ফ্ল্যানারি ও’কনোর গল্প : নাপিত


অনুবাদ : রঞ্জনা ব্যানার্জী

এটা লিবারেলদের জন্যে একটা পরীক্ষা ছিল।
সাদা ডেমোক্রেটদের প্রাথমিক নির্বাচনের পরপরই রেইবার তার নাপিত পাল্টেছিলেন। এর সপ্তাহ তিনেক আগে দাড়ি কামাতে কামাতে সেই নাপিত তাঁকে প্রশ্ন করেছিল, “আপনি কাকে ভোট দিচ্ছেন?”
“ডারমন,” রেইবার বলেছিলেন। “আপনি কি নিগ্রো প্রেমিক?”

চেয়ারে বসা রেইবার জোর ঝাঁকুনি খেয়েছিলেন। এমন হিংসাত্মক আক্রমণ তিনি দুঃস্বপ্নেও ভাবেননি। “না”, উওর দিয়েছিলেন তিনি। যদি অমন অতর্কিতে প্রশ্নটি না আসতো তবে তিনি হয়তো বলতেন, “নিগ্রো কিংবা সাদা কারও সঙ্গেই আমার প্রেম নেই।” ঠিক এই উত্তরটিই তিনি জেকবস নামের সেই দর্শনের শিক্ষককে দিয়েছিলেন এবং ডিলটনে লিবারেলদের প্রতিষ্ঠিত করার দুর্দমনীয় ইচ্ছেটাই ছিল মূল কারণ—জেকবসের মতো শিক্ষিত মানুষটিও—বিড়বিড় করে বলেছিল, “এটা খুবই দুর্বল প্রক্রিয়া।”

“কেন?” রেইবার সরাসরি জানতে চেয়েছিলেন। তিনি জানতেন জেকবসকে তিনি সহজেই তর্কে হারাতে পারবেন। জেকবস বলেছিল, “বাদ দিন।” জেকবস তাঁর নিজের শ্রেণিগত অবস্থানের ব্যাপারে বেশ সতর্ক থাকে। রেইবার আগেও খেয়াল করেছেন, যখনই কোনো বিতর্কিত মতামত দেবার মতো পরিস্থিতি ঘটে তখনই জেকবসের এই শ্রেণি-সচেতনতা প্রকট হয়।
“আমি নিগ্রো কিংবা সাদা কারই প্রেমিক নই,” নাপিতকেও এই কথাটিই হয়তো বলতেন রেইবার।

সাবানের ফেনার ভেতর দিয়ে পরিষ্কার একটা রেখা টেনে নাপিত তার হাতে ধরা ক্ষুরটি রেইবারের দিকে তাক করেছিল। “আমি আপনাকে বলছি, এখন কেবল দুটি পথই খোলা আছে—সাদা অথবা কালো। ভোটের প্রচারণার ধরন থেকে যে কেউ এটা স্পষ্ট মানবে। হক কী বলেছিল জানেন? বলেছিল দেড়শ বছর আগে তারা একজন আরেকজনকে তাড়া করত, একজন আরেকজনের মাংস খেত, বিশাল পাথর ছুঁড়ে পাখি শিকার করত, দাঁত দিয়ে ঘোড়ার খাল ছাড়াত। সেইসব নিগ্রোদের একজন এক সাদা নাপিতের দোকানে এসে চুলের মকশো করবার বায়না ধরে বলল ‘আমার চুল কাটো।” 

ওরা তাকে দোকানের বাইরে ছুঁড়ে দিয়েছিল, কিন্তু এই গল্পটা এখন বলছি আপনাকে বোঝানোর জন্য। এর কারণটাও শুনুন, এই তো গতমাসে মালফোর্ডে এমন তিন কালো হায়েনা একজন সাদাকে গুলি করে মেরে ওর বাড়ির অর্ধেকটা লুট করে ফেলল। এমন অঘটনের পরে ওরা এখন কোথায় আছে জানেন? ওখানকার কাউন্টি জেলে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের মতো আরামে আছে, আয়েস করে খাচ্ছে। রাস্তায় মারপিট করলে ওদের গায়ে নোংরা লাগতে পারে কিংবা ওদের হাতে পাথর দেখেও আপনাদের মতো নিগ্রো-প্রেমিকদের বুক ফেটে যেতে পারে ভেবেই এই ব্যবস্থা। তাই বলি, কোনো কিছুই আগের মতো সুস্থির হবে না, যতক্ষণ না আমরা এই মাথামোটাদের তাড়াতে পারি এবং এমন কাউকে জেতাতে পারি যে কিনা এই নিগ্রোগুলিকে তাদের নিজের চৌহদ্দিতে রাখতে পারে।”

“শুনতে পাচ্ছ জর্জ?” বেসিনের ধারে যে কালচে ছেলেটা মেঝে পরিস্কার করছিল তাকে উদ্দেশ্য করে নাপিত চেঁচিয়ে বলেছিল।
“ভালোই শুনতে পাচ্ছি।” জর্জ উত্তর দিয়েছিল।

এই সময় রেইবারের কিছু একটা বলা উচিত ছিল, কিন্তু যুতসই কিছুই তাঁর মনে পড়ছিল না। জর্জ নামের ছেলেটি যাতে বুঝতে পারে এমন একটা কিছু তিনি বলতে চাইছিলেন। সত্যি বলতে কি, জর্জকে এই আলাপে টানায় তিনি ঘাবড়ে গিয়েছিলেন। তাঁর মনে পড়েছিল জেকবস বলেছিল যে, সে একবার এক নিগ্রো কলেজে সপ্তাহখানেক মাস্টারি করেছিল। ওরা সেখানে নিগ্রো—নিগার—রঙের মানুষ—কালো এইসব শব্দ উচ্চারণ করে না। জেকবস বলেছিল প্রতি রাতে কলেজ থেকে বাড়ি ফিরে তিনি পেছনের জানালার পাল্লা খুলে চেঁচিয়ে বলতেন নিগার-নিগার -নিগার। রাইবার ভাবছিলেন জর্জের রঙের উৎস কি? ছেলেটি বেশ পরিপাটি দেখতে।

“যদি কোনো কাউলা আমার দোকানে চুল কাটার মতো দুঃসাহস করে সে ভালোমতই আমার সেবা পাবে,” নাপিত তার দাঁতের ফাঁকে একধরনের আওয়াজ করেছিল।
“তো আপনি এখনও সেই মোটা মাথা?”
রেইবার হকচকিয়ে গিয়েছিলেন, “মানে?”
“আপনি তারপরেও ডারমন?”
“আমি ডারমনকেই ভোট দিচ্ছি যদি তুমি তা বুঝিয়ে থাকো”, রেইবার নাপিতের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন।
“আপনি হকসনের বক্তৃতা শুনেছেন কখনও?”
“হুম। আমার সৌভাগ্য হয়েছে,” রেইবার বলেছিলেন।
“আপনি ওর শেষ বক্তৃতাটা শুনেছেন?”
“না। তবে আমি জানি এই লোকের বক্তৃতা নতুন হলেও বক্তব্য নতুন নয়।” রেইবার সংক্ষেপে উওর দিলেন।
“তাই বুঝি?” নাপিত উত্তর দিল। “কিন্তু তার শেষ বক্তৃতা সাংঘাতিক ছিল। বুড়ো হক মোটামাথাদের একদম বসিয়ে দিয়েছিল।”
“ভোটারদের বড় একটা অংশ কিন্তু” রেইবার বলতে শুরু করেছিলেন, “তাকে বক্তৃতাবাজ হিসেবেই চেনে।” কথাটা বলেই তিনি ভাবতে বসলেন জর্জ কি বক্তৃতাবাজ শব্দটার সঠিক মানে বুঝেছে। বরং “চাপাবাজ রাজনীতিবিদ” বলাই উওম ছিল।

"বক্তৃতাবাজ!” নাপিত তার হাঁটুতে চাপড় দিয়ে চেঁচিয়ে উঠেছিল। “ঠিক এই কথাটাই হক বলেছিলেন। “ভাইসব মজার কথা শুনুন!” তিনি উঁচু গলায় বলেছিলেন, “ঐ ফাঁকা মগজেরা বলে আমি নাকি বক্তৃতা বেচি?” তারপর খানিক পিছিয়ে গিয়ে নরম গলায় জানতে চেয়েছিলেন, “ভাইসব আপনারাই বলুন আমি কি বক্তৃবাজ?” উপস্থিত জনতা সমস্বরে বলেছিল, “না হক আপনি মোটেও বক্তৃতাবাজ নন!” তিনি এগিয়ে এসে ফের বলেছিলেন, “আরে ভাই আমি ঠিক তাই-ই। এই রাজ্যের শ্রেষ্ঠ উস্কানিদাতা আমিই! উফ আপনি যদি দেখতেন জনতা কীভাবে তখন উল্লাসে ফেটে পড়েছিল— আহা।”
“বেশ নাটুকে বটে,” রেইবার উত্তর দিলেন, “কিন্তু এটা আর কী…”

“ফকিরের পুতেরা” নাপিত গজগজ করতে লাগল, “ওরা আপনাকে একদম গিলে খেয়েছে। দাঁড়ান আমি আপনাকে আরেকটা ঘটনা বলি”...সে হক্সনের চৌঠা জুলাইয়ের ভাষণটা ফের দেখল। এটা আরেকটা মারানাস্ত্র ছিল, কবিতা দিয়ে উপসংহার টানা। ডারমনটা কে? হক জানতে চেয়েছিলেন। সত্যি তো, ডারমন কে? জনতা শোর তুলেছিল। ওরা চেনে না কেন? কেন, সে সেই লিটল বয় ব্লু, যে কিনা শিঙা ফুঁকছিল। হ্যাঁ, বাচ্চারা জলাভূমিতে আর নিগারগুলো ভুট্টা খেতে। কোনো ফকিন্নির পুত এই কথার বিরোধিতা করতে পারেনি।”

রেইবার ভাবছিলেন এই নাপিতের যদি অন্তত কিছুটা পড়াশোনা থাকত...
পড়ার কথা বাদ দিন। খানিক ভাবতে জানলেও চলতো। আজকাল লোকজনের এই হয়েছে সমস্যা—মানুষ আর ভাবে না, তাদের নিজস্ব ঘোড়াটির মগজের সমপরিমাণ জ্ঞানও রাখে না তারা। কিন্তু রেইবার কেন ভাবছেন না। উনার নিজের ঘোড়াসম কাণ্ডজ্ঞানটি কোথায়?

আমি কেন এসব নিয়ে হয়রান হচ্ছি। রেইবার নিজের ওপরে বিরক্ত হয়েছিলেন।
“না স্যার!” নাপিত বলছিল। “ভারী ভারী শব্দ কারও কাজে লাগে না। ওরা চিন্তার জায়গা নিতে পারে না।”
“চিন্তা”, রেইবার চেঁচিয়ে উঠেছিলেন, “তুমি নিজেকে চিন্তক ভাবছ?”
“শুনুন”, নাপিত বলে উঠেছিল, “আপনি জানেন টিলফোর্ডে হক লোকজনকে কী বলেছিল? টিলফোর্ডে হক বলেছিল উনি নিগারদের পছন্দ করেন ততক্ষণ, যতক্ষণ ওরা নিজেদের চৌকাঠ চেনে, যখনই ওরা সেইখান থেকে নড়ে যায় তখনই তাদের সঠিক জায়গায় বসিয়ে দেবার কাজটাও তাঁকেই করতে হয়।”

রেইবারের জানতে ইচ্ছে হয়েছিল এই কথার সঙ্গে চিন্তা-ভাবনার সম্পর্কটা কী?
অন্যদিকে নাপিতের মনে হচ্ছিল চিন্তা-ভাবনার বিষয়টা শুয়োরের সোফায় বসার মতোই সাফসুতরো। সে আরও অনেক ভালো কিছুও ভাবছিল, রেইবারকে সেইসব সে বলেও ছিল। রেইবারকে সে মালিন’স ওক, বেডফোর্ড আর চিকারভিলে হকসনের দেওয়া বক্তৃতাগুলি শুনতে বলেছিল।
রেইবার ফের চেয়ারে গুছিয়ে বসেছিলেন এবং নাপিতকে মনে করিয়ে দিয়েছিলেন যে তিনি দাড়ি কামাতে এসেছেন এখানে।

নাপিতও আবার দাড়ি কামানোতে মন দিয়েছিল। কিন্তু খানিক পরে ফের বলেছিল রেইবারের অন্তত স্পার্টসভিলের বক্তৃতাটি শোনা উচিত। “ফকিরের বাচ্চাদের কেউ ওখানে দাঁড়ানো ছিল না, আর রাখাল ছেলেগুলোর শিঙাই তো ভাঙা। হক বলল : নাপিত বলে যাচ্ছিল, “এখন এমন সময় এসেছে যখন তোমাদের শান্ত হয়ে তাদের পাশে বসতে...”
“আমার একটা কাজ আছে,” রেইবার থামিয়েছিলেন। “খানিক তাড়া আছে আমার,” এইখানে বসে এইসব বাকোয়াজ শোনার কোনো মানে হয় না।

যতই নোংরা হোক এই গর্দভতুল্য কথাগুলোই সারাদিন তাঁর মাথায় তা দিতে থাকল। এমন কি বিছানায় শরীর এলিয়ে দেওয়ার পরেও কথাগুলো তাঁর মাথায় ঘুরছিল। বিরক্তির সঙ্গে তিনি আবিষ্কার করলেন তিনি নাপিতের সঙ্গে আলাপের খুঁটিনাটি ঘুরেফিরে ভাবছেন এবং যদি সুযোগ থাকতো তবে কীভাবে তিনি উত্তর দিতেন সেটিও মাথায় মাথায় তৈরি করছেন। তাঁর জায়গায় জেকবস হলে কী উত্তর দিতো সেটিও ভাবছিলেন। জেকবসের একটা ব্যাপার আছে ওকে দেখে লোকজনের মনে হবে রেইবার যতটা জানেন ভাবেন তার চেয়েও বেশি জানে সে। তাদের পেশায় এই ভান ধরা দোষের নয়। রেইবার মাঝে মাঝে এইসব বিশ্লেষণ করে আমোদ পান। তবে জেকবস নাপিতকে ঠান্ডা মাথায় মোকাবেলা করত। রেইবার ফের সেই কথোপকথন মনে মনে ভাবছিলেন এবং জেকবস হলে কীভাবে উওর দিত তাও ভাবতে লাগলেন। তিনি শেষমেশ নিজেই উওর দিলেন।

পরেরবার যখন তিনি সেই নাপিতের দোকানে গেলেন তখন সেই তর্কাতর্কির পুরো ব্যাপারটাই তাঁর মাথা থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। নাপিতও যেন ব্যাপারটি ভুলে বসেছিল। সে সেদিন আবহাওয়া নিয়ে বিরক্ত ছিল এবং কথা বলছিল না। রেইবার ভাবছিলেন নৈশভোজে আজ কী আছে। ওহো আজ তো মঙ্গলবার। মঙ্গলবার তাঁর স্ত্রী কৌটোর মুরগি রাঁধেন। কৌটোর মুরগি বার করে চিজ সহযোগে সেঁকে নেন—এক টুকরো মাংস এক টুকরো পনির—বেশ ডোরা কাটা একটা ব্যাপার—প্রতি মঙ্গলবার কেন একই খাবার আমাদের খেতে হবে?—তুমি না চাইলে না খেতে পার—আপনি কি এখনও সেই মাথা মোটা?

রেইবারের মাথার পেছনে যেন জোর ঝাঁকুনি লাগল, “কী?”
“আপনি কি এখনও ডারমনের পক্ষে?”
‘হ্যাঁ,” রেইবার বললেন এবং তাঁর মগজ এর পরের কথাগুলি ঠিকঠাক সাজানোর কাজ দ্রুত শুরু করে দিয়েছিল।
“দেখুন, এখানে আপনারা শিক্ষকসমাজ জানেন বলেই মনে হচ্ছে আসলে...” সে খানিক ধন্ধে পড়ে গেছে। রেইবার দেখতে পাচ্ছিলেন গতবারের মতো এবার নাপিত অতটা আত্মবিশ্বাসী নয়, সে হয়তো নতুন কোনো তথ্যের চাপে আছে। “মনে হচ্ছে আপনারা শিক্ষকবৃন্দ হককেই ভোট দেবেন যেহেতু আপনারা তার শিক্ষকদের বেতন সংক্রান্ত বক্তব্যটি জেনে গেছেন। আমার মনে হয় এবার হয়তো আপনাদের সিদ্ধান্ত পাল্টাবে। কেন নয়? আপনারা আপনাদের মাইনে বাড়ুক চান না?”

“বেশি মাইনে!” রেইবার হাসতে থাকেন। “তুমি কি বুঝতে পারছ অমন একটা যাচ্ছেতাই গভর্নর থাকলে সে আমাকে বাড়তি যা দেবে তার চেয়ে বেশি টাকা আমাকে খোয়াতে হবে? “এতক্ষণে তাঁর মনে হতে লাগল এবার তিনি নাপিতের সংগে সমানতালেই খেলছেন। “কারণ হলো, তিনি নানা মতের মানুষ চান না,” তিনি বললেন। “সে আমাকে ডারমনের চেয়ে বেশি খরচ করাবে।”

“তো তাতে কী, যদি দিতে হয়ও?” নাপিত বলে উঠল। “আমি ভালো কিছুর জন্য পয়সা টিপে খরচ করি না। গুণগত মানের জন্য পয়সা ফেলতে রাজি।”
“আমি তা বুঝাইনি।” রেইবার উত্তর দিতে শুরু করলেন। “আমি বোঝাতে চাইছি...”
“হকের বেতন বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি উনার মতো শিক্ষকদের জন্যে নয় যদিও,” পেছন থেকে কেউ একজন বলে উঠল। এক মোটাসোটা ভদ্রলোক বড়কর্তাসুলভ ভাব নিয়ে রেইবারের কাছে এসে দাঁড়ালেন। 

“আপনি কলেজ শিক্ষক, তাই নয় কি?”
“হ্যাঁ,” নাপিত বলল, “এটা ঠিক যে হকের ওয়াদার বৃদ্ধি তিনি পাবেন না; কিন্তু তিনি তো ডারমন জিতলেও কিছু পাবেন না।”
“আহ্ তিনি কিছু পাবেন, সব স্কুলগুলো ডারমনের পক্ষেই। ওরা কিছু পরিমার্জনের জন্য দাঁড়াবেন—বিনেপয়সার পাঠ্যবই অথবা নতুন ডেস্ক অথবা অন্য কিছুর জন্যে প্রতিদিনই তো দাবি তুলবেন। এটাই খেলার শর্ত।”
“ভালো স্কুল,” রেইবার আমতা আমতা করলেন, “সবার জন্যই উপকারী।”
নাপিত বলেছিল, “একথা সেই কবে থেকে শুনে আসছি।”
“দেখুন,” লোকটি ওঁর কথার মাঝখানে ঢুকে পড়ল, “আপনি স্কুলের ক্ষেত্রে কোনও ছাড়ই দিতে পারেন না। সেই কারণেই ওরা টোপ দেয়—সবার জন্যেই কল্যাণকর কিছু।”

নাপিত হাসছিল।
“আপনি যদি অমন কিছু ভেবে থাকেন....” রেইবার বলতে শুরু করেছিলেন।
“হয়তো কক্ষের মাথায় আপনার জন্যে একটা নতুন ডেস্ক থাকবে,” লোকটা বিদ্রুপ করল। “কী বল জো”, এবং নাপিতকে গুঁতোল।

রেইবারের মনে হলো পা তুলে লোকটার থুতনি বরাবর কষে একটা লাথি দেয়। “আপনারা কি যুক্তি বলে কোন শব্দের কথা শুনেছেন কখনও?” তিনি মৃদু স্বরে বললেন।

“শুনুন,” লোকটা বলতে থাকে, “আপনার যা ইচ্ছে বলতে পারেন। আপনি যা বুঝতে চাইছেন না, তা হলো এখানে আমরা একটা সমস্যার মধ্যে আছি আমরা। ভাবুন কিছু কালো মুখ আপনার শ্রেণিকক্ষের পেছন থেকে আপনার দিকে তাকিয়ে আছে তখন আপনার কেমন লাগবে?”

রেইবারের এক মুহূর্তে জন্যে সব অন্ধকার মনে হলো কেউ যেন তাঁকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিচ্ছে। ঠিক এই সময়ে জর্জ ঢুকল এবং বেসিনগুলো পরিষ্কারের কাজে লেগে পড়ল। “আমি শিখতে ইচ্ছুক যে কোনো ব্যক্তিকেই শেখাবো সে কালো হোক কি সাদা,” রেইবার বললেন। তিনি ভাবছিলেন জর্জ কি চোখ তুলেছিল।

“ঠিক আছে,” নাপিত সম্মতি দিলেন, “কিন্তু একসঙ্গে নয় একথা তো ঠিক? সাদাদের স্কুলে যেতে তোমার কেমন লাগবে জর্জ?” সে চিৎকার করে জানতে চাইল।

“ব্যাপারটা আমার পছন্দ হবে না ,” জর্জ উত্তর দিল। “এখানে আরও গুঁড়ো সাবান লাগবে, এই বাক্সে যা ছিলো তা শেষ।” জর্জ বেসিনে গুঁড়ো ছড়াচ্ছিল।
“ গিয়ে কিনে আন যাও”, নাপিত উত্তর দিল।
“এখনই সময়,” সেই বড়কর্তা বলতে লাগল, “ঠিক যেমনটি হক বলেছিলেন আমরা এখন একটা গাধার পাশে দুই পা জোড় করে অনুভূতিহীন বসার পরিস্থিতে আছি।” সে হকসনের চৌঠা জুলাইয়ের ভাষণের পর্যালোচনা শুরু করে দিয়েছিল।

রেইবারের মনে হচ্ছিল লোকটাকে বেসিনের ভেতরে ঠেঁসে ধরে। দিনটা বেশ গরম এবং অসংখ্য মাছি এই মোটা গর্দভের কথা না শুনে কাটিয়ে দিচ্ছিল। তিনি দোকানের কালচে কাচের ভেতর থেকে আদালত ভবনের নিলচে সবুজ ঠান্ডা অলিন্দ দেখতে পাচ্ছিলেন। তিনি মনে মনে চাইছিলেন নাপিত হাত চালিয়ে কাজ করুক। তিনি তাঁর দৃষ্টি আদালত ভবনের উঠোনে স্থির করলেন। নিজেকে সেখানে কল্পনা করতে লাগলেন, যেখানে দাঁড়িয়ে গাছের পাতার নড়াচড়া দেখেই টের পাওয়া যায় যে হাওয়া বইছে। একদল লোক ধীরে আদালত ভবনের দিকে উঠে যাচ্ছে। রেইবার চোখ সরু করে দেখবার চেষ্টা করলেন। মনে হলো তিনি জেকবসকে চিনতে পারছেন। কিন্তু জেকবসের তো দুপুরের শেষে একটা ক্লাস আছে। কিন্তু জেকবসই তো মনে হচ্ছে। নাকি ভুল দেখছেন। যদি জেকবস হয় তবে সে কার সঙ্গে কথা বলছে? ব্লেইক্লি? ও কি ব্লেইক্লি? তিনি আরো চোখ সরু করলেন, তিনজন কালো বালক ঢিলে ঢালা স্যুট পরে ফুটপাত ধরে চলেছে। একজন রাস্তার ধারেই বসে পড়ল আর বাকি দুজন নাপিতের দোকানের জানালার কাচে ভর দিয়ে তাঁর দিকে ঝুঁকল, তাঁর দৃষ্টিসীমায় একটা গর্ত তৈরি হলো যেন। ওরা আর কোথাও দাঁড়াবার জায়গা পেল না? রেইবার প্রচণ্ড বিরক্তি নিয়ে ভেবেছিলেন। “তাড়াতাড়ি কর। আমার একটা জরুরি কাজ আছে।”

“আপনার তাড়া কীসের। বরং সেই রাখাল ছোঁড়ার জন্য অপেক্ষা করুন।”
“আপনি কিন্তু এখনও বলেননি কেন আপনি ওকে ভোট দিতে চান”, নাপিত জিভে আওয়াজ তুলে কথা বলতে বলেতে তাঁর ঘাড় থেকে কাপড়টা ছাড়াল।
“ঠিক,” মোটা লোকটা সম্মতি দিল। “দেখি আপনি আমাদের ভাল শাসন ছাড়া আর কি যুক্তি দিতে পারেন।”
“আমার এক জায়গায় যেতে হবে,” রেইবার বললেন, “ আজ আর সময় দিতে পারছি না।”

মোটা লোকটা আর্তনাদ করে উঠল, “আপনি জানেন ডারমন কী ভয়ানক দুঃখ পাবে যদি জানতে পায় যে আপনি ওর পক্ষে বলার মতো একটিও ভালো কথা খুঁজে পান নি।”

রেইবার বললেন, “শুনুন, আমি আগামী সপ্তাহ এখানে ফের আসব তখন ডারমনকে ভোট দেওয়ার সপক্ষে যত কারণ আপনারা চান সবই দেব, এমনকি হকসনকে ভোট দেওয়ার পক্ষে যা যা যুক্তি দেখালেন তার চেয়েও উত্তম সব যুক্তি।”
“আমি আশা করছি আপনি সেইসব দেখাতে পারবেন,” নাপিত বলল। “কিন্তু ব্যাপার হলো, আপনি কখনোই তা পারবেন না।”
“ঠিক আছে সময়ে তা দেখা যাবে।” রেইবার উত্তর দিয়েছিলেন।
“মনে রাখবেন” মোটা লোকটি ফোঁড়ন কেটেছিল, “কেবল উত্তম সরকার শব্দটি বললে চলবে না।”

“আমি এমন কিছু বলব না যা আপনার বোধগম্য হবে না,” রেইবার গজগজ করলেন, এবং খানিক পরেই নিজের অসন্তোষ এভাবে প্রকাশের জন্য নিজেকে তাঁর বোকা মনে হতে লাগল। মোটা লোকটা এবং নাপিত হাসছিল। “ বুধবার দেখা হচ্ছে,” বলেই রেইবার দোকান থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। ওদের উত্তম যুক্তি দেখানোর বিষয়টি বলাতে তাঁর নিজের ওপরেই প্রচণ্ড রাগ হচ্ছিল। যুক্তিগুলি ধাপে ধাপে কার্যকর করতে হবে। ওদের মতো মুহূর্তেই মগজ খেলাতে পারেননি তিনি। তিনি মনেপ্রাণে চাইছিলেন যেন তিনি পারেন, তিনি মনেপ্রাণে চাইছিলেন সেই ফকিন্নির পুত শব্দটিকে নিন্দা করা যেত। মনেপ্রাণে চাইছিলেন ডারমন তামাকের রসের পিক ফেলার বিষয়টিকে পাত্তা না দেওয়া জিরো। সময়মতো এবং বিপন্নতার সময় ঠিকঠাক শব্দগুলো কার্যকর করা বাঞ্ছনীয়। তাঁর হলোটা কী? কেন যুক্তিগুলো সময়মতো এলো না? নাপিতের দোকানে তিনি যদি মনোযোগ দিতেন তবে সব কিছুই হয়তো পালটে খেত।

তর্কের শুরুর জন্য প্রয়োজনীয় কাঠামোটি তিনি বাড়িতে ঢোকার আগেই গুছিয়ে ফেলতে পেরেছিলেন। তিনি ক্রমশ বুঝতে পারছিলেন এদের ফাঁকগুলো কোনো অপ্রয়োজনীয় শব্দ, কিংবা বিশাল শব্দ দিয়ে ভরানো যাবে না- এটি সহজ কাজ নয়।

তিনি তখুনি এটা নিয়ে কাজ করতে শুরু করলেন। তিনি নৈশভোজের আগেই চারটে বাক্য নির্মাণ করতে পেরেছিলেন এবং চারটিই ফের বাতিল করেছিলেন। তিনি খাওয়ার মাঝে একবার উঠে তাঁর ডেস্কে বসেছিলেন এবং এদের একটি পাল্টেও ছিলেন। খাওয়া শেষ করে ফের সেই পরিবর্তিত বাক্যটি বাতিল করেছিলেন।
“তোমার কী হয়েছে?” তাঁর স্ত্রী জানতে চেয়েছিল।
“কিছু না” তিনি বলেছিলেন, “কিছু না। আমাকে কাজ করতে হবে।”
“আমি তো বারণ করিনি,” তাঁর স্ত্রী উত্তর দিয়েছিলেন।

স্ত্রী বেরিয়ে যেতেই লাথি দিয়ে তিনি টেবিলের নিচের কাঠামোটি হালকা করে দিয়েছিলেন। রাত এগারোটার মধ্যেই তিনি একপাতা লিখে শেষ করতে পেরেছিলেন। পরদিন সকালে কাজটি সহজতর হলো এবং দুপুরের মধ্যেই তিনি সবটুকুই শেষ করতে পেরেছিলেন। তাঁর মনে হয়েছিল লেখাটি যথেষ্ট সরাসরি হয়েছে। “দুই কারণে মানুষ অপর এক মানুষকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করে।” এবং শেষ বাক্যটি হলো “যে মানুষ ধারণার কার্যকারিতা না ভেবে তা উদ্ধৃত করে সে আসলে হাওয়ায় হাঁটছে।” তাঁর মনে হলো এই শেষ বাক্যটি বেশ ফলপ্রসূ হয়েছে।

দুপুরের দিকে তিনি জেকবের অফিসে গিয়েছিলেন।
“ভালো কথা,” জেকবস বললেন। “তো কী হলো?” আপনি নিজেকে কী করছেন বলে সংজ্ঞায়িত করবেন?”

রেইবার যতক্ষণ তাঁর লিখিত বক্তব্য পড়ছিলেন, জেকবস সেই পুরোটা সময় তাঁর সামনে রাখা নথিতে সংখ্যামান টুকছিলেন।
রেইবার ভাবছিলেন আসলেই কি জেকবস ব্যস্ত। “নিজেকে এক নাপিতের আক্রমণ থেকে রক্ষা করছি,” রেইবার উত্তর দিয়েছিলেন। “আপনি কি কখনও কোনো নাপিতের সংগে তর্কযুদ্ধ করেছেন?”
“আমি কখনও তর্ক করি না।” জেকবস উত্তর দিয়েছিলেন।
“কারণ হলো আপনাকে এই ধরনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়নি,” রেইবার ব্যাখ্যা দিলেন। “মানে আপনার এই অভিজ্ঞতা হয় নি কখনও।”

জেকবস বিরক্ত হলেন, “অবশ্যই আমি এমন পরিস্থিতে পড়েছি ।”
“কী হয়েছিল?” রেইবার জানতে চান।
“আমি তর্ক করি না”, জেকবস উওর দিলেন।
“কিন্তু আপনি জানেন যে আপনি সঠিক,” রেইবার চাপ দিলেন।
“আমি তর্ক করি না।“
“আচ্ছা কিন্তু আমি তর্কে যাব,” রেইবার বললেন। “আমি সঠিক কথাটি ওরা ভুল শব্দ বলার আগেই বলে আসব। এটা হলো গতির খেলা। আমাকে বুঝতে হবে।”
“আমি তা বুঝেছি,’ জেকবস বললেন, “আশা করি আপনি তা পারবেন।”
“আমি ইতোমধ্যেই তা করেছি। আপনি লেখাটা পরে দেখেন”, রেইবার বোঝার চেষ্টা করতে লাগলেন জেকবস কি আসলেই মনোযোগী ছিল না কি অন্য কিছু নিয়ে ভাবছিল।
“ঠিক আছে রেখে যান। নাপিতদের সংগে তর্ক করে নিজের গায়ের রঙ নষ্ট করবেন না।”
“এটা করতেই হবে।” রেইবার বললেন।
জেকবস কাঁধ ঝাঁকালেন।

রেইবারের ক্ষীণ আশা ছিল যে জেকবসের সঙ্গে এটা নিয়ে খানিক আলোচনা হবে। “ঠিক আছে দেখা হবে।” বললেন রেইবার।
“ঠিক আছে।” জেকবস উত্তর দিলেন।
রেইবার ভাবতে লাগলেন প্রথমত তিনিই বা কেন লেখাটা ওঁকে পড়ে শোনাতে গেলেন?

মঙ্গলবার নাপিতের দোকানের উদ্দেশ্যে বেরুনোর আগে তিনি খানিক স্নায়বিক চাপে ছিলেন এবং ভেবেছিলেন লেখাটি তাঁর স্ত্রীর সামনে পড়ে দেখা যেতে পারে। তিনি জানতেন না আসলে তাঁর স্ত্রী নিজেই হকসনের দলে কি না। যখনই তিনি নির্বাচনের বিষয়টি তুললেন সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর স্ত্রী মন দিলেন, “তুমি পড়াও ঠিক আছে কিন্তু তার মানে এই নয় যে তুমি সব জানো।” তিনি কি কখনো সব জানেন এমন ভাব করেছেন? তিনি ভেবেছিলেন তাকে হয়তো ডাকা ঠিক হবে না। কিন্তু তিনি হাল্কা চালে বলতে পারেন তাঁকে কেমন শোনাচ্ছে সেটিই কেবল জানতে চান তিনি। এটা এত বড় কিছুও নয়, অতটা সময়ও নেবে না। সে হয়তো শুনতে ডাকলে বিরক্তও হতে পারে। এছাড়া তাঁর বক্তব্যে প্রতিক্রিয়াও হতে পারে স্ত্রীর। হতে পারে। কিন্তু তিনি ডেকে ফেলেছিলেন।

স্ত্রী রাজি হয়েছিলেন তবে হাতের কাজ শেষ হলেই আসবেন জানিয়েছিলেন, দেখা গেল একটি কাজ শেষ না হতেই তিনি আরেকটিতে ঢুকে যাচ্ছেন।

অতঃপর তিনি বলেছিলেন তাঁর হাতে বেশি সময় নেই। দোকান বন্ধ হতে আর মাত্র পঁয়তাল্লিশ মিনিট বাকি—খানিক তাড়াতাড়ি আসা যায় কি?

তিনি হাত মুছতে মুছতে এসেছিলেন এবং বলেছিলেন, “ঠিক আছে, ঠিক আছে তিনি তো এলেনই, নাকি? পড়া শুরু করলেই তো হয় এবার।”

তিনি বেশ হাল্কা চালে সহজভাবে স্ত্রীর মাথার ওপর দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করেছিলেন। শব্দগুলো ঘিরে তাঁর স্বর প্রক্ষেপণ বেশ ভালোই লাগছিল। তিনি ভাবছিলেন তাঁর স্বরের কারণে নাকি শব্দগুলোর নিজের ওজনে শুনতে এমন ভালো লাগছে। তিনি বাক্যের মাঝখানে থামছিলেন এবং স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে কেমন হচ্ছে তার আন্দাজ করার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু তিনি টেবিলের ওপরে রাখা ম্যাগাজিনটির খোলা পাতার দিকে মাথা খানিক হেলিয়ে রেখেছিলেন। তিনি থামা মাত্র স্ত্রী উঠে দাঁড়িয়েছিলেন, “খুবই ভালো হয়েছে”, বলেছিলেন এবং রান্নাঘরের দিকে চলে গিয়েছিলেন। রেইবার নাপিতের দোকানের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েছিলেন।

তিনি কী বলবেন নাপিতের দোকানে তা ভাবতে ভাবতে ধীরে হাঁটছিলেন এবং অন্যমনষ্কভাবে অন্য এক দোকানের জানালার সামনে থেমেছিলেন ব্লক ফিড কোম্পানির স্বয়ংক্রিয় মুরগি মারার যন্ত্রের বিজ্ঞাপন—“এমন কি দূর্বলচিত্তের লোকটিও তার পাখিকে মারতে পারবেন।” বিজ্ঞাপণচিত্রের ওপরে লেখা। রেইবার ভাবছিলেন আসলেই কি দূর্বলচিত্তের লোকেরা এইসব ব্যবহার করে? নাপিতের দোকানের কাছে আসতেই তিনি আবছা দেখতে পাচ্ছিলেন সেই বড়কর্তা হাবভাবের লোকটি কোণে বসে পত্রিকা পড়ছে। রেইবার দোকানে ঢুকে তাঁর টুপিটি যথাস্থানে ঝুলিয়েছিলেন।

“কেমন আছেন”, নাপিত সম্বোধন করে জাউল। “আজকের দিনটা বছরের সবচেয়ে উষ্ণদিন মনে হচ্ছে যদিও!”
“বেশ ভালোই গরম!” রেইবার উত্তর দিয়েছিলেন।
“শিকারের দিন শেষ হয়ে এলো”, নাপিত বলেছিল।

ঠিক আছে, রেইবার বলতে চাইছিলেন আমাদের কাজ শুরু হোক তবে। তিনি ভেবেছিলেন ওদের কথার সূত্র ধরেই তাঁর তর্ক শুরু করবেন। মোটা লোকটি তাঁকে দেখলই না।

“আপনি সেদিন যদি দেখতেন কীভাবে আমার কুকুরটা পাখির দলকে বার করে এনেছিল”, রেইবার চেয়ারে বসতেই নাপিত বলতে শুরু করেছিলে। “পাখিগুলো ছড়িয়ে পড়ার পরে আমরা চারটা শিকার করেছিলাম পরে আবার ছড়িয়ে পড়লে দুটো মেরেছিলাম। তত খারাপ নয়।”

“কখনও কোয়েল মারিনি।“রেইবার গম্ভীরস্বরে বলল।
“একটা কাউলা, একটা হাউন্ড কুকুর আর একটা বন্দুক হাতে কোয়েলের পিছু নেওয়ার মতো আর কিছু হতে পারে না,” নাপিত বলেছিল। “এই অভিজ্ঞতা না থাকা মানে জীবনে বিশাল কিছু হারিয়ে ফেলা,” নাপিত রায় দিয়েছিল।

রেইবার তাঁর গলা খাঁকাড়ি দিয়েছিলেন এবং নাপিত তার কাজ শুরু করেছিল। কোণের মোটা লোকটা পাতা ওল্টালো। ওরা আমার আসার কারণ কী ভাবছে ? রেইবার বোঝার চেষ্টা করছিলেন। ওদের ভুলে যাওয়ার তো কথা নয়। মাছিদের বনবন আওয়াজ শুনতে শুনতে এবং পেছনে অপেক্ষারত লোকজনের অস্পষ্ট কথাবার্তা শুনতে শুনতে তিনি অপেক্ষা করছিলেন। মোটা লোকটি আরও একটি পাতা উলটেছিল। জর্জের ঝাড়ু কক্ষের কোনো কোণে মৃদু আওয়াজ তুলে চলছিল, থামছিল, সে টেনে তুলছিল, আবার... “তো তুমি কি এখনও হকসনেই আছ?” রেইবার নাপিতকে জিজ্ঞেস করেছিলেন।

“হ্যাঁ,” নাপিত হাসছিল। “আরে আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম। আপনার তো ডারমনকে ভোট দেওয়ার কারণ নিয়ে আজ বলার কথা। এই যে রয়!” সে চেঁচিয়ে মোটা লোকটাকে ডেকেছিল, “এদিকে এসো আজ আমরা জানব কেন আমাদের কালা মানিককে ভোট দেওয়া উচিত।”

রয় বিরিক্তি সহকারে আরেকটি পাতা উল্টেছিল, “এই পাতাটা পড়ে পরে আসছি,” বিড়বিড় করে জানিয়েছিল।
“কাকে পেলে ওখানে জো?” পেছন থেকে কেউ একজন জানতে চেয়েছিল, “ভাল শাসনতন্ত্রের প্রবক্তাদের কেউ?”
“হ্যাঁ” নাপিত বলেছিল, “তিনি এখন বক্তৃতা দেবেন।”
“ঐ ধরনের অনেক কটা শুনে ফেলেছি আমি” লোকটি উত্তর দিয়েছিল।
“আপনি জনাব রেইবারের বক্তৃতাটি শোনেন নি এখনও”, নাপিত বলেছিল। “তাঁরটা চলে, যদিও তিনি ভোটের ব্যাপারটা বোঝেন না তাও চলে।”

রেইবার লাল হয়ে উঠেছিলেন। পেছন থেকে দুজন সামনে এগিয়ে এসেছিল। “এটা কোনো বক্তৃতা নয়,” রেইবার আপত্তি করেছিলেন। “আমি কেবল আপনাদের সঙ্গে সুস্থ আলোচনা করতে চেয়েছিলাম।”
“আরে এদিকে এসো রয়,” নাপিত মোটুকে ডেকেছিল।
“তুমি কী করতে চাইছ?” রেইবার নিচু স্বরে জানতে চেয়েছিলেন; এরপরেই হঠাৎ তাঁর মুখ থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল, “তুমি অন্য সবাইকে যখন ডাকছই তবে তোমার সেই জর্জ নামের বালকটিকেও ডাক। না কি ওকে শোনাতে ভয় পাচ্ছ?”

নাপিত কোনো উওর না দিয়ে এক মুহূর্ত রেইবারের দিকে তাকিয়েছিল। রেইবারের মনে হয়েছিল তিনি মনে হয় একটু বেশি রকমের ঘরোয়া হতে চেয়ে ফেলেছিলেন।
“ও শুনতে পারবে,” নাপিত বলেছিল,” ও পেছন থেকেই শুনতে পারবে।”
“ আমি ভাবলাম সে হয়তো শুনতে ইচ্ছুক হবে,” রেইবার বলেছিলেন।
“ও শুনতে পাবে,” নাপিত আগের কথার পুনরাবৃত্তি করেছিল,” ও যা শুনতে চায় তা শোনে, এবং যা শোনার তার দ্বিগুন শোনে। সে আপনি যা বলবেন না তাও শুনতে পারে এবং আপনি যা বলেন তাও।”
“কী খবর বালক,” রয় ওর পত্রিকা গুটাতে গুটাতে কাছে এসেছিল এবং রেইবারের মাথায় হাত দিয়ে বলেছিল, “চলেন আপনার বক্তব্য শুনি।”

রেইবারের মনে হচ্ছিল তিনি যেন জাল ছিঁড়ে বেরুনোর জন্যে লড়াই করছেন। ওরা সকলে তাঁকে ঘিরে ধরেছে, ওদের লাল মুখে কৌতুকের হাসি। তিনি শুনতে পাচ্ছিলেন শব্দগুলো টেনে বার হচ্ছে তাঁর মুখ থেকে, “যেভাবে আমি ভাবি মানুষ যখন কাউকে নির্বাচিত করে...” ওঁর মনে হছিল শব্দেরা যেন গাড়ির বহরের মতো বেরুচ্ছে তাঁর মুখ থেকে নড়ছে, একের পেছনে এক ঠেলাঠেলি করছে, ধাক্কা খেয়ে থামছে, পিছলে যাচ্ছে, পেছনে আটকাচ্ছে, কাঁপছে এবং হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল যেমন রুক্ষভাবে শুরু করেছিলেন। শেষ হয়ে গিয়েছিল। রেইবার নিজেই হতবাক হয়েছিলেন যে এত দ্রুত এটি শেষ হয়ে গেল। কিছুক্ষণের জন্য তাঁর মনে হচ্ছিল লোকজন কেউ কিছু বলল না, ওর হয়তো আরও শোনার অপেক্ষা করছে।

এরপরেই “কজন আপনার কালো মানিককে ভোট দেবে?” নাপিতের গলা শোনা গিয়েছিল।
কয়েকজন পেছনে ফিরে হাসচিল এবং একজন তো হাসতে হাসতে প্রায় দোভাঁজ হয়ে বসে পড়েছিল।
“আমি” রেইবার বলেছিল, “আমি এখনই ছুটছি ওখানে যাতে করে কাল সকালে কালো মানিককে আমিই প্রথম ভোটটা দিতে পারি।”

“শুনুন,” রেইবার বলেছিল, “আমি কোনো চেষ্টা করছি না…”
“জর্জ” নাপিত চেঁচিয়ে ডেকেছিল, “তুমি শুনেছ বক্তৃতা?”
“জ্বী স্যার,” জর্জ উত্তর দিল।
“তুমি কাকে ভোট দেবে জর্জ?”
“আমি কিন্তু এই বিষয়ে...,” রেইবার চেঁচাছিলেন।
“আমি জানি না ওরা আমায় ভোট দিতে দেবে কি না”। জর্জ বলেছিল। “আমি কি মি হকসনকে ভোট দেব?”

“দেখুন,” রেইবার চেঁচিয়েছিল, “আপনারা কী ভেবেছেন আমি আপনাদের মোটা মাথা পাল্টাতে এসেছি? আমাকে কী মনে করেছ তুমি?” তিনি নাপিতের কাঁধ ধরে ঝাঁকাতে শুরু করেছিলেন। “তুমি কি মনে করেছে তোমার মতো হদ্দবোকাকে আমি জ্ঞান দিতে এসেছি?”

নাপিত ওর কাঁধ থেকে রেইবারের হাত এক ঝটকায় সরিয়ে দিয়েছিল। “উত্তেজিত হবেন না,” সে বলেছিল। “আমরা সবাই ভেবেছি আপনি বেশ ভালো বলেছেন। সেটাই আমি এতক্ষণ বলছি আপনাকে ভাবতে হবে, আপনাকে”... রেইবার তাকে ঘুঁষি মারতেই সে টাল খেয়ে পেছনে চেয়ারের পাদানীতে বসে পড়েছিল। “ভেবেছি এটা ভালোই,” অর্ধেক সাবানের ফেনা তোলা রেইবারের মুখের ওপর জেগে থাকা জ্বলন্ত চোখের দিকে একভাবে তাকিয়ে নাপিত তার অসমাপ্ত বাক্যটি শেষ করেছিল। “এতক্ষণ ধরে আমি এই কথাটাই বলছিলাম।”

রেইবারের গলার কাছে রক্ত চড়ে ঠিক চামড়ার নিচে দপদপ করে যেন লাফাচ্ছিল। তিনি পেছন ফিরে দ্রুত তাঁর চারপাশের জমায়েতকে ঠেলে দরোজা দিয়ে বেরিয়ে এসেছিলেন। রাস্তায় তখন সূর্যের আগুনে হলকায় সব ভাসছিল, এবং তিনি প্রথম মোড়টায় পৌঁছানোর আগেই তাঁর গালের সাবানের ফেনা কলার বেয়ে নামতে শুরু করেছিল এবং নাপিতের আটকানো কাপড়টা হাঁটুর কাছে নেমে ঝুলছিল। ·


লেখক পরিচিতি
ফ্ল‍্যানারি ও’কনোরের জন্ম ১৯২৫ সনে, আমেরিকার জর্জিয়া প্রদেশের সাভান্নাহ শহরে। তাঁর পুরো নাম মেরী ফ্ল‍্যানারি ও’কনর। তিনি তাঁর নামের মেরী অংশটুকু ছেঁটে ফেলেছিলেন। বারো বছর বয়েসে পরিবারের সঙ্গে তিনি একই প্রদেশের দূরবর্তী শহর মিলেজভিলে চলে আসেন এবং সেখানেই তাঁর জীবনের বেশিরভাগ সময় লেখালিখি আর পোষা ময়ূরদের সঙ্গে কেটেছিল। ফ্ল‍্যনারি ও’কনর দুটি উপন্যাস, ত্রিশটির মতো গল্প এবং নানা বিষয়ে প্রবন্ধ লিখেছেন। কোনোরকম রাখঢাক ছাড়াই বর্ণবাদ, রাজনীতি, অভিবাসী, শ্রেণি বৈষম্য প্রভৃতি বিষয় তাঁর লেখায় উঠে এসেছে।
১৯৫১ সনে ফ্ল‍্যানারি দুরারোগ‍্য ব‍্যাধী “লুপাসে” আক্রান্ত হন। দীর্ঘ রোগভোগের পর মাত্র উনচল্লিশ বছর বয়েসে ১৯৬৪ সনে ফ্ল‍্যনারি ও’কনর মৃত‍্যুবরণ করেন।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ