সাক্ষাতকার নিয়েছেন ফ্রাঞ্চেস্কো পাচিফিকো
দি প্যারিস রিভিউ, সংখ্যা ২৪৭, বসন্ত ২০২৪
অনুবাদ : উৎপল দাশগুপ্ত
ঝুম্পা লাহিড়ির সঙ্গে প্রথম আমার কথাবার্তা হয় রোমে, এই জুলাই মাসে, ত্রাস্তেভেরের জ্যানিকুলমের কাছে ওঁর অ্যাপার্টমেন্টে। দিনটা ছিল অসম্ভব গরম – আমাদের একটি সাক্ষাত হয়েছিল এমন একটি দিনে যেদিন ছিল রোমের ইতিহাসের অন্যতম উষ্ণ দিন, ১১০ ডিগ্রি – শেষ বিকেলের দিকে উত্তাপ কিছুটা নিরাপদ সীমায় পৌঁছনোর পরে ছাদে পা রাখার আগে পর্যন্ত আমরা বৈঠকখানাতেই বসে কথা বলছিলাম, যেখানে একটি বড় পাখা বনবন করে ঘুরছিল, ঠিক হেনরি জেমস-এর একটি দৃশ্যের মত বাইরে একটি ঘিঞ্জি বস্তির ওপরে ঢালু হয়ে নেমে আসা কতগুলি টিলা দেখা যাচ্ছিল। অ্যাপার্টমেন্টে ছড়িয়ে ছিটিয়ে যে সব টুকরোটাকরা জিনিস ছিল তার মধ্যে দেখতে পেলাম ভিন্টেজ সিসিলিয়ান-অরেঞ্জ প্যাকেজিং-এর কিছু নিদর্শন, ইতালিয়ান কমিউনিস্ট পার্টির লোগোর ছবি দেওয়া একটি ফলক, আর গ্লাসকেসের মধ্যে বাঁধিয়ে রাখা ফুটবল খেলোয়াড় দানিয়েলে দি রসি’র সই করা একটি জার্সি।
লাহিড়ির জন্ম ১৯৬৭ সালে লন্ডনে, কলকাতা থেকে আসা এক বাঙালি দম্পতির সংসারে, প্রতিপালিত হন রোড আইল্যান্ডের একটি ছোট শহরে। ২০১২ সালে সাংবাদিক-সম্পাদক স্বামী আলবের্তো ভ্যুরভলিস-বুশ এবং ওঁদের সন্তান অকতেভিও আর নুর-এর সঙ্গে রোমে চলে আসেন। গত দশকের বেশ অনেকখানি সময় ওঁর কেটেছে ইতালি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া আসা করে, ২০১৫ থেকে ২০২২ পর্যন্ত প্রিন্সটনে উনি শিক্ষকতার কাজে নিযুক্ত ছিলেন, এবং গত বছর শীতের শুরু থেকে বার্নার্ড কলেজে যোগদান করেছেন – যে শিক্ষায়তন থেকে তিনি নিজেও শিক্ষালাভ করেছিলেন – এখানে তিনি সৃজনশীল লেখনীর কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্বেও রয়েছেন। আবার আমাদের সাক্ষাত হয় অক্টোবর মাসে, ব্রুকলীনের ফোর্ট গ্রীনে, ওঁর ব্রাউনস্টোনে (বাদামি স্যান্ডস্টোনের ইট দিয়ে তৈরি বাড়ি যা উনবিংশ শতকে খুবই জনপ্রিয় ছিল)। বাড়িটি চারতলা, বৈঠকখানার শেষে একটি বড়সড় কিচেন আর লিভিং স্পেস আর সর্বোচ্চ তলায় লাহিড়ির স্টাডি। এই বাড়িতে উনি এবং ভ্যুরভলিস-বুশ বছরখানেক কী বছরদুয়েক ধরে থাকেননি, তাই আমরা যখন সোফায় বসে আলাপচারিতা করছিলাম, ওঁর স্বামী জায়গাটাকে বাসযোগ্য করে তোলার চেষ্টা করছিলেন। কিছু কিছু আসবাব এখনও স্টোরে বন্ধ, অনেক কলাসামগ্রী, বিমূর্ত ছবির কোলাজ এবং টানটান করে রাখা বড় বড় ক্যানভাস একটি শ্বেতপাথরে ম্যান্টেলপিসের গায়ে হেলান দিয়ে রাখা হয়েছে, নতুন করে টাঙ্গানোর অপেক্ষায়। দেওয়ালগুলো গাঢ় বেগুনি রঙে রঙ করা।
এই দুই শহরেই আমরা ইতালিয়ান ভাষাতেই কথাবার্তা বলছিলাম, ওঁরই অনুরোধে। তিরিশে পা দেবার শুরু থেকেই এই ভাষাটি আয়ত্ত করার জন্য উনি আন্তরিক প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন, তবে ওঁর বাচনভঙ্গিটি অনায়াস এবং পোশাকি শব্দের প্রয়োগ প্রায় নেই বললেই চলে। (আমার সামনে উনি এবং ভ্যুরভলিস-বুশ নিজেদের মধ্যে ইতালিয়ান ভাষাতেই একে অপরের সঙ্গে কথা বলছিলেন।) ইংরেজি শব্দের প্রয়োগ উনি কদাচিৎ করছিলেন, যখন কাউকে উদ্ধৃত করার দরকার পড়ছিল, বিশেষত, আমেরিকান প্রকাশনা – যাদের সঙ্গে ওঁর সম্পর্ক কিছুটা হলেও বিতর্কিত – তাদের কোনও ব্যক্তিত্বের উল্লেখ করার সময়। যখন ওঁর সর্বপ্রথম প্রকাশিত গল্পসংগ্রহ, Interpreter of Maladies (১৯৯৯)’র জন্য পুলিৎজ়ার প্রাইজ় পান, তখন লাহিড়ির বয়স ছিল বত্রিশ বছর, এবং এখনো পর্যন্ত উনিই এই সম্মানের কনিষ্ঠতম প্রাপক। এই সংগ্রহের এবং এর ঠিক পরবর্তী সংগ্রহ, Unaccustomed Earth (২০০৮)’র কাহিনীগুলির সংবেদনশীলতা এক প্রকার হালকা আঁচড় টেনেই তুলে আনার নিপুণতা দেখিয়েছেন, অল্প কয়েকটি বাক্যের মাধ্যমে চরিত্রগুলিকে এবং তাদের আবেগপ্রবণতাকে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করিয়ে নেওয়ার দক্ষতা দেখিয়েছেন, এবং প্রেমিক-প্রেমিকা কিংবা দুজন নিকটাত্মীয়ের স্থিতিশীল সম্পর্কে সামান্যতম চিড় ধরলেও যে ধরণের আলোড়ন সৃষ্টি হতে পারে, সেই বিরল দিকটিতেও দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়েছেন। অনেকেই যেটি ওঁর সাহিত্যের মূল ধারা বলে মনে করেন – মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আগত ভারতীয় অভিবাসীদের অভিজ্ঞতা – সেটির জন্যও উনি প্রসিদ্ধি লাভ করেছেন। ওঁর প্রথম উপন্যাস, The Namesake (২০০৩), সমালোচকদের মনযোগ আকর্ষণ করতে পেরেছে এবং বাণিজ্যিক ভাবেও উপন্যাসটি সফল হয়েছে, প্রকাশিত হবার বছর তিনেক পরে এটি চলচিত্রায়িতও হয়েছে; The Lowland (২০১৩) – লাহিড়ি নিজেই আমাকে জানিয়েছেন যে ইংরেজি ভাষায় লেখাগুলির মধ্যে এটিই ওঁর সর্বাপেক্ষা উচ্চাভিলাষী রচনা এবং তাঁর নিজের কাছেও এই বইটির প্রভূত গুরুত্ব রয়েছে বলে মনে করেন – এই উপন্যাসে তিনি বারে বারে মূল প্রসঙ্গ থেকে বিচ্যুত হয়ে টুকরো টুকরো ঘটনাবলী দিয়ে, যাকে বলা যেতে পারে, একটি পারিবারিক কাহিনী উপস্থাপন করেছেন, এবং এই উপন্যাসই এখন পর্যন্ত ইংরেজি ভাষায় লেখা ওঁর সর্বশেষ উপন্যাস।
“আজকাল যেহেতু আমি ইতালিয়ান ভাষায় লেখালেখি করি, তাই কেমন যেন মনে হয় যে মানুষ হয়ত ভাবছেন আমি হয়ত লেখালেখি করার পাট চুকিয়েই দিয়েছি,” লাহিড়ি আমাকে বলে ফেললেন। কিন্তু ইতালিয়ান ভাষায় লেখালেখি শুরু করার পর থেকে নয় বছরে ছ’টি বই প্রকাশ করে কেবল যে একজন অনুপ্রাণিত লেখক হিসেবেই আত্মপ্রকাশ করেননি, উপর্যুপরি লেখালেখি করার নূতন এবং বৈচিত্রময় বিন্যাসের সন্ধান পেয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে In Other Words (২০১৫, অনুবাদ ২০১৬)-এ দিনলিপির আকারে লেখা সংবাদপত্রের কলামের সংকলন, ভাষাটা রপ্ত করে সেই ভাষায় লিখতে শুরু করার প্রয়াস; চিত্রকল্পের কাঠামোতে লেখা Whereabouts (২০১৮, অনুবাদ ২০২১) – মধ্যবয়সী একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের জীবনকে কেন্দ্র করে একটি উপন্যাসিকা (“শিরোনামটা ইংরেজিতে যথাযতভাবে ব্যক্ত করা যায় না,” লাহিড়ির বক্তব্য); এবং Roman Stories (২০২২, অনুবাদ ২০২৩) – যে শহরকে উনি স্বভূমি বলে দাবি করেন সেই শহরে আসা বিবিধ ধরণের বিদেশিদের সঙ্গে সাক্ষাতের অভিজ্ঞতা নিয়ে টুকরো টুকরো ইতিবৃত্ত। Whereabouts উপন্যাসটি এবং Roman Stories-এর অধিকাংশ কাহিনী লাহিড়ি নিজেই ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন; তাঁর অনুবাদ করা দোমিনিকো স্তারনোনে’র Ties, Trust, এবং Trick, এই উপন্যাসগুলি– শেষের অনুবাদটি National Book Award for Translated Literature-এর জন্য চূড়ান্ত তালিকাভুক্ত হয়েছে - মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ওঁর রচনা সম্পর্কে নতুন করে আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। বর্তমানে তিনি ইয়েলানা বারাজ়ের সঙ্গে যৌথভাবে Modern Library’র জন্য ওভিদ-এর Metamorphoses-এর একটি নতুন অনুবাদের কাজে হাত লাগিয়েছেন।
লাহিড়ির সঙ্গে কথাবার্তা বলার সময় ওঁর মধ্যে একটি অস্থিরতার আভাস পাওয়া যায়, ওঁর জীবনচর্যায় এবং ওঁর লেখালেখি নিয়ে, প্রায় আবিষ্ট হয়ে আছেন বলা যায়, যেন কোনো সীমিত পরিসরে আবদ্ধ হয়ে না থাকার জন্য ওঁর সচেতন সংগ্রাম। শেষ যেবার যখন ওঁর সঙ্গে সাক্ষাত হয়েছিল, বার্নার্ডে ওঁর দপ্তরে, একটি সবুজ রঙের স্যুটকেসের কথা মনে পড়ে গেছিল, যেটি আমি রোমে ওঁর লিভিং রুমের মাঝখানে রাখা ছিল দেখেছিলাম – সেই সময় উনি ওঁর বিশৃঙ্খল জীবনযাত্রার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন। এখন দপ্তরের পেছনের দিকে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন, দেখতে পেলাম স্যুটকেসটি সেখানেও বিরাজমান।
সাক্ষাতকার গ্রহিতা
কথা বলার সময় আপনার অঙ্গভঙ্গি লক্ষ্য না করে পারিনি ... ইংরেজিতে কথা বলার সময়ও এটাই করে থাকেন?
ঝুম্পা লাহিড়ি
না, এটা কেবল আমার ইতালিয়ান অস্তিত্বের অঙ্গই বলতে পারেন। এই মুহূর্তে আমরা যদি ইংরেজিতে কথা বলতাম, তবে আমি অনেক বেশি আড়ষ্টবোধ করতাম, আত্মসচেতন হয়ে পড়তাম।
সাক্ষাতকার গ্রহিতা
এই তারতম্য কী কারণে?
ঝুম্পা লাহিড়ি
বলে বোঝানো বেশ কঠিন – তবে ইতালিয়ানে কথা বলার সময় আমি অনুভব করতে পারি যে আমি হলাম সেই ঝুম্পা যে পোর্তা পোর্তেসের বাজারে ক্যালাব্রিয়ান দম্পতির কাছ থেকে স্যান্ডুইচ কিনতে যায়, যে ত্রাস্তেভেরে পুলে সাঁতার কাটতে যায়, পাশাপাশি লেনে সাঁতার কাটার সময় যদি ওদের ‘হাই’ বলি, আমার আরেকটা অস্তিত্ব নিয়ে ওদের সামান্যতম ধারণাও থাকবে না। এই সব মুহূর্তে নিজেকে সব চাইতে সজীব আর সহজ মনে হয়। আমার কাছে ইতালি থেকে সব থেকে বড় প্রাপ্তি হল যে আমার অন্তরাত্মা আমাকে এই বলে আশ্বস্ত করে যে এখানে আমার কঠোর অনুশাসন মেনে চলবার দায় নেই, যেটা হতে ইচ্ছে করে সেটাই হতে পারি, যা লিখতে মন চায়, লিখতে পারি, একদম নিজস্ব শর্তে। একমাত্র ইতালিয়ান ভাষায় লেখালেখি করার সময়েই আমি হয়ত কেবল নিজেরটা ছাড়া অন্যান্য সব কণ্ঠস্বরকে, সমস্ত ছিদ্রান্বেষী কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করে দিতে পারি।
সাক্ষাতকার গ্রহিতা
ঠিক কোন সব কণ্ঠস্বরের কথা আমরা বলতে চাইছি?
ঝুম্পা লাহিড়ি
আমার ইংরেজি সত্তাময় জীবনে, যদি সময়টাকে সেভাবে চিহ্নিত করা যায়, একটা অনুভূতি হত যে যদি বিশেষ একটা মাপকাঠি ছুঁতে না পারি, আমি অসফল বলে দেগে যাব। মার্কিন শিক্ষাদীক্ষা, একেবারে শুরু থেকেই, আমার মনে বিশেষ কিছু ধারণা জন্মিয়ে দিয়েছে – এই সংস্কৃতির ধারকবাহক হয়ে উঠতে হবে, আর তারপর, আমি যখন লেখালেখির জগতে প্রবেশ করলাম, আমাকে আমেরিকা-প্রবাসী ভারতীয়দের অভিজ্ঞতার ‘প্রতিনিধিত্ব’ করতে হবে, অভিবাসী অভিজ্ঞতার। তারপর আমার মা, আমার পিতা-মাতা, তাঁদের অভিবাসী সম্প্রদায়, তাঁদের বহু উচ্চশিক্ষিত বন্ধুবান্ধব – এঁদের সম্বন্ধে চিরকালীন কিছু প্রচলিত ধারণা তো রয়েছেই। এঁদের শরীরী ভাষায় তুলনা আর প্রতিদ্বন্দ্বিতার ছোঁয়া লেগে থাকে, প্রত্যেকেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে আর অন্যান্যদের তুলনায় এগিয়ে থাকতে ব্যস্ত থাকেন। তার ওপরে আছে কলকাতায় যে জগতটাকে পেছনে ফেলে আমার বাবা-মা চলে এসেছেন, সেই জগত সম্বন্ধে কিছু পূর্বনির্ধারিত ধারণা। এই সব কিছুই আমাকে আত্মস্থ করতে হয়েছে।
সাক্ষাতকার গ্রহিতা
ব্যাপারটা বেশ কৌতূহলোদ্দীপক তো – ইংরেজিতে লেখা আপনার উপন্যাসগুলোতে পরিবারই হল সর্বাত্মক শক্তির আধার, কিন্তু ইতালিয়ান উপন্যাসগুলোর কেন্দ্রে আপনি নিঃসঙ্গ নারীদের হাজির করিয়েছেন।
ঝুম্পা লাহিড়ি
ধন্যবাদ ডঃ পাচিফিকো – হয়ত একমাত্র ইতালিয়ানে লেখালেখির সময়েই আমি নিজের মধ্যে নিজেকে খুঁজে পাই।
সাক্ষাতকার গ্রহিতা
ঠিকই, একটি অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি! অর্থাৎ তিনশ ডলার।১
আচ্ছা বলুন তো, এমন কোনও মুহূর্ত কি এসেছে যখন প্রথমবার নিজের কণ্ঠস্বর আপনাকে আনন্দ দিয়েছে?
ঝুম্পা লাহিড়ি
না। নিজের কণ্ঠস্বর থেকে আনন্দলাভ করা আমার লক্ষ্য ছিল না। আমি কেবল এটুকুই চেয়েছিলাম আমার একটা কণ্ঠস্বর তৈরি হোক।
সাক্ষাতকার গ্রহিতা
অর্থাৎ যখন আরম্ভ করলেন, তখন কখনো অনুভব করেননি যে আপনি একটা লক্ষ্যভেদ করে ফেলেছেন?
ঝুম্পা লাহিড়ি
Interpreter of Maladies-এর গল্পগুলো নিয়ে যখন ভাবনাচিন্তা করছিলাম, ঠিক করেছিলাম গল্পগুলো নৈর্ব্যক্তিকতার ধার ঘেঁষে যাবে – পুরোপুরি পক্ষপাতশূন্য এবং যতটা সম্ভব কম দৃষ্টি আকর্ষণকারী হবে। যেন দরজা খোলার সময় আমার চাবি ঘোরানোর শব্দও যেন কারও কানে না পৌঁছায়।
সাক্ষাতকার গ্রহিতা
এরকম কেন?
ঝুম্পা লাহিড়ি
মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা নিয়ে আমি আতঙ্কিত ছিলাম, আর কিছুটা অপ্রতিভও ছিলাম, মনে হয় এটাই আমার বিড়ম্বনার কারণ। একটা কথা আমি কারোর কাছে স্বীকার করতেই চাইছিলাম না, আমার বাবা মায়ের কাছে নয়, এমনকি নিজের কাছেও নয়, যে আমি লেখক হয়ে উঠবার এই অদম্য বাসনা পোষণ করি।
সাক্ষাতকার গ্রহিতা
আপনার লেখক হয়ে ওঠার ব্যাপারে আপনার বাবা মায়ের সায় ছিল না?
ঝুম্পা লাহিড়ি
আমার ওপর সর্বদাই একটা চাপ ছিল আমি যেন অধ্যাপনার জগতকেই পেশা হিসেবে গ্রহণ করি। বাবা আমাকে বলতেন, “তোমাকে পিএইচডি করতে হবে। তোমাকে নিজের জায়গা তৈরি করে নিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিমণ্ডল সর্বদা তোমাকে আগলে রাখবে।” এটাই ছিল ওঁর আমেরিকা নিয়ে অনুভব। ওঁর দুনিয়া বলতে বিশ্ববিদ্যালয়। কিংস্টনের রোড আইল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার বাবা ছিলেন একজন গ্রন্থগারিক – আমার বয়স যখন তিন, তখন আমরা এখানে চলে আসি। লিন্ডন বি জনসন একটি আইন প্রণয়ন করেছিলেন যে আইন সুদক্ষ কর্মীদের এশিয়া মহাদেশ থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চলে আসার জন্য উৎসাহ প্রদান করত – আমার বাবাও এভাবেই ভিসা পেয়েছিলেন। অনেকেই আমাকে জিজ্ঞাসা করে থাকেন, “তোমার গল্পের সকলেরই একটা পিএইচডি ডিগ্রী আছে, এটা কীভাবে সম্ভব?” কিন্তু আমার বেড়ে ওঠার সময় এটা বাস্তবেই আমার কাছে স্বাভাবিক মনে হত। আমার বাবা চিরকালই একজন কৃতি পড়ুয়া ছিলেন – এমনকি উনি যখন কলকাতার জেনারাল পোস্ট অফিসে পার্ট-টাইম কাজ করতেন, তখনও উনি ম্যান্ডারিন আর রাশিয়ান শিখতেন এবং লাইব্রেরি সায়ান্সে ডিগ্রীলাভ করার জন্য সান্ধ্যকালীন স্কুলে যেতেন। ওঁর সর্বোচ্চ স্বপ্ন ছিল একটি পিএইচডি ডিগ্রী লাভ করা, যদিও সেই স্বপ্ন ওঁর কোনোদিনই সাকার হয়নি।
সাক্ষাতকার গ্রহিতা
কোথায় বাধা ছিল?
ঝুম্পা লাহিড়ি
ওঁর ওপরে একটি পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব ছিল, ফলে এমন একটি পেশা গ্রহণ করেন যেটি ওঁর শিক্ষাগত যোগ্যতার সঙ্গে মানানসই হয়, সারাটা জীবন বইয়ের ক্যাটালগিং-এই লাগিয়ে দিলেন। তবে ওঁর সত্যিকারের আবেগের জায়গাটা ছিল মার্ক্স আর ইতিহাস, এবং ষাটের দশকের প্রথম দিকে, তখনও উনি কলকাতাতেই ছিলেন, ভারত সরকারের কাছ থেকে চিনে গিয়ে অধ্যয়ন করার জন্য একটা ছাত্রবৃত্তি লাভ করেন। যাবার জন্য যখন তৈরি হচ্ছিলেন, ভারত-চিন যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল, ফলে সেই ছাত্রবৃত্তি স্থগিত হয়ে গেল, তার বদলে ব্রিটিশ সরকারের একটা জব ভউচার নিয়ে লন্ডনে চলে গেলেন এবং সেখানে লন্ডন স্কুল অফ ইকনমিক্সে লাইব্রেরিয়ান হিসেবে একটা চাকরি পেয়ে গেলেন। এটা ১৯৬৪ সালের কথা। কোনো এক সময় উনি স্বল্প মেয়াদে কলকাতায় ফিরলেন যাতে বাবা-মা ওঁর বিয়ের বন্দোবস্ত করতে পারেন। আমার মা ওঁর সঙ্গে লন্ডনেই চলে এসেছিলেন, প্রবাসজীবন হয়ত সাময়িক হবে এটা ভেবেই এসেছিলেন – তারপর আমার জন্ম হল এবং আমার জন্মের দু’বছর পরে উনি MIT’র লাইব্রেরিতে চাকরি নেন, এবং তার অল্প কিছুদিনের মধ্যেই URI-তে যোগদান করেন। আজও আমার লেখা কোনও বই যদি ওঁকে দিই, উনি প্রথমেই গ্রন্থস্বত্বের পাতায় গিয়ে দেখে নেবেন বইটার শ্রেণীবিন্যাস কীভাবে করা হয়েছে।
সাক্ষাতকার গ্রহিতা
মার্ক্সবাদী বুর্জোয়া!
ঝুম্পা লাহিড়ি
দেখুন, আমাদের পরিবারে, মার্ক্সকে পৃথিবীর সবচাইতে ধীমান মানুষ বলে মনে করা হত, এর অন্যথার হবার সুযোগই নেই। বাবা আর মা দুজনেই দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারের সন্তান, কিন্তু আদর্শগত অবস্থান থেকে ওঁরা ছিলেন সাম্যবাদী। মায়ের তিন ভাইয়ের মধ্যে এক ভাই, যিনি বন্দুক আর গোলা তৈরির কারখানায় কাজ করতেন, তিনি সত্যিই একজন সংগ্রামী এবং সংগঠক ছিলেন। ওঁর শোবার ঘরের দেওয়ালে লেনিনের একটি ছবি ঝোলানো থাকত। আমাদের বর্ধিত পরিবারের অনেকেই, বিশেষ করে মায়ের জ্ঞাতি ভাইবোনেরা সত্তরের দশকের নক্সাল আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিল। গল্প শুনেছি, একবার যখন আমার দিদিমা রান্না করছিলেন, বাড়ির দরজায় ধাক্কা পড়ল – পুলিশ ওঁদের দুজনের খোঁজে তল্লাশি করতে এসেছে। দিদিমা ছাদের জলের ট্যাঙ্কের ভেতর ওঁদের লুকিয়ে রেখেছিলেন।
সাক্ষাতকার গ্রহিতা
আপনার শিক্ষাদীক্ষায় আপনার বাবা-মায়ের রাজনৈতিক বিশ্বাস প্রভাব ফেলেছিল?
ঝুম্পা লাহিড়ি
আমার বাবার বিশ্বাসগুলো এতই কট্টর ছিল যে একবার বাবা-মা যখন বার্নার্ডে আমাকে দেখতে এলেন, ফিফথ অ্যাভিনিউ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে দোকান দেখতে যাবার কথা বলেছিলাম, বাবা রাজি হননি। ফালতু কারণে টাকা খরচ করা আর টাকা জমানোর নেশা নিয়ে বাবার তীব্র ক্ষোভ। আজও ওঁর উপার্জনের বড় অংশটাই ওঁর নিঃস্ব আত্মীয়স্বজন আর ভারতের বিভিন্ন দাতব্যসংস্থায় চলে যায়। অপব্যয় করা ওঁর চোখে একটা অপরাধ। ১৯৪৩ সালের বাংলার দুর্ভিক্ষ ওঁর নিজের চোখে দেখা, যখন ইংরেজরা কলকাতার মানুষদের অনাহারে থাকতে বাধ্য করেছিল। বড় হওয়ার পর, আমেরিকান বন্ধুবান্ধবদের আমার জন্মদিনের পার্টিতে আমন্ত্রণ জানাতে যথেষ্ট সঙ্কোচ বোধ করতাম, কারণ সমস্ত উদ্বৃত্ত খাবার ফেলে দেবার সময় বাবা-মা সর্বদাই বিরূপ মন্তব্য করতেন। আমার শৈশবে, বাবা মায়ের প্রায় প্রতিটা কেনাকাটার সিদ্ধান্ত খুব বিচার বিবেচনা করেই নেওয়া হত। কিংস্টনে আসার সময় আমাদের সঙ্গে ছিল অল্প কয়েকটা স্যুটকেস আর গোটা দুয়েক থালা আর বাটি। বেশি বাড়িয়ে বলতে চাই না, কিন্তু অত্যন্ত মিতব্যয়িতা আর কৃচ্ছসাধনের মধ্যে দিয়েই আমার ছেলেবেলা কেটেছে, কোনোমতে দিন চলে যাচ্ছে এরকম একটা অনুভূতি হত।
সাক্ষাতকার গ্রহিতা
একজন লেখক হিসেবে, আপনার মা-বাবার অতীত জীবন উন্মুক্ত করার কিছুটা বাধ্যবাধকতা আপনার আছে বলে কখনও মনে হয়নি?
ঝুম্পা লাহিড়ি
হ্যাঁ, জীবনের যে অধ্যায়টা ওঁরা পেছনে ফেলে এসেছেন, যথা সম্ভব বিস্তারিতভাবে সেটার পুননির্মাণ করার ইচ্ছে আমার হয়, কারণ দেশ ছেড়ে চলে এসেছেন বলে ওঁদের যে অপরাধবোধ হয়েছিল আর যন্ত্রণা পেয়েছিলেন, সেটা আমি তীব্রভাবে অনুভব করি। দু’বছরে একবার করে আমরা কলকাতায় যেতাম, আর ফেরার দিনটা আমার কাছে খুবই ভীতিজনক হত, বাবা সকলের কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছেন এই দৃশ্যটা হত বড়ই বেদনাদায়ক। আর কখনোই বাবাকে এমন হাপুস নয়নে কাঁদতে দেখিনি। কোনোভাবেই শান্ত করা যেত না – আমি ভয় পেয়ে যেতাম। তারপর ট্যাক্সি করে বিমানবন্দরে যাওয়ার রাস্তাটা হত একেবারে চুপচাপ, উনি ধীরে ধীরে বাস্তবতার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে এসে নিজের কাজের জগতে ফিরে যাওয়ার পর উনি আবার স্বাভাবিক হয়ে যেতেন, কিন্তু রোড আইলান্ডে আমার মায়ের বড় একা একা লাগত – কলকাতার জন্য ওঁর মন কেমন করত, ওখানকার খাওয়াদাওয়া, ওখানকার সুবাস, ওখানকার গাছপালা, এবং বিশেষ করে ওঁর আত্মীয়স্বজনদের।
সাক্ষাতকার গ্রহিতা
আপনার মায়ের সম্বন্ধে কিছু বলুন।
ঝুম্পা লাহিড়ি
আমার মা গরীব পরিবারের মেয়ে, কিন্তু উনি বড় হয়ে উঠেছিলেন পরিচালক, শিল্পী এবং গায়কদের সান্নিধ্যে – ওঁর বাবা, ফণীভূষণ সান্যাল, উনি ছিলেন একজন বর্ণিক (painter), সত্যজিৎ রায়ের ছবির সেট নির্মাণ সংক্রান্ত বিষয়ের পরামর্শদাতা হিসেবে ওঁর সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন। আমাদের রোড আইল্যান্ডের বাড়িতে ওঁর আঁকা কিছু ছবি ছিল, যে অল্প কয়েকটা ব্যাপারে আমার বাবা-মা অকৃপণ হাতে টাকা খরচ করেছেন, তার মধ্যে একটা হল সেই ছবিগুলো বাঁধানোর জন্য। আমার মা নাটকে অভিনয় করেছেন, পথের পাঁচালির দুর্গা চরিত্রটার জন্য ওঁকে ভাবা হয়েছিল – সেই চরিত্রটা করার সুযোগ যদি পেতেন, ওঁর জীবন সম্পূর্ণ অন্য খাতে বইত। আবার ওঁর অধ্যাপনা করবার ইচ্ছেও হয়েছিল। বিয়ের আগেই উনি বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর উপাধি অর্জন করে নিয়েছিলেন, মাঝেসাঝে কবিতাও লিখতেন। এরকমই একটা ভবিষ্যৎ উনি পেতে পারতেন – কলকাতার কোনো স্কুলে কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকের সম্মানজনক বৃত্তি, বাংলা কবিতার ধারায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করা। কিন্তু তার বদলে কী হল? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই শান্ত, প্রাদেশিক, কখনোসখনো প্রতিকূল পরিবেশে এসে পড়লেন, এবং যেখানেই যেতেন, একজন অজ্ঞ বিদেশিনী হিসেবে গণ্য হতে থাকতেন।
অবশেষে, একটা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষিকা হিসেবে যোগ দেন, শিশুদের মধ্যে কাজ করে উনি অপার আনন্দ পেতেন, আমার ছোটবোনের জন্মের আগে পর্যন্ত বাড়িতে বেশিরভাগ সময়টা আমরা দুজনে নিজেরা নিজেরাই থাকতাম, আমি ওঁর বিষাদ, ওর নিঃসঙ্গতা ভাগ করে নিতাম। ওঁর মুখে গল্প শুনতে শুনতে বুঝতে পারতাম আমার বড় হয়ে ওঠাটা ওঁর কাছে কতই না অচেনা। উনি বলতেন, “আমি বড় হয়েছি আঠাশ জন জ্যাঠতুতো, খুড়তুতো ভাইবোনদের সঙ্গে একসাথে, ঝুম্পা। স্কুল থেকে ফেরার পরে আমি হয়ত কোনো একজন পিসীর বাড়িই চলে যেতাম, তারপরে হয়ত কোনো কাকুর বাড়ি। আমি যে বাড়িতে বেড়ে উঠেছি, সেখানে দুটোই মাত্র ঘর ছিল এবং আরও ছ’জন মানুষ থাকতেন।” একটা অণু পরিবার, ওঁর চোখে, বৃহত্তর কিছুর একটা টুকরো মাত্র। আমার মা আর আমার সম্পর্কটা ছিল খুবই নিবিড়, অনেক ব্যাপারেই একে অপরের ওপর ভীষণ নির্ভরশীল, আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে দূরত্বও ছিল। আমি আমেরিকানদের মত ইংরেজি বলা শিখছিলাম, ওঁর মনে হত আমি যেন দিনে দিনে আরও বেশি করে আমেরিকান হয়ে উঠছি। সর্বোপরি যে ভাবনাটা আমার কাছে সর্বাধিক পীড়াদায়ক ছিল – সেটা হল, বাবা-মা আর আমার মাঝখানে এক যোজনস্পর্শী দূরত্ব তৈরি হওয়া, পরিপার্শ্ব সম্পর্কে ওঁদের সঙ্গে আমার দৃষ্টিভঙ্গির প্রভেদটা।
সাক্ষাতকার গ্রহিতা
আপনি বইপ্রেমের কথা বলেছিলেন না? বইয়ের সম্ভারে বাড়ি নিশ্চয়ই পরিপূর্ণ।
ঝুম্পা লাহিড়ি
সকলে সেরকমই ভাবে – কিন্তু না, আসলে প্রায় নেই বললেই চলে। বাবা বলবেন, “যেসব বই তোমার পড়ার ইচ্ছে হবে, সে তো লাইব্রেরিতেই আছে” – কারণ, তা না হলে সেসব বই তো আমাদের কিনে ফেলতে হত। আর আমার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অত্যন্ত ভাল একজন লাইব্রেরিয়ান ছিলেন, মিস্টার লাইট, লম্বা চুল আর দাড়িওয়ালা। সাধারণত, এই হিপি গোছের মানুষদের সান্নিধ্যেই আমি স্বচ্ছন্দ বোধ করতাম – আমার মায়েরও তাই – কারণ ওঁরা ছিদ্রান্বেষী হতেন না, তাছাড়া ভারতবর্ষ সম্বন্ধে, ওপর ওপর হলেও, এঁদের একটা আগ্রহ থাকত। ওঁরা আমার শাড়ি পরিহিতা মাকে দেখে বলে উঠতেন, “বাহ্, কী চমৎকার!” যাই হোক মিস্টার লাইট আমাদের কাছে উচ্চৈঃস্বরে সি এস ল্যুইস, রোল্ড ডাহ্ল, ডিকেন্স পড়ে শোনাতেন – আর এভাবে পড়ে শোনানোটা আমার খুব ভাল লাগত। সেই লাইব্রেরিতেই অ্যানি ফ্রাঙ্কের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল, আর তখনই মনে হয়েছিল যে একজন বালিকাও লেখক হতে পারে।
মা অবশ্য ওঁর বেডসাইড টেবিলে বাংলা কবিতার আর উপন্যাসের কয়েকটা বই রাখতেন, যেগুলো উনি হয়ত লক্ষাধিক বার পড়ে ফেলেছিলেন – আমার বিশেষ করে মনে আছে – কবি কাজি নজ়রুল ইসলামের বড়সড় একটা সংগ্রহ ওঁর খুবই প্রিয় ছিল। মাঝে মাঝে সেখান থেকে কিছু কিছু অংশ উনি আমাকে পাঠ করে শোনাতেন যাতে আমি সেই সব লেখার মাধুর্য অনুভব করতে পারি; কিন্তু কেতাদুরস্ত সাহিত্য আমার কাছে অনতিগম্য বোধ হত। ওঁর সব থেকে বড় ভাই নিজেও একজন অত্যন্ত মেধাবী, খামখেয়ালি গ্রন্থকীট ছিলেন। উনি ছিলেন অতিমাত্রায় ইংরেজি সাহিত্যের অনুরাগী – ওঁর কাচের দরজা দেওয়া কাঠের আলমারি ভরে ছিল ব্রিটিশ এবং আমেরিকান বই, সেগুলো উনি নিয়মিত ধুলো ঝেড়ে সাফ করতেন – আমরা দেখা করতে যাবার আগে থেকেই বলে রাখতেন, “এবার আমার জন্য সমারসেট মম নিয়ে এসো।” অনেক সময়েই উনি কার কথা বলতে চাইছেন, মা বুঝতেই পারতেন না, তাই আমি একটু বড় হয়ে ওঠার পরে ওঁর পছন্দের বই সংগ্রহের দায়িত্ব আমার ওপরই এসে পড়েছিল।
সাক্ষাতকার গ্রহিতা
কবে থেকে লেখা শুরু করলেন?
ঝুম্পা লাহিড়ি
অক্ষরজ্ঞান হওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই, স্কুলে শিক্ষিকাদের ক্যাবিনেট থেকে চুপিসারে নোটবুক সরিয়ে এনে আমার নিজের মত করে গল্প লেখা আরম্ভ করি। আসলে আমি ছিলাম অসম্ভব লাজুক, বন্ধু পাতানোর আমার নিজস্ব একটা অছিলা বলতে পারেন – অন্য মেয়েদের সঙ্গে একসাথে বসে একটা নোটবুক চালাচালি করে সবাই মিলে একটা গল্প লেখার চেষ্টা চলত। বেশিরভাগ গল্পই হত অনাথ শিশুদের নিয়ে, কিংবা ডাইনিদের নিয়ে যাদের ভোল বদলে ফেলার বিশেষ ক্ষমতা থাকত। স্কুলে মাধ্যমিক পর্যায়ে পৌঁছনোর পর ব্যাপারটা আমার কাছে বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়ালো – ফ্লার্টিং আর ডেটিং-এর মত ব্যাপার, ভয়ঙ্কর রকমের হইহুল্লোড় আর নাচানাচি – সবটাই বেশ অস্বস্তিকর তার ওপরে আবার আমার বাবা-মায়ের নিষেধাজ্ঞা। আমার ইচ্ছে হত, আগের মতই গল্প লেখা চালিয়ে যেতে, লেখার আনন্দ আর স্বাধীনতা অনুভব করতে, কিন্তু আমি ক্রমশ আত্মসমালোচকও হয়ে উঠলাম। অতএব আমি ইংরেজি বিভাগে লেগে পড়লাম এবং (গল্প লেখার বদলে) প্রবন্ধ আর স্কুলপত্রিকার জন্য আর্টিকল লিখতে আরম্ভ করলাম। তারপর আমি যখন চৌদ্দ, ঊচ্চ বিদ্যালয়ের প্রথম সেমিস্টারে, বাবা বললেন, “ছ’মাসের ছুটি পাওয়া গেছে। চল কলকাতা ঘুরে আসি।”
সাক্ষাতকার গ্রহিতা
ধরে নিলাম এই ইঙ্গিতটার অর্থ হল, আমাকে সাবাড় করে দাও।
ঝুম্পা লাহিড়ি
ইতস্তত ভাসমান এক আনাড়ি কিশোরি – এই ছিল আমার অবস্থা। যতদিন আমি বাইরে থাকবে, পড়াশোনার কাজটা আমি নিজেই চালিয়ে নিয়ে যাব, এরকম একটা প্রতিশ্রুতি বাবা-মা আমার শিক্ষা উপদেষ্টাকে দিয়েছিলেন। আমার কাজ়িনরা প্রত্যেকদিন বাসে চেপে স্কুলে যাবে, কিন্তু আমার একা একা কোথাও যাওয়ার অনুমতি ছিল না। ফলে সোফোক্লেস, শেক্সপিয়ার সহ রাশি রাশি বই সামনে নিয়ে আমি গৃহবন্দি হয়ে গেলাম। পাগলের মত নোট নিতাম, একেবারে দিশাহীনভাবে মনে যা আসত তাই লিখে ফেলতাম। এখান থেকেই আমার মধ্যে সৃজনশীলতার বুনিয়াদ গড়ে উঠতে শুরু করে। যখন সময় এল, ঠিক করে ফেললাম, কলেজে আবেদনের নিবন্ধটা হবে অ-প্রথাগত বিষয় নিয়ে।
সাক্ষাতকার গ্রহিতা
বিষয়টা কী ছিল?
ঝুম্পা লাহিড়ি
আজকাল আপনাকে অনেক বেশি বেশি করে আত্মপ্রচার করতে হয় – “আমি ঝুম্পা লাহিড়ি। আমি এক সংকর প্রজাতির প্রাণী যার পরিচয় দুটো ভিন্ন দুনিয়ায় বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে ...” কিন্তু আমার লেখাটা ছিল একটু প্রতিচ্ছায়াবাদী গোছের, কলকাতায় মায়ের কথায় আড়ি পাতার কথা, মা ওঁর ননদকে এমন একটা ঘটনা শোনাচ্ছিলেন যা আমি আগে কখনো শুনিনি। লন্ডনে, আমি যখন খুবই শিশু, আমার বিশাল আর ভারি পেরাম্বুলেটারটা সামনের ফুটপাথে রেখে বড় একটা স্টোরে ঢুকে গেছিলেন। ফিরে এলেন যখন, আমি আর সেখানে নেই।
সাক্ষাতকার গ্রহিতা
হে ভগবান।
ঝুম্পা লাহিড়ি
উনি তো কান্নাকাটি জুড়ে দিলেন, দুজন পুলিশের আবির্ভাব ঘটল – এবং অবশেষে ওঁরা আমাকে খুঁজে পেলেন। একজন ভদ্রমহিলা পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, উনি আমাকে তুলে নিয়েছিলেন। আমাকে কোলে নিয়ে উনি কেটে পড়বার চেষ্টা করছিলেন। যাই হোক, যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি আবেদন করেছিলাম, এই অদ্ভুত কাহিনীটাই সব জায়গায় পাঠিয়েছিলাম, বার্নার্ডে মনোনীত হয়ে গেলাম।
সাক্ষাতকার গ্রহিতা
ওখানে স্বচ্ছন্দ বোধ করছিলেন?
ঝুম্পা লাহিড়ি
আমার চারপাশে ছিল অত্যন্ত অল্পবয়সেই কৃতি লাভ করা তরুণীদের ভিড়, আমার খুব ভয় ভয় করত, মনে হত এতদিন যেটা বাস্তব সত্য বলে ভেবে এসেছি সেটা আসলে নিশ্চিতভাবেই ভ্রান্ত ছিল। বার্নার্ডে হয়ত কম করে জনা দশেক বিভিন্ন চরিত্রের সঙ্গে আলাপ জমাবার চেষ্টা করলাম। কোন ধরণের পোশাক পরব খুব ভেবেচিন্তে বাছাই করতাম – রঙচঙে, ভবঘুরে ধরণের পোশাক, যা আমার রুচিবোধ নিয়ে নির্দিষ্ট কোনও বার্তা দিতে পারবে – আর অচিরেই এমন একজনের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে গেল যে কেবল কালো রঙের পোশাকই পরে, ফলে সারা বছর ধরে আমি যেসব পোশাক পরলাম, সবই কালো। কলেজের দ্বিতীয় বর্ষে, আরও একজনের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হল, যে কিনা আবার একটু বেশিই দুরুস্ত – লরা অ্যাশলের কথা মনে পড়ে? আমি কালোদের বাতিল করে সুন্দর সুন্দর ড্রেস আর লম্বা লম্বা স্কার্ট কিনে ফেললাম। সেই বছরে আমার আরও একজন বান্ধবী হল, যে বেশ জেদি, শিল্পী হতে চায় – ফলে আবার জিনস আর ফ্ল্যানেল শার্টে প্রত্যাবর্তন, খোলামেলা পোশাকের চল হওয়ার আগের ধারার। আমি কী হতে চাই সে নিয়ে আমার কোনো সম্যক ধারণাই ছিল না।
সাক্ষাতকার গ্রহিতা
আপনার একজন লেখক হবার ইচ্ছে সেই কথাটা জানতেন?
ঝুম্পা লাহিড়ি
কলেজে থাকার সময় আমি দুটো সৃজনশীল লেখার ক্লাসে অংশগ্রহণ করি, ঠিকঠাকই উতরে গিয়েছিলাম, তবে আমার মনে হয়েছিল শিল্পীরা অন্য ধরণের মানুষ হন, যা আমি নই। ইংরেজি সাহিত্যের আমার এক সহপাঠী বান্ধবীও ছোটগল্প লিখত, সত্যিই ভাল লিখত, মনে আছে আমায় বলেছিল যে একবার একটা গল্প কর্মশালায় শোনানোর পর ওর শিক্ষিকা বলেছিলেন, “এটা তো অসাধারণ। এই গল্পটা আমাদের ‘দ্য নিউ ইয়র্কারে’ পাঠাতে হবে।” ভিন্ন এক দুনিয়ার প্রতিনিধি ছিল ওই পত্রিকাটি, মার্কিনি দুনিয়ার, যার সঙ্গে আমার লালনপালনের দুনিয়ার সঙ্গে কোনো মিলই নেই। আমার আশেপাশের সকলেই পড়ছে রেমন্ড কার্ভার, অ্যান বীটী, আড়ম্বর বর্জিত – ধরণটা আমি পরখ করেই দেখিনি। একজন কিশোরি হিসেবে আমার পড়তে ইচ্ছে হত এমন সব বই যেগুলো আকারে বৃহৎ এবং রহস্যময় – তলস্তয়, ক্যামু, মেল্ভিল, হোমার, এবং তখনও সেসবই পড়তে ইচ্ছে করত। আমি উলফের লেখা পড়ছি, জয়েস, কাফকা, বেকেট, এচ ডি, নবোকভদের আবিষ্কার করছি। আরও পেছনে চলে যাবার ইচ্ছে হত – চসার, স্পেন্সার, তারপর ওভিদ আর হোর্যাস।
লাতিন খুব পছন্দের ছিল আমার, তারপর ওপরের ক্লাসে যখন প্রাচীন গ্রীক সাহিত্য বেছে নিলাম, আমার নজর চলে গেল ধ্রুপদী সাহিত্যের দিকে। তো আমি স্নাতকোত্তর গোছের কিছু একটা করব বলে ঠিক করে ফেললাম – এই বছর কয়েক প্রাচীন গ্রীক আর সংষ্কৃত নিয়ে অধ্যয়ন, যাতে করে পরবর্তী সময়ে ধ্রুপদী সাহিত্যে পিএইচডি করার জন্য আবেদন করতে পারি। হার্ভার্ডে অল্প কিছু ক্লাসে অংশগ্রহণ করতে আরম্ভ করলাম। আমার বাবা-মা তো ভীষণ খুশি হলেন। কিন্তু একটা সেমিস্টার শেষ হওয়ার পরেই লক্ষ্য করলাম যে আমি ক্লাস করা বন্ধ করে দিয়েছি। একটা বইয়ের দোকানে পার্ট-টাইম কাজ করছি, চারপাশে থেকে আমাকে খাজাঞ্চিরা ঘিরে রয়েছে, যারা নিজেরাও লেখক হয়ে ওঠবার স্বপ্ন দেখছে, আমি নিজেও আবার লিখতে শুরু করলাম, অবশ্য গোপনে। তারপর আমি অ্যালবার্ট আইনস্টাইন ইন্সটিটিউশনের একজন গবেষকের গবেষণা সহকারী হিসেবে চাকরি পেলাম, যিনি অহিংস সামাজিক আন্দোলন নিয়ে অধ্যয়ন করছিলেন। আমার প্রকৃত কৌতুহলের সঙ্গে এই চাকরির বিন্দুমাত্র সম্বন্ধ ছিল না, কিন্তু অফিসে প্রবেশ করার চাবি আমার হাতে এল, আর এই প্রথম, একটা ডেস্কটপ কমপিউটার পেলাম, তাই সাপ্তাহান্তিক দিবসগুলিতে আমি চলে আসতাম আর লিখতে থাকতাম।
সাক্ষাতকার গ্রহিতা
কী নিয়ে লিখছিলেন?
ঝুম্পা লাহিড়ি
মনে পড়ে, একটা গল্পের পেছনে অনেকটা সময় খরচ করেছিলাম যেখানে একজন শ্বেতাঙ্গ আমেরিকান মহিলা বন্ধুর পিকনিকে গেলেন আর ভুল ধরণের কেক বা কিছু একটা নিয়ে গেলেন। আসলে উলফ আমাকে একেবারে জাদু করে ফেলেছিলেন, অনুভূতি আর আবেগ প্রকাশের জন্য সর্বদাই ওঁর দুনিয়ায় প্রবেশ করার চেষ্টা করতে থাকতাম। সংলাপ নিয়ে আমার বেশ সমস্যা ছিল, আমার চরিত্রদের কথা বলানোর ব্যাপারে – কারণটা হয়ত, আমার মননে যেসব মানুষের তাৎপর্যময় উপস্থিতি, তাঁরা সকলেই বাঙলায় কথা বলেন।
সাক্ষাতকার গ্রহিতা
কাউকে দেখিয়েছিলেন গল্পটা?
ঝুম্পা লাহিড়ি
তখুনি তখুনি নয়। আমার সত্তার এই দিকটা তখনও লুকিয়েই রেখেছি। আমার বাবা মা আমার ওপর নজর রাখছেন কেবল এই অনুভূতিটুকুই নয় – আমার মার্কিন বন্ধুদের আমাকে নিয়ে একজন পড়ুয়া ভারতীয় মেয়ে এইরকম একটা বদ্ধমূল ধারণাও যে আছে, সেটা আমার জানা ছিল। হয় আমি পিএইচডি করি আর নাহলে বিয়ে করি, আমার বাবা মায়ের আর আত্মীয়স্বজনের এই প্রত্যাশা ক্রমে বেড়েই চলছিল। কলেজে থাকার সময় আমি কখনো ডেট করিনি, কারণ আমি কোনো আমেরিকান ছেলের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়লে আর সেটা জানাজানি হয়ে গেলে ঘটকালি করে বিয়ে দেওয়ার বাজার থেকে আমার নাম কাটা যাবে – মায়ের এই আশঙ্কা আমাকে একেবারে বিবশ করে ফেলেছিল। আমার চৌদ্দ বছর বয়স থেকেই মা ভারতে আর আমেরিকায় আমার জন্য পাত্রের সন্ধান করতে শুরু করে দিয়েছিলেন – তখনই আমার বিয়ে দিয়ে দেবার উদ্দেশ্যে নয়, কেবল কাজটা চালু করে দেওয়ার মানসে।
তখনই বিয়ে করে ফেলার প্রশ্নই ওঠে না, তাই আবার লেখাপড়ার জগতে ফিরে গেলাম। বস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে একেবারে স্নাতকোত্তর স্তর পর্যন্ত অধ্যয়ন করার সুযোগ পেয়ে গেলাম – খুব যে পুলকিত হলাম তা নয়, কিন্তু ভাবলাম অসুবিধে কোথায়? ওখানে যোগ দেবার পর জানতে পারলাম, যে ভবনে আমি ক্লাস করব, সৃজনশীল লেখনীর ক্লাসও সেই একই ভবনে হয়, হলঘরের ভেতর দিয়ে ছাত্রদের ওই ক্লাসে যেতে দেখতে পেতাম। আমারও ইচ্ছে করত একজন ভাল লেখক হয়ে উঠতে, কিন্তু বুঝতে পেরেছিলাম সেটা কেবল নিজের চেষ্টায় হয়ে ওঠা সম্ভব নাও হতে পারে। জানতে চাইলাম আমি ওদের কর্মশালায় আসতে পারি কিনা, তো ওরা কার্যক্রম অধিকর্তা, লেসলী এপস্টাইনের কাছে একটা গল্প পাঠাতে বলল। কেক নিয়ে গল্পটা আমি ওঁকে পাঠিয়ে দিলাম। উনি জবাব দিলেন, “গল্পের প্রথম বাক্যটা বড়ই দীর্ঘ, তবে তুমি ক্লাসে আসতে পার।” অতএব নিজেকে দুটো ভাগে ভাগ করে নিলাম – একজন ঝুম্পা যে সর্বোচ্চ তলায় ফকনার আর শেক্সপিয়ার পড়তে যায়, আর অন্য আরেকজন ঝুম্পা তেতলায় নেমে আসে লেখকদের সান্নিধ্যে থাকার জন্য।
সাক্ষাতকার গ্রহিতা
সুপারইগো২ আর ইড৩।
ঝুম্পা লাহিড়ি
নিজেকে অনুপ্রবেশকারী বলে মনে হত, ক্লাসে একমাত্র আমিই ছিলাম যে সৃজনশীল লেখনী পাঠ্যক্রমের কেউ নই, কিন্তু ওই ছোট্ট কক্ষেই অবশেষে আমি নিজের গোষ্ঠী চিনতে পারলাম। ওই দুনিয়ার সঙ্গে যত বেশি করে আমি জড়িয়ে পড়তে লাগলাম, ততই তত্ত্ব নির্ভর জগতের সঙ্গে আমার বাঁধন আলগা হতে লাগল। বলতে চাইছি, বাখতিন৪ আমার খুবই ভাল লাগে, কিন্তু সেই সময় সাহিত্যের বিশ্লেষণে আমার বিন্দুমাত্র মন ছিল না – সাহিত্য কীভাবে সৃষ্টি হয় সেটাই আমার জানতে ইচ্ছে করছিল। তাই ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর পাঠ্যক্রম সমাপ্ত হবার পর আমি সৃজনশীল লেখনীর স্নাতোকত্তর পাঠ্যক্রমে যোগ দেবার জন্য আবেদন করলাম। কপালজোরে, কথাটা যখন বাবা মায়ের কাছে তুললাম, ইংরেজিতে, (“creative writing”-এর বদলে) ওঁরা প্রতিবারই শুনলেন “critical writing”। মা মনে করলেন আমার সাহিত্য নিয়ে অধ্যয়নে ব্যাপারটা অনেকটা অতিরিক্ত একটা ব্যঞ্জনের মত – এমন একটা বিষয় যা ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পাণ্ডিত্যপূর্ণ রচনায় কাজে আসবে। ওঁদের বোঝবার এই সামান্য ভ্রান্তিটা আমি আর শুধরে দিলাম না।
সাক্ষাতকার গ্রহিতা
আপনার গল্প এবং গল্পের চরিত্ররা কোথা থেকে আসে?
ঝুম্পা লাহিড়ি
গ্রীষ্মের সময়টা তখনও আমি বাবা মায়ের সঙ্গে কলকাতাতেই কাটাচ্ছিলাম, আমার বেশিরভাগ গল্প এই পরিবেশ নিয়েই লিখেছিলাম। ১৯৯২’র গ্রীষ্মের শেষে, যেদিন আমরা এরকমই একটা সফরের পর ফিরে এলাম, রোড আইল্যান্ডে আমার ঘরে বিছানায় শুয়ে আছি, সময় বদলে যাবার জন্য একটু বিহ্বল, “A Real Durwan.” গল্পের পুরো খসড়াটাই লিখে ফেললাম। গল্পের প্রধান চরিত্র একজন মহিলাকে মনে রেখে লেখা, যিনি উত্তর কলকাতার যে বাড়িতে আমার মা বড় হয়েছিলেন এবং যে বাড়িতে আমি অনেকটা সময় কাটিয়েছি, সেই বাড়ির প্রবেশ দ্বারের কাছে থাকতেন – উনি ছিলেন এখন যাকে বাংলাদেশ বলা হয়, সেখান থেকে চলে আসা একজন উদ্বাস্তু। গল্পটা নিয়ে গিয়েছিলাম আমার গ্রীষ্মকালীন সাহিত্যচর্চার ক্লাসে এবং যেটা চালাতেন হার্ভার্ড রিভিউয়ের সম্পাদক স্ট্র্যাটিস হ্যাভিয়ারাস, উনি জানালেন যে গল্পটা উনি প্রকাশ করতে চান।
পেছন ফিরে তাকিয়ে মনে হচ্ছে, প্রান্তিক চরিত্ররা আমাকে টানত, কারণ নিজের অস্তিত্বেও আমি ঠিক এই রকম প্রান্তিকতা অনুভব করতাম। একটা গল্পকে কীভাবে খাড়া করা যায় আমি তার প্রয়োগিক দিকটা নিয়ে শিক্ষানবিশি করছিলাম, কিন্তু নিজের মনস্তাত্বিক অবস্থান জানবার ঐকান্তিক প্রচেষ্টা থেকে বিচ্যুত হচ্ছিলাম। মনে পড়ছে ওই পাঠ্যক্রমে যুক্ত থাকার সময়েই নিজেকে প্রায়শই প্রশ্ন করতাম, আমার চরিত্রদের কি আমেরিকায় এনে ফেলতে পারব? যখন লিখলাম, ‘মিস্টার পিরজ়াদা যেদিন নৈশাহারে এলেন,’ – গল্পটা ভীষণভাবে আমেরিকায় ভারতীয় অভিবাসী বাবা মায়ের দ্বি-সাংস্কৃতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা সন্তানের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ফসল – মনে হল আমার নিজস্ব দুনিয়াটা যেন কেঁপে উঠল।
সাক্ষাতকার গ্রহিতা
প্রথমবার লেখা প্রকাশ পাওয়ার পরে আপনার জীবনে কী ধরণের প্রবর্তন লক্ষ্য করেছিলেন?
ঝুম্পা লাহিড়ি
“A Real Durwan”-এর জন্য খুব গর্ববোধ হয়েছিল, মনে হয়েছিল স্ট্র্যাটিস গল্পটাকে ঠাহর করতে পেরেছিলেন। আমার সহপাঠীদের মত উনিও “খুব অচেনা” বলে ওঠেননি। কিছুটা অদ্ভুত মনে হলেও সত্যি, আমার সত্তার যে দিকের অস্তিত্বই নেই, আমার সহজাত প্রবৃত্তি আমাকে সেই দিকেই এগিয়ে নিয়ে গেল। আমার পরবর্তী পরিকল্পনা কী, সেটা নিয়ে বাবা মা এখনও জিজ্ঞাসাবাদ করে চলেছেন, তাই ভাবলাম তাহলে পিএইচডিটা এবার করেই নেওয়া যাক।
সাক্ষাতকার গ্রহিতা
মনে হচ্ছে যেন আপনি তিনপাত্তি খেলতে লেগেছেন, আর এই ফাঁকে নিজের প্রকৃত অভিপ্রায়টা সবার চোখের আড়াল করে রেখেছেন। আপনি কি শিক্ষাজগতে বিনিয়োজিত?
ঝুম্পা লাহিড়ি
বিয়ে না করেও কীভাবে অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর থাকা যায় আমি তার একটা রাস্তা খুঁজছিলাম, যাতে গল্প লেখার কাজটা ব্যক্তিগত স্তরেই চালিয়ে যেতে পারি। সেই সময়, আমার ছাত্রজীবন আর আমার সৃজনশীল হবার উচ্চাকাঙ্ক্ষা দুটো পরস্পরবিরোধী প্রবাহ বলে মনে হচ্ছিল, তবে আজ আমি উপলব্ধি করতে পারি যে এই দীর্ঘ ছাত্রজীবন আমার প্রায় প্রতিটি প্রকল্পের বুনিয়াদ মজবুত করে দিয়েছিল। আমার পিএইচডি পাঠ্যক্রমের যে স্নাতকোত্তর পর্যায়টা ছিল, আমি আশাপূর্ণা দেবীর কয়েকটি ছোটগল্পের অনুবাদ আর সেগুলো নিয়ে কিছু লিখব বলে মনস্থির করে নিয়েছিলাম, আমার মায়ের খুব প্রিয় লেখিকা যিনি দাম্পত্যজীবন এবং পরিবার নিয়ে অত্যন্ত স্বচ্ছ সরল বাংলায় লিখতেন এবং তাতে প্রচুর কথোপকথন থাকত। বই থেকে বাংলায় গল্পগুলো পড়া আমার পক্ষে বেশ কঠিন ছিল, তাই মা জোরে জোরে পড়ে যেতেন, আর আমি সেগুলো রেকর্ড করে নিতাম, তারপর কাজ করতে করতে সেগুলো শুনতাম। কালক্রমে আমি ইতালিয়ান পালাৎজ়োকে প্রেক্ষাপটে রেখে ইংরেজিতে লেখা একগুচ্ছ জ্যাকোবিয়ান নাটক নিয়ে আমার পবেষণামূলক প্রবন্ধ তৈরি করে ফেললাম – যাকে ইংরেজদের দৃষ্টিকোণ থেকে ক্ষমতা, বিশ্বাসঘাতকতা, হিংসা এবং ষড়যন্ত্রের উৎসস্থল হিসেবে প্রাসাদের ভূমিকার বিশ্লেষণ বলা যেতে পারে। আমার মনে হয় এর থেকে আমি এই শিক্ষাই পেয়েছি যে কোনো স্থানকে কেবল একটি পটভূমি নয় বরং একটি চরিত্র হিসেবেও দেখা দরকার।
সাক্ষাতকার গ্রহিতা
কাঙ্খিত জীবন লাভ করা সম্ভব এই কথা কখন উপলব্ধি করলেন?
ঝুম্পা লাহিড়ি
পিএইচডি করার সময় ব্রুকলিনে লেসলী এপস্টাইনের সাথে মাঝেসাঝে দেখা হয়ে যেত, উনি জিগ্যেস করতেন, “লেখালেখি করছ তো, ঝুম্পা?”, আর আমি বলতাম, “গবেষণাপত্রগুলো শেষ করার তাড়া রয়েছে – ফুকো (Foucault) আমার প্রতীক্ষায় বসে আছেন যে।” তখন উনি বলতেন, “লেখক হয়ে ওঠার কথাটা ভুলে যেও না।” কথাগুলো আমার মনে গেঁথে গেছিল, গ্রীষ্মের অবকাশে, বা যখনই একটু সুযোগ পেতাম, একটা গল্পের খসড়া বানিয়ে ফেলতাম কিংবা নতুন কোনো গল্প শুরু করে দিতাম। এই পিএইচডি’র পালা সাঙ্গ হলে আমি নিউ ইয়র্কে চলে যাব বলে মনস্থির করে রেখেছিলাম – আলবের্তোর সঙ্গে দেখা হয়েই গেছিল, ও ওখানেই থাকত – কোনো পত্রিকায় একটা চাকরি জোগাড় করে নেব, কিছু টাকা জমিয়ে নেব, পাশাপাশি লেখালেখিও করব। কিন্তু আমি প্রভিন্সটাউনের ফাইন আর্টস ওয়ার্ক সেন্টারের কথা শুনেছিলাম, কতকটা ঝোঁকের বশেই তিনটে গল্প ওদের কাছে পাঠিয়ে দিলাম। ফেলোশিপের একটা প্রস্তাব পেলাম – চালাঘরে একটি কক্ষ আর মাসে মাসে প্রায় তিনশো ডলার। প্রভিন্সটাউনে আগে কখনো যাইনি, তাই প্রস্তাবটা গ্রহণ করার আগে একবার দেখে আসতে গেলাম। ব্যস্ততার মরশুম চলছিল না সেই সময়, দেখেই জায়গাটা আমার ভাল লেগে গেল। মনে পড়ে আলবের্তোর সঙ্গে অকতেভিওকে স্ট্রোলারে নিয়ে ২০০৩-এ, প্রথম যেবার রোমে যাই, ঠিক একই রকম অনুভূতি হয়েছিল। ভিয়া আরেনুলার ইহুদিপল্লীতে একটা অ্যাপার্টমেন্টে আমরা থাকতাম, মালপত্র নামিয়ে রেখে আমরা আশেপাশে ঘোরাঘুরি করছিলাম, পোরতিকো দ্য’আত্তাভিও ওখানেই – আলবের্তোকে বললাম, “এখানেই আমি থাকতে চাই।” সে যাই হোক, প্রভেন্সটাউনকে একেবারে নিজের জায়গা বলে মনে হল, ওই ছোট্ট ভূখণ্ডটা এতটাই বিচ্ছিন্ন ছিল যে মনে হত যেন আলাদা একটা দেশ।
সাক্ষাতকার গ্রহিতা
নব্বইয়ের দশক কি ছোটগল্পের জন্য সেরা সময় ছিল?
ঝুম্পা লাহিড়ি
ছোটগল্পের জন্য সেরা সময় বলে কিছু নেই। একটা সঙ্কলনের প্রথম খসড়া হিসেবে আমার কাছে যেটা তৈরি ছিল, দুজন এজেন্ট সেটা আমাকে ফেরত দিয়ে দিল, আর ওদের একজন তো বলেই দিল, “আপনি যদি কখনো উপন্যাস লেখেন, আমাকে জানাবেন।” এই ঘটনার পরে আমার মনে হয়েছিল যে আমার গল্পগুলো নিশ্চয়ই একটা বই হয়ে প্রকাশ হবার মত ভাল হয়নি, কারণ প্রভিন্সটাউনে থাকতেই আমি অন্য একটা লেখায় হাত দিয়েছিলাম পরে যেটার The Namesake নাম দেওয়া হয় – কিন্তু মাসখানেক পরে খুব বেশি এগোতে না পেরে আমি অন্য একটা লেখা আরম্ভ করলাম, এক নিষ্প্রদীপ পরিবেশে দুজন মানুষের কোনোরকমে সময় কাটানোটাই এই গল্পের বুনিয়াদ। গল্পটা এগোচ্ছিলই না, আর তখনই অতীত হাতছানি দিল – ঘটনাটা আমার জীবনে কিংবা আমার বাবা মায়ের জীবনে ঘটেনি, ঘটেছিল আমার পরিচিত এক দম্পতির জীবনে, আমাদের পরিবারের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন ওঁরা, ওঁদের একটি মৃত সন্তানের জন্ম হয়েছিল, আমার বোনের জন্মের অল্প কিছুদিনের মধ্যেই। সাত বছর বয়সে, সেটাই ছিল আমার জীবনের প্রথম একটি দুঃখজনক অভিজ্ঞতা – মা বাবার সন্তান হারানোর বেদনা, আমি কিছুতেই ভুলতে পারিনি। খুঁটিনাটি ব্যাপারগুলো আড়াল করে এবং পরিবেশের আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে আমি এমন কিছু পেয়ে গেলাম আবেগপ্রবণতার দৃষ্টিকোণ থেকে যাকে বাস্তবসম্মত বলে অনুভব করা যায়। সেই গল্পটাই হল “A Temporary Matter” আর গল্পটা শেষ হওয়ার পরে আমি একটা নতুন পথের সন্ধান পেলাম – অতীতের আবেগের সঙ্গে নিজস্ব আবেগের মেলবন্ধন ঘটানোর।
অল্প কিছুদিন পরেই আমি অন্য একজন এজেন্টের সঙ্গে দেখা করে সংকলনটা দিলাম, সদ্য শেষ করা নতুন গল্পটাও তার মধ্যে থাকল। ভদ্রমহিলা পড়ে দেখলেন, তারপর বললেন, “দেখুন খুব বেশি আশা করে থাকবেন না, তবে আমি চেষ্টা করব।” উনি “A Temporary Matter,” গল্পটা The New Yorker পত্রিকার দপ্তরে পাঠালেন।
সাক্ষাতকার গ্রহিতা
সেই সম্পাদনার প্রক্রিয়া কেমন লেগেছিল আপনার? শুনেছিলাম The New Yorker-এর সম্পাদকরা নাকি প্রচুর কাটছাঁট করেছিলেন।
ঝুম্পা লাহিড়ি
স’নাতে যখন যান কীভাবে ঘেমে নেয়ে আপনার শরীরের টক্সিন বের হয়ে যায় জানেন তো? যখনই আমি The New Yorker-এ কোনো গল্প পাঠাই, আলবের্তোকে বলি, “জান তো, গল্পটা স্পা করতে গেল।” ক্রেসিডা লেহসনকে, ওখানে যিনি আমার লেখার সম্পাদনা করেন, তাঁকে আমার লেখক জীবনের সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বলে আজও আমি মনে করি।
সাক্ষাতকার গ্রহিতা
আপনার গল্পগুলিতে সঙ্কোচন আর গতির উল্লেখযোগ্য ভূমিকা লক্ষ্য করা যায়। কোন কোন লেখকদের দ্বারা আপনি প্রভাবিত হয়েছেন?
ঝুম্পা লাহিড়ি
Interpreter of Maladies-এর গল্পগুলো লেখার সময় আমি পড়ছিলাম ফ্ল্যানেরি ও’কনর, চেকভ, গার্সিয়া মার্কেজ়, জয়েসের Dubliners, আর প্রচুর হেমিংওয়ে – ওঁর গল্পের অটুট কাঠামোটি, যা বাকি সব কিছুই গৌণ করে দেয় – সেটি আমার আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছিল। গল্প বলবার বাঙালি ধরণটাও আমি মায়ের কাছ থেকে আত্মস্থ করে নিয়েছিলাম – আশাপূর্ণা দেবী ছাড়াও উনি আমাকে মহাশ্বেতা দেবীর হাজার চুরাশির মা উপন্যাসটিও চিনিয়ে দিয়েছিলেন, তাছাড়া আমরা দুজনে একসাথে বসে ঋত্বিক ঘটক এবং মৃণাল সেনের মত পরিচালকদের ছবি দেখতাম।
Unaccustomed Earth-এর ব্যাপারে ম্যাভিস গ্যালান্ট আমাকে সাহায্য করেছিলেন। সেই কারণেই সে সব গল্পে দম নেবার কিছুটা ফুরসৎ পাওয়া যায় –ওঁর লেখার মধ্যে যে ধরণের বিশৃঙ্খলা তৈরি হয় এবং সময়ের দীর্ঘ সারণি বেয়ে যে সুনিপুণতার সঙ্গে উনি সেই সব বিশৃঙ্খলাকে সঙ্ঘবদ্ধ করে ফেলেন, সেটা আমাকে খুব টানত। “Hema and Kaushik”-এর অনুপ্রেরণা ছিলেন উইলিয়াম ট্রেভর – একটি গল্প দুটো ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বা তিনটে পর্যায়কে নিয়ে লেখা সম্ভব, সেটি উনিই দেখিয়ে দিয়েছিলেন। সেই গল্পের প্রথম পর্যায়, “Once in a Lifetime” স্বয়ংসম্পূর্ণ একটি আখ্যান হিসেবেই লিখেছিলাম, কিন্তু সেটি ছাপা হবার পর মনে হল, বলার অনেক কিছুই থেকে গেছে। তারপর যখন The Lowland-এর ওপর কাজ করছি, জেমস সলটারের Light Years আমাকে সম্পূর্ণভাবে প্রভাবিত করে ফেলেছে। বইটা কম করে তিরিশবার পড়ে ফেলেছিলাম – তার একটা কারণ হল, প্রথম থেকেই জানতাম যে গল্পটা আমি বলতে চলেছি, সেটাকে ছোটগল্পের পরিসরে বেঁধে ফেলা অসম্ভব ব্যাপার, তাই গল্পটা ধরে রাখার জন্য আমাকে ভিন্ন ধরণের নির্মাণকৌশল উদ্ভাবন করতে হবে।
সাক্ষাতকার গ্রহিতা
আপনার সব উপন্যাসের আরম্ভ কীভাবে হয়ে থাকে?
ঝুম্পা লাহিড়ি
একটি মাত্র দৃশ্য থেকে The Lowland-এর আরম্ভ – পরিবারের চোখের সামনে উদয়নের খুন হয়ে যাওয়া – বাবা বলেছিলেন, সত্তরের দশকের প্রথম দিকে কলকাতায় ওঁদের বাড়ির সামনে এরকম একটা ঘটনা ঘটেছিল – অনেকটা সেই ঘটনারই ছায়া। ওঁদের এক প্রতিবেশীর ছেলে, একজন তরুণ নকশাল, পুলিশের চোখ এড়িয়ে জলার ধারে লুকিয়ে ছিল, পুলিশ যখন ওকে খুঁজে পেল, খুন করার জন্য টেনে হিঁচড়ে বাড়িটার সামনে নিয়ে এল আর বাড়ির লোকজনকে নিচে নেমে এসে সেই দৃশ্য দেখার হুকুম দিল।
The Namesake-এর জন্য পিএইচডি করার সময় আমার নোটবুকে লিখে রাখা একটি বাক্যাংশে ফিরে গেলাম – “গোগোল নামের ছেলেটি।” কলকাতায় আমার এক কাজ়িনের গোগোল নামে একজন বন্ধু ছিল – নামটা বাঙালি ছেলেদের মধ্যে সচরাচর দেখা যায় না – তবুও সেই নাম নিয়ে কেউ কোনো টিপ্পনিও কাটেনি। আমি ভাবতে লাগলাম গোগোল নামের বালকটি যদি আমেরিকায় বড় হয়ে উঠত তাহলে ব্যাপারটা কেমন দাঁড়াত। এসবই হয়ে দাঁড়াল আমেরিকায় বেড়ে ওঠা মানুষ হিসেবে আমার প্রথম এবং প্রধানতম অস্বস্তির কারণ অনুসন্ধান করার একটা পন্থা – আমার নিজের নামটা।
সাক্ষাতকার গ্রহিতা
ঝুম্পা নামটার কথা বলতে চাইছেন?
ঝুম্পা লাহিড়ি
হ্যাঁ, কিন্তু আমার পুরো নাম হল ঝুম্পা নীলাঞ্জনা সুদেষ্ণা লাহিড়ি – মা ভাবতেই পারেননি যে আমি লন্ডনের হাসপাতালে থাকতে থাকতেই ওঁকে আমার জন্মের শংসাপত্র ভরে দিতে হবে, তাই মনে মনে যেসব নাম নিয়ে জল্পনা করছিলেন ওতে সবকটা নামই বসিয়ে দেন। শিশু বয়সে এটা নিয়ে সবাই খুব নির্দয়ভাবে আমার পেছনে লাগত, আর আমার বাবা মা আর তাঁদের বন্ধুবান্ধবরা ছাড়া অন্যেরা নামটা বিকৃতভাবে উচ্চারণ করত, আমার অপমান লাগত। নিজেই নিজের ওপর রেগে যেতাম, ওদের ভুল শুধরে দেবার সাহস পেতাম না বলে – কলেজে যাবার আগে পর্যন্ত পরিচয় দেবার সময় নিজের নামটা দীর্ঘ ঊ দিয়ে উচ্চারণ করে বলিনি। আমার এই ঘরেও-নেই-পারেও-নেই গোছের অবস্থানগত জটিলতার গোড়ায় পৌঁছনোর চেষ্টা হিসেবেই The Namesake লিখেছিলাম। অবশ্য এই উপন্যাসে আমি একজন বাঙালি-আমেরিকানকে নিয়েই লিখেছিলাম, তবে ব্যাপারটাকে কিছুটা গোগোল সদৃশ করে তোলার জন্য ওর কোনও বাঙালি নামও নেই, ফলে উভয় সংস্কৃতির কাছেই ও ব্রাত্য হয়ে রইল।
সত্যি বলতে কী, The Namesake-এর সঙ্গে আমার লড়াই কখনোই থামেনি, কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এটাই আমার সবচাইতে জনপ্রিয় বই। কোনো কোনো মুহূর্ত আমারও ভাল লাগে, যে সব জায়গায় আমি যা বলতে চাই সেরকম কিছু রয়েছে, কিন্তু সব মিলিয়ে বইটা আমায় আবেগকম্পিত করতে পারে না।
সাক্ষাতকার গ্রহিতা
কেন পারে না?
ঝুম্পা লাহিড়ি
দেখুন, প্রথমে যে খসড়াটা লিখেছিলাম, সেটা ছিল বেশ ছোট আর আঁটসাঁট, একটি উপন্যাসিকার আকারে। আমি একটি “ইউরোপিয়ান” বই লিখতে চেয়েছিলাম। চরিত্ররা কী ধরণের কাজ করে, রাস্তার কী নাম, স্থানীয় সুপারমার্কেটের নাম কী – এই সব বিস্তারিত ব্যাখ্যানে যাবার ইচ্ছে মোটেও ছিল না। খসড়াটা ছিল ঠিক একটা তিরের মত, নিক্ষিপ্ত হয়েই সোজা গল্পের ভেতরে ঢুকে পড়ে। কিন্তু ওটা একপাশে সরিয়ে রাখলাম, ভয় হচ্ছিল সম্পাদকমশাইয়ের গল্পটা পছন্দ হবে না, অন্য কোনও ফেলে রাখা অসমাপ্ত কাজে মন দিলাম। কিছুদিন পরে আবার ওই খসড়াতে ফিরে এলাম, ঠিকই ভেবেছিলাম – আমার প্রকাশক বললেন বইটা বড়ই ক্ষীণকায়, আমাকে একটু “রক্তমাংস লাগাতে হবে”, ঠিক যে কথাটাই অনেক আমেরিকান সম্পাদক এবং সৃজনশীল সাহিত্যের অধ্যাপকরা সর্বদা বলে থাকেন। ওঁরা চান সবকিছুর মধ্যেই সুগম এবং বাস্তববাদী সুরটা বজায় থাকুক। “দানাদার।” আমাকে ভুল বুঝবেন না, টমাস হার্ডি আমার খুবই পছন্দের, কিন্তু এই ধরণের প্রতিক্রিয়া অনেক ক্ষেত্রেই লাভের চেয়ে লোকসানই বেশি করে ফেলে। সে যাই হোক, আনন্দদান করার শিক্ষাই আমি পেয়েছি, তাই উপন্যাসটিতে আরও খুঁটিনাটি জুড়ে পূর্ণরূপ দিলাম। মূল পাণ্ডুলিপির চেয়ে দুই থেকে তিনগুণ বেশি দীর্ঘ হয়ে উঠল।
সাক্ষাতকার গ্রহিতা
ইতালিতে অনেক ক্ষেত্রেই কৃশতনু রচনারই কদর বেশি। যেমন ধরুন, পিরানদেল্লো, ভিত্তোরিনি ...
ঝুম্পা লাহিড়ি
জানি, এমনকি মোরান্দি আর জিওকোমেত্তি – এঁরাও নিজের নিজের মত করেই সহজিয়া। তবে ছোটগল্পের মতই ছোট উপন্যাসেরও মন্দ কপাল – সর্বদা লাঞ্ছনাই পেয়ে থাকে।
সাক্ষাতকার গ্রহিতা
জানেন কি, টেইলর সুইফটের অ্যালবামগুলোকে “টেইলরের সংস্করণ” বলা হয়?
ঝুম্পা লাহিড়ি
না।
সাক্ষাতকার গ্রহিতা
কোনো এক সময়, রেকর্ড কোম্পানি ওঁর অনুমতি ছাড়াই ওঁর সব গানের প্রধান সংস্করণের সত্ব বিক্রি করে দেয়, তাই কয়েক বছর আগে থেকে উনি সেই সব গানের নতুন সংস্করণ রেকর্ড করতে আরম্ভ করেন, ওঁর নিজস্ব প্রধান সংস্করণ।
ঝুম্পা লাহিড়ি
আচ্ছা।
সাক্ষাতকার গ্রহিতা
The Namesake-এর ঝুম্পার সংস্করণ লিখবেন বলে ভাবছেন?
ঝুম্পা লাহিড়ি
প্রথম সংস্করণটা যে কোথায় আছে কে জানে – থাকবে নিশ্চয়ই কোথাও। শেষ পর্যন্ত যেটা ছাপা হয়েছিল সেটা সম্পূর্ণভাবে আলাদা বই। আমার মূল প্রেরণাটা বিসর্জন দিতে কষ্ট হয়েছিল – কিন্তু পুলিৎজ়ার জেতার পরে, মনে আছে এতটাই অস্বস্তি হয়েছিল যে এরকম আলোড়ন সৃষ্টি করার জন্য ক্ষমা চেয়ে নেবার জন্য মনে মনে প্রায় তৈরি হয়ে গেছিলাম। কারণ পুরস্কারটা সত্যি সত্যিই কিছুটা আলোড়ন তুলেছিল – ওগুলো ছিল ছোট গল্প আর বইটা ছিল পেপারব্যাক সংস্করণ। সহসা দেখলাম The NewsHour with Jim Lehrer অনুষ্ঠানে বসে আছি! বাবা মা তো একেবারে হতবাক আর যারপরনাই গর্বিতও, তবে কয়েক মাস পরে যখন আলবের্তো আর আমি আমাদের প্রথম অ্যাপার্টমেন্ট কিনলাম, মনে আছে, বাবা বলেছিলেন, “তোমাকে সর্বদা একটা বিকল্প পরিকল্পনা তৈরি রাখতে হবে। তোমার অবস্থা এখন একজন রাজনৈতিক নেতারই মত, তাই অনুকূল আর প্রতিকূল দু’রকম পরিস্থিতির জন্যই তৈরি থাকতে হবে।” তখন মন্তব্যটা শুনে বিরক্তই হয়েছিলাম, কিন্তু নিছক সত্যি কথাটাই বলে দিয়েছিলেন। তখন লোকে আমাকে বলত, “হার্পার লী’র কথা ভুলে যেও না,” যেন বলতে চাইত, বড় পুরস্কারটা যখন পেয়েই গেছ, লেখালেখিটা হয়ত পুরোপুরি বন্ধই করে দেবে। পুলিৎজ়ার যে আমার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে না, সেটা প্রমাণ করে দেবার জন্য আমি বদ্ধপরিকর হয়ে উঠলাম, কিন্তু মানুষের প্রত্যাশা বিশাল, এবার যেটা লিখব সেটা বেরতে না বেরতেই চিরায়ত সাহিত্যের মর্যাদা পেয়ে যাবে। আমি তো শিল্পীর মর্যাদা পেয়েই গেছি, ফলে অনুমোদন লাভের ক্লিষ্ট জাঁতাকল থেকে মুক্তিলাভ করে ফেলেছি, কিন্তু তারই মধ্যে একাধারে সমালোচকদের নয়নের মণি এবং সর্বাধিক বিক্রিত লেখক হিসেবে আমাকে দেগে দেওয়াও হয়ে গেছে। এবারে যেটা আসবে, বর্ধিত পাঠকসমাজের কাছে পৌঁছনোর জন্য সেটাকে বিশাল কিছু তো হতেই হবে, অতএব “তাৎপর্যপূর্ণ” বই হতে হবে, বাস্তববাদী শৈলীতে লেখা, এবং – সওয়ালটা উঠল যখন আমার The Lowland লেখা হয়ে গেছে – নৈতিক অস্পষ্টতা সহ যে কোনোরকম ঝুঁকি এড়িয়ে চলতে হবে – সাহিত্যের দৃষ্টিকোণ থেকে ভয়ঙ্করতম অভিপ্রায়।
সাক্ষাতকার গ্রহিতা
মনে আছে পাঠক সেই উপন্যাসের গৌরী চরিত্রটাকে নিজস্ব পথ খুঁজে নেবার প্রচেষ্টারত একজন মহিলা হিসেবে নয় বরং একজন ডাইনী রূপেই দেখেছে।
ঝুম্পা লাহিড়ি
গৌরী কীভাবে নিজের মেয়েকে পরিত্যাগ করতে পারে সেটা প্রায় কোনো পাঠকই বুঝতে পারেননি, অথচ পুরুষমানুষ নিজের সন্তানদের পরিত্যাগ করেছে, এরকম ভূরিভূরি উদাহরণ সাহিত্যে আছে। আমার সম্পাদক বুঝতে পেরেছিলেন, তবে দেরিতে – ততদিনে আমিও দৃঢ় হতে শিখে গেছি – বইটা যখন ওঁকে দিলাম, উনিও বললেন, “তোমারও কি মনে হয় না যে ব্যাপারটা একটু বেশিই অপবিত্র লাগতে পারে?” পাঠকরা এটা গ্রহণ করতে অস্বীকার করলেন, উপন্যাসের গৌরীর বিচার শুরু করে দিলেন, ওই চরিত্রটা সৃষ্টি করার জন্য আমারও সমালোচনা করতে লাগলেন। আমার পরিচিত মহিলাদের সঙ্গে কথাবার্তায় ওর প্রসঙ্গ এসেই যেত, ওঁরা চুপিচুপি, কথায় কথায় আমাকে জানাতেন, “আর একাজ আমি করতে পারব না,” বা “আমার জীবন তো শেষই হয়ে গেছে,” কিংবা “এখন তো আমার একটি সন্তান আছে, জানি না আমার অবস্থান কী হতে পারে।” মাতৃত্ব নিয়ে সেটা আমার নিজস্ব অভিজ্ঞতা ছিল না, কিন্তু দেখলাম যেসব মহিলারা এই রকম সমস্যার শিকার, আমি অবলীলায় তাঁদের মনের ভেতরে উঁকি মারতে পেরেছিলাম। The Lowland প্রকাশ পাবার এক দুই বছরের মধ্যেই অবশ্য ফেরান্তে৫ ঝড় আছড়ে পড়ল।
সাক্ষাতকার গ্রহিতা
গৌরী যে উপন্যাসটার দখল নিয়ে বসবে এই কথাটা কি আপনি প্রথম থেকেই জানতেন?
ঝুম্পা লাহিড়ি
না, আমার পরিকল্পনা ঠিক এরকম ছিল না – প্রথম দিকে, কেবল সুভাষ আর উদয়নের মৃত্যুকে ঘিরে ওর স্মৃতি, এটাই ছিল। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একজন অভিবাসী হয়ে থাকাটা যে কত কঠিন এই কথাটার পুনরাবৃত্তি করতে দিতে চাইনি, গৌরী আমাকে এই জট থেকে বেরিয়ে এসে গল্পটাকে নতুন দিকে চালিত করবার সুযোগ করে দিয়েছিল। বইটা লেখা যখন শেষ হল, বুঝতে পারলাম The Namesake, The Lowland, আর ওই সব গল্প – যেগুলোর ধারণা একই সঙ্গে, প্রায় একযোগেই, মনের মধ্যে তৈরি হয়ে ছিল, অবশেষে সেই কাহিনীবৃত্তে দাঁড়ি টানতে পেরেছি – প্রতিটি চরিত্র, সামাজিক পরিবেশ – সবটাই এক বিশেষ পরিমণ্ডলের ফসল এবং বৃত্তাকারে ঘটে চলে।
সাক্ষাতকার গ্রহিতা
ইতালিয়ান সাহিত্য কি আপনি তখন থেকেই পড়তে আরম্ভ করে দিয়েছিলেন, জানার কৌতুহল হচ্ছে?
ঝুম্পা লাহিড়ি
হ্যাঁ, অবশ্য সেই সময় একটা ছোটগল্প পড়লেও মনে হত বিশাল কিছু করতে পেরেছি। বেশ মনে আছে [চেজ়ারে] পাভেজ়ে’র একটা গল্প পড়তে চার মাস লাগিয়ে দিয়েছিলাম। ২০১২’র গ্রীষ্মের কথা, The Lowland-এর চূড়ান্ত রূপ দেওয়ার কাজে হাত লাগিয়েছি, অধ্যায়গুলোর পুনর্বিন্যাস করছি, ইতালিয়ান কবিতার একটা সংকলন আবিষ্কার করলাম, যার পাশে ইংরেজি অনুবাদও দেওয়া আছে – [জিউসেপ্পে] উঙারেত্তি, [উমবের্তো] সাবা, [জর্জো] বাস্সানি, [জর্জো] ক্যাপ্রোনি, আর প্রিমো লেভি, ইনি আজও আমার কাছে একনম্বর। এঁদের অনেকেই এমন লেখক ছিলেন যাঁরা ভাষা আর সংস্কৃতির সন্ধিস্থলে বিরাজ করতেন। The Lowland’-এর সূত্র-লিপিটাও আমি এখানেই পেয়েছিলাম, বাস্সানির একটা কবিতায় —“let me return to my home town entombed / in grass as in a warm and high sea.” আমার একটা পা অন্য দিকে বাড়ানোই ছিল। উপন্যাসের খসড়া যখন চূড়ান্ত করছি, ততদিনে আমি রোমে চলে এসেছি।
সাক্ষাতকার গ্রহিতা
ইতালিয়ান ভাষা শিখতে আরম্ভ করার সময় কোনোদিন ভেবেছিলেন কি যে আপনি এই ভাষাতেই লেখালেখি শুরু করবেন?
ঝুম্পা লাহিড়ি
প্রথম দিকের উপন্যাস এবং গল্প পড়ার সময় এটা আমার সুদূরতম কল্পনাতেও আসেনি। দাঁড়ান, এই নোটবুক থেকে দেখাই আপনাকে, কবে থেকে আমি ইতালিয়ান ভাষায় লিখতে শুরু করেছি – চলে আসার ঠিক আগেই এটা কিনেছিলাম। এই তো, জাহাজে বসেই প্রথম লিখেছিলাম – অগাস্ট ৪, ২০১২ – এখনও ইংরেজিতেই যদিও, আর আরও সপ্তাহ দুয়েক সেভাবেই চলেছিল ...
সাক্ষাতকার গ্রহিতা
জাহাজে করেই ইতালি যাত্রা করেছিলেন?
ঝুম্পা লাহিড়ি
এখন ব্যাপারটা ভাবলেই মাথাটা বনবন করে ঘুরে ওঠে। নিউ ইয়র্ক থেকে সাদাম্পটন যেতে পাক্কা এক সপ্তাহ লেগে গেছিল, তারপর সেখান থেকে বাসে করে লন্ডন, তারপর আকাশপথে রোম – সেটাও আবার দুটো বাচ্চাকে সঙ্গে নিয়ে। আসলে আমার বাবার ভারত থেকে আসার অভিজ্ঞতার পুনর্নির্মাণ করতে চেয়েছিলাম। কলকাতা থেকে লন্ডন উনি ইতালিয়ান জাহাজ SS Roma-তে করে পাড়ি দিয়েছিলেন, ছোটবেলায় উনি আমাকে সুয়েজ় ক্যানেল পেরনোর গল্প শোনাতেন, বাতাস কেমনতরো অবরুদ্ধ ছিল। ঠিক করে নিয়েছিলাম একটা ডাইরি রাখব যাতে পরে স্মৃতিচারণ করতে পারি। তারপর অগাস্টের ১৮ তারিখ থেকে, সেটা ছিল একটা শনিবার, রোমে যখন প্রায় এক সপ্তাহ হয়ে গেছে, আমি ইতালিয়ানে লিখতে আরম্ভ করলাম। এই যে দেখুন - “কাম্পো দে ফিওরে থেকে ফল আর শাকসবজি কিনলাম। আমার সেলফোনের একটা ঢাকা পেলাম।” ফোনের খাপের সঠিক প্রতিশব্দটা জানা ছিল না - custodia. “একটি শান্ত কাফেতে দুটো caffé latti [sic] পান করার জন্য।”
সাক্ষাতকার গ্রহিতা
Caffé latti ... হা হা!
ঝুম্পা লাহিড়ি
“ভিয়া আরেনুলাতে অকতেভিওর জন্য একজোড়া স্নীকার্স। বাড়িতে ফিরে লম্বা একটা জিরেন, মেঘমুক্ত আকাশ। বাইরে তখনও বেশ গরম। আরেকটা গির্জা। উঁচু, বাদামি। ত্রাস্তেভেরে থেকে আট নম্বর ট্রামে করে আমরা প্রান্তিক স্টেশন পর্যন্ত গেলাম, তারপর আমরা লার্গো আর্গেন্তিনায় ফিরে এলাম। বাড়িতে পিপ্পি লংস্টকিং৬ এর সঙ্গে ডিনার সারলাম। পার্সলে আর লেবু দিয়ে স্পাগেটি।”
সাক্ষাতকার গ্রহিতা
ঠিক কোন কারণে আপনি দিনপঞ্জি রাখতে ভালবাসেন?
ঝুম্পা লাহিড়ি
এক দশক ধরে দিনপঞ্জি রাখছি – আমার সমস্ত লেখালেখির উৎস। সম্প্রতি বার্নার্ডে ডাইরি নিয়ে একটা ক্লাস নিয়েছিলাম, সেখানে আমরা পাভেজ়ে, উলফ, সনট্যাগ, আঁদ্রে জিদ এবং কারোলিনা মারিয়া দ্য হেসুস – এঁদের সত্যিকারের ডাইরি এবং জয়েস, এর্নো আর অন্যান্যদের রচনা পাঠ করেছিলাম। আজকাল মানুষ অবান্তর, প্রায় উপস্থাপনার অযোগ্য লেখা নিয়ে মাতামাতি করে, ওই যে সব লেখার ব্যক্তিগত, অন্তরঙ্গ বৃত্তেই কেবল অস্তিত্ব, তবে বহুদিন ধরেই সাহিত্যের একটা শ্রেণীবিন্যাস চালু হয়ে আছে যার সর্বোচ্চ স্তরে আছে উপন্যাস এবং যে কোনো ধরণের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা সম্বলিত দস্তাবেজ – বিশেষ করে যেগুলো মেয়েদের অভিজ্ঞতা – রয়েছে সর্বনিম্ন স্তরে – যেমন শুনে থাকেন, “ওই দেখ, মেয়েটা আবার সবাইকে ডেকে ডেকে নিজের মনের কথা বলে বেড়াচ্ছে।” আমি সর্বদাই নিজের চারপাশে এমন একটা বৃত্ত তৈরি করে নিতে অভ্যস্ত যাতে আমাকে কেউই লক্ষ্য করতে পারবে না বা আমার কথা শুনতে পাবে না। মনে আছে, লন্ডনে Interpreter of Maladies কে নিয়ে একটা অনুষ্ঠানে – পুলিৎজ়ার পুরস্কার পাওয়ার আগের কথা বলছি – সমাবেশটা বেশ বড়ই ছিল – শ্রোতাদের একজন আমার কাছে জানতে চাইলেন, “আপনি কার জন্য লেখেন?” মঞ্চে দাঁড়িয়ে এই আমি – একেবারে আনকোরা, আনাড়ি একজন লেখিকা, বলেছিলাম, “আমি নিজের জন্য লিখি।” চারপাশে সর্বাত্মক নীরবতা।
সাক্ষাতকার গ্রহিতা
“বোঝাই যাচ্ছে সহমর্মিতার ছিটেফোঁটাও ছিল না ওঁর মধ্যে!”
ঝুম্পা লাহিড়ি
ঠিক তাই। তবে আমি উলফের ওই কথাটায় বিশ্বাস করি – “নিজের আনন্দ পাওয়াটাই একমাত্র নিশ্চয়তা।” যখন আমার এত বছরের লেখালেখির ফসলের পানে তাকাই করি, মনে হয় আমার প্রকাশিত লেখাগুলো তো মাত্র তার অর্ধেক। আমার ড্রয়ারে থাকা সব ডাইরি – লেখা হিসেবে সেগুলোর নিজস্ব পরিচয় আছে। আপনাকে যে নোটবুকটা দেখালাম, ইতালিয়ানে লিখতে আরম্ভ করার সময়ে এই ধরণের নোটবুক রাখাটা আমার জন্য খুবই জরুরি ছিল। ধরুন আমি ব্যাকরণে ভুল করলাম, তবুও, নাহ্ ভুল হয়ে গেল ভেবে, লেখা বন্ধ না করে যেন লেখাটা এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি। এর ফলে আমি ভুলগুলো, এমনকি মর্মান্তিক ভুলগুলো সম্বন্ধেও সতর্ক হতে পেরেছি, নিজেকে বলতে পেরেছি, ঠিক আছে, এভাবেই নিজের উন্নতিবিধান সম্ভব, এভাবেই ইংরেজি ভাষার প্রতি ঝোঁককে অতিক্রম করতে পারব।
সাক্ষাতকার গ্রহিতা
আপনি কি সব সময় হাতেই লিখে থাকেন?
ঝুম্পা লাহিড়ি
যখন ইংরেজিতে লিখতাম, সিধে আমার মান্ধাতার আমলের ম্যাকেই লিখতাম, তবে আজকাল একটা পুরো খসড়া নোটবুকেই লিখে নিই – তাড়াহুড়ো করে, হিজিবিজি করে লিখি, ফলে পাতাটা ভরে যাবার পর প্রথমে অপঠনযোগ্য মনে হয়। কোন দিক দিয়ে এগোবো সেটা নিয়ে কদাচিৎ সম্যক কোনো ধারণা থাকে, তবে গল্পের প্রয়োজনে পাশ কাটিয়ে অন্য পাশে যেতে হয় – আর তখন আপনি একেবারে গল্পের অন্দরে ঢুকে পড়েছেন, গল্পের রেলগাড়ি ছুটিয়ে দিতে পারেন। Il quaderno di Nerina (নেরিনার নোটবুক, ২০২১) পুরোটাই একটা সাদা-কালো গ্রাফ-পেপারের নোটবুকে লেখা হয়েছিল – চামড়া দিয়ে সুন্দর করে বাঁধানো দামি নোটবুকগুলো আমাকে ভয় পাইয়ে দেয়। খেয়াল করে দেখেছি, পড়তে পড়তে বইতে কোনো নোট নেবার দরকার হলে আমি বইটার সামনের দিকে (recto) লিখতে আরম্ভ করব, কিন্তু যখন নিজেই কিছু লিখতে চাইব, তখন বইয়ের পেছনের দিকে (verso) চলে যাব, যেন নিজের অজান্তেই আমি ক্রমশ বইয়ের মাঝামাঝির দিকে এগিয়ে যাই। যেন কোনো প্রকল্পকে অত্যাধিক গুরুত্ব দিয়ে ফেলাকে আমি ভয় পাই।
সাক্ষাতকার গ্রহিতা
খুব বেশি পরিমার্জনা করে থাকেন?
ঝুম্পা লাহিড়ি
পৃষ্ঠার মার্জিনে সংযোজন করতেই থাকি, আবার কাটছাঁটও করি, ছন্দ রক্ষার প্রয়োজনে শব্দের অদলবদলও ঘটাই। ট্র্যাক চেঞ্জগুলো অনুসরণ করতে গেলে আমার গায়ে জ্বর এসে যায়, তাই নতুন করে প্রিন্ট নিয়ে নিজে হাতেই অদলবদলগুলো করি, ফলে শেষমেশ আমার অগুনতি টীকাযুক্ত খসড়া হয়ে যায়। কোনো বই যখন একেবারে শেষ পর্যায়েও পৌঁছে যায়, তখনও হাতে লেখা একটা পাণ্ডুলিপি আমার লাগে।
ইতালিয়ান ভাষায় যখন লেখালেখি করতে শিখছিলাম, অলঙ্কার ব্যবহার করে লেখা তখন আমার পক্ষে অসম্ভব ছিল – কেবলই নিখাদ বর্ণনা, অপরিহার্য উপাদানটুকুই। আজকাল আমি অনেক সাবলীল হয়ে গেছি, তাই আমাকে সতর্ক থাকতে হচ্ছে, নতুন ভাষার দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে লেখিকা যেন তার লেখকসত্তা থেকে বিচ্যুত না হয়। কাটাকুটি করি, বাদ দিই, কেবল আবশ্যক বস্তুটাকে রাখি। এই নয় যে বর্ণনার ভাষা নেই – রাখা না রাখার ইচ্ছেটাই আসল। কাহিনীকে “দানাদার” করে তোলার কোনও ইচ্ছেই আমার নেই। Whereabouts গড়ে উঠেছে নামহীন একটি জায়গাকে কেন্দ্র করে, অনামা কথকের মুখ দিয়ে গল্প বলানো হয়েছে, এর ফলে কিছু পাঠক দিশেহারা বোধ করেছেন, কিন্তু লেখিকা হিসেবে আমি সম্পূর্ণভাবে দিশা খুঁজে পেয়েছি। Roman Stories ইতালিয়ানে লেখা আমার প্রথম বই যার মধ্যে আমার ইংরেজির লেখার সঙ্গে কতকাংশে সাদৃশ্য পাওয়া যাবে, কিছু কিছু গল্পে আপনি যৎসামান্য হলেও রোমকে চিনতে পারবেন, scalinata (সোপান/সিঁড়ি) আর প্রবাসীদের উল্লেখ থেকে, কলসিয়ানের অন্তরালে কর্মরত স্বামীদের উল্লেখ থেকে – এবং অবশ্যই অভিবাসীদের নিয়ে আমি আবার নতুন করে কিছু পড়াশোনা করেছি। তবে “পি’র সেই সব পার্টি’র” মত করুণ রস এবং প্লট ভিত্তিক গল্পগুলো একটু হেঁয়ালি করে লেখা – ইংরেজিতে কোনোভাবেই এই ধরণের কাহিনী কল্পনাতে আসাই সম্ভব নয় – অনেকগুলো বছর লেগেছিল এই গল্পটা লিখতে এবং ঘষামাজা করে নিতে, কারণটা এরকম নয় যে গল্পটা নিয়ে আমি ফেঁসে গেছিলাম, আসল কারণ হল ইতালিয়ানে এই গল্পকে নিজের ইচ্ছেমত মোচড় দেবার স্বাধীনতা ছিল।
সাক্ষাতকার গ্রহিতা
আপনার কি মনে হয় ইতালিয়ান আর আমেরিকান লেখকরা রচনার আকার এবং আকৃতি নিয়ে ভিন্ন মনোভাব পোষণ করেন?
ঝুম্পা লাহিড়ি
ইতালীতে উপন্যাসের সংজ্ঞা অনেকটাই নমনীয় এবং কল্পনাশ্রয়ী আত্মজীবনীমূলক লেখাকে কেবল এক প্রবণতা হিসেবে নয় বরং ঢিলেঢালা পরম্পরা হিসেবে স্বীকার করে নেওয়া হয়, ইতালিতে যার অর্থ হল নাতালিয়া গিনজ়বুর্গ আর ওয়াল্টার সিটি এমনকি আরও পিছিয়ে গিয়ে দান্তের সময়কালেও ঢুঁ মারা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রকাশকরা বিষবস্তুর ধ্রুব বিন্যাস প্রত্যাশা করেন – একটা উপন্যাস, বা একটা স্মৃতিচারণা, বা একটা ছোটগল্প। দোমেনিকো স্তারনোনে, যিনি আমার প্রতিটি ইতালিয়ান পাণ্ডুলিপি পাঠ করেছেন, বিশেষ করে Roman Stories কে, খুবই উদার মনোভাব নিয়ে, ওঁর দীর্ঘ, বিশদ উপন্যাসগুলির জন্য উনি ইতালিতে খ্যাতিমান হয়েছেন, তবে ওঁর যেসব উপন্যাস আমি অনুবাদ করেছি সেগুলি খুবই সংহত এবং রসস্নিগ্ধ। ঔপন্যাসিক হিসেবে তত নয়, ক্যালভিনো নিজেকে বরং একজন ছোটগল্পকার হিসেবেই ভাবতে পছন্দ করতেন, বিন্যাসের ধরণ নিয়ে নিরন্তর পরীক্ষানিরীক্ষা চালাতেন, মহাকাব্য আর উপকথার ত্রিমাত্রিক ধাঁচকে নিজের লেখায় ব্যবহার করেছেন। ইমানুয়েলে ত্রেভি স্ত্রেগা পুরস্কার এমন একটা বইয়ের জন্য পেয়েছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে খুব সম্ভব সেটাকে উপন্যাস বলাই হবে না। আমার একটি বই লেখার ইচ্ছে আছে যেখানে একটি ছোটগল্প থাকবে, তার পরে থাকবে একটি কবিতা, আর তারও পরে থাকবে একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রবন্ধ। ওভিদের কথা মনে করুন, এখন আমি যাঁর অনুবাদের কাজ করছি – পুরাকথা, গাথা এবং ইতিহাস উনি একই আধারে পরিবেশন করেছেন, অনেকটা জ়িবালদোনের৭ ধাঁচে। ওভিদ বলতে গেলে নানাভাবে সীমালঙ্ঘন করেছেন। উনি সর্বদাই উৎসের দিকে লক্ষ্য রাখেন, ঘটনার মূলবিন্দুতে মনোযোগ দেন, স্থানচ্যুত হয়ে সত্তার কিছু অংশকে বিসর্জন দিয়ে যখন আমাদের নতুন কিছু গ্রহণ করতে হয় তখন আমাদের কী প্রতিক্রিয়া হয় সেটা নির্ধারণ করবার চেষ্টা করেন, আমাদের সকলের ভেতরে লুকিয়ে থাকা দানবীয় সত্তাকে খুঁজে বের করেন। উনি বহুত্বে বিশ্বাসী – অর্থাৎ মনে করেন সব ঘটনাই একটি মাত্র ধারা থেকে প্রবাহিত হয় না, বরং তার একাধিক ধারা থাকে।
ইতালিয়ান ভাষায় লেখালেখি করা এবং অধিকতর নমনীয় বিন্যাসকে বেছে নেওয়াই হল আমার আধুনিকতাবাদী পদেক্ষেপ। In Other Words-কে পাঠক একটি স্মৃতিকথা হিসেবে পড়ে থাকেন, এই সত্যটা মানতে গিয়ে আমার প্রায় মাথা খারাপ হয়ে যাবার জোগাড় হয়েছিল, কিন্তু কিছু কিছু পাঠক আছেন যাঁরা এভাবেই এর মর্মোদ্ধার করতে পারেন। ওঁরা চান আমার লেখা আরও একটু প্রথাসিদ্ধ হোক। Translating Myself and Others (2022)-তে [আন্তোনিও] গ্রমসিকে নিয়ে লেখা প্রবন্ধটির ক্ষেত্রেও ঠিক এই ব্যাপারটাই ঘটেছিল, ওঁর Prison Notebooks-এর গঠনসংক্রান্ত দিকটির প্রতিধ্বনি করার উদ্দেশ্যে সচেতনভাবেই স্মারকলিপির একটি ক্রম হিসেবে লিখেছিলাম। বইটির একটি সমালোচনায় এই অভিযোগ করা হয়েছিল যে ওই অধ্যায়টি যথেষ্ট উপলব্ধি ছাড়াই লেখা হয়েছিল – বুলেট পয়েন্ট দেওয়া একটি তালিকা ছাড়া আর কিছু নয়।
সাক্ষাতকার গ্রহিতা
বোঝাই যাচ্ছে ওতে আরও একটু অবয়ব দান করলে ভাল হত! আচ্ছা, আমেরিকান পাঠকদের তুলনায় ইতালিয়ান পাঠকদের সম্পর্কে আপনার নিজস্ব ধারণাটা ঠিক কেমন?
ঝুম্পা লাহিড়ি
সাধারণভাবে বলতে গেলে, ওঁদের উদারতায় আমি মুগ্ধ হয়ে গেছি। যেসব লেখক বা পাঠকদের সঙ্গে আমার আলাপ আছে, তাঁরা ই-মেইল পাঠিয়ে বা টেলিফোন করে বলবেন, “আপনার গল্পটা আমার ভাল লাগল – আসুন, এক পেয়ালা কফির সামনে বসে এটা নিয়ে চর্চা করা যাক।” মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এমন ঘটনা বিরল, ওঁরা হয়ত সময়ে কুলিয়ে উঠতে পারেন না। ইতালিয়ানে প্রকাশিত হতে পারাটা আমার কাছে প্রথম থেকেই একটি অলৌকিক ঘটনার মত। যেদিন Internazionale-এ প্রথম লেখাটি বেরিয়েছিল, সেই কলামে পরে যেটি In Other Words নামে পরিচিত হয়, সেদিনের কথা আমার বেশ মনে আছে। নিউজ়স্ট্যান্ড থেকে নিজস্ব সংখ্যাটি সংগ্রহ করবার জন্য বেরিয়ে পড়লাম, ফেরার পথে আমাদের স্থানীয় salumeria-৮তে থামলাম। এখানেই আমি রিকত্তা৯ কিনতে যাই। এত গর্ব হচ্ছিল আর এতই উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলাম যে খবরটা তখুনি ভাগাভাগি না করতে পারলে শান্তি পাচ্ছিলাম না। বললাম, “রোবের্তো, আন্দাজ কর তো কী? ইতালিয়ানে আমার লেখা ছাপা হয়েছে!” ব্যাপারটা ও জানতই না, তবু বলল, “দারুণ ব্যাপার তো! কই দেখি।”
রোমের চালিকাশক্তির ধরণটাই অন্য রকম, বাজার চলতি সাহিত্যের চেয়ে এর ব্যাপ্তি অনেক বেশি। হোরেসের ভূত তাড়া করে বেড়াচ্ছে, ওভিদের ভূত তাড়া করে বেড়াচ্ছে – এক নিরহঙ্কার অনুরণন যা জীবন এবং শিল্পের তাৎপর্যকে হারিয়ে যেতে দেয়নি। আমার মনে হয়, যাঁরা দু’তিনটে ভিন্ন ভাষাতেও লেখেন – যেমন ইতালো স্বেভো, আন্তোনিও তাবুচ্চি, বেপ্পে ফেনোলিও ... আমেলিয়া রোসেল্লি, যিনি তাঁর কবিতা ইতালিয়ান, ফরাসি এবং ইংরেজির মিশেল ঘটিয়ে লিখেছেন – ইতালিয়ানরা এই সব লেখকের লেখা পড়তে অভ্যস্ত। অনেক ইতালিয়ান অবশ্য (আমাকে নিয়ে) বলে থাকেন, “নিজেকে উনি কী মনে করে থাকেন যে আমাদেরই ভাষাতে লিখতে লেগেছেন?” অথবা বলে থাকেন যে আমি এমন শব্দের প্রয়োগ করি যা অচল হয়ে গেছে, বড় বেশি পোশাকি – খাঁটি ইতালিয়ানরা এরকম শব্দ ব্যবহারই করে না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যদিও সমালোচনা এসেছে বিপরীত অভিমুখ থেকে, অ্যাংলোস্ফিয়ার১০ থেকে। “আজকাল ও নিজের ভাষায় লিখছে না কেন?” “ইংরেজিতে লেখালেখিতে আবার ফিরব কবে?” আমার প্রশ্ন হল, একটা ভাষা আপনার বা আমার হয়ে যায়, কীভাবে?
সাক্ষাতকার গ্রহিতা
ইতালির প্রতি আপনার অনুভূতিকে কীভাবে ব্যক্ত করবেন, ভালবাসা?
ঝুম্পা লাহিড়ি
ওহো, মানুষ আমাকে এত কিছু দিয়েছেন যে ইতালিকে ভাল না বেসে পারাই যায় না, যদিও অস্বীকার করব না, একটা ধারণা কখনো কখনো আমার বিরক্তি উৎপাদন করে –এর মধ্যে একটা যৌনতা খোঁজার চেষ্টা করা হয়, আমার নাকি মাথা খারাপ হয়ে গেছে আর সমস্ত দায়িত্ব ঝেড়ে ফেলে আমি মালির সঙ্গে পালিয়ে এসেছি। তবে অন্য একটি ভাষার প্রেমে পড়া – এটা সত্যিই রহস্যজনক একটা ব্যাপার – ব্যাপারটা যখন ঘটে যায় তখন আমরা এটা নিয়ে বিশেষ উচ্চবাচ্য করি না। যখন ইতালিয়ান শিখছিলাম – কেবল নতুন একটা ভাষা শিখে ফেলার উদ্দেশ্যেই তা করছিলাম না – নিজের মধ্যে আমি সুপ্ত থাকা কিছুর অনুসন্ধান করছিলাম, অধিক মাত্রায় ব্যক্তিগত এবং সৃজনশীল স্বাধীনতা, আর সেটাই খুঁজে পেলাম এমন একটা ভাষার মধ্যে যেখানে আমি সর্বদা একজন বহিরাগতই থেকে যাব। এই ভাষা আমাকে আমার শেকড় থেকে এবং তার দ্বারা আরোপিত পরিচয়ের ফাঁদ, নির্ভেজালত্ব প্রমাণের দৌরাত্ম্য এবং তথাকথিত মাতৃভাষা নামক কিংবদন্তি থেকে মুক্তি দিয়েছে। এটাই হল আমার বিচারে প্রকৃত স্বাধীনতা। ইতালিয়ানে লেখার আর রোমে থাকার সুবাদে যে মুক্তির আস্বাদ আমি পেয়েছি, তার জন্য আমাকে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে, কিন্তু তার জন্য আমার মনে কোনো দুঃখ নেই, কারণ এভাবেই আমি বিদ্যমানতা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছি। সম্প্রতি অ্যাথেন্স থেকে বিমানে ফিরছিলাম, ইন্টারকমে বিমানচালকের কণ্ঠস্বর ভেসে এল —“Buonasera, benvenuti a bordo di questo volo a Roma”— আমার চোখে জল এসে গেল, কারণ আমি জানি আমি বাড়ি ফিরছি। ("শুভ সন্ধ্যা, রোমের এই ফ্লাইটে আপনাকে স্বাগতম")
ইতালিয়ান থেকে অনুবাদ করেছেন ফ্রাঞ্চেস্কো পাচিফিকো এবং অরিয়ানা উলমেন।
ইংরেজি থেকে বাংলা ভাষান্তর – উৎপল দাশগুপ্ত
টীকা –
১ ইংরেজিতে মূল অংশটি হল – “Right, end of session! That’ll be three hundred dollars.” এই উক্তিটির প্রসঙ্গোদ্ধার করতে পারিনি। তাই ইংরেজি মূলটি পাঠকের জন্য রাখলাম, যদি কেউ আলোকপাত করতে পারেন।
২ সুপারইগো – ব্যক্তিত্বের নৈতিক উপাদান যা ইগোর নীতিপরায়ণতার মান নির্ধারণ করে। ইগো হল একজন ব্যক্তির অহংবোধের প্রকাশ, তার চিন্তাভাবনা, অনুভূতি এবং আত্মমর্যাদাবোধ।
৩ ইড – সহজাত, স্বতঃস্ফূর্ত মানসিক আবেগ।
৪ বাখতিন - মিখাইল মিখাইলোভিচ বাখতিন একজন রাশিয়ান দার্শনিক, সাহিত্য সমালোচক এবং পণ্ডিত যিনি সাহিত্য তত্ত্ব, নীতিশাস্ত্র এবং ভাষার দর্শন নিয়ে কাজ করেছেন।
৫ ফেরান্তে – এলেনা ফেরান্তে ছদ্মনামে একজন বেনামী ইতালিয়ান লেখিকা।
৬ পিপ্পি লংস্টকিং - সুইডিশ লেখক অ্যাস্ট্রিড লিন্ডগ্রেনের ছোটদের বইয়ের একটি কাল্পনিক চরিত্র।
৭ জ়িবালদোনে –স্ক্র্যাপবুক যেখানে ইতালিয়ানরা বিভিন্ন ধরণের, বিভিন্ন বিষয়ের ওপর নোট সংকলন করে রাখত।
৮ salumeria – ইতালির প্রক্রিয়াজাত মাংসের দোকান (সসেজ, সালামি ইত্যাদি)।
৯ রিকত্তা – ইতালিয়ান পনীর।
১০ অ্যাংলোস্ফিয়ার – সেই সব দেশ যেখানে ইংরেজি ভাষা এবং ব্রিটেনের সংষ্কৃতি আর ইতিহাস প্রাধান্য পায় – যুক্তরাজ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজ়িল্যান্ড।


0 মন্তব্যসমূহ