উপল মুখোপাধ্যায়ের ধারাবাহিক উপন্যাস: আলমগীর-- পর্ব:২



দ্বিতীয় পর্ব:
হিন্দুস্থানের জঙ্গল। সে বাঘেরও হতে পারে বা হাতির, কোথাও বা সিংহের, চিতার, চিতা বাঘের আর সর্বত্র হাজার , লাখো হরিণ , গাউর , বুনো শুয়োর,সাপ , বাঁদর , হনুমান , খরগোশ , ঘড়িয়াল ,কুমির , ভোঁদড় এইসব। । আর তার রক্ষক কে, কে হতে পারে। এ কথার জবাব দেবার আমরা কে ? প্রকৃতিকে সম্পদ মনে করে খাজনা উশুল করা বা আরো খাজনার জন্য জঙ্গল হাসিল করা, চাষ করা। সেই জমি থেকে আরো খাজনা উশুল করতে থাকা, করতে থাকা। তারপর সেই জমির খাজানায় সন্তুষ্ট না হলে বসত জমি করা, শহর বানানো । আরো আরো সম্পদ বাড়ানোর জন্য স্মার্ট সিটি বানানো। এর শেষ কোথায় ভাবতে ভাবতে একটা ছোট্ট ভূকম্পন হয়। সব মাটির ওপর পড়ে যায় যত খাড়াই উমারত। অথবা শুকিয়ে আসে মাটির যাবতীয় জল। শুখার সংবাদ শোনায় হাহাকারের আসপাশ। তেমনই এক স্মার্ট সিটির ছবি দেখাতে থাকে ড্রোন। স্বপ্ন দেখায় কিন্তু বড় রঙ্গিলা এর অধিবাসীরা তারা এখনও জঙ্গলের গন্ধ পাচ্ছে। শুধু পাচ্ছে এমনটাই নয় অনবরত বলতে থাকে পুরনো কথা বা জঙ্গলের কথা। গুজরাট মধ্যপ্রদেশের সীমান্তে গুজরাটের ভাবী স্মার্ট সিটি দাহোদ শহর গুজরাটেই বটে আর তার প্যানোরামিক ভিউ দেখাতে দেখাতে ড্রোনের কাজ খতম হল। চোখ ধরল স্থানীয় ইতিহাসকার বিপিন দেশাই ভাইকে। মুখে পান দিয়ে কথা বলতে বলতে হাত দুটোকে অদ্ভুতভাবে মেলে ধরেন তিনি ফলত চোখ চলে গেল বিপিন ভাইয়ের হাতের পাঞ্জায়। দেখা গেল বাঁ হাতের কড়ে আঙুলের নখটা বড়সড় হয়ে উঠেছে আর চোখ দুটোয় রঙ্গিলা সুর্মা। মুখে চাপ দাড়ির অযত্ন অভ্যাস তাতে এক পোঁচ বয়সের সাদা পড়ে বাকি সব রঙ শুষে নিয়েছে, চুল ছোট করে ছাঁটা , মাথার ওপর কালো ফ্রেমের চশমা তোলার স্টাইল। মুখ একটু ওপরে তুলে স্থানীয় ইতিহাস বলছিলেন তাতে কথার বিস্তার হতে থাকে,“ ঔরঙ্গজেবকে বাত করে তো উসসে পহলে ম্যায় আজসে কুছ সাল পহলে মেরে লিখে এক দো পংক্তিয়া প্রস্তুত করুঁগা। য্যায়সে কি আজ দাহোদ স্মার্ট সিটি বন রহা হ্যায়। ও উসকে উপর মেরে পংক্তিয়া লিখে থি - ‘নগরমাতি জোত জোতামা বনিগা উঁচে শেহর,নগরমাতি জোত জোতামা বনিগা উঁচে শেহর,কোই পা হয় ওস দাহোদ মাঝে মৌজ মস্তি নে লেহর।’ দাহোদমে মৌজ হ্যায়, মস্তি হ্যায় আউর লেহর ভি হ্যায় যায়সে আপন বলতে হ্যায়।'
—— ঔরঙ্গজেব কে বারে মে ।

—— মেরেকো আজ বাত করনে কা ঔরঙ্গজেব কি।

—— জি।

—— তো ঔরঙ্গজেব কো বাত করুঁ - তো সন ১৬১৮ মে ঔরঙ্গজেব কা জনম দাহোদ মে হুয়া থা। অব ঔরঙ্গজেব দেলহি কা রহনেওয়ালা দাহোদ মে ক্যায়সে জন্মা।

—— ক্যায়সে ?

—— ইসেকি ভি এক পিছে এক পস্ট পস্ট স্টোরি হ্যায়।

—— স্টোরি ?

—— হা জি। ঔরঙ্গজেব কা যো পিতাজি ওর দাদা জাহাঙ্গির বাদশা ঔর শাহজাঁ, উস জমানে মে উসকা নাম থা শাহজাদা খুররাম মির্জা, ও দোনো রসালা লে কর নিকলে থে। অহমদাবাদ মে ভেকেশন কে লিয়ে নিকলে থে। উস টাইম মে দেওয়ালি কা মহল থা।

—— ইয়ানি কি এ্যায়ন্ড অফ অক্টোবর ইয়া নভেম্বর ?

—— মালুম নেহি। আউর ভেকেশনকে লিয়ে নিকলে তো এহমদাবাদ গেয়ে। এহমদাবাদ মে বহুত ধুল উড় রহি থি উস জমানে মে। তো ধুলকো দেখকর এ্যায়সা বলে -‘ এ্যায় তো এহমদাবাদ হ্যায় ক্যা গরদাবাদ হ্যায়। ’

—— সচ মে বোলে ?

—— এ্যায়সা হিস্ট্রি মে লিখা হুয়া হ্যায়।

—— তব তো মাননা হি পড়ে গা।

—— তব তো গরদাবাদ বোলকে আগে নিকলে ইহা আ গেয়। দাহোদ মে। ইহা আকে দেখা তো ইহা ছাপ তলাও, করিব একশো চাল্লিশ একর মে ফেহলা হয়া ছাপ তলাও থা। আউর উস টাইম পে ছাপ তলাও বহুত বেহতরিন থা।

বিপিন ভাইয়ের কথার সুতোর টানে ছাপ তলাও জলাশয়ের ছবি দেখা যেতে পারে। এলিয়ে পড়া লম্বাটে এক জলের ক্ষেত্র তার চারপাশ নগরায়ন হয়েছে, রাস্তা টাস্তা আর স্মার্ট সিটির ল্যান্ডমার্ক হিসেবে সৌন্দর্যায়নের আয়োজন। সে সময়ের আহমেদাবাদের ধুলো ছেড়ে মোগল বাদশাহ দাহোদের এই জলখণ্ডটি বেছেছিলেন এতে কোন সন্দেহ থাকতে পারে কি ?

—— স্বচ্ছ পানি থা। কমল কে ফুলে তেহল রহে থে। হনস তেহল রহে থে। বহুৎ প্রসন্ন হো গয়ে আউর পুরা রসালা ইহা ঠেহর গয়ে।

বিপিন দেশাইভাইয়ের কথা মতো এখানেই দাহোদের এই জলাশয়ের পাড়ে মোঘল ছাউনি পড়ে। আর এখানেই গর্ভবতী মুমতাজ মহল জন্ম দেন ষষ্ঠ সন্তান মুহিয়ুদ্দিন মহম্মদ ঔরঙ্গজেবের। আচার্য যদুনাথের বর্ণনায় - আহমদনগর সুলতানৎকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার জন্য অনন্য হাবশি সেনাপতি মালিক অম্বরের আর এক আক্রমণকে উড়িয়ে দিয়ে তাঁর সেনাধ্যক্ষ আর উত্তরাধিকারী শাহজাদা খুররামকে নিয়ে খোশমেজাজে গুজরাট থেকে আগ্রায় ফিরছিলেন সম্রাট জাহাঙ্গির সপরিবারে। উজ্জয়িনীর পথে দোহাদে ২৪ই অক্টোবর সন ১৬১৮ তে জন্ম হল ঔরঙ্গজেবের। রাজকীয় বহর মালওয়ার রাজধানী উজ্জয়িনীতে পৌঁছলে যথাযোগ্য মর্যাদায় নবজাত শাহজাদার জন্ম উদযাপন উৎসব হল।

ঔরঙ্গজেবের জন্ম তারিখ নিয়ে পরবর্তী ইতিহাস গবেষণা অবশ্য অন্য কথা বলছে। জীবনীকার অড্রে ট্রুস্কে জানাচ্ছেন ঔরঙ্গজেব জন্মেছিলেন ৩রা নভেম্বর ১৬১৮। জন্মস্থান নিয়ে বিতর্ক নেই। সাড়ম্বর জন্ম উদযাপনও সুবিদিত। জানা যায় দাক্ষিণাত্যে মালিক অম্বরের বিরুদ্ধে নির্ধারক জয়ের পর জাহাঙ্গিরের দরবারে ১৬১৭ র অক্টোবরে শাহজাদা খুররামকে এক রাজকীয় অভ্যর্থনা জানানো হল। সে সময়ই তিনি শাহজাহান উপাধি পেলেন। এত্তো বড় ট্রে ভর্তি মনিমুক্তো আর সোনার মোহর তাঁর ও হাতি সার্ণকের মাথায় উপুড় করে ঢেলে দিলেন জাহাঙ্গির। পাদশা বেগম নূর জাহানের তরফেও যুদ্ধজয়ী শাহজাদাকে মুক্তো খচিত পাগড়ি ও কোমরবন্ধ উপহার দেওয়া হল। তাছাড়া হাতি ঘোড়া রত্নখচিত হাওদা এসব তো ছিলই। শাহজাদার পরিবারের অন্যরা বা চাকররাও পুরষ্কৃত হল। নূর জাহান এতো ক্ষমতাবান ও বিত্তবান ছিলেন যে সে সময় তিন লক্ষ, ইরা মুখুটির মতে ২০১৮ র অর্থমূল্যে পনেরো কোটি টাকা, ফুটকড়াই করলেন এ বাবদ। এর থেকে প্রমাণ হচ্ছে ঔরঙ্গজেবের জন্মের আগেই তাঁর বাবা শাহজাহান উপাধি পান আর মুঘল দরবারের অবিসংবাদী উত্তরাধিকারী হিসেবে স্বীকৃত হন। পরে অবশ্য তখতের এই দাবীদারি জাহাঙ্গির বা নূর জাহান মানেন নি।

ঔরঙ্গজেবের মা মুমতাজ মহলের দিকটাও এবার দেখতে হবে। জেনানা মহলের ঐতিহাসিক বর্গীকরণ বা শুধুই মোগল বাদশাহদের দাপটে কুঁকড়ানো লেখার চাপ থেকে মমতাজ মহলের অভিমুখে যাত্রা অন্য হাওয়া ও বাতাস আনতে থাকে। চোদ্দ বছরের পারস্য কন্যা আরজুমান্দ বানু বেগমের সঙ্গে পনেরো বছরের শাহজাদা খুররাম মির্জার এনগেজমেন্ট হল লাহোরে ১৬০৭ এ। এরাই হলেন ভবিষ্যত মুমতাজ ও শাহজাহান। মুমতাজের বাবা আবু আল হাসান ইয়ামিন আল দৌলা ছিলেন মেহেরউন্নিসা বা নুরজাহানের ভাই। ইনি মোগল দরবারে অত্যন্ত প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন ও ১৬০৯ এ ইরানি নববর্ষে বা নওরোজ উৎসবের সময় আসফ খান উপাধি পান। আর দাদু ছিলেন জাহাঙ্গির বাদশাহের শ্বশুর আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোঘল রাজপুরুষ গিয়াস বেগ যিনি ইদমদ উদ দৌলা বা রাজস্তম্ভ উপাধি পান। একেবারে খাঁটি পারসিক রক্ত! মোঘলদের মতো কোন রাজপুত ভেজাল নেই! বছর কাটে বিয়ে আর হয় না। দেখতে দেখতে পাঁচ গড়িয়ে গেল। এর মধ্যে জাহাঙ্গিরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করলেন তাঁর ছেলে খুসরু। সেই বিদ্রোহ দমনে খুররাম মির্জা বিশেষ ভূমিকা নিয়ে বাপের প্রিয়পাত্র হন। তাঁর ক্ষমতা বাড়ে, স্বাধীন কর্তৃত্ব পান, আলাদা মহল হয় আগ্রায়। আরজুমান্দ বানু লাহোরে বসে শুনলেন খুররাম মির্জা ১৬০৯ এ বিয়ে করেছেন আর এক পারসিক অভিজাত মির্জা মুজফফর হুসেন সাফাভির মেয়েকে। শুনে কী প্রতিক্রিয়া হয়েছিল সদ্য যৌবনা মেয়েটির তা কোথাও লেখাপত্তর নেই। তবে আন্দাজ করাই যায় এরকম ঝুলে থাকা সম্পর্কের একটা টানা পোড়েনের প্রভাব তার ওপর তো পড়বেই কারণ শাহজাদার তো হেলদোল নেই সে ক্ষমতা আর খেতাব ,উপঢৌকনের স্বাদ পেয়ে তাতেই মত্ত। এর মধ্যে মেহেরুন্নিসা জাহাঙ্গিরকে বিয়ে করে হলেন নূরজাহান। ছ মাসের মধ্য তিনি হলেন মোঘল সম্রাজ্যের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী মহিলা। তাঁর পরিবারেরও ভাগ্যে চিচিং ফাঁক হল। জ্যোতিষীর বলা দুষ্টগ্রহের প্রভাব বা অন্য কিছু বাধা থেকে থাকলেও সব কেটে গেল এক ঝটকায়। উনিশ বছরের আরজুমান্দ বানুর সঙ্গে ক্ষমতাবান খেতাবধারী সুলতান খুররামের বিয়ে হল। মুমতাজ হল মেয়েটি। তারপর থেকে তাঁদের উনিশ বছরের দাম্পত্য জীবনে মুমতাজ মহল শাহজাহানের সঙ্গে কখনও রাজপুতদের সঙ্গে লড়তে আজমির কেল্লায়, কখনও মালিক অম্বর বা অন্যান্য দাক্ষিণাত্যের সুলতানদের পাঙ্গা নিতে বুরহানপুর কেল্লায় ছুটে বেড়িয়েছেন। সে সময় মোঘল রাজমহিষী বা রাজকন্নেরাও তাঁদের বর বা বাবার সঙ্গে ঘুরতেন। নানান স্তরের অন্যান্য অভিজাত মহিলারা , উপপত্নী , নর্তকী , অপর লিঙ্গের মানুষ, খোজা ইত্যাদি নিয়ে গোটা জেনানা মহল সঙ্গে যেত। এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় যাওয়ার জন্য মেয়েরা হাতির পিঠে চড়ে পর্দানসীন হয়ে যেত। একটু কম গুরুত্বের মহিলাদের জন্যে ছিল উটের বাহন।এই উনিশ বছরে অন্যান্য মোঘল সম্রাটদের তুলনায় শাহজাহান অনেক অংশেই একগামী হয়ে পড়েন । তাঁর অন্য দুই বউ মুমতাজের মতো একভাবে তাঁকে সঙ্গ দিতেন না বা দেওয়ার সুযোগ পেতেন না । তাঁদের একটা করে সন্তান হয় এই পর্যন্তই। মুমতাজ মহলের চোদ্দটা বাচ্চা হয়। তার মানে অনবরত সাম্রাজ্যের এধার থেকে ওধার করার সময় তিনি অধিকাংশ সময় গর্ভবতী থাকতেন। যাতায়াতের সুবিধের জন্য ১৬১৬ তে জাহাঙ্গির সুলতান খুররামকে শাহ উপাধি দিয়ে (পরের বছর যা উন্নত হয়ে শাহজাহান) অন্য অনেক কিছুর সঙ্গে বংশীবদন নামের একটা হাতি উপহার দেন আর এক বিলিতি কোচোয়ান সহ এক বিলিতি ঘোড়ায় টানা কোচের দেশি সংস্করণ উপহার দেওয়া হয়। ইরা মুখোটি বলছেন ওই কোচ ছুটিয়ে শাহজাদা আজমিরে তাঁর তাঁবুতে গেলেন পথে জনতার উদ্দেশ্যে পয়সা ছড়াতে ছড়াতে। ওই আজমিরে থাকাকালীনই মুমতাজের চারটে বাচ্চা হয়। সেখানে অবশ্য বাচ্চাদের দেখভালের জন্য ধাত্রীমাতাদের অভাব ছিল না। মোঘল হারেমে সম্রাজ্ঞীরা নিজেরা বাচ্চার দেখভাল করতেন না। ওই ১৬১৬ তে আজমিরের সুখের দিনে কালো মেঘ নেমে এলো - মুমতাজের প্রথম সন্তান হুর আল নিসা স্মল পক্সে মারা গেল। তারপরেই অবশ্য চতুর্থ সন্তান শাহ সুজার জন্ম হল। সুজাকে জাহাঙ্গির অসম্ভব ভালোবাসতেন। তার কারণ কি সুজার অসুস্থতা , মৃগীরোগ ?

১৬১৬ র পর থেকে এখনকার মধ্যপ্রদেশে দাক্ষিণাত্যের প্রবেশ পথ তাপ্তি নদীর বাঁকে বুরহানপুরে ফারুকি আমলের বাদশাহি কেল্লায় শাহজাহানের দরবার চলে গেল দাক্ষিণাত্যের যুদ্ধ সামলাতে। সেই সব যাত্রাপথে নতুন পাওয়া বিলিতি কোচগাড়ি ও নতুন প্রশিক্ষিত হাতি বংশীবদনে চড়ে শাহজাহান মুমতাজেরা যাতায়াত করতেন।থাকার জন্য ওই কেল্লাটা শাহজাহান সাজিয়ে নিলেন - দেওয়ানি আম , দেওয়ানি খাস আর জেনানা-মহলের ব্যবহারের জন্য সুসজ্জিত হামাম বা চানের ঘর বানানো হল। ১৬১৭ তে ওই বুরহানপুর কেল্লার নিরাপত্তায় মুমতাজের পঞ্চম সন্তান রোশেনারা বেগমের জন্ম হল। মোগল সেনাপতি, কবীরতুল্য দোঁহা রচয়িতা, দুধর্ষ যোদ্ধা খান আব্দুল রহিম খান ই খানানও তখন বুরহানপুরে থেকে মোগলদের দাক্ষিণাত্যে শাসনে সহায়তা করতেন। এই মহান সেনাপতি , পণ্ডিত আরবি ফারসি ও সংস্কৃত ভাষায় পারদর্শী ছিলেন, ছিলেন তুলসীদাস সুহৃদ ও সাংস্কৃতিক মিলন ঐতিহ্যের প্রতীক।ওনার ছেলে শাহনাওয়াজ খানের মেয়ে ইজ উন্নিসার সঙ্গে শাজাহানের তৃতীয় বিয়ে হয় ওই ১৬১৭ তেই । এই বিয়ের কারণ ছিল সম্পূর্ণ রাজনৈতিক। আব্দুল রহিম খান ই খানানকে নতুন জেতা দাক্ষিণাত্যের সুবেদার আর শাহনাওয়াজ খানকে সেনাপতি নিযুক্ত করে তাঁদের আনুগত্য নিশ্চিত করতে শাহজাহান এই প্রথাগত বিয়ে করলেন। মেয়েটি পরে আকবরাবাদী মহল বলে খ্যাত হন আর একটা ছেলে হয় তার যে বেশিদিন বাঁচেনি। ১৬৬৮ তে উনি মারা যান। শাজাহানের মৃত্যুর দু বছর পর। পুরোনো দিল্লী বা শাহজাহানাবাদে ওনার সমাধি আছে যা আকবরাবাদী মসজিদ বলে লোকে জানে। বলা হয় ১৬৫০ এ আকবরাবাদী মহল ওটা বানিয়েছিলেন। রানা সাফভি ২৮ই নভেম্বর ২০২২এর এক টুইটে জানাচ্ছেন ওটা ১৮৫৭-৫৮ তে সেপাই বিদ্রোহের সময় ভেঙে দেওয়া হয় ইংরেজের গোলায় যা অবস্থিত ছিল এখনকার সুভাষ পার্কের কাছে। তাঁর মত জনশ্রুতিকেই সমর্থন দিচ্ছে। এটা নিয়ে বাওয়াল অনেক দিনের। ২০১২ তে দিল্লী মেট্রোর তৃতীয় পর্যায়ের কাজের সময় ওই এলাকায় মাটি খুঁড়তে গিয়ে এক মসজিদের ধংসাবশেষ পাওয়া গেল। প্রাথমিক ভাবে দেখা গেল ওখানে মাটির নিচে দেয়াল আর কিছু ভাঙা বাসনপত্র পাওয়া যাচ্ছে যা মসজিদে ব্যবহার হয়। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ , এ এস ই কিছু সিদ্ধান্তে আসার আগেই স্থানীয় লোকজন মাতিয়া মহলের তৎকালীন বিধায়ক শোয়েব ইকবালের নেতৃত্বে ওটাকেই আকবরাবাদী মসজিদ মনে করে নামাজ পড়তে শুরু করে। ফলে খনন কাজ আর হতে পারেনি। পরে আদালতের হস্তক্ষেপে ওই জায়গার স্থিতাবস্থা বজায় আছে। বেগম আকবরাবাদীর তৈরি মসজিদের ঠিকানা খুঁজছেন ইতিহাসবিদ রানা সাফভি। তিনি খুঁজেই চলেছেন দিল্লীর সবকটা বাড়ি, মহল , দোকান, সরাইখানা, মঞ্জিল , মসজিদ আরো আরো অনেক কিছু যা ইংরেজের গোলায় উড়েছে সেই দাস্তানে গদার জানতে জানতে আবার আমরা ফিরতে পারি ১৬১৮ তে যখন মুমতাজেকে নিয়ে, একমাত্র তাঁকে নিয়েই শাজাহানের চলমান তাঁবু এগিয়েছে আগ্রার দিকে। পথে কোথায় জাহাঙ্গীর বাদশা আর নূর জাহানের চলমান তাঁবুর হাতি ঘোড়া সেপাই লস্করের সঙ্গে তাঁদের দেখা হয় সে অজানা।

মুমতাজের হারেম আলো করে ছিলেন আদবে চোস্ত বিদূষী এক পারস্য কন্যা সাতি উন্নিসা যিনি ডাক্তারিও জানতেন। উনি ছিলেন জাহাঙ্গীর বাদশাহর সভাকবি আবু তালিবের বিধবা বোন। মুমতাজ মহলের দেশোয়ালি বোন হবার কারণে দুজনের খুব জমে গিয়েছিল। বিপিন দেশাইয়ের কথামত ধরে নেওয়া যাক সবুজ ঘেরা ছাপ তালাওয়ে গাছের ছাওয়ায় বাদশাহী তাঁবু পড়েছে সারি সারি। সেখানের জংলা পাখিরা শিস দিতে ভুলে নিঃশব্দে ফল খাচ্ছে আর হরিণেরা তলায় দাঁড়িয়ে সেই অবশিষ্ট ফলের গতি করছে। হরিণের খয়েরি চামড়ার আভাস খুব কাছ থেকে দেখে আরো কাছে গিয়ে কোন জাতের হরিণের দল দাহোদএর জঙ্গলে ঘরে সে দেখতে গিয়ে চারশো বছর পর আবার বিপিন ভাইয়ের গলা শুনতে পাওয়া গেল আর জঙ্গল পালিয়ে স্মার্ট সিটির ধূলো ধোঁয়া যেন নাকে জ্বালা ধরিয়ে দেয় , দিতেই থাকে। তখন কথায় কথায় জঙ্গলের ইতিহাস ভেসে ওঠে।

-----উসকে পেহেলে জাহাঙ্গীর বাদশা, দো সাল পেহেলে ইহা আয়া থা।

------ ইহা ?

------ হা। অউর জাহাঙ্গীর বাদশাহ নে ইহা ইয়ানিকি সেভেন্টি সে জায়াদা এলিফান্ট শিকার কিয়া।

------ গজব কি বাত !

------ হিস্ট্রি মে লিখা হুয়া।উস জামানে দাহোদ মে পুরা জঙ্গল এরিয়া থা। অউর হাতি বাঘ সব থা ।

এক বা একাধিক মাস্কেটের প্রবল আওয়াজ শোনা যায়। আলাদা আলাদা হাওদা চাপিয়ে মোঘল আর্মির হাতিরা মুভ করছে। অনবরত ড্রাম পেটানোর গুরুগুরু আওয়াজ। দাহোদ এলাকাটা ঘিরে ফেলেছে বাদশাহী শিকার বাহিনী। শিকার অন্তঃপ্রাণ জাহাঙ্গীর বাদশাহ ঝলমলে মণিমুক্তো লাগানো হাওদায় , হাতির নাম নূর বখত, মাহুতররাও কম বিখ্যাত ছিলেন না মাহুত প্রধান হলেন রাজা কিসান দাস যিনি আবার এক হাজারি মনসবেরও মালিক, সবই বাদশাহের কৃপায়। এ যে সে শিকারি নয়, এক তাবড়তোর পশুপ্রেমীও বটে বাঘ আর একশোর মতো পালতু সিংহের মর্জি বুঝতে কোন কোনটাকে কখনো দেওয়ানি খাস কখনো বা শোবার ঘরে ছেড়ে রেখে দেখেন কোন ক্ষতি করছে কিনা। ওরা শাহজাদা সেলিম ওরফে বাদশাহ জাহাঙ্গীরকে কিছুই করেনি কারণ কি এমন যে এ ছাড়া জাহানে কেই বা জানোয়ারের জন্য প্রেমের মিনার বানাবে , পালতু হরিণ মানসরাজের জন্য - হিরণ মিনার। লাহোরের সেকুপুরায় ওই জাহাঙ্গীরের তৈরি করা ওই স্থাপত্য আর তার জলাশয় মধ্যবর্তী বারদুয়ারি থেকে মনোরম হাওয়া দেয় আর মিনার থেকে এখনো আলো ঠিকরে আসে কলোনিপতি সাহেব শিকারিদের কান ধরে জুলজি আর পশু মনস্তত্বের উচ্চপাঠ শেখাতে । জাহাঙ্গীরনামা পড়লে যাকে করবেটের গুরু মানতে হয় সেই বাদশাহকে আবার বেগম নূরজাহানের বন্দুকের টিপ আর শিকারি হোস সম্পর্কে উচ্ছসিত দেখা যাচ্ছে। বেগম যাচ্ছেন আলাদা হাতিতে , হাতে আলাদা মাস্কেট। সতেরো ইঞ্চি বাই বারো ইঞ্চি একটা ছবিতে সহ শাসক নূর জাহানকে দেখছে ইয়াঙ্কি দখলে থাকা অন্তর্জালের গুগুল সার্ভার , দেখছে আর বিস্ময়ে দেখাতেই হচ্ছে কারণ গোটা ইউরোপে এর জুড়ি ছিল না , নূর জাহানের মতো সহ শাসকের। মোঘলদের মধ্যেও না। আগেও না পরেও না। নূর জাহান সাইজে তাঁর থেকে অনেক বড় এক মাস্কেটে গান পাউডার - বারুদ ভরছেন, এই ছবি এঁকেছেন শিল্পী শ্রেষ্ঠ, নাদির উজ্জামান বা যুগের বিস্ময় আবুল হাসান। শিকারি পোষাক পরা , ছেলেদের আধিপত্যে থাকা পাগড়ি কেড়ে ও পরে দিগন্ত প্রসারী দৃষ্টিতে নূর জাহান বুকের উন্নতাভাসে,সদম্ভে মাস্কেট হাতে। এরপরই তাঁর মাস্কেটও গর্জে উঠেছিল দাম দাম করে - হতে পারে এক এক গুলিতে একটা বাঘ মারা পড়ে ।

বিপিন ভাই অবশ্য জোর দিয়ে হাতি শিকারের কথাই বলছেন , শুধুই হাতির যা পাওয়া যেত দাহোদের জঙ্গলে আর এখন যেখানে স্মার্ট সিটি আর মৌজ মস্তির লহর। এসব তিনি পছন্দ করবেন কেন ? কেইবা করেছে , না আমির , না খুসরু , না রুমি , না মির্জা , না গালিব , না বাহাদুর শাহ না জাফর , না ওয়াজেদ আলী শাহ , না অন্য কোন জাহাবাজ শাহ পীর বা মসুর সায়ের তাই তিনি ১৬১৮র কথা বলছেন , ছাপ তালাও এর পাশেই শাহী তাঁবুতে যেখানে ঔরঙ্গজেবের জন্ম দিচ্ছেন মুমতাজ।

------ উস টাইম পে শাহজাঁ কে ওয়াইফ প্রেগনেন্ট থি। তো রাসালা রুখা অউর ঔরঙ্গজেব কে জনম হুয়া।

------ দাহোদ মে।

------ ইস দাহোদ মে। বাদমে উসকা নাম গিরা আলমগীর বাদশা । উসকে আয়ু ষাট সাল কে হুই তো শোলাসো আঠাত্তর সাল আই। উস্কো ধ্যান আয়া কে মেরা জন্মস্থল দাহোদ হ্যায়। জাইসা কে উস্কো মা বাপ নে বলা থা তু দাহোদ মে জনম লিয়া। উসনে গুজরাটকে সুবেদার কো বোলা মেরে জন্মস্থলী কে ইয়াদ মে কুছ ,উহা কুছ বানহাও।

------ বানায়া কেয়া ?

------ জরুর। ইয়ে জো দেখ রাহে হো ইসকা নাম হায় গড়ি কা কিল্লা। এ জাগা কিউ পসন্দ হুয়ে হায় ইসকে পিছে ভি এক স্পষ্ট স্পষ্ট স্টোরি হায়।

------ স্টোরি ?

------- ইয়ে জাগা সে কোই ভি দিশা আপ জায়োগে সাব জাগা পে এক চড়াই আয়েগি। ইয়ে সবসে হাইটয়ালি জাগা উস জামানে মে থি।

আলমগীরের আমলে তৈরী বেশিরভাগ স্থাপত্যের মতো গড়ি কা কিল্লা নেহাতই ইঁট চুনের কাঠামো , অনেকটা উঁচুতে বলে তার ওপর থেকে শাহজাহানের হারেমের দিকে নজর করা তাই এখনো কষ্টকর নয় । ছাপ তালাওয়ের কোন এক পাশটা স্পষ্টই দেখা যাচ্ছিল স্মার্ট সিটির হাই রাইজ এড়িয়ে । সাতি উন্নিসার তত্ববধানে তখন মুমতাজ ষষ্ঠ সন্তানের জন্ম দিচ্ছেন। রয়েছেন নূর জাহানের মা অসমত বেগম ,মুমতাজের মা দিয়ানজি বেগম যাঁর সম্পর্কে লিখিত বিশেষ নেই , নূর জাহান নিজে আর জেনানার অন্যান্যরা। কল্পনা করা যেতে পারে ওই তাঁবুর মেজেতে ঘাসের বেশ ওপর পাতা আছে পারস্যের কার্পেটের বদলে ফরাস এ চাঁদনি , নূর জাহানের আবিষ্কার করা সাদা ধপধপে চাদর। আর তাতে কয়েক ছিটে রক্ত ছিটকে পড়ল নবজাতকের পা বেয়ে আর অজস্র লালা , মুমতাজের রক্ত জল করে আরো এক জন্ম হল। ঘাস আর দৃশ্যমান বা অদৃশ্য অনেক জঙ্গলের বীজ ও পোকাদের ওপর পাতা ধপধপে ফরাস রঙ্গিন হয়ে বদলের অপেক্ষায় থাকল।

তাঁর প্রিয় বাবা খুররাম যতই জাহাঁবাজ হোক, যতই যুদ্ধ জয় করে শাজাহান উপাধি পাক, নাতিনাতনীর ব্যাপারে জাহাঙ্গীর বাদশাহ খুবই স্পর্শকাতর ছিলেন। টেনশনে হয়তো দুপাত্তর বেশি ই খেয়েফেলেছেন। আফিমের কয়েকটা ডেলাও বেশি খরচ করা হয়ে গেছে বাদশাহের। ছেলে হবার আগে থেকেই রাজ জোতিষী জোতিক রায়কে কাছছাড়া করছেন না। বার বার জিজ্ঞেস করছেন ভাবি সন্তান ছেলে হবে না মেয়ে যেমনটা করেই চলেছে লোকে। গ্ল্যামারাস এই রাজ জোতিষীর নিদান শুনতে শাজাহানও কম আগ্রহী ছিলেন না সেদিন। কিন্তু মুমতাজের জন্য দুঃশ্চিন্তা তাঁকে আচ্ছন্ন করছে , তিনি বেরিয়ে আসছেন লাল রাঙা বাদশাহী তাঁবু থেকে - ছাপ তালাওয়ের ঠান্ডা হাওয়ায় চোখ বন্ধ করে নিঃশ্বাস নিলেন। তার পর কাছেই চিতল হরিণের ডাক শুনলেন, বাঘ হাঁটছে আর তার ডেরায় মোঘল বাদশাহকে সে থোড়াই পাত্তা দেবে।তখনই যেন শাহজাদার জন্ম সময় জেনানার মহিলাদের তুমুল ঢোলবাদ্দির ছবি দেখা গেল আর জাহাঙ্গীরের জন্ম উপলক্ষ্যে সেই ছবির অনুরূপ এক ঘটনা ঘটে গেল দাহোদের জঙ্গলের মধ্যে । এই তুমুল শব্দেরা ,অনেকদিন চুপচাপ থাকা পথশ্রান্ত হারেমের বাঁধন ছাড়া শব্দেরা , বনের যাবতীয় ডাক থামিয়ে দেয়। জেনানা মহল থেকে খবর এল বেগম মুমতাজ ভালো আছেন তাঁর ষষ্ঠ সন্তান ছেলেই বটে। বাঘ তুমুল আওয়াজ শুনে থমকে গিয়ে এই জঙ্গল থেকে ওই জঙ্গলে এমন চলে যায় যে আর ফেউয়ের আওয়াজ শোনার কোন সম্ভাবনাই নেই । বাদশাহ জাহাঙ্গীর ঘোষণা করলেন মালওয়ার রাজধানী উজ্জয়িনীতে পৌঁছলে যথাযোগ্য মর্যাদায় নবজাত শাহজাদার জন্ম উদযাপন উৎসব হবে ।

------ উস জামানে মে গড়ি কা কিল্লা নাম হি নেহি থা।

------ তব ?

------ সরাই থা।

------ সরাই ?

------ মুসলিম ফকিরো কে লিয়ে বানাই গায়ি থি। বহুত বেহতারিন বানাই থি। উসমে আজ ভি দো দরওয়াজা হায়।

------ আভি ভি ?

------ আভি তিন হায়। এক পাল্লা খো গেয়া।

বিপিন ভাই কিল্লার ওপরে থাকা এক হতমান মোঘল কামানের দিকেও দেখাচ্ছেন যা হয়তো সরাইখানার নিরাপত্তায় ব্যবহার হতো। আর গড়ি কে কিল্লার খসে যাওয়া চুনের আস্তরণের দিকেও বা দেখানো চলছে সেখানে কিছু মন্দির স্থাপত্যের অবশেষ পাওয়া গেল। লোকশ্রুতিতে সেগুলো দ্বাদশ শতকের মন্দির ভাঙার অবশেষ, কিল্লা গড়ার সময় যা ইঁট হিসেবে ব্যবহার হয়েছিল। মন্দির ভেঙে ? যার দায় নিয়ে ইতিহাসের কালোতম শাহেনশা হয়ে চলেছেন ঔরঙ্গজেব আলমগীর। তবে লোকশ্রুতি লোকশ্রুতিই বটে জনমান্যতার চাপানে যার উতোরের দিকেও চলে যেতে পারে ক্যামেরার চোখ। সে ঠিক খুঁজে নিতে বেরিয়েছে অপরকে। চলে যাচ্ছে দাহোদেরই এক মহল্লায় সেখানে নাকি ঔরঙ্গজেবের কাটা নাড়ি পুঁতে রাখা আছে এক ছোট্ট ইঁট গাঁথা কাঠামোয়। সেটা যথারীতি সবুজে রাঙ্গানো।

------- অব মায় মজুদ হু দাহোদ নালগড়ি মে। ইয়ে জো হরে রং কে এক আকার দেখ রহে হায় ইহা পে হি মোঘল সাম্রাজকে ছাটে শাসক ঔরঙ্গজেব কি নাল , জো জনম কে বাদ আতি হায়, ইহা পর গাড় গায়ি থি। মেরে সাথে এক বুজর্গ হায় যে হমে জায়াদা জানকারি দে পায়েগে। কেয়া ইতিহাস রাহা হায় ইহা ঔরঙ্গজেব কে জনম কা ?

জায়গাটা দেখা যাচ্ছে একটু উঁচু মতো ওই দাহোদেই যেখানে একজন বয়স্ক মুসলিম ভদ্রলোককে প্রশ্ন করা হচ্ছে। পেছনেই সবুজ রঙের ছোট ইঁটের কাঠামো ওপরটা ছোটোখাটো এক গম্বুজের আকার। জায়গাটাকে নালগড়ি বলে। বেরিয়ে আসবে আরেক ন্যারেটিভ যা বিপিন ভাইয়ের মতো ছাপ তালাও বা জঙ্গল সম্পৃক্ত নাও হতে পারে। উত্তর দিচ্ছেন ভদ্রলোক ।

------- ঔরঙ্গজেব রেহমাতুল্লা আলে জিস কো হাম সুফি মানতে হায় , ইতিহাস মে উনকো ক্রূর শাসক বাতায়া গেয়া হায়। উন কে জনম ইহা হুয়া অউর উনকি নাল ইহা পর গাড়ি হুই হায়। ইস স্থানকে উপর। উনোনে বহুত সাদা জিন্দেগি জিয়ে হে। ইন্ডিয়াকে উপর উনপঞ্চাশ সাল রাজ কিয়া অর অখন্ড ভারত উনোনে হি বানায়া।

ঠিকঠাক জন্মস্থান নিয়ে নানামত অনেকটা স্থানীয় ইতিহাসের চর্চার বিষয় হতে থাকে। নানা কথা ও তার বাড়াবাড়িই যার আসল সিলসিলা। একথা আর সে কথার পর ইতিহাস মোদ্দা যে তথ্যের কাছে বারবার ফেরে সে হল জায়গাটা আর তার নাম দাহোদ। যেটা এখনকার গুজরাট- মধ্যপ্রদেশ সীমানায়। সম্প্রতি যা হতে চাইছে এক স্মার্ট সিটি। সেখানে ধূলো উড়বে , ধোঁয়ায় থাকবে বিষ অথচ তাঁবুতে তাঁবুতে ঘোরা মোঘল শাসকদের মতো কেউ পালতে চাইবে না সেখান থেকে। সপ্তদশ শতকের মতো হাতি শিকার করতে আসবে না কেউ। দাক্ষিণাত্যের দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে মধ্যপ্রদেশের দিকে যেতে কোন বাদশাহী তাঁবু পড়বে না এখানে। হয়ত ছাপ তালাও নামের এখনও জেগে থাকা এক বৃহৎ জলাশয়ের পাশে বা নালগড়ি নামের ঝোপঝাড় ঢাকা উঁচু জায়গায় কেউ আঁতুড় ঘরের খোঁজে আসবে না। তবু একটা শাস্ত্রে ,একটা পদ্ধতিতে সে জায়গা চিহ্নিত হবে বিশেষ একজনের জন্মস্থান হিসেবে। কঠিনতম পদ্ধতি অনুসৃত সে শাস্ত্রটার নাম ইতিহাস । বিশেষ লোকটার নাম ঔরঙ্গজেব আলমগীর আর জায়গাটার নাম অন্য কিছু নয়। এক ও অনন্য দাহোদ যার স্থানীয়দের নিয়ে একটা রঙমিলান্তি খেলা হচ্ছিল তাতে কিছু রঙ মিলে আর না মিলে আবার একটা চিঠির দিকে পৌঁছে দিল। জীবন সায়াহ্নে চিঠি লিখছেন আলমগীর আর তা অনুবাদ করছেন আচার্য যদুনাথ।চিঠিটা লেখা হচ্ছে তাঁর ছেলে মহম্মদ আকবরকে,

“ মহান পুত্র আমার, সুবে গুজরাটে দাহোদ গ্রাম এ পাপীর জন্মস্থান। ওখানকার লোকেদের ঠিকমত মায়া দয়া দেখিয়ো। নজর রেখ , ওখানের অনেক কালের বয়স্ক ফৌজদার যেন বহাল থাকে।”

চিঠিতে গুজরাট আর দাহোদ তাদের গুরুত্বে মহিমান্বিত হয় তেমনই বুড়ো , অনেক কালের ফৌজদারও। যদিও তাঁর নাম জানা যায় না। এমনকি স্থানীয় ইতিহাসের দীর্ঘ কথায়- কই, তাঁকে তো খুঁজে পাওয়া গেল না ? যিনি বহাল করেন তাঁর মহিমাই সবাই করে প্রশংসা বা নিন্দায় আর যিনি বহাল হন তাঁর কথা কোথায় যে মিলিয়ে থাকে - দাহোদের বাতাস আর মাটির আঁতিপাঁতি খুঁজেও তা মিলছে না।


চলবে...
--------------


লেখক পরিচিতি
উপল মুখোপাধ্যায়
কথাসাহিত্যিক। অনুবাদক
কলকাতায় থাকেন

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

2 মন্তব্যসমূহ

  1. আশ্চর্য গঠনশৈলী। তথ্য, তার এই যে কথোপকথনের আদলে পরিবেশন , ভাষায় একটা যেন আভা, এখনও ঠিক ধরতে পারিনি আলোর উৎস।

    উত্তরমুছুন
  2. ঠিক। এটা আমারো খোঁজ। ফ্যাক্ট আর নুয়েন্সেস থেকে নানাভাবে বেরিয়ে আবার ফিরে ফিরে এলে একটা টেক্স্টচ্যুয়াল ইনইগমার আলো বেরয় কিনা। ওই অদ্ভূত আলোটা বেরলে আকাঁড়া শুদ্ধ ইতিহাস উপন্যাসে উতরবে।

    উত্তরমুছুন