(The Geranium)
অনুবাদ: রঞ্জনা ব্যানার্জী
বৃদ্ধ ডাডলি জানালার ধারে রাখা চেয়ারটার ভেতরে শরীরকে ভাঁজ করে জুতে এনে, পনের ফুট দূরে কালচে হয়ে যাওয়া লাল ইটের ধার বসানো অন্য জানালাটার দিকে চোখ পেতে বসেছিলেন। তিনি আসলে জেরেনিয়ামটির জন্য প্রতিক্ষা করছিলেন। ওবাড়ির লোকেরা প্রতিদিন সকাল দশটার দিকে ওকে বার করে এবং সন্ধে সাড়ে পাঁচটায় ভেতরে নিয়ে যায়। তাঁদের বাড়িতে মিসেস কারসনেরও জানালার ধারে এইরকমের জেরেনিয়াম ছিল। ও বাড়িতে প্রচুর জেরেনিয়াম ছিল এবং তারা প্রত্যেকে এর চেয়ে ভালো দেখতে। “আমাদেরগুলো হলো সত্যিকারের জেরেনিয়াম”, বৃদ্ধ ডাডলি মনে মনে ভাবেন, এমন পাঁশুটে গোলাপি রঙের ফুলের গায়ে সবুজ কাগজের রিবন বেঁধে সাজিয়ে রাখবার জিনিস নয়। জানালার ধারের ফুলটাকে দেখে তাঁদের গ্রামের পোলিও আক্রান্ত বালক গ্রিসবির কথা মনে পড়ে যায় তাঁর , যাকে প্রতি সকালে চাকা ঠেলে বাইরে আনা হতো এবং সূর্যের আলোয় চোখ পিটপিট করবার জন্য রেখে আসা হতো।
লুটিশাও যদি এই ফুলটিকে মাটিতে পুঁততো তাতেও কয়েক সপ্তাহ’র মধ্যে এর চেহারা অন্তত তাকাবার মতো হতো। গলির ধারের লোকগুলির একে নিয়ে যেন কোনো মাথা ব্যথাই নেই। সকালে বার করে দেয়, সারা দিনমান সূর্যের তাপে সে সেদ্ধ হতে থাকে, তাছাড়া জানালার কিনারে এতটাই ঘেঁষে রাখে যে জোরে হাওয়া দিলে এক ধাক্কাতেই এটি ধরাশায়ী হবে। এই ফুলের কোনো কদর নেই ওদের কাছে, বিন্দুমাত্র নয়। ফুলটার আসলে এখানে থাকবার কথা নয়। বৃদ্ধ ডাডলির গলা ধরে আসে । লুটিশ যে কোনো কিছু ফলাতে পারতো। র্যাবি-ও। তাঁর গলা বুঁজে যায়। তিনি মাথা পেছনে হেলিয়ে দেন এবং মন থেকে এই সব সরানোর চেষ্টা করতে থাকেন। এইখানে এমন কিছু নেই যা নিয়ে ভাবতে বসলে এই গলা বুঁজে আসার অনুভূতি না ঘটতে পারে।
তাঁর কন্যা ঢুকল ঘরে। “হাঁটতে যাবে না আজ?” জানতে চাইল সে। তাকে দেখে বেশ উত্তেজিত মনে হচ্ছে। তিনি চুপ করে রইলেন। “যাবে না?” -“না”। এই মেয়ে কতক্ষণ এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে তিনি অনুমান করবার চেষ্টা করেন। মেয়েটি তাঁর চোখের অবস্থাও গলার মতোই করে দেয়। চোখে জল এলেই সে টের পেয়ে যাবে। এর আগেও তাঁর চোখে জল দেখেছে সে এবং তাঁর জন্য কষ্ট পেয়েছে । তবে সে নিজের জন্যেও কষ্ট অনুভব করেছে, অথচ চাইলেই সে নিজেকে এই চক্কর থেকে বাঁচাতে পারতো, বৃদ্ধ ডাডলি ভাবেন মনে মনে, যদি কেবল বাপের ব্যাপারে মাথাটা না ঘামাতো- নিজের বাড়িতে নিজের মতো করে যদি বাবাকে থাকতে দিতো এবং এই বিড়ম্বনার দায় কাঁধে না নিতো। মেয়েটি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল কিন্তু জেনেবুঝেই তার সশব্দ দীর্ঘশ্বাসটি পেছনে ফেলে গেল যাতে করে তা হামা দিয়ে ক্রমশ তাঁকে গ্রাস করতে পারে এবং সেই বিভ্রান্তিকর ক্ষণটির স্মৃতি গা ঝাড়া দিয়ে জাগে – ভুলটি তাঁর কন্যার নয় বরং তিনিই নিউইয়র্কে মেয়ের সঙ্গে থাকতে চেয়েছিলেন।
তিনি তো তাঁর সিদ্ধান্ত বদলাতে পারতেন। গোঁ ধরে বললেই হতো যে তিনি যেখানে এতকাল কাটালেন সেখানেই বাকি জীবন কাটিয়ে দেবেন, প্রতিমাসে বাবাকে সে টাকা পাঠাক কিংবা না- পাঠাক, পেনশনের টাকা এবং ছোটোখাটো কাজ করে তিনি দিন চালিয়ে নেবেন। এই ছাতার টাকা কটা সে নিজের কাছেই রাখুক – এই টাকা বাপের চেয়ে তার নিজেরই দরকার বেশি । এভাবে যদি বলা যেতো- তবে ওকে দায়িত্ব থেকে রেহাই দেওয়াও হতো। মৃত্যুর সময় ছেলেমেয়েদের তাঁর কাছে না-থাকাকে কারণ হিসেবে কেউ দুষলে তখন তার এই ইচ্ছেটিকেই সে অজুহাত হিসেবে চালিয়ে দিতে পারত, কিংবা তিনি যদি অসুস্থ হয়ে পড়তেন এবং সেবা করার জন্যে নিজের কেউ না থাকত তবে অনায়াসে সে বলে দিতে পারতো যে, বাবা নিজেই এমনটি চেয়েছিলেন। কিন্তু সেইদিন তাঁর নিউইয়র্ক দেখার গোপন ইচ্ছেটি হঠাৎ আড় ভেঙেছিল। কিশোরকালে তিনি একবার আটলান্টা গিয়েছিলেন এবং সেখানে এক ছবির প্রদর্শনীতে নিউইয়র্কের ছবি দেখেছিলেন।‘ বড় শহরের ছন্দ’ শিরোনামে ছিল সেই প্রদর্শনী। গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলির সবকটিই থাকে বড় শহরে। সেদিনের সেই গুপ্ত ইচ্ছেটিই মুহূর্তের জন্যে চাঙ্গা হয়েছিল। ছেলেবেলার ছবিতে দেখা শহরটিতে তাঁর জন্যে একটি কক্ষ আছে। সেই গুরুত্বপূর্ণ শহরটিতে তাঁর থাকবার জন্যে একটি কক্ষ আছে! তিনি সম্মতি জানিয়েছিলেন: রাজি।
তবে তিনি তিনি নিশ্চিত এই সম্মতি দেওয়ার সময়ে তিনি সুস্থ ছিলেন না । সুস্থ মস্তিষ্কে কিছুতেই তিনি এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। তিনি অসুস্থ ছিলেন বলেই মেয়েকে এই দায়িত্বের দায় কাঁধে নিতে হয়েছিল, তাঁর মুখ দিয়ে সে এই সম্মতির কথাটি আদায় করিয়ে নিয়েছিল। কিন্তু তাঁকে বিরক্ত করতে কেনই বা সে গিয়েছিল সেখানে? তিনি তো ভালোই চালিয়ে নিচ্ছিলেন। অবসর ভাতাতে তাঁর খাদ্যের জোগান হচ্ছিল এবং অন্যান্য খুচরো কাজের পারিশ্রমিক দিয়ে সেই বোর্ডিং কক্ষে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় অনুসঙ্গগুলিয় চালিয়ে নিচ্ছিলেন তিনি।
ফেলে আসা সেই কক্ষটির জানালা তাঁকে আস্ত একটা নদী দিয়েছিল- গভীর নাব্যতার নদী, পাথর পেরিয়ে ধীরে বাঁক নেওয়ার সময় সেই নদীর জলে লাল রঙ ছলকে উঠতো। তিনি মনে করবার চেষ্টা করেন- লালচে রঙ আর ধীরে বওয়া ছাড়া আর কী ছিল সেই নদীর জলে? দুধারের বৃক্ষরাজির সবুজ ছোপ ছিল আরও ছিল উজান স্রোতে বয়ে আসা নদীর বুকে দোল খাওয়া আবর্জনার খয়েরি বিন্দু । তিনি এবং র্যাবি একটা চ্যাপ্টা নৌকায় চড়ে প্রতি বুধবারে মাছ ধরতে বেরোতেন । নদীর বিশ মাইলের ভেতরের সবকিছুই ছিল র্যাবির নখদর্পণে। কোয়া নামের গ্রামটিতে আর কোনো নিগ্রো র্যাবির চেয়ে বেশি করে এই নদীকে জানতো না। র্যাবি নদীকে ভালোবাসতো অথচ বৃদ্ধ ডাডলির নদী নিয়ে কোনো আদিখ্যেতাই ছিল না। মাছের জন্যেই তিনি মুখিয়ে থাকতেন। তিনি সাধারণত রাতের দিকে গাদাখানেক মাছ সিংকে থাবড়ে নামাতে নামাতে বলতেন, “অল্প কটা মাছ পেলাম আজ।“ “এই পরিমাণ মাছ ধরতে তাগত লাগে”- বোর্ডিংয়ের বয়স্ক মেয়েরা বলতো। তিনি এবং র্যাবি বুধবার খুব ভোরে বেরিয়ে পড়তেন এবং সারাদিন মাছ ধরেই কাটাতেন। র্যাবি মাছেদের অবস্থান এবং ঝাঁক খুঁজে দিতো; বৃদ্ধ ডাডলিই তাদের ধরত। মাছ ধরার প্রতি র্যাবির কোনো আগ্রহ ছিল না- সে কেবল নদীর টানেই সঙ্গী হতো। “ঐখানে ছিপ ফেলে কোনো ফায়দা নেই ওস্তাদ”, সে বলতো। “ এই বুড়ি নদী ঐখানে কিসসু লুকিয়ে রাখেনি ওস্তাদ, কিসসু না।“ ও হাসতে হাসতে উজানের দিকে বৈঠা মারতো। র্যাবি এমনই। চুরিতে সে নেউলকে হার মানায় এবং মাছেদের বাড়িও নির্ভুল চেনে। বৃদ্ধ ডাডলি তাকে সবসময়ই চুনোমাছগুলো দিয়ে দিতেন।
বোর্ডিংয়ের ওপর তলার কোণের কক্ষটিতে তিনি সেই ১৯২২ সনে, তাঁর স্ত্রী বিয়োগের পর থেকে থাকছিলেন। এই বিল্ডিংয়ের বয়স্কা নারীদের দেখভালের দায়িত্ব ছিল তাঁর । সেই বিল্ডিংয়ে তিনিই ছিলেন একমাত্র পুরুষ এবং তিনি সেইসব পুরুষালি কাজেরই দায়িত্ব নিয়েছিলেন যা সাধারণত বাড়ির পুরুষেরা পালন করে। তবে রাত নামলেই এই কাজ তাঁর কাছে পানসে হয়ে যেত যখন বৃদ্ধারা বৈঠকখানায় খিটখিট করতো এবং কুরুশ বুনতো আর বাড়ির পুরুষ হিসেবে তাঁকে তাঁদের এই কিচমিচে চড়ুই পাখির ঝগড়ার মতো হাল্কা ঝামেলাগুলোর মীমাংসা করতে হতো। দিনের বেলায় র্যাবি ছিল তাঁর সঙ্গী। র্যাবি আর লুটিশ নিচে বেইসমেন্টে থাকতো। লুটিশ ছিল রান্নার দায়িত্বে আর র্যাবি ছিল পরিচ্ছন্নতা এবং সব্জিবাগানের দায়িত্বে; কিন্তু সে আধা কাজ রেখে দিব্যি কেটে পড়তে জানত এবং বৃদ্ধ ডাডলির চলতি কোনো কর্মযজ্ঞে জুড়ে যেতো - তা মুরগির ঘর বানানো কিংবা দরজা রঙ যাই হোক না কেন। র্যাবি শুনতে ভালবাসত, বিশেষ করে বৃদ্ধ ডাডলির আটলান্টা সফরের কথা এবং কীভাবে বন্দুক জোড়া লাগাতে হয় - এই প্রবীন মানুষটির জীবনের গল্প তাকে টানতো । কোনো কোনো রাতে ওরা ‘পসাম’ শিকারে যেতো। তারা কখনই কোনো ‘পসাম’ ধরতে পারেনি কিন্তু বৃদ্ধ ডাডলির কাছে বোর্ডিং এর বৃদ্ধা- সঙ্গ থেকে পালানোর জন্যে শিকারে বেরিয়ে পড়াই ছিল উত্তম অজুহাত।
র্যাবি ‘পসাম’ ধরা পছন্দ করতো না। যদিও তাঁরা পসাম শিকার তো দূরের কথা কোনো পসামের দেখাও পাননি কোনোদিন ; র্যাবি হলো জলপ্রেমী নিগ্রো। তিনি হাউন্ড আর বন্দুক বিষয়ে কথা বলতে শুরু করলেই র্যাবি জানতে চাইতো, “ আমরা কিন্তু পসাম ধরতে যাচ্ছি না, তাই না ওস্তাদ? আসলে আমার একটা ছোটো কাজ ছিল, কেবল দেখতে এলাম আপনার কিছু লাগবে কি না” ।
“কাদের বাড়ির মুরগি চুরিতে যাবে আজ?”, ডাডলি মজা করে জানতে চাইতেন।
“ তার মানে আমরা পসাম ধরতে যাচ্ছি ,” র্যাবি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতো।
বৃদ্ধ ডাডলি তাঁর বন্দুক বার করতেন এবং বন্দুকের অংশগুলো পৃথক করতেন, র্যাবি প্রতিটি অংশ মুছতে মুছতে তাঁর মুখে এদের কার্যকারিতার বিবরণ শুনতো। এরপরে তিনি ফের এদের জুড়তেন। র্যাবি মুগ্ধচোখে তাঁর বন্দুক জোড়া লাগানোর কাজটি দেখতো। আজ র্যাবি এখানে থাকলে তিনি তাকে নিউ ইয়র্ক চেনাতে নিয়ে যেতেন। তিনি যদি র্যাবিকে নিউ ইয়র্ক শহর দেখাতে পারতেন তবে হয়তো শহরটা অমন বিশাল মনে হতো না- এখন যেমন বাইরে বেরোলেই মনে হয় শহরটা তাঁকে চ্যাপ্টা করে দিচ্ছে তখন হয়তো এই অনুভূতি হতো না। তিনি র্যাবিকে বলতেন, “ এই শহর আসলে অতটা বিশাল নয়”, বলতেন “এই শহরকে তোমাকে দমাতে দিও না র্যাবি। এটি কেবল অন্য একটি শহর আর শহর মানে জটিল কিছু নয়।“ কিন্তু নিউ ইয়র্ক আসলেই জটিল। অবিরাম চলমান এবং ঠাঁসাঠাঁসির শহর থেকে চোখের পলকে নোংরা এবং সুনসান স্থবির জায়গা হয়ে যেতে পারে অনায়াসে। এমন কি তাঁর কন্যাটি যেখানে বাস করে সেটিও কোনো বাড়ি নয়। সে থাকে দালানে - একই ধরনের সার বাঁধা দালানগুলির মধ্যিখানেরটিতে; সবকটির রঙ কালচে লাল এবং ধূসর যেখানে খসখসে মুখের মানুষেরা তাদের জানালার আশেপাশে দাঁড়িয়ে তাকালেই দেখে উল্টো পাশের জানালায় দাঁড়ানো মুখেরা একইভাবে দেখছে তাদের। ভবনগুলির ভেতরে, উপরে কিংবা নিচে চলাচল করা যায় আর সরু গলির মতো বারান্দার দুধারের দরজাগুলো ঠিক যেন মাপজোকের ফিতের ইঞ্চির দাগচিহ্ন হয়ে বেরিয়ে থাকে। তাঁর মনে পড়ে এখানে আসার প্রথম সপ্তায় ভবনগুলির একই চেহারা দেখে তিনি ঘাবড়ে গিয়েছিলেন। প্রতিদিন ঘুম ভাঙলে ভাবতেন বারান্দাগুলো রাতে হয়তো বদলে গেছে এবং দরজা খুলে পরখ করতে গেলে দেখতেন তারা কুকুরদৌড়ের পথের মতোই একভাবে বিছিয়ে আছে । রাস্তাগুলোও একইরকম। তিনি মনে মনে ভাবতেন যদি রাস্তাগুলির কোনো একটি ধরে হাঁটতে শুরু করেন তবে কোথায় গিয়ে থামবে এই পথ? একরাতে স্বপ্নে দেখেছিলেন যে সত্যিই তিনি এমনটি করেছেন এবং হাঁটতে হাঁটতে এই দালানের শেষ মাথাতে পৌঁছেছেন – অন্য কোথাও নয়।
পরের সপ্তায় তাঁর মেয়ে, মেয়ে-জামাই এবং তাদের ছেলেটির উপস্থিতির বিষয়টি প্রকট হয়ে উঠেছিল তাঁর কাছে – ঘরের ভিতরে এদের এড়িয়ে হাঁটাচলা করার কোনো উপায়ই নেই । মেয়ে-জামাইটি অদ্ভুত প্রকৃতির। সে ট্রাক চালায় এবং সপ্তাহান্তে বাড়ি ফেরে। ‘না’ কে বলে ‘নাহ্। এবং ‘পসাম’ নামে যে একটি প্রাণী আছে সেই তথ্য জানা নেই তার । বৃদ্ধ ডাডলি তাঁর নাতির কক্ষে থাকেন, যার বয়স ষোল এবং যার সংগে বাতচিত করা দুরূহ। কিন্তু মাঝে মাঝে যখন বাড়িতে তিনি এবং কন্যা একা হন তখন কন্যাটি পিতার পাশে এসে বসে এবং কথা বলে। কিন্তু কথোপকথন শুরুর আগে সে কোনো একটি বিষয় মাথায় নিয়ে আসে। সাধারণত সে তার অন্য কোনো কাজের ছুতোয় উঠে যাওয়ার মোক্ষম সময়টিতেই সেই বিষয়টি উপস্থাপন করে , ফলে ডাডলিকেই কিছু একটা বলতেই হয়। তিনি এমন কিছু বলার চেষ্টা করেন যা এর আগে বলেননি। সে কখনই দ্বিতীয়বার একই জিনিস কানে নেয় না।
মেয়েটি চেয়েছিল তার বাবার জীবনের শেষ দিনগুলি যেন আপনজনদের সান্নিধ্যেই কাটে, জরাগ্রস্ত বোর্ডিং হাউসটির নড়নড়ে মাথাওয়ালা বৃদ্ধাদের সঙ্গে নয়। সে তার কর্তব্য করছিল। ওর আরও ভাইবোন আছে তারা তা করেনি।
একবার কন্যা তাঁকে নিয়ে কেনাকাটা করতে গিয়েছিল কিন্তু তিনি ওর সঙ্গে পা মিলিয়ে চলতে পারছিলেন না, পিছিয়ে যাচ্ছিলেন । তাঁরা ‘সাবওয়ে’তে উঠেছিলেন - মাটির তলায় চলা ট্রেন যেন বিশাল গুহার ভেতরে রেলপথ । লোকজন সেই ট্রেন থেকে সেদ্ধ হয়ে উথলে বেরুচ্ছিল এবং সিঁড়ি বেয়ে বাইরের রাস্তায় ছিঁটকে পড়ছিল। আবার একইভাবে রাস্তা থেকে গড়িয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে অন্য ট্রেনের ভেতরে ঘুঁষে যাচ্ছিল - কালো-সাদা- হলুদ, হরেক রঙের মানুষ ঠিক যেন হরেক রকম সব্জির মিশেল স্যুপ। সেই স্যুপের ভেতর সমস্ত কিছু টগবগ করে ফুটছে অবিরাম। ট্রেনগুলো সুরঙ্গ থেকে হুশ করে বেরিয়ে খালের উপর উঠে হুট করে থেমে যাচ্ছিল । বেরিয়ে আসা মানুষগুলো, ভেতরে ঢুকতে যাওয়া মানুষের ভিড় ঠেলে পথ করে নিচ্ছিল , এবং সঙ্কেত বাজতেই ট্রেনগুলো চকিতে অদৃশ্য হচ্ছিল । বৃদ্ধ ডাডলি এবং তাঁর কন্যাকে এমনই তিনটি পৃথক ট্রেন পাল্টে তবেই যেখানে যাওয়ার সেখানে পৌঁছাতে হবে। তিনি ভাবছিলেন লোকজন কেন যে তাদের বাড়ি ছেড়ে বেরোয়। মনে হচ্ছিল তাঁর জিভ মুখে নেই পিছলে পেটে সেঁধিয়ে গেছে। মেয়েটি তাঁর কোটের হাতা ছুঁয়ে ছিল এবং মানুষের ভিড় ঠেলে তাঁকে টেনে পার করছিল।
সেই দিন মাটির ওপরের ট্রেনেও চড়তে হয়েছিল। মেয়েটি একে বলেছিল ‘ইআই’। সেই ইআই ট্রেন ধরতে তাঁদেরকে আবার একটা উঁচু প্ল্যাটফরমে উঠতে হয়েছিল। বৃদ্ধ ডাডলি সেই প্ল্যাটফরমের রেলিঙয়ের ওপর থেকে তাকিয়েছিলেন নিচে, লোকজন হুড়মুড়িয়ে চলছে এবং যানবাহন ছুটছে অবিরাম। তাঁর শরীর গুলিয়ে উঠেছিল। তিনি এক হাতে রেলিঙে ভর দিয়ে কাঠের পাটাতনে বসে পড়েছিলেন। মেয়েটি আর্তনাদ করে উঠেছিল এবং তাঁকে কিনারা থেকে হ্যাঁচকা টানে সরিয়েছিল, “ তুমি কি ঝাঁপ দিয়ে নিজেকে মারতে চাইছ?”
পাটাতনের চিড় খাওয়া অংশটুকু দিয়ে তিনি তখনও দেখতে পাচ্ছিলেন রাশিরাশি গাড়ি মহাসড়কে সাঁতার কেটে চলেছে। “ আমার কিছু যায় আসে – না’, তিনি অস্ফুটে বলেছিলেন, “ আমি মরা-বাঁচার ধার ধারি না।‘
“চল,” কন্যা বলেছিল, “ বাড়ি ফিরলে তোমার ভালো লাগবে’।
“ বাড়ি”? তিনি পুনরাবৃত্তি করেছিলেন। তাঁর ঠিক নিচে তখনও গাড়িগুলো ছন্দ মিলিয়ে পেরিয়ে যাচ্ছিল।
“ চল বাবা,” মেয়ে বলেছিল , “ ট্রেন আসছে, ধরতে হলেএক্ষুনি যেতে হবে”। তাঁরা সেদিন সবকটি ট্রেনই শেষ মুহূর্তেই ধরতে পেরেছিলেন।
শেষ ট্রেনটিতেও উঠেছিলেন একইভাবে। বিল্ডিঙে ফিরেছিলেন এবং ফিরেছিলেন অ্যাপার্ট্মেন্টেও। অ্যাপার্ট্মেন্টটা সেদিন ভীষণ চাপা লাগছিল। মনে হচ্ছিল এমন কোনো জায়গা নেই এখানে যেখানে অন্য কেউ নেই। রান্নাঘর তাকিয়ে আছে বাথরুমের দিকে, বাথরুম হাঁমুখ খুলে দেখছে অন্য যা কিছু, সব এবং তুমি ঠিক সেইখানে গেঁড়ে আছ যেখান থেকে শুরু করেছিলে। ফেলে আসা বাড়িতে উপরতলা ছিল, বেইসমেন্ট ছিল এবং ফ্রেজিয়েরস এর সামনেই ছিল নদী… তার গলা ফের বুঁজে আসতে থাকে।
জেরেনিয়ামটা আজ বড় দেরি করছে। এখন সাড়ে দশটা বাজে। ওরা সাধারণত সোয়া দশটার মধ্যে ওকে বাইরে বসায়। হলঘরের কোথাও রাস্তার দিকে অবোধ্য কিছু চেঁচিয়ে বলে চলেছে কোনো নারী; রেডিও তে কোনো ধারাবাহিকের পুরোনো সুর কোঁকাচ্ছে; এবং অগ্নি-নির্গমন দরজার ওপার থেকে আবর্জনার পাত্র সশব্দে গড়িয়ে পড়েছে । পাশের অ্যাপার্টমেন্টের দরজাটা সজোরে বাঁধল কেউ এবং জুতোয় ক্যাঁচক্যাঁচ আওয়াজ তুলে কেউ একজন যাচ্ছে করিডোর ধরে। “সেই নিগ্রোটাই হবে” , বৃদ্ধ ডাডলি বিড়বিড় করলেন। “মচমচ জুতো পায়ের সেই নিগ্রো”।
সপ্তাহ খানেক আগে তাঁর সামনেই নিগ্রোটা ভেতরে ঢুকেছিল। সেই বৃহস্পতিবারে তিনি দরজার বাইরে এই কুকুর-দৌড়ের লম্বা করিডোরের দিকে তাকিয়েছিলেন তখনই দেখলেন নিগ্রোটা পাশের অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকছে। ওর গায়ে ছিল ধূসর সরু ডোরাকাটা স্যুট, গলায় খয়েরি টাই। কড়া করে মাড় দেওয়া শার্টের উঁচু সাদা কলার ওর গলার কাছে স্পষ্ট বিভাজন টেনেছিল।পায়ের চকচকে জুতোজোড়ার রঙ ওর টাই এবং গায়ের রঙের মতোই খয়েরি। বৃদ্ধ ডাডলি মাথা চুলকেছিলেন। তাঁর ধারণা ছিলো না, এই ধরনের বিল্ডিঙে চাকর রাখার মতো সম্পন্ন কেউ থাকতে পারে। তিনি মৃদু হেসেছিলেন। অনেক ভালো নিগ্রোরা তাদের রবিবারের পোশাকে এমনতরো কাজে আগ্রহী হবে। এই নিগ্রোটা নিশ্চয় এই শহরের আশপাশ ভালো চিনবে অন্তত কীভাবে কোথায় পৌঁছাতে হয় তার ধারণা রাখবে। বলা যায় না শিকারেও পাকা হতে পারে। এমন কি ধারে কাছে কোথাও কোনো নদীর খোঁজও জানতে পারে। তিনি দরজা লাগিয়ে মেয়ের ঘরের দিকে পা চালিয়েছিলেন। “জানো পাশের ফ্ল্যাটের ওরা একটা কালো চাকর রেখেছে। নিশ্চয় ওদের ঘরদোর পরিষ্কার করে সে। তোমার কি মনে হয় প্রতিদিন একে রাখার মতো সামর্থ্য আছে ওদের?”
কন্যাটি বিছানা পরিপাটি করতে করতে চোখ তুলে তাকিয়েছিল বাবার দিকে। “ কী বলছ তুমি?”
-“বলছি পাশের ফ্ল্যাটের ওরা একটা নিগ্রো চাকর রেখেছে- রবিবারের পোশাকে দুরস্ত হয়ে এসেছে।“
কন্যা হেঁটে বিছানার অন্যপ্রান্তে গেল গুছাতে, বলল, “তোমার মাথাটা গেছে বাবা”, পাশের অ্যাপার্ট্মেন্ট খালি, তাছাড়া এখানে কারুরই চাকর পোষার সামর্থ্য নেই। “
“ আমি তো তোমাকে বললাম, আমি নিজের চোখে দেখেছি,” বৃদ্ধ ডাডলি বাঁকা হাসি দিয়েছিলেন। “ গলায় টাই আর সাদা কলার পরে সোজা ভেতরে গেল- চোখা জুতো আছে পায়ে।“
“ যদি সে ভেতরে গিয়ে থাকে তবে সে নিজেই সে বাড়ির দেখভালের মালিক”, মেয়ে নিচুস্বরে উত্তর দিয়েছিল। এবং এগিয়ে ড্রেসিং টেবিলের জিনিসপত্র গোছগাছ করতে লেগেছিল।
বৃধ ডাডলি হেসে দিয়েছিলেন। এই মেয়ে চাইলে ভয়ানক মজা করতে পারে। “ যাই হোক,” তিনি বলেছিলেন, “আমার মনে হয়ে আমি ভেতরে গিয়ে ওর কোন দিন কাজ নেই তা জেনে নেবো । হয়তো মাছ ধরার লোভও দেখাতে পারি,” তিনি তার পকেটে চাপড় দিয়ে ভেতরের সিঁকি দুখানির আওয়াজ শোনালেন।
কিন্তু দরজা খুলে বারান্দায় পা রাখবার আগেই মেয়ে তীব্রবেগে ছুটে তাঁকে টেনে ভেতরে ঢুকিয়েছিল। “তুমি কি শুনতে পাওনি আমি কী বলেছি?”, চেঁচাচ্ছিল সে। “ তোমাকে আমি সত্যিটাই বলেছি। যদি লোকটা ভেতরে ঢুকে থাকে তবে সে নিজেই ভাড়া নিয়েছে। তুমি ওখানে গিয়ে ওকে কিছু বলবে না বা জিজ্ঞাসা করবে না। আমি নিগ্রোদের সঙ্গে কোনোরকমের ঝামেলায় যেতে চাই না। ”
“ কী বলছ!, “ বৃদ্ধ ডাডলি বিড়বিড় করছিলেন, “ ও তোমার পড়শি ?”
মেয়ে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলেছিল, “ আমার তো তাই-ই মনে হচ্ছে। এবং তোমাকে নিজের চরকাতেই তেল দেওয়ার অভ্যেস করতে হবে” ।
কথাগুলো ঠিক এইভাবেই বলেছিল মেয়ে। যেন তাঁর কোনো আক্কেলজ্ঞান নেই। কিন্তু তিনিও ওকে ছাড়েননি, দু’কথা শুনিয়ে দিয়েছিলেন। যা বলবার বলেছিলেন এবং মেয়েও জানতো তিনি ঠিক কি বোঝাতে চাইছেন।
“তোমাকে এইভাবে মানুষ করা হয়নি মোটেই”, তিনি ভারী স্বরে মনে করিয়ে দিয়েছিলেন মেয়েকে, “তোমাকে এইভাবে বড় করা হয়নি যে তুমি এমন ঘেঁষাঘেঁষি করে নিগ্রোদের সঙ্গে বাস করবে যাতে করে ওদের মনে হয় যে তোমার মতোই ওরাও কিংবা নিজ গোত্রের সংগেই ওদের ওঠাবসা চলছে! আর যদি ভেবে থাকো যে ওদের সঙ্গে আমার ভাব করার ইচ্ছে আছে , তবে তোমার নিজের মাথাই নষ্ট বলতে হবে।“ এই কথা কটি তাঁকে সময় নিয়ে থেমে থেমে বলতে হয়েছিল কেননা তার গলা ধরে আসছিল। মেয়ে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে শুনেছিল এবং উওরে জানিয়েছিল যে ওরা ওদের সামর্থ্য অনুযায়ী যেখানে ভালো জীবন যাপন করতে পারবে সেখানেই থাকে এবং সুযোগের সর্বোচ্চ ব্যবহারও করে। ভাবা যায় ! মেয়ে তাঁকে জ্ঞান দিচ্ছে! এবং এতটূকু বলেই সে আড়ষ্ট পায়ে ভেতরে চলে গিয়েছিল। এটি তাঁর মেয়ে। বাতাসে গলা ভাসিয়ে কাঁধ দুটো ভেতরের দিকে ঢুকিয়ে পুণ্যাত্মার ভাব নিয়েছিল সে, যেন তিনি নির্বোধ। তিনি শুনেছিলেন ইয়াংকিদের কেউ কেউ এদের সদর দরজা দিয়ে বাড়িতে ঢুকতে দিচ্ছে এবং বসার ঘরের সোফায়ও বসতে দিচ্ছে কিন্তু তাঁর নিজের মেয়ে যাকে কিনা যথার্থ মূল্যবোধে বড় করা হয়েছে, সে এদের পাশের ঘরেই থাকবে এবং ভাববে তার বাবার মাথা এমনই নষ্ট হয়েছে যে এদের সঙ্গে মেলামেশা করার চিন্তা করছেন। তিনি কি এইধরনের কিছু ভাবতে পারেন!
তিনি চেয়ার ছেড়ে উঠে পাশের চেয়ারের ওপর থেকে পত্রিকাটি তুলে নিলেন। মেয়ে ফের ঘরে ঢুকলে যেন মনে করে যে তিনি পত্রিকা পড়ছেন। দরজার মুখে দাঁড়িয়ে মেয়ের তাঁকে কীভাবে ব্যস্ত রাখা যায় ভেবে সারা হওয়ার বিষয়টি অর্থহীন মনে হয় তাঁর কাছে। পত্রিকার ওপর দিয়ে জানালার ওপারের গলির দিকে ফের দৃষ্টি দিলেন তিনি। জেরেনিয়ামটি এখনও নেই ওখানে। এত দেরি এর আগে কখনও হয়নি। প্রথম যেদিন এটিকে দেখেছিলেন সেইদিন তিনি জানালা দিয়ে গলির ওপারের জানালাটার দিকে তাকিয়েছিলেন এবং পরে ঘড়ি দেখেছিলেন বুঝতে প্রাতঃরাশের পরে ঠিক কতটা সময় ধরে ফুলটি ওখানে আছে। পরে আবার যখন তাকিয়েছিলেন দেখেছিলেন ফুলটা তখনও বাইরেই। কেন জানি ফুলটা তাঁকে বিস্মিত করেছিল। তিনি পুষ্পপ্রেমী নন কিন্তু এই জেরেনিয়ামটিকে ঠিক ফুল মনে হচ্ছিল না তাঁর, সেই গ্রিসবি নামের বালকটির মতোই লাগছিল আর এর রঙ দেখে মনে হচ্ছিল ফেলে আসা হোমের বৃদ্ধাদের বসবার ঘরের জানালার পর্দার রঙ এবং কাগজের ফুলটি লুটিশের রবিবারের পোশাকের পেছনে বাঁধা ফিতের ফুলটি যেন। লুটিশের ফিতের প্রতি দুর্বলতা আছে। কালোদের প্রায় সকলেরই এই প্রীতি আছে ডাডলি মনে মনে ভাবেন।
তার কন্যা ফের এলো । তিনি ভান নয় আসলেই পত্রিকার দিকে তাকিয়ে ছিলেন তখন। “তুমি আমার একটা উপকার করতে পারবে?” সে এমনভাবে জিজ্ঞেস করল যেন এইমাত্র উপকারটির কথা ওর মাথা থেকে গজিয়েছে। তিনি মনে মনে ভাবলেন মুদির দোকানে যেতে না- হলেই হয়। আগেরবার তিনি পথ হারিয়েছিলেন। উঁচু দালানগুলোর প্রত্যেকে দেখতে একই রকম। তিনি মেয়ের দিকে সম্মতিসূচক মাথা নাড়লেন।
“ নিচের তলার মিসেস শিমার্টের কাছ থেকে শার্টের ছাঁচটা নিয়ে আসবে যেটা তিনি জেইকের জন্য ব্যবহার করেন? “
মেয়েটা কেন যে তাঁকে বসে থাকতে দেয় না? শার্টের ছাঁচের আসলে কোনো প্রয়োজনই নেই।
“ ঠিক আছে। কত নম্বরে ?”
“ দশ নম্বর। আমাদেরটার মতো একই নম্বর। ঠিক আমাদের নিচেই, তিন তলায়।“ বৃদ্ধ ডাডলি এই কুকুরদৌঁড়ের বারান্দা দিয়ে হাঁটার সময় আতঙ্কে থাকেন, কখন কোন দরজা খুলে জানালা দিয়ে গলা বাড়ানো তীক্ষ্ণনাসা হাতকাটা গেঞ্জি পরা লোকগুলির কোনো একজন বেরিয়ে এসে খেঁকিয়ে বলবে, “কী চাই এখানে?”
নিগ্রোটার অ্যাপার্ট্মেন্টের দরজা খোলা। এখান থেকেই তিনি দেখতে পারছেন জানালার ধারে একজন মহিলা বসা, মহিলার চোখে রিমলেস চশমা এবং কোলের ওপরে বই। নিগ্রোদের একটা ব্যাপার আছে, বৃদ্ধ ডাডলি মনে মনে ভাবেন, ওদের বদ্ধ ধারণা চোখে চশমা না- পরা পর্যন্ত সাজ সম্পূর্ণ হয় না। লুটিশের চশমা পরার কথা মনে পড়ে গেল তাঁর। চশমা কেনার জন্য লুটিশ তের ডলার জমিয়েছিল। কত পুরু কাচের চশমা লাগবে তা জানতে চলে গিয়েছিল ডাক্তারের কাছে। ডাক্তার সাহেব ওকে কাচের ভেতর দিয়ে পশুর ছবি দেখতে বলেছিলেন এবং ওর চোখে আলো ফেলে চোখের ভেতরে পরীক্ষা করেছিলেন, মাথার ভেতরেও দেখেছিলেন। অতঃপর রায় দিয়েছিলেন চশমার দরকার নেই। লুটিশ এতটাই খেপেছিল যে পরপর তিন দিন ভুট্টার রুটি গড়তে গিয়ে পুড়িয়ে ফেলেছিল। তারপর ‘দশ-সেন্টের’ দোকান থেকে একটা চশমা কিনে এনেছিল। সস্তা চশমা। মাত্র এক ডলার আটত্রিশ সেন্ট দাম। প্রতি রোববার লুটিশ সেই চশমা চোখে আঁটতো। “নিগ্রোরা এমনই”, তিনি বিড়বড় করলেন। অমনি মনে হলো বেশ আওয়াজ করেই বলে ফেলেছেন তিনি। মুখের উপর হাত উঠে গেল তাঁর। অ্যাপার্ট্মেন্টের কেউ শুনে ফেলতে পারে। তিনি সিঁড়ির দিকে পা চালালেন। দ্বিতীয় সারি সিঁড়ির ধাপে পা রাখতেই নিচ থেকে কারও উঠে আসার আওয়াজ শোনা গেল। তিনি রেলিঙের ওপারে ঝুঁকে দেখলেন, মোটাসোটা অ্যাপ্রোন গায়ে এক মহিলা উঠে আসছেন। ওপর থেকে তাঁকে দেখতে অনেকটা তাঁদের বাড়ির মিসেস বেনসনের মতোই লাগছে। ভদ্রমহিলা কি তাঁর সঙ্গে কথা বলবেন - তিনি ভাবতে থাকেন। যখন তাঁরা পস্পরের চার ধাপ দূরে, তিনি আড়চোখে তাকান মহিলার দিকে- মহিলা তাঁকে দেখছে না। যখন তাঁদের মধ্যে দূরত্বই রইল না, মুহূর্তের জন্য চোখ তুললেন তিনি, দুজনের চোখাচোখি হলো – মহিলা ঠাণ্ডা মুখে তাঁকে দেখলেন। এবং পাশ কেটে উপরে উঠে গেলেন। একটি শব্দও ব্যয় করলেন না। তাঁর পেটের ভেতরে কেমন ভার ভার বোধ হতে লাগল তাঁর।
তিনি তিনতলার জায়গায় আরও একতলা বেশি নেমে গিয়েছিলেন । ফের একসারি বেয়ে উপরে উঠতে হলো এবং দশ নম্বর ঘরও খুঁজে পেলেন। মিসেস শ্মিট আশ্বস্ত করলেন ‘ঠিক আছে’ এবং তাঁকে এক মিনিট দাঁড়াতে বলে মাপের ছাঁচ আনতে ভেতরে চলে গেলেন। খানিক পরে বাচ্চাদের একজনের হাতে দিয়ে নকশাটি পাঠিয়ে দিলেন। বাচ্চাটি কিছু বলল না। বৃদ্ধ ডাডলি উপরে যাওয়ার জন্যে সিঁড়িতে পা রাখলেন। এবার তাঁকে ধীরে সিঁড়ি বাইতে হবে। উপরে উঠতে তাঁর ক্লান্ত লাগে। ইদানিং সবকিছুতেই তাঁর ক্লান্তি আসে । তাঁর ফুটফরমায়েশ খাটার জন্যে র্যাবির মতো কেউ নেই এখানে। র্যাবি হাল্কা পায়ে চলতঁে জানা নিগ্রো। সে এমনভাবে চুপিসারে মুরগির খোপে ঢুকতো যে খোদ মুরগিরাই টের পেতো না এবং সে তাঁর জন্যে সবচেয়ে নাদুশনুদুশ মুরগিটাই আনতো, ডানা ঝাপ্টানোগুলো নয়। দ্রুততায়ও রাবি অনন্য ছিল। ডাডলি আগাগোড়াই এমনই ভারীপায়ে কদম ফেলা মানুষ। তার মনে আছে একবার তিনি এবং রাবি মল্টনের কাছে কোয়েল শিকারে গিয়েছিলেন। তাঁদের সঙ্গে ছিল হাউন্ড কুকুর যে কিনা শখের পইন্টারগুলোর চেয়ে দ্রুতগতিতে শিকারের খোঁজ দিতে পারতো। শিকার তাড়িয়ে আনতে না-পারলেও শিকারের দিকে বন্দুক তাক করবার সময় সেখানে সে মৃতের মতো নিশ্চল অপেক্ষা করতে জানতো। সেবার হাউন্ডটা তেমনই বরফের মতো জমে বসেছিল। “বড় কোনো দাও হবে নির্ঘাত,” রাবি চাপাস্বরে বলেছিল , “ আমি দিব্যি টের পাচ্ছি”। ধীরে বন্দুক উঁচু করে চলছিলেন তিনি । পাইন-সূচগুলো সাবধানে মাড়াতে হচ্ছিল । সারা পথ জুড়ে ছড়িয়ে ছিল ওরা এবং পথ পিচ্ছিল বানিয়ে রেখেছিল। র্যাবি ওর শরীরের সাম্য রাখছিল এদিক ওদিক হেলে এবং সেই মোমের মতো পিচ্ছিল সূচের গায়ে স্বতঃস্ফূর্ত সতর্ক পা ফেলে এগিয়ে যাচ্ছিল। সে সামনের দিকে সটান তাকিয়ে দ্রুতগতিতে চলছিল। অন্যদিকে বৃদ্ধ ডাডলি এক চোখ সামনে এবং অন্য চোখ মাটিতে পেতে হাঁটছিলেন। ঢালু পথে যখনই পা হড়কাচ্ছে তখনই বৃদ্ধ বিপদজনকভাবে সামনে ঝুঁকছিলেন অথবা সাম্য রাখার জন্য একপাশে হেলতে গিয়ে পেছনে পিছলে যাচ্ছিলেন।
“ওস্তাদ এই বার আমি পাখি মারার কাজটা করলে ভালো হতো না? “র্যাবি প্রস্তাব দিয়েছিল। “আপনি কখনই সোমবারে সোজা পায়ে খাড়া থাকতে পারেন না। একবার যদি গর্তে পড়েন তবে বন্দুকের গুলি বেরিয়ে পাখিদের ছত্রখান করে দেবে” ।
কিন্তু বৃদ্ধ ডাডলি নিজেই এই পাখির দলকে মারবেন সাধ করেছিলেন। অন্তত চারটে পাখি এক ছড়ড়ায় নিচে ফেলতে পারবেন তাঁর বিশ্বাস। “আমিই ধরব ওদের”, চাপা গলায় বলেছিলেন তিনি। চোখের সমান্তরালে বন্দুক তাক করে সামনে ঝুঁকে পা ফেলতেই পায়ের নিচে কিছু একটা সরে গিয়েছিল এবং তিনি গোড়ালির উপর ভর রেখে পেছনে পিছলে গিয়েছিলেন। যথারীতি বন্দুকের গুলি বেরিয়ে গিয়েছিল এবং ডানা ঝাপ্টে পাখিসব ছড়িয়ে পড়েছিল চারদিকে।
“ধুসস, এত্ত ভালো শিকার আজ ভেস্তে গেল!” র্যাবি দীর্ঘশ্বাস ছেড়েছিল।
“আমরা আরেকটা দল খুঁজে নেবো। “বৃদ্ধ ডাডলি সান্ত্বনা দিয়েছিলেন, “এখন আমাকে এই বিশ্রী গর্ত থেকে উদ্ধার কর।‘
তিনি অন্তত পাঁচটা পাখি সেই দিন মারতে পারতেন যদি পিছলে না-পড়তেন। বেড়ার ওপরে রাখা কাচের বোতল ফাটানোর মতোই শুইয়ে দিতে পারতেন সবকটাকে। তিনি এক হাত কানের কাছে পেছনে টেনে আরেক হাত দিয়ে বন্দুক ধরার ভঙ্গি করলেন। মাটির কবুতরের মতোই সবকটাকে এক গুলিতেই সাবাড় করতে পারতেন। ব্যাং! আর ঠিক তখনই পেছনে সিঁড়িতে ক্যাঁচক্যাঁচ আওয়াজ হলো, তিনি সজোরে ঘুরে তাকালেন- তাঁর বাহুতে তখনও সেই অদৃশ্য বন্দুকটি তাক করা। সেই নিগ্রোটা! জুতো মচমচিয়ে উঠে আসছে তাঁর দিকে, ওর নিপুণ- ছাঁটা গোঁফের আড়ে আমুদে হাসি ছড়িয়ে আছে। ঠোঁটজোড়া পেছনে চেপে সে না-হাসার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে। বৃদ্ধ ডাডলি স্থানু হয়ে রইলেন। নিগ্রোটার শার্টের কলার তার গলার কাছে যেখানে তীক্ষ্ণ বিভাজন টেনেছে, সেইদিকে স্থির চেয়ে রইলেন। ‘কী শিকার করছেন পুরোনো মানুষ?” নিগ্রোর জিজ্ঞাসার স্বরে নিগ্রোদের হাসি আর সাদা মানুষের বিদ্রুপ মেশানো।
বৃদ্ধ ডাডলির নিজেকে খেলনা বন্দুক হাতে কোনো শিশুর মতো মনে হচ্ছিল। তাঁর হা-মুখের মাঝখানে জিভটা যেন শক্ত হয়ে জমে আছে। ঠিক নিচে হাঁটু জোড়া ফাঁপা মনে হলো । এবং তাঁর পায়ের পাতা ফস্কে গেল। তিনি তিন সিঁড়ি নিচে পিছলে বসে পড়লেন।
“আপনাকে সাবধানী হতে হবে”, নিগ্রো বলল। “এই সিঁড়িগুলোতে অনায়াসেই আপনি বড় ধরনের দুর্ঘটনায় পড়তে পারেন।“ এবং সে বৃদ্ধ ডাডলির দিকে হাত বাড়িয়ে দিলো যেন তিনি তার উপর ভর দিয়ে উঠে আসতে পারেন। লম্বা সরু তার হাত এবং নখের ডগা পরিচ্ছন্ন আর যত্নে কাটা। দেখে মনে হচ্ছে ওদের ঘষে মসৃণ করা হয়েছে। বৃদ্ধ ডাডলির হাতজোড়া তাঁর হাঁটুর দুপাশে ঝুলছিল । নিগ্রো তাঁকে বাহু ধরে ওঠানোর চেষ্টা করছিল। ‘উফফ’, সে নিশ্বাস নিল, “আপনার ওজন আছে। একটু নিজেকে তুলে ধরুন এপাশটায়।“ বৃদ্ধ ডাডলির হাঁটুর ভাঁজ খুলে গেল এবং তিনি টলমল করে উঠে দাঁড়ালেন। নিগ্রো তাঁর বাহু সংলগ্ন হয়ে রইল। “আমি তো উপরেই যাচ্ছি। আমি আপনাকে সাহায্য করব।“ বৃদ্ধ ডাডলি উদ্ভ্রান্তের মতো তাঁর চারপাশে চোখ বোলালেন। পেছনের সিঁড়ির ধাপগুলি সব যেন বুঁজে আসছে। তিনি একজন নিগ্রোর সঙ্গে উপরে উঠছেন। নিগ্রো তার জন্যে সিঁড়ির প্রতিটি ধাপে অপেক্ষা করছিল।“তো আপনি শিকার করেন?” নিগ্রো বলে চলছিল। “তাই মনে হচ্ছে। আমিও একবার হরিণ শিকারে গিয়েছিলাম। আমার যতটা মনে পড়ে আমরা সেবার ডডসন .৩৮ দিয়ে সেই হরিণগুলো মেরেছিলাম। আপনি কী ব্যবহার করেন?” বৃদ্ধ ডাডলি ওর চকচকে জুতোর দিকে তাকিয়ে উত্তর দিলেন, “ আমি বন্দুক ব্যবহার করি।“
“বন্দুক নিয়ে শিকার করার চেয়ে বন্দুক নিয়ে ভাব দেখানোতেই বেশি আনন্দ পাই আমি”, নিগ্রোটা বলল। “‘আমি খুব একটা শিকারপ্রেমী নই। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের বদলে তাদের বিলুপ্তির কারণ হওয়া লজ্জাকর বটে। যদিও সময় এবং সামর্থ্য থাকলে আমিও নানা ধরনের বন্দুক সংগ্রহ করতাম।“ সে সিঁড়ির প্রতিটি ধাপে বৃদ্ধ ডাডলি পা না - রাখা পর্যন্ত অপেক্ষা করছিল। এবং নানা ধরনের বন্দুক ও তাদের তৈরির বিবরণ দিয়ে যাচ্ছিল। ধূসর রঙের উপর কালো ছিঁটে দেওয়া মোজা পরা ওর পায়ে।
তাঁদের সিঁড়ি বাওয়া শেষ হলো । নিগ্রো ডাডলির বাহু ধরে বারান্দা পার করাল। বাইরে থেকে দেখে ভ্রম হতে পারে যে ডাডলিই ওর বাহু ধরে আছেন ।
ডাডলির ফ্ল্যাটের দরজায় সামনে গিয়েই থামল সে। এরপর জানতে চাইল, “আপনি কি এখানকার?” বৃদ্ধ ডাডলি মাথা নাড়লেন, চোখ তার দরজার দিকে সন্নিবদ্ধ। পুরোটা সময় তিনি একবারের জন্যেও নিগ্রোর মুখের দিকে তাকাননি।সিঁড়ি ভেঙে এতটা পথ যে এলেন, একবারও মুখ তুলে তাকাননি লোকটার দিকে।
“আসলে এই জায়গাটা দারুণ – একবার অভ্যেস হয়ে গেলেই ঠিক হয়ে যাবে। “সে তাঁর পিঠে বার কয়েক মৃদু চাপড় দিলো এরপরে নিজের অ্যাপার্ট্মেন্টে সেঁধিয়ে গেল। বৃদ্ধ ডাডলিও ঘরে ঢুকলেন। তাঁর গলার ভেতরের টনটনে ব্যথাটা সারা মুখে ছড়িয়ে এবার চোখে বেয়ে ঝরছে ।
তিনি জানালার ধারের চেয়ারটা টেনে শরীর ছেড়ে দিলেন ।মনে হচ্ছে তাঁর গলা ফেটে চৌচির হবে এখনই। তাঁর গলা চৌচির হবে একজন নিগ্রোর জন্য- একটা হতচ্ছাড়া নিগ্রো যে তাঁর পিঠ চাপড়ে স্তোক দিলো এবং তাঁকে বলে গেল পুরোনো মানুষ! ‘তিনি’ যে কি না নিশ্চিত যে তিনি এমনটি নন। ‘তাঁকে’ যিনি কি না উত্তম জায়গা থেকে উঠে এসেছেন। উত্তম জায়গা। যেখানে এমনতরো কিছু ঘটতেই পারে না। তাঁর চোখজোড়া কোটরের ভেতরে অদ্ভুত বোধ করাচ্ছে। তারা যেন ফুলে উপচে উঠছে। খানিক সময় পরে কোটরের ভেতরে তাদের আর জায়গাই হবে না। তিনি এমন এক ফাঁদে পড়েছেন যেখানে নিগ্রোরা অনায়াসে মুখের উপর বলে দেয়, ‘পুরোনো মানুষ’। এই ফাঁদ থেকে তাঁকে বেরুতে হবে। এখানে আটকে পড়া যাবে না। তিনি চেয়ারের পেছনে তার মাথা এলিয়ে দিলেন, যেন তার গলা শিথিল হয় এবং ভেতরের ভরাট চাপটি চলে যায়।
হঠাৎ নজরে এলো একটা লোক তাঁকে দেখছে। গলির ওপারে জানালার ধারের লোকটি সটান তাকিয়ে আছে তাঁর দিকে! লোকটি তাঁর কান্নার দৃশ্য দেখছে দাঁড়িয়ে । ঠিক এই জায়গাতেই জেরেনিয়ামটির থাকবার কথা অথচ গেঞ্জিপরা লোকটি সেখানে দাঁড়িয়ে তাঁর কাঁন্না দেখছে, তাঁর গলা ফেটে যাওয়ার মুহূর্তটির জন্য অপেক্ষা করছে। বৃদ্ধ ডাডলি লোকটির দিকে ফিরে তাকালেন। এখানে জেরেনিয়ামটি ছিল। ওখানে জেরেনিয়ামের থাকার কথা, লোকটির নয়।
“জেরেনিয়ামটা কোথায়?”, তাঁর ভারী গলা তুলে তিনি জানতে চাইলেন।
“আপনি কী কারণে কাঁদছেন? আমার জীবনে কোনো পুরুষকে এভাবে কাঁদতে দেখিনি।“
“ জেরেনিয়ামটা কোথায়?” বৃদ্ধ ডাডলির গলা কেঁপে উঠল। “ ওখানে তোমার নয় তার থাকবার কথা।“
“ এটা আমার জানালা। চাইলেই এখানে দাঁড়াবার অধিকার আমার আছে।“
“ কোথায় ফুলটা?” বৃদ্ধ ডাডলির গলা বুঁজে আসছে।
“ আপনার অবগতির জন্য জানাচ্ছি ওটা পড়ে গেছে।“
বৃদ্ধ ডাডলি চেয়ার ছেড়ে জানালার কার্নিশের কাছে এগিয়ে গেলেন। দেখলেন গলির সামনে ছয় তলার নিচে ধুলোবালির ভেতরে মাটির টবটা শতখান হয়ে পড়ে আছে এবং সবুজ ফিতের ফুলের ভেতর থেকে গোলাপি রঙের কিছু একটা বেরিয়ে আছে। ছয় তলার নিচে। টবটা খান খান হয়ে গেছে- ছয় তলার নিচে পড়ে।
তিনি লোকটির দিকে তাকালেন যে কিনা চুইংগাম চিবোতে চিবোতে তাঁর গলা ফেটে যাওয়ার ক্ষণটির অপেক্ষা করছে।
“ ওটাকে কার্নিশের অত কাছে রাখা ঠিক হয়নি।“ উনি চাপাস্বরে জানতে চাইলেন, “ তুলে আনছ না কেন?”
“দাদাজান আপনি যান না কেন?”
তিনি লোকটিকে রাগীচোখে দেখলেন, যে লোকটি জেরেনিয়ামের জায়গা দখল করে দাঁড়িয়ে আছে -সেই লোকটির দিকে তাকালেন। তিনি যাবেন। সিদ্ধান্ত নিলেন - নিচে যাবেন এবং তুলে আনবেন। এরপরে ফুলগাছটিকে নিজের জানালার ধারে রাখবেন এবং তাঁর ইচ্ছেমত সারাদিন দেখতে থাকবেন। তিনি জানালা থেকে সরে গেলেন এবং ঘরের বাইরে এলেন। কুকুর-দৌড়ের সরু বারান্দা পেরিয়ে সিঁড়ির ধাপে পা রাখলেন। এই সিঁড়িটা যেন মেঝের গভীর ক্ষতের মতো নিচে গড়িয়ে গেছে। গুহার ভেতরের কোনো কুঠূরির মতো খুলে গিয়ে ক্রমাগত গড়িয়ে চলেছে নিচে। এবং একটু আগেই তিনি নিগ্রোটার খানিক পেছনে এই সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠেছেন। আর সেই নিগ্রো তাঁকে টেনে তুলে খাড়া করেছিল এবং তার বাহু সংলগ্ন হয়ে একই ধাপে পা রেখে উপরে উঠেছে, এবং হরিণ শিকারের গল্প বলেছে, “ পুরোনো জমানার মানুষ” বলেছে, অদৃশ্য বন্দুক ধরে থাকার দৃশ্যটিও দেখেছে। ওর পায়ে চকচকে খয়েরি জুতো ছিল এবং সে হাসি সামলাবার চেষ্টা করছিল এবং সমস্ত ব্যাপারটিই ছিল চুড়ান্ত হাস্যকর। সিঁড়ির ধাপগুলো পেঁচিয়ে নেমে যাচ্ছে নিচে। তিনি আর নিচে নামবেন না এবং কোনো নিগ্রোকে তাঁর পিঠ চাপড়াবার সুযোগ করে দেবেন না। তিনি তাঁর কক্ষে ফিরে এলেন এবং জানালার ধারে গিয়ে দাঁড়ালেন এবং নিচে পড়ে থাকা জেরেনিয়ামটিকে দেখতে থাকলেন।
লোকটা এখনও সেখানেই যেখানে ফুলটির থাকবার কথা । “ কী ব্যাপার, ফুলটা তুলে আনতে দেখলাম না যে,” লোকটা আওয়াজ দিলো।
বৃদ্ধ ডাডলি রাগী চোখে তাকালেন লোকটির দিকে।
“ আপনাকে আমি আগেও দেখেছি,” লোকটা বলে চলল, “ আমি দেখেছি ঐ পুরোনো চেয়ারটায় গেঁড়ে বসে প্রতিদিন আপনি জানালা দিয়ে আমার অ্যাপার্টমেন্ট দেখেন। আমি কী করি আমার ঘরে তা আমার একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার, বুঝেছেন ? আমি কী করি না - করি তা বসে বসে কেউ জরিপ করবে তা আমি বরদাস্ত করব না।“
নিচে, গলিতে জেরেনিয়ামটা ওর শেকড় উপরে ভাসিয়ে নিস্তেজ পড়ে আছে।
“আমি কিন্তু একবারই সাবধান করি,” লোকটি বলল এবং জানালা ছেড়ে ভেতরে ঢুকে গেল।
লেখক পরিচিতি:
ফ্ল্যানেরি ও’ কনরের জন্ম ১৯২৫ সনে, আমেরিকার জর্জিয়া প্রদেশের সাভান্নাহ্ শহরে। তাঁর পুরো নাম মেরী ফ্ল্যানেরি ও’কনর। তিনি তাঁর নামের ‘মেরী’ অংশটুকু ছেঁটে ফেলেছিলেন। বারো বছর বয়সে তাঁর পরিবার একই প্রদেশের দূরবর্তী শহর মিলেজভিলে চলে আসেন এবং এখানেই তাঁর জীবনের বড় অংশ লেখেলিখি এবং তাঁর পোষা ময়ূরদের সান্নিধ্যে কাটিয়েছেন। তিনি দুটি উপন্যাস, ত্রিশটির মতো গল্প এবং নানা বিষয়ক প্রবন্ধ লিখেছেন। রাখঢাক ছাড়াই বর্ণবাদ, রাজনীতি, অভিবাসী, শ্রেণীবৈষম্য তাঁর লেখায় উঠে এসেছে।
১৯৫১ সনে ফ্ল্যানেরি দুরারোগ্য ব্যাধি ‘লুপাসে’ আক্রান্ত হন। দীর্ঘ রোগ-ভোগের পর মাত্র উনচল্লিশ বছর বয়েসে ১৯৬৪ সনে ফ্ল্যানারি ও’ কনর মৃত্যুবরণ করেন।
অনুবাদক :
রঞ্জনা ব্যানার্জী
গল্পকার, অনুবাদক।
কানাডা।


0 মন্তব্যসমূহ