বিয়ের দেড়বছরের মাথায় আমার মেয়ে হয়, খুব ঘাবড়ে গিয়েছিলাম সেই সময়, বলতে গেলে কী একদম রেডি ছিলাম না আমি।
দুর্গাদাসের কথায় পঞ্চাশোর্ধ সীতাংশু হাসলেন কিনা বোঝা গেল না, তবে একটু অন্যমনস্ক হলেন যেন। সীতাংশু হাসেন কম, হাসলেও সে হাসিতে কোনো শব্দ থাকে না, বোবার হাসিতেও যা থাকে। সীতাংশুর এ অভ্যেস গত তিরিশ বছরের, যখন থেকে নিজের জন্য ভাবা শুরু, সেই তখনকার। কমদিন হল! এর মধ্যে কত মুখ্যমন্ত্রী কত প্রধানমন্ত্রী বদল হল, এখানে আর ওখানে, মানে দিল্লিতে। তাঁরা তো ভাবতেন বিধান রায় আর জওহরলাল ব্যতীত ওই সিটে বসবার মানুষ নেই এদেশে।
-শোনো, রেডি না থাকলে হবে কী, যখন বউ-এর মুখে খবর পেলাম, তখন আমার তো পাগল হওয়ার দশা।
নিঃশব্দে হাসলেন সীতাংশ, যা বলেছ!
-আমি ক্যালেন্ডারে দাগ মারতে আরম্ভ করলাম, আর যাকে বলে আদর আর সোহাগ তা যেন আমার ভেতরে দিন দিন উথলে উঠতে লাগল।
সীতাংশু নীরবে শুনছেন। মন্তব্য করলেন না।
-জন্মের পর তার নাম রাখলাম সোহাগ, সত্যি বলতে কী প্রথম সন্তান তো সোহাগেরই সৃষ্টি, কী বল?
সীতাংশ অস্ফুট কণ্ঠে যা বললেন তা দুর্গাদাসের কানে গেল না। দুর্গাদাস কথা থামালেন না, বললেন, সোহাগ করলে তো সবাইকে কাছে আনা যায়, ধরে রাখা যায়, কী বল?
সীতাংশু এবার একটু জোরে বললেন, তা বলতে পার, কিন্তু মেয়ে সন্তান তো ঘরে রাখার নয় শেষ পর্যন্ত।
তা বটে! দুর্গাদাসের মুখের উপরে যেন পাতলা ময়লার সর পড়ল, যেমন শীতকালে হয় গাছের পাতায়, যদিও সময়টা এখন আষাঢ়ের শেষ, তবে বাতাস থেমে যাওয়ায় গাছের পাতা ময়লা হতে শুরু করেছে, বৃষ্টি নামলে তবে ধুয়ে যাবে। সেই মলিন মুখ কিন্তু চুপ করে থাকল না, দুর্গাদাস ফিসফিসিয়ে চাপা স্বরে বললেন, আমি আমার মেয়ের মুখ দেখেছিলাম মাঝরাতে, তখন গাছপালাও তো ঘুমোচ্ছিল আয়েশে, বাতাস নেই, আকাশে গুমোট মেঘ, একদিনও বৃষ্টি হয়নি তখনো, ধাই মা যখন আমাকে ডেকে বলল মেয়ের মুখ দ্যাখো গো নন্দীমশায়, আমি হেরিকেনের ময়লা আলোয় দেখলাম অন্ধকারে সে যেন হাসফাস করছে, মনে হল তখনো বুঝতে পারেনি কোথায় এসে পড়েছে, যেখানে ছিল সেখানকার অন্ধকার আর এই অন্ধকারে তফাৎটা কী।
বলতে বলতে দুর্গাদাস থেমে গেছেন। জানালার বাইরে বেলা বয়স্ক হয়েছে, প্রায় এই এঁদের মত। আলো যাই যাই, বুড়োটে ভাব জেগেছে হেথা হোথা, তবু কখনো সখনো টের পাওয়া যাচ্ছে যৌবনের ভাব, ছায়া ইত্যাদি যা যেমন।
দুর্গাদাস বাইরে তাকিয়ে তাকিয়ে প্রসন্ন হলেন, তারপর ঘাড় ঘুরিয়ে ফিরলেন বন্ধুর দিকে। বন্ধুটি তাঁর মত নয়, জোরে হাসে না, কথা বলে না অহেতুক, বন্ধুর টাকা পয়সা বাড়ি ঘরদোরের গুমর আছে ভেতরে ভেতরে তা ওর মুখের ভাবেই স্পষ্ট।
দুর্গাদাস বললেন, আমি খুব গোলাপ ভালবাসি, তা মনে আছে তোমার সীতাংশু ?
সীতাংশু আড়মোড়া ভাঙলেন, গোলাপ কার না পছন্দ?
দুর্গাদাস বললেন, পরের মেয়েটির নাম দিয়েছি গোলাপ, কেমন নাম?
সীতাংশু নিঃশব্দে হাসলেন ঠোঁটের কোণায়। তারপর জরিপ করতে লাগলেন বন্ধুটিকে। বন্ধু ছিল একদিন, এখন সম্পর্কটা কী রকম? আরো নীরব হলেন যেন সীতাংশ। পুরনো বাড়ির মতো ভেঙেচুরে গেছে দুর্গাদাস। পঞ্চাশ বছর কী কোনো বয়স হলো! তাঁর নিজের দু দশটা চুল পাকলেও ডাই করে একদম তিরিশ বছর আগের মতো। অথচ দুর্গাদাসের মাথাটি পুরোপুরি সাদা। গায়ের চামড়া একটু কুঁচকেছে যেন মনে হচ্ছে। মোটা গোঁফ জোড়া কাঁচায় পাকায় ভালো দেখাচ্ছে না, সীতাংশু গোঁফ রাখেন না। এমন গোঁফ রাখা যায় না। দুর্গাদাসের মুখখানি বেশ ভারী, থমথমে, কিন্তু গাল তুবড়ে গেছে। তিরিশবছর আগে দুর্গাদাস খুব ফরসা ছিল। সেই রং এতকাল ধরে এই গঞ্জের রোদে পুড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজিয়ে তামাটে করে ফেলেছে, এখন ঘষলেও পুরনো রং ফিরবে না। বুকের খাঁচার হাড় কাঠি দেখা যাচ্ছে। কিন্তু এতসবের মধ্যেও ভাল করে লক্ষ করলে বোঝা যায় দুর্গাদাস এককালে কী ছিল, কেমন ছিল। চওড়া কাঁধ, প্রশস্ত বুক, চওড়া কব্জি নিয়ে দুর্গাদাস যেন পুরনো জমিদার বাড়ি, প্রাচীর উধাও হওয়া রাজগৃহ। ধ্বংসস্তূপ দেখলে যার যৌবনের রমরমা দিনগুলোকে মনে করা যায়। মেরুদণ্ড এখন একটু নুয়েছে বটে, কিন্তু যদি সোজা করে দাঁড়ায় তো কেমন হবে ?
ধরা যাক তিরিশবছর বাদে সীতাংশু চক্রবর্তীর সঙ্গে দুর্গাদাস নন্দীর দেখা হয়েছে এই পুরনো গঞ্জে। এখানে সীতাংশুর কৈশোর কেটেছিল কাটা ঘুড়ির মত, এখানে তিনি যৌবনে পা দিয়েছিলেন শাল বৃক্ষের মত। যৌবনে পা দিয়ে সীতাংশু আর এখানে থাকেন নি । তিরিশটা বছর কোনো খোঁজ রাখেননি এই গঞ্জের। ভাগ্য অন্বেষণে বেরিয়েছিলেন, ভাগ্য খুঁজে পেয়েছেন। অনেকদিন দূরদেশে কাটিয়ে সীতাংশু এই ক'বছর ফিরেছেন নদীর ওপারে। নদী নয়, তাঁরা বলতেন দামোদর নদ, তার ওপারে ইস্পাত নগরী দুর্গাপুর। দুর্গাপুরে থিতু হয়েছেন সীতাংশু। দুর্গাপুর এখান থেকে বাসে একঘণ্টা, দামোদরের ব্যারেজ পেরতে হয়। সীতাংশুদের পৈতৃক গ্রাম এই গঞ্জ থেকে আটমাইল, শালি নদীর উজানে উজানে। শালি নদীর নাম এই গঞ্জের মানুষ ব্যতীত বাইরের কেউ জানে না, কিছুটা পুবের দিকে গিয়ে দামোদরেই তার শেষ, ।
সীতাংশু বহুকাল বাদে এই গঞ্জে পা রেখেছেন কারণটা খুব সামান্য। বয়সের টানে হয়ত দেখতে আসা কেমন আছে সেই গঞ্জ, কিন্তু তাও নয়, তিনি এসেছেন সামান্য ধান্দায়। পৈতৃক গ্রামে এখন আর যাওয়া সম্ভব নয়, তবে শুনেছেন সেখানকার দু পাঁচ বিঘে মাটিতে তাঁর অধিকার এখনো আছে, অন্তত কাগজে কলমে। তিনি কিছু পাবেন উত্তরাধিকার সূত্রে। তার যদি সন্ধান করা যায়। ফোকটে যদি কিছু পাওয়া যায়। সেই সন্ধানে জমির অফিসে ঢুকে যে কেরানীবাবুটির সঙ্গে কথা বলতে আরম্ভ করেছিলেন তিনি এইজন। সীতাংশুর অভিলাষ শুনে দুর্গাদাস বলেছিলেন, কী দরকার ও সম্পত্তির, তুমি তো বিক্রি করে দুর্গাপুরের বাড়ি সাজাবে তাই না?
সীতাংশু ঘাড় হেলিয়েছিলেন, হ্যাঁ টাকার দরকার পড়েছে।
এতদিন বাদে টাকার দরকার পড়ল সীতাংশু, এই পঞ্চাশ বছরে পা দিয়ে?
সীতাংশু চুপ করে ছিলেন, জবাব দেননি স্বভাব অনুসারে।
দুর্গাদাস আবার বলেছিলেন, ওই টাকা তুমি দুর্গাপুর থেকেই জোগাড় করো না কেন, যারা এতকাল আগলে আগলে রেখেছে ওই সম্পত্তি, ভোগ দখল করছে, তাদের নিরাশ্রয় না হয় নাই করলে।
কথা হয়েছিল এইটুকু। সীতাংশু ফিরবেন ঠিক করেছিলেন। আজ ভুল করে এই মানুষটিকে না ধরে যদি কোনো দালালের হাতে ভার দিতেন তাহলে নিশ্চয়ই কোনো একটা হিল্লে হত। এমন ভাবতে ভাবতে বাসস্ট্যান্ডের দিকে পা বাড়িয়েছেন যখন, তখন তাঁর পিঠে হাত, চলো সীতাংশু, আমার বাড়ি চলো, কতদিন বাদে এলে তুমি !
দুজনে দুজনকে চিনতে একটুও ভুল করেন নি। দুর্গাদাসের কাছে অনেক খবর পেয়েছেন সীতাংশু, যার একটি হলো এই তিরিশ বছর দুর্গাদাস এই গঞ্জ ছাড়েননি কখনো। দামোদর পার হয়েছেন যদি সকালে তো বিকেলেই ফিরে এসেছেন সেই ব্যারেজর উপর দিয়ে। বাইরে রাত্রিবাস করেননি কখনো, কি করে করবেন, ছেলেপুলেদের ছেড়ে যে কোথাও থাকতে পারেন না দুর্গাদাস। সীতাংশু ভেতরে ভেতরে হেসেছিলেন একথা শুনে, একেবারে গ্রাম্য হয়ে আছে, বদলালো না একটুও !
রাস্তায় দুর্গাদাস জিজ্ঞেস করেছিলেন, 'বহু জায়গা তো ঘুরে এলে তাই না?
-হ্যাঁ, গোটা ভারতবর্ষই বলো।
-কিন্তু এখন চেনাও দেখি আমার বাড়ি কোনটা ?
থমকেছিলেন সীতাংশু। চিনতে পারবেন কি? চারদিকে অনেক বদল হয়ে গেছে। এমন কি দুর্গাদাসের সেই বুনো মহিষের মতো দেহটিও ভেঙে পড়েছে চুন সুরকির দেওয়াল যেমন জীর্ণ হয়। কথা না বলে সীতাংশু হেঁটেছিলেন দুর্গাদাসের পাশাপাশি। এই তো ধর্মরাজতলা, ধর্মঠাকুরের গাজন হয়, ওই তো জমিদার বাড়ি, ভেঙে পড়েছে যেন হুড়মুড় করে। দরজায় দরজায় তালা। সীতাংশুর খুব খারাপ লাগছিল না। একটু একটু করে যেন চিনতে পারছিলেন সব। তাঁর বয়স যেন নামছিল এক এক ধাপ করে। যে সিঁড়ি পথে তিনি উঠে গিয়েছিলেন বয়সের এই চাতালে, সেই পথে নয়, যেন অন্য কোনো ভাঙাচোরা সিঁড়ি দিয়ে তাঁকে নামিয়ে এনেছিলেন দুর্গাদাস। শেষ পর্যন্ত পেরেছিলেন, অস্ফুট গলায় চাপা, চিৎকার করে উঠেছিলেন 'ওই তো তোমার বাড়ি !
সীতাংশু আশ্চর্য হয়েছিলেন দুর্গাদাসের বাড়িটি দেখে। অবিকল যেন সেই তিরিশ বছর। আগের মত দাঁড়িয়ে। তিরিশটা বছর তাহলে এমন কিছু নয়। সেই টিনের চাল, পাকা দেওয়ালে খড়িমাটি রং, তিরিশ বছর আগের একটি পায়রা যেন অবিকল সেই ভাবে একা একা বসে আছে মরচে ধরা চালের এক ধারে। আগের মতই সাদায় কালোয় মেশানো পালক। সীতাংশুকে এতদিন বাদে দেখে ডানা ঝাপটে চালের উপর লাফ দিল একবার। তারপর গরগর করে উঠল ফূর্তিবাজ মেঘের মতো। দুজনে ভেতরে এসে বসেছেন তক্তপোষের উপর। রাস্তার দিকের দরজায় তালা লাগানো ছিল। সদর দরজা দিয়ে ঢোকার প্রয়োজন হল না। দুর্গাদাস গায়ের জামাটি খুলে গা আলগা হলেন।
সীতাংশু বসে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার স্ত্রী কই?
-বাড়ি নেই, এমন একটা দিনে তুমি এলে যখন বাড়িটা ফাঁকা।
সীতাংশু ভাবছিলেন ফাঁকা রয়েছে খারাপ কি? দুর্গাদাসের স্ত্রীর সঙ্গে তিনি কী কথাই বা বলতেন। সে এক কাণ্ড হতো বটে। দুজনে চুপচাপ বসেছিলেন কয়েক মিনিট, তারপর দুর্গাদাস তাঁর ছেলেমেয়ের কথা আরম্ভ করলেন।
-কত বয়স তোমার মেয়ের? জিজ্ঞেস করেছেন সীতাংশু।
-ধরো তার জন্ম ছেষট্টির প্রথমে। ইন্ডিয়া পাকিস্তান ওয়ার হলো পঁয়ষট্টিতে তখন সে মায়ের পেটে, জানুয়ারিতে বোধহয় রাশিয়ার তাসখন্দে গিয়ে লালবাহাদুর শাস্ত্রী মারা গেলেন, সে হল তারও পাঁচ মাস বাদে জুনমাসে।
-চমৎকার হিসেব রেখেছ তো?
-বাহ্ রাখবো না। ধরো তার আগের বছর ভীষণ খরা গিয়েছিল, ভাদ্র মাসেও রোয়া হয়নি অধিকাংশ জমিতে, তাই ভারত পাকিস্তান যুদ্ধের সময়, মানে অঘ্রান মাসে ধান কাটা হল না,, চাপটা এসে পড়ল শীত শেষ হওয়ার আগেই, ভাবতে পার কাঁচা শালপাতা সেদ্ধ ক'রে খেয়েছে সেবার মানুষ, মানে যেবার আমার মেয়ে হল, কী অভাব ঘরে ঘরে।
সীতাংশু পিছনে ফিরে তাকান না কখনো। কবে কোন কালে কী হয়েছিল, কে মরেছিল কে বেঁচেছিল সে হিসেব রাখা তাঁর অভ্যাস নয়। তাঁর এসব মনে রাখার দরকার নেই। মাথাকে কাজে ব্যবহার করতে হয়, এটি সীতাংশু খুব ভাল জানেন। সুতরাং তাঁর চুপ করে থাকাই শ্রেয়। সীতাংশু ভাবছিলেন শুধু সিক্সটি সিক্স থেকে এই এতটা বছর এই বয়সের মেয়ে গাঁয়ে গঞ্জে ঘরে থাকে না। সেও এতদিনে সংসায় বুঝে নিয়ে ছেলেমেয়ের মা হয়ে গেছে নিশ্চয়ই। বহুকাল নগর বাসে সীতাংশু একটি অভ্যাস আয়ত্ত করেছেন, তা হল অনাবশ্যক কৌতূহল নিবৃত্ত করা। তাই ঠোঁট জোড়া বুজিয়ে রাখলেন।
দুর্গাদাস বললেন, তারপরের জন, গোলাপের পরে আমার ছেলে হয়, তার নাম আদিত্য, আদিত্য তো সূর্য, তাই না?
সীতাংশু ঘাড় হেলালেন।
-ইস্কুলের হেডমাস্টার মশায় নামটা বলে দিয়েছিলেন, আমি রেখেছিলাম সূর্য, হেড মাস্টার মশায় শুনে বললেন, বরং আদিত্য রাখো ।
বাইরে পর্যটক মেঘ এসেছে তা বুঝলেন সীতাংশু। ঘরের ভেতরটা হঠাৎ যেন ছায়ায় ভরে গেল। তার ভেতরে গম্ভীর ভারী গলায় দুর্গাদাস তাঁর ছেলেমেয়ের ইতিবৃত্ত বলছেন। সীতাংশুর হঠাৎ মনে হল এ যেন মেঘের ডাক, বৃষ্টি নামতে পারে যখন তখন। ঘরে বসেই যেন বৃষ্টিকে ডাকছে দুর্গাদাস। সীতাংশুর মনে পড়ল, একবার, সেই বহুকাল আগে, এই দুর্গাদাস তাঁকে ময়ূর দেখাতে টেনে নিয়ে গিয়েছিল জঙ্গলে। বলেছিল মেঘ ডাকলে ময়ূর পেখম মেলে। সেদিন মেঘ ডেকেছিল খুব, কিন্তু তাঁরা ময়ূরের দেখা পাননি জঙ্গল ঢুঁড়ে। সারা দুপুর কেটেছিল শাল মহুয়া, আকাশমণি, কেঁদ, নিম, বুনো আম গাছের আড়ালে। দুর্গাদাসের একথা মনে আছে কি? তাঁর যখন মনে পড়ল তখন দুর্গাদাসও ভোলেনি নিশ্চিত। এখন যে এই ঘরে বসে লোকটা মেঘ ডাকছে প্রায়, কোনো ময়ূর কী এই ডাকে পেখম তুলে দাঁড়াবে? জানালার বাইরে উঠোন। উঠোনে বেশ বড় একটা গাছ। পাতায় পাতায় পেখম তোলা ময়ূর অথবা মেঘ, কিংবা কিছুই না শুধুই গাছ। সীতাংশু গাছটিকে দেখতে পেলেন, সঙ্গে সঙ্গে গন্ধ পেলেন। লোভের গন্ধ, কাঁঠালী চাঁপা ফুল অথবা কাঁঠাল। কাঁঠাল পেকেছে হয়ত। সীতাংশু এই পর্যন্ত এগিয়ে কৌতূহল সম্বরণ করলেন। চোখের দেখায় বিশ্বাসী সীতাংশু। উঠোনে বেরিয়ে দেখবেন গন্ধটা আসছে কোথা থেকে।
দুর্গাদাস বলছিলেন, আদিত্য হল সেভেনটিতে, সিক্সটি এইটে গোলাপ আর ছেষট্টিতে সোহাগ, সোহাগ যখন হল তখন তো দেশ উত্তাল, খাদ্য আন্দোলন শুরু হয়ে গেছে, মিছিল দাবি, গুলি, টিয়ারগ্যাস, কী কলকাতা, কী মফস্বল, সব জায়গা যেন টগবগ করে ফুটছে। তা করতে করতে সাতষট্টিতে ভোট। ভোটে যুক্তফ্রন্ট হল, কী রমরমে অবস্থা তখন সীতাংশু, তোমার নিশ্চয়ই সব মনে আছে, আমরা কি ভাবতে পেরেছিলাম এখানে যুক্তফ্রন্ট আসতে পারে, ভাবতে পারিনি। কিন্তু তা হয়ে গেল, কিন্তু হলো তো মাত্র ক'দিনের জন্য, আটষট্টির ফেব্রুয়ারিতে ভেঙে গেল ফ্রন্ট, সমস্ত স্বপ্ন ভেঙে পড়ল হুড়মুড় করে। সেই বছরই জানুয়ারিতে হয় গোলাপ, তারপর আবার ভোট, আবার যুক্তফ্রন্ট, খুন জখম, পুলিশের বন্দুকের গুলি ফুরোচ্ছে না, কী ভীষণ অবস্থা, সত্তরের মাঝামাঝি সময় আদিত্য হলো।
সীতাংশ কথাগুলি নির্বিকার কানের পাশ দিয়ে উড়িয়ে জানলা দিয়ে বাইরের গাছটির দিকে ঠেলে দিচ্ছিলেন ক্রমাগত। এ ছাড়া তাঁর আর উপায় কী? নিষ্কর্মা লোক ছাড়া এত পুরনো কথা কেউ বলতে পারে? সীতাংশু তো এসেছেন উদ্দেশ্যে। দুর্গাদাসের বাড়ি আসার মধ্যেও যে উদ্দেশ্য নেই তা নয়। যদি গাঁয়ের সেই সম্পত্তির ব্যবস্থা করে দিতে পারে দুর্গাদাস, প্রথমে অরাজী হলেও, রাজি হতে কতক্ষণ। মানুষ এখন এই ভাবে, তখন অন্য রকম। সিক্সটি সিক্স, এইট, সেভেনটি দিয়ে কোনো দরকার নেই সীতাংশুর। তাঁর সেই সময় কেটেছিল ভাগ্য গড়তে। অত গোলমালের ভেতর এখানে মানে এই পশ্চিমবঙ্গে থাকলে তাঁর অসুবিধে হতো ঠিক, হয়তো দুর্গাদাসের মতো পঞ্চাশ বছরে এসে শুধু পুরনো কাসুন্দি ঘাঁটতে বসতেন। তা হয়নি কেন না তিনি তখন সুজলা সুফলার মায়া কাটিয়ে চলে গিয়েছিলেন সুদূর মধ্যপ্রদেশের রুক্ষ নিষ্ফলা পাহাড়ের কোলে, জঙ্গলের ছায়ায় ।
অন্যমনস্ক সীতাংশুকে ডাকলেন দুর্গাদাস, তুমি শুনছ?
চমকে উঠেছেন সীতাংশু, ও হ্যাঁ, বলো, তারপর কী যেন হল?
হা হা করে হাসলেন দুর্গাদাস, রাজকন্যার ঘুম ভাঙাইতে গিয়া রাজপুত্তুর রাক্ষসের গন্ধ পাইল।
সীতাংশু হাওয়ার মত হাসলেন, তা যা বলেছ, এসব এখন রূপকথাই বলে মনে হয়।
দুর্গাদাস মুহূর্তে গম্ভীর, হ্যাঁ, অনেকটা তাই, আদিত্যের পরে মৃগাঙ্ক হল, মৃগাঙ্ক মানে যে চাঁদ, তা আমি জানতাম না, বলেছিলেন আমাদের হেডসার।
সীতাংশু শুনলেন মৃগাঙ্ক মানে চাঁদ। এর আগের পরের কথা যথারীতি জানলা টপকে বাইরের গাছের পাতায় জড়িয়ে গেছে। গাছটা এখন কেমন মেঘ মেঘ লাগছে। এতো পাহাড়ের দেশ নয় যে জানালার মুখে মেঘ এসে দাঁড়াবে। ফাঁক পেলেই ঢুকে পড়বে ভেতরে, সুতরাং ওটা গাছই।
দুর্গাদাস বলছিলেন, জঙ্গলের হরিণ আর আকাশের চাঁদ, দুইয়ে মিলিয়ে নাম রাখা হল। বাহাত্তর সালে মৃগাঙ্ক হয়। তখন মিলিটারি ক্যাম্প ইস্কুলের মাঠে, জলপাই রঙের রাইফেলধারীরা দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার মোড়ে মোড়ে, হুটহাট ঢুকে পড়ছে গৃহস্থের ভদ্রাসনে। হেডমাস্টারমশায়কে একদিন রাইফেলের কুঁদো দিয়ে পিটিয়ে হাড় ভেঙে দিল পায়ের, তাঁর অপরাধ, ইস্কুলের মেয়ের দিকে অশ্লীল ইঙ্গিত করেছিল এক গোঁফু মিলিটারি, একদিন একজনের হাত ধরে টানতে গিয়েছিল জলপাই রঙের সৈনিক, এ সবের প্রতিবাদ করতে হেডস্যার ঢুকে পড়েছিলেন ক্যাম্পের ভেতরে।
-কেউ কিছু বলল না?
-মাথা খারাপ, একাত্তরে বাঙলাদেশ হয়ে গেছে, তখন ক্ষমতায় চলে এসেছেন জওহরলালের কন্যা, এখানে রাষ্ট্রপতি মিলিটারি দিয়ে খুব শাসন করছেন আমাদের, যে বলতে যাবে তার প্রাণ চলে যাবে, হেডস্যার এখনো হাঁটতে পারেন না, পা ভেঙে পড়ে আছেন ঘরে, ওই অবস্থায় নামটি আমাকে বলে দিয়েছিলেন কিন্তু মনের মত করে।
সীতাংশু চুপচাপ শুনছিলেন। শেষের কথাগুলি তাঁর তেমন পছন্দ হয়নি বটে, কিন্তু প্রথম দিকেরগুলি কানে ঢুকে গেছে আলটপকা । সীতাংশু জানলেন বুড়ো হেডমাস্টার মশায়, যাঁর এখন আশির কাছে বয়স, তিনি চলাফেরা করতে পারেন না তেমন, কেন না চোরের মার খেয়েছিলেন রক্ষী বাহিনীর হাতে।
দুর্গাদাস বললেন, ওসব থাক তোমার কথা বল।
বাঁচলেন যেন সীতাংশু বললেন, মনে পড়েছে তাহলে?
নিঃশব্দে লজ্জিত হলেন দুর্গাদাস, 'আমি খুব নিজের কথা বলতে ভালবাসি, এজন্য কেউ আমার ছায়া মাড়াতে চায় না, দেখছ তো কেমন বোবা মেরে আছে চারদিক।
সীতাংশু টিনের চালের উপর সেই পায়রাটির বকম বকম শুনতে পেলেন। আর কেউ এসেছে নাকি? ডানা ঝাপটে চালের অন্যদিকে একা দোক্কার মত লাফ দিল যেন পায়রাটি। সীতাংশু কান পাতলেন, খুব নৈঃশব্দ্যের মধ্যে বোঁ বোঁ যেন মউমাছির ডানার শব্দ। মিষ্টি গন্ধটা জানালার আলোয় যেন মাখামাখি হয়ে আছে। কোথায় যে কাঁঠালি চাঁপা ফুটল! সীতাংশু প্রায় তিরিশ বছরের নৈঃশব্দ ভেঙে বললেন, 'আমার প্রথমটি ছেলে, দুর্গাপুরে ইঞ্জিনীয়ারিং পড়ছে, ফাইনাল ইয়ার।'
-তোমার মত হয়েছে, না ওর মায়ের মত?
-মিলিয়ে মিশিয়ে। সীতাংশু অস্ফুট জবাব দিলেন।
-কী নাম?
-শ্যামল।
দুর্গাদাসের গোঁফের নিচে জেগে উঠল যেন প্রাপ্তির হাসি, তিনি বললেন, 'আমার একটি ছেলেরও যে ওই নাম, শ্যামল মানে তো সবুজ, উচ্চারণ করলেই যেন বুকের ভেতরে মায়া ধরে যায়, কী বলো?
সীতাংশু চুপচাপ। ভাবছিলেন কখন উঠবেন। নামের ব্যাপারে তাঁর কোনো আগ্রহ নেই, হলেই হলো।
দুর্গাদাস বললেন, শ্যামল হল আটাত্তরে। তার আগে এমার্জেন্সী শেষ হয়েছে, এখানে লেফট ফ্রন্ট আর দিল্লিতে জনতাপাটি— হেডস্যার আবার ক্রাচ ভর করে হেঁটে বেড়াচ্ছেন, আমি ছুটে গেছি তাঁর কাছে-- সে বছরই বন্যা হল, দামোদরের ব্যারেজ একাংশ ভাঙল, একনাগাড়ে বৃষ্টি আর দুর্যোগ যে কী ভীষণ তা কল্পনা করতে পারবে না সীতাংশু।
কল্পনা করা বড় কঠিন। বিশেষত সীতাংশুর পক্ষে তো বটেই। তিনি ভাবছিলেন এতটা বছর এই গঞ্জে বাস করে, এখানে কেরানিগিরি ক'রে কী ভয়ানক কান্ডই না বাঁধিয়েছে তাঁর সামনের লোকটা। এতগুলি ছেলেমেয়ে। একএক বছরের তফাতে বাবা হওয়া। সীতাংশু এতক্ষণে দুর্গাদাসের অনেক কথাই জানলা পথে বাইরের ঝুপসি মেঘের মত গাছটির দিকে ধাক্কা দিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু এবারে ভাবনার চোরাবালিতে যেন পড়ে গেলেন। দুর্গাদাস কি অন্ধ ? পৃথিবীর কোনো খোঁজই রাখে না। ও না রাখুক, হেডমাস্টার মশায় তো রাখেন। তাঁর উচিত ছিল তো ওকে থামানো। নাকি তিনিও ভাঙা পায়ে গাঁয়ের ইকুলে বসে নামের ফুল ফোটাচ্ছেন, ছাত্রসংখ্যা বাড়াচ্ছেন। কোথায় দুর্গাদাসের সাধের ছেলে মেয়েগুলো, কী যেন নাম সব, সোহাগ গোলাপ, আদিত্য মৃগাঙ্ক—মোট কতজন?
সীতাংশুকে কঠিন ভাবনার হাত থেকে রক্ষা করলেন দুর্গাদাস, তোমার ছেলের কথা তো শুনলাম, মেয়ে ?
-পড়ছে, ইংরিজিতে অনার্স নিয়েছে, থাকে কলকাতায় হোস্টেলে।
-কত বয়স?
সীতাংশু যেন দুর্গাদাসের মতই বললেন, সাতষট্টিতে হয়েছে।
-তার মানে যেবার যুক্তফ্রন্ট হল?
-হ্যাঁ আমি তখন উজ্জয়িনীতে, এখানে ছিলাম না। সীতাংশু বললেন।
দুর্গাদাসের ঘাড় ঝুঁকে গেছে যেন নিচে, বুক ছুঁয়ে ফেলেছে তাঁর চিবুক, কিছু যেন মনে করার চেষ্টা করছেন, একটু নীরব হলেন দুর্গাদাস, তারপর চাপা গলায় ফিসফিসিয়ে বললেন, 'তুমি এখানে ছিলে না, তাই দ্যাখোনি তো সীতাংশু কী দিন এসেছিল সেবার, ফুড মুভমেন্টে অত মার খেয়েও শেষ পর্যন্ত জিতে ঘরে এসেছে সকলে, প্রথম যুক্তফ্রন্ট, মনে হচ্ছিল গোটা দেশটাই যেন আমাদের দখলে চলে এসেছে, বহু কষ্ট গেছে আগের বছর। আমরা আগে গম চিনতাম না, গমের স্বাদ পেয়েছি সবে, কিন্তু এতে তো কষ্ট ছিল না, গোলাপ তখন ওর মায়ের পেটে।
সীতাংশু নিশ্চুপ। তাঁর প্রতিক্রিয়া বোঝা গেল না। দুর্গাদাস মুখ তুললেন বৃষ্টির শব্দে। হঠাৎ বাইরে মেঘ এসেছে, মাঘ তার খেয়াল মেটাতেই ঝম ঝম—। টিনের চালে একশোটা কচি শিশুর পা পড়ছে তালে তালে, খেয়ালে ঝুম ঝুম, পায়ের মল বাজছে যেন। সীতাংশু কান পেতে আছেন। দুর্গাদাসের চোখ বাইরের একদলা অন্ধকারে, গাছের উপর।
দুর্গাদাস জানালা থেকে জোর করে চোখ সরিয়ে এনে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার মেয়ের নাম কী?
সীতাংশু জবাব দিলেন না। তিনি বৃষ্টির শব্দ থেকে কান সরিয়ে এনেছেন তবুও জবাব দিলেন না। ভাবছিলেন কখন যেতে পারবেন। আর ভালো লাগছে না। মনে হচ্ছে বয়স যেন প্রতি মুহূর্তে লাফ দিয়ে দিয়ে বাড়ছে। ছেলেমেয়েদের নিয়ে এত কথা বললে এ ব্যতীত অন্য কিছু মনে হওয়া সম্ভব নয়। বয়স বাড়া থামাতেই এখন বেরনোর দরকার, কিন্তু বৃষ্টি যে ডালপালা মেলা গাছটাকে ধুইয়ে দিচ্ছে ক্রমাগত। সীতাংশু নাকে আবার সেই গন্ধটা পেলেন। দুর্গাদাস বললেন, আমার শেষের জনের নাম মৃত্তিকা ।
সীতাংশু অবাক হলেন না, কিন্তু চমকে উঠেছেন হঠাৎ, তোমার কটি ছেলে মেয়ে?
নয়টি। দুর্গাদাস স্থির হয়ে জবাব দিলেন।
সীতাংশু নিবিষ্ট হয়ে জরিপ করছিলেন বন্ধুকে। বন্ধু কি! ছিল একসময় বন্ধুতা যখন বাছ বিচার করতে জানতেন না। এখন নয় ছেলেমেয়ের বাবা এই লোকটাকে দেখে আর বন্ধু মনে হচ্ছে না সীতাংশুর, মনে হচ্ছে আলটপকা আলাপ হওয়া কোনো লোক গালগপ্পো ফেঁদে বসেছে তাঁর কাছে। ছেলেপুলের ভারে লোকটা একটু নুয়ে পড়েছে বটে।
-তুমি কি আমাকে কিছু বললে সীতাংশু? দুর্গাদাস একটু ঝুঁকে জিজ্ঞেস করলেন ।
-না, মানে তোমার ওয়াইফ পারলেন?
দুর্গাদাস জানলা দিয়ে বাইরে তাকালেন, টিনের চাল থেকে গড়িয়ে আসা জল টপ টপ ক'রে জানালা থেকে এক দেড় হাত দূরে সরু সুতোর মত দুলছে যেন হাওয়ায়। বৃষ্টি থেমেছে। ওদিকে তাকিয়েই দুর্গাদাস বললেন, পেরেছে।
-উঠবে তো?
-হ্যাঁ, জল থেমেছে। দুর্গাদাস উঠে পাঞ্জাবিটা মাথা দিয়ে গলিয়ে নিলেন, 'চলো'।
সীতাংশু বাঁচলেন। দুর্গাদাসের নয় ছেলেমেয়ের ফিরিস্তি তাঁকে আর শুনতে হবে না। ওঁরা এবার উঠোনের দিক দিয়ে বেরোবেন। দরজায় তালা দিয়ে ভেতরের প্রাচীর ঘেরা উঠোনে নামতেই সীতাংশু দেখলেন গাছটা কাঁঠালের। সদরের একপাশে দাঁড়িয়ে দরজার মুখটা অন্ধকার করে রেখেছে। গন্ধটা ওর গা থেকেই আসছে। আকাশের গা পরিষ্কার হয়ে গেছে, জলে ধোয়া। ঝকঝকে। অনেক দূরে পুবের দিকে এক টুকরো মেঘ, যেন সমুদ্রের ভেতরে একটি নৌকো। সীতাংশু ঘাড় নামিয়ে চোখ সোজা করলেন গাছটার দিকে। আশ্চর্য! একেবারে গোড়া থেকেই ফল ধরেছে, মাটিতে লুটোচ্ছে পাকা কাঁঠাল। গন্ধটা ওই পাকা ফলের। বৃষ্টিতে এখন বাতাসও কেমন ধোয়া, মোলায়েম ঠাণ্ডা ভাব। পুরো গাছটা জলে ভিজেছে, চান করে উঠে এসেছে যেন জল ছপছপ ক'রে। পাতা থেকে নিঃশব্দে জল ঝরছে, এখনো মাথা মোছেনি, চুলের ঢাল তো দেখার মত। এমন চুলের মহিমাতেই মেয়েদের বিয়ে হয়ে যেত এককালে। গন্ধে গন্ধে সীতাংশু এগোলেন, নিচু হয়ে গাছটার তলার ছায়ায় দাঁড়াতেই তাঁর মাথায় টপ ! একফোঁটা দুফোঁটা জল, সীতাংশুর চোখের পাতায় পড়ল, কেননা তিনি তখন দেখছিলেন কয়েক হাত উপরে ডালের গায়ে পাতার আড়ালে একটি বড়সড় ছাই রঙের মৌচাক, মৌমাছি বিন বিন করছে। তার গা দিয়েও জল ঝরছে। সীতাংশুর গা ভিজে যাচ্ছে পাতার কোষ থেকে নিবেদনের মত নেমে আসা জলের বিন্দুতে। তিনি গুঁড়ি মেরে বেরিয়ে এলেন।
উঠোনের অন্যদিকে বহু পুরনো একটি সজনে গাছ, তার পাতা ঝরছে একটি দুটি করে। একটা কাঠবিড়ালি হঠাৎ থমকে পাঁচিলের উপর মুখ গুঁজে চুপচাপ। হঠাৎ বৃষ্টি, তার উপরে উঠোনে ঘুরছে দুজন মানুষ, থমকে যাওয়ার কথা তো বটে।
সীতাংশু বললেন, বেশ বড় মৌচাক, ভেঙে দাও।
দুর্গাদাস হাসলেন। জবাব দিলেন না।
সীতাংশু বললেন, একেবারে গোড়া থেকে কাঁঠাল, একটা তো পেকে ফেটে যাওয়ার জোগাড়, কেটে নাও ।
দুর্গাদাস ঘাড় বাঁকিয়ে গাছটার দিকে তাকালেন, তারপর ঘুরে বললেন, দেখেছ সীতাংশু, গাছটার ফল ধরার ক্ষমতা কী রকম, বয়সও কম না, সেই যেবার সোহাগ হয়, এখন একেবারে গা থেকে মাথা পর্যন্ত ফল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
সীতাংশু প্রমাদ গুনলেন। আবার কি ছেলেপুলের কাহিনি শুরু হবে। কিন্তু সত্যি গাছের চেহারাটি দেখার মত। স্নান সারা, চুল এলানো, কোলে কাঁখে ছেলে মেয়ে—সীতাংশু চমকে উঠেছেন ভেতরে। চোখ জোর ক'রে ঘুরিয়ে নিলেন গাছটি থেকে। টিনের চালটি এখন জল ধোয়া, পুরনো পায়রাটিকে দেখা যাচ্ছে না। আছে বোধহয় অন্য ধারে।
সীতাংশু জিজ্ঞেস করলেন, তোমার নয়জনের নাম?
সোহাগ, গোলাপ, আদিত্য, মৃগাঙ্ক, বিশাখা, ধ্রুব, শ্যামল, পলাশ ও মৃত্তিকা।
সীতাংশু হাসলেন নামের তালিকায়, বললেন, ন'টি নাম খুঁজে পেয়েছো এও ভাল। আমি তো হাতড়াতাম ৷
দুর্গাদাস বললেন, হেডস্যারের দেওয়া।
কাঁঠাল কাটবে না?
-থাক না, পাখিতে থাক, ফেটে যাক আপনা আপনি, তারপর পাখিতে বীজ ছড়াক।
-জঙ্গল হয়ে যাবে যে সব। সীতাংশু বললেন।
-হোক না, জঙ্গল আর পাখি, আর পাকা ফলের গন্ধ, উফ্ ভাবতে পারো তুমি!
কথা বলতে বলতে দুর্গাদাস বাইরে। পিছনে সীতাংশু। দুর্গাদাস সদরে তালা লাগালেন। দুজনে এবার পথে। নিঝুম হয়ে বাড়িটা প'ড়ে থাকল। দুপা এগিয়ে সীতাংশু আবার ফিরলেন। পাঁচিল টপকে কাঁঠাল গাছটি মাথা তুলে তাকিয়ে আছে বাইরে। হাওয়ায় পাতা দুলছে। সীতাংশুর মনে হল অনেকগুলি হাত। হাত নাড়ছে যেন নিঝুম বসত বাটি থেকে নানা বয়সের মানুষ। ডিঙিয়ে তাকাচ্ছে যেন তাঁদের পথের দিকে। দুটি মৌমাছি এলোমেলো হয়ে বেরিয়ে এল বাইরে। সীতাংশুকে এবার রাস্তার বাঁক ঘুরতে হল। বাঁক ঘুরে এগিয়ে যেতেই দুর্গাপুর যাওয়ার পিচঢালা হাইওয়ে। আগে এ রাস্তা মোরামের ছিল, লাল ধুলো উড়ত খুব। দুর্গাদাস হাঁটতে ইটিতে দাঁড়ালেন, বললেন, 'বুঝলে প্রথমে সোহাগের সন্তান, তার পর ভালবাসার গোলাপ।
এরপর তুমি নামের জন্য আকাশে পাড়ি দিলে? সীতাংশুর গলায় যেন ব্যঙ্গের সুর।
-আমি নই হেডস্যার, ভাঙা পায়ে প্রায় ছুটেই এসেছেন ক'বার। দুর্গাদাস বললেন। সীতাংশু বৃষ্টি ধোঁয়া আকাশ দেখলেন, ধুলো ময়লা সাফ, সুগন্ধ নামছে যেন ওপর থেকে। তাঁর মুখে প্রসন্নতা জেগে উঠল। তিনি দেখছিলেন, এখন আদিত্য অস্ত গেছে, মৃগাঙ্ক জাগেনি, ধ্রুব, বিশাখা ঘুমিয়ে--। সীতাংশু আকাশের মধ্যে আদিত্য মৃগাঙ্ক ধ্রুব বিশাখাদের খোঁজ করতে করতেই বললেন, এরপর তুমি মাটিতে নামলে ?
-হেডস্যার, আমি নই।
সীতাংশু দেখচ্ছিলেন তাঁদের মাথার উপরে আকাশটা সত্যি শূন্য, নিরাভরণ, নিঝুম, থমথমে, না সূর্য না চাঁদ, না গ্রহ, না নক্ষত্র, কোনো কিছুই দেখা যাচ্ছে না। একেবারে খোলা পতিত জমি যেমন, অনেকটা তাই।
-আমরা কোনদিকে যাচ্ছি? সীতাংশু জিজ্ঞেস করলেন।
-কেন শালি নদীর দিকে।
এতক্ষণে সীতাংশু কেমন ঘোরে পড়ে গেছেন। দুর্গাদাসের টানে হেঁটে চলেছেন তাঁর পিছনে পিছনে, কিন্তু শালি নদীর কথা শুনে থামলেন। অস্ফুট গলায় বললেন, না গেলে হত না, যদি মন খারাপ হয়?
-কেন ও ও! হঠাৎ ঘুরে তাকিয়েছেন দুর্গাদাস, সীতাংশু শুনলেন মেঘ ডেকে উঠল যেন মহিষের বিক্রমে। দুর্গাদাস কাঁপছেন থরথরিয়ে।
সীতাংশু বললেন, নদী ধরে পশ্চিমে তো আমাদের গ্রাম।
দুর্গাদাস স্থির হলেন, ধীরে শ্বাস নিতে নিতে বললেন, এই মন খারাপে তো আনন্দ আছে সীতাংশু।
সীতাংশু বিমর্ষ মুখে মাথা নামালেন। চুপচাপ হাঁটতে লাগলেন। দুর্গাদাস আবার বিড়বিড় আরম্ভ করেছেন। তাঁর কথার ঝুলি যেন ফুরোবার নয়। সীতাংশুর মনে হচ্ছিল বয়স যেন বাড়ছে সত্যি।
আটাত্তরে প্রবল বন্যা হয়, সেবার শ্যামল হল। ওই বছরই পঞ্চায়েত ভোট হয় বহুদিন পরে, ভোটের পরে বন্যা, কী অবস্থা তুমি ভাবতে পারবে না, কী লড়াই! বন্যাও সামাল দেওয়া গেল, এরপর অনেক বছরের মাথায় মৃত্তিকা, অতদিনে আবার সব বদলাতে শুরু করেছে,
সীতাংশু তুমি মানুষ দেখেছো? শিখ মরছে, খ্রিস্টান, মুসলমান মরছে, মানুষ ক্রমশ নিষ্ঠুর হয়ে উঠেছে, মায়া মমতা ফুরিয়ে যাচ্ছে..... আমার সন্তানেরা এরই ভিতর জন্মাতে থাকে পরপর।
সীতাংশু এই এত বছরের কথা ভাবেননি। তাঁর আক্ষেপ নেই সেই জন্য। ভাগ্য অন্বেষণে বেরিয়ে কখনো তিনি উজ্জয়িনী কখনো গোয়ালিয়র কখনো বস্তার জেলার খনি অঞ্চলে। পঁয়ষট্টির পর চলে গিয়েছিলেন মেঘদূতের জন্মভূমিতে, যখন এখানে আকাশে জলহীন মেঘ ইতিউতি ঘুরছে, জল নেই, মাটি শুখা, যখন ছেষট্টিতে এখানে আগুন জ্বলছিল খাদ্যের জন্য তখন সীতাংশু দেখেছিলেন বর্ষায় মহাকাল মন্দিরের মাথায় কীভাবে মেঘ ঠাঁই নিয়েছে বিন্ধ্য থেকে হিমালয়ের দিকে যেতে যেতে। তিনি জানতেন না সেই সময়, খরা, আগুন, লাঠি গুলি টিয়ার গ্যাসের গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে, জিভে প্রথম গম আস্বাদ করতে করতে কেউ তার প্রথম সন্তানের নাম রাখছে সোহাগ ।
সীতাংশু দেখলেন বড় সোনার থালার মত চাঁদ উঠছে নদীর ওপারের জঙ্গলে, একটু টাল খেয়েছে এক ধারে। অনেকদিন আগে হয়ত হাত ফসকে পড়ে গিয়েছিল শানের মেঝেতে। তিরিশ বছর আগের চাঁদের সঙ্গে দেখা হল সীতাংশুর, চাঁদ অভিভূতের মত জ্যোৎস্নার ঢেউ গড়িয়ে দিল চরাচরে।
দুর্গাদাস বললেন, দাঁড়াও সীতাংশু।
সীতাংশু আকাশ থেকে চোখ নামালেন। দেখলেন কয়েক হাত দূরে নদীর ঢালে দুর্গাদাস দাঁড়িয়ে। তাঁর কানে এল ১৯১৮ সনে চালু হওয়া ন্যারোগেজ ট্রেনের বুড়ো ইঞ্জিনের ঘসঘস। বাঁকুড়া দামোদর রিভার রেলওয়ের ভোঁ ভোঁ শব্দটা যেন তিরিশ বছর পিছন থেকে আসছে।
দুর্গাদাস বললেন, তুমি আমাকে ঘেন্না করছ, তাই না, ন'টা বাচ্চার জন্ম দিয়েছি।
সীতাংশু না বলতে পারলেন না। চুপ করে আছেন। দুর্গাদাস সীতাংশুর মনোভাব বুঝে ঘাড় নুয়ে নদীর বালিতে চেয়ে আছেন।
সীতাংশু বললেন, ঘেন্না না হোক, কাজটা কি ঠিক করেছ, তারা কে কোথায় কী করছে বলো দেখি, ন'জনকে মানুষ করা তো তোমার কম্মো নয়।
দুর্গাদাস বাধ্য ছেলের মত সীতাংশুর মাস্টারি বকুনি শুনছেন।
-তোমার ওই ঘর, নয় ছেলেমেয়ে, ন'জন যখন একসঙ্গে হয় প্রায় ওই গাছটারই মত অবস্থা হয়ে ওঠে তোমাদের বাড়িটার, ইটে ইটে যেন মানুষের গন্ধ।
মাথা তুলেছেন দুর্গাদাস, পেয়েছো মানুষের গন্ধ?
. সীতাংশু থমকে গেছেন, সত্যি! এমন গন্ধ কি ছিল ওই বাড়িতে? দুর্গাদাস নীরবে চেয়ে আছেন তাঁর দিকে। তার পিছনে অন্ধকারের নদী চালচিত্রের মত। ক্ষীণস্রোতের শব্দ, জ্যোৎস্নায় সব স্পষ্ট হয়ে উঠছে একটু একটু করে।
দুর্গাদাস বিড়বিড় করছেন, মানুষের গন্ধ কেমন, বলতে পার তুমি?
সীতাংশু দেখলেন, দুর্গাদাসের দুচোখ ক্রমশ জ্বলতে আরম্ভ করেছে যা খাওয়া বুনোজন্তুর মত। থরথর করে নদীর কিনারে দাঁড়িয়ে কাঁপছে দুর্গাদাস, যেন পা রেখেছে চোরাবালির গায়ে। সীতাংশু বুঝতে পারছিলেন, তিনি সত্য বলেননি, দুর্গাদাসের বাড়িতে পুরনো চুনসুরকি আর কাঁঠালের গন্ধ, পায়রার ডানার শব্দ। নয় পুত্রকন্যা যার, তার বাড়ির চেহারা অত থমথমে তো হওয়ার কথা নয়।
দুর্গাদাস কয়েক পা এগিয়ে এলেন, একটু চাপা গলায় বললেন, 'জানো সীতাংশু, যখনই স্বপ্ন আর বাস্তব এক হয়ে গেছে, তখনই সব ভেঙে চুরমার, এই জীবনে এ পর্যন্ত আমি শুধু হারিয়েছি আর হারিয়েছি, যখনই পেয়েছি তা যেন হারানোর জন্যই পেয়েছি, আমার ঘরে কেউ থাকে না, বাপকে সবাই ত্যাগ করেছে।
সীতাংশু আন্দাজ করছিলেন এমন, তাই কৌতূহল সম্বরণ করেছেন অভ্যাসে। যদি বলে দুর্গাদাস তবে তিনি শুনতে পারেন, তিনি নিজে জিজ্ঞেস করবেন না। দুর্গাদাস শালি নদীর তীরে বসে পড়েছেন দু হাঁটু মুড়ে। সীতাংশু আস্তে আস্তে ভীত হয়ে উঠছেন। অভ্যাসে এক পা পিছিয়েছেন।
-তুমি যখন একটু একটু করে ভাগ্য গড়েছো, আমি তখন এক এক করে, বছর বছর— সীতাংশু আর পারলেন না, এগিয়ে এলেন, দুর্গাদাসের মুখোমুখি হওয়ার জন্য নত হলেন, নদীর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করছেন, কী হয়েছে তোমার দুর্গাদাস, তারা সব কোথায়?
দুর্গাদাস আকাশের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করলেন, আছে কাছাকাছি, সব শুয়ে আছে এই নদীর বালিতে, সোহাগ থেকে মৃত্তিকা, ধ্রুব, বিশাখা সবাই, ন'টির একটিও বাদ নেই হে।
সীতাংশু ধরথর করে কেঁপে উঠেছেন এ-কথায়। কী বলছে ও? একি সত্য না মায়া! কঠিন মায়া, দুঃস্বপ্ন! স্বপ্নের মতো তো দুঃস্বপ্নও সত্য হয়না কখনো।
-বিশ্বাস করো তুমি, সন্তান নিয়ে কেউ মিথ্যে বলেনা, তাতে তাদের কল্যাণ হয়না সীতাংশু, নটিকেই আমি নিজে হাতে করে এই বালিতে পুঁতেছি।
সীতাংশু আর পারলেন না, থামো দুর্গাদাস থামো, আমিও তো বাবা কারোর কারোর।
-তুমিতো সব গড়ে নিয়েছো হে, চোখ বুজে থেকেছ, খাদ্যের অভাব দ্যাখোনি, খরায় পোড়নি এদেশে। মিলিটারি মার্চ করাও দ্যাখোনি, এটুকু দ্যাখো। তিন চারদিনের বেশি আয়ু দিতে পারেননি ওদের মা ওদের, তার যেমন দুর্বল হৃদপিণ্ড, ওদেরও তেমন। পৃথিবীটাকে সহ্য করতে না পেরে, বাতাসে খাবি খেতে খেতে আমার কাছ থেকে নাম নিয়ে সব ফিরে গেছে অন্ধকারে, ওরা যত মরেছে, আমারও রোখ যেন তত বেড়ে উঠেছিল সীতাংশু, পৌরুষে যে ঘা লাগছিল বারবার।
দুর্গাদাস তুমি থামো, আমার লাগছে ভীষণ, আমি সহ্য করতে পারছি না দুর্গাদাস।
দুর্গাদাস হাঁপাচ্ছিলেন, শেষটা শুনে যাও সীতাংশু, মৃত্তিকা হওয়ার সময় ওদের মাও শেষ হয়ে গেছে, শেষের দিকে সে আমাকে থামতে বলত। কী করে থামব? এতগুলো ছেলেমেয়ে যে নিজের হাতে পুঁততে পারে মাটিতে তার কতটা শক্তি আন্দাজ করতে পার? আর এই এতো বছর ধরে মানুষও আরো মায়া মমতাহীন হয়ে উঠেছে, মানুষ বদলেছে, জল মেঘ হয়ে আবার জল হয়ে ফিরে এসেছে হে, শুধু আমিই দিন দিন ক্ষয়ে গেছি। কিন্তু ইচ্ছেটা যায় না কখনো, দিনে দিনে বাড়ছে আমার আর সেই পাভাঙা হেডস্যারের, যিনি নামের খাতা খুলে বসে আছেন সবসময় ।
সীতাংশু চক্রবর্তী ভাবতে পারেননি তাঁর নির্বিবাদ জীবনে এখন একটা সন্ধে এসে হাজির হবে, তিনি যেন বোবা হয়ে গেছেন একেবারে।
দুর্গাদাস তখন কথা থামিয়ে নদীর দিকে এক পা দু পা এগিয়ে ডাক দিয়েছেন চাপা স্বরে, আয়রে আমার সোহাগ গোলাপ, আয়রে আমার ধ্রুব।'
সীতাংশু দেখলেন মেঘ ভেসে যাচ্ছে নদীর হাওয়ায়। সেই মেঘ ডাকছে গুরুগুরু, ও শ্যামল ও গোলাপ ও ধ্রুব, আয়, তোদের আবার ভাই-বোন দেব, আয়, উঠে আয়.....।
সীতাংশু এতক্ষণে ভয় পেলেন। অনেক হয়েছে, আর নয়। তাঁর মনে হচ্ছিল, নদীর অতল থেকে বোধহয় সেইসব সোহাগ গোলাপ শিশুরা উঠে আসবে এখনি। ভয়ে তিনি শহরের অভ্যাসে পিছিয়ে গেলেন, তারপর মেঘ জ্যোৎস্না ভেদ করে দৌড়লেন নদীতীর ধরে। না, দিক ভুল হয় নি তাঁর। পশ্চিমে নয় পুবে ছুটেছেন, তারপর দক্ষিণে, যেদিকে হাইওয়ে। ঠিক সময়ে ঠিক সিদ্ধান্ত তিনি নিতে জানেন। ঠিক সময়ে এই গঞ্জ, এই দেশ তিনি ছেড়েছিলেন, ঠিক সময়ে ছাড়ছেন নদীঘাট। নতুন জুতোয় একটু অসুবিধে হচ্ছিল ঠিক, মানিয়ে নিলেন। তাঁর কান থেকে আস্তে আস্তে মিলিয়ে গেল বৃষ্টির জন্য মেঘের ডাক, দুর্গাদাসের কণ্ঠস্বর, বাতাসের সোঁ সোঁ নদীর বয়ে যাওয়া।
# # #
ধরা যাক, সীতাংশু চক্রবর্তী বলে কেউ আসেনি আজ এই গঞ্জে। ধরা যাক, সীতাংশু চক্রবর্তী নামের কেউ কোনোদিন ছিল না এই গঞ্জে। এ নামে যদি কেউ থাকে তবে সে অন্য কোনখানে, অন্য গঞ্জে, অন্য গ্রামে। তাকে নিয়ে কাহিনিটা লেখক বানিয়েছে।
কিন্তু সন্ধেয় যে নদীর বালিতে পা ডুবিয়ে ডুবিয়ে এক দুর্গাদাস নন্দী নেমে যায় জলের ভিতরে, এর মধ্যে কোনো মিথ্যে নেই। ফিরবে যখন, তখন এই গঞ্জের চোখে ঘুম, হাইওয়ে পড়ে থাকবে মরা সাপের মত। বাড়িটি দুর্গাদাসের জন্য অপেক্ষা করে আছে অন্ধকারে, শুধু বাড়ি নয়, উঠোনের মৌচাক, কাঁঠাল গাছটিও। দোরগোড়ায় তার অপেক্ষা সারাদিনের, কখনো স্নান করে কখনো রোদপোড়া হয়ে মৌচাকের মৌমাছিগুলির হিসেব রাখতে রাখতে। কাঁঠাল গাছটির গন্ধে, ক'টি মৌমাছির গুনগুনানিতে দুর্গাদাসের কোনোদিন বাড়ি চিনতে ভুল হয় না, তা রাতের অন্ধকারে যতই পোঁচ পড়ুক অন্ধকারের। মৌমাছিগুলি তাকে রাস্তা থেকেই ডেকে আনে। আনতে যায়।
লেখক পরিচিতিঃ
কথা সাহিত্যিক
কলকাতায় থাকেন।


15 মন্তব্যসমূহ
চমৎকার বুনন। চমৎকার চলন। এমন গল্প মন ভারী করে দ্যায়। সে ভার যেমন দুঃখের। তেমন আনন্দেরও।
উত্তরমুছুনচমৎকার বুনন। চমৎকার চলন। এমন গল্প মন ভারী করে দ্যায়। সে ভার যেমন দুঃখের। তেমন আনন্দেরও।
মুছুনভীষণ ভালো লাগলো। কি অপুর্ব সব উদাহরণ মন জুড়িয়ে গেলো।
উত্তরমুছুনকী ভাষা ; তেমন উপমা, গল্পের গঠন, দারুন ভাল লাগল।
উত্তরমুছুনঅসাধারণ গল্প। মানুষ জীবন রাজনীতি প্রকৃতি। ভিতরটা তছনছ করে দেয়।
উত্তরমুছুনএমন গল্পের বুনন আপনার কাছ থেকে তো আশাই করা যায়। অপূর্ব গল্প বলার ভাষা ও কায়দা। 🙏
উত্তরমুছুনআশ্চর্য গল্প। গল্পের চলন মুগ্ধ করে , বিস্মিত করে পাঠককে। মারাত্মক ট্রাজেডি এই গল্পের অভ্যন্তরে কুণ্ডলী পাকিয়ে রয়েছে, এ গল্পের আরম্ভের শ্লথ চলন, কথোপকথন, গল্পের বুনটে কল্পনাই করা যায়না। অথচ ইঙ্গিত ছিল। ইশারা ছিল কথোপকথনেই, ইঙ্গিত ছিল গৃহ, প্রকৃতির বর্ণনে।ইশারা বোনা রয়েছে গল্পের সুরে।
উত্তরমুছুনশূন্য থেকে শুরু করে এই যাত্রা পাঠককে ভাবের যে কেন্দ্রে পৌঁছে দেয়, তাতে সে বিস্মিত, মুগ্ধ এবং বিহ্বল।
আন্তর্জাতিকমানের একটি লেখা।
কলমকে নমস্কার।
পড়তে পড়তে মন ভারি হয়ে গেল।
উত্তরমুছুনকী দূর্দান্ত গল্প। শুরুতে আটপৌড়ে মন হলেও গল্প ক্রমশ যেন ঘণিয়ে উঠছিল। পড়তে পড়তে গায়ে কাঁটা দিচ্ছিল। কাঁঠালের গন্ধের পাশাপাশি এমন একটা গন্ধ, একটা ইঙ্গিত, হাড় কাঁপানো একটা সুর আমি টের পাচ্ছিলাম যেন। ঠিক ঘটলও তাই। গল্পের পেটের ভেতরে কুন্ডলি পাকানো সেই নীল কষ্টটা একসময় বেরিয়ে এলো—!
উত্তরমুছুনমা হয়ে ওঠার আগে, বাপ হয়ে ওঠার আগে, একের পর এক--- বুক ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে পড়তে পড়তে। আর সময়ের বিষাক্ত চাবুকও একের পর এক, নেপথ্যেই, যেন দায়িত্ব নিয়েই।
উত্তরমুছুনবিন্যাসও মুগ্ধ করছে।
সুতপন চট্টপাধ্যায়
উত্তরমুছুনসুন্দর গল্প। একটি গল্পে কি ভাবে ইতিহাস,সময়,রাজনীতি,মনন ও মেধা মিশিয়ে দিতে হয় তা এই লেখা না পড়লে বোঝা যাবে না।
আমার প্রণাম নেবেন কথা সাহিত্যিক অমর মিত্র মহাশয়। আগেও পড়েছি, সেই টানেই কিনেছিলাম শারদীয় অনুষ্টুপ ও কৃত্তিবাস। আপনার দুটো লেখাতেই আমি অত্যন্ত হতাশ হয়েছি। চেনা অমর মিত্রকে আবার পেলাম এই গল্পে। আপনাকে কুর্নিশ।
উত্তরমুছুনমনে হয় অনুষ্টুপের গল্প গ্যেরনিকা পড়েননি।
মুছুনএ যেন আরেক তেলেনাপোতা আবিষ্কার!চমৎকার গল্প টি।
উত্তরমুছুনপড়লাম।এক নতুন আঙ্গিকের অসাধারণ চিত্র বিন্যাস।
উত্তরমুছুন