প্রথম যেদিন সন্তোষ আমাকে গুহাটার কথা বলেছিল,বিশ্বাস করিনি। বিশ্বাস করার কথাও নয় কারণ আমাদের শহরে পাহাড় তো দূরের কথা, টিলাও নেই। সুতরাং গুহা থাকবে কিভাবে! বুঝেছিলাম, সন্তোষ নির্ঘাত জালিয়াতির ব্যবসা ধরেছে। একদা চাকুরিজীবী অধ্যুষিত এই শহরে এখন এই ব্যবসারই রমরমা দশা। প্রতি দশজনে একজন জালিয়াত। সন্তোষ যোগ দেয়ার পর এখন সংখ্যাটা দুজনে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু জালিয়াতিও খুব একটা ছেলেখেলা গোছের জিনিস নয়, তার জন্য যথেষ্ট এলেম লাগে। সন্তোষের সেই এলেম কি আদৌ আছে? কে জানে, হয়তো আমিই ওর প্রথম খরিদ্দার। যেহেতু সন্তোষ জানে আমাকে ঠকানো সবথেকে সহজ হয়তো সে কারণেই আমাকে দিয়ে হাত পাকাতে চাইছে!
আমার চোখের দিকে তাকিয়েই সন্দেহটা টের পেয়েছিল সন্তোষ। জিজ্ঞেস করেছিল, বিশ্বাস হচ্ছে না, না?
চোখ সরিয়ে নিয়ে বলেছিলাম, ঠিক তা নয়, মানে শহরে যে গুহা আছে সেটা জানতাম না জন্য একটু….।
কথাটা শুনে হেসেছিল সন্তোষ, তুমি কতটুকু চেনো এই শহরকে?
এরপর কথা চলে না। সত্যিই তো, এই শহরকে যে একতিলও চিনি না সেটা তো পদে পদেই প্রমাণ পেয়ে গিয়েছি। এমন কী সে কথা সন্তোষেরও জানতে বাকি নেই। আমিই জানিয়েছি। জানাতে বাধ্য হয়েছি, কারণ ওর সঙ্গে যখন আমার পরিচয় হয়েছিল ততদিনে আত্মবিশ্বাসের তলানিটুকুও বাষ্প হয়ে উড়ে গিয়েছে। থলথলে কাদার মতো পড়েছিল শুধু অস্তিত্বটুকু। সেটুকুও গোপন করতে আমার তখন শেষ আশ্রয় সিন্ধুবালা পাবলিক লাইব্রেরি। তবে জায়গাটা তো খারাপ ছিল না। লম্বা বেঞ্চ, মাথার ওপর বনবন পাখা। সামনের ডেস্ক থেকে একটা খবরের কাগজ বেছে নিয়ে প্রথমে ঝিমোও যত খুশী, তারপর ধীরে ধীরে কাত হয়ে যাও, আপত্তি করছে কে? পাবলিক লাইব্রেরিতে কোনো পাবলিক এলে, তবে তো আপত্তি!
কিন্তু আপত্তি করার মতো একেবারেই যে কেউ ছিল না, তা নয়। লাইব্রেরিয়ান হরিপদ মণ্ডল। লোক আসুক বা না আসুক, সপ্তাহে ছ’দিন খুলতেই হোত লাইব্রেরি। সরকারি নিয়ম বলে কথা। নিয়মের ক্যাঁচাকলে পড়ে মণ্ডলদাও হয়ে পড়েছিল খিটখিটে। প্রথমদিনই জিজ্ঞেস করেছিল, কী চাই!
প্রশ্নটা শুনে ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। যার না পাওয়ার তালিকা দীর্ঘ সে কিভাবে এক কথায় জানাবে কী চায়! হরিপদদাও উত্তরের অপেক্ষা না করে নিজের কাজে ডুবে গিয়েছিল।
তৃতীয় দিন ফের এগিয়ে এসেছিল, তুমি খুব পড়ুয়া টাইপের। বাঃ, ভালো। এরকম তো দেখি না আজকাল।
প্রশংসায় অনভ্যস্ত কান দুটো গরম হয়ে ওঠায় কিছু বলতে পারিনি। শুনতেও চায়নি হরিপদদা।ফিসফিসিয়ে জানতে চেয়েছিল, অআজও কি অনেকক্ষণ থাকবে?
প্রশ্নটা শুনে ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। তাড়িয়ে দিতে পারে জেনেও বলে ফেলেছিলাম, থাকব।
উত্তর শুনে রেগে ওঠার বদলে স্বস্তি পেয়েছিল মণ্ডলদা। বলেছিল, বাঃ, খুব ভালো। আমার কিছু কাজ আছে। তুমি একটু সামলে নিতে পারবে?
কথাটা শুনে আমার ভেতের জেগে উঠেছিল ডবলা ঘাবড়ানি। কী সামলাতে হবে? আমি কি পারব? জীবনে কিছুই তো সামলাতে পারিনি!
আমাকে আশ্বস্ত করেছিল মণ্ডলদা, তেমন কিছু না। কেউ আসবে না, শুধু একটু খেয়াল রাখবে। কেউ যদি আচমকা এসে পড়ে তাহলে ওই আলমারিটার কাছে গিয়ে একটু গলা খাকারি দেবে। সাবধান, কেউ যেন সন্দেহ না করে।
আমি মাথা হেলিয়ে সায় দিতেই হরিপদদা খুশী হয়ে নির্দিষ্ট আলমারিটার পেছনে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল। পরে উঁকি মেরে দেখেছি ওই ছোট্ট জায়গাটায় চমৎকার একটা ক্যাম্প খাট পাতা আছে। বালিশ চাদর তো বটেই একটা টেবিল ফ্যানও আছে।
তারপর থেকে প্রতি দুপুরে আলমারির পেছনে হরিপদ মণ্ডল, রিডিং রুমের বেঞ্চে আমি, দুজনে তোফা রেস্ট নিচ্ছিলাম। কেউ কখনও বিঘ্ন ঘটাতে আসেনি। তবে কখনও সখনও প্রাকৃতিক প্রয়োজনে বিশ্রামাগার ছেড়ে বেরুতে বাধ্য হওয়া মন্ডলদা যদি দেখে ফেলতো আমি বেঞ্চে শুয়ে ঘুমোচ্ছি তাহলে ধাক্কা দিয়ে তুলে দিয়ে বলত, শুয়ে পড়েছ কেন! লাইবেরী কি ঘুমানোর জায়গা? বসে বসে ঝিমোও।
এরপর থেকে মন্ডলদাকে সামলে চললেও একদিন ধরা পড়ে গেলাম অন্য লোকের কাছে। সে এসে আমাকে রীতিমত খোঁচা মেরে জাগিয়ে তুলেছিল!
ধড়মড়িয়ে জেগে উঠে দেখেছিলাম আগন্তুককে। বুঝতে চেষ্টা করেছিলাম আগন্তুক কতটা পায়াভারি। সেটা বুঝে তবে তো হরিপদ মণ্ডলকে সতর্ক করবো!
অবিন্যস্ত চুল, মুখময় দাড়ি, সর্বোপরি নোংরা পোষাক দেখে বুঝেছিলাম ফালতু পাবলিক। আমার সামনে হাত মেলে ধরে আগন্তুক বলেছিল, পাঁচটা টাকা ছাড়ো।
দাবি শুনে অবাক হয়েছিলাম, এটা ভিখিরি, না ডাকাত!
--কিসের টাকা!
--কিসের আবার! আমার ফিস।
–কিসের ফিস?
–মাথার ওপর পাবলিকের পয়সায় চলা ফ্যান,লাইট দিব্যি এনজয় করতে করতে ঘুমোচ্ছিলে, এটা কত বড় অন্যায়, জানো না? তেমন লোকের চোখে পড়লে ভীষণ বিপদে পড়ে যেতে। বাঁচিয়ে দিলাম। তাই ফিস তো দিতেই হবে। ফিস ছাড়া আমি কোন কাজ করি না।
মনে হয়েছিল, লোকটা নির্ঘাত পাগল। কথা বাড়ালে যদি চিৎকার জুড়ে দেয়,যদি সেই আওয়াজে ঘুম ভেঙে যায় মণ্ডলদার তাহলে মস্ত ঝামেলা বেঁধে যাবে সুতরাং কায়দা করে লোকটাকে নিয়ে এসেছিলাম লাইব্রেরির বাইরে। টাকা দেয়ার ক্ষমতা যেহেতু নেই তাই মিষ্টি কথায় ভোলানোর চেষ্টা করেছিলাম। ব্যর্থ হইনি। দুজনে অনেকক্ষণ গল্প করেছিলাম। নিশ্চিন্ত হয়েছিলাম, না লোকটা পাগল নয়। আমারই মতো ওকেও সারা পৃথিবী বেড়াজালে ঢেকে শত্রুতা করছে। কিভাবে রক্ষা পাবে সেটা ওরও জানা নেই।
অবশ্য আমি এমনটা ভাবলেও লোকটা যে নিজের সম্পর্কে ওরকম ভাবে না সেটা খানিকক্ষণ পরই টের পেয়েছিলাম। হাতে ধরা খাতার ভেতর থেকে একটা কার্ড বের করে দেখিয়েছিল। যদিও ওটাকে কার্ড না বলে এক চিলতে ময়লা কাগজও বলা যেতে পারে কারণ ওতে নাম, ঠিকানা, পেশা লেখা থাকলেও সেসব ছিল পেনে লেখা। এমন কী কার্ডের দুপাশের নক্সা দুটোও ছিল অঙ্কণের অক্ষম প্রয়াস মাত্র।
আমার চোখের সামনে এক পলক নাচিয়েই কাগজটা রেখে দিয়েছিল খাতার ভেতর। ওটুকু সময়ের মধ্যেই নামটা পড়ে নিতে অসুবিধে হয়নি।
জিজ্ঞেস করেছিলাম, কিসের বিজনেস আপনার?
গম্ভীর স্বরে জবাব দিয়েছিল সন্তোষ, অনেক কিছুর।
কিন্তু ওটুকু তথ্য থেকে কী বা বোঝা যায়! আমার হতভম্ব দশা দেখে সন্তোষ দয়া করে খানিকটা খোলসা করেছিল, পুরানো বই বিক্রি, এমন কি শিশি বোতল বিক্রিও করি। এছাড়া বাড়ি বাড়ি খবরের কাগজ দেওয়া, রেল টিকিটের ব্রোকারি, এরকম আরও অনেক কিছু। এখনও অনেক ক’টা প্রোজেক্ট মাথায় আছে। শেষ অবধি কোনটা করবো সেটা ঠিক করিনি। তবে কিছু একটা তো ফাইন্যাল করতেই হবে।
--চাকরির চেষ্টা করেননি?
সন্তোষ সাফ জবাব দিয়েছিল, নাঃ, চাকরগিরি আমার পোষাবে না। তাছাড়া জ্যোতিষীও হাত দেখে বলেছে বিজনেসই আমার ভবিষ্যত। এই লাইনেই একদিন বিশাল মানুষ হবো।
‘বিশাল’, শব্দটা আমার মাথার ভেতর এমন ঘা মেরেছিল যে ভেতরটা কেমন যেন তালগোল পাকিয়ে গিয়েছিল। বারবার মনে হচ্ছিল, সন্তোষের কাছ থেকে জেনে নেব নাকি জ্যোতিষীর ঠিকানাটা? একদিন গিয়ে জেনে আসব নাকি বিশাল হওয়ার জন্য আমার লাইন কোনটা! কিন্তু বিনে পয়সায় কি ভাগ্য জানা যায়?
কয়েকদিন পর সন্তোষের সঙ্গে ফের দেখা হয়েছিল। এবার লাইব্রেরিতে নয়। কারণ কী একটা উৎসবের কারণে যেন সেদিন লাইব্রেরি বন্ধ ছিল। উপায় না পেয়ে হাঁটতে হাঁটতে চলে গিয়েছিলাম কাছারি রোডে। গিয়ে দেখি রাস্তা পুরো জমজমাট। একটা রাজনৈতিক দলের পথসভা চলছে। কেউ একজন জ্বালাময়ী ভাষণ দিচ্ছে, মানুষজন সেটা হা করে গিলছে।
গিলুক। আমার কী! পাশ কাটিয়ে চলে যেতে গিয়ে হঠাৎ দেখি সেই ভিড়ের ভেতর সন্তোষ! হাতে একটা কৌটো। জমায়েতের সামনে গিয়ে গিয়ে কৌটো ঝাঁকিয়ে পয়সা তুলছে।
বুঝলাম এই প্রজেক্টটাই বেছে নিয়েছে সন্তোষ। এটাও কি জ্যোতিষীরই পরামর্শে! রাজনীতি যদিও ব্যবসা হিসেবে দারুণ ফাটাফাটি কিন্তু সন্তোষের মতো লোকের পক্ষে কি সেই ব্যবসায় সফল হওয়াটা সম্ভব?
সন্তোষও দেখতে পেয়েছিল আমায়, তবে চেনা দেয়নি। কৌটো ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে আমার সামনে চলে এসে ফিসফিসিয়ে বলেছিল, ফাইভ পারসেন্ট।
মাইক গর্জনের তুলনায় সেই স্বর এতটাই মিহি ছিল যে বুঝতে পারিনি কথাটার অর্থ।
--মানে! কিসের ফাইভ পার্সেন্ট।
নিমেষে চোখের ইশারায় আমাকে চুপ করিয়ে সরে পড়েছিল সন্তোষ। তবে যেতে যেতে ইশারায় নির্দেশ দিয়ে গিয়েছিল অপেক্ষা করার। কৌতূহল এড়ানোটা যেহেতু আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না তাই ভিড় থেকে খানিকটা সরে গিয়ে অপেক্ষায় করছিলাম। কিন্তু শেষ অবধি বিষয়টা জানা হয়নি আমার। মাঝখানেই ঘটে গিয়েছিল একটা ঘটনা। কায়দা করে ভিড় এড়াতে গিয়ে উল্টে গিয়েছিল একটা রিকশা। আরোহিনী ছিটকে পড়েছিল রাস্তায়। জমায়েত থেকে বেরিয়ে আসা কিছু মানুষ নিমেষে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল আরোহিনীকে উদ্ধার করার পাশাপাশি রিকশাওলাকে শিক্ষা দিতে।
ঘটনাটা ঘটেছিল আমার প্রায় সামনে, তবু এগোইনি। না এগোনোর কারণ, উদ্ধারকারীর সংখ্যা ছিল এতটাই বেশী যে আমার উপস্থিতির প্রয়োজন ছিল না।
না এগোনর আরও একটা কারণ, আমার পায়ের কাছে ছিটকে এসে পড়েছিল একটা বাদামী রঙের ডায়েরি। আমি এগোলে ডায়েরিটা কেউ নির্ঘাত হাপিস করে দিত।
পরদিন লাইব্রেরিতে গিয়ে না ঘুমিয়ে ডায়েরিটা পড়েছিলাম। যদিও না বলে কারো ডায়েরি পড়াটা অন্যায় কিন্তু জিনিসটা ফিরিয়ে দিতে গেলে তো পাতা ওল্টাতেই হয়।
প্রথম পাতাতেই লেখা ছিল--শ্রীমতি অপাপবৃতা দত্ত। বাবু পাড়া। কম্পুটার ছাত্রী। ভারতীয়। হিন্দু। ব্লাড গ্রুপ-বি নেগেটিভ।
ভেতরের লেখাগুলো একটানা ছিল না। পাতায় পাতায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কিছু টুকরো টুকরো লাইন ছিল। যেমন–
“পেপারে পাত্র চাই বিজ্ঞাপন দেখে মা আজ একটা চিঠি লিখল। পাত্র ডাক্তার। আমি বললাম, ডাক্তার কেন আমাকে বিয়ে করতে যাবে? মা রেগে গিয়ে বলল, পোড়ামুখি, প্রথমেই বাগড়া দিস জন্য তোর কিছু হয় না। আমি কালীমন্দিরে গিয়ে চিঠিটায় সিঁদুর লাগিয়ে তারপর ডাকবাক্সে ফেললাম। এবার কাজ না হয়ে যায় না।”
“মায়ের জন্য তাউজীর দোকান থেকে জটা মানসী নিতে হবে। জলে ভিজিয়ে রস খেলে নাকি সুগারে দারুণ কাজ দেয়। কিন্তু মা যেরকম চিনি খায় তাতে কী কাজ হবে!”
“কিভাবে ডকুমেন্ট সেভ করতে হয়। (১)প্রথমে ফাইল মেনুতে গিয়ে সেভ অ্যাজ ক্লিক করতে হবে। (২) সেখান থেকে ডাইলোগ বক্স বেরোলে ফাইল নেম দিতে হবে।(৩) তারপর সেভ ক্লিক করলেই, ব্যস। হেব্বি সোজা। এখন থেকে কম্পিউটারে ডায়েরি লিখে রাখব। কেউ পড়তে পারবে না।”
“নিজের ছায়া দক্ষিণে পড়িলে বিপদের আশঙ্কা। স্বপ্নে পরী দর্শন কিংবা মাথার উপরে কাক বসিলে সমূহ বিপদ। যে শিশুর জোড় মাসে দাঁত ওঠে তাহার কথা সর্বাংশে ফলিয়া যায়।”
“তন্ময় স্যার বিশ্রি ভাবে টাকা চাইলো। সবার সামনে বললো, মাইনা ক্লিয়ার না করলে মেশিনে বসতে দেবে না।”
“ভুল মানব ধর্ম। ক্ষমা ঈশ্বর ধর্ম। মা সন্তোষী ক্ষমা করো।”
“মা যেন দিন দিন কেমন হয়ে যাচ্ছে! দাদা চড় মারল, মা কিচ্ছু বলল না। বিয়েটা হয়ে গেলে আমি কোনদিন এদের কাছে আসব না। আমার কেউ নেই।”
“মুখ দেখে মানুষ চিনুন। মূল্য-সত্তর টাকা। সডাক-একশ টাকা। মদন লাইব্রেরি। ২৩, ক্যানিং স্ট্রিট,কলিকাতা ২।”
এরকম আরও অজস্র লেখা ছড়িয়ে ছিল পাতায় পাতায়। সবগুলো পড়িনি। নাম, ঠিকানা যখন পেয়েই গিয়েছি তখন গোপনে অন্য কারুর গোপন কথা পড়ব কেন?
কিন্তু বাবুপাড়া কি একটু খানি এলাকা! অপাপবৃতা দত্তকে কেউ চেনে না। বাড়ি খুঁজে বের করতে গিয়ে আমার প্রায় কালঘাম ছোটার দশা। তবে উদ্দেশ্য সৎ হলে যেহেতু স্বয়ং ভগবান সাহায্য করে তাই এক সময় প্ল্যাস্টার বিহীন একতলা বাড়িটার টিনের গেটের সামনে পৌঁছতে পেরেছিলাম। কিন্তু পৌঁছনটাই তো বড় কথা নয়, মাথার ভেতর একরাশ চিন্তা ভিড় করেছিল। ডায়েরিটা ফেরাব কিভাবে! যদি অপাপবৃতা বাড়িতে না থাকে তাহলে কার হাতে দেব?
এবারও ভগবান সাহায্য করেছিল। আচমকা দেখি গেটের সামনে শ্রীমতি অপাপবৃতা। আমাকে চিনতে না পারলেও আমার হাতে ধরা ডায়েরিটা এক নিমেষে চিনেছিল। গেটটা সামান্য খুলেই ছোঁ মেরে ডায়েরিটা কেড়ে নিয়ে ভেতরে চলে গিয়েছিল। ধন্যবাদ জানানোর সৌজন্যটুকুও দেখায়নি। মনটা খুব খারাপ হয়ে গিয়েছিল, মানুষ এত বেইমান হয়! একটু দাঁড়িয়ে জেনে নিতে পারত না, আমার নাম ঠিকানা? জিনিসটা অন্য কারো হাতে পড়লে কী হোত?
খানিকক্ষণ বোকার মতো দাঁড়িয়ে থেকে যখন ফিরতে যাব তখনই ফের ফাঁক হয়েছিল গেটটা। শুধু মুখটুকু বের করে অপাপবৃতা বলেছিল, এখনও দাঁড়িয়ে আছেন কেন? কিছু বলার থাকলে কাল এগারোটায়, নেটকমের সামনে আসবেন। এখন চলে যান...শিগ্রি।
এরপর ভেতর থেকে একটা পুরুষ কন্ঠ হেঁকে উঠেছিল,“ অপুউউ।” শ্রীমতিও হাওয়ায় ভর করে নিমেষে ভেতরে চলে গিয়েছিল। আমার মন যেহেতু তখন আনন্দে থইথই তাই আমিও দাঁড়াইনি। তাছাড়া নেটকম তো আমি চিনতাম। আগে নাম ছিল নিতাই কম্পুটার সেন্টার। তেমন ছাত্রছাত্রী ছিল না। নাম বদলানোর পর অবস্থাটাও বদলেছে।
সাড়ে ন’টা থেকে আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম। সত্যিই এগারটা নাগাদ এসেছিল বটে মহারাণী তবে আমার দিকে একবারও ফিরে তাকায়নি। মাথা নিচু করে ঢুকে পড়েছিল। বেরতে বেরতে দু ঘন্টা কাবার এবং বের হওয়ারও পরও একই স্টাইল। তাড়াতাড়ি একটা রিকশা ধরে রওনা দিয়েছিল। তবে এবার আমার দিকে তাকিয়েছিল। এক পলক মাত্র। সেটুকুর ভেতরই আমার মনের ভেতর গিঁথে গিয়েছিল অপাপবৃতার কাজল কালো চোখ।
এভাবেই চললো বেশ কিছুদিন। আমার ঘন্টা দুই তিন দাঁড়িয়ে থাকা এবং প্রাপ্তিযোগ বলতে এক পলক চাহনি। তবে নিরাশ হইনি, কারণ লক্ষ্য করেছিলাম চাহনিতে ধীরে ধীরে ভাষা ফুটছে।
একদিন রিকশা না ধরে হেঁটে ফিরেছিল অপাপবৃতা। আমিও পিছু নিয়েছিলাম কিন্তু খানিকটা এগোনর পরই আচমকা দাঁড়িয়ে পড়ে অপাপবৃতা জিজ্ঞেস করেছিল, কিছু বলার আছে?
রাস্তা ভর্তি লোকের মাঝখানে এমন প্রশ্ন শুনে আমার ভেতরটা শুকিয়ে উঠেছিল। এরপর কি করবে মেয়েটা? চেঁচিয়ে লোক ডাকবে? কি জবাব দেব তাদের! অপাপবৃতা যদি উল্টোপাল্টা কিছু বানিয়ে বলে তাহলে কি গণধোলাই শুরু হবে?
তাড়াতাড়ি মাথা নেড়ে বলেছিলাম, না তো! অপাপবৃতাও রিকশা ডেকে উঠে পড়েছিল।
কাণ্ডটা ওখানেই থেমে গেলে ভালো হোত। কিন্তু হয়নি। পরদিন ফের গিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম নেট কমের সামনে। এবার অপাপবৃতা বেরিয়ে সোজা চলে এসেছিল আমার সামনে। চোখের দিকে তাকিয়ে বলেছিল, আমার কিছু কথা বলার আছে, শুনবেন?
আমি সঙ্গে সঙ্গে রাজি, বলুন।
অপাপবৃতা মৃদু বকুনী দিয়েছিল, এভাবে হাটের মাঝখানে কথা বলা যায় নাকি! জায়গা ঠিক করুন, তারপর।
অপাপবৃতা তো হুকুম করেই খালাস কিন্তু আমি জায়গা ঠিক করি কিভাবে! শহরে বেশ কিছু রেস্তরাঁ আছে বটে কিন্তু সেসব জায়গায় কখনও যাইনি। রেট কিরকম, জানি না। যদি মেয়েটা উল্টোপাল্টা কিছু অর্ডার করে বসে তাহলে নির্ঘাত গলা ধাক্কা খেতে হবে।
অনেক খোঁজাখুঁজির পর নেতাজী কেবিনটাকে বেছে নিয়েছিলাম। কারণ দোকানটা অতটা হাইফাই নয়। খরিদ্দার বলতে শুধু প্রেমিক প্রেমিকারা। তারা খায় কম, আড্ডা দেয় অনেকক্ষণ। মালিক কিচ্ছু বলে না।
অপাপবৃতাকে নিয়ে গিয়েছিলাম ওখানে। এমন কী স্টাইল করে দু কাপ চায়েরও অর্ডার দিয়েছিলাম, রেট না জিজ্ঞেস করেই।
কথা বলার জন্য যে ডেকেছিল সে কিনা এমন দারুণ একটা জায়গা খুঁজে পাবার পরও বিলকুল চুপ! এমন কী চোখ তুলে তাকাচ্ছিলও না। বুঝতে পারছিলাম, শুরুটা আমাকেই করতে হবে কিন্তু কিভাবে শুরু করবো বুঝতে না পেরে টেবিলের পাদানিতে পা রেখে ঘনঘন দোলাচ্ছিলাম। পুরোন কাঠ বেশীক্ষণ দোলন সহ্য করতে না পেরে মচাৎ করে ভেঙে পড়েছিল। কী বিশ্রি শব্দ। খোদ মালিক ছুটে এসেছিল।
--দিলে তো লস করে! খাবে তো এক কাপ চা, যত্তসব। কোতথেকে যে সব আপদ এসে জোটে!
আমি তেড়ে উঠতে চেয়েছিলাম কিন্তু তার আগেই অপাপবৃতা উঠে বেরিয়ে গিয়েছিল দোকান থেকে,পিছু পিছু আমিও। তবে বেশী দূর যেতে পারিনি। চট করে একটা খালি রিকশা পেয়ে গিয়েছিল অপাপবৃতা।
এরপরও গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম নেটকমের সামনে। অপাপবৃতার কাছে গিয়ে ফিসফিসিয়ে বলেছিলাম, জায়গা পাওয়া গিয়েছে।
সিন্ধুবালা পাবলিক লাইব্রেরির কথা কেন যে সেদিন মনে পড়েনি কে জানে! মনের কথা বলার মতো এমন নিরাপদ জায়গা আর হয় নাকি!
মণ্ডলদা নিজের ঘরে ঢুকে যাবার পরই এসেছিল অপাপবৃতা। নিঃসন্দেহ হতে উঁকি মেরে দেখেও এসেছিলাম, নাক ডাকছিল হরিপদ মণ্ডল। তবু আমরা পাশাপাশি বসিনি। মস্ত টেবিলটাকে মাঝখানে রেখে আমরা দুজনে বসেছিলাম মুখোমুখি এবং পাদানিতে পা রাখিনি। অপাপবৃতা শুরু করেছিল পুরুষরা ভালো নয়, শুধু সুযোগ খোঁজে দিয়ে। তারপর বাবা রেলের কতবড় কর্মচারি ছিলেন, কত টাকা বেতন পেতেন, আচমকা মারা না গেলে আজ কী হোত এবং দাদার অত্যাচারের বিবরণ পেশ করার পর বক্তব্য শেষ করেছিল একটা প্রশ্ন দিয়ে, তুমিও ঠকাবে নাতো!
এরপর আমার পালা। কিন্তু কিভাবে শুরু করবো সেটা বুঝে উঠতে না পেরে বেঞ্চ ছেড়ে উঠে গিয়েছিলাম অপাপবৃতার কাছে। পিঠে হাত রেখে সবে বলতে শুরু করব ঠিক তখনই আলমারির পেছন থেকে বেরিয়ে এসে কঁকিয়ে উঠেছিল হরিপদ মণ্ডল, এসব কী,অ্যাঁ! বৃন্দাবনের রাসলীলা চলছে? তোমাকে তো আমি ভদ্রলোকের সন্তান ভেবেছিলাম!
উত্তরে কিছু যে একটা বলা দরকার সেটা স্পষ্ট বুঝতে পারা সত্বেও যথারীতি কথা খুঁজে পাইনি। মণ্ডলদা অবশ্য সুযোগও দেননি। মাইম করে খোলা দরজা দেখিয়ে দিয়েছিলেন।
এবার অবশ্য রিকশা পায়নি অপাপবৃতা। হাঁটতে হাঁটতে রেলগেট অবধি যেতে হয়েছিল। এবার পিছু পিছু নয়, হেঁটেছিলাম পাশাপাশি; রাস্তার লোকদের কৌতূহলের পরোয়া না করে। তবে একটা কথাও বলেনি অপাপবৃতা; শুধু রিক্সোয় ওঠার পর হুড টেনে দিতে দিতে বলেছিল, হয় ভালো একটা জায়গা খুঁজে বের করবে, যেখানে তুমি আর আমি ছাড়া কেউ থাকবে না, নাহলে আমাদের সম্পর্ক এখানেই শেষ। খবদ্দার যেন নেটকমের আশে পাশে না দেখি।
মহারাণি তো হুকুম দিয়েই খালাস কিন্তু কোথায় পাবো তেমন জায়গা? কে দেবে? জন্মের আগেও কি তেমন কোন জায়গা পেয়েছি! মায়ের গর্ভেও হাত পা খেলিয়ে, কখনও চিৎ কখনও উপুর হয়ে থাকার সুযোগ পাইনি। সুযোগে ভাগ বসিয়েছিল আমার যমজ বোন। জন্মানোর পর সেই ভাগ বাঁটোয়ারা তো আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছিল। আমার জীবন তো ঐকিক নিয়মের সূত্রে বাঁধা একটা অঙ্কের মতো, সাতজন মানুষের জন্য দুই খানি ঘর এবং মাঝারি মানের উপার্জন বরাদ্দ করা হইলে শতকরা হিসাবে কতখানি নিজস্বতা এক এক জনের ভিতর গড়িয়া উঠিতে পারে?
অঙ্কে যেহেতু বরাবরই কাঁচা তাই কোনদিনই ওই অঙ্কের সমাধান করে উঠতে পারিনি। শুধু দিদি এবং বোনদের টিপ, কাজল,লিপস্টিক,শায়া, ব্লাউজ, ব্রেসিয়ারের চোরাঘূর্ণিতে টালমাটাল হয়েছি। এহেন দশাতেও কিভাবে যে পঁচিশ বছরের ঘাটে এসে পৌঁছতে পারলাম কে জানে! আমার তো কোন স্বপ্ন ছিল না! তাবলে স্বপ্ন যে কখনও আসেনি তা নয়। কিন্তু প্রাণভরে সেই স্বপ্ন দেখতে পারিনি। কিংবা বলা ভালো, দেখতে দেয়া হয়নি। স্বপ্নগুলো যখন ভাসিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে এবং আমিও সেসবের হাত থেকে রেহাই পাবার বদলে ভেসে যেতে চাইছি ঠিক তখনই চড় কিংবা কানমলা আমাকে স্বপ্ন থেকে তুলে এনে ডাঙায় আছড়ে ফেলে বলত, ঠিক হয়ে শো। পাজী ছেলে, মা বোন জ্ঞান নেই? কাল থেকে বারান্দায় শুবি।
এমন জীবন যার সে কিভাবে খুঁজে পাবে নিরিবিলি স্থান? কিন্তু এসব কথা তো অপাপবৃতাকে বলা যায় না। যদি বা বলতেই হয় তাহলেও প্রয়োজন এমন একটা জায়গা যেখানে থাকব শুধু আমরা দুজন। কেউ আমাদের বিরক্ত করতে আসবে না, অনেকক্ষণ। কিন্তু কোথায় পাবো তারে?
এরকম দশাতে হঠাৎ সন্তোষের সঙ্গে আবার দেখা। ঘাঘু লোক ঠিক টের পেয়েছিল যে ঝামলায় আছি।
--আরে, মুখ চোখ এত শুকনো কেন? খবর ঠিকঠাক তো?
ভেবেছিলাম এড়িয়ে যাব কিন্তু মুখচোখের প্রসঙ্গ ওঠায় তাকিয়ে ছিলাম সন্তোষের মুখের দিকে। এ কোন সন্তোষ! চুল পরিপাটি করে আঁচড়ানো, নিখুঁত কামানো দাড়ি। এমন কী পোষাকও যথেষ্ট পরিপাটি। কি করে হলো এসব? ফাইভ পার্সেন্টের কৌটো ঝাঁকিয়ে রাতারাতি এমন হয়!
আমার বিস্ময়টাকে আত্মবিশ্বাসের ঝড় দিয়ে নিমেষে উড়িয়ে দিয়েছিল সন্তোষ।
--ধুর, তুমিও পারো! আরে বাবা, ওটা ছিল ফুংফাং। শেষ পর্যন্ত খুঁজে পেয়েছি আমার আসল ব্যবসা। এখন আমার ক্লায়েন্ট আলাদা। সব ঘ্যাম পার্টি।
--কিসের ক্লায়েন্ট! ব্যবসাটা কি?
পকেট থেকে রুমাল বের করে অহেতুক মুখ মুছতে মুছতে সন্তোষ উত্তর দিয়েছিল, এখন যে ব্যবসাটা সবাই করে, অর্ডার সাপ্লাই। হেব্বি প্রফিট।
--কী অর্ডার সাপ্লাই করো তুমি?
--আরে কী নয়, সেটা বলো! যার যেটা প্রয়োজন। তোমার দরকার আছে কিছু? একবার বলে ফেল, তারপর দেখ, পেয়ে যাও কিনা। তোমার জন্য স্পেশাল অফার–ডেলিভারির পর পেমেন্ট। নো টেনশন।
সন্তোষের প্রস্তাবটা এতই ধারাল ছিল যে, পঁচিশ বছর ধরে আমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখা দড়িগুলো নিমেষে পটাপট কেটে গিয়েছিল। কোনো ভাবনা চিন্তার পরোয়া না করেই ভেতর থেকে টপ করে বেরিয়ে এসেছিল চাহিদাটা।
কী জন্য নিরিবিলি জায়গা প্রয়োজন সেটা জানতে চায়নি সন্তোষ। চাহিদা শোনার সঙ্গে সঙ্গে মাথা নেড়ে বলেছিল, এটা কোন ব্যাপার? যাও, দিয়ে দিলাম তোমাকে নিরিবিলি জায়গা। তবে পঞ্চাশ টাকা দিতে হবে কিন্তু। অন্য কেউ হলে রেট আরও বেশী নিতাম, নেহাত তুমি আমার নিজের লোক।
দুটো দুর্ঘটনার কথা যেহেতু ভুলিনি তাই নিশ্চিত হোতে জিজ্ঞেস করেছিলাম, পুরো নিরিবিলি তো? কেউ দেখে ফেলবে না?
জামার কলারে টোকা দিয়ে সন্তোষ বলেছিল, ফুল গ্যারান্টি। ওই গুহার কথা আমি ছাড়া এই শহরের কেউ জানে না।
গুহা? মালটা কি আমাকে গান্ডু পেয়েছে। ওরকম একটা অবিশ্বাস্য কথা শুনলে রাগ হওয়াটাই যেহেতু স্বাভাবিক তাই এরপর চলে আসতে চেয়েছিলাম কিন্তু সন্তোষের হাত থেকে রেহাই পাওয়া অত সহজ নয়।
–চলো, হাতে কলমে প্রমাণ দিচ্ছি, তাহলে বিশ্বাস করবে তো?
এরপর সন্তোষের পিছুপিছু এসে ছিলাম বটে তবে সেটার কারণ বিশ্বাস নয়, চট করে কাউকে অমান্য করতে পারি না, তাই। ব্যক্তিত্বের অভাব থাকলে যা হয়।
সন্তোষ যেখানে নিয়ে এসেছিল সেই জায়গাটা শহরের খানিকটা বাইরে। এদিকে অআগে জঙ্গল ছিল, কাঠচোরদের দৌরাত্মে এখন শুধু বুনো ঝোপঝাড় ঘেরা অঞ্চল।
ঝোপের ভেতরে নিয়ে গিয়ে সন্তোষ যখন সত্যি সত্যিই আমাকে আস্ত একটা গুহার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল তখন আমার দশা ছিল শোচনীয়। লম্বা চোয়ালটা আরও লম্বা হয়ে প্রায় মাটি ছুঁইছুঁই দশা অথচ নিজেকে সামলানোর উপায়ও খুঁজে পাচ্ছিলাম না।
সন্তোষ আমার দিকে না তাকিয়ে এমন গটমটিয়ে ভেতরে ঢুকে গিয়েছিল যেন গুহাটা ওর ব্যক্তিগত সম্পত্তি। আমি কিন্তু ওকে অনুসরণ করিনি বরং খানিকটা পিছিয়ে গিয়ে লক্ষ্য রেখেছিলাম সন্তোষ ঢোকার পর গুহার দরজাটা বন্ধ হয়ে যায় কি না। যদিও গুহার কোনো দরজা চোখে পড়েনি আমার, এমন কী ঢোকার আগে সন্তোষও কোনো মন্ত্র পড়েনি, তবু বলা তো যায় না, গুহা মানেই ম্যাজিক। যদি এমন হয়ে থাকে, আমাকে ফাঁদে ফেলার জন্য গুহাটাও ষড়যন্ত্র করছে। একবার ভেতরে ঢুকলেই আড়াল থেকে কপাট বের করে আটকে দেবে আমাকে। তারপর সঠিক মন্ত্র ছাড়া কিছুতেই মুক্তি মিলবে না। তখন কোথায় পাব মন্ত্র? সন্তোষ কি আদৌ জানে? জানলেও কি তখন মনে করতে পারবে? যদি ভুলে যায়!
সেদিনই ঠিক করে রেখেছিলাম যদি অপুকে নিয়ে আসি তাহলে সন্তোষের কাছ থেকে মন্ত্রটা জেনে নিয়ে কাগজে লিখে তারপর দুজনে ঢুকব। যদি সন্তোষ মন্ত্রটা জানাতে না চায় তাহলে আসবই না। পরের মেয়েকে নিয়ে এসে বিপদে ফেলব নাকি!
ফেরার পথে আরও একটা আশঙ্কা চাগাড় দিয়েছিল, অপাপবৃতা রাজী হবে তো এখানে আসতে? আমাকে কতটুকুই বা চিনেছে! সেটুকুর ওপর ভরসা রেখে কোনো গুহায় ঢোকা যায়!
না, কোনো আপত্তি করেনি অপু। আমার ভরসায় আজ চলে এসেছে এখানে। এমন কী আমার উপদেশ মতো মাঝপথে রিকশা ছেড়ে দিয়ে অনেকটা পথ হেঁটেই এসেছে। আমি কোনো সাক্ষী রাখতে চাইনি। তাই সন্তোষকেও নিষেধ করে দিয়েছি আজ আসতে।
ঘাড় ফিরিয়ে দেখলাম অপু দাঁড়িয়ে পড়েছে, দুচোখে ইচ্ছে এবং ভয়ের যুগপৎ ওঠানামা।
--কী হলো, ভয় পাচ্ছ!
অস্বীকার করতে চাইলেও পারল না অপু।
--না, মানে ওই আর কী।
--কিসের ভয়?
--যদি বাঘ টাঘ কিছু থাকে!
সন্দেহটা যে আমার মনেও আসেনি তা নয়।এখন যেহেতু ওসব চিন্তাকে প্রশ্রয় দেয়ার মানে হয় না তাই ঠাট্টা মাখা গলায় বললাম, কী মেয়ে মাইরি তুমি! শহরে বাঘ থাকবে কিভাবে?
--শহরে কি গুহা্ও থাকে?
অপুর এই পাল্টা প্রশ্নটা যথার্থই আমাকে পেড়ে ফেললো। হেঁটে, কখনও সখনও হোঁচট খেয়েও প্রতিটা গলি, ঘুঁজি, প্রধান রাস্তা এতটাই চিনেছি যে কেউ যদি দুচোখ বেঁধেও দেয় তবু নির্ভুল গন্তব্যে পৌঁছতে যেতে পারবো। সেই আমিও কি জানতাম এই শহরে এমন একটা গুহা আছে?
অপুকে দাঁড়িয়ে পড়তে দেখে আমি এমন ভঙ্গীতে এগিয়ে গেলাম যেন এটা আমারই গুহা। জন্মানোর পর থেকে এখানেই আছি। নাহলে অপু বুঝে যেত আমিও ভয় পাচ্ছি। নির্ঘাত ফিরে যেত তারপর। এতটা এগিয়ে এসে কি ফেরা যায়?
বাইরেটা মাটির ঢিবির মতো দেখতে হলেও ভেতরটা পুরো পাথরে মোড়া। যদিও আমি পাথর চিনি না তবু শক্তপোক্ত দেখে নিশ্চিন্ত হলাম, আচমকা হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ার চান্স নেই। চাতালটাও এত পরিস্কার, যেন আমাদের জন্যই কেউ ঝেড়ে মুছে তকতকে করে রেখে গিয়েছে। যদি বা তেমনটা হয়েও থাকে তবু আমি নিশ্চিত, কাজটা সন্তোষের নয়। হোতে পারে না। কেননা অর্ডারটা ছিল শুধুই জায়গার, পরিষ্কার জায়গার নয়। যতটুকু অর্ডার থাকে তার একতিল বেশী যে সাপ্লাই করে না, সেটা সন্তোষ আমাকে আগেই বলে দিয়েছে।
চারপাশটা ভালো করে জরিপ করতে গিয়ে ধন্দে পড়ে গেলাম, এটা গুহা, নাকি সুরঙ্গ? গুহা তো ঘরের মতো হয় আর এটা লম্বা হয়ে ঢুকে গিয়েছে অনেকটা ভেতরে! কতটা ভেতরে সেটা এখান থেকে নজরে পড়ছে না। অবশ্য গুহার বিষয়ে কতটুকই বা জানি আমি! সুরঙ্গই কি কখনও নিজের চোখে দেখেছি? সবটাই বইয়ে পড়া। তাছাড়া সন্তোষ যখন বলেছে এটা গুহা তখন কিছুতেই সুরঙ্গ হোতে পারে না। গুহার অর্ডার নিয়ে সুরঙ্গ সাপ্লাই দেয়ার মতো অসৎ সন্তোষ নয়। ব্যবসায়ের সাফল্য তো সততার ওপরই নির্ভর করে।
তবু বেশী দূর এগোলাম না কারণ আমি তো গুহা আবিষ্কারের উদ্দেশ্যে আসিনি, এসেছি নিরিবিলিতে কিছু কথা শুনতে আর বলতে। এবং সেটার জন্য আমাদের দুজনকে কেউ অনন্ত কাল বরাদ্দ করেনি। অপুর কম্পুটার ক্লাসের সময় সীমার মধ্যেই আমাদের কথাবার্তা শেষ করতে হবে। বড়জোর রিক্সো না পাবার অজুহাত দেখিয়ে দু-দশ মিনিট এদিক ওদিক করা যাবে। তারপর যদি দুজনে দুজনার কথা শুনে সন্তুষ্ট হই, যদি অপু মনে করে আমি নির্ভরযোগ্য তাহলে নাহয় ফের আসা যাবে। তখন নিশ্চয়ই আরেকটু বেশী সময় কাটাতে আপত্তি করবে না অপু।
সামনেই একটা পাথরের চাতাল। হাত ধরে অপুকে টেনে নিয়ে এসে বসালাম, তারপর খানিকটা ইতস্ততঃ করে নিজেও বসে পড়লাম। এরপর? কোথা থেকে শুরু করব কথা! আমার কাঁধে অপুর কাঁধ। অপুর শরীর থেকে ভেসে আসা একটা মিষ্টি গন্ধ গুহার ভেতরের বাতাসটাকে এতটাই ভারি করে তুলেছে যে ভাষা তো দুরস্থান, প্রশ্বাস নেয়ার মতো বাতাসই যেন হারিয়ে গেল! বুকের ভেতরটা এমন কেঁপে উঠল, মনে হলো যেন অজ্ঞান হয়ে যাব। নিজেকে বাঁচাতে জাপ্টে ধরলাম অপুকে। অপু বোধহয় কিছু একটা বলতে চাইছিল কিন্তু আমার ঠোঁট ততক্ষণে এতটাই চেপে বসেছে ওর ঠোঁটের ওপর যে শব্দ বেরুতে পারল না। কে জানে, ওরও শ্বাস প্রশ্বাস আচমকা বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম হলো কিনা, কেননা এরপর অপুও জাপ্টে ধরল আমাকে।
আমার ঠোঁট যখন অপুর ঠোঁটের আশ্রয় ছেড়ে আছড়ে পড়েছে ওর বুকে, অপু্ও আমার চুলের ওপরে মুখ রেখে ঘসছে,তখনই আচমকা এক ধাক্কায় ছিটকে পড়লাম।
কে ধাক্কা দিল এভাবে? তাকালাম অপুর দিকে, দেখলাম ওর দৃষ্টি আমাকে ছাড়িয়ে আরও অনেক গভীরের দিকে। দৃষ্টি অনুসরণ করে তাকাতেই দেখলাম, কে যেন গুহার শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে! আধো অন্ধকারে স্পষ্ট দেখা না গেলেও দীর্ঘ অবয়ব, ধবধবে শাদা পাগড়ি, শাদা আলখাল্লার মতোই শাদা দাড়িটুকু স্পষ্ট নজরে পড়ল। আর নজরে পড়ল মস্ত দুটো চোখ যা কিনা আধো অন্ধকারেও জ্বলজ্বল করছে।
অপু ফিসফিসিয়ে বললো, চিনতে পারছ লোকটাকে?
আবার দেখলাম। লোকটাকে চেনা চেনা লাগছে ঠিকই কিন্তু যার কথা ভাবছি সে এখানে আসবে কিভাবে! তাছাড়া লোকটা তো বেঁচেও নেই। শুনেছি, হত্যা করে নাকি লোকটাকে মাঝ সমুদ্রে ফেলে দেয়া হয়েছে। তাহলে কে হোতে পারে? কোনো বহুরূপী? নাকি লোকটা আদৌ মরেনি, সবটাই বানানো গল্প?
এবার কী করব? অপুর হাত ধরে দৌড়ে পালাব? যদিও গুহার মুখটা খানিকটা দূরে কিন্তু খুব বেশী দূরে তো নয়। লোকটা এই অবধি এসে পৌঁছনর আগেই আমরা দুজন খোলা আকাশের নীচে গিয়ে দাঁড়াতে পারব। তারপর চিৎকার করে লোক জমিয়ে লোকটাকে ধরে ফেলাটা কোন ব্যাপারই হবে না।
কিন্তু উঠে দাঁড়াতে পারলাম না। লোকটার পিঠে যদি এ.কে ফর্টি সেভেন ঝোলান থাকে? নিশানাবাজীতে এরা যতটা তুখোর তাতে উঠে দাঁড়ানো মাত্র আমরা দুজনেই ঝাঁঝড়া হয়ে যাব। তারপর কেউ কোনদিন জানতেও পারবেনা কোথায় হারিয়ে গেল দুটো ছেলে মেয়ে।
ভয়েরও যেহেতু একটা পরিসীমা থাকে তাই মাথা থেকে নামতে থাকা ঠান্ডা রক্ত ফের গরম হয়ে ফিরতে লাগল মাথায়। অপুর হাত ছাড়িয়ে গটগট করে হেঁটে গেলাম লোকটার দিকে। কোমরে হাত রেখে জিজ্ঞেস করলাম, কী ব্যাপার, আপনি এখানে!
উত্তরে হাসল লোকটা, সেই হাসি যতটা না ঠোঁটে তারচে অনেক অনেক বেশী ছড়িয়ে পড়ল চোখ বেয়ে। ঈস, এমন মায়াবী চোখ নিয়ে মানুষ যে কিভাবে এতটা নৃশংস হয়!
--প্রশ্নটা তো আমারও। তোমরা কি করছ আমার গুহায়?
আমার প্রশ্নের উত্তরে যদিও এটা পাল্টা প্রশ্ন কিন্তু তাতে চ্যালেঞ্জের সুর না থাকায় আমার সাহস আরও বেড়ে গেল।
--মোটেও এটা আপনার গুহা নয়। আপনারটার নাম ছিল তোরাবোরা। সেটাও বোমা মেরে গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে।
ফের হাসল লোকটা। স্নেহমাখা স্বরে বলল, ভুল কোর না। তোরাবোরাকে কখনও গুঁড়িয়ে দেয়া যায় না। নিজেকে বাঁচাতে মানুষ চিরকাল যে জায়গাটা বেছে নেবে সেটার নামই তোরাবোরা।
আচমকা গুলী চালিয়ে মেরে ফেলার বদলে মুখে হাসি, গলায় স্নেহমাখা সুর শুনে সাহস পেলাম। স্বর চড়িয়ে বললাম, একদম ফালতু কথা বলবেন না। আপনার কেসের সঙ্গে আমাদের কোনো মিল নেই। আপনি সারা পৃথিবীর মানুষের আশ্রয় কেড়ে নিতে চেয়েছিলেন জন্যই ইঁদুরের মতো পালিয়ে বেরিয়েছেন।
লোকটা এবার হাসি মুখে আমার সব কথা শুনলো। তারপর জিজ্ঞেস করল, এসব কে বলেছে তোমাকে?
দ্বিগুণ চিৎকার করে বললাম, কে আবার বলবে? আমি জানি। যাও, ফোটো।
লোকটা সত্যি সত্যিই যে হুকুম শুনে গুহার গভীরে রওনা দেবে সেটা ভাবতেই পারিনি। জীবনে প্রথমবার কাউকে ভয় পাওয়াতে পেরে উত্তেজনায় পিছু ধাওয়া করতে যাচ্ছিলাম। অপু এসে বাধা দিলো।
–কোথায় যাচ্ছ? মাথা খারাপ হলো নাকি তোমার! নিশ্চই লোকটার দলবল আছে ভেতরে, ওদের ডাকতে গেল। চলো পালিয়ে যাই।
বোকা মেয়েটা এখনও ভয় পাচ্ছে দেখে করুণাই হলো।
--কাউকে ডাকবে না। লোকটা বুঝে গিয়েছে এখানে সুবিধে হবে না।
তবু আমার হাতটা ছাড়ল না অপু।
--আমরা কি ওসব করতে এখানে এসেছি?
অপুর এই কথাটা অগ্রাহ্য করার মতো নয়। সত্যিই তো, জীবনের এতগুলো বছর পেরিয়ে আসার পর একটা প্রকৃত নির্জন জায়গা পেয়েছি যখন, যখন কিনা সঙ্গে আছে এক প্রিয়তম মানুষ তখন সেই মুহূর্তটাকে নষ্ট করার অধিকার কি আমার আদৌ আছে? যদি বা করি তাহলেও কি ভবিষ্যতে নিজেকে নিজে ক্ষমা করতে পারব?
কিন্তু প্রকৃত মুহূর্তকে কিভাবে ব্যবহার করতে হয়, কিভাবে স্মৃতির মণিকোঠায় চির উজ্জ্বল করে রেখে দিতে হয়, সেটা তো জানা নেই! অপু জানে? তাহলে শিখিয়ে দিক না, হাতে কলমে!
জড়িয়ে ধরলাম অপুকে। আমার বুকের ভেতরে আচমকা থরথরিয়ে কেঁপে উঠল অপু। আমি জিজ্ঞেস করলাম, আবার কী হলো!
অপু ফিসফিসিয়ে বলল, কে যেন ডাকছে!
আমি দুহাতে ওর কান চেপে ধরে বললাম, ওটা বাইরে থেকে নয়, অন্তর থেকে আসছে। আমি ডাকছি।
অপুর কান দুটো চেপে রাখলেও যেহেতু আমার কান দুটো খোলা ছিল তাই স্পষ্ট শুনলাম, এই অপু, বেরিয়ে আয় বলছি। যদি ভেতরে ঢুকি তাহলে কিন্তু আজই শেষ দিন।
কে এমন হুমকি দিচ্ছে? যদি গুহার ভেতর থেকে আসত তাহলে নাহয় ভেবে নিতাম লোকটা দূর থেকে ভয় দেখাচ্ছে কিন্তু ডাকটা তো আসছে বাইরে থেকে!
ডুকরে কেঁদে উঠল অপু।
--দাদা এসেছে। এখন কী হবে!
এই প্রশ্নটার উত্তর আমারও জানা নেই। বরং পাল্টা যে প্রশ্নটা মাথার ভেতর জেগে উঠল সেটা হলো অপুর দাদা জানল কিভাবে এই গুহার খবর! এই গুহার কি আরও একটা রাস্তা আছে? লোকটা কি সে পথ দিয়ে বেরিয়ে গিয়ে অপুর দাদাকে ডেকে এনেছে? আমরাও যদি সে পথে বেরিয়ে যাই তাহলে কেমন হয়!
আচমকাই দেখলাম সন্তোষ এসে দাঁড়িয়েছে। খড়কুটো আঁকড়ে ধরার ভঙ্গীতে আমি সন্তোষের হাত দুটো ধরে বললাম, বাঁচাও।
আমার কাঁধে চাপড় মেরে সন্তোষ বলল, ধুর, ভয় পেওনা। কিচ্ছু বলবে না তোমাদের। আমি এগ্রিমেন্ট করে নিয়েছি। উনি শুধু বোনকে নিয়ে চলে যাবেন।
আমি অবাক।
--এগ্রিমেন্ট মানে!
শিশু বোঝানোর ঢঙে সন্তোষ বলল, এগ্রিমেন্ট ছাড়া ব্যবসা করি না আমি। তোমার ব্যাপারটা ঠিক করার পর আমিই ওকে বোনের খবর দিয়েছি।
যেহেতু জীবনে প্রথমবার কারুর গায়ে হাত তুললাম তাই থাপ্পড়টায় বোধহয় একটু বেশীই জোর পড়ে গিয়েছিল। ঠোঁটের কোণ থেকে রক্ত মুছতে মুছতে সন্তোষ বলল, গায়ে হাত তোলার কিন্তু কথা ছিল না। এত রাগের কী আছে, অ্যাঁ! তুমি তো জানই আমি অর্ডার সাপ্লায়ার। তোমার জায়গার দরকার ছিল, দিয়েছি। তাও আবার কম রেটে, মাত্র পঞ্চাশ টাকায়। বোনের খবরটার জন্য দুশো টাকা কেউ যদি খরচ করতে চায় তাহলে অর্ডারটা নেব না? এটাই তো আমার রুজি রুটি, বলো!
বলার মতো কিছু খুঁজে না পেয়ে চুপ করে রইলাম। সন্তোষ অপুকে নিয়ে চলে গেল অর্ডার সাপ্লাই করতে। যাবার আগে অপু একবারও তাকাল না আমার দিকে। কিংবা কে জানে, তাকিয়ে ছিল কিনা! আমি তো মেঝের দিকেই তাকিয়ে বসেছিলাম। ভাবছিলাম, এরপর কী!
আচমকা খুকখুক কাশির শব্দে তাকালাম। দেখলাম লোকটা ফের এসে দাঁড়িয়েছে। একই ভঙ্গীতে। হাসি, তাকানো সব আগের মতো।
পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম লোকটার কাছে। আমার কাঁধে হাত রেখে লোকটা বলল, চলে এসো।


1 মন্তব্যসমূহ
তোরাবোরা পড়লাম। যথারীতি ভালো লাগল।
উত্তরমুছুন