অমর মিত্রের গল্প : হানাবাড়ি

                                         


পৃথিবীর আয়ু ফুরিয়ে এসেছে প্রায়। লোকটা বলল।

লোকটার সঙ্গে সুমনের দেখা হয়েছে সন্ধের পর খালাসিটোলায়। এই সেই খালাসিটোলা, যেখানে কলকাতার অনেক বড় বড় মানুষ আসতেন নিয়মিত আড্ডায়। গল্পলেখক, কবি, ভাবুক, নিন্দুক। তার আগে কলকাতা বন্দরের খালাসিরা আসত নেশা করতে। খালাসিদের সমুদ্র ভ্রমণের অভিজ্ঞতায় নরক গুলজার হতো। এডেন বন্দর ভালো, না রেঙ্গুন, নাকি টেমস নদীর বন্দর, মাদ্রাজ নাকি করাচি বন্দর, সুরাট, বোম্বাই ইত্যাদি ইত্যাদি। কত রকম বন্দরের নাম শোনা যেত নেশাড়ুর গলায়। কবি শুনতে শুনতে বলত, দেখেছ দেখেছ, ও এত ঘুরে এল, আমি শুধু কলকাতার রাস্তা আর রাস্তা, জোর চাইবাসা, কি ধলভূমগড়, সাঁওতাল পরগণা।

এখন খালাসিরা আসে তা বোঝা যায় কি না সন্দেহ। খিদিরপুর বন্দর, যেখান থেকে এক কবি পরবাসের উদ্দেশে যাত্রা করেছিলেন আশার ছলনে ভুলি, সেখানে জাহাজ ভিড়লে তারা আসত এদিকে, হয় টমটম গাড়ি ভাড়া করে হল্লা করতে করতে, বিজাতীয় ভাষা বলতে বলতে, বিজাতীয় সুরে বিজাতীয় গান গাইতে গাইতে, আমোদ করতে করতে, তারপর দেড়শো বছর কেটে গেছে। বন্দরের নাব্যতা কমেছে। নতুন বন্দর হয়েছে হলদিয়ায়। কলকাতা বন্দরের ধারে নেশা করার জায়গা হয়েছে অনেক। খালাসিটোলায় খালাসি কেউ কেউ আসে হয়ত, আর আসে নানা রকম মানুষ। তাদের সমুদ্র যাত্রা হয়নি, আকাশপথে হয়েছে, তেমনই মানুষ এই আধবুড়ো, চাপা গলায় বলল, শুনছ, পৃথিবীর আয়ু বেশি নয়, হয়ে এল।

সুমন চট্টরাজ, বাড়ি বাঁকুড়ার বড়জোড়া, দামোদরের কাছে, এখন কলকাতাবাসী। কাজ করে এক বিলিতি অফিসে। কোভিডের আগে অফিস যেতে হতো সেই সেক্টর ফাইভ। তার কলকাতার বাসস্থান খেলাতবাবু লেন থেকে অনেকদূর। কোভিড আসার পরে ঘরে বসে ল্যাপটপে কাজ। ওয়ার্ক ফ্রম হোম। সব সময় তোমাকে বাড়ি থাকতে হবে। বাড়ি থাকা মানে ল্যাপটপে থাকতে হবে। অন লাইন থাকতে হবে। মানে ১৬ ঘন্টার ডিউটি। বিয়ে করেনি। বিয়ে করবে বলে মনস্থির করে আর ফসকে যায়। একটা এক ঘরের ফ্ল্যাট কিনেছে। নিজে হাতে রেঁধে খায়। একজন রান্নার লোক পেয়েছিল। সে সকাল ছটায় আসে। তখন সুমনের ঘুমের আরম্ভ বলা যায়। ফলে ছেড়ে দিতে হয়েছে। রাতের খাবার কিনে আনে সামান্য হাঁটাহাঁটি করতে বেরিয়ে। এই হলো সুমনের দৈনিক রুটিন। শনি রবি ছুটি। এই দু’দিন বেরোয়। খালাসিটোলা, বারদুয়ারি, শ-ব্রাদারস, এমনি সব কলকাতার প্রাচীন মদের টেকে যায়। বিলিতি হলে আড়াই থেকে তিন পেগ, দেশি হলে এক পাঁইট। কোনোদিন এসব না করে কফিহাউসে যায়। সেখানে একটা শনিবারের ঠেক ছিল। ভেঙে গেছে কোভিড পর্বে। একজন গণেশদা মারা গেছে। হরর লিখত। রহস্য রোমাঞ্চ। থ্রিলার। সেগুলি সে গোগ্রাসে গিলত। কী ভয়ানক সব তন্ত্র মন্ত্র, পড়ত আর আরাম করত। ভুলে যেতে টাইম লাগত বেশি না। তারপর এক সময় দেখল আরাম হচ্ছে না। তখনই কোভিড এল। তখন গণেশদার সঙ্গে যোগাযোগ হতো ফোনে। ফোনেও সেই সব কথা। নতুন হরর। কোভিডের হরর তখন মুণ্ডহীন মানুষের হরর ছাপিয়ে গেছে। প্রেতাত্মার চেয়েও বেশি প্রতিশোধ নিচ্ছে কোভিড। মানুষ মরছে পটাপট। গণেশদা বলল, দ্যাখ, সুমন, কোভিড গেলে, হরর লিটারেচরের কথা নতুন করে ভাবতে হবে, নতুন ভাবনা আসবে হরর কাহিনিতে ?

কীভাবে ভাববে ? সুমন জিজ্ঞেস করেছিল।

ভাইরাসকে আমার অতৃপ্ত প্রেতাত্মা মনে হয়, তারা এক সঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়েছে পৃথিবীর মানুষের উপর, যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে, প্রেতাত্মার সঙ্গে জীবিত মানুষের, অনেক মরবে।

কী বলছ গণেশদা ? ভয় পেয়ে থামাতে চেয়েছিল সুমন।

গণেশ ত্রিবেদী বলেছিল, আমার ভাবনায় কোনো ভুল নেই, পোকামাকড়ের মতো মরবে মানুষ, সাবধানে থাকিস, আমার দিকেও নজর আছে প্রেতাত্মার।

সেই গণেশ ত্রিবেদীই চলে গেল কোভিডে। এমন ভাইরাস তাঁকে ধরেছিল, তাকে নির্মূল করাই গেল না। বড় হাসপাতাল, আই সি সি ইউ, অক্সিজেন, কত রকম ওষুধ–সব ব্যর্থ হয়ে গেল। প্রেতাত্মা প্রতিশোধ নিল। হরর কাহিনিতে প্রেতাত্মাদের নিয়ে খেলা করার প্রতিশোধ। অথচ গণেশদা মানুষটি ভালো ছিলেন। স্নেহময়। কলকাতার পুরোন বাসিন্দা। কয়েক পুরুষ আগে আদিবাড়ি ছিল হুগলিতে, সরস্বতী নদীর ধারে। তার আগে হয়ত হল্যান্ড কিংবা ডেনমার্ক। বাণিজ্য করতে এসে রয়ে গিয়েছিল এদেশে। এসব গণেশদার কথা। সত্যমিথ্যা বিচার করা প্রয়োজন নেই। এখন শোভাবাজার চিৎপুরে তাঁদের পুরোন বাড়ি। সে প্রায় দুর্গের মতো। তাঁদের পরিবারের ব্যবসা ছিল মশল্লার। মশল্লা নিতেই তো ওলন্দাজ বণিক এদেশে এসেছিল একদিন। তখন সরস্বতী নদী নাব্য ছিল। হুগলী বন্দরে ভিনদেশী জাহাজ এসে নোঙর বাঁধত। সেই ব্যবসা ভাগ হয়ে হয়ে নেই প্রায়। ঠাকুরদার করা বাড়িও ভাগ হয়েছে। বাড়ির ভিতর দিয়ে পাঁচিল উঠেছে। তাঁর ভাগে তিনটে ঘর। সে কম নয়। গণেশদা বলত, তাদের বাড়ির শরিকি ঘরের অধিকাংশ তালা বন্ধ। তারা কেউ সল্ট লেক, কেউ নিউটাউনে থাকে। একজন যোধপুর পার্কে। তারা প্রস্তাব দিয়েছে বাড়িটি ভেঙে বহুতল তুলতে। বহুতলে সকলে একটা বা দুটি করে ফ্ল্যাট পাবে, আর নগদে বেশ ভালো অঙ্কের টাকা। গণেশদা রাজি হয়নি। গণেশদা আহিরিটোলা হাইস্কুলে কেমিস্ট্রির টিচার ছিল। বলত, বাড়ি যদি ভেঙে ফেলা হয় তাঁর লেখা শেষ হয়ে যাবে। বাড়ি থেকেই তাঁর লেখা জন্ম নেয়। তাঁর পূর্ব পুরুষের আত্মারা বাড়িটিতে আছেন। নেশা করে সুমনের মনে হলো, গণেশদার আত্মা নিশ্চয় শোভাবাজারের বাড়ি ছাড়েনি। আত্মা না প্রেতাত্মা?

লোকটা আবার বলল, পৃথিবীর আয়ু ফুরিয়ে এসেছে, টের পাও ?

ছোলাসেদ্ধ আর আদার কুচি মুখে নিয়ে, শসা টমেটো, লেটুস পাতা চিবিয়ে চিবিয়ে মুখের স্বাদ বদল করে সুমন বলল, আপনি কী করে বুঝলেন ?

তুমি বোঝ না ? লোকটা ঝুঁকে পড়ল।

না বুঝি না, বুঝব কী করে ?

মিলিয়ে নিও আমার কথা। লোকটা বলেছিল।

কী মিলিয়ে নেব ? সুমন জিজ্ঞেস করল।

বাংলা বোঝ না নাকি ? সেই ছ’ফুটের উপর ঢ্যাঙা, শীর্ণকায় লোকটি বলেছিল। তার চোখদুটি কটা, নাক খাড়াই, মাথা ভর্তি কাঁচাপাকা চুল, গায়ে একটা ঢলঢলে সোয়াটার, পরনে জিন্স। একটা ক্যাপ ছিল মাথায়। সেটি খুলে কাঁধের ঝোলা ব্যাগে ঢুকিয়ে দিয়েছে। ব্যাগটি হাইবেঞ্চের দেওয়াল সাইডে একটি পেরেকে ঝোলানো। লোকটা বলল, মিলিয়ে নেবে আমার কথা সত্যি কি না, আমি ভুলভাল বলছি কি না ?

সুমন বলল, পৃথিবীর আয়ু কতদিন মনে হয় ?

ব্রহ্মার এক পলকপাতে শেষ।

এসব পুরাণের কথা। সুমন বলেছিল, পড়তে দারুন, ভাবতে দারুন, দারুন ইমাজিনেশন।

লোকটা বলল, পুরাণে আমি কিছু যোগ করেছি।

কোন পুরাণে, কোন জায়গায়, কোথায় লিখলেন ? সুমনের তর্কের শেষ নেই।

লোকটা শূন্যে আঁকিবুকি কাটল, তারপর বলল, এখেনে, শূন্য পুরাণে।

তখন সুমনের ফোন এল। সুমন দেখল অফিস কলিগ চন্দ্রার। চন্দ্রা ডাকল, তুই কোথায় ?

কেন, আজ তো আমার অফ ডে।

চন্দ্রা বলল, মিঃ লাখেরাজ, টপ বস ইউ এস থেকে আগামীকাল ল্যান্ড করছে, আগামীকালই মিটিং ডেকেছে, আমি বলে দিলাম।

ধুত। ফোন কেটে দিল সুমন। কিন্তু আবার ফোন বাজল, চন্দ্রা বলল, অনলাইন মিটিং হবে, প্রেজেন্ট হবি।

আমি এখন ক্যানিং পোর্টে, নেট থাকছে না, ল্যাপটপ আনিনি, হবে না।

তুই খালাসিটোলায় তো।

এই তুই খালাসিটোলা জানিস ?

জানি, তুই বলেছিস বস, বাড়ি বসে ড্রিংক কর, ওখেনে রোজ ঝামেলা বাঁধে। চন্দ্রা উপদেশ দিল।

আবার ফোন কেটে দেয় সুমন। লোকটা তার ফোনাফোনি শুনছিল। বলল, মিলিয়ে নাও।

চমকে উঠল সুমন। হাঁ করে তাকিয়ে থাকল লোকটার মুখের দিকে। সে তখন মন দিয়ে চাটের লবন জিভে দিয়ে স্বাদ নিচ্ছে। সুমন জিজ্ঞেস করল, তোমার বাড়ি কোথায় ?

হারিয়ে ফেলেছি। হাসল লোকটা।

ঠিকানা জান না ?

ভুলে গেছি।

এখানে কোথা থেকে এলে ?

লোকটা বলল, রাস্তা থেকে, ধরো লেনিন সরনি ধরে সোজা, তারপর ্ডাইনে মুড় আর মনে নেই, বাড়িটার ঠিকানা কী বলো তো ?

সুমন বলল, খালাসিটোলা একটু বাদে বন্ধ হয়ে গেলে যাবে কোথায় ?

পৃথিবীর পথে। বলে লোকটা গুণগুণ করতে থাকে, কানট্রি রোড টেক মি হোম, জানো এই গান ?

সুমন বলল, জানি।


লোকটা বলল, পৃথিবীর আয়ু সীমিত, তোমার বাড়ি কোথায়?

টালায়, জলট্যাঙ্কির গায়ে খেলাতবাবু লেনে।

২৪ ঘন্টা জল, বাড়ি যাও।

একা একা সে বাড়িকে ভূতের বাড়ি লাগে, হানাবাড়ি। বলল সুমন।

সেখানে গিয়ে থাকো, একদিন, খুব সামনেই সেদিন পৃথিবীতে সব বাড়ি ভূতের বাড়ি হবে, আর প্রেতাত্মারাই সেখানে থাকবে শুধু। লোকটা এই কথা বলতে, সুমন একটু চমকেও উঠেছিল। গণেশদার কথার সঙ্গে মিল পাচ্ছে কি? গণেশদা এমনি বলেছিল কি ? গণেশদা ফোনে বলেছিল, আড্ডা, দেখাশোনা সব বন্ধ হয়ে গেল সুমন, আমি এই ভুতুড়ে বাড়িতে একা কার সঙ্গে কথা বলি বল দেখি।

সে একেবারে প্রথম লকডাউনের কথা।মহামারি এসেছিল বসন্তকালে। প্রাতঃভ্রমণও বন্ধ করে দিয়েছিল সরকার। শুধু দরকারে দোকানে যেতে পারবে। দোকানপাটও সীমিত সময়ের জন্য খুলত। গণেশ ত্রিবেদী রাত জেগে লেখে। ঘুমতে যায় কাক ডাকার সময়। রাত না জাগলে তার লেখা হত না। রাতের নিঝুমতাই হরর স্টোরি লেখার পক্ষে উত্তম। তখন কারা যেন ভর করত গণেশ ত্রিবেদীর উপর। কারা যেন লিখে দিত তার লেখা। কম্পিত হতো চিত্ত। কম্পিত চিত্তেই লিখত গণেশ ত্রিবেদী। কম্পিত চিত্ত তার শব্দবন্ধ। তার লেখার ভিতরে এমন ভারি ভারি শব্দ থাকত। তা নাকি লেখার ওজন বাড়াত। গণেশের বাড়ি যাবে নাকি এখন সুমন। বাড়িতে কে আছে ? গণেশদার স্ত্রী লিপি বউদি। মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। থাকে দিল্লি কিংবা মুম্বই। উঠে পড়ল সুমন। বলল, পৃথিবীর আয়ু কম, কিছু কাজ আছে আমার, সেরে ফেলতে হবে।

লোকটা বলল, আমার সব কাজ শেষ, এখন প্রত্যক্ষ করব।

কী করবেন ? ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল সুমন।

লোকটা জবাব দিল না। তখন খালাসিটোলার বালক ওয়েটার এসে জিজ্ঞেস করল, আর একটা পাঁইট দেব গণেশদা,, টাকা দেন।

সে বলল, গণেশ না গ্রেগরি, তোকে বলেছি না ভুল নামে ডাকবি না।

বলতে পারি না। বালক হাসিমুখে বলল।

সুমন বলল, কেন গণেশ নাম খারাপ হবে কেন, সিদ্ধিদাতা গণেশ, গণেশ ত্রিবেদী, হরর রাইটার, কোভিডের সময় প্রেতাত্মারা নিয়ে গেছেন তাঁকে।

গণেশ ত্রিবেদী, এখানে আসতেন ? জিজ্ঞেস করল গ্রেগরি।

না মিঃ গ্রেগরি পেক, বেশ ক’টা শনিবার দেখে ভেবেছি লোকটা কে, এখন বুঝলাম।

গ্রেগরি তো নয়, গ্রেগর সামশা, পড়েছ সেই গল্প ?

তুমি আবার মানুষ হলে কী করে ?

হে হে করে হাসে লোকটা, বলে, আমি টনি গ্রেগ, ভুলে গেছিস।

সে আমার জন্মের আগের কথা, টিভিতে দেখেছি মনে হয়।

পৃথিবীর আয়ু কমে এসেছে, আমি গ্যালিভার বলছি, হরিপদ মুস্তাফি।

সুমন বেরিয়ে এল। বোঝা গেল লোকটা আসলে সব কিছু। থঙ্গরাজ নামে এক সাড়ে ছ’ফুট উচু গোলকিপার ছিল, লোকটা থঙ্গরাজ হতে পারে। সেই বাস্কেটবল প্লেয়ার হতে পারে যে কি না রাস্তায় দাঁড়িয়ে বাসের মাথা থেকে মাল নামাত। লোকটা তাদের বড়জোড়ার হাতিরাম দলুই হতে পারে, দুখানা খাটিয়া লম্বালম্বি লাগত যার শোয়ার জন্য। রামকৃষ্ণ টকিজের একদম শেষ রোয়ে বসত। তাছাড়া তার সিট ছিল না। শালগাছের মতো লম্বা ছিল সে। লোকটা সে-ও হতে পারে। নেশায় চোখ জড়িয়ে গেছে, কুয়াশা লেগে গেছে চোখের সামনে, তাই চিনতে পারছে না।


 
দুই

টনি গ্রেগ কিংবা হাতিরাম দলুইকে ছেড়ে সে খালাসিটোলা থেকে বেরিয়ে পড়ল। পা টলমল করছে। সে বাসে কিংবা ট্রামে শ্যামবাজার চলে যেতে পারে। তারপর হাঁটতে হাঁটতে কালীমন্দিরের পাশ দিয়ে, একটা নমস্কার ঠুকে সোজা হেঁটে আর জি কর হাসপাতালের পাশ দিয়ে ব্রিজে উঠে ব্রিজের কাছিম পিঠের উপরে উঠে আবার নেমে বাঁয়ে ঘুরে খেলাতবাবু লেনে তার আশ্রয়ে পৌঁছতে পারে। কিন্তু তার আগে তাকে যেতে হবে গণেশ ত্রিবেদীর বাড়ি। কোভিডে মৃত গণেশদার বডি হাসপাতাল দেয়নি। গণেশদা কতদিন চলে গেছেন, তাঁর বাড়ি সে একবার যেতে পারত। গিয়ে কী হতো ? গণেশদাকে পেত না তো। গণেশদার স্ত্রীকে সে চেনে না। বেঁচে থাকতে তাঁর বাড়ি একবার গিয়েছিল। তাও আধঘণ্টার জন্য। গণেশদার স্ত্রী সেদিন বাড়ি ছিলেন না। ফলে সাক্ষাৎ হয়নি। গণেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে তার পরিচয় কফিহাউসে। সে বছর পাঁচেক মাত্র। শেষের দু বছর লকডাউন, কোভিডে গেল। তার মানে দেখা হয়েছে তিন বছর মাত্র। কোনো কোনো শনিবার। এক এক শনিবার খালাসিটোলায় দেখা হয়নি যে তা নয়। সত্যি বলতে গেলে খালাসিটোলায় আলাপ। সেখান থেকেই কফিহাউস। তখন শনিবার ছাড়াও সে এসেছে এই টোলায়। সন্ধের পর অফিস ছুটি হতো সেই সময়। দুপুরে ৪৫ মিনিট লাঞ্চ আওয়ার ছিল। লাঞ্চের পর আরামে সিগারেট পান ছিল স্মোকিং জোনে গিয়ে। কত রকম মেয়েরা তখন সেই বিল্ডিঙের নানা অফিসে ছিল। কত রঙের শাড়ি, শালোয়ার, জিন্স টপ, চশমার ফ্রেম। স্মোকিং জোনে সেই সব মেয়েদের কেউ কেউ ধূমপান করতে আসত। হাই বলে হাসত। সেই সব দিন দূর অতীত। সেই সব মেয়েরাও ঘরে বসে কাজ করছে। ঘর থেকে বেরোয় না বলা যায়। তারা কি ঘরে থেকে থেকে ইটচাপা ঘাসের মতো হয়ে গেছে। কোভিড এসে পৃথিবীর সব রূপ শুষে নিয়েছে। এখন সেই সব মেয়েদেরও ছুটি নেই বলতে গেলে। ঘরে বসে কাজ দাও। টার্গেট নামাও। তাদের জিন্স, টপ, রঙিন শাড়ি আলমারির অনেক জামা-কাপড়ের ভিতর হারিয়ে গেছে। সুমন খোঁজ নিয়েছিল, কবে আবার অফিস শুরু হবে ?

অফিস তো চলছে। বসের নিচের বস বলেছিল, এখন এমনিই চলবে, খারাপ লাগছে ?

সন্ধে পেরিয়ে রাত আটটা। তার ভিতরে অফিসের সেই সব কন্যাদের জন্য আবেগ বিপুল হয়ে উঠল। তারাও ঘরে বসে কাজ করছে ? কী কাজ ? ঝাঁটপাট, রান্নাবান্না, বাচ্চাকে পড়ানো, তার ফাঁকে ফাঁকে ল্যাপটপ। কী যে হয়ে গেল সব! গণেশ ত্রিবেদীও মরে গেল। তার ভিতরে এবার

গণেশ ত্রিবেদীর জন্য শোক উথলে উঠল। সে ট্রামে উঠল। বেশ ফাঁকা। হাত পা ছড়িয়ে বসা গেল। পেছনের বগিতেই উঠেছে সুমন। হাতিবাগানে নেমে সেখান থেকে অটো ধরবে। শীতলাতলা লেনে নামলেই কয়েক পা দূরে গণেশদার মঞ্জিল। গুরুধাম। গুরুপদ ত্রিবেদী তাঁর প্রপিতামহ। তিনিই প্রথম কলকাতা আসেন নদীপথে মগরা থেকে। কুন্তি নদী দিয়ে হুগলি নদী। হুগলি নদীর ভাটিতে কলকাতা, আহিরিটোলা ঘাটে নামেন। এসব গণেশ ত্রিবেদীই তাকে বলে গেছে। সেই গ্রুপদ ত্রিবেদীর নামেই গুরু ধাম। কন্ডাকটর বেশ লম্বা। ট্রামের সিলিং পর্যন্ত তার মাথা পৌঁছে গেছে। অভ্যাস হয়ে গেছে, তাই পারে। বসে আছে কন্ডাকটরের সিটে। তাও ঘাড় তুলে দেখতে হয়। কত লম্বা হাত বাড়ালো। একেবারে রান্নাশাল থেকে বাগানে হাত চালিয়ে লেবু তুলে আনার মতো। মানুষ কি ক্রমশ লম্বা হয়ে যাচ্ছে কলকাতায় ? পৃথিবীর আয়ু কমে গেলে কি তা হয় ? মোবাইল বের করে সুমন। টনি গ্রেগ না গ্রেগরি পেক কিংবা গ্রেগর সামসাকে ফোন করবে। কলকাতা কি লম্বা হয়ে যাচ্ছে ? কলকাতা গলে গলে অনেকদূর গড়িয়ে গেছে। কলকাতায় লম্বা লোকের সংখ্যা বেশি ? কবে হলো, কী করে হলো, কেন হলো? সে নিজে কি লম্বা হয়ে গেছে ? এই বয়সে কি লম্বা হয় মানুষ ? ফোন সার্চ করে টনি গ্রেগ কিংবা থঙ্গরাজের নম্বর পায় না। পাবে কী করে, এদের কারো কাছে ফোন নেই। তখন মোবাইল ফোন আবিস্কার হয়নি। ল্যান্ড লাইনই বা ছিল কোথায় ? ইস, কী করে মানুষের জীবন চলত ? কথায় কথায় গুগল ছিল না। মানুষ জানত কম। এই ধরা যাক, কলম্বাসের বাবার নাম কী ? কোনো বইয়ে ছিল না। এখন কি গুগল বলে দেবে। জিজ্ঞেস করলেই হয়, হাই গুগল, হু ইজ দ্য ফাদার অফ ক্রিস্টোফার কলম্বাস। গুগল বলবে, বাবার নাম জেনে হবে কী ? এই যে স্যার, কলম্বাসের বাবার নাম কী?

লম্বু কন্ডাক্টর জিজ্ঞেস করল, কোন কলম্বাস ?

কলম্বাস তো একজনই ছিল ? সুমন জবাব দিল।

কন্ডাক্টর বলল, না অনেক কলম্বাসের কথা আমি জানি, কিন্তু বাপের নাম জেনে কী হবে ?

জানেন না বলুন।

কন্ডাক্টর বলল, আমাদের পাড়ায় এক বুড়ো আছে, এইট্টি আপ, তার নাম কলম্বাস মণ্ডল, সান অফ হ্যারিপদ মণ্ডল।

হরিপদ মণ্ডল ? সুমন জিজ্ঞেস করল।

ইয়েস স্যার, কলম্বাস জেঠু কর্পোরেশনে কাজ করত, সাইকেলে বোরো অফিস যেত। বলতে বলতে কন্ডাক্টর টিংটিংটিং করে বেল বাজায়। ট্রাম থামে। ট্রামে একজন ওঠে। সেও এক লম্বা লোক। বেশ লম্বা। একদম পেছনে গিয়ে বসল। উটের মতো চেয়ে থাকল তাদের দিকে। মনে হলো পুলিশের খোঁচর, এনফোরস্মেন্ট ব্রাঞ্চের কেউ। নজর রাখতে ট্রামে উঠেছে। কলম্বাসের কথা কি নিষিদ্ধ কথা ? লোকটা কি এফ বি আইয়ের গুপ্তচর ? হোকগে। পৃথিবীর আয়ু আর কতদিন? পৃথিবী না থাকলে এফ বি আই কিংবা সি আই এ যাবে কোথায় ? কন্ডাকটর হাত বাড়াল তার সিটে বসে। নতুন যাত্রীও হাত বাড়াল। লম্বা হাত ট্রামের অর্ধেক অর্ধেক অতিক্রম করল। রঙে চোবানো ব্রাশ ক্যানভাসে টেনে টেনে সব বড় করা। ঘড়িটিও লম্বা রবারের মতো হয়ে গেছে। হ্যাঁ নতুন যাত্রীর কব্জিতে একটি লম্বা ঘড়ি। সুমন জিজ্ঞেস করল, দাদা, কটা বাজে?

লোকটা বলল, কিন্তু কী বলল, বুঝতে পারল না সুমন। লম্বা সময়। কত লম্বা। জাতীয় মহাসড়ক যত লম্বা, ততো হবে? কলকাতার এমন কোনো রাস্তা নেই যে অত সময় ধরতে পারবে। রাস্তার সঙ্গে সময়ের সম্পর্ক কী ? কত পথ যেতে কত সময় লাগবে। ট্রামে সব চেয়ে বেশি সময় নেয়। লাইন ছাড়া চলতে পারবে না। কন্ডাকটর আবার থিতু হয়েছে টিকিট বিক্রি করে। টিকিট বেচাই তার কাজ। ওয়ার্ক ফ্রম হোম হবে না। কন্ডাকটর কথা শুরু করল আবার, নামবেন কোথায় ?

‘হাতিবাগান’ বলে সুমন জিজ্ঞেস করল, কলম্বাস জেঠুর কী হলো ?

কন্ডাক্টর চমকে উঠল, বলল, কিছু হয়নি তো, পিছনে আমেরিকা, কী হবে ?

আমেরিকা জানে কলম্বাস কলকাতায় থাকে ?

ইয়েস, রাষ্ট্রদূত একবার কেক পাঠিয়েছিল, আমেরিকার পাঁচশো বছর হলো, সেই সময়।

তারপর ? সুমন জিজ্ঞেস করল মাথা এগিয়ে দিয়ে।

জেঠু বলে বার্ধক্য ভাতা দেয় ইউ এস এ, ব্যাঙ্কে জমা পড়ে।

তারপর কী হলো ?

কন্ডাকটর বলল, জেঠু আমেরিকার গল্প বলে তার বাড়ির রোয়াকে বসে, একদিন আসবেন, শুনে যাবেন, আমেরিকার রাস্তায় হরিণ ঘুরে বেড়ায়, কচ্ছপ আর খরগোসের রেস হয়, কচ্ছপ সব বার জিতে যায়, খরগোস জেনেও শিক্ষা নেয় না।

সুমন ভাবতে থাকে আমেরিকার রাস্তার কথা। কচ্ছপ আর খরগোসের লেন আলাদা করা আছে। তারা সবদিনই রেস দেয়। হ্যালো কন্ডাকটরদাদা, আপনার নাম ?

আঁজ্ঞে কলম্বাস সরকার।

কলম্বাস ! আপনার নামও কলম্বাস, আপনার জেঠুর নামও কলম্বাস ?

ইয়েস স্যার, আমাদের পাড়ায় অনেক কলম্বাস আছে, ছোট কলম্বাস, বড় কলম্বাস, বেঁটে কলম্বাস, লম্বু কলম্বাস, মোটা কলম্বাস, রোগা কলম্বাস, সকলেই বলে সে-ই সাচ্চা কলম্বাস।

আপনার পাড়া কোথায় ? সুমন জিজ্ঞেস করে।

আঁজ্ঞে কলম্বাস স্ট্রিট, কলকাতা বিয়াল্লিশ।

কী ভাবে যেতে হবে ?

বাসে যেতে পারেন, তিন হাজার এক তিরিশ নম্বর বাস, ধর্মতলা থেকে পাবেন।

আপনার নম্বরটা দেবেন ? সুমন তার মোবাইল বের করল নোট করবে বলে। কন্ডাকটর হেসে বলল, আমাদের কোনো মোবাইল নম্বর নেই, কলম্বাসের তা থাকে না, তখন ছিল পায়রা।

উটের মতো গলা তুলে সেই প্যাসেঞ্জার তাদের কথাবার্তা গিলছিল, বলল, আমার নম্বর আছে, নেবেন স্যার।

কী হবে নিয়ে ? সুমন বলল।

আমাকে ফোন করবেন মনে পড়লে।

ফোনে কী কথা বলব ?

যা ইচ্ছে তাই, কলম্বাসের খবর। লোকটা হেসে বলল।

সুমন বলল, বলুন, কোন নামে সেভ করব।

যা মনে হয় করবেন, লোকটা ফোন নম্বর বলতে লাগল। লম্বা নম্বর, শেষই হয় না। ট্রাম হাতিবাগান ক্রশিঙে এসে পৌঁছেছে। লম্বা গাড়ির সার। লাল আলো জ্বলেই রয়েছে। লম্বা লাল আলো। এত লম্বা যে শেষই হয় না। শেষই হয় না। কত সময় লাগে একটা ফোন নম্বর বলতে? লম্বা, লম্বা সময়। গলে গলে কত বড় হয়ে যাচ্ছে। সময় গড়িয়ে যাচ্ছে রক্তের মতো। সুমন নেমে পড়ল ট্রাম থেকে। মানে কন্ডাক্টর কলম্বাস সরকার তাকে, হাতিবাগান, হাতিবাগান করতে করতে নামিয়ে দিল। কিন্তু সেই লোকটার ফোন নম্বর বলা তখনো শেষ হয়নি। লম্বা নম্বর বলা থামছেই না। সারা হাতিবাগান জুড়ে নাইন এইট নাইন ফোর, নাইন টু… বলা চলতেই থাকে। প্রাইভেট গাড়ি, ট্যাক্সি, মিনি, বাস, ট্রামের আওয়াজ, হর্ন, ঘন্টি বাজতেই থাকে। সুমন হাতিবাগান মোড়ে দাঁড়ায় শোভাবাজারের অটোর জন্য। অটো আসছে আওয়াজ তুলতে তুলতে দেহ বাঁকিয়ে বাঁকিয়ে।


তিন

অটো ড্রাইভার বলল, শীতলাতলা লেন যাব না, আগের স্টপেজ হরিতলা বাইলেন পর্যন্ত।

হরিতলা বাইলেন থেকে যাব কী করে? সুমন জিজ্ঞেস করল।

অটোওলা বলল, পদব্রজে স্যার, সামান্য সময়, কয়েক মিনিট।

সুমন উঠল। আজ সে গণেশ ত্রিবেদীর বাড়ি যাবেই যাবে। গণেশদা, গণেশদা, আমি সুমন।

গণেশদা বেরিয়ে এসে বলবে, আমি তো নেই রে সুমন।

তাহলে করব কী ? সুমন জিজ্ঞেস করল।

বাড়ি গিয়ে ওয়ার্ক ফ্রম হোম।

ধুর নিকুচি করেছে, আজ শনিবার, আজ কফিহাউস কিংবা খালাসিটোলার দিন।

আমি তো নেইরে সুমন, তুই তাহলে ঘরে বস, বহুদিন বাদে এলি। বলে গণেশদা ধীরে ধীরে ভিতরে মিলিয়ে গেল। পড়ে থাকল তার কথাটা। সুমন জিজ্ঞেস করল, হ্যাঁ, ভাই, তুমি গণেশদাকে চেন, গণেশ ত্রিবেদী ?

চিনি, ঢ্যাঙা মতো, রাত্তিরেও গগলস পরে।

গগলস না চশমা।

মনে হয় গগলস, না গগলসই, রাতের বেলা তাতে নাকি সব দিনের আলোর মতো পস্কার হয়ে যায়। অটোওলা বলছিল আর মাথা বের করে দেখছিল প্যাসেঞ্জার আসে কি না। চারজনের সিটে একজন বসে আছে। আর তিনজন তো চাই। নিদেন পক্ষে দু’জন। না হলে পড়তায় পোষাবে না। অটোওলা বলল, উনি আজকেও ফিরেছে।

ফিরেছে ? সুমন অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।

ইয়েস স্যার আগের ট্রিপে, পুরোটায় তিনি একা, সব ক’টা সিটের ভাড়া দিল তিনি।

গগলস পরা ? সুমন জিজ্ঞেস করল। গণেশদা আগেও গগলস পরত, এখনো পরে। হরর লেখককে অমনি হতে হয়। দেখেই যেন মনে হয় রহস্যময়। অলৌকিক। অপার্থিব।

ইয়েস, সেই সঙ্গে মাস্ক, আমাকে বলল মাস্ক পরতে, পরলাম, মানে উপরে তুলে দিলাম নাক অবধি, তাঁর খুব তাড়া ছিল, তাই একা গেলেন।

তোমার নাম কী ভাই ? সুমন জিজ্ঞেস করল।

আঁজ্ঞে আমি হরিদাস মোদক।

হরিদাস মোদক, শ্যামবাজারে তোমার নামে দোকান আছে ?

ইয়েস স্যার, আছে, রাস্তাও আছে আমার নামে, হরিতলা লেন, হরিতলায় আমার জন্ম। অটোওলা হরিদাস বলল।

সুমন বলল, তোমার নাম ইন্ডিয়া বর্ডারে আছে, হরিদাসপুর।

শুনেছি স্যার, যাইনি, হরিতলা, শোভাবাজার, আহিরিটোলা, ফের খান্না, বিধান নগর, এই আমার রুটিন ভ্রমণ, দীঘা গিয়েছি দু’বার।

সুমন বলল, আজই ফিরেছেন ত্রিবেদীদা ?

আজই হবে তো, রোজই যান, আর আজ শনিবার, আজ তো যাবেনই।

সুমন জিজ্ঞেস করল, তিনিই তো?

হ্যাঁ স্যার, শীতলাতলা লেনে থাকেন।

গুরুধাম বাড়ির নাম ? সুমন জিজ্ঞেস করে।

হতে পারে স্যার, সব গায়ে গায়ে বাড়ি, কোনটা কার বাড়ি বোঝাই যায় না, একজন অন্য জনের বাড়িতে ঢুকে পড়ে, একজন আর একজনের বাড়ি থেকে বের হয়।

সেটা কী করে হয় ? সুমন জিজ্ঞেস করল।

তা তো জানি না স্যার।

সুমন জিজ্ঞেস করল, কখন ছাড়বে ?

দেখছি প্যাসেঞ্জার যদি হয়।

আমি যদি সব ভাড়া দিই ?

তাহলে আর কী। বলেই অটো স্টার্ট করল। ভুটভুট ভুটভুট শব্দ হতে লাগল। আর তখনই একজন ছুটে আসতে লাগল, এই অটো, অটো।

অটোওলা হরিদাস দাঁড়াল, বলল, উনি থিয়েটার করেন, বহুতদিন বন্ধ ছিল, আবার দিদি বেরিয়েছেন।

হুঁ, ওয়ার্ক ফ্রম হোম হয় না, থিয়েটার তো।

হয় না ? হরিদাস জিজ্ঞেস করতে করতে তিনি এসে উঠলেন, হ্যারিদা, উফ, তুমি।

আমি কিন্তু হ্যারিতলা পর্যন্ত যাব।

ঠিক আছে চলো, বাকিটা হেঁটে চলে যাব।

হরিদাস বলল, দিদি ইনিও যাবেন শীতলাতলায় ত্রিবেদী বাড়ি।

আচ্ছা, কোন ত্রিবেদী ?

গণেশ শুনে দিদি বললেন, কার্ত্তিকদাকে চিনি, থিয়েটারে সেট করেন, তবে এখন সল্টলেকে থাকেন।

চুপ করে থাকল সুমন। তাদের মাঝখানে একটুখানি শূন্যতা। ওখানে একজন প্যাসেঞ্জার আসার কথা। আসেনি। হয়ত তিনি গণেশপদা কিংবা গ্রেগর সামসা। অটো চলল। দিদির বয়স বছর তিরিশ। হৃষ্টপুষ্ট তিনি। কলকল করেন। জিন্স আর শারট পরেন, কিন্তু এখন শাড়ি আর গায়ে চাদর। চাদর তুলে মাথা ঢাকা। শীতের সময় তো। গলায় একটা স্কারফ আছে নিশ্চয়। গলায় ঠান্ডা না লাগে যেন। সুমন বলল, ইনি মানে গণেশ ত্রিবেদী একজন লেখক।

আচ্ছা, হতে পারে, আমাদের ওখানে এত রকম মানুষ থাকে, ত্রিবেদী লেখক নিশ্চয় থাকেন।

তিনি মাস্কে মুখ ঢেকেছেন। কন্ঠস্বর খুব ভালো। কানের কাছে যেন বেজে যায়, বসন্ত এসে গেছে। বসন্তের এখন অনেক দেরি। সুমন জিজ্ঞেস করল, আপনি কোন দলে আছেন ?

পার্টি, পার্টি আমি করি না।

না না থিয়েটারের কথা বলছিলাম, যেমন বীনাপানি অপেরা, মা কমলা অপেরা।

মেয়ে খিলখিল করে হাসল, হাসির লহরে মুখ থেকে মুক্ত বিমুক্ত হলো, বলল, আরে না না, আমি গ্রুপ থিয়েটার করি, যাত্রা না, আমার দলের নাম মুক্তধারা।

কবে হবে নাটক ? সুমন জিজ্ঞেস করে। অনেকদিন বাদে, হ্যালো হাইয়ের গন্ধ পাচ্ছে যেন, কোভিড কালে পৃথিবীর সমস্ত সুন্দরী নারী বিলুপ্ত হয়ে গেছে মনে হয় তার। এ ফিরে এসেছে সেই নির্বাসন থেকে।

তিনি বিমর্ষ গলায় বললেন, দল বসে গেছে, অভীকদা নেই।

নেই মানে ? আবার দুঃখ এসে ঘাই মারল।

কোভিড কেড়ে নিল, তিনি নির্দেশক ছিলেন, ইয়াং ম্যান অফ ফোরটি, অভীকদা চলে যেতে আমার আর ইচ্ছেই করছে না থিয়েটার করতে।

আপনার নাম ?

ঐশী, ঐশী বসু, একটা নাটকের কথা ভাবা হচ্ছে, কিন্তু ভেবে কী হবে, সব ভুলভাল হয়ে যাচ্ছে।

অটো ছুটতে ছুটতে দাঁড়ায় শোভাবাজার মোড়ে। বড় সিগনাল। একটা সবুজে পার হতে পারবে কি না সন্দেহ। ঐশী বসু জিজ্ঞেস করল, আপনি কি থিয়েটার করেন ?

না, করি না। জবাব দিল সুমন, ওয়ার্ক ফ্রম হোম।

আপনাদের চিন্তা নেই, ঘরে বসে কাজ, আমাদের তা হবে না। বিমর্ষ গলায় বলল ঐশী।

সুমন চুপ করে থাকে। দিদিমণি মাস্ক খুলতে খুলতে বললেন, আবার আসবে ঢেউ ?

জানি না। সুমন অস্ফুট গলায় জবাব দিল, আরো মৃদু গলায় বলল, পৃথিবীর আয়ু ফুরিয়ে এসেছে।

তা বললে হবে, আমরা জীবন আরম্ভ করলাম সবে, আয়ু ফুরোলে হবে!

জানি না, তিনি বললেন কি না।

যিনিই বলুন ঠিক বলেননি, ভয় দেখাতে নেই, যদি মহামারি ফিরে আসে, আবার ঘরে বসে যেতে হবে, অভীকদা কিছুই মানত না, মহামারি নিয়ে নাটক নামাবে বলছিল, শুটিং করছিল সিরিয়ালের, কী থেকে যে কী হয়ে গেল!

আমাদের গণেশদাও অনেকটা এমনি। বলতে গেল সুমন। কিন্তু তখন সিগন্যাল সবুজ হয়েছে। সমস্ত গাড়ি একসঙ্গে হর্ন দিতে আরম্ভ করেছে, ইঞ্জিন গরগর করতে আরম্ভ করেছে। তার কথা চাপা পড়ে গেল এসবের ভিতরে। তাদের অটো রাস্তা পার হয়ে থেমে গেল আচমকা। ড্রাইভার হরিদাস এটা ওটা করতে লাগল। তারপর বলল, যাবে না, আপনারা অন্য গাড়িতে যান দাদা, ভাড়া দিতে হবে না।

দু’জনে নেমে দাঁড়ায়। ঐশী বলল, আপনাকে তো আগে দেখিনি এই রুটে, আমাদের এলাকায়।

আমি খেলাতবাবু লেনে থাকি, টালার ট্যাঙ্কের ঠিক পিছনে। বুঝিয়ে দিল সুমন।

তাহলে এদিকে কেন ? ঐশী জেরা করতে থাকে শান্ত গলায়।

কেন এদিকে ঘুরতে আসা যায় না ?

খিলখিল করে মুক্তঝরা হাসি হাসল মেয়ে, বলল, ওরে মা, শীতলাতলায় কেউ ঘুরতে আসে, মা শীতলার মন্দিরে দিবারাত্র ঢং ঢং, ঘন্টা কাঁসি বাজছে।

সুমন দেখল ঐশীকে। লম্বা নয়। মাপে মাপে উচ্চতা। দোহারা গড়ন। মানে রোগা নয়, আবার মোটাও নয়। জ্বলজ্বলে চোখ। মুখখানি লম্বাটে। হাসিতে ভরা। বলল, চলুন হাঁটি, মিনিট পনের লাগবে, তার কম ও হতে পারে, ভালোই হলো, আজ হাঁটা হলো কই, বাড়ি বসে বসে মুটিয়ে যাচ্ছি, জিমে যাওয়া আবার শুরু করেছি।

আপনি গণেশ ত্রিবেদীর লেখা পড়েননি ?

কী বই বলুন দেখি? ঐশী জিজ্ঞেস করল।

বই, রোমাঞ্চ, থ্রিলার, ভয়ের, প্রেতাত্মা, দুরাত্মা সব তাঁর লেখায় আসে, গা ছমছম করবে, ঘুমের ভিতরে প্রেতাত্মা আসা যাওয়া করবে, ইন ফ্যাক্ট…। সুমন প্রেতাত্মার প্রতিশোধের কথা বলল।

ঐশী বলল, আমি পড়িনি, আমাদের মেজকাকা বলতে পারে, মেজকাকা খুব পড়ে ওসব।

আপনি পড়েন না, এত যে ছুটি গেল, করলেন কী ?

মেয়ে বলল, ছুটি কই, ছুটি হলে তো আমরা বন্ধুরা মিলে শান্তিনিকেতন যেতাম, টাকি যেতাম, বরন্তি লেক, টিলাবনি পাহাড় যেতাম, যেতে পারিনি তো, আসলে আমরা বন্দি ছিলাম, পৃথিবীটা একটা জেলখানা হয়ে উঠেছিল।

সুমন বলল, আমি মাঝে দু’বার বড়জোড়া গিয়েছি।

সেখানে কী ?

জঙ্গল আছে, জঙ্গলে হাতির পাল, বাঁকুড়া। সুমন বলে।

খুব যেতে ইচ্ছে করে, কিন্তু থিয়েটার যদি না হয়, যেতে মন চায় না, কী যেন বলছিলেন, পড়িনি কেন ?

না কিছু বলছি না। সুমন এড়িয়ে গেল।

তারা হাঁটতে হাঁটতে কথা বলছিল। সুমন দূরত্ব রেখে হাঁটছিল। ঐশী দূরত্ব কমিয়ে আনছিল। হঠাৎ বলল, আপনি ওসব ছেড়ে দেন।

কী ছেড়ে দেব ? সুমন অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।

ওয়ার্ক ফ্রম হোম, আমাদের থিয়েটারে আসুন।

হাসল সুমন, বলল, আমার শনিবার ছাড়া ছুটি নেই।

চাকরি ত্যাগ করে আসুন, আমাদের হিরো পাচ্ছি না, আমি ডিরেক্ট করছি, আমার প্রথম কাজ, আমি দেখিয়ে দেব কেমন থিয়েটার বুঝি।

সুমন বলল, আমি অভিনয় করিনি কোনোদিন।

হয়ে যাবে, হয়ে যাবে, দেখবেন আপনিই হিরো হয়ে যাবেন একদিন।

তা হয় না, আমার চলবে কী করে ?

সব ব্যবস্থা হবে, আপনি আগামীকাল বিকেলে চলে আসুন, কার্ড রাখুন, সব আছে, ঠিকানা, ফোন নম্বর, আপনি অপুর চরিত্রে অভিনয় করবেন।

কে অপু ?

অপরাজিতর অপু, আমরা নতুন করে নামাচ্ছি, স্ক্রিপ্ট অভীকদা, আপনি তাঁর পরিবর্তে অপু।

প্রক্সি দিতে হবে ?

না, আপনিই অপু, প্লিজ আসুন, আপনার নম্বর দিন।

শীতলাতলা এসে গেছে। মেয়ে বলল, আপনি ডানদিকে যান, পরপর ত্রিবেদী বাড়ি, কত নম্বর ?

আঁজ্ঞে নম্বর জানি না, কিন্তু চিনি, চৈতন্য সুইটসের উল্টোদিকে, লাল রঙের বাড়ি।

মেয়ে বলল, ওদিকে অনেকদিন যাই না, আগে নাচ শিখতে যেতাম, আপনি যান, পেয়ে যাবেন, গণেশ ত্রিবেদী, একজন মারা গেছে ত্রিবেদী, কোভিডে, তিনি নয় তো ?

হ্যাঁ তিনি। সুমন বলল, গণেশদা মারা যেতে ফেসবুকে ঝড় উঠেছিল।

তবে যে তাঁর কাছে ?

মৃত্যুর পর আসিনি।

যান, বাড়িটা দেখে আসুন, মেজকাকা, ও মেজকাকা, শুনবে ?

সুমন অবাক হয়ে দেখল মস্ত লম্বা একটি লোক এগিয়ে আসছে। অমিতাভ বচ্চন কিংবা টনি গ্রেগ। নাকের নিচে মোটা গোঁফ। জ্যাকেট আর চেক পায়জামা, মাথায় মাফলার জড়ানো। তিনি ঐশীর ডাকে এগিয়ে এলেন, জিজ্ঞেস করলেন, ইনি কে, সেই অভীক ?

উফ মেজকাকা, সে নেই, সে আসবে কী করে, ইনি সুমন, ইনি তোমার লেখক গণেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। বলে সুমনকে মেজকাকার হাতে দিয়ে ঐশী চলল বাড়ির দিকে। মেজকাকা সিগারেট ধরাল। সুমনকে খুঁটিয়ে দেখতে দেখতে জিজ্ঞেস করল, মামনের সঙ্গে পরিচয় হলো কবে ?



চার

সুমন বলল, আপনার নাম মেজকাকা ?


পলয়, প্রলয় মণ্ডল, নামে কী হবে ? গম্ভীর গলায় লোকটি বলল।

গণেশদা সত্যিই মরে গেছে ?

আপনি জানেন না ?

জানব কী করে, লকডাউনে কত কথা শোনা যাচ্ছিল, সত্যি, মিথ্যে, বানানো, ভেজাল দেওয়া খবর, অটোর ড্রাইভার হরিদাস মোদক বলল, আগের ট্রিপে ফিরেছে বাড়ি।

মেজকাকা প্রলয় বসু বলল, হরিদাস খুব মিথ্যে কথা বলে, হয়ত দু’বছর আগের কথা বলেছে, এই শুনুন, আমি গিয়েছিলাম তারাপীঠ, কৌশিকী অমাবস্যা ছিল, রটে গেল আমার কোভিড হয়েছে, আমি হাসপাতালে, চারদিন আমাদের বাড়ি বাঁশ দিয়ে বন্ধ, ্পরিত্যাগ করল সকলে, শেষে আমি ফিরতে তবে সকলে বলল, ভুল হয়েছে, চোদ্দদিন হবিষ্যি করো, ঘর থেকে বেরুবে না, রটিয়েছিল নাকি অটো হরিদাস।

গণেশদার এমন হতে পারে ? উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করল সুমন।

হতে পারে, নাও পারে, লোকটাকে আর দেখি না, পুষ্প হত্যা রহস্য লাস্ট বই, তারপরে আর বেরোয়নি।

আপনি খোঁজ নেননি, পাড়ার লেখক। সুমন বিস্মিত হলো, আপনার ফেবারিট রাইটার।

কী করে জানব উনি পাড়ার লেখক, লেখার ভিতরে শুধু জঙ্গল, পোড়োবাড়ি, রক্তখাকি ডাকিনী, যোগিনী, খুব রহস্যময় রাইটার, তুকতাক জানে শুনেছিলাম, তন্ত্রমন্ত্র, এদিকে থাকে কানাঘুষো শুনেছিলাম, কিন্তু হাবিজাবি, ভুল্ভাল কিছু হয়ে গেলে সব্বোনাশ হয়ে যাবে, তাই বই পড়েই ক্ষান্ত দিয়েছি। মেজকাকা বলতে বলতে চলল।

একটা স্রু গলির ভিতর দিয়ে শর্টকাট করল তারা। গলিটা অন্ধকার। দুপাশে বাড়ির দেওয়াল। মানুষ ছাড়া কেউ এ পথে যেতে পারবে না, পিছনে পিছনে যেতে হবে, সামনে কেউ এসে গেলে দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়াতে হবে। মেজকাকা প্রলয় বলল, কর্পোরেশনের কিছু করার নেই এই গলিতে, আলোও লাগাতে পারেনি, পোস্ট বসালে রাস্তা আটকে যাবে কিছুটা, দুই পারে দুই আলো, দেওয়ালে কেউ আলো লাগাতে দেয়নি, খুব হিংসুটে বাড়ি সব।

সুমন বলল, গলি দিয়ে যাতায়াত বন্ধ করতে চেষ্টা করেনি ?

করেছিল, কিন্তু এক পক্ষ বিগড়ে বসল, বলল, লাভ কী হবে তাতে।

আমাদের গাঁয়ে হলে রক্তারক্তি হয়ে যেত, লাশ পড়ে যেত, মামলা বছরের পর বছর চলত।

আহা, আমাদের এখেনে কেন এমন হয় না। মেজকাকা বলল।

মামলা করা ভালো বলছেন ? সুমন জিজ্ঞেস করে।

ভালো মন্দ জানি না, হলে দেখা যেত, আরে বইয়ে যে তন্ত্রমন্ত্র থাকে, তা কেন চোখে দেখতে পাই না, রক্তমুখী নীলা কোথায় পাওয়া যায় জানেন ? মেজকাকা প্রলয় জিজ্ঞেস করল।

সুমন জবাব দিল না। এদিকে গলি শেষ। শেষ হতেই চওড়া রাস্তা। রাস্তার ওপারে জ্বলজ্বল করছে চৈতন্য সুইটস। সে প্রলয়ের সঙ্গে রাস্তা পার হয়ে চৈতন্য সুইটস বাম দিকে রেখে সমুখে কোণাকুণি তাকায়। ক্ষুধিত পাষাণ দাঁড়িয়ে আছে। সামনে বুলডোজার। মেজকাকা প্রলয় বলল, কোন বাড়িটা বলুন তো, দাঁড়ান জিজ্ঞেস করছি, অ্যাই রঘু, গণেশ ত্রিবেদীর বাড়ি কোনটা ?

সুমনই উত্তর দেয়, ঐ দেখা যাচ্ছে, ভেঙে পড়ার জন্য রেডি, বুলডোজার এসে গেছে, চাকা গড়ালেই হলো, তাহলে প্রমোটার নিতে পারল শেষ পর্যন্ত!

বছর কুড়ির রঘু বলল, ফ্ল্যাট দরকার হলে সকালে আসতে হবে, আমি প্ল্যান দেখিয়ে দেব, এখন বুকিঙে টেন পারসেন্ট ছাড়, সেটা কম কিছু নয়, নো প্রফিট প্রোজেক্ট এইটা।

কী দেখাবি, বুলডোজার পর্যন্ত হাজির, স্যার এই বাড়ির কথা বলছেন তো, আরে রঘু, চিরকাল মূর্খ হয়ে থাকবি, লেখকের বাড়ি, কত স্মৃতি, সব লোপাট করে দিবি, আমি আগে জানলে চিফ মিনিস্টারের কাছে চিঠি লিখতাম, গণেশ ত্রিবেদীর সব চলে গেল।

তুমি কি দ্যাখনি মেজকাকা, এই তো পরশু একটা খদ্দের নিয়ে এলে ফ্ল্যাটের, হানাবাড়ি ঘুরিয়ে দেখালে, এখন উলটো গাইছ ?

প্রলয় বলল, আরে, তখন কি জানতাম এইটাই গণেশ ত্রিবেদীর বাড়ি।

সুমন বলল, গুরুধাম।

গুরুধাম, হ্যাঁ গুরুধাম, গুরুধাম যে গণেশ ত্রিবেদীর বাড়ি তা জানব কীভাবে, আমি তো পুষ্প হত্যাকাণ্ডর পরের অংশর জন্য ওয়েট করছি, পুষ্পর প্রেতাত্মা কীভাবে শোধ নিল সেই কাহিনি আসবে, তাই বলি, বই আসে না কেন লাইব্রেরিতে ? মেজকাকা বলল অনেক সংশয় নিয়ে।

লাইব্রেরি খোলা ? সুমন জিজ্ঞেস করল।

না খোলা নেই, আমি খুলি আর বন্ধ করি, কলেজ স্ট্রিট যাই, কিন্তু নতুন বই কোথায়, দোকান বলে, ‘নেই, গণেশ ত্রিবেদী আর লিখছে না’। মেজকাকা বলল।

সুমন বলল, আর হবে না মনে হয়, আর বই বেরবে না গণেশ ত্রিবেদীর।

কেন হবে না স্যার, গণেশ ত্রিবেদীর নামে একজন লিখে যায় যদি? মেজকাকা বলল, বইয়ে গণেশ স্যারের নাম থাকলেই হবে, তাতেই এক থালা ভাত, গন্ধরাজ লেবু পাতা আর শুকনো লঙ্কা পোড়া হলেই চলবে।

আপনি বলছেন ? সুমন অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে।

ইয়েস স্যার, কে খোঁজ করবে লেখক সন্ন্যসী হয়ে গেছে না মরে গেছে, গণেশ ত্রিবেদী চলতে থাকুক, আমি আজ রাতেই চিঠি লিখব পাবলিশারের কাছে। বলে মেজকাকা সিগারেট ধরায় আবার, ধোঁয়া ছেড়ে বলে, গণেশের নামেই চলবে স্যার, দরকারে আমি লিখব, কিন্তু গণেশ ত্রিবেদীর নতুন বই বন্ধ করা যাবে না, পুষ্পর পরের কাহিনি বের করতেই হবে, কালই যাব ভূতুড়ে গলি, আরামচাঁদ লেনে, সেখানে রহস্যকুঠী পাবলিশার।

মেজকাকা লোকটা খুব বকে। ডেকরেটরের ব্যবসা আছে। আর ছিল ট্যুরিজম কোম্পানির চাকরি। কিন্তু করোনা এসে সব বন্ধ। ডেকরেটরের অর্ডার নেই, গোডাউনে সব পড়ে আছে, গোডাউন আর রাখতে চায় না মালিক, বলছে ছেড়ে দিতে, টেবিল চেয়ার তেরপল, সামিয়ানা, শাদা, নীল, হলুদ কাপড়, সিল্কের পর্দা নিয়ে রাখবে কোথায় মেজকাকা ?

সুমন বলল, পৃথিবীর আয়ু ফুরিয়ে এসেছে।

কী বললেন, পৃথিবীর আয়ু।

একজন বলল তাই।

মেজকাকা বলল, এখন এই রকম অনেক কথা শোনা যাচ্ছে, কেউ বলছে পৃথিবীর আয়ু, কেউ বলছে মানুষের আয়ু, কেউ বলছে এমন বৃষ্টি হবে, যে সব ডুবে যাবে, গঙ্গার জল আহিরিটোলা ঘাট ছাপিয়ে কলকাতা ভাসিয়ে দেবে।

কে বলে ? সুমন জিজ্ঞেস করল।

কতজন বলে, সারাদিন এইসব চলে, খুন জখম ধর্ষণ, অবিরাম বৃষ্টি, অবিরাম খরা, আকাশ থেকে তারা খসে যাওয়া, পৃথিবীর আয়ু, সব।

সুমন বলল, নিশ্চয় গণেশ ত্রিবেদীর স্ত্রী লিপি বউদি অনুমতি দিয়েছেন, তাই বাড়ি প্রোমোটারের কাছে গেল, তিনি কোথায় আছেন কেউ জানে?

অ্যাই রঘু, উনি ত্রিবেদী স্যারের বন্ধু, ত্রিবেদী স্যারের মিসেস কোথায় গেলেন, বাড়িতে তিনি থাকতেন তো।

রঘু বলল, তিনি যেখানেই থাকুন, ঠিকানা দেওয়া বারণ।

সুমন চুপ করে থাকে। মেজকাকা তক্কে মেতেছে রঘুর সঙ্গে। ত্রিবেদী স্যারের বই কত লোক পড়ে, তিনি চলে গেছেন বলে তাঁর মিসেস অ্যাবস্কন্ড করবেন, তা হয় না। স্যার বেঁচে থাকবেনই। তাঁর বই বেরোবেই, আচ্ছা রঘু, তুই ফ্ল্যাট বানাচ্ছিস বটে, কিন্তু সেই বাড়ি ভূতের বাড়ি হবে সিওর, কেউ থাকবে না, সবাই কিনে রাখবে, ঘরে ঘরে ভূতের চাষ হবে।

ফালতু কথা বলো না মেজকাকা, সন্ধেয় চড়িয়েছ, কত টাকার প্রোজেক্ট জানো, নিচে গারমেন্টস শোরুম, সব ব্র্যান্ডেড ড্রেস, পাবলিক খাক না খাক, ড্রেস দেবে এমন যে তুমি বুঝতেই পারবে না সে আম্বানি না জাম্বানির বেটা না বেটি।

আমার মনে হয় তোরা বাড়ি নেওয়ার জন্য গণেশ ত্রিবেদী স্যারকে সরিয়ে দিলি রঘু, কোভিড হলো সোজা উপায়, কেউ ভয়ে চারপাশ মাড়াবে না, কেউ দেখতেও যাবে না সত্যি মরেছে কি না, লেকিন ইয়ে নেহি হো সকতা। মেজকাকা তার প্রিয় লেখকের মৃত্যু সংবাদে ব্যথিত।

আরে কাকা, বসো বসো, লেখক কি আর নেই, অনেক আছে, সব পাবে, গণেশ ত্রিবেদীর বই তাঁর মিসেসই লিখত শুনেছি। রঘু বলল।

তুই জানিস, তুই পড়েছিস ? রুখে গেল মেজকাকা।

শুনেছি, এসব নিয়ে ফেসবুকে লেখা হয়েছে, তুমি কি ফেসবুক করো? রঘু জিজ্ঞেস করল।

মেজকাকা বলল, করেছিলাম, কিন্তু কোম্পানি তা নষ্ট করে দিয়েছে।

কী করেছিলে, ফিমেল কেস ?

আমি নাকি দু’হাজার মেয়েকে রিকোয়েস্ট দিয়েছিলাম, তারা বিরক্ত হয়ে রিপোরট করে আমাকে ভাগিয়ে দিয়েছে, আমিও আর ফেসবুক করিনি, শালা বড় বড় কথা আর কথা।

রঘু এবার সুমনকে জিজ্ঞেস করল, তুমি কি ফ্ল্যাট কিনবে কাকা ?

আমি গণেশ ত্রিবেদীর কাছে এসেছিলাম, বাড়িটা ভেঙে দেবে সে মরে যেতে ? সুমনের গলায় ক্ষোভ।

ভাঙব না কী করব, মিসেস, মানে জেঠিমা বলল, এই বাড়িতে তিনি থাকবেন না, বাপের বাড়ির অংশ পেয়েছেন, বাড়িতে ভূতের উপদ্রব বেড়ে গেছে, ভাঙতে হবেই।

সুমন বলল, আপনারা দেখেছিলেন ভূত ?

দেখলেও বলব না স্যার, ফ্ল্যাট বিক্রি হবে না।

মেজকাকা বলল, কিন্তু এটা যে গণেশ ত্রিবেদীর বাড়ি, তা জানলে আমি হরিদ্বারের সাধু এনে যজ্ঞ করাতাম, তাতে ভূত নিকেশ হতো, গণেশ স্যারের মিসেস আমাকে বললে, আমিই ব্যবস্থা করতাম, আমাদের পাড়ার গৌরব ধূলিতস্যাত হয়ে গেল, আমি হরর মিউজিয়ম করতাম এখেনে/

ও মেজকাকা, তুমি ভয়ে তারাপীঠ পালালে, ফিরেও এলে না একবার, তখন কত লোক পরপর মারা গেল। রঘু বলল রাগ করে, ফ্ল্যাটবাড়িটা হতে দাও, পাড়া চিনতে পারবে না, এমন ডিজাইন করা হয়েছে, পাবলিক বাড়ি দেখতেই ভীড় করবে মেজকাকা।

হাবিজাবি কথা চলতে লাগল। সুমন ভাবল এবার যাওয়া উচিত। সে হাত নেড়ে একটা অটো পেয়ে গেল বিবেকানন্দ রোড পর্যন্ত। উঠে পড়ল মেজকাকা আর রঘুকে ফেলে। অটো ছুটতে লাগল গলি রাস্তা, অপরিসর রাস্তা দিয়ে। তারপর গিরিশ পার্ক মেট্রোর সামনে তাকে নামিয়ে দিল। সে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ফোন করল ঐশী বসুকে, হ্যালো।

হ্যালো রাজি তো ? ঐশী জিজ্ঞেস করল।

না, উনি কি আপনার মেজকাকা ?

আমার হতে যাবে কেন, সকলের মেজকাকা, পাড়ার মেজকাকা, ভালো মানুষ।

আপনি যে বললেন আপনার মেজকাকা ?

ভুল শুনেছেন, আমার মেজকাকা দিল্লি থাকে, তাকে আমি কাকাই বলি, কাকাই মৌসম ভবনে কাজ করে, কবে মেঘ আসবে, কবে ঝড় উঠবে, আগাম জানতে পারে।

মামন কি আপনার ডাক নাম?

মেজকাকা মামন বলে, কেন বলুন তো ?

দেখুন ঐশী, আপনি একটা কাজ করতে পারেন, মৌসম ভবনে খোঁজ নিতে পারেন, পৃথিবীর আয়ু আর কতদিন।

ঐশী বলল, তোমার কি দিল টুটে হায়, হাফসোল খেয়েছ বাবু ?

তোমার বিশ্বাস হচ্ছে না, আচ্ছা যে এইটা জেনেছে তার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেব।

কাল কিন্তু আসছ, তুমিই অপু, আমার আবিস্কার, দ্যাখোনা কী হয়, নাটক সুপার হিট।



পাঁচ

গণেশ ত্রিবেদীর স্মরণ সভা ডেকেছে তাঁর ফলোয়াররা। ফলোয়ারের সংখ্যা এক দেড় লাখ হবে। মৃত্যুর পরও গণেশের ফেসবুক পেজ সক্রিয় রয়েছে। কে চালায় তা রহস্য। অদ্ভুত কথা রটেছে , গণেশের নতুন নতুন পাণ্ডুলিপি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে, সব বেরোচ্ছে একটি ট্রাঙ্ক থেকে। গণেশ কিন্তু কলমেই লিখতেন। কলমে লিখতেন এইটা এতদিন জানা ছিল না তাঁর অনুসরণকারীদের। কিন্তু এইটা সত্য। লাল কালিতে লিখতেন। প্রকাশক বলেছেন, এইটা সত্য। গণেশের ট্রাঙ্ক থেকে যা পাওয়া গেছে, তা দিয়ে আগামী বিশ বছর অনায়াসে বছরে দুটি করে বই বেরতে পারবে। প্রয়োজনে আরো অনেক বছর। কথাটা শুনে ট্রামের সেই লম্বু কন্ডাকটর কলম্বাস সর্দার কিংবা ট্রামের সেই লম্বু প্যাসেঞ্জার দালির ঘড়ির মতো টেনে লম্বা করা সময় নিয়ে বলতে লাগল, এ তো হতেই পারে, বিশেষত যার উপন্যাসের অত কাটতি, তিনি মরে গেলে হবে ? হতেই পারে খালাসিটোলার হিরো, যার নাম হরিপদ মুস্তাফি সে বলল, তাইই হয়েছে, পৃথিবীর আয়ু কম বলে সে মরে গিয়ে লিখছে, মরণের পরে লিখছে ?

আপনি বলছেন হরিদা, গ্রেগর সামশা ?

একটা পাঁইট শেষ হয়ে দু’নম্বর আরম্ভ করল হরিপদ মুস্তাফি, বলল, ইয়েস, তুমি বুঝতে পারবে না, মানুষ ক্রমশ ভূত হয়ে যাচ্ছে।

তার মানে ? অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল সুমন।

মানে ভূতে উপন্যাস লিখছে, ট্রাম চালাচ্ছে, রাস্তায় ভূতেরা ঘুরঘুর করছে।

আমি তুমি ? সুমন জিজ্ঞেস করল।

পৃথিবীর শেষ নিঃশ্বাস পড়লেও, খালাসিটোলা আর আমি তুমি থেকে যাব ্বেতারে ধারাবিবরণী দিতে, চিয়ার্স।

মুস্তাফিদা তুমি যাবে স্মরণ সভায় ? জিজ্ঞেস করে সুমন।

সে কোথায় হবে ? মুস্তাফি ঢুলু ঢুলু চোখে জিজ্ঞেস করল।

হানাবাড়িতে, কেউ একজন কোর্টে গিয়ে বাড়ি ভাঙা বন্ধ করে দিয়েছে, মেজকাকা মামনকে বলেছে, মামন আমাকে বলেছে ফোনে, গণেশ ত্রিবেদীর বাড়িতেই হবে।

গণেশের বউ পুষ্পরানি কোথায় ? হরিপদ মুস্তাফি সব খবর রাখে।

বউয়ের নাম কি পুষ্প, আমি তো জানি লিপি?

ইয়াস, লিপিও, পুষ্পও, স্বামী স্ত্রীতে বনে না, গণেশ লিপির নাম বদল করে পুষ্প হত্যাকাণ্ড লিখে দিল, তারপর করোনায় মরে গেল।

স্যার হরিপদ আপনি কি গোয়েন্দা ? সুমন বিনীত গলায় জিজ্ঞেস করল।

আমি হরিপদ, হরি, রাখে হরি মারে কে, মারলে আমিই মারব, তারপর গণেশ লিখবে। বলে মিটিমিটি হাসে হরিপদ মুস্তাফি, গণেশের বিবি কি আসবে সেই স্মরণ সভায়?

হ্যাঁ, তিনি থাকবেন, আপনিও যাবেন স্যার।

হরিপদ বলল, ততদিন পৃথিবী থাকলে হয়, প্রদীপের তেল ফুরিয়ে এসেছে, নিভল বলে।

তখন ঐশী, মামনের ফোন এল, হ্যালো বাবু, তুমি আজ রিহারসালে এলে না কেন ?

আমি তো খালাসিটোলায়।

ইস, তোমাকে আমি নায়কের রোল দিয়েছি, তুমিই অপু, তুমি এলে না ?

সুমন বলল, আমি পারব না ঐশী, পৃথিবীর আয়ু কম, খুবই কম, যে হরি রাখে, তিনিই বলছেন, রাখবেন না আর পৃথিবীকে।

ঐশী, মামন বলল, না, আয়ু যাতে বাড়ে তার চেষ্টাই এই নাটক, প্লিজ এস পরের শনিবার।

রাখি ঐশী, শনিবার গণেশ স্যারের স্মরণ সভা তোমাদের পাড়ায়, তুমি শুনলে অবাক হবে গণেশ ত্রিবেদীর অনেক অনেক অপ্রকাশিত লেখা পাওয়া যাচ্ছে, এখন বছরে দুটি বই বাঁধা।

ঐশী জিজ্ঞেস করল, কে গণেশ, আমি চিনি না, আমি ভূত, থ্রিলার, নরক পড়ি না।

কথা হতে হতে থেমে গেল। সমাধান হলো না শনিবার ‘অপুর পৃথিবী’ নাটকের রিহারসালে যাবে না, গুরুধামে স্মরণ সভায় যাবে সুমন। গুরুধামের স্মরণ সভায় প্রস্তাব নেওয়া হবে, হানাবাড়ি হিশেবে গুরুধামকে পরিচিত করে তোলা। হরর মিউজিয়ম প্রতিষ্ঠা করা। প্রকৃত হানাবাড়ি যেমন হয়ে থাকে, আলো ছায়া, হেরিকেন নিভু নিভু, দেওয়ালে লম্বা ছায়া কার্নিশে কালো বেড়াল, নিম গাছে হুতুম পেঁচা, শকুনের কান্না ইত্যাদি ইত্যাদি। সেই সভায় প্রস্তাব নেওয়া হবে, প্রতি ছ’মাস অন্তর গণেশ ত্রিবেদীর একটি করে পুস্তক প্রকাশ করার। গণেশের প্রেতাত্মা এই বাড়িতে থেকে লিখবেন, এবং সেগুন কাঠের বাক্সে তা ভরে দেবেন। লাল কালি ও কলম সঙ্গে রুল টানা কাগজ প্রকাশক সরবরাহ করবেন। শুনতে শুনতে হরিপদ মুস্তাফি নিবাস খালাসিটোলা, কলিকাতা বললেন, প্রেতাত্মাকে কি কারণ বারি সরবরাহ করা হবে না, মড়ার খুলিতে হলেও তিনি নিয়মিত তাঁর সঙ্গ দিতে পারেন।

প্রকাশক বললেন, যদি তিনি চান, দেওয়া যাবে।

পুষ্প দেবী কিংবা লিপি বউদি সব শুনে বললেন, তিনি গয়ায় যাবেন, তিনি হানাবাড়িতে থাকবেন না, গয়ায় পিণ্ড না দিলে তাঁর প্রয়াত স্বামীর আত্মার শান্তি হবে না, মুক্তি হবে না, তিনি চান না আর কোনো বই প্রকাশিত হোক।

লিপি দেবীর কথায় স্মরণ সভায় নীরবতা নামল। প্রকাশক ক্ষুব্ধ গলায় বললেন, আপনার টাকা বাড়িয়ে দেব, রয়ালটি।

লাগবে না, আমি গয়া যাব। মিসেস ত্রিবেদী ক্ররুদ্ধ গলায় বললেন।

তখন প্রেতাত্মার বাণী শোনা গেল, গয়ায় যা না পুষ্প, যত পারিস গয়ায় যা বউ, আমি কিন্তু যাব না, আমি না গেলে পিণ্ড নেবে কে ? প্রেতাত্মার কণ্ঠস্বর বেশ কর্কশ, মেজাজি, খুনখুনে। তাতেই মেজকাকার শীত করল। হাড়ে হিম লাগল। মেজকাকা বলল, স্যার, আপনি লিখুন, আমি কতদিন নতুন বই পড়িনি আপনার, গয়ায় যাবেন না, আমি রোজ আপনাকে চাল কলা দিয়ে যাব, সঙ্গে চৈতন্য সুইটসের হিম শীতল দধি, নিজে পিণ্ড মেখে খাবেন।

ধ্যাত, কে পিণ্ড খায়, আমি নররক্ত খাই, আমি প্রেতস্য প্রেত, সূক্ষ্ম দেহে মানুষের ভিতর ঢুকে অনাছিস্টি লাগিয়ে দিই।

কে কথা বলে ! মিসেস ত্রিবেদী ক্রুদ্ধ গলায় জিজ্ঞেস করলেন। বললেন, আমি পুষ্প না লিপি, আমাকে মার্ডার করতে এস একবার, কলমের নিব ভেঙে দেব।

শুনতে শুনতে মেজকাকার সাহস হলো না নিজের পরিচয় দেওয়ার। এইসব হাবিজাবি কথাবার্তার ভিতরে অপুর হাত ধরে টানল অপর্ণা, না না, সুমনের হাত ধরে টানল ঐশী, বলল, চ বাবু, আমরা কাজে যাই, সকলে বসে আছে, না হলে বাইরে যাই, দম আটকে আসছে।

হরিপদ মুস্তাফি বলল, তুই ভাব কী করবি, ওয়ার্ক ফ্রম হোম না কি ওয়ার্ক ফ্রম হানাবাড়ি।

সুমনের তখন যেন চৈতন্য হলো, বিমর্ষ গলায় বলল, স্যার মুস্তাফি, ওয়ান রুম ফ্ল্যাট, কেউ নেই, মাঝে মাঝে কে যেন চমকে দেয়, কম্পিউটার হ্যাং করে যায়, নেট চলে যায়, সব নিঝুম, ফোনের টাওয়ার নেই, গা ছমছম করে, আই ওয়ার্ক ফ্রম হানাবাড়ি, তখন বস বারবার ডাকে, নেই কেন তুমি, তুমি কই গেলে, হাই সুমন, হোয়ারার ইউ ? যেন যমদূতের ডাক।

তার মানে আমার কথা সত্যি, হানাবাড়িতে ভর্তি হয়ে যাচ্ছে চাদ্দিক, পৃথিবীর আয়ু শেষ হয়ে গেলে, সমস্ত ঘরবাড়ি হানাবাড়ি হয়ে যাবে, দেখছ না মানুষ প্রেত হয়ে যাচ্ছে ক্রমাগত, রেপ আর মার্ডার বেড়ে যাচ্ছে দিনদিন, ভূতেরা লিখবে, পড়বে, ভূতেরা হানাবাড়িতে বসে কাজ করবে, ইস, কী হলো আমার পৃথিবীর?

ঐশী জিজ্ঞেস করে, বাবু, তুই এসব বিশ্বাস করিস ?

আমার বিশ্বাসে কী আসে যায়, মেজকাকা কী বলে শোন।

,বাবু, মেজকাকার মাথায় অসুখ।

সুমন বলল, মনে তো হয় না, ভালো মানুষ।

চোখ দেখিস, রক্তবর্ণ, বনবন করে ঘুরছে। ঐশী বলল, ঠিক যেমন বর্ণনা থাকে হরর বইয়ে, ফিল্মে, এক্সরসিস্ট দেখেছিস, আমাজনে পাবি।

আমি তো তা দেখি না।

আমিও দেখি না, বাবু প্লিজ আমাদের রিহারসালে আয়।

কী যে করি, এমন ভাবে মেয়েটা ডাকছে, নাটক পাগল!

একটা নিপ গলায় ঢেলে হরিপদ মুস্তাফি বলল, সে তোমাকে দেখতে চায়, খুব দেখতে চায়, মন দিয়ে দেখতে চায়, তোমার নিঃশ্বাস নিজের গায়ে নিতে চায়, ইয়েস, ইয়েস ইয়েস, নিপে হচ্ছে না, নে আর একটা পাঁইট বল, আমি আছি, ভয় কী রে পাগল, রাখে হরি, আমিই হরি।

আজ মাসের বারো তারিখ। আজ শনিবার। পরের শনিবার যা যা হবে, হতে পারে তার আগাম বিবরণ দেওয়া হলো। এর কোনোটা ঘটবে, কোনোটা ঘটতে ঘটতে ঘটবে না। কোনোটি আগেই ঘটে গিয়ে থাকবে। হয়ত সুমনের হাত ধরবে ঐশী। হরিদাস অটোওয়ালা হাজির। আজ শীতলাতলা লেন থেকে হাতিবাগান ছুটবে দু’জনকে  নিয়ে।              

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ