ইন্তিজার হুসেইনের গল্প : ছায়া


অনুবাদ : প্রতিভা সরকার

এইরকম কথা কেউ কখনও কল্পনাতেও শুনেছে! চোখের চশমা ঠিক করে নিয়ে গলাটা একটা রুমাল দিয়ে শুকনো করে মুছল সে। ঘামে একেবারে ভিজে গেছে, বুকের মধ্যেকার ধুকপুক আওয়াজটা যেন নিজের কানেই খুব জোর শোনা যাচ্ছিল, যদিও তা এখন কমে এসেছে।

কিছুক্ষণ আগে নিজের ব্যবহারের কথা ভেবে এখন তার লজ্জাই লাগছে। শুধুমাত্র সন্দেহের বশে সে কেমন ভয় পেয়ে গিয়েছিল আর দৌড়ে পালাচ্ছিল। কেন ঐভাবে পালাতে গেল সে? কেউ তো তার পিছু নেয়নি, নাকি নিয়েছিল? কিন্তু সে তো কোনও অপরাধ করেনি, কাউকে খুন করেনি। না:, ফিরে গিয়ে ব্যাপারটা দেখতে হচ্ছে, নাহলে সারাজীবন এই সন্দেহ তাকে পীড়া দেবে।

রেস্টুরেন্টে যখন সে ফিরে এলো, তখন নিজের আতঙ্ক সে কাটিয়ে উঠেছে, যদিও বুকের ধুকপুকানি তখনও একটু আছে আর পাগুলো যেন একটু বেশি ভারী। তবুও বেশ দৃঢ়তার সঙ্গে সে ভেতরে ঢুকে গেল, আর যে টেবিলটা সে এইমাত্র ছেড়ে গিয়েছিল, সেটার দিকে তাকালো। কই, লোকটা তো নেই! কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেল! এই তো এক্ষুনি খাবারের অর্ডার দেবার পর সে নিজের পরিচয় দিচ্ছিল! এটা কী করে সম্ভব যে মাত্র এই ক' মিনিটে অর্ডারি খাবারদাবার তাকে সার্ভ করা হলো আর সে সেগুলো খেয়েদেয়ে চলেও গেল? অসম্ভব! অবশ্য এটা হতে পারে যে লোকটা রেস্ট রুমে গিয়ে ঢুকেছে।

সে এবার টেবিলটার কাছাকাছি একটা জায়গা বেছে নিল, আর খবরের কাগজ পড়বার ভান করতে লাগলো। কিন্তু পড়া দূরের কথা, তার সমস্ত মনোযোগ আছড়ে পড়ছিল রেস্ট রুমের বন্ধ দরজাটার ওপর। একসময় দরজাটা খুলে গেল, একজন খুব তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে এলো, রুমালে হাত মুছতে মুছতে একটা টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল যেটায়

আগে থেকেই কয়েকজন চায়ের কাপ নিয়ে বসেছিলো।

তাহলে ব্যাটা গেল কোথায়? এইবার সে সত্যিই ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল! ও কি একটা মানুষ ছিল, নাকি একটা ছায়া! টেবিলে খবরের কাগজটা রেখে সে উঠে পড়ল। ক্যাশ কাউন্টারের পাশ দিয়ে যাবার সময় মনে হল ম্যানেজারকে জিজ্ঞাসা করলেই তো হয়। পর মূহুর্তেই ভাবলো, ম্যানেজারের পক্ষে কি নির্দিষ্ট একজন কাস্টমারকে খেয়াল করা সম্ভব? সে তাড়াতাড়ি রেস্টুরেন্টের বাইরে এল।

সাইকেল স্ট্যান্ডের কাছে দাঁড়িয়ে প্রত্যেক বাইকওয়ালাকে খুঁটিয়ে নজর করে বেশ কিছুক্ষণ পর সে বাড়িতে ফিরল বটে, কিন্তু মনের মধ্যেটা নানা দ্বিধা এবং সন্দেহের কুয়াশায় ভরেই রইল।

তাদের দুজনেরই কি একই নাম নয়? নিজের সঙ্গেই তার বিস্তর তর্কাতর্কি চলছিল। হ্যাঁ, একই নাম তো। দুজন কেন, অনেক লোকেরই এক নাম থাকতে পারে। কিন্তু মুখ? হুবহু একরকম দেখতে দুটো লোক থাকতে পারে? এবার তার সব গুলিয়ে যায়। তার যুক্তি বুদ্ধি আবার কাজ করা বন্ধ করে দেয়। আবার সেই মুখটা মনে পড়ে তার। এতো গভীর মনোযোগ দিয়ে সে চা খেতে খেতে কাগজ পড়ছিল যে লোকটাকে সে ভালো করে লক্ষ্যই করেনি। ট্রেনে যাবার সময় বা রেস্টুরেন্টে অলসভাবে বসে থাকলেও সে কখনও অচেনা লোকের সঙ্গে ভাব জমায় না। কিন্তু লোকটা যখন তার পরিচয় দিল, তার কান একেবারে খাড়া হয়ে উঠলো, কারণ ওর মুখে নিজের নামটাই শুনতে পেয়েছিল সে। চমকে লোকটার মুখের দিকে তাকিয়ে সে একেবারে হতবাক হয়ে গেল। লোকটার মুখটা একেবারে হুবহু…, তার চোখ যেন ফেটে বেরিয়ে আসছিল,মেরুদণ্ড দিয়ে ঠান্ডা স্রোত নেমে যাচ্ছিল, সে কাঁপতে কাঁপতে বেরিয়ে এসে প্রায় ছুটতে শুরু করলো। চিন্তাগুলো তার সঙ্গে ছুটছিল, যদিও কিছু না ভাবার প্রাণপণ চেষ্টাই সে করে চলেছিল।

কেন ছুটছি আমি? আমি কি জেলভাঙা কয়েদি? নাকি খুনের আসামি? সে এবার ব্যাপারটা ঠান্ডা মাথায় ভাবার চেষ্টা করলো। হতেও তো পারে, একই নামের দুজন মানুষ কোনো অদ্ভুত উপায়ে একই রকম দেখতে হয়ে গেল। একই রকম দেখতে কি মানুষ হয় না? কিন্তু ঐ লোকটা কী করে তার ডাবল হবে! তাহলে হয়তো বা তার কল্পনা এই ভ্রম ঘটিয়েছে!

গেট পেরিয়ে সে সোজা নিজের ঘরে এসে ঢুকলো। তখনই হঠাৎ মনে পড়লো গতকাল বাইরে থাকবার সময় কেউ এসে তার খোঁজ করেছিল। বড় ঘরটা পেরিয়ে সে উঠোনে নামল, আম্মাজি, কেউ এসেছিল আমাকে খুঁজতে ?

না তো।

গতকাল কে এসেছিল?

কে জানে! নামধাম বলে যায়নি তো।

ও তাই!

সে একটু ইতস্তত করে বলে ফ্যালে,

-লোকটাকে দেখতে কেমন ছিল?

- কী আশ্চর্য, আরে আমি কি বেরিয়ে ওকে দেখেছি নাকি!

এবার ওর নিজের কানেই নিজের প্রশ্নটা একেবারে ফালতু শোনাল।

কিন্তু লোকটা কে? এসেছিল কেন? বন্ধুদের মধ্যে কেউ? কিন্তু বন্ধুদের সঙ্গে তো রোজই দেখা হচ্ছে। গতকালও হয়েছে। আর কেউ বলেওনি যে তার অনুপস্থিতিতে কেউ তার বাড়ি এসেছিল। পুরনো কেউ? হতে পারে, তবে এটা কেমন যে তাকে দেখতে চেয়ে একেবারে বাড়ি এসে উপস্থিত হল, আবার না পেয়ে একদম উবে গেল? লোকটা কি আদৌ মানুষ, নাকি ছায়া? এটা ভাবতে ভাবতেই তার মনে পড়ে গেল, মেসবাহুদ্দিন তাকে বলছে যে দুদিন আগে কেউ নাকি সারা কলেজে তাকে খুঁজে বেরিয়েছে। এবার সে সত্যি কৌতুহলী বোধ করল, কে তাকে এতো খুঁজে বেড়াল!

ঘরে ফিরে আসবার বদলে সে মেসবাহউদ্দিনের বাড়ি চলে গেল, -সেদিন কে আমায় খুঁজছিল রে?

তা তো জানি না। তবে সে নাকি বহুক্ষণ ধরে তোকে খুঁজেছে।

নাম বলেছে?

না।

মুখটা মনে আছে?

মুখ মনে আছে কিনা? মেসবাহউদ্দিন থতমত খায়।

না মানে, লোকটাকে কার মতো দেখতে?

আরে ধুর, আমি তো নিজের চোখে দেখিইনি। আমি শুধু দেখলাম সামি একটা অপরিচিত লোকের সঙ্গে কথা বলছে। তখন মনোযোগ দিইনি। পরে সামির সঙ্গে দেখা হতে ও বলল, হাসানকে খুঁজতে এসেছিল। তা তুই তো সেদিন কলেজে যাসইনি। পরেও আমরা দুজন মিলে লোকটাকে খুব খুঁজলাম, কিন্তু পেলাম না। তখন ক্লাসে চলে গেলাম।

উত্তরটা তাকে সন্তুষ্ট করতে পারল না। কীরকম একটা অশান্তি হচ্ছিল তার। কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে সে হঠাতই বললো, এবার কিন্তু যেতেই হচ্ছে।

তার মানে? কোথায় যাবি এতো তাড়াতাড়ি?

সামির সঙ্গে কথা বলতে হবে।

পাগলা হলি নাকি! কারও যদি তোকে দরকার হয়, সে নিশ্চয়ই খুঁজে বার করবে। সেটা নিয়ে এতো ভাবার কী আছে! তোর জায়গায় আমি থাকলে বিন্দাস থাকতাম। দরকার হলে খুঁজে নেবে। ব্যস।

না। আল্লা জানেন, ও কে! হতেই পারে দরকারটা খুব জরুরি। বলা তো যায় না…

সে চলে যায়। সোজা সামির কাছে। দরজা ধাক্কা দেয়, সামি, সামি! পায়ের শব্দ তুলে সামি এসে দরজা খোলে,

আরে তুই? আয় আয়।

দুদিন আগে কেউ আমাকে খুঁজছিল। কোনো আইডিয়া আছে, লোকটা কে হতে পারে?

হ্যাঁ, লোকটা অনেকক্ষণ ধরে তোকে খুঁজেছে, কিন্তু পায়নি। পরে শুনলাম সেদিন তুই আসিসনি।

লোকটার নাম কী রে?

নাম? নাম তো বলেনি।

দেখতে কেমন ছিল?

শামি খুব মনে করার চেষ্টা করতে থাকে ।

আমার মতো রোগাপটকা?

হ্যাঁ। তুই বলাতে মনে পড়ল। শামি বলে।

চশমা পরে?

চশমা?

শামি ভেবেছিল ব্যাপারটা মিটে গেছে, কিন্তু নতুন প্রশ্ন ছুটে আসায় সে একটু ভেবলে যায়। তারপর বলে,

পরতে পারে, নাও পরতে পারে, আমি জানি না। মনে পড়ছে না। কিন্তু তোর বাড়িতে যাবে বলছিল।

- গতকাল কেউ বাড়িতে এসেছিল তো। তখন আমি কলেজে। কী অদ্ভুত না, যখন আমি যেখানে থাকি না, সেখানেই আমাকে খুঁজে বেড়ায়!

শামি হঠাৎ বলল, আরে এখুনি মনে পড়ল ও এডওয়ার্ড হোস্টেলে থাকে।

তাই? রুম নম্বর জানিস?

সামি অবাক হয়ে যায়।

রুম নাম্বার? বলেনি তো। দ্যাখ, ব্যাপারটা এইরকম, আমি গিয়ে মেসবাহউদ্দিনকে জিজ্ঞেস করি তুই কোথায় ও জানে কিনা। ও বলে জানে না। আমি লোকটাকে সেটা জানাতে গিয়ে দেখি এর মধ্যেই সে হাওয়া হয়ে গেছে। তবে মনে আছে, কথা বলার সময় একবার বলেছিল, ও এডওয়ার্ড হোস্টেলের একেবারে টপ ফ্লোরে থাকে।

টপ ফ্লোরে? আচ্ছা তাহলে দেখি পাওয়া যায় কিনা।

দেখবি? তবে আমার মনে হয় তোর বাড়িতে ও আবার আসবে। তোকে যদি সত্যি সত্যিই দেখতে চায়, তাহলে এ ছাড়া আর উপায় কী ওর?

সামির কাছ থেকে বিদায় নেবার সময় সে ঠিক করে নিয়েছিল বাড়িতেই যাবে। সেই লোকটার যদি তার সঙ্গে এতোই দেখা করার ইচ্ছা তো সে নিজেই ঠিক করুক কোথায় কখন দেখা করবে। কিন্তু বাস স্টপে পৌঁছে যেই দেখল বাসটা এডোয়ার্ড হস্টেলের দিকে যাচ্ছে, সব গোলমাল হয়ে গেল। কিচ্ছুটি না ভেবেই সে ছুটে গিয়ে বাসে চেপে বসলো।

ভেতরে ঢোকার পর তার চোখ পড়ল বাস কন্ডাকটরের ওপর। কী আশ্চর্য, আজ সকালে এ-ই তো বাসে ছিল! তবে এইরকম সমাপতন এমন কিছু অদ্ভুত নয় কিন্তু, এটা বাসে যারা চড়ে, তারাই জানে। কিন্তু পাশের প্যাসেঞ্জারটি যদি সকালে বিকেলে একই থাকে? হ্যাঁ, গত মাসে এরকম অদ্ভুত ঘটনা তার সঙ্গে ঘটেছিল। লরিতে যে লোকটা তার পাশে বসেছিল, পরের দিন তাকেই দেখল একটা হোটেল থেকে বার হয়ে আসছে, আবার তার পরদিন লরিতে ফেরার সময় সেই একই লোককে দেখল পেছনের সিটে বসে থাকতে।

সহযাত্রীরা নানা রকম হয়। তাদের কারও সঙ্গে হয়তো সারা জীবন দেখা সাক্ষাৎ হয়নি, কিন্তু গন্তব্যে যেতে যেতে খুব ভাব হয়ে গেল। তারপর দারুণ পছন্দের মানুষটির সঙ্গে আর কখনও দেখাই হলো না। আবার কারও কারও সঙ্গে ফিরে ফিরেই দেখা হতে পারে, কিন্তু একবারও কথা বলতে ইচ্ছে হবে না, এমনও হয়। তাই সহযাত্রীরা চির রহস্যময়, তারা একেবারে গায়েব হয়ে যেতে পারে, আবার ফিরে ফিরেও আসতে পারে।

এই চিন্তার সঙ্গে সঙ্গে তার মনের মধ্যে এই অপার রহস্যের প্রতি একটা শ্রদ্ধাপূর্ণ বিস্ময় চাগিয়ে উঠছে এটা টের পেতে পেতেই এডোয়ার্ড হস্টেল স্টপ চলে এল আর সে ইটের গাঁথুনিওয়ালা ডর্মিটারিতে দ্রুত ঢুকে পড়ল।

বাড়িটা বাইরে থেকে দেখতে নতুন, কিন্তু ভেতরটা অতি প্রাচীন। যেন আদি পিতা এডামের কালের তৈরি। ভাবতে ভাবতে কখন সে সিঁড়ির শেষ ধাপে একটা চওড়া অন্ধকার ছাদে চলে এসেছে, খেয়ালই করেনি। প্রথমে চমকে গেলেও পর মূহুর্তে নিজের ভুল বুঝতে পারে সে, সিঁড়ির পাশে যেখানে বারান্দাটা বেঁকে গেছে, সেইদিকে যাওয়া উচিত ছিল। হুড়মুড়িয়ে নেমে এসে তা-ই করল সে, কিন্তু লম্বা বারান্দাটা খুবই নির্জন আর পরিত্যক্ত মনে হলো। অনেকদূরে যেখানে বারান্দাটা বেঁকে গিয়ে আর একটা বারান্দার সঙ্গে মিশেছে সেইখানে একটি দ্রুত হেঁটে চলে যাওয়া লোকের পিঠ আবছা দেখা গেল যেন।

সে বারান্দার পাশে প্রত্যেকটি দরজা খুঁটিয়ে দেখতে লাগলো। এতো ঘর! লোকটা কোন ঘরে থাকে সে বুঝবে কী করে! সব দরজাই তো বন্ধ। কাকেই বা জিজ্ঞেস করবে! হঠাৎ নজরে পড়ে একটা আধখোলা দরজা, ভেতরটা অন্ধকার, কিন্তু যতদূর তার চোখ চলে কেউ কোথাও নেই।

অগুণতি দরজার এই গোলকধাঁধায় শেষমেষ একটা দরজা পুরো খোলা পাওয়া গেল। ভেতরে আলো জ্বলছে। একটা কোণায় বিছানা পাতা রয়েছে, তার পাশেই একটা ফাঁকা চেয়ার। মনে হচ্ছে ভেতরে কেউ নেই। হঠাৎই তার মনে পড়ল বাঁকানো বারান্দায় আবছা দেখা লোকটাকে। সে কোথায় গেল?

আবার আর একটা বারান্দায় হাঁটতে লাগলো সে। এটাও আগেরটির মতোই শুনশান। সেই একই রকম দরজার পর দরজা, কোনটা ভেতর থেকে বন্ধ, কোনটার বাইরে শিকলি ঝুলছে। গোটা বারান্দা শেষ করে এইবার সে এসে দাঁড়াল একটা অন্ধকার সিঁড়ির প্রথম ধাপে। এতো অন্ধকার যে চোখ চলে না। কেন এইখানে লাইট নেই? এটা কি ব্যবহার করা হয়না? যদি না করা হয়, তাহলে এইরকম খুলে রাখা হয়েছে কেন? এটা নেমে গেছে কোথায়? নানা প্রশ্ন মাথায় নিয়ে সে পিছিয়ে এল।

প্রথম যে বারান্দা দিয়ে সে গিয়েছিল, এবার সেটাতেই ফিরে গেল। আবার তার নজরে এল খোলা দরজা, বিছানা এবং খালি চেয়ার। আর একটা দরজার কাছে গিয়ে পড়ল সে, বন্ধ সেটা, কিন্তু হঠাৎ তার মনে হল ভেতরে মানুষজন কিছু বলাবলি করছে। শোনার চেষ্টা করলেও কিছুই শোনা গেল না, কিন্তু সে পরিষ্কার বুঝতে পারল ভেতরের লোকেরা হঠাৎ তাদের গলা একেবারে খাদে নামিয়ে দিয়েছে, যেন এখন ফিসফিস করে কথা বলছে। তাড়াতাড়ি সেখান থেকে চলে যেতে যেতে সে টের পেল, পেছনে একটা দরজা খুলে গেছে, আর কেউ মুখ বাড়িয়ে তার পিঠে নজর রেখেছে।

তার মনে হলো এতো পরিশ্রম বৃথা। তাড়াতাড়ি চলে যাওয়াই ভালো। কিন্তু অদ্ভুত একটা অনুভূতি তাকে ছেয়ে ফেলছিল, যেন কেউ তার পিছু নিয়েছে, তাকে ধরে ফেলবে, আর সে পাগলের মতো একটার পর একটা ঘরে ঢুকে আত্মগোপন করছে। যেন লুকোচুরি খেলা!

কে আমাকে খুঁজছে? কেন খুঁজছে? সে কে? আমিই বা কে? তার মনে পড়ে গেল সন্ত বায়াজিদের কথা। একটা লোক ধর্মস্থানের দরজায় আঘাত করছিল, "আমি বায়াজিদকে চাই।" ভেতর থেকে সন্ত উত্তর দিলেন, কে তুমি, কাকেই বা চাও? "

জবাব এলো, "বায়াজিদ বায়াজিদ!"

"কোন বায়াজিদ," সন্ত আবার বললেন, "সে কোথায় থাকে, কী করে?"

লোকটা এবার খুব জোরে দরজায় আঘাত করল, "বায়াজিদকেই চাই আমার।" সন্ত বায়াজিদও এবার চেঁচালেন, "আমিও বায়াজিদকে খুঁজে বেড়াচ্ছি, এখনও তার দেখা পেলাম কই!"

সে সিঁড়ির ধাপে হুমড়ি খেয়ে পড়ল, তারপর দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে গেল। নামতে নামতেই সে টের পেল ওপরতলার সমস্ত দরজা হাট হয়ে খুলে গেছে, প্রচুর লোক বারান্দায় বেরিয়ে এসে চেঁচামেচি করে কথা বলছে। আবছা ভেসে আসা সেই আওয়াজ তার মনকে যেন বিকল করে দিল, মন যেন ভেসে বেড়াতে লাগল এক অদ্ভুত কুয়াশায়, যার প্রতিটি কণায় গাঁথা আছে গল্পকাহিনী, সেই রাজপুত্রের রূপকথা যাতে পুণ্যাত্মা প্রদর্শিত পথে অলৌকিক ফল আহরণ করতে গিয়ে পেছন ফিরে তাকানো বারণ জেনেও কোলাহলে ভুলে গিয়ে সে পেছন ফেরে এবং মূহুর্তের মধ্যে প্রস্তরখণ্ডে পরিণত হয়।

আরও বড় এক রহস্য, আরও গভীর বিস্ময় বাইরে তার জন্য অপেক্ষা করে ছিল। একি, এতো রাত হয়ে গেছে! এতো সময় কেটে গেল কী করে! সে যখন মেসবাহউদ্দিনের কাছে গিয়েছিল, তখন তো দিনের বেলা! মেসবাহউদ্দিন এবং সামি, দুজনের সঙ্গেই সে কথা বলেছে খুব অল্প সময়, আর তখন ঝকঝকে দিনের আলো ছিল। তারপর তো সে সোজা এই হস্টেলে এসেছে। মনে হচ্ছিল অল্প সময়, কিন্তু এখন তো দেখা যাচ্ছে ঘন্টার পর ঘন্টা সে এইখানে কাটিয়েছে। কীভাবে এটা সম্ভব? সময়ের গতি কি দ্রুত হয়ে গেল? নাকি সবটাই তার কল্পনা! এই রাতের আবহ কি সে কল্পনায় দেখছে?

চোখ কচলে সে রাস্তার দিকে দেখে। গাড়িঘোড়ার চিনহ মাত্র নেই, ল্যাম্পপোস্টের আলোর নীচে গা এলিয়ে পড়ে আছে দীর্ঘ রাস্তা৷ বাসস্ট্যান্ডটা অন্ধকারে ডুবে আছে। কিন্তু কেন যেন তার সন্দেহ হল ওর ভেতর কেউ আছে। এলোমেলো হাঁটতে লাগলো সে, কারণ তার মনে হচ্ছিল শেষ বাস ধরবার সময়ও অনেকক্ষণ পেরিয়ে গেছে।

তার পাশ দিয়ে একটা খালি অন্ধকার বাস ছুটে গেল। কিন্তু ওটা কি সত্যিই বাস? কারণ লজঝরে বাসগুলো আসে জানান দিতে দিতে, প্রবল গর্জন করে। কিন্তু এটা এসেছে নি:শব্দে, কোনো আওয়াজই না করেই! চেনা বাসের ভেতরটা আলোহীন অন্ধকার ঘুটঘুটে থাকলে তাকে কী রহস্যময়ই না দেখায়!

অন্ধকারে অবশ্য অনেক জানা চেনা জিনিসকেই অদ্ভুত আশ্চর্য মনে হয়। যেমন এই এখন তার হচ্ছে। এখন সময় কী, সেই প্রশ্ন তো জ্বালিয়ে মারছেই, তারপর এমন একটা রাস্তায় সে হেঁটে চলেছে যার আলোগুলো পরস্পরের সঙ্গে অদ্ভুত ভাবে জড়িয়েমড়িয়ে গেছে। এমনিতে মনে হচ্ছিল রাস্তার বালবগুলো যেন অবিচ্ছিন্ন ভাবে একটা দড়ির সঙ্গে বাঁধা আছে, কিন্তু হাঁটতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে একটা বাতিস্তম্ভ থেকে আর একটার দূরত্ব যেন অন্তহীন। আর প্রত্যেকটার মাঝখানে সুদীর্ঘ পথ ঢেকে রয়েছে ঘুটঘুটে অন্ধকারে।

আরও অদ্ভুত, মাঝখানের এই রাস্তাটা এতোই এবড়োখেবড়ো যে তার সামনে পড়ে থাকা নিজের ছায়াটা কখনও বেশি কালো হয়ে যাচ্ছে, কখনও কাছিয়ে আসছে, ঘুরে এবার ডানদিকে এসে সেটা তার সঙ্গে সঙ্গে চলতে লাগলো, আবার পরের বাতিস্তম্ভের কাছে এসে বাতাসে মিলিয়ে গেল, পরক্ষণেই আবার দেখা দেবে বলে। আবার কোনাকুনি দুটো ছায়া মাটিতে বিছিয়ে সে পরের বাতিস্তম্ভের দিকে হাঁটা লাগাচ্ছিল। এইরকম প্রত্যেকবার।

হঠাৎ মনে হল, দ্বিতীয় ছায়াটা! দ্বিতীয় ছায়াটা কার? ভয়ংকর একটা ধাক্কা খেল সে, ভীষণ ভয়ের অনুভূতি ঢেউ খেলিয়ে দিল তার সারা শরীরে। পেছন ফিরে তাকাবার একটা অদম্য ইচ্ছে হলো, কিন্তু মনে পড়ে গেল আর একটা কাহিনি…

"দ্যাখো বাপু, একাই বেরিয়ে পড়েছিলাম। তখন মাঝ রাত্তির,নির্জন রাস্তাটা কী অদ্ভুত দেখাচ্ছে! আমার বুকটা এইভাবে ধুকপুক করছিল…"

সে হাতের পাঁচ আঙুল খুলল, আবার বন্ধ করল, " যে মূহুর্তে এই তেঁতুল গাছের তলায় এলাম, মনে হল কেউ আমাকে অনুসরণ করছে। আমি পেছন ফিরলাম আর দেখলাম একটা লোক!

সত্যি?

সত্যি নয় তো কী! আমার হার্টবিট যেন থেমে গেল আর ওখানেই ধপাস করে পড়ব এইরকম মনে হচ্ছিল। আজ তোর হয়ে গেল রে বাচ্চা, নিজেকে এইরকম বলছিলাম। কিন্তু পেছনের লোকটা লম্বা লম্বা পা ফেলে আমায় পেছনে রেখে এগিয়ে গেল, তারপর, তারপর কী হল জানিস?

ও ক্রমশ লম্বা হতে লাগলো, আরও আরও লম্বা, যতক্ষণ না তেঁতুল গাছের মাথাটা ছুঁয়ে ফেলে!

ও: ভাই, কী যে ভয় পেয়েছিলাম। তবু বুদ্ধি করে পবিত্র সূরা আওড়াতে লাগলাম, মাত্র তিনবার আউরেছি, অমনি সে ব্যাটা গায়েব হয়ে গেল। সূরার যে কী মহিমা সে আর কী বলব!"

এই সময় সামনের দিক থেকে আসা একটা গাড়ি তাকে চমকে দেয়। ঘন ঘন হর্ন বাজিয়ে রাস্তাটাকে আলোকিত করে, তাকে চমকে দিয়ে সেটা চলে যায়। এইভাবে কেউ গাড়ি চালায়! এইরকম স্পিডে? ভীষণ বিরক্ত হয়ে পড়ে সে, তারপর তার মনোযোগ যায় ড্রাইভারের দিকে। লোকটা কে ছিল? খুব চেষ্টা করেও সে ড্রাইভারের মুখ মনে করতে পারে না। কী করেই বা পারবে? লোকটাকে তো এক ঝলক কেবল একটা ছায়ার মতো দেখেছে সে। মনে হয় ও ইচ্ছে করেই অতো জোরে চালাচ্ছিল। কেউ ওকে চিনে ফেলুক তা চায় না বলেই অতো জোরে গাড়ি ছোটাচ্ছে।

ভাবতে ভাবতে রেস্টুরেন্টের কাছাকাছি চলে এলো সে। এখনও ওটা খোলা রয়েছে, যদিও লোকজন বেশি দেখা যাচ্ছে না। দুচাকার সাইকেলের স্ট্যান্ড ফাঁকা, শুধু একটা একলা বাইক দাঁড়িয়ে। যাইহোক একজন হলেও কেউ আছে রেস্টুরেন্টে।

যেই না ভাবা, অমনি একরাশ প্রশ্ন ছুটে এলো।

একজন মাত্র খদ্দেরকে সার্ভ করার জন্য এতো রাত অবধি রেস্টুরেন্ট খোলা কেন? গভীর রাতে লোকটাই বা ওখানে কী করছে? সারা রাতই কি রেস্টুরেন্ট খোলা থাকে?

হন হন করে রেস্টুরেন্টের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল সে। কিন্তু বাইকের কাছাকাছি এসে মত বদলায়, বাড়ি ফিরে যাওয়া যাক।

আবার প্রলম্বিত দুটো ছায়ার কাটাকুটির ফাঁদে বন্দী হয়ে সে হাঁটছিল। এই ছায়াগুলোর হাত থেকে মুক্তি নেই? রাস্তার একপাশে সরে এল সে, বাতিস্তম্ভগুলোর পেছন দিয়ে হাঁটতে লাগলো। কিন্তু শেষ রক্ষা হল না, উল্টো দিকের আলো তখনও তার গায়ে এসে পড়ছিল। ফলে ছায়াও ছিল অল্পবিস্তর।

এমন একটা শরীরের কল্পনা করছিল সে, যাতে ছায়া লগ্ন হয়ে নেই। একটা মেঘের টুকরো মাটির ওপর আবছা ছায়া ফেলে তো, কিন্তু একটা মাছিও সেটা নজর করতে পারে না।

এই চিন্তাটা অদ্ভুত প্রভাব ফেলে তার মনের ওপর, তাকে সান্ত্বনা দিতে সক্ষম হয়। সমস্ত সন্দেহ দূরে গিয়ে নিজেকে খুব হালকা লাগে তার। হঠাৎ মনে হয় তার নিজের পায়ের আওয়াজ আসছে অন্য এক ভুবন থেকে, যেন সম্পূর্ণ নতুন এক রাস্তা খুঁজে পেয়েছে সে। আর তার কানে আসছে গম্ভীর সম্ভ্রমপূর্ণ কন্ঠে গাওয়া এক শান্ত সঙ্গীত, "হে অবতারদের অবতার, তোমার পথ দেখাবার এই তো সময় প্রভু।"

তার পিতামহের মসলিনের শার্ট ও টার্কিশ টুপি পরা চেহারাটা ভাসে তার চোখে। ভোরের প্রার্থনার পর যখন তিনি পবিত্র গ্রন্থ থেকে মুখস্থ বলতেন, তাঁর ঠোঁটদুটো কাঁপতো আর চোখ উপচে অশ্রুধারা লম্বা দাড়ি ভিজিয়ে দিত,

-হে অবতারের অবতার, এবার পথ দেখাও প্রভু,

অদ্ভুত সময় এক ছায়া ফেলছে আমাদের ওপর!

কিন্ত্য নিজের আবেগ সে নিয়ন্ত্রণ করল, রাতের নির্জনতায় উঁচু গলার প্রার্থনা কেমন শোনাবে এই ভেবে। অবশ্য তার ধর্মীয় আবেগ যেমন হঠাৎ এসেছিল, তেমনি হঠাৎ চলেও গেল। তার বদলে পড়ে রইল তার হৃদয়কে ব্যথাতুর করে তোলা এক সচেতনতা - শরীর কেবল মাত্র ছায়া তো নয়, কিন্তু তার শরীর একটি ছায়াই কেবল, যার ওপর অজস্র মাছি বসে ভনভন করতে পারে, অথচ যার ওপর কোনো মেঘখন্ড ভাসে না। আমরা শুধুই ছায়া, কিন্তু কোন শরীরের সঙ্গে সেই ছায়ার সম্পর্ক ? কেমন যেন ক্যারাভান বা গাড়ির মিছিলের কথা মনে আসে, যা অনেকক্ষণ আগে চলে গেলেও পেছনে ফেলে যেতে থাকে দীর্ঘ ছায়া। কিন্তু এ কিরকম ক্যারাভান, যা নিজে আগে চলে যায়, আর পেছনে পড়ে থাকি আমরা, হারানো ছায়ারা? আমি নিজেও ঐরকম অশেষ ছায়ার ক্যারাভান থেকে হারিয়ে যাওয়া একটি ছায়া, অন্ধকার ঘ্যানঘেনে সন্দেহের পুঞ্জ মাত্র! কিন্তু কোন সন্দেহ?

এই আমি আছি, আবার নেইও… শোন বৎস, সেই জ্ঞানী মানুষটি বলেছিলেন, তোমার পেছনে রয়েছে একটি গুহা, আগুন জ্বলছে তার ভেতরে, তার পেছনে শুধু দেওয়াল।আর তোমার সামনে রয়েছে তার থেকেও লম্বা তার থেকেও বড় আর একটি প্রাচীর। ক্রীতদাসেরা শৃঙখলিত হাতে প্রজ্জ্বলিত গুহার সামনের দেওয়ালের ওপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে আর তাদের ছায়া এসে পড়ছে তোমার সামনের দেওয়ালে। কেমন বিপদ তোমার, তুমি চট করে ঘুরে যেতে পারবে না আগুনের শিখা কিম্বা বন্দী দাসদের দেখবার জন্য। তোমাকে যা দেখে যেতেই হবে তা হলো তা হলো আগুনের প্রতিচ্ছায়া, আর সেই প্রতিফলনে হেঁটে যাওয়া ছায়াদের।

সামনে থেকে বাস আসছে দেখে সে রাস্তায় সরে গেল আর ল্যাম্পপোস্ট ধরে চলতে শুরু করল। বাসটার একটা হেডলাইট ভাঙা, ভেতরটাও ঘুটঘুটে অন্ধকার। তার মনে হল ঐ অন্ধকারেই কেউ জানালার পাশে পেছনের সীটে বসে আছে। কন্ডাকটর হতে পারে, কিন্তু নিজেকে সে এইভাবে লুকিয়ে রাখবে কেন! এটা নিয়ে ভাবতে ভাবতেই সে আরও অনেকটা পথ হেঁটে ফেলল। তারপর সে সিদ্ধান্তে এল, না বাসটা ফাঁকাই ছিল, তার মনটাই থেকে থেকে তাকে ধোঁকা দিচ্ছে। খুব ইচ্ছে হল পেছন ফিরে দ্যাখে বাসটা কতদূর গেছে, দাঁড়িয়েছে কিনা। হঠাৎ রাস্তার মধ্যেই সে দাঁড়িয়ে পড়ল, তারপরই লম্বা লম্বা পা ফেলে সামনের দিকে ছুটতে লাগলো।

বাড়ির গেটে নিজে ঢোকার আগেই তার ছায়া সামনে লাফিয়ে এলো, আর আগে আগে যেতে লাগলো। উঠোনের ভেতরে থেকে দু'পায়ের ফাঁকে ল্যাজ ঢোকানো একটা কুকুর গেটের দিকে ছুটে এলো। তার নিজের অগ্রসর ছায়া আর জন্তুটার ছুটে আসা ছায়া একে অন্যের সঙ্গে যেন কাটাকুটি খেলতে লাগলো।

বারান্দায় উঠে সে ভাবলো আম্মা এখনও জেগে থাকলে একগাদা প্রশ্ন ধেয়ে আসবে। কোথায় ছিলি, কী করছিলি, খেয়েছিস কিছু, এইসব এবং আরও কতো কী।

একটুও শব্দ না করে, শেকল খুলে সে নিজের ঘরে ঢুকে পড়ল।

ভেতরটা একইরকম লণ্ডভণ্ড হয়ে রয়েছে। শুধু একটা উপন্যাস বুককেস থেকে বেরিয়ে টেবিলের ওপর খোলা অবস্থায় মুখ থুবড়ে রাখা। কে তার জিনিসপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করল! মনে হয় শামিমই হবে,ও-ই মাঝে মাঝে তার বইপত্র ঘেঁটে উপন্যাসের খোঁজ করে। এটাও ওরই কীর্তি।

ফায়ারপ্লেসের ওপরের আয়নার দিকে সে তাকাল, নিজের প্রতিচ্ছবি না দেখে সে দেখল উজ্জ্বল আলোকিত চৌকোর ওপর কয়েকটি পিঁপড়ে নাড়াচাড়া করছে। আয়নাটা নোংরা হয়ে যাবে এই ভয়ে সে ওটার ওপরের আচ্ছাদন টেনে নামিয়ে দিল।

জামাকাপড় পালটে, আলো নিভিয়ে বিছানায় ঢুকে পড়েও তার ঘুম এলো না। অনেক চেষ্টা করেও এল না। অনেকবার এপাশ ওপাশ করার পর চোখ খুলতে ও বন্ধ করতে লাগল বার বার। ঘুম এল না, শুধু চোখ জ্বালা করতে লাগল আর চোখের মণিদুটো ব্যথা হয়ে গেল। শুধু দরজার কাচের খড়খড়ি ছাড়া সে আর কিছুই দেখতে পাচ্ছিল না। ঘুটঘুটে অন্ধকারে তাদের দুটো বিরাট নিষ্প্রভ সাদাটে রঙের প্রলেপের মতো লাগছিল। বার বার করে তাদের দিকে তাকাতে তাকাতে আকুল হয়ে সে ভাবলো ও দুটোর পেছনে কী আছে! হঠাৎ তার খুব ঘাম হতে লাগল, নি:শ্বাসের কষ্টও। বিছানা থেকে উঠে সে আলো জ্বাললো। এই পরিবর্তন তার ক্লান্ত ইন্দ্রিয়গুলোকে একটু আরাম দিল, কিন্তু অতো উজ্জ্বল আলোতে আবার তার হৃদস্পন্দন বেড়ে গেল।

বিছানা ছেড়ে উঠে চুল আঁচড়াল সে, বেশি ফিটফাট হবার দরকার নেই ভেবে আলো নিভিয়ে বাইরে এল, আসার আগে দরজাটা ভেজিয়ে দিল। এমন ছুটে বেরলো, যেন সে জেল ভাঙা কয়েদি। আলোর স্তম্ভের জড়ানো কারিকুরির মধ্যে বাইরের নির্জন রাস্তা শান্ত শুয়েছিলো। ল্যাম্পপোস্টের পেছনে আবছা অন্ধকারে হাতের লাঠিতে ভর দিয়ে এক পুলিশ দাঁড়িয়ে, যেন কাঠের সেপাই। তবুও সে সাহসী একরোখা পা ফেলে এগিয়ে যেতে লাগলো। যেন পাত্তাই দিচ্ছে না এইভাবে পুলিশটিকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে গিয়ে সে টের পেল আবার নিজে সেই দুটো ছায়ার কাটাকুটির মধ্যে বন্দী হয়ে পড়েছে। একটি ছায়া আগে আগে তো আর একটি তার পেছনে চলছে। রাস্তা ছেড়ে দিল সে, কারণ তার মনে মনে ভাবনা চলছিল, যদি আমি ছায়ার হাত থেকে বাঁচতে চাই তাহলে আলো থেকে দূরে যেতে হবে, আর একমাত্র অন্ধকারেই সেটা সম্ভব। অন্ধকারে ছায়া তো দূরের কথা, একজন মানুষকেই চেনা কঠিন। তাই অন্ধকারে এসে সে নি:শ্বাস ফেলে বাঁচল, আবার একই সময়ে ছায়ার সঙ্গে একাত্ম বোধ করল, যেন তাদের মধ্যে রয়েছে ভ্রাতৃত্বের এক আশ্চর্য বন্ধন।

যা-ই বলো,সে ভাবলো, যে কারও নিকটতম প্রতিবেশী হচ্ছে তার ছায়া। কিন্তু যখন সে ব্রিজের ওপর উঠেছে, একটা বেওয়ারিশ ভাঙা গাড়ির নীচ থেকে লাফিয়ে বেরিয়ে এল একটা কুকুর আর অন্ধকারের ভেতর থেকেই সে প্রচন্ড ঘেউ ঘেউ করতে লাগলো। সঙ্গে সঙ্গে "ভ্রাতৃত্বে"-র ধারণা জলাঞ্জলি দিয়ে তার মনে হলো, বাব্বা নিকটতম প্রতিবেশী যেন শত্রুর রূপ ধরেছে। আর অন্ধকারে হাঁটাহাঁটি নয়, আঁধারের ঘূর্ণন থেকে সে এসে পড়ল আলোর ঘূর্ণিতে। কিন্তু কুকুরটা তার দিকে তেড়ে আসা থামাল না। যতই সে জোরে হাঁটে, ততই সেটা জোরে চেঁচায়। ভয়ংকর বিরক্ত হয়ে সে একটা আধলা ইট কুড়িয়ে নেয়, কুকুরটার দিকে ছুঁড়ে মারে। সে ব্যাটা এবার পালাবে বলে অন্ধকারের দিকে ছুটে যায়, সেও আলোর সীমানা অব্দি কুকুরটার পেছন পেছন ছোটে। কিন্তু সেটা অপর দিকে অন্ধকারের রাজ্যে হারিয়ে যায়।

আবার লম্বা লম্বা পা ফেলে সে হাঁটতে থাকে। ঠিক তখনই আগুন- জ্বলা গুহার ছবি তার মনে ফিরে আসে। তার হঠাৎ মনে হয় যে শৃঙখলিত দাস কুকুরটাকে তাড়াতে ছুটে গিয়েছিল, সে আছে তার পেছনে, আর যে এগিয়ে এল সেটা সে নিজে, ঐ দাসের একটি ছায়ামাত্র।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ