সুরেখা যখন মঙ্গল সূত্র খুলে ফেলছিল, এমন ধক ধক করছিল বুকের ভিতর, যে মনে হচ্ছিল শেষ শ্বাসটুকু নেওয়ার জন্য বুঝি খাবি খাচ্ছে ও। আর একটি নিঃশ্বাস কেবল, তারপরেই যেন স্তব্ধ হয়ে যাবে ওর হৃদপিন্ড। মৃত্যুর ঠিক আগে নক্ষত্রের হৃদস্পন্দন নাকি মিনিটে দু’শসত্তর কোটি বার- এক তিব্বতী লামা বলেছিলেন, সুরেখা পড়েছিল কোথাও। মঙ্গল সূত্র খুলে ফেলার মুহূর্তে সে কথা ওর মনে পড়ে গিয়েছিল। আসলে, পুরোনো সব কথারা ভিড় করে আসছিল তখন ; গত ক'বছরের মারাত্মক সব ঘটনাপ্রবাহ মনে পড়ছিল, যার মধ্যে দিয়ে সুরেখাকে যেতে হয়েছে । সেই সব সময়ে, এত তীব্রভাবে বুক কেঁপেছে বারবার, সুরেখার মনে হচ্ছিল, এই যেন ওর অবশ্যম্ভাবী শেষ হৃদস্পন্দন- তারাদের মতো ও যেন খসে পড়বে এবারে।
প্রথম প্রেমের কথা মনে পড়েছিল - সদ্যোঋতুমতী কোঙ্কনী কিশোরী সুরেখা আর মরাঠী তরুণ রাজ- খোলা জানলা দিয়ে ঢুকে পড়া সমুদ্রের উথাল -পাতাল হাওয়ার মতো ভালোবাসায় নিজের অস্তিত্বই যেন লোপ পেয়ে গিয়েছিল ওর।
সে ছিল পাগল করা হাওয়া বাতাসের দিন; সুরেখা রাজের হাত ধরে বলেছিল, " জানি, আমাদের এ'মিলন দুটি আত্মার - এখানে জাতপাত নেই, অঞ্চলের ভেদ নেই, কিন্তু আমার দিদা, বা তারও আগে দিদার মায়ের থেকে পাওয়া উত্তরাধিকারের মতো একটি রীতি যেন আমার মনের গভীরে গেঁথে রয়েছে। এই প্রথা অনুসারে আমাকে একটি মঙ্গল সূত্র পরিয়ে দিও।" সে’সময় রাজের রোজগারপত্র নেই। সুরেখা নিজেই কিনে এনেছিল দশ টাকার পুঁতির মালা- ওর প্রথম মঙ্গল সূত্র।
মেয়ে হয়েছিল সুরেখা আর রাজের। যদিও সুরেখার বাবা ওদের বিবাহ অনুমোদন করেন নি, নাতনির জন্মের পরে হৃদয়ের আমূল পরিবর্তন হয়েছিল তাঁর; সব রাগ গলে জল , অন্তর স্নেহে দ্রবীভূত - মৃতা প্রথম স্ত্রীর যাবতীয় পার্থিব সম্পদ উজাড় করে দিতে চাইছিলেন দৌহিত্রীকে, যদিও এই ইচ্ছায় বাদ সেধেছিলেন তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী, সুরেখার সৎ মা। সুরেখা তখন বলেছিল, " কিচ্ছু চাই না আমি। শুধু মা'র মঙ্গল সূত্র আমাকে দেবে বাবা? শান্তি পাব, জানো? আসলে মা কে তো বিধবা হতে হয় নি; আমিও মা 'র মতই যেতে চাই।"
সুরেখার কাছে মায়ের মঙ্গল সূত্র যেন সাক্ষাৎ দৈবের প্রসাদ; ঈশ্বরের কৃপায় রাজ দীর্ঘজীবী হবে- ওর মনে হয়েছিল। তবে রাজের চাকরির ব্যাপারে পরম করুণাময়ের ছিঁটেফোঁটা দাক্ষিণ্যও যে নেই- স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল; চাকরির জন্য রাজ সে'সময় মাথা কুটে মরছে - হতাশায় ডুবে যেতে যেতে মৃত্যুকে কামনা করছে প্রবলভাবে। সুরেখার তখন বাঁচার লড়াই- ঐ মঙ্গল সূত্র বাঁধা দিয়েই দৈনন্দিন গ্রাসাচ্ছাদনের ব্যবস্থা হল কোনো রকম। ততদিনে তাদের দুটি সন্তান। সংসার চালাতে চাকরি নিল সুরেখা। আর ব্যর্থতা কুরে কুরে খেতে লাগল রাজকে- মদ ধরল। তারপর দীর্ঘজীবনের আশীর্বাদ ভগবানকে নিজেই ফিরিয়ে দিল একদিন। বন্ধকী অলঙ্কারটি ছাড়িয়ে আনার জন্য সুরেখার এযাবৎ কালের সঞ্চয় টুকু যথেষ্টই, কিন্তু স্বামীর মৃত্যুর পরে, মঙ্গল সূত্র তখন সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় ওর কাছে; ফলে মহাজনের সিন্দুকেই পাকাপাকি স্থান হল সেটির।
বেশ ক'বছর পরে, সুরেখার জীবন আবার নতুন এক বাঁকের মুখে- ওকে বিয়ে করতে চাইল একজন। মানুষটির দুটি শিশু সন্তান, স্ত্রী গত ; দু হাত বাড়িয়ে সে বলেছিল," আমার সন্তানদের মা হবে তুমি? তোমার বাচ্চাদেরও তো বাবার প্রয়োজন।" সুরেখা আবার সেই পুরাতন প্রথার কথা ভাবল খুব সম্ভব; খনখন করে হেসে বলল, "আমি না হয় কোনোরকম বেঁচে, আমার মঙ্গল সূত্র কিন্তু মহাজনের সিন্দুকে পচে মরেছে।" মৃতা স্ত্রীর মঙ্গল সূত্র সুরেখাকে দিয়ে লোকটি বলেছিল - " স্মৃতিচিহ্নে এবার তবে প্রাণ ফিরুক "। পরক্ষণেই মাতৃহারা দুই সন্তানকে নতুন স্ত্রীর কোলে চাপিয়ে দিতে সুরেখা বিস্ময়ে হতবাক।
সুরেখার নতুন মঙ্গল সূত্রটি সোনার, দিব্যি ভারি; ও খেয়াল করে দেখে, তিন জায়গায় মেরামতির দাগ- বার তিনেক ভেঙে গিয়েছিল খুব সম্ভব, আবার জোড়া দেওয়া হয়েছে। ভাঙাচোরা জীবনেরই মতো।
কিছুদিনের মধ্যেই সুরেখা বুঝতে পেরেছিল- সে ঠকেছে, ভয়ংকর ঠকে গেছে সে। লোকটি ভন্ড, প্রতারক - বাবা অথবা স্বামীর দায়িত্বপালন তো দূরের কথা, তার নজর শুধুই সুরেখার অর্থে। যেদিন লোকটি ওর সমস্ত উপার্জন হাতিয়ে নিল, সুরেখা খুলে ফেলল সাধের মঙ্গল সূত্র, ফিরিয়ে দিল সটান; সেই মুহূর্তে সুরেখার হৃদস্পন্দনের হার যেন দুশো সত্তর কোটি -খসে পড়ার আগে তারাদের যেমন হয়।
তারপর যেন এক ঘোরের মধ্যে নিজের সন্তানদের নিয়ে সুরেখা ফিরে এসেছিল পুরোনো বাড়িতে, স্মৃতির মুহূর্তরা যেখানে দেওয়ালের আংটা থেকে দোল খায়।
যত দিন যায়, সুরেখার নিজেকে ভস্মপিন্ড মনে হতে থাকে, যেন এক নক্ষত্র পুড়ে খাক হয়ে গিয়েছে। অবশেষে একদিন, সে যখন তার সন্তানদের নিয়ে ঘুমিয়ে, ঘরে শুধুই নিদ্রিত মানুষের শ্বাস প্রশ্বাসের শব্দ, সুরেখা সহসা অনুভব করে এই সব শ্বাসবায়ু যেন ছাইয়ের গাদায় মৃদু ফুঁ দিচ্ছে, আগুনের ফুলকি খুঁজছে সেখানে। আশ্চর্য এক উত্তাপ সঞ্চার হয় সুরেখার হৃদয়ে। ওর মনে পড়ে যায়, দুশো সত্তর কোটি বার হৃদস্পন্দনের পরে যে নক্ষত্র ঝরে পড়ে, তারই অঙ্গার থেকে আবার স্ফুলিঙ্গ সৃষ্টি হয়, নতুন একটি তারা জন্ম নেয়। সে' রাতে নিজেকে নবজাত নক্ষত্র মনে হয় সুরেখার; রাতভর এ বাড়ির আনাচে কানাচে ডাঁই হয়ে থাকা যত বিষাদ, যত অতীতকে প্রাণপণ ঘষে ঘষে মুছতে থাকে।
পরদিন সকালে সুরেখা নতুন মঙ্গল সূত্র কিনে আনে, আয়নার সামনে নিজেকে পরায়; ফিসফিস করে বলে, "এখন কে আমাকে ত্যাগ করে, আর কে বিধবা করে দেখি ! "
-----------
[ইংরাজিতে শ্রী হরি শর্মা কৃত 270 Crore Heartbeats থেকে বাংলায় অনুবাদ ]


0 মন্তব্যসমূহ