এখনো পাহাড়ের ক্লিফে, ঈগল পাখির বাসা থেকে ঈগল পাখির বাচ্চার মত চিঁ চিঁ শব্দ শোনা যাচ্ছে। তবু বহুদূরে পাহাড়ের নিচ থেকে ভেসে আসছে ঘন্টার শব্দ, ধূপের গন্ধ।পায়ের কাছেই নূপুরের মত ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে জীবনের উৎসব। আছে জল, মাটি, সবুজ মাঠ। সবুজ মাঠটা এতটাই দূরে যে মনে হচ্ছে যেন একটা বিন্দু। সবুজ কিংবা গাঢ় বাদামি বিন্দুটা তবু প্রতিদিন একটু একটু করে বড় হচ্ছে। একদিন তা একটা দিগন্ত-বিস্তৃত সবুজের সমুদ্র হয়ে যাবে।
তার উপর থোকা থোকা হলুদ রঙের বুনো ফুলের মত, ভালোবাসার মত প্রজাপতিরা উড়ে যাবে।
ঈগল পাখিরা আকাশে উড়তে পারে। ঝড়ের মেঘের উপর দিয়ে। মানুষের জীবনের একমাত্র ম্যাজিক হল - মানুষ আঁধারেও বাঁচে।
জীবনে বিতৃষ্ণা নেই আনন্দ-র । তবে তৃষ্ণা শেষ হয়ে গেছে। গত ছয়মাস ধরে পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়ার নানা উপায় খুঁজে চলেছে ও। আসলে আমার আছে বাই পোলার ডিসঅর্ডার ওয়ান। কিছুদিন ম্যানিয়া হয়। মনে হয় এই এখনই একটা গ্র্যান্ড পিয়ানো কিনে ফেলি। স্টাইনওয়ে। মুঠো মুঠো ম্যালাকাইট, এম্বার, এমেথিস্ট, এম্যারল্ড, নীল হীরা, পোখরাজ, সিট্রিন, চুণি ছড়িয়ে দিই চারপাশে। তোমার বেগুনি ঠোঁটে চুমু খাই।
মনে হয় নিজের মাথার ভিতর নিজেই যেন ঝিঁ ঝিঁ পোকার মত গান গেয়ে যাই -
‘লা লা লা, আহা। সঙ্গীত আমার কাছে সাঁতরে ফিরে আসেআর যে রাতে ওরা আমাকে পাহাড়ের উপরেএই প্রাইভেট ইন্স্টিটিউশনে রেখে গিয়েছিলআমি আজো সে রাতে বাজানো সুরটা ছুঁতে পারি।ভাবো তো। একটা রেডিও বাজছেআর এখানে সবাই পাগল।সুরটা আমার ভালো লেগেছিলআর আমি ঘুরে ঘুরে নেচেছিলাম।’
(মূল – অ্যান সেক্সটন
ভাষান্তর – কল্যাণী রমা)
আমি কতদিন গান করি নি। আমি ঘুরে ঘুরে নাচ করি নি। বাঁশবন জুড়ে শুধুই ঝিঁ ঝিঁ পোকার শব্দ! ঝিঁ ঝিঁ পোকার…
আমি ঘুমাতে পারি নি দিনের পর দিন। একবার বাইশ দিন কি ঘুমাই নি আমি? এবার টানা বারো দিন।
যখন অমাবস্যার কালো অন্ধকার আছড়ে পড়ে ঘরের মেঝেতে, তা কিন্তু কালো নয়, সেও এক রকমের আলো। আমি যে বিছানায় ঘুমাই তার কাছেই একটা আলমারি আছে। আমার চোখের সামনে । অন্ধকারে তা ভালো দেখা যায় না। কিন্তু তার হাতলগুলো চকমকে। সে দিকেই এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকি আমি। এক সেকেন্ড এক সেকেন্ড ক’রে সময় পার হ’য়। তাকিয়ে থাকতে থাকতে ক্লান্ত হয়ে যাই। প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করি। ‘fastest front crawl’ দিয়ে। আমি সেই মহাসাগর পাড়ি দিতে পারি না। দিনের বেলাতেও আমার সূর্য ওঠে না।
আজকাল খুবই এংসাইটি আর অস্থিরতা বেড়ে গেছে। নিজের ছোট ঘরের ভিতরই কত পা যে হেঁটেছি আমি! নিঃশব্দে! বাতাসে গাছের পাতার কেঁপে ওঠা শুনে জেগে ওঠে আমার যে কুকুর ক্রোকাস – তারও যেন ঘুম না ভাঙে। আমি সবকিছু ভালোবাসি। শুধু নিজেকে ভালোবাসতে পারি না।
এর পরই আসে সেই ভংয়কর ডিপ্রেশন। বেড়ে যায় মৃত্যুর চিন্তা, দুর্বিসহ মন খারাপ। আমি ভাবি এ মন খারাপ বুঝি মৃত্যুর অন্ধকারের থেকে কালো। কবরের নিচে মানুষের হাত পা কঙ্কাল হয়ে যায়। ম্যানিক ডিপ্রেশনেও মানুষের হাত পা কঙ্কালই হয়ে যায়।তা হাতে সূচ ফোটালেও কোন আবেগহীন, স্পর্শহীন অবশ হয়ে যাওয়া নয়।
এই আমি এত যে রান্না করতাম। ফাইভ স্টার হোটেলের মত ডিসপ্লে! আর আমার বাগান? সে তো ব্যাবিলনের শূন্যদান!
কিন্তু এখন কিছুই রান্না করতে পারি না আমি। গত তিনমাস ধরে শুধু দুধ সিরিয়াল খেয়ে আছি? শুনেছিলাম এপস্টেইনের প্রাসাদে মেয়েদের নাকি শুধু দুধ সিরিয়াল খেতে দিত। আদিম কামনায় খেতে গিয়ে সময় নষ্ট করবার মত সময় কই সেখানে? তবে আমার কামনা ছিল মৃত্যুর কামনা। যৌন কামনার থেকে তা কোনই কম নয়।
কীভাবে পৃথিবীর আলো, হাসি, গান ফেলে চলে যাওয়া যায় সে চিন্তায় মগ্ন হয়ে উঠেছিলাম আমি।
প্রথমে মনে হ’ল পিস্তল দিয়েই কাজটি সারি। আমেরিকার সংবিধানের সেকেন্ড এমেন্ডমেন্টের জন্য যে কেউ নিজের কাছে বন্দুক রাখতে পারে। আমিও নেশাগ্রস্তের মত পিস্তল যোগাড় করবার জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠলাম। উড়ে যাক, উড়ে যাক সব। ঝড়ের হাওয়ায়! ফুলের পাপড়ির মত।তারপর মনে হ’ল রান্নাঘরের কাঠের সুন্দর হাতলওয়ালা ছুরি দিয়েই কাজটি সারব আমি। মৃত্যু যদি হবেই, সুন্দরের হাতেই হোক।
আমার ক্রোকাস সারাদিন পায়ে পায়ে ঘোরে। মাঝে মাঝেই আমার সাথে ও একা একা থাকে। মনে হ’ল ছুরি দিয়েই যদি কিছু করি, আমার রক্তের ভিতর বসে ক্রোকাস কুঁই কুঁই করে কাঁদবে। ও তো কষ্ট পাওয়া ছাড়া আর কিছু করতে পারবে না। ক্রোকাসকে কষ্ট দিতে পারলাম না আমি।
কিন্তু আমাকে যে যেতেই হবে।
শনিবারের সকাল। ২০২৩ সাল। ৩০শে সেপ্টেম্বর। আমি অনেকদিন ধরে আমার অসংখ্য ওষুধের মাঝ থেকে ওষুধ চুরি করে চলেছিলাম। নিজের মৃত্যুর জন্য নিজের বেঁচে থাকা চুরি করা! তা ছাড়াও সেদিন ফার্মেসিতেও গিয়েছিলাম।
“Hello, Anando
How are you doing? Oh ho! It is so cold out there! Below zero today!
I almost had to carry out my dog for a walk! My goodness!
Wait a little. We are going to fill your prescription in a bit.”
এই এক আরেক সমস্যা! বছরের অর্ধেক পোলার বেয়ার হ’য়ে থাকতে হবে বলেই কীনা জানি না, উইস্কনসিনে মানুষজন খুব কম। দেখা হলেই অল্প স্বল্পnগল্প গুজব। এমনটি শিকাগো, নিউ ইয়র্ক, ফ্লোরিডা, লজএঞ্জেলেসে দেখি নি। আমরা আগে গ্রামে থাকতাম। ভুট্টা ক্ষেতের পাশ দিয়ে হাঁটতে বের হতাম বিকালবেলা। সাইকেল চালিয়ে যেতে যেতেও চালকেরা হাত নাড়িয়ে অল্প কথা বলে যেত। আকাশে উড়ে যেত ক্যানাডিয়ান গীজ!
ফুল প্রেসক্রিপশন যোগ হওয়ায় ওষুধের কমতি নেই আমার। স্প্যানিশ জাহাজ ডুবে গেলে যেভাবে গভীর সমুদ্রের নিচ থেকে গোল্ড কয়েন কুড়ায় মানুষ, আমিও ঠিক তেমনি। ঠিক কতটুকু গোল্ড
কয়েন কুড়াতে পারলে গোল্ড কয়েনের ভারে আমি চিরদিন সমুদ্রের
নিচে থেকে যেতে পারি তা আমি মেপেছি, প্রতিটি ওষুধ পাল্লায় দিয়ে দিয়ে। সূর্য-র বাড়িতে গিয়ে মিষ্টি কুকুরছানা ক্রোকাস, আমার বড় মেয়ে এলা, আর সূর্যের সাথে দেখা করে এলাম।
এলা বলল, ‘Oh mom! I missed you so much!’
সূর্য বলল, ‘কী রে আনন্দ, আছিস কেমন?’ এক কাপ দুধ চা বানিয়ে দিল ও। তিন চামচ চিনি!
ক্রোকাসের সাথে কিছুক্ষণ বল নিয়ে খেললাম। কয়েকজন প্রিয় বন্ধুকে ফোন করলাম। শেষবারের মত ওদের সবার সাথে হাসলাম। যাদের ফোনে পেলাম না তাদের ভয়েস মেলে আমার গলার স্বর থেকে গেল। যদি সত্যিই চলে যেতে পারি ওরা আমার গলার স্বর শুনতে পাবে। মানুষের গলার স্বরটুকুই তো শেষ পর্যন্ত আসল। শরীর তো নয়!
বাড়িঘর সাজালাম। জীবনের জলসা! আমার মৃত্যুর পর কেউ যেন আমার ঘরদোর নিয়ে সমালোচনা না করে। আর যাই হোক, এ জীবনে আমি অন্যের কিংবা নিজের সমালোচনা যথা সম্ভব কম সহ্য করতে পারি। কেমন এক অন্ধকার কূয়ার ভিতর পড়ে যাই। যেখানে সবুজ শ্যাওলাও নেই। জীবন নেই! ভারী সুন্দর একটা ঘন নীল রঙের কাঁচের গ্লাস আছে আমার। তার
গায়ে সমুদ্রের ঢেউ-এর মত আঁকা। সেই গ্লাসে জল ভরলাম আমি।
তারপর মুঠো মুঠো ওষুধ খেতে শুরু করলাম। ওভারডোজ। হালকা গোলাপি, হালকা নীল, হালকা হলুদ আর সাদা রঙের ওষুধ…বেবি কালার সব…হাতছানি দিয়ে ডাকছে নরম রঙের hydroxyzine, lithium carbonate, clonazepam, oxcarbazepine, propranolol, risperidone, ambien…
সিলভিয়া প্লাথের “Paralytic” কবিতার কথা মনে পড়ল। দাঁতের উপর সারি সারি ওষুধ, মুখভর্তি ওষুধ। মুক্তার মত ঝলমল করছে। মৃত্যুর পথে চলেছে প্লাথ। আমিও। সূর্যোদয় আর সূর্যাস্তের রঙের পার্থক্য আমার চোখের উপর থেকে মিলিয়ে যাচ্ছে…
এ পৃথিবী পুরোপুরি অন্ধকার হয়ে যাওয়ার আগে সূর্যকে একটা ফোন করেছিলাম। চিরদিনের দিশাহারা আমি। সূর্য-র কাছে সবসময়ই আমার ঘরের দিশা রাখবার জন্য একটা চাবি থাকত।
“আনন্দ বলছিস?”
তারপর আর কিছু মনে নেই আমার। অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম। এরপরের সবকিছুই শোনা কথা।
সূর্য এসে 911 কল করে। ‘Shurjo saved my life!’
ততক্ষণে পুলিশের গাড়ি, ফায়ার ট্রাক আর এম্বুলেন্স এসে গেছে। মুখ দিয়ে ফেনার মত ওষুধ বের হচ্ছে। একা ছিলাম বাড়িতে। অজ্ঞান হওয়ার আগে যদি সূর্যকে ফোনটা না করতে পারতাম, বাঁচানো যেত না আমাকে। প্যারামেডিক বলেছিল হাতে মিনিট দশেক সময় আছে।
ধীরে ধীরে কমে আসছে হার্টবীট। নিভে আসছে জীবনের প্রদীপ। এম্বুলেন্সের আলো জ্বালিয়ে ওরা দ্রুত ছুটে যাচ্ছে ইমারজেন্সির দিকে...
লাইফ সাপোর্টে রেখেছিল আমাকে। হাত পা বেঁধে রেখেছিল যেন বাঁধ ভেঙে দাও, বাঁধ ভেঙে দাও গান গেয়ে আমি সব অজস্র টিউব ছিঁড়ে না ফেলতে পারি! ঠিক যেভাবে জেলখানায় কয়েদিদের পায়ে শিকল পরানো থাকত! পরে যখন বিপর্যস্ত আর বিধ্বস্ত এলা দেখতে এসেছিল আমায়, ও বলে কী, ‘Mom, you are looking like a sci-fi movie!’
ব্রিদিং টিউব, টেম্পরারি পেসমেকার বসিয়েছিল ওরা। কনসেন্ট দিয়েছিল আমার বড় মেয়ে এলা। এলা দিতে না পারলে দিতে হ’ত আমার ছোট মেয়ে খেলা-র। আর তা না হ’লে আমার ছোটবোন অশ্রুর।
ছেলেবেলার সিঁড়িভাঙা অংক যত্তসব! ফিডিং টিউবের কনসেন্ট দিয়েছিল খেলা। লিগ্যালি আমার জীবনের আর কোন ধরণের কনসেন্ট দিতে পারে না এখন সূর্য! আর আমাদের ক্রোকাস তো এক হতচ্ছাড়া! কোন কিছুতেই কনসেন্ট দেওয়ার কোন অধিকারই নেই ওর। শেখবার ইচ্ছেও নেই। আসলে এক লেজ নাড়ানো আর পোস্টম্যানকে ভৌ দেওয়া ছাড়া অন্য কিছুই শেখেন নি তিনি! তা
কলম ধরতে না হয় না পারুক, চার হাত-পা দিয়ে টিপসই তো দিতে পারেন! নাহ, বুদ্ধু একখান! তবে আজকাল দেখি পোস্টম্যানরাও চালাক হয়ে গেছে। ক্রোকাসের মত ‘Adbhut Kalyan raga’ তে গান গাওয়া কুকুরদের জন্য তারা পকেটে করে ডগবিস্কুট নিয়ে ঘোরে!
আমি আই সি ইউ-তে ছিলাম। আমেরিকার আই সি ইউ নরক থেকে স্বর্গের দরজা। ‘Rainbow bridge!’ ওরা আমায় ভেন্টিলিটারে রেখেছিল। ইনটিউবেশন করতে হয়েছিল।
‘ল্যাজারাস আমি, মৃত্যু থেকে ফিরে এসেছি,
মৃত্যুর গল্প বলতে ফিরে এসেছি, বলব তোমাদের’-
--(মূল - টি. এস. এলিয়েট, ভাষান্তর – কল্যাণী রমা)
কল্যাণী রমা
জন্ম ঢাকায়। ছেলেবেলা কেটেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। ভারতের খড়গপুর আই আই টি থেকে ইলেকট্রনিক্স এ্যান্ড ইলেকট্রিক্যাল কমুনিকেশন ইঞ্জিনীয়ারিং-এ বি টেক করেছেন। এখন আমেরিকার উইস্কনসিনে থাকেন। কাজ করেছেন ম্যাডিসনে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং স্পেশালিষ্ট হিসাবে।
প্রকাশিত বইঃ
আমার ঘরোয়া গল্প (যুক্ত)
হাতের পাতায় গল্পগুলো – ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা (চৈতন্য)
রাত বৃষ্টি বুনোহাঁস – অ্যান সেক্সটন, সিলভিয়া প্লাথ, মেরি অলিভারের কবিতা(চৈতন্য)
মরণ হ’তে জাগি – হেনরিক ইবসেনের নাটক (যুক্ত)
রেশমগুটি(যুক্ত)
জলরঙ(যুক্ত)
দমবন্ধ (যুক্ত)
লবঙ্গ এলাচ দারচিনি (সৃষ্টিসুখ, কলকাতা)
কবিতার ইকেবানা (যুক্ত)



0 মন্তব্যসমূহ