গল্পটির সম্পর্কে আলাপ:

গল্পপাঠ :
 গল্পটি কখন ও কোথায় লিখেছেন?

মোজাফফর হোসেন :
 গত অক্টোবরে শেষ করেছি। রাজধানীতে আমার নূরজাহান রোডের বাসায়।

গল্পপাঠ :  
গল্পটির বীজ কীভাবে পেয়েছিলেন?

মোজাফফর হোসেন :
অক্টোবরের শুরুর দিকে এক রাত। টেবিলে বসেছিলাম। দীর্ঘদিন ধরে ‘দক্ষিণ এশীয় ডায়াসপোরা সাহিত্য’ শীর্ষক পাণ্ডুলিপিটি সম্পাদনা করছি। সে-রাতে খুব ক্লান্তিবোধ করছিলাম। হটাত করেই একটা বাক্য এলো মাথায়। অনেকটা কবিতার মতো: ‘লোকটা আত্মহত্যা করার জন্যই মরেনি’। এইটুকুই। এই লাইনটা নিয়ে অনেকক্ষণ বসেছিলাম। আগেপিছে কিছু যোগ করা যায় কিনা ভাবছিলাম। ভাবতে ভাবতে কিছুটা লেখা হলো। 

গল্পপাঠ :
এই বীজ নিয়ে কাজ গল্প লিখতে আগ্রহী হলেন কেন। কেন মনে হলো এই বিষয় নিয়ে গল্পটি লিখবেন?

মোজাফফর হোসেন :
আমি আর্নেস্ট হেমিংওয়ের মতো। হেমিংওয়ে একটা যথার্থ বাক্যের জন্য অপেক্ষা করতেন। অনেকে আছেন পুরো গল্পটা মনে মনে সাজিয়ে বা একটা আউটলাইন ভেবে নিয়ে লিখতে বসেন। আমি সেটা পারি না। কোনো গল্প জানি বলে সেটা পাঠকের সঙ্গে শেয়ার করছি, এমনটি আমার ক্ষেত্রে ঘটেনি। আমি গল্পটা জানি না, লিখতে লিখতে জানা হয় বলে গল্পলেখাটা আমি উপভোগ করি। ফলে আমার গল্পে শুরুটা হঠাৎ করেই হয়, শেষটাও কোনো সোজা পথ ধরে গন্তব্যে পৌঁছানোর মতো নয়। এই গল্পে যেটা হয়েছে — একটি উপযুক্ত বাক্য খুঁজে পাওয়ার পর মনে হয়েছে বাক্যটিকে বাঁচিয়ে রাখা প্রয়োজন। আমরা জানি, গল্পের জন্য বা প্রয়োজনে একটার পর একটা বাক্য তৈরি হয়। এখানে একটা বাক্যের প্রয়োজনে গল্পটা তৈরি হয়েছে। কিন্তু লেখার মাঝপথে গল্পটা আর এই লাইনের প্রতি বিশ্বস্ত থাকেনি। অন্য একটা গল্পের পথে এগিয়ে গেছে। 

গল্পপাঠ :
 গল্পটি কতদিন ধরে লিখেছেন? কাটাকুটি কেমন হয়েছে?

মোজাফফর হোসেন :
 মোটা-দাগে গড়গড় করে বলে যাওয়ার মতো গল্প এটা না, তাই আমাকে বারবার বসতে হয়েছে। আবার এ ধরনের গল্পে জোর করে কিছু আরোপও করা যায় না। কোনো যৌক্তিক ঘটনার প্রবাহ যেহেতু নেই তাই আমাকে সময় দিতে হয়েছে। প্রতিমুহূর্তে কতগুলো সম্ভাব্য পথের একটি একটি করে বেছে নিয়ে এগিয়ে গেছি। সবসময় সঠিক পথ নির্বাচন করতে পেরেছি বলে মনেও হয় না। ফলে যেখানেই শেষ করি না কেন, এটি একটি অসমাপ্ত গল্প। 

গল্পপাঠ :
 লিখতে লিখতে কি মূল ভাবনা পালটে গেছে?

মোজাফফর হোসেন :
ভাবনার ভেতর কেবল ছিল, একজন লোক থাকবে যে আত্মহত্যা করার জন্য বেঁচে আছে। অর্থাৎ আত্মহত্যা করছে না বলেই তার মৃত্যু হচ্ছে না। এটা একধরনের কনসেপচুয়াল গল্প। কিন্তু লিখতে লিখতে গল্পটা আর এই ধারণার ভেতর থাকেনি। এক প্রকারের এলিগরিতে পরিণত হয়েছে। মানুষের ধর্মীয় বোধের দার্শনিক এলিগরি। মানুষ তার চারপাশে ঈশ্বরের ধারণাগত গল্পের ভেতর বন্দি হয়ে আছে। ঈশ্বর মরতে চান। তার মৃত্যু তার চাওয়াতেই হবে। কিন্তু মানুষ তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে বিশ্বাস এবং অবিশ্বাসের ঘোরে। মানুষ যদি ঈশ্বরের গল্পকে সম্পূর্ণভাবে বিশ্বাস করতে পারে তাহলে আর মানুষের অস্তিত্ব থাকে না, কারণ মানুষের অস্তিত্ব ঈশ্বরের কল্পনার বাইরে নেই। ঈশ্বরের কাছে সৃষ্টি একটি ধারণামাত্র। ইচ্ছা প্রকাশ করলেই সেটি আবির্ভূত হয় আবার অনিচ্ছাতে শূন্য হয়ে যায়। অর্থাৎ ঈশ্বর সত্যি হলে তার ধারণার বাইরে মানুষের কোনো অস্তিত্ব নেই। পুরো মহাবিশ্বটাই ঈশ্বরের মাথার ভেতরে এক চিন্তার খেলা। আবার উল্টো ঈশ্বর যদি মানুষের কল্পনামাত্র হয় তাহলে ঈশ্বরের গল্পকে সম্পূর্ণরূপে অবিশ্বাস করতে পারলে ঈশ্বর থাকে না। ঈশ্বরকে তাই মরতে হলে মানুষের কল্পনাতে মরতে হবে। মানুষের বিশ্বাসে মরতে হবে। আমরা দেখছি, ঈশ্বর একদিকে যেমন মানুষের কল্পনা থেকে বের হতে চাচ্ছেন অন্যদিকে তেমন মানুষও ঈশ্বরের কল্পনা থেকে বের হতে চাচ্ছেন। ফলে শেষ পর্যন্ত আর কেউ কারও কাছ থেকে মুক্তি পাচ্ছেন না। 


গল্পপাঠ :
গল্পটি লেখার পরে প্রথম পাঠক কে ছিলেন?

মোজাফফর হোসেন :
 প্রতিটি গল্পের প্রথম পাঠক হলেন সেই গল্পের লেখক। অনন্ত সম্ভাবনার ভেতর থেকে একটি গল্পকে তুলে আনেন একজন লেখক। সেটিও একপ্রকারের পাঠ। এরপর কথিত পাঠক যখন গল্পটি পাঠ করেন তখন আর সেই গল্পের অনন্ত সম্ভাবনা থাকে না। আমি এই গল্পটি লেখার মাঝপথে অংশবিশেষ ফেসবুকে পোস্ট করেছিলাম গত অক্টোবরের ১৯ তারিখ। প্রথম পাঠক কে ছিলেন তাই বলা মুশকিল। যিনি প্রথম কমেন্ট করেছেন বা লাইক দিয়েছেন তিনিই যে প্রথম পাঠক বা আদৌ পাঠক কিনা বলা যায় না। 

গল্পপাঠ :
লেখার পরে কি মনে হয়েছে, যা লিখতে চেয়েছিলেন তা কি লিখতে পেরেছেন?

মোজাফফর হোসেন :
 যেহেতু কোনো পূর্বপরিকল্পনা এঁটে লিখতে শুরু করিনি তাই কি লিখতে চেয়েছি বলতে পারবো না। তবে এটা হয়ত ঠিক, যেটা শেষ পর্যন্ত লিখতে পেরেছি সেটা লিখতে চাইনি। 

গল্প 
লোকটা আত্মহত্যা করার জন্য মরেনি 
মোজাফ্ফর হোসেন 

নিজের ইচ্ছায় পৃথিবীতে আসিনি, কিন্তু চলে যেতে চাই নিজের মতো করে দিনক্ষণ ঠিক করে। এই বলে বলে লোকটা আর মরল না। আমাদের গাঁয়ের একেবারে শেষ বাড়িটা ওর। আগে নাকি ওটাই এই অঞ্চলের কেন্দ্র ছিল। সরতে সরতে গ্রামটা উত্তর দিকে হেলে গেছে। কেন্দ্র বলে এখন আর কিছু নেই এখানে। চারিদিকে খামচা খামচা করে ঘরবাড়ি হয়েছে, সবখানে বাজার বসে প্রতি জুম্মার পর, সবখানে মুদিখানার দোকান, ডিসপেনসারি, ফ্লেক্সিলোডের ব্যবস্থা, চায়ের দোকান—সবই আছে। আমরা গ্রামের ওদিকটাই যাই বর্ষাকালে — ঢলে ও পুকুর উপচে চাষের জমিগুলো ডুবে গেলে মাছ ধরতে। বৃষ্টি শুরু হলে লোকটার খুপরির মধ্যে বসে থাকতে হয়। কোনো কোনো দিন অর্ধেকটা কেটে যায় বসে। লোকটা আসে, প্রথমবার যেমন দেখেছি তেমনই আছে। আমাদের গ্রামের সবচেয়ে বুড়ো মানুষগুলোও স্মৃতি থেকে ওর অন্য চেহারা আবিষ্কার করতে পারে না। তারাও নাকি কৈশোর থেকে এই চেহারা দেখে আসছে। এখানে এমনি করে তারাও একদিন মাছ ধরতে এসে লোকটার পাশে বসে তার গল্প শুনেছে। একই গল্প আমরা গাঁয়ের কয়েক-প্রজন্ম একমুখ থেকে শুনে আসছি। এই গ্রামে যাদের জন্ম হয়েছে বা হয় কিংবা হবে তাদের এই গল্প এড়িয়ে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। জন্ম থেকে মৃত্যু একই গল্প শুনে যেতে হবে। 

গল্পটা তেমন আকর্ষণীয় কিছু না। তার উপর শুনতে শুনতে বৈচিত্র্য যা ছিল ছুটে গেছে কবেই। আমরা আশ্রয় পাই তাই শুনি। কথাটার আরেকটু ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। আমরা মাছ ধরতে এলে বৃষ্টি হবেই। আর বৃষ্টি হলে লোকটির ঘরে আশ্রয় নেয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। অতীতে, কোনো এক কালে, যারা গল্পটি শুনবে না বলে বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে মাছ ধরেছে, পরদিন তাদের সকলে একজন একজন করে পুকুরে গোসল করতে নেমে ডুব দেওয়ার পর আর উঠে আসেনি। ওদের কয়েকজন বিষয়টি টের পেয়ে ডুব না দিয়েই গোসল সেরে উঠে এসেছে ডাঙায়। কিন্তু অক্সিজেনের জন্য ছটফট করতে করতে ফের ফিরে গেছে সেই পানিতে। ডুব দিয়ে না-উঠে আসাদের দলে যুক্ত হয়েছে। এই ঘটনার পর থেকে আর কেউ সেই পুকুরের মাছ ধরে খায়নি। আর কেউ এখানে মাছ ধরতে এলে বৃষ্টিতেও ভেজেনি। তাই আমরা বৃষ্টি আসা মাত্রই লোকটির চালার নিচে আশ্রয় নিই। তার গল্প শুনি; শুনি মানে নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে মাঝে মাঝে ‘আচ্ছা?’ ‘তারপর?’ এসব বলে তাল দিই। কিন্তু অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা লোকটির গল্পে বুদ হয়ে যাই। পুরো গল্পটা আমাদের জানা, তবুও মনে হয় যেন না শুনলে কিছু বাদ পড়ে যাবে। 

তুমি আত্মহত্যা করো না কেন? আমরা জিজ্ঞাসা সেই প্রশ্নটি। আমরা তাকে কোনো সম্পর্ক দিয়ে সম্বোধন করি না। কারণ এত প্রাচীন কোনো মানুষকে কি বলে সম্বোধন করতে হয় আমাদের কেউ শিখিয়ে দেয়নি। 

মনে কোনো সুখ পাই না যে? লোকটি উত্তর দেয়। 

তাই তো। এইজন্যে তো তোমার আত্মহত্যা করা উচিত। সুখ না থাকলেই তো মানুষ আত্মহত্যা করে! আমরা উৎসাহ জুগিয়ে বলি। 

কিন্তু আমি মরতে চাই সুখে। পরম সুখে যখন আমার ভেতরটা ভরে উঠবে, চরম তৃপ্তিতে যখন আমার গল্পগুলো পাথরের মতো জমে যাবে— তখনই আমার মৃত্যু হবে। 

এভাবে একা একা থাকতে কষ্ট হয় না তোমার? আমরা ফের তাকে কষ্টের জায়গায় নিয়ে যেতে চাই। কারণ আমাদের ধারণা এবং প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা মানুষ কেবল কষ্টেই আত্মহত্যা করে। 
হয় বলেই তো বেঁচে আছি। আমি এভাবে একা থাকার কষ্ট নিয়ে মরতে চাই না। লোকটি বলে। 

এই বাক্যবিনিময় আমাদের নতুন না। আমাদের বাবা-চাচারাও, তারও আগে দাদা এবং দাদার বাবারাও এভাবে বসে বসে একই কথা বলেছেন। আজ যারা শিশু কিংবা অনাগত তারাও একদিন আমাদের মতো বৃষ্টিতে আটকে পড়ে এভাবে এই প্রশ্নগুলো করবে। আমাদের ভূমিকা আগে থেকেই নির্দিষ্ট। এখন আর মনে করে কিংবা নতুন করে কিছু বলতে হয় না। লোকটার এই খুপরিতে বসলেই আমরা ইতিহাসের চরিত্র হয়ে উঠি। আমরা বলি যা আমাদের বলা উচিত। এরপর আমরা জানতে চাই, একা থাকার কষ্ট নিয়ে মরতে যখন চাও না, তখন কাউকে নিয়ে থাকলেই পারো? এরপর যখন ভালো লাগে তখন আত্মহত্যা করবে? 

ভালো লাগা আর সুখ তো এক উপলব্ধি না। লোকটি বলে। 

তবে তোমার সুখ আসবে কিসে, যে সুখে তোমার আনন্দে আত্মহত্যা করতে ইচ্ছা করবে? আমরা হতাশ হয়ে জানতে চাই। 

তখনই যখন তোমরা আমার গল্পকে সত্য বলে বিশ্বাস করবে। মনে করবে আমার গল্পটাই তোমাদের একমাত্র অতীত। বিদ্যালয়, জ্ঞান-বিজ্ঞান যা কিছু শেখায় সব বানানো। তোমাদের এই বিশ্বাসে আমার মুক্তি, মুক্তি তোমাদেরও। লোকটি বলে। 

আমরা এবার তার গল্পটা শোনার জন্য অস্থির হয়ে উঠি। এবং মনে মনে প্রতিজ্ঞা করি, গল্প যেমনই হোক, আমরা আজ বিশ্বাস করেই উঠবো। এবার আমরা গল্পের মুড়োটা ধরিয়ে দিতে প্রশ্ন করি তাকে— আমরা তোমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা কালের কথা জানতে চাই? 

লোকটি চুপ করে থেকে বলে, এখানে তখন নদী ছিল। ঢেউ-খেলা নদী। বাণিজ্য আসতো দূর দেশ থেকে। এখানেই আমার জন্ম। নদীটা আর নেই দেখে তখন আমাদের মনে কষ্ট জাগে। আমরা তখন বন্যা ও বানের জলে তলিয়ে যাওয়া বিস্তীর্ণ ধানি জমিনের দিকে তাকিয়ে উদাস হয়ে যাই।
নদীটা এখান থেকে সরে গেল কিভাবে? আমরা জানতে চাই। 

সরে যায়নি তো! আত্মহত্যা করেছে। লোকটি বলে। 

নদীর আত্মহত্যার বিষয়টি আমরা কিছুতেই মেলাতে পারি না। আত্মহত্যা বলতে আমরা গলাই দড়ি দিয়ে ঝুলে পড়া অথবা বিষ খাওয়া বুঝি। শহরে ঘুমের বড়ি খেয়ে কিংবা ট্রেনের নিচে শরীর দিয়ে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে বলে শুনেছি। একটা নদী এর কোনোটাই করতে পারবে না। আমরা না চাইলেও তখন লোকটার গল্প নিয়ে আমাদের মনে অবিশ্বাস জাগে। আমাদের তখন বিদ্যালয়ে শেখানো বুলির কথা মনে পড়ে যায় — পৃথিবীতে জড়বস্তু কোনো কাজ করতে পারে না। জড়বস্তু হলো অবজেক্ট। বিধেয়। প্রাণ যার আছে সেই সাবজেক্ট; মানে উদ্দেশ্য। নদীর কি তবে প্রাণ থাকে? বিজ্ঞান তো সে-কথা বলে না। যে পানি ছাড়া প্রাণ হয় না, সেই পানি নিজে নিষ্প্রাণ হয় কেমন করে? আমরা তখন বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলায় দুলতে থাকি। আমরা তখন লোকটার গল্পে বিশ্বাস ফেরাতে নদীর আত্মহত্যার কথা ভুলে যেতে চাই। ভুলে যেতে চাই সমস্ত জ্ঞান-বিজ্ঞানের কথা যা আমরা স্কুলের বিজ্ঞান বইতে পড়েছি। গল্পের বাকিটা শোনার জন্য উৎসুক হয়ে তাকিয়ে থাকি লোকটার দিকে। 

নদী গেলে শূন্য জায়গাটা ভরাট হলো বৃক্ষে। গাছে গাছে মাঠ পেরিয়ে গেল দিগন্ত। জলের মানুষ নেমে পড়ল জঙ্গলে। জেলে তখন শিকারি কিংবা চাষি হলো কাঠুরে। 

তখন কি ইংরেজরা এসেছে? নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয় হলো কি এর পরেই? নাকি তারও আগে — ভারতে তখন সুলতান-মুঘলদের শাসন? আমরা তখন এভাবে ইতিহাস পাঠ থেকে সময়টাকে মেলাতে চেষ্টা করি। এই প্রশ্নটা আমাদের বাবা-দাদারা করতেন না। প্রতিটা প্রজন্ম একটা একটা করে নতুন প্রশ্ন আনে। আমরা এনেছি এটা। প্রশ্নের কোনো উত্তর আসে না দেখে আমরা জানতে চাই, পানি পথের যুদ্ধ কি সেই নদীর কোথাও হয়েছিল কিংবা তারও শতশত বছর আগে লক্ষণ সেনের দুর্গ বরাবর ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বখতিয়ার খলজির ঘোড়া ছুটেছিল কি সেই জঙ্গল ধরে? 

লোকটা এবার মুখ খোলে। বলে, যুদ্ধ একটা হয়েছিল বটে। মানুষে-মানুষে নয়। মানুষে-জ্বিনে। পৃথিবী দখলের যুদ্ধ সেটা। এই প্রান্তর-জুড়ে তখন উঁচু উঁচু পাহাড়। দিগ্বিদিক মরুভূমির মতো খাঁ খাঁ শূন্যতা। পরাজিত হয়ে জ্বিনেরা মর্ত্যরে সংসার গুটিয়ে চলে গেল সেই শূন্যতা ধরে। সঙ্গে পাহাড়গুলোও ভেসে গেল তুলোর মতো। পড়ে রইল সমতল ভূমি আর নিহত কতগুলো মানুষ। আমার ঘরটা ছিল পাহাড়ের গায়ে, সেই অংশটুকু কেবল সামান্য হয়ে রয়ে গেল। এরপর আমরা লোকটির ঘরের চারপাশে তাকিয়ে বুঝতে পারি ঘরটি সমতল থেকে বেশ কিছুটা উপরে, বুঝতে পারি এই কারণেই মাঠের বন্যা কখনোই এই ঘরে ওঠে না। লোকটির গল্প তখন আমাদের কাছে বিশ্বস্ত হয়ে ওঠে। আমরা তখন সেই যুদ্ধ সম্পর্কে জানতে চাই। এবং প্রতিবারই এই কথা জানতে চেয়ে ভুল করি। কারণ এরপর জ্বিনদের সম্পর্কে লোকটি যা বলবে তার কোনোটাই আমরা বিশ্বাস করতে পারবো না। আর জ্বিনে অবিশ্বাস আনা যে মহাপাপ তা আমাদের কারোরই অজানা নয়।
জ্বিনের গোত্রপ্রধান ছিল একজন নারী। লোকটা বলে যায়। নাম তার 

খাইরনবিলতোমিসকিরনিহানতু। লম্বা নামটি লোকটি প্রতিবারই খুব যতœ করে উচ্চারণ করে। তখন ওর চোখেমুখে ঝিলিক দিয়ে আলো খেলে যায়। আমরা ধরে নিই, জ্বিন-নারীর সঙ্গে লোকটির কোনো সম্পর্ক ছিল। তখন আমরা আরও বেশি করে ঐ জ্বিন-নারীকে নিয়ে প্রশ্ন করি। লোকটি আর কোনো কথা বলে না। আমরা তখন হতাশ হয়ে জানতে চাই, তুমি কি তবে সেই যুদ্ধে প্রতিপক্ষ হয়েছিল ঐ জ্বিন-নারীর? মানুষের পক্ষে নেতৃত্বে দিয়েছিলে যুদ্ধে? 

লোকটি এই প্রশ্ন শুনে গল্পে আগ্রহ ফিরে পায়। হাসতে থাকে। বলে, দুপক্ষের যুদ্ধে সবসময় জয়ী হয় মৃত্যু। নাশ। আমি মরতে চাইনি ওভাবে, অনিশ্চয়তার মধ্যে। আমি সবসময় চেয়েছি মৃত্যুটা আমার ইচ্ছামতো দিনক্ষণ ঠিক করে হোক। একটা প্রশান্তির ভেতর দিয়ে আমি যেন মৃত্যুর সঙ্গে মিশে যেতে পারি। যেভাবে আমার বিস্মৃতি থেকে জন্ম হয়েছিল স্মৃতিতে, সেভাবেই যেন স্মৃতি থেকে মিশে যাই মহাস্মৃতির ভেতর। 

এরপর আমরা আমাদের বয়সের দোষে সেই প্রশ্নটা করি— খাইরনবিলতোমিসকিরনিহানতুকে কি তুমি ভালবাসতে? তোমাদের মধ্যে কি প্রেম ছিল? 

লোকটি এই প্রশ্নের জন্য কখনোই প্রস্তুত থাকে না। বছরের পর বছর ধরে আমরা তাকে এই প্রশ্ন করে আসছি। লোকটি প্রতিবারের মতো এবারও চমকে ওঠে। থতমত খেয়ে বলে, আমাদের মধ্যে কখনো কোনো কথা হয়নি। এই পাহাড়াটা ছিল ওদের। আমি ছিলাম আশ্রিত। লোকটি এমন করে বলে যেন আমরা এখন কোনো পাহাড়ের উপর বসে আছি। এরপর বৃষ্টি থেমে গেলে আমরা গল্পের মাঝখান থেকেই বেরিয়ে আসি মাঠে, মাছধরার কাজে। 

আমরা চলে এলেও গল্পটি আমাদের মাথার ভেতর রয়ে যায়। যেহেতু জ্বিনের গল্প, আমরা অবিশ্বাস করতে পারি না। হুজুর বলেছেন, জ্বিনের গল্পে অবিশ্বাস করলে ঈমান থাকবে না। আবার জ্বিন-মানুষের যুদ্ধের উল্লেখ পবিত্র গ্রন্থের কোথাও আমরা খুঁজে পাই না। বিশ্বাস-অবিশ্বাসের মাঝে আমাদের তৃতীয় পক্ষের সন্ধান করতে হয়। আমাদের জানা, এই গাঁয়ে একসময় শত শত জ্বিনের বাস ছিল। বাবা-চাচাদের কাছে জ্বিনের অনেক গল্প শোনা হয় তখন। তারা কেউ চান না, আমরা জ্বিনের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলি, তাই তারা আরও জমিয়ে রসিয়ে রসিয়ে জ্বিনের সঙ্গে মানুষের সুসম্পর্ক ও বিরোধের গল্প বাঁধেন। এসব গল্প তাদের উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া। আমরাও পেয়ে যাই আগত প্রজন্মের জন্য। 

গ্রামটি শহরের পোশাক পরার পর জ্বিনে-ধরা মানুষের সংখ্যা কমে যায়। স্বভাবে কারও বেখেয়ালি বা অস্বভাবী ভাব দেখা দিলে মাথার গ-গোল বলে শহরে চিকিৎসা নেওয়া হয়। কিন্তু শহরের ডাক্তার যেদিন নিজেই তার স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য আমাদের গাঁয়ের জুমাত ওঝার কাছে ছুটে আসে, তখন আমাদের ভুল-ভাঙে। আমরা তখন জুমাত ওঝার কাছে ছুটে যাই। জুমাত ওঝার সঙ্গে জ্বিনের নিত্য ওঠাবসা। ভালো-মন্দ, নারী-শিশু, সব ধরনের জ্বিন আসে তার কাছে। দুজন যমজ জ্বিন-বোন সবসময় তার দু-কাঁধে থাকে। একজন তাকে কামড়িয়ে দিলে জুমাত ওঝার পা দিয়ে গলগল করে রক্ত ঝরে; অন্যবোন ওঝা হয়ে ঝেড়ে দিলে সব রক্ত মুহূর্তেই মিশে যায় বাতাসে। অনেকে সেই রক্তঝরা দেখেছে বলে আমরা শুনি। 

জ্বিনের অস্তিত্ব নিয়ে আমাদের মনে কোনো সন্দেহ না থাকলেও জ্বিন মানুষের যুদ্ধ নিয়ে আমাদের মনে অবিশ্বাস পাক ধরে। আমরা জুমাত ওঝার কাছে ছুটে যাই। ও আগে থেকেই উঠোনে পিড়ে সাজিয়ে আমাদের জন্য অপেক্ষা করে। আমাদের জিজ্ঞাসা তার অজানা নয়, তবুও কণ্ঠ ভারি করে বলে, বল তোরা কি জানতে চাস? 

আমরা তখন জ্বিন-মানুষের যুদ্ধের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলি। সে তখন দম ধরে থেকে তার দু-কাঁধে থাকা দুই নারী জ্বিনের কাছে আমাদের প্রশ্ন পৌঁছে দেয়। দুই রকম কণ্ঠে তাদের পরস্পরবিরোধী দুইরকম বয়ান আমাদের শোনায়। একজন বলে এইরকম একটা যুদ্ধের কথা সেও শুনেছে তার পূর্বপুরুষদের কাছে। অন্যজন বলে, জ্বিনেরা বৃক্ষের মতো নির্যুদ্ধ জাতি। এরপর ফের প্রথম নারী কণ্ঠ বলে, এরকম যুদ্ধ যদি হয়েই থাকে তাহলে সেই যুদ্ধের ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কারণ মানুষ মাটি দিয়ে তৈরি আর জ্বিন আগুনের। আগুনের সঙ্গে মাটির কোনোদিনই পেরে ওঠার কথা না। 

দুই নারীকণ্ঠের কথা শুনে আমরা তখন লোকটির গল্পে বিশ্বাস হারাতে বসি। কিন্তু আমরা ভুলে যেতে পারি না, বিশ্বাস হারালে এই গল্পের ধাঁধাঁ থেকে কোনোদিনই বের হতে পারবো না। যেমন আমাদের পূর্বপুরুষেরা পারেনি। আমাদের মধ্য থেকে তখন ঐ দুই নারীভাষ্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। আমরা স্মরণ করি পবিত্র গ্রন্থের কথা— সাক্ষ্যদানের ক্ষেত্রে এক পুরুষের বিপরীতে দুই নারীসাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য। কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হুজুর বলেছেন, নারীরা সহজেই ভুলে যায় কিংবা অল্পতে ভুলবোঝে। আমরা তখন জুমাত ওঝার কাছে কোনো পুরুষ জ্বিনের বয়ান চাই। জ্বিনদের মধ্য প্রবীণতম জ্বিনের ভাষ্য শোনানোর আবদার করি। জুমাত ওঝা খানিক চুপ মেরে থেকে জানায়, সবচেয়ে প্রবীণ জ্বিনের বয়স এক হাজার বছর। এরপর সে কণ্ঠ বদলে আরও বৃদ্ধকণ্ঠে বলে, মানুষের তৈরি ইতিহাসে সে বিশ্বাস করে না। মানুষ জ্বিনের ইতিহাস তো জানেই না। নিজের ইতিহাসও ভুল জানে। 

আমরা সঠিক ইতিহাসের কথা জানতে চাইলে সেই প্রবীণতম জ্বিন বলে, ইতিহাস শেখানো তার কাজ না। তার কাজ মানুষরূপী জ্বিনদের গতিবিধির নজরদারি করা। 

এরপর আমরা মানুষ এবং জ্বিনের মধ্যকার সেই ঐতিহাসিক যুদ্ধের কথা জানতে চাই। যুদ্ধের সত্যতা নিশ্চিত করে সে বলে, হাজার হাজার বছর আগে ঘটে যাওয়া সেই যুদ্ধে তিন হাজার ছয়শ আটজন জ্বিনের মৃত্যু ঘটে। আমরা মানুষের হিসাব জানতে চাইলে সে বলে, একজন মানুষও বাঁচেনি সে যুদ্ধে। 

এই প্রবীণতম জ্বিনের ভাষ্য সঠিক হলে গাঁয়ের ঐ প্রাচীন লোকটির বেঁচে থাকা মিথ্যা হয়ে যায়। আমরা জুমাত ওঝার কাছ থেকে কোনো সিদ্ধান্তহীন অবস্থায় ফিরে আসার সময় সিদ্ধান্ত একটা নিয়ে ফেলি— রাতের অন্ধকারে লোকটিকে খুন করার। ওর গল্প থেকে বের হওয়ার জন্য এই একটি পন্থা তখন আমাদের মনে আসে। যেহেতু তার গল্প আমরা সম্পূর্ণরূপে বিশ্বাস করতে পারবো না, সেহেতু সে কোনোদিনই পরিপূর্ণ তৃপ্ত হবে না। ফলে সে আত্মহত্যা করতে পারবে না। বেঁচে থাকবে অনন্তকাল। আমরা খুনের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রত্যেকে হাতে দা-কাস্তে নিয়ে রওনা দিই পূর্বপুরুষদের মতো। 

আমরা জানি লোকটি তখন ফুটন্ত জোছনায় পিঠ পেতে বসে থাকবে। আমাদের হত্যা করতে যাওয়ার বিষয়টি তার অজানা থাকবে না। আমরা গিয়ে লোকটির সামনে দাঁড়াবো। আমাদের হাতের ধারালো অস্ত্র জোনাকি পোকা আর চাঁদের আলোয় ঝলক দিয়ে উঠবে। 
এখন তো মাছধরার সময় না! লোকটি বলবে। 

তুমি সত্যিই বেঁচে আছো কিনা আমরা তার পরীক্ষা নিতে এসেছি। হাতের অস্ত্রগুলো দৃশ্যপটে এনে আমরা বলবো। 

তোমরা তো আমাকে মারতে পারবে না— বলে লোকটি হাসতে থাকবে। কুৎসিত হাসি। আমরা বিস্ময়ে বিরক্তির সঙ্গে তাকিয়ে থাকবো ওর দিকে। 

তোমরা নিজেরাই তো মরে গেছ সেই কবে। জ্বিন মানুষের যুদ্ধে। আমাকেও মেরে ফেলা হয়েছিল। কিন্তু আমি বেঁচে আছি, কারণ আমি আত্মহত্যা করেই মরতে চেয়েছি। লোকটি বলবে। 

তাহলে আমরা কে? আমরা তখন প্রশ্ন করবো। 

তোমরা কেউ না। লোকটি এমন করে বলবে যেন নিজের সঙ্গে নিজে কথা বলছে। 

তবে আমরা আছি কেন? আমরা সমবেত কণ্ঠ উত্তেজিত হয়ে জানতে চাইবো। 

তোমাদের থাকা আমার কল্পনা মাত্র। কল্পনার এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেলে বুকভরা আনন্দে আমি আত্মহত্যা করতে পারবো। তোমাদের বিশ্বাসে আমার মুক্তি। আমার মুক্তিতে মুক্তি তোমাদেরও। 
আমাদের তখন মনে পড়ে শতশত বছর আগে একদল যুবক এভাবেই লোকটিকে খুন করতে এসে আর ফিরে যায়নি গাঁয়ে। 



লেখক পরিচিতি

মোজাফ্ফর হোসেনের জন্ম মেহেরপুরে, ১৯৮৬ সালে। ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন। পেশাজীবন শুরু করেন সাংবাদিকতা দিয়ে। পাক্ষিক অনন্যার নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে কয়েক বছর দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে বাংলা একাডেমির অনুবাদ, পাঠ্যপুস্তক ও আন্তর্জাতিক সংযোগ বিভাগে অনুবাদ-কর্তকর্তা হিসেবে কর্মরত আছেন। মূলত ছোটগল্পকার। বিশেষ আগ্রহ অনুবাদ এবং সমালোচনা সাহিত্যে। ছোটগল্পের জন্য ‘এক্সিম ব্যাংক-অন্যদিন হুমায়ূন আহমেদ কথাসাহিত্য পুরস্কার-২০১৭’, ‘বৈশাখী টেলিভিশন তোমার গল্পে সবার ঈদ পুরস্কার-২০১৩’ ও ‘অরণি ছোটোগল্প পুরস্কার-২০১৩’ অর্জন করেন।

প্রকাশিত বই:

বাংলা সাহিত্যের নানাদিক (প্রবন্ধ, গ্রন্থকুটির প্রকাশনী)
বিশ্বসাহিত্যের কথা (প্রবন্ধ, বেঙ্গল পাবলিকেশন)
অতীত একটা ভিনদেশ (গল্পগ্রন্থ, বেহুলা বাংলা)
খুন হয়ে যাচ্ছে সব সাদেক (গল্পগ্রন্থ, অন্যপ্রকাশ)
আদিম বুদবুদ অথবা কাঁচামাটির বিগ্রহ (গল্পগ্রন্থ, রাত্রি প্রকাশনী)
দ্বিধা (গল্পগ্রন্থ, অন্বেষা প্রকাশনী)
বিশ্বগল্পের বহুমাত্রিক পাঠ (প্রবন্ধ, অনুপ্রাণন প্রকাশনী)
আলোচনা-সমালোচনা (প্রবন্ধ, অনুপ্রাণন প্রকাশনী)
প্রশ্নের বিপরীতে (সাক্ষাৎকার, অনিন্দ্য প্রকাশ)
নির্বাচিত হেমিংওয়ে (সম্পাদনা, আলোঘর প্রকাশিত)
বিশ্বসাহিত্যের নির্বাচিত প্রবন্ধ (সম্পাদনা, দেশ পাবলিকেশন্স)
কল্পে-গল্পে ইলিশ (গল্পসংকলন, সহ-সম্পাদনা, মূর্ধন্য প্রকাশনী)
দক্ষিণ এশিয়ার ডায়াসপোরা সাহিত্য (গবেষণা, প্রকাশিতব্য, পাঞ্জেরী প্রকাশনী)
পাঠে-বিশ্লেষণে বিশ্বগল্প (ছোটগল্পের তাত্ত্বিক গ্রন্থ, প্রকাশিতব্য, পাঞ্জেরী প্রকাশনী)