মার্গারেট মিচেলের উপন্যাস : যে দিন ভেসে গেছে--প্রথম অধ্যায়


(প্রথম অধ্যায়)

অনুবাদক : উৎপল দাশগুপ্ত

মুখবন্ধ
গন উইথ দ্য উইন্ড আমেরিকান ঔপন্যাসিক মার্গারেট মিচেলের লেখা একমাত্র সাহিত্যকীর্তি। এই উপন্যাস ১৯৩৬ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়। আমেরিকার গৃহযুদ্ধের (১৮৬১-১৮৬৫) পটভুমিকায় লেখা এই উপন্যাস একসময় খুবই জনপ্রিয় হয়।  ১৯৩৬ এবং ১৯৩৭ সালে এই উপন্যাস আমেরিকার বেস্টসেলার তালিকায় সর্বোচ্চ আসন লাভ করে। ১৯৩৭ সালে এই উপন্যাস পুলিৎজ়ার পুরস্কার পায়। ১৯৩৯ সালে এই উপন্যাসের সফল চলচিত্রায়ন হয়।  এত বছর পরে এখনও আমেরিকার পাঠকের কাছে গন উইথ দ্য উইন্ড  বাইবেলের পরেই দ্বিতীয় জনপ্রিয় বই।


মার্গারেট মিচেলের জন্ম ১৯০০ সালের ৮ই নভেম্বর জর্জিয়ার অ্যাটলান্টা শহরে। মৃত্যু ১৬ অগাস্ট ১৯৪৯ সালে।  তাঁর পরিবারের সকলেই আগ্রহের সঙ্গে আমেরিকার ইতিহাস নিয়ে চর্চা করতেন। বাল্যকালে, কৈশোরে আর যৌবনে আমেরিকার গৃহযুদ্ধ নিয়ে যে সব ঘটনা উনি শুনেছিলেন, সেগুলোরই ফলশ্রুতি এই উপন্যাস।

উপন্যাসটা আমি প্রথম পড়ি কলেজে পড়াশোনা করার সময়। আমার মতে উপন্যসটা চিরায়ত বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম সম্পদ। বইটা নিশ্চয়ই অনেক ভাষায় অনুদিত হয়েছে।  কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় বাংলাভাষায় এর কোন অনুবাদ আজ পর্যন্ত আমার চোখে পড়েনি। সময় ও সুযোগ পেলে এর বাংলা অনুবাদ করার ইচ্ছে অনেকদিন থেকেই মনের মধ্যে ছিল।  বইটার বিপুলতা দেখে বার বার পিছিয়ে গেছি। শেষ পর্যন্ত ইচ্ছেটাই জয়ী হল। আমি সাহিত্যের লোক নই। তাই ভাষার অক্ষমতা থেকে যাবে। যাঁরা কষ্ট করে পড়বেন, তাঁদের কাছে আগেই আমি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।

সব শেষে একটা কথা বলতে চাই। ইংরেজি আর বাংলার প্রকাশভঙ্গী সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। তাই নিখুঁত আক্ষরিক অনুবাদ করলে পাঠককে পদে পদে হোঁচট খেতে হবে।  তবুও যথাসম্ভব অবিকৃত রেখে অনুবাদ করার চেষ্টা করেছি। আর কৃষ্ণকায় মানুষরা সে সময় যেভাবে ইংরেজি বলতেন, সেটা আমি বাঙলা করবার চেষ্টা করিনি স্বাভাবিক কারণেই।  কৃত্রিমতা এসে যেত। তাদের কথাবার্তা আমি সোজা বাংলায় অনুবাদ করে দিয়েছি। শুধু এই দু ধরণের স্বাধীনতা আমি এই অনুবাদে নিয়েছি। ইংরেজি নামের সঙ্গে মিলিয়ে বাংলায় নাম দিয়েছি যে দিন ভেসে গেছে (রবীন্দ্রনাথের গানের একটা পঙতি)।

ধন্যবাদান্তে।
উৎপল দাশগুপ্ত



()

স্কারলেট ওহারা কে সেভাবে সুন্দরী বলা যায় না তবে স্কারলেটের চাকচিক্যের মোহে অন্ধ ছেলেছোকরার দল ব্যাপারটা ধরতেই পারত না। টার্লটনদের যমজ ভাইদের কথাই ধরা যাক না কেন। স্কারলেটের চেহারায় ওর মায়ের ফরাসি উপকূলবর্তী অঞ্চলের সুক্ষ্ম কমনীয় আভিজাত্য আর ওর বাবার মুখের আইরিশ দৃঢ়তার এক অদ্ভুত সমন্বয় ঘটেছিল। ছুঁচলো চিবুক আর চওড়া হনু ওর মুখমণ্ডলকে খুবই আকর্ষণীয় করে তুলেছিল। দু’চোখে হালকা সবুজের আভা, আর চোখের ঘন কালো পালক কোণের দিকে ঈষৎ হেলানো।  চোখের ঠিক ওপরে কালো ভ্রূদ্বয় ঈষৎ ঊর্ধগামী, ওর শ্বেতশুভ্র ত্বকে চমকপ্রদ তির্যক এক রেখার আভাস।  এই শ্বেতশুভ্র ত্বককে সূর্যের দাহক রশ্মি থেকে রক্ষা করার জন্য মহিলারা বনেট, অবগুণ্ঠন, দস্তানা ব্যবহার করতেন।

১৮৬১ সালের এপ্রিল মাসের সেই উজ্জ্বল অপরাহ্ণে, ওর বাপির প্ল্যান্টেশন টারার শীতল ছায়াঘন বারান্দায় স্টুয়ার্ট আর ব্রেন্ট টার্লটনদের সঙ্গে বসে থাকার সময় ওকে খুবই মনোরম দেখাচ্ছিল।  পরনে ছিল ওর বাপির অ্যাটলান্টা থেকে নিয়ে আসা সবুজ রঙের মসলিনের নতুন ফুলকাটা পোশাক, বারো হাত চওড়া ঘের পায়ের কাছে ঢেউ খেলিয়ে নেমে এসেছে, পায়ে তারই সঙ্গে মানানসই সবুজ রঙের সমতল মরক্কো চটি। পোশাকে ওর সতেরো ইঞ্চির সরু কটিদেশ – আশেপাশের তিনটে কাউন্টির মধ্যে এমন সরু কটির সন্ধান পাওয়া ভার – সেটাকে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।  আঁটসাঁট বক্ষাবরণীর জন্য ওর বক্ষপ্রদেশ  ষোলো বছর বয়সের তুলনায় একটু বেশিই পরিপক্ক লাগছে।  ছড়িয়ে পড়া স্কার্টের শালীনতা, সুসম্বদ্ধ ভাবে বাঁধা খোপার নম্রতা, কোলের ওপর শান্তভাবে পড়ে থাকা শ্বেতশুভ্র ছোট ছোট দুটো হাত, কোনোটাই ওর সত্যিকারের স্বভাবকে আড়াল করে রাখতে পারছে না। সযত্নে লালিত স্নিগ্ধ মুখমণ্ডল, কিন্তু সেখানে ওর সবুজ চোখ দুটো অশান্ত, অবাধ্য আর প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর। ওর ভব্য, নম্র, শান্ত আচরণের সঙ্গে ঠিক যেন খাপ খাচ্ছে না। ওর মায়ের অমায়িক উপদেশ আর ওর ম্যামির কঠোর অনুশাসন ওর আচরণে আরোপিত হতে পারলেও, চোখের ভাষা ওর একেবারে নিজস্ব।

যমজ ভাই দুজন ওর দু’পাশে রাখা দুটো চেয়ারে অলস ভঙ্গিতে বসে –  পুদিনা লতায় ছাওয়া লম্বা কাচের ভেতর দিয়ে আসা সূর্যের আলোর জন্য দৃষ্টি তেরছা – হেসে হেসে গল্প করছে। ওদের লম্বা লম্বা পেশিবহুল ঠ্যাংগুলো হাঁটু পর্যন্ত চামড়ার জুতোয় ঢাকা, মৌরসিপাট্টা মেরে একটা ঠ্যাং-এর ওপর অন্য ঠ্যাংটা তুলে দেওয়া। উনিশ বছর বয়স, ছ’ফুট দীর্ঘ, বলিষ্ঠ পেশিবহুল চেহারা, রোদে পোড়া মুখ আর গাঢ় লালচে বাদামি চুল, উদ্ধত কিন্তু প্রাণচঞ্চল চোখ। দুজনের পরনেই হুবহু একই নীল রঙের কোট আর গাঢ় হলুদ রঙের পাৎলুন। ঠিক তুলোর দুটো ফলের মত একজনকে অন্যজনের থেকে আলাদা করা মুশকিল।  

বাইরে, পড়ন্ত বিকেলের সূর্য তেরছাভাবে উঠোনে পড়ে ডগউড গাছের নবীন সবুজ পাতার ওপর ঝুলে থাকা থোকা থোকা সাদা ফুলের ওপর বিচ্ছুরিত হয়ে ঝলমল করে উঠেছে। ভাইদের ঘোড়া দুটো গাড়িবারান্দার কাছে বাঁধা, বিশাল আকারের জানোয়ার, ওদের মালিকদের চুলের মতই লাল, আর ঘোড়াদুটোর পায়ের কাছে রোগা একজোড়া পসাম হাউন্ড নিজেদের মধ্যে খুনসুটি করছে। স্টুয়ার্ট আর ব্রেন্ট যেখানেই যাক না কেন, এদের সঙ্গে নিয়েই যায়। এছাড়া ছিল একটা কালো ছোপ ছোপ পাহারাদার কুকুর, গম্ভীর উদাসীনতায় থাবার ওপর মুখ রেখে বসে ধৈর্য ধরে মালিকদ্বয়ের সাপারের জন্য বাড়ির দিকে রওনা হবার প্রতীক্ষা করছে।  

হাউন্ড আর ঘোড়াদুটো যমজ ভাইদের নিত্যসঙ্গী হওয়া ছাড়াও এদের সঙ্গে দু’ভাইয়ের অন্তরঙ্গতা অত্যন্ত গভীর।  প্রত্যেকেই ছিল স্বাস্থ্যবান, হঠকারী এবং সতেজ প্রাণী, চটপটে, সুদর্শন, উচ্ছল।  ছেলেদুটোও –  যে ঘোড়াগুলোয় ওরা চড়ে –  সেগুলোর মতই তেজস্বী – তেজস্বী এবং ভয়ঙ্কর, তবে যারা ওদের সাথে তাল মিলিয়ে চলবার কৌশলটা জানে, তাদের কাছে ওরা কিন্তু খুব সজ্জন।

প্ল্যান্টেশন পরিবারের স্বাচ্ছন্দে লালিত হলেও – শিশু বয়স থেকেই এদের নিজের হাতে গড়িয়ে এক গেলাস জল পর্যন্ত খেতে হয়নি – বারান্দায় বসা তিনমূর্তির কাউকেই ঢিলেঢালা বা নরমসরম বলা যাবে না। লেখাপড়ার আর বইখাতার মত নীরস বস্তুর সঙ্গে সম্পর্কবর্জিত এবং বাধাবন্ধহীন জীবনধারায় অভ্যস্ত, গ্রামের অন্যান্য লোকের মতই এরাও প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপুর আর তৎপর। অগাস্টা, স্যাভান্না এবং চার্লস্টনের তুলনায়, উত্তর জর্জিয়ার ক্লেটনের এই কাউন্টি কিছুটা নতুন এবং খানিক অমার্জিত। দক্ষিণের অপেক্ষাকৃত ধীরস্থির এবং প্রবীণ অধিবাসীরা জর্জিয়ার গেঁয়ো মানুষজন সম্পর্কে বেশ নাক উঁচু একটা মনোভাব পোষণ করতেন। তবে উত্তর জর্জিয়ার মানুষ প্রথাগত শিক্ষার অভাব এবং তার ফলশ্রুতি হিসেবে আদবকায়দার ঘাটতি নিয়ে বিন্দুমাত্র লজ্জিত ছিলেন না, বরং মনে করতেন ব্যবহারিক জীবনে চালাকচতুর এবং করিৎকর্মা হওয়াটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।  ভাল মানের তুলো উৎপাদন করতে পারা, অশ্বারোহণে পারদর্শিতা, ভাল নিশানাবাজ হওয়া, নৃত্যগীতে রুচি রাখা, অভিজাত এবং সুন্দরী মহিলাদের সাহচর্যদানে এগিয়ে যাওয়া এবং ভদ্রলোকের মত নিজেদের পানীয় নিজেদের সঙ্গে  নিয়ে যাওয়া – এই ব্যাপারগুলোই গুরুত্বপূর্ণ।

এই প্রতিটি ব্যাপারেই যমজ ভাই দুজন অত্যন্ত পারদর্শী ছিল, এবং একই ভাবে একটি বইয়ের দুই মলাটের ভেতরের বিষয়বস্তু আয়ত্ত না করতে পারার ব্যাপারেও এদের কুখ্যাতিও কোনও অংশে কম ছিল না। কাউন্টির অন্যান্যদের তুলনায় এদের অর্থবল বেশি ছিল, ঘোড়ার  এবং ক্রীতদাসের সংখ্যাও বেশি ছিল, তবে দরিদ্রতর প্রতিবেশিদের স্বাক্ষরতার নিরিখে এই দুই ভাই অনেক পেছনে ছিল।

আর ঠিক এই সুনির্দিষ্ট কারণেই স্টুয়ার্ট আর ব্রেন্ট এপ্রিলের এই অপরাহ্ণে টারার বারান্দায় বসে গুলতানি করছে। জর্জিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ওরা সদ্য বহিষ্কৃত হয়েছে – দু’বছরের মধ্যে এটাই চতুর্থ বিশ্ববিদ্যালয় যেখান থেকে ওরা বিতাড়িত হল; ওদের দুজন দাদা – টম আর বয়েডও ওদের সঙ্গেই বাড়ি ফিরে এসেছে, কারণ যে প্রতিষ্ঠানে ওদের যমজ ভাইদের স্থান নেই, সেখানে ওদের থাকবার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে ছিল না। স্টুয়ার্ট আর ব্রেন্ট ওদের এই সর্বশেষ বিতাড়নকে বেশ বড়সড় একটা তামাশা বলেই ধরে নিয়েছে আর স্কারলেটও – যে ফ্যেয়াটভিল একাডেমি ছেড়ে আসার পর থেকে নিজের ইচ্ছেয় একটা বইয়ের পাতাও উলটে দেখেনি – সেও এটাকে মজাদার একটা ঘটনা হিসেবেই দেখছে।  

তোমার যে এই বের করে দেওয়াকে গুরুত্ব দিতে চাও না সে তো আমি জানিই, টমও চায় না,” স্কারলেট বলল। “কিন্তু বয়েডের কী হবে? লেখাপড়া শেখার ব্যাপারে ওর যে খুব ঝোঁক। তোমার দুজনে মিলে ওকে ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে, তারপর অ্যালাবামা থেকে, তারপর ক্যারোলাইনা থেকে আর এখন এই জর্জিয়া থেকে বের করে আনলে! এভাবে চলতে থাকলে তো বেচারার লেখাপড়া শেষ করা আর হয়েই উঠবে না!”

“আরে, ফ্যেয়াটভিলে জাজ্‌ পারমালির অফিসে গিয়েই তো আইন পড়তে পারে,” ব্রেন্ট ওর কথাটা উড়িয়ে দিল। “তাছাড়া খুব কিছু এসে যাবে বলে মনেও হয় না।  বছর শেষ হওয়ার আগে এমনিতেই আমাদের বাড়ি ফিরে আসতে হত।”

“কেন?”

“আরে বোকা, কেন আবার, যুদ্ধের জন্য! যুদ্ধ তো যে কোনোদিন বেঁধে যেতে পারে, আর লড়াইয়ের সময় কলেজে পড়ে থাকার কোনও প্রশ্নই নেই! কি, ঠিক কিনা?”

“ভাল করেই জানো তোমরা, ওই যুদ্ধ-টুদ্ধ কিস্যু হবে না,” স্কারলেটকে বেশ বিরক্ত শোনালো। “এগুলো সবই বাগাড়ম্বর ছাড়া কিছুই নয়। “এই তো, অ্যাশলে উইল্কস আর ওর বাপি, এই গত সপ্তাহেই বাপিকে বলছিলেন, ওয়াশিংটনে আমাদের কমিশনারদের সঙ্গে একটা – একটা শান্তিচুক্তি হতে চলেছে মিস্টার লিঙ্কনের সঙ্গে কনফেডারেসির ব্যাপারে।   আর আমাদের সঙ্গে লাগতে আসার সাহস ইয়াঙ্কিদের নেই। যুদ্ধ হচ্ছে না, আর এসব নিয়ে শুনে শুনে আমি ক্লান্ত হয়ে পড়েছি।”

“কী, যুদ্ধ হবে না!” দু’ভাই ক্ষুব্ধকণ্ঠে একসাথে চেঁচিয়ে উঠল, যেন ওরা ভীষণভাবে ঠকে গেছে।

“অবশ্যই যুদ্ধ হবে, সোনা,” স্টুয়ার্ট বলল। “ইয়াঙ্কিরা আমাদের ভয় পেতেই পারে, কিন্তু যেভাবে গত পরশু জেনারাল বোরিগার্ড ওদের ফোর্ট সামটার থেকে ভাগিয়ে দিয়েছেন, যুদ্ধ ওদের করতেই হবে আর নইলে দুনিয়ার সামনে কাপুরুষ বলে ওরা বদনাম হয়ে যাবে।  কেন, কনফেডারেসি তো – ”

স্কারলেট বিরক্ত মুখভঙ্গী করল।

“আরেকবার ‘যুদ্ধ’ কথাটা উচ্চারণ  দেখ, আমি সোজা ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেব। একমাত্র  ‘বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া’ কথাটা বাদ দিলে ‘যুদ্ধ’ ছাড়া আর কোনো কথা শুনে জীবনে বোধহয় এত বিরক্ত লাগেনি আমার। সকালবেলা হোক কি দুপুর কি রাত, বাপি যুদ্ধের কথা বলতেই থাকবেন, আর ওঁর সঙ্গে যিনিই দেখা করতে আসুন না কেন, ফোর্ট সামটার, রাষ্ট্রের অধিকার আর অ্যাবে লিঙ্কন নিয়ে এমন গলা ফাটাতে থাকবেন যে আমার চেঁচিয়ে উঠতে ইচ্ছে করে! আর ছেলেদের কাছেও এ ছাড়া আর কথাই নেই, কেবল যুদ্ধ আর ওদের পুরনো ট্রুপ!  শীতের পরে একটাও মজাদার পার্টি হতেই পারেনি, কারণ ছেলেরা অন্য কোনো বিষয় নিয়ে কথা বলতেই পারে না। আমি তো বেজায় খুশি হয়েছি যে বিচ্ছিন্ন হবার জন্য জর্জিয়া বড়দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করেছে, নইলে তো বড়দিনের পার্টিটাও মাটি হয়ে যেত। আরও একবার যদি ‘যুদ্ধ’ বল, আমি সোজা ঘরে চলে যাব।”

তর্জনটা ফাঁকা আওয়াজ ছিল না, কারণ যে সব আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ও নিজে নয়, সেরকম আলোচনা স্কারলেট বেশিক্ষণ বরদাস্ত করতে পারত না। কিন্তু কথাটা বলতে বলতে এমনভাবে হাসল যে ওর গালে টোল পড়ল আর চোখের কালো পালকগুলো প্রজাপতির ডানার মত ক্ষিপ্রবেগে নাচিয়ে নিল।  অর্থাৎ যেমনটি চাইছিল, ছেলে দুজন ধরাশায়ী হল এবং অবিলম্বে ওকে বিরক্ত করার জন্য মার্জনা ভিক্ষা করে নিল। আগ্রহ না থাকার জন্য ওদের নজরে স্কারলেট ছোট হয়ে গেল না, বরং ওদের কাছে ওর আকর্ষণ বেড়ে গেল।  যুদ্ধ-টুদ্ধ সব পুরুষমানুষদের ব্যাপার, মেয়েদের নয়, তাই ওর এই আচরণেই প্রমাণ হচ্ছে যে ও একজন নারী।

যুদ্ধ নামক বিরক্তিকর বিষয় থেকে ওদের নজর ঘুরিয়ে দিয়ে স্কারলেট নতুন উদ্যমে ওদের দুজনের বর্তমান অবস্থা নিয়ে আলোচনায় ফিরে গেল।

“এই যে তোমার দুজনকে আবার বের করে দেওয়া হল, তা তোমার মা কী বলছেন?”

ছেলে দুজনের চোখেমুখে অস্বস্তি ফুটে উঠল, তিন মাস আগে বিশেষ অনুরোধে ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ঘরে ফেরার সময় মা যে আচরণ করেছিলেন, সেটা মনে পড়ে গেল।

“আসলে,” স্টুয়ার্ট বলে উঠল, “কিছু বলবার সুযোগ মা এখনও পাননি। টম আর আমরা খুব সকাল সকাল – মানে মায়ের ঘুম থেকে ওঠার আগেই – বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছি। টম ফোনটেনদের ওখানে গেছে আর আমরা এখানে চলে এলাম।”

“কাল রাতে যখন বাড়ি ফিরলে তখন কিছু বলেননি?”

“কাল রাতে কপালের জোরে বেঁচে গেছি বলতে পারো।  কেনটাকিতে গত মাসে মা যে নতুন মদ্দা ঘোড়াটা কিনেছিলেন, আমরা বাড়ি পৌঁছনোর ঠিক আগেই সেটা নিয়ে আসা হয়েছিল আর তখন সেখানে এক ডামাডোল অবস্থা।  সেই প্রকাণ্ড জানোয়ারটা – ওটা বিশালাকায় এক ঘোড়া, স্কারলেট – তোমার বাপিকে বোলো, খুব শিগগির এসে যেন ওটাকে দেখে যান -  রাস্তাতেই ওর সহিসের এক খাবলা মাংস কামড়ে তুলে নিয়েছে আর মায়ের যে দুটো ডার্কি ওকে নিয়ে আসতে জোনসবোরো স্টেশনে গেছিল, ওদের পায়ের তলায় পিষে দিয়েছে। আর আমরা ঢোকার ঠিক আগেই লাথি মেরে আস্তাবলটা তছনছ করে দিয়েছে, আর স্ট্রবেরি – মায়ের আগের মদ্দা ঘোড়াটা – ওটাকে প্রায় মেরেই ফেলেছিল।  যখন বাড়ি পৌঁছলাম, মা এক বস্তা চিনি নিয়ে আস্তাবলে, ওটারই তোয়াজ করতে ব্যস্ত, আর কাজটাও অসাধারণভাবে সারলেন। ডার্কিরা তো প্রাণের ভয়ে কড়িবর্গা ধরে ঝুলছিল, চোখ একেবারে কপালে, কিন্তু মা ঘোড়াটার সঙ্গে কথা বলছিলেন, যেন একটা মানুষ ওটা, ঘোড়াটাও ওঁর হাত থেকে খেয়ে নিচ্ছিল। ঘোড়ার ব্যাপারে মায়ের সঙ্গে কেউ পাল্লা দিতে পারবে না।  আমাদের দেখতে পেয়েই হেঁকে উঠলেন, ‘ব্যাপার কী হে, তোমার আবার বাড়িতে কেন? তোমার তো দেখছি মিশরের মহামারীর থেকেও বেশি নাছোড়!’ ঠিক তখনই ঘোড়াটা আবার ঘোঁত ঘোঁত করে ছটফট করতে শুরু করল। ব্যাস, মা চেঁচিয়ে বললেন, ‘এখান থেকে দূর হয়ে যাও! দেখতে পাচ্ছ না, বেচারা ভয় পাচ্ছে, আমার বড়কা সোনা! কাল সকালে আমি তোমাদের ব্যাপারে ফয়সলা করব।’  আমরাও ঘুমোতে চলে গেলাম, আর ভোর হতে না হতেই বেরিয়ে এসেছি, যাতে আমাদের  ধরতে না পারেন। ওঁকে সামলানোর জন্য বয়েডকে রেখে এসেছি।”

“উনি আবার বয়েডের গায়ে হাতটাত তুলবেন না তো?” কাউন্টির আর পাঁচটা লোকের মতই স্কারলেটও ছোটখাটো মিসেজ় টার্লটন ওঁর সাবালক ছেলেদের ওপর যেভাবে তর্জন করেন সেটা মেনে নিতে পারেনি। দরকার মনে হলে ঘোড়ার চাবুকটা ছেলেদের পিঠের ওপর অনায়াসে চালিয়ে দেন।

বিয়্যাট্রিস টার্লটন খুবই ব্যস্ত একজন মহিলা। বেশ বড়সড় একটা তুলোর প্ল্যান্টেশন, একশজন নিগ্রো, আটজন ছেলেমেয়ে সামলানো ছাড়াও রাজ্যের বৃহত্তম অশ্ব প্রজনন কেন্দ্রটাও উনিই পরিচালনা করেন। বেশ বদমেজাজি, তার ওপর ঘন ঘন চার পুত্রের বেয়াদবি দেখে ওঁর মাথায় আগুন লেগে যেত। যদিও কোনও ঘোড়া কিংবা ক্রীতদাসের ওপর চাবুক চালানোর অনুমতি কারোরই ছিল না, তবে ওঁর ধারণা, মাঝে মধ্যে এক-দু’ঘা চাবুক যদি ওঁর ছেলেদের পিঠে পড়ে তাতে ভাল বৈ মন্দ কিছুই হবে না।

“না, না, উনি বয়েডের গায়ে হাত তুলবেন না। এখন পর্যন্ত উনি বয়েডকে মারধোর করেননি, এক তো ও সবার বড়, কিন্তু আবার সবার চাইতে ছোটখাটো আর দুর্বল,” নিজের ছ’ফুট দু’ইঞ্চির কথা মনে করে বেশ একটু অহঙ্কারের সঙ্গেই স্টুয়ার্ট বলল। “তাই তো ওকে বাড়িতে রেখে এলাম, মাকে সব কিছু বুঝিয়ে বলার জন্য।  হে ভগবান! আমাদের গায়ে হাত তোলার অভ্যেসটা মা যেন ছেড়ে দেন! আমরা উনিশ আর টম একুশ, কিন্তু উনি এমন সব কাজ করেন যে মনে হয় আমরা ছ’বছরের শিশু।”

“কাল উইল্কসদের বারবেকিউতে তোমাদের মা নতুন ঘোড়ায় চেপে যাচ্ছেন?”

“ইচ্ছে তো ছিলই, কিন্তু বাপি বললেন, ওটা এখনও খুবই বিপজ্জনক। এমনিতেও মেয়েরা ওঁকে বাধা দেবে। ওরা বলে দিয়েছে, একটা পার্টিতে অন্তত ঘোড়াগাড়িতে সওয়ারি হয়ে লেডির মত চলুন।”

“কাল আবার বৃষ্টি না হয়,” স্কারলেট বলল। “এক সপ্তাহ ধরে প্রায় প্রত্যেকদিনই বৃষ্টি হচ্ছে। বারবেকিউ যদি শেষমেশ বাড়ির ভেতরে বসে চড়িভাতি করার মত ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়, তার চাইতে খারাপ আর কিছু হতেই পারে না।”

“আরে, ভেবো না, কাল থাকবে একেবারে পরিষ্কার দিন, জুন মাসের মতই উষ্ণ,” স্টুয়ার্ট বলল। “সূর্যাস্তটা একটু খেয়াল কর। এত লালচে সূর্যাস্ত আমি আর দেখিনি। সূর্যাস্ত দেখেই আবহাওয়া আন্দাজ করা যায়।”

ওদের দৃষ্টি, জেরাল্ড ও’হারার সদ্য লাঙ্গল চালানো অন্তহীন তুলোর খেত পেরিয়ে লাল দিগন্তের পানে চলে গেল।  ফ্লিন্ট নদী পেরিয়ে টিলার সারির পেছনে, সূর্য ডোবার মুহূর্তে,  আকাশে যেন একমুঠো সিঁদুর কেউ ছড়িয়ে দিয়েছে।  এপ্রিলের উষ্ণতা কেটে গিয়ে ধীরে ধীরে হালকা কিন্তু শিরশিরে বাতাস বইছে।  

সে বছর বসন্ত একটু আগে আগেই এসে পড়েছে। মাঝে মাঝে দু’এক পশলা বৃষ্টি হচ্ছে।  হুড়োহুড়ি করে পীচগাছে গোলাপি মুকুল ধরেছে।  ডগউড গাছের ফুল সাদা সাদা তারার মত অন্ধকার জলাভূমি আর দূরের টিলাগুলোকে আলোকিত করে তুলেছে। লাঙ্গল চালানো প্রায় শেষ পর্যায়ে। সদ্য চালানো লাঙ্গলের রেখার ওপর সূর্যাস্তের রক্তিমাভা জর্জিয়ার লাল মাটিকে আরও লাল করে তুলেছে। উপড়ে তোলা যে স্যাঁতস্যাঁতে মাটি বুভুক্ষুর মত তুলোর বীজ বপনের প্রতীক্ষা করছে তার ওপরের দিকের বালিমাটিতে হালকা গোলাপির ছোঁয়া, আর পাশের দিকে যেখানে পরিখায় ছায়া পড়েছে, সেখানে সিঁদুরে, টকটকে লাল আর গাঢ় তামাটে রঙের ছোঁয়া। গোলাপি চূড়াওয়ালা উত্তাল ঢেউ সমুদ্রের ফেনার মত মাটিতে লুটিয়ে সহসা স্তব্ধ হয়ে যাওয়া এক বিস্তীর্ণ, সর্পিল লাল রঙের সমুদ্রের মাঝখানে ইটের তৈরি চুনকাম করা প্ল্যান্টেশনের বাড়িগুলো একটা দ্বীপের মত লাগছে। মধ্য জর্জিয়ার সমতল কাদা জমির মত কিংবা উপকূলবর্তী অঞ্চলের কালো মাটিতে যেমন লম্বা সিধে আলের দেখা পাওয়া যায়, উত্তর জর্জিয়াতে তার দেখা মেলা ভার। উত্তর জর্জিয়ায় ঘোরপ্যাঁচ দেওয়া পাহাড়ি জমিতে আলপথ অজস্র বাঁক ধরে এঁকেবেঁকে তৈরি করা যাতে এই উর্বরা মাটি ধোয়া জল নদীতে গিয়ে না মিশে যায়।

এখানকার মাটি নির্মম লাল, বৃষ্টির পরে রক্তবর্ণ ধারণ করে, আবার অনাবৃষ্টিতে ইটের গুঁড়োর মত লাল, তুলো চাষের জন্য পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ এখানকার মাটি। সাদা রঙের আনন্দময় গৃহের সারি সমৃদ্ধ এই দেশ, লাঙল দিয়ে চষা ভূমি আর অলসগতিতে বয়ে হলদে নদী এই দেশের নিবিড় শান্তির প্রতীক। আবার ঝলমলে রোদ আর ছায়াঘন গহন অরণ্যের বৈপরিত্যও এখানেই দেখতে পাওয়া যায়। মাইলের পর মাইল জুড়ে বিস্তৃত প্ল্যান্টেশনে, তুলো চাষের জমিতে সূর্যের উষ্ণ নরম সোনালি আলো পড়ে ঝলমল করে ওঠে। প্রান্তে নিবিড় বনানি মাথা তুলে দাঁড়িয়ে, উষ্ণতম গ্রীষ্মেও ছায়া সুনিবিড় আর শীতল, রহস্যে মোড়া, অলক্ষুণে। মৃদু মন্ধ বাতাসে হেলতে দুলতে পাইন গাছগুলো যেন অনন্তকালের ধৈর্য নিয়ে অপেক্ষা করে আছে, হালকা নিঃশ্বাস ফেলে যেন সতর্ক করে বলছে, “খুব সাবধান! খুব সাবধান! একবার তোমাদের গ্রাস করে নিয়েছিলাম। আবারও গ্রাস করতে পারি।”

বারান্দায় বসা তিনজনের কানেই ঘোড়ার খুরের আওয়াজ, জিনের শেকলের ঝন ঝন শব্দ আর সমবেত নিগ্রোকণ্ঠে তীক্ষ্ণ হাসির আওয়াজ ভেসে এল। খেতমজুরর আর খচ্চরের দল দিনের শেষে মাঠ থেকে ফিরছে। বাড়ির ভেতর থেকে স্কারলেটের মা, এলেন ও’হারার মৃদু কণ্ঠস্বরও ভেসে এল, ওঁর চাবির বাক্সবাহিকা ছোট কালো মেয়েটিকে ডাকছেন। তীক্ষ্ণ শিশুকণ্ঠে জবার এল, “হ্যাঁ, ম্যা’ম”, তারপর ওর পায়ের শব্দ স্মোকহাউজ়ের দিকে মিলিয়ে গেল যেখানে এলেন বাড়ি ফিরে আসা  মজুরদের ভাগের খাবার বিতরণ করবেন। চিনেমাটির আর রুপোর বাসন নাড়াচাড়ার শব্দ, টারার খানসামা পোর্ক সাপারের টেবিল পাতছে।

শেষের এই আওয়াজটা কানে যেতেই দুই ভাই বুঝতে পারল এবার বাড়ির দিকে রওনা হবার সময় হয়ে গেছে। কিন্তু এখুনিই মায়ের মুখোমুখি হতে ওদের ইচ্ছে করছে না, তাই বারান্দাতে সেঁটে রইল, মনে মনে আশা, যদি স্কারলেট সাপারের জন্য ওদের আমন্ত্রণ জানায়।

“কাল কী করবে? ভেবে রেখেছো তো, স্কারলেট?” ব্রেন্ট বলল। “আমরা এখানে ছিলাম না, তাই বারবেকিউয়ের ব্যাপারটা জানা ছিল না, কেবল সেই অজুহাতে, কাল আমরা একসঙ্গে নাচবার প্রচুর সুযোগ পাব না, তা যেন না হয়। সবাইকে আবার কথা দিয়ে বসনি তো?”

“দিয়েছিই তো! তোমার যে বাড়িতে ফিরে আসবে, আমি কী করে জানব? তোমাদের অপেক্ষায় থেকে পটের বিবিটি হয়ে বসে থাকার ঝুঁকি কীভাবে নিই বল তো?”

“পটের বিবি হয়ে বসে থাকবে? তুমি!” দুজনেই খুব জোরে জোরে হেসে উঠল।

“শোনো, ডার্লিং। প্রথম ওয়াল্টজ়টা তোমাকে আমার সঙ্গে নাচবার কথা দিতে হবে আর শেষেরটা স্টুয়ের সঙ্গে। আর সাপারটা আমাদের দুজনের সঙ্গে করবে। আগের বলড্যান্সে যেমন করেছিলাম, আমরা সিঁড়ির ধাপে বসে ম্যামি জিন্সিকে দিয়ে আবার ভাগ্য গণনা করাব।”

“ম্যামি জিন্সির ভাগ্যগণনায় আমার বিশ্বাস নেই। মনে আছে তো, বলেছিল আমার নাকি বিয়ে হবে কালো চুল আর পেল্লায় কালো গোঁপওয়ালা একজন লোকের সঙ্গে, কিন্তু আমি কালো চুলের লোকদের পছন্দই করি না।”

“তুমি লালচুলোদের পছন্দ কর, তাই না, ডার্লিং?” ব্রেন্ট দাঁত বের করে হাসল। “এবার কথা দাও সবকটা ওয়াল্টজ় আর সাপারটা।”

“কথা যদি দাও, একটা গোপন কথা তোমাকে বলে দেব,” স্টুয়ার্ট বলল।

“কী বললে?” স্কারলেট একেবারে বাচ্চা মেয়ের মত উত্তেজনায় চেঁচিয়ে উঠল।

“গতকাল অ্যাটলান্টায় যেটা শুনলাম, সেটাই কি, স্টু? যদি তাই হয়, আমরা কিন্তু বলে দেব না বলে কথা দিয়েছি।”

“হ্যাঁ মিস পিটি যেটা বললেন।”

“মিস – কে?”

“অ্যাশলে উইল্কসের একজন আত্মীয় অ্যাটলান্টায় থাকেন, তুমি তো জানোই, মিস পিটিপ্যাট হ্যামিলটন – চার্লস আর মেলানি হ্যামিলটনের পিসি।”

“হ্যাঁ, জানিই তো! ওঁর মত বোকার হদ্দ বুড়ি আমি দুটো দেখিনি!”

“শোনো তাহলে, কাল আমরা অ্যাটলান্টায় ছিলাম, ফেরবার ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছিলাম, ওঁর গাড়ি ডিপো’র সামনে দিয়ে যাচ্ছিল, উনি গাড়ি থামিয়ে আমাদের সঙ্গে কথা বলতে লাগলেন, বলছিলেন যে আগামীকাল উইল্কসদের বল পার্টিতে একটা বাগদানের ঘোষণা করা হবে।”

“আরে সেকথা তো জানিই আমি,” হতাশ হয়ে স্কারলেট বলল। “ওই যে ওঁর নির্বোধ ভাইপোটা, চার্লস হ্যামিলটন, আর হানি উইল্কস। অনেকদিন ধরেই সবাই জানে কোনো এক সময় ওরা দুজনে বিয়ে করবে, যদিও ছেলেটার খুব একটা আগ্রহ আছে বলে মনে হয় না।”

“ওকে তুমি নির্বোধ মনে কর নাকি?” ব্রেন্ট জিগ্যেস করল। “গতবার বড়দিনে, ওকে তোমার পাশে খুব তো ঘুর ঘুর করতে দিয়েছিলে।”

“ঘুর ঘুর করতে না দিয়ে উপায় কী ছিল  আমার,” স্কারলেট পরম অবহেলায় মাথা নাড়ল। “আমার তো মনে হয় ছেলেটা একনম্বরের মেনিমুখো।”

“তাছাড়া যে বাগদানের ঘোষণা হতে যাচ্ছে, সেটা ওর নয়,” স্টুয়ার্ট নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে উঠল। “আসলে বাগদানের ব্যাপারটা অ্যাশলের সঙ্গে চার্লির বোন মিস মেলানির!”

স্কারলেটের মুখের ভাবে কোনও পরিবর্তন হল না, কিন্তু ঠোঁটদুটো ফ্যাকাশে হয়ে গেল – আচমকা বিশাল ধাক্কা খেলে মানুষের যেমন হয়, ধাক্কা খাওয়ার পরে পরেই বুঝতে পারে না ঠিক কী ঘটেছে। স্টুয়ার্টের দিকে যখন হতভম্ব চোখে তাকাল – স্টুয়ার্টের বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা কোনো কালেই খুব একটা পাকা নয় – ও ধরেই নিল যে স্কারলেট আসলে খুবই অবাক হয়েছে এবং বিশদে জানার কৌতুহল হচ্ছে।

“মিস পিটি বলছিলেন, সামনের বছরের আগে এই বাগদান ঘোষণা করার  ইচ্ছে ওঁদের ছিল না, কারণ মিস মেলির শরীরটা বেশি ভাল যাচ্ছে না; কিন্তু যুদ্ধ নিয়ে চারদিকে যেভাবে জল্পনা শুরু হয়ে গেছে, দুই পরিবারের সবারই মনে হল বিয়ের পাটটা তাড়াতাড়ি চুকিয়ে দেওয়াই মঙ্গল। তাই কাল সন্ধ্যেবেলাই সাপারের বিরতির ফাঁকে এটা ঘোষণা করা হবে। তাহলে, স্কারলেট, গোপন খবরটা দিয়ে দিলাম কিনা, তাই আমাদের সঙ্গে সাপার করার কথা তোমাকে দিতেই হবে।”

“অবশ্যই, কথা দিলাম,” স্কারলেট যান্ত্রিকভাবে বলল।

“আর ওয়াল্টজ়গুলো?”

“সব কটা।”

“ওহ, তুমি না সোনা মেয়ে! বাকি সব ছেলে হিংসেয় নীল হয়ে যাবে!”

“হিংসেয় জ্বলতে দাও ওদের,” ব্রেন্ট বলল। “সে আমরা দুজনেই সামলে নিতে পারব। শোনো, স্কারলেট, কাল সকাল থেকেই তুমি আমাদের সঙ্গে বারবেকিউতে বসছ।”

“কী বললে?”

স্টুয়ার্ট কথাটার পুনরাবৃত্তি করল।

“অবশ্যই।”

দু’ভাই খুশিতে উচ্ছল হয়ে একে অপরের দিকে তাকাল, কিন্তু একটু অবাকও যে হয়নি তা নয়।  ওরা দুজনই যে স্কারলেটের পছন্দের পাণিপ্রার্থী সেটা ওদের মনে হত, কিন্তু সেই পছন্দের নিদর্শন আগে কখনোই এত সহজে লাভ করেনি। সাধারণত, স্কারলেট ওদের ঘোরাতে থাকে, কাতর অনুনয় বিনয় করতে বাধ্য করে, হ্যাঁ কিংবা না কিছুই না বলে ঝুলিয়ে রাখে, মুখ ভার করে থাকলে হাসাহাসি করে, রাগ করলে উদাসীনতা দেখায়। আর আজ কিনা কালকের পুরো দিনটাই ওদের সঙ্গ দেবার কথা দিয়ে ফেলল – বারবেকিউতে ওর পাশে বসতে পারবে, সবকটা ওয়াল্টজ়ও (আর ওদের খেয়াল রাখতে হবে কালকের সবকটা নাচ যেন ওয়াল্টজ়ই হয়!) আর সাপারের বিরতি। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কৃত হয়ে এ যেন সাপে বর হল!

সাফল্য লাভের আনন্দে, ওরা গড়িমসি করতে লাগল, বারবেকিউ, বলড্যান্স, অ্যাশলে উইল্কস আর মেলানি হ্যামিলটনকে নিয়ে কথা বলতে লাগল, মাঝে মাঝে একে অপরের কথায় বাধা দিয়ে কথা বলতে লাগল, অনেক মজার মজার কথা বলতে লাগল আর বেশি বেশি হাসতে লাগল, আর বেশ চোখে লাগার মত ইশারায় সাপারে আমন্ত্রণ পাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যেতে লাগল।  বেশ কিছুক্ষণ কেটে যাবার পর ওদের বোধোদয় হল স্কারলেট প্রায় কোনো কথাই বলছে না।  পরিবেশটা কেমন যেন পালটে গেছে। কীভাবে যে কী হল, দু’ভাই বুঝতেই পারেনি, তবে বিকেলের সেই হাসিখুশি ভাবটা যেন হারিয়ে গেছে।  ওরা কী বলছে না বলছে, স্কারলেট মনোযোগ দিয়ে শুনছেই না সেসব কথা। তবে প্রতি ক্ষেত্রে ব্যাকরণসম্মত প্রতিক্রিয়া দিয়ে গেছে। কিছু একটা ব্যাপার হয়েছে যেটা ওদের মাথায় ঢুকছে না বুঝতে পেরে, কিছুটা হতবুদ্ধি হয়ে, আর মাথায় না ঢোকার জন্য নিজেদের ওপর খানিক বিরক্ত হয়েই, ভাই দুজন আরও কিছুক্ষণ কথা চালানোর চেষ্টা করল, তারপর নিতান্ত অনিচ্ছাভরে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে গাত্রোত্থান করল।

সদ্য লাঙ্গল দেওয়া খেত পেরিয়ে, নদীর ধারের ভূতের মত দাঁড়িয়ে থাকা লম্বা লম্বা গাছের ফাঁক দিয়ে সূর্য একেবারে পাটে নেমে গেছে।  চিলগুলো তীরবেগে উঠোনের ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে, মুরগি, হাঁস আর টার্কির দল হেলতে দুলতে মাঠ থেকে ফিরছে।

“জীমস!” বলে স্টুয়ার্ট হাঁক লাগাল। খানিক বাদে, লম্বা কালো একটা ছেলে, ওদের বয়সিই হবে, বাড়ি আশপাশ থেকেই হাঁপাতে হাঁপাতে বেঁধে রাখা ঘোড়াগুলোর দিকে ছুটে গেল।  জীমস দুই ভাইয়ের ব্যক্তিগত চাকর আর  কুকুরদের মতই, ওদের সঙ্গে সর্বত্র যায়। ছেলেবেলায় ও ওদের খেলার সাথী ছিল, আর ওদের দশ বছরের জন্মদিনে ছেলেটাকে ওরা নিজেদের চাকর হিসেবে পেয়েছে। ওকে দেখেই টার্লটনদের হাউন্ড দুটো লাল ধুলো ঝেড়ে উঠে দাঁড়াল, ওদের মালিকের আসার প্রতীক্ষায়। ছেলেরা স্কারলেটকে ‘বাও’ করল, ওর সঙ্গে করমর্দন করল আর জানাল সকাল সকাল ওরা উইল্কসদের ডেরায় পৌঁছে ওর অপেক্ষা করবে।  এরপর ওরা দ্রুতপদে এগিয়ে গেল, নিজের নিজের ঘোড়ায় সওয়ার হল, তারপর সেডারের সারি দেওয়া রাস্তা ধরে ঘোড়া বাগিয়ে চলতে চলতে টুপি খুলে স্কারলেটের দিকে মুখ ঘুরিয়ে চেঁচিয়ে কিছু বলল। জীমস ওদের পেছন পেছন চলল।

ধুলিধূসর রাস্তাটার মোড় ঘুরে যেখানে টারা আড়াল হয়ে গেল, ডগউড গাছের একটা ঝাড়ের তলায় ব্রেন্ট রাশ টেনে ঘোড়া থামাল। স্টুয়ার্টও থামল, ডার্কি ছেলেটাও ওদের কয়েক পা পেছনে থেমে গেল। রাশ আলগা হতেই ঘোড়াদুটো গলা বাড়িয়ে জমিতে গজিয়ে ওঠা নরম ঘাস খেতে আরম্ভ করল। সহিষ্ণু হাউন্ডদুটো আবার নরম লাল ধুলোর ওপর এলিয়ে পড়ে সন্ধ্যা নেমে ক্রমশ আঁধার হয়ে আসা আকাশে পাক খেতে থাকা চিলগুলোর দিকে সতৃষ্ণ নয়নে চেয়ে রইল। ব্রেন্টের চওড়া ছলাকলাহীন মুখে বিভ্রান্তির ছাপ, হয়ত সামান্য একটু ক্ষোভেরও।

“সত্যি করে বল তো,” ও বলে উঠল। তোর মনে হয়নি ও আমাদের সাপারে থাকতে বলবে?”

“মনে তো হয়েইছিল,” স্টুয়ার্ট বলল। “ওর বলার অপেক্ষাই তো করছিলাম, কিন্তু বললই না। কী মনে হচ্ছে রে তোর?”

“কিছুই বুঝতে পারছি না। আমারও তো মনে হয়েছিল, হয়ত বলবে। বাড়ি ফেরার পর আজই তো আমাদের প্রথম দিন।  কতদিন পরে আমাদের দেখল। ওকে অনেক কিছু বলারও তো ছিল আমাদের!”

“আমাদের দেখে খুব খুশি হয়েছিল বলেই মনে হয়েছিল।”

“আরে, আমারও তো তাই মনে হয়েছিল।”

“আর তারপর, এই আধঘন্টাটাক আগে, ও কেমন যেন থম মেরে গেল, যেন মাথা ধরেছে ওর।”

“ব্যাপারটা আমিও লক্ষ্য করেছিলাম তো, কিন্তু গুরুত্ব দিইনি।  কী মনে হয় তোর, কী ওকে এত ভাবাচ্ছিল?”

“জানি না। তোর কি মনে হয়, আমরা এমন কিছু বলেছি যাতে ও রেগে গেছে?”

দুজনেই মিনিটখানেক চুপচাপ ভাবতে লাগল।

“কিছুই তো সেরকম মনে আসছে না। তাছাড়া, স্কারলেট যখন রেগে যায়, সবাই জানতে পারে। অন্যান্য মেয়েদের মত চুপ করে থাকা ওর স্বভাবে নেই।”

“হ্যাঁ, তাও তো বটে। আর ওর স্বভাবের এই দিকটাই আমার খুব ভাল লাগে। মুখ ভার করে থাকা, চোখেমুখে ঘৃণা নিয়ে ঘোরাফেরা করা, ও এসবের ধারই ধারে না – রেগে গেলে সেটা ও জানান দিয়েই ছাড়বে। একটা কিছু আমরা বলেছিলাম, যার জন্য ও চুপ করে গেল, কেমন যেন ওকে অসুস্থ মনে হচ্ছিল। আমাদের দেখে ও যে দারুণ খুশি হয়েছিল, সে আমি বুকে হাত রেখে বলতে পারি, আর আমাদের সাপারে থাকতে বলার কথাও ভেবেছিল।”

“আমাদের বের করে দিয়েছে বলেই হয়ত। তুই ঠিক জানিস?”

“আরে, না! বোকার মত কথা বলিস না। আমাদের কথা শুনে ও তো হেসে কূল পাচ্ছিল না। তাছাড়া ওই পড়াশোনা, বইখাতার ব্যাপারে আমাদের মতই ওরও কিচ্ছু এসে যায় না।”

ব্রেন্ট লাগামটা একটু ঘুরিয়ে নিয়ে নিগ্রো সহিসকে ডাকল।  

“জীমস!”

হুজুর?”

মিস স্কারলেটের সঙ্গে যেসব কথা হচ্ছিল, তুই শুনেছিলি?”

“নাহ্‌, হুজুর, মিস্ট’ ব্রেন্ট! আপনেদের মত সাদা চামড়ার  কথায় আড়ি পাতব, এটা আপনি ভাবলেন কেন?”

“আড়ি পাতা! বাজে কথা ছাড়! তোরা নিগ্রোরা সব খবর রাখিস। মিথ্যুক কোথাকার, নিজের চোখে দেখেছি, তুই বারান্দার এক কোণে দাঁড়িয়ে চন্দ্রমল্লিকার ঝোপের ওপর ঝুঁকে পড়ে আড়ি পাতছিলি। এখন বল, আমাদের এমন কিছু বলতে শুনেছিলি যাতে মিস স্কারলেট রেগে উঠতে – মানে ওর মনে কষ্ট হতে পারে?”

এইভাবে আবেদন নিবেদন করার পর,  আড়ি পাতা নিয়ে আর বেশি ভণিতা না করে জীমস কালো ভুরু কুঁচকে তাকাল।

“নাহ্‌ হুজুর, আপনেরা এমন কিছু বলেননিকো যে উনি রেগে যেতি পারেন। বরঞ্চ আপনেদের দেখি উনি খুশিই হইছিলেন, আপনেদের অনেকদিন দেখেন নাই কিনা, তাই পাখির মতন কলকল করে অনেক কথা বলছিলেন। মিস্ট’ অ্যাশলের সঙ্গে মিস মেলির শাদির কথা যতক্ষণ আপনেরে না তুললেন ততখন।  তারপরে উনি চুপ করি গেলেন বাজ উড়তি দেখি, পাখি যেমন থম মারি যায়।”

দু’ভাই দৃষ্টি বিনিময় করে মাথা নাড়ল, কিছু না বুঝেই।

“জীমস ঠিকই বলছে। তবে কেন সেটা মাথায় আসছে না,” স্টুয়ার্ট বলল। “হায় রে কপাল! অ্যাশলের সঙ্গে ওর কিছু আছে বলে তো জানি না, ও তো কেবল একজন বন্ধু। অ্যাশলেকে নিয়ে ওর কোনো পাগলামি নেই,  ওর পাগলামিটা তো আমাদের নিয়েই।”

ব্রেন্ট মাথা নেড়ে সায় দিল।

“কিংবা হয়ত,” ও বলল, “কালকের বাগদানের ব্যাপারটা অ্যাশলে স্কারলেটকে নিজেই জানায়নি, তাই হয়ত ও অ্যাশলের ওপর চটে আছে। সবাইকে জানানোর আগে, পুরনো এক বন্ধুকে জানাবে না? আরে মেয়েরা এই সব আগে থেকে জেনে ফেলার ব্যাপারকে বড় বেশি গুরুত্ব দেয়।”

“তাই হবে হয়ত। কিন্তু কালই যে হবে এটা ওকে না জানালে এমন কি এসে যায়? একটু চমক দেবার জন্যেই ব্যাপারটা গোপন রেখেছে, নিজের বাগদানের ব্যাপার নিয়ে বেশি হইচই না হোক, সেটা নিশ্চিত করার অধিকার তো ওর আছেই, তাই না? মিস মেলির পিসি না বললে, আমরাও তো জানতে পারতাম না। কিন্তু অ্যাশলে যে একদিন না একদিন মিস মেলিকেই বিয়ে করত, সেটা তো স্কারলেটের না জানার কথা নয়। আমরা তো বহু বছর ধরেই জানি। উইল্কস আর হ্যামিলটনরা ওদের মামাতো মাসতুতো ভাইবোনের মধ্যেই বিয়ে করে। সবাই মোটামুটি জানতই অ্যাশলে মেলানিকেই একদিন বিয়ে করবে, ঠিক যেমন হানি উইল্কস মিস মেলির ভাই চার্লসকেই বিয়ে করবে।”

“বেশ তো, আমি হাত তুলে দিলাম। তবে ও আমাদের সাপারে থাকতে না বলায়, আমি দুঃখ পেয়েছি।  বাড়ি ফিরে এখনই বহিষ্কার নিয়ে মায়ের সামনে পড়তে একটুও মন চাইছে না রে। যেন এই প্রথমবার আমাদের বের করে দেওয়া হল!”

“এতক্ষণে বয়েড হয়ত মাকে সামাল দিয়ে উঠতে পেরেছে। জানিসই তো বাঁটকুলটা কথা ঘোরাতে কিরকম ওস্তাদ। প্রত্যেকবার মাকে ও-ই সামলে নেয়।”

“হ্যাঁ, বয়েড সত্যিই পারে, তবে ওকে একটু সময় দেওয়া দরকার। ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে কথা বলতে বলতে মাকে এমন গুলিয়ে দেবে যে মা শেষ পর্যন্ত হাল ছেড়ে দিয়ে ওকে বলবেন যে এই সব কথার মারপ্যাঁচ বরং ওকালতি করার জন্য তুলে রাখুক।  কিন্তু এত অল্প সময়ে বেচারা গুছিয়ে শুরুই করতে পারেনি হয়ত।  আমি তোকে বলে দিতে পারি যে মা নতুন ঘোড়াটা নিয়েই এতই উত্তেজিত যে আমরা বাড়ি ফিরে এসেছি সেটা আজ সন্ধ্যেবেলা সাপারের সময় বয়েডের সঙ্গে দেখা না হওয়া পর্যন্ত ধরতেই পারবেন না।  আর সাপার শেষ হওয়ার আগে থেকেই ওঁর নিঃশ্বাস দিয়ে আগুনের হলকা বেরোতে থাকবে। রাত দশটার আগে বয়েড বলবার সুযোগই পাবে না যে চ্যান্সেলার যে সুরে তোর আর আমার সঙ্গে কথা বলেছেন তার পরে মান বাঁচিয়ে আমাদের একজনের পক্ষেও ওই কলেজে থেকে যাওয়া সম্ভব ছিল না।  তারপর চ্যান্সেলরের বিরুদ্ধে মাকে তাতিয়ে দিতে দিতে মাঝরাত পেরিয়ে যাবে, তখন মা বয়েডের কাছে জানতে চাইবেন ও সঙ্গে সঙ্গে ওঁকে গুলি চালিয়ে দিল না কেন। না রে, মাঝরাতের আগে কিছুতেই বাড়ি ফেরা যাবে না।”

বিষণ্ণ মুখে দুই ভাই একে অপরের পানে চাইল। বুনো ঘোড়াই বল কি বন্দুক হাতে লড়াই কি পাড়াপড়শিদের গালাগালি – কোনো কিছুতেই এরা ভয় পেয়ে পিছু হঠবার পাত্রই নয়, কিন্তু ওদের লালচুলো মায়ের বাক্যবাণকে বিশেষ করে ওঁর অশ্বারোহণের চাবুককে ওরা যমের মত ভয় পায়। ওই চাবুক ওদের ওপর চালিয়ে দিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেন না।

“শোন,” ব্রেন্ট বলল। “চল, উইল্কসদের ওখানেই যাওয়া যাক। অ্যাশলে আর ওর বোনেরা সাপারে আমাদের পেলে শুশিই হবে।”

স্টুয়ার্টকে একটু অস্বচ্ছন্দ দেখাল।

“উহুঁ, ওখানে না যাওয়াই ভাল। আমরা গিয়ে পড়লে ওদের কালকের বারবেকিউর জন্য প্রস্তুত হতে অসুবিধে হবে আর তাছাড়া – ”

“ও, হ্যাঁ হ্যাঁ, আমি ভুলেই গেছিলাম সেকথা,” ব্রেন্ট তাড়াতাড়ি বলে উঠল। “না, ওখানে যাওয়া চলবে না।”

নিজের নিজের ঘোড়ায় বসে ওরা দুজনেই নীরবে পাশাপাশি যেতে লাগল, কিছুটা সময়। স্টুয়ার্টের বাদামি গাল অস্বস্তিতে লালচে হয়ে উঠেছে। গত বছর গরমের সময় পর্যন্ত স্টুয়ার্ট ইন্ডিয়া উইল্কসের সঙ্গে প্রেম করত, দুই পরিবারের এবং সমগ্র কাউন্টির অনুমোদনও ছিল তাতে।  কাউন্টির মানুষদের মনে হয়েছিল যে ইন্ডিয়া উইল্কসের শান্ত আর সংযত স্বভাব হয়ত ওর উড়নচণ্ডে স্বভাবকে বাগে আনতে পারবে।  অন্তত এরকম একটা আশা ওদের মনে ছিল। এই বিয়েতে স্টুয়ার্ট খুব সম্ভব রাজিও হয়ে যেত, কিন্তু ব্রেন্ট খুশি ছিল না। ব্রেন্ট ইন্ডিয়াকে পছন্দই করত, কিন্তু ওর মনে হত ও বড়ই সাদামাটা আর গোবেচারা, আর শুধু স্টুয়ার্টকে সঙ্গ দেবার জন্যই ওর প্রেমে পড়তে ব্রেন্টের আপত্তি ছিল। সেবারই প্রথম যমজ দুই ভাইয়ের পছন্দ দুই ভিন্ন খাতে বইতে শুরু করেছিল। একটি মেয়ে – যাকে ব্রেন্টের কখনোই অসাধারণ মেয়ে বলে মনে হয়নি – তার প্রতি ভাইয়ের আগ্রহ দেখে একটু বিরক্তই হয়েছিল।  

তারপর, গত বছর গ্রীষ্মের সময় জোনসবোরোতে, ওক গাছ ঘেরা এক উপবনে রাজনৈতিক সমাবেশে গিয়ে ওরা স্কারলেট ও’হারার অস্তিত্ব আবিষ্কার করল।  অনেক বছর ধরেই ওরা ওকে চেনে, ছেলেবেলায় ওদের প্রিয় খেলার সাথীদের মধ্যে একজন, কারণ ও ঘোড়ায় চড়তে পারত, গাছে উঠতে পারত, প্রায় ওদেরই মত অনায়াস দক্ষতায়। কিন্তু সেদিন ওকে দেখে ওরা চমকে উঠল, এতদিনে ও শুধু সাবালিকাই হয়ে ওঠেনি, অত্যন্ত আকর্ষণীয় একজন নারীতে রূপান্তরিত হয়েছে।  

ওর সবুজ চোখদুটো কেমন কথায় কথায় নেচে ওঠে, হাসলে ওর গালে কী গভীর টোল পড়ে, কী ক্ষুদ্রকায় ওর হাতের আর পায়ের গড়ন, আর ওর কটিদেশ কত সরু – ওরা এই প্রথম খেয়াল করল। ওদের মেয়ে-পটানো মন্তব্যে ও একেবারে হেসে লুটিয়ে পড়ল। ও ওদের এক অসাধারণ  জুটি বলে ধরে নিয়েছে ভেবে, একটু বেশি বেশি করেই নিজেদের জাহির করল।

যমজ ভাইদের জীবনে দিনটা খুবই স্মরণীয় হয়ে রইল। এর পর থেকে যখনই ওরা এই ব্যাপারটা নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে, ওদের মধ্যে বিস্ময়ের অবধি থাকে না কেন স্কারলেটের আকর্ষণ ওরা আরও আগেই লক্ষ্য করেনি।  সঠিক জবাবটা ওরা কোনোদিনই আন্দাজ করতে পারেনি, আর সেটা হল সেদিন স্কারলেট চেয়েছিল বলেই ওরা লক্ষ্য করেছিল।  একজন পুরুষমানুষ ওর প্রেমে না পড়ে অন্য কোনো মহিলার প্রেমে পড়বে এটা  সজ্ঞানে স্কারলেট হতে দিতে পারে না। ইন্ডিয়া উইল্কস আর স্টুয়ার্টকে এক সঙ্গে সমাবেশে দেখে ওর শিকারি সত্তা জেগে না উঠে পারল না। কেবল স্টুয়ার্টেই থেমে না থেকে টুপিটা ও ব্রেন্টের মাথাতেও পরিয়ে দিল আর কাজটা এত সুক্ষ্মভাবে করল যে দুজনেই মাত খেয়ে গেল।  

ইদানিং ওরা দুজনেই স্কারলেটের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে। ইন্ডিয়া উইল্কস আর লাভজয়ের লেটি মুনরো, ব্রেন্টের সঙ্গে যার ওপর ওপর একটা প্রেম চলছিল, এরা দুজনেই এখন ওদের হৃদয়ের পেছনের সারিতে চলে গেছে। স্কারলেট যদি ওদের মধ্যে কোনও একজনকে বেছে নেয়, তাহলে অন্য জন কী করবে সেটা ওরা ভেবে দেখেনি। যখন সেরকম কিছু হবে তখন দেখা যাবে।  ওরা দুজনে একে অপরকে হিংসে করত না, তাই দুজনেরই যখন আবার একই মেয়ের ব্যাপারে মতৈক্য হল, তখন মনে মনে ওরা নিশ্চিন্তই হল।  এরকম  একটা পরিস্থিতি পাড়াপড়শিদের কাছে অত্যন্ত আগ্রহসহকারে লক্ষ্য করার মত বিষয় হয়ে দাঁড়াল, আর ওদের মা, যিনি স্কারলেটকে দু’চক্ষে দেখতে পারতেন না, অত্যন্ত বিরক্ত হলেন।

“ওই সেয়ানা ডাইনিটা যদি সত্যিই তোমাদের মধ্যে একজনকেই বেছে নেয়, তো বেশ হবে,” উনি বলেছিলেন। “এমনও হতে পারে, তোমাদের দুজনকেই বিয়ে করতে রাজি হয়ে গেল, তখন তোমাদের পাততাড়ি গুটিয়ে উটায় চলে যেতে হবে, অবশ্য মর্মনরা যদি মেনে নেয় তোমাদের … আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে সেই ব্যাপারে … যেটা আমার ভয়, একদিন না একদিন ওই দু’মুখো, সবুজচোখো ডাইনিটাকে নিয়ে তোমাদের মধ্যে লড়াই বেঁধে যাবে, দুজনে দুজনকে হিংসে করতে শুরু করবে, আর তোমার একে অপরের ওপর গুলি চালিয়ে মরবে! তা সেটা হলেও খুব একটা খারাপ কিছু হবে না!”

সেই সমাবেশের পর থেকে ইন্ডিয়ার উপস্থিতিতে স্টুয়ার্ট অস্বস্তি বোধ করে। এই সহসা আনুগত্য বদলের জন্য ইন্ডিয়া অবশ্য ওর সঙ্গে ঝগড়াঝাঁটি কিছুই করেনি, এমনকি দৃষ্টিবাণেও জর্জরিত করেনি। আপাদমস্তক ইন্ডিয়া একজন লেডি। কিন্তু তা সত্ত্বেও ইন্ডিয়ার সামনে অস্বস্তিটা কাটিয়ে উঠতে পারে না।  ও জানে যে ইন্ডিয়া ওর সনির্বন্ধতার কারণেই ওকে ভালবেসেছিল, আর এটাও জানে যে ইন্ডিয়া এখনও ওকেই ভালবাসে। হৃদয়ের গভীরে অনুভবও করে, ইন্ডিয়ার সঙ্গে ওর আচরণটা একেবারেই ভদ্রলোকের মত হয়নি। ওর শান্ত, মার্জিত স্বভাব আর শিক্ষা এবং আরও অসংখ্য গুণের জন্য এখনও স্টুয়ার্ট ইন্ডিয়াকেই ভীষণভাবে পছন্দ করে।  কিন্তু স্কারলেটের বৈচিত্রময়, উজ্জ্বল এবং সদা পরিবর্তনশীল উপস্থিতির পাশে ওকে বড়ই একঘেয়ে আর ফ্যাকাশে মনে হতে থাকে। ইন্ডিয়া পাশে থাকলে তোমার অবস্থিতি ঠিক কোথায় সেটা নিয়ে কোনও সংশয় থাকে না, কিন্তু স্কারলেট পাশে থাকলে  তার বিন্দুমাত্র আঁচ তুমি পাবে না। এই আকর্ষণ একজন পুরুষমানুষের হৃদয় বৈকল্য ঘটিয়ে দেবার জন্য যথেষ্ট।

“ঠিক আছে, আমরা তাহলে কেড ক্যালভার্টদের কাছেই যাই, ওখানেই সাপার করব। স্কারলেট বলছিল, ক্যাথলীন নাকি চার্লসটন থেকে বাড়ি ফিরে এসেছে। ফোর্ট সামটার নিয়ে ওর কাছে কোনো খবর থাকতেও পারে, যা আমরা শুনিনি।”  

“ক্যাথলীন! আরে না, রে! আমি বাজি ধরতে পারি যে ফোর্টটা ওই বন্দর শহরে সে কথাটাই ওর জানা নেই, আমরা বম মেরে তাড়িয়ে দেবার আগে ওটা যে ইয়াঙ্কিরাই দখল করে রেখেছিল, সেটা জানা তো অনেক দূরের ব্যাপার!  কটা বলড্যান্সে ও গেছে আর কটা ছেলেকে ও পাকড়াও করতে পেরেছে, সেটা ছাড়া আর কিছু বলতেই পারবে না।”

“সে ওর বকর বকর শুনতে বেশ মজাই লাগে। তাছাড়া মা ঘুমোতে না যাওয়া পর্যন্ত লুকিয়ে থাকার একটা জায়গা তো পাওয়া যাবে।”

“বেশ, বেশ! সে ক্যাথলীনকে আমি পছন্দই করি আর ওর আবোলতাবোল কথা শুনতে আমারও মজাই লাগে। ক্যারো রেট আর চার্লসটনের অন্যান্য লোকজনদের কথাও জানা যাবে। কিন্তু ওর ওই ইয়াঙ্কি সৎ মায়ের সঙ্গে এক টেবিলে বসে আবার খাওয়াদাওয়া করতে হবে ভাবতেই গায়ে জ্বর আসছে।”

“এভাবে বলিস না, স্টুয়ার্ট,  ওঁর সম্বন্ধে। মানুষটা কিন্তু খারাপ নন।”

“না, সেভাবে বলতে চাইনি। দুঃখই হয় ওঁর জন্য আমার, কিন্তু যাঁদের জন্য আমার দুঃখ হয়, তাঁদের আমি ঠিক পছন্দ করতে পারি না। আর এত তালগোল পাকিয়ে ফেলেন যে কী বলব। উনি সর্বদা চেষ্টা করেন যাতে তোর অস্বস্তি না হয়, কিন্তু প্রত্যেকবারই এমন কিছু বলে ফেলবেন বা করে ফেলবেন যাতে একেবারে উলটো ফল হয়। আমার তখন মাথাটা একেবারে গরম হয়ে ওঠে! উনি তো আবার দক্ষিণীদের অসভ্য বর্বর বলে মনে করেন। এমনকি মাকেও কথাটা বলে সেরেছেন! আসলে উনি দক্ষিণীদের ভয় পান। আমাদের দেখলেই উনি ভয়ে একেবারে সিঁটিয়ে যান। ভয়ে জড়সড় হয়ে চেয়ারে বসে থাকেন যে কেউ এক পা এগোলেই উনি আর্তনাদ করে লাফ মেরে পালাবেন।”

“কিন্তু তুই ওঁকে দোষ দিতে পারিস না। কেডের পায়ে গুলি তো তুই করেইছিলি।”

“সত্যি কথা, কিন্তু জ্বালাতনের একশেষ হয়ে গেছিলাম,  নইলে  অমন কাজ আমি করতামই না,” স্টুয়ার্ট জবাব দিল। “আর তার জন্য কেড তো মনে কোনো রাগ পুষে রাখেনি।  ক্যাথলীন বা রাইফোর্ড বা মিস্টার ক্যালভার্টও রাখেননি। কেবল ওই ইয়াঙ্কি সৎমা’ই চেঁচামেচি করে আমাকে বর্বর বলে গাল পেড়ে বলেছিলেন দক্ষিণের বর্বর লোকেদের কাছে কোনও সভ্য মানুষই নাকি নিরাপদ নয়।”

“তাও তুই ওঁর দোষ ধরতে পারিস না। উনি হলেন একজন ইয়াঙ্কি, তাই ভদ্র ব্যবহার ওঁর কাছ

থেকে আশা করা যায় না, তাছাড়া গুলি তুই চালিয়েছিলি, আর কেড হল ওঁর সৎ ছেলে।”

“আরে রাখ তো! আমাকে অপমান করার জন্য এটা যথেষ্ট কারণ হতেই পারে না!  তুই তো মায়ের নিজের ছেলে, কিন্তু টোনি ফোনটেন যখন তোর পায়ে গুলি চালিয়ে দিয়েছিল, তখন কি মা ওকে খারাপ কথা বলেছিলেন? উনি শুধু বুড়ো ডঃ ফোনটেনকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন তোকে ড্রেস করে দেবার জন্য আর ডাক্তারবাবুর কাছে টোনির লক্ষ্যভ্রষ্ট হবার কারণ জানতে চেয়েছিলেন। মা বললেন, ওঁর অনুমান নেশা করার জন্যই ওর লক্ষ্যভেদ করার ক্ষমতা নষ্ট হয়ে গেছে। মনে আছে, এটা শুনে টোনি কী রেগেই না গেছিল?”

দুজনেই জোরে জোরে হেসে উঠল।  

“সত্যি মায়ের তুলনা নেই!” বেশ আবেগের সঙ্গে ব্রেন্ট বলে উঠল। “যখন যেমন করা উচিত, মা ঠিক তাই করেন, বাইরের লোকের সামনে তোকে কখনোই অস্বস্তিতে ফেলবেন না।”

“কিন্তু আজ রাতে বাড়ি ফিরে গেলে বাপি আর বোনেদের সামনেই হেনস্থা হবার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে,” বিরস মুখে স্টুয়ার্ট বলল। “সেটা হলে, ব্রেন্ট, আমাদের ইউরোপে ঘুরতে যাওয়া বাতিল হয়ে যাবে।  তোর মনে নেই, মা বলছিলেন আরও একবার যদি কোনো কলেজ থেকে আমাদের তাড়িয়ে দেওয়া হয়, তাহলে এই জমকালো সফর থেকে আমরা বাদ চলে যাব?”  

“আরে যেতে দে! সত্যিই কি কিছু এসে যায়, তুইই বল?  আরে আছে কী ইউরোপে দেখার মত?  বাজি রেখে বলতে পারি, ওই সব বিদেশিদের আমাদের দেখানোর মত এমন কিছুই নেই যা আমাদের  এই জর্জিয়াতেই পাওয়া যাবে না!  ওদের ঘোড়াও আমাদের ঘোড়ার থেকে জোরে দৌড়তে পারে না, ওখানকার মেয়েরাও আমাদের মেয়েদের মত সুন্দরী নয়, আর ওরা যে রাই হুইস্কি খায় সেটা আমাদের বাপির হুইস্কির ধারে কাছেও যায় না!”

“অ্যাশলে বলছিল, ওদের দেশের প্রাকৃতিক দৃশ্য নাকি অত্যন্ত মনোরম, আর সংগীতও। ইউরোপ অ্যাশলের ভাল লেগেছে। সব সময় ওখানকার কথাই বলতে থাকে।”

“তা – উইল্কসরা কেমন ধারার মানুষ, জানিসই তো। সংগীত, বই আর প্রাকৃতিক দৃশ্য এসব নিয়েই ওঁদের পাগলামির শেষ নেই। মা বলেন, ওঁদের ঠাকুর্দা ভার্জিনিয়া থেকে এসেছিলেন বলেই নাকি ওঁরা এরকম।  ভার্জিনিয়ার মানুষ নাকি এসব জিনিসকে খুব উঁচু নজরে দেখেন।”

“ওঁদের ওসব নিয়েই মশগুল থাকতে দাও।  আমাকে চড়বার জন্য একটা ভাল ঘোড়া দাও, আর ভাল তাড়ি দাও পান করার জন্য, আর একটা ভাল মেয়ে দাও প্রেম করার জন্য আর একটা মন্দ মেয়ে দাও মজা করার জন্য – বাকিরা ইউরোপ নিয়েই মেতে থাকুক … সফরে যেতে না পারলে কী এসে যায়? ধরে নে, আমরা এখন ইউরোপে, যদি যুদ্ধ লেগে যায়? তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে আসতেই পারব না। ইউরোপ যাওয়ার চেয়ে যুদ্ধে যেতে পারলেই বরং বেশি খুশি হব।”

“আমি ঠিক তাই, যে কোনো দিন … দ্যাখ, ব্রেন্ট! সাপারের জন্য আমরা কোথায় যেতে পারি, আমি বুঝে ফেলেছি। জলাভূমিটা পেরিয়ে, চল, আমরা অ্যাবল্‌ ওয়াইন্ডারদের ওখানে যাই আর বলি আমরা চার ভাই আবার বাড়ি ফিরে এসেছি, আর কুচকাওয়াজ করার জন্য তৈরি।”

“এটা বেড়ে বলেছিস!” ব্রেন্ট উত্তেজনায় চেঁচিয়ে উঠল। “ট্রুপের ব্যাপারে তাজা খবরগুলো পাওয়া যাবে, আর ইউনিফর্মের জন্য কোন রঙটা ঠিক করা হল সেটাও জানা যাবে।”

“জ়ুয়েভ হলে কেলো হবে – ট্রুপে যোগ দেব কিনা ভেবে দেখতে হবে। ঐ ঢোলা ঢোলা লাল রঙের প্যান্টে আমাকে একেবারে বোকা বোকা দেখাবে। মেয়েদের লাল রঙের চুড়িদারের  মত লাগে ওগুলো!”

“আপনেরা মিস্ট’ ওয়াইন্ডারদের ‘খানে যাবেন বলে ভাবছেন? যদি ত্যামনটা ভেবে থাকেন, ‘খানে খুব বেশি খাবার জুটবে না,” জীমস বলে উঠল। “ওদের রাঁধুনি মরে গেল, নতুন কারুরে কেনেনি, খেতির মজুর রান্নাবান্না করছে, আর নিগাররা  আমাকে কয়েছে, ওর চেয়ে ঘটিয়া রাঁধুনি পাওয়া যায় না।”

“হে ভগবান! নতুন একটা রাঁধুনি কিনছে না কেন?”

“ঘটিয়া কিসিমের সাদা চামড়ার আদমি, কী করে নিগার কিনবে? চারটের বেশি নিগার ওদের কোনোদিনই ছিল না।”  

জীমসের গলায় শ্লেষের সুরটা স্পষ্ট। টার্লটনদের মালিকানা একশজন ক্রীতদাসের ওপর, তাই ওর সামাজিক মর্যাদা বিপন্ন নয়। বড় বড় প্ল্যান্টারদের ক্রীতদাসদের মতই ছোট ছোট চাষী – যাদের ক্রীতদাসের সংখ্যা অল্প – তাদের ও একটু খাটো চোখেই দেখত।

“মেরে তোর ছাল চামড়া তুলে নেব আমি, ওই কথাটা বলার জন্য,” স্টুয়ার্ট হিংস্র গলায় চেঁচিয়ে উঠল। “খবরদার, অ্যাবল্‌ ওয়াইন্ডারকে যদি ‘ঘটিয়া কিসিমের সাদা চামড়ার আদমি’ বলেছিস তো!  ওর নামে কেউ যদি খারাপ কথা বলে – সে নিগারই হোক কি সাদা চামড়া – আমি তাকে আস্ত রাখব না।  এই কাউন্টিতে ওর থেকে যোগ্য লোক আর একজনও নেই, মুখ দেখে তো আর ট্রুপ ওকে লেফটেনান্ট হিসেবে বেছে নেয়নি!”

“সেটা তো আমি নিজেও সমঝতে পারিনি,” জীমস জবাব দিল, ওর মালিকের ভ্রূকুটি দেখেও বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে। “আমি ভেবেছিলাম শুধু আমির লোকদেরই অফিসার বানানো হবে, ঘটিয়া ছোটলোকদের নয়।”

“ও মোটেই ‘ঘটিয়া ছোটলোক’ নয়!  তুই কি ওর তুলনা স্ল্যাটারিদের মত সত্যিকারের সাদা চামড়ার আবর্জনাগুলোর সঙ্গে করছিলিস? অ্যাবল বড়লোক নয়। ছোট চাষী ও, বড় প্ল্যান্টার নয়, কিন্তু ছেলেরা যদি ওকে লেফটেনান্ট হবার যোগ্য মনে করে থাকে, তাহলে কোনো ডার্কিরই ওকে অপমান করবার আস্পর্ধা দেখানোর হক নেই। ট্রুপ ভাল মনে করেছে, তাই করেছে।”

ট্রুপের অশ্বারোহী বাহিনীর গঠন মাস তিনেক আগে করা হয়েছে, ঠিক যেদিন জর্জিয়া ইউনিয়ন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল, আর তখন থেকেই নবনিযুক্ত ছেলেরা রণহুঙ্কার দিয়ে আসছে। বাহিনীর নামটা এখনও দেওয়া হয়নি, তবে সেটা নামের অভাবের জন্য নয়। এই ব্যাপারে প্রত্যেকেরই নিজস্ব কিছু না কিছু মতামত ছিল, আর কেউই নিজের মত থেকে সরে আসতে রাজি হচ্ছেন না। ‘ক্লেটন ওয়াইল্ড ক্যাটস’, ‘ফায়ার ঈটার্স’, ‘নর্থ জর্জিয়া হুসার্স’,  ‘দ্য ইনল্যান্ড রাইফেলস’ (যদিও ট্রুপকে রাইফেল নয়, পিস্তল, তরবারি  আর ছোরা দেওয়া হবে), ‘দ্য ক্লেটন গ্রেজ়’, ‘দ্য ব্লাড থান্ডারারস’, ‘দ্য রাফ অ্যান্ড রেডিজ়’ – প্রতিটা নামেরই কিছু কিছু সমর্থনকারী ছিলেন। নামের ব্যাপারে ফয়সলা না হওয়া পর্যন্ত বাহিনীকে দ্য ট্রুপ নামেই অভিহিত করা হচ্ছে, এবং যদিও পরে একটা বাগাড়ম্বরপূর্ন নাম দেওয়া হয়, তবুও এই বাহিনীর প্রয়োজন ফুরনোর আগে পর্যন্ত এর ‘দ্য ট্রুপ’ নামটাই টিকে গেল।

কারা কারা অফিসার হবে, সেটা সদস্যরাই বেছে নিয়েছে, কারণ মেক্সিকান আর সেমিনোল যুদ্ধের দু’চারজন অভিজ্ঞ প্রবীণ ছাড়া কাউন্টির কারোরই সামরিক অভিজ্ঞতা ছিল না, তাছাড়া একজন অভিজ্ঞ প্রবীণকে দলনেতা হিসেবে মেনে নিলে অনেকেই আপত্তি ওঠাবে, যদি না তারা তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে পছন্দ বা বিশ্বাস করে। টার্লটনদের চার ভাইকে সকলেই পছন্দ করত, ফোনটেনদের তিন ভাইকেও, কিন্তু খুব দুঃখের সঙ্গেই বাছাইয়ের তালিকা থেকে ওদের নাম বাদ দিতে হল, কারণ টার্লটনরা বড় সহজেই সংযম হারিয়ে স্থান কাল পাত্র ভুলে যায়, আর ফোনটেনরা অত্যন্ত রগচটা, একেবারে খুনে মেজাজ ওদের। অ্যাশলে উইল্কস কাউন্টির সব চাইতে ভাল ঘোড়সওয়ার আর মাথাটাও ঠাণ্ডা থাকায় বাহিনীর মধ্যে একটা শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পারবে, তাই ওকেই ক্যাপটেন বাছা হয়েছে। রাইফোর্ড ক্যালভার্টকে করা হয়েছে ফার্স্ট লেফটেনান্ট, কারণ সবাই রাইফকে পছন্দ করে, আর অ্যাবল ওয়াইন্ডার –  একজন জেলের সন্তান এবং নিজেও একজন ছোট চাষী –  ওকে করা হল সেকেন্ড লেফটেনান্ট।  

অ্যাবল একজন বিচক্ষণ মানুষ, বিশালাকায়, রাশভারি, নিরক্ষর কিন্তু সহৃদয় ব্যক্তি। অন্য ছেলেদের তুলনায় বয়সে কিছু বড় কিন্তু অন্যদের মতই কিংবা হয়ত অন্যদের তুলনায় বেশিই মহিলাদের সম্ভ্রম দেখাতে জানত। ট্রুপে খুব একটা কেউই উন্নাসিক ছিল না। ওদের অনেকেরই বাপ পিতামহ ছোট চাষী থেকে ধীরে ধীরে সমৃদ্ধ হয়েছেন। তার ওপরে ট্রুপে অ্যাবল ছিল সর্বশ্রেষ্ঠ লক্ষ্যবিদ, বলা হয় পঁচাত্তর গজ দূর থেকেও কাঠবেড়ালির চোখ দেখে লক্ষ্যভেদ করতে পারে, মাঠেঘাটে দিন কাটানো, ঝড়বৃষ্টির মধ্যে আগুন জ্বালবার বন্দোবস্ত করা, হারিয়ে যাওয়া পশুর সন্ধান লাগানো আর জলের উৎস খুঁজে বের করতে বেশ পারদর্শী ছিল। ট্রুপ এই সব গুণের কদর করে, আর যেহেতু মানুষটাও ওদের সবার পছন্দের, ওকেও অফিসারের দায়িত্ব দেওয়া হল। এই সম্মান ওর পাওয়ারই ছিল, আর অযথা কোনোরকম হামবড়া ভাব না দেখিয়ে বিনয়ের সঙ্গে এই সম্মান স্বীকার করে নিল। জন্মসূত্রে অ্যাবল বনেদি নয়, কথাটা প্ল্যান্টাররা গায় না মাখলেও তাঁদের পরিবারের মহিলারা কিন্তু ব্যাপারটা অত সহজে মেনে নিতে পারলেন না, এমনকি ক্রীতদাসরাও।

প্রথম প্রথম ট্রুপের নিয়োগ কেবল প্ল্যান্টারদের পুত্রদের মধ্য থেকেই করা হচ্ছিল, ভদ্রলোকদের বাহিনী, প্রত্যেকেই নিজের নিজের ঘোড়া, অস্ত্রশস্ত্র, ইউনিফর্ম এবং একজন ব্যক্তিগত ভৃত্য সঙ্গে নিয়ে আসবে। কিন্তু তরুণ ক্লেটন কাউন্টিতে ধনবান প্ল্যান্টারদের সংখ্যা অল্প, আর একটা পূর্ণ শক্তির ট্রুপের জন্য ছোট চাষী, কাঠুরে, জেলে, ক্র্যাকার এবং ব্যতিক্রমী ক্ষেত্রে কিছু দরিদ্র শ্বেতাঙ্গ – অবশ্যই অপেক্ষাকৃত স্বচ্ছল যারা – এদের ভেতর থেকেও নিয়োগ করে লোকবল বাড়াতে হয়েছিল।    

যুদ্ধ যদি লেগে যায়, ইয়াঙ্কি খেদানোর ব্যাপারে এই শ্রেণীর যুবকদের উৎসাহ ওদের অপেক্ষাকৃত ধনবান প্রতিবেশীদের তুলনায় কোনো অংশে কম ছিল না; কিন্তু এদের আর্থিক স্বচ্ছলতার অভাব একটা সুক্ষ্ম প্রশ্নচিহ্নের মত সামনে চলে এল। খুব কম ছোট চাষীরই নিজস্ব ঘোড়া ছিল। চাষবাসের কাজ এরা খচ্চর দিয়েই সারত আর এদের কাছে বাড়তি খচ্চরও ছিল না। নিদেনপক্ষে চারটে খচ্চরও খুব কম চাষীর কাছেই ছিল।  ট্রুপের কাছে গ্রহণযোগ্য হলেও, (যদিও তা একেবারেই নয়), যুদ্ধের জন্য এগুলো ছেড়ে দেওয়া যাবে না। দরিদ্র শ্বেতাঙ্গদের কাছে একটা খচ্চর থাকাটাই বিরাট ব্যাপার। কাঠুরে আর জেলেদের কাছে ঘোড়া বা খচ্চর কোনোটাই নেই।  এদের জীবিকানির্বাহ হত বন-জঙ্গল থেকে কেটে আনা কাঠ বা জলা থেকে জালে পড়া মাছ বিক্রি করে। এদের কাজ কারবার চলত বিনিময়ের মাধ্যমে, সারা বছরে নগদে পাঁচ ডলার দেখার ভাগ্যও সচরাচর এদের হত না। ফলে ঘোড়া বা ইউনিফর্ম নিয়ে আসা এদের সাধ্যের বাইরে।  প্ল্যান্টাররা যেমন নিজের নিজের ধনসম্পত্তি নিয়ে অহঙ্কার করতেন, এরাও নিজেদের দারিদ্র্য নিয়েও ঠিক ততটাই অহঙ্কার করত, ফলে দান হিসেবে বড়লোক পড়শিদের কাছ থেকে এরা কিছুই গ্রহণ করতে রাজি ছিল না।  এদের অনুভূতিতে যাতে আঘাত না লাগে আর ট্রুপকে যাতে পূর্ণতা দেওয়া যায়, স্কারলেটের পিতৃদেব, জন উইল্কস, বাক মুনরো, জিম টার্লটন, হিউ ক্যালভার্ট – অর্থাৎ অ্যাঙ্গাস ম্যাকিন্টশ বাদে কাউন্টির সমস্ত সমৃদ্ধ প্ল্যান্টার্রা ট্রুপকে ঘোড়া দিয়ে আর জওয়ানদের সাজসরঞ্জামের জন্য অর্থ সাহায্য করলেন।  বলা হল, প্রত্যেক প্ল্যান্টার নিজের সন্তান এবং নির্দিষ্ট সংখ্যক অন্যান্য সদস্যদেরও সাজসরঞ্জাম সরবরাহ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, কিন্তু বন্দোবস্তটা এমনভাবে করা হল যাতে অপেক্ষাকৃত গরীব সদস্যরা নিজেদের জন্য ঘোড়া আর ইউনিফর্ম মর্যাদা বিসর্জন না দিয়েই  গ্রহণ করতে পারবে।

সপ্তাহে দু’বার করে ট্রুপ জোন্সবোরতে একজোট হত – অনুশীলন করার জন্য আর লড়াই আরম্ভ হওয়ার জন্য সর্বান্তঃকরণে প্রার্থনা করতে। সকলের জন্য ঘোড়ার বন্দোবস্ত তখনও করা হয়ে ওঠেনি, কিন্তু যাদের নিজেদের ঘোড়া ছিল তারা আদালত চত্বরের পেছনের মাঠে, অনেক ধুলো উড়িয়ে, নিজেদের মধ্যে হুঙ্কার দিয়ে, আর নিজেদের বৈঠকখানা ঘরের দেওয়াল থেকে খুলে আনা তরবারি হাঁকিয়ে অনুশীলন করতে যেটা কল্পনায় ওরা অশ্ববাহিনীর রণকৌশল অনুশীলন করছে বলে মনে করত। যাদের কাছে তখনও ঘোড়া ছিল না, তারা বুলার্ড স্টোরের সামনের বাঁধানো পাথরের ওপর বসে অশ্বারোহী সঙ্গীদের মহড়া পর্যবেক্ষণ করত, তামাকপাতা চিবোতো, আর গুলতানি করত। কিংবা পিস্তল চালানোর অভ্যেস করত। ছেলেদের পিস্তল চালানো শেখানোর জন্য কোনো গুরুর দরকার নেই। বেশিরভাগ দক্ষিণের মানুষ বন্দুক হাতে নিয়েই জন্মগ্রহণ করে, আর মৃগয়া করে দিন কাটায়, ফলে ওরা অনায়াসেই ভাল নিশানাবাজ হয়ে ওঠে।  

প্ল্যান্টারদের বাড়ি আর জলার ধারের ক্যাবিন থেকে নানা ধরণের আগ্নেয়াস্ত্র এসে জড়ো হতে থাকে। তার মধ্যে লম্বা লম্বা বেশ কিছু স্কুইরেল গান আছে, অ্যালঘেনি পর্বত প্রথমবার পেরোনোর সময় সেগুলো আনকোরাই ছিল, কিছু পুরোনো মাজ়ল লোডার আছে, ১৮১২ সালে সেমিনোল যুদ্ধে এবং মেক্সিকোতে ব্যবহার হয়েছিল, আর কিছু রুপোর পাতে মোড়া ড্যুয়েলিং পিস্তল, পকেটে রাখার মত কিছু হ্যান্ড-গান, দোনলা রাইফেল, আর কিছু চকচকে কাঠের বাঁট লাগানো অত্যাধুনিক ইংলিশ রাইফেল।  

মহড়ার সমাপ্তি  অবধারিতভাবে জোন্সবোরোর পানশালাগুলোতে গিয়েই হত, আর রাত বাড়তে না বাড়তেই নিজেদের মধ্যেই এমন জোরদার লড়াই বেঁধে যেত (ইয়াঙ্কিদের সঙ্গে সংঘর্ষ তখনও ভবিষ্যতের গর্ভে),  যে অফিসাররা আহতদের আলাদা করতে গিয়ে রীতিমত হিমসিম খেয়ে যেতেন। এই রকমই একটা লড়াইয়ের সময় স্টুয়ার্ট টার্লটন কেড ক্যালভার্টের ওপর গুলি চালিয়েছিল আর টোনি ফোনটেন ব্রেন্টের ওপর। ট্রুপের গঠন হয়ে যাবার ঠিক পরেই ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য সদ্য বহিষ্কার হয়ে যমজ ভাই দুজন বাড়ি ফিরে এসেছে, প্রচুর উৎসাহ নিয়ে ওরা গিয়ে ট্রুপে যোগ দিল।  কিন্তু গুলি চলার ঘটনা ঘটার পর মা তল্পিতল্পা গুছিয়ে ওদের রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়ে দিলেন আর হুকুম দিলেন যেন ওরা ওখান থেকে না নড়ে। বাইরে থাকার জন্য এইসব অনুশীলনে এবং তার আনুষঙ্গিক উত্তেজনায় অংশগ্রহণ করতে না পেরে মনে মনে নিজেদের খুব বিচ্ছিন্ন বোধ করছিল। কী হবে লেখাপড়া করে, যদি না বন্ধুদের সঙ্গে ঘোড়ায় চড়ে আর রাইফেল চালিয়ে মজা না করা যায়?

“ঠিক আছে, আমরা ভেতর ভেতর দিয়ে অ্যাবলের ওখানে যাই,” ব্রেন্ট পরামর্শ দিল। “মিস্টার ও’হারার নদীর ঢালু বেয়ে আর ফোনটেনদের গরু চরানোর মাঠের পাশ দিয়ে গেলে এখুনি পৌঁছে যাব।”

“ওখানে গেলি কিন্তু কাঠবেড়ালির মাংস আর শাকসবজি ছাড়া কিছু জুটবেনি,” জীমস শেষ চেষ্টা করল।

“তোর তো কিছুই জুটবে না,” স্টুয়ার্ট একগাল হেসে বলল। “কারণ তোকে এখন বাড়ি ফিরতে হবে আর মা’কে বলতে হবে যে আমরা সাপারের জন্য বাড়ি যাচ্ছি না।”

“উরে বাবা, না, না!” জীমস কঁকিয়ে উঠল। “আমি যেতে পারবনি! মিস বিয়েট্রিসের পেটাইকে আপনাদের থেকে আমি কম ডরাই না। পত্থমেই, জানতে চাইবেন আমি আবার কেনে আপনাদের কলেজ থেকে বার হতে দিলম!  তারপরে জানতি চাইবেন, আপনেদের পেটানোর জন্যি বাড়ি নিয়ে এলম নাই কেনে। তারপর উনি আমার পেটাই করতি আরম্ভ করবেন। সব দোষ আমার উপর লাগবেক। আপনেরা মিস্ট’ উইন্ডারের ওখানে যদি নিয়ে না যান, আমি সারা রাত ধরি জঙ্গলে ছুপে থাকব, কে জানে টহলদার হয়ত আমাকে উঠাই লিবেক। রাগি থাকলে মিস বিয়াট্রিসের চাইতে টহলদারই ভাল।”

দুই ভাই কালো ছেলেটার মুখে সংকল্পের দৃঢ়তা দেখে ঘাবড়ে গেল, মনে মনে বিরক্তও হল।

“সেপাইদের হাতে ধরা পড়াটা ওর জন্য খুব বোকামি হবে, আর মা অনেকদিন ধরে চেঁচামেচি করার মত আরেকটা উপলক্ষ্য পেয়ে যাবেন। আসলে এই ডার্কিগুলোই যত নষ্টের গোড়া। মাঝে মাঝে মনে হয় এই বিলোপবাদীরা হয়ত ঠিক কথাই বলছে।”

“দ্যাখ, আমরা যেটার মুখোমুখি হতে চাইছি না, ওকেও সেটার মুখোমুখি হতে দেওয়াটা ঠিক হবে না বলেই মনে হচ্ছে। ওকে সঙ্গে নিতেই হবে। কিন্তু গাধা, কান খুলে শুনে নে, ওয়াইন্ডারদের ডার্কিদের কাছে তুই যদি বাতেলা মারার চেষ্টা করেছিস তো, যদি হাবেভাবে ওদের বোঝাতে যাস যে আমরা সব সময় ফ্রায়েড চিকেন আর হ্যামই খেয়ে থাকি আর ওদের খরগোশ আর কাঠবেড়ালি ছাড়া আর কিছুই জোটে না, তাহলে আমি –  আমি মায়ের কাছে নালিশ করে দেব। আর লড়াইয়ের সময় তোকে সঙ্গে নিয়েও যাব না।”

“বাতেলা? আমি ওই হাভাতে নিগারগুলোর কাছে বাতেলা মারব? না, হুজুর, আদবকায়দা আমার জানা আছে। তোমাদেরই মত, মিস বিয়াট্রিস আমাকেও কি সহবত শেখাননি?”

“আমাদের তিনজনকে খুব কিছু শিখিয়ে উঠতে পেরেছেন বলে মনে হয় না,” স্টুয়ার্ট বলল। “ঠিক আছে, এবার যাওয়া যাক।”

তারপর নিজের বিশাল লাল ঘোড়াটার পেটে গোত্তা মেরে সচল করে অনায়াসেই ওটাকে কঞ্চির বেড়া পার করিয়ে জেরাল্ড ও’হারার প্ল্যান্টেশনের নরম মাটিতে গিয়ে নামল। ব্রেন্টের ঘোড়াও পিছু পিছু এল, আর তার পিছু পিছু জীমস, ঘোড়ার জিনের সামনের দিক আর ঘোড়ার কেশর ধরে ঝুলে। বেড়ার ওপর দিয়ে ঝাঁপ দেওয়া জীমসের পছন্দের ব্যাপার নয়, তবে ওর মালিকদের সঙ্গে তাল রাখতে গিয়ে এর থেকে উঁচু বেড়াও ঝাঁপ দিতে হয়েছে।

লাল মাটির আলের পথ ধরে টিলা পেরিয়ে নদীর ঢালুর দিকে এগোতে এগোতে ব্রেন্ট ভাইয়ের উদ্দেশ্যে চেঁচিয়ে বলল –

“দ্যাখ, স্টু! তোর কি মনে হচ্ছে না, সাপারে স্কারলেটের আমাদের বলা উচিত ছিল?

“আমি তো সেকথাই ভেবে যাচ্ছিলাম যে ও নিশ্চয়ই বলবে,” স্টুয়ার্ট হাঁক ছেড়ে বলল। “তোর কী মনে হয়, কী কারণে – ”

 

টীকাঃ

১ কনফেডারেট – গৃহযুদ্ধের সময় আমেরিকার দক্ষিণের ১১ টি রাজ্য বিচ্ছিন্ন হয়ে কনফেডারেট স্টেটস অফ আমেরিকা গঠন করবার পক্ষে ছিল। এদের সংক্ষেপে কনফেডারেট বলা হত। যারা এই বিচ্ছিন্নতাবাদের বিপক্ষে ছিল অর্থাৎ উত্তরের রাজ্যগুলো, তাদের বলা হত ইউনিয়নিস্ট

২ ইয়াঙ্কি – ইউনিয়নিস্টদের পক্ষ নিয়ে যারা লড়াই করেছিল তাদের বলা হত 

৩ জেনারাল বোরিগার্ড – ১৮৬১ তে তিনি মার্কিন সেনাবাহিনী ছেড়ে কনফেডারেটদের পক্ষে ব্রিগেডিয়ার জেনারাল হিসেবে যোগ দেন

৪ ফোর্ট সামটার – ইউনিয়নিস্ট সৈন্যরা চার্লসটনের ফোর্ট সামটারে কনফেডারেটদের কাছে হেরে যায়। এই ঘটনাই গৃহযুদ্ধের সূচনা করে

৫ উটা – আমেরিকার পশ্চিম উপকূলেরে একটা রাজ্য। ১৮৪৮ সালে মেক্সিকো থেকে কেটে আমেরিকার অন্তর্ভুক্ত হয়। মর্মনরা এখানে প্রথম বসতি স্থাপন করে। ওরা বহুবিবাহ করত। উটা রাজ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায় ৪ জানুয়ারি ১৮৯৬তে যখন মর্মনরা বহুবিবাহ প্রথা তুলে দিতে রাজী হয়।

৬  মর্মন – উটার প্রথম অধিবাসী যাদের মধ্যে বহুবিবাহপ্রথার চল ছিল ১৮৯৬ সাল পর্যন্ত

৭ জ়ুয়েভ  - ফরাসী সেনাবাহিনীর অ্যালজেরিয়ান পদাতিক বাহিনী। এদের ইউনিফর্মে অনেকদিন পর্যন্ত লাল রঙ ব্যবহার হত

স্কুইরেল গানএক ধরনের রাইফেল, ছোট ছোট পশুপাখি শিকার করার জন্য ব্যবহার করা হত

মাজ়ল লোডারএক ধরণের শট গান 





অনুবাদক পরিচিতি
উৎপল দাশগুপ্ত
ফটোগ্রাফার। অনুবাদক।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ