অনুবাদ : রঞ্জনা ব্যানার্জী
সে তার স্থানিক অবস্থানটির বিষয়ে জ্ঞাত ছিল, অ্যাপার্টমেন্টের দরজার পেছনে টানা বারান্দার শেষ মাথায় এই গন্তব্যের পরিধির ভেতর যেখানে তাকে আনা হয়েছিল, জায়গাটির নাম সোনালি মোজাইকে গিলটি করে লেখা ‘হোটেল লেবুভু’ । বিশাল হল ঘরে প্লাস্টিকে মোড়া একটি সোফা এবং তার সংগে মিল রেখে বেশ কটি আরাম কেদারা ছড়িয়ে ছিল, অপেক্ষমান এলিভেটরটি যা কিনা নানা তলায় শূন্য হলঘরগুলির উজ্জ্বল স্থানিক সঙ্কেত—সম্মেলন কক্ষ, ট্রপিকানা বুফে, মারমেইড বার প্রভৃতি পেরিয়ে ওঠানামা করে, তার খোপে চড়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর সময়টিতেও সে সজাগ ছিল—ঠিক যেভাবে চলচ্চিত্রের এক গুচ্ছ দৃশ্যের দেয়াল পেরিয়ে ক্যামেরা একটিমাত্র অবয়বে এসে থিতু হয়, নায়ক কিংবা ভিলেনের মুখে, ঠিক সেই ভাবে—স্বয়ং তার নিজের অবয়বে।
পর্দাগুলো আঁধার ঘনালেই খোলা হয়, রাতে। সে ঘুম থেকে জাগলেই ফের টেনে দেয়। ইতোমধ্যে সূর্যের আলোতে তাদের গায়ে আগুন ধরেছে । দিনটা পর্দা ঠেলে কক্ষের ভেতরে ঢুকে পড়তে চাইছে । কিন্তু সে পেছন ফিরে আছে; একদার হোটেল কক্ষটির প্রতিধ্বনির মতো।
চেয়ারটি টেলিভিশনের বিশাল পর্দার মুখোমুখি রাখা, নিশ্চিতভাবে ওকে এখানে অন্তরীনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরেই টেলিভিশনটি স্থাপন করা হয়েছিল। এর বিলাশবহুল চাকচিক্যের তুলনায় অন্যান্য আসবাবগুলি বড়োই সাদামাটা—ছোট নরম-কাঠের টেবিল, চারটি শক্তপোক্ত লাল প্লাস্টিকের কভার দেওয়া চেয়ার, দুই আসনের রোমশ সোফা, ফরমিকার আস্তর দেওয়া টুল, আর জ্বলজ্বলে পর্দা যার ছোপ ও বৃত্তের নকশা সূর্যের আলোতে আগুনের শিখার মতো জ্বলছে :এই আয়োজন বরং যাত্রাপথে বিরতি নেওয়া, বিয়ার ছলকে ফেলা, জুতোর তলায় চেপে সিগারেট নেভানো স্বভাবের এক রাতের গ্রাহকের জন্যই শোভন। টেলিভিশনের রুপোলি উওল কাচে বেলুনের মতো ফোলানো একটি আবছা মুখের প্রতিফলন ভেসে আছে, ফ্যাকাসে অথচ ভরাট। সে আনমনে তার গাল এবং থুতনির ওপরে হাত বোলাতে থাকে, কিন্তু ওখানে এখন কোনো দাড়ি নেই—এটিই সত্য সে আসলেই দাড়ি কেটে ফেলেছে। তার নিজের মাপের যে পোশাক সে এখন পরছে, তা কেনার টাকা তারাই দিয়েছিল।ওর দাড়ি (ঘন গাঢ় রঙের দাড়ি ছিল,মাথার চুলের মতো পাতলা নয়), তার সামরিক পোশাকের প্রান্ত ঠাঁসা বুট পরা পায়ের কর্তৃত্বপূর্ণ পদক্ষেপ, চামড়ার ধার ঘোরানো গোল টুপি; সবই সে খুলে ফেলেছিল—নিজেকে এইসব অনুষঙ্গ থেকে বিচ্ছিন্ন করেছিল। এইবার! ওকে বিশ্বাস করতেই হবে এবং ওরা ওকে বিশ্বাস করেছিল। ওর এই ফ্যাকাসে চেহারা এবং থুতনির কাছে টোল খেয়ে আরও ফ্যাকাসে হয়ে নেমে যাওয়া ত্বক: ওর এই লুকিয়ে রাখা স্বরূপ ওদের জন্যই উন্মোচিত করা হয়েছে । প্রাণহীন টেলিভিশনের পর্দায় মুখ তুললেই এই চেহারা দেখতে পাচ্ছে সে।
এই বিশাল পর্দার টিভির মতোই ভালো মানের একটা টেপ-রেকর্ডারও ওরা দিয়েছে। তাতে সে জোরে ক্যাসেট বাজাচ্ছে, ক্যাসেটের বাজনার সুরে কক্ষটি কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যেন পর্দার ওপারের দিনের আলোর চাপকে প্রতিরোধ করছে। এই সুর একটি সিনেমার আবহসঙ্গীত থেকে নেওয়া, যেখানে এক আমেরিকান সৈন্য ভিয়েতনামের যুদ্ধে বাধ্য হয়ে করা সমস্ত নৃসংস ঘটনার পীড়নে আক্রান্ত হয়েছিল। ছবিটি সে অনেককাল আগে দেখেছিল, খুব ভালো মনে নেই তার এবং এই সুরের সংগে যুক্ত দৃশ্যগুলো চোখে ভাসছে না তার। সে আসলে শুনছে না; সুরের এই উদ্বেল উত্থান কিংবা ধ্বস, বিরোধ কিংবা পিতলের বাদ্যযন্ত্রের সম্মিলিত ঝংকার এরপরে সাম্যে স্থিত হওয়া, অনুশোচনার অনুরণন, হঠাৎ থমকে যাওয়া, যা আসলে ঘৃণার তর্জমা—এর সবই তার ভেতর থেকেই উথলে উঠছে। ওরা ওর দেহের বাইরে প্রবাহিত হচ্ছে আর সে একভাবে বসে আছে চেয়ারে, টেলিভিশনের পর্দায় লেপ্টে থাকা ছায়াটির সঙ্গেও চোখ মেলাচ্ছে না। খানিক পর পর সে তার নিজের হাতের পাতার দিকে তাকাচ্ছে। ওর হাতের সংগে ওর মুখের দাড়ি, সামরিক পোষাক, গোল টুপি, যে সমস্ত নির্দেশ সে স্বাক্ষর করত—তার কোনোটির সঙ্গে কখনও মেলেনি। নির্মেদ, ধবধবে সাদা, রোমহীন হাত, ওর ভঙ্গুর হাড়ের ওপরে স্বচ্ছ আবরণ যেন, গিরগিটির ফ্যাকাসে চামড়ার নিচে যেমন কংকাল দেখা যায়, তেমন। আঙ্গুলের গিঁটগুলো হাল্কা গোলাপি—পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হাত, অনেক ঘষার পরেও আঙ্গুলের ফাঁকে যেখানে সিগারেট পুড়েছে সেখানে মল-রঙা নিকোটিনের ছাপ রয়েই গেছে। ওরা তার জন্যে বিদেশী মুদ্রা খরচ করতে তৈরি ছিল। এখনও তারা কোনো এক জায়গা থেকে তার পছন্দের ব্র্যান্ডটি জোগাড় করে দেয়; ওর নাগালের মধ্যেই যথেষ্ট সংখ্যক সেলোফেন মোড়কে পোরা প্যাকেট জমানো আছে। এছাড়াও মেঝেতে রাখা টেলিফোনে নির্দেশিত নম্বরটি ঘোরালেই রুম সার্ভিসের সংযোগ পাওয়া যায় এবং দীর্ঘ প্রতীক্ষার পরে কেউ একজন ঠান্ডা বিয়ার নিয়ে হাজির হয়। শুরুতে ওকে হুইস্কির প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল, ওর যা ইচ্ছে আর সে তা আনিয়েও নিয়েছিল যদিও সে খুব একটা পান করে না। ওর পেশার স্বার্থেই সে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, সে নিজেকে নিয়মানুবর্তী ব্যক্তিত্ব হিসেবে দাঁড় করাতে চেয়েছিল, আত্মবিশ্বাসী অহংকারী হিসেবে প্রীতিময় প্রশংসা চায়নি। হুইস্কি আসা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, সে বোতলের বায়না দিতো ওকে কিছু জানানো হতো না,কেবল ওর কাছে পৌঁছায়নি।
যেন তাতে ওর কিছু যাবে-আসবে।
সুরের মূর্চ্ছনার নিচেই নৈশব্দ চাপা পড়ে আছে। বাড়িটার ব্যাপারে কিছু বলা হয়নি: চুক্তিতে বাড়ির কথা ছিল, ওকে বোঝানো হয়েছিল যে পরিত্যক্ত অভিজাত বাড়িগুলির মধ্যে থেকেই দেওয়া হবে—পালিয়ে যাওয়া ঔপনেবিশিকদের যে বাড়িগুলি সরকার জনগণের নামে অধিগ্রহণ করেছিল তার একটি। বাগানসহ বাড়ি এবং গোপনীয়তা, নিরাপত্তার স্বার্থে একজন পাহারাদার, শ্বেতাঙ্গদের কম অভিজাত এলাকায় থাকা সরকারি চাকুরে বাবার স্কুল পড়ুয়া বালকপুত্রটি যে বাড়িগুলোর পাশ দিয়ে একসময় যাতায়াত করতো, সেগুলির একটি। একটি বাড়ি এবং সঙ্গে গাড়ি। ক্রমশ মোটামুটি সম্মানজনক কোনো পদ। পুনর্বাসন। সে তথ্য, জনসংযোগ (তার আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা) এই সব বিভাগের কথা ভেবেছিল; এখনও এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়ার জন্য তাড়াতাড়িই, তবে ওরা না-ও বলেনি।
সে যা কিছু দাবি করেছিল : সবই তার পুরস্কার হিসেবে প্রাপ্য ছিল। টেলিভিশনের কর্মীরা এসেছিল, কেবল টিনের বাক্সওয়ালা আফ্রিকানরা নয়, বিবিসি, অ্যান্টেনে ২, জুইটেস ডইচে ফ্রাউঞ্জিন—এবং আরও বিদেশী সংবাদ প্রতিনিধিরা তাদের টেপরেকর্ডার সমেত উড়ে এসেছিল। সংবাদ সম্মেলনগুলোতে তাকে সশস্ত্র বাহিনীর কমান্ডার, প্রতিরক্ষা মন্ত্রী এবং তাদের চৌকস সহযোগীদের উপস্থিতিতে হাজির করা হতো ঠিক পতিত ঔপনিবেশিক শাসকদের আমলের মতোই আয়োজনে। জলের পাত্রে ফুলের সজ্জা থাকত। ওদের দেওয়া পোশাক পরিয়ে ওকে পেশ করা হতো, ওর উরুজোড়া যা এককালে সামরিক পোষাকে আবৃত ছিল উষ্ণমণ্ডলীয় খানিক চকচকে প্যান্টে আড়াআড়ি রাখলে মাংসল দেখাতো, ওর সাদা, নরম থুতনীর এবং যেখানে দাড়ি উবে গেছে সেই জায়গাটাও ফাঁকা দেখাতো, ওর চুল পরিপাটি করে ছাঁটা, হাল্কা বাদামী চুলের ঝালর কপালের ওপর পাতা, ক্লিপার দিয়ে ঘাড়ের কাছটাও পরিষ্কার করা হয়েছিল—খবরের কাগজে ওর সেই খানিক কুঁজো বিশাল শরীরের ছবি দেখে ওর মনে হতো যেন এক ছোট্ট বালক ভ্রু কুঁচকে অবাক চোখে তাকিয়ে আছে। সে তার গল্পটি বলেছিল। প্রথম কয়েক মাস বার বার একই গল্প তাকে পরিবেশন করতে হয়েছে। ইতোমধ্যে সকলেরই গল্পটি জানা হয়ে গেছে। টেবিলের চার পাশে চারটে চেয়ার টেনে রাখা এবং তার ওপরে প্লেট দিয়ে ঢেকে রাখা ঠাণ্ডা ডিম ভাজা অপেক্ষা করছে। ইন্সট্যান্ট কফির টিনের পাশে জগভর্তি গরম জল কুসুম ঠান্ডা হয়ে গেছে। কেউ একজন এইসব নিয়ে এসেছিল এবং রেখে চলে গেছে। সকলেই চলে গেছে। কক্ষে ভেসে বেড়ানো উচ্চস্বরে বাজানো সুরটি তার প্রতিবেদন পরিবেশনায় কখনোই সঙ্গত করা হয়নি । বাজনা শেষ হলেই সে রিওয়াইন্ড বোতাম টিপে ফের শুরু থেকে শুরু করে ।
......................
তারা কখনই বাড়ি কিংবা গাড়ির বিষয়টি তোলে না অন্যদিকে কীভাবে প্রসঙ্গটি উত্থাপন করা যায় তা সে বুঝে উঠতে পারে না—আজকাল অবশ্য তারা তাকে ক্বচিত দেখতে আসে আবার এটাই হয়তো স্বাভাবিক কেননা তার বিবৃতি দেওয়া শেষ এবং তা তাদের সন্তুষ্ট করেছে। টেলিভিশনের প্রতিনিধি কিংবা সংবাদ মাধ্যমকে তার নিজেরও আর কিছু বলবার নেই। এর বেশি কিছু আর সে ভাবতে পারে না- আরও ভাবো আরও পেছনে যাও—বলার মতো কিছু খুঁজে বার কর। তারা এই রাজধানী শহরটিতে কাটানো ওর শৈশব সম্পর্কে শুনেছে, এই দেশটির রাজধানী যেখানে সে ফিরে এসেছিল। ওরা জেনেছে সে এক ঔপনিবেশিক সাধারণ পরিবারের সন্তান যার অভিভাবকরা ইউরোপ থেকে এই উষ্ণ দেশটিতে এসেছিল যেখানে তাদের জন্যে আরো উন্নত জীবন লাভের প্রচুর সুযোগ ছড়িয়ে ছিল। দেশটি কেবল উষ্ণ এবং সমুদ্র কিংবা মৌসুমি ফলের সমাহার বা খোড়াখুড়ি কিংবা ভারী জিনিস টানাটানির প্রয়োজনে সুলভে কৃষ্ণাঙ্গ শ্রম ছাড়াও তাদের জন্যে বড় প্রাপ্তি ছিল সরকারি চাকুরির নিম্নপদস্থ স্থায়ী পদটির নিশ্চয়তা। ওর বাবা মা রাজনীতিতে উৎসাহী ছিলেন না, কখনই নয়। কৃষ্ণাঙ্গদের নিয়েও কোনো আগ্রহ ছিল না তাদের। তাদের কিংবা তার জীবনে এরা কোনো প্রভাব ফেলতে পারে এমন ভাবনাও আসেনি তাদের মনে। ঔপনিবাশিক যুদ্ধ যখন শুরু হলো সেটি ছিল তাদের কাছ থেকে অনেক দূরে, উত্তরে; যুদ্ধ দমনে তাদের মাতৃভূমি থেকেই সৈন্যদল পাঠানো হয়েছিল। ওদের ছেলেটি হয়তো হিসাবরক্ষক হবে, নিশ্চিতভাবে একধাপ উঁচু কোনো পদে, কেননা প্রতি প্রজন্মকে তার আগের প্রজন্মের চেয়ে এগিয়ে থাকাই দস্তুর, যেভাবে তারা অভিবাসনের মাধ্যমে নিজেদের উন্নত জীবন তৈরি করেছিলেন। দুঃসাহসিক খেলাধুলার যে সমস্ত কার্যক্রম বা সুযোগকে সে স্বাভাবিক বলে ধরে নিয়েছিল সেইসবের সংগে কৃষ্ণাঙ্গদের যাপিত জীবন কিংবা কৃষ্ণাঙ্গদের সংগ্রামের কোনো সম্বন্ধ ছিল না : বয়ঃসন্ধির সময় প্যারাশ্যুট-ক্লাবে যুক্ত হওয়ার সূত্রে কয়েকজনের সংগে বন্ধুতার বন্ধনে সে জুড়েছিল এবং সে ঝাঁপ দিয়েছিল—যেন বালক থেকে পুরুষ হওয়ার আনুষ্ঠানিক আচার সম্পন্ন হয়েছিল তার।
বহু বছর ধরে চলমান প্রান্তিক অঞ্চলের আদিবাসীদের সেই যুদ্ধের ধাক্কা হঠাৎ করেই রাজধানী শহরে এসে লেগেছিল এবং রাতারাতি বিপ্লবের ফল মিলেছিল ইউরোপীয় শাসনের অবসানে। সেই সূত্রে রাজধানীর চত্ত্বরে কিছু ভাস্কর্যের ভাঙচুর হলো এবং অন্যায় সুবিধা নেওয়ার অপরাধে কিছু দোকানপাঠ লুট হলো। ওর অভিভাবকেরা শুরুতে তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি রোজকার জীবনে জরুরি কর্মকাণ্ডগুলির নিরিখে মাপছিলেন, যে বিষয়গুলি তাদের জন্যে জরুরি : সপ্তাহে দুবার আবর্জনাসংগ্রহ চলছিল নিয়মিত এবং বাজারে মাছের সরবরাহে ছেদ পড়েনি। এক কথায় তাদের সাদামাটা জীবনে কৃষাঙ্গ শাসনের কোনো প্রভাব পড়েনি। সে এক স্থপতির অধীনে শিক্ষানবিস ড্রাফটসম্যান হিসেবে কাজ করছিল (হিসাবরক্ষকের তুলনায় সম্মনাজনক কাজ) আর ওর সপ্তাহশেষের বিনোদনে আকাশ থেকে ঝাঁপ দেওয়ার পাশাপাশি ফটোগ্রাফি যুক্ত হয়েছিল। এমনকি স্থানীয় পত্রিকায় পশুপাখিদের চমৎকার কিছু ছবি বিক্রি করে বেশ হাতখরচাও মিলেছিল। তারপরেই সে ঘটনাটি ঘটেছিল—একসঙ্গে সব, যেভাবে ঐ রেকর্ডারের ভেতরে টেইপের ফিতে বাম দিকের সিলিণ্ডারে নতুন করে শুরু হবার জন্যে গুটিয়ে জড়ো হচ্ছে ঠিক সেইভাবে—সেই অভিজ্ঞতা, এতদিন ধরে যা কিছু সে করেছিল সবকিছুর ব্যাখ্যা, সব কিছু যা তাকে স্বীকার করতে হয়েছিল, যা তাকে অপরাধী বানিয়েছিল এবং সেনাবাহিনীর কমান্ডার ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর উপস্থিতিতে এবং অনুমোদনসাপেক্ষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময় তাকে যেমন মাপা হচ্ছিল এবং এই পর্দাঘেরা অন্ধকারাচ্ছন্ন কক্ষের চাপা আলোয়, টিভির পর্দায় ভাসা মাছের মতো চোখজোড়ার মুখোমুখি বসে, কেবল টেইপ রেকর্ডারের বাজনাকে সঙ্গী করে সে নিজের সংগেও সেই সব বাতচিতের মুখোমুখি হচ্চছে আজও। একটা টাওয়ার সদৃশ স্থাপনার ওপর গাঙচিলের অবতরণের ছবি তুলেছিল সে। ভারী কাটা মেশন গান ধরা সৈন্যেরা তাকে ধরে ফেলেছিল। ওরা ওর ক্যামেরা ভেঙে ফেলেছিল এবং পুলিশের কাছে সোপর্দ করেছিল। পাঁচ সপ্তাহ ধরে ঔপনেবিশিক শাসকেরা কৃষ্ণাঙ্গদের যে সমস্ত নোংরা সেলে রাখতো সেখানেই তাকে রেখেছিল। ওর বাবামাকে জানানো হয়েছিল ওদের নিষ্পাপ সন্তান যে কি না দুবছর আগে স্কুলের গণ্ডি ছেড়েছে সে একজন সাম্রাজ্যবাদী গুপ্তচর। অবশ্যই স্বাধীনতা প্রাপ্তির প্রথম কদিনে এধরনের বিভ্রম হতে পারে ( ও শ্রোতাদের এমনই ব্যাখ্যা দিয়েছিল)। কিন্তু এই ছেলেটা কে যে ভেবে নিলো সে যা ইচ্ছে তার ছবি তুলতে পারবে, এমন কি এই নতুন রাষ্ট্রের শত্রুদের আগ্রহী করতে পারে এমন সামরিক স্থাপনার ছবি? সেই শ্বেতাঙ্গ ছেলেটা।
বিবৃতি দেওয়ার এই পর্যায়ে সে স্বীকার করেছিল যে, তার জীবনে প্রথমবারের মতো সে কৃষ্ণাঙ্গদের নিয়ে ভেবেছিল—এবং তাদের ঘৃণা করেছিল। তারা তার ক্যামেরাটার তো সর্বনাশ করেছেই এবং তাকে একজন কৃষ্ণাঙ্গের মতোই জেলে পুরেছিল। সে তাদের তো বটেই তাদের সরকারকেও ঘৃণা করে, সে সরকার ভালো-মন্দ যে কাজই করুক না কেন, সবকিছুকেই সে ঘৃণা করে। না, সে সেই সময়ে এক মুহূর্তের জন্যেও বিশ্বাস করেনি যে, যে দেশে সে জন্মগ্রহণ করেছিল সেই দেশের জন্য ভালো কিছু করা এদের পক্ষে সম্ভব হবে। তাকে ওরা পৃথক করেছিল কিংবা সে নিজেই পৃথক হয়েছিল—এই সূক্ষ্ম বিষয়টি সেইসব শ্বেতাঙ্গদের কাছে তাকে কখনই খোলাসা করতে হয়নি—যাদের কাছে তার বাবামা তাকে মুক্ত করার আপিল জানাতে সমর্থ হয়েছিলেন। তার ওপরে ঘটে যাওয়া ঘটনা নিয়ে তাদের ক্ষোভ ওকে শান্ত করেছিল এবং প্যারাশ্যুট ক্লাবের বিকল্প হিসেবে (যা কি না কৃষাঙ্গ নিরাপত্তারক্ষীরা বন্ধ করে দিয়েছিল) আজ্ঞাবহ কৃষাঙ্গদের মাধ্যমে শ্বেতাংঙ্গদের শাসন পুনঃস্থাপনের নিমিত্তে গঠিত গোপনীয় প্রতিষ্ঠানটিতে তাকে অন্তর্ভুক্ত করে নিয়েছিল। অবশ্য কীভাবে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা যাবে তার কোনো দিকনির্দেশনা তখনও রূপ নেয়নি, প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে শীতল কিংবা সরাসরি যুদ্ধের পক্ষের বন্ধুরাষ্ট্রটি খুঁজে পাওয়া যায়নি, আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহ যারা এই দেশের খনিজ এবং তেলের খনিতে লগ্নি করতে ইচ্ছুক তাদের কাছ থেকেও অর্থের জোগান পাওয়া যায়নি, জঙ্গলে বিদ্রোহী সেনা গঠনের জন্য অস্ত্রসস্ত্র এবং ভাড়াটে সৈন্য নিয়োগ দেওয়ার সম্ভাবনা তখনও যাচাই করা হয়নি। সে দিনমান তার পরিকল্পনার ছক আঁকিবুকির বোর্ডে ওপর ঘাড় গুঁজে থাকতো আর রাতে গোপন বৈঠকগুলোতে যোগ দিতে যেতো। নিজের কাছে নিজেকে বেশ একজন গুরুত্বপূর্ণ দেশপ্রেমিক বলে মনে হচ্ছিল; এই অনুভূতি একেবারে নতুন, তার বাবা-মা তাদের জন্মভূমি পরিত্যাগ করেছিল অন্যদিকে যে দেশে তার জন্ম সেই দেশ কৃষ্ণাঙ্গরা তাদের নিজেদের স্বার্থে পুনঃদখল করেছে। ওর বাবামা ঈশ্বরের কাছে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিলেন এই ভেবে যে সে এখন সঠিক-সঙ্গে আছে, তাদের মতোই শেতাঙ্গ হলেও সে তাদের চেয়ে সচ্ছল এবং জ্ঞানী এবং সে যেমন জানে কীভাবে এই উষ্ণ দেশটিতে জীবন যাপন করা যায় এবং ঠিক তেমনি করে দেশ ছাড়ার মতো পরিস্থিতি হলে তা নিয়েও অন্যকে উপদেশ দেওয়ার জ্ঞানও সে রাখে। তাঁরা নিজেদের গর্বিত মনে করেছিলেন যখন তাঁদের জানানো হয়েছিল যে তাদের সন্তানকে ইউরোপে উচ্চশিক্ষার জন্যে পাঠানো হয়েছে,যে দেশ ছেড়ে তাঁরা একদিন অভিবাসী হয়েছিলেন সেই দেশে, স্বদেশীদের পক্ষ থেকে এ ছিল এক অনন্য দানশীল উদ্যোগ।
সেই বিনীত যাত্রা ক্রমশ তাকে এই উত্তরাধিকারের প্রতিবিপ্লবে টেনে এনেছিল।
..............
টেলিফোনটি কেবল তার কক্ষের সেবা-তলবের জন্যে নয়, বিয়ার আনানো কিংবা প্লেটে করে ডিম এনে আরেকটি প্লেট দিয়ে ঢাকা দিয়ে যায় যে ক্ষীণকায় খাকি পাতলুন পরা কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ—তাকে ডাকার জন্যে নয়। সে চাইলে প্রতিদিন দূরপাল্লার কলও করতে পারে। এর জন্য কোনো বিল আসে না, ওরাই মেটায়। ব্যবস্থাটা এমন হওয়ারই কথা ছিল, ওরাই সব যোগান দেবে। সেই কারণে প্রতি তিনদিন অন্তর ইউরোপের সেই শহরটিতে থাকা মাকে সে ফোন করে। দেশ ত্যাগের মোক্ষম সময়টি যাদের জানা তাদের নির্দেশেই তার মাবাবা সেই শহরটিতে ফিরে গিয়েছিলেন। তাকে কেবল নম্বরটি ঘোরালেই চলে। অন্য শহটিতে এখন শীতকাল চলছে এবং ডবল-কাচের ঘেরের পেছনে বৈঠকখানার ক্রুশ কাঁটায় বোনা ম্যাটের ওপরে বসানো টেলিফোনটি বেজে উঠবে। এই আয়োজনটি সে আবিষ্কার করেছিল (আচ্ছা তবে এখান থেকেই তার বাবা মা এসেছিলেন) যখন সেই ইউরোপীয় শহরটিতেই তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়। নিশ্চয় তাঁরাও অল্পদিন পরেই বুঝে ফেলেছিলেন যে তাকে পড়তে পাঠানো হয়নি। অন্তত সেই অর্থে তো নয়ই, যেভাবে তাঁরা জানেন কোনো প্রতিষ্ঠানে পড়তে যাওয়া মানে অধীত ডিগ্রীর তুল্য কোনো পেশায় যোগদানের জন্য যোগ্য হওয়া। তা সত্ত্বেও তাঁরা নিশ্চিত ছিলেন যে সে ভালো করছে, সে সেইসব ব্যক্তিদের বিবেচনায় নিশ্চয় উচ্চমানের কেউ তো বটেই নতুবা সেই বীভৎস সময়ে যখন কৃষ্ণাঙ্গরা তাকে কারাগারে ছুঁড়ে দিয়েছিল তখন তাদের সব কিছুই খোয়া গিয়েছিল, এখন সরকারি চাকুরির ভাতা, আম আর প্যশন ফল, সূর্যের আলো—এইসব নিশ্চিতভাবে ভালো কিছুরই নমুনা। সে এখন এইসব প্রভাবশালী লোকজনের আনুকূল্যে আছে, আন্তর্জাতিক লেনদেনে যা তার জন্যে ব্যাখ্যা করা জটিল। এবং গোপনীয়ও বটে। তাঁরা এই গোপনীয়তাকে মর্যাদা দিয়েছিলেন। একজন মা কিংবা বাবা কোনোভাবেই এমন কিছু করতে চান না যা তাদের সন্তানের অনুপম প্রাপ্তিকে বিপদগ্রস্ত করতে পারে বিশেষত যে সাফল্য তাদের পক্ষে যোগান দেওয়া সম্ভব হয়নি। সেইসব সময়ে সে সারাক্ষণই হয় বিমানবন্দর থেকে ফিরছে নয়তো বিমানবন্দরের অভিমুখে যাচ্ছে—ফ্রান্স , জার্মানি, সুইজারল্যান্ড আরও নানা গন্তব্য যা সে উল্লেখ করতো না। নানা ভাষায় তার দখল নিশ্চিতভাবে তার নিজের চেয়েও তার নিয়োগকর্তাদের জন্যে মূল্যবান ছিলো হয়তো সেই কারণেই তার এমন পদপ্রাপ্তি। ছোটখাটো কোনো অ্যাপার্টমেন্ট নয় বরং শহরের নিভৃত কোণে সেরা অভিজাত পাড়াগুলির একটিতে তার জন্যে বিশাল এক বাড়ি কিনে দিয়েছিল তারা। ওর অধ্যয়ন কক্ষ কিংবা অফিস যাই বলি না কেন তা কেবল সারিসারি নথি কিংবা বই দিয়ে ঠাঁসা ছিলো না তাতে দূরসংযোগের সকল আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবস্থা ছিল। বিদেশি সহযোগীরা তার বাড়িতে থাকার জন্যে আসতো এবং তার একজন সার্বক্ষণিক পরিচারিকাও ছিল। ওর নাজুক বয়ঃসন্ধির কোমল থুতনি এই আয়েসী জীবনের তুলতুলে মাংসের তলায় চাপা পড়ে গিয়েছিল। এরপরেই সে দাড়ি রাখতে শুরু করেছিল, যা এতটাই ঘন এবং গাঢ় হয়ে গজিয়েছিল যে তার চেহারায় একধরনের ক্ষমতাবান কেউকেটার ভাব ফুটে উঠেছিল। তার বাদবাকি অনুষঙ্গগুলি তার বাবামা তাকে পরতে দেখেনি : ওর ভারী সামরিক পোষাক, বুট জোড়া কিংবা গোল টুপি। সে তাঁদের দেখতে আসতো সাধারণ পোষাকে যা ছিল তার ছদ্মবেশ।
এই মেঝেতে পাতা ফোন থেকে প্রথম ফোনটা দিয়েছিল সে তার মাকে, জানাতে যে সে বেঁচে আছে এবং এখানেই আছে। মানে কোথায়? তিনি কীভাবে ভাববেন যে এই দেশেই সে ফিরেছে! একই সূর্য, আম (সেই দিন এই টেবিলে ফল সরবরাহ করা হয়েছিল যেখানে এখন ডিম ঠান্ডা হচ্ছে), সেই কারাগার যেখানে তাঁর বাচ্চা ছেলেটাকে যে কোনো কৃষ্ণাঙ্গের মতো ছুঁড়ে ফেলা হয়েছিল। তিনি কাঁদছিলেন কেননা তিনি এবং ওর বাবা দুজনেই ভেবেছিলেন যে সে বেঁচে নেই। দু মাস আগে সে উধাও হয়েছিল। একটা শব্দও নয়; সেটাই ছিল শর্ত তার দিক থেকে যা সে মেনে চলেছিল, সে কারণেই সে তার বাবামাকে বলতে পারেনি যে এই ব্যবসায়িক সফর থেকে সে ফের ফিরে আসবে : বাড়িটা সে ছেড়ে দিচ্ছে,ছেড়ে দিচ্ছে দিন রাতের পরিচারিকা, প্রথম শ্রেনীর বিমান-টিকেট,সেইসব গুরুত্বপূর্ণ অতিথি, বই ঠাঁসা সেই কক্ষ যেখানে দূরসংযোগের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি দিয়ে ট্রেন উড়িয়ে দেওয়া, রাস্তায় মাইন পাতা, এবং যে গ্রামে একদা সে জন্মেছিল সেই গ্রামের ঘুমন্ত মানুষদের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালানোর পরিকল্পনা করা হতো।
আজকের দিনটা তার মাকে ফোন করার দিন। এইসব দায়িত্বপালন ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে। তাছাড়া তাঁকে আর বলবার মতো কিছুই নেই ওর। প্রথম দিকে তিনি কেঁদে কৃতজ্ঞতা জানাতেন যে সে অন্তত বেঁচে আছে। এখন তিনি ঘুরেফিরে প্রশ্ন তোলেন তাঁকে এইভাবে কেন শাস্তি পেতে হবে—কেন সে এমন কিছুর সংগে জড়িয়ে পড়ল যার পরিনাম এতটা খারাপ হলো।
ফোনের ওপার থেকে তিনি জানতে চান, তুমি ঠিক আছ তো?
সে তার বাবার স্বাস্থ্যের খবর নেয়।—এবারের শীত খানিক কম পড়বে?
—এর মধ্যেই পাহাড়ি হাওয়া বাতের ব্যথার আভাস দিচ্ছে।
কিছু লাগবে কি? (বাবামাকে পাঠানোর জন্যে ওর কাছে টাকা পাঠানো হতো, কেননা তাদের পেনসন কেড়ে নেওয়া হয়েছিল; এটাও তার চুক্তির অংশ।)
এরপরে যেন কথা ফুরিয়ে গেল। তিনি জানতে চাইলেন না এখানকার গরমে ওর কোনো কষ্ট হচ্ছে কি না। যদিও এই কক্ষের বন্ধ পর্দার আড়ালে সূর্য তার আগুনে তাপ জমিয়ে রাখে, যদিও তিনি জানেন গ্রীষ্মে এখানকার আবহাওয়া কেমন থাকে, এবং সে সাত বছর ছিল না এখানে—ফের নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারছে না। তিনি তাপমাত্রার কথাটা উল্লেখ করতে চাননি তা করলে স্বীকার করে নিতে হয় যে সে ফিরে গেছে, তিনি এবং ওর বাবা দুজনের কেউই ওর জীবনের বিষয়গুলো কখনই বুঝতে পারবেন না; কেন সে অমন অভিজাত বাড়িতে থাকছিল, সেইসব টেলিযোগাযোগ প্রযুক্তিই বা কেন, কিংবা ওর আন্তর্জাতিক যোগাযোগ অথবা কেনই বা এর সব কিছু সে ছেড়ে দিলো। তিনি ফোনে কথা বলেন ক্ষীণস্বরে এবং অল্পই বলেন। কিন্তু লেখেন ওকে। ওরা তাঁর চিঠি দরজার নিচ দিয়ে ঠেলে দেয় ওকে।—ঈশ্বর কেন আমাকে এমন শাস্তি দিচ্ছেন? তোমার বাবা আর আমি কী এমন পাপ করেছি? এই সব অনেকদিন আগেই শুরু হয়েছিল। আমরা তোমার সংগে আসলে বেশি সহজ ছিলাম। তোমার সেই যাচ্ছেতাই প্যারাশ্যুটের ব্যাপারটা। তোমাকে কোনোভাবেই অনুমতি দেওয়া উচিত হয়নি আমাদের। ঐসব উশৃঙ্খল ছেলেপেলের সঙ্গে তোমাকে ছেড়ে দেয়া উচিত হয়নি আমাদের। তখনই ভুলের শুরু, আমাদের বোঝা উচিত ছিল যে তুমি আমাদের জীবনের বারোটা বাজাতে যাচ্ছ, আমি জানি না কেন, তোমাকে ওপর থেকে ঝাঁপ দিতে হয়েছিল। তুমি কি জান তোমাকে ওভাবে ওপর থেকে পড়তে দেখে আমার কেমন লেগেছিল, ভয়ে আমরা মরে যাচ্ছিলাম দেখে তুমি মজা পাচ্ছিলে আর বোকার মতো নিজের ধ্বংস ডেকে আনছিলে? আমাদের বোঝা উচিত ছিল। কোথায় এটা শেষ হতে যাচ্ছে। কেন তোমাকে এমন হতে হলো? কেন? কেন?
.....................
প্রথম কয়েক সপ্তাহ ওরা তথ্য সংগ্রহ করেছিল এবং এরপরে সংবাদ সম্মেলনগুলির আয়োজন করত যেখানে ওকে বলতে হতো। সাংবাদিকরা বার বার জানতে চাইতো। ওদের অধিকার ছিল জানতে চাওয়ার।
তুমি কীভাবে এই রক্তপিপাসু দঙ্গলের সঙ্গে জড়িয়ে গেলে যারা হাসপাতাল পুড়িয়ে দেয়, গ্রামবাসীদের কান কেটে দেয়, বাড়িমুখো নিরাপরাধী শ্রমিকভরতি ট্রেন উড়িয়ে দেয়, যারা শিশু ধর্ষক এবং যারা বন্দুকের নলের মুখে নারীদের নিজের স্বামীদের হত্যা করে তাদের মাংস ভক্ষন করতে বাধ্য করে?
সে ওদের সামনে শান্ত হয়ে বসে থাকতো এবং এমন উত্তাল প্রশ্নের মুখোমুখি হতো। যেমন করে এই রক্তিম বিষন্ন আলোতে টেলিভিশন সেটটির বিশাল পর্দার মুখোমুখি বসে আছে ঠিক সেইভাবে বসে থাকতো। কাঁপত; ওরা সেই কাঁপন দেখতে পেত না কিন্তু যতবারই ওর জানা ঘটনাগুলি ওদের বয়ানে আসত ততবারই ও ভেতরে ভেতরে কেঁপে উঠত। ওরা কীভাবে একদম ঠিকঠাক জানতে পারল?
কেননা আতঙ্ক ছড়ায় ধীরলয়ে। সপ্তাহ কিংবা মাস লেগে যায়, হাল্কা সুড়সুড়ি ক্রমশ বাড়ে, জমতে থাকে, গড়ায়, ফুলেফেঁপে ওঠে, সেইসমস্ত ফ্যাক্সকৃত সংকেত, যে সমস্ত দেশ অস্ত্রচালানের বিরুদ্ধে সোচ্চার তাদের সংগে গোপনে করা অস্ত্রচুক্তি সম্পাদনের বিজয়; “অস্থিশীল’ শব্দার্থটির সংগে যুক্ত যত ত্রুটিপুর্ণ উপাদান তাদের মূল ভিত্তি থেকে উৎপাটনের মাধ্যমে একটি স্থিতিশীল ব্যবস্থার আয়োজন । সে ফ্যাক্স পাঠাত, বিমানে চড়ে তেল এবং খনিজ খাত অধিগ্রহনে ইচ্ছুক বহুজাতিক কোম্পানিগুলির সমর্থন চাইতো যাদের প্রতিদ্বন্দিদের সংগেই কৃষ্ণাঙ্গদের ব্যবসা চলছিল, সেই প্রস্তাবিত শর্তে আগ্রহী পররাষ্ট্র দপ্তরগুলিতে সে প্রচার চালাতো, সমমনাদের নিয়ে আঞ্চলিক প্রভাব বলয় সৃষ্টি যাকে বলে।
সেই অভিজাত বাড়িটিতে যেখানে একটি প্রাচীন ঘড়ি ছিল সংযোগ স্থাপনের যন্ত্রে হঠাৎ গড়বড় হলেও সেটির ছন্দ হারাতো না , যুদ্ধটি ছিল গোয়েন্দা তথ্যনির্ভর, অলৌকিক ঘটনার মতো হাজার কিলোমিটার দূরে অন্য এক মহাদেশের ঘন জঙ্গলে থাকা কোনো এক জেনারেলের স্বর ভেসে আসতো, সে নিজে যখন ইউরোপীয় মিশনে ভ্রমণ করতো তখন নিজেই হতো সেই যুদ্ধরত মানুষটি : মুখ ভরতি দাড়ি, সামরিক পোশাক এবং সেই গোল টুপি। তখন যাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতো তারা দেখতো ডান-বামের সার্বজনীন যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সটান উঠে আসা একজনকে।তার পোশাক তাকে সেভাবেই উপস্থাপন করতো, মনে হতো সে সেই নিয়তি থেকে উঠে এসেছে যেটিকে কর্মক্ষেত্র বলা হচ্ছে ।
তুমি বলতে চাইছ যে তুমি জানতে না?
কিন্তু কেউ কথা বলছিল না। ছোট একটা ধাক্কা হয়তো লেগেছিল কিংবা নয়। ক্ষুদ্রাকৃতির পতাকা মানচিত্রের ওপর ঘুরে বেড়াচ্ছিল। মানুষ লাপাত্তা হয়ে গেছে এবং সরকারী সৈন্যদলের ওপর আরোপকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নথিবদ্ধ করা হয়েছে। কিছু ব্যর্থতার খতিয়ানও লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল। অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির জন্য বিপুল সরবরাহ এবং সামগ্রী প্রতিবেশী আফ্রিকান মিত্র দেশগুলি থেকে আকাশপথে সফলভাবে আনা হয়েছিল; বিদ্রোহী দল বছরের পর বছর যুদ্ধ করতে পারবে, গ্রামের পরে গ্রাম, ব্রিজের পরে ব্রিজ, বৈদ্যুতিক কেন্দ্র এবং মানচিত্রে প্রদর্শিত কৌশলগত সড়কপথগুলি দখল হবে। ন্যায়ের পক্ষেই বিজয় ঘটবে।
কীভাবে তা সম্ভব কেউ বলেনি। কৃষ্ণাঙ্গ সরকার গণহত্যার খবর ছড়াচ্ছিল কেননা তারা হারছিল অন্যদিকে বামপন্থী ও উদারপন্থী সংবাদমাধ্যম এই গল্পগুলি লুফে নিচ্ছিল। গোয়েন্দা সংস্থা সোনালী কিউপিড খচিত ঘড়িটার মতোই নিয়মানূবর্তী ছিল, তাদের ফাইলের শিরোনাম ছিল : অস্থিতিশীলতা সংক্রান্ত ভুলতথ্য।
বয়ানের এই জায়গাটায় এলে ওরা সবসময় ওকে বলতে দিতো, থামাতো না। দুটো বাক্যের মধ্যবর্তী বিরতিতে সে অবিরাম ঢোক গিলতো এবং তারা তার ঢোক গেলাটা নজরে রাখতো। ঠাণ্ডা ডিমটা গলা দিয়ে নামবে না। খুদে পিঁপড়েদের একটা চিকণ প্রবাহ ছয় তলার ফাঁকা বারান্দা ধরে ,বন্ধ অভ্যর্থনা কক্ষটি পেরিয়ে খাবার রাখা টেবিলটির পা বেয়ে খাবারের কাছে চলে এসেছে; সে জানে। বার বার নিজের সংগে মহড়া দিতো সে, এখন আর কিছু জানতে কেউ আসে না , সে ঢোক গেলে, অন্যদিকে পিঁপড়েরা আজও নিয়ম করেই আসে।
বলতে থাক, চালিয়ে যাও।
আমি সেই প্রতিবেশী রাষ্ট্রটিতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত এর কিছুই সম্ভব হয়নি—শ্বেতাঙ্গ অধ্যুষিত রাষ্ট্র ছিল সেটি এবং ওরা অনেক উন্নত—ওরাই আমাদের প্রয়োজনীয় সরবরাহের যোগান দিয়েছিল, বিমানে। ওদের গোয়েন্দা দলের প্রতিনিধিদের সহযোগিতাতেই ইউরোপের সেই বাড়িতে তথ্য সম্প্রচার কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছিল। ওখানে একটা বেইসও তৈরি করা হয়েছিল।
বলতে থাকো।
আমাদের লোকজনের জন্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ছিল সেখানে। এটি গোপনীয়, কেউ জানতো না যে, সেই বাড়িতে একটা এমন জায়গা আছে। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এলাকায় এটি লুকোনো ছিলো । আমি খুবই আত্মবিশ্বাসী ছিলাম এবং সন্তুষ্টও—আমাকে ইউরোপে নিযুক্ত করেছে বলে নয়, ঐ বিশেষ রাষ্ট্রটিতে যাওয়ার জন্য নির্বাচিত হওয়ার জন্যেও বটে। এছাড়া সমন্বয়ের জন্য। ওখানকার নিরাপত্তা বাহিনীর কমান্ডার এবং বিশেষ বাহিনীর সঙ্গে সাক্ষাতের জন্যেও। আমাদের যৌথ স্বার্থের লক্ষ্যে নিবেদিত এই বিশেষ সহযোগিতার কার্যক্রমের একজন প্রদায়ক হিসেবে নিজেকে দেখে এই ধারনা তৈরী হয়েছিল। সেইসব অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র এবং যুদ্ধ-কৌশল বিষয়ে প্রশিক্ষণকালে আমাদের লোকদের মনোবল সম্পর্কে আমাকে রিপোর্ট পেশ করতে হতো।
তাই?
টেপে রেকর্ড করা প্রণোদনার বক্তব্য শুনে তাদের মধ্যে আবেগ প্রবল হতো : যুদ্ধে জেতার প্রত্যয়, অস্থিতিশীলতার মধ্যে দিয়ে স্থিতিশীলতা আসার আশ্বাস, একটি শান্তি এবং ন্যায়পরায়ণ সরকারের পত্তন।
সংবাদ সম্মেলনের সময়গুলোতে, ঠিক এই জায়গায় আসার পরে ওর ত্বকের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেত। ওদের দৃষ্টির আঁচে ওর ত্বকের নিচের কোষ থেকে যেন উত্তাপ ছেঁকে ফোস্কা ওঠাতো। তারপর?
এখানে কেউ নেই এখন, পর্দা ওকে সকলের কাছ থেকে আড়াল করে রেখেছে। গিলে ফেল। আমি চাক্ষুষ করেছি পুরুষ রিফিউজিদের ধরে এনে অনাহারে রাখতে। আমি দেখেছি কীভাবে তাদের মোকাবেলা করা হতো । আমাদের বাহিনীতে যোগ দেওঁয়ার জন্য তাদের বাধ্য করা হতো নইলে ফের বর্ডারে মরবার জন্যে ফেরত পাঠানো হতো। ওদের গ্রামগুলি জ্বালিয়ে দেয়া হতো, ওদের পরিবারকে কুপিয়ে মারা হতো—ওদের মুখ এবং ওদের শরীরের আঘাতের চিহ্ন দেখেই আপনি বুঝতে পারতেন এটা কীভাবে ঘটেছিল...ভুল তথ্য। এটা নিয়ে কেন্দ্রেও কোনো কথা হতো না। আমাদের মিত্র রাষ্ট্রটি নৈশভোজে শিকারকৃত মাংস এবং ওয়াইন পরিবেশন করতো, সবকিছুই অতি উত্তম মানের, আমাকে ভিআইপির মর্যাদা দিতো ওরা—এই বিষয়গুলি নিয়ে কোনো কথা হতো না। এবং আমাকে চারপাশে ঘুরিয়ে দেখাত—সবকিছু। গোপন বেতার কেন্দ্র যেখান থেকে আমাদের বক্তব্য প্রচারিত হতো সেটিও। সর্বাধুনিক অস্ত্র আমাদের সরবরাহ করা হতো। বুটজুতো এবং ইউনিফর্ম ওদের কারখানায় তৈরি হতো। (আমার পোশাকটিও সেখান থেকেই এসেছিল নিশ্চিত)। বিমানগুলি রাতের আঁধারে আমাদের লোকজনকে নিয়ে উড়াল দিতো, অস্ত্র সজ্জিত এবং তাদের যা করতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল তার সকল অনুসঙ্গসহ। আমি জানি এখন সেটি কী ছিল।
তাই?
অবশ্যই তা যুদ্ধ।
তো?
…যুদ্ধ কখনই মনোরম নয়। দুই পক্ষেই সহিংসতা থাকে। আমাকে বুঝতে হয়েছে। অন্তত বোঝার চেষ্টা করেছি। কিন্তু বর্ডারের ওপার থেকে বিমানগুলি ফিরেও আসতো। খালি বিমান নয়। তারা রিফিউজিদের সন্তানদের নিয়ে আসতো, আমি ভাবতাম যুদ্ধ থেকে বাঁচাতেই বুঝি তাদের আনা হচ্ছে; বারো কি তেরো বছর বয়েসী কিশোরী সব, ভয়ার্ত, ওদের হাঁটানোর জন্যে পরস্পরের কাছ থেকে টেনে আলাদা করতে হতো। ওদের আনা হতো প্রশিক্ষণরত পুরুষদের জন্য । নারীবিহীন পুরুষদের তৃপ্ত করতেই আনা হতো তাদের। রাতের ভোজের পরে কমান্ডার আমাকেও একজনকে দিয়েছিলেন। নিজের কক্ষেও একজনকে নিয়েছিলেন তিনি। আমাকে দেখানোর জন্য মেয়েটিকে তিনি বিবস্ত্র করেছিলেন।
কাজেই আমি জানি কী হতো সেই মেয়ে শিশুদের সঙ্গে। আমি জানি আমাদের সেই বাহিনীর কী বনেছিল—হয়তো সবসময় এমনই ছিল—হ্যাঁ আপনারা যেমন বললেন, হিংস্র দঙ্গল যারা হাসপাতাল পুড়িয়েছে ,গ্রামবাসীদের কান কেটে দিয়েছে, ধর্ষন করেছে, শ্রমিকপুর্ণ ট্রেন বোমা মেরে উড়িয়ে দিয়েছে। আমার জন্মশহরকে ধ্বংস করেছে। শহরটা এখনও আছে কেবল এই জ্বলজ্বলে পর্দা ওকে দূরে সরিয়ে রেখেছে।রাত নামলে যখন এই পর্দা ওঠে এই শহর তখনও সেইখানেই থাকে অন্ধকারে ভেতরে এক গুচ্ছ অন্ধ বিল্ডিংয়ের মধ্যে, প্রশ্বস্ত সড়কের ধ্বংসচিহ্নের ভেতর কিংবা আবছা আলোকিত বিধ্বস্ত চত্ত্বরে। আমার পরিচিত শহরটিকে অচেনা বলে অস্বীকার করতে পারবো না, শহর আমাকে চেনে না তাও বলতে পারবো না। শহরটা আছে সূর্য ঠেসে ধরা এই পর্দার ওপারে, যে জনপদ ভিখারীতে পরিণত হয়ে টিকে আছে, তাবু খাটিয়ে পড়ে আছে—একসময় আমার মতো শ্বেতাঙ্গদের বাড়ি ছিল সেখানে—বিদ্যুতবিহীন, টাইল বাঁধানো জলের সরবরাহহীন বাথরুম, কাচবিহীন জানালা এবং ঐ সব চমৎকার সমুদ্রমুখি ঝুলবারান্দা যেখানে আমরা খাওয়ার আগে পানীয় পান করতাম, সেখানে খোলা আগুনের কুণ্ডগুলিতে ওরা এখন ওদের খাবার রাঁধে ।
এতটা পর্যন্তই ব্যস।
কিন্তু ওকে একই প্রশ্ন বারবার করা হচ্ছিল। কোথাও এসে শেষ হচ্ছিল না। কেবল যে টেইপটা বাজছে তারই সমাপ্তি আছে। আসলে কোনোভাবেই বোঝানো যাবে না ঠিক কীভাবে কেউ এটি বুঝতে শুরু করে। ফ্যাক্স কিংবা স্যাটেলাইটের মাধ্যমে তথ্য না পাওয়া সত্ত্বেও।
.......................
ইউরোপে থাকাকালীন সময়ে সেই কক্ষটিতে স্থাপিত টেলিযোগাযোগের মাধ্যমে কৃষাঙ্গ শাসকদের বিদেশী প্রতিনিধিদের সকল তথ্যের রেকর্ড ছিল। একদিন সে চলে গিয়েছিল সেখানে। বিদ্রোহীদের পোষাক পরে, ওর দাড়িসহ, যেন ওরা ওকে চাইলে গুলি করতে পারে, যেন ওরা বুঝতে পারে ওর পরিচয় এবং ও কতটা জানে। নৃসংসতার তথ্য নয়। অন্যসব কিছু; যা কিছু সে বলে দিতে পারলে ওর স্মৃতি থেকে নির্মমতার তথ্যগুলি মুছে ফেলা সম্ভব হবে; বিদ্রোহী সৈন্যদলের সম্পূর্ণ তথ্য, ওদের নেতা, ওদের অন্তর্দ্বন্দ্ব, ওদের সহযোগী, ওদের সরবরাহসমূহের উৎস, ওদের সকল গুপ্তঘাঁটির সঠিক অবস্থান এবং কর্মকাণ্ড। সব কিছু। সে যা কিছু ছিল এবং করে আসছিল,একদম প্যারাশ্যুট থেকে ঝাঁপিয়ে পড়া থেকে শুরু করে সেই টাওয়ারের ছবি তোলা—সব। ওরা ওকে গুলি করেনি। ওরা ওকে নিরাপদে রেখেছিল যাতে করে ও সব কিছু বলে দেওঁ য়ার আগে সেই পুরোনো ঘড়িওয়ালা টেলিযোগাযোগ সংস্থাপনাযুক্ত কক্ষের লোকেরা ওকে মেরে ফেলতে না পারে। ওর সংগে ব্যবহারে ওরা অতি সাবধানী ছিল; যেন কোনো বিরল প্রজাতি, যাকে অধ্যয়নের জন্যে আটকানো হয়েছে। ওর মূল্য সম্পর্কে ওরা ওয়াকেবহাল ছিল।
এই তথ্য উদ্ধার পর্বটিও ছিল অস্থিতিশীল করার মতোই, আসলে পরিভাষাটি পদ্ধতি কিংবা অভিজ্ঞতার অর্থ ধারন করে না। একের পর এক, ওর বুট জোড়া, সামরিক পোশাক, মাথার গোল টুপি, প্রথম শ্রেণির বিমান ভ্রমণ, ইউরোপের সেই বাড়ি, সম্মানার্থে সেইসব নৈশভোজ, গুপ্তচরের সম্মান—ওর জীবন সব কিছু কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। অন্ধকার ঘরের স্থিরভাবে চেয়ারে বসে থেকে সে এইসব কিছুর ভেতরে থাকা স্বরূপটিকে আবিষ্কার করতে পেরেছিল,কেবল ঘাড়ের পেছনের পুরো খোলা জায়গাটাই স্পন্দিত হচ্ছিল। টেপের বাজনা শেষ হলে হয়তো নিস্তব্ধতার ভেতর থেকে পিঁপড়েদের চলার শব্দ স্পষ্ট শোনা সম্ভব হতো।
ওরা জানত কোনো বিনিময় ছাড়া ওরা সেইসব তথ্যের কিছুই পাবে না—ওর জীবন নিলেও নয়। যদিও ওরা চুক্তি মোতাবেক বাগানসহ বাড়ির ব্যবস্থা করেনি। গাড়িও নয়। অবশ্যই ওর বাইরে যাওয়ার অনুমতি ছিল। যেখানে খুশি সে যেতে পারতো, কেবল প্রথম ছয় মাস ওর চলাফেরায় নিষেধাজ্ঞা বলবৎ ছিল। যখনই ওরা তাকে বিশ্বাস করা যায় জেনে গেল তখন থেকেই ওর ওপর থেকে ওদের সমস্ত উৎসাহ উবে গিয়েছিল। ওদের কাজে লাগে এমন কিছুই আর নেই ওর ঝুলিতে। ওদেরকে যা কিছু বলার কিংবা দেখানোর সবই শেষ হলে আর কিই বা প্রয়োজন তাদের কাছে?
ওদের কথাই ঠিক । হয়তো ওরা আর ওর কাছে কখনই আসবে না।
....................
মেয়েটি শোবার ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। সে বেশ রাত করেই ঘুমাতে যায়।
এখানে একটি মেয়েও থাকে। ওরা অবশ্য মেয়েটিকে পাঠায়নি। অথবা পাঠাতেও পারে, মেয়েটি সেদিন ওয়েটিং রুমে বসা ছিল যখন সে ওদের নজরদারীতেই ডাক্তার দেখাতে গিয়েছিল। ডাক আসতেই সে সৌজন্যের খাতিরে মেয়েটিকে আগে যেতে দিলো, মেয়েটি বেরিয়ে আসার পরেই ওদের আলাপ শুরু হয়।—আমি বুঝতে পারছি না কীভাবে এই ডায়েট অনুসরণ করবো, হাতে বৈদেশিক মুদ্রা না থাকলে এখানে আপনি কীভাবে বাজার করবেন—আপনি জানেন এখানে বাস করা কতটা কী।
সত্যি—প্রথমবারের মতো ওর মনে হয়েছিল হ্যাঁ তাই তো; সে তো এখানেই থাকে। হয়তো মেয়েটির যা দরকার সে জোগাড় করে দিতে পারে। মেয়েটি কোনো কিছু জানতে চায়নি; বৈদেশিক মুদ্রার উৎস নিয়ে আলাপ করাটা কোনো বিষয় হতে পারে না।
মেয়েটি সারা সকাল শোবার ঘরে ছিল, যেন কেউ থাকে না এখানে। এখন আবছা কক্ষটি ওর অবসন্নতা আরও দীর্ঘ করছে, দিন এবং রাতের মাঝে কোনো বিরতি নেই। গোলাপি পায়ের পাতায় হাতুড়ির মতো বাঁকা আঙুল তার। মেঝেতে পা টেনে ঘোরাফেরা করছে, মাঝে মাঝে জিভ তালুতে ঠেকিয়ে চকাস চকাস স্বাদু আওয়াজ করছে। গভীর নিশ্বাস টেনে বেশ সময় ধরে রাখল এরপর ছাড়ল ; কেননা সে কোনো কথা বলছে না।
তুমি কিছু খাবে না ?
মেয়েটি জানতে চাইল এরপর প্লেটের ঢাকনা তুলে হলুদ জমাট বাঁধা ডিমের কুসুমের স্তূপে তর্জনী দিয়ে স্পর্শ করল, জমাট পৃষ্টতলটিতে চকচকে গর্ত তৈরি হলো। মেয়েটি তার আঙ্গুল পরনের টি শার্টে মুছে নিলো, এটি তার রাতের পোশাক ছিলো। ঘরে রাখার গাছের একটি ডাল মেয়েটি এনেছিল একদিন এবং গ্লাসে লাগিয়েছিল,সেটি টেবিলের ওপরে যেখানে সে তাকে রেখেছিল সেখানেই আছে, এই আবছা কক্ষে দেখা যাচ্ছে ঘোলা জলে এটি একটি অতি দুর্বল মূল বার করে ভাসিয়ে দিয়েছে। মেয়েটি পিঁপড়েদের গতিপথ দেখতে নিচু হতেই ওর শরীর থেকে টকে যাওয়া দুধের মতো গন্ধ এবং তার নিজের বীর্যের গন্ধ মিলে মিশে ওর নাকে এসে লাগল। গত রাতে সম্ভোগ শেষে মেয়েটি তাকে বলেছিল : তুমি আমাকে ভালোবাসো না।
ওর তখন সেই বারো বছরের শিশুটির সংগে কমাণ্ডারের যৌন দৃশ্যটি মগজে কষাঘাত করেছিল।
এরপরেই মেয়েটি নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। লোকটি কাঁদছিল। মেয়েটি ভয় এবং ঘৃণায় বিছানার অন্যধারে সরে গিয়েছিল।
মেয়েটি সকাল থেকেই ঘরের ভেতর ওর আশেপাশে ঘুরঘুর করছে বুঝতে পেরেছে যে সে কথা বলবে না।
—আমরা সৈকতে যেতে পারি। চল সাঁতার কেটে আসি। আমার তো যেতে পারলে দারুণ লাগতো, কিছু চিঙড়ি খাওয়া যেতো। আমরা একটা বাস ধরে চলে যেতে পারি।একটা দারুণ জায়গা আছে ওখানে—বেশ সস্তাও। তোমার সাঁতার কাটতে ইচ্ছে হচ্ছে না , আমার তো জলে নামতে তর সইছে না… চল ।
মেয়েটা ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করছে ওর উত্তরের জন্য।
সে কি মাথা নাড়ল—একটু নড়ল বোধ করি। এখানে আর কিছু নেই যা নিয়ে সে কথা ঘোরাতে পারে, লোকটি কি বুঝতে পেরেছে যে সে তাকে ক্ষমা করে দিয়েছে, লোকটিকে বোঝার তার বিনীত চেষ্টা। খানিক পরে সে শোবার ঘরের দিকে পা বাড়াল এবং তৈরি হয়ে বেরিয়ে এলো।
আমি যাচ্ছি। (উপযুক্ত) : সাঁতারে যাচ্ছি।
এবার লোকটি মাথা নাড়িয়ে সাঁয় দিল এবং সিগারেটের জন্যে ঝুঁকল।
মেয়েটি এখনও দরজা খোলেনি। খানিক ইতস্তত করছে, যেন ভাবছে কিছু একটা বলা উচিত কিন্তু কী সেটা বুঝে উঠতে পারছে না, হয়তো এগিয়ে আসতে পারে এবং ওর চুলে হাত দিতে পারে।
মেয়েটি চলে গেল।
সিগারেটের ধোঁয়া ভেতরে যাওয়ার পরে ওর নিশ্বাস যেন ওর শরীর হলো, সে উঠে দাঁড়ালো এবং জানলার ধারে গেল। বাম থেকে ডানে পর্দা টেনে সরালো। খসখস, ফ্যাকাসে, রঙজ্বলা হয়ে গেছে পর্দা । এখন ও নিজেকে উন্মুক্ত করল : এই ভিখারী শহরটি যেন জ্বলজ্বল করে তাকে দেখছে, শহরটি খোল নলচে খুলে উলটে দেখাচ্ছে নিজেকে, বাঁচার জন্যে ছাদ নেই কোথাও, ঐ ভবনের সামনে দাঁড়ানো বৃদ্ধটি মৃত্যুর ক্ষণ গুনছে, অনাথ শিশুরা দল বেঁধে আবর্জনার স্তূপ ঘিরে ছুটছে, কান হারানো লোকটি কিংবা একদা যেখানে বাহু ছিল সেখানে লাঠি ধরা নারীটি, ওদের কোলাহল ওকে লক্ষ্য করে উঠে আসছে, এই সূর্যের আলোয় ভাসা ছয় তলার দিকে ধেয়ে আসছে। সে বাইরে বেরুতে পারে না কেননা এরা সবাই তাকে ঘিরে ধরে, এই মানুষের দল।
ঝাঁপ দাও। যেন মাটি থেকে ধাক্কাটা উঠে এলো ওর ভাঁজ করা হাঁটু লক্ষ্য করে, ঠিক হাওয়ায় ভাসা মসৃণ প্যারাশ্যুটের মতো।
সে সোজা হয়ে দাঁড়াল এরপর ঘরে ফিরে গেল।
এখন নয়; এখনও নয়। ·
লেখক পরিচিতি : নাদিন গর্ডিমার ছিলেন নোবেলজয়ী দক্ষিণ আফ্রিকান সাহিত্যিক, রাজনৈতিক কর্মী এবং বর্ণবাদবিরোধী নেত্রী। জন্ম : ২০ নভেম্বর, ১৯২৩। অসামান্য মানবতাবাদী সাহিত্যকর্মের জন্য ১৯৯১ সালে তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার এবং ১৯৭৪ সালে ম্যান বুকার পুরস্কার লাভ করেন। নৈতিক বিষয় এবং বর্ণবাদ গর্ডিমারের রচনার একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদী সরকারের শাসনামলে তার বার্গার্স ডটার ও জুলাইস পিপল উপন্যাস দুটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। তৎকালীন নিষিদ্ধ আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস দলের সাথে তিনিও অংশগ্রহণ করেন এবং বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। এছাড়াও তিনি এইডস বিষয়ে কাজ করেছেন। ২০১৪ সালের ১৩ জুলাই তিনি মৃত্যুবরণ করেন।


0 মন্তব্যসমূহ