মূল: এজেডাইন সি ফিশার
অনুবাদ: এলহাম হোসেন
আমার বয়স তখন সম্ভবত বার। সে-বয়সে আমি প্রথম বার ইউসুফ ইদ্রিসের গল্প পড়ি। সে-সময় আমার ফুপির সঙ্গে থাকতাম। মা মিশর ছেড়ে কুয়েতে চলে গেছে। ওখানে বাবা কাজ করতো। লক্ষ লক্ষ অভিবাসী শ্রমিকের মতো আমার বাবা-মা আমাকে তাদের সঙ্গে নিতে পারলো না কুয়েত সরকারের ভিসা প্রদানের নিয়ম-কানুনের জটিলতার কারণে। একটা বিশেষ কারণে ফুপির সঙ্গে থাকাটা আমার জন্য আশীর্বাদে পরিণত হয়েছিল। সেটি হলো- আমি ওখানে পড়ার জন্য প্রচুর বই পেয়েছিলাম।
মানসুরা একটা ম্যাড়ম্যাড়ে শহর। এখানে না ছিল কোন বইয়ের দোকান, না ছিল কোন পাবলিক লাইব্রেরী। তবে আমার ফুপির এক মেয়ে কায়রোতে পড়াশুনা করতো। বাড়ি ফেরার সময় ও সঙ্গে করে বই নিয়ে আসতো। বাড়ি পৌঁছানো মাত্রই আমি ওর ব্যাগ হাতড়াতে শুরু করতাম-- অবশ্য ওর অগোচরে। আর এভাবেই আন্তন চেকভ, লুইগি পিরানডিলো, আর্থার মিলার, তৌফিক আল হাকিম এবং এঁদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইউসুফ ইদ্রিসের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। আমার সেই দিনগুলোর স্মৃতি আজও মনে পড়ে। একদিন ওর ব্যাগটা খুললাম। চকচকে সবুজ প্রচ্ছদে ঘন আকৃতির একটি ছবিতে চোখটা আটকে গেল। বইটির শিরোনাম ‘তলবকারী’: ছোটগল্প সংগ্রহ।
শিরোনামটা মনের ভেতর তোলপাড় তুললো। প্রায় একই নামের একটা সিনেমা সম্প্রতি টেলিভিশনে দেখানো হয়েছে। সেটার আগা মাথা অবশ্য খুব সামান্যই বুঝতে পেরেছি। আমাকে একেবারেই টানেনি। তবে বইয়ের ব্যাপারটা তো আলাদা। বই তো বই-ই। যাই হোক, লোভ সম্বরণ করতে পারলাম না। বইটা খুলেই এক নিঃশ্বাসে প্রথম অনুচ্ছেদটা পড়ে ফেললাম। একেবারে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে গেলাম:
দরজাটা খুলে বিভৎস দৃশ্যটা দেখে হামিদ একেবারে মরেই গেল। হ্যাঁ, মরেই গেল। একেবারে হা করে দাঁড়িয়ে রইলো। কী ভাববে, কী বুঝবে- কিছুই ঠিক করতে পারলো না। ওর শরীরটা অবশ হয়ে এলো। সারা দুনিয়া থমকে দাঁড়ালো। সব শেষ হয়ে গেল। হ্যাঁ, সব শেষ। ওর স্ত্রী ফাতিহা মেঝেতে শোয়া। ছোট্ট বাচ্চাটা ওর সঙ্গে ঝুলে আছে। ভয়ে চিৎকার করছে। ওর মাথায় কোন আচ্ছাদন নেই। ওর চুল ধরে বাচ্চাটা টানাটানি করছে। পা দুটো উলঙ্গ। আর ওর ওপর শুয়ে আছে জ্যাকেট পরা এক লোক। লোকটির পরনে পাজামাও নেই, অন্তর্বাসও নেই ওর পশ্চাৎদেশে-- ফাতিয়ার দুই উরুর মাঝখানে। সব শেষ। (অনুবাদ: নিজ)
এক বসাতেই গল্পের বাকিটা শেষ করে ফেললাম। আরবী ভাষায় এত প্রাণবন্ত বর্ণনা আগে কখনও পড়িনি। গল্পটা এতটাই মর্মস্পর্শী যে, এটি আমাকে ক্ষতবিক্ষত করে দেয়। একেবারে ধরে ফেলে। মধ্যবিত্ত নাক-উঁচু ভাবের বেলুন ফুটো করে দেয়। সেই সময়ের মধ্যবিত্তদের যে অহমিকা মিশরের প্রপঞ্চকে ঘিরে রেখেছিল, এটি তাকে চ্যালেঞ্জ করে। সরাসরি পাঠকের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করে। অন্তত পক্ষে আমার সঙ্গে তা ঘটেছিল। পড়ার সময় হামিদের যাতনা ও চুরমার-অবস্থা যেন আমি অনুভব করেছিলাম। দারিদ্রক্লিষ্ট একটি গ্রাম থেকে হামিদ তার পরিবারটিকে শহরে নিয়ে যায়। তারপর একে একে সব হারায়। এ-ও বুঝলাম, ফাতিয়া কিভাবে শহুরে জীবনের জৌলুস ও ফুর্তিতে আকৃষ্ট হয়ে সব হারিয়ে বসে। এই বিষয়টিই লোকটার মধ্য দিয়ে এবং তার সবিশেষ মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ভাস্বর হয়ে উঠেছে।
ইদ্রিসের গল্পে হামিদ যে দরজাটা খুললো সেই দরজাটাই তার জীবন তছনছ করে দিলো। এটি অবশ্য আমাকে উদ্দীপিত করেছে। সম্ভবত প্রতিটি ভালো গল্প যা দেখায় এটিও আমাকে তাই দেখিয়েছে। যে বা যারা সবকিছু ঠিকঠাক রাখার চেষ্টা করছে তাদেরই দোষে যে সবকিছু তছনছ হয়ে যাচ্ছে, তা কিন্তু নয়। এমন কিছু নেই যা দিয়ে হামিদের ক্ষতির খেসারত দেওয়া যায়। ফাতিয়ারও। নামবিহীন শিশুটারও। এই তিনজনের কথা যখন আমি গভীরভাবে চিন্তা করি তখন আমার মনে হয় মুক্তির একমাত্র পথ হলো গল্প বলে যাওয়া। আপাতদৃষ্টিতে দুর্লঙ্ঘনীয় দুর্দশার মধ্যে ইদ্রিসের গল্প আমাকে একটা সুন্দর পৃথিবী উপহার দিয়েছে। যদিও গল্পের অন্তর্নিহিত ভাব আমার বার বছরের শিশু-মনে দাগ কাটে না, তবুও এর মর্মস্পর্শী ভাষা, কল্পচিত্র, ছন্দ, রুক্ষ বাস্তবতা, মিশরীয় ট্রাজেডির স্বচ্ছ উপস্থাপনা আমাকে আজও মানুষের চিরন্তন পরিস্থিতির কথা মনে করিয়ে দেয়।
আমার পড়া ইউসুফের ছোটগল্পগুলোর প্রত্যেকটির সাধারণ কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। সেগুলো কোলাজ রচনাশৈলীর জন্য উল্লেখযোগ্য। ভাষা ব্যবহারে তিনি মিতব্যয়ী। অনাবশ্যক বিষয়-আশয় কঠোরভাবে এড়িয়ে গেছেন। যে অতিরঞ্জন ও অতিনাটকীয়তা তাঁর পূর্বে আরবী উপন্যাসে দেখা যেত, তা তিনি বর্জন করেছেন। যেকেউ তাঁর ছোটগল্পগুলোকে বিভিন্ন দৃশ্যে ভাগ করতে পারবে। সেগুলোর তেমন পরিবর্তন না করেই সিনেমাও বানানো যাবে। এর কোন কোনটা আবার একক দৃশ্যবিশিষ্ট গল্প। তবে আখ্যানের দিক থেকে বেশ শক্তিশালী।
তাঁর রচনাশৈলী এতটাই ধারালো যে, তাঁর ছোট ছোট বাক্য তাঁর গল্পের চরিত্রের নানান উপষঙ্গ চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলে। তাদের অঙ্গভঙ্গি, নড়াচড়া সবকিছুই সিনেমার দৃশ্যের মতো ফুটে ওঠে। ভেবেচিন্তে শব্দের ব্যবহারে কৃচ্ছতা সাধন করলেও তাঁর গল্পগুলো নান্দনিকতার দিক থেকে অসাধারণ। তাঁর ভাষাগত দক্ষতা এবং চোখের সামনে ভেসে ওঠা রূপকল্প মিশরের মানুষ ও সমাজের দুর্ভোগের চমৎকার, শক্তিশালী ও স্থায়ী চিত্র অংকন করেছে। আরবী উপন্যাসে নাগীব মাহফুজ যে জায়গায় পৌঁছেছেন, ছোটগল্পে ইউসুফ ইদ্রিস সেই জায়গায় পৌঁছেছেন। এরা দু’জন দু’টি স্বতন্ত্র ধারার প্রতিষ্ঠাতা। যদিও এরা একে অপরের প্রতি ক্ষোভ লালন করেন, তবুও এদের রচনায় বহু সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়।
ইদ্রিসের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য। এখান থেকেই তাঁর একরোখা ভাব ও বিদ্রোহী মানসিকতার ব্যাপারটা ফুটে উঠেছে। এখানে দাঁড়িয়ে তিনি প্রচলিত ধ্যান-ধারণার বিরোধিতা করেছেন এবং ক্ষমতা-কাঠামোর কঠোর সমালোচনা করেছেন। এই ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যই তাঁর রচনাকে আধুনিক করে তুলেছে। সমাজ ও মানুষের প্রতি ইউসুফ ইদ্রিসের দৃষ্টিভঙ্গি অনপেক্ষ নয়। তাঁর ক্যামেরার লেন্স কোন কিছুকেই ছাড় দেয় না। তাঁর দৃষ্টি সূক্ষ এবং তাঁর বিষয়বস্তুর নির্দেশনাও সুনির্দিষ্ট। সবসময় তিনি পাঠকের চোখ মিশরের দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতির সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকা মানুষদের দিকে। তিনি আমাদের চাকচিক্যময় শহরের একেবারে নীচ তলায় নিয়ে যান। সেখানকার স্বাদ, গন্ধ আর চেহারা দেখান। শহরের এই অন্ধগলি থেকে বেরিয়ে আলোতে আসার জন্য পথ অণ্বেষণ করতে পাঠককে উদ্বুদ্ধ করেন। তাঁর গল্পের বিষয়বস্তুর অস্থিমজ্জায় রয়েছে দারিদ্র আর বিচারহীনতার নির্মম চিত্র। ১৯৩০ এর দশক ও এর আগে-পরে মিশরের গ্রামাঞ্চলে দারিদ্র আর বিচারহীনতা ছিল স্বাভাবিক চিত্র। ইদ্রিসের অবস্থান এক্ষেত্রে পরিষ্কার। তিনি দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মেহনতি মানুষদের পক্ষে দাঁড়ান। এদের দুর্ভোগের কারণ উদঘাটন করেন। মিশরের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে তিনি এর কারণ খুঁজে পান। তাঁর চরিত্রগুলার মধ্যে দ্বন্দ্ব আছে। এরা বাস্তব জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সবসময় সংগ্রামরত। এরা বিশেষ কোন ছকে বাঁধা পড়ে না। যে কারণে পাঠক গল্প পড়ে শেষ করার পরও চরিত্রগুলো তাঁকে সঙ্গ দিতেই থাকে।
উদাহরণ স্বরূপ, ফাতিয়া শহরে বাস করতে আসা কোন মামুলি মহিলা নয়। তার ব্যক্তিত্বের মধ্যে বিশেষ একটি বৈশিষ্ট্য, দ্বান্দ্বিক দ্বক আবেগ ও দ্বিধা রয়েছে। সে রক্তমাংসের মানুষ। তার সঙ্গে পাঠকের যখন সাক্ষাৎ হয় তখন মনে হয় পাঠক যেন তাকে আগে থেকেই চেনে। তার চরিত্রের মধ্যে সর্বজনীনতা রয়েছে। যে দ্বিধা, দোদুল্যমানতা ও অনিশ্চয়তা মিশরকে অনেক দিন ধরে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখেছিল সেগুলোর বিরুদ্ধে সংগ্রামরত চরিত্রগুলোই তার গল্পের ক্যানভাসে ধরা দিয়েছে। মোদ্দা কথা হলো, তাঁর চরিত্র, তাদের সংগ্রাম ও তাদের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য মিশরের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিরই রূপকল্প বা মেটাফোর। এরা রক্তমাংসের সামাজিক প্রাণী।
প্রচলিত ধ্যান-ধারণার সঙ্গে ইউসুফ ইদ্রিসের সংশ্লিষ্টতা বোঝার জন্য তাঁর চরিত্রগলোর বিশ্লেষণ জরুরি। তিনি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ লেখক। মানুষের দুর্ভোগ আর জীবনের জটিল সব সমীকরণ নিয়ে রচিত হয়েছে তাঁর সাহিত্যকর্ম। ব্যক্তিস্বাধীনতা, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ও সম্ভবত মানুষের চিরন্তন সংগ্রামের বিশ্বাসযোগ্য বয়ান নির্মিত হয়েছে তাঁর সব গল্পে। তাঁর ছোটগল্প ‘দ্য কিউ’ এক্ষেত্রে একটি উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত হতে পারে। যখন তাঁর চরিত্রগুলোর সংগ্রাম সামাজিক প্রেক্ষাপটে পর্যালোচনা করা হয় তখন দেখা যায়, তিনি সমাজের প্রতি এবং তাঁর প্রতিশ্রুতির প্রতি আঁড়চোখে তাকাচ্ছেন। এ কারণেই মিশরের নেতা গামাল আবদেল নাসের ও তাঁর পরবর্তী নেতৃবৃন্দের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের খুব অবনতি ঘটে।
একই কারণে তিনি কমিউনিস্ট পার্টিরও সমর্থন হারান। অন্যান্য বামপন্থী দলও তাঁকে সমর্থন দেয় না। এদের তিনি তুলোধুনো করে ছেড়েছেন তাঁর ছোট উপন্যাস দ্য হোয়াইট - এ। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ, স্বাধীনতাবোধ ও সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ তাঁকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। প্রচলিত ভাবধারার সঙ্গে যখন ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের সংঘাত হয় তখনই প্রতিশ্রুতির ব্যাপারটা সামনে আসে। এই প্রতিশ্রুতি যেমন আছে ইউসুফ ইদ্রিসের রচনায় তেমনি আছে তাঁর বাস্তব জীবনেও।
ইউসুফ ইদ্রিস ভেবেছিলেন, তিনি মোটে এক দশক লেখালেখি করবেন আর বাকি সময় তিনি দেখবেন কিভাবে মিশর জেগে উঠছে। তবে নিজের স্বপ্ন নিয়ে হাসিঠাট্টা করার জন্য তিনি অবশ্য দীর্ঘ একটি জীবন পেয়েছিলেন। ইদ্রিসের চাইতে নাসের অপেক্ষাকৃত অল্প বয়সেই মারা যান। ইদ্রিস তাঁর স্বপ্নকে মুখ থুবড়ে পড়তে দেখেছেন। তবে উভয়েই তাঁদের উত্তরাধিকার রেখে গেছেন। রেখে গেছেন তাঁদের দর্শন ও এর সমর্থকদের।
আজ অনেকেই বিশ্বাস করেন, সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এবং স্বপ্নকে সামনে রেখে সুশৃংখল ও সক্রিয় অগ্রযাত্রায় মিশরের মুক্তি আসবে। অপরদিকে আমার মতো অনেক লোক আছেন যাঁরা ইউসুফের অনুসারী। আমি বিশ্বাস করি, মানুষের মুক্তির প্রধান উপষঙ্গ হলো স্বাধীনচেতনা, প্রতিবাদ এবং সৃজনশীলতা।
এ কথা সত্য, ইউসুফ ইদ্রিস আগাগোড়া একজন সাহিত্যিক। ইদ্রিসের গল্পগুলোর পঠন-পাঠনের মধ্য দিয়েই আমার আরবী উপন্যাসের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। যখন আমি ‘তলবকারী’ নামের ছোটগল্পসংগ্রহ বইটির খোঁজ পেয়েছিলাম তখন থেকেই আমি আরবী সাহিত্যের বড় বড় গ্রন্থের পঠন-পাঠন শুরু করি। আমি ইদ্রিসের মধ্যে আধুনিক আরবী শব্দের সন্ধান পেয়েছি। শব্দের অর্থ, এর সঙ্গে বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ ব্যঞ্জনার সংশ্লিষ্টতা আমার কল্পনার সঙ্গে জুড়িয়ে যায়। এ কাজ তিনি করেছেন মুন্সিয়ানার সঙ্গে। যদিও আমি শেষ পর্যন্ত উপন্যাস নিয়েই আছি তবুও তিনিই আমাকে লেখার ব্যাপারে আগ্রহী করে তুলেছেন। শুধু আমাকে নয়, আমার প্রজন্মের অনেক লেখককেই।


0 মন্তব্যসমূহ