ভাষান্তর : কুলদা রায়
লেখক পরিচিতি ঃ রোয়ল্ড ডাল'এর জন্ম বৃটেনে, ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে। উপন্যাস, ছোটো গল্প, কবিতা, সিনেমার চিত্রনাট্য লেখক হিসেবে তিনি সুখ্যাত অর্জন করেছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি বিমানবাহিনীতে উইং কমান্ডার হিসেবে কাজ করেছেন।
চল্লিশের দশকে তিনি শিশুদের জন্য লেখা শুরু করেন। এবং সঙ্গে সঙ্গে বড়োদের জন্যওলেখেন। তিনি একজন বেস্ট সেলিং লেখক। সারা পৃথিবীতে ২৫০ মিলিয়ন কপি বই বিক্রি হয়েছে তাঁর।
বিংশ শতাব্দীর অন্যতম মহান শিশুসাহিত্যিক হিসেবে তিনি পরিচিত। তার গল্পের শেষটায় থাকে অসামান্য চমক। যেকোনো পাঠকেরই পূর্বানুমাণকে তিনি ব্যর্থ করে দেন।
ডালের বই--Tales of the Unexpected, The Mystery Writers of America। প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার আলফ্রেড হিচকক তাঁর 'হিচকক প্রেজেন্টস' শোতে তাঁর বেশ কয়েকটি গল্পের চলচ্চিত্ররূপ গ্রহণ করেছেন। ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দে তিনি মারা যান।

চল্লিশের দশকে তিনি শিশুদের জন্য লেখা শুরু করেন। এবং সঙ্গে সঙ্গে বড়োদের জন্যওলেখেন। তিনি একজন বেস্ট সেলিং লেখক। সারা পৃথিবীতে ২৫০ মিলিয়ন কপি বই বিক্রি হয়েছে তাঁর।
বিংশ শতাব্দীর অন্যতম মহান শিশুসাহিত্যিক হিসেবে তিনি পরিচিত। তার গল্পের শেষটায় থাকে অসামান্য চমক। যেকোনো পাঠকেরই পূর্বানুমাণকে তিনি ব্যর্থ করে দেন।
ডালের বই--Tales of the Unexpected, The Mystery Writers of America। প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার আলফ্রেড হিচকক তাঁর 'হিচকক প্রেজেন্টস' শোতে তাঁর বেশ কয়েকটি গল্পের চলচ্চিত্ররূপ গ্রহণ করেছেন। ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দে তিনি মারা যান।

রোয়ল্ড ডাল'এর গল্প :
দক্ষিণ থেকে আসা লোকটি
প্রায় ছটা বাজতে চলেছে। ভাবলাম, একটা বিয়ার কিনে বাইরে গিয়ে সুইমিং পুলের পাশে একটা ডেকচেয়ারে বসি। সন্ধ্যার রোদটুকুও কিছুক্ষণ গায়ে লাগবে।
বারে গিয়ে বিয়ার নিলাম। সেটা নিয়ে বাইরে বেরিয়ে বাগানের ভেতর দিয়ে পুলের দিকে হেঁটে গেলাম।
বাগানটা চমৎকার। সুন্দর লন, আজেলিয়া ফুলের বেড আর লম্বা লম্বা নারকেলগাছ। গাছগুলোর মাথার ওপর দিয়ে জোরে হাওয়া বইছিল। পাতাগুলো হিসহিস আর মড়মড় শব্দ করছিল, যেন আগুনে পুড়ছে। পাতার নিচে বড় বড় বাদামি নারকেলের কাঁদি ঝুলতে দেখলাম।
সুইমিং পুলের চারদিকে প্রচুর ডেকচেয়ার ছিল। ছিল সাদা টেবিল আর বিশাল উজ্জ্বল রঙের ছাতা। রোদে পোড়া নারীপুরুষেরা সাঁতারের পোশাক পরে চারপাশে বসে ছিল। পুলের মধ্যে তিন-চারটি মেয়ে আর প্রায় ডজনখানেক ছেলে জল ছিটিয়ে হইচই করছিল, একে অন্যের দিকে বড় একটা রাবারের বল ছুড়ে দিচ্ছিল।
আমি দাঁড়িয়ে তাদের দেখছিলাম। মেয়েগুলো ইংরেজ, এই হোটেলেরই অতিথি। ছেলেগুলোর কথা জানতাম না, তবে কথাবার্তা শুনে আমেরিকান মনে হচ্ছিল। ভাবলাম, সম্ভবত নৌবাহিনীর ক্যাডেট। সেই সকালে বন্দরে এসে পৌঁছানো মার্কিন নৌবাহিনীর প্রশিক্ষণ জাহাজ থেকে তীরে এসেছিল।
একটা হলুদ ছাতার নিচে চারটি খালি চেয়ার দেখে সেখানে গিয়ে বসলাম। বিয়ার ঢেলে একটা সিগারেট নিয়ে আরাম করে হেলান দিলাম।
বিয়ার আর সিগারেট নিয়ে রোদে বসে থাকাটা ভারী আরামদায়ক। সবুজ জলের মধ্যে সাঁতারুদের জলকেলি দেখতে ভালো লাগছিল।
আমেরিকান নাবিকদের সঙ্গে ইংরেজ মেয়েদের বেশ ভাব হয়ে গিয়েছিল। এতটাই যে ছেলেরা জলের নিচে ডুব দিয়ে মেয়েদের পা ধরে উল্টে দিচ্ছিল।
ঠিক তখনই দেখলাম, ছোটখাটো, একটু বয়স্ক একজন লোক পুলের ধার ঘেঁষে দ্রুত হেঁটে আসছেন। সাদা স্যুট পরে একেবারে পরিপাটি। ছোট ছোট লাফানো পা ফেলে খুব দ্রুত হাঁটছিলেন। প্রতিটি পা ফেলার সময় পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে শরীরটা বেশ উঁচু করে তুলছিলেন। মাথায় বড় একটা ক্রিম রঙের প্যানামা টুপি। লোকজন আর চেয়ারগুলোর দিকে তাকাতে তাকাতে লাফানো ভঙ্গিতে পুলের পাশ দিয়ে এগিয়ে এলেন।
আমার পাশে এসে থামলেন। হাসলেন। তাঁর খুব ছোট, এবড়োখেবড়ো, সামান্য মলিন দু-সারি দাঁত দেখা গেল। আমিও হাসলাম।
“মাফ করবেন প্লিজ, আমি কি এখানে বসতে পারি?”
“অবশ্যই,” বললাম। “বসুন।”
তিনি ছোট ছোট লাফে চেয়ারটার পেছনে গিয়ে নিরাপদ কি না ভালো করে পরীক্ষা করলেন। তারপর বসে পা দুটো আড়াআড়ি করে রাখলেন। তাঁর সাদা হরিণচর্মের জুতোর সারা গায়ে বাতাস চলাচলের জন্য ছোট ছোট ফুটো করা।
“সুন্দর সন্ধ্যা,” তিনি বললেন। “জ্যামাইকায় সব সন্ধ্যাই সুন্দর।” তাঁর উচ্চারণ ইতালীয় না স্প্যানিশ, ঠিক বুঝতে পারলাম না। তবে মোটামুটি নিশ্চিত হলাম, দক্ষিণ আমেরিকার কোনো দেশের লোক। কাছে থেকে দেখলে বোঝা যাচ্ছিল, বয়সও বেশ হয়েছে। আটষট্টি কিংবা সত্তরের কাছাকাছি হবে।
“হ্যাঁ,” বললাম। “জায়গাটা দারুণ, তাই না?”
“আচ্ছা, জিজ্ঞেস করি, এরা সবাই কারা? এরা তো হোটেলের লোক নয়।” পুলে সাঁতার কাটতে থাকা লোকজনের দিকে আঙুল দেখালেন।
“আমার মনে হয় ওরা আমেরিকান নাবিক,” বললাম। “নাবিক হওয়ার প্রশিক্ষণ নিচ্ছে।”
“অবশ্যই আমেরিকান। দুনিয়ায় আর কে এমন হইচই করবে? আপনি আমেরিকান নন, না?”
“না,” বললাম। “আমি আমেরিকান নই।”
হঠাৎ একজন আমেরিকান ক্যাডেট এসে আমাদের সামনে দাঁড়াল। তার শরীর থেকে পুলের জল টপটপ করে পড়ছে। সঙ্গে একজন ইংরেজ মেয়েও।
“এই চেয়ারগুলো কি কেউ নিয়েছে?” সে জিজ্ঞেস করল।
“না,” বললাম।
“আমি বসলে আপত্তি আছে?”
“বসো।”
“ধন্যবাদ।” তার হাতে একটা তোয়ালে ছিল। বসে তোয়ালেটা খুলতেই ভেতর থেকে এক প্যাকেট সিগারেট আর একটা লাইটার বেরোল। মেয়েটিকে সিগারেট দিল, সে নিল না। তারপর আমাকে দিল। আমি একটা নিলাম। ছোটখাটো লোকটি বললেন, “ধন্যবাদ, না। আমার মনে হয় আমার কাছে একটা সিগার আছে।” কুমিরের চামড়ার কেস থেকে একটা সিগার বের করলেন। তারপর একটা ছোট ছুরি বের করলেন, যার মধ্যে ছোট্ট একটা কাঁচিও ছিল। সেই কাঁচি দিয়ে সিগারের মাথাটা ছেঁটে নিলেন।
“এই যে, আমি আগুন দিচ্ছি।” আমেরিকান ছেলেটি লাইটারটা এগিয়ে ধরল।
“ওটা এই হাওয়ায় কাজ করবে না।”
“অবশ্যই করবে। এটা সব সময় কাজ করে।”
ছোটখাটো লোকটি মুখ থেকে না-ধরানো সিগারটা সরালেন। মাথাটা এক পাশে কাত করে ছেলেটির দিকে তাকালেন।
“সব সময়?” ধীরে জিজ্ঞেস করলেন।
“অবশ্যই। এটা কখনো ফাঁকি দেয় না। অন্তত আমার হাতে নয়।”
লোকটির মাথা তখনও এক পাশে কাত। ছেলেটির দিকে তাকিয়ে রইলেন। “ভালো, ভালো। তা হলে তোমার কথা, এই বিখ্যাত লাইটার কখনো ফাঁকি দেয় না। তাই তো?”
“অবশ্যই,” ছেলেটি বলল। “ঠিক তাই।” বয়স উনিশ-কুড়ি হবে। লম্বাটে মুখজুড়ে ছোট ছোট বাদামি ছোপ। নাকটা একটু চোখা, পাখির ঠোঁটের মতো। বুক খুব বেশি রোদে পোড়েনি, সেখানেও বাদামি ছোপ। মাথায় অল্প কয়েক গোছা ফ্যাকাশে লালচে চুল। ডান হাতে লাইটারটা ধরে চাকাটা ঘোরাতে প্রস্তুত ছিল। “এটা কখনো ফাঁকি দেয় না,” সে বলল। এবার হাসছিল, কারণ নিজের ছোট্ট বড়াইটা ইচ্ছে করেই একটু বাড়িয়ে বলছে। “আমি কথা দিচ্ছি, এটা কখনো ফাঁকি দেবে না।”
“এক মিনিট, প্লিজ।” সিগার ধরা হাতটা তিনি ওপরের দিকে তুললেন। তালুটা সামনের দিকে রাখলেন, যেন ট্রাফিক থামাচ্ছেন। “শুধু এক মিনিট।” তাঁর গলা অদ্ভুত রকম নরম, প্রায় সুরহীন। পুরো সময় ছেলেটির দিকেই তাকিয়ে ছিলেন।
“এটা নিয়ে ছোট্ট একটা বাজি ধরলে কেমন হয়?” ছেলেটির দিকে তাকিয়ে হাসলেন। “তোমার লাইটার জ্বলে কি না, সেটা নিয়ে?”
“অবশ্যই ধরব,” ছেলেটি বলল। “কেন নয়?”
“তুমি বাজি ধরতে পছন্দ করো?”
“অবশ্যই। আমি সব সময় বাজি ধরি।”
লোকটি একটু থামলেন। সিগারটা পরীক্ষা করলেন। সত্যি বলতে কী, তাঁর আচরণটা আমার মোটেই ভালো লাগছিল না। মনে হচ্ছিল, কথাটাকে ধরে তিনি যেন কিছু একটা করতে চাইছেন, ছেলেটিকে বিব্রত করতে চাইছেন। একই সঙ্গে মনে হচ্ছিল, তাঁর নিজের কোনো ছোট্ট গোপন ব্যাপার আছে, যা তিনি ভেতরে ভেতরে বেশ উপভোগ করছেন।
আবার ছেলেটির দিকে তাকিয়ে ধীরে বললেন, “আমিও বাজি ধরতে পছন্দ করি। এ নিয়ে একটা ভালো বাজি ধরি না কেন? বেশ বড়সড় একটা বাজি।”
“এই, এক মিনিট,” ছেলেটি বলল। “তা আমি পারব না। তবে পঁচিশ সেন্ট ধরতে পারি। এমনকি এক ডলারও। অথবা এখানে যা চলে, কয়েক শিলিং বোধ হয়।”
ছোটখাটো লোকটি আবার হাত নাড়লেন। “আমার কথা শোনো। এবার একটু মজা হোক। আমরা একটা বাজি ধরি। তারপর হোটেলে আমার ঘরে যাব। সেখানে হাওয়া নেই। আমি বাজি ধরে বলছি, তোমার এই বিখ্যাত লাইটারটা টানা দশবার জ্বালাতে পারবে না। মাঝখানে একবার না একবার ফাঁকি দেবেই।”
“আমি বাজি ধরে বলছি, পারব,” ছেলেটি বলল।
“ঠিক আছে। ভালো। তাহলে বাজি হলো, হ্যাঁ?”
“অবশ্যই। এক ডলার।”
“না, না। আমি তোমাকে খুব ভালো একটা বাজি দিচ্ছি। আমি ধনী মানুষ। বাজির লোকও বটে। আমার কথা শোনো। হোটেলের বাইরে আমার গাড়ি আছে। খুব ভালো গাড়ি। তোমাদের আমেরিকার গাড়ি। ক্যাডিলাক—”
“এই, দাঁড়াও।” ছেলেটি ডেকচেয়ারে হেলান দিয়ে হেসে উঠল। “তার বদলে ওই রকম কিছু আমি বাজিতে রাখতে পারব না। এটা পাগলামি।”
“একটুও পাগলামি নয়। তুমি টানা দশবার লাইটার জ্বালাতে পারলে ক্যাডিলাকটা তোমার। গাড়িটা পেলে ভালো লাগবে, হ্যাঁ?”
“অবশ্যই। একটা ক্যাডিলাক পেলে ভালোই লাগবে।” ছেলেটা তখনও হাসছে।
“ঠিক আছে। ভালো। আমরা বাজি ধরলাম, আর আমি আমার ক্যাডিলাকটা বাজিতে রাখছি।”
“আর আমি কী রাখব?”
ছোটখাটো লোকটি তাঁর এখনও না-ধরানো সিগারের লাল ফিতেটা সাবধানে খুললেন। “বন্ধু, আমি কখনো তোমাকে এমন কিছু বাজি রাখতে বলি না, যা দেওয়ার সামর্থ্য তোমার নেই। বুঝেছ?”
“তাহলে কী রাখব?”
“আমি তোমার জন্য খুব সহজ করে দিচ্ছি, হ্যাঁ?”
“ঠিক আছে। সহজ করে দাও।”
“খুব ছোট কিছু। এমন কিছু, যা তুমি দিতে পারবে। আর যদি হেরেও যাও, খুব বেশি খারাপ লাগবে না। ঠিক?”
“যেমন?”
“যেমন, ধরো, তোমার বাঁ হাতের কড়ে আঙুল।”
“আমার কী!” ছেলেটার হাসি থেমে গেল।
“হ্যাঁ। কেন নয়? তুমি জিতলে গাড়ি নেবে। তুমি হারলে আমি আঙুল নেব।”
“বুঝলাম না। কী মানে, তুমি আমার আঙুল নেবে?”
“কেটে নেব।”
“বাপ রে! এ তো পাগলা বাজি। আমার মনে হয় এক ডলারই থাক।”
ছোটখাটো লোকটি চেয়ারে হেলান দিলেন। দুই হাতের তালু ওপরে রেখে ছড়িয়ে দিলেন, তারপর সামান্য অবজ্ঞার ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকালেন। “বেশ, বেশ, বেশ,” বললেন। “আমি বুঝি না। তুমি বলছ লাইটারটা ঠিকই জ্বলে, কিন্তু বাজি ধরবে না। তাহলে থাক, ভুলে যাই, হ্যাঁ?”
ছেলেটি একেবারে চুপ করে বসে পুলের সাঁতারুদের দিকে তাকিয়ে রইল। হঠাৎ মনে পড়ল, তার সিগারেটটাই এখনও ধরানো হয়নি। সিগারেট ঠোঁটে রেখে দুই হাত দিয়ে লাইটারটা আড়াল করল, তারপর চাকা ঘোরাল। শলতে জ্বলে উঠে ছোট, স্থির, হলুদ শিখা হলো। সে এমনভাবে হাত দিয়ে আগুনটা আড়াল করেছিল যে বাতাস একেবারেই লাগল না।
“আমাকেও একটু আগুন দেবে?” বললাম।
“আরে, দুঃখিত। ভুলে গিয়েছিলাম আপনার কাছে লাইটার নেই।”
আমি লাইটার নেওয়ার জন্য হাত বাড়ালাম। কিন্তু সে উঠে এসে নিজেই আমার সিগারেট ধরিয়ে দিল।
“ধন্যবাদ,” বললাম। সে আবার নিজের চেয়ারে ফিরে গেল।
“সময়টা ভালো কাটছে?” জিজ্ঞেস করলাম।
“ভালো,” বলল। “এখানে বেশ ভালো লাগছে।”
এরপর কিছুক্ষণ চুপচাপ। লোকটার উদ্ভট প্রস্তাবে ছেলেটা যে অস্বস্তিতে পড়েছে, সেটা বোঝা যাচ্ছিল। সে খুব স্থির হয়ে বসেছিল, কিন্তু ভেতরে ভেতরে একটা চাপ জমতে শুরু করেছিল। তারপর চেয়ারে অস্থির হয়ে নড়াচড়া করতে লাগল। হাত দিয়ে বুকটা ঘষল, তারপর ঘাড়ের পেছনে হাত বোলাল। শেষে দুই হাত হাঁটুর ওপর রেখে আঙুল দিয়ে হাঁটুতে টুকটুক করতে লাগল। কিছুক্ষণ পর এক পা দিয়েও টোকা দিতে শুরু করল।
“আচ্ছা, বাজিটা আরেকবার মিলিয়ে নিই,” শেষ পর্যন্ত সে বলল। “তুমি বলছ, আমরা তোমার ঘরে যাব। আমি যদি লাইটারটা টানা দশবার জ্বালাতে পারি, তাহলে একটা ক্যাডিলাক পাব। একবার যদি না জ্বলে, তাহলে বাঁ হাতের কড়ে আঙুলটা হারাব। ঠিক?”
“অবশ্যই। এটাই বাজি। তবে আমার মনে হয় তুমি ভয় পেয়েছ।”
“আমি হারলে কী হবে? তুমি কাটার সময় আমাকে কি আঙুলটা সামনে বাড়িয়ে রাখতে হবে?”
“ওহ্, না! সেটা ভালো হবে না। তখন হয়তো তুমি আর আঙুলটা বাড়িয়ে রাখতে চাইবে না। তাই খেলা শুরুর আগে তোমার এক হাত টেবিলের সঙ্গে বেঁধে রাখব। তারপর ছুরি হাতে পাশে দাঁড়িয়ে থাকব। লাইটারটা একবার না জ্বললেই সঙ্গে সঙ্গে আঙুলটা কেটে দেব।”
“ক্যাডিলাকটা কোন বছরের?” ছেলেটি জিজ্ঞেস করল।
“মাফ করবেন, বুঝলাম না।”
“কোন বছরের? গাড়িটার বয়স কত?”
“আহা! কত পুরনো? হ্যাঁ। গত বছরের। বেশ নতুন গাড়ি। তবে দেখছি তুমি বাজি ধরার লোক নও। আমেরিকানরা কখনোই বাজি ধরার লোক নয়।”
ছেলেটি এক মুহূর্ত থামল। প্রথমে ইংরেজ মেয়েটির দিকে তাকাল, তারপর আমার দিকে। “হ্যাঁ,” হঠাৎ তীক্ষ্ণ গলায় বলল। “আমি বাজি ধরব।”
“ভালো!” ছোটখাটো লোকটি দুই হাত একবার আস্তে চাপড়ালেন। “ভালো। তাহলে শুরু করা যাক। আর আপনি, স্যার,” আমার দিকে ফিরে বললেন, “আপনি কি... কী যেন বলে... রেফারি হতে রাজি হবেন?” তাঁর চোখ দুটো এত ফ্যাকাশে যে প্রায় রংহীন। মাঝখানে ছোট ছোট উজ্জ্বল কালো মণি।
“বেশ,” বললাম। “বাজিটা আমার কাছে পাগলামি মনে হচ্ছে। মোটেই ভালো লাগছে না।”
“আমারও না,” ইংরেজ মেয়েটি বলল। এই প্রথম সে কথা বলল। “আমার মনে হয় বাজিটা নির্বোধ আর হাস্যকর।”
“ছেলেটা হারলে আপনি সত্যিই তার আঙুল কেটে দেবেন?” জিজ্ঞেস করলাম।
“অবশ্যই। আর সে জিতলে ক্যাডিলাকটাও দেব। চলো, এবার আমার ঘরে যাই।”
তিনি উঠে দাঁড়ালেন। “আগে কিছু জামাকাপড় পরে নেবে?”
“না,” ছেলেটি বলল। “এভাবেই যাব।” তারপর আমার দিকে ফিরে বলল, “আপনি সঙ্গে এসে রেফারি হলে আমার খুব উপকার হবে।”
“ঠিক আছে,” বললাম। “আমি যাব। কিন্তু বাজিটা আমার মোটেই পছন্দ নয়।”
“তুমিও এসো,” ছেলেটি মেয়েটিকে বলল। “এসে দেখো।”
ছোটখাটো লোকটি বাগানের মধ্যে দিয়ে হোটেলের দিকে আমাদের আগে আগে নিয়ে চললেন। এখন তিনি খুবই প্রাণবন্ত আর উত্তেজিত। উত্তেজনায় হাঁটার সময় পায়ের আঙুলের ওপর আগের চেয়েও বেশি উঁচু হয়ে উঠছিলেন।
“আমি হোটেলের পাশের ভবনে থাকি,” বললেন। “আগে গাড়িটা দেখবে? এই কাছেই।”
তিনি আমাদের এমন জায়গায় নিয়ে গেলেন, যেখান থেকে হোটেলের সামনের গাড়ি চলার পথটা দেখা যায়। কাছেই একটা ছিমছাম, হালকা সবুজ ক্যাডিলাক দাঁড়িয়ে ছিল। সেটার দিকে আঙুল দেখিয়ে বললেন,
“ওই যে। সবুজটা। পছন্দ?”
“বাহ্, বেশ সুন্দর গাড়ি,” ছেলেটি বলল।
“ঠিক আছে। এবার ওপরে যাই। দেখি তুমি ওটা জিততে পারো কি না।”
তাঁর পেছন পেছন হোটেলের পাশের ভবনে ঢুকে এক প্রস্থ সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠলাম। তিনি দরজা খুললেন। সবাই একসঙ্গে বড়, আরামদায়ক একটা শোবার ঘরে ঢুকলাম। একটি বিছানার পায়ের দিকটায় একজন মহিলার ড্রেসিং গাউন আড়াআড়ি পড়ে ছিল।
“প্রথমে,” তিনি বললেন, “একটু মারটিনি খাওয়া যাক।”
ঘরের দূরের কোণে ছোট একটা টেবিলের ওপর পানীয় মেশানোর সবকিছু সাজানো ছিল। পানীয় মেশানোর একটা পাত্র, বরফ আর অনেকগুলো গ্লাস। তিনি মারটিনি বানাতে শুরু করলেন। মারটিনি বানাতে বানাতেই ঘণ্টা বাজালেন। একটু পর দরজায় টোকা পড়ল, একজন কৃষ্ণাঙ্গ পরিচারিকা ঢুকল।
“আহ্!” জিনের বোতলটা নামিয়ে পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করলেন। সেখান থেকে এক পাউন্ডের একটা নোট বের করে বললেন, “আমার জন্য এখন একটা কাজ করবে, প্লিজ?” নোটটা পরিচারিকার হাতে দিলেন।
“এটা রাখো,” বললেন। “এখন আমরা এখানে ছোট একটা খেলা খেলব। তুমি আমার জন্য দুটো... না, তিনটে জিনিস জোগাড় করে আনবে। কিছু পেরেক, একটা হাতুড়ি, আর একটা কসাইয়ের মাংস-হাড় কাটার চাপাতি। রান্নাঘর থেকে ধার নিতে পারবে। জোগাড় করতে পারবে, হ্যাঁ?”
“চাপাতি!” পরিচারিকা চোখ বড় বড় করে দুই হাত সামনে জোড় করল। “সত্যি সত্যি একটা চাপাতি চাই?”
“হ্যাঁ, হ্যাঁ, অবশ্যই। যাও এখন, প্লিজ। নিশ্চয়ই জিনিসগুলো পাবে।”
“জি স্যার, চেষ্টা করব স্যার। নিশ্চয়ই চেষ্টা করব।” সে চলে গেল।
ছোটখাটো লোকটি সবার হাতে মারটিনি তুলে দিলেন। আমরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চুমুক দিচ্ছিলাম। ছেলেটির লম্বাটে মুখে বাদামি ছোপ, নাকটা চোখা। বিবর্ণ বাদামি সাঁতারের শর্টস ছাড়া গায়ে আর কিছু নেই। ইংরেজ মেয়েটি বড়সড় গড়নের, হালকা-সোনালি চুলের, পরনে ফ্যাকাশে নীল সাঁতারের পোশাক। গ্লাসের ওপর দিয়ে সারাক্ষণ ছেলেটির দিকে তাকিয়ে ছিল। ছোটখাটো লোকটি একেবারে পরিপাটি সাদা স্যুট পরে দাঁড়িয়ে মারটিনি খাচ্ছিলেন। তিনি বর্ণহীন চোখে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে ছিলেন।
পুরো ব্যাপারটা দেখে কী ভাবব, বুঝতে পারছিলাম না। বাজিটা যে লোকটি সত্যিই গুরুত্ব দিয়ে নিয়েছেন, তা বোঝা যাচ্ছিল। ছেলেটির আঙুল কাটার কথাটাও তিনি সত্যিই বলছেন বলে মনে হচ্ছিল। কিন্তু ধুর, ছেলেটা যদি হেরে যায়? তখন যে ক্যাডিলাকটা সে জিততে পারেনি, সেই গাড়িতেই তাকে তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। কী চমৎকার কাণ্ডই না হবে! সত্যিই, কী চমৎকার কাণ্ড! আমার চোখে পুরো ব্যাপারটাই ছিল একেবারে নির্বোধ, অপ্রয়োজনীয় একটা কাণ্ড।
“তোমার মনে হয় না বাজিটা বেশ নির্বোধ?” বললাম।
“আমার তো দারুণ বাজি মনে হচ্ছে,” ছেলেটি বলল। এরই মধ্যে বড় এক গ্লাস মারটিনি শেষ করে ফেলেছিল।
“আমার মনে হয় এটা নির্বোধ আর হাস্যকর বাজি,” মেয়েটি বলল। “তুমি হেরে গেলে কী হবে?”
“কিছু হবে না। ভেবে দেখলে, জীবনে কখনো বাঁ হাতের কড়ে আঙুলটা কোনো কাজে লেগেছে বলে মনে পড়ে না। এই যে ও।” ছেলেটি আঙুলটা ধরল। “এই যে ও, আজ পর্যন্ত আমার জন্য কিছুই করেনি। তাহলে ওকে বাজিতে রাখব না কেন? আমার তো ভালো বাজিই মনে হচ্ছে।”
ছোটখাটো লোকটি হাসলেন। পানীয় মেশানোর পাত্রটা তুলে আমাদের গ্লাস আবার ভরে দিলেন।
“শুরু করার আগে,” তিনি বললেন, “গাড়ির চাবিটা আমি এই... এই রেফারির হাতে দেব।” পকেট থেকে গাড়ির চাবি বের করে আমাকে দিলেন। “কাগজপত্র,” বললেন, “মালিকানার কাগজ আর বিমার কাগজ গাড়ির ভেতরের পকেটে আছে।”
তখন পরিচারিকাটি আবার ঢুকল। এক হাতে কসাইরা মাংসের হাড় কাটতে যে ধরনের ছোট চাপাতি ব্যবহার করে, তেমন একটা চাপাতি। অন্য হাতে হাতুড়ি আর এক ব্যাগ পেরেক।
“ভালো! সব পেয়েছ। ধন্যবাদ, ধন্যবাদ। এবার তুমি যেতে পারো।”
পরিচারিকা দরজা বন্ধ না করা পর্যন্ত তিনি অপেক্ষা করলেন। তারপর জিনিসগুলো একটা বিছানার ওপর রেখে বললেন, “এবার প্রস্তুত হওয়া যাক, কী বলো?” ছেলেটিকে বললেন, “টেবিলটা একটু সরাতে আমাকে সাহায্য করো, প্লিজ।”
হোটেলের সাধারণ লেখার টেবিল। সাদামাটা আয়তাকার, প্রায় চার ফুট বাই তিন ফুট। ওপরে ব্লটিং প্যাড, কালি, কলম আর কাগজ। দুজন মিলে টেবিলটা দেয়াল থেকে সরিয়ে ঘরের ভেতরের দিকে আনল। তারপর লেখার জিনিসপত্র সরিয়ে ফেলল।
“এবার,” তিনি বললেন, “একটা চেয়ার।” একটা চেয়ার তুলে এনে টেবিলের পাশে রাখলেন। খুব তৎপর আর উৎসাহের সঙ্গে কাজ করছিলেন, যেন বাচ্চাদের কোনো পার্টির খেলার আয়োজন করছেন। “এবার পেরেক। পেরেকগুলো পুঁততে হবে।” পেরেক এনে টেবিলের ওপর হাতুড়ি দিয়ে পুঁততে শুরু করলেন।
আমরা তিনজন, ছেলেটি, মেয়েটি আর আমি, হাতে মারটিনির গ্লাস নিয়ে দাঁড়িয়ে তাঁর কাজ দেখছিলাম। টেবিলের ওপর ছয় ইঞ্চি দূরে দূরে দুটো পেরেক পুঁতলেন। পেরেক দুটো পুরোটা পুঁতে দিলেন না। প্রতিটির সামান্য অংশ ওপরের দিকে বের করে রাখলেন। তারপর আঙুল দিয়ে নাড়িয়ে দেখে নিলেন শক্ত আছে কি না।
দেখে মনে হচ্ছিল, হারামজাদাটা এ কাজ আগেও করেছে। একবারও ইতস্তত করছে না। টেবিল, পেরেক, হাতুড়ি, রান্নাঘরের চাপাতি। ঠিক কী লাগবে আর কীভাবে সাজাতে হবে, সব জানে।
“এবার,” বললেন, “শুধু একটু দড়ি দরকার।” দড়িও খুঁজে পেলেন। “ঠিক আছে, এবার সব তৈরি। প্লিজ, এখানে টেবিলের কাছে বসো,” ছেলেটিকে বললেন।
ছেলেটি গ্লাসটা সরিয়ে রেখে এসে বসল।
“এবার এই দুই পেরেকের মাঝখানে বাঁ হাতটা রাখো। পেরেক দুটো শুধু তোমার হাতটা ঠিক জায়গায় বেঁধে রাখার জন্য ব্যবহার করব। ঠিক আছে, ভালো। এবার তোমার হাতটা টেবিলের সঙ্গে শক্ত করে বেঁধে দিই।”
তিনি ছেলেটির কবজির চারদিকে দড়ি প্যাঁচালেন। তারপর হাতের চওড়া অংশের চারপাশে কয়েকবার পেঁচিয়ে দড়িটা পেরেক দুটির সঙ্গে শক্ত করে বাঁধলেন। এমনভাবে বাঁধলেন যে কাজ শেষ হওয়ার পর ছেলেটির হাতটা আর টেনে সরানোর কোনো উপায় ছিল না। তবে আঙুলগুলো নাড়াতে পারছিল।
“এবার প্লিজ, কড়ে আঙুলটা বাইরে রেখে বাকি আঙুলগুলো মুঠো করো। কড়ে আঙুলটা টেবিলের ওপর শুইয়ে রাখো।”
“চ-মৎ-কার! চ-মৎ-কার! এবার আমরা তৈরি। ডান হাত দিয়ে লাইটারটা চালাবে। কিন্তু এক মিনিট, প্লিজ।”
লাফিয়ে লাফিয়ে বিছানার কাছে গিয়ে চাপাতিটা তুলে নিলেন। তারপর আবার টেবিলের পাশে এসে দাঁড়ালেন।
“সবাই তৈরি?” বললেন। “মিস্টার রেফারি, আপনিই ‘শুরু’ বলবেন।”
ফ্যাকাশে নীল সাঁতারের পোশাক পরা ইংরেজ মেয়েটি ছেলেটির চেয়ারের ঠিক পেছনে চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল। ছেলেটি একেবারে স্থির হয়ে বসে ডান হাতে লাইটার ধরে চাপাতিটার দিকে তাকিয়ে ছিল। ছোটখাটো লোকটি তাকিয়ে ছিলেন আমার দিকে।
“তুমি তৈরি?” ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করলাম।
“তৈরি।”
“আর আপনি?” ছোটখাটো লোকটিকে বললাম।
“একেবারে তৈরি।” তিনি চাপাতিটা ওপরে তুললেন। ছেলেটির আঙুলের প্রায় দুই ফুট ওপরে ধরে রাখলেন, কোপ দেওয়ার জন্য তৈরি। ছেলেটি চাপাতিটার দিকে তাকাল, কিন্তু একটুও কেঁপে উঠল না। মুখও নড়ল না। শুধু ভুরু তুলল, তারপর কপাল কুঁচকাল।
“ঠিক আছে,” বললাম। “শুরু করো।”
ছেলেটি বলল, “আমি যতবার জ্বালাব, আপনি কি গুনে গুনে বলবেন, প্লিজ?”
“হ্যাঁ,” বললাম। “গুনব।”
বুড়ো আঙুল দিয়ে লাইটারের ঢাকনাটা তুলল। তারপর একই বুড়ো আঙুল দিয়ে চাকাটা ঝটকা দিয়ে ঘোরাল। চকমকি থেকে ফুলকি বেরোল। শলতেতে আগুন ধরে ছোট একটা হলুদ শিখা জ্বলে উঠল।
“এক!” আমি বললাম।
সে ফুঁ দিয়ে আগুন নেভাল না। লাইটারের ঢাকনা বন্ধ করে আগুনটা নিভিয়ে দিল। তারপর প্রায় পাঁচ সেকেন্ড অপেক্ষা করে আবার ঢাকনা খুলল। চাকাটা খুব জোরে ঝটকা দিয়ে ঘোরাতেই আবার শলতের ওপর ছোট একটা শিখা জ্বলে উঠল।
“দুই!”
আর কেউ কোনো কথা বলল না। ছেলেটির চোখ লাইটারের ওপর। ছোটখাটো লোকটি চাপাতিটা উঁচু করে ধরে রেখেছেন। তিনিও লাইটারের দিকে তাকিয়ে।
“তিন!”
“চার!”
“পাঁচ!”
“ছয়!”
“সাত!” বোঝাই যাচ্ছিল, লাইটারটা বেশ ভরসার। চকমকি থেকে বড়সড় ফুলকি বেরোচ্ছে, আর শলতেটাও ঠিক মাপের। আমি দেখছিলাম, বুড়ো আঙুলটা ফট করে ঢাকনাটা নামিয়ে শিখাটা চাপা দিচ্ছে। তারপর একটু বিরতি। আবার সেই বুড়ো আঙুলই ঢাকনা তুলছে। পুরো কাজটাই হচ্ছিল ওই বুড়ো আঙুল দিয়ে। বুড়ো আঙুলটাই সব করছিল। আমি শ্বাস নিলাম, আট বলার জন্য তৈরি হলাম। বুড়ো আঙুল চাকাটা ঝটকা দিয়ে ঘোরাল। চকমকি থেকে ফুলকি বেরোল। ছোট শিখাটা জ্বলে উঠল।
“আট!” বললাম, আর বলার সঙ্গে সঙ্গেই দরজা খুলে গেল। আমরা সবাই ঘুরে তাকালাম। দরজায় ছোটখাটো, কালো চুলের, বেশ বয়স্ক একজন মহিলা দাঁড়িয়ে। প্রায় দুই সেকেন্ড সেখানে দাঁড়িয়ে থেকে হঠাৎ “কার্লোস! কার্লোস!” বলে চেঁচাতে চেঁচাতে ছুটে এলেন। লোকটির কবজি চেপে ধরলেন, হাত থেকে চাপাতিটা কেড়ে বিছানায় ছুড়ে ফেললেন। তারপর সাদা কোটের কলারের দু-পাশ ধরে প্রচণ্ডভাবে ঝাঁকাতে শুরু করলেন। একই সঙ্গে স্প্যানিশের মতো শোনায় এমন কোনো ভাষায় খুব দ্রুত, জোরে আর প্রচণ্ড রাগে কথা বলে যাচ্ছিলেন। এত দ্রুত ঝাঁকাচ্ছিলেন যে লোকটাকে আর দেখা যাচ্ছিল না। কুয়াশার মতো অস্পষ্ট একটা অবয়ব শুধু দ্রুত নড়ছিল, যেন ঘুরন্ত চাকার শিক।
তারপর তাঁর ঝাঁকুনি একটু ধীর হলো। ছোটখাটো লোকটিকে আবার দেখা গেল। মহিলা তাঁকে টেনে ঘরের ওপারে নিয়ে গিয়ে পেছন দিকে ঠেলে একটা বিছানায় বসিয়ে দিলেন। লোকটি বিছানার কিনারায় বসে চোখ পিটপিট করতে লাগল আর ঘাড়ের ওপর মাথাটা এখনও ঘোরে কি না দেখে নিতে লাগল।
“আমি খুব দুঃখিত,” মহিলা বললেন। “এমনটা ঘটল বলে আমি ভীষণ দুঃখিত।” তিনি প্রায় নিখুঁত ইংরেজিতে কথা বলছিলেন।
“খুব খারাপ হলো,” তিনি বললেন। “বোধ হয় দোষটা আমারই। মাত্র দশ মিনিটের জন্য ওকে একা রেখে চুল ধোয়াতে গিয়েছিলাম। ফিরে এসে দেখি আবার শুরু করেছে।” তাঁকে সত্যিই দুঃখিত আর খুব চিন্তিত দেখাচ্ছিল।
ছেলেটি তখন টেবিল থেকে নিজের হাতের বাঁধন খুলছিল। ইংরেজ মেয়েটি আর আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম।
“লোকটা একেবারে বিপজ্জনক,” মহিলা বললেন। “আমাদের ওখানে বিভিন্ন মানুষের মোট সাতচল্লিশটা আঙুল কেটে নিয়েছে, আর এগারোটা গাড়ি হেরেছে। শেষ পর্যন্ত ওরা হুমকি দিয়েছিল, ওকে কোথাও আটকে রাখবে। তাই ওকে এখানে নিয়ে এসেছি।”
“আমরা তো শুধু ছোট একটা বাজি ধরছিলাম,” বিছানা থেকে ছোটখাটো লোকটি বিড়বিড় করে বলল।
“বোধ হয় তোমার সঙ্গে একটা গাড়ি বাজি ধরেছিল,” মহিলা বললেন।
“হ্যাঁ,” ছেলেটি বলল। “একটা ক্যাডিলাক।”
“তার কোনো গাড়ি নেই। ওটা আমার। আর তাতেই ব্যাপারটা আরও খারাপ,” মহিলা বললেন। “নিজের বলে বাজিতে রাখার মতো কিছুই নেই, তবু তোমার সঙ্গে আমার গাড়ি বাজি ধরেছে। পুরো ব্যাপারটার জন্য আমি লজ্জিত, আর খুবই দুঃখিত।” তাঁকে খুব ভালো মানুষ বলে মনে হলো।
“বেশ,” বললাম, “তাহলে এই নিন আপনার গাড়ির চাবি।” চাবিটা টেবিলের ওপর রাখলাম।
“আমরা তো শুধু ছোট একটা বাজি ধরছিলাম,” ছোটখাটো লোকটি আবার বিড়বিড় করল।
“বাজিতে রাখার মতো তার আর কিছুই নেই,” মহিলা বললেন। “এই দুনিয়ায় তার নিজের বলতে কিছুই নেই। একেবারেই কিছু নেই। আসলে অনেক দিন আগে আমি নিজেই তার কাছ থেকে সবকিছু জিতে নিয়েছি। সময় লেগেছে, অনেক সময়। কাজটাও কঠিন ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সবই জিতে নিয়েছি।” তিনি ছেলেটির দিকে তাকিয়ে ধীরে, বিষণ্নভাবে হাসলেন। তারপর টেবিলের কাছে এসে চাবিটা নেওয়ার জন্য হাত বাড়ালেন।
এখনও চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি সেই হাতটা। তাতে ছিল মাত্র একটি আঙুল আর একটি বুড়ো আঙুল।
------------------------------------------------
------------------------------------------------
Man From South গল্পটির চলচ্চিত্ররূপ
১. রোয়ল্ড ডালের আলোচনাসহ চলচ্চিত্ররূপ--ইউটিউব লিঙ্ক
১. রোয়ল্ড ডালের আলোচনাসহ চলচ্চিত্ররূপ--ইউটিউব লিঙ্ক
২. আলফ্রেড হিচকক প্রেজেন্টস-- ইউটিউব লিঙ্ক
part 1

6 মন্তব্যসমূহ
ঝরা সৈয়দের আলোচনাটি বিস্তারিত। এভাবে অ্যাকিাডেমিক বিশ্লেষণ করতে না জানলেও এটা বুঝতে পারছিলাম গল্পটি টেনে ধরে রাখছে, ছেড়ে দিচ্ছে। আবার বেঁধে ফেলছে। শেষ চমকে পাঠককে ভাববার সুযোগও দিচ্ছে।
উত্তরমুছুনঅসাধারণ গল্প। অনুবাদও সাবলীল। মুগ্ধ হলাম পড়ে।
উত্তরমুছুনডাল আমার প্রিয় লেখক। অনুবাদও মন- কাড়া।
উত্তরমুছুনপ্রথমদিকে গল্পটি কেনো যেনো টানছিল না। হঠাৎই অপেক্ষার জালে বেঁধে ফেললো। ভ্রমনের শেষ দিকে কালো চুলে ছোটখাটো মহিলার আগমন ভ্রমনকে সার্থক করে তুললো। অনুবাদেও মুগ্ধতা ছিল।
উত্তরমুছুনগল্পের প্রথম দিকটা একটু মনোটোনাস। কিন্তু শেষটা সাসপেন্সে ভরা। ইউটিউবের ভিডিওটাও দেখলাম। উপভোগ্য।
উত্তরমুছুনসাংঘাতিক চমকে গেছি। এরকম গল্প আগে পড়িনি। দারুণ অনুবাদ।
উত্তরমুছুন