শনিবার, ১৮ জানুয়ারী, ২০২০

স্বকৃত নোমান' এর সাক্ষাৎকার : পাঠ ও পাঠকৃতি

এমদাদ রহমান : 
কোন লেখক আপনাকে প্রভাবিত করেছেন এবং কীভাবে করেছেন? 

স্বকৃত নোমান : 
লেখালেখির শুরুর দিকে তো আমি নাট্যকার সেলিম আল দীন দ্বারা প্রভাবিত হয়েছি। প্রথম উপন্যাস ‘নাভি’, দ্বিতীয় উপন্যাস ‘বংশীয়াল’-এর ভাষায় তাঁর প্রভাব ছিল। নাভি ও বংশীয়ালের দুটি কপি বাংলাদেশের কথাসাহিত্যিক আহমাদ মোস্তফা কামালকে দিয়েছিলাম। এক বইমেলায় বাংলা একাডেমির মাঠে তিনি বললেন, ‘আপনি সেলিম আল দীনের প্রভাব থেকে বের হন।’
তাঁর পরামর্শটি গুরুত্বের সঙ্গে নিই। পরবর্তীকালে উপন্যাস দুটির দ্বিতীয় সংস্করণে ভাষাকে আমূল বদলে দিই। পরবর্তী উপন্যাসে সেলিম আল দীনের প্রভাব থেকে হাজার মাইল দূরে সরে যাই। এ ছাড়া সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়েছি বাল্মিকী, ব্যাসদেব, ভিক্টর হুগো, গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস ও আখতারুজ্জামান ইলিয়াসে। ‘রামায়ণ’ ‘মহাভারত’ থেকে আমি শিখেছি কীভাবে গল্পের মালা গাঁথতে হয়। এই দুটি মহাগ্রন্থে দেখবেন অসংখ্য গল্প, কিন্তু সবকটি গল্প একটি সুতোয় গাঁথা। উপন্যাসের বিস্তারটা কীভাবে ঘটাতে হয় তা আমি শিখেছি এই দুটি বই থেকে। ভিক্টর হুগোর ‘লা মিজারেবল’ পড়ে জেনেছি একটা চরিত্রের মধ্যে কীভাবে ঢুকিয়ে দিতে হয় দেশ ও কালকে। উপন্যাসটি পড়ার সময় আমার মনে হয়েছিল জাঁ ভলজার সঙ্গে হাঁটছে তৎকালীন ফরাসি দেশের সংস্কৃতি, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ ইত্যাদি। ভিক্টোরিয়ান যুগের উপন্যাস, রুশ ও ফরাসি উপন্যাস পড়ে উপন্যাস বলতে যা বুঝেছি, গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের উপন্যাসগুলো পড়ে সেই বুঝটা ঝুরঝুর করে ভেঙে গেল। যেন আবিষ্কার করলাম উপন্যাসের এক নতুন ধরণ। এখন যে কোনো প্রভাবকে এড়িয়ে চলি। লেখার সময় কোনো মহীরুহ লেখকের প্রভাব সামনে এসে দাঁড়ালে ঠেলে এক পাশে সরিয়ে দিই। এখন আমি সকল ধরনের প্রভাব থেকে মুক্ত। 



এমদাদ রহমান :
এখন কোন বইগুলো পড়ছেন। খাটের পাশের টেবিলে কোন বইগুলো এনে রেখেছেন পড়বার জন্য? 

স্বকৃত নোমান : 
নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে পড়ে শেষ করেছি পশ্চিমবঙ্গের কথাসাহিত্যিক আনসার উদ্দিনের উপন্যাস ‘গো-রাখালের কথকথা।’ শুরুর দিকে খুব ভালো লাগছিল। শিল্পী যেমন রঙ-তুলি দিয়ে গ্রামবাংলার একটা দৃশ্য আঁকেন, আনসার উদ্দিন শব্দ দিয়ে আঁকতে চেয়েছেন। কিন্তু কিছু কিছু জায়গায় লেখকের অসতর্কতা দেখে হতাশ হয়েছি। যেমন ধরুন চতুর্থ পরিচ্ছদে এসে তিনি লিখলেন, ‘...একদিন কাজের কামাই হলে পরদিন উনুনে মেকুর ঘুমায়।’ কী অসাধারণ ইমেজ! আমার মনে পড়ে গেল শৈশবের কথা। আমাদের পাশের বাড়িটি ছিল এক ভিক্ষুকের। ও বাড়ির এক মহিলা গ্রামে গ্রামে ভিক্ষা করত। দিনের পর দিন তার চুলোয় হাড়ি চড়ত না। চুলাটি হয়ে পড়ত বিড়ালের ঘুমানোর জায়গা। আমাদের বাড়ির চুলাতেও দেখতাম বিড়াল ঘুমাতে। কিন্তু এর পরের লাইনে এসে আনসার উদ্দিন লিখছেন, ‘মেকুর মানে হচ্ছে বিড়াল। কোনো বাড়িতে যদি খাদ্য-খোরাকির সংস্থান না হয় তাহলে সে বাড়ির উনুনে তো নিশ্চিন্তে মেকুর ঘুমানোর কথা। আগুন নেই, আগুনের আঁচ নেই, তেমন উনুনই মেকুর ঘুমানোর আদর্শ।’ পড়ে খুব বিরক্তি লাগল। আগের ইমেজটিকে তিনি বরবাদ করে দিলেন। তিনি পাঠককে অশিক্ষিত ভাবছেন। মেকুর মানে যে বিড়াল, তা বুঝিয়ে দিচ্ছেন এবং চুলায় হাড়ি না চড়লে যে চুলায় বিড়াল ঘুমায় তার বিস্তারিত লিখে বোঝাচ্ছেন। কেন? আমরা কি স্কুল-কলেজের পাঠ্যবই পড়তে বসেছি যে, ব্যাখ্য, বিশ্লেষণ, টীকা, টিপ্পনিসহ বুঝিয়ে দিতে হবে? এগুলো হচ্ছে লেখকের দুর্বলতা। আনসার উদ্দিন যদি এসব দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারেন, তবে তিনি সমকালীন বাংলা সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করতে পারবেন। এছাড়া পড়ার সিরিয়ালে রয়েছে পশ্চিম বাংলার লেখক সাদিক হোসেনের গল্পের বই ‘রিফিউজি ক্যাম্প’ ও ‘হারুর মহাভারত’, কার্লেস ফুয়েন্তেসের গল্প, ফিউদর দস্তয়ভস্কির দুই খণ্ডের উপন্যাস ‘ইডিয়ট’। ‘রিফিউজি ক্যাম্পে’র কয়েকটা গল্প পড়েছি। ভালো লেগেছে। 


এমদাদ রহমান : 
এ বইগুলো পড়ার পর কোন বইগুলো পড়বেন বলে ভেবেছেন? 

স্বকৃত নোমান : 
নভেম্বরের শুরুর দিকে কলকাতায় গিয়েছিলাম। অভিযান পাবলিশার্স থেকে কিনে এনেছি শুভংকর গুহ’র ‘শ্রেষ্ঠ গল্প’। অভিযানের প্রকাশক মারুফ হোসেন শুভংকর গুহের খুব প্রশংসা করলেন। বইটি পড়ব। এছাড়া জন বেনভিলের ‘দ্য সী’ উপন্যাসটা পড়ব। গল্পকার মোজাফফর উপন্যাসটির প্রশংসা করেছেন। পড়ার তালিকায় আরো রয়েছে অমর মিত্রের উপন্যাস ‘ধ্রুবপুত্র’, আলীম আজিজের অনুবাদে নাজিম হিকমতের ‘জীবন বড় সুন্দর, ব্রাদার’। 


এমদাদ রহমান :
আপনার প্রতিদিনকার পাঠের অভিজ্ঞতার কথা বলুন। কখন, কোথায় এবং কীভাবে পড়েন? 

স্বকৃত নোমান : 
সবসময়ই আমি অফিসে যাওয়ার সময় বগলে করে একটা বই নিয়ে যাই। স্ট্যান্ডে যখন অফিসের গাড়ির অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকি, তখন পড়ি। বাসে যেতে যেতে পড়ি। অফিসে কাজের ফাঁকে সুযোগ পেলেই পড়ি। বাসায় এখন আর পড়ি না। যতক্ষণ বাসায় থাকি কখনো লিখি, লেখা নিয়ে ভাবি, গান শুনি অথবা সিনেমা দেখি। 


এমদাদ রহমান :
 কোন বইটি আপনার খুব প্রিয়, কিন্তু অনেকেই বইটির কথা জানে না। 

স্বকৃত নোমান : 
এমন বইয়ের কথা বলা আসলে মুশকিল। সব পাঠককে তো আমি চিনি না। যে বইটি পড়ে ভাবছি আমি ছাড়া এ বইয়ের খবর কেউ জানে না, অথচ দেখা গেল আমার আগেই অনেকে পড়ে বসে আছেন। যেমন ধরুন সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের সাক্ষাৎকারের বই ‘কথাবার্তা সংগ্রহ’ পড়ে মনে মনে ভাবছি বইটি সম্ভবত আমি ছাড়া বাংলাদেশের তেমন কেউ পড়েনি। একদিন কবি পিয়াস মজিদকে বললাম বইটির কথা। পিয়াস বললেন, ‘ভালো বই, আমি পড়েছি।’ সৈয়দ হকের একটা উপন্যাস আছে, ‘দ্বিতীয় দিনের কাহিনি’ নামে। খুব প্রিয় একটি উপন্যাস। আমার ধারণা উপন্যাসটি বাংলাদেশের অনেকে পড়েনি। যাদের সাথেই এটি নিয়ে এ যাবৎ কথা বলেছি, কেবল সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ও গল্পকার মোজাফফর হোসেন ছাড়া, সকলের উত্তর―পড়িনি। কিংবা এমনও হতে পারে, এটি যাঁরা পড়েছে, তাঁদেরকে আমি চিনি না। 


এমদাদ রহমান :
কোন বইটি জীবনে একবার হলেও প্রত্যেকের পড়া উচিৎ? 

স্বকৃত নোমান : 
মহাভারত। 


এমদাদ রহমান :
ঔপন্যাসিক, গল্পকার, নাট্যকার, সমালোচক এবং কবিদের মধ্যে এখনও লিখছেন এমন কাকে আপনি সবচেয়ে বেশি শ্রদ্ধা করেন? কেন করেন? 

স্বকৃত নোমান :
বাংলা ভাষার আমার পরিচিত কবিদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি শ্রদ্ধা করি নির্মলেন্দু গুণকে। প্রকৃতই তিনি কবিসত্তার মানুষ। অকপট। ব্যতিক্রম। আর কারো সঙ্গে তাঁকে মেলানো যায় না। পঁচাত্তর পরবর্তীকালে যখন বঙ্গবন্ধুর নামটিও উচ্চারণ করা যেত না, সেই সময় তিনি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লিখলেন ‘আমি আজ কারো রক্ত চাইতে আসিনি’ কবিতা : ...‘সমবেত সকলের মতো আমিও গোলাপ ফুল খুব ভালোবাসি/রেসকোর্স পার হয়ে যেতে সেইসব গোলাপের একটি গোলাপ/গতকাল আমাকে বলেছে, আমি যেন কবিতায় শেখ মুজিবের কথা বলি/আমি তাঁর কথা বলতে এসেছি।’ গুণদা এখনো লিখে যাচ্ছেন। খুবই রসিক মানুষ। তাঁর সঙ্গে কথা বললে মন ভালো হয়ে যায়। আর পরিচিত কথাশিল্পীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি শ্রদ্ধা করি হাসান আজিজুল হককে। তাঁর প্রায় প্রতিটি গল্প, প্রতিটি বই আমার পড়া। আমি তাঁকে বড় গল্পকার মনে করি। ফোনে প্রায়ই কথা হয় তাঁর সঙ্গে। প্রত্যেকবারই তিনি এমন কিছু কথা বলেন, শুনে আমি ঋদ্ধ হই। এছাড়া অপরিচিত, অদেখা লেখকদের মধ্যে শ্রদ্ধা করি ওরহান পামুককে। তাঁকে অনেক বড় মাপের ঔপন্যাসিক বলে মান্য করি। আহা, যদি একবার দেখা পেতাম তাঁর! 



এমদাদ রহমান :
লেখক হিসেবে তৈরি হতে কোন বইটি আপনার মনকে শৈল্পিক করে তুলেছে এবং কীভাবে? 

স্বকৃত নোমান : 
একক কোনো বই নয়, এক্ষেত্রে অনেক বই কাজ করেছে। প্রত্যেক শিল্পীরই একটা শিল্পমন থাকা লাগে। আমার একটা শিল্পমন গড়ে ওঠার পেছনে বিস্তর বইয়ের ভূমিকা রয়েছে। কয়েকটির কথা তো শুরুতেই বলেছি। তেমন অসংখ্য বইয়ের নাম করা যায় যেগুলো পড়ে শিল্পসমুদ্রে স্নাত হয়েছি। যেমন ধরুন ‘শাহনামা’র কথা। পুত্র সোহরাবকে হত্যার পর রুস্তম যখন বিলাপ করে, সেই বিলাপের যে বর্ণানা ফেরদৌসী দিয়েছেন, সত্যি আমি শিল্পস্নাত হয়েছি। মনে হয়েছিল, আহা, জীবনে যদি আমি এরকমভাবে পিতৃবেদনার কথা লিখতে পারতাম! কিংবা ধরুন গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ তাঁর ‘নিঃসঙ্গতার এক শ বছর’ উপন্যাসে যখন হোসে আর্কাদিওর ফেরার বর্ণনা দেন, পড়ে আমার মনে হয়েছিল আমি শিল্পসমুদ্রে ডুবে যাচ্ছি। মনে আছে, পড়তে পড়তে আমি দাঁড়িয়ে গিয়েছিলাম, বইটি পড়ে গিয়েছিল আমার হাত থেকে। আমি কাঁদতে শুরু করলাম। রবীন্দ্রনাথের ‘গীতাঞ্জলি’ ও জীবনানন্দের ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ পড়ে মনে হয়েছিল এই পৃথিবীতে আমি একটি এসাইনমেন্ট নিয়ে এসেছি। আমার কিছু কাজ আছে। সেই কাজগুলো আমাকে করে যেতে হবে। 



এমদাদ রহমান :
কোনো বিশেষ ভাব কিংবা পরিবেশ কিংবা পরিস্থিতি আপনাকে লিখতে বাধ্য করে? 

স্বকৃত নোমান : 
আমি লেখক, লেখাই আমার কাজ। যতই বিরুদ্ধ পরিবেশ হোক না কেন, আমার লেখায় বিঘ্ন ঘটাতে পারে না। গল্প-উপন্যাস আমি কোনো ভাব, পরিবেশ-পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে লিখি না, লিখি স্বতঃস্ফূর্তভাবে। গল্প-উপন্যাসের বাইরে যেসব মুক্তগদ্য লিখি সেগুলো ভাব, পরিবেশ-পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়ে লিখি অনেক সময়। 


স্বকৃত নোমান : 
আপনি কীভাবে আপনার বইগুলোকে গুছিয়ে রাখেন? 

স্বকৃত নোমান : 
আমার বাসায় বইয়ের দুটি আলমিরা, একটি বেতের র‌্যাকে। আলমিরাগুলোর কোন তাকে কী ধরনের বই আছে, আমি জানি। আমার মাথায় সেট করা আছে। প্রয়োজনের সময় হুট করে বের করে নিই। আবার অনেক সময় খুঁজতে খুঁজতে পাই না। তখন বইটা আবার কিনি। অনেক দিন পর দেখা গেল যে বইটি খুঁজছিলাম সেটি চোখের সামনে জ্বলজ্বল করছে। এমন কাণ্ড অনেকবার ঘটেছে। 


এমদাদ রহমান :
শব্দকে আপনি কীভাবে অনুভব করেন? আপনি কি কখনও শব্দের গন্ধ পেয়েছেন? 

স্বকৃত নোমান : 
ওঁ। শব্দই ব্রহ্ম। আবার সেমেটিক মিথে বলা হচ্ছে সৃষ্টির প্রথম শব্দ কুন। মানে, হও। আর শব্দের গন্ধ তো পাই। যেমন ধরুন সৈয়দ মোস্তফা সিরাজের একটি গল্পে গ্রামের সহজল-সরল মানুষ বোঝাতে ‘হেঁদিপেদি’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। এই শব্দটির মধ্যে আমি গ্রামের ঐ মানুষগুলোর গন্ধ পাই। তাদের ঘামের গন্ধ, বাড়ির রান্নাঘরের গন্ধ, তরকারির গন্ধ, লেট্টিনের গন্ধ, গোবরের গন্ধ, পাঁক-কাদার গন্ধ পাই। কিংবা আমার একটা গল্প আছে ‘নিশিরঙ্গিনী’। এই শব্দটায় আমি বেশ্যার গায়ের গন্ধ পাই। কিংবা ধরুন আমার লেখায় যখন ‘সীমান্তরেখা’ শব্দটি কখনো ব্যবহার করি, তখন আমার নাকে টের পাই পৌষের গোধুলিবেলাকার নাড়া পোড়ানোর গন্ধ। মাঝেমধ্যে যখন ঘুমাতে যাই, তখন মাথায় ভেসে ওঠে একটা শব্দ। মনে হয়, উপন্যাসের ঐ চ্যাপ্টারে ঐ শব্দটা না দিয়ে এই শব্দটা দিলে ভালো হয়। সঙ্গে সঙ্গে উঠে শব্দটি টুকে নিই। 


স্বকৃত নোমান : 
সাম্প্রতিক কোন ক্ল্যাসিক উপন্যাসটি আপনি পড়েছেন? 

স্বকৃত নোমান : 
আমার সর্বশেষ পড়া ক্ল্যাসিক উপন্যাস ওরহান পামুকের ‘স্নো’, বাংলা অনুবাদে যা ‘তুষার’। উপন্যাসটি পড়ার সময় মনে হচ্ছিল আমি কার্স শহরে উপস্থিত। পাঠের মধ্য দিয়ে আমি কার্সকে যতটা দেখেছি, কার্সের সমাজ-রাজনীতি-সংস্কৃতি যতটা বুঝতে পেরেছি, মনে হচ্ছিল, ভিসা নিয়ে তুরস্কের ওই কার্স শহরে এক বছর ভ্রমণ করলেও এতটা বুঝতাম কিনা সন্দেহ। প্রায় চার শ পৃষ্ঠার উপন্যাসটি পড়তে পড়তে আমার মনে হচ্ছিল উপন্যাসটি শেষ না হোক...শেষ না হোক। যে অদেখা দুনিয়ায় আমি ঢুকে পড়েছি সেখানে আরও কিছুদিন থাকি, আরও কিছু দিন করিম আলাকুশোলু বা ‘কা’-র কবিতা পড়ি, আরও কিছুদিন সুন্দরী আইপেকের অনিন্দ্য রূপ দেখি, কাদিপের চুলের সৌন্দর্য দেখি, ন্যাশনাল থিয়েটার মঞ্চে কাদিপ ও সুনে জাইম অভিনীত নাটক দেখি, তুরুগুত ভাই-এর পিতৃত্বের স্নেহ দেখি, আরও কিছুদিন খুনের দায়ে অভিযুক্ত ভ্রাম্যমাণ ইসলামপন্থী নীল-এর গুপ্ত কার্যকলাপ দেখি, সেনা অভ্যুত্থানের নায়ক সুনে জাইমের তৎপরতা দেখি, সাংবাদিক সরদার ভাই সম্পাদিত ‘সীমান্ত শহর সংবাদ’ পত্রিকা পড়ি, স্নো প্যালেস হোটেলের খাটে গা এলিয়ে অবিরাম তুষারপাত দেখি, নিউ লাইফ প্যাস্ট্রি দোকানে বসে বাদাম দেওয়া বাঁকানো রোল খাই, রাকি খেয়ে মাতালের চূড়ান্ত হই। মহৎ উপন্যাস এমনই―মনের মধ্যে গেঁথে যায়, ভেতরটাকে নাড়া দিয়ে যায়। মনে হয়, নতুন কোনো জগৎ আবিষ্কার করেছি, নতুন কোনো দর্শন আবিষ্কার করেছি। ‘স্নো’ উপন্যাসের কুশলী বয়ানের মধ্য দিয়ে ওরহান পামুক ধর্মবিশ্বাসের প্রকৃতি নিয়ে অনুসন্ধান করেছেন, আধুনিক তুরস্কের চারিত্র্য বিশ্লেষণ করেছেন, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সম্পর্কের টানাপড়েনের অন্তর্দ্বন্দ্ব খতিয়ে দেখেছেন। উপন্যাসের পটভূমিকে কার্স নামক শহরে স্থাপন করে বর্ণনা করেছেন আসলে আধুনিক তুরস্কের রাজনৈতিক পরিস্থিতি। ব্যবহার করেছেন এমন আঙ্গিক, যে আঙ্গিকের সঙ্গে আমি ইতোপূর্বে পরিচিত ছিলাম না, এই আঙ্গিক আমার কাছে একেবারেই নতুন। এই আঙ্গিক উপন্যাসের বয়নকৌশলের ব্যাপারে আমার ভেতরে এনেছে নতুন ভাবনা। 

পামুক তাঁর ‘দি নাইভ অ্যান্ড দি সেন্টিমেন্টাল নভেলিস্ট’-এ বলেছিলেন, ‘উপন্যাস আধুনিক যুগের মানুষকে সম্বোধন করতে পারে, বস্তুত সমগ্র মানবিকতাকে সম্বোধন করতে পারে, কেননা তা ত্রিমাত্রিক গল্প। তা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলতে পারে, বলতে পারে আমাদের ইন্দ্রিয়লব্ধ জ্ঞানের কথা; একই সাথে তা জ্ঞানের খণ্ডাংশ উপহার দিতে পারে, উপহার দিতে পারে ষষ্ঠেন্দ্রিয়, গভীরতর বিষয় সম্বন্ধে একটি সূত্র।’ কথাগুলো কি তিনি ‘স্নো’ লেখার আগে বলেছিলেন? কে জানে! যখনই বলুন না কেন, মনে হচ্ছিল, উপন্যাস সম্পর্কে তার এই দৃষ্টিভঙ্গির সম্পূর্ণ প্রতিফলন তিনি ঘটিয়েছেন ‘স্নো’তে। এটি এমন একটি উপন্যাস যার একটি শব্দও বাদ দেওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। বেখেয়াল থেকে পড়ে যাওয়ার উপায় ছিল না। কোনো কারণে বেখেয়াল হয়ে পড়লে আবার পড়তে হয়েছে পঠিত পৃষ্ঠাটি। 


এমদাদ রহমান :
‘স্নো’র বাংলা অনুবাদ কে করেছেন? 

স্বকৃত নোমান : 
কলকাতার প্রবীর চ্যাটার্জী। বাংলাদেশের সন্দেশ প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত। ইংরেজি ভার্সনও পাওয়া যায়। ইতিহাস, সংস্কৃতি, সামাজিক মূল্যবোধ, ঐতিহ্য, পরমতসহিষ্ণুতা, জীবন-বাস্তবতা ইত্যাদি নানা বিষয় ওরহান পামুক যে শিল্পকুশলতায় এঁকেছেন, তাতে মনে হয়েছে, তিনি সত্যিকার অর্থেই আধুনিক-উত্তর সময়ের একজন পুরোধা ঔপন্যাসিক। ফকনার, তলস্তয়, দস্তয়ভস্কি, জোলা, হুগো, বোর্হেস, মার্কেজ প্রমুখ ঔপন্যাসিকের কাতারে তাঁর স্থান। 


এমদাদ রহমান :
আপনি যখন একটি বইয়ের কাজ করছেন, লিখছেন, সম্পদনা করছেন, কাটাকাটি করছেন―সেই সময়টায় আপনি কোন ধরনের লেখাপত্র পড়েন? আবার ঠিক এরকম পরিস্থিতিতে কী ধরনের লেখা আপনি এড়িয়ে চলেন? 

স্বকৃত নোমান : 
এ সময় সাধারণত আমি ক্ল্যাসিক গল্প-উপন্যাস ও কবিতা পড়ার মধ্যে থাকি। বিশেষ করে বাংলা ভাষার কবিদের কবিতা পড়ি বেশি। যেমন ধরুন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জীবনানন্দ দাশ, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শঙ্খ ঘোষের কবিতা পড়ি। সেই রকম উচ্চমার্গীয় না হলে বিদেশি সাহিত্য খুব একটা পড়ি না। কোনো গল্প-উপন্যাসের অনুবাদ তো নয়ই। অনুবাদ পড়লে মনে হয় আমি ভাষার যে ফ্লো-টার মধ্যে আছি সেটা নষ্ট হয়ে যাবে। একই কারণে প্রবন্ধ, ইতিহাস, দর্শন ও সাহিত্যতত্ত্বের বই থেকে এক শ হাত দূরে থাকি। দৈনিক পত্রিকা তো ছুঁয়েও দেখি না। 



এমদাদ রহমান :
আপনি কোন ধরনের লেখা পড়তে আগ্রহ বোধ করেন, আর কোন ধরণটি এড়িয়ে চলেন? 

স্বকৃত নোমান : 
ইতিহাস, দর্শন, রাজনীতি, কবিতা, আত্মজীবনী, স্মৃতিকথা, সাহিত্যতত্ত্ব পড়তে পছন্দ করি। সায়েন্স ফিকশন, গোয়েন্দা কাহিনি, আধ্যাত্মিক বিষয় নিয়ে বইপুস্তক এবং ধর্মীয় বইপুস্তক এড়িয়ে চলি। পড়তে ইচ্ছে করে না। অর্থনীতি বিষয়ক বই আমার একদমই পড়তে ইচ্ছে করে না। 


স্বকৃত নোমান : 
আপনার জীবনে উপহার হিসেবে পাওয়া শ্রেষ্ঠ বই কোনটি? 

স্বকৃত নোমান : 
আমাকে কেউ ভালো বই খুব একটা উপহার দেয় না। প্রচুর বই উপহার পাই। আমার ঠিকানায় ডাকে/কুরিয়ারে আসে, কিংবা অনেকে এসে দিয়ে যায়। সেগুলোর কয়েক পাতা পড়ে হতাশ হয়ে রেখে দিই। বছর শেষে কোনো পাঠাগারকে দিয়ে দিই। তবে, যতটা মনে পড়ে, একবার আজিজ মার্কেট থেকে সন্দ্বীপন চট্টোপাধ্যায়ের দুই খণ্ডের ‘গল্প সমগ্র’ কিনে দিয়েছিলেন আমার বন্ধু কবি ও চলচ্চিত্রকার মাসুদ পথিক। আরেকটা বই উপহার দিয়েছিল আমার বন্ধু কবি অঞ্জন আচার্য, সন্দীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ছেচল্লিশের দাঙ্গা’। ছোট্ট একটি বই। কিন্তু পড়ে নড়ে গিয়েছিলাম। 


এমদাদ রহমান :
ছোটবেলায় কেমন বই পড়তেন? সেই সময়ে পড়া কোন বই এবং কোন লেখক আপনাকে আজও মুগ্ধ করে রেখেছে? 

স্বকৃত নোমান : 
ছোটবেলা তো ধর্মীয় বইপুস্তক পড়েই কেটেছে। পাশাপাশি পড়েছি পারস্য কবি ওমর খৈয়াম, জালালুদ্দিন রুমি, হাফিজ, শেখ সাদী, শেখ ফরিদ উদ্দিন আত্তারের কাব্য। রুমির ‘মসনবি’তে এখনো আমি মুগ্ধ। আরেকটি বইয়ের কথা এখনো ভুলতে পারি না। দশ-এগার বছর বয়সে, আমার জন্মগ্রামের আবদুল কাইয়ুম নামে এক বড় ভাই ‘শীত-বসন্ত’ নামে ছোটদের একটি গল্পের বই আমাকে পড়তে দিয়েছিলেন। লেখকের নাম মনে নেই। বইটি পড়ে কিশোরমনে মনে দাগ কেটে গিয়েছিল। সেই বইয়ের গল্পটি এখনো মনে আছে। পরবর্তীকালে বইটি অনেক খুঁজেছি, কোথাও পাইনি। ২০০৮ সালের দিকে শ্রীদীনেশচন্দ্র সেন সঙ্কলিত ও সম্পাদিত ‘পূর্ববঙ্গ গীতিকা’র পাঠ শুরু করি। চতুর্থ খণ্ডে কমল সদাগরের পালাটির সঙ্গে শীত-বসন্তের গল্পের মিল খুঁজে পাই। পালার শুরুতে দীনেশচন্দ্র সেন লিখিত ভূমিকার মাধ্যমে জানতে পারি কমল সদাগরের পালাটি সেই শীত-বসন্তেরই রূপান্তর। সেদিনই প্রথম ‘পূর্ববঙ্গ গীতিকা’র পালাগুলোকে ছোটদের উপযোগী করে সংক্ষিপ্ত গল্পরূপ দেওয়ার ভাবনাটি আমার মধ্যে জারিত হয়। কারণ ‘পূর্ববঙ্গ গীতিকা’র পালাগুলো আঞ্চলিক ভাষায় রচিত। ছোটদের পক্ষে এই ভাষা বোঝা কষ্টসাধ্য। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বড়দের পক্ষেও। নানা ব্যস্ততার কারণে কাজটি করা সম্ভব হচ্ছিল না। ২০১৮ সালের জুনের শুরুর দিকে আলমিরা থেকে ‘পূর্ববঙ্গ গীতিকা’ বের করে আবার পড়তে শুরু করি। আটাশটি পালা নির্বাচন করে শুরু করি লেখা। ‘ছোটদের পূর্ববঙ্গ গীতিকার গল্প’ নামে বইটি প্রকাশ করেছে বাংলাদেশের রোদেলা প্রকাশনী। 


এমদাদ রহমান :
এ পর্যন্ত কতগুলো বই অর্ধেক কিংবা পড়া শুরু করে শেষ না করেই ফেলে রেখেছেন? 

স্বকৃত নোমান : 
অসংখ্য বই। গোণাগুনতি নাই। যেমন ওরহান পামুকের ‘মাই নেম ইজ রেড’ বইটি আমি বারবার চেষ্টা করে অর্ধেকটাও পড়তে পারিনি। কালকূটের ‘কোথায় পাব তারে’ অর্ধেক পড়ার পর মনে হয়েছে আর পড়ার দরকার নাই। অরুন্ধতী রায়ের ‘দ্য মিনিস্ট্রি অব আটমোস্ট হ্যাপিনেস’ অর্ধেকটা পড়ে মনে হয়েছে এই বই আমার জন্য লেখা হয়নি, আমি যে ধরনের উপন্যাস পড়তে পছন্দ করি এটি তা নয়। দেবেশ রায়ের ‘তিস্তাপুরাণ’ অর্ধেক পড়ে বিরক্ত হয়ে রেখে দিয়েছি। মাঝেমধ্যে পাতা ওল্টাই, পড়ার চেষ্টা করি, কিন্তু ঘুম পায়। আর পড়া হয় না। গোলাম মুরশিদের ‘হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি’ এক তৃতীয়াংশ পড়ে মনে হয়েছে বাকিটা আমি জানি। ইয়স্তাইন গোর্ডারের ‘সুফির জগত’ কয়েক পাতা পড়ার পর মনে হয়েছে কী পড়ব? সবই তো জানি, সবই তো আগের পড়া, নতুন কিছু তো দেখছি না। এরকম অসংখ্য না-পড়া বই আছে। আমি তো প্রচুর বই কিনি আর প্রচুর বই ফেলে দিই। ফেলে দিই মানে কাউকে বা কোনো পাঠাগারকে দিয়ে দিই। একবার একটা বই রাগ করে আগুনে পুড়িয়ে দিয়েছিলাম। এত বাজে লেখা। 


স্বকৃত নোমান : 
কোন বইগুলোয় আপনি নিজেকে খুঁজে পেয়েছেন? 

স্বকৃত নোমান : 
সৈয়দ মুস্তফা সিরাজের ‘অলীক মানুষ’ পড়ে আমি যেন নিজেকে খুঁজে পেয়েছি। বদিউজ্জামানকে মনে হয়েছে আমার বাবা। শফি, ছবি বা ছবিলালকে মনে হয়েছে যেন আমি। যেন আমার কথাই লিখেছেন মোস্তাফা সিরাজ। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘খোয়াবনামা’ পড়ে মনে হয়েছিল আমিই যেন তমিজ। আমি আসলে বারবার মহাকাব্য আর মহাউপন্যাসের কাছে ফিরে যাই। মহাকাব্য আর মহাউপন্যাস্যের মধ্যেই খুঁজে পাই নিজেকে। মনে হয় ওটাই আমার জগত। 


স্বকৃত নোমান : 
মহাউপন্যাস বলতে...? 

স্বকৃত নোমান : 
যেমন ধরুন তলস্তয়ের ‘ওয়ার এন্ড পীস’, মিখাইল শলোখোভের ‘প্রশান্ত দন’, অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ট্রিলজি, গুন্টার গ্রাসের ‘টিন ড্রাম’। 


এমদাদ রহমান :
কোন বইগুলো জীবনে বারবার পড়েছেন এবং আরও বহুবার পুনর্পাঠ করবেন? 

স্বকৃত নোমান : 
‘গীতা’ ও ‘উপনিষদ’ আমি একাধিকবার পড়েছি। জীবনানন্দের ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ যে কতবার পড়েছি হিসাব নেই। আবার পড়ব। হোর্হে লুইস বোর্হেসের গল্পসমগ্র আবার পড়ব। মৃত্যুর আগে কালীপ্রসন্ন সিংহ অনূদিত দুই খণ্ডের ‘মহাভারত’ আবার পড়ার ইচ্ছে আছে। 


এমদাদ রহমান :
লেখালেখির নিরন্তর প্রক্রিয়ার সঙ্গে কীভাবে একাত্ম থাকেন? 

স্বকৃত নোমান : 
আমার গুরু আমাকে প্রায়ই বলতেন, তোমার মাথাটাকে ডান-বাম দুই ভাগে ভাগ করে নাও। ডানের অংশে রাখবে দৈনন্দিন বিষয়াবলি। যেমন চাকরি, সংসার, সন্তান, হাটবাজার, আড্ডা, মুদি দোকান, বার, চা-দোকান ইত্যাদি এবং বাঁয়ের অংশে রাখবে জ্ঞান। এই অংশটি তোমার লেখকসত্তার জগত। এখানেই তোমার অধিবাস। এই অংশটি হবে সংরক্ষিত এলাকা। দৈনন্দিনতার প্রবেশ এখানে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এই সংরক্ষিত এলাকার সঙ্গে প্রকৃতির একটা সরাসরি সংযোগ থাকবে। এখানে নদ-নদী, সপ্ত সমুদ্র, বিস্তৃত আকাশ আর আদিগন্ত ভূমি থাকবে, পাহাড় অরণ্যও থাকবে, অযুত-নিযুত পাখির কলতান থাকবে, আর থাকবে জীবনের সব অভিজ্ঞতার নির্যাস। পার্থিব জটিলতাগুলো তোমাকে যখন আঁকড়ে ধরতে চাইবে, ঝটপট তুমি মাথার ডানের অংশের দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে বাঁয়ের অংশে ডুব দেবে। দেখবে, সাধারণদের মতো পার্থিব গ্লানি তোমাকে তেমন স্পর্শ করতে পারবে না। এবং মধ্যরাতে কিংবা শেষ রাতে, স্থাবর-জঙ্গম যখন নিশিঘুমে থাকে, ডানের অংশের দরজাটা তুমি বন্ধ করে দেবে এবং খুলে দেবে বাঁয়ের অংশটা। যদি এই সাধনা চালিয়ে যেতে পার, তবে তুমি কলমের খোঁচায় স্বর্ণখনি আবিষ্কার করতে পারবে। প্রকৃতির বহু গোপন রহস্য তোমার কাছে ধরা দিতে থাকবে। ক্রমে তুমি হয়ে উঠতে থাকবে ক্ষমতাসম্পন্ন একজন ঔপন্যাসিক। আমি সবসময় পার্থিব ক্ষুদ্রতাগুলোকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করি। যে মানুষটির সঙ্গে আমার বনিবনা হবে না বলে মনে করি, তাকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করি। সবসময় শিল্পের জগতে থাকার চেষ্টা করি। এ বিষয়ে আমার স্ত্রী-কন্যাও আমাকে বিশেষ সহযোগিতা করে। তারা আমাকে বিরক্ত করে না। 


এমদাদ রহমান :
কে সেই লেখক যাকে আপনি পাঠ করেন গভীর আনন্দের সঙ্গে, যিনি আপনার ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেন? 

স্বকৃত নোমান : 
গভীর আনন্দের সঙ্গে পাঠ করি রবীন্দ্রনাথ ও জীবনানন্দ। যতবারই পাঠক করি, মনে হয় নতুন কিছু পাচ্ছি। 


এমদাদ রহমান :
গল্প লিখতে শুরু করেন কীভাবে? একজন রিপোর্টারের মতোই কি আপনি চারপাশটাকে অবিরাম পর্যবেক্ষণে রাখেন? আপনি কি নোট নেন? 

স্বকৃত নোমান : 
রিপোর্টারের মতো পর্যবেক্ষণ করি না। আজকালকার বাংলাদেশের রিপোর্টাররা পর্যবেক্ষণ করে না। তাদের অধিকাংশই মারিং-কাটিং সাংবাদিক। কেউ ঘটনার গভীরে যেতে চায় না। অনুসন্ধানী প্রতিবেদন আজকাল চোখে পড়েই না বলতে গেলে। বলতে পারেন, আমি একজন গোয়েন্দার মতো চারপাশটা পর্যবেক্ষণ করি। ধরুন একটি খুনের ঘটনার কোনো কিনারা পাচ্ছে না পুলিশ। কিনারার দায়িত্ব দেওয়া হলো একজন গোয়েন্দাকে। ক্লু উৎঘাটনের জন্য তিনি যেভাবে অবিরাম পর্যবেক্ষণ করে যান, আমিও ঠিক সেভাবে পর্যবেক্ষণ করি। কিন্তু কোনো নোট নিই না। নোট নেয়া সাংবাদিকের কাজ, গবেষকের কাজ, ঔপন্যাসিকের নয়। উপন্যাস লেখা হয় অভিজ্ঞান থেকে। পর্যবেক্ষন করে তথ্যগুলোকে মাথার ভেতর জমা করি। কিছু তথ্য হারিয়ে যায়, কিছু থেকে যায়। থেকে যাওয়া তথ্যগুলো পচে-গলে গেজানো মদের মতো হয়ে যায়। লেখার সময় অলৌকিক পাখির মতো সেগুলো বেরিয়ে আসে। 


এমদাদ রহমান :
লেখালেখির সবচেয়ে কঠিন দিক হিসেবে কোনটিকে চিহ্নিত করবেন? 

স্বকৃত নোমান : 
উপন্যাস লেখার ক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত চরিত্রগুলোর পেছনে লেগে থাকা। ঠিক ঠিকভাবে ফুটিয়ে তোলা। কাহিনিটাকে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবিন্দু পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া। 


এমদাদ রহমান :
আপনাকে ধন্যবাদ।

স্বকৃত নোমান : 
আপনাকে ধন্যবাদ।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন