পশ্চিম প্রান্তে লাল ইটের বাড়িগুলোতে যাদের বাস, তাদের মধ্যে বিরাট একটা অংশ সময়ের মতোই অস্থির আর চঞ্চল। তারা অনবরত বাসস্থান বদলায়। গৃহহীন বলেই অসংখ্য জায়গায় তাদের ঘর। চিরদিনই তারা যাযাবর--সাজানো এক ঘর থেকে অন্য এক ঘরে তারা ক্রমাগত শুধু ঘুরে বেড়ায়। অস্থায়ী তাদের আবাস, পরিবর্তনশীল তাদের হৃদয় আর মন । ... নাচ-গানের আসরে তারা গান গায় : ‘মধুময় এই ঘর'। নিজেদের গৃহ- দেবতাকেও তারা হাতবাক্সে বয়ে নিয়ে বেড়ায় ।
তাই হাজার হাজার মানুষের অস্থায়ী বাসস্থান এই বাড়িগুলোতে জড়িয়ে আছে অসংখ্য কাহিনী, যার অধিকাংশই নিঃসন্দেহে বৈচিত্র্যহীন। কিন্তু এই ভবঘুরে অতিথিদের ফেলে যাওয়া চিহ্ন অনুসরণ করে এগিয়ে গেলে, দু-একটি প্রেতাত্মার সন্ধান না পাওয়াটাই হবে বিস্ময়ের বস্তু।
একদিন সন্ধ্যাবেলা অন্ধকার ঘনিয়ে আসার পর এক যুবক এই জীর্ণ লাল বাড়িগুলোর দরজায় দরজায় ঘন্টি বাজিয়ে কাকে যেন খুঁজে বেড়াচ্ছিলো। দ্বাদশতম বাড়িতে এসে মানুষটা তার হাতের শীর্ণ বোঝাটা সিঁড়িতে নামিয়ে রেখে, টুপির কানা আর কপাল থেকে ধুলো মুছে নিলো। ঘন্টির শব্দটা খুব অস্পষ্ট শোনালো—যেন বহু দূরে কোনো এক জনহীন নিতল শূন্য গহ্বরে বেজে উঠেছে ঘণ্টিটা ।
ঘন্টি বাজাবার পর দ্বাদশতম এই বাড়িটার দরজায় যে তত্ত্বাবধায়িকাটি এসে হাজির হলো, তাকে দেখে যুবকের মনে হলো মহিলা যেন অতিরিক্ত গুরু ভোজনে অসুস্থ হয়ে পড়া একটা কৃমিবিশেষ, যে তার বাদামের শাঁসটাকে নিঃশেষে খেয়ে ফেলে শূন্যগর্ভ খোলাটার মধ্যে এখন কিছু বাসিন্দাকে ভোজ্য বস্তু হিসেবে রেখে দিতে চাইছে ।
যুবক জানতে চাইলো, বাড়িতে ভাড়া দেবার মতো কোনো ঘর আছে কি না ৷
‘ভেতরে আসুন’, যেন গলার অন্তস্তল থেকে মহিলার কণ্ঠস্বর বেরিয়ে এলো—মনে হলো ওর গলার ভেতরে যেন পশমের একটা আস্তরণ রয়েছে।
‘চারতলায় পেছনের দিকের ঘরটা এক হপ্তা ধরে খালি রয়েছে। সেটা দেখতে চান?’
মহিলাকে অনুসরণ করে যুবক সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতে লাগলো। কোনো অজানা উৎস থেকে আসা সামান্য একটু ক্ষীণ আলো হলঘরের ছায়ার আঁধারকে খানিকটা স্বচ্ছ করে তুলেছে। সিঁড়িতে পেতে রাখা গালচেটাকে মাড়িয়ে নিঃশব্দে উঠছিলো ওরা। গালচেটা একদিন যে তাঁতে বোনা হয়েছিলো এখন সেই তাঁতটি গালচেটার অবস্থা দেখলে হয়তো সেটাকে সৃষ্টি করার দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করতো। গালচেটা এখন যেন উদ্ভিদ হয়ে উঠেছে, যেন এই জঘন্য রোদহীন পরিবেশে সেটা পচে গলে ছত্রাক কিংবা ছড়িয়ে পড়া শ্যাওলা হয়ে এখানে-সেখানে ইতস্তত গজিয়ে উঠেছে সিঁড়ির ধাপগুলোতে——জৈব পদার্থের মতো চটচট করছে পায়ের তলায়। সিঁড়ির প্রতিটা বাঁকেই দেয়ালের মধ্যে কতকগুলো শূন্য কুলুঙ্গি। হয়তো একদিন ওগুলোতে ফুলগাছ বসানো ছিলো। যদি তাই হয়, তাহলে এই অস্বাস্থ্যকর দূষিত বাতাসেই তারা মরে গেছে। কিংবা একসময় হয়তো ওখানে সাধু- সন্তদের মূর্তি ছিলো—কিন্তু এটা অনুমান করে নেওয়া কঠিন নয় যে ভূতপ্রেত আর শয়তানের দল তাদের অন্ধকারের ভেতর দিয়ে টেনে-হিঁচড়ে অপবিত্র পাতালের কোনো সুসজ্জিত গহ্বরে নামিয়ে নিয়ে গেছে।
‘এই হচ্ছে ঘর,’ তত্ত্বাবধায়িকা খসখসে গলায় বললো। ‘সুন্দর ঘর। প্রায় কখনই খালি থাকে না। গত বছর গ্রীষ্মকালে কয়েকজন দারুণ ভদ্র ভাড়াটে পেয়েছিলুম—কোনো ঝামেলা হয়নি, এসেই ভাড়াটা আগাম মিটিয়ে দিয়েছিলো। জলের ব্যবস্থা হলঘরের শেষদিকে। স্প্রাউলস আর মুনি এই ঘরটা তিন মাসের জন্যে ভাড়া নিয়েছিলো। ওরা নাচগানে ভরা একটা নাটকও করেছিলো। মিস ব্রিটা স্প্রাউলস— হয়তো নামটা শুনেছেন— হ্যাঁ, ওটা ওর মঞ্চের নাম। ঠিক ওখানটাতে, সাজগোছ করার টেবিলটার ঠিক ওপরেই, ওদের বিয়ের প্রমাণ-পত্রটা টাঙানো ছিলো—ফ্রেমে বাঁধানো। এই হচ্ছে গ্যাসের ব্যবস্থা। আর দেখতেই পাচ্ছেন, পোশাক ছাড়ার ঘরটাতেও যথেষ্ট জায়গা। ঘরটা প্রত্যেকেরই পছন্দ হয়, কখনও বেশি দিন খালি পড়ে থাকে না।’
'আপনার এখানে নাট্য জগতের অনেক লোকজনই থাকে বুঝি?' যুবক জিজ্ঞেস করলো।
'তারা আসে, যায়। আমার ভাড়াটেদের মধ্যে অনেকেই নাট্য জগতের সঙ্গে জড়িত। আজ্ঞে হ্যাঁ, এটা থিয়েটার পাড়া। অভিনেতারা কখনই এক জায়গায় বেশি দিন থাকে না। তারা আসে আর চলে যায়— তবে আমি আমার পাওনাটা পেয়ে যাই।'
এক সপ্তাহের ভাড়া অগ্রিম দিয়ে যুবক ঘরটা ভাড়া নিলো। বললো, সে ক্লান্ত-- এক্ষুণি ঘরের দখল নেবে। তারপর গুনে গুনে টাকা দিলো । মহিলা জানালো, ঘরের সমস্ত কিছুই তৈরি আছে—এমন কি জল আর তোয়ালে পর্যন্ত। যুবক যে প্রশ্নটা সর্বদা নিজের জিভের ডগায় নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, মহিলা ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার সময় সহস্রতমবার সে সেই প্রশ্নটাই উচ্চারণ করলে! ।
'একটি অল্পবয়সী মেযে, মিস ভ্যাশনার-- মিস এলোয়া ভ্যশনার – আচ্ছা, এই নামে আপনার কোনো ভাড়াটে ছিলো কি না, মনে পড়ে? সম্ভবত সে মঞ্চে গান গাইতো। ফর্সা, মাঝারি লম্বা, ছিপছিপে চেহারা মাথায় লালচে সোনালি চুল আর বাঁদিকের ভুরুর কাছে একটা কালো জড়ুল। '
‘না, ওই নামের কাউকে তো মনে পড়ছে না! নাটকের লোকেরা তাদের ঘরের মতো নামটাও ঘনঘন বদলায়। ওরা শুধু আসে আর যায়। নাঃ, ওই নামটা আামার মোটেও মনে পড়ে না।'
না। সর্বদাই শুধু না। পাঁচ মাস অবিরাম জিজ্ঞাসাবাদের জবাবে অনিবার্য সেই 'না'। দিনের বেলা কত অজস্র সময় কেটে গেছে থিয়েটারের ম্যানেজার, এজেন্ট, স্কুল আর সমবেত নৃত্য-গীতে অংশগ্রহণকারীদের প্রশ্ন শুধিয়ে। আর রাতগুলো কেটেছে এমন সমস্ত সস্তা নিচু শ্রেণীর রঙ্গালয়ে দর্শকদের সঙ্গে বসে, যেখানে ওর দেখা পাবার কথা ভাবতেও সে ভয় পেয়েছে। সে ওকে সব চাইতে বেশি ভালোবাসতো। আর এখন সে-ই ওকে খুঁজে পাবার চেষ্টা করছে। বাড়ি থেকে ও উধাও হয়ে যাবার পরমুহূর্ত থেকেই সে সুনিশ্চিত ছিলো, জলবেষ্টিত এই শহরটাই কোথাও না কোথাও ওকে লুকিয়ে রেখেছে। কিন্তু গোটা শহরটাই যেন একটা ভয়ঙ্কর চোরাবালি, এর কোনো ভিত নেই—আজ যে স্তরটা ওপরের দিকে রয়েছে, কালই সেটা তলিয়ে যায় পিছল নরম কাদার গভীরে।
আসবাবে সাজানো ঘরটা তার শেষতম অতিথিটিকে কপট আতিথেয়তার প্রাথমিক দীপ্তি নিয়ে সন্দেহজনক চরিত্রের কোনো মহিলার কপট-সুন্দর হাসির মতো এক রুগ্ন ক্লান্ত আন্তরিকতাবর্জিত অভ্যর্থনা জানালো। কৃত্রিম স্বাচ্ছন্দ্যের আবহাওয়া ফটে উঠছিলে। ঘরের জীর্ণ আসবাব, সোফা আর দুটো কুর্সির ছেঁড়া মখমলের গদি, দুটো জানলার মাঝখানে এক ফুট চওড়া একফালি সস্তা আরশি, দেয়ালে ঝোলানো দু-একটা ছবির গিল্টি করা ফ্রেম আর এক কোণে রাখা একটা পেতলের বাতিদানে প্রতিফলিত হওয়া আলোর আভাসে।
নতুন অতিথি একটা কুর্সিতে শরীর এলিয়ে নিস্পন্দ হয়ে বসে পড়লো আর ঘরটা যেন মুখর হয়ে উঠলো অর্থহীন কথকতায়—যেন এক হট্টগোলের হাটে ঘরটার অবস্থান, যেন তার বিচিত্র ভাড়াটেদের সম্পর্কে সে আলাপ করার চেষ্টা করতে লাগলো অতিথিটির সঙ্গে।
তরঙ্গিত একটা জীর্ণ মাছরের মাঝখানে হরেক রঙের একখানা গালচে বিছানো — ঠিক যেন সমুদ্রে ঘেরা, উজ্জ্বল ফুলে ঝলমলে হয়ে থাকা ছোট্ট একটা আয়তাকার বিষুবীয় দ্বীপ। ধূসর হয়ে ওঠা দেয়াল-কাগজগুলোতে সেই সমস্ত অতি পরিচিত ছবি—হ্যুগেনট প্রেমিক, প্রথম বিবাদ, বিয়ের প্রাতরাশ, ঝরনার পাশে প্রজাপতি—যা গৃহহীন মানুষকে এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে ক্রমাগত ভাড়া করে বেড়ায়। অ্যামাজন অঞ্চলের প্রগলভ নর্তকীর অপ্রশস্ত কটিবস্ত্রের মতো ছোট্ট এক টুকরো রুচিহীন পর্দা দিয়ে তাপচুল্লির প্রকট তাকটাকে কোনোমতে আড়াল করে রাখা হয়েছে। সেখানে দু-একটা সস্তা ফুলদানি, অভিনেত্রীদের কয়েকটি ছবি, একটা ওষুধের শিশি আর কয়েকটা তাস এলোমেলোভাবে ছড়ানো—ডুবন্ত জাহাজের মানুষ যেমন অন্য কোনো জাহাজে চেপে নতুন বন্দরের উদ্দেশ্যে রওনা হবার সময় নিজেদের মালপত্র ফেলে রেখে চলে যায়, এ ঘরে সাময়িকভাবে আশ্রয় নেওয়া মানুষরাও ওগুলো তেমনি করে ফেলে রেখে গেছে।
সাঙ্কেতিক লিপির অক্ষরগুলো ক্রমশ যেমন একটা একটা করে পরিস্ফুট হয়ে ওঠে, তেমনি এই আসবাবে সাজানো ঘরে অতিথিদের ফেলে যাওয়া ছোটো ছোটো চিহ্নগুলোও ক্রমশ অর্থময় হয়ে উঠতে লাগলো। সাজগোছের টেবিলের সামনে গালচেটার জীর্ণ দশা দেখে বোঝা যায়, বহু সুন্দরী নারী এখানে এসে দাড়িয়েছে। দেয়ালের গায়ে আঙুলের ছোটো ছোটো দাগগুলো বলে দেয়, এ ঘরের অভাগা বন্দীরা বাইরের রোদ আর বাতাসের স্পর্শ পাবার জন্য পথ খোঁজার চেষ্টা করতো। বিস্ফোরিত বোমার ছায়ার মতো দেয়ালের গায়ে ছলকে ওঠা কোনো জলীয় পদার্থের দাগটা জানিয়ে দেয়, পানীয় সমেত কোনো গ্লাস বা বোতল ওখানে আছাড় মেরে চুরমার করে ভেঙে ফেলা হয়েছিলো। দেয়ালের আরশিটাতে হীরে দিয়ে আঁকাবাঁকা অক্ষরে একটা নাম লেখা—'মেরি'। মনে হয় এঘরের নিদারুণ শীতলতায় এখানকার বাসিন্দারা ধৈর্য হারিয়ে ক্রুদ্ধ হয়ে উঠতো এবং তাই এই ঘরের ওপরেই তারা গায়ের ঝাল মিটিয়েছে। আসবাবপত্রগুলো চলটা ওঠা, বিবর্ণ ও ক্ষতবিক্ষত। স্প্রিং-বেরিয়ে পড়া সোফাটার বিকৃত অবস্থা দেখে মনে হয় যেন একটা ভয়ঙ্কর দানব কোনো বীভৎস শারীরিক আক্ষেপে আক্রান্ত অবস্থায় নিহত হয়েছে। হয়তো তার চাইতেও মারাত্মক কোনো আলোড়ন তাপচুল্লির ওপরে মর্মর পাথরের তাকটা থেকে বেশ বড়োসড়ো একটা টুকরোকে বিচ্ছিন্ন করে নিয়েছে। মেঝের পাটাতনের প্রতিটা তক্তার আর্তনাদ একেবারে আলাদা এবং তাদের যন্ত্রণাবোধও ভিন্ন ভিন্ন। ভাবতে গেলে অবিশ্বাস্য বলে মনে হয় -- অথচ যারা কিছুদিনের জন্যে এখানে এসে বাসা বেঁধেছে, তারাই হিংস্র বিদ্বেষে এমন ক্ষতবিক্ষত করে তুলেছে ঘরটাকে। হয়তো ঘর বাঁধার সহজাত প্রবৃত্তিটা প্রবঞ্চিত হয়েছিলো বলেই মেকি গৃহদেবতারা তাদের মধ্যে ক্রোধের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিলো আর তাই এই ঘরের ওপরেই তারা নিজেদের আক্রোশ প্রকাশ করেছে। আসলে নিজের ঘরটা যদি কুঁড়েঘরও হয়, তাহলে সেটাকেও আমরা ঝেড়ে মুছে সাজিয়ে-গুছিয়ে আনন্দ পেতে পারি।
তরুণ ভাড়াটেটি কুর্সিতে বসে মনে মনে যখন এই সমস্ত কথা ভাবছে তখন কিছু শব্দ আর কিছু গন্ধ ঘরের মধ্যে ভেসে এলো। একটা ঘর থেকে সে চাপা অসংযত হাসির আওয়াজ শুনতে পেলো। অন্য ঘরগুলো থেকে শোনা যাচ্ছিলো স্বগত ভৎর্সনা, পাশা-ঘুঁটি ঝাঁকানোর আওয়াজ, ঘুমপাড়ানি গান আর এক- ঘেয়ে একটা কান্নার আওয়াজ। ঠিক ওপরের ঘরটা থেকে একটা ব্যাঞ্জোর উৎসাহী ঝঙ্কার ভেসে আসছিলো। কোথায় যেন সশব্দে একটা দরজা বন্ধ হয়ে গেলো। উঁচু লাইনের ওপর দিয়ে মাঝে মাঝেই ট্রেন ছুটে যাচ্ছে সগর্জনে। পেছনের বেড়ার ওপর থেকে একটা বেড়াল করুণ সুরে ডাকলো । নিঃশ্বাসের বাতাসে তরুণ যেন বাড়িটার ঘ্রাণ পেলো—ঠিক ঘ্রাণ নয়, যেন একটা স্যাঁৎ- সেঁতে গন্ধ—যেন ভূগর্ভের ঘর থেকে ভেসে আসা ঠাণ্ডা পচাগলা জিনিসের দুর্গন্ধের সঙ্গে মিশে থাকা মেঝেতে বিছানো তৈলাক্ত লিনোলিয়াম আর ছাতা-পড়া পচা কাঠের ভ্যাপসানো গন্ধ ।
তরুণ ওই ভাবেই বসেছিলো— হঠাৎ মিন্যনেত ফুলের তীব্র মধুর সুগন্ধে ঘরটা ভরে উঠলো। বাতাসের একটি মাত্র দমকে এমন সুনিশ্চিত সুস্পষ্ট যার সুরভিত তার উপস্থিতি যে মনে হলো যেন সপ্রাণ কোনো আগন্তুক ঘরে এসে ঢুকলো। মানুষটা চিৎকার করে উঠলো, 'বলো, সোনা!' তার মনে হলো, কেউ যেন তাকে ডাকলো--তাই লাফিয়ে উঠে ঘুরে দাড়ালো সে। সুতীব্র সেই
নির্যাস মানুষটাকে জড়িয়ে ধরলো, ঘিরে রাখলো তার সমস্ত অস্তিত্ব। তাকে ধরার জন্যে দু হাত বাড়িয়ে দিলো মানুষটা, সময় সম্পর্কে তার সমস্ত বোধ যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে গেলো। একটা সুগন্ধ কি করে মানুষকে এমন সুনিশ্চিত ভঙ্গিতে ডাক দিতে পারে, যে ডাক অবহেলা করা যায় না? একটা শব্দ নিশ্চয়ই হয়েছিলো। কিন্তু সেই শব্দটাই কি তাকে স্পর্শ করেনি, তাকে সোহাগ জানায়নি ?
'ও এখানে ছিলো!' চিৎকার করে উঠলো যুবক। ঘর থেকে মেয়েটির কোনো চিহ্ন খুঁজে বের করার জন্যে চকিতে উঠে দাড়ালো সে। কারণ সে জানতো যে জিনিস ও স্পর্শ করেছে, যে জিনিস একদিন ওর ছিলো—তা অতি তুচ্ছ হলেও সে ঠিকই চিনতে পারবে। কোত্থেকে ভেসে এলো মিন্যনেতের এই সৌরভ যা এখন সর্বত্র এমন করে ছড়িয়ে পড়েছে, যে নির্যাস ওর অমন প্রিয় ছিলো, যে সুগন্ধকে ও একেবারে নিজস্ব করে নিয়েছিলো ?
ঘরটাকে এলোমেলোভাবে কোনো রকমে গুছিয়ে রাখা হয়েছে। সাজ- গোজের টেবিলে পাতলা স্কার্ফ টার ওপরে আধ ডজন চুলের কাঁটা ছড়ানো । ওরা মেয়েদের বন্ধু, কাজের জিনিস—কিন্তু ওদের দেখে আলাদা করে চেনা যায় না। তাই ওদের পরিচয়হীনতা সম্পর্কে সচেতন হয়েই যুবক ওদের উপেক্ষা করলো। দেরাজ-আলমারীর টানাগুলো তন্ন তন্ন করে খুঁজে ছোট্ট একটা পরিত্যক্ত ছেঁড়া রুমাল খুঁজে পেলো সে। রুমালটাকে সে নিজের মুখে চেপে ধরলো। উগ্র ঝাঁঝালো একটা ফুলের গন্ধ। মেঝের দিকে রুমালটাকে ছুঁড়ে দিলো সে। অন্য একটা দেরাজে কয়েকটা বোতাম, একটা নাটকের অনুষ্ঠান- লিপি, বন্ধকি দোকানের নাম ঠিকানা লেখা একটা কার্ড, দুটো হারিয়ে যাওয়া তুলতুলে লেবেনচুষ আর স্বপ্নের অর্থ নিয়ে লেখা একখানা বই পাওয়া গেলো। শেষ দেরাজটাতে মেয়েদের চুলে লাগাবার একটা কালো সার্টিনের ফুল ছিলো। বরফ আর আগুনের দোটানায় থমকে রইলো যুবক। কারণ কালো সার্টিনের ফুলও মেয়েদের মুক, নৈর্ব্যক্তিক, সাধারণ অলঙ্কার এবং ওরা কোনো কাহিনী বলে না ।
গন্ধ শুঁকে শুঁকে এগিয়ে চলা শিকারী কুকুরের মতো এবারে সে ঘরের সর্বত্র ঘুরে বেড়াতে লাগলো। ওর কোনো একটা চিহ্ন খুঁজে পাবার আশায় মানুষটা দেয়ালগুলোকে হাতড়ে দেখলো, ঘরের কোণগুলোতে ফুলে ফেঁপে থাকা গালচেটাকে হাত আর হাঁটু দিয়ে টিপে টিপে পরীক্ষা করলো, তন্ন তন্ন করে খুঁজলো টেবিল, তাক, মদ রাখার দেরাজ, পর্দা আর দেয়ালে ঝুলিয়ে
রাখা জিনিসগুলোকে। মেয়েটি তার পাশে পাশে রয়েছে, তাকে ঘিরে রয়েছে, তার অন্তরে-বাহিরে রয়েছে, তাকে ও জড়িয়ে রেখেছে, আদর করছে, সুক্ষ্ম অনুভূতিতে সে ওর ডাক শুনতে পাচ্ছে এবং ওর সে তীব্র আহ্বানে মানুষটার স্থুল অস্তিত্বটাও সচেতন হয়ে উঠেছে – অথচ মানুষটা তা বুঝতে পারছে না ৷ ফের একবার উঁচু গলায় সে বললো, 'বলো, সোনা!' তারপর মুখ ফিরিয়ে বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে রইলো শূন্যতার দিকে—কারণ মিন্যনেতের ওই সৌরভের মধ্যে সে তখনও রূপ, রঙ, প্রেম আর প্রসারিত বাহুর প্রভেদ করতে পারছিলো না। হে ঈশ্বর! কোত্থেকে এলো ওই সৌরভ ? আর সৌরভই বা কবে থেকে আহ্বান জানাবার মতো কন্ঠস্বর পেল? মনে মনে এই সব প্রশ্নের জবাব হাতড়াতে লাগলো যুবক ।
ঘরের আনাচে-কানাচে খোঁজাখুঁজি করে কয়েকটা ছিপি আর সিগারেট পেলো সে। উদাস অবজ্ঞায় ওগুলোকে সে উপেক্ষা করলো। কিন্তু একবার গালচের ভাঁজে একটা আধ-পোড়া চুরুট পেয়ে, একটা তীক্ষ্ণ হিংস্র শপথ বাক্য উচ্চারণ করে সেটাকে সে গোড়ালির চাপে পিষে ফেললো। ঘরের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত অব্দি অবিশ্রাম পায়চারি করে বেড়ালো সে। ঘরের সাময়িক বাসিন্দাদের অনেক ছোটোখাটো তুচ্ছাতিতুচ্ছ নজিরই সে খুঁজে পেলো। কিন্তু যার চিহ্ন সে আবিষ্কার করতে চাইছিলো, যে হয়তো এই ঘরেই ঠাঁই নিয়েছিলো একদিন, যার আত্মা যেন এখানেই ঘুরে বেড়াচ্ছে—তার কোনো চিহ্নই সে খুঁজে পেলো না ।
তারপরেই বাড়ির তত্ত্বাবধায়িকার কথা মনে পড়লো তার ৷
এক ছুটে ওই ভূতুড়ে ঘরটা থেকে বেরিয়ে এলো সে। তারপর সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে একটা দরজার সামনে গিয়ে দাড়ালো। ভেজানো দরজাটা দিয়ে একটা আলোর রেখা দেখা যাচ্ছিলো। টোকা দিতেই তত্ত্বাবধায়িকা দরজা খুলে বেরিয়ে এলো।
'আচ্ছা, আমি আসার আগে ওই ঘরটাতে কে ছিলো বলুন তো?” উত্তেজনাকে যথাসম্ভব লুকিয়ে রেখে জিগেস করলো যুবক ।
'হ্যাঁ স্যার, তা আপনাকে আমি ফের বলতে পারি। আপনাকে তো বলেছি, ওখানে স্প্রাউলস আর মুনি থাকতো। ওর থিয়েটারের নাম মিস ব্রিটা প্রাউলস, কিন্তু এখানে ও ছিলো মিসেস মুনি। ভদ্দরলোকের বাড়ি বলে আমার বাড়ির খুব সুনাম। ওদের বিয়ের সার্টিফিকেটটা ফ্রেমে বাঁধানো অবস্থায় একটা পেরেকে ঝোলানো থাকতো
‘আচ্ছা, ওই মিস ম্পাউলস — উনি কি রকম মানে উনি দেখতে কেমন ছিলেন, বলুন তো?'
‘কেমন আবার—মাথায় কালো চুল, ছোটোখাটো শক্তসমর্থ চেহারা আর মুখটা বেশ মজাদার। এক হপ্তা আগে গত মঙ্গলবার ওরা এখান থেকে চলে গেছে।'
'ওঁদের আগে কে ছিলো?”
'মালপত্র বয়ে নেবার কাজে জড়িত এক ভদ্রলোক। সে এক হপ্তার ভাড়া বাকি রেখেই কেটে পড়েছিলো। তার আগে ছিলো মিসেস ক্রোডার আর তার দুটো বাচ্চা। ওরা চার মাস ছিলো। তার আগে থাকতো মি. ডয়েল বলে এক বুড়ো——তার ছেলেরা তার ঘরের ভাড়াটা মেটাতো। সে ছিলো ছ মাস । এখানেই তো এক বছরের হিসেব হয়ে গেলো – তার আগেকার কথা আমার আর মনে নেই, স্যা।’
মহিলাকে ধন্যবাদ জানিয়ে কোনোক্রমে নিজের ঘরটাতো ফিরে গেলো যুবক। ঘরটা তখন নিষ্প্রাণ। যে সুগন্ধ ঘরটাকে প্রাণময় করে তুলেছিলো, তা তখন মিলিয়ে গেছে। বিদায় নিয়েছে মিন্যনেতের সেই সৌরভ। তার জায়গায় রয়েছে শুধু জীর্ণ আসবাবের পুরনো বাসি গন্ধ আর গুদামখানার বদ্ধ আবহাওয়া ।
ক্রমশ মিলিয়ে যেতে থাকা আশা মানুষটার বিশ্বাসকে ভাসিয়ে নিয়ে গেলো। গ্যাসের কেঁপে কেঁপে ওঠা হলদে আলোটার দিকে তাকিয়ে বসে রইলো সে। একটু বাদেই বিছানার কাছে এগিয়ে গিয়ে চাদরটাকে সে ফালা ফালা করে ছিঁড়তে শুরু করলো। তারপর নিজের ছুরির ফলাটা দিয়ে কাপড়ের ফালিগুলোকে জানলা-দরজার প্রতিটা ফাঁক-ফোকরে ঠেসে ঠেসে গুঁজে দিলো। প্রতিটা ফাঁক এইভাবে বন্ধ করে দেবার পর যুবক ঘরের আলোটা নিভিয়ে, গ্যাসটা পূর্ণমাত্রায় খুলে দিয়ে কৃতজ্ঞচিত্তে বিছানায় শুয়ে পড়লো ।
...........................................................................
সেদিন রাতে মিস ম্যাককুলের বিয়ার নিয়ে যাবার পালা। তাই সে সেটা নিয়ে গিয়ে মিসেস পার্ডির সঙ্গে একটা ভূগর্ভের ঘরে আড্ডা দিতে বসলো । বিভিন্ন বাড়ির তত্ত্বাবধায়িকারা খোশ মেজাজে আড্ডা জমাবার জন্যে এই সমস্ত ঘরগুলোতেই জমায়েত হয় ।
'আজ সন্ধ্যেবেলা আমার চারতলার পেছন দিকটা ফের ভাড়া দিলুম,' বিয়ারের ফেনার একটা নিটোল বৃত্তের ওধার থেকে মিসেস পার্ডি বললো । ‘লোকটার বয়েস অল্প—ঘণ্টা দুয়েক আগে শুতে চলে গেছে'।
“বলো কি গো, মিসেস পার্ডি ?' মিসেস ম্যাককুল নিবিড় প্রশংসায় গদগদ হয়ে উঠলো, 'ওই রকম একটা ঘর ভাড়া হওয়াটাই তো আশ্চর্যের কথা! তা তুমি তাকে সবকিছু বলে দিয়েছো নাকি?' রহস্যে ভরা ফিসফিসে কণ্ঠস্বরে প্রশ্ন করলো মহিলা।
'ঘরগুলো তো ভাড়া দেবার জন্যেই আসবাব দিয়ে সাজিয়ে রাখা হয়েছে।' মিসেস পার্ডি খসখসে গলায় বললো, 'তাই আমি আর যেচে কিছু বলিনি, মিসেস ম্যাককুল।
'তুমি ঠিকই করেছো। ঘরের ভাড়াই তো আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে! তোমার সত্যিই ব্যবসা-বুদ্ধি আছে, ভাই। ওই ঘরে বিছানায় শুয়ে একজন আত্মহত্যা করেছে বললে, অনেক লোকই ঘরটা আর ভাড়া নিতে রাজি হবে না!'
‘তা যা বলেছো, ভাই । আমাদেরও তো করে খেতে হবে।'
‘ওইটেই হচ্ছে খাঁটি কথা! ঠিক এক হপ্তা আগে আজকের দিনেই তো আমি তোমার ভাড়াটেকে পেছনের ওই ঘরখানা সাজিয়ে-গুছিয়ে দেবার জন্যে হাত লাগিয়েছিলুম। তা ছুড়িটা কিনা গ্যাস খুলে দিয়ে আত্মহত্যা করলো ! ছুঁড়ির মুখখানা কিন্তু ভারি মিষ্টি ছিলো, মিসেস পার্ডি !’
‘তা যা বলেছো, মেয়েটাকে সুন্দরীই বলা চলতো।' একমত হলেও মিসেস পার্ডি একটু সমালোচনার সুরে বললো, 'শুধু বাঁদিকের ভুরুর কাছে ওই জরুলটাকে বাদ দিয়ে। তা এবারে তোমার গ্লাসটা আবার ভরে নাও, মিসেস ম্যাককুল।'
লেখক পরিচিতি
ও হেনরি।
ও হেনরি।
আসল নাম উইলিয়াম সিডনি পোর্টার। আমেরিকার নর্থ ক্যারোলিনায় জন্ম ১৮৬২, সেপ্টেম্বর ১১। নিউ ইয়র্ক সিটিতে মৃত্যু ১৯১০, জুন ৫।
ছোট গল্প ছাড়াও লিখেছেন কবিতা। গদ্য।
স্বাভাবিক দৃষ্টিভঙ্গি, কৌতুকপূর্ণ বর্ণনাভঙ্গি আর বিস্ময়কর পরিণতি নিয়ে লিখেছেন তার গল্পগুলো। বিশ শতকেই তার গল্পের পটভূমি। নিউ ইয়র্ক শহরের প্রতি ছিল ও হেনরির অনেক ভালোবাসা। এজন্য এই শহরটিকে তিনি সাব-ওয়ের উপরে অবস্থিত বাগদাদ বলে অভিহিত করতেন। তাঁর অধিকাংশ গল্পের পটভূমিই এই নিউ ইয়র্ক শহরটি।
স্বাভাবিক দৃষ্টিভঙ্গি, কৌতুকপূর্ণ বর্ণনাভঙ্গি আর বিস্ময়কর পরিণতি নিয়ে লিখেছেন তার গল্পগুলো। বিশ শতকেই তার গল্পের পটভূমি। নিউ ইয়র্ক শহরের প্রতি ছিল ও হেনরির অনেক ভালোবাসা। এজন্য এই শহরটিকে তিনি সাব-ওয়ের উপরে অবস্থিত বাগদাদ বলে অভিহিত করতেন। তাঁর অধিকাংশ গল্পের পটভূমিই এই নিউ ইয়র্ক শহরটি।
কর্মজীবী মানুষজনই ছিল তাঁর গল্পের চরিত্ররা। বিশেষ করে পুলিশ, রেস্টুরেন্টের পরিবেশিকা, ক্রিমিনাল আর অচ্ছুৎ মানুষজনকে নিয়েই তিনি লিখেছেন।


0 মন্তব্যসমূহ