ইউসুফ ইদ্রিসের গল্প: কনে নিয়ে আসা


অনুবাদ: উৎপল দাশগুপ্ত

ল্‌ শারকিহ্‌ পরগনা – আমার বাড়িও ওই পরগনাতেই – ওখানকার মানুষ যে অত্যন্ত দরিয়াদিল হয় তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু ‘দুলহন নিয়ে আসা’ নিয়ে ওদের দরিয়াদিলির মাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়াটা ছিল আলাদা করে বলার মত বিষয়। বছর দুই আগে বাতিল হয়ে যাবার আগে পর্যন্ত এই আজব রেওয়াজটা ওরা মেনে চলত। এক গাঁয়ের মেয়ের অন্য কোথাও বিয়ে হলে, বিয়ের দিন পুরো পরিবারের ওর সঙ্গেই ওর দুলহা’র দেশে যাবার জন্য রওনা দেওয়াটা ছিল খুবই স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। আর সেই সময় দূরদেশে যাবার রাস্তাগুলো খুব একটা নিরাপদ ছিল না। তাই পরিবারের লোকেরা বেশ বড়সড় একটা দল নিয়ে শোভাযাত্রা করে দুলহনের উটের পিছু পিছু আসত। সাধারণত সেই দলের নেতৃত্ব দিত দুলহা নিজে বা তারই কোনো শাগরেদ।

ব্যাপারটা মোটেও অস্বাভাবিক ছিল না, বরং সমগ্র মিশরের প্রতিটি গ্রামেই বিবাহ অনুষ্ঠানে এই রেওয়াজ মেনে চলা হত। তবে যেটা লক্ষণীয় ছিল সেটা হল এল্‌ শারকিহ্‌ পরগনার একক বৈশিষ্ট – নববধুকে নিয়ে শোভাযাত্রা করে আসার সময় পথের মাঝে যে সব শহর আর খামার পড়ত, সেই সব জায়গার সমস্ত মানুষ, তরুণ কিংবা বৃদ্ধ, ওদের অভ্যর্থনা জানাতে বেরিয়ে আসত আর নিজের নিজের বাড়িতে আসবার জন্য নিমন্ত্রণ করত। আর নিমন্ত্রণটা যে মন থেকেই করা হচ্ছে সেটা প্রমাণ করার জন্য একটি পশুকে জবাই করে তার মাথাটা লম্বা একটা খুঁটিতে পেঁচিয়ে রাখত। কাফিলা কাছে এসে না পড়া পর্যন্ত ওরা অপেক্ষা করত, তারপর ওদের সঙ্গে দেখা করার জন্য এগিয়ে যেত, বলে উঠত, “মেহেরবানি করে আমাদের বাড়ি চলুন। পশু জবাই করা হয়ে গেছে, আপনাদের রাতের আহারও প্রস্তুত। আজ রাতে আপনারা আমাদের মেহমান।”

খুব সঙ্গত কারণেই কনেযাত্রীদের পক্ষে এই নিমন্ত্রণ গ্রহণ করা সম্ভব হত না, ওরা বোঝানোর চেষ্টা করত যে সেটা বিয়ের রাত, ফলে পথে অন্য কোনও আমন্ত্রণ গ্রহণ করা বা মেহমাননওয়াজ়ি কবুল করার সময় হাতে নেই। বলাই বাহুল্য যে আমন্ত্রণকারীরা এই কৈফিয়ত মেনে নিতে চাইত না, ওদের কাছে ব্যাপারটা অপমানজনক বলে মনে হত, ফলে ওরা আরও বেশি করে জেদাজেদি করতে থাকত আর কনেযাত্রীরাও ততোধিক জোরের সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করতে থাকত। প্রায়শই এই তর্জনগর্জন হাতাহাতি, মারামারি, গালিগালাজে পরিণত হত, অনেক ক্ষেত্রেই কিছু লোকের জখম হয়ে পড়ার বা খুন হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া চলত না। বিবাদের মীমাংশার জন্য কেবলমাত্র দুটো রাস্তাই খোলা ছিল – হয় জিতটা কনেযাত্রীদের হত, ওরা নিজেদের গন্তব্যস্থলের দিকে বিনা বাধায় এগিয়ে যেতে পারত, কিংবা জিতটা হত অন্য পক্ষের, তখন পরাজিত পক্ষকে বলপূর্বক শহরে নিয়ে যাওয়া হত এবং আতিথেয়তা গ্রহণ করতে বাধ্য করা হত। অবশ্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কনেপক্ষই জিতে যেত কারণ ওদের কাছে সেটা ছিল ইজ্জতের সওয়াল। পক্ষান্তরে, শহরের লোকেদের কাছে ব্যাপারটা ছিল নিছকই মহত্ব দেখানোর একটা অজুহাত, তবে এতটা মহত্ব দেখানো নয় যে নিজেরাই বিপদে পড়ে যাবে।

বাতিল হয়ে যাবার আগে পর্যন্ত বহু শতাব্দী ধরেই এই রেওয়াজ চালু ছিল, বাতিলও হয়েছে খুব বেশি দিন হয়নি। বাতিলের কারণ হল কাফর আজ়ব গ্রামের এক তরুণী, ভিন শহরের এক তরুণের বাকদত্তা সে। বিবাহের দিন, যথারীতি পুরো শহর ভেঙ্গে পড়ল মেয়েটিকে তার নতুন বাসগৃহে দেখার আগ্রহে। একটা কালো দৈত্য এসে ওদের পথ আটকে দাঁড়িয়ে পড়ল। লোকটাকে দেখেই ওদের হুঁশ উড়ে গেল, কারণ ওদের মধ্যে কারোরই সাহসী বলে বিশেষ পরিচিতি ছিল না। আগে কাফর আজ়বে বেশ কিছু একান্নবর্তী পরিবার ছিল, কিন্তু দারিদ্র্যের কারণে আর জমির আকাল থাকায়, সেই সব পরিবার ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। কালক্রমে গ্রামটি একটি পল্লীতে পরিণত হয়ে পড়ল যেখানে কাতারে কাতারে ঝগড়ালু মানুষ বসবাস করত এবং একে অপরের সর্বনাশ করার জন্য সদা মুখিয়ে থাকত। এরা সকলেই ছিল টুকরো টুকরো ছোট জমির মালিক, এক ফেদ্দান১ জমির অতি সামান্য একটা টুকরোর ওপরেই এদের খবরদারী, প্রত্যেকেরই উচ্চাশা কীভাবে এই টুকরোটা আস্ত বানিয়ে ফেলা যায়। এদের মধ্যে যারা ব্যবসায়ী – যদি এই নামে তাদের ডাকা চলে – তারা আসলে ফেরিওয়ালা, হাটের দিনে মালপত্র মাথায় নিয়ে ফেরি করাই এদের পেশা। গ্রামে প্রায় পঞ্চাশটার মত মুদিখানা ছিল – গোটা পঞ্চাশ পাউন্ডের বেশি পুঁজি কারোরই ছিল না। শয়ে শয়ে লোকের পেশা ছিল কেবল চা আর কফি বানানো, আর এদের পুঁজি বলতে চায়ের কেটলিটা আর একটা ভাঙ্গাচোরা খুপরি – ওদের মাথা গোঁজার ঠাই। কিছু ধর্ম প্রচারক ছিলেন, কিছু মানুষ সুর করে কোরান পাঠ করতেন আর ছিল তা’ আমেহ্‌২ বিক্রেতারা, নামাজের পরে মসজিদের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে যারা পশরা বিক্রি করত। কিছু মানুষ ঝুড়ি বোনার কাজ করত, কিছু ছিল গল্পবলিয়ে, আর ছিল অগুনতি ছিঁচকে চোর আর ছিনতাইকারী। চৌকিদারের চাকরির জন্য একটা পদও খালি হলে অন্তত একশ আবেদন জমা পড়ে যেত, আর মারামারি লেগে যেত একে অপরকে ডিঙিয়ে কীভাবে সেই পদটা দখল করা যায়। ফসল তোলার মরসুমে ফসলের পাতা থেকে কীট-পতঙ্গ বাছাইয়ের তদারকি করার একটা কাজ কেউ জোগাড় করে ফেলতে পারলে সে নিজেকে অশেষ ভাগ্যবান মনে করত।

এই রকম ভয়ানক দারিদ্র্য সত্ত্বেও, কিংবা হয়ত দারিদ্র্যের বশেই, একে অপরের নামে নালিশ দর্জ করানোর ব্যাপারে কখনোই পিছপা হত না। কাফর আজ়ব থেকে খুনের চেষ্টা, সশস্ত্র ডাকাতি, ধর্ষণের অভিযোগ থানায় দায়ের হওয়ায় কোনোই কমতি ছিল না। চালাকচতুর বলতে তাদেরই বোঝাত যারা কোনো রকম অগ্রপশ্চাত বিবেচনা ছাড়াই টাকা জমিয়ে ফেলত। কিপটেমি করে, খুঁটে খুঁটে যারা এক মিলিঅ্যাম (millieme)৩ জমিয়ে ফেলতে পারত তাকে একজন প্রতিভাধর মানুষ বলে মনে করা হত। একজন ভূমি আধিকারিক তাঁর প্রতি সই পিছু কিছু মূল্য ধার্য করলে মনে করা হত সে একজন চতুর ব্যক্তি। কিন্তু সব থেকে বেশি চালাক হল একজন ওমডাহ্‌৪ – যে তুলোর কারবারের সৌজন্যে ওই পদ লাভ করেছে, আপাতদৃষ্টিতে তুলোর দ্বিতীয় দফার ফসল বেচে, কিন্তু কার্যত খেত থেকে চুরি করা তুলো বেচে। তাই কেউ যদি নিজের আত্মমর্যাদা, সাহস এসব নিয়ে বারফট্টাই মারে আর কাফর আজ়বের মানুষ যদি হ্যাটা করে “তোর ওই ফালতু জিনিসটার বাজার দর কত রে?” বলে তার মুখ বন্ধ করে দেয়, তাহলে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

সেদিনও ওরা যথারীতি দুলহনের পেছন পেছনই এগোচ্ছিল, ওর নতুন বাসায় ওকে পৌঁছে দেবার জন্য। আসল মতলবটা ছিল যাবার পথে যদি কোথাও বিয়ের ভুরিভোজ খানা জুটে যায়। সদ্য সেঁকা গরম গরম রুটির সঙ্গে মশালেদার আলু আর ভুনা গোস্ত। তাছাড়া শেষ পাতে মেঠাই তো থাকবেই। মুফ্‌তে অনেক তফরিহ্‌ করা যাবে, তার সঙ্গে একটা আধটা সিগারেটও যদি জুটে যায়, তাহলে তো একেবারে ফাটাফাটি ব্যাপার।

তাই আসমান ফুঁড়ে রাস্তা আটকে দাঁড়িয়ে থাকা কালো দৈত্যটাকে দেখে ওদের বুকের ভেতর যে দুরুদুরু করে উঠেছিল, সেটা আন্দাজ করা মোটেও শক্ত নয়। আতঙ্কে ওরা সবাই দলছুট হয়ে পড়ল, নিজেদের মধ্যে কানাকানি করতে লাগল, আর ঘাড় ঘুরিয়ে হালহকীকত বোঝবার চেষ্টা করতে লাগল। ওদের দলে সর্দারগোছের কেউই নেই যাকে পাঠিয়ে দৈত্যটার সঙ্গে আলোচনা করা যায়। প্রকৃতপক্ষে কাফ্‌র আজ়বের মানুষ কখনোই কাউকে সর্দার বানানোর কথা ভাবেইনি, বরং প্রত্যেকেই নিজেকেই সর্দার বলে জাহির করতে ভালবাসত। কিন্তু এই সঙ্গীন পরিস্থিতিতে সর্দারী করা মানেই সাধ করে নিজেরই বিপদ ডেকে আনা। ফলে দৈত্যটার সঙ্গে ওদের হয়ে কথা বলতে ইচ্ছুক একজন লোক ঠিক করতেই ওদের অনেক সময় লেগে গেল।

কেউ কেউ শেখ রাগব আবু শমা’আ’র নাম করল। সেটা এজন্য নয় যে ইনি
তিন তিনটে আস্ত ফেদ্দানের মালিক, নিজের মোষের দুধ নিজে না খেয়ে, বাচ্চাদের খেতে না দিয়ে, একটু একটু করে জমি কিনেছেন; কারণ, ওদের সবার মধ্যে উনিই সবচাইতে বিজ্ঞ আর মাথাটাও সবার চেয়ে ঠাণ্ডা। অন্যভাবে বলতে গেলে সব থেকে কম হঠকারী, আর এরকম পরিস্থিতিতে যেখানে দুঃসাহস দেখানোটা বোকামি হয়ে যেতে পারে, হয়ত অসভ্যতা বলেও মনে হতে পারে, সেখানে এই রকম একজন মানুষেরই সর্দার হওয়া উচিত।

শেখ রাগব নিমরাজি হলেন, তাও সবার অনেক কাকুতিমিনতির পর। চিৎকার করে সবাইকে খামোশ হতে বললেন, তারপর বেটে-মোটা গাধাটার পেটে লাথি মেরে দৈত্যটার দিকে এগিয়ে খুব কাছাকাছি গিয়ে সসম্ভ্রমে মাটিতে নেমে দাঁড়ালেন।

“দিনটা আপনার খুশির হোক,” কাফর আজ়বের বাসিন্দাদের অভ্যেস মত খোশামুদে গলায় কথাটা বললেন।

“দিনটা খুশির হওয়ার নিকুচি করেছে,” হুঙ্কার দিল দৈত্যটা, চোখে গনগনে আগুন জ্বলছে। “এই পথ ধরে এগিয়ে যান।”

“কোন পথ ধরে, হুজুর?” শেখ রাগব আরও মিনমিনে গলায় জানতে চাইলেন, যেন ভাজা মাছটাও উলটে খেতে জানেন না।

“আজ রাতের জন্য আপনারা আমাদের মেহমান।”

“কার মেহমান, একটু খোলসা করে যদি বলেন?”

“আজ আপনারা এল্‌ সান্দিক হুজুরের মেহমান। আমরা ওঁরই লোক। আর আমি হলাম অ্যাম্বার, ওঁরই গোলাম।”

এই পরিস্থিতি থেকে ছুটকারা পাবার জন্য শেখ রাগব সব রকম চেষ্টা করে গেলেন। এমনকি খুঁটিতে পেঁচিয়ে রাখা জবাই করা জানোয়ারের মুণ্ডুর কথাও জানতে চাইলেন এই বলে যে সেটা না থাকলে মেহমাননওয়াজ়ি অস্বীকার করবার হক ওঁদের আছে। কিন্তু ওঁকে জানানো হল – আর কোনোরকম বিতর্কের সুযোগ না রেখেই জানানো হল – একটা জানোয়ারকে সত্যি সত্যিই জবাই করা হয়েছে, তাই মেনে নিতে ওদের হবেই, সে ওরা ভালয় ভালয় যেতে রাজি হোক বা জবরদস্তি করতে হোক। তবে কিছু ছেলেছোকরার দল অ্যাম্বারের এই হুজ্জতি খুশিমনে মানতে পারছিল না। তাই ওরা শোরগোল করতে শুরু করল, যাতে আর কিছু না হোক, অন্তুত মেয়েদের নজর কাড়া যায়। জঙ্গ লড়বার জন্য ওরা লাঠিসোঁটাও হাতে তুলে নিল। কিন্তু শেখ রাগব কর্তৃত্বব্যঞ্জকভাবে হাত তুলে ওদের চুপ করতে বললেন। এদের দৌড় কত দূর সে ওঁর ভাল মতই জানা। আর লড়াই হলে তার ফলাফল কী হতে পারে সেটার আন্দাজও ওঁর যথেষ্ট আছে। লড়াই শুরু হতে না হতেই একটা কি দুটো ঘা লাগিয়ে কি না লাগিয়েই যে যার মত চম্পট দেবে।

“আপনারা আমাদের কাছ থেকে ঠিক কী চান, দোস্ত?” শেখ রাগব জিগ্যেস করলেন।

“আমরা চাই, আপনারা আর একটাও বাড়তি কথা না বলে আমাদের খামারে চলে আসুন,” অ্যাম্বার জবাব দিল।

“অবশ্যই, অবশ্যই,” গাধার পেটে আবার লাথি মেরে শেখ রাগব বলে উঠলেন। “আপনাদের মেহমান হতে পারলে আমরা অত্যন্ত সম্মানিত বোধ করব। মেহেরবানি করে গুসসা হবেন না। এই যে তোমরা, এদিকে এস!” দলের লোকদের ওঁর পেছনে পেছনে আসার হুকুম দিলেন।

দৈত্যাকৃতি অ্যাম্বার এই অপ্রত্যাশিত এবং আকস্মিক আত্মসমর্পণে অবাক না হয়েই পারল না। একটা জঙ্গ ছেড়বার এমন বেসব্‌র্‌ ইন্তিজ়ার, ফলাও করে অনেকদিন ধরে বলবার মত এত বড় একটা সুযোগ এত সহজে হাত ফসকে বেরিয়ে গেল! এই লোকগুলোর মধ্যে ঘমন্ডের অভাব দেখে ও খুবই আশ্চর্য হল। কিন্তু কী আর করে, উটের রাশ ধরে কাফর আজ়বের প্রায় শ’পাঁচেক বাসিন্দাকে খামারের পথ ধরে নিয়ে চলল। এদের মধ্যে কেউ কেউ যাচ্ছে জানোয়ারের পিঠে চেপে, আবার কেউ কেউ চপ্পলজোড়া বগলদাবা করে, দাঁত দিয়ে গালেবিয়েহ্‌’র৫ ঝুল সামলে, পায়ে হেঁটে। আবার কেউ কেউ তার বাহনের পেছন পেছন আসছিল, কথায় আছে না – বেইজ্জতি নিজের হয় হোক, তবু বাহনকে বেইজ্জত হতে দিও না।

কিছুক্ষণের মধ্যেই এল সান্দিক খামার দেখতে পাওয়া গেল। শোরগোল শুনতে পেয়ে হুজুর নিজেই বেরিয়ে এলেন। চাষাভুষোদের ছোটখাট একটা বিয়ের শোভাযাত্রা দেখবেন বলে ভেবেছিলেন, কিন্তু বাইরে এসে ভিড় দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। আর মিছিলের সর্বাগ্রে রয়েছে, আর কেউ নয়, অ্যাম্বার, ওঁরই নওকর।

“খামোশ হয়ে সবাই এখানেই দাঁড়ান, চেঁচামেচি করবেন না,” শেখ রাগবকে উদ্দেশ্যে করে অ্যাম্বার বলল।

তারপর ওদের ছেড়ে হুজুরের দিকে ঘুরে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াল, তারেক ইব্‌ন জ়িয়াদ ইস্‌পানিয়া দখল করার পর যে ভঙ্গীতে দাঁড়িয়েছিলেন, ঠিক সেই ভাবে।

“হুজুর, দুলহনকে আমরা নিয়ে এসেছি,” জঙ্গ হাসিল করে ফেরা নায়কের মতই বলল।

হুজুর প্রথমে একদৃষ্টে ওর দিকে চেয়ে রইলেন, কিছুই যেন বোধগম্য হচ্ছে না। তারপর হঠাৎ এই রকম কিছু একটা রেওয়াজের কথা মনে পড়ে গেল। আব্বাজানের কাছে এই রকম কিছু যেন শুনেছিলেন। কিন্তু সে তো বহুকাল আগে হত, ওঁর বাল্যকালে, ওঁর আব্বাজানের সময়ে বা তারও আগে, ওঁর দাদার (ঠাকুর্দার) সময়ে। সেই সময় প্রচুর ধনদৌলত ছিল, দেড় হাজার ফেদ্দান জমি ছিল তাঁদের, চার হাজার ভেড়া ছিল। কিন্তু এখন এসব কোথায়? জমিজমা চলে গেছে, দৌলতও তার সাথে সাথে পগারপার। মেহমানখানা ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে, আর জমির ফসল তো অনেকগুলো ব্যাঙ্কের কাছে বন্ধক রাখা, ফসল কাটার অনেক আগে থেকেই। সেই ভাল সময়ের প্রতিনিধি হিসেবে একমাত্র অ্যাম্বারই অবশিষ্ট আছে। খানদানের শেষ গোলাম, আগে যেখানে ওরা শয়ে শয়ে থাকত। আর এই আহম্মকটা কিনা গিয়ে কাফর আজ়বের পুরো একটা গিরোহ্‌ উঠিয়ে নিয়ে চলে এসেছে! ভুখাপেট, বেহাল পল্টন একটা, শাদির দাওয়াত খাওয়ার আশায় কতদিন ধরে যে উপোস করে বসে আছে কে জানে!

বেচারা অ্যাম্বারের ওপর কিল চড় ঘুষি লাথি আর অকথ্য গালিগালাজ পড়তে লাগল। বেচারা হালে পানি পাচ্ছে না, কী ভুল করে ফেলেছে কিছুই বুঝতে পারছে না! হুজুরের আব্বাজানের সময়ে এরকম কত দুলহনকে খামারে আমন্ত্রণ করে নিয়ে এসেছে, কত তারিফ শুনেছে তার জন্য, কত কত ইনাম পেয়েছে! আর এখন কিনা এই রকম ভাল একটা কাজ করার জন্য ওকে মার খেতে হচ্ছে! মনে হচ্ছে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হুজুরও বুরা হয়ে গেছেন। মনে হচ্ছে সেই শাহী মেহমাননওয়াজ়ির দিনকাল আর নেই, যখন দুলহনকে দাওয়াত কবুল করানোটা গর্বের কাজ বলেই মনে করা হত, তার বদলে এরকম নারাজ হয়ে ওঠার মত কিছু তো হয়নি।

হুজুর নিজের নওকরকে বেছে নেবার জন্য দুটো বিকল্প দিলেন – হয় এই ভিড়কে পত্রপাঠ বিদায় কর, আর নয়ত, হুজুর ওকে নিজের হাতে খুন করবেন। প্রথম বিকল্পটা বেছে নেওয়াই অ্যাম্বারের কাছে সমীচীন মনে হল, তাই পাগলা কুকুরের মত শেখ রাগবের দিকে ছুটে এল, আলোচনা করার জন্য। চোখের আগুন নিবে গেছে, হার মেনে নেওয়ার বিষণ্ণতায় শরীর ঝুঁকে পড়েছে। এবার মিনমিন করে কথা বলার পালা ওর, বার বার মাফ চাইতে লাগল, বোঝাতে লাগল সব কিছুই একটা ভুল বোঝাবুঝির ফলেই হয়ে গেছে। নিজের ঘাড়েই সব দোষ নিয়ে নিল, বলল, এতে হুজুরের কোনও গলতি নেই।

কিন্তু শেখ রাগব এসব কিছুই মানতে রাজি নন। নিজের গাধার পিঠে অনড় হয়ে বসে থেকে, কাফর আজ়বের পাঁচশ বাসিন্দার বলে বলিয়ান হয়ে হুঙ্কার দি্লেন যে ফিরে যাবার বিন্দুমাত্র ইচ্ছেই ওঁদের নেই। এল্‌ সান্দিক হুজুরের জেদাজেদি করে নিয়ে আসা আমন্ত্রণে এত দূর এসে ফিরে গেলে ওঁদের মর্যাদায় আঘাত লাগবে। নিজের দেওয়া কথার সম্মান রক্ষার দায় হুজুরেরই। ওরা সকলেই একজোট হয়ে রইল – হয়ত কাফর আজ়বের ইতিহাসে এই প্রথমবার।

হুজুর আর শেখ রাগবের মধ্যে কথা চালাচালি করতে করতে অ্যাম্বারের পায়ে ব্যথা হয়ে গেল। তার ওপর আবার কে কার সম্বন্ধে কী বলছেন, সবটুকু অকপটে জানানোও যাচ্ছে না অ্যাম্বার মরিয়া হয়ে প্রার্থনা করতে লাগল যেন ওর কোশিশ সফল হয়। কিন্তু সে হবার নয়।

হুজুর বুঝতে পারলেন যে উনি যদি আমন্ত্রণ ফিরিয়ে নেবার কোশিশ চালিয়ে যান তাহলে সকলের কাছে কঞ্জুষ প্রতিপন্ন হয়ে যাবেন, দূর দূরান্তের মানুষের কাছে উনি হাসির খোরাক হয়ে পড়বেন। অগত্যা এদের অতিথি হিসেবে মেনে নেওয়া ছাড়া ওঁর কাছে অন্য কোনও পথই খোলা নেই। এদের থাকার জায়গা, বসবার জায়গা, আর এই এতগুলো ভুখা পেট ভরানোর জন্য খানার বন্দোবস্ত করা – সারারাত উনি তটস্থ হয়ে দৌড়াদৌড়ি করতে লাগলেন। কিন্তু সকাল হতে না হতেই প্রথম যে কাজটা করলেন সেটা হল অ্যাম্বারকে বরখাস্ত করা – রাজসিক জমানার শেষ প্রদীপটাও নিবিয়ে দিলেন। ভবিষ্যতের আবার এরকম বিড়ম্বনায় পড়ার চাইতে এটাই বরং ভাল।

কনেযাত্রীর দল সকালের কফি তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করে, প্রথম সিগারেটটা ধরিয়ে, বাকি পথের যাত্রা শুরু করল। শেখ রাগবের এবং তাঁর ধারালো বুদ্ধির প্রশংসায় সবাই পঞ্চমুখ। ওঁর সর্দারী নিয়ে কারও মনে যদি কোনও সন্দেহ থেকেও থাকত, সেটাও দূর হয়ে গেল। এখন থেকে প্রত্যেকেই ওঁর চ্যালা বনে গেল। ব্যাপারটা এত দূর পর্যন্ত গড়াল, যে দুলহনের উটকে থামিয়ে শেখ রাগবকে কাফিলার সব থেকে আগে আগে যাওয়ার রাস্তা করে দেওয়া হল, ফলে উনিই হয়ে গেলেন এই শোভাযাত্রার মাথা।

ভরপেট খাওয়াদাওয়া করে জোরে জোরে হাসতে হাসতে ওরা এল্‌ সান্দিক ছেড়ে বেরোতে না বেরোতেই আরও একদল লোক ওদের পথ আটকাল, ওরা এল্‌ রোডা’র বাসিন্দা, পুলের ধারে ওদের জন্য অপেক্ষা করছে। সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি, শেখ রাগব একই ভাবে আকাশ থেকে পড়ার ভান করলেন। সে দলের সর্দারের মুখ থেকে ‘আমন্ত্রণ’ কথাটা খসতে না খসতেই শেখ রাগব সেই গ্রামের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমালেন, দলবলকে হাত নেড়ে ওঁর পেছন পেছন আসতে বলে।

ফলে এল্‌ রোডা গ্রামও নিজেদের বিপদ ডেকে আনল, পাঁচশ লোককে থাকতে আরে খেতে দেওয়া কী সহজ কাজ, ওদের নিজেদের জনসংখ্যাই যখন মাত্র দু’শ’র আশেপাশে? ওরাও রেহাই পাওয়ার জন্য বেকার কোশিশ করতে লাগল, বলতে লাগল, এত লোকের জন্য বন্দোবস্ত করার হিম্মত ওদের নেই। কিন্তু শেখ রাগব “কিছু একটা ব্যবস্থা হলেই চলবে’ বলে ওদের মুখ বন্ধ করে দিলেন।

--

এইভাবে ওরা এক শহর থেকে আরেক শহরে, এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে যেতে লাগল, এমনকি মাত্র একজন লোকও যদি ওদের পথ আটকায়, আমন্ত্রণটা যতই ফিকে লাগুক না কেন, তা সত্ত্বেও। আসল মঞ্জিলে ওরা পৌঁছল সাত দিন পরে, ভরপেট খাবার আর পানীয় খেতে খেতে আর ধূমপান করতে করতে।

এরপর থেকে এল্‌ শারকিহ্‌ পরগনার লোকেরা সবাই মিলে ঠিক করে নিল যে এই দরিয়াদিলির ওপর একটা রুকাবট লাগানো জরুরি। আস্তে আস্তে দুলহন নিয়ে আসার রেওয়াজটা ওরা বন্ধ করে দিল।



টীকা:

১ ফেদ্দান – মিশরের জমি মাপার একক। ১ ফেদ্দান = ১.০৩৮ একর।

২ তা’ আমেহ্‌ - বরবটি জাতীয় সবজি দিয়ে তৈরি একধরণের নিরামিষ বার্গার।

৩ মিলিঅ্যাম (millieme) – মিশরের আর্থিক একক। ১ মিলিঅ্যাম = ১০০০ পাউন্ড।

৪ ওমডাহ্‌ - মোড়ল জাতীয় ব্যক্তি, মেয়র।

৫ গালেবিয়েহ্‌ - মিশরের বুনিয়াদি/পরম্পরাগত পোশাক।


লেখক পরিচিতি: ইউসুফ ইদ্রিস - ১৯শে মে ১৯২৭ সালে মিশরের ফাকুশ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি প্রাদেশিক রাজধানীতে মাধ্যমিক শিক্ষা শেষে চিকিৎসা শাস্ত্রে উচ্চ শিক্ষার উদ্দেশ্যে ১৯৪৫ সালে কায়রো গমন করেন। সেখানে ১৯৪৭ সালে চিকিৎসা শাস্ত্রে এম.বি.বি.এস ডিগ্রি অর্জন করেন। অবশেষে ১৯৫১ সালে চিকিৎসা বিজ্ঞানের মনোবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞ হিসেবে ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর সাহিত্য জীবন ছাত্রাবস্হাতে শুরু হয়। 'আল্‌ মাসরি নামে কায়রোর এক নামকরা পত্রিকায় তাঁর ছোটগল্প প্রকাশিত হতে থাকে। ১৯৫৪ সালে তাঁর ছোট গল্পের প্রথম সঙ্কলন 'আরক্‌হাস লাইলি (দ্য চীপেস্ট নাইটস)' প্রকাশিত হয়। ১৯৬০ সালে তিনি ডাক্তারি পেশা চিরতরে ছেড়ে দিয়ে সাহিত্য রচনায় মনোনিবেশ করেন। ছোটগল্প ছাড়াও তিনি উপন্যাস, নাটক এবং প্রবন্ধ রচনা করেছেন। বাম আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং নানা সময়ে তাঁকে কারাবরণ করতে হয়েছে।

১ আগস্ট ১৯৯১ সালে ৬৪ বছর বয়সে হার্ট অ্যাটাকে লন্ডনে পরলোক গমন করেন।
------------
 

অনুবাদক পরিচিতি:
উৎপল দাশগুপ্ত
অনুবাদক। ফটোগ্রাফার
কলকাতায় থাকেন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

2 মন্তব্যসমূহ

  1. অনেক জায়গায় ছুটে গেছে অনুবাদটা। অনেকটা অস্পষ্টও। সবমিলিয়ে ভালো ছিল।

    উত্তরমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. কিন্তু অনুবাদটা তো যথাসম্ভব আক্ষরিকই করা হয়েছে। এবং যথাসম্ভব কোনও লাইন বাদ দেওয়া হয়নি। এখানে প্রকাশের সময় কিছু যুক্তাক্ষর ভেঙ্গে গেছে। কোথায় কোথায় ছেড়ে গেছে একটু জানানোর বিনীত অনুরোধ রইল।

      মুছুন