পিসিমাদিদাকে দেখতে গিয়েছিলাম আমরা। একপাশ হয়ে শুয়ে থাকা ঐ মাংসপিণ্ডই যে পিসিমাদিদা আমার মানতে কষ্ট হচ্ছিল।
কী সুন্দর দেখতে ছিলেন পিসিমাদিদা! ধবধবে সাদা খোলের চিকন পাড়ের শাড়ি পরতেন। গা থেকে অগুরুর মিষ্টি গন্ধ বেরোতো। তা প্রায় ত্রিশ বছর আগেকার কথা!
আমার সাত বছর বয়সে দেখা সেই মুখের কোনো প্রামাণ্য চিহ্নই নেই এই মুখে! আমি দ্বিধা নিয়ে মায়ের দিকে তাকাই; মা ততক্ষণে চৌকির ধার ঘেঁষে বসে পড়েছেন। সেদিন প্রায় দু’ঘণ্টা ছিলাম ওখানে। মা কানের কাছে মুখ টেনে বেশ ক’বার ফিসফিস করে বলেছিলেন, 'পিসিমা, আমি রানু।' তিনি চোখ মেলেন নি। রাতে ট্রেন ছাড়তেই প্রদীপবাবুর ফোন---পিসিমাদিদা নেই আর। আমার কাঁধে মাথা রেখে মা হু হু কাঁদছিলেন। আর আমি ট্রেনের দুলুনির তালে শুনছিলাম সেই সুর, 'আমার পরাণে প্রেমের বিন্দু ...'
গত মাসে প্রদীপ রায় ফোন দিয়েছিলেন। মা যদি পারেন তবে যেন একবার আসেন চাটগাঁয়। পিসিমাদিদা মৃত্যুশয্যায়। মা’কে খুব দেখতে চাইছেন। প্রদীপবাবু ওঁর জ্ঞাতি ভাইপো। আমার ঘোর যায় না। পিসিমাদিদা বেঁচে আছেন!
চাটগাঁয় আমাদের কেউ নেই আর। দাদু-দিদা নেই; নেই বাড়িটাও। নিবারণ কাকার মৃত্যুর খবর বাবা ভাত মাখতে মাখতে খুব স্বাভাবিকভাবে দিয়েছিলেন। আমরা তখন রাতের খাওয়া সারছি। জোছনারাতে অসাবধানে পা-হড়কে পুকুরে পড়ে গিয়েছিলেন কাকা। সাঁতার জানতেন না। আমার কানে সেদিনও অবিরাম বেজে চলেছিল, 'আমার পরাণে প্রেমের বিন্দু তুমি শুধু তুমি...'
নিবারণ কাকার বাবা দাদুর বাড়ির দেখভাল করতেন। বছরে একবার পুজোর সময় আমরা সবাই যেতাম বাড়িতে। আনন্দের হাট বসতো তখন। জোছনা ঢালা ফকফকা উঠোনে গানের আসর হতো। নিবারণ কাকা মায়ের পছন্দের 'বর্ণে গন্ধে...' গাইতেন। কাকা চোখে দেখতে পেতেন না। জন্মান্ধ নয়। কী এক স্নায়ুর অসুখে দৃষ্টি হারিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু অসম্ভব সুন্দর ছবি আঁকতেন। বলতেন, 'মনের আলোয় দেখতে পাই।'
পুজোর ক’দিন দাদুর কাছারিতেই সবার জন্য পাত পড়তো। নিবারণ কাকা সেদিন খেতে যান নি। আমাকে মা খাইয়ে দিয়েছিলেন আগেভাগে। আমি কাকার ঘরে ঢুকে দেখি টেবিলে ঝুঁকে আঁকছেন কিছু। ওমা! প্রজাপতি। মাথা তুলে বলেছিলেন, 'ইচ্ছেদের ডানা দিচ্ছি।' আমি অবাক। ইচ্ছেদের ডানা থাকে! হঠাৎ আমারও অদ্ভুত ইচ্ছেটা জাগলো, 'আমার ছবি এঁকে দেবে?' কাকা আমার মুখে আলতো হাত বোলালেন, 'এই মুখ আমি এক টানেই আঁকতে পারি।' আমার আর তর সইছিল না। আঁকা শেষ হতেই আমি অবাক---'এ তো মা!’
নিবারণ কাকা ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিলেন। আমি ছবি নিয়ে একছুট্টে কাছারিতে। সবাই খাচ্ছে। পিসিমাদিদা তদারকি করছেন দাঁড়িয়ে। আমি বাবাকেই নালিশটা দিলাম, 'আমাকে আঁকতে গিয়ে মা’কে এঁকেছে নিবারণ কাকা!' হঠাৎ সব থমকে গেল। বাবা উঠে গেলেন খাওয়া ছেড়ে। আমি বোকার মতো দেখলাম ছবিটা ডানা ভেঙে পিসিমাদিদার পায়ের কাছে মুখ থুবড়ে পড়লো। পিসিমাদিদা ওটা কুড়িয়ে নিলেন মমতায়।
সেদিন রাতেই বাবা আমাদের নিয়ে ট্রেনে চেপেছিলেন। আমরা আর কখনো চাটগাঁয় যাইনি। ·
আসলামের বৌ
নিউমার্কেটে এসেছিলাম সোফার কাভার কিনতে। দামে বনলো না। রিয়াজুদ্দিন বাজারে একই কোয়ালিটির কাপড়ে মিটার প্রতি প্রায় কুড়ি টাকা সস্তা। সেলসম্যানকে এ কথা জানাতেই কাপড়ের রোলটা গুটিয়ে উত্তর দিলো, 'এটা একদরের দোকান।'
আমার পাশে বসা দুই মহিলা একের পর এক গাঁট নামিয়েই যাচ্ছেন। ওরা পর্দার কাপড় কিনবেন। ড্রইংরুমের বাকি সজ্জার সঙ্গে কী রং মিলবে সেটা নিশ্চিত হতে পারছেন না দুজনের কেউই। ওদের কাণ্ড দেখে ভাবছিলাম আমার সাধ্যে কুলাচ্ছে না আর ওদের সাধ্য অসীম কিন্তু সিদ্ধান্ত দুলছে। অল্পবয়েসী জনের মাথায় লেবু রঙের ওড়না। দোকানের ফকফকা আলোয় ওর হাতভর্তি সোনালি চুড়ি ঝিকমিকিয়ে চমকাচ্ছে।
নিউমার্কেটে দাম চড়া জানি, তবে এতটা ফারাক হতে পারে ভাবিনি। রিয়াজুদ্দিন বাজারে গিয়েছিলাম। পছন্দসই রং পেলাম না। পাড়ার দর্জি বলেছে রোজার দশ-বারো দিন আগে না-দিলে ঈদের সময় ডেলিভারি দিতে পারবে না। সোফার কাভার এবার না-পাল্টালেই নয়। সোহেলের পোস্টিং এখন ঢাকায়। দুই দিকে খরচ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছি আমরা। তার ওপর আম্মার ওষুধের খরচ, ফিজিওথেরাপি! আজ ছুটাবুয়াকেও বলে রেখেছিলাম থাকতে। বেকার সময়-নষ্ট হলো। বিষণ্ণতা গ্রাস করে আমাকে...
ফেরার জন্যে উঠে দাঁড়াতেই পাশ থেকে কেউ ডাকে, 'আরে... রেহনুমা!' ওড়না মাথার পাশের জন। ওঁর নাকছাবির বিশাল ঝকমকে সাদা পাথরে চোখ আটকে থাকে আমার। আসলামের আম্মা! আমাকে চিনলেন কীভাবে! ভদ্রমহিলা এগিয়ে এসে আমাকে প্রায় জড়িয়ে ধরেন। মসৃণ ম্যানিকিউর করা হাত! আমার ভিম-বারে বাসনমাজা আঙুলগুলো শাড়ির আড়াল খোঁজে। উনি খলবল করে বলেন, ‘আল্লাহ্! কত দিন পর দেখলাম তোমাকে। তোমার আম্মা-আব্বা কেমন আছেন?’
লেবু ওড়নাও পেছন ফেরে। মোমের পুতুল যেন! উনি পরিচয় করিয়ে দেন, ‘ও সোমা---আসলামের বৌ’। সোমা হাত উঠিয়ে সালাম দেয়। ওর সোনার চুড়ি ঝিকমিকিয়ে হাসে। আমি সহজ হওয়ার চেষ্টা করি, ‘আব্বা নাই। আম্মার প্যারালাইসিস।' ঠিক তখনই ফোনটা বাজে---রেশমি। হড়বড় করে কথা বলছে: ওর কোচিংয়ে যাওয়ার সময় হয়ে যাচ্ছে। স্কুল থেকে ফিরেছে সেই কবে! আম্মা আবার বিছানা ভিজিয়েছেন। বুয়া আমার দেরি দেখে চলে গেছে।
হঠাৎ কী যেন হয়! ফোন কানে চেপে দ্রুত বেরিয়ে পড়ি। টের পাই, অবাক দুই জোড়া চোখ হাঁটছে আমার পেছনে। ফোনের ওপারে রেশমি কী বলছে তার কিছুই কানে যাচ্ছে না। চোখে ভাসে অনেককাল আগের সেই চেহারা---আসলাম! মোড়ে ফোন-ফ্যাক্সের দোকান ওদের। কলেজের গণ্ডি পেরোয়নি। সারাদিন বাপের দোকানে বসে পাড়ার মেয়েদের যাওয়া-আসার হিসাব কষে।
আমার অনার্স ফাইনাল ইয়ার। খালাম্মা গাজরের হালুয়া নিয়ে এলেন এক বিকালে, সাথে বিয়ের প্রস্তাবও। আম্মা হতভম্ব। আব্বা সামলে উঠে ছেলের লেখাপড়ার ব্যাপারটা তুললেন। উনি বললেন, লোকে পাশ দেয় টাকা রোজগারের জন্যে। তার ছেলের সেটা আছে।
ভদ্রমহিলা চলে গেলে আম্মা গাজরের হালুয়া রান্নাঘরের নোংরার বালতিতে ঢেলেছিলেন...
রিকশায় উঠতেই হ্যান্ডেলের বাহারি আয়নায় শেষ বিকেলের রোদ ঠিকরে চোখে লাগে। মনে হয়, যেন আসলামের বৌয়ের চুড়িভরা হাত চমকাচ্ছে আয়নায়! ·
লেখক পরিচিতি : রঞ্জনা ব্যানার্জী গল্পকার, অনুবাদক। প্রকাশিত বই : তেত্তিরিশ, একে শূন্য, সম্পাদিত বই : বুকার পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখকদের গল্প সংকলন। অনূদিত বই : জর্জ অরওয়েলের অ্যানিমেল ফার্ম, প্রকাশ,২০২৫, কবি প্রকাশনী। রঞ্জনা ব্যানার্জীর বর্তমান বাসস্হান শার্লটটাউন, প্রিন্স এডওয়ার্ড আইল্যান্ড, কানাডা ।


1 মন্তব্যসমূহ
চমৎকার দুটি ছোটো আখ্যান। গল্পের এরকম গঠন খুব ভালো লাগে - দীপেন ভট্টাচার্য
উত্তরমুছুন