সোমবার, ৮ জুলাই, ২০১৯

রঞ্জনা ব্যানার্জী'র গল্প : ফ্রুট ফ্লাই

ঠিক এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে টেবিলটা গোল না হয়ে চৌকোণো হলেই ভাল ছিল, নিদেনপক্ষে লম্বাটে গোল। গোল আকারটা বড় বেশি জমানো। এই যে আমার মুখোমুখি বসে রজত ছুরি-কাঁটা দিয়ে বিলেতি কেতায় অমলেটকে এক্কেবারে জ্যামিতিক শুদ্ধতায় আট টুকরো করলো, কাঁটা-ছুরির সমান্তরাল নড়াচড়া আমি না তাকিয়েই টের পেলাম। ওর গোলমরিচের গুঁড়ো ছড়ানোর শব্দটাও মনে হল আমাকে ভেঙচি কাটছে।
মনে মনে নিজেকে একটা পোক্ত গাল পাড়ি। আজ সব কিছু সুনসান রাখার দিন। অনেক কষ্টে সব গুছিয়ে এনেছি। অনেক কষ্টে নিজেকে বাঁধন মুক্ত করার আনজাম করেছি। এতটা পথ এসে সব কেঁচে যাবে! 

চোখ নামাই চায়ের কাপে। সোনালি লিকার, চিনি ছাড়া লেবু চা! আমার সকালের খাবার। প্লেটে ন্যাতানো লেবুর খোসা। এরই মধ্যে ছোট ছোট ফলের মাছি জড়ো হয়ে গেছে খোসাটা ঘিরে। রজত এখনও খেয়াল করেনি। ও এসব একদম পছন্দ করে না। আমি খোসাদুটো তুলে নিয়ে গারবেজ ক্যানে ঠুসে দি’। রজত মুখ তোলে না। রজত সব সময় টোস্ট, অমলেট,ফলের জ্যুস আর কালো কফি দিয়ে ব্রেকফাস্ট সারে। পাঁচ বছর ধরে একই মেন্যু! ভুল বললাম, আমার আমেরিকা বাসের দিনের হিসেবে পাঁচ বছর দুই মাস তেইশ দিন। আমি ভেতো। ব্রেকফাস্ট আমার ধাঁতে নেই। বেলা না বাড়লে খিধে পায় না। ভাত দিয়ে কাঁচা লঙ্কা ডলে ডিম সেদ্ধ, আলু সেদ্ধ চটকে খাওয়া। মনে হয় সারা জীবন ধরেই এই একটাই মেন্যু আমার! ‘ডিসগাস্টিং!’ রজত একদিন বলেছিল। 

আরেক কাপ লিকার ঢালি। আর তক্ষুণি চোখে পড়ে ছোট্ট পোকাটা। ওর টোস্টের ওপর। প্রায় দেখাই যায় না এমনই ছোট। গাঢ় লাল ক্র্যানবেরি জ্যামে আঁটকে আছে। ফলের মাছি। ফ্রুট ফ্লাই। রজত একটুকরো অমলেট মুখে চালান দেয়। কী যেন হয় আমার! আমি চুপ মেরে থাকি। রজত টোস্টে কামড় বসায়। ঘন ক্র্যানবেরি জ্যাম পোকা সমেত চিবুতে থাকে। আমার পেট গুলিয়ে ওঠে। আমি হুড়মুড়িয়ে সিংকের দিকে ছুটি। ‘কী হল’?’ রজত জানতে চায়। আমি মাথা নাড়ি,‘কিছু না’। ‘হে ঈশ্বর ঘেঁটে দিও না’ মনে মনে অসীমে মাথা ঠেকাই। আমি টের পাই পেছনে রজতের চোখ হাঁটছে। আমার মুখ ভর্তি হয়ে যায় টক জলে। কল ছেড়ে দি’ জোরে। জল ভরতি হয়ে গ্লাস উপচে গড়ায়। আমার ভীষণ নার্ভাস লাগতে থাকে। রজত আরও কিছু বলে কিন্তু আমার কানে যায় না। 

মুখে যা ছিল ঢক করে জল দিয়ে গিলে ফেলি। বুঝি চেয়ার ঠেলে রজত উঠছে। ঘুরে তাকানোর সাহস হয় না। ‘আমি চলে যাচ্ছি’, মনে মনে বলি। রজত কি কিছু বুঝতে পারে? আমি নিঃশ্বাস বন্ধ করে গুনতে থাকি ‘এক মিসিসিপি, দুই মিসিসিপি...’ নাহ্‌, ও দরজা খোলে। আমি এক ঝটকায় ঘুরে তাকাই। দু’দিনের সেমিনারে ও বস্টন যাচ্ছে। তাড়া আছে। আরো দু’জন যাচ্ছে সাথে। একজন প্রফেসর টমাস ডান, আমি বলি টম। অন্যজন সুধা, সুধা পিল্লাই। আমার ‘নিয়তি’! 

ব্যাগটা গতকাল আমিই গুছিয়ে দিয়েছি। ব্যাগ কাঁধে রজত বেরিয়ে যায়। কী আশ্চর্য! একবারের জন্যেও পেছন ফেরে না। হয়তো ‘যাই’ বলেছিল, আমিই শুনতে পাই নি। দরজাটা আমার চোখের সামনেই ধীরে ধীরে উল্টো দিকে টান খায়। আমি অপলক দেখি আমাদের দুজনের মাঝখানের ছয় বছর দুই মাস তেইশদিনের সাতপাকের সম্পর্ক দরজার টানের সাথে ছিঁড়ে যাচ্ছে ভোকাট্টা ঘুড়ির মত। হাতলটা এখনও রজতের মুঠোয়। আমার গা কাঁটা দেয়। ক্লিক আওয়াজটা নিশ্চিত করে, দরজা খাপে খাপ বন্ধ হয়েছে। আমি কান পাতি। রজতের সিঁড়ি ভাঙার শব্দ শুনি। চৌদ্দটা সিঁড়ি। ওপরে ছটা নিচে আটটা তারপর ল্যান্ডিং। 

রজতের সিঁড়ি ভেঙে নামতে কুড়ি সেকেন্ড আর বেয়ে উঠতে পঁয়ত্রিশ সেকেন্ড। ওয়ান মিসিসিপি, টু মিসিসিপি, চৌত্রিশ মিসিসিপি গুনতেই দরজায় চাবি ঘোরানোর আওয়াজ শুনতে পেতাম। প্রতি মিসিসিপি এক সেকেন্ড। রজতই শিখিয়েছে। ইস্‌ মাছিটা রজত টের পেল না! আমার পেটের ভেতর থেকে সব উলটে বেরিয়ে আসে। 

প্রথম প্রথম কী যে একা লাগতো! রজতের আসার সময় হলে ঠিক এখানেই এই জানালাটা ধরে তাকিয়ে থাকতাম। এখান থেকে পার্কিং লট টা’র পেছন দিক ’পষ্ট দেখা যায়। আমাদের পার্কিং স্পট ডানদিকে। বেশ খানিকটা হাঁটতে হয়; জানালা দিয়ে দেখা যায় না। ওর বাড়ির দিকে হেঁটে আসা নজরে এলেই আমি নিঃশব্দে সরে যেতাম। ও জানে না। জানলে কি কিছু অন্যরকম হতো? আমি দেখি রজত মিলিয়ে যাচ্ছে ডান দিকে। ক্রিম শার্ট আর ডার্ক ব্রাউন প্যান্টে আজ ওকে অন্যরকম চৌকস লাগছে। 

শুরুতে দিনের আলো ফিকে হতে লাগলেই কী ভয়ই না পেতাম! জানালা থেকে নড়তাম না। মাঝে মাঝে কল দিতাম ওর সেলফোনে। ওদের ল্যাবের ল্যান্ড ফোনে নয়। ও বিরক্ত হত’; আঁচ পেতাম। কী করুণ ছিল সময়গুলো! ভাষাটা তখনও রপ্ত হয়নি অতটা । কাউকে চিনি না। সারাক্ষণ বন্দি এই দুই বেডরুমের ফ্ল্যাটে। আমি মফস্বলের মেয়ে। নাক সোজা কলেজ গেছি আর বাড়ি ফিরেছি। এদিক সেদিক ঘুরি নি। ডিগ্রী পরীক্ষার পরপরই আমার বিয়ে হয়ে যায়। পরীক্ষার মধ্যেই বিয়ের তারিখ পড়েছিল,মা রাজি হননি। ‘পরীক্ষাটা শেষ হোক!’ মা’র এক কথা। 

পাত্র ছোট পিসির লতায়পাতায় আত্মীয়। আমেরিকায় থাকে। পিএইচডি শেষের পথে। বাবার স্ট্রোক শুনে এসেছে। এক ভাই, দু’বোন। বো্নেরা বড়। বিয়ে হয়ে গেছে। দাবিদাওয়া নেই! আমার ছোট আরো দুই বোন। প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক বাবার কাছে এমন প্রস্তাব তো ঐশীবাণীই! 

আমাকে যেদিন ওদের বাড়ি থেকে দেখতে এল সেদিন বাবার স্কুলের হেডমাস্টার রহিম চাচাও ছিলেন। রহিম চাচা ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ইংরেজি বিভাগে পড়তেন। মুক্তিযুদ্ধে কোন এক অপারেশনে পা হারিয়েছিলেন। পড়া আর শেষ করেননি যুদ্ধ শেষেভিটেতেই ফিরে এসেছিলেন। বিয়ে থা’ও করেন নি। স্কুলটাই ওঁর সংসার। তবে মল্লিক বাড়ির অমলা পিসিকে নিয়ে ফিস্‌ফাস্‌ আছে। অমলা পিসিরা ভিটে ছেড়ে ও পারে চলে গেছেন সে কবেই! 

আমাকে ভীষণ ভালবাসতেন রহিম চাচা। শেক্সপিয়ার আমি রহিম চাচার কল্যাণেই পড়েছি। ছেলের মা যখন আমাকে আঙটি পরাতে ব্যাগের মুখ খুললেন, বাবা মা বোঝেন নি। রহিম চাচা তাঁর উদ্যোগ মাঝপথে থামিয়ে আমাকে প্রায় জোর করে ভেতরে নিয়ে যান । জিজ্ঞেস করেন, ‘তোর মত আছে তো মা?’ এই প্রথম কেউ আমার মত জানতে চাইল। বাবা, এমনকি মাও বিরক্ত হয়েছিল রহিম চাচার এমনতরো ব্যবহারে। আমার আবার মত কী? লেখা পড়ায় তেমন কিছু না কেবল ‘খোমা’! এটা আমার ন’মাসির কথা। মাসতুতো দিদিটা’র ভাল বিয়ে হয়নি। একধরনের ঈর্ষা কাজ করছিল আত্মীয় স্বজনদের মধ্যে। রহিম চাচার জিজ্ঞাসার উত্তরে সেদিন আমি নিজেকে অবাক করে দিয়ে হুহু কাঁদতে থাকি । কোথাও ঘষা কাচের ভেতর থেকে দেখার মত একটা ছবি চোখের জলে ধুয়ে যায়। বট গাছটার নিচে সাইকেলে হেলান দিয়ে প্রতিদিন দাঁড়িয়ে থাকা শ্যামলা মানুষটার আবছা অবয়ব! স্বাক্ষরবিহীন সেই ছোট চিরকূট, “আমি কেবলই স্বপন করেছি বপন বাতাসে”! আমি বিব্রত রহিম চাচাকে বাঁচিয়ে দি’ মাথা নেড়ে। কন্যা দায়গ্রস্ত পিতা দায়মুক্ত হউক! 

আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থা অন্য আত্মীয়স্বজনদের তুলনায় নিচের দিকেই। টেনে টুনে চলার মত। সেই পরিবারের লক্ষ্মী প্যাঁচার এমন অনুপ্রবেশ অনেকেই মানতে পারছিল না। আমিও না। ‘ছেলের বয়েস বেশি’- অতঃপর আরামের ঢেকুর তুলেছিল সবাই বিয়ের দিন। 

বিয়ের এগারো দিনের মাথায় বর চলে যায়। ভাল করে চেনাও হয়নি আমার। তারপর প্রায় পনের মাসে হাতে গোনা ক’টা চিঠি। বেশির ভাগই কেজো কথা; ‘খুব ব্যস্ত’, ‘ল্যাবেই থাকতে হয় প্রায় সারাদিন’, ‘ইংরেজিটা রপ্ত কর’-এইসব। মাঝে মাঝে দুয়েকটা ছবি। ফোন দিত অবশ্য প্রতি শুক্রবার। আমার শ্বশুর শাশুড়ির বেডরুমে ফোন। খুব কিছু বলা যেতো না। শ্বশুর মশাইয়ের শরীরটা তখন খারাপই থাকত প্রায় সময়। 

অবশেষে একবছর তিন মাস পর আমার সেই ‘দিন’ এল। আমেরিকা’র ভিসা মিলল! কবে যাচ্ছি, কবে যাব, এই করে করে সবাই আমাকে এই পনের মাস অস্থির করে ফেলেছিল, এমনকি মা বাবাও! 

প্রায় এক দিনের সফর। লোগান এয়ারপোর্টে যখন প্লেনটা ল্যান্ড করল তখন আমার দু’চোখ ভরে রাজ্যের ঘুম! চোখ টেনে খুলে রাখতে পারছিলাম না। যাত্রাপথের পুরোটাই কিন্তু আমি টানটান ছিলাম। আমার কোন ধারণাই ছিলনা কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স শেষ হতে কতটা সময় লাগতে পারে। সব প্রশ্ন আমি বুঝতেও পারছিলাম না। বিশালদেহী কালো কাস্টম অফিসার যখন ওর কুঁতকুঁতে চোখ আরও সরু করে আমার চানাচুরের প্যাকেট টান দিয়ে নামিয়ে জিজ্ঞাসা করল ‘হোয়াটস দিস?’ একছুট্টে বাড়ি চলে যেতে ইচ্ছে হচ্ছিল। অবশেষে আমার জবরদস্ত দুই স্যুটকেস এবং ছোট বড় আরো গন্ডা কয়েক বাক্সপ্যাটরা ট্রলিতে সামলে এক্সিট সাইন অনুসরণ করে রাজ্যের ‘যদি’ যুক্ত ভারী মাথা নিয়ে যখন লাউঞ্জে পা রাখলাম তখন কেবল একটা মুখই খুঁজছিলাম। 

ও একা আসেনি নিতে। রোড আইল্যান্ড থেকে বস্টন প্রায় দেড় দু’ ঘন্টা’র ড্রাইভ। তখন অতটা ড্রাইভ করতো না, তাই স্যাম ছিল। স্যাম। স্যাম্যুয়েল জন্সটন। আমেরিকান। পূর্ব পুরুষ স্কটিশ। হাত বাড়িয়ে দিল, ‘নাইস টু মিট ইয়্যু’, আমি অপ্রস্তুত; কী করি! বাড়ানো হাতটা তখনও ঝুলছে। রজত বিন্দাস, মাছমুখো। আমি হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে থাকলাম ‘নমস্কার’ শব্দটাও বেরুলো না মুখ দিয়ে। এখনও খ্যাপায় আমাকে স্যাম! তখন কী আর জানতাম এই স্যামই আমার ত্রাতা হবে একদিন! 

স্যামের কথা মনে পড়তেই চোখ জ্বলছে। আমার ফ্লাইট সাড়ে চারটায়। তিন ঘন্টা আগে রিপোর্টিং। এখন সকাল আটটা। ট্যাক্সি ডাকব দশটায়। স্যাম চেয়েছিল পৌঁছে দিতে, আমিই না করেছি। আমি চাই না আমার কারণে ও কোন ঝামেলায় জড়াক। বাড়িতে আমার বাবামাও জানে না। মেজ বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। ওর বরটা ভাল। কেবল ওরা দু’জন জানে । আমি চেক-ইন করে ওদের একটা মেসেজ পাঠাব। তেমনই কথা। ল্যাপ টপ, একটা হ্যান্ড ব্যাগ আর একটা লাগেজ। এই-ই সম্বল। আমার পাসপোর্ট ওর ড্রয়ারে থাকত। ওটা বেশ কসরত করে বের করতে হয়েছে। 

অক্টোবর মাস। গাছের পাতায় রঙ লেগেছে। এই ক’দিন ভাল করে চোখ মেলে দেখি নি। কালের-লিখন বোঝা বড় দায়। একটা আপাত নির্দোষ দিন কীভাবে একটা পুরো জীবন পালটে দেয়! 

মাত্র একদিন আগে আমি প্রেগন্যান্সি টেস্ট করেছিলাম। নিজেই। পজিটিভ! মনটা ফুরফুরে। রজতকে জানাইনি, ও প্রজেক্টের কাজে সেবারও শহরের বাইরে, ফিরতে আরও দিন দুয়েক বাকি। বিকেলে হাঁটতে বেরিয়েছিলাম। পাড়ার ‘নিডস স্টোর’ টা পার হওয়ার সময় মনে পড়ল দুধ শেষ। ঢুকলাম। ফ্রেশ ‘ওকরা’ এসেছে। লোভ সামলানো গেল না। কিনলাম। দাম দিতে কাউন্টারে গেলে মেয়েটা বলল ‘শো কেমন হয়েছিল?’ আমি বুঝি নি। ভাবলাম কোথাও ভুল হচ্ছে। 

-তোমাদের তিন সারি পেছনে ছিলাম আমি। রাজাট এর সাথে ব্রেক এ দেখা হয়েছে। 

-কোথায় বলতো? 

-কেন? বস্টনে! মেয়েটা চোখ উলটায়। ‘ওহ্‌ ইট ওয়াজ সো গুড!তোমরা তো হিল্টনে ছিলে, রাজাট বলছিল। আমরা ফিরে এসেছিলাম। জনি’র পরদিন কাজ ছিল!’ উচ্ছ্বাস উপচে পড়ে ওর। 

আমি হাসি হাসি মুখ করে হিসেব চুকাই। আমার কান ঝাঁঝাঁ করছিল। এই মেয়ের নাম এ্যামি ।ওর বাবা এই স্টোরের মালিক। লেবানিজ। আর মা, ন্যান্সি রজতদের ডিপার্টমেন্টের সেক্রেটারি। আমার সাথে দেখা হয়েছে ক্রিস্টমাস ডিনারে বেশ ক’বার। রজত টেনিউর পাওয়ার পর ডিপার্টমেন্টের সবাইকে যুগলে ডেকেছিলাম। ন্যান্সির বর আসেনি বদলে মেয়ে এ্যামি এল, ইন্ডিয়ান ফুড ওর প্রিয়। আমি ওকে আধা ঘণ্টা ধরে বুঝিয়েছিলাম আমারটা বাংলাদেশী ফুড, ইন্ডিয়ান নয়। 

আমার আর শো এর নাম কী, বৃত্তান্ত কী, জানা হল’ না। চোখের সামনে থেকে পর্দা উঠে যাচ্ছিল ধীরে ধীরে, যেভাবে মঞ্চের পর্দা ওঠে! ঘটনাগুলো অন্য মানে তৈরি করছিল। রজতের কাজের চাপ। কথায় কথায় রাগ! 

আমি কীভাবে স্টোর থেকে বেরুলাম, কীভাবে বাড়ি পৌঁছুলাম কেবল ভগবান জানেন। কোনদিন যা করিনি সেদিন তা করলাম। ওর ড্রয়ার ঘাঁটলাম। ওর জামাকাপড় ঘাঁটলাম। কোথাও কিছু নেই।রাতে ওর ফোন পেলাম। কথা বলতে পারছিলাম না। ‘কী হয়েছে?’, ও বারবার জিজ্ঞেস করছিল। আমি নিজেকে শান্ত রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছিলাম। 

-বাড়িতে সবাই ঠিক আছে তো? 

আমি কী বলি? কোন বাড়ি? ঘুণপোকা তো আমার নিজের ঘরে। আমি টের পেয়েছি মানতে চাই নি। আমি কথার উত্তর দিই না। নিঃশব্দে কাঁদতে থাকি। 

একদিন পর রজত ফেরে। এসেই আমাকে আদরে ভরে দেয় আর আমার গা ঘিনঘিন করতে থাকে। ঠাণ্ডা জলে আওয়াজ তুলে মাঝ রাত্তিরে শাওয়ার নি। রজত বিরক্ত হয়। 

-নিচের তলার বুড়ি কাল ঠিক রিপোর্ট করবে, ও গজগজ করে। 

আমি জানতে দি’ না ওর বীজ আমার শরীরে। অপেক্ষায় থাকি পরদিন সকালের। ও বেরিয়ে যাওয়া মাত্রই আমি ওর ব্যাগ খুলি। প্যান্টের পকেট, প্রতিটা শার্ট তন্নতন্ন করে খুঁজি। অফিস থেকে ফিরলে ওয়ালেটও সুযোগ বুঝে ঘাঁটি। কিছুই নেই। নিজের ওপরে নিজের রাগ হয়। কিন্তু অস্বস্তিটা আমাকে তাড়া করতেই থাকে। 

আমি বাসে কাজে যাই। অনেকটা পথ হাঁটতে হয়। সেদিন বাইরে ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছিল। কোট ক্লজেট থেকে হাল্কা একটা জ্যাকেট টান দি আর তখনই হ্যাঙ্গারে ঝোলানো ওর ফল জ্যাকেটের দিকে নজর যায়। এটা ও বস্টনে যাওয়ার সময় নিয়েছিল। কীভাবে ভুললাম? বুক পকেটে পেয়ে যাই ‘দ্য বুক অফ মরমন’ এর দুটো টিকেট, আর হোটেলের বিল। হিল্টন নয় ডব্লিউ বোস্টন। ডবল বেড। কেমন লাগছিল আমার? থরথর কাঁপছিলাম। সুস্থির হওয়ার পর স্যামকে কল দি। স্যাম আসে লাঞ্চ টাইমে। একই ডিপার্টমেন্ট। ও পোস্ট ডক্টরাল ফেলো। কেন স্যাম? নিজেই জানি না কেন অন্য কারো কথা মনে এল না। স্যাম কিছু বলে না কেবল শুনে যায়। আমি বুঝতে পারি স্যামও কিছুটা আঁচ করেছিল। আমার বলা শেষ হলে ও অনুরোধ করে একটু সময় নিতে, সব ভাল করে ভেবে দেখতে। সরাসরি কথা বলতে। 

এই সাতদিন ধরে সব ভাবলাম; সিদ্ধান্তে এলাম। স্যামকে জানালাম। তারপর সব হুড়োহুড়ি করেই করতে হল। আরেকটা ইমেইল খুললাম। টিকেট বুকিং করলাম নতুন ইমেইল থেকে। এর মধ্যে একদিন সেই সুধা পিল্লাইকেও দেখলাম সুপার স্টোরে। রজতদের প্রজেক্টে পোস্ট ডক হিসেবে যোগ দিয়েছে বছর দুই আগে। আমার বাড়িতে অনেকবার এসেছে ‘ঘর কা খানা’ খেতে। আমি ওর হোমসিকনেস কাটাতে কয়েকবার নিজেও ডেকেছি। রজতের কাছাকাছি বয়েস। খাওয়ার টেবিলেও মাইক্রো-বায়োওলজি কপচাতো। দেখতে আহামরি না হলেও চটক আছে। একদিন রান্নাঘর থেকে কিছু একটা খাবার টেবিলে আনার সময় হঠাৎ টেবিলের নিচে চোখ গিয়েছিল। আড়ং এর লেইসের কাজের টেবিল ক্লথ, ঝুল অনেক। তাও সূক্ষ্ম লেসের ফাঁকে আমি স্পষ্ট দেখলাম ওরা পায়ে পায়ে খেলছে। আমি কাছে আসতেই ‘ডিয়ার-টিক’ আর ‘লাইম ডিজিজ’ নিয়ে জ্ঞানগর্ভ আলোচনা!সুধা চলে যাওয়ার পর রজতকে জিজ্ঞেস করতেই ও আকাশ থেকে পড়ল আর আমি ভাবলাম আমারই ভুল। 

আমার টেক্সি ডাকার সময় হয়ে এল। এ্যাপার্টমেন্ট টা আর একবার ঘুরে দেখি। কিছু ফেলে গেলাম কি? পাসপোর্ট, টিকেটের অনলাইন প্রিন্ট সব ঠিকঠাক। গারবেজ ক্যান পরিস্কার করি। ধুপ কাঠি জ্বালিয়েছিলাম, চন্দন সুবাসের, ঘরটা ম ম করছে। পেটের উপর হাতটা অজান্তেই উঠে আসে। কে জানে ও থাকবে কি না আমার কাছে! জানালা দিয়ে দেখি ম্যাপল গাছটা অকারণে তিরতির পাতা ঝরাচ্ছে। অত হাওয়া নেই আজ। রজত এতক্ষণে পৌঁছে গেছে। ইম্পর্ট্যান্ট সেমিনার। লাইম ডিজিজের ওপর কাজ। সারা রাত কম্পিউটার স্ক্রিনে ঝুঁকে ছিল। বিশাল ফান্ডিং যদি ধরতে পারে। সুধা’র সাথে আলাপ করছিল। সুধাকে ও কীভাবে আদর করে? আমার আবার কান্না পাচ্ছে। খুব সহজে আমি ছাড় দিলাম কি? হেরেই গেলাম? জানতেও দিলাম না যে জেনে গেছি আমি! ট্যাক্সি এসে গেছে। দরজাটা টানতে গিয়ে আবার চোখ যায় ডাইনিং টেবিলটার ওপর। ফের পেট গোলায়। ফ্রুট ফ্লাই টা টের পেল না ও! আমি ধীরেসুস্থে সিঁড়ি ভাঙি। আমার স্যুটকেসটা অত ভারী নয় তাও ভীষণ ভার মনে হয়। 

এয়ারপোর্টে পৌঁছেই ফোন দি স্যামকে। অবাক হয়ে দেখি কথা বলতে বলতে স্যাম আমার দিকেই আসছে। কী যে খুশী লাগে! ওর বাড়িয়ে দেয়া হাত ধরতে যাই। ও ফট্‌ করে নমস্কারের ভঙ্গি করে। আমরা দুজনেই হাসি। প্রথম দেখার কথা মনে পড়ে যায়। অমিল অনেক। লাগেজ কম! আমি একা নই। নেমেছিলাম বস্টনে। আজ আমার রুট ভিন্ন; প্রভিডেন্স থেকে নিউইয়র্ক হয়ে হিথরো তারপর বাংলাদেশ। আর রজত এই মুহূর্তে আমার সেই শুরুর শহর, বস্টনে! 

আমার চেক-ইন এর টাইম হয়। বিদায় নেয়ার আগে হঠাৎ স্যাম আমাকে গাঢ় আলিঙ্গনে বাঁধে। আমার চোখের জলে ওর কাঁধ ভিজে যায়! 

জানালার পাশে সিট। হঠাৎ ভেতরটা ফাঁকা মনে হয়। একুশ বছর বয়েসে আমেরিকায় ঢুকেছিলাম প্রায় সাতাশে ফিরছি । আমি আমার অনাগত শিশুকে মনে মনে বলি, ‘ছেড়ে যেও না।’ প্লেনের নাক উঁচু হয়। আমি চোখ বন্ধ করি। 

ফ্রুট ফ্লাই টা’র কথা ওকে বললেই পারতাম। আমার গাল বেয়ে জল গড়ায়; গড়াতেই থাকে।

২টি মন্তব্য: