অনুবাদ: মৌসুমী বিলকিস
এবং, এরকমই জীবন ছিল আমার, ছোটো ছোটো কিছু সুখের মুহূর্ত বাদ দিলে দুর্দশাপীড়িত এক পুরুষ। দুর্দশাপীড়িত পুরুষ আসলে সে-ই যার পিছন সবার পায়ের দয়ার ওপর নির্ভর করে থাকে, আসলেই তামাম পায়ের, এমনকী দুর্দশাপীড়িতদের পায়ের ওপরও। সবথেকে মজার ব্যাপার কী জানেন? সারা জীবনে কোন প্রাণীর সান্নিধ্যে সবচেয়ে বেশি এসেছি এ বিষয়ে কোনো বিচারক বা সাংবাদিক প্রশ্ন করলে দ্বিধাহীন উত্তর ছিল- আরশোলা। মানুষের সেরা বন্ধুর খেতাব পাওয়ার প্রতিযোগিতায় জিতে যাওয়া কুকুর, বিড়ালের থেকেও আরশোলার সান্নিধ্য পেয়েছি বেশি। সেই বিরল দিনগুলোয় যখন আমার খাদ্যের অভাব হয়নি, আমি শপথ করেছিলাম, যদি দৈব অঘটনে কোনোদিন সম্মানিত হই তাহলে আমার প্রতীক চিহ্ন হবে নীলের প্রেক্ষাপটে জমকালো সোনালি আরশোলা…। কিন্তু তবুও এই প্রাণীগুলোর বিষয়ে দীর্ঘশ্বাস আর হাহাকার মেশানো গভীর, তীব্র ঘৃণা ছাড়া আর কিছুই অনুভব করিনি। বছর বছর বাড়তে থাকা আমার দুর্দশার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সংখ্যায় বেড়েছে আমার আশেপাশের আরশোলাও। যেখানে বছর শেষে কিছু মানুষের পুরস্কার ছিল টাকা, শেয়ার, উপহার, মনোরম সব ঘরবাড়ি, এমনকী মেয়েদের সঙ্গে অবসর যাপনও; সেখানে আমার উপহার, আমার শেয়ার, আমার লভ্যাংশ সবই আরশোলা। বিশেষ করে মনে পড়ে নববর্ষের আগের সেই রাত, সম্ভবত সবচেয়ে দুর্দশাপীড়িত রাত, দুর্বলতায় প্রায় অচেতন আমি ঘরে ফিরি (নিম্নপদস্থ কর্মচারীদের জন্য আয়োজিত একটা ইস্টার জমায়েত থেকে সবেমাত্র ফিরেছি), ঘরের আলো জ্বালতেই দেখি আরশোলার দঙ্গল দিগবিদিকে ছুটে পালাচ্ছে, এরা যেন বা সেইসব জনতা যারা তাদের প্রিয় নেতার আগমনে উল্লসিত হাততালিতে ফেটে পড়ে… মাফ করবেন, এই প্রাণীগুলোর কথা না বলে পারছি না। তাছাড়া, ওদের কথা যদি না বলি তাহলে আর কি-ই বা বলব? আমার হাহাকার, আমার খিদে, আমার চরম হতাশা, আমার আতঙ্ক--- সবকিছুর নীরব সাক্ষি থেকেছে ওরা। মানুষ বাইরে বেরিয়ে বন্ধুর সঙ্গে দেখা করে তার খিদের কথা জানায়, আত্মীয়র সঙ্গে দেখা করে ধার চায়, জুতোর সুকতলা ক্ষয়ে কোনো মন্ত্রীর দপ্তরে রুজিরুটির জন্য অনুনয়-বিনয় করে; কিন্তু আত্মীয়, বন্ধু বা মন্ত্রী কেউই আমাদের প্রাত্যহিকতার নীরব সাক্ষী নয়। তারা থাকে মুহূর্তের জন্য, আর আরশোলারা চিরকালীন। একেবারে শুরুর দিকে, যখন আশায় আশায় বাঁচি, আমি ওদের নির্বংশ করার চেষ্টা করি। পতঙ্গগুলোর সঙ্গে এক ক্লান্তিকর লড়াইয়ের পর নিজেকে বুঝাই সবকিছু বদলে যাবে, আমার প্রতি প্রসন্ন হবে ভাগ্য; যদি আমার ঘরে একটাও আরশোলা না থাকে, আমার জীবনও ওদের মতো তুচ্ছ হবে না। নিশ্চিতভাবেই প্রাচুর্যের সুস্বাদু ফল নিয়ে আমার দরজার দিকে কেউ এগিয়ে আসছে আমারই উদ্দেশে; আমি স্পষ্টতই শুনি তার পদধ্বনি, এমনকী দেখি আমার দিকে বাড়িয়ে দেওয়া উপহারে উপচে পড়া তার হাত। কিন্তু এসব সত্যি হওয়ার বদলে পরবর্তী বছরগুলোয় কানে ধাক্কা দেয় নিজেরই খিদের করুণ আর্তনাদ। তখনই আমি আরশোলা নিধন যজ্ঞ পরিহার করি; বুঝি যে তারা আমারই অংশ, বাকি পৃথিবী নিছক এক মায়া, আর ওরা, ওরাই একমাত্র বাস্তব। ক্রমে ক্রমে সবকিছুই আমাকে বুড়ো আঙুল দেখায়, কেবল আরশোলারা ছাড়া; তারা আমাকে এমনভাবে অধিকার করে যে আমি মানুষের হাতের পরিবর্তে দেখি আরশোলার পাখা, মানুষের পায়ে দেখি আরশোলার পা। এই অবস্থা চূড়ান্ত রূপ নেয় সেদিন যখন একজনকে বলি, “ওপরওয়ালা আপনার মঙ্গল করুন, আরশোলা…”, এই সেই মানুষ যিনি এইমাত্র আমাকে একটা পুরোনো স্যুট দান করেছেন। হতাশার গভীরে তলিয়ে যাই। ছুট লাগাই নিজের ঘরে, বন্দি করি নিজেকে। ঠিক করি আর কোনোদিন রাস্তায় বেরোব না। আমার চেতনা যেন লোপ পায়: পৃথিবীকে যদি একটা আস্ত আরশোলা ভাবি তাহলে আমার সগোত্র প্রাণীদের থেকে আর কি-ই বা আশা করতে পারি? আরশোলাদের আজ পর্যন্ত কখনো কোনো সৃজনমূলক কাজ করতে দেখিনি। বরং তারা সামনে যা পায় তা-ই গেলে গোগ্রাসে। তাহলে আমার এত লড়াইয়ের মানে কী?... কয়েক দিনের মধ্যেই আমি মৃত্যুর দিকে ঢলে পড়ি। তাতেও কিছু বদলায় না: আরশোলারা আগের মতোই চলাচলে বিরামহীন, ছুটে পালায়, অসহ্য গন্ধ ছড়ায়, ডানা ঝাপটানোর ভয়ানক শব্দ করে, আর আমার বিষণ্ণতা যত গভীর হয় ততই বাড়ে তাদের রংবাজি, আমার শরীরে উড়ে এসে বসে, প্রথমে একটু দ্বিধা নিয়ে, পরে প্রবল দুঃসাহসে, কাপড়ের টুকরোগুলো খেয়ে ফেলে আরও ভালো কিছু পাওয়ার প্রত্যাশায়। এক দলের মাধ্যমে খবর পায় আরেক দল, লুপ্ত চেতনার ক্ষণিক জাগরণে টের পাই তাদের অসহ্য ভার, যেন বা আমার শরীর জুড়ে চেপে আছে অত্যন্ত ভারী একটা বর্ম। এই কল্পনা কি বাড়াবাড়ি হবে-- কর্তৃপক্ষ, যারা আমার দরজা ভেঙে ঢুকবে, বিস্ময়ে চিৎকার করবে, পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো আরশোলাটিকে দেখে?
----------------
মূলগল্প: How I Lived and How I Died
অনুবাদক পরিচিতি: লেখক পরিচিতি: মৌসুমী বিলকিস কবি, গল্পকার ও চলচ্চিত্র পরিচালক। জন্ম ৭ আগস্ট, ১৯৭৭, কলকাতা থেকে প্রায় দুশ কিমি দূরে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে।
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। ইন্দো-ইতালীয় ফিল্ম স্কুল রূপকলা কেন্দ্র থেকে চলচ্চিত্র পরিচালনা বিষয়ে পোস্ট-গ্রাজুয়েট।
প্রকাশিত বই: এবং আমার চুলগুলি ফণা তুলছে (কবিতা, ২০১৮), একাকী কয়েকটি জীবন ও অন্যান্য (গল্পগ্রন্থ, ২০১৭), হলদে শাড়িটি ও অন্যান্য অণুগল্প (২০১৮)
উপন্যাস: একা এবং এক রাত্রি (সাহিত্য ম্যাগাজিনে প্রকাশিত এবং অগ্রন্থিত)
পরিচালিত চলচ্চিত্র: কবি (তথ্যচিত্র, ২০০৪), শবনম (শর্ট ফিকশন, ২০০৪), আবাদ (ডকু-ফিকশন, ২০০৭), Voix de Femmes Indiennes (যুগ্ম পরিচালনা, ডকু-ফিকশন, ২০১৮) ইত্যাদি।
নির্মীয়মাণ চলচ্চিত্র: Walking Through The Fire (তথ্যচিত্র), Bach in the Afternoon (শর্ট ফিকশন), Sound Of Cosmic Self (তথ্যচিত্র) ইত্যাদি।
সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন ঋতুপর্ণ ঘোষ-সহ অনেক প্রথিতযশা পরিচালকের সঙ্গে। চলচ্চিত্র, সাহিত্য ও অন্যান্য বিষয়ে প্রায়শই তার লেখা প্রকাশিত হয় কলকাতার বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকা, লিটিল ও ডিজিটাল ম্যাগাজিনে।
0 মন্তব্যসমূহ