবে সাদা চুলের দিকে তাকিয়ে আমার বড় আপন মনে হয়। আমি অজান্তেই বলি আমার যত নাবলা কথা। বলি মা হিসেবে আমার অপরাধবোধ। সময়ের খেই হারিয়ে ফেলা।

উনি চুপচাপ মন দিয়ে শোনেন। আমার বলা শেষ হলে মুখ খোলেন, ‘তোমার যে ব্যাপারটা হচ্ছে এর একটা বৈজ্ঞানিক নাম আছে, ‘হাইপারগ্রাফিয়া’। লেখার অদম্য ইচ্ছে। রাইটারস ব্লক শুনেছো তো?’ ‘না’ আমি মাথা নাড়ি। লেখালেখির কোন টার্মই আমি জানি না। 

‘রাইটার্স ব্লক হচ্ছে সৃষ্টিশীল মানুষের জন্যে সংকটময় পরিস্থিতি। সৃষ্টিশীল ভাবনার গোড়া শুকিয়ে যায় এই সময়। আসলে এটা একধরণের নিউরলজিক্যাল অবস্থা। তারা এই সময়ে লিখতে পারেন না, আঁকতে পারেন না। হাইপারগ্রাফিয়া হলো ঠিক এর উলটো। মানে শব্দেরা তাড়া করে অবিরাম অথবা অজস্র চিত্রকল্প ভাসতে থাকে চোখের সামনে। শুধু যে লেখক বা চিত্রশিল্পীদের হয় তাই নয় যারা বেশি কথা বলেন তাদেরও অনেকটা এই সমস্যা। খুঁটিনাটি কিছুই বাদ দিতে ইচ্ছে হয়না। মনে আছে হুমায়ূন আহমেদের অয়োময়ের সেই লাঠিয়ালের কথা? খুকখুক কাঁশতো তারপর ঘটনার আগে পেছনে সব বিস্তারিত বর্ণনা দিত’। মলি দেখেনি অয়োময়। আমার মনে আছে। ‘ওটাও হাইপারগ্রাফিয়ার উদাহরণ হতে পারে। এইসব আসলে নিউরোলজিক্যাল সিচ্যুয়েশন। সৃষ্টিশীল মানুষদের জন্যে ব্রেনের দুটো অংশ বেশ জরুরী। ফ্রন্ট্যাল লোব যেটা তোমার ব্রেনের সবচে’ সামনে থাকে, সেটা তোমার চিন্তা, চেতনা, আবেগ, বিশ্লেষণ-ক্ষমতা এসব কিছু নিয়ন্ত্রণ করে আর টেম্পোর‍্যাল লোব যা কানের পেছনের দিকে থাকে সেটা তোমার ভাষা, শ্রুতি এবং স্মৃতি এই ডিপার্ট্মেন্টগুলোর নিয়ন্ত্রক। এদের কোথাও কোন গড়বড় হলেই তোমার আচরণে ভাবনায় কিংবা দেখার দৃষ্টিতে পরিবর্তন হয়। অনেক নামীদামী সাহিত্যিক শিল্পীর হাইপারগ্রাফিয়া ছিল। শোনা যায় ফিউদর দস্তোয়ভস্কির ছিল। ভ্যানগগ নাকি প্রতি ছত্রিশ ঘণ্টায় একটা করে ছবি চাপাতেন ইজেলে আর ভাইকে অবিরাম চিঠি লিখতেন। তোমার যা হচ্ছে সেটা এমন কিছু। তবে সময় হারিয়ে ফেলার ব্যাপারটা একটু চিন্তার। এপিল্যাপ্টিক কিছু কিনা নিউরোলজিস্ট জানবেন। আমি তো ডাক্তার নই। কিন্তু শব্দ নিয়ে তোমার অস্থিরতার সমাধানের চেষ্টা করতে পারি। এটা নির্ভর করছে তুমি কী চাও তার ওপরে’। 

আমার মন খারাপ হয়ে যায়। কী যে চাই তাইই তো জানি না। চাচা হাসেন, ‘আরে মেয়ে তুমি তো মুখ লম্বা করে ফেললে। এটা একটা আশির্বাদ হিসেবে নাও। এই শব্দেরা হেসেখেলে তোমার কাছে আসছে তাদের নিয়ে কিছু কর। আচ্ছা এভাবে ভাবো। তোমার মশলাপাতি আছে, মুরগীটাও কুটে ধুয়ে রাখা। এখন যদি তাকে মশলাপাতি মাখিয়ে চুলোতে না চাপাও তবে রান্না হবে কি? কেউ রাঁধতে রাঁধতে শেখে রান্না, কেউ আগে রেসিপি জানে তারপরে কাজে নামে।আবার যা রাঁধছ তার স্বাদ সম্পর্কে আগাম ধারণা থাকা চাই রাঁধুনীর। তবেই বুঝবে কতটা কী দিলে স্বাদু হবে তরকারি। এই শব্দের ব্যাপারটাও তেমন। একে ঠিকঠাক বুঝতে হয় তারপরেই সাজানোর মকশো করার পালা। ওদের ছাঁচে ফেলতে হবে। আবার ঠিক ছাঁচটা বাছার জন্যে কিছুটা পড়াশোনার দরকার। তুমি যেহেতু রেশমি লাইন ভাবছো তাই কবিতাই পড়া উচিত তোমার। এর খুঁটিনাটি নিয়ে ভাবো। দেখবে রেশমি লাইনগুলো রেশম হয়ে তোমার তাঁতের মাকুতে বসে যাচ্ছে অনায়াসে আর তুমি তোমার পছন্দের নকশায় ওদের বুনছো নিজেই’। 

আমার মন থেকে সব ভার ধীরেধীরে উবে যায়। পিঁয়াজু আর মুড়িমাখা সাথে চা খেতে খেতে আরও শুনি চাচার কথা। 

মধু দা’ রিকশা ঠিক করে দেন আমাদের। ফেরার সময় চাচা আমাকে দুটো বই দেন শেল্ফ থেকে। ‘জীবনানন্দের রচনা সমগ্র’ আর রবিঠাকুরের ‘বলাকা’। 

রিকশায় সারা রাস্তা আমি মলির হাত ধরে থাকি। ট্র্যাফিক সিগন্যালে থামলে রিকশাওয়ালার ঠিক মাথার ওপর হঠাৎ ঝিকমিকিয়ে উঠলো ‘হাইপারগ্রাফিয়া’ আর সাথে সাথে লাইনটাও হাওয়ায় দুলে উঠলো,

‘মৌন সন্ন্যাসীর দল মগ্নতা ফেরি করে উদ্‌ভ্রান্ত মুখরতায়’। 




1 টি মন্তব্য:

  1. Ooooof! How does she do it? It's amazing to see ideas and designs piggy-backing on her words moving like a chain of ants as told in this story without ever stumbling like a white-painted palisade but without leaving any clue for the helpless reader. How does she do it?

    উত্তরমুছুন