দানপত্র (সাহেবমারি বাস্কে সম্পাদিত)
গ্রহীতাঃ শ্রীসাহেবমারি বাস্কে, পিং মুচিরাম বাস্কে, জাতি সাঁওতাল, গূঢ় অর্থে ভারতীয় সাকিন— মৌজা | সোনারিমারা, অর্থে স্বদেশ ভারতরাষ্ট্র।
দাতা : শ্রীসাহেবমারি বাস্কে, পিং মুচিরামবাস্কে, জাতি ঐ, সাকিন ঐ।
কস্য জবরদখলী স্বত্ববিশিষ্ট স্বত্বের জোতজমি বাস্তভিটা ইত্যাদি স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি আদির পরিবারিক সদর্থে সামাজিক দানপত্র মিদং কার্য্যজ্ঞাগে, পরগণা সান্তালিবসান, ভারতরাষ্ট্রভুক্ত তপশীলবর্ণিত সম্পত্তি—
আমি পূণ্য জন্মভূমি, সদর্থে মাতৃভূমি ভারতরাষ্ট্রভূক্ত সোনামিমার মৌজা নিবাসী স্বর্গীয় সাহেবমারি বাস্কে মহাশয়ের পৌত্র এবং ঐ সোনারিমারা নিবাসী স্বর্গীয় মুচিরাম বাস্কে মহাশয়ের পুত্র শ্রীসাহেবমারি বাস্কে অদ্য ভাদ্রমাসের করমপরব তিথিতে অঙ্গীকার করিতেছি যে, এই দানপত্র দলিলে বর্ণিত সমুদয় স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ঐ সোনারিমারা মৌজা নিবাসী শ্রীসাহেবমারী বাস্কের অধীনে যাইবে। আমার লোকান্তে এই তপশীলবর্ণিত ভূমি বিষয়ে যাবতীয় কার্যাবলী এই দানপত্র গ্রহীতা দ্বারা সম্পন্ন হইবে। যাবতীয় দখলীস্বত্ব যাইবে সাহেবমারি বাস্কের অনুকূলে। অদ্য হইতে এই দানপত্রে বর্ণিত ভূ-সম্পত্তি-আদির প্রতি আমার কোনও রূপ মায়া রহিল না। ইহার যাবতীয় শোক - আনন্দের ভাগ গ্রহণ করিতে তুমি, শ্রীসাহেবমারি বাস্কে, নীতিগতভাবে বাধ্য থাকবে।
হ্যাঁ, ইহা সত্য যে, এই ভূ-সম্পত্তির যাবতীয় দায়ভার অদ্য হইতে তোমাতে সমর্পিত হইল। আমি সাহেবমারি বাস্কে, তোমার পিতামহ, আমার ভয়াবহ জীবন বিষয়ে তুমি সম্পূর্ণ অবগত। এক্ষণে আমি জীবনসায়াহ্নে উপনীত, এ দেহ জরায় কবলিত, চক্ষুতে আলোর চিহ্ন লুপ্তপ্রায়। এ জীবনে আমা দ্বারা প্রার্থিত কার্যাদি সম্পন্ন হইবার সম্ভাবনা আর দেখিনা।তবুও আশাহত হই নাই। সে কারণেই এই দানপত্রের অবতারণা। আশা এই যে জীবনের অবশিষ্ট দিনগুলিতে, দানপত্র মোতাবেক তোমার কার্যাবলী আমাকে সুখী করিবে। সেরমাপুরি অর্থে স্বর্গপুরীতে গমনের পূর্বে আমার এ চক্ষুতে আলো আসিবে, এ দেহে উত্তাপ জন্মিবে, ন্যুব্জ শরীর পাইবে বৃক্ষের কাঠিন্য এবং দৈর্ঘ্য।
এই দানপত্র পাঠকের নিকট দাতা এবং গ্রহীতার পরিচয় বিষয়ে একরূপ জটিলতা সৃষ্টি হইতে পারে। | আমাদিগের জীবনে জটিলতা প্রকাশ পাইলে বহুজনের জীবনে আনন্দ আসে, সেই আনন্দ আমাদিগের শোকের কারণ হয়। সুতরাং জটিলতা দূর করিবার প্রচেষ্টাই হইবে দাতা এবং গ্রহীতার আশু কর্তব্য। নচেৎ ভবিষ্যৎ নিরাপদ নহে।
এই দানপত্র গ্রহীতা এবং দাতার জাতিগত পরিচয় সাঁওতাল, আদিবাসী। বর্ণ পাথুরে কৃষ্ণ, দাতা সাহেবমারি বাস্কের দক্ষিণহস্ত নাই। সেই কাহিনী সামান্য অন্তর বর্ণিব। তুমি, সাহেবমারি বাস্কে, এই দানপত্র গ্রহীতা, জানিবে এই মাতৃভূমি ভারতরাষ্ট্রের মৃত্তিকা হইতে তোমার জন্ম। এই দেশের আদি মানুষ তোমার পূর্বপুরুষগণ। সে কারণে এই দানপত্র সম্পাদনে আমার অধিকার। ইহা গ্রহণে তোমার আনন্দ ।
আমি সাহেবমারি বাস্কে, তোমার পিতামহ, আমার নামে তোমার নামকরণ হইয়াছে। দাতা সাহেবমারি বাস্কের নামকরণ হইয়াছিল তাহার পিতামহের নামে। এইরূপে আমরা পূর্বজীবনে দৃষ্টিপাত করি। সদর্থে তোমার আমার নাম পূর্বজীবনের কোন এক সাঁওতাল পুরুষকে মনে রাখিয়া হইয়াছে। তুমি সাহেবমারি বাস্কে, আমার পৌত্র, স্মরণ রাখিয়ো, তোমার দেহে আমাদিগের সেই অদেখা অথচ অনুভবের পুরুষ আদি সাঁওতাল পিতা সাহেবমারির রক্তধারা প্রবাহিত।
সাহেবমারি আমাদিগের আদিপুরুষ। তাঁহার পুণ্য স্মৃতিকে রক্ষা করিবার জন্য, তাঁহার পুণ্যজীবনের দ্বারা অনুপ্রাণিত হইবার জন্য এই প্রথার প্রতি অনুগত থাকিয়ো ।
এক্ষণে, আমরা সেই পূর্বজীবনে দৃষ্টিপাত করি। এই দৃষ্টিপাতে চক্ষুর উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি পাউক, জীবনের মায়াচ্ছন্নতা হউক দূরীভূত।
স্মরণ রাখিয়ো, এই সাহেবমারি বাস্কের জন্ম হইয়াছিল কোনও এক কালে এই সোনারিমারা মৌজায়। তখন তাঁহার কী নাম ছিল তাহা বিস্মৃতিতে, তবে ইহা জানি, সাহেব মারিয়া তিনি হইয়াছিলেন সাহেবমারি।
আমাদিগের এই নামকরণে বাবুমানুষ, শিক্ষিতজনেরা প্রায়শঃ অভিমান করেন। কহেন, ইহার সহিত একটি ভীষণ হত্যাকাণ্ডের স্মৃতি জড়িত। ইহা বহন করে হিংসার চিহ্ন। এই নামকরণ একপ্রকার বর্বরতাকে প্রশ্রয় দেয়। ইহা আমাদিগের জীবন সরল হইবার অন্তরায়। তাঁহারা কহেন, সাঁওতাল জাতি অতীব সরল, ইহাদের হৃদয় ঝর্নার ন্যায় স্বচ্ছ। এই নামকরণ ঐ স্বচ্ছ জলাশয়ে পঙ্কের ন্যায়। এই নামকরণে সাঁওতাল জাতি তাহাদিগের সারল্য হারায়।
হে পৌত্র, ইহজীবনের অভিজ্ঞতা বলে, বাবুমানুষ, দিকু-মহাজন কথিত ঐ সরলতা আমাদিগের জীবনের অন্ধকার। ঐ সরলতা যাবতীয় অধিকারচ্যুত হইবার একপ্রকার সূত্র। সুতরাং বাবুদিগের অভিমানে আমাদিগের বিচলিত হইবার কোনও কারণ নাই। জীবনের অধিকার বুঝিয়া পড়িয়া না লওয়া যদি সরলতা হয়, আইস, সেই সরলতা মুক্ত হইয়া আমরা আদিমানুষ সাহেবমারি বাস্কের জীবন স্মরণ করি।
ইহা সত্য যে, দিকু বাঙালী মহাজন ঈশ্বরবাবুর গৃহে সেই সাঁওতাল পুরুষ বাঁধা মুনিষ হইয়া জীবন অতিবাহিত করিতেন। তাঁহার কঠোর জীবনের কথা কী কহিব? ঈশ্বরবাবুর নিকট ঋণের দায়ে ভাত-কাপড়ের বিনিময়ে নিজেকে বিক্রয় করিতে বাধ্য হইয়াছিলেন তিনি। ঈশ্বরবাবু এক অর্থে আমাদিগের সেই পূর্বপুরুষ সাঁওতাল পিতার ঈশ্বর-ই হইয়াছিলেন।
তৎকালে এ দেশ আরো অরণ্যময়। এই অরণ্যের ভিতর ঈশ্বরবাবুই বুদ্ধিমান, সুতরাং রাজা ! তখন ভারতভূমি ইংলন্ডীয় সাহেবদিগের অধীনে। সদর শহরে থাকিতেন এক সাহেব বেনিয়া। তিনি একদা কার্যোপলক্ষে এদেশে আগমন করেন। আতিথ্য লন মহাজন ঈশ্বরবাবুর গৃহে। বাবু মহাজন ধন্য হইলেন। বোঝা গেল, ঈশ্বরও তাঁহা অপেক্ষা শক্তিমান কাহাকেও ঈশ্বর জ্ঞানে ভজনা করেন। তিনি একমেব অদ্বিতীয়ম নহেন। অদ্বিতীয় হইয়াছিলেন | আমাদিগের সেই পূর্বপুরুষ।
হে পৌত্র, মহাজন ঈশ্বরবাবু খাল কাটিয়া কুম্ভীর আনয়ন করিলেন। তাঁহার ষোড়শ বর্ষীয়া সুন্দরী কন্যার প্রতি সাহেবের বিলাইতি চক্ষু মায়াময় হইল। সাহেব প্রস্তাব করিলেন গোপনে ঈশ্বরবাবুর সেই কন্যাকে। ঈশ্বরবাবুর কন্যা সাহেবের বিলাইতি ভাষা বুঝিতে পারিলেন না, তবে ইঙ্গিত বুঝিলেন। তিনি ভয়তরাশে পিতাকে সব অবগত করাইলেন। ঈশ্বরবাবু তাঁহার ঈশ্বরের রূপ-প্রকৃতি বিষয়ে সচেতন ছিলেন। চিন্তিত হইলেন। তিনি সাহেবকে যুক্ত করে সাঁওতাল যুবতী সেলামি দিবার কথা কহিলেন। সাহেবের চতুর মন, সমুদয় উপলব্ধি করিল। তাঁহার মুখ ভার হইল। বেনিয়াযর চক্ষু পুলিশ মিলিটারির চক্ষু হইল কোন অজান্তে।
ইহাতেই সমাপ্তি ভাবিয়া ঈশ্বরবাবু লোভনীয় সাঁওতাল বাগদি ডোম রমনীর খোঁজ করিলেন। সেই রাত্রে রমণী কন্ঠের তীক্ষ্ণ চিৎকারে আমাদিগের সেই পূর্বপুরুষের ঘুম ভাঙিলো। দিবসে অরণ্যে কাষ্ঠ সংগ্রহ করিয়া, গো চারণ করিয়া, সন্ধ্যায় তিনি অবসাদগ্রস্ত হইয়াছিলেন। তখন কুয়া পার্শ্বে সেই ধবলবর্ণ দিকু সাহেব মহাজন ঈশ্বরবাবুর উপাস্য দেবতা শ্রীকৃষ্ণ হইয়াছেন। আকর্ষণ করিয়াছেন বালিকার বস্ত্র। বিপদাপন্ন হইয়াছে ঈশ্বরবাবুর সুন্দরী কন্যা। | গর্জিয়া উঠিলেন সাঁওতাল পুরুষ। এক যষ্টির আঘাতে সাহেবের প্রাণপাখি সমুদ্র পার হইয়া গেল। আমাদিগের পূর্ব-পুরুষ সাহেবমারি হইলেন।
ইহার ফলাফল হইল বিষম। ঘটনা উল্টাইয়া গেল। যা ঘটিয়াছিল, তাহা কেহ জানিল না, দেশবাসী সাহেবের কীর্তিগাথায় মুগ্ধ হইল। সাহেবের মর্মরমূর্তি স্থাপিত হইল সদর শহরে। তাহা এখনো বিদ্যমান, আমি দেখিয়াছি, তুমি দেখিয়াছ। কী করিয়া ইহা হইল, সে কথায় পরে আসিতেছি।
এই দানপত্রে বর্ণিত জমিজমার ইতিহাস শ্রবণ করা তোমার আশু কর্তব্য। জমির দেহ, জমির প্রকৃতি, রূপ ইত্যাদি বুঝিলে যেমন ফসল উৎপাদন প্রভূত হয়, তেমনি জমির পূর্বকথা জানিলে উহাতে অধিকার রক্ষার পথ প্রশস্ত হয়। জমির ইতিহাস হাত-বদলের কাহিনী। মালিকানা বদলের গল্প। সঠিক মালিকানা শূন্য হইবার ইতিহাস। কিরূপে কিরূপে সম্পত্তিআদি হাতবদল হইয়াছে তাহা না বর্ণিলে শুধুমাত্র তপশীল বর্ণনা নথিপত্রের সহিত মিলিবেনা । সরকারী নথিপত্র জমির হিসাব সংরক্ষণ করে। তাহা অতি ভয়ঙ্কর বস্তু।
এই দানপত্র তপশীলে সোনারিমারা মৌজার সমুদয় বাস্তুভিটা ও ধান্য জমি দাগ নম্বরসহ বর্ণিত হইয়াছে। এই ধান্য জমি আউয়াল শ্রেণীর। যদিচ ইহা অরণ্যময় অঞ্চল, তথাপি এই সমস্ত আউয়াল জমি বহুকালের কর্ষণে উৎকৃষ্ট হইয়াছে। ইহাতে ফসল ফলাইয়া মাটিকে সম্মানিত করিয়াছেন আমাদিগের পূর্বপুরুষগণ। এই ভূমির রহস্য আমাদিগের পূর্বপুরুষে অবগত হইয়াছিলেন, সে কারণে মনোনিবেশ করিয়াছিলেন ইহাতেই। আমাদিগের দ্বারা মাটি সম্মানিত হইবার পর, ইহার দিকে চক্ষু নিবন্ধ করিলেন বাবুমানুষেরা। ভূমি হাতবদল হইল। বদল হইল সরকারী নথিপত্র। আমাদিগের সারল্যে বাবুগণ লাভবান হইলেন।
হে পৌত্র, যেহেতু এই দানপত্র তপশীল আপাতচক্ষে গরমিলে পরিপূর্ণ, সে কারণে বারংবার ভূমির হাতবদলের সূত্র উল্লেখ করিলে সমস্ত বিষয়টি স্বচ্ছ হইয়া উঠিবে। দানপত্র মোতাবেক কার্য সম্পাদনে তোমার | সুবিধা হইবে। তুমি জান, সোনারিমারা মৌজার প্রান্তে শালমহুয়া কুসুমের ঘন অরণ্য। এই অরণ্যের গভীরে এক ঝর্ণার পার্শ্বে এক বিঘার একটি জমি বহুকাল ধরিয়া আমরা চাষ করিতাম। আমার পিতা উহাতে চাষ করিতেন। পিতামহ, পিতৃপিতামহ ঐ জমিতে শ্রম করিয়াছেন, বিনিময়ে ফসল উঠিয়াছে গৃহে। আমরা মাটিকে চিনি, নথিপত্র সহিত পরিচিত নহি। নথিপত্র ফসল উৎপাদন করে না ইহাই জানিতাম। হে পৌত্র, সে জানা সঠিক ছিল না নিশ্চিত, অন্তত পরবর্তী ঘটনাক্রম তাহাই কহে।
জানিলাম উহা সরকারে বর্তানো খাস জমি। একদিন দেখিলাম, বাবু চৈতন্য মহাকুড় মহাশয়ের মুনিষ ঐ জমিতে। কারণ জানিতে চাহিলাম, জানিলাম, ঐ জমি বাবু জোতদার মহাশয়ের অনুকূলে সরকারী পাট্টা বন্দোবস্ত হইয়াছে। শুনিলাম, ঐ জমি একদা চৈতন্যবাবুর নিকট হইতে সরকারে বর্তায় অতিরিক্ত জমি হিসাবে (আইন মোতাবেক জমির সিলিং -এর অতিরিক্ত)।
সরকার চৈতন্যবাবুর নিকট হইতে একদা ঐ জমি গ্রহণ করে, বিনিময়ে চৈতন্য মহাকুড় পান ক্ষতিপূরণ।
ক্ষতিপূরণ পাইবার পর ঐ জমি আবার চৈতন্য মহাকুড় মহাশয়ের নিকট পাট্টা বন্দোবস্ত মোতবেক ফিরিয়া আসে। চৈতন্যবাবু তাঁহার মুনিষের নামে পাট্টা বন্দোবস্ত করিয়াছেন। মুনিষ জানে, ইহা তাহার নামিত বাবুর জমি। ইহাতে তাদের অধিকার নাই।
নথিপত্রের এত কথা জানিতাম না। বহুকাল ঐ জমি আমাদিগের দ্বারা কর্ষণ হয়। কবে চৈতন্য মহাকুড়ের হইল, কবে উহা সরকারে বর্তাইল, কখন তাহার জন্য মোটা অঙ্কের টাকা ক্ষতিপূরণ পাইলেন চৈতন্যবাবু এসব আমাদিগের অজ্ঞাত। সবই নথিপত্র দ্বারা সম্ভব হইয়াছে। সম্ভব হইয়াছে ইহার পাট্টা বন্দোবস্ত
হে পৌত্র, আমি রুখিয়া দাঁড়াইলাম। কহিলাম, এই মাটি আমাদিগের পিতৃপুরুষের। সরকারী কর্মচারী হাসিলেন, কহিলেন, মিথ্যা কহিয়ো না, ইহা তো চৈতন্যবাবুর জমি ছিল একদা, তা হইতেই সরকারী খাস হইয়াছিল।
বুঝিলাম, ইহা নথিপত্রের খেলা। চৈতন্য মহাকুড় মহাশয় ইহকালে এই ভূমিতে পা রাখেন নাই। তথাপি ইহার দ্বারা সরকারের নিকট হইতে ক্ষতিপূরণ আদায় করেন, আবার পাট্টা বন্দোবস্ত করিতেও তাঁহার অসুবিধা হয় না।
কহিলাম, নথিপত্র বুঝি না, এই মাটি আমাদিগের।
চক্ষুর সম্মুখে বাবু চৈতন্য মহাকুড় নীলবর্ণের পাট্টা বন্দোবস্ত কাগজটি দুলাইতে লাগিলেন। দেশীয় আইনরক্ষকদের আগমন ঘটিল এই অরণ্যে।
হে পৌত্র, নথিপত্র মানুষের জীবন অপেক্ষা মূল্যবান, তাহা সে নথি সত্য মিথ্যা যাহাই বহন করুক না কেন! পিতৃপুরুষের মাটিতে রক্তপাত হইল। আমার দক্ষিণহস্ত বন্দুকের গুলিতে ঝাঁঝরা হইয়া গেল।
অবশেষে সরকারী আইনের জয় হইল। চৈতন্য মহাকুড় জমিতে দখল পাইলেন। জমি দখলের হাঙ্গামায় পুলিশের গুলিতে নিহত হইল হাড়িরাম বাগদি, সে আমার হইয়া মাটিতে দৃপ্ত বক্ষে দাঁড়াইয়াছিল। আইন এবং নথিপত্রকে যথাযোগ্য সম্মান প্রদর্শন করিবার জন্য এই রকম হত্যাতে আইনরক্ষকগণ নির্দোষ। বিচারক তাহাই কহিলেন। ভূমির সম্মান রক্ষা করিবার নিমিত্ত আমি আমার দক্ষিণ হস্তটি বিসর্জন দিতে বাধ্য হইলাম, হাড়িরাম বাগদি তাহার প্রাণ উৎসর্গ করিল।
এখন সেই নথিপত্র ফসল তুলিতেছে বাবু চৈতন্য মহাকুড় -এর গৃহে। একদা এই সোনারিমারা মৌজা, তপশীল বর্ণিত দাগগুলি, এই দানপত্রদাতা ও তাহার স্বজন-পরিজন বন্ধুবান্ধব সকলের দখলীভূক্ত ছিল। বহুকাল পূর্বের নথিপত্র সন্ধান করিলে আমার বর্ণনাই সত্য বলিয়া প্রতিভাত হইবে।
ইহার পর নথিপত্র স্বয়ং বদল হইয়াছে। এই বদল অতিশয় আশ্চর্যজনক। নথিপত্রকে তাই কখনো জীবন্ত প্রাণী বলিয়া মনে হয়। মনে হয় উহা বহুরূপী-গিরগিটি সদৃশ। সময়ে সময়ে রূপ-রঙ বদল করিয়াছে। একদা যে প্রাণীর বাস ছিল সবুজ অরণ্যে, তাহা কোন অলক্ষ্যে পা বাড়াইয়াছে এক ধূসর মৃত বৃক্ষের দিকে। আশ্রয় করিয়াছে সেই বৃক্ষকে। তাহার পর রঙ বদল করিয়াছে। মনে হয়, প্রাণীটি হয়ত রঙ বদল করিয়া সেই বৃক্ষে দেহ রাখিয়াছে।
ফলশ্রুতি, সেই মানুষটির কথা স্মরণ করি। সদর শহরের বাঙালী যুবক। দৃপ্ত উজ্জ্বল চক্ষু পুরুষ। আমাদিগের দরদীও বটে। নৈশ স্কুলে আমি তাঁহার হাতে অক্ষরজ্ঞান লাভ করি। তিনি ছিলেন বিদ্যাদাতা, আমি হইলাম গ্রহীতা। সেই স্মৃতি আজও ভুলিবার নয়। আমার সম্মুখে মানুষের পৃথিবী জগতের রহস্য উন্মোচন করিয়া তিনি স্মরণীয় হইলেন। জানিলাম পৃথিবীর জন্মকাহিনী, সম্পদের ইতিহাস, ভিন্নদেশের আলো-হাওয়া মেঘ অরণ্যের কথা।
সেই দেবেন্দ্রনাথ একদা কহিলেন, এইসব কৃষ্ণ মানুষ ইহারাই পৃথিবীর আদি, তোমরা জান না, তোমাদের জন্ম হইয়াছিল মৃত্তিকা হইতে। অন্তরে বিস্ময়বোধ জাগ্রত হইল। তিনি কহিলেন, যেমন আমাদিগের দেবতা শিবশম্ভু উঠেন মৃত্তিকা গর্ভ হইতে, কালো পাথর তাঁহার দেহ, তেমনি তোমরা উঠিয়াছ মৃত্তিকা ভেদ করিয়া, আমাদিগের দেবতা শিবশম্ভুর কল্পনা হয়ত আদিবাসী মানব হইতে। মৃত্তিকায় তোমাদিগের আজন্ম অধিকার।
হে পৌত্র, হিন্দুদিগের দেবতা শিবশম্ভুর কথা জানি। জানি তাঁহার প্রলয়ঙ্কর চরিত্রের কথা। দেবেন্দ্রনাথ সেই মহাদেবতার সহিত আমাদিগের তুলনা করিলেন। পুনঃপুনঃ কহিলেন, মৃত্তিকায় আমাদিগের আজন্ম অধিকার। তিনি প্রশ্ন করিলেন, এই ভূমি একলা তোমাদিগের ছিল?
আমি তাঁহকে সমর্থন করিলাম।
দেবেন্দ্রনাথ প্রশ্ন করিলেন, হাত বদল হইল কী করিয়া ?
হে পৌত্র, হাতবদলের সূত্র তো অজানা নয়। সেই সূত্রের একটিকে ছিন্ন করিয়াছেন দেবেন্দ্রনাথ। আমি শিক্ষার আলো পাইয়াছি। কিন্তু অন্য সূত্রগুলি? জন্মাবধি তো সকলে ভূমিশূন্য গৃহশূন্য। পিতৃপিতামহও তাই। অথচ ইহা আশ্চর্যের যে এক একটি জমি এক এক মানুষের, জাতি নামে চিহ্নিত, যাহারা এখন দুঃসহ জীবন ভোগ করিতে করিতে ক্রমে জগতের প্রতি বীতশ্রদ্ধ।
তুমি অবগত যে সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট দশ বিঘার লপ্তটি নিমে সাঁওতালের জমি নামে পরিচিত। কে এই নিমে সাঁওতাল! তাহা জানা নাই। আমাদিগের পূর্বপুরুষ কেহ হইবে। ঐ জমি এখন উৎকল ব্রাহ্মণদের হেফাজতে। উহার পার্শ্ববর্তী তিরিশ বিঘার টুকরো টুকরো লপ্তগুলি সাঁতালি সোত নামে চিহ্নিত। এখন উহা সাঁওতালিদেগের নহে। এমনি বাগদির মাঠ, ডোমের মাঠ, মাহালিশোল, ধারোপায় জোড়া কত জমি! সোনারিমারায় সব জমিই এক এক নামে চিহ্নিত।
দেবেন্দ্রনাথ কহিলেন, এইসব জমির নামের সহিত তাহার আসল মালিকানার চিহ্ন জড়িয়ে। দুই শত বৎসরেও গোটা ভারতভূমির নাম যেমন ইংলন্ড হয় নাই, তেমনি অক্ষত রহিয়াছে বাগদির মাঠ, মাহালিশোল, সাঁতালি সোত।
সকলে নিশ্চুপ। বাগদি, বাউরি, ডোম, সাঁওতাল সকলের চক্ষুতে বিস্ময়। অশীতিপর বৃদ্ধ হরি ডোম চীৎকার করিয়া কহিল, হ্যাঁ সত্যই বটে, ডোমের মাঠ আমাদিগের ছিল, পিতার নিকট তাহা শুনিয়াছি।
সন্ধ্যার পর কয়েক প্রহর পার হইয়াছে। সব নিঃঝুম। অদূর বনভূমিতে বোধ হয় সেই কথার প্রতিধ্বনি, উঠিল। আমি শুনিলাম, অরণ্য কহিতেছে, এই সব ভূমি সত্যই উহাদের, আমরা তো বহুপ্রাচীন, সাক্ষী রহিয়াছি! বিষণ্ণ হইলাম, এই অরণ্যের ভাষা নাই, এই সব সুপ্রাচীন বৃক্ষের আমাদিগের সপক্ষে আইন আদালতে গিয়া সাক্ষ্য দিবে না।
আর আইন আদালত বড় বিষম ক্ষেত্র। মিথ্যা মামলা মোকদ্দমায় সত্য সাক্ষ্য দ্বারা যখন জীবন রক্ষা করিতে চেষ্টা করিয়াছি, উকিলের জেরায় সেই সাক্ষী মিথ্যাকে সত্য প্রতিপন্ন করিয়া ঐ ভয়ঙ্কর স্থান হইতে পলায়ন করিয়া বাঁচিয়াছে। আদালতের রায়ে যখন বিবাদী দরিদ্র মানুষটির শাস্তি হইয়াছে, তখন সেই ভীত দরিদ্র সাক্ষীটি গ্রামে ফিরিয়া ক্রন্দন করিয়াছে। বারংবার কহিয়াছে, ঐ হেন বিচিত্ররূপ স্থানে গিয়া জিহ্বা আড়ষ্ট হইয়া যায়। উকিল বাবুর সমুখে মস্তিষ্কের যন্ত্রণা শুরু হয়। ভয়ে রক্তচাপ বৃদ্ধি পায়।
সুতরাং যদি কেহ সত্যই দর্শন করিয়া থাকে, তাহাতে কোন লাভ দেখি না। সেই সুপ্রাচীন মানুষ একপ্রকার ভাষাহীন বৃক্ষ।
দেবেন্দ্রনাথ সন্ধান করিতে লাগিলেন, গমন করিলেন জিলা সদরে। তাহার পর একদিন পরম উল্লাসে ছুটিয়া আসিলেন সোনারিমারায়। তাঁহার সহিত কত কাগজপত্র। নানান তথ্য তাঁহার মনে উল্লাস জাগাইয়াছে। কহিলাম, কোথায় গিয়াছিলেন?
তিনি কহিলেন, সদর শহরে, মহাফেজখানায়।
হরি ডোম কহিল, মহাফেজখানায় পুরাতন সরকারী নথিপত্র রক্ষিত থাকে। গোটা জিলার ভূমির ইতিহাস তথায় পাওয়া সম্ভব।
অতঃপর দেবেন্দ্রনাথের নিকট মহাফেজখানার ইতিবৃত্ত শুনিলাম। তথায় ধূলির ভিতরে লুক্কায়িত আছে আমাদিগের জমির ইতিহাস। সমস্ত পুরাতন নথিপত্র। সরকারী বিজ্ঞপ্তি ইত্যাদি।
লাখন মুর্ম কহিল, তথায় ইন্দুর নাই?
লাখন মুর্মু জমিতে জমিতে ইঁদুরের সন্ধান করিয়া ফেরে। উহার ভূমি নাই, বস্তু নাই। বৎসর ভর ইদুর ভক্ষণ করিয়া তাহার দেহে কী প্রকারে যেন চর্ম রোগ দেখা দিয়াছে।
লাখন মুর্মু কহিল, যে ইন্দুর বাবুদিগের জমির ফসল ভক্ষণ করে, তাহার স্বাদ জানি। যে ইদুর মৃত্তিকার ইতিহাস ভক্ষণ করে তাহার স্বাদ কী প্রকার জানিতে ইচ্ছা হয়।
আমরা জানিলাম, দেবেন্দ্রনাথ মহাফেজখানার ধূলি মাখিয়াছেন, পাঠ করিয়াছেন বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন, আরো কত আইন। নকল করিয়াছেন ডিস্ট্রিক্ট সেটেলমেন্ট, পার্মানেন্ট সেটেলমেন্ট ইত্যাদির নথিপত্র।
তিনি প্রশ্ন করিলেন, হাত বদলের সূত্র কী?
রাবন সোরেন কহিল, ক্ষুধা।
আমি সমর্থন করিলাম। হ্যাঁ, ক্ষুধাই হইবে। দরিদ্র মানুষের দেহে অপরিসীম ক্ষুধা।
শিক্ষিত জন কহে, উহারা স্ত্রীপুত্র বেচিয়া খায়। পারিলে পৃথিবীকে উহারা হাঁ-মুখ গহ্বরে প্রবেশ করাইবে। দেবেন্দ্রনাথ কহিলেন, যত জমি রহিয়াছে সোনারিমারায় তাহার সমুদয় যদি তোমাদিগের হয়, বাঁচিবে ? । হ্যাঁ, বাঁচা সম্ভব হইবে। আমাদিগের একমাত্র চাহিদা জীবন রক্ষা।
দেবেন্দ্রনাথ কহিলেন, যে কালে এই ভূমি তোমাদিগের ছিল, সেই কালে মানুষও অনেক কম ছিল, তথাপি ক্ষুণ্ণিবৃত্তির দায়ে ভূমি হাত বদল হইল?
সকলে নিশ্চুপ হইয়া গেল। সেইকালে কি একটি মানুষ বিশটি মানুষের খাদ্য গ্রহণ করিয়া বাঁচিয়া থাকিত! দেবেন্দ্রনাথ ছুটিলেন জিলা সদরে। আবেদন করিলেন মহামান্য বিচারপতি নিকট। নথিপত্রে দেখা যাইতেছে। এই ভূমি অন্য মানুষের। তাহারা এখন ভূমিশূন্য, অবহেলিত। ভূমি তাহাদের হাত হইতে অন্যের নিকট কীভাবে গেল সেই সূত্রও নথিপত্র উল্লেখ নাই। নথিপত্র স্বচ্ছ নহে। সুতরাং আইনকে সম্মানিত করিবার জন্য যাহাদের ভূমি তাহাদের ফেরত দেওয়া হউক। যাহার মাটি তাহার কাছে গিয়া আহ্লাদী হউক।
হে পৌত্র, যে বহুরূপী গিরগিটি ধূসর বৃক্ষকে আশ্রয় করিয়া রঙ বদল করিয়াছে, অতঃপর তাহাতে দেহ রাখিয়া জীর্ণ মলিন হইয়াছে, তাহাকে সবুজ অরণ্যে ফিরাইয়া রঙ বদলের কি অমানুষিক চেষ্টাই না দেবেন্দ্রনাথ করিলেন। সর্বক্ষণ এই আশা করিতে লাগিলেন যে, নথিপত্রে আমাদিগের মালিকানা দখলীস্বত্ব পুনর্লিখিত হইবে।।
হায়! সেই সুন্দর আদালতগৃহ মৃত গিরগিটির কটু গন্ধে পরিপূর্ণ হইয়া গেল। নথিপত্র জীৰ্ণ হইয়া উড়িয়া ঝরিয়া পড়িতে লাগিল। এইরূপে সময় গেল। বিচারক মহাশয় উঠিলেন, গোপনকক্ষে আহার বিশ্রাম সারিলেন আবার ফিরিলেন। উকিলবাবুর পোষাক নথিপত্রের ধূলিতে বিবর্ণ হইল। বাকবিতণ্ডা চরমে উঠিল। বিচারক জনে জনে পরামর্শ করিলেন। বারংবার যুক্তির বিপক্ষে যুক্তি খাড়া করিলেন। মাথার রগ চাপিয়া ধরিলেন। কিছুতেই আপন সিদ্ধান্তে নিবিষ্ট হইতে পারিতেছিলেন না। অবশেষে তিনি ভাবিলেন, জগতে এইরকমই হয়।
বহুরূপীর রঙ এইভাবে আর বদল হইবার নহে। বিধ্বস্ত দেবেন্দ্রনাথ সোনারিমারায় ফিরিলেন না। মহাজন বাবুগণ তাঁহার উপর যেইরূপ, আমাদিগের উপর তদ্রুপ ক্ষিপ্ত হইলেন। ফলাফল শুভ নহে। কেন না এক্ষণে জানিয়াছি যে, আমরা মৃত্তিকাজাত। মৃত্তিকা ভেদ করিয়া নিকষ কালো পাথরের ন্যায় আমরা উঠিয়া আসিয়াছি। মৃত্তিকায় আমাদের দখল ও স্বত্ব প্রাকৃতিক নিয়ম। আদালত হইতে ফিরিয়া আমরা হৃত ভূসম্পত্তির উপর দখল দাবী করিলাম। সোনারিমারা অশান্ত হইল। ভূমি দখল হইল। আবার দেশীয় আইনরক্ষকের দ্বারা সেই দখল হইতে আমরা উৎখাত হইলাম। প্রায়শঃ ইহা ঘটিতে লাগিল। রক্তপাত হইতে লাগিল মৃত্তিকার দেহে। বুঝিলাম, এ পৃথিবী হইল যুদ্ধের।
হে পৌত্র, দেবেন্দ্রনাথ অতীব শিক্ষিত মানবদরদী ব্যক্তি। কিন্তু তিনি হয়ত অবগত ছিলেন না প্রাকৃতিক নিয়মগুলি, যাহা এই দুঃসহ জীবনে আমরা অবগত হইয়াছি। তাহা একান্তই মেঘ অরণ্যের নিয়ম। অরণ্যে না জন্মিলে অরণ্যের ভাষা জানিবে কী করিয়া? মাটি কখন মেঘের গন্ধ চায়, একথা কে জানে?
যে প্রাণীটি মৃত তাহাকে ঐ পদ্ধতিতে আর জীবিত করা সম্ভব নহে। আইন এবং নথিপত্রও তো সেই বিষ যাহা উহার রং বদলের কারণ। যে বিষে মৃত্যু সেই বিষে প্রাণ সঞ্চার সম্ভব হইতে পারে, কেননা বিষে বিষে বিষক্ষয়, ইহা জানিতেন দেবেন্দ্রনাথ। কিন্তু বিষক্ষয়ের পর আবার ঐ বিষ প্রয়োগে মৃত্যু হইতে পারে। এই সহজ প্রাকৃতিক সত্যটি ভুলিবার নয়।
যে নথিপত্র রঙ বদল করিয়াছে, তাহা এই মোকদ্দমায় আবার বদল হইলেও সেই বদল যে চিরদিনের, এ বিশ্বাস কোথায়? উহা যে আবার আইন মোতাবেক দিকু মহাজনের নিকট আত্মগোপন করিত না, একথা কে কহিতে পারে ?
দেবেন্দ্রনাথ শ্রদ্ধেয়। তিনি সত্য সন্ধান করিয়াছিলেন। ইহা প্রমাণিত যে, তাঁহার মত সূত্র সন্ধান করিলে দেখা যাইবে, সমস্ত পৃথিবীর মাটি যাহাদের এখন নাই, তাহাদের। মাটির গভীরে অনুসন্ধান করিলে দেখা যাইবে, আমাদিগের ন্যায় মানুষের নাম সর্বত্র প্রোথিত আছে। সাঁতালি সোত, ডোমের মাঠের ন্যায় গোটা পৃথিবী নিশ্চিত নিঃস্বের ভূমি।
এই সত্য মহাফেজখানার ধূলিতে লুক্কায়িত রহিয়াছে। তোমাকে ইহা অবগত করাইয়া আমি নিঃস্ব হইলাম। জানিয়া রাখ, সাহেবকে মারিয়া আমাদিগের পূর্বপুরুষ কুখ্যাত হইয়াছিলেন বাবুগণের নিকট, দূরান্তের মানুষের নিকট। মোকদ্দমায় ইহা প্রকাশ পাইল যে, সেই সাঁওতাল পুরুষ ঈশ্বরবাবুর কন্যার উপর অত্যাচার করিতে যায়, সাহেব তাহা প্রতিবোধের কারণে নিহত হন। সরকারী সাক্ষী হইলেন ঈশ্বরবাবু। তাঁহার কন্যাও রক্ষা পাইল, তিনিও সরকার বাহাদুরের দ্বারা সম্মানিত হইলেন। সেই ধবলবর্ণ সাহেবের মূর্ত্তি স্থাপিত হইল সদর শহরে। আমাদিগের পরিবারে সাহেবমারি নামকরণ তাই বাবুগণের নিকট বর্বরতার নিদর্শন।
হে পৌত্র, যতবার সদরে গিয়াছি, ঐ মূর্ত্তি চোখে পড়িয়াছে। যাহা সত্য তাহাকে পদলুণ্ঠিত করিয়া ঐ সাহেব মূর্ত্তি এদেশে বর্তমান। যাহা পুরাতন সত্য তাহাই ইতিহাস। সেই ইতিহাসকে মহাফেজখানায় রাখিয়া মিথ্যা কাহিনী প্রচলিত হইয়াছে এদেশে। আমাদিগের শৌর্যের কথা, সততার কথা মানুষের নিকট প্রকাশিত হয় নাই। ভুল ইতিহাস আমাদিগে বর্বর, চোয়াড় আখ্যা দেয়। সেই ইতিহাসকে অগ্রাহ্য করিয়া সাহেবমারির আসল ইতিহাস এক্ষণে বর্ণিত হইল।
জানিয়ো, সাহেবকে মারিয়া আমাদিগের সেই পূর্বপুরুষ কারাগারে নিক্ষিপ্ত হইয়াছিলেন। সাহেবমারি বাস্কের জন্ম হইয়াছিল কারাগারে। সেই কাল হইতে এই পরিবারে, এই সোনারিমারা মৌজায় সাহেবমারির জন্ম হইতেছে। জন্ম হইতেছে কারাগারে।
কারাগারে জন্মের দরুণ এই পৃথিবীর বর্ণ গন্ধ সাহেবমারি উপলব্ধি করিতে পারেন না। কতবার চেষ্টা হইয়াছে কারাগার ভাঙ্গিবার। জন্মের পর দারিদ্র, অসম্মান এই পৃথিবীটিকে আমার নিকট আমার পিতামহ সাহেবমারির নিকট কারাগার করিয়া তোলে।
আমি সাহেবমারি বাস্কে, এই দানপত্র দাতা, বহুবার চেষ্টা করিয়াছি এই কারাগার ভাঙ্গিবার। সফল হই নাই। সেকারণে জগতের আলো হাওয়া আমাদিগের দেহের কাছাকাছি নাই। অথচ উহা অপ্রতুল নহে। ইহা স্পষ্ট। কারাগারের গরাদ ধরিয়া সেই আদি পুরুষ সাহেবমারি বাস্কে আকাশ দেখিবার চেষ্টা করিতেন। ভাবিতেন ফসলের কথা। মৃত্তিকার ধর্মরক্ষার কথা। সম্মান বাঁচাইবার কথা। এই ভাবেই সকল সাহেবমারির জীবন অতিবাহিত হইয়াছে। তুমি সহেবমারির বাস্কে, এই দানপত্র গ্রহীতা, দুই হস্ত প্রসারিত করিয়ো। জীবনের অভিজ্ঞতা বলে গরাদ অতি ভঙ্গুর জীব।
এই দানপত্র সম্পাদনের প্রথা দিকু মহাজন বড়মানুষদিগের। তাঁহারা বিভিন্ন কৌশলে সম্পদ অর্জন করেন। আমরা নিঃস্ব হই। সম্পদ অর্জনই তাঁহাদের কৃতী হইবার পরিমাপ। অতঃপর এই সম্পদকে রক্ষা করিবার বাসনায়, আমাদিগকে বঞ্চিত করিবার দায়ে আস্থাভাজন কোনও এক ব্যক্তিকে দানপত্র সম্পাদন করেন। দিকু বড়মানুষে দানপত্র সম্পাদন করেন এই আশায় যে, যেভাবে তাঁহার জীবন কাটিয়াছে, অসংখ্য মানুষের সম্পদ যেভাবে তিনি নিজগৃহে মজুত করিয়াছেন, সেই প্রথা বজায় রাখুক তাঁহার মনোনীত উত্তরাধিকারী।
আমার ঐরূপ আকাংখা নাই। যে জীবন অতিবাহিত করিয়া গেলাম, তাহা অন্য মানুষের নিকট যেন উপস্থিত না হয়। কেহ যেন আমাদ্বারা দর্শিত ভয়াবহ পৃথিবীর সম্মুখীন না হয়। সে কারণে এই দানপত্রের অবতারণা।
হে পৌত্র, অদ্য পবিত্র করম পরব। আকাশ পৃথিবী মেঘ ও ফসলের ভারে নত হইয়াছে। এই দিবসেই পুরাণ কথার কর্মু যাত্রা করিয়াছিল করম দেবতার নিকট। সেই যাত্রাপথে ভয়ঙ্কর বিঘ্ন। দুর্দম অগ্নি, বিষধর সর্প, কুম্ভীর, সমুদ্র, নদী, পাহাড়। কর্মু ইহাদের সাহায্য লইয়া পৌঁছিল করম ঠাকুরের নিকট। উদ্ধার করিল হৃত সম্পদ। যে সমস্ত দুর্দম শক্তি বন্ধু হইতে পারে, তাহাদিগকে বন্ধু করিয়ো। ইহা করম পরবের কথা। তাহা হইলে এই দানপত্র সত্য হইবে।
স্মরণ রাখিয়ো, বাবু মানুষের দানপত্র দ্বারা কেহ কেহ বঞ্চিত (আমাদিগের বঞ্চনার কথা আর কহিনা), কেহ লয় লাভবান। ঐ দানপত্রের সহিত জড়িত থাকে অবিশ্বাস এবং ভয়। সেকারণে ঐ দানপত্র কোবলাটি সিন্দুকে রক্ষিত হইয়া জীর্ণ হইতে থাকে।
সাহেবমারি বাস্কে জানিয়া রাখো, এই দানপত্র সরকারি নথিপত্র এবং বাবু মানুষের কোবলার ন্যায় রক্ষিত হইবে না মহাফেজখানায় বা লৌহসিন্দুকে। ইহাতে নাই অবিশ্বাস। এতকাল কাটাইয়া ভয়েরও কিছু দেখিনা। সেকারণে ইহা জীর্ণ হইবে না। মহাফেজখানার ইন্দুরের খাদ্য হইবে না।
আশা এই যে, সাহেবমারি বাস্কে কৃত দানপত্রের অক্ষর চিরদিনের জন্য জগতের আলোয় বাতাসে বর্ণে গন্ধে মেঘে ফসলে লিখিত হইবে। জন্মিবার পর চক্ষু উন্মীলনের মুহূর্তে মানুষ পৃথিবীর দিকে দৃষ্টিপাত করিলে ইহার অক্ষর, অক্ষরে অক্ষরে মিলিয়া যে ভাষা, তাহা বুঝিতে পারিবে। বুঝিবে ইহার গ্রহীতা হইল সাহেবমারি, যে সাহেবমারির নিকট বাবু-মানুষের পৃথিবী হইল কারাগার। বুঝিবে সেই কারাগার ভাঙিতে পারিলে মৃত্তিকাজাত মানুষের নিকট মৃত্তিকাময় পৃথিবী ফিরিবে। জানিবে, এই দানপত্রে লিখিত রহিয়াছে সাহেবমারির জন্মকথা, যে জন্ম জীবনের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের দায়ে রক্তপাত হেতু।
জীবনের প্রান্তে আসিয়া আমি বৃদ্ধ সাহেবমারি বাস্কে এই দানপত্র সম্পাদন করিতেছি। আকাংখা এই যে, আলোয় মৃত্তিকায় দৃষ্টিপাত করিয়া এই দানপত্রে উল্লেখিত ভূমি গ্রহণের নিমিত্ত সকলে হইয়া উঠিবে সাহেবমারি।
এতদর্থে সাক্ষীগণের সাক্ষতে লিখিত পড়িত করতঃ সুস্থ শরীরে স্বেচ্ছাপূর্বক সরল অন্তঃকরণে, অন্যের বিনা প্ররোচনায়, পবিত্র করম পরব দিবসে, অত্র সামাজিক দানপত্র সম্পাদন করিলাম।
ইসাদী
(মেঘ অরণ্যময় পৃথিবী ও জন্মদাত্রী মৃত্তিকা)
ভবদীয়
সাহেবমারি বাস্কে সাকিন সোনারিমারা ভারত রাষ্ট্র।
(১৯৮০)
-----------
লেখক পরিচিতি: অমর মিত্র-এর জন্ম ৩০ আগস্ট, ১৯৫১) একজন ভারতীয় বাঙালি লেখক। বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলেন। কর্মজীবন কাটে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের এক দপ্তরে। তিনি ২০০৬ সালে ধ্রুবপুত্র উপন্যাসের জন্য সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পেয়েছেন। অশ্বচরিত উপন্যাসের জন্য ২০০১ সালে বঙ্কিম পুরস্কার, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের উচ্চ শিক্ষা দপ্তর থেকে। এ ব্যতীত ২০০৪ সালে শরৎ পুরস্কার ( ভাগলপুর ), ১৯৯৮ সালে সর্ব ভারতীয় কথা পুরস্কার স্বদেশযাত্রা গল্পের জন্য। ২০১০ সালে গজেন্দ্রকুমার মিত্র পুরস্কার পান। ২০১৭ সালে সমস্ত জীবনের সাহিত্য রচনার জন্য যুগশঙ্খ পুরস্কার, ২০১৮ সালে কলকাতার শরৎ সমিতি প্রদত্ত রৌপ্য পদক এবং গতি পত্রিকার সম্মাননা পেয়েছেন। ২০২২ এ ছোটগল্পের জন্য পেয়েছেন ও’হেনরি পুরস্কার। তাঁর গল্প, ‘দ্য ওল্ড ম্যান অফ কুসুমপুর’ তাঁকে এই পুরস্কার এনে দিয়েছে। গল্পটির বাংলা শিরোনাম ‘গাঁওবুড়ো’। বাংলায় লেখা গল্পটির ইংরেজি অনুবাদ করেছেন সাংবাদিক অনীশ গুপ্ত। গল্প, উপন্যাস, ইত্যাদি মিলিয়ে তাঁর অসংখ্যা গ্রন্থ রয়েছে।

1 মন্তব্যসমূহ
আবারও পড়লাম ।বারবার পড়ার মতোই ।
উত্তরমুছুন