রবিবার, ২৮ অক্টোবর, ২০১৮

সালেহা চৌধুরী'র গল্প : ভোগ

সময়টা তিরিশের দশকের শেষ আর চল্লিশের দশকের প্রথম। একজন বাঙালি মুসলমান কোলকাতাতে আবগারি বিভাগে দারুণ রকম দক্ষতা দেখাতে শুরু করেন। একে ধরে, ওকে ধরে, কাউকে প্রায় জেলে পুরে কাউকে খালাস করবে বলে টাকা হাতায়। একবার একদল স্মাগলারকে ধরে ফেলেন যাদের ভেতর প্রায় সকলেই সাদা মানুষ। এরপর তাকে খান বাহাদূর খেতাব দেওয়া হয়। তিনি হয়ে যান খানবাহাদুর হাবিব হোসেন খান। তিনি অত্যন্ত ধনসম্পদের মালিক হয়ে যান। ভারতের অনেক জায়গায় তার প্রায় ডজন খানেক বাড়ি, দেশে জমিদারি ও জমি।
সে একেবারে এলাহি কারবার। টাকা যখন আর কোন প্রশ্ন নেই-- তিনি ঠিক করেন এবার দেশে গিয়ে জমিদার হবেন। যেমন জমিদার কেউ দেখেনি। আগুনের মত গরম, পাথরের মত কঠিন। প্রজাদের সবকটাকে বাড়ির চাকর করবেন। এমন এক শুভ ইচ্ছা নিয়ে নিজের গ্রাম সুখসারিতে ফেরত যান। সাপের বুকের মত তিরতিরে নদী কাঞ্চনের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সুখসারি গ্রামে তিনি না আসা পর্যন্ত সকলে সুখে ছিল। 

প্রথম সন্তান হতে গিয়ে স্ত্রী গিয়ে মারা গেলে তিনি আবার বিয়ে করেন। তখন ঠিক করেন যেসব কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা বানিয়েছেন সেগুলো ব্যাংকে রাখবেন। দেশে ফিরে জমিদারি দেখবেন আর জমিদার হয়ে প্রজা শাসন করবেন। জমির আয়, ব্যাংকের সুদ আর ভাবেন টাকায় টাকা আনে কথাটা সত্য করবেন। ডায়নামোতে বিদ্যুত বাতি আর পাখা চলে। মাটির নিচ থেকে পানি ওঠে কলে। সকলে বলে তাঁর সকালের নাশতা আসে কোলকাতা থেকে। কেমন করে? ট্রেনে করে। ফারপোর রুটি আরো নানা কিছু। কিম্বদন্তি এমন -- একবার কোন একজন বিশেষ মানুষ তাঁর বাড়িতে এসেছিলেন। সকালের নাশতার টেবিলে তিনি নাকি বলেছিলেন -- ডিম নাই? সেদিন কোন কারণে ভুলে ডিম ছিল না টেবিলে। বোধহয় ডিম রাখার জায়গা ছিল না। তিনি শুনে বলেন -- কি ডিম নাই? তারপর সারা গ্রামের যেখানে যত ডিম সব মুহূর্তের ভেতরে তার বাড়িতে চলে আসে। তাঁর গর্জন আর হুংকারে সেইদিন সেই গ্রামের প্রতিটি মুরগী নাকি দুইবার করে ডিম পাড়ে। 

সেইকালে দশলক্ষ টাকা দিয়ে বিশাল এক জমিদার বাড়ি তৈরী করেন। যার দাম আজকের দিনে একশো কোটি টাকা কিম্বা তার চাইতেও বেশি। সাদা ও নীল মার্বেলে বাড়িটা সূর্যের নিচে তার এশ্বর্য এর গল্প হয়ে আরো দশগ্রামে ছড়িয়ে পড়ে। ‘হাবিব ম্যানসন’ একেবারে সত্যিই এক ম্যানসন। 

সুখসারি গ্রামে এমন বাড়ি আর কেউ দেখেনি। তিন তলা। ছাদ ঘেরা। সেখানে ব্যাবিলনের শুন্যদানের মত টবের বাগান। দুইজন মালি দিনরাত খেটে সেই শূন্যদানকে স্বর্গ করে। বাড়ির সামনে খোলা মাঠ। সেখানেও বাগান। তিনি বারান্দায় বসে ফর্সি হুঁকো খান আর দেখেন তার কোন প্রজা কি করছে? বেশ চমৎকার একখানা ইজি চেয়ার আছে তার। সেখানে ছোট টেবিলে জর্দা-পান, চা, এবং আরো নানা কিছু সাজানো থাকে। 

ওটা কেরে? আমার বাড়ির সামনে দিয়ে জুতো পরে হাঁটে। ধরে আনতো। 

লোকটাকে ধরে আনা হয়। 

কি নাম তোর? 

সলিম উদ্দিন হুজুর। 

আমি তোদের কে জানিস? 

জানি হুজুর। জমিদার সাহেব। 

আমি তোদের ঈশ্বর। এ কথা সবসময় মনে রাখবি। জমিদার সাহেব! এটা যদি জানিস তাহলে আমার সামনে দিয়ে এমন জুতো পরে যাস কেন? 

হুজুর! লোকটা কি বলবে বুঝতে পারে না। 

শোন এরপর আর কোনদিন আমার বাড়ির সামনে দিয়ে জুতো পরে যাবি না। 

যাব না হুজুর। 

যা মাঠের ভেতর গিয়ে দুই কানে হাত দিয়ে কান ধরে ওঠাবসা কর। এরপর আবার যদি এমন করিস জুতোর মালা পরিয়ে সারাগ্রাম ঘোরানো হবে। মনে থাকবে? 

জি হুজুর। 

লোকটাকে কান ধরিয়ে ওঠাবসা করিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। ও যখন ওঠাবসা করে বাড়ির চাকর সেই ওঠা বসা গোনে। -- হুজুর একশো হয়ে গেছে। 

পাছায় একটা লাথি দিয়ে বিদায় করে দে। 

এমন এক ত্রাসের রাজত্ব চলে তখন সুখসারিতে। কিন্তু কেউ ভয়ে মুখে টুঁ শব্দটি করতে পারে না। তার বাড়িতে প্রতিবাদ, চিৎকার করা, এটা ওটা নালিশের লোকদের ফেলে দেবার পুকুর বানিয়েছেন। যেখানে পিরহানা মাছের এদের শরীরের মাংস টেনে টেনে খায়। সে পুকুরে আরো কিছু আছে। কার ঘাড়ে কয়টা মাথা, কার বুকে দুইখানা কলিজা কিছু বলবে? মাঝে মাঝে লালমুখো সাহেবরা আসে। পার্টি হয়। বাইজিরা গান করে। খান বাহাদুরের ভবিষ্যত আরো পাকা হয়ে যায়। 

এ গ্রামের নাম আগে ছিল পচা গ্রাম। একশো বছর আগে কোন এক মণীষী এই নাম বদলে গ্রামের নাম রেখেছিলেন সুখসারি। কারণ এই গ্রামের প্রকৃতি ও সৌন্দর্যে তিনি মুগ্ধ হয়েছিলেন। সেই গ্রামের নামটাকে ‘হাবিব নগর’ করা যায় কিনা সেটা নিয়েও ভাবেন খান বাহাদুর হাবিব হোসেন খান। গ্রামের সেই ¯িœগ্ধতা একটা প্রচন্ড দাবানলে চলে যেতে বসেছে। দাবানলে পুড়ছে পুরো গ্রাম। কিন্তু কেউ টুঁ শব্দটি করতে পারে না। 

প্রথম স্ত্রী মারা যাবার পর দুই বার বিয়ে করেও তাঁর কোন সন্তান নেই। অবশ্য সেটা তাঁর দোষ নয়, এটা ডাক্তারদেরও অভিমত নয়, কেবল প্রথম স্ত্রীতো প্রমান দিয়ে গেছে। তবে খানবাহাদুর নিজে ঠিক জানেন না প্রথম বউএর ছেলেটা তার কিনা। বোধকরি তাই দাই নাড়ি কাটতে ভুলে যায়, বউ মারা যায়। দ্বিতীয় স্ত্রী কাজের মেয়ে থেকে স্ত্রী হন। সেটাতে তাঁর কিছুটা সন্মানের হানি হয়। দেখা গেল সে বউটাও পেটের অসুখে মরে গেল। -- গরীবের মেয়ে খাবার দেখে লোভ সামলাতে পারেনি। কুত্তার পেটে কি ঘি হজম হয়. এই বলে বলেন -- কবরদে। দেরী করিস না। তারপর বেশ বড়লোকের আই এ পাশ এক মেয়েকে বিয়ে করেন। মেয়ের মামা, চাচারা, ভাইয়েরা, দুলাভাই বেশ সব ভালো ভালো পদে আসীন। কেউ আবার পুলিশ বিভাগে। সে মেয়ে দেখতেও ভালো। কিন্তু তার কোন সন্তান হয় না। -- তুমি জানো দোষ আমার নয়। তোমাকে আরো কিছুদিন দেখব। তারপর? 

আবার বিয়ে করবে? 

বংশ রক্ষার জন্য করতেই হবে। তুমি কি বল? আমার এই অগাধ সম্পত্তি কে খাবে বল? কোন কুকুরবেড়ালের হাতে চলে যায় সেটা আমি চাই না। তুমি পছন্দ করে এই হাবিবকে নওশা সেজে পাঠিয়ে দিও। তবে এখন নয় কামরুণ। আরো পাঁচ বছর দেখব। তারপর বিয়ে। তখন তুমিও থাকবে। সন্তান হলে দুইজন মিলে দেখাশোনা করবে। না তিনি সবসময় এত বেশি অবিবেচক নন। 

কামরুণ কিছু বলে না। কিন্তু স্বামীকে তিনি কতটা ভালোবাসেন কে জানে? তাঁর ভালোবাসার মানুষটি এখনো তার বুকের গভীরে তাবিজ হয়ে আছে। মাঝে মাঝে নাকি এখানে ওখানে তাদের দেখা হয়। খানবাহাদুর কি জানেন না? তিনি অন্য কোন মতলবে চুপ করে আছেন? খানবাহাদুরের সবকিছু সকলে বুঝবে? না তেমন শক্তি কারো নেই। 

সেদিন সকালে ও কোলকাতার নাশতা খেয়ে কামরুণকে বলেন -- বাপের বাড়ি যাবে? -- কামরুণ জানায় -- পরে যাব। একটু সুগন্ধি জর্দায় পান খেয়ে বাইরে বসেছেন। ফালগুন মাস। চারপাশে ফালগুনের বাতাস। দেখছেন কে জুতো পায়ে গেল, কে মাথা উঁচু করে হাটছে। কার মাথায় পাগড়ি। কে উঁচু টুপি পরেছো এইসব। সত্যিকারের জমিদার হয়তো এত কিছু করে না। কিন্তু তিনিতো সত্যিকারের জমিদার নন। একজন চাষাভুষোর ছেলে জমিদারী কিনে জমিদার। কাজেই তার তাপ আর পাঁচটা জমিদারের চাইতে বেশি হবে এতে আর আশ্চর্য কি? তাকিয়ে আছেন। হঠাৎ দেখতে পান একটা সাজানো পাল্কিতে একজন নববধূ চলেছে। স্বামীটি সঙ্গে। সুখসারিতেই থাকে। বউ নিয়ে ফিরছে। সারা মুখে খুশী। 

পাল্কি থামাও। তিনি আদেশ করেন। পাল্কি বরদার পাল্কি মাটিতে নামিয়ে রাখে। তিনি স্বামীকে ডাকেন। এর পর দুইজনে ভেতরের ঘরে আসেন। 

বউ নিয়ে চলেছো? 

জ্বি হুজুর। 

ভালো কথা। কিন্তু আমি তোমাদের জমিদার। তোমাদের ঈশ্বর। দেবতা। 

সেটা তো জানি হুজুর। আপনি আমাদের মা বাবা। ওত বড় পাকা মসজিদ করে দিয়েছেন রাস্তা পাকা করেছেন! হুজুর আপনার দয়ার শেষ নেই। 

এটা তোমরা মানো? তাহলে আমার সঙ্গে ভেতরে চল। কথা আছে। 

এরপর বিশ মিনিট কথা হয়। কি কথা সেসব ওদের ব্যাপার। তবে আরম্ভটা এমন -- 

তুমি ভোগ শব্দটির মানে জানো? 

হুজুর! ভোগ মানে কোন কিছু উপভোগ ------ 

কথা শেষ হয় না। তিনি চিৎকার করে বলেন -- সে ভোগ বলছি না। গ্রামের শেষপ্রান্তে যেসব হিন্দু আছে জানো? 

জানি হুজুর। 

ওরা দেবতাকে ভোগ দেয় সেটা জানো। রান্নাকরে আগে দেবতাকে দেয়। ভালো কিছু আগে দেবতার জন্য। এই দেওয়াকে বলে -- ভোগ। 

জ্বি হুজুর। 

তুমি বউ নিয়ে চলেছো। একটা নতুন জিনিস। সেটা তোমাদের দেবতাকে আগে দেবে না? 

কি বলছেন হুজুর? 

তুমি তো খানিক আগে স্বীকার করলে আমি তোমাদের দেবতা? 

হুজুর! 

বিশ মিনিট পরে সরল লোকটা মাথা নিচু করে বের হয়। -- তোমার বউকে উপহার দেব। সেটা পাবার যোগ্যতা আছে কিনা সেটা আমার দেখতে হবে। সুখসারিতে বউ হয়ে আসার যোগ্যতা আছে কিনা সেটা আমার জানা দরকার। আমি তোমাদের জমিদার। তোমাদের মা বাবা। তোমাদের দেবতা। 

জ্বি হুজুর। 

গ্রামের জমিদার হিসাবে এসব দেখা আমার কর্তব্য। বুঝতে পারছো? 

লোকটি উত্তর দেয় না। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। 

সেদিন রাত বারোটায় নতুন বউটি জমিদার সাহেবের খেদমতে আসে। যেখানে আর কোন তৃতীয় পক্ষ আসতে পারে না। সকালবেলা একটা সোনার চেন আর কয়েকটা শাড়ি দিয়ে তাকে বাড়ি পাঠানো হয়। গজ গজ করে নিজেকে শুনিয়ে বলেন -- শালা আমাকে বউনি করতে না দিয়ে বউ নিয়ে ঘুমাবি তুই? না। তা কি করে হয়? এত বড় মসজিদ এ গ্রামে কবে কোনজন দেখেছে? তারপর ধুলি শূণ্য পাকারাস্তা। মসজিদের পাশে পাকা পুকুর। মেয়েটা মুখ ঢেকে সকালে চলে গেল। এরপর সেই সংসারে কি হলো, বিয়েটা থাকলো না গেল, সেটা দেখা জমিদারের কাজ নয়। তবে তিনি বলে দিয়েছেন -- এসব কথা চাউর করলে যা হবে সেটা ভালো কিছু নয়। আর বউকে নিয়ে সুখে ঘর করবা। আমি দেখেশুনে বুঝতে পারলাম চলবে। এটা তোমার জন্য ভালো। 

কাকাপাখি ডাকার ডাকে নতমুখী বউটা বাড়ি চলে যায়। যারা একটু আধটু ঘটনা পরখ করেছে তারা একেবারে জিভকাটা মানুষের মত চুপচাপ। এসব নিয়ে কথাবার্তা? প্রাণের মায়া কার নাই। 

এই হলো শুরু। ঠিক মানুষ খুন করবার মত। প্রথমটাই কঠিন। এরপর কুমড়ো কাটার মত সহজ। 

এরপর সুখসারিতে কোন নতুন বউ জমিদারের সেবা না করে কি করে বাড়ি যায়? দু একজন এই কারণে গ্রাম ছেড়ে চলে যায়। তবে সকলে চলে যাবে তেমন অবস্থা সকলের নয়। 



খান বাহাদুর হাবিব হোসেন খান এরপর গ্রামে একটা মাদরাসাও করে দেন। বলেন -- দেখ তোমাদের জন্য আমি কি করছি। সভা ঘরে সকলে বলে -- হুজুর আপনি বড় কলিজার মানুষ। 

কেবল বউ কামরুণ একদিন বলে -- আল্লাহ গুনা সহ্য করবে না। 

কিসের গুনা কামরুণ। 

আমার যে বাচ্চাকাচ্চা হয় না সেইসব ওই গুনার ফল। 

কোনসব গুনার ফল? 

কামরুন কোন উত্তর দেয় না। বাবার একশোবিঘার আর্দ্ধেক নিয়ে সে এই সংসারে এসেছে। দুই ভাই পুলিস অফিসার। দুলাভাই জেলা জজ তাকে খান বাহদুর কিছু বলতে চায় না। কিছু পুলিস অফিসার হাতে থাকা ভালো। অনেক কাজে অকাজে পুলিসের দরকার। তারপর তিনি কামরুণকে বলেন -- 

এখন যদি একটা বিয়ে করি তাহলে বাচ্চা ঠিকই হবে। তুমি তো আর একটা বিয়ে করতে দেবে বলে মনে হয় না। কি যেন ভাবে কামরুন। খানবাহাদুর হুইসকি পান করছেন। ওগুলো বাইরে থেকে আসে। কামরুণ ওই খাটে দেয়ালের দিকে মুখ করে শুয়ে আছে। তিনি কয়েক পেগ হুইসকি গিলে স্ত্রীকে অধিকার করেন যেদিন করবার। কামরুণ উঠে বসে। বড় বড় চুলের হাত খোপা বেঁধে বলে -- করেন আপনি আর একটা বিয়া। দেখি কেমন ছেলেমেয়ে হয় আপনার। 

এ নিয়ে বাপ ভাইকে কিছু লাগাবে না তো? 

না। কামুরুণ উঠে পাশের ঘরে চলে যায়। এখন স্বামীর শরীরের চাপ আর মুখের হুইসকির গন্ধ তার পছন্দ নয়। সে একটু পাড়াশুনা করে। আই এ পাশ করে বি এ পর্যন্ত পড়াশুনা ওর। ও এখন যাকে গভীর রাতে ভাববে সে ওর স্বামী নয় অন্যকেউ। একসময় গভীর সম্পর্ক ছিল। এখন ও খানিকটা আছে। এমনি সময়ে সে লোকটাকে ফোন করে। কথা বলে। এ গ্রামে ফোনের লাইন ঠিকমত পাওয়া যায় না। তখন চিঠি লিখে। বাপের বাড়িতে গেলে দেখাও হয়। কামরুন জানে ও চলে এলে একজন দাসী আসে জমিদার সাহেবের পা টিপে দিতে। শরীর ভর্তি মাংস, বুকের স্তন বড় চালতার সমান। গলায় ঝোলে মটরমালা। মুখে পানবাহারি পান। যার একটি মাত্র ছেলে ঢাকায় পড়াশুনা করে। তার গুমোড় আর ঠাটবাট অন্যসব দাসীর মত নয়। সে জমিদারের পেয়ারের একজন। 

একদিন বলেন -- আজকাল গ্রামে বিয়ে শাদি মনে হয় একটু কমে গেছে। মনে মনে ভাবনে কিনা কে জানে সকলে কি বিয়ে করতে ভয় পায়? কেউ অন্য জায়গায় গিয়ে বিয়ে করে? তারপর গ্রাম ছেড়ে চলে যায়। তেমনি এক সময় গ্রামের হিরামিয়া পাশের গ্রামের বানুবেগমকে বিয়ে করেন। ফুটফুটে বানু বেগম। হিরামিয়ার কি কোন কান্ডজ্ঞান নেই? কি জানি কেন যে এমন করে হিরামিয়া। তারপর আবার ‘হাবিব ম্যানসনের’ সামনে দিয়ে যখন পাল্কি চলছে খান বাহাদুর চমশমার কাচ মুছে ভালো করে তাকান। 

যখন তার সেবায় বানু বেগম আসে মুখের ঘোমটা সরিয়ে ফেলার সঙ্গে সঙ্গে প্রায় মুর্ছা যাবার মত অবস্থা হয় তার। নতমুখে বসে ছিল মেয়েটা। যেমন আর সকলে বসে থাকে। তিনি তখন ঘোমটা খুলে মুখ দেখেন। তারপর শরীর। তারপর? সারারাতের অবাধ আনন্দ। এই বানু বেগমের রূপ গা ভরা। সে রাতের পর বানু বেগমকে ছেড়ে দিতে মন চায় না। 

বউকে তালাক দে। পাঁচ বিঘা জমি দেব। সকালে তিনি হিরামিয়াকে বলেন। 

না হুজুর। আপনি আমার বউ আমারে ফেরতে দেন। হুজুর আপনার তো সেবা করেছে এখন আবার আপনি কি চান? একটা মোটা সোনার চেন আর কানের ঝুমকায় বানু বেগমকে আরো সুন্দর দেখায়। বউটা ছল ছল চোখে একবার কেবল স্বামীকে দেখেছে। চোখের ঈশারায় বলেছে আমাকে নিয়ে যাও। চোখের ইশারায় হিরা মিয়া বলেছেন -- ঠিক আছে। ভয় পাইও না। আমি নিয়া যাব। 

তিনি আরো দু একবার বলেন -- আর একটা বিয়া কর। গ্রামে কি মেয়ের অভাব? 

না হুজুর আমার বানুরে আমারে ফেরত দেন। ও আমার কলিজার টুকরা। আমার জীবন। 

তিনি কি ভাবেন। তারপর বলেন -- আচ্ছা তুমি খাওয়া দাওয়া কর। তারপর তোমার বউ তুমি নিয়ে চলে যেয়ো। 

খাবারের পর লোকটার ভেদবমি। তারপর প্রাণ শেষ। তিনি লোকদের ডাক দিয়ে চিৎকার করে বলেন -- শালা হারামজাদা মরার আর জায়গা পেল না। আমার বাড়ির বসার ঘরে মরতে আসছিল। এইসব লোকদের জন্য তার একখানা বৈঠকখানা আছে। সেখানেই ছটফট করতে করতে হিরামিয়া মারা গেল। বানু বেগম তখন খান বাহাদুরের বিশেষ ঘরে ছটফট করছে। ভাবছে কখন সে ছাড়া পাবে। 

এরপর বানু বেগম আর কোথায় যাবে? ছাড়াও পায় না ওর আর কোথাও যাওয়া হয় না। 

কামরুন বলে -- ঠিক আছে বিয়ে কর। আমি বাবার বাড়ি গেলাম। 



বিয়ে হয়ে যায়। ঠিক এক মাস পর বানু বেগম পোয়াতি হয়। খান বাহাদুর স্ত্রীকে জানায় দেখ আমি বলেছিলাম না -- দোষ আমার নয়। 

কামরুন বলে -- ঠিক আছে। ও তখন সেই হ্রদয়ের মানুষ নিয়ে ভালোই আছে। মাঝে মাঝে স্বামীকে দেখতে আসে। এক সুটকেস টাকা নিয়ে চলে যায়। বানু বেগমের ফোলা পেট চোখে পড়ে। ধামার মত একটা বড় পেট নিয়ে ও যখন মাথা নিচু করে ঘুরে বেড়ায় কামরুণ মনে হয় কুকুর বেড়াল দেখছে এমন ভাবে তাকায়। -- মাগি বিয়াবে সেই গুমোরে বাঁচে না। তুই বিয়া। আমি গেলাম। 

আর কামরুন গেলে প্রক্সির জন্য আছে সেই মাংসময়ী মোটরমালার যাদুকরী। একটা বালাও পেয়ে যায় যে না চাইতেই। অন্য জায়গায় কামরুণ ভালোই আছে। 

কিন্তু সাত মাসের পর থেকে বানু একটু সহজ হয়। কেমন যেন খুশী খুশী ভাব। কোন কিছু স্বপ্নে দেখেছে বা কোন গায়েবী আওয়াজ পেয়েছে কিন্ কে জানে। মনে হয় কোন এক কারণে এখানে ও আটকে আছে। কোন একটা কাজ ওকে করাবেন বলে কোন একজন আকাশ থেকে কল টিপছেন। সেটা বানু কেমন করে জানলো কাউকে বলে না। আকাশ থেকে ফোন আসার কোন নিয়ম নেই। টরে টক্কাও কেউ কখনো শোনেনি। তাহলে? দু একবার হিরাকে স্বপ্নে দেখেছে। তবে হিরা তেমন কিছু বলেনি। ধামার মত পেট এখন ডবল ধামা হয়ে গেছে। খানবাহাদুর প্রশ্ন করেন -- মাদি কুত্তার মত কয়টা বিয়াবি তুই? আমি হলাম সিংহ। আমার একখান ছেলের দরকার। তবে যত ইচ্ছা বিয়া খাওয়া পরা নিয়ে ভাবিস না। 

দেখি কয়টা পারি। আপনার ছোলপোলের খায়েশ। 

নথ নেড়ে বলে ও। খান বাহাদুর হাসেন। বলেন আবার -- যে কয়টা পারিস বিয়া। ভালো জাতের জিনিস বিয়াবি। আমি হলাম খান বাহাদুর হাবিবুর রহমান খান। আমার তো টাকার অভাব নাই রে বান্।ু তিনি কি বানুকে একটু ভালোবেসেছেন? কে জানে সে কথা। 

ঠিক নয়মাস পরে একসঙ্গে চারটি মেয়ের জন্ম দেয় বানু। একটা থলিতে একসঙ্গে চারটা মেয়ে বেরিয়ে আসে। যেমন একটা টাকার থলি আছে খানবাহাদুরের। প্রজাদের কাছ থেকে যে থলিতে টাকা আদায় করতে যায় তার পিয়াদা, নায়েব। -- মেয়ে হওয়া সুন্নত। একটা নয় দুইটা নয় চারটা। -- যারা বলে স্তাবকতার জন্য মেডেল পেতে পারে তেমন সব লোকজন। যারা খানবাহাদুরের কথার সমর্থনে সূর্যের ও চাঁদের ওঠা নামার দিক বদলে ফেলতে পারে। বেশ দেখতে মেয়েরা। টিকালো নাক, ফর্সা রং। আর সবগুলোই বাঁচবে বলে যেন জন্মগ্রহণ করেছে কোন এক বিশেষ মকরধ্বজ খেয়ে এই কঠিন পৃথিবীতে নেমে এসেছে। চার কন্যার এমন এই দৃশ্যে কামরূন চলে যায়। আর কখনো আসে না। তবে নিয়মিত খরপোষ পায়। কামরুণের দুই পুলিস অফিসার ভাই আর দুলাভাই জজ বোধকরি সেই কারণ। কামরুণ ভালোই আছে। স্বামী তালাক না দিলেও বেশ মনের মত জীবন যাপন করছে। যে প্রেমিক ওর কথা রাখে এবং অন্য কোন মেয়ের দিকে তাকায় না। 

কিছুদিন পর বোঝা যায় মেয়েগুলো তেমন স্বাভাবিক নয়। কেউ কথা বলে না। কেবল গোঁ গোঁ করে। আর রেগে গেলে হাত পা ছোড়ে। জিনিসপত্র ছোঁড়ে, ভাঙ্গে। তবে সেটা প্রতিদিন নয়। হঠাৎ করে এক একদিন। অপরূপ চারটি মেয়ে। পাশাপাশি সাজিয়ে গুছিয়ে বসালে মনে হয় চারটে পুতুল। বানু সাজায়। ওরা কেবল ওদের শরীর মাকে ছুঁতে দেয়। ওদের আর সবকিছুই স্বাভাবিক। কেবল কথা না বলা এবং এর সঙ্গে আছে আরো একটি জিনিস। সেটা আর কিছু নয় ওদের হাতের নখ গুলো বেড়ালের মত বড় ও বাঁকানো। কেবল বানু সেগুলোকে একটু ট্রিমিং করতে পারে। কিন্তু খুব বেশি নয়। ওরা চায় একটা বিশেষ লম্বাত্ব। তার বেশি আর কাটতে দেয় না। বানু ওদের নাম রেখেছে -- সোনা, রূপা, নীলা,হিরাা। সোনা, রূপা, নীলা, হিরা ঝলমল করে যখন ওদের সাজানো হয়। হয়তো খানবাহাদুর ওদের জন্য একটু মায়া বোধ করেন। তাই যখন রেগে ওরা এটা সেটা ভেঙ্গে ফেলে সেগুলো তিনি নিজে কিনে আনেন। আবার সেগুলো ঠিক জায়গায় রাখেন। 

এমনি করে চারজন চৌদ্দ বছরে পরে। একদিন ওদের লাল শাড়িতে, গয়নাতে, আলতায়,টিপে বানু সুন্দর করে সাজিয়ে একটা বড় খাটে বসিয়ে রেখেছে। ওরা যখন বসে থাকে নববধূর মত মাথা নিচু করে বসে থাকে। একেবারে নতমুখী নববধূর মত। মুখ তোলে যখন রেগে যায়। 

খানবাহাদুর ঘরে ঢোকেন। তিনি তাকিয়ে থাকেন তার চৌদ্দ বছরের মেয়েদের দিকে। হঠাৎ তার সমস্ত শরীর শির শির করে। এদের লাগছে সেইসব নববধূর মত যাদের তিনি ঘোমটা খোলেন। যাদের নথ খোলেন। শরীরের শেষ সুতো খোলেন। তাঁর পা আটকে গেছে ঘরের মেঝেতে। কি যেন বলতে চান তার আগেই চারজন এক টানে ঘোমটা সািরয়ে তার শরীরে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তিনি কারণ জানেন না। এক একজন তাদের লম্বা নখে তার সমস্ত শরীর বোধকরি বিদীর্ণ করে দেবে। 

তার প্রবল চিৎকারে আর্দ্ধেক গোসল ফেলে বানু ছুটে আসে। ছুটে আসে আরো লোকজন। ওদের শরীরে কোন বন্য জন্তুর জোর। বন্য শুকুর না বাঘ কে বলবে? তারপরেও একসময় ওদের ছাড়ানো হয়। 

খান বাহাদুর প্রাণে মারা যান নি তবে তার দুটো চোখ নখের আঘাতে শেষ। সেখান থেকে দর দর করে রক্ত পড়ছে। 

সে চোখ আর ভালো হয় না। বারান্দায় বসে জুতো পায়ে কে গেল, কার মাথায় বিশাল পাগড়ি, কোন পালকিতে নতুন বউ গেল, সেসব আর দেখা হয় না। 

তাঁর ক্ষমতা এখন নিভে যাওয়া সুর্য। বানু প্রাসাদের সর্বময় কর্ত্রী। নায়েবের সঙ্গে বেশ একটু মাখামাখি বানুর। যেদিন মনে হয় মেয়েদের কানে কানে কি যেন বলেন -- চারজন বাবার উপর আবার ঁঝাপিয়ে পড়তে চায়। তারপর শান্ত হয়ে ওঠে। এরা মনে হয় বানুর নিজস্ব একপাল শিকারি হিং¯্র কুকুর। সেটা কেবল খান বাহাদুরের জন্য। অন্য সময় ওরা চুপচাপ। 

মোটা চাবির গোছা পিঠে ফেলে বানু দপদপিয়ে হাঁটে। সোনা রূপা, নীলা, হিরা এমনিতে মন্দ না। খালি খান বাহাদুরকে দেখলে ওদের যে কি হয় কে জানে। বানু হেসে হেসে বলে -- বাপের সঙ্গে এমন করে রে মেয়েরা? বাপরে শ্রদ্ধা করতে হয়। নতমুখী মেয়েরা কথা বলে না। লাল শাড়িতে বানু ওদের সাজিয়ে রাখে। গলায় সোনার চেন। কানে কানপাশা। লাল ফিতের ফুলে বেনীর খোঁপা। খোঁপায় কাঁটা। ঠোঁটে লাল রং। কপালে টিপ। রেশমে জড়ানো বেনি। নতমুখী বধূর মত ওরা বসে থাকে চুপচাপ। বানু অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে হাসে। নিজের ঘর থেকে খানবাহাদুর আর বেরুতে চান না। 

বিশেষ মকারধ্বজ পান করে যারা এই পৃথিবীতে এসেছে তারা কখন যাবে? কেউ জানে না। অ›ততপক্ষে খানবাহাদুর বেঁচে থাকতে তো অবশ্যই নয়।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন