মঙ্গলবার, ১৪ জুন, ২০২২

বুকার আন্তর্জাতিক পুরস্কারপ্রাপ্ত কথাসাহিত্যিক গীতাঞ্জলী শ্রীকে নিয়ে



স্মৃতি ভদ্র

সীমান্ত বিচ্ছিন্নতা নয় বরং দু’পাশের মিলনস্থল। প্রতিটি সীমান্তকে সেতুতে রূপান্তরিত করার আমার অদম্য ইচ্ছে——-গীতাঞ্জলী শ্রী।

বুকার ইন্টারন্যাশনাল পুরস্কার পাওয়া এই লেখিকার প্রকাশিত প্রতিটি বই ব্যবসায়িকভাবে অসফল। এই কথাটা বলার উদ্দেশ্য একটাই, গীতাঞ্জলী শ্রী হিন্দি ভাষার খুব জনপ্রিয় লেখক নন। অনেক সাধারণ পাঠকই তাঁর লেখার সাথে পরিচিত নয়। তিনি কখনই পাঠক তুষ্টির জন্য লেখেননি। বরং পাঠককে তিনি তাঁর ভাষার ঔদার্য্য দিয়ে আমন্ত্রণ জানান তাঁর লেখাটি আবিস্কারের জন্য।

‘রেত সমাধির’ বইয়ের জন্য লেখক গীতান্জলী শ্রী বুকার ইন্টারন্যাশনাল পুরস্কার পেয়েছেন। বইটি প্রকাশ হয়েছে ২০১৮ সালে। বইটির প্রকাশকের নাম রাজকমল প্রকাশন। এই রাজকমল প্রকাশন থেকেই তাঁর সবগুলি বই প্রকাশিত হয়েছে। বলা যায় কয়েক দশক ধরে রাজকমল প্রকাশন গীতান্জলী শ্রী’র সবগুলো ব্যবসায়িক অসফল বই প্রকাশ করে চলছেন। এ থেকেই বোঝা যায় সাহিত্যের প্রতি দায় একজন লেখকের যতখানি, ঠিক সমপরিমাণ দায় প্রকাশকেরও থাকতে হয়।

গীতান্জলী শ্রী’র ‘রেত সমাধী’ প্রথমে ফ্রেঞ্চ ভাষায় অনুদিত হয়, এরপর ইংরেজী ভাষায়। ইংরেজী ভাষায় অনুদিত বইটির নাম ‘টম্ব অফ স্যান্ড।

গীতান্জলী শ্রী লিখছেন দীর্ঘদিন ধরে। প্রায় তিন দশক ধরে তিনি লিখছেন।তাঁর প্রকাশিত প্রথম বইয়ের সময়কাল ৯০ দশক। আর তাঁরও বহু আগে থেকে তিনি পড়তেন। গীতান্জলী শ্রী বুকারের মঞ্চে পুরস্কার পাবার পরপরই ছোট্ট ভাষণে বলেন, দক্ষিণ এশিয় বহুমাত্রিক ভাষার সুবিশাল সাহিত্যকর্ম আর যুগ যুগ ধরে চলে আসা সাহিত্য পরম্পরার প্রভাব আমার সাহিত্যকর্মে সবসময় প্রতিফলিত হয়।

গীতান্জলী শ্রী বিভিন্ন সময়ে তাঁর সাহিত্যকর্ম নিয়ে আলোচনায় বারবার হিন্দি ভাষায় তাঁর পূর্বসূরী কৃষ্ণা সৌবতী’র নাম উল্লেখ করেছেন। ভাষার উত্থান পতন সম্পর্কে একজন লেখকের পরিপূর্ণ জ্ঞান থাকা কতটা জরুরী গীতান্জলী শ্রী’র ভাষায় তিনি তা শিখেছেন পুর্বসূরী লেখক কৃষ্ণা সৌবতির কাছ থেকেই।

আর ঠিক এ কারণেই গীতান্জলী শ্রী’র লেখায় আমরা বারবার খুঁজে পাই ভাষার অভুতপূর্ব ব্যবহার। তিনি শব্দ নিয়ে খেলতে পছন্দ করেন। তাঁর ভাষায়, শব্দ আসলে কি? এক একটি ধ্বনি ছাড়া আর কিছুই নয়,তাতে অর্থ ঝুলিয়ে দেওয়া হয়; যার কোনো প্রমাণ নেই। শব্দ নিজেই নিজের পথ বেছে নেয় অর্থপূর্ণ হওয়ার জন্য।

এই ক’টি লাইন থেকেই বোঝা যায়, ভাষার উপরে তাঁর দখল কতখানি।

‘ না, আমি উঠবো না; কম্বলের ভেতর গুঁটুসুঁটি পাকিয়ে যাওয়া বৃদ্ধাকে আর কম্বল থেকে আলাদা করা যায়না। বৃদ্ধাটি আরোও জেদের সঙ্গে আবার বললো, না, আমি এখন আর উঠবোই না!

এই ঘটনায় বাড়ির সবাই স্তম্ভিত হয়ে গেলো। সাথে সাথে বৃদ্ধার সন্তানদের জেদও বেড়ে গেলো কয়েকগুণ। তবে শুধু জেদ নয়, জেদের আড়ালে প্রতিটি সন্তানদের মনে ভয়ও হচ্ছে খুব।

হায়! বাবা মারা গেলেন আর সাথে সাথে যেনো মা’কেও নিয়ে গেলেন। 

সন্তানেরা আবার বলতে শুরু করলো, মা ওঠো।

সারাদিন শুয়ে থাকে, চোখ বন্ধ করে পড়ে থাকে—-চারদিকে ফিসফাস শুরু হয়ে গেলো।

বাবা যতদিন বেঁচে ছিলেন মা ততদিন সবকিছুতে উৎসাহ পেতেন। বাবার দেখাশোনা থেকে ঘরের কাজ সবকিছুতেই মাকে পাওয়া যেতো। মা যেন বাড়ির সকলের প্রাণ ছিলেন তখন। হবেইবা না কেন, সবার খুব কাছের ছিলেন যে মা।

আর এখন!

না, আমি উঠবো না!

যেন মা’র জীবনের সবকিছু অর্থহীন হয়ে গেছে বাবা ছাড়া।

সন্তানেরা আবার বলতে শুরু করে।

মা, ওঠো, বাইরে দেখো। কী সুন্দর রোদ! ওঠো দেখো তোমার হাতের লাঠিটা এখানে। ওঠো মা, ওঠো। 

জেদ ভুলে ক্লান্ত বৃদ্ধা মা এবার বলেন,

নারে, আমি আর উঠবো না, আর না।

সন্তানদের আর্জি এবার আর্তির মতো শোনায়,

মা আমার, ওঠো এবার।

আচ্ছা, মা কি কখনো ভেবেছে সন্তানদের এই আওয়াজ তাঁকে আরোও দেয়ালের দিকে ঠেলে দেয়। তা না হলে যতবার বৃদ্ধা একাকী ক্লান্ত মা’র ঘরের দরজায় পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়, ততবারই মা মুখ ফিরিয়ে নেয় দেয়ালের দিকে। সরে যায় দেয়ালের দিকে। প্রতিবার মা যেন মরে যায়। চোখ বন্ধ, নিঃশ্বাস ঢিমে, নিশ্চুপ ঠোঁট, স্বপ্ন-ইচ্ছে পাখির মতো উড়িয়ে দিয়ে সর্বশান্ত এক মায়ের শব হয়ে ওঠে প্রতিবার।’

‘রেত সমাধি’ বইয়ের এই লাইনগুলো উদ্ধৃত করলাম লেখক গীতান্জলী শ্রী’র শব্দ নিয়ে খেলার প্রবণতা বোঝাতে। এইক’টি লাইনে ‘ না আমি উঠবো না’ এই শব্দ ক’টির নানাভাবে ব্যবহার আমাদের কাছে প্রকট করে একজন বৃদ্ধা নিঃসঙ্গ নারীর মানসিক অবস্হাকে।

লেখক গীতান্জলী শ্রী ইতিহাসের ছাত্রী। তিনি ইংরেজি ভাষাতে পড়াশোনা করেছেন। ভালো ইংরেজি বলতে ও লিখতে পারেন তিনি। কিন্তু লেখা সময় তিনি বেছে নিয়েছেন হিন্দি ভাষাকে। তাঁর ভাষায়, আমি লিখতে চাই সেই ভাষায় যে ভাষায় আমার সকল চিন্তা, সকল অনুভূতিকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বয়ান করতে পারি। আর এটার জন্য আমার কাছে আমার মাতৃভাষা হিন্দির বিকল্প নেই।

গীতান্জলী শ্রী’র প্রথম উপন্যাস ‘মাঈ’। তিন প্রজন্মের নারী আর সেইসব নারীদের ঘিরে রাখা পুরুষদের নিয়ে লেখা এই উপন্যাসটি বেশ কয়েকটি ভাষায় অনুদিত হয়েছে। তার মধ্যে ইংরেজি অনুবাদও রয়েছে। আর এই ইংরেজী অনুবাদটিই ‘সাহিত্য একাডেমী ট্রানশ্লেসন’ পুরস্কার পায়। তাঁর আরেকটি উল্লেখযোগ্য উপন্যাস ‘ হামারি শহর উস্ বরস’। বাবরি মসজিদ ধ্বংস পরবর্তী ভারতীয় সমাজ এই উপন্যাসের মূল উপজীব্য। সাম্প্রদায়িকতা কীভাবে খুব নিঃশব্দে সাধারণ মানুষের জীবন আর সমাজে জায়গা করে নেয়, তা তিনি তাঁর শক্তিশালী ভাষায় বয়ান করেছেন। এই উপন্যাস দিয়েই মূলত তিনি হিন্দি সাহিত্যের নিবিড় পাঠকদের মনোযোগ আকর্ষণ করেন। এরপর তিন লেখেন ‘তিরোহিত’, হিন্দি সাহিত্য সমলৈঙ্গিক মানবিক সম্পর্ক নিয়ে একজন নারী লেখকের খুব সম্ভবত এটাই প্রথম উপন্যাস। এই উপনাস্য তিনজন নারীর দেখা তিনরকম জীবনের আখ্যান। একজন লেখকের সার্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গি ঠিক কতটা জরুরী তা যেন আমরা বুঝতে পারি এই আখ্যান আবিষ্কার করতে যেয়ে। 

আসলে লেখক গীতান্জলী শ্রী’র সাহিত্যকে খুব সহজভাবে ব্যাখ্যা করা যাবে এমন নয়। তিনি খুব গভীর চিন্তাকে সুক্ষ্ম অনুভূতি দিয়ে বয়ান করেন। এ জন্যই গীতান্জলী শ্রী’র যে কোনো রচনা বারবারই খুব মনোযোগী পাঠক দাবী করে। গীতান্জলী শ্রী তাঁর লেখায় সহজাত ভাষা দিয়ে এমন এক পৃথিবীর রচনা করেন যেখানে শব্দ বারবার সীমান্ত অতিক্রম করে হয়ে ওঠে সার্বজনীন আর আখ্যান হয়ে ওঠে সকলের।

গীতান্জলী শ্রী তাঁর প্রথম লেখা দিয়েই বুঝিয়ে দেন তিনি একজন ব্যতিক্রমী লেখক। ‘বেলপত্র’ তাঁর প্রথম ছোটগল্প। ৮০’র দশকের সামাজিক চড়াই উৎরাই এই গল্পের মূল উপজীব্য। এই লেখকের ছোটোগল্প সংস্করণের নাম ‘বৈরাগ্য’। এই বইয়ের প্রতিটি গল্পই ভারতীয় উপমহাদেশের পিছিয়ে পড়া মেয়েদের গল্প।

একজন লেখককে কতটুকু রাজনৈতিকভাবে সচেতন হতে হয়? প্রশ্নটি একজন মৌলিক লেখক আর পাঠক হিসেবে আমাকে সবসময় ভাবায়। আর এর উত্তরটি আমার কাছে এরকম, রাজনৈতিক সচেতনতা শুধু একজন লেখক নয়, বৈশ্বিক পৃথিবীর দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে সকলের থাকা দরকার। আর এই সচেতন বোধ একজন লেখকের অন্তর্দৃষ্টি দান করে। যে দৃষ্টি দিয়ে লেখক দেখতে পান ঠিক সেই দৃশ্যটি যেটি চোখের সামনে ঘটে যাওয়া ঘটনার অদৃশ্যে থাকে।

উপরে বলা প্রতিটি কথাই আমি খুঁজে পাই লেখক গীতান্জলী শ্রী’র মাঝে। শুধু সমাজ নয় কিংবা শুধু মানুষ নয়, তিনি লেখেন সীমান্তহীন এক পৃথিবীর গল্প।

লেখক গীতান্জলী শ্রী’র ভাষায়, আমার যে কোনো লেখা বা উপন্যাসের বীজ হয়তো একটি ছবি কিংবা একটি দৃশ্য। তাঁর ভাষায় ‘রেত সমাধি’ উপন্যাস তিনি লিখেছেন সারাদিন দেয়ালের দিকে মুখ করে চেয়ারে বসে থাকা ৯০ বছর বয়সী তাঁর মা’কে দেখে। লেখকের ভাষায়, সবকিছু থেকে আগ্রহহীন হয়ে যাওয়া অতীশিপর এই মানুষটি আসলে কী অগ্রাহ্য করতে চান? তাঁর সদ্য যাপিত জীবন নাকী তাঁর মৃত্যুকে? দেয়ালে সেঁধিয়ে যাওয়া বৃদ্ধ মানুষটি দেয়ালের বা সীমান্তের ওপাড়ে কোথায় ফিরতে চান? অনেক আগে ফেলে কোনো জীবন নাকী স্মৃতির প্রতি দায় মেটানোর কোনো অসমাপ্ত সময়ে?

লেখক গীতান্জলী শ্রী’র ভাষায়, এই প্রশ্নগুলোই তাঁর ‘রেত সমাধী’ উপন্যাসের বীজ। 

এই যে দেখার বাইরের ভূবন, দৃশ্যের আড়ালে অদৃশ্য সত্য’র আবিষ্কার করার প্রয়াস—-এটাই একজন লেখককে মহৎ করে তোলে। যা দেখছি, যা ঘটছে, যা দেখানো হচ্ছে তার বাইরে অনেককিছু আছে। একজন লেখকের দায় হলো নিজের বোধ দিয়ে সেই অদেখাকে আবিষ্কার করা।

আর লেখক গীতান্জলী শ্রী’র এই আবিস্কারই লেখক হিসেবে বারবার তাঁকে স্বতন্ত্র করে তোলে।

সংবেদনশীলতা যে কোনো লেখকেরা আরেকটি অন্তর্গত গুণ। সেই সংবেদনশীলতায় আঘাত না আসলে কোনো লেখকের কলমেই লেখা যোগায় না। আর এই সংবেদনশীলতা নিয়ে লেখক গীতান্জলী শ্রী’র ভাবনা খুব স্পষ্ট। তাঁর ভাষায়, প্রতিটি লেখকের উচিত তাদের অনুভূতিপ্রবণতার পরিচর্যা করা। অনুভূতিপ্রবণতা প্রতি মুহূর্তের অভিজ্ঞতায় আমাদের মনে জন্ম নেয়। এটা হুট করে আসে না। এটাকে লালন করতে হয় প্রতিটি লেখককে।

গীতান্জলী শ্রী’র এই কথাগুলোতে আমি খুঁজে পাই লেখক মান্টোর কথার প্রতিধ্বনি। দু’জন লেখকই সীমান্তকে বাঁধা নয়, মিলনস্থল বলতে চেয়েছেন বারবার।

আর ঠিক এ কারণেই রাজনৈতিক-সামাজিক পটভূমিকে তিনি ভাষা দিয়ে এমনভাবে ধরেন যেখানে তাঁকে অতিক্রম করে তাঁর সৃষ্ট চরিত্রগুলো সবসময় পাঠকের খুব কাছে চলে আসে। গীতাঞ্জলী শ্রী অভিজ্ঞতা আর কল্পনার মিশ্রণে এমন এক আখ্যানের পটভূমি রচনা করেন, যে আখ্যানে অতীত আর ভবিষ্যতের এক অভূতপূর্ব সমন্বয় হয়।

এসব আখ্যান এতই সুক্ষ্ম অনুভূতির যে দ্রুত পাঠনে তা ঠিকঠাক ধরা যায় না। তাই গীতাঞ্জলী শ্রী’কে পড়তে হয় রয়েসয়ে, সময় নিয়ে, বারবার।

২টি মন্তব্য:

  1. স্মৃতি, আপনার লেখার ভক্ত আমি বহুদিন ধরেই। আজ এই লেখাটি পড়ে আর একবার আপনার লেখার মায়ায় জডালাম। গীতান্জলি শ্রী এর লেখা পড়ার আগ্রহ তৈরি করে দিয়েছে আপনার এই আলোচনামূলক লেখাটি। অনেক অনেক ধন্যবাদ।

    উত্তরমুছুন
  2. অসংখ্য ধন্যবাদ

    উত্তরমুছুন