মার্গারেট মিচেলে ধারাবাহিক উপন্যাস: আমার যেদিন ভেসে গেছে-- পর্ব ৩৩


ভাষান্তর: উৎপল দাশগুপ্ত

পরের দিন বিকেলে স্কারলেট আর ম্যামি যখন অ্যাটলান্টায় ট্রেন থেকে নামল, তখন বেশ জোরে ঠাণ্ডা হাওয়া বইছে, আকাশ কালো-ধূসর মেঘে ঢাকা। শহরটা জ্বালিয়ে দেবার পরে ডিপোটা আর নতুন করে নির্মাণ করা হয়নি। ট্রেন থেকে নেমে ওরা প্যাচপেচে ছাই আর কাদায় পা রাখতে বাধ্য হল। অভ্যেস মত স্কারলেট আঙ্কল পিটারকে আর আন্ট পিটির ঘোড়ার গাড়ির খোঁজার চেষ্টা করল। যুদ্ধের বছরগুলোতে টারা থেকে অ্যাটলান্টা ফেরার সময় প্রত্যেকবারই আঙ্কল পিটার গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করত। নিজের অন্যমনস্কতায় নিজেই বিরক্ত হল। আন্ট পিটিকে আগে থেকে জানায়নি, ফলে পিটারের ওখানে থাকার কথাই নয়। তার ওপরে বৃদ্ধার লেখা একটা চিঠির কথাও মনে পড়ল। দক্ষিণ আত্মসমর্পণ করার ঠিক পরেই আঙ্কল পিটার বুড়ো ঘোড়াটাকে নিয়ে আন্ট পিটিকে ম্যাকন থেকে অ্যাটলান্টায় ফিরিয়ে আনতে গেছিল। কান্নায় ভেঙে পড়ে আন্ট পিটি ঘোড়াটার মরে যাওয়ার খবর জানিয়েছিলেন।ডিপোর চারপাশে তাকিয়ে দেখল – চেনা পরিচিত কাউকে যদি পাওয়া যায় – যে ওদের আন্ট পিটির বাড়ি অবধি পৌঁছে দিতে পারে। সাদা বা কালো – নজরে কোনও চেনা মুখ পড়ল না। পিটির কথা সত্যি হলে, ওদের পুরনো চেনা পরিচিতদের মধ্যে কারোর কাছেই আর ঘোড়ার গাড়ি নেই। দিনকাল খুব কঠিন, যেখানে নিজের থাকা খাওয়ার জোগাড় করতেই মানুষ হিমসিম খেয়ে যাচ্ছে, একটা জানোয়ার পোষার প্রশ্নই ওঠে না। মিস পিটি সহ ওঁর প্রায় সমস্ত বন্ধুবান্ধবই আজকাল পায়ে হেঁটেই যাতায়াত করেন।

কয়েকটা ওয়াগনে মাল বোঝাই চলছে, কাদায় মাখামাখি বেশ কয়েকটা বগীগাড়িও রয়েছে, মুস্কো চেহারার অচেনা লোকদের হাতে লাগাম, তবে যাত্রীগাড়ি আছে মাত্র দুটো। বন্ধ গাড়ি একটা, আর অন্যটা খোলা, সেটাতে সুবেশা একজন মহিলা আর একজন ইয়াঙ্কি অফিসার বসে। ইউনিফর্ম দেখে স্কারলেটের দমবন্ধ হয়ে এল। পিটি অবশ্য লিখেছিলেন যে অ্যাটলান্টায় সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। রাস্তাঘাটে জওয়ানদের ঘুরতে ফিরতে দেখা যায়। তবুও নীল ইউনিফর্ম পরা লোক দেখে স্কারলেট চমকে গেল, সন্ত্রস্তও হয়ে উঠল। মনে হচ্ছে লড়াই যেন শেষ হয়ে যায়নি। এই লোকটা যে ওর পিছু নেবে না, বা ওকে লুট করবে না, বা অপমান করবে না, তার নিশ্চয়তা কী?

তুলনামূলকভাবে ট্রেনটাতে যাত্রীর ভিড় কমই ছিল। স্কারলেটের মন ফিরে গিয়েছিল ১৮৬২ সালের সেই সকালে – ক্রেপের কাপড়ে সর্বাঙ্গ ঢেকে, বিধবা বেশে, একঘেয়ে জীবনযাত্রায় ক্লান্ত – ও অ্যাটলান্টায় এসেছিল। সেদিন ছিল ঠাসাঠাসি ভিড়, ওয়াগন, জুড়িগাড়ি, অ্যাম্বুলেন্সের ভিড়। তার ওপর চেঁচামেচি, কোলাহল, হইচই। চেনামুখ দেখলেই একে অপরকে জড়িয়ে ধরে অভিবাদন জানানোর ঘটা। লড়াইয়ের সময় সেই হালকা হাস্যপরিহাসের দিনগুলো মনে পড়ে যায়। আর আজ আন্ট পিটির বাড়ি পর্যন্ত হেঁটে যেতে হবে ভেবেই ওর দীর্ঘশ্বাস পড়ল। অবশ্য পীচট্রী স্ট্রীট পর্যন্ত যেতে পারলেই একজন না একজন চেনা মানুষ পাওয়া যাবে, যিনি ওদের গাড়িতে করে আন্ট পিটির বাড়ি পৌঁছে দেবেন। ক্ষীণ একটা আশা মনে।

চারপাশে চোখ চালানোর জন্য দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতেই, গাঢ় বাদামী রঙের মাঝবয়সি একটা নিগ্রো বন্ধ গাড়িটা নিয়ে ওর দিকে এগিয়ে এল। তারপর মুখ বাড়িয়ে জিগ্যেস করল, “গাড়ি লাগবে ম্যাম? পঁচিশ সেন্টের বদলে “’ল্যান্টা’র যে কোনো জায়গায় নিয়ে যাব।”

ম্যামি দৃষ্টি দিয়ে ওকে প্রায় ভস্ম করে ফেলল।

“ভাড়ার গাড়ি!” গরগর করে উঠল। এই নিগার, তুই জানিস আমরা কারা?”

ম্যামি গ্রামে থাকে, তবে চিরদিন তো আর গ্রামে থাকত না, তাই ভাল করেই জানে ভদ্র বাড়ির মহিলারা ভাড়ার গাড়িতে যাওয়া আসা করেন না। বিশেষ করে সেটা যদি আবার বন্ধ গাড়ি হয় – আর পরিবারের কোনো পুরুষ অভিভাবক যদি সঙ্গে না থাকে। এমনকি সঙ্গে একজন নিগ্রো পরিচারিকা থাকলেও এই সংস্কার যথাযথভাবে পালিত হল বলে গণ্য করা হয় না। সতৃষ্ণ নয়নে স্কারলেটকে ওই ভাড়াগাড়িটার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে ম্যামি কটমট করে তাকাল।

“চলে এসে ওখান থেকে, মিস স্কারলেট! একে তো ভাড়াগাড়ি, তার ওপর আবার ছুট পাওয়া নিগার! একেবারে সোনায় সোহাগা!”

“কে বলল আমি ছুট পাওয়া নিগার,” বেশ গরম হয়েই লোকটা জবাব দিল। “বুড়ি মিস ট্যালবট আমার মালকিন, আর এটা ওঁরই গাড়ি। নিজেদের জন্য কিছু উপার্জন করার জন্যই এটা আমি চালাই।”

“কোন মিস ট্যালবটের কথা বলছিস?”

“মিলেজভিলের সুজ়ানা ট্যালবট। লড়াইতে বুড়ো মার্সের মারা যাওয়ার পর আমরা এখানে চলে এসেছি।”

“তুমি চেন ওঁকে, মিস স্কারলেট?”

“উহুঁ,” মুখ ভার করে স্কারলেট বলল। “মিলেজভিলের কজনকেই বা চিনি!”

“তাহলে হেঁটেই যেতে হবে আমাদের,” ম্যামি কড়া গলায় বলল। “এই নিগার, রাস্তা ছাড়!”

কার্পেটের ব্যাগটা হাতে তুলে নিল। ওতে স্কারলেটের ভেলভেটের নতুন পোশাক, বনেট আর রাত্রিবাস রয়েছে। নিজের জামাকাপড়ের পুটুলিটাও বগলে গুঁজে নিল। তারপর প্যাচপেচে ছাই আর কাদার ভেতর দিয়ে স্কারলেটকে তাড়া দিয়ে নিয়ে চলল। গাড়ি করে যাবার ইচ্ছে থাকলেও, স্কারলেট আর তর্কাতর্কি করে কথা বাড়াল না, কারণ ম্যামিকে এখন চটিয়ে দেওয়া সমীচীন হবে না। কাল সন্ধ্যেবেলা ভেলভেটের পর্দা হাতে ম্যামির কাছে ধরা পড়ার পর থেকেই ওর চোখে একটা কুটিল সন্দেহ উঁকি মারছে, যেটা স্কারলেটের একটুও ভাল লাগছে না। ওর খবরদারির হাত ফস্কে পালানোটা খুব সহজ হবে বলে মনে হচ্ছে না, আর খুব প্রয়োজন না পড়লে ম্যামিকে ঘাঁটটানোর বিন্দুমাত্র ইচ্ছেই ওর নেই।

সরু ফুটপাথ ধরে পীচট্রী স্ট্রীটের দিকে এগোতে এগোতে স্কারলেট হতাশ হয়ে পড়ল, মনটাও খারাপ হয়ে গেল। কী বিধ্বস্তই না দেখাচ্ছে শহরটাকে, যে শহরকে ও চিনত তার সঙ্গে কোনও মিলই নেই। সেই যেখানে অ্যাটলান্টা হোটেলটা ছিল – যেখানে রেট আর আঙ্কল হেনরি থাকতেন – কী সুরূচিসম্মত আসবাবপত্র – সেটা এখন একটা খোল আর আগুনে পুড়ে কালো হয়ে যাওয়া ভাঙাচোরা দেওয়াল। রেললাইনের দুই ধারে, প্রায় সিকি মাইল জুড়ে যে সব গুদাম ছিল, সেনাবাহিনীর জন্য রসদে ভরা থাকত, সেগুলোও আর নতুন করে তৈরি করা হয়নি। আয়তাকার ভিতগুলো শুধু মেঘলা আকাশের নিচে প্রেতাত্মার মত জেগে আছে। রাস্তার দু’পাশের অট্টালিকার দেওয়াল আর গাড়ি রাখার ছাউনিগুলো না থাকায় রেললাইনগুলো খালি খালি আর বেপর্দা লাগছে। আর এরই কোথাও, অন্যগুলোর থেকে আলাদা করে চেনা না গেলেও, স্কারলেটের নিজস্ব গুদামের ভগ্নাবশেষটাও আছে – চার্লসের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া গুদামটা। ওর হয়ে আঙ্কল হেনরি গত বছরের খাজনা মিটিয়ে দিয়েছিলেন। টাকাটা কোনো এক সময় ওকে ফেরত দিতে হবে। এটা নিয়েও ভাবনাচিন্তা করতে হবে।

পীচট্রী স্ট্রীটের ঢোকার জন্য মোড় ঘুরতেই ফাইভ পয়েন্টের দিকে চোখ পড়ল। মনে প্রচণ্ড ধাক্কা খেল, দীর্ঘশ্বাস পড়ল। ফ্র্যাঙ্ক অবশ্য বলেছিলেন যে বাড়িগুলো পুড়িয়ে মাটির সঙ্গে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে ধ্বংস যে এতটাই সামগ্রিক, সেটা ওর কল্পনাতেও আসেনি। এখনও চোখ বুজলেই, ওর ভালবাসার এই শহরে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা অট্টালিকার সারি আর সুদৃশ্য বাড়িগুলো ভেসে ওঠে। পীচট্রী স্ট্রীটকে খুব অচেনা লাগছে, সমস্ত লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য বিলুপ্ত হয়ে গেছে। মনে হল এখানে আগে কখনো আসেনি। প্যাচপ্যাচে এই রাস্তাটা – যুদ্ধের সময় যেখান দিয়ে কতবার গাড়িতে করে যাওয়া আসা করেছে, অবরোধের মধ্যে গোলাগুলি চলার ভয়ে, আতঙ্কে মাথা বাঁচিয়ে যে রাস্তা ধরে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ছুট লাগিয়েছে, পশ্চাদপসারণের দিন যে রাস্তা হয়ে আছে মানুষের তীব্র হতাশা আর আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পালিয়ে যাবার ব্যস্ততার সাক্ষী – সেই রাস্তাটা এতই অপরিচিত লাগছে যে ওর চোখ ফেটে জল বেরিয়ে আসতে চাইছে।

শহরে আগুন লাগিয়ে দিয়ে শেরম্যানের বাহিনীর চলে যাবার পরে আবার বেশ কিছু নতুন অট্টালিকা নির্মাণ যে হয়নি তা নয়, অনেক কনফেডারেট ফিরেও এসেছেন, তবুও ফাইভ পয়েন্টের আশেপাশে অনেক জায়গাই খালি পড়ে আছে। সেখানে জঞ্জাল, আগাছার স্তুপের ওপর ছাতা পড়া ভাঙাচোরা ইট ডাঁই করে রাখা আছে। দেখে মনে হল ওর চেনা কিছু অট্টালিকা আর বাড়ির ধ্বংসাবশেষ ওগুলো। ছাদহীন ভাঙা দেওয়ালের ওপর দিয়ে সূর্যের আলো এসে পড়ছে। চিমনিগুলো নিঃসঙ্গ হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। আশেপাশে তাকিয়ে দুয়েকটা চেনা দোকান নজরে পড়ল, যেগুলো কোনোক্রমে গোলাগুলি আর বিধ্বংসী আগুনের হাত থেকে আংশিকভাবে হলেও রক্ষা পেয়েছে। মেরামতও করা হয়েছে। ছোপধরা পুরনো দেওয়ালের ওপর ইটের নতুন লাল রঙ বেশি করে নজর কাড়ছে। নতুন নতুন দোকান আর অফিসঘরের সামনে কিছু কিছু নাম ওর চেনা লাগল, তবে বেশিরভাগ নামই আগে শোনেনি, বিশেষ করে অনেকগুলো ফলকের ওপরেই নাম না শোনা ডাক্তার, উকিল আর তুলো ব্যবসায়ীদের নাম। একটা সময়ে, অ্যাটলান্টার প্রায় প্রত্যেককেই ও চিনত। এখন এক সঙ্গে এতগুলো অপরিচিত নাম দেখে কষ্ট হতে লাগল। তবে রাস্তার ধার দিয়ে নতুন নতুন অনেক অট্টালিকা তৈরি হচ্ছে দেখে ভালও লাগল।

প্রায় বারো-চোদ্দোটা এই রকম বাড়ি, বেশ কয়েকটা আবার তিন তলার সমান উঁচু। সামনে যত দূর চোখ গেল, দেখল নির্মাণের কাজ কমবেশি চলছে। নতুন অ্যাটলান্টার সঙ্গে মনকে অভ্যস্ত করে নেবার চেষ্টা করল। হাতুড়ি পেটার আর করাত চালানোর শব্দ ভেসে আসছে, ভারা লাগানো রয়েছে, চউন-সুরকি আর ইটের ঝুড়ি কাঁধে নিয়ে লোকেরা সিঁড়ি বেয়ে উঠছে। প্রিয় রাস্তাটা বেয়ে দূরে তাকিয়ে রইল, কিছুই নজর এড়িয়ে গেল না।

“পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছে তোমাকে,” মনে মনে বলল, “তোমাকে একেবারে মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছে। কিন্তু তোমার মনোবল ভাঙতে পারেনি। তুমি আবার মাথা তুলে দাঁড়াবে, আগে তুমি যেমন ছিলে – কল্লোলিনী, তিলোত্তমা – আবার ঠিক সেরকমই হয়ে উঠবে তুমি!”

পীচট্রী স্ট্রীট ধরে এগিয়ে চলল। ম্যামি ওর পেছন পেছন হেলতে দুলতে আসছে। খেয়াল করল ফুটপাথে এখনও লোকজনের রীতিমত ভিড়, লড়াইয়ের দিনগুলোতে যেরকম ভিড় হত। এখনও সেই একই রকম ব্যস্তসমস্ত ভাব, কোলাহল। প্রথমবার যখন আন্ট পিটির কাছে এল – সে অনেকদিন আগের কথা – এই ব্যস্ততা, এই কোলাহল দেখে – ওর রক্ত টগবগ করে উঠেছিল। সেদিনের মতই আজও ওই কাদা প্যাচপ্যাচে রাস্তায় অজস্র যানবাহনের চলাচল, দেখা নেই কেবল কনফেডারেট অ্যাম্বুলেন্সের, দোকানের সামনে ঘোড়া আর খচ্চরগুলো ঠিক একই ভাবে বেঁধে রাখা। ফুটপাথগুলো লোকে লোকারণ্য, কিন্তু তার মধ্যে চেনা মুখ একটাও নজরে পড়ল না, নজরে পড়ল না একটাও চেনা সাইনবোর্ড, সমস্ত কাটখোট্টা নতুন নতুন পুরুষমানুষ আর জমকালো পোশাক পরা অচেনা সব মহিলা। অগুনতি নিগ্রো দেওয়ালে হেলান দিয়ে গুলতানি করছে, কিংবা মোড়ের মাথায় বসে শিশুসুলভ কৌতুহলী চোখ নিয়ে যানবাহনের আসা যাওয়ার সার্কাস দেখছে। রাস্তাগুলো মিশমিশে কালো হয়ে উঠেছে।

“ছুট পাওয়া গাঁইয়া ভূত নিগার যতসব,” নাক কুঁচকে ম্যামি বলল। “গাড়িঘোড়া জীবনে দেখেনি বলে মনে হয়। কী রকম নির্লজ্জ বেহায়া, দেখ একবার!”

সত্যি সত্যিই যে ওরা নির্লজ্জ বেহায়া, কথাটা স্কারলেটকেও মানতে হল। কেমন ড্যাবড্যাব করে ওর দিকে তাকিয়ে আছে! কিন্তু হঠাৎ নীল ইউনিফর্ম দেখে ওর চমক ভাঙল, ওদের কথা ভুলে গিয়ে নতুন করে সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ল। শহর ভর্তি ইয়াঙ্কি সৈন্য, ঘোড়ায় চড়ে, পায়ে হেঁটে, সেনাবাহিনীর ওয়াগনে চেপে, রাস্তায় টহল দিচ্ছে, পানশালা থেকে বেরিয়ে আসছে।

আমি ওদের কখনোই মেনে নিতে পারব না, মনে মনে ভাবল, তাত দুটো মুঠি পাকিয়ে উঠল। কোনোদিনও না! তারপর ঘাড় ঘুরিয়ে, “পা চালিয়ে চল, ম্যামি, এই ভিড় থেকে বেরোতে হবে।”

“ইচ্ছে তো করছে এই কালো জঞ্জালগুলোকে লাথি মেরে সামনে থেকে সরিয়ে দিই,” ম্যামি বেশ জোরে জোরেই বলে উঠল। একটা পাজি নিগার বদ মতলবে ওর পাশে ঘুরঘুর করছিল। কার্পেটের ব্যাগটা দোলাতে দোলাতে ম্যামি ওর দিকে তেড়ে যেতেই এক লাফে পাশে সরে গেল। “জায়গাটা আমার একটুকুও ভাল লাগছে না, মিস স্কারলেট। খালি ইয়াঙ্কি আর ছুট পাওয়া নিগারে গিজগিজ করছে!”

“একটু ফাঁকায় গেলে ভালই লাগবে। ফাইভ পয়েন্টটা পেরিয়ে যেতে দাও, ওখানটা এত খারাপ হবে না।”

ডেকাটুর স্ট্রীটের কাদার ওপর পাথর বিছানো পিছল পথ পেরিয়ে পীচট্রী স্ট্রীট ধরে ওরা এগোতে থাকল। ভিড় পাতলা হয়ে এল। ওয়েজ়লে চ্যাপেলের কাছে পৌঁছে স্কারলেট একবার তাকিয়ে দেখে একচোট হাসল, মুখটা ভার হয়ে উঠল। ১৮৬৪ সালে ডঃ মীডের কাছে দৌড়ে যাবার সময় এখানেই দম নেবার জন্য থেমেছিল। সন্দিগ্ধ চোখে সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে ম্যামি ওর চোখের দিকে তাকাল, কিন্তু কৌতুহল নিরসন হল না। কী ভয়ই না সেদিন ওকে পেয়ে বসেছিল, কথাটা মনে পড়তেই, অবজ্ঞায় মন ভরে গেল। ভয়ে ওর পা চলতে চাইছিল না, একেবারে জড়সড়ো হয়ে গেছিল – ইয়াঙ্কিদের ভয়ে, বিউয়ের জন্মের সময় এগিয়ে আসছে এই ভয়ে। আজ ভেবে অবাক হচ্ছে, কেন সেদিন এত ভয় পেয়েছিল, পটকা ফাটার আওয়াজ শুনে বাচ্চারা যেমন ভয় পেয়ে যায়, ঠিক সেই রকম। আর একেবারে শিশুর মতই ভেবে নিয়েছিল যে ইয়াঙ্কিরা, আগুনের লেলিহান শিখা আর পরাজয়ের চেয়ে চরম বিপর্যয় ওর জীবনে আর আসতেই পারে না! এলেনের মৃত্যু, জেরাল্ডের মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে যাওয়া, অনাহার, শীতে কষ্ট পাওয়া, হাড়ভাঙা খাটুনি আর নিরাপত্তার অভাব নিয়ে দুঃস্বপ্ন – এসবের তুলনায়, সেগুলো তো নিতান্তই তুচ্ছ ব্যাপার। আজ মনে হচ্ছে, সেনাবাহিনীর আক্রমণের সামনে সাহস দেখানোটা কত সহজ ব্যাপার! আর টারা আজ যে বিপদের মুখে পড়েছে, তার থেকে উদ্ধার পাওয়াটা কত কঠিন! নাহ্‌, এবার থেকে দারিদ্র্য ছাড়া আর কোনোকিছুতেই ভয় পাবে না।

পীচট্রী স্ট্রীট ধরে এগোতেই একটা ঝাঁপ বন্ধ গাড়ি আসতে দেখল। স্কারলেট তাড়াতাড়ি করে রাস্তার ধার ঘেঁষে দাঁড়াল। গাড়ির আরোহীকে চেনে কিনা জানার দুরন্ত কৌতুহল। আন্ট পিটির বাড়ি এখনও বেশ কয়েকটা ব্লক পেরিয়ে। ও আর ম্যামি ঝুঁকে পড়ে দেখতে লাগল। গাড়িটা কাছাকাছি এসে পড়েছে। স্কারলেট মুখটা হাসি হাসি করে রেখেছে, চিৎকার করে প্রায় ডেকেও ফেলেছিল। গাড়ির জানলা দিয়ে পলকের জন্য একজন মহিলার মুখ দেখতে পেল, পশমের সুন্দর টুপির নিচে টকটকে লাল রঙের চুল। দুজনের মুখেই চিনতে পারার অভিব্যক্তি। স্কারলেট এক ঝটকায় দু’পা পিছিয়ে এল। বেল ওয়াটলিং! দৃষ্টির বাইরে চলে যেতে যেতে নাসিকা স্ফীত করে অসন্তোষ ব্যক্ত করে গেল। কী আশ্চর্যের ব্যাপার, তাই না! বেলকেই কিনা প্রথম চেনা মুখ হতে হল!

“কে ও?” সন্দেহের সুরে ম্যামি জানতে চাইল। “তোমাকে জানত, তবুও নমস্কার করল না? বাপের জন্মেও চুলের ওই অদ্ভুত রঙ দেখিনি! এমনকি টার্লটনদের বংশেও দেখিনি! আমার মনে হচ্ছে – ওটা – মনে হচ্ছে চুলে রঙ করা হয়েছে!”

“হ্যাঁ, তাই,” কথা না বাড়িয়ে স্কারলেট বলে দিল। তারপর জোরে জোরে হাঁটা লাগাল।

“চুলে রঙ করা ওই মহিলাকে তুমি চেন? ও কে, সেটা জানতে চেয়েছিলাম।”

“এই শহরের খারাপ মেয়েমানুষ,” খুব সংক্ষেপে স্কারলেট বলল, “আর দিব্যি কেটে বলছি, ওকে আমি চিনি না, তাই মুখটা বন্ধ রাখ!”

“হায়, ভগবান!” ম্যামির দীর্ঘশ্বাস পড়ল। প্রবল কৌতুহলে দূরে মিলিয়ে যেতে থাকা গাড়িটার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকল। কুড়ি বছরেরও আগে এলেনের সঙ্গে স্যাভান্না ছেড়ে চলে আসার পর খারাপ মেয়েমানুষ আর দেখেনি। কেন যে আরও একটু ভাল করে নজর করে দেখল না!

“নিশ্চয় সুন্দর পোশাক পরেছে টাঙ্গাটা কী দামী, একজন কোচোয়ানও রয়েছে,” বিড়বিড় করে ম্যামি বলল। “খারাপ মেয়েমানুষদের এই রকম আয়েস আর সুখের জীবন এদিকে আর আমাদের মত ভালমানুষরা খিদেয় কাতরাচ্ছে, পায়ে দেওয়ার চপ্পলটাও নেই – ভগবানের এ কেমনধারা বিচার কে জানে!”

“ঈশ্বর আমাদের নিয়ে ভাবনাচিন্তা করা বহুদিন হল বন্ধ করে দিয়েছেন,” হিংস্র গলায় স্কারলেট বলল। “আর খবর্দার এটাও বলতে এসো না আমায় যে আমার কথা শুনে মা কবরের ভেতর নড়াচড়া করতে আরম্ভ করেছেন!”

স্কারলেটমনে মনে নিজেকে বেল-এর চেয়ে উঁচু আসনে বসাতে চাইল, নিজেকে বেল-এর চাইতে বেশি পবিত্র মনে করার চেষ্টা করল, মনের ভেতরটা খচখচ করতে লাগল। পরিকল্পনাটা কার্যকরী করতে পারলে বেল আর ও একই পথের পথিক হয়ে পড়বে, আর সেই একই লোকের দাক্ষিণ্যে। নিজের সিদ্ধান্তটা নিয়ে কোনও আফসোস না থাকলেও, মনে কিছুতেই শান্তি পাচ্ছিল না। “নাহ্‌, এসব নিয়ে এখন মাথা গরম করার সময় নয়,” এই ভেবে নিজেকে সান্ত্বনা দিয়ে আরও জোরে পা চালাল।

মীডদের বাড়িটা যেখানে ছিল সেই জায়গাটা পেরিয়ে এল। একটা কী দুটো পাথরের সিঁড়ি একা একা জেগে আছে এখনও, হাঁটা পথটা এক শূন্যতায় গিয়ে পড়ছে। হোয়াইটিংদের বাড়ির জায়গাটা এখন কেবল একখণ্ড জমি। ভিত, এমনকি ইটের তৈরি চিমনিগুলোও চলে গেছে। যে ওয়াগনে করে ওগুলো তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, সেই গাড়ির চাকার দাগ রয়েছে মাটিতে। এলসিংদের ইটের বাড়িটা এখনও দাঁড়িয়ে আছে। ছাদটা নতুন, তার ওপরে দোতলাটাও নতুন। বনেলদের বাড়িটা জোড়াতালি দিয়ে মেরামত করা। নুড়ি পাথরের বদলে কাঠের তক্তা দিয়ে ছাদটা সারানো হয়েছে। ভাঙাচোরা হলেও মোটামুটি মাথা গোঁজবার মত ঠাঁই করা গেছে বলেই মনে হয়। কিন্তু দুটো বাড়িরই জানলায় কারোর মুখ দেখা গেল না। মনে মনে একটু খুশিই হল স্কারলেট। এখুনি কারোর সঙ্গে দাঁড়িয়ে কথা বলতে ইচ্ছে করছিল না।

এরপর স্লেট পাথরের নতুন ছাদওয়ালা আন্ট পিটির লাল ইটের বাড়িটা দেখতে পেল। স্কারলেটের বুকটা ধকধক করে উঠল। ঈশ্বরের অপার করুণা, বাড়িটার মেরামতের অযোগ্য হয়ে যাওয়ার মত কোনো ক্ষতি হয়নি! আঙ্কল পিটার বাড়ির সামনের উঠোনে বেরিয়ে এল, হাতে একটা বাজারের ঝুড়ি। স্কারলেট আর ম্যামিকে ক্লান্তভাবে হেঁটে আসতে দেখে ওর কালো মুখটা অবিশ্বাস আর খুশির হাসিতে ভরে উঠল।

কালো রঙের ওই বুড়ো বোকা মানুষটাকে আমি চুমো খেয়ে ফেলতে পারি, স্কারলেট খুশি হয়ে উঠল। চেঁচিয়ে উঠল, “পিটার, শিগগির গিয়ে আন্ট পিটির মূর্চ্ছা ভাঙানোর বোতলটা বের করে আন! এটা সত্যি সত্যিই আমি!”

* * *

সেদিন রাতে আন্ট পিটির সাপারের টেবিলে সেই একঘেয়ে জলে সেদ্ধ করা ভুট্টার গুঁড়ো আর শুকনো মটরশুঁটি। খেতে খেতে স্কারলেট মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, আবার যখন ওর টাকাকড়ি হবে, তখন এই দুটো জিনিস আর কিছুতেই ওর খাবার টেবিলে থাকবে না। অনেক টাকাকড়ি ওকে কামাতেই হবে, যে কোনো মূল্যেই। প্রভূত অর্থ উপার্জন করতে হবে, কেবল টারার খাজনার টাকা জোগাড় করেই ক্ষান্ত হবে না, দরকার হলে মানুষ খুনও করতে পারে।

খাবার ঘরের ল্যাম্পের ম্যাড়ম্যাড়ে হলদে আলোয় বসে আন্ট পিটির কাছে ওঁর আর্থিক অবস্থার কথা জানতে চাইল। ক্ষীণ একটা আশা, চার্লসের পরিবার হয়ত প্রয়োজনীয় অর্থ ওকে ধার দিতে পারবেন। কথাটা খুব রাখঢাক না করেই স্কারলেট পেড়ে বসল, তবে নিজের মানুষের সঙ্গে মনের কথা বলতে পারার খুশিতে, প্রশ্ন করার স্থুলতাটা খেয়ালই করলেন না। চোখ থেকে অনেক জল ঝরিয়ে নিজের দুর্ভাগ্যের ব্যাখ্যান ্করে চললেন। কী করে যে ওঁর খামার, শহরের জমিজমা আর টাকাপয়সা উধাও হয়ে গেল তা উনি বুঝে উঠতেই পারছেন না। অন্তত ওঁর ভাই হেনরি ওঁকে সেরকমই বলেছেন। উনি নাকি খাজনার টাকা মেটাতে পারেননি। এই বাড়িটা ছাড়া সবই গেছে। আর পিটি যেখানে থাকেন সেটাকে কখনোই নিজের বলে মনে করেননি। এই বাড়িতে মেলানি আর স্কারলেটের সমান সমান ভাগ। ভাই হেনরি কোনোমতে এই বাড়ির খাজনার টাকাটা মিটিয়ে দিয়েছেন। খোরপোশের জন্য হেনরি মাসে মাসে ওঁকে অল্প কিছু টাকা দিয়ে থাকেন, তবে ওই টাকাটা হাত পেতে নিতে ওঁর খুবই লজ্জা লাগে। কিন্তু উপায়ও যে নেই!

“হেনরি বলে খাজনা নাকি এত বেড়ে গেছে যে সব দিকে কী ভাবে সামলে উঠবে বুঝতেই পারছে না। তবে সত্যি বলছে বলে মনে হয় না। টাকা ওর অনেকই আছে, আমাকে খুব বেশি দেওয়ার ইচ্ছে ওর নেই।”

স্কারলেট বুঝতে পারে আঙ্কল হেনরি একদম মিথ্যে বলছেন না। চার্লসের সম্পত্তির বিষয়ে যে দুটো চারটে চিঠি উনি স্কারলেটকে লিখেছেন, তার থেকেই এটা স্পষ্ট। বৃদ্ধ আইনজীবী প্রাণপণে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন যাতে এই বাড়িটা আর শহরের মধ্যিখানে একখণ্ড জমি যেখানে গুদামটা ছিল, এই দুটোকে বাঁচাতে, যাতে সব কিছু খোয়ানোর পরও ওয়েড আর স্কারলেটের জন্য এটুকু অন্তত থাকে। অনেক অসুবিধে করেই উনি এই দুটো সম্পত্তির খাজনা মিটিয়ে চলেছেন।

“সত্যি সত্যিই ওঁর বিশেষ টাকাপয়সা নেই,” হতাশ মনে স্কারলেট ভাবল। “ঠিক আছে, ওঁকে আর আন্ট পিটিকে নাহয় আমার হিসেব থেকে বাদি দিয়ে দিলাম। তার মানে রেট ছাড়া আর কেউই রইল না। আমাকেই কিছু একটা করতে হবে। কিন্তু এখনই এটা নিয়ে ভাবাটা ঠিক হবে না … য়াগে বরং আন্ট পিটিকে দিয়ে রেটের কথা তোলাই যাতে কথায় কথায় কাল ওঁকে এখানে নিমন্ত্রণ করার কথা আন্টির মাথায় ঢুকিয়ে দিতে পারি।”

হাসি হাসি মুখে আন্টির নরম থলথলে দুটো নিজের হাতে নিয়ে চটকাতে লাগল।

“আমার সোনা আন্টি,” ও বলল, “টাকা পয়সা নিয়ে আলোচনা করে মন খারাপ করে আর কী হবে? চল, ওসব ভুলে গিয়ে গিয়ে আমরা বরং এমন কিছু কথা বলি যাতে মন ভাল হয়ে যায়। তার চেয়ে তুমি নাহয় আমাদের পুরনো বন্ধুবান্ধবদের খবর বল। মিসেজ় মেরিওয়েদার আর মেবেল – ওঁরা কেমন আছেন? শুনলাম মেবেলের ছোট্ট ক্রিওল নাকি নিরাপদেই বাড়ি ফিরে এসেছে? আর এলসিংরা কেমন আছেন … আর ডঃ মীড?”

প্রসঙ্গ বদলে যেতেই পিটিপ্যাট খুশিতে ঝলমল করে উঠলেন। ওঁর শিশুসুলভ মুখ বেয়ে চোখের জল পড়াও বন্ধ হল। পুরনো প্রতিবেশীদের খবর বিস্তারিতভাবে বললেন – কে কী করছে, কী পরছে, কী খাচ্ছে, কী ভাবছে। রেনে পিকার্ড লড়াই থেকে ফেরার আগে পর্যন্ত কীভাবে মিসেজ় মেরিওয়েদার আর মেবেলকে পাই বানিয়ে ইয়াঙ্কি সৈন্যদের কাছে বিক্রি করে দিন গুজরান করতে হয়েছে, সেটাও গলার স্বরে আতঙ্কের রেশ টেনে জানালেন। কল্পনা করতে পারছ! এমন অনেকদিন হয়েছে যে কম করে দু’ডজন ইয়াঙ্কি মেরিওয়েদারের বাড়ির পেছনের উঠোনে পাই তৈরি হবার জন্য হন্যে হয়ে দাঁড়িয়ে আছে! এখন অবশ্য রেনে বাড়ি ফিরে এসেছে। একটা পুরনো ওয়াগন ভর্তি করে কেক, পাই আর বিস্কুট নিয়ে বিক্রি করার জন্য প্রতিদিন ইয়াঙ্কি ছাউনিতে যাচ্ছে। মিসেজ় মেরিওয়েদার বলেছেন আরও একটু টাকা জমাতে পারলে শহরের মাঝখানে একটা বেকারি খুলবেন। পিটি মোটেও ওদের সমালোচনা করতে চাইছেন না, কিন্তু তবুও – ইয়াঙ্কিদের সঙ্গে ব্যবসা করার চেয়ে – পিটি বললেন – উনি নিজে বরং উপোস করেই থাকতেন। উনি তো ঠিকই করে রেখেছেন, রাস্তায় কোনও ইয়াঙ্কি সৈন্য সামনাসামনি পড়লে, তাচ্ছিল্য দেখিয়ে যতখানি সম্ভব অপমান করে রাস্তার অন্য দিকে চলে যাবেন, যদিও বৃষ্টির দিনে ব্যাপারটা বেশ অসুবিধেজনক হয়ে পড়ে। স্কারলেট বুঝে নিল মিস পিটিপ্যাটের কাছে কনফেডারেসির প্রতি আনুগত্য দেখানোর জন্য যদি জুতোয় কাদাও লেগে যায়, সেটুকু আত্মত্যাগ করতে ওঁর একটুও আপত্তি নেই।

ইয়াম্নকিরা যখন শহরে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল, সেই সময়েই মিসেজ় মীড আর ডাক্তারবাবু গৃহহারা হয়ে গেছিলেন। সেই বাড়ি নতুন করে বানানোর মত টাকাও নেই ওঁদের, তাছাড়া ফিল আর ডার্সির মৃত্যুর পরে ইচ্ছেটাও চলে গেছে। মিসেজ় মীড বলেই দিয়েছেন উনি আর বাড়ি চান না, সন্তানসন্ততি, নাতিনাতনি না থাকলে কী বাড়িকে বাড়ি বলে মনে হয়? ওঁরা খুবই নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছেন, তাই এলসিংদের সঙ্গেই থাকছেন। বাড়ির ক্ষতিগ্রস্ত অংশটা এলসিংরা মেরামত করে নিয়েছেন। মিস্টার আর মিসেজ় হোয়াইটিংরাও ওখানে একটা ঘর নিয়েছেন। মিসেজ় বনেলও ওখানেই উঠে যাবার কথা ভাবছেন, যদি অবশ্য উনি নিজের বাড়িটা একজন ইয়াঙ্কি অফিসারের পরিবারকে ভাড়া দিতে পারেন।

“কিন্তু কী ভাবে ওঁরা সবাই একসঙ্গে গাদাগাদি করে আছেন?” স্কারলেট অবাক হয়ে বলল। মিসেজ় এলসিং আছেন, তারপর আবার ফ্যানি আর হিউ – ”

“মিসেজ় এলসিং আর ফ্যানি বসার ঘরে ঘুমোচ্ছে আর হিউ চিলেকোঠার ঘরে,” আন্ট পিটি বুঝিয়ে বললেন। বন্ধুবান্ধবদের হাঁড়ির খবর সব ওঁর নখদর্পণে। “সোনা, কথাটা তোমাকে বলতে একটু বাধো বাধো ঠেকছে – মিসেজ় এলসিং ওঁদের বলেন ‘পেয়িং গেস্ট’ কিন্তু,” পিটির গলা খাদে নেমে গেল, “সত্যি বলতে কী ওঁরা আসলে বোর্ডার ছাড়া আর কিছুই নন। মিসেজ় এলসিং আসলে একটা বোর্ডিং হউস চালাচ্ছেন! কী জঘন্য ব্যাপার, তোমার কী মনে হয়?”

“দারুণ ব্যাপার তো!” স্কারলেট বলে উঠল। “ইশ, টারাতেও আমরা যদি গত বছর বিনে পয়সার বোর্ডারের বদলে এরকম ‘পেয়িং গেস্ট’ পেতাম! তাহলে হয়ত টাকাপয়সার এত টানাটানি হত না।”

“কোন মুখে তুমি কথাটা বলতে পারলে, স্কারলেট? তোমার মা বেচারি টারায় আতিথেয়তার বদলে টাকা নেওয়ার কথা ভেবে কবরের ভেতর অস্বস্তিতে নড়াচড়া করতে আরম্ভ করেছেন! সন্দেহ নেই যে মিসেজ় এলসিং এই কাজ করতে একরকম বাধ্যই হয়েছেন। ওঁর সুক্ষ্ম সেলাইয়ের কাজ, বা ফ্যানির চিনেমাটির ওপর পেন্টিং বা হিউয়ের জ্বালানি কাঠ ফেরির টাকা থেকে ওদের সংসার আর চলছিল না। সোনার টুকরো হিউ জ্বালানি কাঠ ফেরি করছে! একবার কল্পনা কর তো! যার কিনা বড় উকিল হবার স্বপ্ন ছিল! আমাদের সোনার টুকরো ছেলেদের অবস্থা দেখে আমি কেঁদে কূল পাই না!”

টারার তামাটে আকাশের নিচে সারি সারি তুলোর চারার কথা স্কারলেটের চোখের সামনে ভেসে উঠল। হেঁট হয়ে ওদের লালনপালন করতে করতে পিঠ কেমন টাটিয়ে উঠত। আনাড়ি হাতে লাঙল চালানো, হাতের তালুতে ফোস্কা, সব মনে পড়ে গেল। তাই এতখানি সহানুভূতি হিউ এলসিং-এর পাওনা হয় না। কী নির্বোধই না এই পিটি বুড়ি, আর এমন দুর্দিনেও কী তোলা তোলা করে ওঁকে রাখা হয়েছে!

“কাঠ ফেরি করা যদি ভাল না লাগে, ওকালতি করতেই তো পারে? নাকি অ্যাটলান্টা থেকে আজকাল ওকালতি পেশাটাই উঠে গেছে?”

“কথাটা ঠিকই বলেছ, সোনা! ওকালতির ব্যবসা তো রমরমিয়ে চলছে। বলতে গেলে সবাই আজকাল সবার নামে মামলা ঠুকে দিচ্ছে। সবই তো জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে, ফলে জমিজমার সীমানা নিয়ে ধন্ধ তো আছেই। কেউই জানে না কার জমি কোথা থেকে শুরু হয়েছে আর কোথায় গিয়ে শেষ হয়েছে। তবে মামলা লড়লেও পারিশ্রমিক য়ার কোথায় পাচ্ছে? টাকাপয়সাই নেই কারোর কাছে! ফলে হিউকে কাঠ ফেরি করার কাজ নিয়েই থাকতে হচ্ছে … এই দেখ, আমি তো ভুলেই গেছিলাম! তোমাদের লিখেছিলাম কি? কাল সন্ধ্যেবেলা ফ্যানি এলসিং-এর বিয়ে, আর তুমি নিশ্চয়ই যাবে। তুমি যে শহরে এসে পড়েছ জানতেই পারবেন আর তুমি গেলে খুব খুশি হবেন। ওটা ছাড়া আরেকটা ফ্রক এনেছো তো? না, না, এটি ফ্রকটাও খুবই সুন্দর, সোনা, তবে কী বলব – একটু পুরনো পুরনো লাগছে, এই যা। ও আচ্ছা, একটা ভাল ফ্রক আছে তোমার? খুবই ভাল কথা - শহরটার পতনের পর এই প্রথম একটা সত্যিকারের বিয়ের অনুষ্ঠান হতে চলেছে অ্যাটলান্টায়। কেক আর ওয়াইনের বন্দোবস্ত আছে আর পরে একটু নাচগান। কিন্তু এলসিংরা কী ভাবে সব সামলে উঠবেন জানি না – ওঁরা এত গরীব হয়ে গেছেন!”

“ফ্যানি কাকে বিয়ে করছে? ভেবেছিলাম গেটিসবার্গে ডালাস ম্যাকলিওর মরে যাবার পর – ”

“সোনা, তুমি ফ্যানিকে খারাপ মনে কোরো না। তোমার মত বেচারা চার্লির স্মৃতি আগলে বসে থাকা কি সবার পক্ষে সম্ভব? কী যেন বেশ নামটা? একটু মনে করতে দাও। কিছুতেই আমার নাম মনে থাকে না – টম কিছু একটা হবে। ওর মাকে খুব ভাল করেই চিনতাম। লা’গ্রাঞ্জ ফিমেল ইনস্টিটিউটে একসাথে পড়তাম। লা’গ্রাঞ্জের টমলিনসনদের বাড়ির মেয়ে আর ওর মা ছিলেন – দাঁড়াও – প্যরকিন্স? পারকিন্স? পারকিনসন? হ্যাঁ, তাই। স্পার্টার মানুষ। খুবই ভাল পরিবার – তবুও – জানি না বলাটা ঠিক হবে কিনা – ভেবেই পাচ্ছি না ফ্যানি ওকে বিয়ে করতে রাজি হল কেন!”

“মানে, খুব মদটদ খায়, নাকি – ”

“আরে না, না, সেরকম কিছু নয়! খুবই ভাল ছেলে। একটা শেলে ফেটে গিয়ে নিচের দিকে চোট পেয়েছিল। পা দুটোতে কিছু একটা হয়ে গেছে – ফলে – ফলে – কথাটা বলতে খারাপই লাগছে – পা দুটো ফাঁক করে হাঁটতে হয়। এত বাজে দেখায় – হাঁটবার সময় ওকে খুবই কদর্য দেখায় – দেখে অস্বস্তি হয়। জানি না কেন ওকে বিয়ে করছে।”

“মেয়েদের একজন না একজন ছেলেকে বিয়ে করতে হবে।”

“করতেই হবে সেকথা কে বলল?” ভুরু কোঁচ করে পিটি বললেন। “কই আমাকে তো করতে হয়নি।”

“তোমার কথা বলিনি, সোনা আন্টি আমার! সবাই জানে তোমার কী চাহিদা ছিল এবং এখনও আছে! কেন, ওই যে বুড়ো জজসাহেব কার্লটন – আড়চোখে তোমাকে দেখতেন – এই সেদিন পর্যন্ত, আমি – ”

“এই স্কারলেট, চুপ, চুপ! ওই বোকা বুড়োটা!” পিটি খিলখিলিয়ে হেসে উঠলেন। মেজাজ আবার দুরস্ত। “তবে কিনা ফ্যানির এত চাহিদা ছিল – আরও ভাল কাউকে জোগাড় করতেই পারত। ওই টম কী যেন – ওকে ভালবাসে বলেও তো আমার বিশ্বাস হয় না। ম্যাকলিওরের মরে যাবার শোকটা ও কাটিয়ে উঠতে পেরেছে বলেও আমার মনে হয় না। তবে কী জানো, সবাই তো আর তোমার মত হতে পারে না! তুমি তো বেচারা চার্লিকে ছাড়া কারোর কথা ভাবলেই না। চাইলে তুমি কত বার বিয়ে করে ফেলতে পারতে। মেলি আর আমি তো প্রায়ই নিজেদের মধ্যে বলাবলি করি যে কীভাবে ওর স্মৃতি আঁকড়ে বেঁচে আছ, অথচ লোকে তোমার নামে কত আজেবাজে কথা রটায়।”

ওর প্রতি পিটির এই সরল বিশ্বাসের কথা শুনতে শুনতে স্কারলেট সুকৌশলে ওঁর অন্যান্য বন্ধুবান্ধবদের প্রসঙ্গ এক এক করে তুলতে লাগল। কথাবার্তাকে ক্রমশ রেটের প্রসঙ্গে নিয়ে যেতে ওর আর তর সইছিল না। এখানে পা রাখতে না রাখতেই, এত তাড়াতাড়ি রেটকে নিয়ে কথা বলতে শুরু করলে ভাল দেখায় না। বুড়ির মন হয়ত এমন সব খাতে বইতে শুরু করল যেগুলো এড়িয়ে যেতে পারলেই ভাল। রেট যদি ওকে বিয়ে করতে রাজি না হন, পিটির মনে অযথা সন্দেহ জাগাবার মত অনেকটা সময় থেকে যাবে।

একজন শ্রোতা পেয়ে আন্ট পিটি একেবারে বাচ্চাদের মত মনের সুখে বকবক করে চলেছেন। রিপাবলিকানদের দুষ্কর্মের জন্য অ্যাটলান্টার নাকি খুবই খারাপ দশা। ওদের বজ্জাতির কোনও শেষ নেই, আর সবচাইতে খারাপ হল ডার্কি বেচারাদের মাথায় ওরা কুবুদ্ধি ঢুকিয়ে দিচ্ছে।

“জানো তুমি, ওরা নাকি ডার্কিদের ভোট দিতে দেবে! এরকম বোকার মত কথা কস্মিনকালেও শুনেছ? যদিও - জানি না এসব নিয়ে এত ভাবছি বলেই হয়ত মনে হচ্ছে – আমার দেখা যে কোনো রিপাবলিকানের চেয়ে আঙ্কল পিটারের মাথা অনেক বেশি সাফ। সহবতও অনেক বেশি। ভোট দেবার কথা মাথাতেই আনবে না। অথচ এই সব কথা বলে ডার্কিদের মাথা ঘুরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কেউ কেউ এমন উদ্ধত হয়ে পড়েছে যে কী বলি। সন্ধ্যের পর রাস্তায় বেরনোটা আর মোটেই নিরাপদ নয়, এমনকি প্রকাশ্য দিবালোকেও ওরা মেয়েদের ঠ্যালা মেরে ফুটপাথ থেকে কাদায় ফেলে দিচ্ছে। কোনো ভদ্রলোক প্রতিবাদ করতে গেলেই তাঁকে গ্রেপ্তার করে নিচ্ছে আর – ওহো, তোমাকে বোধহয় বলাই হয়নি – যে ক্যাপটেন বাটলার জেলে রয়েছেন?”

“রেট বাটলার?”

খবরটা পেয়ে স্কারলেট নিঃসন্দেহে চমকে উঠল, তবু ওঁর নামটা ওকে নিজে থেকে তুলতে হল না বলে খুব স্বস্তিবোধ করল।

“তবে আর বলছি কী!” উত্তেজনার চোটে পিটির গাল লাল হয়ে উঠল। একেবারে সোজা হয়ে বসলেন। “একজন নিগ্রোকে খুন করার অপরাধে এই মুহূর্তে উনি জেলে বন্দী! ফাঁসিও হয়ে যেতে পারে! কল্পনা কর, ক্যাপটেন বাটলারের ফাঁসি!”

পলকের জন্য স্কারলেটের দম বন্ধ হয়ে এল, অসুস্থ বোধ করতে লাগল। মোটা বুড়ির দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। ওঁর কথায় স্কারলেটের প্রতিক্রিয়া দেখে উনি যারপরনাই পুলকিত।

“এখনও কিছু প্রমাণ করতে পারেনি অবশ্য। তবে কোনো সাদা মহিলাকে উত্ত্যক্ত করার জন্য কেউ একজন এই ডার্কিটাকে খুন তো করেছে, সেটা নিশ্চিত। ইদানিংকালে এতজন এই রকম বেয়াদব নিগ্রো খুন হয়েছে যে ইয়াঙ্কিরা রীতিমত খেপে উঠেছে। ডঃ মীড বলেছেন, রেটের বিরুদ্ধে ওদের হাতে কোনো প্রমাণ নেই, কিন্তু ওরা দৃষ্টান্তমূলক কিছু করার কথা ভাবছে। ডাক্তারবাবু বলেন, যদি ওঁকে ফাঁসি দেওয়া হয়, তাহলে সেটাই হবে ইয়াঙ্কিদের প্রথম একটা সৎ কাজ। কিন্তু, কে জানে – জানি না … আর দেখ মাত্র এক সপ্তাহ আগেই ক্যাপটেন বাড়লার আমার কাছে এসেছিলেন – এত সুন্দর একটা কোয়েলের পালকের ব্রাশ উপহার দিয়েছিলেন – তোমার কথাও জিজ্ঞেস করছিলেন – বলছিলেন অবরোধের সময় উনি তোমাকে এমন চটিয়ে দিয়েছিলেন যে জীবনেও তুমি নাকি ওঁকে ক্ষমা করবে না।”

“কতদিন জেলে থাকতে হবে?”

“কেউ জানে না। হয়ত ওঁকে ফাঁসিতে না ঝোলানো পর্যন্ত। তবে মনে হয়, ওঁর বিরুদ্ধে খুনটা প্রমাণ করতেই পারবে না। তবে দোষী কী দোষী নয় তাতে মনে হয় ইয়াঙ্কিদের কিছুই এসে যায় না, ফাঁসিতে চড়ানোর জন্য একজন কাউকে পেলেই হল। ওরা খুব খেপে আছে” – পিটির গলা রহস্যঘন হয়ে খাদে নেমে এল - “কু ক্লুক্স ক্ল্যানদের নিয়ে। তোমাদের কাউন্টিতেও ক্ল্যানরা আছে নাকি? আছে বলেই আমার বিশ্বাস, সোনা, তবে মনে হয়, তোমাদের – মেয়েদের – এসব কথা জানতে দেয় না। ক্ল্যান্সমেনদের বলা বারণ। ভূতের মত পোশাক পরে, ওরা রাতের অন্ধকারে টহল দেয়। জোচ্চোর কার্পেটব্যাগারদের আর বেয়াদব নিগ্রোদের ওপর চড়াও হয়। কখনো ওদের ভয় দেখিয়ে, হুমকি দিয়ে অ্যাটলান্টা ছেড়ে চলে যেতে বলে। তবে যদি বেয়াদবি করে, ওদের ওপর চাবুক চালায়, আবার কখনো” ফিসফিস করে পিটি বললেন, “ওদের মেরে ফেলে সবার নজরে পড়ার মত জায়গায় ফেলে রেখে যায়, কু ক্লুক্সের কার্ড ওদের ওপর ফেলে দিয়ে যায় … আর এর জন্য ইয়াঙ্কিরা রেগে অস্থির, কাউকে দিয়ে এমন দৃষ্টান্ত তৈরি করতে চায় … হিউ এলসিং অবশ্য বলছিল যে ওর মনে হয় না ক্যাপটেন বাটলারকে ওরা ফাঁসিতে ঝোলাবে। টাকাপয়সা কোথায় লুকিয়ে রাখা আছে সেটা উনি নিশ্চয়ই জানেন, কিন্তু কিছুতেই মুখ খুলছেন না। ওরা ওঁর মুখ খোলানোর চেষ্টা করছে।”

“টাকাপয়সা?”

“ও মা, তুমি জানো না? তোমাদের লিখেছিলাম না? নাহ্‌ সোনা, টারা নিয়ে তুমি একেবারে উদ্বিগ্ন হয়ে আছ, তাই না? ক্যাপটেন বাটলার যখন ফিরে এলেন – তরতাজা ঘোড়া লাগানো ঝকঝকে গাড়ি করে পকেটভর্তি টাকাপয়সা নিয়ে – শহর জুড়ে আনাকানি শুরু হয়ে গেল। চোখ টাটানোরই কথা, আমরা তখন পরের দিনের খাবার জুটবে কিনা তাই নিয়ে ভেবে মরছি। সবাই রীতিমত খেপে উঠল। ফাটকাবাজ একটা লোক, যে কিনা সারাক্ষণ কনফেডারেসির বদনাম করে গেছে, এত টাকা তার কাছে থাকবে কেন যখন আমাদের কাছে কানাকড়িও নেই! এত টাকা কোথায় পেলেন জানার জন্য সবার মনেই অনেক প্রশ্ন উঁকিঝুঁকি মারছিল – তবে জিগ্যেস করার সাহস কারোরই হয়নি। একমাত্র আমার ছাড়া – শুনে উনি তো হা হা করে হেসে উঠলেন, বললেন – ‘সৎভাবে যে নয় সে ব্যাপারে আপনাকে আশ্বস্ত করতে পারি।’ জানোই তো, ওঁর পেট থেকে কথা বের করা কী রকম মুশকিল।”

“চোরা কারবার থেকেই কামিয়ে থাকবেন নিশ্চয়ই – ”

“সেটা নিশ্চয়ই কামিয়েছেন, সোনা, অন্তত খানিকটা। তবে ওঁর কাছে সত্যি সত্যি যত টাকা আছে তার তুলনায় সে তো নামমাত্র। সকলেই, এমনকি ইয়াঙ্কিরাও, মনে করে, কনফেডারেট সরকারের সোনায় ওঁর কাছে কম সে কম কয়েক কোটি ডলার আছে – লুকনো আছে কোথাও না কোথাও।”

“কয়েক কোটি – সোনায়?”

“একবার ভেবে দেখ, বাছা, আমাদের কনফেডারেটের সোনা কোথায় হাওয়া হয়ে গেল? কয়েকজন লোক মিলে নিশ্চয় সরিয়ে থাকবে আর ক্যাপটেন বাটলার অবশ্যই সেই কয়কজনের একজন হবেন। ইয়াঙ্কিদের ধারণা, রিচমন্ড থেকে পালানোর সময় প্রেসিডেন্ট ডেভিসের কাছেই ওই সোনা ছিল। কিন্তু বেচারাকে ওরা যখন আটক করল, ওঁর কাছে এক কানাকড়িও ছিল না। যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবার পর, কোষাগার একেবারে শূন্য হয়ে গেছিল। সবাই ভেবে নিয়েছিল কয়েকজন চোরাকারবারি মিলে ওগুলো চুপচাপ সরিয়ে নিয়েছিল, কাউকে জানতেও দেয়নি।”

“কয়েক কোটি – সোনায়! কীভাবে সম্ভব – ”

“কয়েক হাজার গাঁঠ তুলো ক্যাপটেন বাটলার কনফেডারেট সরকারের হয়ে বিক্রি করবার জন্য ইংল্যান্ড আর ন্যাসাউ নিয়ে গেছিলেন, ঠিক কিনা?” পিটি বেশ বিজ্ঞের হাসি হেসে জিগ্যেস করলেন। “কেবল নিজের তুলো নয়, সরকারের তুলোও? আর যুদ্ধের সময় ইংল্যান্ডে তুলো কী দামে বিকোতো, সেটা জানো? যে দাম তুমি চাইবে, সেই দামেই! সরকারের মুক্ত প্রতিনিধি হিসেবে ওঁর কাজ ছিল তুলো বিক্রি করে সেই টাকা দিয়ে বন্দুক কিনে সেগুলো চোরাপাচার করে আমাদের জন্য নিয়ে আসা। তারপরে অবরোধে যখন খুব কড়াকড়ি হতে লাগল, তখন বন্দুক পাচার করা ওঁর পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ল। তুলো বিক্রির টাকার একশ ভাগের একভাগ টাকাও নিশ্চয়ই খরচ করে উঠতে পারেননি। ফলে ইংল্যান্ডের ব্যাঙ্কগুলোতে ক্যাপটেন বাটলার এবং অন্যান্য চোরাকারবারিরা সেই টাকা জমা দিয়ে অবরোধের কড়াকড়ি শিথিল হওয়ার অপেক্ষা করতে লাগলেন। তুমি নিশ্চয়ই আশা কর না যে ডলারগুলো ওঁরা কনফেডারেসির নামেই জমা করেছিলেন! ডলারগুলো এখনও ওখানেই আছে … আত্মসমর্পণের পর সবাই এই নিয়ে বলাবলি করছেন আর চোরাকারবারিদের কঠোর সমালোচনা করছে। ওই ডার্কিটাকে খুন করার অভিযোগে ইয়াঙ্কিরা যখন ক্যাপটেন বাটলারকে গ্রেপ্তার করল, তখন এই সব গুজব নিশ্চয়ই ওদের কানে গেছিল, কারণ ডলারগুলো কোথায় আছে জানার জন্য ওঁর ওপরে চাপ সৃষ্টি করছে। দেখ, কনফেডারেসির তহবিল এখন ইয়াঙ্কিদের প্রাপ্য – অন্তত ইয়াঙ্কিরা সেটাই মনে করছে। কিন্তু ক্যাপটেন বাটলার বলছেন যে উনি কিছুই জানেন না … ডঃ মীড বলেন যে আজ না হোক কাল ওঁকে ফাঁসিতে ঝোলানোই উচিত, তবে কিনা ওঁর মত চোর আর মুনাফাবাজদের জন্য ফাঁসিটা গুরু পাপে লঘু দণ্ড হবে – একি বাছা – তোমাকে কেমন যেন দেখাচ্ছে! মাথা ঘোরাচ্ছে নাকি? এই সমস্ত বলে আমি তোমাকে বিচলিত করে ফেললাম নাকি? আমি জানি উনি এক সময় তোমার প্রণয়ী ছিলেন, তবে মনে হয়েছিল অনেক আগেই তোমাদের ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছিল। সত্যি বলতে কী, আমি কোনোদিনই ওঁকে মেনে নিতে পারিনি – যেরকম ফন্দিবাজ মানুষ উনি – ”

“মোটেও উনি আমার বন্ধু নন,” কথাটা স্কারলেট বেশ জোর দিয়েই বলার চেষ্টা করল। “অবরোধের সময়, তুমি ম্যাকনে চলে যাবার পর, ওঁর সঙ্গে আমার ঝগড়া হয়ে গেছিল। কোথায় – উনি কোথায় আছেন এখন?”

“বড় চৌরাস্তার সামনের ফায়ারহাউসে।”

“ফায়ারহাউসে?”

আন্ট পিটি খিলখিল করে হেসে উঠলেন।

“হ্যাঁ, ফায়ারহাউসেই আছেন উনি। ইয়াঙ্কিরা এখন ওটাকে মিলিটারি জেল হিসেবে ব্যবহার করছে। চৌরাস্তার কাছে সিটি হলের চারপাশে ইয়াঙ্কিরা ছাউনি ফেলে থাকে। ফায়ারহাউস তো ওই রাস্তারই একপ্রান্তে। ক্যাপটেন বাটলার তার মানে ওখানেই আছেন। কথাটা কে বলেছিল, সেটা মনে পড়ছে না। কী রকম সেজেগুজে মানুষটা থাকতেন, সে তো তুমি জানোই – খুব বাবুগিরি করতেন। ইয়াঙ্কিরা ওখানেই ওঁকে আটক করে রেখেছে, স্নানও নাকি করতে দেয় না। প্রতিদিনই উনি জেদ করছিলেন, ওঁকে স্নান করতে দিতে হবে, শেষমেশ ওঁকে খুপরি থেকে বের করে এনে চৌরাস্তার কাছে ঘোড়াদের জল পানের জন্য যে চৌবাচ্চাটা রয়েছে সেখানে নিয়ে গেল। বাহিনীর সকলেই নাকি ওই চৌবাচ্চার জলেই স্নান করে! বলল, উনি এখানে নাইতে পারেন। উনি রাজি হলেন না। বললেন, ইয়াঙ্কিদের গায়ের ময়লার থেকে ওঁর নাকি দক্ষিণদেশের ময়লাই বেশি পছন্দের আর – ”

অবিরাম গতিতে চলতে থাকা বকবক স্কারলেট শুনছিল বটে, তবে কথাগুলো কানে ঢুকছিল না। দুটো মতলব ওর মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিল। যা ভেবেছিল, রেট বাটলারের কাছে তার চেয়েও বেশি টাকা আছে, আর উনি এখন জেলে। উনি জেলে আছেন আর ওঁর হয়ত ফাঁসি হতে পারে – এই দুটো ব্যাপার হিসেবটা বেশ খানিকটা বদলে দিচ্ছে, মানে সম্ভাবনাগুলো আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। রেটের ফাঁসি যেতে পারার খবরে ওর কোনো কষ্টই হচ্ছে না। টাকাটা ওর খুব প্রয়োজন, মরিয়া হয়ে গেছে সেই জন্য, এখন ওঁর চরম পরিণতি কী হতে পারে সেটা ভাবার সময় নেই। তার ওপর, ডঃ মীডের সঙ্গেও ও মোটামুটি সহমত যে ফাঁসিতে ঝোলাটা ওঁর জন্য গুরু পাপে লঘু দণ্ডই। যে মানুষ রাতের অন্ধকারে দুজন মহিলাকে পরস্পরের সঙ্গে লড়াই করতে থাকা দুই দল সৈন্যের মাঝখানে ছেড়ে দিয়ে পালাতে পারেন – এমন একটা আদর্শের হয়ে লড়াই করার মত হাস্যকর ছুতো দেখিয়ে, যে আদর্শ আগে থাকতেই হেরে বসে আছে – তাঁর ফাঁসিই হওয়া উচিত … জেলে থাকতে থাকতেই যদি ওঁকে বিয়ে করে ফেলতে পারে তবে ওঁর ফাঁসি যাওয়ার পর ওই কয়েক কোটি ডলার একেবারে ওর নিজের হয়ে যাবে। বিয়ে করা একান্তই যদি সম্ভব না হয়, তাহলে জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর ওঁকে বিয়ে করবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে – বা যে কোনো প্রতিশ্রুতি দিয়ে – কিছু টাকা ধার নিতে পারবে! আর তারপর যদি ওরা ওঁকে ফাঁসি দেয়, সেই ধার শোধ করার সময় আর কখনোই আসবে না।

কয়েক মুহূর্তের জন্য ইয়াঙ্কি সরকারের সদয় হস্তক্ষেপে বিধবা হতে পারার সুখস্বপ্নে বিভোর হয়ে রইল। কয়েক কোটি ডলার, সোনায়! টারার মেরামত করে ফেলতে পারবে, মজুর লাগিয়ে মাইলের পর মাইল জুড়ে তুলোর চাষ করতে পারবে। সুন্দর সুন্দর পোশাক কিনতে পারবে, যা খেতে মন চাইবে খেতে পারবে, স্যুয়েলেন আর কারিনও পারবে। ওয়েডকে পুষ্টিকর খাবার খাওয়াতে পারবে যাতে ওর শুকনো গাল দুট আবার ভরে ওঠে, ওর জন্য গরম জামাকাপড় কিনবে, একজন গভর্নেস রাখতে পারবে, তারপর বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে পড়াশুনা করতে পারবে … গরিবগুর্বোদের মত খালি পায়ে ঘুরে বেড়াবে না বা গণ্ডমূর্খ হবে না।

সহসা আন্ট পিটির একঘেয়ে বকবকানি থেমে গেল। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে বললেন, “কী বলছ, ম্যামি?” স্কারলেটের সুখস্বপ্নও ভেঙে গেল। দেখল ম্যামি দোরগোড়ায় এসে দাঁড়িয়েছে। হাত দুটো এপ্রনের তলায় রাখা, চোখে মর্মভেদী দৃষ্টি। কে জানে কতক্ষণ ম্যামি এভাবে দাঁড়িয়ে আছে! কতটা শুনেছে, কী কী লক্ষ্য করেছে, কে জানে! ওর ঝানু গনগনে দৃষ্টি দেখে মনে হচ্ছে হয়ত সবটাই!

“মিস স্কারলেটকে দেখে মনে হচ্ছে ও খুবই ক্লান্ত। মনে হয় এবার ওর ঘুমোতে যাওয়াটাই ঠিক হবে।”

“সত্যিই আমি খুব ক্লান্ত,” শিশুদের মত অসহায় দৃষ্টিতে ম্যামির দিকে তাকিয়ে ম্যামি উঠে দাঁড়াল। “মনে হচ্ছে একটু ঠাণ্ডাও লাগিয়ে ফেলেছি। আমি যদি কাল একটু বেলা পর্যন্ত ঘুমোই আর তোমার সঙ্গে না বের হই, তুমি কি কিছু মনে করবে? আমি অন্য কোনো সময় দেখা করে নেব, আর ফ্যানির বিয়েতে কাল সন্ধ্যেবেলা নিশ্চয়ই যাব। বেশি বাড়াবাড়ি হয়ে গেলে আর যেতে পারব না। একটা দিন শুয়ে থাকতে পারলে মনে হয় চাঙ্গা হয়ে উঠব।”

ম্যামির চোখে উদ্বেগের ছায়া। স্কারলেটের হাত ধরে আর ওর চোখের দিকে তাকিয়ে অবস্থাটা বুঝতে চেষ্টা করল। সত্যিই ওকে ঠিকঠাক লাগছে না। এতক্ষণের উত্তেজনা চলে গিয়ে ওকে রীতিমত ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে, কাঁপুনিও আসছে।

“তোমার হাতদুটো যে বরফের মত ঠাণ্ডা, বাচ্চা! চল শোবে চল। আমি তোমাকে গরম চা বানিয়ে দিচ্ছি, আর গরম সেঁক দিয়ে দিচ্ছি যাতে তুমি ঘেমে যেতে পার।”

“দেখ দেখি, একদম খেয়াল করিনি আমি!” বৃদ্ধা আফসোস করতে লাগলেন। চেয়ার ছেড়ে উঠে স্কারলেটের বাহুতে হাত বোলাতে লাগলেন। “কেবল বকবক করেই চলেছি, তোমার কথা না ভেবেই। কাল সারাদিন ধরে তুমি ঘুমোও বাছা – পরে আবার একসাথে বসে গল্প করব – ওহ্‌, না কাল তো হবে না! মিসেজ় বনেলকে কথা দেওয়া আছে, কাল ওর কাছে যাব। ও আর ওর রাধুনি দুজনেই সর্দিজ্বরে কাবু। তুমি এখানে আছ, ম্যামি, আমি খুব নিশ্চিন্ত বোধ করছি। কাল সকালে আমার সঙ্গে চল, একটু হাতে হাতে সাহায্য করতে পারবে।”

অন্ধকার সিঁড়ি বেয়ে স্কারলেটকে নিয়ে উঠতে উঠতে ওর ঠাণ্ডা হাত আর পাতলা জুতো নিয়ে রাগে বিড়বিড় করতে লাগল। স্কারলেটকে দুর্বল দেখাচ্ছে। তবে মনে মনে খুব খুশি। ম্যামির মন থেকে সন্দেহটা ভাল করে দূর করে ওকে যদি বাড়ি থেকে বের করতে পারে, তাহলে সোনায় সোহাগা। নির্বিঘ্নে বাড়ি থেকে বেরিয়ে রেটের সঙ্গে ইয়াঙ্কিদের জেলে গিয়ে দেখা করতে পারে। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে দূর থেকে মেঘের গর্জন ভেসে এল। সিঁড়ি বেয়ে ওঠবার পরিচিত ধাপে দাঁড়িয়ে ওর মনে হল যেন অবরোধের সময়ের কামানের আওয়াজ। কে জানে, হয়ত মেঘের গুরুগুরু ধ্বনি চিরকালের জন্যই ওর কাছে কামানের গর্জনের মতই শোনাবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ