মার্গারেট মিচেলের ধারাবাহিক উপন্যাসঃ যে দিন ভেসে গেছে




 অনুবাদ: উৎপল দাশগুপ্ত

পর্ব- ৩৭

প্রিল মাসের এক ঝোড়ো, বৃষ্টিভেজা রাতে টোনি ফোনটেন জোনসবোরো থেকে ঘোড়া ছুটিয়ে এল, ক্লান্তিতে ওর ঘোড়ার মুখ থেকে ফেনা ঝরছে, মৃতপ্রায় অবস্থা। কড়া নাড়ার শব্দ শুনে স্কারলেট আর ফ্র্যাঙ্কের ঘুম ভেঙ্গে গেল। অজানা আতঙ্কে ওঁদের দম বন্ধ হয়ে আসার জোগাড়। গত চার মাসে, এই নিয়ে দ্বিতীয়বার স্কারলেট পুনর্গঠনের বাস্তব রূপটা সম্যক উপলব্ধি করল। উইল যে বলেছিল, “এই তো সবে আমাদের সমস্যার শুরু!” সেই কথাটার সঠিক অর্থ ভাল মত বুঝতে পারল। টারার ফলের বাগানে, ঝড়বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে হিমশীতল কণ্ঠে অ্যাশলে বলেছিল, “এখন আমরা যে পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি, সেটা যুদ্ধের থেকেও ভয়ানক – বন্দিদশার চেয়েও খারাপ – মৃত্যুর চেয়েও ভয়ঙ্কর!” – খুব সত্যি কথাই বলেছিল।

পুনর্গঠনের ভয়াবহতার প্রথম পরিচয় স্কারলেট পেয়েছিল যখন ও জানতে পারল যে ইয়াঙ্কিদের সহায়তায় জোনাস উইল্কারসন ওকে টারা থেকে উৎখাত করে দিতে পারে। টোনির আকস্মিক আগমন সেই ভয়াবহতায় নতুন একটা মাত্রা যোগ করল। এল যখন, নিকষ কালো অন্ধকার, বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে, আর কয়েক মিনিটের মধ্যেই সেই অন্ধকারে চিরতরে হারিয়ে গেল। অথচ সেই অল্প কয়েক মুহূর্তের কথাবার্তাই স্কারলেটের চোখের সামনে আতঙ্কের নতুন একটা পর্দা উন্মোচিত করে দিয়ে গেল। এই পর্দা আর কখনোই টেনে বন্ধ করা যাবে না, হতাশ মনে স্কারলেট ভাবল।

সেই ঝোড়ো রাতে যখন মরিয়া ধাক্কায় দরজা প্রায় ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম, স্কারলেট তখন সিঁড়ির ধাপে দাঁড়িয়ে। গাউনটা হাতের মুঠোয় ধরে নিচের হলঘরের দিকে তাকাতেই এক ঝলক টোনির কালচে বিষণ্ণ মুখটা দেখতে পেল। ঠিক তখনই টোনি ফ্র্যাঙ্কের হাতে ধরা মোমবাতিটা ফুঁ দিয়ে নিবিয়ে দিল। স্কারলেট অন্ধকারের মধ্যেই দৌড়ে নিচে নেমে টোনির ঠাণ্ডা স্যাঁতস্যাঁতে হাতটা চেপে ধরল। ওকে চাপা গলায় বলতে শুনল। “ওরা আমার পিছু নিয়েছে – টেক্সাস চলে যাচ্ছি – আমার ঘোড়াটা বাঁচবে না – খিদেতে আমার পেট জ্বলছে। অ্যাশলে বলছিল আপনি নাকি – না, না, মোমবাতিটা জ্বালিও না! ডার্কিদের ঘুম থেকে তুলো না –আপনাদেরও কোনো ঝামেলায় ফেলতে চাই না – যদি সেটা সম্ভব হয়।”

রান্নাঘরের খড়খড়িগুলো নামিয়ে দেওয়ার পর আর সব কটা পর্দা টেনে দেওয়ার পর ও একটা মোমবাতি জ্বালাতে দিল। ছোট ছোট প্রায় অসংলগ্ন বাক্যে ফ্র্যাঙ্ককে পরিস্থিতিটা দ্রুত বোঝাতে লাগল। স্কারলেট তাড়া করে ওর জন্য যা হয় কিছু খাবারের জোগাড়ে লেগে গেল।

গায়ের ওপর ওভারকোট নেই, ওর ত্বক অবধি জলে সপসপ করছে। মাথায় টুপিও নেই, ভিজে কালো চুল মাথার ওপর চেপে বসেছে। কিন্তু ফোনটেন ভাইয়েদের আমুদে মেজাজটা বহাল তবিয়তেই আছে। শরীর হিম করে দেবার মত আমুদে মেজাজ, ওকে হুইস্কির গ্লাস ধরিয়ে দিতে দিতে স্কারলেটের মনে হল। কী ভাগ্য যে আন্ট পিটির ওপর তলায় নাক ডাকিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছেন। এই ছায়ামূর্তি দেখলেই উনি নির্ঘাত ভিরমি খেতেন।

“বেজন্মা – একটা স্ক্যালাওয়াগ – কমিয়ে ফেলেছি,” আরও একটু পানীয়র জন্য গ্লাসটা বাড়িয়ে দিয়ে টোনি বলল। “জোরসে ঘোড়া ভাগিয়ে এলাম, শিগগির এখান থেকে বেরোতে না পারলে, পিতৃদত্ত প্রাণটা যাবে। আমার কোনও আক্ষেপ নেই। যা করেছি, বেশ করেছি! টেক্সাসে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি, কিছুদিন ওখানেই গা ঢাকা দিয়ে থাকতে হবে। জোনসবোরোতে অ্যাশলে সঙ্গে ছিল আমার, ও-ই আপনাদের কাছে আসতে বলল। অন্য একটা ঘোড়া দরকার আমার, ফ্র্যাঙ্ক, আর কিছু টাকা। আমার ঘোড়াটা তো আধমরা হয়েই গেছে – এতটা রাস্তা ঊর্ধ্বশ্বাসে ছোটা – আর কী বোকার মতই না আমি কোট না পরেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছিলাম – আর পকেটে এক কানাকড়িও না নিয়ে। ঘরভর্তি টাকা যে আছে, তাও অবশ্য নয়।”

বুভুক্ষুর মত জুড়িয়ে ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া ভুট্টার রুটি আর জমে কাঠ হয়ে যাওয়া মাখন লাগানো শালগমের পাতা চিবোতে চিবোতে একটু হাসল।

“আমার ঘোড়াটা নিয়ে যেতে পার,” খুব শান্ত গলায় ফ্র্যাঙ্ক বললেন। “আমার কাছে এখন কেবল দশ ডলার আছে, তবে সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা কর যদি – ”

“উরিব্বাস, অপেক্ষা করার প্রশ্নই নেই!” কথাটা জোর দিয়ে বললেও, টোনির মুখটা হাসি হাসিই রইল। “কে জানে, ওরা হয়ত আমার বেশি পেছনে নেই। হাতে খানিক সময় নিয়ে তো আর পালাবার সুযোগ পাইনি! অ্যাশলে যদি আমাকে টানতে টানতে বাইরে এনে আমার ঘোড়ার ওপর বসিয়ে না দিত, আমি বোকার মত ওখানেই রয়ে যেতাম, হয়ত এতক্ষণে ফাঁসির দড়িতেই ঝুলে পড়তে হত। চমৎকার ছোকরা – এই অ্যাশলেটা!”

তাহলে অ্যাশলেও জড়িয়ে আছে এই ভয়ঙ্কর ঘটনায়, স্কারলেটের রক্ত হিম হয়ে গেল। ঘাবড়ে গিয়ে হাতটা গলার কাছে উঠে এল। ইয়াঙ্কিরা কি এতক্ষণে অ্যাশলেকে ধরে ফেলেছে? ফ্র্যাঙ্ক এটা ঘটনাটা নিয়ে কোনো প্রশ্ন করছেন না কেন? এতটা শান্ত হয়েই বা আছেন কী করে – যেন সাধারণ কোনো ঘটনা? কী জিগ্যেস করা যায় – স্কারলেট মনে মনে হাতড়াতে লাগল।

“কী – ” ও বলতে গেল। “কে – ”

“তোমার বাপির আগেকার ওভারসিয়ার – ওই শয়তানটা – জোনাস উইল্কারসন।”

“তুমি কি – ও কি মরে গেছে?”

“আমাকে তুমি কী মনে কর, স্কারলেট ও’হারা!” টোনি বিরক্ত মুখে বলল। “কারোকে খতম করে দেবার ইচ্ছে হলে তাকে ছুরির ভোঁতা দিকে দিয়ে থেঁতলে আমি সুখ পাব বলে মনে হয় না। তোমার কী মনে হয়? এই বুকে হাত রেখে বলছি, কেটে ওকে টুকরো টুকরো করে দিয়েছি!”

“ভাল করেছ,” হালকা চালে ফ্র্যাঙ্ক বললেন। “লোকটাকে কোনোদিনই আমি পছন্দ করিনি।”

স্কারলেট ওঁর মুখের দিকে তাকাল। এঁকে তো ঠিক মিনমিনে ফ্র্যাঙ্ক বলে হচ্ছে না, কথায় কথায় ঘাবড়ে গিয়ে যিনে নিজের দাঁড়ি ধরে টানাটানি করেন, চোখ রাঙিয়ে যাঁকে দিয়ে সহজেই কার্যসিদ্ধি করা যায় বলেই জানে! ধীর স্থির একটা ভাব যে জরুরি একটা পরিস্থিতির করছেন অযথা বাগাড়ম্বর না করেই। উনি একজন পুরুষমানুষ, টোনিও একজন পুরুষমানুষ, আর বর্তমান হিংস্র পরিস্থিতির মোকাবেলা দুজন পুরুষমানুষ মিলে করছেন, আর এখানে নারীর কোনও ভূমিকা নেই।

“আর অ্যাশলে – ও কি – ”

“না। তবে খুনটা ওরই করবার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু আমি বললাম, তা হয় না, অধিকারটা আমাকেই বর্তায়, কারণ স্যালি আমারই ভাইয়ের বউ। শেষমেশ কথাটা মেনে নিল। জোনসবোরো যাবার সময় আমার সঙ্গ নিল, পাছে উইল্কারসন আগেই আমার ওপর চড়াও হয়ে যায়। তবে অ্যাশকে এই ব্যাপারে জড়াতে পারবে বলে মনে হয় না। আশা করব যেন না পারে। ভুট্টার এই রুটিটার জন্য একটু জ্যাম হবে? আর সঙ্গে নেবার জন্য অল্প কিছু খাবার বেঁধে দিতে পারবে?”

“দেখ, সব কথা খুলে না বললে আমি কিন্তু চেঁচিয়ে পাড়া মাথায় করব!”

“আগে আমাকে পালাতে তো দাও, তারপর যত খুশি পাড়া মাথায় কোরো, যদি করতেই হয়। ঠিক আছে, ফ্র্যাঙ্ক ঘোড়া জুততে জুততে যেটুকু বলা যায় বলছি। ওই শয়তানের বাচ্চা – উইল্কারসনটা ইতিমধ্যেই অনেক রকম ঘোঁট পাকিয়েছে। খাজনা নিয়ে তোমাকে কী ভাবে কোনঠাসা করে ফেলেছিল, সে তো তোমার জানাই। এটা তো ওর অনেক বদমাইশির একটা। সব থেকে খারাপ ব্যাপারটা হল, ও সর্বক্ষণ ডার্কিদের উসকে দিতে থাকত। আদপেই ভাবিনি যে ডার্কিদের ঘেন্নার চোখে দেখার দিনও আমাকে দেখতে হবে! আর ওই কালো কালো মূর্খগুলো, শয়তানগুলো যা বলছে সব অন্ধের মত বিশ্বাস করে ফেলছে, আমরা ওদের জন্য কী কী করেছি, সব ভুলে বসে আছে! এখন আবার ইয়াঙ্কিরা বলছে ডার্কিদের নাকি ভোট দেবার অধিকারও দেওয়া হবে। অথচ আমাদের ভোট দিতে দেওয়া হবে না! মুষ্টিমেয় কিছু ডেমোক্র্যাট আছে এই কাউন্টিতে, যাদের ভোট দেবার অধিকার কাড়া হয়নি আর কনফেডারেট বাহিনীর পক্ষে যারা লড়াই করেছিল তাদের ভোট দেবার অধিকার নিষিদ্ধ করে দিয়েছে। আর একবার যদি নিগ্রোরা ভোট দিতে পারে, তাহলে আমাদের ভবিষ্যৎ একেবারে অন্ধকার। নিপাত যাক ওরা! রাজ্যটা আমাদেরই, ওই শয়তান ইয়াঙ্কিগুলোর নয়! ঈশ্বরের নামে দিব্বি কেটে বলছি, স্কারলেট, এসব সহ্য করা যাবে না! হবেও না সহ্য করা! কিছু একটা আমরা করবই, যদি তার অর্থ এই হয় যে আরও একটা লড়াই হবে, তবে তাই সই! কিছুদিনের মধ্যেই নিগার বিচারকরা আমাদের বিচার করবে, নিগার আইনকর্তারা আমাদের জন্য আইন বানাবে – জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসা কালো কালো কিছু উল্লুক – ”

“তাড়াতাড়ি করে – বল না আমায়! তুমি কী করলে?”

“বেঁধে ফেলার আগে ওই ওই ভুট্টার রুটির আরেকটা টুকরো আমাকে দিও তো। যাই হোক, একটা কথা হাওয়ায় ভাসছিল যে নিগারদের সমানাধিকার নিয়ে উইল্কারসন নাকি একটু বাড়াবাড়ি করতে আরম্ভ করেছিল। সময় নেই, অসময় নেই, একটানা ওদের মাথা খেতে লাগল। কী সাহস ওর জান – ” বলতে গিয়ে টোনি হোঁচট খেল, “বলে কিনা সাদা চামড়ার মেয়েদেরও – ওদের – নিগারদের – বিয়ে করবার অধিকার আছে!”

“কি যা তা বলছ, টোনি – না, এটা হতে পারে না!”

“সত্যি বলছি – বিশ্বাস কর! কেমন কেমন লাগছে যেন তোমাকে – লাগারই কথা – কিন্তু খবরটা তুমি আগে শোনোনি – এটা হতেই পারে না! এই খোদ অ্যাটলান্টাতেই কথাটা ওদের মধ্যে চাউর করছে।”

“আ – আমি জানতামই না।”

“বুঝেছি, ফ্র্যাঙ্ক কথাটা তোমার কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছিলেন। সে যাই হোক, আমরা সবাই মিলে ঠিক করলাম যে মিস্টার উইল্কারসনের কাছে রাতের বেলা আলাদা করে গিয়ে একটু কড়কে দিতে হবে, কিন্তু সেসব করে ওঠার আগেই – ইউস্টিসকে তোমার মনে আছে – ওই বেয়াড়া নিগ্রোটা –আমাদের ফোরম্যান ছিল?”

“হ্যাঁ।”

“রান্নাঘরে এসে হঠাৎ হাজির হল – স্যালি ডিনারের জোগাড় করছিল – জানি না ও স্যালিকে কী বলেছিল। কখনো জানতে পারব বলে মনে হয় না। তবে কিছু একটা তো বলেই ছিল আর আমি স্যালির চিৎকার শুনে রান্নাঘরে দৌড়ে গেলাম – শুয়োরের বাচ্চাটা ওখানেই দাঁড়িয়ে – মদে দূর হয়ে – কিছু মনে কোরো না, স্কারলেট – মুখ ফস্কে গালিটা বেরিয়ে গেল।”

“বলতে থাক।”

“সোজা গুলি চালিয়ে দিলাম ওর ওপর। স্যালিকে সামলানোর জন্য মা ছুটে এল। ঘোড়া চেপে জোন্সবোরোর দিকে ছুটলাম, উইল্কারসনকে খুঁজতে। ও-ই হল এসবের নাটের গুরু। ও না খোঁচালে ওই বোকা নিগারটার এরকম কিছু করার কথা মাথাতেও আসত না। টারার পাশ দিয়ে যাবার সময় অ্যাশলের সঙ্গে দেখা হল, আমার সঙ্গ নিল ও। বলল কাজটা ওকেই করতে দিতে – টারা নিয়ে যা ঘোঁট পাকিয়েছিল শয়তানটা। আমি বললাম, না, কারণ স্যালি আমার ভাইয়ের বউ, আর ঘটনাটা ঘটেছে আমারই বাড়িতে। সারা রাস্তা ও আমার সঙ্গে তর্ক করতে করতে চলল। শহরে যখন পৌঁছলাম, বললে তোমার বিশ্বাস হবে না স্কারলেট, পিস্তলটাও সঙ্গে আনা হয়নি। আস্তাবলেই ফেলে এসেছি। মাথাটা এত গরম হয়ে গেছিল, ওটার কথা আমার মনেই – ”

টোনি কথা বলা থামিয়ে কড়কড়ে রুটিটা চিবোতে লাগল। স্কারলেটের গায়ে কাঁটা দিল। ফোনটেনদের চণ্ডাল রাগের কথা কাউন্টির সকলেই বহুদিন থেকেই জানে – বর্তমান অস্থির সময় আরম্ভ হবার অনেক আগে থেকেই।

“তো আমাকে চাকু বাগিয়েই ওর কাছে যেতে হল। শুঁড়িখানায় স্ফূর্তি করছিল। ঘরের এক কোণে ওকে টেনে নিয়ে গেলাম, বাকি লোকগুলোকে অ্যাশলে আটকে রাখল। চাকু চালানোর আগে ওকে বললাম, কেন এই কাজ করতে আমি বাধ্য হলাম। তারপর চাকু চালাতেই সব শেষ, আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই,” দৃশ্যটা কল্পনা করতে করতে টোনি বলল। “একটু সুস্থির হয়ে প্রথমেই যেটা খেয়াল করলাম, অ্যাশলে আমাকে ঘোড়ার পিঠে চড়িয়ে দিয়েছে আর তোমাদের কাছে আসতে বলল আমাকে। খুবই ভাল ছেলে এই অ্যাশলে। বিপদের মুখে মাথা ঠাণ্ডা রাখতে পারে।”

ফ্র্যাঙ্ক এসে পড়লেন, বাহুতে ওঁর ওভারকোটটা ধরা, টোনিকে এগিয়ে দিলেন। এটাই ফ্র্যাঙ্কের একমাত্র ভারি ওভারকোট। সেটা জেনেও স্কারলেট কোনো প্রতিবাদ করল না। এসব ব্যাপারে মাথা গলানোটা উচিত হবে না বলেই মনে হল, পুরোটাই তো পুরুষদের নিজেদের মধ্যেক্যার ব্যাপার।

“কিন্তু টোনি – বাড়িতে তোমাকে ওঁদের দরকার পড়তে পারে। যদি তুমি ফিরে গিয়ে একটু বুঝিয়ে বল – ”

আপনি একজন আহম্মককে বিয়ে করে ফেলেছেন, ফ্র্যাঙ্ক,” কোটটা গায়ে গলাতে গলাতে টোনি হেসে বলল। “ও ভাবছে মেয়েদের গায় হাত দিতে বাধা দিলে, ইয়াঙ্কিরা আমাকে মাথায় তুলে নাচবে। নাচবেই তো, খাপ পঞ্চায়েত বসিয়ে দড়িতে ঝুলিয়ে দিয়ে। একটা চুমু খেতে দাও আমাকে, স্কারলেট। ফ্র্যাঙ্ক কিছু মনে করবেন না, তাছাড়া তোমার সঙ্গে আবার দেখা নাও হতে পারে। টেক্সাস অনেক দূর। চিঠি লেখাটা ঝুঁকি হয়ে যাবে, তাই বাড়ির লোক অন্তত এটুকু জানুক, এ পর্যন্ত আমি নিরাপদেই ছিলাম।”

টোনিকে ও চুমু খেতে দিল, তারপর ভদ্রলোক দুজন বৃষ্টির মধ্যেই বাইরে গিয়ে দাঁড়ালেন, পেছনের উঠোনে দাঁড়িয়ে নিজেদের মধ্যে কথা বলতে লাগলেন। একটু পরে হঠাৎ ঘোড়ার খুরের ছপছপ শব্দ ওর কানে এল, টোনি চলে গেল। দরজা অল্প ফাঁক করে স্কারলেট দেখতে পেল ফ্র্যাঙ্ক একটা হাঁপাতে থাকা, হোঁচট খেতে খেতে চলা ঘোড়া টেনে আস্তাবলের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন। দরজা বন্ধ করে ও বসে পড়ল। ওর হাঁটু কাঁপছে।

পুনর্গঠন বলতে ঠিক কী বোঝায় সেটা এখন ও বুঝে ফেলেছে। ঠিক যেন বাড়িটা চারপাশ থেকে নগ্ন শ্বাপদেরা ঘিরে ফেলেছে, গুঁড়ি মেরে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য তৈরি। চারধারে এত আলোচনা চলে – ভদ্রলোকরা নিজেদের মধ্যে যেমন করে থাকেন, হয়ত ও যখন এসে পড়ল তখন অর্ধেক আলোচনা সারা হয়েই গেছে, মনোযোগ দিয়ে শোনার দরকারই বোধ করেনি – কত ছোট ছোট ঘটনা ঘটেছে, ও গ্রাহ্যই করেনি – সেই সব আলোচনা, সেই সব ঘটনা হঠাৎ ওর মনে ভিড় করে আসতে লাগল। কেবল মাত্র বৃদ্ধ আঙ্কল পিটারের ভরসায় ওর মিলে যাওয়া নিয়ে ফ্র্যাঙ্কের দুর্বল প্রতিবাদ ও গায়েই মাখেনি। এখন দুইয়ে দুইয়ে চার করতে গিয়ে যে ছবিটা ভেসে উঠছে সেটা রীতমত ভয়ঙ্কর।

এখন নিগ্রোরাই সব কিছুর মাথায়, আর ইয়াঙ্কিরা বেয়নেট নিয়ে ওদের পেছনে দাঁড়িয়ে। ওরা ওকে খুন করে ফেলতে পারে, ধর্ষণও করতে পারে, কিন্তু তারপরেও ওদের পার পেয়ে যাবার সম্ভাবনাই বেশি। প্রতিহিংসার বশে কেউ যদি কিছু করে ফেলে, ইয়াঙ্কিরা তাকে ফাঁসির দড়িতে লটকে দেবে, আদালতের সামনে নিরপেক্ষভাবে বিচারের সুযোগ না দিয়েই ফাঁসি দিয়ে দেবে। ইয়াঙ্কি অফিসাররা – আইন সম্বন্ধে যাদের বিন্দুমাত্র জ্ঞান নেই, কিংবা কোন পরিস্থিতিতে অপরাধটা ঘটেছে সেটা নিয়েও কোনও পরোয়া নেই, বিচারের একটা প্রহসন করে ফাঁসির দড়ি দক্ষিণের সেই আসামির গলায় লটকে দেবে।

কী করতে পারি আমরা?” অসহায় আতঙ্কে হাত কচলাতে কচলাতে ও ভেবে চলল। “টোনির মত ভাল একটা ছেলেকে – স্রেফ মহিলাদের সম্মান বাঁচাতে গিয়ে একটা পাঁড় মাতাল আর একটা শয়তান স্ক্যালাওয়াগকে খুন করার জন্য – ওই শয়তানগুলো ওর ফাঁসি দিয়ে দেবে! েই শয়তানদের শায়েস্তা করার জন্য কোন রাস্তা খোলা আছে আমাদের?

“এসব আর সহ্য করা হবে না!” টোনি চেঁচিয়ে উঠেছিল – ভুল তো কিছু বলেনি। এসব সহ্য করা যায় না। কিন্তু সহ্য করা ছাড়া কী আর উপায় আছে, এতটাই যখন অসহায় ওরা? স্কারলেট কাঁপতে লাগল। জীবনে প্রথমবার, নিজেকে সরিয়ে রেখে মানুষ আর ঘটনাপরম্পরা নিয়ে চিন্তা করতে লাগল। উপলব্ধি করল যে স্কারলেট ও’হারার ভয় পাওয়া বা অসহায় বোধ করাটাই সব নয়। ওর মত হাজার হাজার মহিলা আছেন, সমস্ত দক্ষিণ জুড়ে, তাঁরাও একই রকম ভীত, অসহায়। আর সেইসব পুরুষমানুষরা, যাঁরা একদিন অ্যাপোম্যাটক্সে অস্ত্র সমর্পণ করেছিলেন, তাঁরাই আজ নারীদের সম্মান রক্ষার্থে আবার হাতে অস্ত্র তুলে নেবার জন্য প্রস্তুত, মুহূর্তের উদ্দীপনায় আত্মবলিদানের জন্য প্রস্তুত।

টোনির হাবভাবে এমন একটা কিছু ছিল যেটা ও ফ্র্যাঙ্কের মুখেও দেখতে পেয়েছিল। সম্প্রতি অ্যাটলান্টার অনেক মানুষের মুখেই একই রকম অভিব্যক্তি দেখতে পাচ্ছে কিন্তু কারণটা নিয়ে মাথা ঘামায়নি। আত্মসমর্পণের পর লড়াইয়ের ময়দান থেকে ঘরে ফেরা মানুষের মুখে যেরকম একটা অবসন্ন অসহায় ভাব দেখা যেত, এটা তার থেকে একেবারে আলাদা। ওইসব মানুষের মধ্যে ঘরে ফেরার তাড়া ছাড়া আর কোনও আবেগ ছিল না। কিন্তু এখন আবার নতুন করে ওরা সজাগ হয়ে উঠছে, আলসেমি ঝেড়ে ফেলে হারিয়ে ফেলা আবেগটা ভেতরে ভেতরে আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে। অনাসক্তি কাটিয়ে উঠে নির্মম শীতল তিক্ততায় জ্বলতে শুরু করেছে। আর ঠিক টোনির মতই ওরাও ভাবছে, “এসব সহ্য করা হবে না!”

স্কারলেট দেখেছে, লড়াই বাঁধবার আগে, দক্ষিণের মানুষরা মৃদুভাষী হতেন, কিন্তু লড়াইয়ের শেষের দিকে, যখন পরিস্থিতি হতাশাময় মোড় নিচ্ছে, তখন থেকে ওঁরা হয়ে উঠলেন বিপজ্জনক, বেপরোয়া এবং অনমনীয়। অথচ অল্প কিছু আগেই, দুজন মানুষ মোমবাতির আলোয় পরস্পরের দিকে তাকিয়েছিলেন, সেই চাওয়াতে অভাবনীয় কিছু ছিল। সেই চাউনিতে আশার আলো দেখতে পেলেও, স্কারলেট মনে মনে আতঙ্কিত হয়েও পড়ল। ওঁদের চাউনিতে যে আক্রোশ আছে, তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না, আর ছিল যে কোনো পরিস্থিতিতেই পিছু না হঠে আসার দৃঢ় সংকল্প।

এই প্রথম স্কারলেট ওর চারপাশের মানুষদের সঙ্গে নৈকট্য বোধ করল। ওঁদের ভীতি, ওঁদের মনোবেদনা, ওঁদের দৃঢ় সংকল্পের সঙ্গে একাত্ম বোধ করল। না, এসব কিছুতেই সহ্য করা হবে না! বড় সুন্দর জায়গা এই দক্ষিণাঞ্চল, বিনা যুদ্ধে একে কিছুতেই হাতছাড়া হতে দেওয়া যাবে না। কিছুতেই ইয়াঙ্কিদের দ্বারা পদদলিত হতে দেওয়া যাবে না, দক্ষিণের মানুষদের যারা মানুষ বলেই মনে করে না আর পায়ের তলায় পিষে ফেলতে চায়। বড় প্রিয় এই মাতৃভূমি, মূর্খ, কাণ্ডজ্ঞানহীন নিগ্রোদের স্বাধীন করে দেওয়ার নামে ওদের হাতে সঁপে দেওয়া যাবে না।

টোনির অতর্কিত আগমন এবং দ্রুত প্রস্থানের কথা ভাবতে ভাবতে স্কারলেটের নিজেকেও ওর সগোত্র বলে মনে হতে লাগল। পুরনো একটা ঘটনা মনে পড়ে গেল – কীভাবে ওর বাপি রাতের অন্ধকারে আয়ার্ল্যান্ড ছেড়ে পালিয়েছিলেন, একটা খুন করে ধরা পড়বার হাত থেকে বাঁচতে, যেটা কিনা ওঁর বা ওঁর পরিবারের কারোর কাছেই খুন বলে মনে হয়নি। ওর শরীরেও জেরাল্ডের সেই রক্ত বইছে, প্রতিহিংসাপরায়ণ রক্ত। সেই লুঠেরা ইয়াঙ্কিটাকে গুলি করে মেরে ফেলে কী রকম প্রতিহিংসার আনন্দ পেয়েছিল, সেই কথা মনে পড়ল। ওদের সবার মধ্যেই প্রতিহিংসার আগুন ধিকিধিকি জ্বলছে, আপাত সৌজন্যের আড়ালে, সামান্য উসকানি পেলেই ফেটে বেরোবে। প্রত্যেকটা মানুষই – স্কারলেট যাঁদের চেনে জানে, এমনকি স্বপ্নময় জগতে মগ্ন থাকা অ্যাশলে আর ভীরু স্বভাবের ফ্র্যাঙ্কও – এঁদের মধ্যেও সেই আগুন জ্বলছে – প্রয়োজনে হিংস্র হয়ে উঠবে, খুন করতেও হাত কাঁপবে না। এমনকি ওই রেট, বিবেক বলে যাঁর মধ্যে বস্তুই নেই, তিনিও ‘একজন মহিলার সঙ্গে বেয়াদবি করার জন্য’ একটা নিগ্রোকে খুন করেছেন।

বৃষ্টিতে ভিজে সর্বাঙ্গ থেকে জল ঝরছে, থেকে থেকে কেশ উঠছেন – ফ্র্যাঙ্ক যখন ভেতরে এলেন, স্কারলেট উঠে দাঁড়াল।

“আচ্ছা, ফ্র্যাঙ্ক, এরকম কতদিন চলবে?”

“ইয়াঙ্কিরা যতদিন আমাদের ঘৃণা করবে, সোনা।”

“কেউ কি কিছুই করতে পারবে না?”

ক্লান্ত হাতটা ফ্র্যাঙ্ক ভিজে দাড়ির ওপর বোলালেন। “চেষ্টা তো আমরা করছি।”

“কী বললে?”

“যতদিন না কিছু করে দেখাতে পারছি ততদিন ও সব কথা নিয়ে আলোচনা করে কি লাভ? তার জন্য বছরের পর বছর লেগে যেতে পারে – কেবলতে পারে – দক্ষিণ হয়ত চিরটা কাল এমনটাই থেকে যাবে।”

“না, না, সেটা হতে দেওয়া যায় না!”

“চল, সোনা, শুয়ে পড়ি। তোমার নিশ্চয়ই ঠাণ্ডা লাগছে। এত কাঁপছ তুমি।”

“কবে শেষ হবে এই সব?”

“আবার যেদিন আমরা সকলে ভোট দিতে পারব, সোনা। যাঁরা যাঁরা দক্ষিণকে বাঁচানোর জন্য লড়াই করেছিলেন, তাঁরা যখন ভোটের বাক্সে একজন দক্ষিণের মানুষ এবং ডেমোক্র্যাটের পক্ষে ব্যালট কাগজ জমা দিতে পারব।”

“ব্যালট কাগজ?” হতাশ গলায় স্কারলেট বলে উঠল। “ব্যালট কাগজ দিয়ে কী ভালটা হবে – ডার্কিদের মাথাটাই যখন খারাপ হয়ে গেছে – ওই ইয়াঙ্কিরাই তো আমাদের বিরুদ্ধে ওদের কানে বিষ ঢেলে দিচ্ছে?”

ফ্র্যাঙ্ক তাঁর নিজস্ব শান্ত ভঙ্গিমায় ওকে বোঝাতে লাগলেন, কিন্তু ব্যালট কাগজ দিয়েই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে এই ধারণাটা ওর কাছে এতই জটিল বলে মনে হল যে ওর মাথায় কিছুই ঢুকল না। জোনাস উইল্কারসন যে আর টারাকে জ্বালাতন করতে আসবে না, এই কথাটাই কৃতজ্ঞচিত্তে বার বার স্মরণ করতে লাগল। টোনির কথাও মনের মধ্যে ঘুরপাক খেতে লাগল।

“ফোনটেনদের ভাগ্যটা সত্যিই খুব খারাপ!” মন খারাপ করে স্কারলেট বলল। “মিমোজ়াকে সামলানোর জন্য একমাত্র অ্যালেক্স ছাড়া আর কেউ রইল না। কেন যে কাজটা রাতের অন্ধকারে করার কথা টোনির মাথায় এল না – কেউ জানতেই পারত না কার কীর্তি? টেক্সাসে পালিয়ে যাওয়ার চেয়ে, শীতের শেষ্‌ খেতে হাল টানলে তবু একটু সুরাহা হত।”

ফ্র্যাঙ্ক স্কারলেটকে বাহুতে টেনে নিলেন। সাধারণত কাজটা উনি খুবই ভয়ে ভয়ে করে থাকেন, যেন বিরক্ত হয়ে হয়ত ও নিজেকে ছাড়িয়ে নেবে। কিন্তু আজ ওঁর দৃষ্টি দূরান্ত ভেদ করে চলে গেছে, আর ওঁর বাহু দৃঢ় হাতে ওর কটি বেষ্টন করে রইল।

“হাল টানার থেকেও জরুরি কিছু কাজ রয়েছে এখন, সোনা। ডার্কিদের ভয় দেখানো আর স্ক্যালাওয়াগদের উচিত শিক্ষা দেওয়া, তার মধ্যে এক নম্বর। টোনির মত ভাল ছেলেরা যতদিন থাকবে, আমার মনে হয় না, ততদিন দক্ষিণ নিয়ে আমাদের খুব একটা দুশ্চিন্তা করার কারণ আছে। চল, শোবে চল।”

“কিন্তু, ফ্র্যাঙ্ক – ”

“দেখ, আমরা সবাই যদি একসাথে রুখে দাঁড়াতে পারি, ইয়াঙ্কিদের এক ইঞ্চি জমিও না ছাড়ি, তাহলে কোনো একদিন আমাদের জয় হবেই। সোনা, তোমার ওই সুন্দর মাথাটা এসব নিয়ে একেবারে ঘামিও না। আমাদের, পুরুষদের ওপর এই সব ভাবনাচিন্তা ছেড়ে দাও। আমাদের সময়কালেই জয় এসে যাবে, এমনটা নাও হতে পারে, তবে একদিন যে আসবেই, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আমাদের জ্বালাতন করতে করতে ইয়াঙ্কিরা একদিন হেদিয়ে যাবে, দেখবে যে কিছুতেই এদের মচকানো যাবে না। ওরা রণে ভঙ্গে দিলেই, আমাদের দুনিয়া আবার সুন্দর হয়ে উঠবে – বসবাসের জন্য, সন্তান প্রতিপালনের জন্য।”

ওয়েডের কথা মনে পড়ল স্কারলেটের, মনে পড়ে গেল কিছুদিন ধরে লুকিয়ে রাখা একটা গোপন অস্বস্তির কথাও। এই রকম ঘৃণা আর অনিশ্চয়তার অস্থির আবহাওয়ায় ওর সন্তানসন্ততি বড় হয়ে উঠুক, এটা একেবারেই ওর কাম্য নয়। হিংসা আর সন্ত্রাস ঘাপটি মেরে বিস্ফোরণের অপেক্ষায় রয়েছে। চতুর্দিকে দারিদ্র্য, অসহনীয় দুঃখকষ্ট আর নিরাপত্তাহীনতা। এমন একটা বিষাক্ত পরিবেশে ওর ছেলেমেয়েরা মানুষ হোক, স্কারলেট কখনোই চায়নি। এক স্থিতিশীল দুনিয়া, যেখানে শিশুদের জন্য স্নেহ আর কোমলতার অভাব থাকবে না, নিরাপদ ভবিষ্যতের আশ্বাস থাকবে, উপোস করে থাকতে হবে না, ভাল জামাকাপড়ের অভাব থাকবে না – এমনই একটা দুনিয়ার স্বপ্ন দেখেছিল স্কারলেট।

আর ফ্র্যাঙ্ক কিনা ভাবছেন শুধুমাত্র ভোটাভুটি করাতে পারলেই পরমার্থ লাভ হয়ে যাবে? ভোটাভুটি? কী হবে ভোটাভুটি দিয়ে? দক্ষিণের ভদ্র মানুষরা আর কোনোদিনই ভোট দেবার সুযোগ পাবেন না। ভাগ্যের বিড়ম্বনা এড়ানোর জন্য একটা জিনিসই প্রভূত পরিমাণে প্রয়োজন – প্রচুর টাকাকড়ি। একটা ঘোরের মধ্যে পড়ে স্কারলেটের মনে হতে লাগল ওদের প্রচুর টাকার দরকার যাতে যে কোনো বিপদেও টিকে থাকা যায়।

হঠাৎই ফ্র্যাঙ্ককে বলে ফেলল যে ও অন্তঃসত্ত্বা।



***

টোনির পালিয়ে যাবার পরের কয়েক সপ্তাহ ধরে আন্ট পিটির বাড়িতে ইয়াঙ্কি সৈন্যরা দল বেঁধে ঘন ঘন এসে তল্লাশি চালাতে লাগল। সময় অসময়ের পরোয়া না করে, আগে থেকে কিছু না জানিয়েই ওরা সারা বাড়ি তছনছ করে চলে যায়। খেয়ালখুশিমত যে কোনো ঘরে ঢুকে পড়ে, জেরার পর জেরা করতে থাকে, ওয়ার্ডরোব খুলে জামাকাপড় টেনে হিঁচড়ে মেঝের ওপর ছুঁড়ে ফেলে, বিছানার তোষক উঠিয়ে তত্ত্বতালাশ করে। সামরিক কর্তৃপক্ষ জানতে পেরেছে যে টোনিকে মিস পিটির বাড়িতে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল, তাই ওরা নিঃসংশয় যে টোনি ওখানেই বা আশেপাশেই কোথাও লুকিয়ে আছে।

ফলে আন্ট পিটির – আঙ্কল পিটারের ভাষায় – ‘একেবারে কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা’। কখন যে একজন অফিসার দলবল নিয়ে ওঁর শয়নকক্ষে হানা দেবে, ওঁর অজানা। ফ্র্যাঙ্ক কিংবা স্কারলেট টোনির হঠাৎ আবির্ভাবের ঘটনাটা বৃদ্ধার কাছে চেপে গেছিলেন। ওঁর বলবার ইচ্ছে থাকলেও ওঁকে জেরা করে কিছুই জানা যাবে না। তার ফলে জ্বালাতন করার জন্য হাত পা নেড়ে প্রতিবাদ জানাতে জানাতে সরল মনে যেটুকু বলেছেন, তাতে কোনো জল নেই। টোনি ফোনটেনকে জীবনে একবারই মাত্র উনি দেখেছেন, আর সেটা হল ১৮৬২’র বড়দিনের সময়।

“তাছাড়া,” হাঁসফাঁস করতে করতে হয়ত ইয়াঙ্কি সেনাদের কৃতার্থ করার জন্যই আরও জানান, “সেদিন ও মদে একেবার চূর হয়ে ছিল।”

গর্ভধারণের একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে, স্কারলেটের শরীর আর মন, কোনোটাই ভাল থাকত না। তখন পর্যায়ক্রমে একবার নীলকোটদের ওপর তীব্র ঘৃণা উগরে দিত, ওর ব্যক্তিগত পরিসরকে লণ্ডভণ্ড করে নিজেদের খুশিমত গয়নাগাটি উঠিয়ে নিয়ে যাবার জন্য, আবার কখনো টোনির আকস্মিক আগমনের কারণে ওর স্বপ্নগুলো সব বানচাল হতে বসেছে, এই ভেবে আতঙ্কিত হত। অনেক কম অপরাধের জন্যই অনেককে গ্রেপ্তার করার ফলে জেলখানা উপচে পড়ছে আজকাল। সামান্যতম প্রমাণ ওদের হাতে এলেই, কেবল ও আর ফ্র্যাঙ্ক নন, নিরপরাধ পিটিকেও ওরা জেলে পুরে দেবে।

কিছুদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধদেনা আদায় করার জন্য ওয়াশিংটনে ‘বিদ্রোহী সম্পত্তি’ বাজেয়াপ্ত করার আন্দোলন চলছে। এই আন্দোলনের জন্য স্কারলেট ভয়ে একেবারে কাঁটা হয়ে আছে। তার ওপরে আবার সামরিক আইন অমান্যকারীদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার জোর গুজব ছড়িয়েছে অ্যাটলান্টায়। গুজবটা স্কারলেটকে কাঁপিয়ে দিয়েছে, হয়ত কেবল স্বাধীনতাই নয়, ওর আর ফ্র্যাঙ্কের ঘরবাড়ি, স্টোর এমনকি মিলটাও হাতছাড়া হয়ে যাবে। সেনাবাহিনী ওদের সম্পত্তি যদি অধিগ্রহণ নাও করে, কিন্তু ওকে আর ফ্র্যাঙ্ককে গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠিয়ে দেয়, তাহলেও তো একই ব্যাপার হবে। ওদের অবর্তমানে কে ওদের ব্যবসার দেখভাল করবে?

এই রকম একটা ঝামেলা ডেকে আনার জন্য স্কারলেট মনে মনে টোনির ওপর খুব চটে গেল। বন্ধুদের সঙ্গে এরকম কাজ কী করে করতে পারল? আর অ্যাশলেই বা কোন আক্কেলে টোনিকে ওদের কাছে পাঠাতে গেল? কাউকে সাহায্য করার মানে যদি এই হয় যে মৌচাকে ঢিল পড়ার মত দলে দলে ইয়াঙ্কিরা এসে হুজ্জতি করতে থাকবে, তাহলে ও আর কোনোদিনও কাউকে সাহায্য করবে না। কেউ সাহায্য চাইতে আসলেই তার মুখের ওপরেই দরজা বন্ধ করে দেবে। অবশ্য অ্যাশলে ছাড়া। অল্প একটু সময়ের জন্য টোনির আসা আর চলে যাবার পর বেশ কয়েক সপ্তাহ স্কারলেট ভাল করে ঘুমোতে পারেনি। দুঃস্বপ্ন দেখে বা রাস্তা থেকে ক্ষীণ আওয়াজ ভেসে এলেও ও ধড়মড়িয়ে ঘুম থেকে উঠে পড়ত। ওর মনে হত অ্যাশলেকে হয়ত টেক্সাসে পালিয়ে যেতে হচ্ছে, টোনিকে সাহায্য করার মাসুল গুণতে। এখন ও কী অবস্থায় আছে সেটা জানারও কোনো উপায় নেই, কারণ টোনির মধ্যরাত্রির অভিযান নিয়ে ওরা টারাতে কোনও চিঠি লেখার সাহস করেনি। ইয়াঙ্কিরা সেই চিঠি আটক করে পড়ে ফেলতে পারে, আর তখন প্ল্যান্টেশনের ওপরেও বিপদ নেমে আসতে পারে। যাই হোক, বেশ কিছু সপ্তাহ কেটে যাওয়ার পরেও যখন কোনো খারাপ খবর এল না, ওরা বুঝল যে ভাবেই হোক অ্যাশলে ফাঁড়া কাটিয়ে উঠতে পেরেছে। সর্বোপরি, ইয়াঙ্কিরাও কিছুদিন পর থেকে ওদের জ্বালাতন করা বন্ধ করে দিল।

কিছুটা স্বস্তি পেলেও স্কারলেট কিন্তু পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হতে পারল না। টোনির দরজায় খটখট করার পর থেকে ওর মনে যে আতঙ্কের সঞ্চার হয়েছিল সেটা থেকে থেকেই ওকে অস্থির করে তুলত। শহর দখল করার সময়কার শেলের কান ফাটানো শব্দ কিংবা যুদ্ধ শেষের দিনগুলোতে শেরম্যান বাহিনীর সন্ত্রাস – কিন্তু এই আতঙ্ক সেসব আতঙ্কের চেয়েও ভয়াবহ। মনে হচ্ছে টোনির সেদিনের অতর্কিত আবির্ভাব ওর চোখের ওপর থেকে ছদ্ম স্বস্তির পর্দাটা সরিয়ে ফেলে ওর জীবনের প্রকৃত অনিশ্চয়তার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

১৮৬৬ সালের হিমেল বসন্তের সময়, নিজের চারপাশে তাকিয়ে, স্কারলেট উপলব্ধি করতে পারল যে কী নিদারুণ এক দুঃসময়, কেবল ওকে নয়, সমগ্র দক্ষিণকেই গ্রাস করে ফেলেছে। ভবিষ্যতের একটা নির্দিষ্ট রূপরেখা বানিয়ে ও কাজ চালিয়ে যেতে পারে, এক সময় ক্রীতদাসদের যতটা মেহনত করতে হত তার চেয়েও বেশি মেহনত ও করতেই পারে, সমস্ত বাধাবিপত্তি অতিক্রম করে এগিয়ে যাওয়াও যেতে পারে, দৃঢ়তার সঙ্গে যে কোনো জটিল সমস্যার সমাধানও করে ফেলতে পারে যার জন্য আগে থেকে কোনও প্রশিক্ষণও পাওয়া নেই। কিন্তু এত পরিশ্রম, এত আত্মত্যাগ, এত উদ্যমের ফসল মুহূর্তের মধ্যে বেহাত হয়ে যেতে পারে। কিন্তু এই রকম অন্যায় যদি ঘটেও যায়, প্রতিবাদ জানানোর, নিজের অধিকার রক্ষা করার, সুবিচার পাওয়ার আশায় দাঁড়ানোর মত কোনও জায়গাই নেই, কেবল ওই পক্ষপাতদুষ্ট আদালতগুলো ছাড়া, যাদের নিয়ে টোনির অনেক অভিযোগ। ওই সব সামরিক আদালতগুলোর হাতে প্রভূত ক্ষমতা, আর নিজেদের খেয়ালখুশিমত সেই ক্ষমতার অপব্যবহার করে থাকে। আজকাল একমাত্র নিগ্রোদের সুবিচার কিংবা প্রতিকার পাওয়ার অধিকার আছে। ইয়াঙ্কিরা সমগ্র দক্ষিণকে পায়ের তলায় দাবিয়ে রেখেছে, আর সুদূর ভবিষ্যতেও সেভাবেই রাখার অভিপ্রায়। দৈত্যাকার একটা হাত যে দক্ষিণকে এক ধাক্কায় পেছনে ঠেলে দিয়েছে। একও সময় যাঁরা দক্ষিণের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা ছিলেন আজ তাঁরা তাঁদের পূর্বতন ক্রীতদাসদের চেয়েও বেশি অসহায়।

ইয়াঙ্কি সেনাবাহিনী জর্জিয়া রাজ্যকে এক নিশ্ছিদ্র বলয়ে ঘিরে রেখেছে, অ্যাটলান্টা শহরের ওপরেও তার আঁচ পাওয়া যাচ্ছে। প্রতিটা শহরে সেনাবাহিনীর সামরিক কর্তাদের হাতে দেওয়া হয়েছে অসামরিক জনগণকে নিয়ন্ত্রণে রাখবার জন্য অসীম ক্ষমতা – এমনকি তাদের বাঁচা মরা নির্ধারণ করার ক্ষমতাও, আর সেই ক্ষমতার যথেচ্ছ প্রয়োগও হচ্ছে। যে কোনো নাগরিককে, যে কোনো কারণ দেখিয়ে বা কোনো কারণ না দেখিয়েই ওরা কয়েদ করতে পারে, সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে পারে, ফাঁসিতেও ঝুলিয়ে দিতে পারে, আর সেটা ওরা করছেও। যে কোনো নাগরিককে ওরা হয়রান করতে পারে, কীভাবে ব্যবসা চালাতে হবে, বা কর্মচারিদের কত বেতন দিতে হবে, জনসমক্ষে এমনকি নিজেদের মধ্যে কথাবার্তাতেও কী বলা চলবে বা চলবে না, বা সংবাদপত্রে কী লেখা চলবে বা চলবে না – এই সব নিয়ে অনেক পরম্পরবিরোধী নিয়ম বানিয়ে দিয়েছে। কখন, কোথায় ময়লা ফেলতে হবে সেটা নিয়েও ওরা বাধানিষেধ আরোপ করে দিয়েছে। প্রাক্তন কনফেডারেটদের কন্যা এবং স্ত্রীরা কোন কোন গাইতে পারবে আর পারবে না, সেটাও ওরা ঠিক করে দিয়েছে। ফলে ‘ডিক্সি’ বা বনি ব্ল্যু ফ্ল্যাগ’ জাতীয় কোনো গান গাওয়া অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে, প্রায় রাজদ্রোহেরই সমতুল্য অপরাধ। হুকুম জারি করেছে যে ‘লৌহাবরণ শপথ’১ না নয়া থাকলে ডাকঘর থেকে চিঠিপত্র নেওয়া যাবে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই ঘৃণ্য শপথ না নেওয়া থাকলে দম্পতিকে বিবাহের অনুজ্ঞাপত্রও দেওয়া হত না।

সংবাদপত্রের কণ্ঠ এমনভাবে রুদ্ধ করা হয়েছিল যে সামরিক শাসনের অবিচার আর লুণ্ঠনরাজের বিরুদ্ধে গণপ্রতিবাদে সোচ্চার হবার কোনও অবকাশই ছিল না। কারাবাসের দণ্ড শুনিয়ে লুণ্ঠনরাজের বিরুদ্ধে সমস্ত প্রতিবাদকে নীরব করে দেওয়া হয়েছিল। বহু বিশিষ্ট নাগরিককেই কারাবন্দী করে রাখা হয়েছে এবং অদূরভবিষ্যতে তাঁদের বিরুদ্ধে মামলার শুনানি হবার কোনও সম্ভাবনাই নেই। জুরি ব্যবস্থা আর হেবিয়াস কর্পাসের মৌলিক অধিকার কার্যত শিকেয় তোলা। দেওয়ানি আদালতগুলো খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে, তবে তাদের চলতে হয় সামরিক শাসকদের মর্জিমাফিক। আদালত কী রায় দেবে তা নিয়ে ওদের নাক গলানোর সম্পূর্ণ অধিকার রয়েছে এবং ওরা সেই অধিকারের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করে থাকে। ফলে দুর্ভাগ্যবশত একবার গ্রেপ্তার হলেই সেই হতভাগ্য নাগরিককে একরকম সামরিক শাসকদের খেয়ালখুশির ওপরেই নির্ভর করে থাকতে হত। আর গ্রেপ্তারও কম মানুষ হননি। সরকারের বিরুদ্ধে অভিসন্ধিমূলক উক্তির সন্দেহে, কু ক্লুক্স ক্ল্যানের২ সঙ্গে হাত মেলানোর আরোপ লাগিয়ে কিংবা যে কোনো নিগ্রো একজন শ্বেতাঙ্গর বিরুদ্ধে ঔদ্ধত্যের অভিযোগ আনলেই সেই নাগরিককে জেলের ঘানি টানতে হত। তথ্য প্রমাণের কোনও প্রয়োজন হত না। অভিযোগটাই যথেষ্ট। আর ফ্রীডমেন’স ব্যুরোর বিরামহীন প্ররোচনার সৌজন্যে অভিযোগ করার মত নিগ্রোর অভাব ছিল না।

নিগ্রোদের ভোটদানের অধিকার এখনও দেওয়া হয়নি, তবে ওদের যে ভোট দিতে দয়া উচিত, সেই সিদ্ধান্তে উত্তর একেবারে অবিচল, এবং সেই ভোট যেন উত্তরের পক্ষেই যায় সেটাও নিশ্চিত করতে হবে। এই লক্ষ্য মাথায় নিয়ে ওরা নিগ্রোদের সর্বস্তরে তোষণ করা শুরু করল। নিগ্রোরা যাই করুক না কেন, ইয়াঙ্কি সেনারা ওদের মদত দিত, আর যে কোনো শ্বেতাঙ্গর নিজের বিপদ ডেকে আনার সবচাইতে সহজ উপায় হল কোনো নিগ্রোর নামে অভিযোগ দায়ের করা।

আগে যারা ক্রীতদাস ছিল, ইয়াঙ্কিদের মদতে এখন তারাই দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। সব চেয়ে নিকৃষ্ট আর সব চেয়ে মূর্খ নিগ্রোরাই বড় বড় সব পদ দখল করে বসে আছে। আর যে সব নিগ্রোর বোধবুদ্ধি আছে, তারা স্বাধীন হওয়ার হাতছানিকে ঘৃণাভরে পরিত্যাগ করে তাদের শ্বেতাঙ্গ প্রভুদের মতই চরম কষ্টে দিনাতিপাত করছে। হাজার হাজার গৃহভৃত্য – ক্রীতদাসদের মধ্যে যাদের সর্বোচ্চ বর্ণের বলে ধরা হয় – শ্বেতাঙ্গ প্রভুদের সঙ্গেই থেকে গেছে – এখন খেতমজুরের মত কায়িক পরিশ্রম করতে হচ্ছে – আগেকার দিন হলে, এই কাজকে ওরা অমর্যাদাকর বলে মনে করত। এমনকি অনেক বশংবদ খেতমজুরও মুক্তি লাভ করার এই নবীন প্রবণতা থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রেখেছে। অবশ্য ছাড়া পাওয়া ইতর নিগারদের’ অধিকাংশই এসেছে খেতমজুর সম্প্রদায় থেকেই, আর এরাই সব থেকে বেশি অসভ্যতা করছে।

ক্রীতদাসপ্রথা যখন চালু ছিল, সেই সময়েও গৃহভৃত্যরা এবং যে সব ভৃত্য চাতালে কাজ করত, তারাও এই সব ইতর নিগারদের অবজ্ঞার চোখেই দেখত, ওরা যেন মনুষ্যেতর শ্রেণীর জীব। যেমন এলেন করে থাকতেন, এবং অন্যান্য প্ল্যান্টেশনের কর্ত্রীরাও তাই করতেন, নিগ্রো শিশুদের প্রশিক্ষণ দেবার বন্দোবস্ত করতেন। এদের ভেতর থেকে সেরাদের বাছাই করে দায়িত্বপূর্ণ কাজে লাগিয়ে দেওয়া হত। খেতের কাজে তাদেরই লাগানো হত যাদের শেখবার ইচ্ছে বা ক্ষমতা কম হত, যাদের মধ্যে উৎসাহের অভাব দেখা যেত, আর সততা আর বিশ্বাসযোগ্যতার অভাব লক্ষ্য করা যেত, যারা সবচাইতে ইতর আর অভদ্র হত। কৃষ্ণাঙ্গ সমাজের জাতিভেদের নিরিখে এই আপদগুলোই দক্ষিণিদের জীবনকে তছনছ করে দিয়েছে।

অসাধু আর হঠকারি লোকেরা – যারা ফ্রীডমেন’স ব্যুরোর হর্তাকর্তাবিধাতা – আর দক্ষিণের প্রতি সীমাহীন ঘৃণাপোষণকারী উত্তরের মানুষ – এরা সবাই মিলে একযোগে প্রাক্তন খেতমজুরদের ক্ষমতার আসনে বসিয়ে দিয়েছে। ফলে নিম্ন মেধার লোকের পক্ষে যা করা স্বাভাবিক, ধরা কে সরা জ্ঞান করতে শুরু করেছে। একদল বাঁদরের বা কিছু অবাধ্য বাচ্চার সামনে লোভনীয় বস্তু সাজিয়ে দেওয়া হয়েছে। এসবে মূল্য বোঝার ক্ষমতা ওদের নেই, কিন্তু সেসব নিয়েই কাড়াকাড়ি করে চলেছে। ওদের মাথা একেবারে খারাপ হয়ে গেছে – হতে পারে ওদের মধ্যে লুকিয়ে থাকা ধ্বংস করার প্রবৃত্তি মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে, আর নয়ত নিজের বুদ্ধি খাটিয়ে সুস্থির কিছু করবার ক্ষমতা ওদের নেই।

নিগ্রোদের ব্যাপারে – এমনকি সব চেয়ে মন্দবুদ্ধি নিগ্রোদের ক্ষেত্রেও – একটা কথা স্বীকার করে নিতেই হবে, যে অসূয়া তাড়িত নিগারের সংখ্যা খুবই নগণ্য, আর ‘ইতর নিগার’ বলতে এদেরই বোঝায়, ক্রীতদাস প্রথা যখন চালু ছিল তখন থেকেই। তবে একটা গোষ্ঠী হিসেবে এদের ছিল শিশুসদৃশ মানসিকতা, হুকুম তামিল করার অভ্যেসটা এদের জন্মগত, ফলে ওরা খুব সহজেই বিপথে চালিত হৎ। আগে এদের হুকুম দেবার মালিক ছিলেন শ্বেতাঙ্গ প্রভুরা। এখন ওদের হুকুম দেবার মালিকরা বদলে গেছে – ব্যুরো, কার্পেটব্যাগারের দল এরাই এখন এদের হুকুম দিয়ে থাকে। ওরা ওদের মাথায় ঢুকিয়ে দেয়, “তোমরা সাদা মানুষদের থেকে কোনও অংশে কম নও, তাই তোমরাও ওদের মত যা খুশি তাই করতে পার। ভোট দেওয়ার অধিকার একবার তোমরা পেয়ে যাও, তখন রিপাবলিকান টিকিটে ভোট দিলেই তোমরা সাদা মানুষদের সম্পত্তি দখল করে নিতে পারবে। ধরে নাও ওগুলো তোমরা পেয়েই গেছ। যদি পার, দখল করে নাও!”

এই সব গালগল্প শুনে শুনে ওদের মনে হত মুক্তি যেন আসলে একটা অনাদিকাল জুড়ে চলা বনভোজনের মত, সপ্তাহের প্রতিটা দিনেই বারবেকিউয়ের আয়োজন, অলস স্ফূর্তি করার অবিচ্ছিন্ন অবকাশ, লুঠপাট করা আর ঔদ্ধত্য দেখানোর অবাধ অনুমতি। গ্রাম ছেড়ে নিগ্রোরা দলে দলে শহরে এসে ভিড় করতে লাগল, ফলে গাঁয়ে ফসল ফলানোর কাজে মজুর পাওয়া যায় না। এমনিতেই অ্যাটলান্টা এদের ভিড়ে গিজ গিজ করছে, তার ওপর প্রতিদিন হাজারে হাজারে আরও নতুন করে ঢুকছে, আর নতুন তত্ত্ব মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়ার ফলে ওরা রীতিমত অলস আর বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। নোংরা ঘুপচি ঘরে গাদাগাদি করে থাকার ফলে ওদের মধ্যে গুঁটি বসন্ত, টাইফয়েড আর যক্ষারোগের প্রকোপ বেড়েই চলেছে। ক্রীতদাস অবস্থায় অসুখ করলে গৃহকর্ত্রীরা এদের দেখাশোনা করতেন, সেটাতেই ওরা অভ্যস্ত ছিল, কিন্তু নিজেদের বা রুগীদের যত্ন কীভাবে নিতে হয় সেই ব্যাপারে ওদের কিছুই জানা নেই। আগেকার সময়ে ওদের শিশু আর বয়স্কদের যত্ন নেওয়ার ব্যাপারে ওরা মালিকদের ওপরেই নির্ভর করত, ফলে ওদের দায়িত্ববোধটাই গড়ে ওঠেনি, খুবই অসহায় অবস্থা। ব্যুরোর লোকেরা রাজনৈতিক ব্যাপারস্যাপার নিয়েই এত ব্যস্ত যে প্ল্যান্টেশনের মালিকরা এক সময় যে যত্ন নিতেন, সেটা নেবার সামর্থ্য বা ইচ্ছে এদের নেই।

বেওয়ারিশ নিগ্রো বাচ্চারা ভয় পাওয়া পশুর শহরের রাস্তায় রাস্তায় ছোটাছুটি করে বেড়াচ্ছে যতক্ষণ সহৃদয় কোন শ্বেতাঙ্গ দয়াপরবশ হয়ে ভরণপোষণের দায়িত্ব নিয়ে নিজেদের রান্নাঘরে লাগিয়ে না নেন। গাঁয়ের বয়স্ক নিগ্রোরা – নিজের ছেলেমেয়েরা এদের ছেড়ে চলে গেছে – শহরের ব্যস্তসমস্ত হালচাল দেখে রীতিমত ভয়তাড়িত হয়ে রাস্তার ধারে অসহায়ভাবে বসে বসে পথচারিণী ভদ্রমহিলাদের কাছে করজোড়ে মিনতি করে চলেছে – “শুনছেন, ও ম্যা’ম, দয়া করে ফ্যেয়াট কাউন্টিতে আমার পুরনো মালিককে চিঠি লিখে জানিয়ে দিন, আমি এখানে পড়ে আছি। উনি এসে এই বুড়ো নিগারটাকে ফিরিয়ে নিয়ে যান। সত্যি বলছি, এই মুক্তি পাওয়ার শখ আমার বরাবরের মত ঘুচে গেছে!”

এই বিপুল সংখ্যক মানুষকে সামলাতে গিয়ে ফ্রীডমেন’স ব্যুরো রীতিমত নাস্তানাবুদ হয়ে পড়ছিল, একটু দেরিতে হলেও নিজেদের ভুল কিছুটা বুঝতে পারল, তাই আর দেরি না করে গ্রাম থেকে আসা মানুষগুলোকে আবার ওদের প্রাক্তন মালিকদের কাছে পত্রপাঠ ফেরত পাঠাতে লাগল। ওদের বোঝানো হল, ফিরে গেলে ওরা স্বাধীন মজুর হিসেবেই কাজ করতে পারবে, লিখিত চুক্তি অনুযায়ী দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে। বৃদ্ধ ডার্কিরা খুশি মনেই প্ল্যান্টেশনে ফিরে গেল কিন্তু দরিদ্র্য হয়ে পড়া প্ল্যান্টেশন মালিকদের বোঝা অনেক বেড়ে গেল যদিও ওঁরা প্রাণে ধরে এদের ছাড়িয়ে দিতে চাইলেন না। অল্পবয়সীরা আটলান্টাতেই থেকে গেল। এদের মধ্যে কাজ করার কোনো ইচ্ছেই নেই। কেনই বা থাকবে যখন বিনা পরিশ্রমেই খাবার জুটে যাচ্ছে!

জীবনে প্রথমবার নিগ্রোরা আশ মিটিয়ে হুইস্কি পান করার সুযোগ পেল। ক্রীতদাস জমানায়, একমাত্র বড়দিন ছাড়া এই বস্তুর স্বাদ গ্রহণ করার কোনো উপায় ছিল না। বড়দিনের উপহারের সঙ্গে ‘এক ফোঁটা’ হুইস্কিও তখন ওদের দেওয়া হত। ফ্রীডমেন’স ব্যুরোর মুরুব্বিদের আর কার্পেটব্যাগারদের লাগাতার উস্কানি তো আছেই, এখন তার সাথে জুড়েছে হুইস্কির সুড়সুড়ি, ওদের তাণ্ডব যে সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যাবে সে আর নতুন কথা কী? জানমালের নিরাপত্তা নিয়ে ওদের কোনও মাথাব্যথাই নেই। শ্বেতাঙ্গরা নিরাপত্তার অভাব থেকে রীতিমত আতঙ্কে দিন কাটাতে লাগলেন, কারণ ওঁরা আইনের রক্ষকবচ পাবেন না। রাস্তাঘাটে কালো মানুষগুলো মাতলামি করতে করতে যাজে তাকে অপমান করে ছাড়ছে, রাতের বেলায় বাড়িতে, গোলায় আগুন লাগিয়ে দিচ্ছে, আর প্রকাশ্য দিবালোকেই ঘোড়া, গবাদি পশু, মুরগি উঠিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, আরও কত রকম অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে, কিন্তু একজন অপরাধীরও কোনও শাস্তি হচ্ছে না।

কিন্তু শ্বেতাঙ্গ মহিলাদের ওপরে যে দুর্যোগ ঘনিয়ে এসেছে তার তুলনায় এই সব বেইজ্জতি, এই সব বিপদ তো তুচ্ছ। যুদ্ধের কারণে এঁদের অনেকেই নিজেদের পুরুষরক্ষক থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। শহরের নানা প্রান্তে এবং এমনকি শহরের বাইরে নির্জন রাস্তার ধারেও এঁদের থাকতে হয়, একেবারে একা একা। ইদানিং মহিলাদের ওপর জুলুম করার বেশ কিছু ঘটনা সামনে এসেছে, তাছাড়া প্রত্যেকের মনেই নিজের নিজের স্ত্রী আর কন্যার নিরাপত্তা নিয়ে দুর্ভাবনা করার অবকাশও রয়েছে, তাই দক্ষিণের মানুষদের জমে ওঠা ক্ষোভ আর আক্রোশ থেকে রাতারাতি কু ক্লুক্স ক্ল্যান নামে একটা সংস্থা জন্ম নিল। আর এই নৈশ সংস্থাটির বিরুদ্ধেই উত্তরের সমস্ত সংবাদপত্র গলা ফাটিয়ে বলতে শুরু করল, কোন দুঃখজনক পরিস্থিতিতে এই সংস্থা জন্ম নিতে বাধ্য হল তা নিয়ে একবারও মাথা ঘামালো না। উত্তরের দাবী হল কু ক্লুক্স ক্ল্যানের প্রতিটা সদস্যকে খুঁজে খুঁজে বের করে ফাঁসিতে লটকে দেওয়া হোক। আক্রমণকারীরা আইনের শাসন রদ করে দেওয়া সত্ত্বেও অপরাধীদের শাস্তি দেবার কাজটা এরা নিজেদের হাতে তুলে দেবার হিম্মত দেখাচ্ছে!

জাতির অর্ধেক অংশ বাকি অর্ধেক অংশের ওপর, বেয়নেটের ডগায়, নিগ্রো শাসন কায়েম করানোর জবরদস্তি করছে – এ এক অভূতপূর্ব দৃশ্য! আর এই সব নিগ্রোদের অনেকেরই আফ্রিকার জঙ্গল থেকে এসে একটা প্রজন্মও কাটায়নি। ওদের ভোট দেবার অধিকার দিতেই হবে, অথচ ওদের অনেক প্রাক্তন মালিককেই সেই অধিকার কিছুতেই দেওয়া যাবে না। দক্ষিণকে দাবিয়ে রাখতে হবে, আর শ্বেতাঙ্গদের ভোটদানের অধিকার কেড়ে নেওয়াটা দক্ষিণকে দাবিয়ে রাখার অন্যতম উপায়। যারা যারা কনফেডারেসির হয়ে লড়াই করেছে, কনফেডারেসির প্রশাসনিক পদে থেকেছে, কনফেডারেসিকে যে কোনোভাবে সাহায্য করেছে বা সুবিধে করে দিয়েছে, তাদের একজনকেও ভোট দেবার অনুমতি দেওয়া যাবে না। জনগণের প্রতিনিধি বেছে নেবার কোনও অধিকারই ওদের থাকবে না, বহিরাগত শাসকদের অধীনেই ওদের থাকতে হবে। অনেকেই জেনারাল লী’র উপদেশ এবং দৃষ্টান্ত স্মরণ করে শপথ নিতে ইচ্ছুক ছিলেন, অতীতের কথা ভুলে আবার নাগরিক হতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তাঁদের সেই অনুমতি দেওয়া হয়নি। বাকি যাঁরা, যাঁদের শপথ নেবার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, যে সরকার তাঁদের সঙ্গে ইচ্ছে করে নিষ্ঠুর এবং অসম্মানজনক আচরণ করে চলেছে, সেই সরকারের প্রতি আনুগত্য স্বীকার করে শপথ নেওয়া তাঁরা ঘৃণার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেন।

একটা কথা স্কারলেট প্রায়ই শুনতে পেত, এতবার কথাটা শুনতে হয়েছে, যে সেটা ওর অসহ্য লাগত – “ওই জঘন্য শপথটা নিয়েই ফেলতাম হয়ত, আত্মসমর্পণের পরে পরেই, যদি ওরা অসভ্যতা না করত। ইউনিয়নে য়ামরা আবার ফিরে যেতেই পারি, কিন্তু কোনোমতেই সেটা নতুন করে যোগদান বলে ধরা যেতে পারে না!”

উদ্বিগ্ন প্রহরগুলো স্কারলেট ভয়ে কাঁটা হয়ে কাটাত। উচ্ছৃঙ্খল নিগ্রো আর ইয়াঙ্কি সৈন্যদের দৌরাত্ম্য সর্বদা মনের মধ্যে খচখচ করত। বিষয়সম্পত্তি দখল হয়ে যাবার ভয় ওকে তাড়া করে ফিরত, এমনকি ঘুমের মধ্যেও ওর পিছু ছাড়ত না। চরম সন্ত্রাসের দিন আসছে ভেবে আতঙ্কিত হত। নিজের, বন্ধুদের, সমগ্র দক্ষিণের মানুষদের অসহায়তা স্কারলেটকে খুব মনমরা করে ফেলেছিল, আবেগের সঙ্গে বলা টোনির কথাগুলো খুব মনে পড়ে যেত –

“ঈশ্বরের নামে দিব্বি কেটে বলছি, স্কারলেট, এসব সহ্য করা যাবে না! হবেও না সহ্য করা!”

* * *

এত লড়াই, এত ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া, তার ওপর পুনর্গঠনের নাম করে অনাচার – তা সত্ত্বেও অ্যাটলান্টা আবার চনমনে হয়ে উঠেছে। কনফেডারেসি আমলের প্রথম দিকে বেড়ে ওঠা যে কোনো নবীন শহরের সঙ্গে অনেক মিল – ঠিক তেমনই প্রাণবন্ত, তেমনই ব্যস্তসমস্ত একটা ভাব। একটা ব্যাপারই কেবল বেমানান – রাস্তায় টহল দেওয়া সৈন্যরা ভুল রঙের ইউনিফর্ম পরে থাকে। টাকাকড়িও সব ভুল মানুষদেরই হাতে। আর আছে নিগ্রোরা – আলসেমি আর বাউণ্ডুলেপনা করে মজায় আছে, আর ওদের প্রাক্তন মালিকরা অনাহারে কায়ক্লেশে কোনোমতে দিন গুজরান করছেন।

ধ্বংসাবশেষের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে দ্রুতগতিতে নতুন করে নিজেকে নির্মাণ করতে ব্যস্ত, প্রাণবন্ত, ব্যস্ত, সমৃদ্ধ একটা শহর বলে বাইরে থেকে মনে হলেও তলায় তলায় অনেক দৈন্য, অনেক আশঙ্কা জমে আছে অ্যাটলান্টায়। সব কিছুতেই অ্যাটলান্টার যেন ঘোড়ায় জিন লাগিয়ে রাখার স্বভাব, পরিস্থিতি যেমনই হোক না কেন। স্যাভান্না, চার্লসটন, অগাস্টা, রিচমন্ড, নিউ অরলিয়্যান্স – তাড়াহুড়ো করা এদের স্বভাবেই নেই। তাড়াহুড়ো করাকে এরা মনে করত শিক্ষার অভাব, ইয়াঙ্কি সংস্কৃতির প্রভাব। আর বর্তমান সময়কালে, অ্যাটলান্টা শহরটা শিক্ষাদীক্ষার অভাব আর ইয়াঙ্কি রুচির প্রভাবে ছেয়ে গেছে, যা আগে কখনও দেখা যায়নি, ভবিষ্যতেও দেখা যাবে বলে মনে হয় না। চারধার থেকে নতুন নতুন মানুষের আগমনে সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত রাস্তাঘাটে দমবন্ধ করা এক পরিবেশ, কোলাহল, চেঁচামেচিতে কান পাতা দায়। ইয়াঙ্কি অফিসারদের বউদের আর ভুঁইফোঁড় কার্পেটব্যাগারদের ঝাঁ চকচকে জুড়িগাড়িগুলো শহরের মানুষদের জীর্ণ গাড়িগুলোর ওপর কাদা ছিটিয়ে চলে যায়। শহরের আদি বাসিন্দাদের শান্ত, নিবিড় কুটীরের পাশে পাশে বিত্তশালী আগন্তুকদের ঝলমলে প্রাসাদ গড়ে উঠতে লাগল।

একথা সত্যি যে দক্ষিণের অন্যান্য শহরের নিরিখে অ্যাটলান্টার গুরুত্ব অনেকটাই বেড়ে গেল। একদা অখ্যাত শহরকে এখন সবাই এক কথায় চেনে। যে রেলপথের দখল নেবার জন্য শেরম্যান পুরো একটা গ্রীষ্ম লড়াই চালিয়ে গেছিলেন, হাজার হাজার মানুষের প্রাণবলির বিনিময়ে, সেই রেলপথ আবার শহরে জীবনের ছন্দ নতুন করে ফিরিয়ে আনছে। অ্যাটলান্টা বিশাল একটা অঞ্চলের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছে, শহরটা ধ্বংস হয়ে যাবার আগে ঠিক যেমন ছিল। প্রতিদিনই বিশাল সংখ্যায় নতুন নতুন মানুষের আগমন ঘটছে শহরে – বাঞ্ছিত এবং অবাঞ্ছিত, দু’ধরণেরই।

আক্রমণকারী কার্পেটব্যাগারের দল অ্যাটলান্টাতে ওদের সদর দপ্তর বানিয়ে নিল। হাটেবাজারে ওদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়ে যেত অ্যাটলান্টায় নবাগত কিন্তু দক্ষিণের সবচেয়ে পুরনো কিছু পরিবারের লোকজনদের সঙ্গে। মফস্বলে আর গ্রামে শেরম্যানবাহিনীর লুঠতরাজের সময় এঁদের বিষয়সম্পত্তি জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দেওয়া হয়েছিল। ক্রীতদাস ছাড়া একা হাতে এঁদের পক্ষে জমিতে চাষবাস করা সম্ভব ছিল না, তাই জীবিকার্জনের আশায় এঁরা আটলান্টায় চলে এসেছেন। টেনেসি থেকে, ক্যারোলাইনা থেকে প্রত্যেক দিনই নতুন নতুন অভিবাসীরা আসতে লাগলেন। সেই সব জায়গায় নাকি পুনর্গঠনের ধাক্কাটা জর্জিয়ার থেকেও ভয়াবহ। ইউনিয়ন বাহিনীর অনুদানভোগী অনেক আইরিশ এবং জার্মান কর্মীও অব্যহতি পাওয়ার পর অ্যাটলান্টায় এসে বসতি স্থাপন করেছে। ইয়াঙ্কি গ্যারিসনের সৈন্যদের স্ত্রী এবং সন্তানসন্ততিরাও চলে এসে অ্যাটলান্টার জনসংখ্যা বাড়িয়ে দিয়েছে। চার বছর ধরে চলা লড়াইয়ের পর, এদের মনে দক্ষিণ সম্পর্কে অসীম কৌতুহল। এরা ছাড়া কিছু দুঃসাহসী মানুষও ভাগ্যানুসন্ধানে অ্যাটলান্টায় এসে আস্তানা গেড়েছে। আর প্রতিদিন নিগ্রোদের হাজারে হাজারে চলে আসা তো আছেই।

শহরটা একেবারে গমগম করে উঠল – সীমান্তবর্তী কোনো গাঁয়ের মতই বাধাবন্ধহীন – শহরের পাপ আর ক্লেদের জায়গাগুলো আড়াল করে রাখার কোনো প্রচেষ্টাই নেই। রাতারাতি অনেক পতিতালয় গজিয়ে উঠল, প্রতিটা পাড়ায় দুটো কিংবা তার থেকেও বেশি সংখ্যায়। সন্ধে হয়ে যাবার পর রাস্তাঘাট সাদা আর কালো দু’ধরণের মাতালে গিজগিজ করতে থাকত। অন্ধকার অলিগলিতে আর প্রায় অন্ধকার রাস্তায় ঠগ, জোচ্চোর, পকেটমার আর বেশ্যাদের রমরমা। জুয়োর আড্ডাগুলোও রমরমিয়ে চলে। এমন একটা রাতও যায় না যখন গুলির আওয়াজ শোনা না যায় বা দাঙ্গাহাঙ্গামার খবর না আসে। এমন বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে এত পতিতাপল্লী, এমন রমরমিয়ে চলছে, এটা আবিষ্কার করে শহরের সম্মানিত নাগরিকদের চোখ কপালে গিয়ে ঠেকল। লড়াই চলার সময়েও এতটা বাড়বাড়ন্ত দেখা যায়নি। প্রতি রাতে পর্দার আড়াল থেকে পিয়ানোর ঝঙ্কার ভেসে আসে, ভেসে আসে অশ্লীল গানের কলি আর অশ্রাব্য গালিগালাজ। মাঝে মাঝে অবশ্য এই সব শব্দ ক্ষণিকের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায় চিৎকার চেঁচামেচি আর পিস্তল চালানোর আওয়াজে। এইসব কোঠাবাড়ির বর্তমান নিবাসীরা যুদ্ধ চলাকালীন পতিতাদের থেকে অনেক বেশি দুঃসাহসী। জানলায় নির্লজ্জভাবে দাঁড়িয়ে পথচারীদের ভেতরে আসার আহ্বান জানায়। আর রবিবার বিকেল হলেই কোঠাবাড়ির মালকিনরা জমকালো পোশাক পরা মেয়েদের নিয়ে শহরের বড় বড় রাস্তা ধরে বন্ধ জুড়িগাড়ি হাঁকিয়ে যেত, সিল্কের পর্দার ফাঁক দিয়ে তাজা বাতাস নেবার জন্য।

কোঠাবাড়ির এই সব মালকিনদের মধ্যে বেল ওয়াটলিংই ছিল সবচেয়ে ডাকসাইটে। নিজেই একটা কোঠাবাড়ি খুলে ফেলেছে, বাড়ি নয় অট্টালিকা বলাই বোধহয় ঠিক, দোতলা, এলাকার অন্যান্য বাড়িগুলো সেই অট্টালিকার পাশে নিতান্তই ঘিঞ্জি খুপরি বলে মনে হয়। একতলায় লম্বা একটা পানকক্ষ, দেওয়ালে তৈলচিত্রের রুচিশীল সমাহার। প্রতি সন্ধ্যায় সেখানে নিগ্রো অর্কেস্ট্রার আসর বসে। লোকমুখে জানা যায়, দোতলায় নাকি দামী পুরু গালিচা পাতা, লেস দেওয়া ভারি ভারি পর্দা আর বিদেশ থেকে আনা সোনার ফ্রেমে বাঁধানো আয়না ঝোলানো। যে দশ বারোজন অল্পবয়সী মেয়ে ওই বাড়িতে থাকে, তাদের সাজসজ্জায় চড়া রঙের কিছু বাড়াবাড়ি থাকলেও, প্রত্যেকেই সুন্দরী, তবে অন্যান্য কোঠাবাড়ির তুলনায় ওদের আচরণ অনেক বেশি ভব্য। অন্তত, পুলিশকে কালেভদ্রেই বেলের বাড়িতে হানা দিতে যেতে হত।

এই বাড়িটা নিয়ে অ্যাটলান্টার প্রবীণাদের নিজেদের মধ্যে বিস্তর কানাঘুষো চলত। শহরের যাজক সম্প্রদায়ও ঠারে ঠারে নিন্দা করে বলে বেড়াতেন যে এই বাড়িটা আসলে হল পাপীদের আড্ডা, নরকের দ্বার। সকলেই জানতেন যে বেল-এর মত একজন মেয়েমানুষের পক্ষে এই রকম একটা বিলাসবহুল ধান্ধা ফেঁদে বসার সামর্থ্য থাকার কথা নয়। পেছন থেকে কোনো একজনের মদত যে আছে, এবং তাঁর যে যথেষ্ট অর্থবল আছে, তাতে কোনোই সন্দেহ নেই। আর রেট বাটলার কখনোই বেল-এর সঙ্গে ওঁর সম্পর্কটা গোপন রাখার শালীনতা দেখানোর ধার ধারেননি, তাই মদতদাতা যে উনিই হবেন তাতে আর সন্দেহ কী? বেল-এর নিজের চালচলনেও শ্রীবৃদ্ধির ছোঁয়াটা বজায় রাখে। ওর দোআঁশলা নিগ্রো অর্বাচীন গাড়োয়ানটা কখনো-সখনো যখন ওর পর্দা ঢাকা জুড়িগাড়িটা চালিয়ে নিয়ে যায়, বেলকে এক ঝলক দেখা যায়, তার থেকেই লোকের মনে এই ধারণা। পাড়ার ছোট ছোট দুষ্টু ছেলেরা মায়ের চোখের আড়াল হয়ে দামী চিকের ফাঁক থেকে ওকে দেখার চেষ্টা করে আর নিজেদের মধ্যে ফিসফিসিয়ে বলতে থাকে – “ওই যে ওকে দেখ! ওটা বেল না? ওর লাল চুলগুলো দেখতে পেলাম যে রে!”

শেলের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত বাড়িগুলো – পুরনো কাঠ আর পুড়ে কালো হয়ে যাওয়া ইট দিয়ে কোনোরকমে তালি লাগানো – ওই বাড়িগুলোর সঙ্গেই গা ঘেঁষাঘেঁষি করে কার্পেটব্যাগার আর যুদ্ধের বাজারের মুনাফাখোররা চকমেলানো বিশাল সব অট্টালিকা নির্মাণ করাচ্ছে। রাতের পর রাত এই সব অট্টালিকার জানলাগুলো থেকে গ্যাসের বাতির চোখ ঝলসানো আলো দেখতে পাওয়া যায়, ভেতর থেকে সংগীতের মূর্চ্ছনা, নৃত্যের ঝঙ্কার ভেসে আসে। প্রশস্ত বারান্দা দিয়ে মহিলাদের ঘরতে দেখা যায়, পরনে রেশমের উজ্জ্বল দামি পোশাক। তাদের পাশে পাশে সান্ধ্য পোশাকে পুরুষমানুষদেরও দেখা যায়। শ্যাম্পেনের বোতল খোলার আওয়াজ আসে। লেসের টেবিল ক্লথ দিয়ে ঢাকা টেবিলের ওপর অন্তত সাত পদের মহার্ঘ খাবার। ওয়াইনে ভেজানো হ্যাম, হাঁসের মাংস, হাঁসের মেটে দিয়ে বানানো কারি, সময় আর অসময়ের দুর্লভ ফলফলাদি থরে থরে সাজানো।

এদিকে পুরনো বাড়িগুলোর ভাঙাচোরা দরজার পেছনে অভাব অনটন আর সর্বগ্রাসী ক্ষুধার রাজত্ব। সুশীল পরিবারে নির্ভিক মানসিকতা নিয়ে বড় হয়ে ওঠার ফলে এই বৈষম্য খুব পীড়াদায়ক। সব রকম পার্থিব চাহিদাকে উদাসীন দম্ভ দেখিয়ে উপেক্ষা করাটাও বেশ ক্লেশকর। ডঃ মীড এমন অনেক করুণ কাহিনী জানেন যেখানে অনেক পরিবারকেই অবস্থান্তর হবার কারণে অট্টালিকা ছেড়ে ভাড়াবাড়িতে উঠে যেতে হয়েছে, তারপর অবস্থা আরও পড়ে যেতেই বস্তিতে আশ্রয় নিতে হয়েছে। ওঁর এমন অনেক মহিলা রুগী আছেন যাঁরা ‘দুর্বল হৃদয়’ বা ‘যক্ষারোগে’ ভুগছেন। উনি জানেন, আর ওঁরাও জানেন যে উনি জানেন, অর্ধাহার আর অনাহার থেকেই এসব রোগের উৎপত্তি। যক্ষারোগ যে ধীরে ধীরে সমস্ত পরিবারকেই গ্রাস করে ফেলছে সেটা উনি বুঝে গেছেন। অপুষ্টির সমস্যা – আগে কেবল দরিদ্র শ্বেতঙ্গদের মধ্যেই পাওয়া যেত – আজকাল তার আক্রমণ থেকে অ্যাটলান্টার সেরা পরিবারগুলোও রেহাই পাচ্ছে না। তারপর আছে উনপাঁজুরে শিশুদের নিয়ে সমস্যা আর মায়েরা যাঁরা এদের যত্ন নিতে অক্ষম। বৃদ্ধ ডাক্তার এক সময়ে প্রতিটি শিশুকে পৃথিবীতে পাঠানোর জন্য ঈশ্বরের কাছে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাতে ভুলতেন না। কিন্তু আজকাল আর জীবনকে তিনি ঈশ্বরের আশীর্বাদ বলে একই রকমভাবে মনে করতে পারছেন না। শিশুদের জন্য পৃথিবী এখন বড় নির্মম, ভূমিষ্ঠ হবার কয়েক মাসের মধ্যেই এত শিশুর মৃত্যু ঘটে যায় যে সে আর বলার নয়।

চোখ ঝলসানো আলো আর সুরা, নৃত্য আর সংগীত, ব্যয়বহুল পোশাক পরিচ্ছদ, নজর কাড়া অট্টালিকা, আর সেসবের পাশাপাশি অনাহার, অর্ধাহার আর হাড় কাঁপানো শীতের দৌরাত্ম্য। বিজেতাদের ঔদ্ধত্য আর অনুভূতিহীনতা, আর বিজিতদের টিকে থাকার প্রাণপাত করে লড়াই আর হৃদয়ে চরম ঘৃণা পোষণ।


টীকা:

১ লৌহাবরণ শপথ – Ironclad Oath – আমেরিকার গৃহযুদ্ধের সময় উগ্র রিপাবলিকানরা প্রাক্তন কনফেডারেট সৈন্যদের এই শপথ নিতে বাধ্য করত। এর ফলে এরা কিংবা এদের সমর্থকরা কোনও রকম রাজনৈতিক কাজকর্মে অংশগ্রহণ করতে পারত না। এই শপথে সমস্ত ভোটারদের দিয়ে বলিয়ে নেওয়া হত যে তারা কখনওই কনফেডারেসিকে সমর্থন করেনি। অ্যাব্রাহাম লিঙ্কন এই ধরণের শপথবাক্য পাঠকে সমর্থন করেননি।

২ কু ক্লুক্স ক্ল্যান – মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্ণবৈষম্যবাদী সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠী। ঊনবিংশ শতকের ষাটের দশকে আফ্রিকান-আমেরিকান (নীগ্রো) গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক এবং সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্ত ছিল। এদের উদ্দেশ্যে ছিল মার্কিন সমাজকে পরিশুদ্ধ করা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে আরও দু’বার কু ক্লুক্স ক্ল্যানের উত্থান ঘটে। বর্তমানে এর অস্তিত্ব নেই।



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ