অনুবাদ- জয়া চৌধুরী
"একটু কাছে আয় তো ছল্লোর মা, দেখ না আজ হাঁটুটা মনে হচ্ছে যেন বুঝদার হয়ে উঠেছে”- পা ছড়িয়ে বসে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে দেখতে ছল্লোর বাবা তার মাকে ডেকে বলল। হাঁটুতে প্রচন্ড ব্যথা হয়েছে। তারপর আবার ছড়ানো পা গুটিয়ে নিল। বুড়ো হুকুমচাঁদের প্রথম বউটা মারা গিয়েছে। সেই ছিল আসলে ছল্লোর মা। তারপর হুকুমচাঁদ পয়সার জোরে কর্তার নামের এক যুবতীকে বিয়ে করে নিল। বিয়ের দুদিন পর থেকেই বউকে ‘ছল্লোর মা’ বলে ডাকতে শুরু করেছিল। কিন্তু কর্তারের এটা একেবারেই পছন্দ ছিল না। সে বেশ কয়েকবার রাগ করে বলেছিল – সোজাসুজি নাম ধরে ডাকো। সারাক্ষণ ‘ছল্লোর মা’, ‘ছল্লোর মা’ বলে ডাকো, আমার একদম ভাল্লাগে না।
দেখ। আমি হলাম গিয়ে ছল্লোর বাপ। তাহলে তুইই বল, তুই ছল্লোর মা হলি, কী হলি না! আমি কী কিছু খারাপ কথা বললাম।
কর্তারের কথা শুনে বুড়ো হুকুমচাঁদ বউকে নাম ধরেই ডাকত কিন্তু তা সত্ত্বেও, কখনও সখনও বেখেয়ালে মুখ দিয়ে বেরিয়েই যেত ‘ছল্লোর মা’। আসলে ছল্লো ছিল তার বড্ড প্রিয়। মেয়ের নাম সে রেখেছিল ‘কৌশল্যা’। তবে ভালবেসে মেয়েকে সে ‘ছল্লো’ বলেই ডাকত। আর এই ছল্লো ডাকটা শুনলেই কর্তার রেগে উঠত আর হুকুমচাঁদ হাসতে হাসতে বলত –
-তাহলে তুই একটা ছেলে বিইয়ে দে, আমি তোকে তার মা বলে ডাকব’খন। আচ্ছা ব্যাটা হলে কী নাম রাখবি? চন্দন? চন্দন, চন্দন নাম রাখিস ওর। চন্নন না চন্দন। তালে আমি তোকে ডাকব- চন্দনের মা… আরে ও চন্দনের মা।
আর এসব শুনে কর্তার যতই গম্ভীর হওয়ার চেষ্টা করুক না কেন, তবু তার হাসি পেয়েই যেত।
বহু বছর কেটে গেল। কিন্তু ঘরে কোনো চন্দনের জন্মই হল না। তার ফলে সেই ‘চন্দনের মা’ বলে ডাকবার কোনো সুযোগও হুকুমচাঁদ পেল না। সরাসরি ‘কর্তার’ নামেই বউকে ডাকতে হতো। তবে কখনও কখনও মুখ দিয়ে ভুল করে ‘ছল্লোর মা’ বেরিয়েই যেত।
হুকুমচাঁদ পশ্চিম পাঞ্জাবে থাকত। পরে সে পূর্ব পাঞ্জাবে চলে এসেছিল। যে টাকার জোরে হুকুমচাঁদ কর্তারের যৌবন নিজের বার্ধক্যের সঙ্গে বেঁধে রেখেছিল সেই জোরও ভেঙে গিয়েছিল। স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কের বাঁধন যদিও আগের মতই ছিল, কিন্তু সেই বাঁধনে মাঝে মাঝে গিঁট দিতে হতো। হুকুমচাঁদের হাত থেকে ধনের লাঠি ছিটকে গিয়েছিল। হাঁটুর ব্যাথাতেও সে জর্জরিত অচল হয়ে পড়েছিল। এইবার হুকুমচাঁদ একটু জোরে ডাকল,
-আরে ও ছল্লোর মা।
-বলো, কী বলবে, ছল্লোর মা মরবেও না আর তার হাত থেকে রেহাইও পাব না- ওড়না দিয়ে হাত মুছতে মুছতে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এল কর্তার।
-আরে খামোখা খারাপ কথা বলিস না। ছল্লোর মা তো মরেই গেছে, এবার অন্যজনকেও মারবার জন্য উঠে পড়ে লেগেছিস নাকি।
-আগের জন, তোমার পেয়ারের ছল্লোর মাকেও আমি মেরেছি না কী? নিজে তো দিব্যি মরে সুখে নিদ্রা যাচ্ছে আর সব কাঁটা আমার ওপরে চাপানোর জন্য রেখে গেছে।
-তুই কথার কাঁটা ফোঁটাস না। হ্যাঁ হ্যাঁ। এ তোর কম্ম নয়। তুই ব্যাস কাঁটা ফুটিয়েই যা। কাঁটা গেঁথে দে।
-আচ্ছা, আমি তোমায় কাঁটা ফুটাই খালি, আর ছল্লোকেও ফুটাই। তোমায় খাটিয়ায় বসিয়ে ভাত বেড়ে খাওয়াই, পেয়ারের মেয়েকে ভাত বেড়ে খাওয়াই । এসব তো বাপ বেটিকে কাঁটা ফোটানোই হয়। অনেকবার বলেছি মেয়ে নিজেই ক’খানা রুটি বানিয়ে নিক। ওই কটা ঝুড়ি নিয়ে বাড়ি থেকে বেরোয় আর সারাদিন বাইরে কাটিয়ে ফেরে। রুটি বানাবে ও?
=আরে, তোকে কতবার বলেছি ওকে ঝুড়ি বেচতে পাঠাবি না। পাঁচ রকম লোক থাকে বাজারে। যদি কোনো কিছু হয়ে যায়?
=ছল্লোর বাপ, এ উপদেশ তুমি তখন দেবে যখন চার পয়সা রোজগার করে আমার হাতে দেবে। তার বদলে এখানে খাটিয়ায় বসে বসে বকবক করতে থাকো আর আমি… বলতে বলতে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে।
সত্যিই তো বলে কর্তার। এখন কোন মুখেই বা বলব আমি। পয়সাও আমার হাত ছেড়ে দিয়েছে। শরীরও। এখন আমি মিষ্টি মিষ্টি কথাই বলি কী গালি দিই। সময় মত দুটো রুটি তো ও পাতে বেড়েই দিচ্ছে - হুকুমচাঁদের বুক ঠেলে কষ্ট উঠে এল। খুব নরম গলায় কর্তারকে বলল-
-আমার জন্য রসুন থেঁতে তেল গরম করে নিয়ে আয়। বসে বসে হাঁটু মালিশ করি। আর শোন অড়হর আর ছোলার ডাল করিস না। শালা ওগুলো আমার জন্য বিষ হয়ে গেছে। আমার শরীর খেয়ে নিচ্ছে ওগুলো।
-কেন? অড়হর ডাল ছোলার ডাল রান্না করব কেন? আজ মাংস রাঁধব।
-সত্যি? তুই তো আমার মনের কথা টের পেয়ে গেছিস রে কর্তার। বছর ঘুরে গেছে মাংসের স্বাদ পাই নি। আর ডাক্তারবাবুও তো বলেন – হুকুমচাঁদ শরীর সুস্থ রাখতে গেলে স্যুপ খাবে। তা’লে আজ তুই অবশ্যই মাংস রান্না কর। - বলতে বলতে হুকুমচাঁদ নিজের হাঁটুতে আবার নজর বুলালো। দেখে মনে হল যেন মুখের বদলে ওই হাঁটুই মাংসের স্বাদ পাচ্ছে।
-হ্যাঁ হ্যাঁ আজ স্যুপ খেও। আমি আমার মাথাটা কেটে রান্না করে দেব। তুমি স্যুপ খেও।
-হে ভগবান যখনই কথা বলিস মুখ দিয়ে খারাপ কথাই বেরোয়। কে জানে! আজ হয়ত আমার কপাল ভাল থাকলে চারটের বদলে কুড়িটা ঝুড়ি বিক্রি হয়ে যাবে। আরে ছল্লো, আজ আমার কথা রাখিস তুই। আজ কুড়িটা ঝুড়ি বিক্রি করিস। পুরো কুড়িখানা। আর আসার সময় ওই কোনের দোকান থেকে পুরো আধ সের মাংস কিনে আনিস মা। যা মা যা। গাড়ি আসার সময় হয়ে গেছে। আর দেখিস, আসার সময় পেঁয়াজ, রসুন, কাঁচা লংকা আদা সবকিছু নিয়ে আসিস। নাহলে তোর মা মাংসটা এমনিই সিদ্ধ করে দেবে।
দেখে মনে হচ্ছিল বাবার মুখে এসব শুনে ছল্লো খুব জোরে জোরে হেসে উঠবে। কিন্তু ছল্লো ঠিক ওরকম চুপচাপ ভাবেই মাথা নিচু করে ঝুড়িগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল।
-কেউ যদি ঝুড়ি কিনতেও চায় তাহলেও ওর মুখের দিকে তাকালে আর কিনবে না। বুঝলে? সারাক্ষণ মুখটা তোলো হাঁড়ির মত করে রাখে।
কর্তারের রাগ এখন হুকুম চাঁদের পিছন ছেড়ে মনে হচ্ছিল ছল্লোর পিছনে ধাওয়া করেছে।
-আসলে হয়েছেটা কী? মেয়েটার মুখে আবার কি হল? তুই তো সারাক্ষণ ওর পিছনে টিকটিক করিস। আরে তোর থেকে তো ওর মুখ অনেক সুন্দর।
হুকুমচাঁদ কর্তারের সমস্ত রাগ নিজের দিকে ঘোরানোর চেষ্টা করছিল। কিন্তু কর্তারের রাগও এত শিগগিরি দিক পাল্টানোর বস্তু নয়। ও সেই একভাবেই ছল্লোর দিকে বারবার কটকট করে তাকিয়ে বলতে লাগল,
--আরে একটু হেসে কথা বললে খরিদ্দার একটার জায়গায় দুটো মাল কিনে নেয়। এত গাড়ি এখান দিয়ে যাওয়া আসা করে, বাইরে ভেতরে সব জায়গায় তাদের জিনিষ থাকে। ওরা কি একটার জায়গায় দুটো ঝুড়ি কিনতে পারে না? এই ঝুড়িগুলোর কী কোনো ওজন আছে নাকি? এমন রঙিন ঝুড়ি কোথায় পাবে সব? কিন্তু এ মেয়ে মুখ দিয়ে কিছু বলবে তবে তো হবে! যতক্ষণ ধরে মোটরগাড়ির চালকেরা বাইরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চা খায় ততক্ষণে ওনাদের সঙ্গে দুটো মিষ্টি কথা বলুক, হেসে কথা বলুক। তো দেখো না কোন চালক ঝুড়ি না কিনে চলে যায়!
কথাগুলো ছল্লো এমন ভাবে শুনতে লাগল যেন তুলো নয় কানে কাপড় গুঁজে রেখেছে। আগেও অনেক বার সে বলেছে-
-মা কেউ ঝুড়ি কেনে না। এই লরি বা বাস চালকেরা যদি বা কেনেও, মোটর গাড়ির চালকেরা এদিকে ফিরেও তাকায় না। আর কাছে গেলে তো এক্কেবারে গিলে খেতে আসে যেন। বলতে থাকে – কাচে হাত দিবি না, কাচে হাত দিবি না। ময়লা হয়ে যাবে। দূরে দাঁড়া, দূরে দাঁড়া।
কর্তার কিন্তু ছল্লোর একটা কাকুতি মিনতিও শোনে না। যে রাগ তার মোটর গাড়ির চালকদের ওপর হওয়া উচিৎ ছিল সেটা সবসময় ছল্লোর ওপরেই করে। সবসময় এরকমই বলতে থাকে,
-তুই তো মুখটাকে মগের মত করে রাখিস। তোর হাত থেকে কেই বা ঝুড়ি কিনবে!
ছল্লো সত্যি সত্যিই বেশ কয়েকবার চেষ্টা করেছে মুখটা যাতে ওরকম মগের মত না হয়ে যায়। আর মোটরগাড়ির কাচের কাছে দাঁড়িয়ে সে যতই না হাসুক না কেন, কোনো না কোনো চালক তাকে একবার নয়, তিন তিনবার বলেছে-
-এমন দাঁত বের করে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? এমন দাঁত বের করে? আজকাল এসব ঝুড়ি কেউ কেনে? গেঁয়ো ভূতরাই কেবল কিনবে।
একদিন তো কর্তার ছল্লোর ওপর পুরোদমে ক্ষেপে উঠল।
- ওই বজ্জাত! কী যেন নাম ছেলেটার? – বলে চলছিল - বলছিলাম ওই যে বাসস্ট্যান্ডে খবরের কাগজ বেচে ছেলেটা … রতন… হ্যাঁ রতনই তো নাম। তোমার মেয়ের ওকে দেখলেই তো মুখ হাঁ হয়ে যায়। তখন একেবারে গদগদ হাসি। তখন তো তাকে শেখাতে হয় না কেমন করে হাসবে।
-কর্তার! মুরগির মত নোংরা ছড়াস না বলছি!
হুকুমচাঁদ ধমকে মুখ বন্ধ করতে বলল বউকে।
-কিছু ভুল বলেছি নাকি! – কর্তার ফুঁসে উঠল।
- তোমার রাজকুমারীর এখন প্রেমে পড়ার স্বভাব শুরু হয়েছে। তবে ওর তো শেখা দরকার নাগরকে কীভাবে মুঠোয় রাখতে হয়, তার সম্পক্কে খবর রাখাও তো দরকার। তুই জানিস এ ছোকরা বাসস্ট্যান্ডে কাগজ বেচে খায়। তোর খরচ সে চালাবে কী করে?
কর্তারকে কথা শেষ করতে না দিয়ে ছল্লো নিজের মাথা ওড়না দিয়ে ঢেকে নিল। ঝুড়ির পুঁটলিটা মাথায় তুলে বাসস্ট্যান্ডের দিকে পা বাড়াল।
-ছল্লো, আজ দেরি করলি যে বড়! - হঠাত করে পিছনে এসে দাঁড়াল রতন।
-আমি… একটু বলেই থেমে গেল।
তারপর রতনের মুখের দিকে তাকাল। সে জানত এখন আর নিজের মুখটা মগের মত দেখাচ্ছে না।
- আমি ঝুড়ি বোনা শেষ করছিলাম। সুন্দর হয়েছে না? এটায় সবুজ ফুল বুনে দিয়েছি।
-তুই দারুণ ঝুড়ি বানাস- রতন উত্তর দিল, তবে সারাদিন তুই লোকের কাছে দৌড়ে দৌড়ে যাস ঝুড়ি নিয়ে, আমার ভালো লাগে না একদম।
-কিন্তু তুমিও তো লোকের কাছে কাগজ নিয়ে দৌড়াও- ছল্লো হাসতে হাসতে বলে।
-আমার কথা আলাদা। আমি পুরুষ মানুষ। কেউ তো আমার মুখের দিকে চেয়ে থাকে না।
-আমার দিকে কেই বা চাইবে? মুখটা তো মগের মত। - ছল্লো হাসতে শুরু করে।
-এই যে দেখ। এরকম করে অচেনা মানুষের কাছে আবার হাসতে শুরু করবি না তুই। ঝুড়ির বদলে সে হয়ত…
শশশ… ছল্লো মুখের হাসি মুছে চট করে গম্ভীর হয়ে গেল।
- অচেনা লোকদের সামনে আমার মুখ গম্ভীর হয়ে যায়। তখন মনে হয় আমি যেন কাঁধের ওপর মাথা না মগ বয়ে চলেছি। আর মা কী না সারাক্ষণ বলে- খরিদ্দারদের সামনে মুখটা মগের মত করে রাখবি না।
ছল্লোর হাত থেকে ঝুড়ির পুঁটলিটা রতন টান মেরে নিয়ে নেয়।
- আমি তোকে ঝুড়ি বেচতে দেব না আর- সে বলে চলে – যা এক জায়গায় গিয়ে বোস। - একটা বন্ধ দোকানের সামনের দিকে ইশারা করে দেখায় সে।– আমায় এখন যেতেই হবে কাগজ বেচার জন্য। আজ সবকটাই বেচে ফেলতে হবে।
-আর তারপর তুমি সেই টাকা দিয়ে আমার ঝুড়িগুলো কিনবে। রতন এভাবে আর কতদিন চালাব আমরা? আর এইসব ঝুড়ি দিয়ে তুমি করবেই বা কি? আচার বানাবে?
-হুম, ওই করব আমি। তুই যদি সাবধান না হোস, তালে তোর মা একদিন তোকেই আচার বানিয়ে দেবে। একটা বাস আসছে দেখছি। দাঁড়া এখানে। আমি শিগগিরি ফিরছি।
ছল্লোর হাতে ঝুড়িগুলো ফেরত দিয়ে রতন বাসের দিকে ছুটে গেল। ছল্লো একবার ভাবল রতনের পিছু পিছু যায়। ওখানে গিয়ে ঝুড়িগুলো বেচে। কিন্তু রতনের আদেশ অমান্য করতে পারল না সে। যেখানে ছিল সেই দোকানের সামনেটায় বসে পড়ল পাশে ঝুড়ির স্তূপ রেখে।
-নাক কেটে দিল, নাক কেটে দিল! তারাচাঁদ নামের একজন লোক ছুরি দিয়ে বউয়ের নাক কেটে দিল। সুন্দরী বউ, মাত্র কুড়ি বছর বয়স! পড়ুন পড়ুন… আজকের কাগজ… পড়ুন!
ছল্লোর দিকে পিছন ফিরে রতন চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলতে লাগল। ছল্লো দেখল অনেক লোক এসে রতনকে ঘিরে ধরল। ব্যস্ত হাতে সবাই কাগজ কিনে নিচ্ছিল। ছল্লোর মুখে হাসি ফুটে উঠল।
রতন সবসময় এরকম করে। প্রতিদিনের খবরের আগ্রহের বিষয়টাকে তুলে ধরার কায়দা রতনের জানা আছে… গরম খবর… বিজ্ঞানের আবিষ্কার! রাশিয়ার নতুন রকেট! দলাই লামাকে নিয়ে আরো খবর!
বাস চালক তার হর্ন বাজাতে লাগল জোরে জোরে। যাত্রীরা সব একে একে বাসে ফিরে আসতে লাগল। দেখল রতন ফিরে আসছে তার দিকে। হেসে তাকে বলল-
-হ্যাঁ, মেয়েদের নাকের সঙ্গে আমার বুদ্ধিকে মেশাতে হয়!
আবার একটা নতুন বাস এসে দাঁড়াল। দোকানগুলোর সামনে দুটো গাড়িও।
-যাই আর এক চক্কর ঘুরে আসি- রতন বলল।
-আমিও যাই, দেখি কপালে কি আছে- ছল্লো বলে উঠল।
-না ছল্লো, তুই যাবি না।
-তুমি পাগল হলে নাকি? এভাবে সারাদিন হাতের ওপর হাত রেখে বসে থাকলে আমি কীভাবে…
-তোকে বলিনি? ছটা ঝুড়ি আমি কিনে নেব? আমার ছল্লো সুন্দরী! - রতন মুখে ভাব ফুটিয়ে ছল্লোকে খ্যাপাতে লাগল।
-না আমি যাব। রোজ রোজ এভাবে চলতে দিতে পারি না। তুমি তো জানো, বাবা বলেছে আমি যেন আজ কুড়িটা ঝুড়ি অবশ্যই বেচি।
রতন বাসের দিকে ছুটে গেল আর ছল্লো গাড়িগুলোর দিকে। ছল্লো ভাবছিল আজ কী দারুণ হবে । আধা সের মাংস, রসুন, পেঁয়াজ, কাঁচালংকা, আদা… বাবা যা যা চেয়েছে ছল্লো আজ সে সব কিছু কিনে নিয়ে যেতে পারবে। কর্তারের কথাগুলো ছল্লোর কানে সূচের মত বিঁধছিল- কেউ যদি ভাবেও যে ঝুড়ি কিনবে তাহলেও সে ওর মুখ দেখেই পিছিয়ে যাবে।
গাড়ির ভিতর বসে থাকা লোকটার দিকে তাকাল। মনে মনে ভাবল নিজের মুখ যেন মগের মত না দেখায়।
-বাবু, সুন্দর ঝুড়ি- বলল।
-কোন ঝুড়ির কথা বলছিস তুই?
গাড়িতে বসা লোকটা প্রশ্নের চোখে তাকাল ছল্লোর দিকে।
-দাঁড়া, আমি সোডা আর বরফ খুঁজছি দোকানে, ঝুড়ি না।
-সোডা বরফ,
ছল্লো পিছন ঘুরে চেঁচিয়ে দোকানীকে জানাল। তারপর গাড়ির আরো সামনে এগিয়ে গিয়ে বলল,
-খুব সুন্দর ঝুড়ি, বাবু।
মোটরগাড়ির ভিতরে বসা লোকটা ঝুড়ির দিকে তাকালই না। ছল্লোকে জরিপ করতে লাগল মাথা থেকে পা অবধি।
- হ্যাঁ সুন্দর ঝুড়ি।
-আপনি তাহলে নিচ্ছেন না কেন?- ছল্লো জিজ্ঞেস করল। একেকটা স্রেফ ছ’ আনা দাম বাবু। ছল্লো প্রাণপণ চেষ্টা করছিল তার মুখে পাথুরে ভাবটা যেন ফিরে না আসে।
দোকানের ছেলেটা সোডা আর বরফ নিয়ে এল। গাড়ির লোকটা ঝুড়ি খুলে একটা হুইস্কির বোতল বের করল। সেখান থেকে গ্লাসে একটু বিয়ার ঢালল। তারপর গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে ছল্লোর দিকে ফিরল।
-একেকটা ছ’ আনা করে?
-হ্যাঁ বাবু, মাত্র ছ’আনা। আপনি যদি দুটো কেনেন তাহলে দশ আনায় দুটো দিয়ে দেব।
-যদি চারটে কিনি?
-চার! – ছল্লো আঙুলের কড় গুণতে শুরু করল। গুণতে গুণতে তার মাথায় এল তার মা কর্তারের কথাগুলো। ঠিকই বলে মা। যদি সে একটু হাসে তাহলে কত লোকে ঝুড়িগুলো কিনবে।
মোটরগাড়ির লোকটা গ্লাসের বিয়ার শেষ করল। ছেলেটার হাতে গ্লাস ফেরত দিয়ে গাড়ির ইঞ্জিন চালু করল।
-বাবু, ঝুড়ি?- ছল্লোর আশা মিলিয়ে যেতে থাকল।
-ঝুড়ি কিনতে আপত্তি নেই। কিন্তু আমার কাছে খুচরো নেই তো।
-আমি ভাঙতি করিয়ে দেব দোকান থেকে বাবু।
-ছোট্ট দোকান আমার ক্যাশ ভাঙাতে পারবে না। আমার শুধু একশ টাকার নোট আছে।
বিমর্ষ হয়ে ছল্লো গাড়ির জানলা থেকে হাত নামিয়ে নিল।
লোকটা বলল,
-তবে একটা উপায় আছে। যেন প্রাণপণ চিন্তা করে কথাটা বলল।
ছল্লোর আশা ফিরে এল।
-আমি যেদিকে যাচ্ছি ওখানে একটা বড় পেট্রল পাম্প রয়েছে। সেখানে পেট্রল ভরাব আমি। ওদের কাছেই আমার টাকার ভাঙতি পাওয়া যাবে।
-কিন্তু জায়গাটাতো আমি চিনি না। এখান থেকে অনেকটা দূর। - ছল্লো উত্তর দিল।
-আমি তোকে ওখানে নিয়ে যাব। তোর ঝুড়িগুলো খুব সুন্দর। আমি সবকটা কিনে নেব- লোকটা ছল্লোর জন্য গাড়ির দরজা খুলে ধরল।
ছল্লো একটু ইতস্তত করল। মনে পড়ল বাবার কথা। সে তার বাবাকে নিরাশ করতে পারে না। ঝুড়িগুলো বেচতেই হবে। অন্তত কুড়িটা তো বটেই। তাড়াতাড়ি গাড়িতে উঠে বসল।
গাড়ি গতি চড়াল। আরো বেগে ছুটতে লাগল। তারপর বড় রাস্তা ছেড়ে পাশের মেঠো নোংরা রাস্তা ধরল।
-বাবু, পেট্রল পাম্প কোথায়?
ছল্লোর ভয় লাগছিল। তারপর খেয়াল করল লোকটা তাঁকে হ্যাঁচকা টান দিয়ে নিজের কাছে টানছে। তার মাথা ঘুরছিল। লোকটার হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেবার জন্য ধ্বস্তাধ্বস্তি করতে লাগল।
জ্ঞান ফিরলে ছল্লো দেখল একটা গাছের নিচে শুয়ে আছে সে, কাপড়চোপড় এলোমেলো। সেখানে কোনো গাড়ি নেই, কোনো বাবুও। নিজের পোশাকের দিকে তাকাল, তারপর ঝুড়িগুলোর দিকে। সবকিছু ধুলোয় ভরা।
অনেক কষ্টে ঝুড়িগুলোকে মাথায় তুলতে পারল। পা পাথরের মত ভারী। কষ্টেসৃষ্টে কাঁচা রাস্তা পার করে বড় রাস্তা অবধি পৌঁছল। পথ চলতি একটা বাস এসে থামল তার সামনে। কন্ডাক্টর চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল- কারনাল যাবেন? এক ঝলক বাসের দিকে তাকাল ছল্লো। - হ্যাঁ- মাথা নাড়িয়ে বলল ছল্লো। কন্ডাক্টর তার কাছে ভাড়া চাইলে সে চমকে তাকাল। তার কাছে একটা টাকাও নেই ভাড়া দেবার মত। তখন মনে পড়ল চার আনা বোধহয় আছে। পকেট হাতড়াল। আনাগুলো নেই। তার বদলে একটা কড়কড়ে দশ টাকার নোট।
মনে হচ্ছিল চলন্ত বাস থেকে ঝাঁপ দেয়। নিজেকে মেরে ফেলে। ইচ্ছে করছিল নোটটা ছিঁড়ে ফেলে দেয়।
মেয়েটাকে ভাবনায় তলিয়ে যেতে দেখে কন্ডাক্টর তার হাত থেকে নোটটা তুলে নেয়। বলে- ভাড়া স্রেফ পাঁচ আনা। আপনার নোটের অনেক খুচরো আমার কাছে আছে, দিতে পারব। কন্ডাক্টর খুচরোয় ফেরত দিলে ছল্লো সেগুলো পকেটে পুরে ফেলল। গুণলও না।
-পয়সা গুণে নিন- কন্ডাক্টর বলল।
ছল্লো নিজের মনে কিসের চিন্তায় তলিয়ে গিয়েছিল ফের।
কারনাল বাসস্টপে বাস থামল। অনিচ্ছা সত্ত্বেও ছল্লো বাড়ির দিকে পা বাড়াল।
গলির শেষে তাদের পাড়ার মাংসের দোকান। পকেট থেকে পয়সা বের করতে করতে ক্লান্ত গলায় বলল
-আধ সের মাংস দিন তো।
রান্নাঘরের তাকে যখন মাংস আর অন্যান্য জিনিষ ক’টা রাখল, দেখে তার মা উল্লসিত হয়ে উঠল।
-আজ কটা ঝুড়ি বেচলি তুই?
-সবকটা।
বালতিতে জল ভরতে ভরতে উত্তর দিল ছল্লো।
-ওই ছেলেটা, রতন, তোর খোঁজ করছিল।
-ওহ তাই নাকি?
হঠাত চুপ করে গেল ছল্লো। তারপর কলঘরের দরজা বন্ধ করে স্নান করতে শুরু করল। বাইরে বের হলে দেখল কর্তার মাংস রান্না করছে কড়াইতে…
হুকুমচাঁদ চেঁচিয়ে বলছিল,
-নাকে মাংসের সুবাস আসছে। বাড়িটা ফের গমগম করে উঠছিল। আমি বলি না যে বাড়িতে মাংস রান্নার গন্ধ পাওয়া যায় না সেটা কোনো বাড়িই না।
বলতে বলতে ছল্লোর দিকে আদরমাখা চোখে তাকাল হুকুমচাঁদ।
-আমার ছল্লোরানী, আমার সোনা মেয়ে।
ফুটন্ত মাংসের ঝোলের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে ছল্লোর মনে হচ্ছিল ওখানে তার নিজের মাংস ফুটছে।
----------
মূলগল্প: CHAMMAK CHALLO AMRITA PRITAM
(ইংরিজি/ হিন্দি থেকে বাংলা)


0 মন্তব্যসমূহ