শনিবার, ১৮ জানুয়ারী, ২০২০

সালেহা চৌধুরী'র গল্প : কলম-কথা

কবিতা উৎসবে গিয়ে অনিরুদ্ধ সোম দেখে ও একা হাতে লেখে না। লেখে আরো অনেকে। অনেকেই ওকে বলে-- এত আধুনিক তুমি। কমপিউটার ব্যবহার কর না। 

অবশ্যই করি। তবে লেখালেখি হাতে। মনের ভাব মন থেকে হাতে যায়। কলম সেই ভাব লেখে। কমপিউটার আমার কাছে যন্ত্র মনে হয়। তবে একজন সেক্রেটারি জাতীয় লোক আছেন যিনি দরকার মত আমার লেখা কম্পোজ করে দেন।

সেক্রেটারী জাতীয়? না সেক্রেটারী? 

অনিরুদ্ধ সোম বলেন না -- আসলে সেই সেক্রেটারী আর কেউ নয় তাঁর স্ত্রী মেরিনা। সংক্ষেপে মেরু। 

বেশ গেল তিনদিন। এত বড় সন্মেলন আগে কখনো যান নি অনিরুদ্ধ। পুরো ঢাকা, কোলকাতা, জলপাইগুড়ি, শিলিগুড়ি, আগরতলা, বটতলা সবখান থেকে গনগনে লোকজন এসেছে আসরে। আলমগির হাসানের কবিতা বেশ লাগে তার। কবিতাগুলো প্রেমের, বিষাদের, বেদনা, সন্তাপের, আনন্দ ও সুখের কবিতা। তবে সবখানেই একটা সরু বেদনার তার কোন এক আশ্চর্য অনানুকরণীয় সুর তোলে। 

তোমার কাঁধে হাত রাখতেই 

বৃষ্টি! 

আসলে সেদিন ঢাকাতে এক ফোঁটা মেঘ ছিল না। 

এমনি নানা ধরণের অনুভব আর অনুভূতির কবিতা। 

আমি পালাতে চাই তেজপাতা থেকে 

দারুচিনি পাতায়, 

আমি দেখতে পাই 

মসলার কৌটায় তোমার মুখ। 

রাজেন্দ্র কলেজ ফরিদপুর! 

একদিন দুজনে চা পান করতে করতে এমনি সব কবিতা শোনান। আলমগির হোসেন নোট বই খুলে একটার পর একটা কবিতা বাছেন। চা বিস্কুট মুচমুচে শব্দ / কবিতার সুখ। 

অনিরুদ্ধ বলে -- আপনি কি হাতে লেখেন? 

না হলে কিসে? মেসিনে। নানা সেটা আমার ভালো লাগে না। ছয়টা কবিতার বই বেরিয়েছে সবগুলো কলমে। পকেট থেকে কলম বের করেন আলমগির হোসেন। কালো সাধারণ কলমের উপরে সোনালি নামের আদ্যাক্ষর -- আ হা। বলে -- বউ দিয়েছিল এক জন্মদিনে। ওই আ হা লিখেছে কোন একজনকে দিয়ে। কলকাতার কোন এক দোকান থেকে কিনেছিল। পাঁচ বছর হলো লিখছি। এ দিয়েই ছয়টা কবিতার বই বেরিয়েছে। দেদার কবিতা লিখছি। কালি ভরে লেখা যে চল সেটা প্রমান করতে। আবার বাইরোর মত ব্যবহার করাও যায়। কলমটা না জীবন্ত। বাবার কাছ থেকে একটা পার্কার পেন পেয়েছিলাম কালি ভরে লেখা যায়। এখন এইটা। তবে আমি বাইরোর মত ব্যবহার করি। অনিরুদ্ধ সোম বলেন -- স্ন্যাপ। আমিও তাই করি। তবে কালিভরা কলমে নয় নানা সব বাইরো আছে তা দিয়ে। 

অনেকেই তাই করে। ভাব মরে যাবার আগে হাতেই লিখে ফেলে। 

আপনি কি আর কিছু লেখেন? মানে গদ্য? অনিরুদ্ধ প্রশ্ন করেন আলমগিরকে। 

না। কেবল কবিতা। ওই আমার প্রাণ আমার সবিতা। কলম টাকে চুমু খান আলমগির। 

আপনি? 

প্রধানত গদ্য। হঠাৎ কবিতা। কেমন করে যে আমন্ত্রন পেলাম বুঝতে পারছি না। একজন কর্তা ব্যক্তি আমার আত্মীয় উনিই ব্যবস্থা করেছেন বুঝতে পারছি। এরপর আরো কয়েক কাপ চা পান করে, বিস্কুট ডানকিং করে ফিরে যাওয়া যে যার আসরে। 

আসার দিনে হঠাৎ করে অনিরুদ্ধের ছোট গল্পের বই -- ‘হরিৎ মদ’ বইটা একজন এনে ওনাকে সাইন করতে বলে। যা হয় -- পকেটে কোন কলম পান না। আলমগিরকে ওর কলম ধার দিতে বরেন। আলমগির ওর সেই কালো কলমটা অনিরুদ্ধকে দেয়। যেখানে আছে সোনালি অক্ষরে ওর নামের আদ্যাক্ষর। এরপর কে যেন ওকে ডাকে। এরপর আলমগির হাসতে হাসতে সেদিকে এগিয়ে যায়। কলমটা রয়ে যায় অনিরুদ্ধের কাছে। আলমগির এসেছিলেন বালুর ঘাট থেকে। অনিরুদ্ধ ঢাকার। মন খারাপ হয় ওর বউএর সে উপহার -- কালো আর সোনালি কলমটা ওর কাছে থেকে গেল বলে। 

কয়দিন পর মনে মনে ভাবছেন অনিরুদ্ধ সোম একটা গল্প লিখবেন। টেবিলে বসেছেন। লিখতে চাইছেন আলমগির হাসানের কলম দিয়ে। ওমা! কি ব্যাপার? কেবল তো কবিতার পর কবিতা আসছে। গল্পতো আসে না। বিরক্ত হয়ে যান তিনি। আর কবিতা গুলো সব হয়ে গেছে আলমগিরের কবিতার মত। -- জলবুকে বসে আছে মেঘের নুপুর/ আমার একলা দুপুর। তুমি কোথায়/ হাত বাড়াই কোন আশায়? রেগে যান অনিরুদ্ধ সোম। এমন কবিতা তিনি লেখেন না। এরপর যা লিখতে চান সব আলমগির হাসানের কবিতা হয়ে যায়। মানে স্টাইলটা একেবারে একরকম। 

আলমগির বলেছিলেন -- তিনি ঢাকার ‘শব্দালিতে’ কবিতা পাঠাবেন। যথাসময়ে শব্দালি এলে সেখানে আলমগিরের কবিতা দেখা যায় না। লেখা -- ঘোষনা দেওয়ার পরও আলমগির হাসানের শরীর খারাপের জন্য ওঁর কবিতা ছাপানো গেল না। দুঃখিত। দিব্যি ভালোমানুষ আলমগির হাসান। তাঁর আবার কি হলো? একটা দুশ্চিন্তা অনিরুদ্ধ সোমকে পেয়ে বসে। 

কোন এক রেস্টুরেন্টে নোটবুকে কি যেন লিখতে গিয়ে কলমটা সেখানে ফেলে আসেন। ইচ্ছা করে কিনা কে জানে। 

দুই সপ্তাহ পরে শব্দালিতে কতগুলো কবিতা দেখেন। লেখা মেহেরুন নেসা। এই কবির নাম আগে শোনেননি অনিরুদ্ধ সোম। আশ্চর্য তিনটা কবিতা দিয়েছে মেহেরুণ। ঢাকার কবি। মনে হয় সে আলমগিরের ভাবশিষ্য। একই ধরণের কবিতা লিখেছে। সেদিন রেস্টুরেন্টে নীল শাড়ি পরে একজন বসেছিল। সেইকি মেহেরুন। কলমটা ফেলে এসেছিলেন না? এক টুকরো কাগজ আর কলম। 

অনিরুদ্ধ সোম ফিরে পেয়েছেন গদ্য লেখার ভাষা। নিজের কলমে। মনে মনে বলেন -- বাঁচলাম। 

তিনমাস পরে মাস পরে এক কবিতা সমগ্রতে কতগুলো কবিতা দেখেন। লিখেছেন বিপুল রায়ান। সবগুলো কবিতাই আলমগির হাসানের স্টাইলে লেখা। তাহলে মেহেরুন নেসা কি কলম হারিয়ে ফেলেছিল? অনিরুদ্ধ কিছু বুঝতে পারছেন না। এরপর আরো কয়েকবার আলমগিরের কবিতার মত কবিতা চোখে পড়েছে। কিন্তু কোনখানে আর আলমগির হাসানের নিজের লেখা কবিতা দেখেন নি। 

একদিন অনেক খোঁজ করে একটা চিঠি বালুরঘাটে আলমগির হাসানকে পাঠাবেন বলে ঠিক করেন। এক বছর চলে গেছে। ওর বাড়িটার নাম --ছন্দালি। মনে আছে এ নাম। সেখানকার ঠিকানায় একটা চিঠি লেখেন। কলমের কথা বলেন না। লেখেন -- আলমগির হাসান আপনি আর শব্দলিতে লেখেন না কেন? কোন প্রত্র পত্রিকায় আপনার কবিতা দেখি না। টসটসে, মুচমুচে, জলজ, সহাস্য, রোদেলা নানা সব কবিতা। আপনি ভালো আছেন তো? 

খুব তাড়াতাড়ি উত্তর আসে। লেখা -- প্রিয় অনিরুদ্ধ কেবল আপনি একা নন আরো অনেকে চিঠি লিখে জানতে চেয়েছে কেন আমি আর কবিতা লিখি না। বুঝতে পারছি না কবিতা কেন আমার উপর অভিমান করলো? বউ আবার কোলকাতা গিয়ে সেই দোকান থেকে একটা পেটমোটা কলম দিয়েছে। ওকে ‘কিমো’ নিতে মাঝে মাঝে কোলকাতা যেতে হয়। বলে -- সেই রহস্যময় দোকানের কলম। লোকটা জিনিস ব্রিক্রি করতে করতে খালি কবিতা লেখে। আমি সেই কলম দিয়ে কিছু লিখতে গিয়ে বুঝতে পারলাম এ কলম কবিতা লিখবে না। কেবল ভয়ানক সব জ্ঞানের রচনা। জীবনেও ভাবিনি ‘গ্লোবালাইজেসন’ আমি কিছু লিখতে পারব। ‘থার্ড ইকোনমি ইজ ড্রাগ’ এইসব। এইসব ওই পেটমোটা কলমটা আমাকে দিয়ে চলেছে। আমার সেই আ হা লেখা কলমটা কেমন করে যে হারিয়ে গেল বুঝতে পারছি না। 

মাঝে মাঝে লিখবেন। আজকের দিনে কেউ চিঠি লেখে না। যেমন এখন আর কেউ কলম দিয়েও লেখে না। মানুষজন কেমন যন্ত্র হয়ে উঠছে দেখেছেন? বুঝতে পারছি না কবিতা কেন আর আসে না। 

আলমগির হাসান 

স্বস্তি পেলেন অনিরুদ্ধ সোম তিনি যে কলম ধার নিয়েছিলেন উনি তা মনে করতে পারছেন না। কেন কবিতা আসে না? 

হয়ত অনিরুদ্ধ সোম খুব ভালো করে এর কারণ জানে। 




কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন