অনুবাদ: প্রতিভা সরকার
বন্ধুটি দুজোড়া প্রেমিক প্রেমিকাদের জন্য সব ব্যবস্থা করে ফেলেছিল। এই প্রথমবার তারা পরস্পরের দেহমিলনের স্বাদ পাবে।
এইজন্য যা যা ব্যবস্থা করতে হয়, সবই নিখুঁত ভাবে করা হয়েছে, শর্ত একটাই, বন্ধুর এই সহৃদয় আয়োজনের পরিবর্তে তাদের দুটি জিনিস মেনে চলতে হবে - তারা মিলিত হবে ঘন অন্ধকারে এবং সম্পূর্ণ নৈঃশব্দের মধ্যে।
তাই প্রেমিক প্রেমিকারা পৌঁছলে বন্ধুটি সাফ জানিয়ে দিল, এই আলোকিত ঘরে যেখানে তারা দাঁড়িয়ে আছে, সেটাই তাদের যৌন-মদির মিলনের আগে শেষ আলোকদর্শন!
সেখানেই একট আধটু কথাবার্তার পর তারা একটা সংকীর্ণ সুড়ঙ্গ দিয়ে এগিয়ে গেল বিরাট দরজার দিকে, তাদের বন্ধু বলেছিল, সেই দরজার ওপারেই আছে দুটি সজ্জিত বাসরঘর।
সুড়ঙ্গেও কিন্তু ঘন অন্ধকার। আলোর ছিটেফোঁটাহীন যাত্রাপথে প্রেমিক প্রেমিকারা কেবল শুনতে পাচ্ছিল আঁধার-অভ্যস্ত বন্ধুর কন্ঠস্বর, এই তোমরা এসে গেলে পার্থিব স্বর্গের দ্বারে, আমি খুলে দিলাম সেই দরজা। এবার ভেতরে প্রবেশ কর, হে অমর সঙ্গীরা, যদিও অন্ধকারে ভাগ্যের নির্দেশে পরস্পরের কাছ থেকে তোমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তেও পার !
এ কথায় প্রেমিক প্রেমিকারা হঠাৎ যেন শিউরে উঠল ! কোথা থেকে ছুটে এল ঝোড়ো হাওয়া, মেয়েদের গাউন উড়িয়ে দিল এক নিমেষে। নিদারুণ ভয়ে তারা প্রেমিকের হাত ছেড়ে দিয়ে ছুটে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা খোদ বন্ধুর বুকের ওপর। মিটিমিটি হেসে সে তাদের কবজি ধরল মুঠোতে, তারপর দুজনকেই এমন ভাবে একপাক ঘোরালো যাতে একজন আরেকজনের প্রেমিকের বুকে এসে পড়ে।
প্রেমিক পুরুষ দুজন দাঁড়িয়েছিল শিক্ষণপ্রাপ্ত ঘোড়ার মতো উত্তেজিত ও নিঃশব্দ। বন্ধুর ইঙ্গিত কানে আসতেই অজান্তেই ভুল প্রেমিকাকে নিয়ে তারা ঢুকে পড়ল পৃথক পৃথক প্রমোদ কক্ষে।
তারপর অচিন্ত্যনীয় রভসে রাত কাটাল তারা। বিন্দুমাত্র শীৎকারের শব্দ না করেও তারা পরস্পরকে এমন তুমুল উপভোগ করল যে কতবার তাদের আনন্দপাত্র পূর্ণ হয়ে আবার রিক্ত হয়ে গেল।
এদিকে আলোকিত কক্ষে বন্ধুটি ছটফট করছিল। কী হবে যখন বন্ধুরা জানতে পারবে এই বদলাবদলির কথা! কী ভাববে তারা যখন দেখবে তারা রতিমিলনে লিপ্ত হয়েছে অজানা জনের সঙ্গে !
কী করা যায় ! আর একবার মেয়েদের চুপচাপ তাদের সঠিক জুড়ির সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া ঠিক হবে কি? কিন্তু তারা যদি সন্দেহ করে ?
হঠাৎ বন্ধুর মুখ হাস্যোজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে হাততালি দেওয়ামাত্র দুজন পরিচারক ছুটে এল, তাদের কানে কানে বলা নির্দেশ শুনে নিয়েই আবার কোথায় যেন চলে গেল। এবার যখন তারা ফিরে এল, তাদের হাতে রয়েছে ছোট ছোট সোনার সূঁচ আর বিরাট বিরাট রূপোর কাঁচি। বন্ধুর নির্দেশে তারা মিলনক্লান্তদের কক্ষে ঢুকে গেল আর হাতড়ে হাতড়ে চারজনেরই জিভ কেটে চোখ উপড়ে নিল।
এইবার এই বোবা ও অন্ধ পুরুষ নারীদের নিয়ে আসা হল পূর্বের আলোকিত কক্ষে, যেখানে বন্ধু তাদের জানাল, তাদের মিলন রাত্রিকে অপার ও অনিঃশেষ করবার জন্য সে এই কাজ করেছে। এ কথা শুনে সেই ক্ষতবিক্ষত মুখগুলিতে ফুটে উঠল অসীম সুখ এবং ইশারায় তারা বন্ধুকে জানাল তার এই কাজের জন্য তারা কত কৃতজ্ঞ !
তারপর তাদের কত সময় কেটে গেল মিলনের আনন্দে। মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী, তাই সেই সময় এলে এই আদর্শ প্রেমিক প্রেমিকার দুজোড়াই আক্রান্ত হল একই রোগে এবং আদর্শ প্রেমের পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে তারা একই মুহূর্তে শেষ নিঃশ্বাস নিল।
এ খবর শুনে বন্ধু আবার একটু হাসল। তাদের সমাধিস্থ করবার সময় সে ফের একটা অদলবদল ঘটাল, দুই ক্ষেত্রেই প্রেমিকের কাছে ফিরিয়ে দিল সঠিক প্রেমিকাকে।
বন্ধু ফেরাল তো ফেরাল, তাতে কী হল, অজ্ঞ মানুষ মানুষীরা কিছু না জেনেবুঝেই তাদের অবিস্মরণীয় রতিমিলনের আনন্দ হৃদয়ে নিয়ে পাশাপাশি কবরে শুয়ে রইল।
-----------
মূলগল্প: The Switch
অনুবাদক পরিচিতি: প্রতিভা সরকার একজন ভারতীয় ঔপন্যাসিক এবং ছোট গল্পকার। অনুবাদ কর্মেও তিনি আগ্রহী। ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র এবং অধ্যাপক প্রতিভা নিজের পাঠ এবং পেশাসূত্রেই অনেক অনুবাদের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন। রতিভা সরকারের প্রথম উপন্যাস মানসাই। প্রকাশিত হচ্ছে আরও দুটি, রসিকার ছেলে এবং কমলেকামিনীর কিসসা। প্রবন্ধের বই মেয়েদের কথা এবং হননকাল। ছোট গল্প সংকলন ফরিশতা ও মেয়েরা, গুনিন ও বেলেহাঁস, শ্মশানবন্ধু, সদাবাহার।


4 মন্তব্যসমূহ
এই গল্প পাঠের প্রতিক্রিয়া দেওয়ায় অপারক হয়ে গেলাম।সভ্যতা কী ক্রমাগত অন্ধ আর মূক হয়ে যাচ্ছে
উত্তরমুছুনভূতের গল্প নয় মোটেই। একজন স্যাডিষ্ট, যে অন্য কে কষ্ট দিয়ে আনন্দ পায়। কিংবা হয়তো এর অন্য কোনো মাত্রা আছে । আমিই বুঝতে পারলাম না।
উত্তরমুছুনবহুমাত্রিক ভাবনার একটি গল্প, নানা ভাবে দেখা যেতে পারে। আসলে আমাদের বহুগামী কামনার একটা ইঙ্গিত রয়ে গেছে শেষে। প্রতিভাদি, চমৎকার।
উত্তরমুছুনভয়ংকর!
উত্তরমুছুন