রবিবার, ১০ মার্চ, ২০১৯

রঞ্জনা ব্যানার্জী'র গল্প ভাসান

টুনু পিসিকে শেষমেশ পাওয়া গিয়েছিল। বোসেদের পোড়ো মন্দিরটার ভাঙা সিঁড়ির ধাপে টুনুপিসি কাত হয়ে মরে পড়ে আছে, পাশে গাঢ় খয়েরি রঙের বোতলটা তখনও পিসির আঙুল ছুঁয়ে আছে। আমার দুই কাকু, দাদাভাই, মৃদুলদা – সব্বাই রাতভর তন্ন তন্ন করে সারা গ্রাম চিরুনিখোঁজা খুঁজেছে। কিন্তু বাড়ির পেছনে চোট্টাপাতার জঙ্গলে, প্রায় ‘নেই’ মন্দিরটায় খোঁজার কথা কারুর মনে হয়নি। ওখানে কেউ যায়? তাছাড়া টুনুপিসি তো আর বাচ্চা মেয়ে না!

আমার দাদুর বাড়ির রাখাল রহিম বক্সের ছেলে, কানা শমসু, সক্কালবেলা বাড়ি মাথায় তুলে খবরটা দিল। মিন্টুদা বলে, ও গাঁজাখোর! ওর গাঁজার কল্কে আর নানা জিনিস থাকে মন্দিরের ভাঙা দরজার পেছনে। ছোটকাকু আর মৃদুলদা বাইরের দাওয়ায় বসেই ছিল, শোনামাত্র ছুট। টুনু পিসির মা স্বর্ণ ঠাকুরমা খবরটা শুনেই ‘ওরে আমার টুনু রে-’ বলে সেই যে ফিট হলেন, মেয়ের লাশটাও দেখতে পেলেন না; হাসপাতালেই কাটিয়ে দিলেন ন’দশদিন। লাশ ঘরে ঢোকার আগেই দাদু তড়িঘড়ি ছোটকাকুকে ঢাকা পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। 

আগের দিন রাতে আমাকে আলাদা করে বড়রা অনেক জেরা করেছিল। পুরো পাড়া ফাঁকা ছিল দিনভর। প্রায় সবাই নদীর ঘাটে, ভাসান দেখতে। আমি আর টুনুপিসিও গিয়েছিলাম। আমার মা, তিন কাকিমা, দুই পিসি, ঠাকুরমা, একপাল তুতো দিদি, স্বর্ণ ঠাকুরমা সব্বাই ছিল একসাথে; একই ট্রাকে। টুনুপিসি খুব ভালো শাঁখ বাজায়। মা কাকিমাদের বাতাস কেটে ‘উলুলুলু’র সাথে টুনু পিসির গমগমে গম্ভীর শাঁখ! ঐ ট্রাকে প্রতিমা নেই, তাই আমি উঠি নি। আমি ছিলাম কাকু, দাদাভাই সবার সঙ্গে অন্য ট্রাকে, যেখানে মৃদুলদা মাথা ঝাঁকিয়ে ঢোলের কাঠিতে বোল তুলছিল, ‘ধাঁই গদা ঘাই ঘিজির ঘিজির’, আর টুটুলদা’ কাঁসায় সংগত করছিল, ‘ট্যাং টিটি ট্যাং টিটি’! দাদাভাই আর কাকুরা গলা ফাটিয়ে শোর তুলছিল, “দুর্গা মাঈ কি জয়!” 

প্রতিমার ট্রাকে আমিই ছিলাম একমাত্র মেয়ে। মৃদুলদার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ছিলাম আর ঢোলের তালে তালে দুলছিলাম। সরু গলায় চেঁচাচ্ছিলাম পাল্লা দিয়ে, ‘দুর্গা মাঈকি জয়!’ আমাদের ট্রাকটা ছিল সামনে, মা’দেরটা পেছনে। নদীর বেশ খানিকটা দূরেই পেছনের ট্রাককে ভলান্টিয়াররা থামিয়ে দিল; কেবল প্রতিমার ট্রাক লাইনে থাকবে। আমি দেখতে ছোটখাটো; নয় চলছে, দেখে মনে হয় না। ভলান্টিয়ারদের একজন বলল - এই বাচ্চা যাবে না! দশ বছরের টুটুলদা তখন উদাস চোখে অন্য দিকে তাকিয়ে বাজিয়ে যাচ্ছে, ‘ট্যাং টিটি ট্যাং টিটি’। ও মাথায় অতটা উঁচু নয়, কিন্তু গাট্টাগোট্টা। ভলান্টিয়ারদের আমার হয়ে কেউ বোঝালো না। সবচেয়ে বেশি অভিমান হয়েছিল মৃদুলদা’র ওপর। আমি ঠিক করেছিলাম, বড় হলে মৃদুলদাকে বিয়ে করব; সেই মৃদুলদা আমার নেমে যাওয়া খেয়ালই করল না! মাথা ঝাঁকিয়ে ঢোল বাজাতেই থাকলো! 

ছোটকাকু আমাকে প্যাঁজাকোলা করে মা পিসিদের ভিড়ের দিকে যখন এগোচ্ছে, আমি তখন চারপাশের অত আওয়াজেও স্পষ্ট শুনছি মৃদুলদার ঢোলের বাড়ি, 

‘ধাঁই গদা ঘাই ঘিজির ঘিজির, 

কুর্চি সোনা নেমে গেল’ 

টুটুলদার কাঁসাও হঠাৎ বেশ জোরে বাজছিল, ‘ট্যাং টিটি ট্যাং টিটি, হারু মেয়ে হারু মেয়ে’! 

সবকিছু হঠাৎ কেমন যেন অসহ্য লাগছিল আমার। বাড়ি ফেরার জন্য ভয়ানক কান্নাকাটি শুরু করেছিলাম। 

‘কী ভ্যাতকাঁদরা মেয়ে রে!’ মেজকাকিমার টিপ্পনি শুনে, মা ঠাস্‌ করে আমায় চড় লাগিয়ে দিল। 

চাটগাঁর ভাষায় ‘ভ্যাতকাঁদরা’ মানে ‘ছিঁচকাঁদুনে’। 

তখুনি টুনুপিসি বলল, ‘বউদি আমি রেখে আসি? আমারও ভালো লাগছে না’। 

বাড়িতে দাদু আর বম্মা। বম্মা হ’ল দাদুর একমাত্র বিধবা বোন। বম্মার অনেক বয়েস। চামড়ায় অসংখ্য ভাঁজ। টুটুলদা বলে, ভাঁজের সংখ্যা যত বম্মা’র বয়েসও তত। আমি এক দুপুরে বম্মার বয়েস গুনতে বসেছিলাম। পঁয়ষট্টি পর্যন্ত গুনতে পেরেছিলাম। বম্মার বাঁ গালের ভাঁজ ধরে গুনছিলাম; ভাঁজের মধ্যে ভাঁজ। একটু টেনে চামড়া আলগা করতে চাইলাম, অমনি বুড়ি খনখনে গলায় মা’র ঘুম চটিয়ে দিল, ‘ও দিফতি তোর মাইয়া আঁরে চুঁইডার’! (ও দীপ্তি, তোর মেয়ে আমাকে চিমটি কাটছে)। 

ব্যাস্‌ আমার গোনা খতম! মা কান ধরে হিড়হিড় করে টেনে ঘরে নিয়ে খিল দিয়ে দিয়েছিল। 

সেদিন মা টুনু পিসিকে রিক্সা ভাড়া দিতে দিতে আমার দিকে চোখ গোল করে শাসালো, ‘তুমি যদি কাউকে জ্বালিয়েছ, একটা মারও কিন্তু মাটিতে পড়বে না।’ 

এবারের পুজোয় আমার বাবা আসতে পারেনি। বাবা এলে আমার সাথে এমন করার কেউ সাহসই করতো না! 

টুনুপিসি আমাকে হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরে ভিড় ঠেলে বের করে নিয়ে এসেছিল। বেরুনোর সময় ছোটকাকুকে দেখি বিড়ি ফুঁকছে রিকশাগুলোর কাছে। আমাদের দেখে এগিয়ে এলো। টুনুপিসি কিন্তু দেখেও দেখল না। আমিও না। রিকশায় উঠেই পিসি দুম করে হুড তুলে দিল। আমি ফোঁপাতে ফোঁপাতে শুনছি ছোটকাকু চাপা গলায় বলছে, ‘পম্পা দাঁড়াও!’ টুনুপিসির ভালো নাম পম্পা। টুনু পিসিকে আমার তখন ভীষণ মায়াবতী লাগছিল। আর ছোটকাকুকে? অসহ্য। 

স্বর্ণঠাকুরমা আমার ঠাকুরমা’র দূরসম্পর্কের বোন। এই বাড়িতেই থাকে। পুজোর সময় শহর ছেড়ে সবাই ভিড় করি এখানে; আর সব সামলায় স্বর্ণঠাকুরমা। 

আমি বাড়ি ফিরে দাদুর পাশে শুয়ে পড়েছিলাম। কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়েও পড়েছিলাম। সবাই কখন ফিরল কিচ্ছু জানি না। ছোটকাকুই আমাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে বাইরে নিয়ে এসেছিল। দাদারা সব তখন তারাবাজি ফোটাচ্ছে। ছোটকাকু আমাকেও ধরিয়ে দিল। জিজ্ঞেস করল, ‘টুনুপিসি কোথায় রে?’ আমি কী জানি! জানলেও বলতাম না। 

টুনু পিসির লাশ আমরা ছোটরা দেখি নি। বম্মার ঘরে আটকে রেখেছিল আমাদের। 

একসময় শুনলাম, গা হিম করা ‘বল হরি হরি বোল’। শ্মশানে নিয়ে যাচ্ছে টুনু পিসিকে! বম্মা হঠাৎ ডুকরে কেঁদে উঠল। টুনু পিসির জন্যে এই প্রথম আমাদের বাড়ির কেউ কাঁদল। 

আমার হাতের তালুটা হঠাৎ কেমন গরম মনে হচ্ছিল, ঠিক যেন টুনু পিসির হাতের ওম ধরে আছি। ‘হরি বোল’ নয়, স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিলাম, ‘দুর্গা মাঈ কি জয়’! 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন