অনুবাদ: রঞ্জনা ব্যানার্জী
গত মঙ্গলবার দুপুর তিনটের দিকে দামিয়ানের ফোন এসেছিল, “কী খবর, কেমন আছ? কী করছ?”
“সবে খেয়ে উঠলাম,” উত্তর দিলাম আমি, “বিছানায় খানিকক্ষণ গড়াব, তারপরে খবরের কাগজ পড়ব। কেন বল তো?”
“গাড়িতে উঠে সোজা ‘পনের তলা’ বিল্ডিঙে চলে এসো। “
“ঘটনা কী?”
“প্রশ্ন করো না তো। গাড়িতে ওঠো। এলেই দেখতে পাবে…,”
“দামিয়ান শোনো, আমার সময় নষ্ট করার সময় নেই। কী সমস্যা ঝটপট বলে ফেল। “
“কোনো সমস্যা নেই। তোমাকে যেমনটি বলছি তেমন কর, গাড়িতে ওঠো। ‘পনের তলা’র কোণে একটা পার্কিং লট আছে, আমি সেইখানে অপেক্ষা করব ।” এটুকু বলেই দামিয়েন লাইন কেটে দিলো। সত্যি বলতে কী আমি সেই মুহূর্তে দামিয়ানের ফোন নিয়ে অতটা ভাবিনি। কিন্তু খানিক সময় যেতেই আমার উৎকণ্ঠা হতে লাগল। আমি ওকে ফোন করলাম,ও বাড়িতে নেই। আচ্ছা পনের তলায় কি আগুন লাগতে পারে? অবশ্য আগুন লাগা না-লাগায় আমার কিছু যায় আসে না। সেইসব দিনে দামিয়ান আর আমি এমন অগ্নিকাণ্ডের চেয়েও দুর্দান্ত সব দুর্যোগ চাক্ষুষ করেছি। আসলে দুপুর তিনটের সময় , গরমের ভেতর ভাতঘুম বাদ দিয়ে গাড়িতে চাপার বিন্দুমাত্র আগ্রহ জাগছিল না। আমি না-যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম বরং এসি ছেড়ে দারুণ একটা ঘুম দেবো ঠিক করলাম। তবে তার আগে আমার বৌ, ডোরাকে কাহিনীটা বললাম। ডোরা তখন রান্নাঘরে বাসন ধুচ্ছিল। এবার ডোরা কী বলল শুনুন:
“আহা কী বল! চল আমিও যাচ্ছি সঙ্গে! ঝটপট পাজামা পাল্টাও; আমি তৈরীই। মাথায় চিরুনি চালিয়ে নিলেই হলো।“এবং সে আধা ধোয়া সব সরঞ্জাম ওভাবে রেখেই পা বাড়ালো। আমি ওর বাহু টেনে থামালাম,
“ডোরা, মাথা খাটাও একটু। দামিয়ান সব কিছু নিয়ে মজা করতে ওস্তাদ। আমরা পনের তলার বিল্ডিঙের নিচে পৌঁছানোর পরে যখন দেখব আসলে কিছুই ঘটেনি, তখন ওর চেহারাটা কেমন হবে ভেবেছ?”
“যা হয় হোক, তারপরেও আমরা যাব; আমার মন বলছে…”
“তোমার মন আসলে কিছুই বলছে না এটা হলো বিচ্ছিরী মেয়েলী কৌতুহল” …
“সে তোমার যেমন ইচ্ছে পরে ভেবো, এখন আমরা যাচ্ছি। হাঁদার মতো দাঁড়িয়ে না থেকে ঝটপট জামা পাল্টে চল.। “
অতএব যেতেই হলো। ডোরার মাথায় একটা কিছু ঢুকলে তা বার করতে হলে, হয় ওকে ছাড়তে হবে নয়তো খুন। তবে এইক্ষেত্রে আমাকে স্বীকার করতেই হবে, ওর সেদিনকার অদম্য কৌতূহল কিংবা মেয়েলি স্বজ্ঞা ওর অনুমানের মান রেখেছিল।
আমরা পনের তলা বিল্ডিঙের চত্ত্বরে পৌঁছাতেই দেখলাম লোকজনের ভিড় জমে গেছে।
ডোরা আমাকে টানতে টানতে এগোচ্ছিল, এত লোকজন দেখে সে যারপরনাই উত্তেজিত, খানিক পরপর আফসোস করে বলে চলেছে, “সেরা মুহূর্তটা মনে হয় ফস্কে গেলো …,”
“ঈশ্বরের দোহাই ডোরা, মাথা খাটাও,” আমি ওকে থামাতে চাইছিলাম, ও ততক্ষণে টানতে টানতে আমার বাহুর জোড় প্রায় খুলে ফেলেছে । “তুমি তো জানোই না পনের তলায় কী ঘটছে, সেরা মুহূর্ত আবার ফসকায় কী করে?”
সে ভিড় ঠেলে যেতে যেতে বলছিল, “আমি জানি …আমি সবকিছু জানি।
যাই হোক কীভাবে জানি না, আমরা শেষ পর্যন্ত বিল্ডিঙের সামনে পৌঁছে গেলাম। প্রথম দিকে উল্লেখযোগ্য কিছুই চোখে পড়লো না, এমনকি দামিয়ানও নয় । ওর রসিকতা সংক্রান্ত অনুমান মাথা থেকে হটিয়ে, ভাবলাম এই জনসমুদ্রই হয়তো ওকে আমাদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে। তবে এ নিয়ে ভাববার ফুরসৎ পাইনি কেননা ঠিক তখনই লোকজন উল্লাসে ফেটে পড়েছিল। সবার দৃষ্টি বিল্ডিঙের ওপর তলার দিকে… টের পাচ্ছিলাম ডোরা আমার ঘাড় চেপে আমি যেদিকে তাকিয়ে আছি তার উলটো দিকে আমার মাথা ঘুরিয়ে দিচ্ছে। এবং এর পরেই আমিও দৃশ্যটি দেখতে পেলাম - দশ তলার ব্যালকনির রেলিঙে ভর দিয়ে এক লোক একজন নারীকে বাহুতে আলগে ধরে আছে। ঠিক যেন ‘পিয়েতা’র উলটো দৃশ্যকল্প : এক্ষেত্রে লোকটি মা মেরী আর নারীটি হয়ে গেছে ক্রুশবিদ্ধ যিশু । যদিও এত দূর থেকে কারও পক্ষেই বিশদে এই দৃশ্যের তারিফ করা সম্ভবপর নয়, তারপরেও আমি দেখতে পাচ্ছিলাম দুজনই মূর্তির মতোই নিশ্চল হয়ে আছে ; যেন ঝুলবারান্দাটির নান্দনিক শোভার জন্যই ওদের ওখানে স্থাপন করা হয়েছে।
কিছু সময় পরে , লোকটি ধীরে ধীরে পেছাতে লাগল এবং একসময় আমাদের দৃষ্টিসীমার বাইরে অদৃশ্য হয়ে গেল। অনেকে তখনও ব্যালকনি থেকে চোখ সরাচ্ছিল না, যেন তাদের অক্ষিপটে সদ্য অদৃশ্য হওয়া অদ্ভুত যুগলের ছাপচিত্র তৈরির প্রক্রিয়া চলছে । অবশ্য বেশিরভাগ মানুষ নানা মন্তব্য করছিল, কেউ কেউ বিল্ডিঙের দিকে এগোচ্ছিল। ডোরার হাবভাব দেখে মনে হচ্ছিল ও যেন আগে থেকেই সব জেনে বসে আছে। আমার বাহু টেনে হাঁটতে বাধ্য করছিল। যেতে যেতে লোকজনের নানা কথা কানে ভেসে আসছিল , “লোকটা নিজেকে স্রেফ জাহির করছে … আত্মহত্যা করতে চেয়েছিল, ভয় পেয়েছে …, প্রতিবিপ্লবী… সুযোগসন্ধানী…” একলোককে তার নারীসঙ্গীর উদ্দেশ্যে বলতে শুনলাম, “বাড়ি চল, তোমাকে আল্গাতে আমার মতন একজন পুরুষই যথেষ্ট।“
“পারছি,” ডোরা উওর দিয়েছিল । “কিন্তু সমস্যাটা হচ্ছে ওখানে কীভাবে পৌঁছানো যাবে.। “
“ওখানে? … মানে ঐ অ্যাপার্টমেন্টে যেখানে পাগলটা আছে?”
“অবশ্যই! ওখানে যাওয়ার জন্যে আমার প্রাণ বেরিয়ে যাচ্ছে। “
যাই হোক শেষমেশ আমরা সেখানেও যেতে পারলাম। কীভাবে জানি না, কিন্তু আমরা পারলাম। বিল্ডিঙের প্রবেশমুখে প্রায় আধা ডজন পুলিশ দাঁড়ানো ছিল। ডোরা আমাকে তাড়া দিচ্ছিল, “তোমার সাংবাদিক পরিচয়পত্র দেখাও। “
আমি যখন আমার পরিচয়পত্র দেখাচ্ছিলাম ও তখন আমাকে রীতিমত ধাক্কা দিচ্ছিল, এবং পুলিশ অফিসারদের একজনকে বলেছিল, “আমার স্বামী একজন সাংবাদিক, এই বিষয়ে প্রতিবেদন লিখবে বলে এসেছে এখানে…”
ডোরা এমনই: সবসময়ই আগ বাড়িয়ে দায়িত্ব নিয়ে নেয়। আমি বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু সে আবারও আমার বাহু টেনে ধরেছিল এবং আমাকে প্রায় ধাক্কিয়ে অ্যালিভেটরের সামনে নিয়ে গিয়েছিল। আমরা ওপরে উঠেছিলাম। দশ তলায় আরও পুলিশ ছিল, ফলে আরও ব্যাখ্যা এবং ডোরার এই সংক্রান্ত অনর্গল মিথ্যা বলাও চলেছিল পাল্লা দিয়ে।
অবশেষে আমাদের ভেতরে যাওয়ার অনুমতি মিলল। ভেতর থেকে এক বৃদ্ধা বেরিয়ে এলেন । ডোরা তাঁকে যথারীতি আমার সাংবাদিক পরিচয়টি জানাল। বৃদ্ধা এই তথ্যে বেশ প্রীত হলেন।
“এই দিকে আসুন,” তিনি বলতে লাগলেন, “আজ প্রচুর লোক এসেছে। গতকাল থেকে শুরু হয়েছে; কেউ বিশ্বাস করতে চায়নি, তাছাড়া সকলে বেশ আতঙ্কিত ছিল। ওরা ধরে নিয়েছিল তিনি পাগল।“এইসব বলার সময় হাত বৃদ্ধা হাত নাড়ছিলেন এবং মাথা এমনভাবে ঝাঁকাচ্ছিলেন যেন এই সাংঘাতিক দুর্নাম তিনি নিজেই খারিজ করছেন। তিনি বললেন, “ইনি একজন সন্ত! আসলে সন্তই!”
অতঃপর আমরা ছোটো একটা কক্ষে ঢুকলাম। বৃদ্ধা আমাদের বসতে বললেন, আমরাও বসলাম।
এরপর কথা নয়া বাড়িয়ে, বৃদ্ধা সরাসরি জানতে চাইলেন, “আপনি কী জানতে চান স্যার?” “ইয়ে বেশ,” আমি তোতলাচ্ছিলাম, “বেশ …আমি …“ এবং আমার উত্তেজিত স্নায়ুর কারণেই হয়তোবা এরপরে কোনো ভূমিকা ছাড়াই ফট করে বলে বসলাম, “কী ঘটছে আসলে এখানে?”
বৃদ্ধা মাতৃসুলভ হাসি দিলেন, বললেন, “যা ঘটছে তা হলো, তিনি একজন সন্ত…”
আমি খানিক রূঢ় স্বরেই বললাম, “তো তারপরে কী…”
“আপনি নিশ্চয় বুঝবেন …আজ মঙ্গলবার ঠিক? তো রোববার দশটার দিকে আমার দরজায় কেউ টোকা দিলো। ইনিই তিনি। ঈশ্বরের ইচ্ছাই ছিল তেমন, যেন আমি তক্ষুনি দরজা খুলে ঢুকাই তাঁকে। আপনাদের একটা কথা বলা জরুরি, আমি কিন্তু দরজার ফুঁটোতে কে এলো নিশ্চিত হয়ে দেখে তবেই দরজা খুলি। কিন্তু সেদিন টোকা পড়া মাত্রই যেন ঈশ্বরের নির্দেশে দরজা খুলে দিয়েছিলাম । এবং তিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন – আপনারা তো তাঁকে সামনাসামনি দেখেন নি এখনও, তাই ধারণা করতে পারবেন না কতটা রূপবান এবং ঋষির মতো দেখতে তিনি। এরপরে কী করলেন জানেন? আমাকে কোনো প্রশ্ন করবার সুযোগ না দিয়েই সরাসরি ব্যালকনিতে চলে গেলেন। কাচের দরজাটা খুললেন এবং তাঁর অর্ধেক শরীর রেলিঙের ওপর থেকে নিচে ঝুলিয়ে দিলেন।
“ব্যস এটুকুই!” ডোরার প্রশ্ন। (আহারে! মহিলা! ইনার কল্পনাশক্তি একেবারে যাচ্ছেতাই -আমার চেয়েও খারাপ!)
“না,” বৃদ্ধা উত্তর দিলেন। “তিনি ব্যালকনির ওপর থেকে অর্ধেক শরীর ভাসিয়ে তো দিলেনই এর পরে দুই হাত ছড়িয়ে দিয়ে ক্রুশ তৈরি করলেন…”
“তারপর কী?” ডোরা তাঁর কথা প্রায় লুফে নিলো।
“তিনি সেভাবেই কিছু মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইলেন, নিশ্চল - যেন প্রাণহীন কেউ।“
বৃদ্ধা খানিকক্ষণ ভাবলেন, এবার খানিক রঙ চড়ালেন, “দেখুন, স্যার, আমি কোনো কিছু নিয়েই বিশদ জানি না, কিন্তু ঘটনা হলো, তাঁকে সেই হাত ছড়ানো ভঙ্গিতে দেখে আমার মনে হলো যেন স্বয়ং যিশুর হাত। “
“তারপর?” ডোরা ফের জানতে চাইল।
“তারপর,” বৃদ্ধা বলে চললেন, “তিনি আমার দিকে তাঁর হাত দুটি বাড়িয়ে দিলেন- ঠিক এইভাবে,“ বৃদ্ধা তাঁর দুই হাত ছড়িয়ে দেখালেন।
“আপনার কী মনে হয় তিনি কিছু বলবার চেষ্টা করছিলেন?”
“তাতো অবশ্যই!”, বৃদ্ধা সোৎসাহে বলে চললেন, “তিনি আমাকে তাঁর বাহুবন্দি করতে চাইছিলেন…”
“এবং আপনি তাঁর আমন্ত্রণ গ্রহণ করলেন?” ডোরা বাধা দিয়ে জানতে চাইল।
“আমি খানিক ভয় পেয়েছিলাম, কিন্তু তাঁর অদ্ভুত শান্ত দৃষ্টির টান আমি উপেক্ষা করতে পারলাম না। আমি নিশ্চিত ছিলাম যে তিনি আমায় ব্যালকনি থেকে ফেলে দেবেন না।“
“কত সময় ধরে তিনি আপনাকে সেইভাবে ধরে রেখেছিলেন?”
“আমি জানি না। মনে হচ্ছিল যেন অনন্তকাল ধরে আনন্দে ভাসছি আমি। আমি সবকিছু ভুলে গিয়েছিলাম: আমার বেদনা, বাতের ব্যথা, কিছুই অনুভব করছিলাম না। তাঁর বাহুতে আমার নিজেকে একটা ছোট্ট মেয়ের মতো মনে হচ্ছিল।“
আমি বলতে যাচ্ছিলাম, তিনি যাকে সন্ত ভাবছেন সে একটা উন্মাদ কিংবা আরও বাজে কিছু -ভণ্ড: কিংবা বিষণ্ণ নিষ্ঠুর কেউ কল্পনাতীত কোনো মুহূর্তের মোক্ষম সুযোগ নিয়ে দানব হয়ে উঠতে পারতো। আমি আমার সন্দেহের কোনো কিছুই মুখ দিয়ে বার করিনি , বৃদ্ধার প্রতি সহমর্মিতার কারণে কিংবা হতে পারে এই ধরনের পরিস্থিতিগুলোতে আমাদের একবিন্দু বিশ্বাসের কারণে যা কোনো যুক্তিরই তোয়াক্কা করে না । তারপরেও ভেতরের অস্বস্তি আমাকে কিছু একটা বলতে উস্কাচ্ছিল এবং আমি বললাম,
“মানলাম আপনার এই অনাহূত অতিথি একজন সন্তই, কিন্তু শেষমেশ এইসবের ফলাফলটা কি?”
“আমি জানি না। মনে হয়েছে তাঁর পক্ষে স্পষ্ট করে কিছু বলা কঠিনই। যেমন তিনি হয়তো বাকপ্রতিবন্দ্বী আবার তা যদি নাও হন হয়তো ভান করছেন। “
“তো তিনি মহিলাদের ধরে রাখা ছাড়া আর কিছুই করেন না?” ডোরা জানতে চাইল।
“না, ম্যাম, তিনি পুরুষদেরও ধরে রাখেন আর আমার মনে হয় হয়তো শিশুদেরও। মায়েরা এখনও তাদের বাচ্চাদের আনেন নি যদিও তবে মনে হচ্ছে এটিও শিগগির ঘটে যাবে… দেখা যাক।”
“আপনি কি একা থাকেন?” আমি জানতে চাইলাম।
“হ্যাঁ একাই- আমার গৃহপরিচারিকা নরমা থাকে অবশ্য। কেন বলুন তো?”
“স্রেফ কৌতূহল,” আমি জবাব দিলাম।
“তবে আপনাকে জানিয়ে রাখি তিনি নরমাকেও তাঁর বাহুতে নিয়েছিলেন।“
“নরমার বয়স কত?”
“বিশ বছর," বৃদ্ধা উত্তর দিলেন।
“নরমা কি সুন্দরী” ডোরা জানতে চাইল।
“নরমাকে দেখতে কুমারী মাতার মতোই" বৃদ্ধা উওর দিলেন, এবং তাঁর চোখ জোড়া প্রসারিত হলো, তিনি দুই হাত কচলাতে লাগলেন।
“এইসব প্রশ্নের অর্থ কি?”
“দুশ্চিন্তা করবেন না,” আমি তাঁকে আশ্বস্ত করলাম, “এই সবই আমার প্রতিবেদনের জন্যে…”
“ওহ, এখন বুঝেছি …,” বৃদ্ধা বলে চললেন, “রোববার থেকে এই পর্যন্ত প্রায় পঞ্চাশ জনকে তিনি তাঁর বাহুতে ধরেছেন। “
আমি উত্তেজনা আটকাতে পারলাম না:
“অবিশ্বাস্য!”
“অবশ্যই অবিশ্বাস্য,” বৃদ্ধা মহিলা জোর দিলেন।
“ওরা ভয় পায়নি?” আমি জানতে চাইলাম, “ভাবুন, তাঁর বাহুতে ঝুলছে কেউ, ব্যালকনি আর রাস্তার ঠিক মাঝখানে ভাসছে জীবন বাজী রেখে।“
“মানে?”, বৃদ্ধা খানিক বিভ্রান্ত যেন, “আপনি যখন তাঁর বাহুতে থাকবেন তখন কোনো ভীতিই আসবে না মনে। আমার কথা বিশ্বাস না করলে, তিনি যাদের বাহুতে নিয়েছেন তাদের জিজ্ঞেস করতে পারেন।“
এই সময় একজন লোক চেঁচাতে চেঁচাতে বেরিয়ে এলো, “আমার মনে হচ্ছে আবার নতুন করে জন্ম নিয়েছি!”
“কিন্তু আমাকে বলুন ম্যাম, এইসবের অর্থ কী?”
“আমার জানা নেই, প্রজ্ঞাবান কেউ আপনার প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবেন। আমি কেবল এটি বলতে পারি যে তিনি ভালো কিছু করছেন।"
“আমি কি তাঁকে দেখতে পারি?” আমি তাঁর কাছে জানতে চাইলাম। বৃদ্ধা আমার প্রশ্নের উওর না দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। কয়েক সেকেন্ডের জন্য ভেতরে গেলেন এবং ফিরে এসে আমাদের ডাকলেন, “এক্ষুনি আসুন। তিনি এখন একজন বৃদ্ধকে কোলে নেবেন। “
আমরা বসার ঘরের দিকে ছুটলাম।
দেখতে পেলাম সেই আসল কিংবা ভণ্ড সন্ত, বেশ দৈত্যাকারের দেহধারী একজন। মুখে বয়ঃসন্ধির ব্রণের চিহ্ন ছাড়া কোনো বিশেষ ছাপ নেই । বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি হতে পারে, কিন্তু কেউ খুব কাছ থেকে দেখলে তাঁর মুখে তারুণ্যের ঢলই দেখবে , যেন তাঁর তারুণ্য নিয়ে এই পরিণত বয়সের অবয়বের ওপরে ভেসে আছেন। সব মিলিয়ে তিনি যেন শূন্যে ছড়িয়ে থাকা এক অশরীরী প্রতিকৃতি , তাঁর দৃষ্টিতে, তাঁর যন্ত্রনাক্লিষ্ট চৈতন্যের মগ্নতা, হাতের ত্বক, গলা, মুখ সব কিছু যেন কোনো এক অতর্কিত বিপর্যয়ের আভাস নিয়ে থমকে আছে। আমরা যখন কক্ষে ঢুকেছিলাম তখন তিনি তাঁর দুই হাত কম্পমান বৃদ্ধ লোকটির দিকে প্রসারিত করেছিলেন। বৃদ্ধকে দেখে মনে হচ্ছিল যেন এক শ্বেত পাথরের আবক্ষ মূর্তির গায়ে হেলান দিয়ে আছেন। এই পৃথিবীতে যেন উপস্থিত নন তিনি, চিরমুক্তির শেষ ঘণ্টার প্রতিক্ষায় উদগ্রীব এক প্রাণ। সন্ত মানুষটি গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে বৃদ্ধের গলা এবং গোড়ালি তাঁর আঙুলের ডগা দিয়ে স্পর্শ করলেন। বৃদ্ধ তাঁর বিধ্বস্ত পেশি পুরোপুরি শিথিল করে দিলেন। এবার তিনি বৃদ্ধকে ধীরে ধীরে বুকের কাছাকাছি তুলে নিলেন এবং যখন তিনি এগোচ্ছিলেন অর্থাৎ ব্যালকনির দিকে যাচ্ছিলেন তখন মনে হচ্ছিল যেন ধোঁয়ার কুণ্ডলি ধরে আছেন।
ব্যালকনির ধারে এসে তিনি হঠাৎ করেই থেমে গেলেন, এবং অতি ধীরে সাবধানে বৃদ্ধের শরীর রেলিঙয়ের ওপারে হাওয়ায় ভাসিয়ে ধরলেন। সূর্যের তীক্ষ্ণ আভা বৃদ্ধের শরীর এফোঁড় ওফোঁড় করে দিচ্ছিল। এবং এইভাবে তাঁরা নিশ্চল অথচ অদৃঢ় ভঙ্গিতে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল; এতটাই লম্বা সময় যে দৃশ্যটি অলৌকিক হওয়া সত্ত্বেও আমার ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটতে শুরু করেছিল। আমি বৃদ্ধার কাছে জানতে চাইলাম এত দীর্ঘ সময় এভাবে থাকাটা স্বাভাবিক কি না । বৃদ্ধাও আমার মতোই অবাক হচ্ছিলেন, স্বীকার করলেন এতটা লম্বা সময় তাঁর অনুগ্রহ কেউ পায়নি।
“সাবধান,” আমি সকৌতুকে বললাম, “উনি বৃদ্ধকে ফেলে দিতে পারেন। এমন ঘটলে কিন্তু বৃদ্ধ স্রেফ মাংসের কিমা বনে যাবেন। “
“তিনি জানেন কী করছেন,” বৃদ্ধার স্বরে ভর্ৎসনা,” তিনি জানেন কী করছেন, জানেন যে এই বৃদ্ধকে এতটা সময়ই রাখতে হবে।“
আমি চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। ডোরা জানাল সে থাকবে। সেও সন্তের বাহুবন্দী হতে চায়।
আমি জবাব দিলাম, “ঠিক আছে, হয়তো কিছুই ঘটবে না, কিন্তু উনি যদি তোমাকে ফেলে দেন মনে রেখো এই গল্প বলার জন্য তুমি বেঁচে থাকবে না । আমার কথা যদি বল, তিনি আমাকে আল্গাতে পারবেন সেই ভরসা আমার নেই । যাই হোক দেরি করো না। সিনেমা কিন্তু আটটায় শুরু হবে।“
আমি বিদায় না নিয়েই বেরিয়ে এলাম। নিচে জনতার ভিড় আগের চেয়ে বেড়েছে। আমি আরেকবার ওপরে তাকালাম: বৃদ্ধ তখনও স্থির হয়ে এলিয়ে আছেন, সন্ত… কিংবা ঠগবাজ লোকটির বাহুতে। টের পেলাম কেউ একজন আমার কাঁধে টোকা দিচ্ছে। সে হলো দামিয়ান ।
“ঝামেলাটা বেকার যায়নি তবে, কি বলো?” সে বলল।
“ওহে বৃদ্ধ, আমি যে দুপুর দুটো থেকে ছটা পর্যন্ত এক তরুণীর সঙ্গে কাটানোর পরিকল্পনা করেছিলাম, সেটাও মূল্যবানই ছিল ঠিক কি না? “
(রচনা কাল: ১৯৬৩)
*****
মূল গল্প: Balcony রেজি: মার্ক শ্যাফের
লেখক পরিচিতি: রঞ্জনা ব্যানার্জী- গল্পকার, অনুবাদক। প্রকাশিত বই: তেত্তিরিশ, একে শূন্য, সম্পাদিত বই: বুকার পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখকদের গল্প সংকলন। অনূদিত বই: জর্জ অরওয়েলের অ্যানিমেল ফার্ম, প্রকাশ,২০২৫, কবি প্রকাশনী। রঞ্জনার বর্তমান বাসস্হান শার্লটটাউন, প্রিন্স এডওয়ার্ড আইল্যান্ড কানাডা ।


0 মন্তব্যসমূহ