বাংলা অনুবাদঃ অমিতাভ চক্রবর্ত্তী
ডাইনোসরদের দ্রুত বিলুপ্তির কারণগুলো আজো রহস্যে ঘেরা। ট্রায়াসিক এবং জুরাসিক যুগ জুড়ে প্রজাতিটির বিবর্তন এবং বৃদ্ধি ঘটেছিল, এবং ১৫০ মিলিয়ন বছর ধরে ডাইনোসরেরা সবকটি মহাদেশ জুড়ে অপ্রতিদ্বন্দী রাজত্ব চালিয়েছিল। সম্ভবত ক্রিটেসিয়াস যুগে ঘটে যাওয়া জলবায়ু এবং উদ্ভিদের বিপুল পরিবর্তনের সাথে প্রজাতিটি খাপ খাইয়ে নিতে পারেনি। এই যুগের শেষে সমস্ত ডাইনোসর মারা গিয়েছিল।
আমি ছাড়া বাকি সবাই, - কিউএফডাব্লুএফকিউ শুধরে দিল - কারণ, একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য, বলতে গেলে, প্রায় পঞ্চাশ মিলিয়ন বছর, আমিও একটি ডাইনোসর ছিলাম: এবং তাই নিয়ে আমার কোন আফসোস নেই; আপনি যদি সেই যুগে একজন ডাইনোসর হয়ে জন্মে থাকেন তবে আপনি নিঃসন্দেহে সেই যুগের পক্ষে শ্রেষ্ঠ জীবনটি কাটিয়েছিলেন এবং বাকি সকলের কাছে আদর্শ ছিলেন।
তারপর অবশ্য পরিস্থিতি পাল্টে গেল - আপনাকে আর এই নিয়ে আমার বিস্তারিতভাবে বলার কিছু নেই - এবং তখন থেকেই সমস্ত রকমের সমস্যা শুরু হল, পরাজয়, ত্রুটি-বিচ্যুতি, সন্দেহ, বিশ্বাসঘাতকতা, মহামারী। পৃথিবীতে একটি নতুন জনগোষ্ঠী বেড়ে উঠেছে, আমাদের প্রতি শত্রুভাবাপন্ন। তারা আমাদের চারদিক থেকে আক্রমণ করেছে; তাদের সঙ্গে পেরে ওঠা বা কোন সমঝোতা করা কোনটাই সম্ভব হয়নি। এখন অবশ্য অনেককেই বলতে শুনি যে নতুন প্রজাতির এই আক্রমণের অনেক আগে থেকেই অবক্ষয়ের আনন্দ, ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা আমাদের ডাইনোসরদের নিজেদের চেতনারই অংশ ছিল। আমি জানি না: আমি নিজে কখনই এমন অনুভব করিনি; যদি অন্যরা কেউ কেউ তা করে থেকে থাকে, তবে তার আসল কারণ ছিল এটাই যে তারা বুঝে গেছিল যে তারা ইতিমধ্যেই শেষ হয়ে গেছে।
আমি মহা-মৃত্যুর সময়কালের কথা মনে করতে চাই না। আমি কখনও ভাবিনি যে আমি এটার থেকে রেহাই পেতে পারব। দেশ ছেড়ে বেরিয়ে পড়ার পর যে দীর্ঘ পথযাত্রা আমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছিল সেটি করতে গিয়ে আমাকে এমন এক কবরস্থানের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল যেখানে কংকালগুলোর গায়ে এক বিন্দু মাংস ছিলনা, এক সময়ের জীবন্ত প্রাণীদের প্রাচীন সৌন্দর্যের স্মারক হিসেবে এখানে ওখানে পড়েছিল কেবলমাত্র একটি শিং বা মাথার ঝুঁটি বা গায়ের বর্মের কোন আঁশ, কিংবা শিংওয়ালা চামড়ার একটি টুকরো। আর সেই অবশিষ্টাংশগুলো নিয়ে কাজ করে যাচ্ছিল ধারালো নখ-দাঁত-ঠোঁটেরা, এই গ্রহের নতুন প্রভুদের শোষকেরা। অবশেষে যখন আমি এমন এক জায়গায় গিয়ে হাজির হলাম যেখানে আমি ছাড়া আর কোন জীবিত বা মৃত প্রাণীর অস্তিত্ব চোখে পড়ছে না, তখন আমি থেমে গেলাম।
সেই নির্জন মালভূমিতে আমি অনেক, অনেক বছর কাটিয়েছি। আক্রমণ, মহামারী, অনাহার, তুষারপাত – সব সয়ে বেঁচে থেকেছি আমি: কিন্তু পুরোটাই কাটাতে হয়েছে সঙ্গীহীন, একা। সেখানে চিরকাল থেকে যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। আমি মালভূমি ছেড়ে একদিন নিচে নামতে শুরু করলাম।
পৃথিবী বদলে গেছে: পাহাড়, নদী বা গাছপালা - কোন কিছুই আর চিনতে পারছিলাম না আমি। প্রথমবার যখন কিছু জীবন্ত প্রাণী নজরে এল আমার, এক ঝলকের মত দেখেই আমি লুকিয়ে পড়েছিলাম: নতুন প্রাণীদের একটি দল, আয়তনে ছোটখাটো, কিন্তু শক্তিশালী।
“হেই, তুমি!” তারা আমার উপর নজর রাখছিল, এবং এখন এমনভাবে আমায় ডাকল যেন আমায় তারা ভালোরকম চেনে। আঁতকে উঠে দৌড়ে পালিয়ে গেলাম আমি; তারা আমায় ধাওয়া করল। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে আমার চারপাশে আতঙ্ক ছড়িয়ে এসেছি আমি। সেই আতঙ্কের ধাক্কায় অন্যদের যে প্রতিক্রিয়া হত সেটা রীতিমত উপভোগ করাই দস্তুর ছিল আমার। এখন আর তার কিছুই অবশিষ্ট নেই। “হেই, তুমি!” তারা আমার কাছে এগিয়ে এসেছিল নিতান্ত সাধারণভাবে, ভয় দেখাতে কি, ভয়ে সিঁটিয়ে থাকতে – কোনটাই নয়।
“তুমি দৌড়চ্ছ কেন? কিসে তাড়া করেছে তোমায়?” তারা আমার কাছে এসেছিল কোথায় যেন একটা কিভাবে সব চেয়ে তাড়াতাড়ি যাওয়া যায় সেই খোঁজ করতে। আমি তোৎলাতে তোৎলাতে বললাম যে আমি সেখানে নূতন এসেছি। তাদের মধ্যে একজন বলল, “কিন্তু, তুমি পালালে কেন? তোমাকে দেখে মনে হচ্ছিল যেন তুমি সেই ভয়ানক প্রাণীটাকে দেখেছ... একটা ডাইনোসর!” বাকিরা হেসে ফেলল। কিন্তু সেই হাসিতে আমি প্রথমবারের মতো একটা বিপদের আভাস অনুভব করলাম। তাদের খোলামেলা হাল্কা হাসিগুলো কিছুটা যেন জোর করে করা। তারপর তাদের মধ্যে একজন গম্ভীর হয়ে বলল, “না না, এই কথাটা ঠাটা করেও বলা উচিত না। তুমি ত জানো না তারা আসলে ঠিক কি…।”
তার মানে, নতুন প্রাণীদের মধ্যে ডাইনোসরের আতঙ্ক এখনও ভাল মতই চালু আছে, তবে তারা সম্ভবত কয়েক প্রজন্ম ধরে কোন ডাইনোসর দেখেনি আর তাই এখন ডাইনোসরদের একজনকে সামনা-সামনি দেখেও চিনতে পারেনি। আমার ভ্রমণ চলতে থাকল, সাবধান হয়ে গিয়েছিলাম, কিন্তু সেই সাথে আগের পরীক্ষাটি আবার করে দেখার জন্য অধৈর্য্যও হয়ে উঠেছিলাম। একটি ঝর্ণায় নতুন প্রাণীদের একটি মেয়ে জল খাচ্ছিল, একাই। আমি আস্তে করে এগিয়ে গেলাম,তার ঠিক পাশটিতেই নিজেও জল খাওয়ার জন্য ঘাড়টা বাড়ালাম। আমাকে দেখামাত্র মরিয়া চিৎকার করে যে দম-আটকানো দৌড়টা সে দেবে, সেটা আমি পরিস্কার কল্পনা করতে পারছিলাম। তার ওই চিৎকার থেকে চারিদিকে বিপসংকেতের ঘন্টি বেজে যাবে আর, নতুন প্রাণীরা দলে দলে বেরিয়ে এসে আমাকে শিকার করার জন্য সমস্ত শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে। ... এক মুহুর্তের জন্য নিজের কাজের কারণে আফশোষ হল আমার, মনে হল, আমি যদি নিজেকে বাঁচাতে চাই, তাহলে আমার এক্ষুনি যা করা উচিত তা হল এই মেয়েটির উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তার হাত-পা ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে ফেলা: সমস্ত কিছু আবার নতুন করে শুরু করা ...
মেয়েটি আমার দিকে তার মুখটি ফিরিয়ে বলল, “কি পরিস্কার আর ঠান্ডা জলটা, তাই না?” সহজ আন্তরিকতার সাথে সে কথাবার্তা চালিয়ে গেল, যেমনভাবে কেউ একজন অচেনা আগন্তুকের সাথে আলাপ করে, জানতে চাইল - আমি কি অনেক দূরের দেশ থেকে এসেছি, পথে বৃষ্টি-বাদলা পেয়েছি, না কি রোদ ছিল খুব। আমি কখনও ভাবতেও পারতাম না যে যারা ডাইনোসর নয়, তাদের সাথে এই ভাবে গল্প করা যায়, এবং প্রচন্ড উদ্বেগে আমি বেশিটা সময় চুপ করে থাকলাম।
“জল খাওয়ার জন্য আমি সবসময় এখানেই চলে আসি”, বলল সে, “ডাইনোসরের কাছে …” হেঁচকি ওঠার অবস্থা হল আমার, চোখগুলো বড় বড় হয়ে গেল।
“হ্যাঁ, এই নামেই আমরা ডাকি একে, এই ঝর্নাটাকে, ডাইনোসরের ঝোরা...। বহুযুগ ধরেই এই নামটা চলে আসছে। সবাই বলে যে এক সময় একটি ডাইনোসর এখানে এসে লুকিয়ে ছিল, সর্বশেষগুলির মধ্যে একটি, এবং যখনই কেউ এখানে জল খেতে আসত ডাইনোসরটা তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং তার হাত-পা টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলত। হে ভগবান!”
আমার ইচ্ছে করছিল মাটির মধ্যে ঢুকে যাই আমি। “এইবার ত সে ঠিক বুঝে যাবে আমি কে,” ভাবছিলাম আমি, "এখনই সে আমার দিকে আরও ভাল করে তাকাবে আর আমাকে চিনে ফেলবে!” এবং এই সব সময়ে সবাই যা করে, নিজেকে যখন কেউ ধরা দিতে না চায়, আমি চোখ নামিয়ে মাটির দিকে তাকিয়ে থাকলাম এবং আমার লেজটি কুণ্ডলী পাকিয়ে নিলাম, যেন এটি লুকিয়ে ফেলা দরকার। ঘটনাটা এতই উত্তেজনাপূর্ণ ছিল যে, মেয়েটি যখন বিদায় জানিয়ে নিজের পথ ধরে ফিরে গেল, তখনও মুখে হাসি লেগেছিল তার, আমি অসম্ভব ক্লান্ত বোধ করলাম, যেন আমি একটি যুদ্ধ শেষ করে উঠেছি, সেই সব যুদ্ধগুলির একটি যখন আমরা আমাদের নখ এবং দাঁত দিয়ে নিজেদের রক্ষা করতাম। এক সময় খেয়াল করলাম যে তাকে আমি বিদায়টুকুও জানাইনি।
আমি একটি নদীর তীরে গিয়ে হাজির হলাম, যেখানে নতুন প্রাণীদের আস্তানা ছিল। তারা সেখানে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করত। সেই সময় তারা গাছের ডাল-পালা দিয়ে একটা বাঁধ বানাচ্ছিল যাতে নদীতে ঐ জায়গায় একটি বাঁক তৈরি হয় আর সেই বাঁকে জলের গতি কমে গিয়ে মাছগুলো আরো বেশি সময়ের জন্য সেখানে থেকে যায়। আমাকে দেখামাত্র তারা উঠে দাঁড়িয়ে কাজ থামিয়ে দিল। তারা আমার দিকে তাকাল, তারপর চুপ করে একে অপরের দিকে তাকাল, যেন একে অপরকে কোন প্রশ্ন করছে। "বাঁচবার আর কোন উপায় নেই," ভাবলাম আমি, "বড়জোর যা করতে পারি, তা হল - আমার এই জীবনের জন্য একটা চড়া দাম আদায় করে নেওয়া।” এবং আমি আত্মরক্ষার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়তে তৈরী হয়ে গেলাম।
কপাল ভালো আমার যে সময়মতো আমি নিজেকে থামিয়ে নিয়েছিলাম। সেই জেলেদের আমার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ ছিল না: আমায় দেখে আমার গায়ে অনেক জোর আছে মনে হওয়ায় তারা আমাকে জিজ্ঞাসা করতে চেয়েছিল যে আমি তাদের সাথে থেকে গিয়ে কাঠ বওয়ার কাজে লেগে যেতে পারি কিনা।
"এই জায়গাটা ভালো, বিপদ-আপদ নেই কিছু," আমায় দোনামোনা করতে দেখে জোর দিয়ে বলল তারা। "আমাদের চোদ্দ পুরুষে এখানে কখনও কোনও ডাইনোসর দেখা যায়নি..."
কেউ সন্দেহ করেনি আমি কে হতে পারি। আমি থেকে গেলাম। জল-হাওয়া মনোরম, খাবার আমার রুচি-মত ছিল না, তবে ভাল-ই ছিল, এবং আমার গায়ের জোরের হিসেবে কাজটি আমার জন্য খুব কঠিন ছিল না। তারা আমাকে একটি ডাকনাম দিয়েছিল: "কদাকার", কারণ আমি তাদের থেকে আলাদা ছিলাম, অন্য কোনও কারণে নয়। এই নতুন প্রজাতি, আমি জানি না আপনারা কি বলে ডাকেন তাদের, প্যান্টোথেরিস বা অন্য কিছু, প্রজাতি হিসেবে তখনও তারা পুরোপুরি রূপ নেয়নি; প্রকৃতপক্ষে, এদের থেকেই পরবর্তী কালে অন্যান্য সমস্ত প্রজাতির আবির্ভাব ঘটেছিল; এবং ইতিমধ্যেই প্রাণীদের পরস্পরের মধ্যে মিল এবং অমিল দুটোই এমন উঁচু পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, যদিও আমি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরণের প্রাণী ছিলাম, আমি শেষ পর্যন্ত নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলাম যে আমি কারও থেকেই খুব বেশি আলাদা নই।
এমন নয় যে আমি কখনও এই ধারণায় পুরোপুরি অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম: আমি নিজেকে সবসময় শত্রুবেষ্টিত ডাইনোসরের মতো অনুভব করতাম, এবং প্রতি সন্ধ্যায়, যখন তারা ডাইনোসরদের গল্প বলতে শুরু করত, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা কিংবদন্তি সব, আমি ছায়ার আড়ালে নিজেকে সরিয়ে নিতাম, বোধ-বুদ্ধি ঠিক রাখা কঠিন হয়ে উঠত।
গল্পগুলো ছিল ভয়ংকর। বলার ভঙ্গিতে শ্রোতারা ফ্যাকাশে হয়ে যেত, মাঝে মাঝে আতঙ্কে কেঁদে উঠত, এবং একই রকম আবেগে গল্পকারের নিজের কণ্ঠস্বরও ভেঙ্গে আসত। খুব তাড়াতাড়ি আমি বুঝে গিয়েছিলাম যে তারা সবাই সেই গল্পগুলি আগে থেকেই জানত (যদিও নাটকীয়তার কোন অভাব ছিল না), তবে যখন তারা সেগুলি শুনত, প্রতিবারই তারা নতুন করে ভয় পেতে। এত নানা রকম দানব হিসেবে ডাইনোসরদের ছবি আঁকা হত, তাতে এমন প্রচুর পরিমাণ খুঁটিনাটি বিবরণ যোগ করা হত যে সেগুলো থেকে ডাইনোসরের আসল রূপটি বুঝে ওঠা অসম্ভব ছিল। এবং সমস্ত ছবির বক্তব্য একটাই – ডাইনোসরদের কাজ নতুন প্রাণীদের ক্ষতি করা, যেন প্রথম থেকেই নতুন প্রাণীরা পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাসিন্দা ছিল এবং সকাল থেকে রাত পর্যন্ত তাদের তাড়া করে বেড়ানো ছাড়া আমাদের আর কোন কাজ ছিল না। নিজের জন্য, যখন আমি আমাদের ডাইনোসরদের কথা ভেবেছিলাম, তখন আমি স্মৃতিতে ফিরে গিয়েছিলাম – দীর্ঘ সময় ধরে কষ্ট পাওয়া, মৃত্যু-বেদনা, শোক; নতুন প্রাণীরা আমাদের সম্বন্ধে যে গল্পগুলো বলেছিল তা আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে এতটাই দূরের ছিল যে সেগুলো আমাকে উদাসীন করে তুলেছিল, যেন তারা বহিরাগত, অপরিচিতদের নিয়ে কথা বলছিল। এবং তার পরেও যেটা বলার থাকে, যখন আমি তাদের গল্পগুলো শুনেছিলাম, আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে আমরা অন্যদের কাছে কীভাবে পরিচিত হয়েছি তা নিয়ে এর আগে আমি কখনও ভাবিনি, এবং সমস্ত বাজে কথার মধ্যে, এই গল্পগুলি, বর্ণনাকারীদের দৃষ্টিকোণ থেকে, একটা অমোঘ সত্যকে তুলে ধরেছে। আমরা তাদের উপর যে আতঙ্ক চাপিয়ে দিয়েছিলাম তার সন্ত্রাসের কাহিনীগুলো আর আমার নিজের সন্ত্রাসের স্মৃতিরা আমার মনের ভিতর মিলে মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছিল। আমি যত বেশি জানতে পেরেছি যে আমরা কীভাবে অন্যদের কাঁপিয়েছি, ততই আমি নিজের ভিতরে কেঁপে গিয়েছি।
প্রত্যেকেই একটা করে গল্প বলল, এবং তারপরে একটা সময় এল যখন তারা বলল, "এবার কদাকার মশাইয়ের পালা, কি, আপনি কিছু বলবেন ত? আপনার কি একটাও কোনো গল্প নেই? আপনার পরিবারের কারো কি ডাইনোসরদের সাথে কোন অ্যাডভেঞ্চার ঘটেনি?
“হ্যাঁ, কিন্তু...” আমি তোৎলাতে শুরু করলাম, "সে সব ত অনেক দিন আগেকার কথা ... কি যে বলি, আপনারা যদি সত্যিটা জানতেন ..."।
সেই মুহুর্তে যে আমায় সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছিলেন সে ছিল ফার্ন-ফ্লাওয়ার, ঝর্ণার ধারের সেই তরুণ প্রাণীটি। “ছেড়ে দাও ওনাকে … বাইরে থেকে এসেছেন, এখনো আমাদের সাথে ঠিকমত মিশে উঠতে পারেননি, আমাদের ভাষায় কথা বলাটা সহজ নয় ওনার পক্ষে …”
শেষ পর্যন্ত তারা অন্য কথায় চলে গেল। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম আমি।
ফার্ন-ফ্লাওয়ার আর আমার মধ্যে এক ধরনের বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল। খুব অন্তরঙ্গ কিছু নয়: আমি কখনই তাকে ছুঁয়ে দেখার সাহস করিনি। কিন্তু আমরা গল্পে গল্পে লম্বা সময় কাটিয়ে দিয়েছি। বা আরো ঠিকভাবে বললে, সে আমার সাথে তার জীবনের নানা কিছু নিয়ে গল্প করেছিল, সমস্ত কিছু নিয়ে; অন্যদিকে নিজেকে প্রকাশ করে ফেলার ভয়ে, আমার পরিচয় নিয়ে তার কোনরকম সন্দেহ জেগে ওঠার ভয়ে, আমি সব সময় অনির্দিষ্ট সাধারণ কথাবার্তায় নিজেকে আটকে রাখতাম। ফার্ন-ফ্লাওয়ার আমাকে তার স্বপ্নের গল্প করেছিল: "গত রাতে আমি এই বিশাল এক ডাইনোসরকে দেখেছি, ভয়ংকর, তার নাক দিয়ে ধোঁয়ার নিঃশ্বাস বের হচ্ছে। সেটা আমার কাছে ঘেঁষে এসে আমার ঘাড়ের পিছন থেকে আমায় ধরে তুলে নিয়ে চলে গেল। ও আমায় জ্যান্ত খেয়ে ফেলতে চেয়েছিল। ভয়ানক স্বপ্ন একটা, ভয়ানক ত বটেই, কিন্তু - কিছুটা অদ্ভুতও নয় কি? - আমি একটুও ভয় পাইনি। শুধু তাই না, আমি জানি না কিভাবে বলাটা ঠিক হবে ... আমার তাকে ভালই লেগেছিল ..."।
এই স্বপ্নটি থেকে আমার অনেক কিছু বুঝে নেওয়ার ছিল, বিশেষ করে এই কথাটা যে: ফার্ন-ফ্লাওয়ার আক্রান্ত হতেই চেয়েছিল। তাকে কাছে টেনে নিয়ে জড়িয়ে ধরার এটাই ছিল পরম মুহূর্ত। কিন্তু তাদের কল্পনার ডাইনোসর আমি নিজে যে ডাইনোসর, তার চেয়ে একেবারে আলাদা ছিল এবং এই চিন্তাটাই আমায় আরও বেশি করে আলাদা আর ভীরু করে তুলেছিল। সোজা কথায়, আমি একটি ভাল সুযোগ হাতছাড়া করেছি। এই ঘটনার পরেপরেই ফার্ন-ফ্লাওয়ারের ভাই আরও নীচের সমতলের দেশ থেকে মাছ ধরার মরসুম শেষে ফিরে এসেছিল, মেয়েটিকে এর পর অনেক বেশি নজরে নজরে রাখা হল, আর আমাদের দুজনের গল্প করা, আড্ডা দেওয়াও অনেক কমে গেল।
এই ভাই, জাহ্ন তার নাম, আমাকে প্রথম দিন থেকেই সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করে। "ওটা কে? কোথা থেকে এসে হাজির হয়েছে?" আমার দিকে ইঙ্গিত করে সবাইকে জিজ্ঞাসা করতে থাকে সে।
"ওকে আমরা কদাকার বলে ডাকি, বিদেশী লোক, কাঠের বোঝা আনা-নেওয়ার কাজ করে,” তারা বলে তাকে। “কেন? ওর মধ্যে অদ্ভুত কি দেখলে তুমি?”
"আমি ওকেই সেটা জিজ্ঞাসা করতে চাই," জাহ্ন একটা হিংস্র দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বলল। "এই যে, তুমি! তোমার মধ্যে একটা কিছু অস্বাভাবিক ব্যাপার আছে, তাই না? কি সেটা?” এই কথার আমি কি উত্তর দিতে পারতাম? “আমায় বলছেন? কিছুই না।”
"তুমি তা হলে অদ্ভুত কিছু নও, তাই ত?" এবং সে হেসে উঠল। সেই সময় ঘটনা আর এগোয়নি, কিন্তু আমি সবচেয়ে খারাপ অবস্থার জন্য তৈরী ছিলাম।
এই জাহ্ন ছিল গ্রামের সবচেয়ে সক্রিয় লোকদের একজন । সে সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়িয়েছে এবং অন্যদের চেয়ে অনেক বেশি খবরাখবর রাখত বলে মনে হয়েছিল আমার। ডাইনোসরদের নিয়ে চলতি গল্পগাছা শুনলে সে খানিকটা অধৈর্য্য হয়ে পড়ত। “রূপকথার গল্প সব,” একদিন বলে উঠল সে, “তোমরা সবাই রূপকথার গল্প বলছ। সত্যি সত্যিই যদি এখানে কোন ডাইনোসর এসে হাজির হয় তখন ঠিক কি করবে তোমরা, সেইটা একবার দেখতে চাই আমি।“
“বহুযুগের মধ্যে এমন কিছুর দেখা মেলেনি …” জেলদের একজন বলল।
“অত কিছু আগের দিনের ব্যাপার নয়। ...” জাহ্ন চিৎকার করে উঠল। "এবং গ্রামের দিকে এখনও দু’-একটি পাল থাকতে পারে ... সমতলের এলাকায়, আমাদের একটা দল দিন-রাত পালা করে নজর রাখে। কিন্তু সেখানে আমরা একে অপরকে বিশ্বাস করতে পারি; ওখানে এমন লোককে আমরা কখনও দলে ঢুকিয়ে নিই না যাকে আমরা চিনি না, জানি না ..." এবং তারপর সে অনেকক্ষণ আমার দিকে এক দৃষ্টিতে চেয়ে থেকে যা বোঝানোর বুঝিয়ে দিল।
ব্যাপারটা আর টানতে দেওয়ার কোনও মানে হয় না: যা বলার সবার সামনে এখনই বলতে হবে ওকে। এক পা এগিয়ে গেলাম আমি। “তুমি কি আমার বিরুদ্ধে কিছু বলতে চাইছ?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
"আমি এমন যে কারও বিরুদ্ধে বলতে চাই, যাকে আমরা জানি না তার মা-বাপ কারা বা কোথা থেকে সে এসেছে, এবং যখন সে আমাদের খাবারে ভাগ বসাচ্ছে এবং আমাদের বোনদের দিকে হাত বাড়াচ্ছে ..."
জেলেদের মধ্যে একজন আমায় বাঁচাতে এগিয়ে এল: “কদাকার নিজের রোজগারে খায়; অত্যন্ত পরিশ্রম করে ও …।”
"পিঠে করে গাছের গুঁড়ি বয়ে নিয়ে যেতে পারে ও। সেটা আমি অস্বীকার করছি না," বলে চলল জাহ্ন, "কিন্তু যদি বিপদ আসে, যদি নিজেদের নখ আর দাঁত দিয়ে সবাইকে বাঁচাতে হয় তখন আমরা কিভাবে নিশ্চিত হব যে এই লোক সেই সময় আমাদের জন্য তার করণীয় কাজটা ঠিকমত করবে?”
তর্কাতর্কি শুরু হয়ে গেল। আজব ব্যাপার হলো, আমিই যে একজন ডাইনোসর হতে পারি, সে কথা একবারো কেউ বলে নি, আমার বিরুদ্ধে যেই সব পাপ কাজের অভিযোগ আনা হয়েছিল তা হল আমায় অন্য রকম দেখতে, আমি একজন বিদেশী এবং তাই বিশ্বাসের অনুপযুক্ত; এবং বিতর্কের কেন্দ্রে ছিল - আমার উপস্থিতি ডাইনোসরদের ফিরে আসার বিপদকে কতটা বাড়িয়ে তুলেছিল সেইটা।
"আমি তাকে যুদ্ধে দেখতে চাই, তার ঐ ছোট্ট টিকটিকির মত মুখ নিয়ে..." ঘেন্নার সাথে জাহ্ন আমাকে খোঁচাতে রইল।
আমি হঠাৎ করেই তার মুখোমুখি হয়ে দাঁড়ালাম। "তুমি এখনই আমাকে লড়তে দেখতে পারো , যদি তুমি নিজে পালিয়ে না যাও।”
সে এতটা আশা করেনি। চারদিকে তাকালো সে। বাকিরা গোল করে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। লড়ে যাওয়া ছাড়া আমাদের আর কোন উপায় ছিল না।
সামনে এগোলাম আমি, ঘাড় ঘুরিয়ে নিয়ে তার কামড় এড়িয়ে গেলাম ; আর সেটা করতে করতেই আমার থাবার এক ঘা কষিয়ে দিলাম তাকে। চিৎ হয়ে ছিটকে পড়ল ও, আর আমি ওর বুকের উপর চড়ে বসলাম। এইটাই ভুল হয়ে গেল আমার। যেন আমার এটা জানা ছিল না, যেন আমি কখনও ডাইনোসরদের মারা পড়তে দেখিনি, যখন তারা ধরেই নিয়েছিল যে তারা তাদের শত্রুকে পেড়ে ফেলেছে, ঠিক তখনই নখের আঁচড়ে আর দাঁতের কামড়ে তাদের বুক-পেট ফালা ফালা হয়ে যেতে দেখিনি। কিন্তু তখনও এই জ্ঞানটুকু ছিল যে কিভাবে আমার লেজটাকে ব্যবহার করতে হবে, নিজেকে স্থিতিশীল রাখতে হবে; আমি লড়ে যাচ্ছিলাম যাতে সে আমায় উল্টে ফেলে দিতে না পারে। চাপ দিয়ে যাচ্ছিলাম ক্রমাগত, কিন্তু একটা সময় মনে হল, আর পারছি না, হাল ছেড়ে দিতে হবে এবার …
ঠিক সেই সময় লড়াই দেখতে থাকাদের একজন চিৎকার করে বলে উঠল, "আচ্ছা করে পেটা ওকে, ডাইনোসর!” যেই মুহুর্তে তারা আমার মুখোশটা টেনে খুলে নিল, আমি সেই পুরনো দিনের ডাইনোসর হয়ে গেলাম: যেহেতু আমার সব কিছু শেষ হয়ে গেছে, এবার তা হলে অন্তত ওদের পুরনো আতঙ্কটাই ওদের ফিরিয়ে দেওয়া যাক। এবং আমি জাহ্নকে মারতে থাকলাম - একবার, দু’বার, তিনবার ...
সবাই আমাদের টেনে-হিঁচড়ে আলাদা করে দিল। "জাহ্ন, আমরা তোমাকে আগেও বলেছি! কদাকারের গায়ের জোর কিন্তু প্রচণ্ড! কায়দা-কৌশল করে আর যার সাথেই পার পাও, কদা-ওস্তাদের সাথে ও সব করে লাভ নেই কোন!” এবং তারা হাসতে হাসতে আমাকে অভিনন্দন জানায়, তাদের থাবা দিয়ে আমার পিঠে চাপড় মারে। আমি ত নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলাম যে আমি ধরা পড়ে গেছি, ফলে আমার যে এখন কি করা উচিত কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। অনেক পরে আমি বুঝতে পারি যে "ডাইনোসর" বলে চিৎকার করা তাদের একটা অভ্যাস, ঐ বলে তারা প্রতিদ্বন্দ্বীদের যুদ্ধে উত্সাহিত করে, যেন বলে: "এগিয়ে যাও, তুমিই সবচেয়ে শক্তিশালী!" এবং আমি এটাও নিশ্চিত নই যে তারা ঐ কথাটা বলে কাকে উৎসাহ দিচ্ছিল, আমায় না জাহ্নকে।
সেই দিন থেকে আমি সকলের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত লোক হয়ে গেলাম। এমনকি জাহ্নও এখন আমাকে উৎসাহ দিত, আমি কেমন নতুন নতুন উপায়ে নিজের জোরের প্রমাণ দিই সেসব দেখার জন্য আমার পিছন পিছন ঘুরে বেড়াত। আরেকটা কথাও অবশ্য না বললেই নয় যে, ডাইনোসর সম্পর্কে তাদের রোজকার কথাবার্তাও এখন কিছুটা পাল্টে গিয়েছে, যেমন হয় আর কি, দিনের পর দিন একই ধরণের সমালোচনা করতে করতে লোকেরা ক্লান্ত হয়ে পড়ে আর ইতিমধ্যে ফ্যাশান পাল্টে যায়। এখন, যদি তারা গ্রামে কোনও কিছুর সমালোচনা করতে চায়, তবে এইভাবে বলে যে ডাইনোসররা এমন কাজ কখনও করত না, ডাইনোসরদের থেকে নানা বিষয়ে অনেক কিছু শেখার আছে, কিংবা, এই অবস্থায় কি ঐ পরিস্থিতিতে (যেমন ধরো ব্যক্তিগত জীবন-যাপনে) ডাইনোসরদের আচরণ সমস্ত সমালোচনার ঊর্ধে থাকত, ইত্যাদি। সংক্ষেপে বলতে গেলে, এই ডাইনোসরদের, যাদের সম্পর্কে কেউ সুনির্দিষ্ট করে কারো কিছু জানা নেই, তাদের জন্য এক ধরণের মরণোত্তর প্রশংসা গড়ে উঠছে বলে মনে হচ্ছিল।
মাঝে মাঝে আমি না বলে পারতাম না: “দেখুন, শুধু শুধু বাড়িয়ে বলার কোন মানে হয় না। ডাইনোসররা আসলেই কেমন ছিল বলে আপনাদের মনে হয়?”
তারা আমাকে থামিয়ে দিয়ে বলে, “চুপ করো। তাদের সম্পর্কে কী জানো তুমি? নিজের চোখে ত কোন ডাইনোসর দেখোনি কোনদিন।”
সম্ভবত সত্যিটাকে সামনে নিয়ে আসার, কোদালকে কোদাল বলা শুরু করার এটাই সঠিক সময় ছিল। “হ্যাঁ, আমি তাদের দেখেছি” আমি চিৎকার করে বললাম, “আর যদি চাও, আমি তোমাদের ব্যাখ্যা করে বুঝিয়েও দিতে পারি যে তারা কেমন ছিল!”
তারা আমাকে বিশ্বাস করল না; তারা ধরে নিল আমি তাদের নিয়ে মজা করছি। আমার কাছে, ডাইনোসরদের সম্পর্কে কথা বলার এই নতুন ধরণটাও সমান অসহ্য হয়ে উঠেছিল। কারণ - আমার প্রজাতির করুণ পরিণতির জন্য আমি যে কষ্ট অনুভব করেছি সে সব ছাড়াও - আমি ডাইনোসরদের জীবনকে ভিতর থেকে জানতাম, আমি জানতাম যে কীভাবে আমরা সংকীর্ণতা, কুসংস্কার দ্বারা পরিচালিত হয়েছি, নতুন পরিস্থিতির সাথে নিজেদেরকে মানিয়ে নিতে কতটা অক্ষম আমরা । এবং এখন আমাকে দেখতে হচ্ছিল যে তারা আমাদের সেই ছোট্ট জগৎকে একটি মডেল হিসাবে গ্রহণ করেছে, কতটা পিছিয়ে থাকা চিন্তা-ধারা এবং সে জন্যই - সত্যি বলতে কি - বিরক্তিকর! আমার মনে হচ্ছিল আমার উপর এরা সবাই মিলে জোর করে একটা সম্মানের বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে, আমার পুরো প্রজাতির প্রতি এক পবিত্র সম্মান, যা আমি নিজে কখনও অনুভব করিনি! কিন্তু, একদিক থেকে বলতে গেলে, এটাও ঠিক-ই ছিল: এই নতুন প্রাণীদের এমন কী ছিল যা পুরানো দিনের ডাইনোসরদের থেকে বিরাট রকম আলাদা? তাদের বাঁধ আর তাদের পুকুর নিয়ে তাদের গ্রামে নিরাপদে আছে তারা, কত গর্ব তাদের, তারা ছাড়া আর সবাই ত হাবিজাবি, এলেবেলে ... অবশেষে এদেরকেও আমার সেই একই রকম অসহ্য লাগতে শুরু করল যেমনটি লাগত আমার নিজের চারপাশের সবাইকে, এবং যত বেশি আমি তাদেরকে ডাইনোসরদের প্রশংসা করতে শুনলাম ততই আমি ডাইনোসর এবং এই নতুন প্রাণীদের একইরকম ঘেন্না করতে থাকলাম।
“তুমি জানো, কি হয়েছে? কাল রাতে আমি স্বপ্নে দেখেছিলাম যে একটি ডাইনোসরের আমার বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়ার কথা আছে,” ফার্ন-ফ্লাওয়ার বলছিল আমাকে, "একটি দুর্দান্ত ডাইনোসর, ওদের কোন রাজকুমার বা রাজাও হতে পারে। আমি নিজেকে সুন্দর করে সাজালাম, মাথায় ফিতে বাঁধলাম এবং জানালা দিয়ে বাইরে ঝুঁকে পড়লাম। আমি ঐ ডাইনোসরের মনোযোগ আকর্ষণ করার চেষ্টা করেছিলাম, আমি তার কাছে নিজেকে সঁপে দিয়েছিলাম, কিন্তু সে এমনকি আমায় খেয়াল করেছে বলেও মনে হল না, এমনকি একটি বারের জন্য ভুল করেও আমার দিকে ফিরে তাকায়নি..."
এই স্বপ্নটি আমার প্রতি ফার্ন-ফ্লাওয়ারের মনোভাব বোঝার জন্য আমাকে একটি নতুন পথের সন্ধান দিয়েছিল: তরুণীটি আমার কুণ্ঠাকে ন্যক্কারজনক দাম্ভিকতা হিসাবে ভুল করেছিল। এখন, যখন আমি ফিরে তাকিয়ে সেই দিনটির কথা মনে করি, পরিস্কার বুঝতে পারি যে আমাকে যা করতে হত তা হ'ল সেই উদ্ধত মনোভাবটিকে আরও কিছুক্ষণ ধরে রাখা, আমি যে যার-তার সাথে মিশি না সেটা বেশ গর্বের সাথে জাহির করা, এইটুকু করলেই আমি তাকে সম্পূর্ণভাবে জিতে নিতে পারতাম। পরিবর্তে, তার কথাগুলো আমাকে এতটাই নাড়িয়ে দিয়েছিল যে আমি তার পায়ের কাছে আছড়ে পড়েছিলাম,আমার চোখ জলে ভরে গিয়েছিল এবং বলেছিলাম: "না, না, ফার্ন-ফ্লাওয়ার, তুমি যা ভাবছ, তা আদৌ সে রকম নয়, তুমি যে কোন ডাইনোসরের চেয়ে ভাল, একশো গুণ ভাল, এবং আমার নিজেকে তোমার তুলনায় এত ছোট মনে হয় …"
ফার্ন-ফ্লাওয়ার শক্ত হয়ে গেল, এক পা পিছিয়ে গেল, “এ সব কি বলছ তুমি?” এই রকম কিছু সে আশা করেনি: বিরক্তি লেগেছিল তার এবং সমস্ত ঘটনাটি তার কাছে কিছুটা অপ্রীতিকর বলে মনে হয়েছিল। এটা বুঝতে আমার অনেক দেরি হয়ে গেল; দ্রুত নিজেকে সামলে নিলাম আমি, কিন্তু এখন থেকে একটা অস্বস্তির বোঝা ভারী হয়ে আমাদের মধ্যে ঝুলে রইল।
এর ঠিক পরে পরেই যা সব ঘটে গেল তাতে অবশ্য এই ব্যাপারটা নিয়ে ভাবার আর কোন অবসর ছিল না। গ্রামের বাইরে থেকে দম বন্ধ করে ছুটতে ছুটতে খবর নিয়ে এল লোকেরা। “ডাইনোসররা ফিরে আসছে!” অদ্ভুত রকম দানবদের একটি পালকে দেখা গিয়েছে, যারা সমভূমির উপর দিয়ে প্রচণ্ড গতিতে ছুটে আসছিল। এই হারে ছুটতে থাকলে তারা পরের দিন সকালেই গ্রাম আক্রমণ করবে। বিপদঘন্টি বাজিয়ে দেওয়া হল।
একবার ভেবে দেখুন, এই খবরে কি পরিমাণ পরস্পরবিরোধী আবেগের বন্যায় আমার বুক ভরে গিয়েছিল: আমার প্রজাতি বিলুপ্ত হয়নি, আমি আমার ভাইদের সাথে যোগ দিতে পারব, আমার পুরানো জীবন ফিরে পাব! কিন্তু আমার মনে পুরনো জীবনের যে স্মৃতি ফিরে এসেছিল তা ছিল অন্তহীন প্রবাহের – পরাজয়ের, উড়ে চলার, বিপদের; আবার শুরু করার অর্থ সম্ভবত সেই মৃত্যুর বেদনাকে আরো কিছু দিন ধরে সহ্য করা, এমন একটি পর্বে ফিরে যাওয়া যা আমি ভেবেছিলাম ইতিমধ্যেই শেষ হয়ে গেছে। এখন, এখানে এই গ্রামের জীবনে, আমি এক ধরণের নতুন প্রশান্তি অর্জন করেছি, এবং এটিকে হারিয়ে ফেলতে কষ্ট হবে আমার।
নতুন প্রাণীরাও পরস্পর বিরোধী অনুভূতিতে ভেঙে পড়েছিল। একদিকে ছিল আতঙ্ক; অন্যদিকে, প্রাচীন শত্রুর উপর বিজয়ের আকাঙ্ক্ষা; এবং একই সময়ে, এই বিশ্বাস কাজ করছিল যে ডাইনোসররা যদি টিঁকে গিয়ে থাকে, আর এখন যেই রকম প্রতিহিংসার সাথে তারা এগিয়ে আসছে, তার মানে হচ্ছে কেউ তাদের থামাতে পারবে না এবং তাদের বিজয়, এই নতুনদের জন্য যতই করুণ হোক না কেন, সবার জন্য ভেবে দেখলে হয়ত একটা ভাল কিছুও হতে পারে। যেন নতুনরা একই সাথে নিজেদের রক্ষা করতে, পালাতে, শত্রুকে নিশ্চিহ্ন করতে এবং পরাজিত হতে চেয়েছিল; এবং এই অনিশ্চয়তা তাদের প্রতিরক্ষা প্রস্তুতির বিশৃঙ্খলায় ধরা পড়ছিল।
“এক মিনিট!” জাহ্ন চিৎকার করল। "আমাদের মধ্যে কেবল একজনই আছেন যিনি এই যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার উপযুক্ত। আমাদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী তিনি, কদাকার!
“একদম ঠিক কথা! কদাকারকেই আমাদের নেতৃত্ব দিতে হবে!” জনতা সমস্বরে চিৎকার করে উঠল।
"হ্যাঁ, হ্যাঁ, কদাকরকেই পূর্ণ ক্ষমতা দেওয়া হল!" এবং তারা আমার আদেশ মানার জন্য তৈরী হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।
"না, না, আমি কীভাবে এই কাজ করব, একজন বিদেশী লোকের কাজ নাকি এটা?... আমি এই কাজের যোগ্য লোকই নই …” ঝেড়ে ফেলতে চাইলাম আমি। কিন্তু তাদের বোঝানো আমার সাধ্যের বাইরে ছিল।
এবার কি করবো আমি? সেই রাতে আমি চোখ বন্ধ করতে পারিনি। আমার রক্তের ডাক আমায় জোর করছিল যে আমি এদের ছেড়ে যেন চলে যাই এবং আমার ভাইদের সাথে যোগ দিই; আর এই নতুন প্রাণীরা যারা আমায় স্বাগত জানিয়েছিল, আমায় আশ্রয় দিয়েছিল এবং আমাকে বিশ্বাস করেছিল তাদের প্রতি আনুগত্য আমার কাছে দাবি জানাচ্ছিল যে আমি নিজেকে তাদের পক্ষে সামিল করি; এবং এর পরেও যে কথাটা বলার থাকে, আমি পুরোপুরি জানতাম যে ডাইনোসররা বা নতুন প্রাণীরা – এদের কারোই আমার শক্তি কাজে লাগানোর যোগ্যতা ছিল না। যদি ঘটনা এটাই হয় যে ডাইনোসররা আক্রমণ এবং গণহত্যার মাধ্যমে তাদের শাসন পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছে, তবে এর অর্থ দাঁড়ায় যে তাদের অভিজ্ঞতা থেকে তারা কিছুই শেখেনি, তারা কেবল ভুল করে বেঁচে আছে। অন্যদিকে, এটাও স্পষ্ট যে, নতুন প্রাণীরা আমার হাতে নেতৃত্বের দায়ভার তুলে দিয়ে সবচেয়ে সহজ সমাধানটি খুঁজে নিয়েছে: সমস্ত দায়িত্ব একজন বহিরাগতের উপর ছেড়ে দাও, যিনি তাদের ত্রাণকর্তা হতে পারেন, কিন্তু পরাজয় ঘটলে, শত্রুকে শান্ত করতে তার হাতে তুলে দেওয়ার জন্য একটি বলির পাঁঠা হিসেবে তাকে কাজে লাগানো যাবে, কিংবা একেই পাওয়া গেছে সেই বিশ্বাসঘাতক যে তাদের শত্রুদের হাতে তুলে দিয়ে ডাইনোসরদের দ্বারা শাসিত হওয়ার তাদের গোপন, অপ্রকাশ্য স্বপ্ন পূর্ণ করিয়ে দিতে পারে। সংক্ষেপে, আমি উভয় পক্ষের কারও কাজে লাগতে চাইনি: তারা একে অপরকে পালা করে ছিন্নভিন্ন করে ফেলুক! আমি তাদের কারো ব্যাপারে মাথা ঘামাইনি। আমাকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পালাতে হত, তাদের নিজেদের ঝোলে তারা নিজেরাই সেদ্ধ হয়ে মরুক, এই সব পুরানো বস্তাপচা কাহিনিতে আমার আর নতুন কিছু যোগ করার নেই।
সেই রাতেই অন্ধকারে চুপিসাড়ে আমি গ্রাম ছেড়ে চলে গেলাম। আমার প্রথম ঝোঁক ছিল যুদ্ধক্ষেত্র থেকে যতটা সম্ভব দূরে চলে যাওয়া, আমার গোপন আশ্রয়ে ফিরে যাওয়া; কিন্তু তার পর কৌতূহলটা বড় হয়ে উঠল: কারা আমার প্রতিদ্বন্দী তাদের না দেখে যাই কি করে, কে জিতবে সেটা ত জানতে হবে। আমি নদীর বাঁক বরাবর ঝুল-বারান্দার মত পাহাড়ের যে চাটাইগুলো বেরিয়ে আছে তাদের উপর গিয়ে লুকিয়ে থেকে ভোরের অপেক্ষায় রইলাম।
আলো ফুটে ওঠার সাথে সাথে দিগন্তে কিছু ছায়া-মূর্তির আবির্ভাব হল। তারা প্রবল বেগে সামনে ছুটে চলেছে। ভালো করে খুঁটিয়ে না দেখেও ডাইনোসররা যে কোনদিন এমন ল্যাগব্যাগ করে ছুটবে এমন সম্ভাবনার কথা পুরোপুরি খারিজ করে দিয়েছিলাম আমি। যখন তাদের ভালো করে চিনতে পারলাম, আমি ভেবে পেলাম না যে, হাসব নাকি লজ্জায় লাল হয়ে যাব। গণ্ডারদের একটি পাল, সামনেরগুলো আয়তনে তুলনায় বড়, লটপট করছে, ছিরি-ছাঁদ নেই কোন, মাথায় শিংয়ের মত উঁচু হয়ে থাকা ঢিবলি, তবে আর যাই হোক, আক্রমণাত্মক নয় মোটেও, ঘাস ছেঁড়া ছাড়া আর কোন দিকে মন নেই: এদেরই কিনা বাকিরা ভুল করে ধরে নিয়েছিল, পৃথিবীর আদি প্রভু হিসেবে!
গন্ডারের পাল বজ্রপাতের মত শব্দ করে দ্রুত এগিয়ে চলল, মাঝে মাঝে কিছু ঝোপ ঝাড় চাটতে থামল, তারপর সামনের দিগন্তরেখার দিকে ছুটে চলে গেল, জেলেদের যে দলটা তাদের অপেক্ষায় ছিল তাদের দিকে আদৌ কোনরকম নজর করেছে বলে মনে হল না।
আমি দৌড়ে গ্রামে ফিরে গেলাম। "আপনারা সব পুরোপুরি ভুল বুঝেছেন! ওরা মোটেও ডাইনোসর ছিল না!” আমি ঘোষণা করলাম। "এক দল গণ্ডার শুধু, অন্য কিছু না! তারা ইতিমধ্যেই চলেও গেছে। এখন আর কোনো বিপদ নেই!” এবং রাতে আমার নিখোঁজ হওয়ার স্বপক্ষে যে যথেষ্ট যুক্তি ছিল সেটা প্রমাণ করার জন্য যোগ করলাম: "আমি আগে গিয়ে খোঁজখবর নিয়ে নিতে চেয়েছিলাম, তাদের উপর গুপ্তচরগিরি করে সমস্ত তথ্য যোগাড় করে ফিরে এসে আপনাদের জানাব ভেবেছিলাম।
"আমরা হয়তো বুঝতে পারিনি যে তারা ডাইনোসর নয়," জাহ্ন শান্তভাবে বলল, "কিন্তু আমরা এ’টা বুঝতে পেরেছি যে আপনি আমাদের সাথে ছিলেন না," এবং সে আমার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল।
ঠিক করে বলতে গেলে, তারা সবাই হতাশ হয়েছিল: ডাইনোসরদের সম্পর্কে, আমার সম্পর্কে। এখন ডাইনোসরের গল্পগুলো হাসি-ঠাট্টার বিষয় হয়ে উঠল, যেখানে ভয়ানক দানবরা অবিশ্বাস্যরকম হাস্যকর আচরণ করে। আমি এখন আর তাদের গভীর বুদ্ধির অভাব দেখে বিচলিত হই না। এখন আমি আমাদের মূল্যবোধের সেই মহত্ত্বের কদর করতে শিখেছি, যা নিজেদের জন্য অনুপযুক্ত কোন পৃথিবীতে বাস করার চেয়ে সকলে মিলে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়াকেই শ্রেয় মনে করেছিল। আমার বেঁচে থাকার একটাই কারণ দেখতে পাচ্ছি, সেটা হল, আমাদের চারপাশের এই যে হতচ্ছাড়াগুলো, যারা বোকা বোকা খোঁচাখুঁচির আড়ালে নিজেদের ভিতরের সেই ভয়টাকে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করে চলে যেটা আসলে এখনো তাদের আচ্ছন্ন করে রেখেছে, সেই তাদের মাঝখানে অন্তত একজন নিজেকে ডাইনোসর বলে অনুভব করতে পারুক। এবং উপহাস ও ভয়ের মধ্যে কোন একটাকে বেছে নেওয়া ছাড়া এই নতুন প্রাণীদের আর করারই বা কি ছিল?
ফার্ন-ফ্লাওয়ার যখন আমাকে তার একটি সদ্য-দেখা স্বপ্নের বর্ণনা দিল তখন সে আমাদের একটি নতুন বোঝাপড়াকে চুরমার করে ভেঙ্গে দিল: "এই যে ডাইনোসরটি, এ খুব মজার ছিল, পুরোপুরি সবুজ রংয়ের; এবং, সবাই তাকে জ্বালাতন করছিল আর তার পিছনে লাগছিল। একসময় আমি এগিয়ে গিয়ে তাকে উদ্ধার করলাম; আমি তাকে ওখান থেকে সরিয়ে নিয়ে এসে পোষ মানালাম। আর তখন একদিন বুঝতে পারলাম, উপরে উপরে তার আচার-আচরণ যেমন হাস্যকরই লাগুক, আসলে দুনিয়ার সমস্ত প্রাণীদের মধ্যে সে ছিল সকলের চেয়ে দুঃখী এবং সেদিন তার ঐ লাল আর হলুদ চোখ দুটি থেকে অঝোর ধারায় কান্নার স্রোত নেমে এসেছিল।
এই কথাগুলো শুনে আমার ঠিক কী মনে এসেছিল? বিরক্তি, সেই স্বপ্নের দৃশ্যগুলির সাথে নিজের মিলকে অস্বীকার করা, যখন মনে হচ্ছে যে আমার জন্য মমত্ব দেখিয়ে আসলে আমায় করুণা করা হচ্ছে তখন সেটা মেনে নিতে অস্বীকার করা, একজন ডাইনোসরের আত্মসম্মান কমাতে কমাতে যেখানে নামিয়ে আনা হয়েছে সেটা অসহ্য মনে হওয়া? অভিমানে ফেটে পড়েছিলাম আমি; ভিতরটা শক্ত হয় উঠল আমার এবং তার মুখের উপর এক গুচ্ছ অপমান করা কথা ছুঁড়ে দিলাম: “কেন তোমার এই হাবি-জাবি স্বপ্নগুলোর কথা বলে মাথা ধরিয়ে দাও আমার? দিন কে দিন এগুলো আরো বোকা বোকা হয়ে উঠছে। ভাবে গদগদ নির্বোধ আবেগ ছাড়া আর কোন কিছু নিয়ে স্বপ্ন দেখতে পারোনা তুমি!”
ফার্ন-ফ্লাওয়ার কান্নায় ভেঙে পড়ে। আমি কাঁধ ঝাঁকিয়ে চলে গেলাম।
ঘটনাটি ঘটেছিল বাঁধের উপর; আমরা একা ছিলাম না; জেলেরা আমাদের কথাবার্তা শোনেনি ঠিকই, কিন্তু তারা আমার রাগ করা এবং তরুণীর কান্নায় ভেঙ্গে পড়া অবশ্যই নজর করেছিল।
জাহ্নর মনে হল তাকে এর মধ্যে ঢুকতেই হবে। "কি মনে করো তুমি নিজেকে?" অত্যন্ত কঠিন স্বরে জানতে চাইল সে, “আমার বোনকে অপমান করার সাহস হলো কী ভাবে তোমার? ”
আমি থেমে গেলাম কিন্তু কোন উত্তর দিলাম না। সে যদি লড়াই করতে চায়, আমি প্রস্তুত ছিলাম। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে গ্রামের মেজাজ পাল্টে গেছে: তারা এখন সবকিছু নিয়ে ঠাট্টা, ইয়ারকি করে। একদল জেলে অস্বাভাবিক উঁচু গলায় চেঁচিয়ে উঠল: “অনেক হয়েছে, এইবার সব মিটিয়ে ফেলো দেখি, ডাইনোসর কোথাকার!” আমি ভালভাবেই জানি যে এই কথাগুলো যেমন আজকাল সবাই মজা করে বলে সেই রকম ভাবেই বলা হয়েছিল। যার মোদ্দা অর্থটা হচ্ছে: “বাড়াবাড়ি কোরো না, মাথা গরম কোরো না” ইত্যাদি। কিন্তু আমার রক্তে ত তখন অন্য কিছুর ঝড় উঠেছে।
“হ্যাঁ, আমি ঠিক তাই, যদি সত্যিই জানতে চাও ত শুনে রাখো, ” আমি চিৎকার করে বললাম, "আমি একজন ডাইনোসর! পুরোপুরি! আজ পর্যন্ত আর কোন ডাইনোসরের ত দেখা পাওনি তোমরা, এইবার ভালো করে আমায় দেখে নাও!”
চাপা হাসাহাসি শুরু হয়ে গেল।
"আমি গতকাল একটাকে দেখেছি," একজন বুড়ো জেলের গলা শোনা গেল, “বরফ গলে বেরিয়ে এসেছে।” সঙ্গে সঙ্গে তার চারপাশে নীরবতা নেমে এল।
বুড়ো লোকটি আগের দিনই পাহাড়ি এলাকায় বেড়ানো শেষ করে বাড়ি ফিরে এসেছিল। গরমের ফলে অনেক গলে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে আজকাল। একটি প্রাচীন হিমবাহ গলে গিয়ে একটি ডাইনোসরের কঙ্কাল বের হয়ে এসেছিল।
খবরটি ছড়িয়ে পড়ে পুরো গ্রামে। “চলো যাই, ডাইনোসর দেখে আসি!” তারা সবাই দৌড়ে পাহাড়ে উঠে গেল এবং আমিও গেলাম তাদের সাথে সাথে।
আমরা যখন গলিত হিমবাহের স্রোতের ঠেলায় জমে ওঠা পাথর, উপড়ে যাওয়া গুঁড়ি, কাদা এবং মরা পাখির একটি স্তুপ বা মোরাইন অতিক্রম করলাম, তখন আমরা একটি গভীর, খোলার আকৃতির উপত্যকা দেখতে পেলাম। বহুযুগ আগের শ্যাওলার পর্দা পড়ে পাথরগুলো সবুজ হয়ে গিয়েছিল, এখন তারা বরফ থেকে মুক্ত হয়েছে। মাঝখানে এমনভাবে বস্তুটি শুয়ে আছে যেন সে ঘুমিয়ে রয়েছে, কশেরুকাগুলোর মাঝে অনেকটা করে ফাঁক, ফলে ঘাড়টি লম্বা করে বাড়ানো। লেজটি একটি লম্বা সাপের মত পড়ে আছে যেন মাটিতে খোদাই করা, দৈত্যাকার একটি ডাইনোসরের কঙ্কাল পড়ে আছে ওখানে। বুকের গহ্বরটি ছিল একটি বাঁকানো পালের মতো, এবং যখন বাতাস তার পাঁজরের সমতল স্ল্যাবগুলিতে ধাক্কা দিচ্ছিল, তখন মনে হচ্ছিল যেন একটি অদৃশ্য হৃদয় এখনও তাদের মধ্যে স্পন্দিত হচ্ছে। মাথার খুলিটি বেদনাদায়ক অবস্থায় ঘুরে রয়েছিল, মুখ খোলা ছিল যেন শেষ আর্ত চিৎকারে।
নতুন প্রাণীগুলি হুল্লোড় করে চিৎকার করতে করতে সেখানে ছুটে গেল; মাথার খুলির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তাদের মনে হচ্ছিল যেন চোখের খালি গর্তগুলি তাদের দিকে তাকিয়ে আছে; তারা চুপ করে কয়েক পা দূরে দাঁড়িয়ে থাকল, তারপর ঘুরে দাঁড়াল এবং আবার তাদের বোকা বোকা উল্লাসে মেতে উঠল। আমি যখন সেখানে দাঁড়িয়ে এটির দিকে তাকিয়ে রয়েছিলাম, তখন তাদের মধ্যে একজনও যদি একবার কঙ্কালের থেকে চোখ ফিরিয়ে আমার দিকে তাকাত, তবে সে সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পেরে যেত যে আমরা অভিন্ন। কিন্তু কেউ তা করেনি। সেই হাড়গুলি, সেই নখগুলি, সেই নৃশংস হাত-পায়েরা একদিন যে ভাষায় কথা বলত এখন আর সেটি বোঝা সম্ভব নয়; এখন আর তারা কাউকে কিছু বলছিলও না, কেবল সেই অস্পষ্ট নামটি ছাড়া যেটি বর্তমান যুগের অভিজ্ঞতার সাথে কোন ভাবে সংযুক্ত ছিল না।
আমি কঙ্কালটির দিকে তাকিয়েই থাকলাম, আমার বাবা, ভাই, আমার বন্ধুদের, আমার নিজের অস্তিত্ব; আমার মাংসহীন অঙ্গগুলি, পাথরে খোদাই করা আমার রেখাগুলি, আমরা যা কিছু ছিলাম এবং আর নেই, আমাদের মহিমা, আমাদের দোষ, আমাদের ধ্বংসকে, চিনতে পারছিলাম।
এখন এই অবশেষগুলো এই গ্রহের নতুন, অমনোযোগী অধিবাসীদের মানচিত্রে স্রেফ একটা জায়গাকে চিহ্নিত করার কাজে ব্যবহৃত হবে, তাদের কাছে "ডাইনোসর" নামটা নিয়তির অমোঘ নিয়মে একটি ঝাপসা, অর্থহীন শব্দ হয়ে উঠবে। আমি এটা কিছুতেই হতে দেব না। ডাইনোসরদের আসল পরিচয়ের সাথে সম্পর্কিত সমস্ত কিছুর অবশ্যই গোপন থাকা দরকার। নতুন প্রাণীরা কঙ্কালটা পতাকা দিয়ে সাজিয়ে রেখেছিল; রাতে, যখন তারা সেটাকে ঘিরে ঘুমিয়ে রয়েছিল, আমি একটি একটি করে প্রতিটি কশেরুকা তুলে নিয়ে গিয়ে সকলের চোখের আড়ালে আমার মৃত আত্মজনকে কবর দিলাম।
সকালে নতুন প্রাণীরা কঙ্কালের কোনও চিহ্ন খুঁজে পেল না। তারা অবশ্য খুব বেশিদিন এ নিয়ে মাথা ঘামায়নি। ডাইনোসরকে নিয়ে অনেক রহস্যের সাথে আরও একটি রহস্য যুক্ত হল। খুব তাড়াতাড়িই এই ঘটনাটিকে তারা তাদের চিন্তা-ভাবনার জগৎ থেকে বার করে দিয়েছিল।
কিন্তু কঙ্কালের আবির্ভাব তার চিহ্ন রেখে গেল, কারণ তাদের সকলের মনে ডাইনোসর নিয়ে চিন্তা-ভাবনাগুলো এখন থেকে কোন না কোন করুণ পরিসমাপ্তির ধারণার সাথে জুড়ে গেল, এবং এখন থেকে ডাইনোসর নিয়ে তাদের গল্পের মূল সুরটি হয়ে উঠল সমব্যাথার, আমাদের কষ্টের জন্য দুঃখবোধের। তাদের এই করুণায় আমার কোনো দরকার ছিল না। কিসের জন্য করুণা? যদি কখনও কোন প্রজাতি বিবর্তনের চূড়ান্ত শিখরে উঠে থাকে, লম্বা সময় ধরে পরম সুখে রাজত্ব করে থাকে, সেটা ছিলাম আমরা, আমাদের প্রজাতি। আমাদের বিলুপ্তি ছিল একটি বিশাল উপসংহার, যা আমাদের অতীত গরিমার উপযুক্ত ছিল। এই বোকাগুলো এ সবের কি বুঝবে? যখনই ওদের আমি বেচারা ডাইনোসরদের নিয়ে আবেগে মাখামাখি কথাবার্তা বলতে শুনেছি, তখনই আমার মনে হয়েছে যে ওরা তাদের নিয়ে মজা করছে, বানিয়ে বানিয়ে, অবিশ্বাস্য গল্প বলছে। যাই হোক না কেন, ডাইনোসরদের সম্পর্কে আসল সত্যটি এখন আর কেউ বুঝতে পারবে না; এখন থেকে এই গুপ্ত বিষয়টি আমি একান্তে শুধু নিজের জন্য রেখে দেব।
একদল ভবঘুরে গ্রামে এল। তাদের মধ্যে একটি তরুণীও ছিল। আমি যখন তাকে দেখলাম, দেখামাত্র অবাক হয়ে গেলাম। আমার চোখ যদি আমাকে ঠকিয়ে না থাকে, তবে এই তরুণীর শিরায় শুধু নতুন প্রাণীদের রক্ত বইছিল না: সে ছিল একটি বর্ণসঙ্কর, একটি ডাইনোসরের অর্ধ-প্রজাতি। সে কি নিজে এ কথা জানত? না, অবশ্যই না, অন্তত তার একেবারে স্বাভাবিক ব্যবহার থেকে সেটাই মনে হয়। সম্ভবত তার মা-বাবার মধ্যে কেউ এ রকম ছিল না, তবে তার দাদা-দাদি বা তাদের দাদা-দাদি বা আরও দূরবর্তী পূর্বপুরুষদের মধ্যে কেউ একজন ডাইনোসর ছিলেন; এবং আমাদের জাতের বৈশিষ্ট্যগুলি, চলাফেরা, যা এখনও অন্যদের কাছে এমনকি তার নিজের কাছেও অপরিচিত, প্রায় দ্বিধাহীন ভাবে তার মধ্যে আবার ফুটে উঠছিল। দেখতে সুন্দরী, হাসিখুশিও; আসার প্রায় সাথে সাথেই তার একদল প্রেমিক জুটে গেল, এবং তাদের মধ্যে সবচেয়ে নাছোড়বান্দা আর ঘায়েল-হয়ে-যাওয়া ছিল জাহ্ন।
গ্রীষ্মের শুরু হয়েছে তখন। তরুণ-তরুণীরা নদীতে ঝাঁপাঝাঁপি করছিল। "চলে এস, চলে এস," জাহ্ন ডাকল আমায়, আমাদের মধ্যের ঝামেলা মিটিয়ে ফেলে আমার বন্ধু হওয়ার চেষ্টা করেছিল সে; আর তারপর মুহুর্তের মধ্যে সেই আধা-ডাইনোসরের পাশে সাঁতার কাটতে ফিরে গেল।
আমি ফার্ন-ফ্লাওয়ারের কাছে গেলাম। হয়তো এখন সময় এসেছে খোলাখুলি কথা বলার, সমঝোতায় পৌঁছানোর। “কাল রাতে কী স্বপ্ন দেখেছিলে তুমি? ” কথা-বার্তা শুরু করার জন্য জিজ্ঞাসা করলাম আমি।
সে মাথাটা ঝুলিয়ে রাখল। "আমি একটি আহত ডাইনোসরকে কাঁদতে এবং মরতে দেখেছি। তার সম্ভ্রান্ত, কোমল মাথাটি সামনে ঝুঁকিয়ে রেখে একটানা কি কষ্টটাই যে সে পেয়ে গেল… আমি তার দিকে তাকালাম, তার উপর থেকে চোখ সরাতে পারলাম না, এবং আমি বুঝতে পারলাম যে তাকে কষ্ট পেতে দেখে আমি এক অদ্ভুত আনন্দ অনুভব করছি..."
ফার্ন-ফ্লাওয়ারের ঠোঁট চেপে বন্ধ করে রাখা, শয়তানি মাখা, এমন একটি অভিব্যক্তি সেখানে ফুটে উঠেছে, যা আমি তার মধ্যে আগে কখনও দেখিনি। যাই হোক, আমি তাকে যা দেখাতে চেয়েছিলাম, সেটা এটুকুই যে, অস্পষ্ট, ভয়াবহ অনুভূতির সেই নাটকে আমার কোনও অংশ ছিল না: আমি এমন একজন ছিলাম যে জীবনকে উপভোগ করেছিল, আমি একটি সুখী প্রজাতির উত্তরাধিকারী ছিলাম। আমি তার চারপাশে নাচতে শুরু করলাম, নদীত লেজ আছড়িয়ে তার গায়ে জল ছিটিয়ে দিলাম।
"তুমি কখনই এমন কিছু নিয়ে কথা বলতে পারো না যা দুঃখজনক নয়!” ঠাট্টার সুরে বললাম আমি। "বাদ দাও এ’সব। এখানে এসো, নাচ করো।“
সে আমাকে বুঝতে পারল না। ব্যথা আর হতাশায় মুখ কুঁচকে গেলো তার।
"শোনো, তুমি যদি আমার সাথে নাচতে না পারো, অন্য কারো সাথে আমি নাচবো তা হলে!” চেঁচিয়ে বললাম আমি। আধা-প্রজাতির মেয়েটিকে এক পায়ে আঁকড়ে ধরে জাহ্নর চোখের সামনে দিয়ে টেনে নিয়ে চলে গেলাম আমি। নিজের সুখস্বপ্নে জাহ্ন এমন বিভোর হয়ে রয়েছিল যে প্রথমে সে কিছুই বুঝতে না পেরে আমাদের দূরে সরে যেতে দেখল, তারপর প্রবল ঈর্ষায় আর ক্রোধে ফেটে পড়ল। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরী হয়ে গেছে। আধা-প্রজাতি আর আমি ইতিমধ্যে ডুব-সাঁতার দিয়ে অন্য পারের দিকে এগিয়ে চলেছি, সেখানে কোন ঝোপঝাড়ের মধ্যে লুকিয়ে থাকব।
সম্ভবত আমার উদ্দেশ্য শুধু ছিল ফার্ন-ফ্লাওয়ারকে দেখানো যে আমি আসলে কে, আমার সম্পর্কে তার ভুল ধারণাগুলি যাতে আমি ভেঙ্গে দিতে পারি। এবং হয়ত জাহ্নর প্রতি আমার পুরনো তিক্ততাও কিছুটা কাজ করে থাকবে; আমি তার বন্ধুত্বের নতুন প্রস্তাবকে সবার চোখের সামনে ফিরিয়ে দিতে চেয়েছিলাম। অথবা, অন্য যে কোনও কিছুর চেয়ে যেটা বেশি সম্ভব, ঐ আধা-প্রজাতির প্রাণীটির পরিচিত অথচ অস্বাভাবিক রূপ আমার মধ্যে একটি প্রাকৃতিক, সহজ সম্পর্কের আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তুলেছিল, যেখানে কোন কিছু লুকিয়ে রাখতে হবে না, কোন স্মৃতির বোঝা বইতে হবে না।
ভবঘুরেদের কাফেলা কাল সকালে আবার অন্য কোথাও চলে যাবে। আধা-প্রজাতি সেই রাতটা ঝোপঝাড়ে কাটিয়ে দিতে চেয়েছিল। আমিও সেখানেই থাকলাম, ভোর না হওয়া পর্যন্ত তার সাথে গড়িমসি করে আমোদ-আহ্লাদে সময় কাটিয়ে দিলাম।
মোটের উপর শান্ত এবং ঘটনাবিহীন জীবনে এগুলিই যা কয়েকটি ক্ষণস্থায়ী অন্যরকমের পর্ব ছিল। আমি আমার সত্য পরিচয় এবং আমাদের আধিপত্যের যুগকে নীরবে মিলিয়ে যেতে দিয়েছিলাম। এখন তারা আর ডাইনোসরদের সম্পর্কে খুব কমই কথা বলে; হয়তো কেউ আর বিশ্বাসও করে না যে কখনো ডাইনোসর নামের কোন প্রাণীর অস্তিত্ব ছিল। এমনকি ফার্ন-ফ্লাওয়ারও তাদের নিয়ে স্বপ্ন দেখা বন্ধ করে দিয়েছিল।
যখন সে এসে আমাকে বলল: "আমি স্বপ্নে দেখলাম যে একটি গুহায় কোন এক প্রজাতির শেষ একটি প্রাণী বেঁচে আছে যার নাম কেউ মনে রাখে নি, এবং আমি তাকে সেটা জিজ্ঞাসা করতে গিয়েছিলাম, এবং গুহার ভিতরটা অন্ধকার ছিল, এবং আমি জানতাম যে সে সেখানে ছিল, এবং আমি তাকে দেখতে পাচ্ছিলাম না, এবং আমি ভালভাবে জানতাম যে সে কে আর সে দেখতে কেমন ছিল তবে আমি সেটা প্রকাশ করতে পারিনি, এবং আমি বুঝতে পারছিলাম না যে সে আমার প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে নাকি আমি তার প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিলাম..." তখন আমি এর মধ্যে একটা ইঙ্গিত দেখতে পেলাম; আমার মনে হল যে অবশেষে আমাদের মধ্যে একটি ভালোবাসার বোঝাপড়া শুরু হয়েছে, সেই ঝর্ণার ধারে প্রথম যেদিন আমি থেমেছিলাম, যখনও জানতাম না যে তারপর আমাকে আর বেঁচে থাকতে দেওয়া হবে কি না, সেইদিন থেকে যেমনটি চেয়ে এসেছি আমি, সেই রকম।
তারপর থেকে আমি অনেক কিছু শিখেছি, এবং বিশেষ করে শিখেছি যে ডাইনোসররা আসলে কিভাবে জিতে যায়। প্রথমে, আমি মনে করেছিলাম যে, অদৃশ্য হয়ে যাওয়াটা ছিল, আমার ভাইদের কাছে, পরাজয়ের একটি মহান স্বীকৃতি; এখন আমি বুঝতে পেরেছি যে ডাইনোসররা যত বেশি অদৃশ্য হয়ে যাবে, ততই তারা তাদের আধিপত্য প্রসারিত করতে থাকবে এবং সমস্ত মহাদেশগুলিকে যা ঢেকে রেখেছে তার থেকেও অনেক বড় বনাঞ্চলকে ছাপিয়ে যাবে: ছড়িয়ে পড়বে বেঁচে থাকা ব্যক্তিদের চিন্তাভাবনার গোলক ধাঁধায়। বর্তমানের অজ্ঞ প্রজন্মের ভয় আর সন্দেহের প্রায়ান্ধকারতা থেকে, ডাইনোসররা তাদের গলা বাড়িয়ে দিয়েছে, তাদের বাঁকানো নখরওয়ালা খুরগুলি তুলে ধরেছে এবং যখন তাদের প্রতিচ্ছবির শেষ ছায়াটুকু মুছে ফেলা হয়েছে, তখন তাদের নাম এগিয়ে চলেছে, সমস্ত চেতনার উপর চেপে বসে, জীবন্ত প্রাণীদের পরস্পরের সম্পর্কের মধ্যে নিজেদের ক্রমাগত জন্ম দিতে দিতে। এখন, যখন নামটিও মুছে ফেলা হয়েছে, এখন তারা চিন্তার নীরব এবং অনামী ছাঁচগুলির সাথে মিশে সেই জিনিসটি হয়ে উঠবে, যার মাধ্যমে আগামীর চিন্তাগুলি রূপ নেবে, নিজেদের গড়তে থাকবে: নতুন প্রাণীদের মনে, এবং তার পরের নতুন প্রাণীদের মনে এবং তারও পরে নতুন যারা আসতে থাকবে, তাদের মনে।
আমি চারপাশে তাকালাম: যে গ্রাম একদিন আমাকে এক অচেনা আগন্তুক হিসেবে আসতে দেখেছে, এখন তাকে আমি সঠিকভাবেই আমার নিজের বলে ডাকতে পারি, এবং আমি ফার্ন-ফ্লাওয়ারকে আমার নিজের বলে ডাকতে পারি, যে একমাত্র উপায়ে একটি ডাইনোসর কোন কিছুকে বা কাউকে তার নিজের বলে ডাকতে পারে। এর ফলে, নীরবে হাত নেড়ে, আমি ফার্ন-ফ্লাওয়ারকে বিদায় জানাই, গ্রাম ছেড়ে এগিয়ে যাই এবং চিরতরে চলে যাই।
চলার পথে আমি গাছপালা, নদী আর পাহাডগুলোকে দেখলাম, এবং আমি ডাইনোসরদের সময়ে যেগুলোকে দেখেছিলাম সেগুলোর থেকে পরের যুগে যাদের দেখেছি তাদের আর আলাদা করতে পারলাম না। কয়েকটি গুহার চারপাশে একদল ভবঘুরে শিবির বানাচ্ছিল। দূর থেকে আমি আধা-প্রজাতিকে চিনতে পারলাম, এখনও আকর্ষণীয় চেহারা, শুধু একটু মোটা হয়েছে। কারো নজরে না পড়ে যাই, তাই , জঙ্গলের আড়াল নিলাম এবং সেখান থেকে তাকে দেখতে থাকলাম। তার পিছনে একটি ছোট ছেলে ছিল, সবে নিজের পায়ে দাঁড়াতে এবং লেজ নাড়াতে শিখেছে। কত যুগ পরে আমি একটি ছোট্ট ডাইনোসরকে দেখছি, এত নিখুঁত, তার নিজের ডাইনোসরের সত্ত্বায় এমন পরিপূর্ণ, এবং "ডাইনোসর" শব্দটির অর্থ কী তা সম্পর্কে এত অজ্ঞ?
আমি জঙ্গলের মধ্যে একটি ফাঁকা জায়গায় তার জন্য অপেক্ষা করছিলাম, যাতে দেখতে পাই, কেমন করে সে খেলা করে, একটি প্রজাপতিকে ধরতে ছুটে বেড়ায়, একটা পাথরে পাইন-কোন ঠুকে ঠুকে পাইনের বাদাম বের করে আনে। আমি এগিয়ে গেলাম। আমার নিজের ছেলে, কাছে যেতেই পারি।
কৌতূহলের চোখে সে আমার দিকে তাকাল। "তুমি কে?" জিজ্ঞাসা করল সে।
“কেউ নয়,” আমি বললাম। “আর তুমি? তুমি কি জানো তুমি কে? ”
“কী প্রশ্ন! এ ত সবাই জানে: আমি একজন নতুন প্রাণী!”
আমি ঠিক এই উত্তরটাই তার কাছে থেকে শুনব বলে আশা করেছিলাম। আমি তার মাথা আদর করে চাপড়ে দিলাম, বললাম, "একদম ঠিক," এবং সেখান থেকে চলে গেলাম।
আমি উপত্যকা এবং সমভূমির মধ্য দিয়ে চলতে থাকলাম। একটি স্টেশনে এসে হাজির হলাম, প্রথম ট্রামটি ধরলাম এবং ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গেলাম।


0 মন্তব্যসমূহ