অমৃতা প্রীতমের গল্প: মগ্ন চড়া




অনুবাদ: বিপ্লব বিশ্বাস


ময়ের নদীতে বয়ে চলা এক উপকাহিনি - একটা যুগের চড়ায় আটকে গেল : ঠিক সেখানেই এবং সেই সময়েই যখন ঋষি বেদব্যাস এক জঙ্গলের মাঝে এক সময় ধ্যানে বসেছিলেন।

যে মুহূর্তে তাঁর ধ্যানমগ্নতার শক্তি ব্যাহত হল, তিনি চোখ মেলে দেখলেন, রানি সত্যবতী সামনে দাঁড়িয়ে - চিরকালিক ঢঙে মনোমুগ্ধকর কিন্তু গভীর দুঃখের চিহ্ন চোখমুখে।

যে গাছের নিচে তিনি বসেছিলেন তার শায়িত পাতার ঢঙে তিনি সশ্রদ্ধ অভিবাদন জানিয়ে বললেন : ‘ আমার চিরসুন্দরী মা, আমাকে বলো, তোমার মুখ জুড়ে এমন দুঃখের ছাপ ফুটে উঠেছে কেন?’

মা তাঁকে আদরে বুকে টেনে নিল। বলল, ‘ তুমি ঋষি বংশের সন্তান। তোমার ধারণা নেই প্রেম - ভালোবাসা মানুষের হৃদয়ে কতটা যন্ত্রণার কারণ হতে পারে। স্বয়ং রাজা শান্তনুর কাছ থেকে সঠিক রাজকীয় ঢঙে শাসন করার রীতিনীতি আমি শিখেছি… রাজবংশের ধারা বজায় রাখতে আমি একই গর্ভ থেকে যেমন দুই রাজপুত্রের জন্ম দিয়েছিলাম, তেমনি তো তোমাকেও জন্ম দিয়েছিলাম। কিন্তু হায়, এক রাজকুমার তো যুদ্ধক্ষেত্রেই নিহত হল ; অন্যজন শিকার হল দুরারোগ্য অসুখের। সান্ত্বনাহীন রানিদের এখন কী হবে? তোমাকে জিজ্ঞেস করছি, তাদের ভাগ্য কি সঠিক খাতে বইবে না?

গাছের সকল ঝরা পাতা এক জায়গায় জড়ো হয়ে বেদব্যাসের মুখের দিকে অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।

রানি সত্যবতীর মন গঙ্গার ধীর ঢেউয়ের সঙ্গে বইতে শুরু করল। সে ভাবল, মহাঋষি পরাশর এই জলের মতোই তো আমাকে তাঁর কাছে টেনে নিয়েছিলেন। সে বলল, ‘ তুমি তো সেই নদীর মূল অংশেরই এক মুক্তোদানা। বালি আর তার চড়ায় খেলাধুলা করে, এইসব ঝোপঝাড়ের মাঝে ইচ্ছেমতো ঘুরে বেড়িয়ে তুমি এদের আপন করে নিয়েছ। রাজমুকুটে শোভিত রত্নের প্রতি যে টান সে বিষয়ে তোমার কোনই ধারণা নেই।’

চারদিকের ধীরে আন্দোলিত নরম সবুজ পাতার ওপর চাকচিক্যদানকারী সূর্যকিরণের মতো এক স্মিত হাসি বেদব্যাসের ঠোঁটজুড়ে খেলে বেড়াতে লাগল, ' ঠিকই, রাজ্য- রাজত্বের প্রতি যে আকর্ষক টান, সে ব্যাপারে আমার কোনও ধারণা নেই ; তবুও মায়ের ভালোবাসা কিছুটা হলেও অনুমান করতে পারি...।'

গাছের ওপর ওঠা লতার প্রান্তের মতো সত্যবতী নিচে ঝুঁকে বলল,' রত্নশোভিত রাজমুকুট অবশ্যই চায় একটি সিংহাসন, আর সেই সিংহাসনে অবশ্যই একজন শাসক বা রাজা থাকবে। আজ আমার দুই বউমাই বিধবা হয়েছে, তাদের প্রতিনিধি হয়ে আমি তোমাকে বলতে এসেছি - দুজনকেই একটি করে সন্তানরূপ আশীর্বাদ দান করো।'

মাথার ওপর ছড়িয়ে থাকা গাছের দিকে চোখ তুলে তাকালেন বেদব্যাস, আর পাতাসহ ডালপালা সব ঝুঁকে গেল যেন তারা মাটিতে তাদের বীজের সন্ধান করছে।

জ্ঞানরঞ্জিত হাসিতে বেদব্যাসের ঠোঁট ফাঁক হল। তিনি বললেন, ' জন্মদায়িনী মা ও ভূমি- মা, উভয়ের আদেশই পালিত হবে। '

বেদব্যাস তাঁর প্রতিশ্রুতি রক্ষা করলেন। তিনি অম্বিকা ও অম্বালিকা উভয়কেই একটি করে পুত্রসন্তান দান করলেন। নিয়োগ প্রথায়।

খেলায় মগ্ন শিশুদের তীক্ষ্ণ আনন্দধ্বনির মতো যখন জলপ্রপাত শিলাখণ্ড বেয়ে নামতে লাগল, তখন সেই একই উপকাহিনি সময়ের খাঁড়ি ও বাঁকের ভিতর - বাহিরের পথ ধরে চলাচল করতে লাগল যতক্ষণ না তা কলিযুগের পাড়ে এসে দুম করে থমকে যায় - ঠিক যেখানে বলদেবের শাদাসিধে, ছোট্ট কুঁড়েঘরটি খাড়িয়ে : ঠিক সেখানে যেখানে এক খসখসে টেবিলের ওপর ক্যামু, কাফকা আর প্যাস্তারনেক শুয়ে ; মহাভারত এক নজরকাড়া শূন্যতা ধারণ করল।

আর ঠিক সামনেই তার বন্ধু কাশীনাথ এসে দাঁড়াল, ঠিক যেন এক ছেঁড়া পাতা পতপত করে উড়তে উড়তে মাটিতে এসে পড়ল। বলল,' সর্বশক্তিমান প্রভু আমার প্রার্থনা মঞ্জুর করতে সমর্থ হননি ; বৈদ্যর কাছ থেকে আনা ভেষজ ওষুধে কোনও কাজ হয়নি। তাই তোমার কাছে এলাম সন্তান প্রাপ্তির আশীর্বাদ চাইতে।'

মাথার ওপর কোনও গাছ নেই। কিন্তু পাতার খসখস আওয়াজে বলদেবের কান ভরে উঠল।

কাশীনাথ বলছিল,' আমার স্বাস্থ্যবতী স্ত্রী এক অভিশপ্ত রোগগ্রস্ত মানুষের গোলামি খেটে খেটে ফুরিয়ে গেল। বন্ধুবর, ক্ষণিকের জন্য তাকে কষ্ট থেকে মুক্ত করো। '

বলদেবের পুরো দেহকাঠামো বিশাল গাছের শেকড়ের মতো জট পাকানো ঢঙে গরগর করতে লাগল। বাতাসের তাড়নায় পতিত পাতার মতো কাশীনাথ তার পায়ে পড়ে গেল,' এ কথা আমার, তোমার আর তার বুকেই চাপা থাকবে। কথা দিচ্ছি, আর কেউ তা জানতে পারবে না। '

কাশীনাথের গ্রন্থিবদ্ধ আর গর্জনরত শরীর থেকে ছোট্ট চারা গজিয়ে উঠল - হয়তো সময়ের আরোপিত উপাখ্যানের মতো... আমিই হয়তো বেদব্যাস... একজন ঋষি...'

এভাবেই এই উপকাহিনি যুগ থেকে যুগান্তরের পথে পরিক্রমা করল। আর পতপতিয়ে ছিঁড়ে পড়া পাতা থেকে ফুলেদের এক বংশ গজিয়ে উঠল।

কাশীনাথের এক পুত্র জন্ম নিল। আত্মীয় - বন্ধুরা শুভেচ্ছা ও আশীর্বাদ জানাতে এল। আর বলদেব যখন দোলনায় সদ্যোজাতকে দেখার জন্য ঝুঁকেছে, বেদব্যাসের মতো তার ঠোঁট খুলল না। গোপন কথাটি গোপন রাখতে।

' না, না... না! আমি বেদব্যাস নই!' এই প্রচণ্ড অস্বীকৃতিতে বলদেবের স্বপ্নভঙ্গ হল আর সে জেগে উঠল।

তখনও তার বিছানার পাশে বোতলের শেষ না হওয়া পানীয়। কাঁপা কাঁপা হাতে গ্লাসে আরও খানিকটা ঢেলে কোঁত কোঁত গিলে সে উন্মাদের মতো বিড়বিড়িয়ে বলল :' তোমার এই বংশধর ঈশ্বরের দান, বেদব্যাসের... সাধারণ মানুষের থেকে নয়। আর তাই তা পার্থক্য রচনা করে, তাই নয় কি?'

বলদেবের কল্পনা পথ পালটে অতি প্রাচীন বনাঞ্চলে ঢুকে পড়ল। আর গভীর থেকে উঠে আসা এক অস্বাভাবিক গোঙানির সঙ্গে সে বিলাপ করতে লাগল : ঋষিরাজ! আপনার ধ্যানমগ্ন হবার ক্ষমতা আছে... নিষ্কলুষ ধ্যানের মাঝে আমার স্বপ্ন বিরাজ করে, শুধুই স্বপ্ন। সে সব খোশখেয়ালের জগাখিচুড়ি...

গাছের মাঝ দিয়ে যে বাতাস বয়ে গেল তার সঙ্গে প্রতিধ্বনিত হল বলদেবের মুখনিঃসৃত শব্দাবলি। 'ঋষিবর তাকান, আমার দিকে তাকান! এখানে দেখুন... এই আমার অম্বিকা। আপনি খুব দ্রুত অম্বিকাকে চেনার চেষ্টা থেকে বিরত থেকেছেন... আমার বিষয়টি আলাদা। আমার কাছে সে এক জ্যান্ত বাস্তবতা... সে আমার একান্ত আপন অম্বিকা : আমার অস্তিত্বের অংশ... আমি যেখানেই যাই সে আমার সঙ্গে থাকে। ' এরপর প্রাণবন্ত হাসি ছড়িয়ে সে বলতে থাকে, ' দেখুন ঋষিবর, আপনার কোনও ছায়া নেই। মানুষ সত্য কথাই বলে যে দেবতাদের... স্বর্গের দেবদেবীরা ছায়াহীন। একমাত্র অভিশপ্ত মানুষের অনুসরণকারী ছায়া আছে। আপনি নিজেই দেখুন - আমারটা কার্যত জীবনের চাইতে বড়ো...। '

তার অনুরণিত চড়া গলা শতাব্দীর নীরবতার গায়ে ধাক্কা খেয়ে করুণভাবে গভীর নিশ্চলতার মাঝে উচ্ছ্বাস পরবর্তী ঢেউয়ের ঢঙে থিতিয়ে যায়। বলে, ' যে মুহূর্তে সত্যবতী আপনাকে ডাক দিলেন সেই মুহূর্তে আপনার ধ্যানের সময় শেষ হয়েছে। আমার কণ্ঠস্বর আপনার কানে ঢুকছে না কেন? এমনটা হচ্ছে কেন? আপনি কখনোই অম্বিকার কোল থেকে আপনার সন্তানকে তুলে নেননি। আমি নিয়েছি... আমি তাকে বুকে জড়িয়ে ধরেছি। আপনি জানেন না কারও অতি নিকটজনের আত্মজ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার অর্থ কী...!'

বলদেবের গোটা শরীর রক্তধারায় স্নাত হল, ' ঋষিবর, আপনি রক্তের গন্ধ চেনেন না গভীরভাবে আহত মানুষের রক্তে এই গন্ধ আরও সুস্পষ্টভাবে থাকে। আর রক্তের যথেষ্ট মনোরম সৌরভ পাওয়া যায় যখন কোনও নরম ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে নিষ্পাপ হাসি ছড়িয়ে পড়ে। তা হয় তখনই যখন পিতা ও পুত্রের মাঝে কেউ তিনটি সাধারণ গন্ধ আবিষ্কার করে। '

আর বলদেবের কপালের ফুলে ওঠা শিরা বেয়ে এক শক্তিশালী, অনেক বেশি ক্ষমতাধারী সুবাস নামতে লাগল। হতচেতন অবস্থায় সে বলে উঠল :

' অম্বিকা সঙ্গে করে তার সৌরভ কোথায় নিয়ে গেছে, তাতে কিছু যায় আসে না, আমি তাকে খুঁজে বের করতে পারি। আমি অনুভব করি সে যেন আমার বাহুতে, ঘাড়ে মাথা রেখে তার আকস্মিক বিক্ষিপ্ত আবেগ ছড়াচ্ছে ও দীর্ঘশ্বাস ফেলছে... আমাতে অমূল্য বিশ্বাস স্থাপন করে সে অনেকটা সময় ধরে আমার গলা জড়িয়ে আছে। আপনি কি দেখেননি যে আমি একবার তাকে নিবিড়ভাবে চুম্বনে আড়পে নিয়েছিলাম?...'

অবর্ণনীয় যন্ত্রণায় তার কপালের একটা শিরা ফুটে বেরিয়ে আসতে চাইল। অধর কামড়ে সে বলল,' আপনি শুধু দিতেই জেনেছেন, ঋষিবর। কখনোই জানতে পারেননি কী পেতে হয়... অন্তর দিয়ে কী গ্রহণ করতে হয়। আমি এ সবের মাঝ দিয়ে গেছি : সেই অনুপম অভিজ্ঞতার মাঝ দিয়ে। যখন আমার অম্বিকার নানাবিধ প্রগাঢ়তার মাঝে অবতরণ করেছি, সেইসব গভীর খাঁজ -খোঁজ আমাকে নিবিড় আশ্লেষে আঁকড়ে ধরেছে এবং পুনরায় যখন পরতে পরতে উঠে আসা ফুলের পাপড়ির মতো সে সব আলগা হয়েছে, আমি আমার সঙ্গে তাদের ঘ্রাণের পরিবর্তমান রূপমাধুরী ফিরে পেয়েছি। তা এক আবেগঘন মুহূর্ত যখন আমি দেয়া- নেয়ার আঁশ- বন্ধনে জড়িয়ে জেগে উঠেছি। সেই অভিজ্ঞতার প্রগাঢ় আবেগের মাঝ দিয়ে গেছি আমি। আপনি কিন্তু যাননি ঋষিবর। গ্রহণের মাঝে যতটা ছটফটানি দেবার মাঝে তার অর্ধেকও নেই। ঋষিবর, সেই ছটফটে যন্ত্রণা যে কী তা আপনি জানেন না... জানতে পারেনও না! '

চারদিকে অপার নিস্তব্ধতা। চারদিকে... দূরে... সেই সুগভীর নীরবতার মাঝ দিয়ে মনশ্চক্ষে ভবিষ্যৎ দেখতে পায় সে। তার জীবনের বাকি সময়কাল সে যেন তার মাঝে অবলোকন করে... ঠিক এক অফুরন্ত, অসীম... দুর্ভেদ্য নীরবতার অন্ধকার। কিন্তু সেই অন্ধকারে বলদেব নিজেকে আবদ্ধ করে আরও গভীর অন্ধকারময় স্থানে ডুব দেয়। একবার সেই অন্ধকারের রাজত্বে থিতু হলে তার ঠোঁটদুটি কাঁপতে থাকে... যেন তাদের সঙ্গে অন্ধকারের স্তরগুলোও... বিব্রত হতে শুরু করে।

' একটু অগ্নিঝলক পেতে আমার কাছে এসেছিল সে। তা দিতেই আমাকে পুড়তে হয়েছিল। যথেষ্টই পুড়েছিলাম। কিন্তু জানতাম না, এমনকি সেও জানত না যে ওই কারণেই... আমাদের উভয়কেই অগ্নিপরীক্ষার মাঝ দিয়ে যেতে হবে। সেই আগুনের ছোঁয়ায় সে কেঁপে উঠেছিল এবং অবলম্বন পেতে একজনের কাছে পুরোপুরি নিজেকে এমনভাবে সঁপে দিয়েছিল যেন তার মাঝ থেকে উঠে আসা আগুনের দাউদাউ শিখায় সে বেশ হতভম্ব হয়ে পড়েছিল। আর এখন দেখতে পাচ্ছি, আমার অন্দরে মিশে যাওয়া সেই আগুন পোড়া ছাইসহ তারটাও ফেলে রেখে গেছে। আপনি নিজেই তা দেখুন, ঋষিরাজ!

আমার সচেতন অবস্থা থেকে এক ধরনের অশরীরী আকার নিল। অন্ধকার ফুঁড়ে যেন বেরিয়ে এল এক পাথরের মূর্তি। হয়তো বাস্তবিকই সময়ের অভিঘাত একে পাথরে পরিণত করেছে... অথবা তাকে দেখে মনে হচ্ছে সম্ভবত তখনও গভীর ধ্যানে মগ্ন। ' সেই অন্ধকারে হাত বাড়িয়ে বলদেব শ্রদ্ধাভরে তার পা ছুঁতে চাইল। আর হাতড়ানো বাহুর ঢঙে তার কণ্ঠস্বর কেঁপে উঠল,' আমি আপনার ক্ষমা প্রার্থনা করি, ঋষিরাজ। যখন সামান্য এক মানুষ হয়ে আপনাকে নকল করতে চেষ্টা করেছি তখন যেন নিজের অস্তিত্ব ভুলেই গেছিলাম। ক্ষণিকের জন্য নিজেকে আপনার সঙ্গে অভিন্ন ভাবতে চেষ্টা করেছিলাম। ক্ষণমুহূর্তের জন্য আপনার ধ্যানাসন চুরি করেছিলাম, সেই বোধে সঞ্চারিত করতে যে আমি আমিই, যে আমি আপনার সমকক্ষ হতে পারি না। আপনার সর্বত্র বিরাজিত উপস্থিতির সমাহিত ভাব এখনও বনময় অনুভূত হয়। অস্থির অবস্থায় মোচড় খেতে খেতে আমি চরম বৈসাদৃশ্যের মাঝে পড়ে আছি এবং তা এই কারণে যে দাতা ও গ্রহীতা উভয়ের স্থানে অবস্থানহেতু সেই অভিশাপের বোঝা আমাকে বইতে হচ্ছে - আমার অম্বিকাকে পুত্রসহ আমার পাশে পেতে চাই। শুধু আগামীর পথে নয়, সুদূর অতীতেও আমার দৃষ্টি প্রসারিত যখন অম্বিকা আমার সঙ্গে ছিল, আমার শরীরে হেলান দিয়ে... আর আমি তার মাঝ দিয়ে এক নতুন প্রসারিত জীবন পাচ্ছিলাম। '

বলদেব তার সংজ্ঞাহীন অবস্থা থেকে ঘুমের জগতে ফিরে মাথা নাড়ল। ঘরের মধ্যেকার নীরবতা খানিক স্বস্তির শ্বাস নিল। কেবল খোলা জানালা দিয়ে বয়ে আসা মৃদুমন্দ হাওয়া টেবিলের ওপর রাখা বইয়ের খোলা পাতাগুলি কাঁপিয়ে দিল ঠিক যেন মহাভারতের পঞ্চম সর্গ ক্যামুর ' আউটসাইডার' এর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করছে, আর যেন প্যাস্তারনেকের জিভাগো, মহর্ষি পরাশরের কটু মৎস্যগন্ধকে মনোরম সুবাসে পরিণত করার গুপ্ত বিষয়টি জানতে পেরে, আবেশে চোখ ডলছে।

হঠাৎই ঘরের ভিতরকার নীরবতা কেঁপে উঠে গভীরভাবে বলদেবকে নিরীক্ষণ করতে লাগল। অত্যাচারের এক বিন্দুতে আক্ষরিক অর্থে উত্তেজিত অনুভব নিয়ে সে বিছানা ছেড়ে উঠে বিড়বিড়িয়ে বলল,' এই অভিশাপ কী, বেদব্যাস। যখন ঘুমোতে যাই আমার যেন জ্বলন হতে থাকে। শুধু আমারই নয়, অম্বিকারও। আর সব সময়েই ঘুম ভেঙে দেখি আমি ছাইয়ের স্তূপ হয়ে গেছি। কীভাবে আমার পুত্র সেই ছাইয়ের গাদা থেকে তার কুলুজি উদ্ধার করবে? আমাকে বলুন। '

নদীটি একইভাবে বয়ে চলেছে। শুধু তার বয়ে চলা তরঙ্গমালা বিষণ্ণতার সঙ্গে নদীচড়ায় পড়ে থাকা সেই উপকাহিনির একমুঠো ধুলো আর ছাইয়ের সাক্ষী রয়ে গেল।







একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ