অনুবাদক : সফিকুন্নবী সামাদী
ঘরদও তারই মতো জায়গায় জায়গায় চোয়াচ্ছে! এই ভাবনায় কল্পেশ মৃদু হাসে। কিছুক্ষণ সে নিজের জায়গা বদলায় না, তেমনিভাবে সামনে তাকিয়ে বসে থাকে। ফোঁটা আবার মাথার ওপর পড়ে। ছাদে একটা সুক্ষ্ম ফাটল ধরেছে, যা ঠিক তার মাথার ওপর এসে শেষ হয়েছে। বৃষ্টির পানি ফোঁটায় ফোঁটায় এগিয়ে আসতে আসতে ফাটলের শেষ প্রান্তে পৌঁছে থেমে যায়, ফোঁটার একটা পুটুলি বানিয়ে পেছন থেকে আসা ফোঁটা তার মধ্যে জমা করে নেয়, কিন্তু যেকোনো মুহূর্তে নিজের বিস্তার ভুলে এক ফোঁটা বেশি হলেই পুরো পুটলি ফেটে যায় এবং কল্পেশের মাথার ওপর ফিচ করে পড়ে।
কল্পেশ একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে এবং আপাতত পরের ফোঁটার অপেক্ষা ত্যাগ করে। চেয়ার পেছনে টেনে নিয়ে তার গ্লাস আবার ভরে নেবার জন্য দাঁড়িয়ে যায়। কাট-গ্লাসের ভেতর কেমন সুন্দর ঝলমলে চমক মনোহর তারাদের। গ্লাস দেখতে দেখতে সে জানালার সামনে দাঁড়িয়ে যায়।
এখান থেকে ফাটক দেখা যায়। কেউ তার ট্রাক ওখানেই দাঁড় করিয়ে দিয়েছে আর কোথাও থেকে একটা ছাগল বৃষ্টির পানি থেকে বাঁচার জন্য তার নিচে পৌঁছে গেছে। সামনে ধোঁয়াটে পানির আড়ালে পার্কের ভাঙা দালান সামান্য স্পষ্ট হয় আবার লুপ্ত হয়ে যায়। জায়গায় জায়গায় ছোট পুকুরের মতো হয়ে গেছে যার মধ্যে পড়া ফোঁটা ফুলের মতো ফুটতে ফুটতে মিলিয়ে যায়। ধোঁয়াটে আকাশ পৃথিবীর ওপর ছেয়ে গেছে।
কল্পেশের চেহারা মলিন হয়ে যায়। দিন তো কাজে-কর্মে কেটে যায়, কিন্তু এই সন্ধ্যা? না জানি কী খুঁজতে থাকে? তার ওপর এই বৃষ্টি, কেউ নিজের কাছ থেকে দূরে যেতে চাইলেও পারে না। গাড়িও সেই চালাতে পারে যে অন্ধ হয়ে ড্রাইভ করতে থাকে!
এমনিতেও, এই নির্দয় বর্ষণ না হলেও কল্পেশ হয়ত কোথাও যেত না। কোথায় যাবে, কোথাও ভালো লাগে না। খুব বেশি হলে শাযীর ওখানে চলে যেত, আর কী?
শাযীর কাছে তো এখনো পৌঁছে যেতে পারে। ছাতা তুলে নিয়ে, রাবারের স্লিপার পায়ে দিয়ে, পার্কের ভেতর দিয়ে শর্টকাট মেরে ভাঙা দালান পার করে ওপারের গলিতে ঢুকে যেতে পারে, চার নম্বর বাড়ি। কিন্তু কে কাদায় থপ থপ করে নিজের গায়েই নোংরা ছিটিয়ে ফিরবে? আর তারপর ওখানেই বা আছে কী? সেই বসে থাকা পা ছড়িয়ে। এখানে খারাপ কী?
বারোই জুন কল্পেশ শাযীকে জোর করে 'সেন্টুর' হোটেলে নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু পরে তার নিজের ওপরই খুব রাগ হয়। শাযী সবকিছু জানে। যে সবকিছু জানে তার সাথে কোনো সম্ভাব্যতা বেঁচে থাকে না। সকল উপায় বানানো বলে মনে হয়, কেঁদে বলো তো, হেসে ফেলো তো, না বলো তো, বলে ফেলো তো...। সবদিক থেকেই ধোকা। কিন্তু তবুও এক আশ্চর্য ধৃষ্টতায় কল্পেশ 'ব্লাডি মেরি' অর্ডার করে। মুখ ঠেকিয়ে বলে, 'এই দিনের নামে... চিয়ার্স'
না কিন্তু, শাযীকে দিয়ে কিছু সম্ভব নয়। কল্পেশের ইচ্ছে করে বলে, আবার বলে, বারবার বলে, ওই কথাই পুনরোচ্চারণ করতে থাকে। যে ভঙ্গিতে পারে বলে। ইচ্ছা হয় কখনো হেসে বলে, 'কী ভুল করেছে সে, আমার মতো ভাঙাচোরা অস্থি-পাঁজরের সাথে কে সম্পর্ক রাখে?' ইচ্ছে হয় কখনো কেঁদে ফেলে, 'কী দোষ করেছি আমি, কোন দায়িত্বহীনতা... কেমন অনাদর?' ইচ্ছে হয় কখনো চীৎকার করে ওঠে, 'সব শালা পোস্ট ফ্যাক্টো রেশনালাইজেশন, কেউ কোনো একজনকে ছেড়ে অন্যকে বেছে নেয় না, কেবল জীবনের পরিচিত জগৎ থেকে বিরক্ত হয়ে নতুন পরিবেশ বেছে নেয় এবং নিজেকে বুঝিয়ে নেয়, ওখানে এই ফারাক ছিল, এখানে এই মিল।' ইচ্ছে হয় কখনো চুপ হয়ে যায়, হঠাৎ, অকারণ, মূর্তির মতো পাথর হয়ে যায়, শাযী বা অন্য কেউ দেখে স্তব্ধ হয়ে যায়, কী হল কল্পেশ কী হল?
কিন্তু 'কী হল' শাযী কখনো জিজ্ঞাসা করবে না। সে সব জানে, কী হয়েছে। তাকে দিয়ে কিছু সম্ভব নয়। কাঁদা ভুল, হাসা ভুল, চুপ করে থাকা ভুল। ঠিক কেবল শীলিত-সযত্ন নাজুক ভারসাম্য যার মধ্যে থাকবে হাতে-কোনা কয়েক ফোঁটা অশ্রু, সামান্য হাসি, আর একটু মৌনতা। কোনো একটির মাত্রা একরত্তি গড়বড় হলে সব নকল। এই অনন্য ভারসাম্য প্রাপ্তিতে কল্পেশ ক্ষুব্ধ হয়ে যায়। বিরক্ত হয়। এই ভারসাম্যকেই নাটুকেপনা বলে মনে হয়।
যদি এমন কোনো জায়গা থাকত যেখানে এই নাটুকেপনাকে নাটুকেপনা মনে না হয়!
রহিয়ে অব এ্যায়সী জগহ চলকর জহাঁ কোঈ না হো
হম-সুখন কোঈ ন হো ঔর হম-যবাঁ কোঈ ন হো*
কোনো পরিচিত মানুষ সামনে থাকবে না আর কল্পেশ সব কিছু পুনরোচ্চারণ করে নেবে, কেঁদে, গেয়ে, মূর্তি হয়ে।
কী আছে শাযীর ওখানে? সেই বিরক্তিকর মৌনতা, সেইসব বাসি কথা।
'সাহেব', বৈরা দাঁড়িয়ে আছে, 'খানা লাগিয়ে দেব?'
'হ্যাঁ?...' কল্পেশ চেয়ার নিরাপদ স্থানে টেনে নেয়, 'আজ কী কী সিরিয়াল আছে?'
'জী সাহেব... সর-আঁখোঁ পর..."
কল্পেশ কোমল করে হাসে, 'এক কাজ করো, খানা লাগিয়ে দাও। আমি একটু দেরি করে খাব। তুমি লাগিয়ে দিয়ে ছুটি নিয়ে নাও, টিভি দেখো, ঘুমাও, ফুসরত পাও।'
'ডে... ডেকে... নেব?'
'... আরে অবশ্যই অবশ্যই, এতে জিজ্ঞাসা করবার কী আছে? বারবার জিজ্ঞাসা কর? যখন খুশি টিভি চালাও, দেখাও।
মেয়েদেরই তো টিভির আসল শখ। আমরা পুরুষেরা তো ওদের সঙ্গ পাবার জন্য বসে যাই!' সে হাসে।
বৈরা তার বউকে ডেকে নিয়ে আসে। কল্পেশের সামান্য পেছনে, আড়াল করে, খাটিয়ার ওপর দুজনে বসে যায়।
বৈরার বউ অবশ্যই কাঁদছে হয়ত পিতাপুত্রের বেদনাঘন মিলন দেখে। কি জানি এদের চোখে কোথা থেকে এত জল জমা হয়ে থাকে যে কারণে-অকারণে বান চলে আসে। তারপর যখন কখনো তারা কাঁদে না তখন কত নির্দয় মনে হয়। কল্পেশ তো ভয়ে কেঁপেই উঠেছিল। সে দৃঢ়, শক্ত, ক্রূর, হ্যাঁ হ্যাঁ কেন বলবে না ক্রূর, চেহারার দিকে তাকিয়ে সে চুপচাপ দস্তখত করে দিয়েছে। ডিভোর্স পেপারে। সে তো অনেক পরে, একা, ওর মনে হয়েছে যে সে নির্বোধ। তারই ওপর আঘাতকারীর তোলা হাতকে সে আশ্রয় দেবার জন্য ধরে ছিল। তারপর সে নিজের জোর দেখাতে শুরু করেছে। ঠিক আছে, যাব, কিন্তু তুমিও কীভাবে মনে রাখবে যে আমি গিয়েছি। হা বাবা! বারোই জুনই সে 'মেটাডোর' নিয়ে পৌঁছে যায়, একেবারে মাঝরাতে, আর নিজের নামের সমস্ত সামান, স্টিরিও সিস্টেম, সোফা সেট, সমস্ত রেকর্ড, পুরনো ফিল্মি গানেরগুলোও যেগুলো সে কখনো শোনে না, নিজের গোলাপী বালতিও, তুলে নিয়ে আসে। শাযী আপত্তি করেছিল, বড় কুৎসিত আচরণ এটা বন্ধু, ভালো দেখায় না। হুঁহ্, ভালো দেখিয়ে কোন হীরা-জহরৎ পাওয়া যাচ্ছে। চুলোয় যাক সৌন্দর্য।
আপত্তি করতে ওস্তাদ সবাই। শাযী তো নারী, রমণ, চঞ্চল, সবিতা...। সবিতা তো রীতিমতো ধমকাচ্ছিল। ভালোমতো নিজের মধ্যে মিলিয়ে যাবে বলে ঠিক করেছ। তোমার মতো এলিজিবল ব্যাচেলর। সম্পন্ন, জওয়ান, সুন্দর...
কল্পেশ ঘুরে কাঁচের দরজায় উঁকি দেয়। বাইরে অন্ধকার রাত হয়ে গেছে, তার পর্দায় অনর্গল পড়তে থাকা বৃষ্টির ফোঁটার মালা, এদের সামনে তার চেহারা। সুন্দর? হ্যাঁ সুন্দরই তো। জওয়ান? হ্যাঁ, কেন নয়, তাও তো।
কিন্তু দীপাবলীতে সবিতা এসেছিল। পুরো মহল্লায় পটকা আর আলোর আবহ। কল্পেশ নিজের ঘরে বন্দী। রাগ... তারপর ভয়... তারপর ঘামের ফোঁটায় কম্পমান লাল চেহারা, কোটরে বসে যাওয়া চোখ, আশ্চর্য আত্মবিচ্ছিন্নতা। সবিতা ধাম করে দরজা খুলে ঢুকে গিয়েছিল।
'এসব কী? কী অবস্থা করে রেখেছ নিজের?'
তারপর বর্ষণ, এমন বর্ষণ যে ভালো লাগতে লাগতে একেবারে হতাশ হয়ে যায়।
'মানুষ নেই তুমি আর... জানোয়ার একেবারে জানোয়ার... নিজের ময়লাতেই ডুবেছ। নিজের সুরত দেখো। কেমন করে কোনো সুন্দর চেহারা এমন কুশ্রী... এমন ঘৃণ্য... হতে পারে... তোমাকে দেখে বোঝা, যায় হাউ আগ্লি এ হ্যান্ডসাম ম্যান ক্যান লুক।...ইউ আর আগ্লি।'
'যেও না।' কল্পেশ অসুস্থের মতো হাত তোলে।
মুহূর্তের জন্য সবিতা ঘুরে দাঁড়ায়, 'বেচারা হয়ে যাবার পর কেবল পোকা হওয়া সম্ভব, কল্পেশ, সেটা আর হয়ো না।'
দাঁড়াও, অসুস্থ হাত তোলে, যেও না। সে শুয়ে থাকে, না উঠতে পারে, না বলতে পারে, অসহায় চোখে দেখতে থাকে।
'মানুষ মৃতের জন্য তো এমন করে না।'
আর কী। মৃতের স্মৃতি তো আলোকপুঞ্জে ঘিরে যায়, যার তেজে সকল মন্দত্ব ভস্ম হয়ে যায়, কোথা-কোথাকার ভালত্ব নক্ষত্রের মতো টিমটিম করতে থাকে। কিন্তু যে মরেনি...?
'কল্পেশ, তোমার কোনো ইজ্জত আছে কি না? তুমি তো মরে যাচ্ছ, অন্যে তোমার থাকা না থাকা উকুনের সমানও অনুভব করে না... এটুকু কি যথেষ্ট নয় সামলে নেবার জন্য?'
যেও না... সবিতা...
'আমি তোমাকে সহ্য করতে পারিনা। জা... জানোয়ার...পতিত... লুজলুজা... পোকা... উফ্।' সে থেমে যায়, শান্ত হয়ে বলে, যেন নিজেকে আশ্চর্য হয়ে দেখে, 'আমি তোমাকে যা খুশি বলতে পারি, তোমার কোনো সেলফ-রেস্পেক্ট নেই? পোকা... কাদা...নাদি...!' যেন সে নিজের সীমানা আঁকতে চায়। আর নিজে নিজেই স্তব্ধ হয়ে ধীরে হেসে ফেলে।
কাতর দৃষ্টিতে তাকিয়ে কল্পেশ হাসি দেখে নিজেই হেসে ফেলে। সবকিছু ঠিক হয়ে গেছে হয়ত।
রমণ বলেছিল, আসলে সব ঠিক হয়ে যায়। ব্যাপার গড়বড় আসলে এটুকু মনে হয় যে জীবনের কোন সংযোগবশত কে কাকে ছেড়ে যায়। ভ্রান্তি জন্মে যায় যে ছেড়ে আসা মানুষটি পেছনে, নইলে কেউ এমনিতে কারো আগে চলে যায় না।
কল্পেশে মুখ বিষণ্ন হয়। এদের মধ্যে কারো সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করে না। যথাসাধ্য ওদের দিকে তাকায় না সে। নতুন মানুষ পেয়ে যায়। শাযী ঠিক আছে। অন্তত উপদেশ দেয় না। কিন্তু কখনো কখনো ওর ওই গম্ভীর, সহনশীল ভাব...।
'হ্যাঁ, শেষ হয়ে গেছে? আজ কী হল?'
'জী...ওই... ছেলে বাড়ি ফিরে এসেছে, এখন বাবার সাথে থাকবে...'
'নিজের বউকেও নিয়ে আসবে...' বৈরার বউও উৎসুক হয়ে বলে ফেলে, চুপ থাকতে পারে না।
কল্পেশ তাকিয়ে থাকে। কি আশ্চর্য ব্যাপার, সিনেমায়, বইয়ে, সেই পুরনো গল্প বারবার ফিরে ফিরে আসে, কেউ নিজের কান্না কাঁদে, তখন দর্শক-পাঠক সকলে সাথে সাথে চোখের জল ফেলে। সেসব শুনে শুনে না বিরক্ত হয়, না খারিজ করে দেয়। আর আমাদের মতো জীবন্ত পুতুল নিজের জীবনের দোহাই দেয়, দেয়ও না, চুপ হয়ে থাকে, আর সবিতা বেগম 'পোকা' বলে ডাকতে থাকে। পোকা। লুজলুজা। বেঢঙ। হ্যাঁ?
'কী নাম তোমার?' আরে এতদিন হয়ে গেল বৈরা তার বউকে নিয়ে এসেছে আর সে ওর নামটাও জানে না!
মেয়েটি হঠাৎ সঙ্কুচিত হয়ে যায়। সোজা শাড়ির ভেতর ঢুকে যায়।
'জী...সোনা...!' বৈরা লজ্জিতভাবে বলে।
'আচ্ছা! এখন কী দেখার আছে? ব্যাস? এখন আর কিছু নেই? ঠিক?'
মেয়েটি আগেই চলে গিয়েছে।
কল্পেশ কাচের দরজায় নিজের চেহারা দেখতে থাকে। কালো কাচ, পেছনে ঝলমলে বর্ষা। বেঢঙ...পোকা...হুঁহ্? ওর মাঝে কোনো অভাব নেই। কিন্তু কেবল সংযোগবশত সে প্রথমে উঠে চলে যায়নি, নইলে সবিতার জন্য...?
কিন্তু এখন? এখন সবিতা বেঁচে যাওয়া টুকুনের জন্য তৈরি কেন হবে? যখন আর কেউ নেই তখন আমার পালা!
কেমন করে অর্থ পাল্টে যায় এই সংযোগবশত। এখন সে 'কম'... 'পেছনে'... 'বেঁচে যাওয়া'...।
যাহ! কে বলছে যে নাও বেঁচে যাওয়া?
এমনিতেও তাদের মধ্যে কার সাথে কখন দেখা হয়? অবসর কোথায়? কাজকর্ম আছে, রোজগার করতে হয়। সমস্ত দিনে তো ব্যস্ততা। রাতও কেটে যায়। নিজের নিদ্রাকে কেউ স্পর্শ করতে পারে না, এমনিতেই তো আর হাসাহাসি হত না যে এর মাথা বালিশ স্পর্শ করলেই যেন বাটন টেপা হয়ে যায়, চোখ বন্ধ আর নিদ্রামগ্ন? কেবল এই নির্দয় সন্ধ্যা। বিশেষত যখন বৃষ্টিতে পার্কের ওই ভাঙা দালান স্পষ্ট হয়-লুপ্ত হয়... আর ঘরের দেয়ালে ভেজা আঠালো দাগ পড়ে যায়...।
কল্পেশ উঠে ড্রিঙ্ক-ক্যাবিনেট পর্যন্ত যায়। ব্যাস আরেকটা। বেশি পান করে না সে। খুব বেশি হলে তিনটা। আজ চার নম্বর নিয়ে নিয়েছে। কখনো কখনো হয়ে যায়। এই বৃষ্টির সন্ধায়। দিনভর একাউন্টের ফাইল পরীক্ষা করতে করতে সন্ধ্যাবেলা অক্ষরসদৃশ কোনো জিনিস দেখতে ইচ্ছে করে না। অবশ্য গান শোনা যেতে পারে। এখন একটা মিউজিক সিস্টেম কিনে নেয়া প্রয়োজন। ওটা তো বোনকে দিয়ে দিয়েছে। সোফাসেট যদু কিনে নিয়েছে। বালতিও অন্য কাউকে দিয়ে দিয়েছে। এমনি বেশিরভাগ জিনিস তো এমনি বিলিয়ে দিয়েছে নিয়ে এসে। বোন বিশেষভাবে খুশি হয়েছে জিনিসগুলো পেয়ে।
বাইরে বৃষ্টি তেমনিভাবে চলছে। অন্ধকারে ভাঙা দালানটা একেবারে লুপ্ত হয়ে গেছে আর কালো কাচে কল্পেশ নিজেকে দেখছে। ছাদের পাইপ থেকে ঝরনার মতো ঝরতে থাকা বৃষ্টির পানি, কলাপাতার ওপর অন্যরকম আওয়াজে গড়ানো পানি, স্ট্রীট লাইটে ভিজতে থাকা ফোটায় ফোটায় বেড়ে চলা বিদ্যুতের তারের ওপর পানি, মাটির ওপর সতত ঝরতে থাকা পানি। আলাদা আলাদা ধ্বনি কিন্তু শান্ত নিরন্তরতায় সমস্বরিত।
এমন রাতে পোকা বেরই হয়, সাপ, বিচ্ছু, কেঁচো, ছোট ছোট লুজলুজা পোকা। হামাগুড়ি দেয়, কিলবিল করে। আর তো আর মোটা মোটা শামুক বাথরুমে যেখানে-সেখানে গড়াগড়ি যায়। একবার তো ঠিক খিলের জায়গায় শামুক আটকে বসে ছিল। তার ওপর হাত পড়তেই যেন বিদ্যুৎ চমকে ওঠে। চীৎকার... হাসি... খেপানো... রোমান্স ফিল্মি স্টাইল!
দেখো কেমন সহজে মনে করে ফেললাম, কল্পেশ ভাবে। আর সবাই, ওর পেছনে পড়ে যায়, 'কী, গুলিয়ে যাচ্ছ নাকি?' কে গুলিয়ে যাচ্ছে, আমি না। এ তো স্মৃতির এক আজব ঢঙ, কখনো অনেক সময় পর্যন্ত জড়িয়ে থাকে আর কিছু অনুভব করা যায় না, আর কখনো বা হঠাৎ লাফ দিয়ে সামনে চলে আসে আর হৃদয়কে দাবিয়ে ওঠে। এমনিতে বেশিরভাগ সময় তো দুঃখও দুঃখপূর্ণ হয় না। কেবল অভ্যাসবশত একটা ব্যথার মতো উঠে আসে হৃদয়ে। অভ্যাস তো এরকমই, যেমন শৈশবে সঙ্কোচবশত দাঁড়াতেই জামার পিছন দিক নিচের দিকে টানত, আর আজ পর্যন্ত যখন শৈশব পার হয়ে গেছে, সঙ্কোচ গেছে, তখনো খামাখাই হাত পেছনে চলে যায় জামার ধার টানার জন্য। সে অবস্থাই এই হৃদয়ের, কোনো স্মৃতি উঠে আসে আর হৃদয় অভ্যাসবশত ব্যথিত হতে থাকে। বেদনা ছাড়াই। অকারণে। অকাজে।
সামান্য কম্পিত পায়ে কল্পেশ আরো এক পেগ মাপে।
'সাহেব...' বৈরা দাঁড়ানো।
গর্দান খানিকটা সামনের দিকে নামায়, কবুতরের গর্দান ভেঙে গেলে যেমন হয়, কল্পেশ ধীরে মাথা ঘোরায়।
'বৈরা।' কত খেয়াল রাখে বৈরা তার। বর্ষায় কাপড় যখন আর্দ্রতার কারণে জড়িয়ে যায় আর কাপড়ের ওপর স্যাঁতসেঁতে দাগ পড়তে থাকে তখন বৈরাই সেগুলো বেলকনিতে ছড়িয়ে দেয়, একটু হাওয়া খেয়ে নিক। 'হ্যাঁ হ্যাঁ, ঠিক বলছ', কল্পেশ মাথা একটু অতিরিক্ত জোরে ওপর-নিচে নাড়াতে থাকে, 'আমি বেশি খাই না... আজই... নিয়ে যাও... এই বোতলই এখান থেকে সরিয়ে নাও... তালা দিয়ে বন্ধ করে রাখো... খুব বেশি না... কিন্তু হ্যাঁ, অন্যদিনের চেয়ে বেশি... এখন আর খাওয়া ঠিক নয়, একেবারেই না... এখন আর খাব না... তুমি যাও... শুয়ে পড়ো... থ্যাঙ্ক ইউ...।'
চেয়ার আবার জানালার সামনে টেনে নিয়ে এসে বসে পড়ে। ভাঙা দালান তো অন্ধকারে একেবারে বিলীন হয়ে গেছে। কেবল এখানে ওখানে জোনাকীর মতো বৃষ্টির ফোঁটা চমকাচ্ছে। ছাদে টানা ফাটলেও ফোঁটা এগুচ্ছে, 'টপ', মাথার পাশ দিয়ে গিয়ে চেয়ারের হাতলের ওপর পড়ছে, আবার এগোচ্ছে, আবার পড়ছে 'টপ'। হালকা ছিটা কল্পেশের মুখে ছড়িয়ে যায়। আশ্চর্য ব্যাপার, ছিটা এমনও হতে পারে যা সামান্যও ভেজা মনে হয় না!
কল্পেশ বসে থাকে। যাই বলো, এমন লাগাতার, একসুর, একলয় বৃষ্টিতে স্বস্তি পাওয়া যায় খুব। মায়ের আঁচলের মতো ছড়ানো, হাওয়ায় দুলে রিমঝিম বর্ষণ অসীম। কেবল শান্তিতে বর্ষিত হতে থাকে, এমন নয় যে হঠাৎ চমকে লাফিয়ে পড়ে, সহসা ধড়ফড় করে চমকে দেয়। ছাদের ওপর পানির ঘুমপাড়ানিয়া বেজে যায়। ফাটলে ফোঁটা এগোতে থাকে। এই অবস্থায় কত মধুর নিদ্রা আসে। ফোঁটা পড়ে, টপ। তারপর থামে। আবার পড়ে। টপ। টপ।
কল্পেশ ওপরে তাকায়। আরো জায়গায় ফাটল ধরতে শুরু করেছে। যেকোনো জায়গায় পানি পড়তে পারে। বৈরা চেয়ার-আসবাব সামলে বেড়ায়, এদের ওপর না আবার পড়ে। কবে থেকে বলছি ঠিক করিয়ে নিন, নইলে একদিন ছাদই যদি ধসে পড়ে?
বৈরার কথা মনে হলে কল্পেশ হঠাৎ উঠে বসে। ওর ঘরেও নয় তো? কল্পেশ ঘাবড়ে গিয়ে দেয়ালের ওপর দৃষ্টি ফেলে।
ছি! বেদনা-ভরা ব্যথায় মন ব্যথিত হয়ে ওঠে। বৈরা তার এত যত্ন করে আর সে এটুকু পর্যন্ত খেয়াল রাখে না তার কোনো কষ্ট হচ্ছে কিনা।
কল্পেশ সঙ্গে সঙ্গে দাঁড়িয়ে যায় এবং পরীক্ষা করার ঋজুতায় চলতে থাকে, মোজাইকে খোদাই করা রেখার ওপর একের পর এক সাবধানে পা রাখতে থাকে। পেছনের দরজা খুলে বারান্দায় বেরিয়ে যায়। গ্যারেজ খোলা, বাতিও জ্বলছে, কিন্তু তার ফাটক ভেতরের দৃশ্যকে ঢেকে রেখেছে।
'বৈরা!' কল্পেশ চীৎকার করে। 'বৈরা!' গলা-খেকারি দিয়ে চীৎকার করে! 'বৈরা' সে গলা ফাটায়।
বৃষ্টি তেমনি এক তালে চলছে।
বারান্দা থেকে গ্যারেজ পর্যন্ত সামান্য পথ। কল্পেশ হঠাৎ দৌড় দেয় এবং কয়েক মুহূর্ত ভিজে গ্যারেজের সামনে এসে পৌঁছায়। লোহার ফাটকের পেছনে চিক দেয়া। ভেতরে অস্থির নড়াচড়া।
'জী সাহেব...' বৈরা ফুর্তির সাথে বাইরে আসে, 'কিছু দরকার সাহেব?'
'ভেতরে আসব?'
'হুজুর!' বৈরা চিক তুলে দেয়।
কল্পেশ মুহূর্ত-খানেক ইতস্তত করে। ভেতরের মৃদু আলো, দড়ির খাট, আরাম-চেয়ার(যেসব সে ক্রুদ্ধ অবস্থায় দিয়ে দিয়েছে। দেখে মনে সেই অভ্যস্ত নিস্পন্দ ব্যথা উঠে) আর অগোছালো ছড়িয়ে থাকা গৃহস্থী। আরামদায়ক, সুখকর। ওপরে টিনের চালে বৃষ্টির ঘুমপাড়ানিয়া। বৈরার বউ, কী নাম বলেছিল ওর? একদিকে আড়ালে দাঁড়ানো।
'কিছু না...ব্যাস, জিজ্ঞাসা করতে এসেছিলাম, এখানেও ছাদ ভাঙতে শুরু করেনি তো?... কিন্তু এখানে তো টিনের ছাদ...'
'জী সাহেব...'
'পাকা করিয়ে দেব, যাতে এখানেও চুনা লাগে... হে হে হে...' মলিন হাসি ছোড়ে কল্পেশ, 'আমি তো অনেকক্ষণ ধরে ওখান থেকে চিৎকার করছিলাম, বৈরা-বৈরা।'
'সরি সাহেব! বৃষ্টির জন্য আমি শুনতে পাইনি।'
'ঠিক আছে। তাতে কী? ভালোই হল। এখানটা কেমন জানতামই না।।'
'বসুন সাহেব!'
বউ খাটের ওপর থেকে কাপড়চোপড় একদিকে সরাতে থাকে। হঠাৎ কল্পেশের দৃষ্টি কাপড়ের মধ্যে থেকে উঁকি দেয়া চোলীর ওপর পড়ে। অনায়াসে। অজান্তে। দৃষ্টি আটকে যায়। এক মুহূর্ত। এক দীর্ঘ মুহূর্ত, চোলী...!
'না না, পেরেশান হওয়ার প্রয়োজন নেই। আমি এমনিতেই বসে যাচ্ছি। বসব?'
চোখ বৈরার ওপর, নজর কোথাও কাপড়ের ওপর।
'আরে সাহেব! আপনারই তো সবকিছু।' বৈরা পুরো শিষ্টতার সঙ্গে কথা বলছে কিন্তু মনে মনে পেরেশান, কী করবে, কী করবে না।
'কোনো অসুবিধে নেই তো?' কল্পেশ গোছানো কাপড়ের কাছে বসে যায়। এক পা যখন খাটের ওপর তোলে তখন হাঁটু চোলী থেকে সামান্য দূর। দূর। কতটুকু দূর।
'না সাহেব, কোনো অসুবিধে নেই। সব আপনার কৃপা। আমরা অনেক আরামে আছি।
'হ্যাঁ হ্যাঁ, কেন হবে না। যখন বাড়িওয়ালী হাজির তখন তোমার কিসের চিন্তা?' কল্পেশ বউয়ের হেসে তাকায়।
কামনা ভরা দৃষ্টি হাঁটুতে ব্যাপ্ত হয়।
'কী বৈরা... বৃষ্টি তো এখন জোরদার হচ্ছে... ওপরওয়ালার কাজ দেখো... হয় দেবেই না আর নইলে ছাপ্পড় ফেড়ে দেবে... সব সমস্যার সমাধান মেরে... চার বছর আকালে মেরেছে... এখন বন্যায় মারার চেষ্টায়, পত্রিকা খোলো আর ব্যাস, পানি-পানির নিচে, এখানে পুল ভেঙে গেছে, ওখানে গ্রাম ভেসে গেছে... আশ্চর্য ব্যাপার... কিন্তু মানুষও খরায় এমন ত্রস্থ ছিল যে, পানির বিরুদ্ধে নালিশ মনে আনতেও ভয় পায়... মরছে কিন্তু হাসছে...'
বৈরা মাঝে মাঝে বলছে, 'জী সাহেব... ঠিক কথা সাহেব... একদম ঠিক... তবে খরিফ ফসল এবার ভালো হবে... কিন্তু এখন কিছুদিনের জন্য আকাশ পরিষ্কার হওয়া দরকার, নইলে কৃষক ফসল বুনবে কেমন করে... খুব বৃষ্টি হচ্ছে, পঞ্চাশ ইঞ্চির এলাকা, সত্তর ইঞ্চি তো এখনই হয়ে গেছে, লোকাল পত্রিকায় ছিল... হ্যাঁ, ধান রোপা হয়ে গেছে...'
কত কথা এই বৃষ্টির সাথে যুক্ত হয়ে গেছে। কেবল হাঁটুর বাঁকা দৃষ্টি চোলীর দিকে তাকিয়ে আছে। চোলী শহরের এই ব্লাউজ থেকে আলাদাভাবে বানানো, যেন বাটির ওপর রেখে কাপড় কেটেছে। চোলীর নিচে কিছু পরার প্রয়োজন হয় না। কিন্তু গ্রামের মেয়েরা শহরে পৌঁছে নতুন নতুন শহুরে সৌখিন কাপড় পরে! মেলা-খেলায় ঝুলে থাকে নীল, লাল, গোলাপী বডিস। চোখা-চোখা। এখন তো শহরের মেয়েরাও চোলীর নিচে কিছু পরে না। চোলীই পরে নেয়, কম কিসে!...
হাঁটুতে নামমাত্র কম্পন হয়, সামান্য নড়ে...এগোয়... চোলীর সাথে লেগে যায়। খানিকটা গলিত-গলিত উষ্ণতার মতো হাঁটুতে বইতে শুরু করে।
কোলের ওপর পড়ে থাকা কল্পেশের আঙুলে বাঁকা দৃষ্টি খুলে যায়। হালকা হালকা কামনায় জ্বলে।
'এরকম রাতে ঘুম তাড়াতাড়ি আসে।... এখন আমি কত তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ি... নইলে আগে বারোটা বাজা তো সাধারণ ব্যাপার ছিল... মেহমানই তখন যেতে শুরু করত...বৈরা তো জানে...' কল্পেশ বৈরার দিকে এমন ভাবে হেসে তাকায় যেন তাদের দুজনের মধ্যে অনেক গভীর গোপন কথা এটা।
গ্যারেজ থেকে ঘরের একটা অংশ দেখা যায়। কাচের দরজা এবং জানালা, ভেতরে চাইনিজ লণ্ঠনের মোলায়েম আলোতে খানা-পীনা, হাসি-গানের কাব্যিক আবহ, এখান থেকে আন্দাজ করা যায় নিশ্চয়ই। গভীর রাতে কখনো চা-কফির প্রোগ্রাম হয়। কিন্তু এগারোটা বাজলে বৈরার ছুটি, এগারোটার পর যা করবার নিজে করো। বৈরা এখানে এসে শুয়ে পড়ুক, চাইনিজ লণ্ঠন ঝুলতে দেখুক, যা খুশি করুক, চা এখন নিজের জিম্মায়।
আঙুলের মাঝে লালসায় তাকানো চোখ!
'চা খাবেন সাহেব?'
'কী বলো! চায়ের ব্যবস্থা আছে এখানে?'
'জী...'
'তাহলে এক কাজ করো, একটা বিড়িও খাওয়াও।'
'হুজুর...!' কিছুটা অস্থিরতা হয়। বৈরা বিড়ি আর দেশলাই খুঁজতে থাকে, তার বউ ভক করে স্টোভ জ্বালিয়ে চা বানাতে শুরু করে।
কেবল এক মুহূর্ত, ভরপুর, কল্পেশের অশান্ত আঙুলগুলো হালকাভাবে চোলী স্পর্শ করে, ধীরে ভাজ দূর করে, তারপর আস্তে আস্তে তার ওপর হাঁটু রাখে এবং চুপচাপ বিড়ি টানতে থাকে।
এই হালকা গরমে আর্দ্র ঘরে, টিনের চালে গুঞ্জরিত বৃষ্টির নিচে, বিড়ি আর চা খাওয়া সুখদ লাগছে। দিনের চাল, ফাটল ধরতে পারবে না। চুনা লাগবে, এমন কোনো ভয় নেই।
----------------------------------------------------------------------
টিকা-
*থাকো গিয়ে এখন এমন জায়গায় যেখানে কেউ থাকবে না
কথা বলবার মতো কেউ থাকবে না, সমভাষী কেউ থাকবে না
মির্জা গালিব
সর-আঁখোঁ পর: একটা সিরিয়ালের নাম বলা হচ্ছে। শিরোনামের শাব্দিক অর্থ 'শিরোধার্য'।
চিক: বাঁশের শলাকা দিয়ে তৈরি এক ধরনের পর্দা
লুজলুজা: হস্তপদবিহীন, বিকলাঙ্গ
চোলী: মেয়েদের এক প্রকার পোশাক যা কেবল শরীরের উপরিভাগ (বক্ষস্থল) ঢাকবার জন্য পরা হয় এবং যাতে নিচের দিকে লাগানো ডোর দিয়ে পিঠের দিকে টেনে বেঁধে রাখা হয়।
চুনা লাগানো ( হিন্দীতে 'চূনা লগানা'): ধোকা দেয়া, ক্ষতি করা সেই সূত্রে চুনা লাগার অর্থ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া বা ধোকা খাওয়া।
লেখক পরিচিতিঃ
কথাসাহিত্যিক, বুকার প্রাইজ় বিজয়ী
ভারতে থাকেন
অনুবাদ করেছেন
সফিকুন্নবী সামাদী


0 মন্তব্যসমূহ